বঙ্গমাতা: প্রেরণাদায়ী ও মমতাময়ী সহচর



খায়রুল আলম
বঙ্গমাতা : প্রেরণাদায়ী ও মমতাময়ী সহচর

বঙ্গমাতা : প্রেরণাদায়ী ও মমতাময়ী সহচর

  • Font increase
  • Font Decrease

একজন নারী । যিনি তার সারা জীবন বিলিয়ে  দিয়েছেন দেশ ও জাতির তরে। যার ত্যাগের কারণেই আমরা পেয়েছি স্বাধীন দেশ ও একজন নেতা। যিনি বাংলাদেশকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন। খোকা থেকে মুজিব, মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু এবং সবশেষে বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতা হয়ে ওঠার পেছনে যে নারীর অবদান অনস্বীকার্য তিনি আর কেউ নন। তিনি আমাদের নারী জাতির অহংকার শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। যিনি সোনার বাংলা বির্নিমানে আড়ালে অন্তরালে থেকে রেখেছেন অসামান্য অবদান।

যিনি কখনো নিজের সুখ সাচ্ছ্যন্দ ও ভোগ বিলাসের কথা ভাবেনি। ভেবেছেন দেশ, দেশের মানুষ আর নেতা কর্মীদের কথা। বঙ্গবন্ধুর বন্দি জীবনে দক্ষ হাতে সামলিয়েছেন ছেলে মেয়ে, সংসার এবং ভেবেছেন নেতা কর্মীদের কথা। সেই দক্ষ সংগঠক মহিয়সি নারী বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।

তিনি এক মহীয়সী নারীর অনন্য উদহারণ। যিনি নিজের ও পরিবারের স্বার্থ ত্যাগ করে কাজ করেছেন বাঙ্গালী জাতির জন্য। যেমন বলা যায় এই লেখাটির অংশবিশেষে: ‘আপনি শুধু আমার স্বামী হওয়ার জন্য জন্ম নেননি, দেশের কাজ করার জন্যও জন্ম নিয়েছেন,দেশের কাজই আপনার সবচাইতে বড় কাজ,আপনি নিশ্চিত মনে সেই কাজে যান,আমার জন্য চিন্তা করবেন না।’ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জেলে থাকাকালে তার স্ত্রীর লেখা একটি চিঠির অংশ। এভাবেই স্বামীর পাশে থেকে সারাজীবন উৎসাহ এবং অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন বিজয়লক্ষী নারী জাতির পিতার অর্ধাঙ্গীনী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। স্বাধীনতার জন্য বঙ্গমাতার মহান ত্যাগ ইতিহাসে চিরভাস্মর হয়ে আছে। পিতৃ-মাতৃহারা এক অনাথ শিশু জীবন শুরু করেছিলেন শত প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে। নিজের আন্তরিকতা, প্রচেষ্টা ও মানসিক দৃঢ়তা দিয়ে এগিয়ে গেছেন তিনি। 

১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট । শেখ মোহাম্মদ জহুরুল হক এবং হোসেন আরা বেগমের কোল আলো করে শ্রাবণের দুপুরে জন্ম নিল এক মহিয়সী নারী ফজিলাতুন্নেছা যার ডাক নাম রেনু। মাত্র তিন বছর বয়সে তিনি তার পিতাকে হারান। তারপরে দু’বছরের মাথায় তার মাকে ও হারান। বড় বোন জিনাতুন্নেছা, ডাকনাম জিন্নি ও ছোট বোন ফজিলাতুন্নেছা এই দুই অনাথ শিশুর দায়িত্ব নেন বঙ্গমাতার দাদা শেখ মো. আবুল কাসেম। দাদার ইচ্ছায় মাত্র তিন বছর বয়সের ফজিলাতুন্নেছার সাথে দশ বছরের শেখ মুজিবুর রহমানের বিয়ে হয়। শাশুড়ি সায়রা খাতুন এবং শ্বশুর শেখ লুৎফর রহমানের কাছে তিনি বাড়ির বউ হয়ে থাকেননি, থেকেছেন নিজের সন্তান হয়ে। শিশু অবস্থায় বিয়ে হলেও বঙ্গমাতার সংসার শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর এন্ট্রান্স পাশের পর ১৯৪২ সালে।

ফজিলাতুন্নেছা মুজিব স্থানীয় একটি মিশনারি স্কুলে ভর্তি হলেও তার স্কুল জীবনের পড়ালেখা বেশি দূর এগোয়নি। তিনি ঘরে বসেই পড়ালেখা শিখেছেন। তারা যখন সংসার শুরু করেন, তখন বঙ্গবন্ধুর বয়স ১৯ বছর আর ফজিলাতুন্নেছার বয়স ১০ বছর। স্বামী বাইরে থাকাকালীন ফজিলাতুন্নেছা অবসর সময়ে বিভিন্ন রকমের বই পড়তেন, গান শুনতেন।

বাংলাদেশের মুক্তির দীর্ঘ  সংগ্রাম, স্বাধীনতা ও দেশ গঠনে, উচ্চারিত নাম মুক্তির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জাতির পিতার নামের সাথে শ্রদ্ধাভরে উচ্চারিত নামটি শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। যখনই আমরা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কথা বলি তখনই বঙ্গমাতার নাম চলে আসে।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণের সঙ্গে বঙ্গমাতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক দায়ের করা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি করে ৩৫ জন বাঙালি নৌ ও সেনাবাহিনীর সদস্য এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র্রদ্রোহের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করা হয়। বঙ্গবন্ধু এ মামলায় বিচলিত না হয়ে আইনিভাবে মোকাবেলার প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য আইনজীবীদের অর্থ জোগানোর জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেন। এ মামলায় বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হলে বঙ্গবন্ধুসহ সব রাজবন্দির মুক্তি দাবিতে বাঙালি রাস্তায় নামে। পূর্ব পাকিস্তানের রাজপথ বিক্ষোভে জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

বঙ্গবন্ধু কলকাতায় লেখাপড়া ও রাজনীতি করতেন, দফায় দফায় কারাবরণ করেছেন। এই নিয়ে কোন অভিযোগ ছিলনা তার। বঙ্গবন্ধু ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছেন, “রেনু খুব কষ্ট করত কিন্তু কিছুই বলতোনা। নিজে কষ্ট করে আমার জন্য টাকা পয়সা জোগাড় করে রাখত। যাতে আমার কষ্ট না হয়।”

১৯৪৪ সালের ডিসেম্বরে তাদের প্রথম সন্তান জন্মের সময় মারা যায়। দুই কন্যা ও তিন পুত্র সন্তানের মধ্যে ’৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহন করেন কন্যা শেখ হাসিনা, যিনি বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। ১৯৪৯ সালে পুত্র শেখ কামাল, ১৯৫৩ সালে শেখ জামাল, ১৯৫৭ সালে কন্যা শেখ রেহানা, ১৯৬৪ সালে পুত্র রাসেল জন্মগ্রহন করে।

