খরচের খাতগুলোই অযাচিতভাবে এভিয়েশন ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করছে



মো. কামরুল ইসলাম
খরচের খাতগুলোই অযাচিতভাবে এভিয়েশন ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করছে

খরচের খাতগুলোই অযাচিতভাবে এভিয়েশন ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করছে

  • Font increase
  • Font Decrease

এভিয়েশনে হিউম্যান রিসোর্সের ব্যয় মিটাতে পৃথিবীর অনেক এয়ারলাইন্সকেই হিমশিম থেতে হচ্ছে। কোনো এয়ারলাইন্স তার অপারেশন কস্ট কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ করলেই প্রথমেই স্টাফ কার্টেল করতে দেখা যায়, দেখা যায় বেতন কাঠামো পূনর্গঠন করতে, অর্গানোগ্রামকে পূনর্বিন্যাস করতে। বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা মহামারির সময় সর্বপ্রথম যে খাতটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তা হচ্ছে এভিয়েশন, ট্যুরিজম এন্ড হোটেল ইন্ডাস্ট্রি। এই ইন্ডাস্ট্রিকে টিকিয়ে রাখার জন্য নানাবিধ উপায়ে কস্ট কার্টেল করে অক্সিজেন সরবরাহ করার চেষ্টা করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনো স্বাভাবিকতা আসেনি।

সকল শিল্পের গতিশীলতা তখনই বজায় থাকবে, যখন আকাশপথের গতিশীলতা বজায় থাকবে। এই আকাশ পথকে সচল রাখতে আকাশ পরিবহনকে বাঁচিয়ে রাখতে বিভিন্ন দেশ কোভিড কালীন সময়ে এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রিকে নানাভাবে প্রনোদণা দিয়ে, বিভিন্ন ধরনের চার্জ বিশেষ করে এ্যারোনোটিক্যাল ও নন-এ্যারোনোটিক্যাল চার্জ মওকুফ করে ইন্ডাস্ট্রিকে সচল রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছে বিভিন্ন দেশের এভিয়েশনের রেগুলেটরি অথরিটিসহ বিভিন্ন সরকারী সংস্থা। কিন্তু বাংলাদেশের এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি বিশেষ করে প্রাইভেট এয়ারলাইন্সসমূহ আসলে কতটুকু সহায়তা পেয়েছিলো তা ভাবনার বিষয়।

প্রনোদণা বলতে যা বোঝায় তা ছিলো জাতীয় বিমান সংস্থার জন্য। কোনো ধরনের চার্জ মওকুফ তো দূরের কথা উল্টো যাত্রীদের উপর এয়ারপোর্ট ডেভেলোপমেন্ট ফি, এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি ফি নামে নতুন নতুন চার্জ আরোপ করা হয়েছে। যা দিন শেষে যাত্রীদের ভাড়ার উপর সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে।

উড়োজাহাজের জন্য জেট ফুয়েল সরবরাহকারী একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন নিয়ন্ত্রিত পদ্মা অয়েল কোম্পানি। সরকারী প্রতিষ্ঠান কিন্তু সর্বদাই লাভ-লস বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ মূল লক্ষ্যই হওয়া উচিত একটি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে। সেখানে বিপরীতচিত্রই ফুটে উঠছে প্রতিনিয়ত।

বাংলাদেশের ইতিহাসে জেট ফুয়েলের রেকর্ড মূল্য বর্তমানে বিরাজ করছে। অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য এয়ারলাইন্সকে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের মূল্য প্রদান করতে হয় ১১১টাকা আর আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য জেট ফুয়েল বাবদ প্রতি লিটারে খরচে করতে হয় ১.০৯ ডলার। এখানেও চরম বৈষম্য বিরাজ করছে। দেশের অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে দেশীয় এয়ারলাইন্স এবং ৯৫% অধিক যাত্রীই হচ্ছে বাংলাদেশী নাগরিক। অথচ এই অভ্যন্তরীণ রুটেই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে দেশীয় এয়ারলাইন্স ও বাংলাদেশি নাগরিকদের।

একটি এয়ারলাইন্স এর যেকোনো রুটের অপারেশনাল কস্টের প্রায় ৪০%-৪৬% খরচই বহন করতে হয় জেট ফুয়েল খরচ বাবদ। অথচ এই করোনা মহামারির সময় থেকে এখন পরযন্ত গত ১৯ মাসে প্রায় ১৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে জেট ফুয়েলের মূল্য। ফ্লাইট পরিচালনার জন্য জেট ফুয়েলের জন্য প্রতি লিটারে প্রায় ১১ থেকে ১২ টাকা বেশী দিতে হচ্ছে অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী দেশীয় এয়ারলাইন্সকে।

দেশের বেসরকারি এয়ারলাইন্স ও জাতীয় বিমান সংস্থার মধ্যে বেশ কিছু অসামঞ্জস্যতা দেখা যাচ্ছে বছরের পর বছর ধরে। রাষ্ট্রীয় সংস্থা হিসেবে যেকোনো খারাপ সময়ে রাষ্ট্র পাশে এসে দাড়ায় অথচ বেসরকারী এয়ারলাইন্স হিসেবে সর্বদাই সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কয়েকবছর আগে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার প্রায় ১৭০০ কোটি টাকা দেনা থেকে দায়মুক্তি দিয়েছিলো অথচ সেই সময়ে ব্যবসায় টিকে থাকতে না পেরে বিভিন্ন বেসরকারী বিমান সংস্থা বন্ধ করে ব্যবসা গুটিয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার কাছে পদ্মা অয়েল কোম্পানী প্রায় ২০০০ কোটি টাকা এবং সিভিল এভিয়েশন অথরিটি বিভিন্ন চার্জ বাবদ প্রায় ৪০০০ কোটি টাকার অধিক পাওনা। অথচ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে আবার রাষ্ট্রীয বিমান সংস্থার বিভিন্ন অর্থ বছরে লাভের হিসাব দেখা যায়। এই ধরনের হিসাবে কি লাভ হয় নাকি আয় হয় তা কোনোভাবেই স্পষ্ট হয়ে উঠে না।

