দুইটা ফিঙে



তানভীর মোহাম্মদ
অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

আকাশে বড় লেজ দুইটা পিচ্চি পিচ্চি পাখি উড়তেছে। মনে হইতেছে ওরা দুইজন পরস্পর দুষ্টুমি করতে করতে—উড়ার নানান তাল ভাঙতে ভাঙতে, হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাইতেছে বাতাসে। ডানা ঝাঁপটায়ে একে অপরকে ঢাইকা ফেলতে চাইতেছে। তারপর ফুড়ুৎ করে একটু নিচে নাইমা গিয়া শাঁই কইরা উড়াল দিতেছে অনেক উপরে। ওদের এইটুকু মাথার ঠিক এইটুকুই প্রকাশ। আমি দেখতে পাই না তাদের ইঙ্গিত। যেন পৃথিবীর সব প্রেম সব কামনা ছোট্ট ছোট্ট দুইটা চোখে একাকার হইয়া মোলায়েম পালকগুলাতে ছড়ায়ে পড়তেছে।

আশপাশ দেখতে দেখতে হঠাৎই চোখ পড়ল দূরের আরেকটা ছাদে। একটা বড়সড় চিলও আমার সাথে দেখতেছে এই দৃশ্য। পরপর আরো দুইটা চিল আইসা বসল। আমি ওদের মনোযোগের কোথাও নাই। বড় বড় চিলগুলাকে দেইখা হিচককের দ্য বার্ডস-এর কথা মনে পড়ল আমার। ওইখানেও চিলেরা এমন নিঃস্পৃহ ভাব নিয়া এদিক ওদিক বইসা থাকে। প্রথমে একটা দুইটা, তারপর কয়েকটা, তারপর অগণিত। আর তার পরই বিপর্যয়। পাখিরা হঠাৎ মানুষের ওপর আক্রমণ শুরু করে। ভয়ানক সেই দুর্যোগ। সিনেমা দেখতে দেখতে আমাদের সাজানো গোছানো প্রিয় সবকিছুর কথা মনে পরে তখন। কাছের মানুষদের বুকের কাছে টের পাই। দুর্যোগে তাদের কষ্ট হবার ভয় জাপটায়ে ধরে। অন্যদের যেন কেউ নাই। কিচ্ছু নাই। বাঁচতে বাঁচতে কতকিছুর সাথেই তো রাইখা যাইতেছি কতরকম দুর্ব্যবহারের ছাপ। কে যে কখন আসতে পারবে তার অনেক অনেক পুরানো পাওনা বুইঝা নিতে, সেইটার সময় নিশ্চয়ই আমরা ঠিক করব না। নাকি করব তাও?

আমার সকাল সকাল এইরকম ছাদে আইসা নানান ভাবনার অভ্যাস কোনো কিছুর ওপরই নির্ভর করতেছে না আজকাল। আমি ঘুমাইলাম কি না ঘুমাইলাম ব্যপারই না যেন। এমন দুর্বার দুর্জয় কামনা আমি কী কইরা হেলাফেলা করি। সূর্য ওঠে-ওঠে-ওঠে আর আমার কপালে ঘুমের পর্দা নামতে থাকে। কতদিন স্বপ্নের মতন ভাবলাম ‘সারাটি রাত ঘুমিয়ে তবে’ ভোরে এইখানে আইসা দাঁড়াব। কফি খাব। তারপর হালকা নাশতা সাইড়া গভীরতর চিন্তাভাবনা করতে করতে লেইখা যাব আবার ঘুম না আসা পর্যন্ত। কিন্তু আমার রাত আমার বাতাস আমার সিনেমা আর গুটিকয় মশাকেন্দ্রিক ব্যস্ততা সারতে সারতে আবারও সেই সকাল। এমন সকাল।

অন্যান্য সময় ভোর হইতে থাকলে চারদিকে নির্মাণ শ্রমিকদের জাইগা ওঠার শব্দ পাই। একজন একজন কইরা হাজিরা দিতে থাকে। আর বিভিন্ন রকম টুংটাং ঠাশটুশ চলতেই থাকে। ফলে সকাল মানে যে কেবলি সকাল তারও কোনো সুযোগ থাকে না। অদ্ভুত ব্যক্তিস্বাধীনতার কবলে পইড়া হাঁসফাঁস করতে থাকি ঘুম ঘুম চোখে। জমিদাররা সব একসাথে বাড়ি বানাইলেই মনে হয় পৃথিবীটা কত শান্তির হইতো। অনুগত মনুষ্যের এই সময়ে আমাদের কেন এত শব্দ পোহাইতে হয়?