অনন্য মানবিক গুণাবলী ছিল তার। ঘরে বসে নিজেই স্কুল খুলে মেয়েদের লেখাপড়া ও সেলাই শেখাতেন। গরীব ছেলেমেয়ে, এতিম, কন্যাদায়গ্রস্থ পিতামাতাকে অর্থ সাহায্য করতেন। দলের নেতাকর্মীদের চিকিৎসার খরচ যোগাতেন। সংগঠন ও আন্দোলন সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর প্রয়োজন মেটাতে নিজের সম্পদ বিলিয়ে দিতেন। তার কাছ থেকে কেউ কোনদিন রিক্ত হস্তে ফেরেনি।

এ প্রসঙ্গে কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন,“বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ রাজনীতিক জীবন, লড়াই, সংগ্রামে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত এসেছে, কিন্তু কখনো মাকে ভেঙ্গে পড়তে দেখিনি। যতো কষ্টই হোক আমার বাবাকে কখনোই বলেননি যে তুমি রাজনীতি ছেড়ে দাও বা সংসার কর বা খরচ দাও। আব্বা যে পদক্ষেপ নিতেন সেটাকেই সমর্থন করতেন তিনি।”

নিজের জমানো টাকা ও আবাসন ঋণ নিয়ে ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর বাড়ি নির্মান করেন। এ প্রসঙ্গে বেবী মওদুদ ‘মহীয়সী নারী বেগম ফজিলাতুন নেছা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, “সব কাজ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি করতেন। খরচ বাঁচানোর জন্য নিজের হাতে পানি দেয়া, ইট ভেজানোসহ বহু শ্রম, যত্ন ও মমতা দিয়ে বত্রিশ নম্বরের বাড়িটি নির্মান করেন।”

জাতির এক সন্ধিক্ষণে বঙ্গমাতা মুজিবের একটি সিদ্ধান্ত বাঙালিকে মুক্তির সংগ্রামে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়েছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় প্যারলে মুক্তি নিতে চাপ দেওয়া হয়। মাকে ভয় দেখানো হয়েছিল ‘পাকিস্তানিদের শর্ত না মানলে তিনি বিধবা হবেন।’ কিন্তু মা কোনো শর্তে মুক্তিতে রাজি হননি। আব্বাও প্যারলে মুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। শেষ পর্যন্ত গণ-অভ্যুত্থানে পাকিস্তান সরকার আব্বাকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।”

১৯৬৬ এর ৫ ফেব্রুয়ারি, বঙ্গবন্ধু বাঙ্গালীর মুক্তির সনদ ছয় দফা ঘোষণা করেন। ৮ মে নারায়নগঞ্জে ছয়দফার সমর্থনে জনসভা করে ঘরে ফেরার পর গভীর রাতে গ্রেফতার হন। ঐ সময় ছয়দফা না আটদফা বিভ্রান্তিতে অনেক নেতাও আটদফার পক্ষে কথা বলেন। ছয়দফা থেকে একচুলও নড়া যাবে না- বঙ্গবন্ধুর এই নির্দেশ বাস্তবায়নে বঙ্গমাতা ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখেন। ছয়দফার সমর্থনে বোরকা পরে জনসংযোগ করেন।

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের ক্ষেত্রেও রয়েছে বঙ্গমাতার বুদ্ধিমত্তার ছাপ। ওইদিনের ঘটনার স্মৃতিচারণ করে বঙ্গমাতার জন্মদিনের এক অনুষ্ঠানে তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ৭ মার্চ ভাষণের আগে কতজনের কত পরামর্শ, আমার আব্বাকে পাগল বানিয়ে ফেলছে! সবাই এসেছে-এটা বলতে হবে, ওটা বলতে হবে। আমার মা আব্বাকে খাবার দিলেন, ঘরে নিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। আব্বাকে সোজা বললেন, তুমি ১৫টা মিনিট শুয়ে বিশ্রাম নিবা। অনেকেই অনেক কথা বলবে। তুমি সারা জীবন আন্দোলন-সংগ্রাম করেছ, তুমি জেল খেটেছ। তুমি জান কী বলতে হবে? তোমার মনে যে কথা আসবে, সে কথা-ই বলবা।

৭১ এর ২৫মার্চ, দিবাগত রাতে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বত্রিশ নম্বর বাড়ি আক্রমন করে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পাকিস্তানী সেনারা। বঙ্গমাতা ছেলেমেয়ে নিয়ে প্রথমে পাশের বাসায় আশ্রয় নেন। বত্রিশ নম্বর বাড়ি তছনছ করে, টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর মা বাবার সামনে বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেয়। বড় ছেলে শেখ কামাল ২৫ মার্চ রাতেই মুক্তিযুদ্ধে যান, আটক অবস্থায় শেখ জামাল ও যান। উনিশবার জায়গা বদল করেও রেহাই পেলেন না, একদিন মগবাজারের বাড়ি থেকে ছেলে-মেয়ে সহ বঙ্গমাতাকে গ্রেফতার করে ধানমন্ডির ১৮ নম্বর রোডের একটি বাড়িতে রাখে পাকসেনারা, বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন কিনা জানতেন না। বন্দি অবস্থায় কন্যা শেখ হাসিনার সন্তান জন্ম নেয়ার সময় তাকে একবারের জন্যও ঢাকা মেডিক্যালে যেতে দেয়া হয়নি।

কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা ‘একজন আদর্শ মায়ের প্রতিকৃতি’ লেখায় এ প্রসঙ্গে বলেছেন,“জুলাই মাসের শেষ দিকে হাসু আপা হাসপাতালে গেল। মা যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েও যেতে পারলেন না। সৈন্যরা তাকে যেতে দিলনা। বলল, ‘তুমি কি নার্স না ডাক্তার যে সেখানে যাবে’ মা খুব কষ্ট পেয়ে সারারাত কেঁদেছিলেন।” বন্দি অবস্থায় তিনি অসুস্থ্য শ্বশুর-শ্বাশুড়ীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করান তৎকালীন পিজি হাসপাতালে (যা বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়), সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সাক্ষাৎ করতেন, খবরাখবর আদান প্রদান করতেন।

তাদের যুদ্ধ দিনের বন্দীদশার অবসান ঘটে ১৭ ডিসেম্বর। মুক্তি পেয়ে বঙ্গমাতা বাড়ির ছাদ থেকে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে টুকরো টুকরো করে আগুন ধরিয়ে দেন। জয় বাংলা শ্লোগান দেন। এসময় হাজার হাজার জনতা ছুটে আসে।