উড়োজাহাজের বিভিন্ন রুটের ভাড়ার ব্যাপারে একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, ১৯৯৯ কিংবা ২০০০ সালে জেট ফুয়েলের মূল্য ছিলো প্রতি লিটার প্রায় ২৫ সেন্ট, কিংবা ১৪ টাকা তখন ডলারের এক্সচেঞ্জরেট ছিলো প্রায় ৫০ টাকা, তখন ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের মিনিমান ভাড়া ছিলো প্রায় ৩০০০ টাকা। তৎকালীন সময়ে এ্যারোনোটিক্যাল ও নন-এ্যারোনোটিক্যাল চার্জসহ অন্যান্য চার্জ বর্তমানের তুলনায় এক তৃতীয়াংশ ছিলো আবার বাংলাদেশের পার ক্যাপিটা ইনকাম ছিলো ১০০০ ডলারের কম। অথচ বর্তমানে জেট ফুয়েলের মূল্য প্রায় ১১১টাকা, পার ক্যাপিটা ইনকাম প্রায় ২৭০০ ডলার, এ্যরোনোটিক্যাল ও নন-এ্যরোনোটিক্যাল চার্জসহ অন্যান্য চার্জ পূর্বের তুলনায় প্রায় তিনগুন অথচ ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের মিনিমাম ভাড়া ৪৫০০টাকা। তারপরও একটি কমন বক্তব্য রয়েছে এয়ারলাইন্সগুলোর ভাড়া অনেক বেশী। এয়ারলাইন্সগুলোর আয়ের সাথে যদি খরচের খুব বেশী রকমের তারতম্য দেখা যায় তখন এয়ারলাইন্সগুলো ব্যবসা গুটিয়ে দিতে বাধ্য হয়্। গত ২৫ বছরে বাংলাদেশের এভিয়েশন সেক্টরে বিশেষ করে প্রাইভেট এয়ারলাইন্স এর ৮ থেকে ৯টি এয়ারলাইন্স বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়।

নাইন ইলিভেন কিংবা করোনা মহামারির কারনে এভিয়েশন সেক্টরে নানাবিধ খরচের অবতারণা ঘটে। স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন করার কারনে আসন সংখ্যা সীমিতকরণ, রেগুরেটরি অথরিটির নির্দেশনা ইত্যাদি কারনে অপারেশন কস্টের আস্ফালন ঘটে অথচ আয়ের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। আয় আর ব্যয়ের মধ্যে চরম বৈষম্য দেখা দেয়।

এয়ারলাইন্সগুলো সাধারণত কোনো উৎসবকে সামনে রেখে ভাড়ার তারতম্য ঘটায় না। বাংলাদেশে ঈদ-উল ফিতর কিংবা ঈদ উল আযহা কিংবা বিভিন্ন জাতীয় দিবসকে সামনে রেখে যাত্রীদের আকাশ পথ ব্যবহারের আধিক্য দেখা যায়। অনেক যাত্রী সেই সব দিবসকে সামনে রেখে অনেক আগে থেকেই ট্রাভেল প্ল্যান সাজিয়ে টিকেট সংগ্রহ হরে নেয়, ফলে কম ভাড়ায় ট্রাভেল করে থাকে। একই সময়ে ট্রাভেল করার জন্য শেষ সময়ে এসে অনেকে ট্রাভেল করার পরিকল্পনা সাজিয়ে থাকে, ফলে ভাড়ার ক্ষেত্রে তারতম্য ঘটে থাকে। তখনই যাত্রীদের কাছে মনে হয় এয়ারলাইন্সগুলো অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছে। আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, সাধারণত ঈদের সময় একদিকে যাত্রীদের চাপ থাকে, যখন ভাড়া ক্যালকুলেশন করা হয়, তখন সেই বিষয়টিকেও মাথায় রেখে অপারেশন কস্ট বিবেচনায় ভাড়া নির্ধারণ করা হয়।

সারা বছর যেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ যাত্রী নিয়ে এয়ারলাইন্সগুলো যাতায়াত করে সেখানে এয়ারলাইন্সগুলো ঈদের সময় বিভিন্ন গন্তব্যে গড় যাত্রী থাকে ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ। কারন হিসেবে ওয়ান ওয়ে ট্রাফিক থাকার কারনে গড় যাত্রী কম হয়ে থাকে।  

এয়ারলাইন্স পরিচালনার ব্যয় আর আয়ের বৈষম্যই এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকাই দূরূহ করে তুলছে বাংলাদেশের বেসরকারী বিমান সংস্থাসমূহকে। খরচের খাতগুলো যাতে অযাচিতভাবে এভিয়েশন ব্যবসায় প্রভাব বিস্তার না করতে পারে সেইদিকে কঠোরভাবে দৃষ্টিপাত করা উচিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।     

লেখক: মোঃ কামরুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

স্বর্গীয় বাগানের নাম ‘ইডেন’



মেজর নাসির উদ্দিন আহমেদ (অবঃ) পি এইচ ডি
স্বর্গীয় বাগানের নাম ‘ইডেন’

স্বর্গীয় বাগানের নাম ‘ইডেন’

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কলিন্স,  ক্যামব্রিজ, অক্সফোর্ড, ম্যাকমিলান ও মারিয়ম ওয়েবস্স্টাটার ডিকশনারি এবং ইনসাইক্লোপিডিয়া ও ইউকিপিডিয়াসহ বহু সূত্রে ,"ইডেন" কে ঈশ্বরের বাগান বা স্বর্গীয় বাগান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাচীন ইঞ্জিল ও বাইবেল মহাগ্রন্থে ইডেন নামে সরাসরি কিংবা নাম উল্লেখ না করে নদী বা নহর বেষ্টিত এমন এক বাগানের বর্ণনা রয়েছে, যেখানে মানবজাতির আদি পিতা-মাতা বসবাস করতেন। এই বাগানের বহু কাল্পনিক চিত্র এঁকেছেন চিত্রশিল্পীরা।  তাদের কল্পনার সেই আদি পিতা মাতার মাঝে কাম-ক্রোধ বা বৈষয়িক কোন চাহিদা ছিল না। তাই ইডেন নামের স্বর্গে তাদের মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ানোর চিত্র ফুটে উঠেছে এসব চিত্রকর্মে।  ইন্টারনেটে ইডেন নামক এমন বহু কাল্পনিক,  ঐশ্বরিক বা স্বর্গীয় বাগানের প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়।  খ্রিস্টধর্ম গ্রন্থ বাইবেলের জেনেসিস ২ : ৮ - ১৪ পর্যন্ত বয়ানে ইডেন নামক স্বর্গীয় উদ্যানের বর্ণনা রয়েছে। ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ ইজেকেইলে ( Ezekiel) ২৪ ও ৩১ নং  স্তবকে রয়েছে ইডেন নামক স্বর্গীয় উদ্যানের নাম।  পৃথিবীর বহু দেশে ইডেন নামে বহূ  বাণিজ্যিক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারতের কলকাতায় রয়েছে ইডেন গার্ডেন্স নামের ক্রিকেট স্টেডিয়াম।  বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়ও রয়েছে ইডেন মহিলা কলেজ (সংক্ষেপে ইডেন কলেজ)  নামের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এককালে গৌরবময় আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকলেও বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠান পথভ্রষ্ট একদল তথাকথিত রাজনৈতিক নেত্রীর অপকর্মের স্বর্গ রাজ্য আর শিক্ষক বা প্রশাসক নামক একদল মেরুদণ্ডহীন শিক্ষিত মানুষের অসহায়ত্বের মুহূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছে।