ঘনবসতির শহরে বড় হইতে হইতে, শব্দের কী এক অদ্ভুত অভ্যস্ততায় আমাদের জীবন স্বাভাবিক হইতে বাধ্য হইল। চক্রাকারে লাখ লাখ মানুষের আবর্তিত হওয়ার শব্দ ঘুরপাক খায়। অগণিত প্রাণ চারপাশকে অত্যধিক জীবন্ত কইরা তুলতে তুলতে, একইসাথে মৃত্যুর দিকেও ঠেইলা দিতে থাকে যেন। যানবাহনের ধোঁয়া আর হর্নের প্রাচুর্যে আমাদের বোধ প্রতিনিয়ত মাটির সাথে মিশে যেতে থাকে। পিষে যেতে থাকে। এরই মধ্যে আমাদের শিল্প, আমাদের সাহিত্য, আমাদের প্রেম-দাম্পত্য সব অ্যাবসার্ড হইতে হইতে ঝাপসা হইয়া যায়। খুব দ্রুত চশমা লাগে। এমনই নিরুপায় বাঁইচা থাকায় যখন ঘুম ভাঙে, দেখি, বেলা উইঠা গিয়া আবার পড়তেও শুরু করছে। আর ওইদিকে আন্ডার কনস্ট্রাকশন থেকা শ্রমের কেমন যেন ক্লান্তি ভাইসা আসতেছে ম্রিয়মাণ শব্দে ভর কইরা।

সেই লেজ বড় পাখিরা গিয়া একটা আন্ডার কনস্ট্রাকশন বিল্ডিংয়ের প্রথম ছাদে বসছে দেখলাম। একটু দূর দূর ভাব। আমাদের দেইখা সোশ্যাল ডিসটেন্সিং খেলা খেলতেছে মনে হয়। অবশ্য বাইরে থেকা দেখা দূরত্বের এই সত্য ওদের সত্যের থেকে কতটা পৃথক তারও আঁচ পাইতেছি কিছুটা। এই যে জুটিটা দূরত্ব বজায়ে রাইখা বইসা আছে আর একটু একটু কইরা দুইজনই আগাইতেছে-সরতেছে, তাতেই বোঝা যায় দৃশ্যমান দূরত্ব এইখানে অনেক ফেলনা ব্যাপার। তার চেয়ে বরং অনেক বেশি কাছাকাছি ওরা নিজেদেরকে পাইতেছে। হয়তো হার্টবিটও শুনতে পাইতেছে পরস্পর। হঠাৎ হঠাৎ ডানা ঝাপটাইতেছে না উইড়াই, আবার ঠিকঠাক তা ছাঁচে না বসায় হালকা নাড়াচাড়া দিয়া ঠিক কইরা নিতেছে। একজন আগায়ে আসলে অপরজনও মৃদু লাফে সইরা যাইতেছে দূরে। যেহেতু তাদের যখন যেখানে খুশি উইড়া যাইতে কোনোই মানা নাই, সেজন্যই হয়তো এক দৃষ্টিতে নিবদ্ধ হবারও কিছু নাই। প্রচুর মাথা নাড়তেছে দুইজনই। মিথ্যা পলায়নরত পাখিটা টাশ কইরা দেখলাম দুইতলার ছাদে চইলা গেল। তারপর ক্ষণকাল। এবং পরেরটাও পিছু নিল মাথা নাড়তে নাড়তে।