১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পান। এরপর সেখান থেকেই লন্ডনে যান। লন্ডন থেকেই বেগম মুজিবের সঙ্গে তার প্রথম কথা হয়। ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। অবসান ঘটে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছার দীর্ঘ প্রতীক্ষার। এরপর যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজেও বঙ্গবন্ধুর পাশে দাঁড়ান তিনি। অনেক বীরাঙ্গনাকে বিয়ে দিয়ে সামাজিকভাবে মর্যাদাসম্পন্ন জীবন দেন। 

স্বাধীনতার পর বীরাঙ্গনাদের উদ্দেশ্যে বঙ্গমাতা বলেন, ‘আমি তোমাদের মা।’ তিনি বলেন, ‘এই বীরাঙ্গনা রমণীদের জন্য জাতি গর্বিত। তাদের লজ্জা কিংবা গ্লানিবোধের কোনো কারণ নেই। কেননা তারাই প্রথম প্রমাণ করেছেন যে, কেবল বাংলাদেশের ছেলেরাই নয়, মেয়েরাও আত্মমর্যাদাবোধে কী অসম্ভব বলীয়ান। (দৈনিক বাংলার বাণী, ১৭ ফাল্গুন, ১৩৭৮ বঙ্গাব্দ)। ’

বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা অবিছিন্ন সত্তা ছিলেন। ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ গ্রন্থে মযহারুল ইসলাম লিখেছেন, “আমি বঙ্গবন্ধুর অনাবিল সাক্ষাতকার লাভ করেছি। একবার তিনি বলেন, ‘আমার জীবনে দুটো বৃহৎ অবলম্বন আছে-- একটি আমার আত্মবিশ্বাস, অপরটি --- তিনি একটু থেকে আমাকে বললেন, অপরটি বলুন তো কি?’ হঠাৎ এ-রকম একটি প্রশ্নের জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। তিনি একটু মৃদু হেসে বললেন,‘অপরটি আমার স্ত্রী, আমার আকৈশোর গৃহিণী।”

তিনি বঙ্গবন্ধুকে শক্তি, সাহস, মনোবল, অনুপ্রেরণা দিয়েছেন বলেই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, বঙ্গবন্ধু ‘জাতির পিতা’ হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু জীবনে যত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেছেন সবটাতেই বঙ্গমাতা তাকে ছায়ার মত সাহায্য করেছেন। ডঃ নীলিমা ইব্রাহিম বলেন,“রেণু ছিলেন নেতা মুজিবের Friend, Philosopher and Guide.”।

৭৫ এর ১৫ আগস্ট বাঙালী জাতির জীবনে নিকষ কালো অধ্যায়। খুনী মোশতাক, খুনী জিয়া বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। বঙ্গমাতা সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে ঘাতকদের বলেন,“তোমরা আমাকে এখানেই মেরে ফেল।” জীবনের মত মরণেও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গী হলেন এই মহাপ্রাণনারী।

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বাংলাদেশের ইতিহাসে নারীর ক্ষমতায়নের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং শ্রেষ্ঠ স্মরনীয় মানবী। বিশ শতকের প্রথমার্ধে নারীর অবরোধের বেড়াজাল উপেক্ষা করে সাহসী পদক্ষেপে বেরিয়ে আসেন তিনি। সহধর্মিণী হিসেবে নয়, রাজনৈতিক সহকর্মী হিসেবে আজীবন প্রিয়তম স্বামী শেখ মুজিবুর রহমানের ছায়াসঙ্গী ছিলেন শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ইতিহাসের কালজয়ী মহানায়ক শেখ মুজিবের অনুপ্রেরণাদায়িনী হয়ে পাশে ছিলেন। বাঙালি জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে ধাপে বঙ্গমাতার অবদান রয়েছে। আর সেটা বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী হিসেবে নয়, একজন দক্ষ নারী সংগঠক হিসেবে। যিনি ধূপের মতো নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন এবং বঙ্গবন্ধুকে হিমালয়সম আসনে অধিষ্ঠিত হতে সহায়তা করেছেন।

লেখক : যুগ্ম সম্পাদক , ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন(ডিইউজে)

ধরে রাখতে হবে এ জাগরণ



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

সাফ উইমেন চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের আগে ফুটবলার সানজিদা আখতারের একটা ফেসবুক পোস্ট ভাইরাল হয়েছিল। সেখানে ছাদখোলা চ্যাম্পিয়ন বাসের প্রসঙ্গ এসেছিল। আক্ষেপ কিংবা বাস্তবতা যা-ই থাকুক না কেন সামাজিক মাধ্যম লুফে নিয়েছিল সে পথ, সংবর্ধনার বিপুল আয়োজনের পথ রচনা হয়েছিল ওখানে। সামাজিক মাধ্যমের সেই তোলপাড় পৌঁছেছিল গণমাধ্যম হয়ে সরকারের উচ্চ মহলে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল সানজিদার ইঙ্গিতবহ আকুতি কিংবা স্বপ্ন আর সামাজিক মাধ্যমের ঝড়ে প্রভাবিত হয়েছিলেন। ব্যবস্থা করেছিলেন একটা ছাদখোলা বাসের।

রাজধানীতে আমাদের ছাদখোলা বাস ছিল না। ছাদসহ বাসকে ছাদখোলা বাসে রূপান্তরের ব্যবস্থা হয়েছে বিদ্যুৎ গতিতে। সরকারি পর্যায়ের সেই কর্মোদ্যম আমাদেরকে নাড়া দিয়েছিল, পুরো দেশে আলোড়ন তুলেছিল। সাফ উইমেন চ্যাম্পিয়নশিপ জেতা ফুটবলাররা তুমুল সংবর্ধনা পেয়েছেন রাষ্ট্রের। ছাদখোলা চ্যাম্পিয়ন বাসে করে বিমানবন্দর থেকে বিজয়ীরা এসেছেন মতিঝিলের বাফুফে ভবনে। সেখানে সংবাদ সম্মেলন হয়েছে। ফুটবল ফেডারেশনের কর্মকর্তারা ছিলেন, প্রতিমন্ত্রী ছিলেন, সচিব ছিলেন; ছিলেন আরও অনেকেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঢাকাবাসী বিজয়ী ফুটবলারদের তুমুলভাবে গ্রহণ করেছে। দিনভর অপেক্ষায় থেকেছে লক্ষ লোক, পথে পথে ছড়ানো হয়েছে ফুল, হয়েছে মিষ্টি বিতরণ। এ অভূতপূর্ব জাগরণ এক, নবজন্ম যেন ফুটবলের!