১৮৬০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এককালের কর্মচারী স্যার এ্যাসলে ইডেন (Sir Eshley Eden) বহু চড়াই উতরাই পেরিয়ে তৎকালীন বাংলার শাসক ব্রিটিশ সরকারের একজন সচিব হিসাবে নিযুক্ত হন এবং দীর্ঘ ১১ বছর এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। এই দায়িত্ব পালন শেষে তৎকালীন ব্রিটিশ বার্মার (বাংলা সহ) গভর্নর নিযুক্ত হন এই স্যার এ্যাসলে ইডেন। দীর্ঘ সাত বছর তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।  দায়িত্ব পালনের শেষ দিকে ১৮৮৭ সালে দুটি বালিকা বিদ্যালয়ের সমন্বয়ে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় একটি গার্লস স্কুল। স্যার এ্যাসলে ইডেনের নামানুসারে এই স্কুলের নামকরণ করা হয় ইডেন গার্লস স্কুল। ১৯২৬ সালে কলেজ শাখা চালুর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নাম হয় ইডেন গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ। ১৯৫৮ সালে কলেজ সেকশন আলাদা হওয়ার কারণে নতুন নাম হয় ইডেন মহিলা কলেজ। ১৯৬২ সালে আজিমপুর ১৮ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত হয় আজকের ইডেন মহিলা কলেজ।

ইতিহাস মতে ১৮৬০ সালে ব্রিটিশ সৈন্যরা সিকিম দখলের পর রাজনৈতিক সমঝোতার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল স্যার এ্যাসলে ইডেন কে। তুমলং চুক্তি সম্পন্ন করে সিকিমের রাজা সিদকেয়ং নামগয়ালকে ( Sidkeyong Namgyal) তিনি বশে আনেন।  সিকিম দিয়ে চলাচলকারী সকল যাত্রী ও বাণিজ্যিক বহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ছিলেন ইডেন । এই সাফল্যে উজ্জীবিত স্যার এ্য।সলে ইডেন কে ১৮৬৩ সালে ভুটানে পাঠানো হয় অনুরূপ সমঝোতার জন্য।  অতিমাত্রায় আত্মবিশ্বাসী ইডেন এই যাত্রায় কোন সৈন্য বাহিনী ছাড়াই ভুটান যান এবং তার কারিশমা প্রয়োগের চেষ্টা চালান । কিন্তু এবার বিধি বাম।  এক্ষেত্রে ভুটানের স্থানীয় জনগণ তাকে কেবল বর্জন করেই ক্ষান্ত হয়নি, তার বাহারি চুল ধরে টানাটানি করে এবং মুখে কাঁচা গোবর মেখে দেয়। এই ঘটনার রেশ ধরে ১৮৬৪ সালের নভেম্বরে "ডুরাণ যুদ্ধ" শুরু হয়, যা চলে এক বছর পর্যন্ত। এতে শেষ বিচারে বৃটিশদেরই জয় হয়।

ঢাকাস্থ ইডেন মহিলা কলেজের রাজনৈতিক নেত্রী নামের কতিপয় বিপথগামী ছাত্রী পৌরাণিক ধর্মে বর্ণিত স্বর্গীয় বাগান ইডেন কিংবা ব্রিটিশ বার্মার গভর্নর ইডেনের ইতিহাস কতটুকু জানেন, তা বলার সাধ্য নেই। তবে যা টেলিভিশনের পর্দায় তা দেখেছি,  তা থেকে বুঝা যায় ভুটানের মানুষ ১৮৬৩ সালে যেভাবে স্যার  এ্যাসলে ইডেনের চুল টেনে ছিলেন,  তার চেয়ে অনেক বেশি দক্ষতার সাথে নিজের সহপাঠী কিংবা ছোট বোন তুল্য অন্য ছাত্রীদের চুল টানায় পরাঙ্গম এ যুগের ইডেন মহিলা কলেজের কতিপয় ছাত্রী।  যেভাবে ভুটানের মানুষ স্যার ইডেনের মুখে গোবর লেপ্টে দিয়েছিল, ১৫৯ বছর পরে তেমনি করে ছাত্র রাজনীতির গৌরবজ্জ্বল অবয়বে কলঙ্কের চুনকালি লেপ্টে দিয়েছে এই ছাত্রী নামের দস্যুরা।   চাঁদাবাজি,  সিট বাণিজ্য, শারীরিক  ও মানসিক নির্যাতন,  বন্দী করে রাখা,আপত্তিকর ছবি তুলে ব্ল্যাকমেইল,  রাজনীতির নামে নিজেদের শোডাউনে যেতে বাধ্য করা সর্বোপরি নেতাদের বাড়িতে ছাত্রীদের পাঠানোর অভিযোগ আজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

ইডেন কলেজে বেশ ক'দিন ধরেই চলছিল এমন অনাচার। ২০১৪ সালের ২৪শে জুন রাতে টেলিভিশনে বিশ্বকাপ ফুটবল চলবে না হিন্দি সিরিয়াল চলবে,  এ নিয়েও ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক শাখার সভানেত্রী ও সাধারণ সম্পাদকের দুটি দল সংঘর্ষে জড়ায়। সিট দখল, উচ্ছেদ  এবং পাল্টা দখলের ঘটনা নৈমত্তিক ব্যাপারে দাঁড়িয়ে ছিল বিগত কিছুদিন যাবত।  চলমান এই দ্বন্দ  চরমে  উঠে গত ২৫ সেপ্টেম্বর, রবিবার।  ঐদিন আবার ছিল বিশ্ব কন্যা দিবস। পুরুষ শাসিত সমাজে কন্যাদের মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করা এবং তাদের ন্যায্য প্রাপ্যটুকু  নিশ্চিত করাই বিশ্ব কন্যা দিবসের প্রতিপাদ্য। আইয়েমে জাহিলিয়াত বা অন্ধকার যুগে সদ্য ভূমিষ্ঠ কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো বাকি জীবনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে।  কন্যা সন্তান প্রসবের জন্য অনেক মা’র সংসার ভেঙে যেত বা অপয়া অপবাদ নিয়ে বেঁচে থাকতে হতো। যৌতুকের অভিশাপ আজও বিরাজ করছে এই সমাজে।  এই উপমহাদেশে গর্ভের সন্তান যদি কন্যা হয়, তবে ক্লিনিকের দালালরা বলে, ৬০০০ টাকা খরচ করে গর্ভপাত ঘটাও, কন্যা বিয়ে দেওয়ার ৬ লাখ টাকা বাঁচবে।  পথে - ঘাটে, যানবাহনে ও কর্মক্ষেত্রে নারীরা বৈষম্যের ও নীরব দহনের শিকার হয়। এমনি এক প্রেক্ষাপটে ২৫ সেপ্টেম্বর অন্ততঃ বিশ্ব কন্যা দিবসে কন্যার বাবারা একটু বাড়তি স্নেহে ভাসিয়ে দিতে চায় কন্যাদের।  সেই বাবারা আজ আতঙ্কে ভুগছে একদল কন্যার প্রতি আরেক দল কন্যার এমন হিংস্র আয়োজনে।  পৃথিবীর সব ধর্মগ্রন্থে কন্যা বা মেয়েদের প্রতি সহনশীল, শ্রদ্ধাশীল এবং বন্ধু বৎসর হওয়ার তাগিদ রয়েছে।  আজ প্রশ্ন জাগে, এই তাগিদ কি কেবল পুরুষদের প্রতি?  ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, ঈশ্বর একজন কন্যাকে তার ঘরেই পাঠায়,  যার একজন চিরজীবনের বন্ধু প্রয়োজন। একজন কন্যার বাবা হিসেবে বলবো,  টেলিভিশনের পর্দায় খোদ রাজধানীর এক ঐতিহ্যমন্ডিত মহিলা কলেজে মেয়েদের উপর নেত্রী নামের দস্যুদের এই আচরণ ক্ষমার অযোগ্য।