যেই ছাদে ওরা দুইজন লুকোচুরি খেলতেছে, সেইটা আটতলা দেহের বিশাল এক বিল্ডিং। সারি সারি পিলার ছাদগুলাকে মাথায় তুইলা রাখছে। এর প্রতিটা নির্মাণে আমার শ্রবণেন্দ্রীয় পুরাপুরি বাধ্য হইয়াই অংশ গ্রহণ কইরা আসছে শুরু থেকা। ফলে ইচ্ছার অভাবের কারণে হবু ভবনটা দেখলেই ঘুমভাঙা দাবির কথা মনে পড়ে। কিন্তু এক সন্ধ্যার ঘটনায় তা ক্ষীণ হইয়া আসাতে, আমি যেমন মারাত্মক মর্মাহত হইলাম। একইসাথে জমিদারদের ওপর থাকা হররেকরকম পুরানো ক্ষোভ রক্তকণিকায় আবারও বেশ পীড়া দিয়া গেল।

সেইদিন সন্ধ্যায়, বের হবার পর মনে হইল আজকের সন্ধ্যাটা একদমই অন্যান্য দিনের মতন লাগতেছে না। লক ডাউনের আতঙ্কে সবার দিশাহারা অবস্থা। বড় মসজিদটায় কিছু লোক মাগরিবের নামাজ পড়তেছে। আশপাশের সব বাড়িতে হইচই হইচই। দুই হাত ভইরা বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য তুলতেছে ফ্যামিলিরা। চাল, ডাল, তেল, আলু, পেঁয়াজ বাজারসুদ্ধ তুইলা আনতেছে একদম। বাজারে গিয়া তো দেখি হুলুস্থুল কাণ্ড। মানুষজনের প্রচণ্ড ভিড়। বস্তা ভইরা ভইরা জিনিসপত্র নিয়া ভ্যান রিকশায় তুলতেছে। কেউ কারো দিকে তাকাইতেই তেমন ইচ্ছুক না। সাহায্য করবার তো সুযোগই নাই। হঠাৎ পরিচিত কারো সাথে দেখা হইয়া গেলে সহানুভূতি জানায়ে রাখতেছে আগত দিনগুলার জন্য। অথবা অনিচ্ছায় পাওনাদারের মুখোমুখি হইয়া পড়লে, শুকনা একটা হাসি দিয়া বলতে চাইতেছে কয়টা দিন খায়া পইড়া বাঁচতে দেখলে রাগ কইরেন না প্লিজ।

লম্বা লম্বা সিরিয়াল প্রতিটা দোকানে। আলু পেঁয়াজ রসুন হুড়মুড় কইরা ঢুকতেছে বস্তার ভিতর। ভিড়ের মধ্যে দেখলাম এক মহিলা। ত্রিশ কেজির বিশাল এক বস্তা হেঁচড়াইতে হেঁচড়াইতে মাটিতে পইড়া গেল। আমি আগাইতে আগাইতে ভাবি, আমার নিত্যদিনের পরিচিত এই বাজার, আজকে কী হইলো তার? খুব দ্রুত আরো এক লোক আগায়ে আসলো সেই মহিলাকে তুলতে। সে এমনিই ঘোরাঘুরি করতেছিল বোধহয়। চেনা লোক। যদিও তার সাথে আমার পরিচয় খুবই অল্প। কুড়িগ্রাম বাড়ি। বাসার পাশের নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ের কাজ হওয়ার সময় দেখছিলাম সে অন্যান্য সহকর্মীদের সাথে আটতলার ছাদে রড উঠাইতেছে। আর সেই রড তোলার পদ্ধতিও কী যে বিপদজনক। কয়েকটা রড দড়ি দিয়া বাঁইধা লম্বালম্বি একজন একজন কইরা সবাই উপরের তলার ছাদে দাঁড়ানোজনকে তুইলা দিতেছিল। এইভাবে এইভাবে আটতলা। অমানবিক! পরে একদিন তার সাথে কথা বইলা সেই শ্রমের মূল্যমান জানার পর, আর কোনোদিনই সোলাইমানের সাথে হাইসা কথা বলতে সাহস পাই নাই। আমি ভাবতাম, আমার সৌখিন হাসাহাসি আর কুশল বিনিময় তার জন্য হয়তো অনেক গভীর অপমানের কারণ হবে।