ফুটবল বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। আমাদের জাতীয় ফুটবল দল আন্তর্জাতিক ম্যাচ খুব বেশি খেলে না, খেললেও সাফল্য পায় না। কিন্তু যখনই ফুটবলের কোন অর্জন হয়েছে তখনই বিপুল জাগরণ হয়েছে দেশে। নিজেদের দেশের খেলা ছাড়াও এখনও রাত জেগে মানুষ ইউরোপীয় বিভিন্ন লিগের খেলা দেখে, আর বিশ্বকাপ ফুটবল এলে তো কথাই নেই-পুরো দেশ বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই বিভক্তির পুরোভাগে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ঠিক, তবে অন্য কিছু দেশের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সমর্থকও আছে দেশে। বিশ্বকাপ ফুটবলের সময়ে সারাদেশ ছেয়ে ভিনদেশের পতাকায়। পছন্দের দেশের ফুটবল দলের জয়ে উল্লাস করে, হারে ব্যথিত হয়; আবার বিভক্তিতে ঝগড়াফ্যাসাদেও জড়ায়। মানুষের শিরায়-শিরায় যে ফুটবল সেটা বিশ্বকাপ এলে টের পাওয়া যায়। গল্পটা যদিও ভিনদেশের ফুটবলকেন্দ্রিক, তবে এটা যে মানুষের আনন্দের অনুষঙ্গ সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

জাতীয় দলের ফুটবলাররা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য না পাওয়ায় আমাদের মাঝে হতাশা আছে, ফুটবল সংগঠকদের প্রতি খেদ আছে। তাদের ব্যর্থতা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বাদ-প্রতিবাদও আছে। তবে যখনই উপলক্ষ হয়েছে আনন্দের তখন সবাই বরণ করতে চেয়েছে ফুটবলারদের। সদ্যসমাপ্ত সাফ উইমেন চ্যাম্পিয়নশিপে ফুটবলাররা যখন শিরোপা জিতেছে তখন অন্তর্গত সেই উল্লাসে প্রকাশিত হয়েছে ফের। তৃতীয় পক্ষ হয়ে উল্লাস করে আসা আমরা এবার নিজেদের অর্জন নিয়েই আনন্দ করেছি, করছি। যদিও এটা বৈশ্বিক এমনকি এশিয়ারও শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি নয়, আঞ্চলিক একটা টুর্নামেন্টের শিরোপা; তবুও। ফাইনাল জেতার আগ থেকে শুরু হয়েছে আলোচনা, ফাইনাল জিতে হয়েছে তার বড়সড় প্রকাশ। এই কিছুদিন সামাজিক মাধ্যমে একটাই আলোচনা ছিল; ফুটবল এবং ফুটবল!

আমাদের কৃষ্ণা-সানজিদা-রূপনা চাকমারা যে পরিবেশে বেড়ে ওঠছে সেখানে পদে-পদে মৌলবাদের চোখ রাঙানি, ভয় আর অপবাদ। নারীর পোশাক নিয়ে যখন খোদ দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষা অঙ্গনে একশ্রেণির লোক ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে যায়, তখন প্রান্তিক এই মেয়েরা ও তাদের পরিবার কী অবস্থার মধ্যে তা ভাবা যায়? তার ওপর আছে অনেকের আর্থিক দৈন্য। আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া লোকজন সামাজিকভাবেই পিছিয়ে থাকে, এ চিত্র অজানা নয় আমাদের। সেই অবস্থা থেকে ওঠে আসা আমাদের মেয়েরা দেশে খেলতে এবং বিদেশে সাফল্য পেতে কী পরিমাণ সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে তা কেবল তারাই জানে। তারা একেকজন একেক সংগ্রামী। আর সে সংগ্রামের পথ ধরে তারা রচনা করেছে সাফল্যের সিঁড়ি।

শিরোপাজয়ী আমাদের ফুটবলারদের নিয়ে আমরা গর্ব করছি। প্রতিক্রিয়াশীলদের ধারাবাহিক চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে বলছি, এটা আঞ্চলিক এক ফুটবল টুর্নামেন্টের শিরোপা জয়ই কেবল নয়, এটা মানুষের মানুষ হিসেবে প্রকাশের বার্তা। আমরা বলছি, সামাজিক মাধ্যম, গণমাধ্যমসহ নানা জায়গায় এই বার্তা দিতে চেষ্টা করছি, কিন্তু তাদের যে সংগ্রাম সেটা তাদেরকেই করতে হয়। উদযাপন শেষে আমরা প্রত্যেকেই নিজস্ব পরিমণ্ডলে ফিরব, তারাও ফিরবে তাদের জায়গায়। সে সময় যদি ফিরে যায় পূর্বতন সময়ে, তখন কী হবে? এখানে দায়িত্ব নেওয়া উচিত রাষ্ট্রের। উদযাপন পর্ব শেষে এটাও যেন আমাদের মোহমুক্তির আরেক অনুষঙ্গ না হয়। বাসে ওঠলে কেউ যেন তাদের লাঞ্ছিত না করে, কেউ যেন টিপ্পনী না কাটে ফুটবলারদের।

একটা টুর্নামেন্টে জেতা নারী ফুটবলারদের নিয়ে সমাজে বিরাজমান সকল অপ-ধারার বিলোপ হয়ে যাবে এমনটা ভাবছি না। সম্ভবও না। তবে শুরুটা হতে পারে। টিপ্পনী কাটা, পোশাক নিয়ে কটু মন্তব্য ও খেলাধুলা নিয়ে সামাজিক যে সমস্যা তার সমাধানের পথে এই বিজয় অনুঘটক হতে পারে। নারীদের অবরোধবাসিনী করে রাখার যে ধারা সেটা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খোঁজার আরেক উপলক্ষ হতে পারে। যদিও কঠিন, তবু শুরু তো হতেই পারে।

বিজয়ী ফুটবলাররা নারী, অনেকের আর্থিক দৈন্য রয়েছে, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের আর্থিক সমস্যাও রয়েছে; সবকিছু আমলে নিতে হবে। প্রথমে নারী ফুটবলারদের সম্মানজনক বেতন-ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে। পুরুষ ও নারী ফুটবলারদের মধ্যে যে বৈষম্য রয়েছে তার সন্তোষজনক সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। যখন নারী ফুটবলার কিংবা ক্রিকেটাররাও পুরুষদের মতো সমান কিংবা সম্মানজনক পর্যায়ের বেতন-ভাতা পেতে শুরু করবে তখন আর্থিক বৈষম্য কমার পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্যও কমতে শুরু করবে। অনেক নারী ফুটবল, ক্রিকেট এবং অন্য খেলার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠবে। আর যখন বিপুল সংখ্যক নারী খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ হবে তখন সামাজিক বৈষম্যও ক্রমে কমতে শুরু করবে, সমাজে সম-অধিকারের বার্তা প্রতিষ্ঠা হবে।

সাফ উইমেন চ্যাম্পিয়নশিপ জেতা ফুটবলাররা দেশে এক জাগরণের সৃষ্টি করেছেন। এই জাগরণ ধরে রাখতে হবে। সানজিদা-কৃষ্ণা-রূপনারা জাগরণের ঢেউ তুলেছেন, এই ঢেউ স্তিমিত যেন না হয়!