সবচেয়ে অবাক লাগে এক্ষেত্রে কলেজ কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরবতা দেখে। দেশের শিক্ষা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর ছাত্র রাজনীতি নামে দস্যুপনার প্রভাব কতটা প্রবল, ইডেন কলেজের ঘটনা যেন তারই প্রমাণ।  হঠাৎ করেই যে ইডেন কলেজে  এমন ঘটনা ঘটেছে, তা নয়।  দীর্ঘদিন ধরেই এমন  বিস্ফোরণূন্মুখ পরিস্থিতি  বিরাজ করছিল ইডেন  কলেজে। অথচ প্রশাসন ছিল নির্বিকার। সাধারণ ছাত্রীরা বহূ অনুনয় বিননয়  করেও প্রশাসনের সাহায্য পায়নি ।  আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে এ সংক্রান্ত কোনো গোয়েন্দা তথ্য বা আগাম সংবাদ বা সংকেত কিছুই ছিল না, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবে কেন এমনটি ঘটলো,  তার কোন সদুত্তর নেই।

আজ ২৮ শে সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখে "মাদার অফ হিউম্যানিটি" শেখ হাসিনার ৭৬ তম জন্মদিন। তাকে জন্মদিনের দোয়া ও শুভেচ্ছা জানিয়ে বলবো, ছাত্র রাজনীতিতে  নেতৃত্বের নামে যারা লুটতরাজ,  চাঁদাবাজি ও অনৈতিক জুলুম নির্যাতন করে, তাদের এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের ও অকর্মণ্য প্রশাসনের বিরুদ্ধে মাতৃস্নেহ নয়,  প্রয়োজন মায়ের কঠিন শাসন ও উপযুক্ত বিচার। রোহিঙ্গাদের নেপথ্যে অনেক এনজিও আছে,  মানবাধিকার সংস্থা আছে, দাতা সংস্থা আছে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আজ কতিপয় পথভ্রষ্ট, তথাকথিত রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীর নিরব সন্ত্রাসের শিকার সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের পিছনে কেউ নেই।  সত্যিই তারা অসহায়।  আপনি তাদেরও "মাদার অফ হিউম্যানিটি" হবেন, এটাই প্রত্যাশা।  যে শিক্ষা প্রশাসন বা পুলিশ প্রশাসন অসহায় ছাত্রছাত্রীদের কন্যা দিবসেও নিরাপত্তা দিতে পারে না,  তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। তবেই আপনার নাম ইডেনে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

লেখক: গবেষক, কলামিস্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষক

;

নেশায় নিষ্ক্রিয় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট



প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

নেশা দিয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে নষ্ট হচ্ছে আমাদের কর্মক্ষম জনসংখ্যার সুফল প্রদানের ক্ষমতা। বর্তমানে আমাদের দেশ কর্মক্ষম জনসংখ্যার সংখ্যার ভারে এগিয়ে থাকলেও নানা কারণে সেই কর্মক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তাদের কারো কাজের দক্ষতা নেই আবার কারো কারো ডিগ্রি ও দক্ষতা থাকলেও সুযোগের অভাবে তারা নিজেদেরকে কাঙ্ক্ষিত কাজে সংযুক্ত করার কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না। ফলে দ্বিবিধ চোরাগলিতে বিপুল কর্মক্ষম মানুষ কর্মহীন থেকে যাওয়ায় আমাদের দেশ অপারগ হচ্ছে কর্মক্ষম মানুষের কর্মশক্তিকে কাজে লাগাতে।

এসকল মানুষের কর্মসুবিধাকে কাজে লাগাতে না পারায় বঞ্চিত হচ্ছে ওরা নিজেরা, ওদের পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের অর্থনীতি। কিছু কর্মক্ষম মানুষ বিদেশে কাজের সুবিধা পেলেও এখনও প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অর্থের অভাবে কোটি কোটি কর্মক্ষম মানুষ কার্যত: বেকার নামক অভিশপ্ত জীবন যাপন করে চলেছে। এদের মধ্যে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকটেপ্রাপ্ত শতকরা ৪২ ভাগ শিক্ষিত বেকারদের অবস্থা সবচেয়ে করুণ। অথচ আমরা গত দশ বছর থেকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট বা জনমিতিক লভ্যাংশ নামক অপার সুবিধার কোটি প্রহর হেলায় পার করে চলেছি।

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট হলো কোন দেশের মোট জনসংখ্যার বড় অংশ যখন যুব কর্মশক্তি হয়ে পড়ে অথবা অর্ধেকর বেশি জনগণ শ্রমশক্তিকে পরিণত হয়। এক্ষেত্রে পরনির্ভরশীল জনসংখ্যার চেয়ে কর্মক্ষম, আত্মনির্ভরশীল জনসংখ্যার হার বেশি হয়। জাতিসংঘের জনসংখ্য তহবিল (ইউএনএফপিএ)-র মতামত অনুযায়ী এই সুযোগের বয়স ১২ থেকে ৫৯-এর মধ্যে অবস্থান করে। বিশ্বের অনেক দেশেই এই ধরণের সুযোগ একবার আসে। কিন্তু সব দেশ এই সুযোগ গ্রহণ করতে পারে না এবং তাদেরকে কাজে লাগাতে পারে না। আমরাও এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারছি না। এর মূল কারণ আমাদের বর্তমান শ্রমপ্রাচুর্য্য কোনরুপ মূলধনপ্রাচুর্য্য অবকাঠামোর মধ্যে আজও প্রবেশ করতে পারেনি। অধিকিন্তু এরা বেকারত্ব ও হতাশার মধ্যে নিপতিত হয়ে নিজেদেরকে নিষ্ক্রিয় করার ফাঁদে আটকা পড়ে যাচ্ছে।