সোলাইমানকে দেইখা অসহায় হাসি দিলাম আমি। জিগেশ করল বাজার করতে আইছেন? অনেকদিনের বাজার কিন্যা ফালান। দেশ তো বন্ধ হয়া যাইব। খাবার দাবার পাইবেন না পরে। অবস্থাটা কী দেখেন। আগে দেখতাম টাকা নাই তাই খাওন নাই। কয়দিন পর তো দেখমু যাগো টাকা আছে তাগোও খাওন নাই। হরবর কইরা এইসব বলতে থাকা সোলাইমানকে থামায়ে দিয়া যখন আমি জিগেশ করলাম কেমন আছেন। সে চুপ হইয়া গেল। জাস্ট চুপ হইয়া গেল। আমারও তখন আর কী বলার থাকে।

আমি ফিঙে পাখি দুইটাকে লক্ষ্য করতে করতে দেখতেছি ওরা সোলাইমানের হাড় ভাইঙ্গা বসানো ছাদগুলাতে এখনো দুষ্টুমি করতেছে। যেইটা হালকা লজ্জা পাওয়ার মতো কইরা একফুট দুইফুট পলায়ে যাইতেছে ওইটাকে মেয়ে ধইরা নেওয়ার ব্যাপারে মনস্থির করলাম। মেয়ে ফিঙেটা হঠাৎই একটা ছাদ স্কিপ কইরা উইঠা গেল উপরের ছাদে। ছেলেটা ওর তাল অনুযায়ী প্রথমে এক ছাদই উঠল। কিন্তু সাথেই সাথেই দেখল, একি। পাজিটা তো উইঠা গেছে উপরেরটায়। সে হুশ কইরা উইড়া গিয়া একদম মেয়েটার সাথে ঘেঁইষা বসতে চেষ্টা করল। উহু উহু। মেয়েটা সইরা বসছে।

ওরা এখন পাঁচতলার ছাদে। কোনো তলারই দেয়াল পুরাপুরি উঠে নাই। নিচের দিকে একটু একটু উইঠা আছে। আর উপরের দিক তো শুধুই ছাদ আর পিলার। এইপাশে ওদিকের আকাশ দেখা যায়, ওইপাশেও নিশ্চয় এদিকের আকাশ আর আমাকে দেখা যাইতেছে। এর মধ্যে দিয়া বাতাসের অবারিত পথ। কোনো ঘর নাই, দেয়াল নাই। কত স্বচ্ছ। আমাদের আসলে কিছুদিন এমন বসতি বানায়েই থাকা উচিত। তখন বোঝা যাবে আমাদের পারস্পরিক কূটনীতি জটিলতার কোনো উপযুক্ত আবাসনের খোঁজ পাইছে কিনা। নাকি তার অন্ধকারের দিকে আগাইবার আরো অনেক পথ বাকি। আমার সাথে আমরা এবং অন্যদের সাথে আমি, আবার তাহাদের সাথে সে ও অন্যরা। এমন কইরা আরো কত। সম্পর্কের এইরকম নানান স্তরের লুকোচুরি কী একটা সভ্য দেয়াল তুইলা দিয়া আড়াল কইরা ফেলি নিমেষেই। অবিশ্বস্ততা, নোংরামি, রাগ, হিংসা, অভিমান, ক্ষুধা সব ঢাইকা দিয়া কোমল শান্তির ছড়াছড়ি আমাদের চোখে মুখে। ওইদিকে পাখিরা আরো একতলা উঠল। ওদের ভাবার দরকার নাই কিছুদিন পর এইখানে কত্তগুলা আড়াল গইড়া উঠবে। যেইগুলার ভিতরের রূপ রস গন্ধ কিছুই টের পাওয়া যাবে না এইদিক থেকা।