;

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বৃক্ষের গুরুত্ব



ড.মতিউর রহমান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এটি আমাদের ভৌগলিক অবস্থান, জনসংখ্যার আধিক্য, প্লাবনভূমি, উচ্চ দারিদ্রের হার এবং প্রাকৃতিক সম্পদের উপর অত্যাধিক নির্ভরতার কারণে।

এটি এখন ক্রমাগত দৃশ্যমান যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে, বৈশ্বিক উষ্ণতা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেইসাথে খাদ্য উৎপাদনশীলতা এবং সুপেয় পানির প্রাপ্যতা হ্রাস পাচ্ছে। এছাড়াও পরিবেশগত বিপর্যয় ও দ্বন্দ্ব–সংঘাত বৃদ্ধি এবং বিশ্বব্যাপী ব্যাপক অভিবাসন বাড়ছে। বিভিন্ন সংক্রামক রোগ-ব্যাধি বাড়ছে। আমরা ইতোমধ্যে করোনা মহামারীর মত সংক্রামক ব্যাধি মোকাবিলা করছি। এছাড়াও ডেঙ্গু. ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া এবং কলেরার মতো অসুখও ক্রমাগত বাড়ছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বন্যা, খরা, দাবানল ইত্যাদি ঘটনা আমরা নিয়মিত প্রত্যক্ষ করছি।

জলবায়ু পরিবর্তন শুধুমাত্র মানব উন্নয়ন এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে প্রভাবিত করছে না বরং মানব নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের চেয়ে অন্য কোনো দেশ এর প্রভাব ভালো জানে না, যেখানে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় ভুগছে। বর্ষায় বৃষ্টিপাত কম হওয়া বা আকস্মিক, মারাত্মক বিপর্যয়মূলক বন্যা হওয়া এবং তাপমাত্রার তীব্রতা সম্প্রতি বৃদ্ধি পেয়েছে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাংলাদেশ উপকূলীয় অঞ্চলে জলাবদ্ধতা এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ক্ষয়, ঘূর্ণিঝড়, বন উজাড়, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি, কৃষি জমি সঙ্কুচিত হওয়া এবং স্থানীয় অভিবাসনের মতো নির্মম প্রভাবের সম্মুখীন হচ্ছে বাংলাদেশ।

বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, গ্রীষ্মমন্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় এবং উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষি জমিতে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশের কারণে, আগামীতে পরিবেশগত উদ্বাস্তু ক্রমেই বাড়বে।

সুতরাং পরিবেশগত এই বিপর্যয়ের মুখে আমাদের ভবিষ্যত পরিবেশগত, প্রতিবেশগত এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়াতে গ্রামীণ এবং শহর অঞ্চলে বেশি করে গাছ লাগানোর জন্য আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করা উচিত।

বলা হয়ে থাকে প্রতিটি জীব কোন না কোন উপায়ে গাছের উপর নির্ভর করে। গাছপালা এবং বনের অভাব আমাদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। আমরা যে ক্রমবর্ধমান জনাকীর্ণ কংক্রিটের জঙ্গলে বাস করি তার পরিপ্রেক্ষিতে, আরও গাছ লাগানো অপরিহার্য হয়ে ওঠেছে, এবং এটি আমাদের অনেক অপ্রয়োজনীয় খরচও বাঁচাতে পারে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন ৫০ বছর বেঁচে থাকা একটি গাছ $৩১,৫০০ মূল্যের অক্সিজেন তৈরি করতে পারে, বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য $৬২,০০০ সাশ্রয় করতে পারে, $৩৭,৫০০ মূল্যের পানির পুনর্ব্যবহার করতে পারে এবং $৩১,৫০০ মূল্যের মাটির ক্ষয় রোধ করতে পারে। তাছাড়া বাংলাদেশের মোট জিডিপির প্রায় ১.৭৪% বনভূমির অবদান।

গাছ সেচ ও পানিবাহী কাঠামো রক্ষা করে এবং নদী ও বন্দরকে চলাচলের উপযোগী রাখে। এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে উপকূলীয় অঞ্চলকে রক্ষা করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দূষণ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করে এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তাদের অবদান অপরিসীম। বনায়ন একটি দীর্ঘমেয়াদী উৎপাদন ব্যবস্থা, এবং সভ্যতার শুরু থেকেই বন সম্পদের একাধিক ব্যবহার স্বীকৃত।

গাছ একটি প্রাকৃতিক আবাসস্থল হিসাবে কাজ করে, বিভিন্ন উদ্ভিদ এবং প্রাণীকে বেঁচে থাকতে সহায়তা করে। তারা খাদ্য ও পুষ্টি সরবরাহ করার পাশাপাশি বনে আশ্রয় খুঁজতে থাকা বন্যপ্রাণীদের গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তার অনুভূতি প্রদান করে।

গাছ বায়ুমণ্ডলের অতিরিক্ত পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড এবং বায়ু দূষণকারী পদার্থকে সরিয়ে দেয়, যার মধ্যে সালফার ডাই অক্সাইড, ওজোন এবং নাইট্রোজেন অক্সাইড রয়েছে। বিনিময়ে, তারা আমাদের জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন দেয়। এমনকি জীববৈচিত্র্যও পালাক্রমে সমৃদ্ধ হয়।

গাছ সূর্য, বাতাস এবং বৃষ্টির প্রভাবকে পরিমিত করে জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে। গাছ ছায়া প্রদান করে গ্রীষ্মের তাপমাত্রাকে প্রশমিত করে এবং শীতকালে বাড়ির জন্য উষ্ণনায়ন হিসাবে কাজ করে। গাছ মাটির ক্ষয় কমায় এবং মাটির উর্বরতা বাড়াতেও সাহায্য করে এবং সমৃদ্ধ মাটি খাদ্যে পুষ্টি তৈরি করে, যা মানুষের স্বাস্থ্যে অবদান রাখে।

গাছের সবুজ প্রাকৃতিক দৃশ্যে রঙ যোগ করে এবং এর সৌন্দর্য বাড়ায়। বাড়ির চারপাশে লাগানো গাছ এবং গুল্মগুলি বাষ্পীভবন শীতল করার সুবিধা প্রদান করে এবং এটি চমৎকার শব্দ শোষণকারী। ফলজ গাছ বিভিন্ন প্রকার ফল দিয়ে আমাদের খাদ্যের অভাব পূরণ করে।

বেশি বেশি গাছ লাগিয়ে শব্দ দূষণ অনেকাংশে কমানো যায়। গাছ লাগানোর ফলে বন্যার পানি ব্যবস্থাপনার সুবিধা হয় এবং গাছ বৃষ্টির পানিকে মাটির উপর দিয়ে প্রবাহিত না করে মাটিতে প্রবেশ করতে দিয়ে বন্যার ঝুঁকিও কমিয়ে দেয়।