জনমিতির এই সুযোগ কোন দেশে চিরদিন স্থায়ী হয়ে থাকে না। বাংলাদেশে ২০১২ সাল থেকে এই সুবিধা চলমান থাকলেও আগামী ২০৩৭ সাল পর্যন্ত পাওয়া যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন। সেই হিসেবে আমাদের দেশে আর মাত্র পনেরো বছর স্থায়ী হতে পারে এই সুবিধা।

কারণ এর পর থেকে আমাদের দেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকেবে। কমে যাবে কর্মক্ষম যুবশক্তির সংখ্যা। কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবার ক্ষেত্রে পরিকল্পনা মাফিক কাজ বা চাকরির সুবিধা সৃষ্টি হচ্ছে না। নিয়োগ ক্ষেত্রে চরম দুর্নীতির বিকাশের কারণে আমরা ক্রমাগত মেধাবীদেরকে কাজের সুবিধা দিতে না পারায় এই জনমিতিক সুবিধা হারিয়ে ফেলছি।

ক’বছর আগেও মেধাবীরা বড় বড় চাকরিতে যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ পেত। এখন সেটা সংকুচিত হতে হতে তলানিতে এসে ঠেকে গেছে। চাকরির বাজার যেন সোনার হরিণ। সরকারি চাকরিতে চূড়ান্ত নিয়োগ পরীক্ষায় পাশ করার পর নানা ছল-ছুতোয় ২০২০ সালে আড়াই হাজার প্রার্থীকে কাজে যোগদান করতে পারেনি। তাদেরকে পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে নানাভাবে হয়রানি করে সময় ক্ষেপণ করে ফেলা হয়েছে। যথাযথ পেপার ডকুমেন্টস ও প্রমাণপত্রসহ বহু যোগাযোগ করা সত্ত্বেও তাদেরকে নিয়োগ দেয়া দেয়া হয়নি। অনেকের কাছে অনৈতিকভাবে ঘুষের অর্থ দাবি করা হয়েছে। এজন্য অনেকের চাকরি লাভের বিষয়টি আইন-আদালত পর্যন্ত গড়িয়ে গিয়ে আরো জটিল হয়ে গেছে। দায়িত্বশীল আইন-শৃংখলা বাহিনীর আর্থিক লোভ ও দুর্নীতির বিষয়টি অনেকাংশে প্রধান সমস্যা হিসেবে উন্মোচিত হওয়ায দরিদ্র-মেধাবী প্রার্থীরা অনেকেই মহা ফাঁপড়ে পড়ে চাকরি প্রাপ্তির আশা ছেড়ে দিয়ে চরমভাবে হতাশ হয়ে পড়েছেন। এই ওপেন সিক্রেট বিষয়টি আমলে না নেয়ায় শিক্ষিত বেকার যুবশক্তির কেউ কেউ নৈতিক শক্তি হারিয়ে ক্ষোভে, লজ্জায় আত্মহণনের পথ বেছে নিয়েছেন। হয়ে পড়েছেন মাদকাসক্ত। তাদের অনেকে জীবন বাঁচার তাগিদে সহজে কিছু আয়ের আশায় মাদক ব্যবসায় নিজেকে জড়িত করে ফেলেছেন। আবার অনেকে নেশা দিয়ে নিজেকে নিষ্ক্রিয় করে হতাশা থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে গিয়ে জীবনের গতিপথ হারিয়ে সর্বশান্ত হয়ে গেছেন।

পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে নানাভাবে হয়রানি শুধু চাকরিপ্রাপ্তি বা নিয়োগের ক্ষেত্রেই নয় বরং প্রমোশন, মামলা, পাসপোর্ট তৈরি ইত্যাদির ক্ষেত্র আরো ব্যয়বহুল ও দুর্নীতির অপমানজনক ক্ষেত্রে পরিণত হয়ে পড়েছে।

এটা অপমানজনক সত্যটি আমাদের চাকরির বাজারে একটি বিষফোঁড়া তা সিডিপি-র সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। সিডিপি ১৭টি সেবাখাতের উপর গবেষণা চালিয়ে উদ্বঘাটন করেছে- দেশের সর্বচ্চো দুর্নীতির খাত হচ্ছে পুলিশ ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। গবেষণা ফলাফলে দেখা গেছে, ২০২১ সালে সর্বোচ্চ দুর্নীতির খাত পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী (৭৪.৪%), পাসপোর্ট (৭০.৫%), বিআরটিএ (৬৮.৩%)। আমাদের এসব সেবা খাতে সর্বোচ্চ দুর্নীতি হয়। এজন্য আমাদের দেশে গড়ে প্রতি পরিবার প্রতি ঘুষ প্রদান করে ৬,৬৯৮ টাকা। ঘুষ না দিলে এসব সেবা পাওয়া যায় না বলে মনে করে ৭১.২% মানুষ। এটা আমাদের সমাজের প্রচলিত সেবাখাতের জনসেবার পরিবর্তে জনগণকে নাজেহাল করার নমুনা।

শুধু নাজেহাল কেন? আসলে এই ধরণের ঘুষ-দুর্নীতি আমাদের সমাজের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। মেধাবীদেরকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থার মেরুদণ্ডকেও ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। দেশের সামগ্রীক জনসেবা ব্যবস্থা সঠিক মেধাবীদের সেবা বঞ্চিত হয়ে একটি মেধাহীন, দুর্নীতিবাজ চক্রের কাছে বন্দী হয়ে পড়েছে। তাইতো তারা ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের’ নৈতিক বাণীর কথা শুনলে মুচকি মুচকি হাসে।

এর ফলে দরিদ্র পরিবারের কোন তরুণ যেমন দেশে চাকরি পাচ্ছে না তেমনি কেউ ভিটেমাটি বিক্রি করে বিদেশে শ্রমিক হিসেবে গমন করতে চাইলেও পাসপোর্ট অফিসে হেনস্তার শিকার হচ্ছে। আবার সেখানকার দালাল ও দুর্নীতিবাজ চক্রের জালে পড়ে পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে মোটা অঙ্কের ঘুষের আব্দার সহ্য করতে না পেরে জীবন সম্পর্কে ঘৃণা নিয়ে কালাতিপাত করতে করতে মাদকসেবী হয়ে পড়ছে। কেউ কেউ আত্মহণনের পথ বেছে নিয়েছে।
অথচ এদিকে কারো সুনজর নেই। সবাই শুধু বক্তৃতা দিয়ে হম্বি-তম্বি করে ক্ষান্ত দিই। একটি বক্তৃতার আসরে বসে কথার ফুলঝুরিতে সবকিছুর উন্নয়নকে উদ্ধার করতে ছাড়ি না। অনেকে অতিকথন ও ফালতু কথার মাধ্যমে নিজেদের ওজন বিনষ্ট ও দেশের মর্যাদাকে জলাঞ্জলি দিতে সরব দেখা যায়।