আমাদের তো এখন শহরই সবকিছু। যাদের কিছু কিছু গ্রামে রাইখা আসছে তারা সবাই বাড়িতে চইলা যাইতেছে। আমাদের কোথাও যাওয়ারই তেমন দরকার নাই। তাই বাসায় বইসা বইসা খাদ্য মজুদ করতেছি, আর যারা ক্ষুধা ও মৃত্যুর মাঝামাঝি পইড়া এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতেছে, ওদের গালাগাল দিতেছি। এইসবে কিছুটা ক্ষোভ ঝইড়া গিয়া ক্ষুধার ব্যাপারে আমাদের জানার ঘাটতিও কিছুটা ঢাকা পড়তেছে বৈকি। সোলাইমান কথায় কথায় জানাইল বাড়ির মালিক যেই পাওনা পরিশোধ করছে ওতে কইরা বাড়ি যাবার মতন সাহস তার হইতেছে না। অযথাই অনেকগুলা ক্ষুধার্ত মুখ দেইখা দেইখা মরতে হবে। এদিকে কাজ বন্ধ হইল অনির্দিষ্টকালের জন্য। খাওয়ানোর আশ্বাসও তো দিতে পারবে না। এইখানে থাকলে আবার নিজের খাবারেরই যোগান আসবে কই থেকা সেইটা ভাবতে ভাবতে বাড়িতে ফিরতে পারার সময়গুলা শেষ হইয়া যাইতেছে। কী থাকতেছে আর। আজকালকের মধ্যে আবার গাড়িও বন্ধ হইয়া যাবে। আজকে দেখা হওয়ার পর কথাবার্তার শুরুর দিকে, একটু বেশিই হাসতেছিল মনে হইল। সেই অতিরিক্ত হাসি হাসি মুখ মনে পড়তে থাকল আমার। ফলে বিজ্ঞানসম্মত কর্তব্য ভুইলা গিয়া সোলাইমানকে বলতে হইল যে তার দ্রুতই বাড়িতে যাওয়া দরকার। বুঝায়ে বললাম দেখেন, আমাদের কিন্তু মাঝেমধ্যে কিছুই থাকে না। সেই সময় ওই মানুষগুলাই থাকে শুধু। যেমনেই থাকুক। আপনে বাড়িতে যানগা তাড়াতাড়ি। আল্লাহর ওপরে ভরসা রাখেন। খাইতে কিছু না কিছু তো পাইবেন অবশ্যই। ওইটা দিয়া চালাইয়া নেন। আমরা বাঁইচা থাকলে আবার মাছ-মাংশ খাবোনে।

প্রয়োজনের তুলনায় অতি অল্প কিছু টাকা দিয়া তার সাহস যোগাইতে চেষ্টা করলাম। তারপর বাজারে ঢুইকা কেনাকাটায় হারায়ে গেলাম। তখন স্বাভাবিকভাবেই আমার পক্ষে কল্পনা করা সম্ভব ছিল না যে সোলাইমান গাড়ি না পাইয়া ড্রামের মালামাল সাইজা অন্ধকার হাতড়াইতে হাতড়াইতে বাড়ি যাবে।

অনিশ্চয়তার কবলে পড়া নিয়া আমার কখনোই বিশেষ ভয় কাজ করে নাই। শুধুই স্রষ্টার ওপরে বা ভাগ্যের ওপরে ভরসা কইরা বইসা থাকা না। আমার ধারণা এর পিছনে নিশ্চয়ই আব্বার গুণগত বৈশিষ্ট অনেক বেশি প্রভাব ফেলছে। আমার মন যখন অনেক নরম; অনেক ছোট, তখন থেকাই প্রভাবিত হওয়াটা ঘইটা থাকতে পারে। আমাদের কত ভালো সময় গেছে, কত খারাপ সময় গেছে। অতি ভালো আর অতি খারাপের সাথেও পরিচিতি ঘটছে বিভিন্ন পর্বে। কিন্তু যতবারই কোনো সংকটের মুখোমুখি দাঁড়াইতে উদ্যোগী হইছি আমার কেবলই মনে পড়ছে ক্ষুধার কথা। অথচ কোনো বেলা আমরা না খাইয়া সবাই একে অন্যের থেকা মুখ লুকাইতেছি এমন মনে পড়ে না। তবু কোথাও না কোথাও নিশ্চয়ই কেউ একজন খাবার পাইতেছে না এই অনুভূতির কারণেই হয়তো ক্ষুধার ভয় থেকা আমি কখনো মুক্তি লাভ করি নাই।