নতুন গাছ লাগিয়ে বিশুদ্ধ পানীয় জলের চাহিদাও মেটানো যায়। বন এবং গাছপালা প্রাকৃতিকভাবে বৃষ্টির পানির প্রবাহকে ধীর করে দেয়, যার ফলে এটি ফিল্টার হয়। বৃষ্টির পানি ভূগর্ভস্থ স্টোরেজ ট্যাঙ্ক বা জলাশয়ে সংরক্ষণ করে আমরা নিরাপদ পানির ব্যবহার বাড়াতে পারি।

এছাড়াও, গাছ সমুদ্রের নোনা জলের সাথে বিশুদ্ধ পানির মিশ্রিত হতে বাধা দেয়। বাংলাদেশে, স্থানীয় জনসংখ্যার বনজ পণ্যের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে এবং পরিবেশগত ও জলবায়ুগত অবক্ষয় রোধ করতে তৃণমূল পর্যায়ে বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচি চালু শক্তিশালী করতে হবে।

এই ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা মাটি ও পানির সম্পদ সংরক্ষণের জন্য আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে পারি এবং আমাদের জনসংখ্যার আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি করতে পারি। বিশেষ করে, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রদান করতে পারে বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচি। সুতরাং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বেশি করে বৃক্ষ রোপণের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করতে হবে।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।

;

স্বপ্ন দেখতে অন্যের সহায়তা প্রয়োজন



মো. কামরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

গত পচিশ বছর বেসরকারি বিমানসংস্থাগুলো বাংলাদেশের এভিয়েশনে টিকে থাকার জন্য লড়াই করছে। এই লড়াইয়ে বাস্তবিক চিত্র কোনোভাবেই সুখকর নয়। ৮ থেকে ৯টি বেসরকারি এয়ারলাইন্স শুরু থেকেই ইতিহাস হয়ে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত অনেক দাবিই অপূর্ণ ছিলো।

অনেক দাবির মধ্যে বেসরকারি এয়ারলাইন্সের জন্য হ্যাঙ্গার সুবিধা ছিলো অন্যতম। দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর পর রেগুলেটরি অথরিটি সিভিল এভিয়েশন সেই প্রত্যাশা পূরণ করেছে। বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছে। যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে পরিশেষে গুরুত্বারোপ করে এয়ারক্রাফটগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম সুষ্ঠভাবে সম্পাদনের জন্য যাত্রীবাহী এয়ারলাইন্সগুলোকে হ্যাঙ্গার সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু বিগত দিনে বন্ধ হয়ে যাওয়া এয়ারলাইন্সগুলোও হ্যাঙ্গার প্রাপ্তির জন্য বহুবার তাগাদা দিয়েছে কিন্তু দাবী পূরণ হওয়ার পূর্বেই সেই এয়ারলাইন্সগুলো ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।

এ্যারোনোটিক্যাল চার্জ। এই চার্জের মধ্যে সাধারণত ল্যান্ডিং, পার্কিং, রুট নেভিগেশন, সিকিউরিটি অন্যতম। ব্যবসায়িক গতিশীলতা বজায় রাখার জন্য বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো সিভিল এভিয়েশনের কাছে সবসময়ই চার্জ কমানোর জন্য যৌক্তিক দাবি তুলে আসছে। এইসব চার্জের কারনে সরাসরি অপারেশন খরচ বেড়ে যায়, যা যাত্রী ভাড়ার উপর প্রভাব পড়ে। যাত্রী ভাড়াকে সহনীয় রাখার জন্য চার্জ কমানোর কোনো বিকল্প নেই।

দেশীয় এয়ারলাইন্স এর ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা চার্জ সমহারে নির্ধারণ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে এয়ারলাইন্সগুলোর পক্ষ থেকে। বিশেষ করে এ্যারোনোটিক্যাল চার্জ অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের তুলনায় আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে প্রায় নয় থেকে দশ শতাংশ বেশী, যা একটি দেশীয় এয়ারলাইন্স কখনো প্রত্যাশা করে না।

সঠিক সময়ে চার্জ প্রদান না করতে পারলে মাসে ৬ শতাংশ হারে বাৎসরিক ৭২ শতাংশ হারে সারচার্জ প্রদান করতে হয়। যা পার্শ্ববর্তী যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশী। সারচার্জ ১২ শতাংশ হারে নির্ধারণ করার জন্য বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো শুরু থেকেই দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু সে দাবি পূরণ না করার কারনে এয়ারলাইন্সগুলো চার্জ ও সারচার্জ বকেয়া রেখেই ব্যবসা গুটিয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। অধিক হারে চার্জ নির্ধারণ সময়মতো চার্জ প্রদান না করার প্রধান কারণ বলেই মনে হয়ে্ছে।

বিভিন্ন সময় সংবাদ মাধ্যমে দেখা যায় বিভিন্ন এয়ারলাইন্স বিশেষ করে বন্ধ হওয়া এয়ারলাইন্সগুলো আর জাতীয় বিমান সংস্থার কাছ থেকে চার্জ আর সারচার্জ মিলিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা বকেয়া পাওনা রয়েছে সিভিল এভিয়েশনের। যৌক্তিক হারে চার্জ ও সারচার্জ নির্ধারণ করলে সিভিল এভিয়েশনকে বিশাল অংকের টাকার হিসাব বহন করতে হতো না।

বন্ধ হওয়া এয়ারলাইন্স জিএমজি, ইউনাইটেড ও রিজেন্ট এর কাছে প্রায় হাজার কোটি টাকার হিসাব আছে বকেয়া হিসাবে, যা আদৌ কোনোদিন আদায় করার কোনো সুযোগ আসবে কিনা সন্দেহ আছে। এছাড়া স্বল্প সময়ে অপারেশনে থাকলেও এ্যারো বেঙ্গল, এয়ার পারাবাত, বেস্ট এয়ার, এভিয়ানা এয়ারওয়েজ এর কাছেও বকেয়া হিসেবে পাওনা আছে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের। যা অনেকটা ”জনম বাকী” হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। এছাড়া অনেক বিদেশি এয়ারলাইন্স এর কাছেও বিভিন্ন চার্জ বাবদ পাওনা রয়েছে সিভিল এভিয়েশনের।

নন- এ্যারোনোটিক্যাল চার্জ বিমানবন্দরের ভিতরে কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য বিভিন্ন জায়গা ভাড়া নেয়ার সুযোগ আছে। ব্যবসা হোক কিংবা না হোক বছরান্তে ভাড়া বৃদ্ধির প্রবণতাও দেখা যায় কর্তৃপক্ষের। নন-এ্যারোনোটিক্যাল চার্জ সহনীয় পর্যায়ে রাখলে এয়ারলাইন্সগুলো টিকে থাকার জন্য সহজ হবে।