দেশের কল্যাণ কামনা ও দুর্নীতি করা একসঙ্গে চলে না। দুর্নীতি করে নিজের রসনাতৃপ্ত করে দেশকে রসাতলে ডুবিয়ে দেয়ার জন্য একদল মানুষ ব্যস্ত রয়েছে। দেশের আপামর জনগণের কল্যাণ কামনাকারী কোন মানুষের এত বেশি জমানো সম্পদ থাকতে পারে না। তা ছাড়া জনগণের উপর জুলুমকারী ও উৎপীড়ক না হলে জননেতাদের এত অবৈধ সম্পদ থাকে কি করে? দুর্নীতির মাধ্যমে চাকরি ও সম্পদের অবৈধ মেরুকরণ বেকারত্মকে আরও মারাত্মক সামাজিক সমস্যায় ঘণীভূত করে ফেলায় মেধার মূল্যায়ণ নিয়ে নিয়োগদাতাদের কোন বিকার নেই।

সেজন্য আমাদের শিক্ষিত, মেধাবী তরুণরা নিজেদের যোগ্যতামতো কোথাও ঠাঁই না পেয়ে ক্রমাগত পথে বসে যাচ্ছে। এ অবস্থা নিরসনের জন্য সুশাসন প্রয়োজন। দেশের প্রচলিত সেবাদান ব্যবস্থাকে কঠোর নৈতিক শৃঙ্খলার মধ্যে এনে একটি উন্নত ব্যবস্থাপনায় রূপান্তর করা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। এ মুহূর্তে নেশায় নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া কর্মশক্তির লভ্যাংশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের কত অংশ ক্ষতিকর প্রভাবের মধ্যে নিপতিত হয়েছে সেটা নিরুপণ করাটা অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। মাদকের সহজলভ্যতা ও ব্যবসা আমাদের দেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের জন্য প্রধান অন্তরায় হিসেবে কেন বিবেচিত হচ্ছে তার কারণগুলো খতিয়ে দেখা এবং সেগুলো নিরসণে যুব উন্নয়ন কেন্দ্রের মাধ্যমে বিশেষ আত্মকর্মসংস্থান ব্রিগেড গঠন করে আশু প্রশিক্ষণ, সুদবিহীন ঋণদান করে কাজের মধ্যে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে পারলে ভাল হবে।

বাংলাদেশ বর্তমানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের যে বিরল সম্ভানাময় সময় পার করছে তাকে গুরুত্ত্ব দিতে হবে। জনমিতিক লভ্যাংশ মাদক ব্যবসা ও মাদক সেবন করে নেশায় বুঁদ হয়ে উচ্ছন্নে যাবে তা কারো কাম্য নয়। কঠোরভাবে মাদক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই ঘৃণিত বিকাশকে বিশেষ কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কারণ এটা আমাদের আর্থ-পরি-সামাজিক, মনো:দৈহিক ও মানবিক উন্নয়নের জন্য চাক্রিকভাবে গুরুত্ব বহন করে। এই সুযোগ আমাদের জন্য প্রকৃতির আশীর্বাদ স্বরূপ। সুতরাং এই বিরল সুযোগকে আর কোনভাবে হেলায় হারানোর অবকাশ নেই।

লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন

;

বেপরোয়া ইউএনওদের থামান!



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ফের আলোচনায় এসেছেন এক ইউএনও। বান্দরবনের আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহরুবা ইসলাম একটা ফুটবল টুর্নামেন্টে অতিথি হয়ে এসে পুরস্কারের ট্রফি ঘোষণা দিয়ে আছাড় মেরে ভেঙেছেন। খেলায় দুপক্ষের বাদানুবাদ হতে পারে, বিজয়ী-বিজিত নির্ধারণে বিতর্ক থাকতে পারে কিন্তু প্রধান অতিথি হয়ে আসা মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তার এমন আচরণ অনাকাঙ্ক্ষিত, অশোভন; ঔদ্ধত্য বললেও অত্যুক্তি হয় না। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হয়েও তিনি উপস্থিত অগণন জনতার প্রতি স্পষ্টতই অসদাচরণ করেছেন, তাদেরকে অসম্মান করেছেন।

গণমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, গত শুক্রবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে উপজেলার চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের মাংতাই হেডম্যান পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে আবাসিক স্বাধীন যুব সমাজের উদ্যোগে জুনিয়র একাদশ বনাম রেপারপাড়া বাজার একাদশ ফুটবল টিমের ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মেহরুবা ইসলাম। সমাপনী খেলায় ৭০ মিনিট খেলার পর ড্র হয়ে যায়। এ কারণে রেফারি দুই দলকে টাইব্রেকার খেলার সিদ্ধান্ত দেয়। খেলায় ৪টা টাইব্রেকারে আবাসিক জুনিয়র দলের ৩টা গোল হয় এবং টাইব্রেকারে রেপার পাড়া একাদশের একটা গোল হয়। খেলার নিয়ম অনুযায়ী আবাসিক জুনিয়র একাদশ চ্যাম্পিয়ন এবং রেপার পাড়া একাদশ রানার্স আপ হয়। এরপর প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মেহরুবা ইসলাম বলেন, ‘খেলায় হার জিত থাকবে। এতে কারও মন খারাপের কারণ নেই।’ তিনি উপস্থিত জনসাধারণের কাছে খেলার ফলাফলে সন্তুষ্ট কিনা জানতে চাইলে কয়েকজন খেলার ‘ফলাফল মানি না’ বলাতে ইউএনও ক্ষিপ্ত হন। এরপর তিনি খেলার চ্যাম্পিয়ন এবং রানার্স আপ ট্রফি ভেঙে ফেলেন। এ সংক্রান্ত ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে ইউএনওকে ট্রফি ওপরে তুলে টেবিলে আছাড় মারতে দেখা যায়। [ইত্তেফাক, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২]