সোলাইমানের পিকআপ ভ্যানে ড্রামে কইরা বাড়িতে যাওয়ার কথা মনে পড়ায় খুব দমবন্ধ লাগতেছে আমার। ত্রিপল দিয়া ঢাকা অনেকগুলা ড্রামের দৃশ্য কল্পনা থেকা মুইছা ফেলতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাইতেছি। বড় বড় শ্বাস নিতেছি স্বাভাবিক হইতে। চারদিকের বিস্তৃত শূন্যতায় দৃষ্টি ছড়ায়ে দিয়া পুরা সময়টা ধারণ করতে চাইলাম। আমরা সবাই মিলা কেমন একা হইয়া গেছি। করোনা আমাদের কপালে আইসা উপস্থিত হওয়ার পর, পর্যায়ক্রমে দেখা বিভিন্ন ঘটনা চেতনে আইসা জ্বালাতন শুরু করে। ফলে কিছুই সহনীয় অবস্থায় থাকতেছে না। যতটুক জায়গা আমার অস্তিত্বের জন্য বরাদ্দ ওইটুকুও শূন্যতাকে দিয়া দিতে পারলে আর কোনো অনুভূতিই থাকত না আমার। কিন্তু ওইটা কি মুক্তি? তা তো হইতে পারে না। এতটা দিন থাকলাম কোনো দায়ই কি মাখল না গায়ে? প্যাকেটবন্দী হয়া বাজার কইরা আসার সময় যখন দেখি শুনশান রাস্তার দুইপাশে অনাহারী মানুষগুলা বইসা তাকায়ে আছে আকাশের দিকে—কেন দেখাইলাম তাদেরকে, যে আমি কিছু না কিছু খাইতে পাইতেছি?

অথরিটি তাদের সাথে কী সম্পর্ক রাখছে সেইটা তাদের অভিযোগের মোটামুটি চূড়ান্ত মাত্রা হইলেও আমার মতন মুখচেনা মানুষগুলার প্রতি ওদের চাহনির যৌক্তিকতা খুব ভালোভাবেই টের পাই তখন। সেইটা সহ্য করবার জন্য কত সবল চিত্তের হইতে হবে তার সম্পর্কেও যখন আমার কোনো ধারণা নাই, আমি কই গিয়া মুখ লুকাব।

লকডাউন শুরু হইল পরে ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ের নির্দেশনা আসার পর সবার যখন রোজগারের পথ বন্ধ হইল, বাসাবাড়ি থেকাও বাইর হওয়া মানা। তখন সঞ্চয়বিহীন ঋণের বোঝা টানতে টানতে ক্লান্ত এই মানুষগুলার তো বাইর হইতেই হয়। রাষ্ট্রের অধীনে থাইকা যেইভাবে এতদিন নিজেদের খাবারটুকু যোগাড় কইরা আসছে; এবং পদে পদে সরকারি কর্তৃত্বের জানা-অজানা নানান অধিকারকে অবধারিত কর্তব্য হিসাবে সন্তুষ্ট কইরা আসছে। তবে কেন এখন ওরা—যাদেরও আছে মৃত্যুর ভয়, ক্ষুধার মুখোমুখি দাঁড়ায়া আপনাকে বিশ্বাস করতে পারল না হে মহামতি ঠাকুর? চিরদিনই তো খালি পুলিশ খালি পুলিশ। ওরা আর আপনার মতো বুদ্ধিমান মানুষ হইতে পারল কই। তার ওপর মুখ ফসকায়ে বোকাবোকা কিছু বললেই আপনার জমাট মাখনের মতো দুগ্ধ অভিমান। যেন কত আপন; যেন বাবা মা!