সময়কে বিবেচনা না করে অনেক সময়ই বিভিন্ন ধরনের চার্জ আরোপ করতে দেখা যায়। উদাহরণ স্বরূপ কোভিড কালীন সময়ে এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম খাত বিশ্বব্যাপী চরমভাবে বিপর্যস্ত ছিলো, বিভিন্ন দেশ যেখানে এখাতকে টিকিয়ে রাখার জন্য যারপর নাই চেষ্টা করেছে, সেখানে বাংলাদেশ এভিয়েশনে এয়ারপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ও সিকিউরিটি খাতে নতুন করে চার্জ আরোপ করেছে। যা সময়ের কাছে অযৌক্তিক মনে হয়েছে। কারন এয়ারপোর্ট ডেভেলপমেন্টও যেমন দরকার তেমনি সিকিউরিটিও প্রয়োজন কিন্তু চার্জ আরোপের ক্ষেত্রে সময়কে বিবেচনায় রাখা খুবই জরুরি।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন যাকে একনামে বিপিসি হিসেবে খুবই পরিচিত। সেবা ধর্মী একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বিপিসির কার্যক্রম দেখলে মনে হয় যেন মনোপলিস্টিক বিজনেস-ই লক্ষ্য। জেট ফুয়েলের মূল্য নির্ধারণে দেশের এভিয়েশন খাতকে বিবেচনায় না রেখে লাভ-ক্ষতির হিসেবকেই প্রাধান্য দিয়ে আসছে। জেট ফুয়েলের উচ্চ মূল্য বাংলাদেশ এভিয়েশনের অস্থিরতার পিছনে মূখ্য ভূমিকা রাখছে। কারন হিসেবে যেকোনো রুটের অপারেশনাল খরচের প্রায় ৫০ শতাংশই হচ্ছে জেট ফুয়েলের খরচ। জেট ফুয়েলের মূল্য নির্ধারণে সতর্কতা অবলম্বন না করলে বাংলাদেশের এভিয়েশন কখনই বিদেশি এয়ারলাইন্সের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না।

অনেক সময়ই আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে মূল্য নির্ধারনে সমন্বয়হীনতা দেখা যায়। কোভিড কালীন ও কোভিড পরবর্তীতে বিদ্যূত গতিতে পূর্বের ক্ষতিকে কাটিয়ে উঠার জন্য ধারাবাহিকভাবে মূল্য বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিলো বিপিসি। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে জেট ফুয়েলের মূল্য কমলেও কচ্ছপ গতিতে লিটার প্রতি জেট ফুয়েলের মূল্য কমানোর হার দেখা যাচ্ছে। যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম খাতে গ্রীষ্মকালীন সূচিতে যাত্রী বৃদ্ধির হার থাকে নিম্নমূখী, সেই সঙ্গে দেশে মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে ও পদ্মা সেতু উদ্বোধনের কারণে দক্ষিণবঙ্গের যাত্রী হ্রাস পাওয়ায় বরিশাল ও যশোর রুটে ফ্লাইট সংখ্যার সাথে যাত্রী ভাড়া কমিয়ে সেবার মান ঠিক রাখার চেষ্টা করছে এয়ারলাইন্সগুলো।

দেশের আকাশ পথের গতিশীলতা বজায় রাখতে দেশের অভ্যন্তরে বন্ধ হওয়া বিমানবন্দরগুলোকে পুনরায় চালু রাখলে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো টিকে থাকার সুযোগ পাবে। সাথে সারাদেশকেই আকাশ পথে সংযোগ স্থাপনের সুযোগ তৈরি হবে।

নানারকম সুযোগপ্রাপ্তিতে এগিয়ে থাকা জাতীয় বিমানসংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এর সাথে বেসরকারি বিমান সংস্থাসমূহের লেবেল প্লেয়িং ফিল্ডের দাবী শুরু থেকেই। জ্বালানি তেল প্রাপ্তিতে কিংবা সিভিল এভিয়েশন অথরিটির পাওনা পরিশোধে ”এক্সট্রা খাতির” বরাবরই দেখা যায়। অথচ হাজার হাজার কোটি টাকা না পরিশোধ করেই প্রায়ই লাভের হিসাব দেখা যায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে।

দেশের এভিয়েশনের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন, সিভিল এভিয়েশন অথরিটি কিংবা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এর দ্বি-নীতি পরিহার করলে ভবিষ্যতে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো সুসংহত হবে। বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোর বন্ধ হওয়ার মিছিলের লাগাম টেনে ধরে এগিয়ে যাওয়ার মিছিল শক্তিশালী হবে।

বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো শুরু থেকেই আকাশ পরিবহনের ব্যবসায় টিকে থাকার স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন, সিভিল এভিয়েশন অথরিটি, সিভিল এভিয়েশন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি সেবা মূলক ও নীতি নির্ধারণী প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ সহযোগিতার ওপর।

লেখক: মোঃ কামরুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

;

সাংবাদিকতা বনাম অপসাংবাদিকতা!



সোহেল মিয়া
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

পৃথিবীর সব পেশায় মহান। তারপরেও মহৎ ও সেবামূলক পেশা হিসাবে সমাজে বেশি প্রচলিত রয়েছে সাংবাদিকদের নাম। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের সম্মান নিয়ে পেশাটি এখনো সগৌরবে রয়েছে। কিন্তু এই সেবামূলক পেশাটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে একটি ধূর্তবাজ গোষ্ঠি। সাংবাদিকদের মধ্যে পেশাদারিত্বের এখন বড় অভাব। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের সাংবাদিকদের সাথে বর্তমান সময়ের সাংবাদিকদের তফাৎ অনেক। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের সাংবাদিকদের যে পেশাদারিত্ব ছিল তা এ যুগের সাংবাদিকদের মধ্যে এখন নেই বললেই চলে।

পেশাদারিত্বের কথা মুখে বললেও অন্তরে পোষণ করছে ভিন্নতা। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে চলছে এই পেশাটি। দিন যত যাচ্ছে ততই সাংবাদিকতার নামে অপসাংবাদিকতা বেড়েই চলেছে। একটু চোখ-কান সজাগ রাখলেই বুঝতে পারবেন সাংবাদিকতার নামে অপসাংবাদিকতার কি ভয়াবহতা।

অপসাংবাদিকতা রোধে সরকার বারবার উদ্যোগ নিয়েও অদৃশ্য কারণে মাঝ পথে থেমে যাচ্ছে। অপসাংবাদিকতা রোধে সারা দেশের সব সাংবাদিকদেরকে অনলাইন ডেটাবেসে যুক্ত করতে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল যে নীতিমালা চুড়ান্ত করেছে সেটার বাস্তবায়ন কবে হবে সেটাও অজানা।

ডিজিটাল আইনের চেয়েও এখন পেশাটির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে অপসাংবাদিকতা। মফস্বলে এখন সাংবাদিকদের নানা নামে ডাকা হয়। কেউ ডাকেন সামবাদিক সাহেব, কেউ বা হলুদ আবার কেউ ডাকে ভূয়া অথবা সাংঘাতিক বলে।