গ্রামাঞ্চলে ফুটবল খেলায় এমনিতেই প্রতিপক্ষরা বিতর্কে জড়ায়, হাতাহাতি-মারামারির ঘটনা পর্যন্ত গড়ায়। টাইব্রেকারে ফল নির্ধারণ অনেক ক্ষেত্রে অনেকেই মানে না, অর্থাৎ ওখানে যা হয়েছিল তার কোনোটাই অস্বাভাবিক নয়। আয়োজকরা শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসে বিজয়ী ও বিজিত নির্ধারণ করেন। কিন্তু ইউএনও মেহরুবা ইসলাম মাঠের বিবাদের সমাধান করতে তো পারেনইনি বরং যা করেছেন তাতে তার পেশাগত অবস্থান ও মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো. জয়নাল আবেদীনের ভাষায় ইউএনও বক্তব্যকালে কেউ কেউ ‘ব্যাড সাউন্ড’ করায় ক্ষুব্ধ হয়ে ট্রফিগুলো ভেঙে ফেলেন।

ইউএনওর এই ট্রফি ভাঙার ভিডিয়ো সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, একাধিক গণমাধ্যম এনিয়ে প্রতিবেদন করেছে। আলোচনা চলছে, প্রতিবাদ করছেন অনেকেই। ভিডিয়োচিত্র থাকায় এটা নিয়ে আলোচনা এতদূর এসেছে, তা না হলে প্রান্তিক সেই সংবাদ প্রান্তেই থেকে যেত। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠনের কথাও জানা যেত না, হয়তো একজন সরকারি কর্মচারীর বেপরোয়া আচরণ ওখানেই সীমিত থাকত। প্রত্যক্ষদর্শীরাই কেবল মুখ বুজে সহ্য করে বাড়ি ফিরত। হ্যাঁ, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছাড়াই সবাই ফিরেছে। এছাড়া আর উপায় কী যেখানে ক্ষমতা সেখানে আমজনতা আদতে অক্ষমই!

একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তার বক্তব্যকালে উপস্থিত লোকজনের কথাবার্তায় কেন বিরক্ত হবেন, কেন তিনি এমন প্রতিক্রিয়া দেখাবেন? যেখানে যেকোনো পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রেখে সন্তোষজনক সমাধানের পথ নির্দেশের দায়িত্ব তার সেখানে তিনি কেন এভাবে উত্তেজিত হবেন? এটা কি তার পেশাগত দক্ষতার অভাব, পরিস্থিতি শান্ত করার মানসিকতা না থাকার প্রভাব, নাকি ঔদ্ধত্য? যেখানে তার দায়িত্বই ছিল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে একটা সন্তোষজনক সমাধান, সেখানে তিনি যা করেছেন সেটা স্রেফ ঔদ্ধত্য ছাড়া আর কী!

আলীকদমের ইউএনওর ঔদ্ধত্য কি কেবলই এখন? না, দেশের নানা প্রান্তে এমন ঘটনা প্রায়ই গণমাধ্যমে আসে। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ‘স্যার’ না বলায় হেনস্তা করার উদাহরণ নতুন নয়। কেবল ইউএনওদের কেউ কেউ নয়, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের অনেকের মধ্যে এমন নাক উঁচু ভাব বিদ্যমান। এসবের কিছু গণমাধ্যমে আসে, অনেকগুলো আড়ালেই থেকে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে, যেখানে মাঠপ্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তি হয়েও তারা আইন নিজের হাতে তুলেছেন, আইন অমান্য করেছেন, জনতার প্রতি অভব্য আচরণ করেছেন। গত বৃহস্পতিবার বগুড়া সদরের ইউএনও সমর পাল নৈশপ্রহরী আলমগীর হোসেনকে লাঠিপেটা করে তার হাত ভেঙে দেন বলে অভিযোগ এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে গত জুলাইয়ে কক্সবাজারের টেকনাফের ইউএনও মোহাম্মদ কায়সার খসরু স্থানীয় সাংবাদিক সাইফুল ফরহাদকে গালিগালাজ করেন। একই মাসের ৯ তারিখে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময়ে মানিকগঞ্জ সদরের ইউএনও রুনা লায়লাকে ‘ম্যাডাম’ না বলে ‘আপা’ বলে সম্বোধন করায় ব্যবসায়ী তপন চন্দ্র দাসকে লাঠিপেটা করে তার সঙ্গে থাকা পুলিশ সদস্যরা। এপ্রিলে নেত্রকোনার কলমাকান্দার ইউএনওকে ‘স্যার’ না বলায় লাঠিপেটার শিকার হন এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র। সূত্র: ডয়চে ভ্যালে।

এগুলো সামান্য উদাহরণ, নিকট অতীতের উদাহরণ। গণমাধ্যমে এসেছে বলে আলোচিত হচ্ছে। এরবাইরে অনেক খবর গণমাধ্যমে আসে না। কেন আসে না এর দায় কিছুটা আবার ওই গণমাধ্যমেরও, কারণ যত নিউজ তারচেয়ে বেশি ‘নিউজ কিল’ হয় বলে একটা অভিযোগ আছে, সে বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা অধিকাংশই এড়িয়ে যান। এতে প্রকৃত তথ্য অনেক সময় উঠে আসে না বলে ধারণা। তবে আলীকদমের ঘটনা হাজারো মানুষের সামনে হওয়ায় এখানে সামাজিক মাধ্যমের প্রবেশ ঘটেছে, ভিডিয়োও প্রকাশ হয়েছে সঙ্গে সঙ্গেই। তাই নিউজ কিলিং বাস্তবতাকে চাপা দিয়েছে সামাজিক মাধ্যম।

দেশে পাঁচশ’র কাছাকাছি উপজেলা রয়েছে। সব উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা যে নিবন্ধে উল্লেখ ইউএনওদের মতো আচরণ করেন না এমনও না। সবাইকে একপাল্লায় মাপা যাবে না ঠিক, কিন্তু যখন কেউ কেউ বিধিবহির্ভূত কিছু করে থাকেন এবং নানা জায়গায় নানা সময়ে একের পর এক বেপরোয়া ভাবের প্রকাশ ঘটে তখন আমরা না চাইলেও পদবি-প্রতিষ্ঠানের উপরই গিয়ে দায় পড়ে। ইউএনওদের রিপোর্টিং অথোরিটি কি এক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে? প্রশ্ন আছে। উত্তর অজানা। তবে দায়িত্বশীলদের কঠোর ভূমিকার উদাহরণ থাকলে এমন ঘটনা বারবার ঘটত না বলে আমাদের ধারণা।