সামনের বিল্ডিং গাছপালা সব কুয়াশায় আচ্ছন্ন হইয়া আছে। যেইখানটাতে গাছও নাই বিল্ডিংও নাই, সেইখানটায়ও নিশ্চয়ই এমন। হালকা কুয়াশা। একটু একটু শীতল বাতাস বইতেছে। আমি আবার মনোযোগ দিলাম ফিঙে দুষ্টুগুলার দিকে। মন খারাপে কাজ নাই। দেখি ওরা কী করতেছে। মেয়ে ফিঙেটা এখন সাততলায় বইসা নিচে উঁকিঝুঁকি মারতেছে একটু একটু। আগ্রহ বেশি প্রকাশ পাইতে নিলে আবার এলোপাথাড়ি মাথা নাড়তেছে এদিক ওদিক। হাহা, কোনো উদ্দেশ্যই নাই তার এই পলায়নের। কাউকেই কিন্তু তার দরকার নাই। নিজেই নিজের কাজ সাইরা নিতে পারবে, হুম। ছেলেটা ছয়তলায় বইসা বইসা একদমই উপরে কেন তাকাইতেছে না সেইটাও একটু ভাইবা নিতেছে হয়তো। ওইটা তো না তাকানোর চেষ্টায় একদম বুকের সাথে মুখ মিশায়ে রাখছে। ওর যে যাইতেই হবে উপরে! বুকটা আকুপাকু করতেছে। ফুড়ুৎ কইরা হয়তো উইড়া গিয়া একদম গায়ে পইড়া যাবে, ছেলেদের মতন।

চারদিকে কোনো সাড়াশব্দ নাই। গুমোট কান্নার মতন লাগতেছে। সবাই ঘুম। জানালা বন্ধ। অথচ এইসময় সব বাসার রান্নাঘর সচকিত হয়া ওঠার কথা। যারা রান্না করবার, পুনর্ঘুমের একটা ফ্রেশনেসের কামনা যাদের কপালকে জর্জরিত কইরা রাখছে, তারা সজাগ হইতে হইতে এইটা ওইটা বসাবে চুলায়। তারপর একে একে সবাই উঠবে। খাবে দাবে এবং বাইর হবে। কিন্তু আজকে তো কারো বাইর হওয়ার কথা নাই। কোনদিন থেকা বাইর হবে তাও ধারণার অতীত। কিংবা আর কখনো বাইর হওয়া হবে কিনা! এভিনিউ দুইয়ের বড় মসজিদ থেকা কয়েকজনকে নামাজ পইড়া পৃথিবীতে বাইর হইতে দেখা গেল। মাস্ক পরতেছে।

গতকাল দেখছিলাম মসজিদ পুরাটা বাঁশ দিয়া ঘেরাও দিয়া রাখা। সবাইকে বাসায় নামাজ পড়ার জন্য মাইকে আহ্বান জানানো হইতেছে সকাল বিকাল। তারপরও নামাজি ব্যক্তিরা পুলিশের গাড়ি চেক দিয়া দিয়া হাজির হয় আল্লাহর কাছে। বাঁশের বাউন্ডারির ফাঁক দিয়া এক পা ঢুকায়ে মাথা নত কইরা চুপেচাপে ঢুইকা যাইতেছে। তারপর সদর দরজা আটকায়ে নামাজ পড়তেছে মাইক ছাড়াই। জনমনে ঠাকুরের মধ্যস্ততাকারীদের এই গাড়িগুলা এতটাই অবিশ্বস্ততার প্রতীক হইয়া ভুমভুম করতে থাকে যে বিশ্বব্যাপী চলমান দুর্যোগ মানে তাদের কাছে শুধু ওই লোকগুলাই। ওদের কোনোভাবে ফাঁকি দিয়া নিজের কাজগুলা সাইরা নিতে পারলেই তো হইল।

চায়ের দোকানদার মিলিটারি ফাঁকি দিয়া শাটার ফালায়ে বইসা থাকে, কেউ টোকা দিলে ভিতর থেকা বলে দুধ চা না রঙ চা? কী অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা। তারপর শাটার অল্প উঁচা কইরা ক্রেতাকে আপন বানায়া নেয়। মাসখানেক আগে ওই দোকানদার হাসতে হাসতে বলতেছিল দেখছেননি ইহুদিগুলান মরতাছে ক্যামনে ভাইরাসে। হালাল হারাম মানে না তো। যা তা খায় একবারে। সেদিনও ওর দোকানে মসজিদকেন্দ্রিক স্থানীয় প্রশাসনের লোকজন আড্ডা মারতেছিল যথারীতি। ওদের সেই খারাপমানুষির মুখোমুখি হইতে গিয়া প্রচণ্ড অস্বস্তি পোহাইছিলাম সেদিন। যুক্তির বিরুদ্ধে ধর্মের ভাবসর্বস্ব যেই লড়াইয়ের ইতিহাস, ইসলাম তাতে একটু ভিন্ন রঙই তো নিয়া আসছিল। মহামারিতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ব্যপারে নবীজির স্পষ্ট বক্তব্য থাকা সত্ত্বেও ইসলামিক নেতারা এমন দুর্বল ভূমিকায় নিজেদের হাজির করাটা খুব বেশিই অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার। অনুসারীদের দায় তারা কিভাবে এড়াইতে পারেন।