সাংবাদিকের মতো এতো পবিত্রতম একটি শব্দ ও পেশাকে কেন সামবাদিক, হলুদ বা ভূয়া সামবাদিক বলে ডাকা হয় তা কি কখনো গণমাধ্যম বিশিষ্টজনরা ভেবে দেখেছেন? সাংবাদিক শব্দটা যাদের জন্য “সামবাদিক” হয়েছে তাদের লাগাম এখনই টেনে ধরতে হবে। সাংবাদিকতার মতো পবিত্রতম পেশাটাকে এরা কলংকিত করে রীতিমতো উলঙ্গ করে ফেলছে।

ফেসবুকে পোস্ট করেই এরা বলে টিভি নিউজ। সারা জীবন দেখে আসলাম আগামি কালের পত্রিকা ছাপা হয় রাত ১২ টার পরে। অথচ এখন দেখি যখনকার ঘটনা তার কিছুক্ষণ পরই পত্রিকাতে প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে। এ আবার কি ধরণের সামবাদিকতা ! পরের দিনের সংবাদ আগের দিনেই প্রকাশ। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়-ওটা পত্রিকা না। পত্রিকার মতো পোস্টার করে ওরা। তারপর ছেড়ে দেয় ফেসবুকে।

আর যাদের নিউজ থাকে তাদের ট্যাগ করে দেওয়া হয়। এতে নাকি ঐ সাংবাদিকের গুরুত্ব বাড়ে। যত তাড়াতাড়ি নিউজ এনে দিতে পারবে তত বড় সামবাদিক হতে পারবে তারা। সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দিয়ে এরা দিনের পর দিন এভাবেই সেবামূলক মহান পেশাটাকে উলঙ্গ করছে সব জায়াগাতে।

১৫০০ টাকা দিয়ে অনলাইন খুলেই সম্পাদক, স্টাফ রিপোর্টার, সিনিয়র রিপোর্টার, জেলা প্রতিনিধি হয়ে যাচ্ছে। যোগ্যতার কথা নাই বা তুললাম। কোন রকম ফেসবুকে শেয়ার করার মতো যোগ্যতা থাকলেই হলো। প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা এখানে চতুর্থ বিষয়। প্রযোয্য নহে।

যখন দেখি দেশের প্রথম সারির পত্রিকা তাদের জেলা প্রতিনিধি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে শর্ত দেন শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকতে হবে স্নাতক। তখন স্বপ্ন দেখি সাংবাদিকতার সুদিনের। কিন্তু যখন দেখি স্নাতক তো দূরের কথা কোনদিন মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও পা দেয়নি এমন লোককে তাদের প্রতিনিধি হিসাবে নিয়োগ দেন তখন চরম হতাশায় নিজেকে গুটিয়ে নিতে হয়। যাদের আয়ের কোন উৎস নেই অথচ তারা দিব্যি বাড়িতে বিল্ডিং, ল্যাপটপ, মোটরসাইকেলসহ দামি ব্রান্ডের মোবাইল ব্যবহার করছেন। কোথায় পাচ্ছে এগুলো?

যখন দেখি দেশের প্রথম সারির মিডিয়ার সহকর্মীরা ঐ সকল ভূঁইফোড় অনলাইন, আন্ডারগ্রাউন্ডের পত্রিকা ও টিভির নামে ফেসবুকে দেওয়া সামবাদিকদের হাতে হাত ধরে কোন দাবি আদায়ের জন্য রাস্তায় দাঁড়ায় তখন নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়। এই মহান পেশার বন্ধুরা কি এতোটাই মানষিক দেউলিয়া হয়ে গিয়েছে। এভাবে হাতে হাত ধরে দাবি আদায়ে রাস্তায় দাঁড়ালে সব সময়ই অধিকার আদায় হয় কিনা জানিনা। তবে হলফ করে এটুকু বলতে পারি- আপনাদের সাথে হাতে হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ছবি তুলে ঐ সকল সামবাদিকরা লাভবান হয় সব জায়গায়। তারা ঐ ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে সবাইকে জানান দেয় তারা এখন অনেক মস্ত বড় সাংবাদিক হয়ে গিয়েছে।

এ সকল সাংবাদিকদের মানবিক, জনদুর্ভোগ কিংবা উন্নয়নমূলক কোন প্রতিবেদন তৈরি করতে দেখা যায় না। কোথাও সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা হত্যাকান্ড ঘটলে ঘটনাস্থলেও তাদের চোখে পড়েনা। কারণ এ সকল সংবাদ সংগ্রহে কোন অর্থ পাওয়া যায় না। বরং আরো নিজের পকেট থেকে যায়। এদের বেশি দেখা যায় সংবাদ সম্মেলনের স্থানে, গ্রামের আনাচে-কানাচে দিয়ে। গ্রামের সরল-সহজ মানুষগুলোকে রীতিমতো সাংবাদিকতার ভয় দেখিয়ে এরা হাতিয়ে নেয় টাকা। সংবাদ সম্মেলনের গিয়ে এদের জন্য ছবি তোলায় দায় হয়ে পড়ে মূলধারার সাংবাদিকদের।

এখনো সময় আছে। যারা গণমাধ্যম নিয়ে কাজ করছেন যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদেরকে এ সকল ভূয়া ও হলুদ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এদের লাগাম টেনে ধরার। এখনই সবার উচিত এদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর। বঙ্গবন্ধু যে সোনার বাংলা গড়ার দৃঢ় স্বপ্ন দেখেছিলেন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে দেশের গণমাধ্যমকে আরো অধিক স্বচ্ছতার জায়গায় নিয়ে আসতে হবে। আর এ কাজে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকল সহযোদ্ধাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই হয়ত দেশের গণমাধ্যম পেশাদারিত্বের সফলতার জায়গায় পৌঁছে যাবে।

প্রিয় পাঠক এবং সহকর্মীবৃন্দ, দুঃখিত পবিত্রতম সাংবাদিক শব্দটাকে বিকৃত করে সামবাদিক লেখার জন্য। অনেকটা নিরূপায় ও হতাশ হয়েই শব্দটা ব্যবহার করলাম। সবাই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। এখনো স্বপ্ন দেখি নতুন ভোরের। এই মহান পেশায় এখনো রয়েছে অনেক নিবেদিত সহকর্মী। যাদের হাত ধরে সাংবাদিকতা পেশাটা সত্যি সেবামূলক পেশায় পরিণত হবে। পরিশেষে একটি সুন্দর দিন ও নতুন সূর্যের অপেক্ষায় থাকলাম। নিপাত যাক অপসাংবাদিকতা; জয় হোক সাংবাদিকতার...

লেখক: সোহেল মিয়া, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম ও সভাপতি, উপজেলা প্রেসক্লাব, বালিয়াকান্দি, রাজবাড়ী।

;