প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হলেও কী হয় কিছু ক্ষেত্রে এটা অজানা নয়। কুড়িগ্রামের ডিসি মোছা. সুলতানা পারভীনের বিরুদ্ধে একটা সংবাদ যাওয়ায় মধ্যরাতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাংবাদিক আরিফুল ইসলামকে কারাদণ্ড দিয়ে আলোচনায় আসা ডিসি ও রেভিনিউ ডেপুটি কালেকটর (আরডিসি) নাজিম উদ্দিন বিভাগীয় শাস্তির মুখে পড়েছিলেন। এরপর তারা পৃথকভাবে শাস্তি মওকুফের আবেদন করে সফল হয়েছিলেন। এতে কী প্রমাণ হয়? প্রমাণ কি হয় না যত বড় ঘটনাই হোক না কেন এর পরিণতি একটা বিভাগীয় শাস্তি এবং এটা আবার মাফ করানোও যায়! তার উপর আছে ‘বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন’ নামের তাদের সংগঠন। অনেকেরই বিস্মৃত হওয়ার কথা না বরিশালের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লার সঙ্গে স্থানীয় ইউএনওর বিবাদের পর কীভাবে প্রশাসন ও রাজনীতিবিদদের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছিল এক বিবৃতির মাধ্যমে। যদিও শেষ পর্যন্ত রফা হয়েছিল, কিন্তু ওই ঘটনা কি মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ সকল স্তরে প্রভাব ফেলেনি? এছাড়া আছে গত এক দশকের দেশের সামগ্রিক অবস্থা যেখানে জনতার কথা বাদই দিলাম কোণঠাসা খোদ আওয়ামী লীগ; সর্বেসর্বা প্রশাসন। আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মসূচি বলতে গেলে নেই দেশে, সরকারি কর্মসূচির আদলে যা কিছুই পালিত হয় সেখানে কেন্দ্রবিন্দুতে প্রশাসনের নানা স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এগুলো কি বাড়াবাড়িতে কিছুটা হলেও সহায়ক হয়নি?

নাগরিকদের সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের যেকোনো অসদাচরণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিধিমালা বলে শাস্তির কথা। বিধিমালা যদি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন না হয় তবে এধরনের অশিষ্ট আচরণ চলতেই থাকবে। যেখানে বেপরোয়া আচরণ সেখানেই দায়িত্বশীলদের কঠোর ভূমিকা আশা করি। তা না হলে এটা বাড়তেই থাকবে!

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

;

কবে থামবে এ মৃত্যুর মিছিল?



ড. মতিউর রহমান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ নদীকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করে। এ ছাড়াও দেশের অধিকাংশ মানুষের যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম নৌপথ। তুলনামূলকভাবে কম খরচ এবং আরামের কারণে দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ যাতায়াতের জন্য নদী পথ বেছে নেয়। কিন্তু যাতায়াতের সবচেয়ে নিরাপদ ও আরামদায়ক এই পথটি এখন সড়ক পথে যাতায়াতের মতোই অনিরাপদ হয়ে ওঠেছে। একের পর এক ঘটছে নৌ দুর্ঘটনা । এসব দুর্ঘটনায় হাজার হাজার মানুষ নিহত ও আহত হচ্ছে।

সম্প্রতি ঘটে গেল আরো একটি হৃদয়বিদারক নৌ দুর্ঘটনা। পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় করতোয়া নদীতে ইঞ্জিন চালিত নৌকা ডুবে মারা গেলেন প্রায় ৪১ জন নারী, পুরুষ ও শিশু। গত রোববার (২৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে মহালয়া উপলক্ষে পাঁচপীর,বোদা, মাড়েয়া, ব্যাঙহারি এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নৌকায় করে বদেশ্বরী মন্দিরে যাচ্ছিলেন পূজা দিতে। এ সময় নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী ছিল। এ কারণে মাঝ নদীতে পৌঁছানোর পর যাত্রীর চাপে নৌকাটি ডুবে যায়। এ সময় কিছু মানুষ সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও বেশির ভাগ যাত্রীই এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর এর তথ্য মতে, দেশে গত সাত বছরে ৪,৭৯১টি নৌ দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ৪,২৩৮ জনের প্রাণহানি হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ২,৭১৪ জন। নৌপথে দুর্ঘটনাগুলোর প্রায় ৫৪ শতাংশই অন্য নৌযানের সঙ্গে সংঘর্ষ ও ধাক্কা লেগে হয়েছে। বাকি দুর্ঘটনার কারণ বৈরী আবহাওয়া, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, লঞ্চের তলা ফেটে যাওয়া, যান্ত্রিক ত্রুটি, আগুন লাগা ও বিস্ফোরণ। সবচেয়ে বেশি নৌ দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নৌ দুর্ঘটনা রোধে নৌপরিহনের চালক ও যাত্রী সবাইকেই সচেতন হতে হবে। চালকরা সাবধানে নৌযান চালালে অনেক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব। নৌযান দুর্ঘটনার বিশেষ করে লঞ্চ দুর্ঘটনার যে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত হয়েছে তার মধ্যে অন্য নৌযানের সঙ্গে ধাক্কা, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন, বৈরী আবহাওয়ায় লঞ্চ চালনা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এছাড়া আগুন ও বিস্ফোরণ, মানবসৃষ্ট ভুল, নৌরুট ও বন্দরের দুর্বল ব্যবস্থাপনাও রয়েছে৷।

এছাড়াও ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চে সার্ভে সনদ ও রুট পারমিট প্রদান, অতিরিক্ত যাত্রী ও অদক্ষ চালকসহ নানা কারণে নৌপথে দুর্ঘটনা ঘটে। বাসের মতো লঞ্চেও মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ইঞ্জিন বা বডি নিয়ে অসংখ্য যাত্রীর জীবন নিয়ে খেলছেন নৌযান মালিক ও চালকরা।

দেশে একেকটি দুর্ঘটনা ঘটে। তদন্ত কমিটি হয়। প্রতিটি তদন্ত কমিটি দুর্ঘটনার কারণ, দায়ী ব্যক্তি চিহ্নিতকরণ, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধের উপায় বা প্রতিকার এবং কিছু সুপারিশ করলেও সেগুলো আলোর মুখ দেখে না।

জানা যায় ‘অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল আইন, ২০২১’ নামে একটি খসড়া আইন প্রণয়নের মধ্যেই তা আটকে রয়েছে। এই খসড়া আইনটির ৭৩ ধারায় অপরাধ ও দণ্ডের বিষয়ে সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আইনের ৮০ ধারায় কোম্পানির পরিচালকদেরও সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দায়ী করে শাস্তি দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত হয়নি আইনটি।

নৌ দুর্ঘটনাসহ সবধরনের দুর্ঘটনা বন্ধে বিশেষজ্ঞরা যেসব সুপারিশমালা বিভিন্ন সময়ে প্রদান করেছেন সেসবের যথাযথ বাস্তবায়ন করে মানুষের জীবন রক্ষা করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা নাহলে এ মৃত্যুর মিছিল থামবে না বলেই প্রতীয়মান হয়। সুতরাং যথাযথ কর্তৃপক্ষ এদিকে আশু নজর দিবেন বলে মনে করি।

ড. মতিউর রহমান: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী

 

;