হঠাৎ কোনো একটা দৃশ্য আমার এইসমস্ত ভাবনাচিন্তাকে পুরাপুরিভাবে অপ্রয়োজনীয় কইরা ফেলল। আমার মনোযোগ সত্যিকার অর্থে কোনদিকে আমি সেদিকে লক্ষ্য করতে চেষ্টা করলাম। পাখি দুইটা আবারও আমার মনোযোগ কাইড়া নিল লাফালাফি করতে করতে। ওরা এখন সর্বোচ্চ ছাদে। যেই ছাদটা এখনো কমপ্লিট হয় নাই। সারি সারি বাঁশের ওপর কাঠ দেওয়া। ফলে ওইখানে কলাবাগানের মতো একটা আড়াল ভাব তৈরি হইছে। ওরা দুইটা তার মধ্যে দিয়া লুকোচুরি খেলতেছে। হাসাহাসি লুকালুকির এক পর্যায়ে মেয়েটা ক্লান্ত হইয়া একখানে বইসা পড়ল। ছেলেটা খুশিতে ওর চারপাশে উড়তে উড়তে চক্কর দিয়া একদম জড়ায়া বসল। এইবার মেয়েটা আর সরতেছে না। আমি আমার মাঝেও কিঞ্চিৎ দুষ্টু দুষ্টু ভাবের আভাস পাইলাম। হার্টবিট বাড়তেছে। এইবার, হ্যাঁ, ওরা দুইজন ফাইনালি মিলিত হইল। আমি তো মানুষ, ওদের কিছুই দেখতে বাঁধা নাই। আমার কনস্ট্রাকশনে আইসা পাখিরা কী কইরা গেল তাতেও মন খারাপ নাই। কিন্তু কিছুক্ষণ পর ওদের প্রশান্ত উইড়া যাওয়া দেখতে দেখতে একটু মন খারাপ হইল। সবই তো আছে। আমরাও থাকি না!

ধারাবাহিক উপন্যাস ‘রংধনু’-২



মাহফুজ পারভেজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

[দ্বিতীয় কিস্তি]

মেয়ের ব্রোকেন ফ্যামিলির বেহাল দশার খবর জেনে একদিন ম্যারির মা এসে হাজির। যথেষ্ট বৃদ্ধ হলেও মিসেস অ্যানি গিলবার্ট, ম্যারির মা, এখনো বেশ শক্তপোক্ত ও কর্মঠ। মা আসায় বাড়িটি কিছুটা প্রাণ পেলো। মেয়ে আর নাতীকে নিয়ে মিসেস অ্যানি গিলবার্ট চারপাশে আনন্দময় একটি পরিবেশ গড়ে তুললেন। তারপর কিছুদিনের মধ্যেই তিনি রুদ্রমূর্তি ধারণ করলেন। ক্রুসেড ঘোষণার মতো তিনি বাড়ি থেকে ক্যাভিনের যাবতীয় স্মৃতি মুছে ফেলতে লাগলেন। তার পরিত্যক্ত জামা-কাপড়, বইপত্র, এমনকি দেয়ালে ঝুলানো একটি হাস্যোজ্জ্বল ছবিও মিসেস অ্যানি গিলবার্টের ক্ষোভ থেকে রেহাই পেলো না। তিনি সময় পেলেই গজগজ করে ক্যাভিনকে অভিসম্পাত করেন এবং তার মেয়ের সকল দুর্গতির জন্য তাকে আসামী করে অভিযোগ করতে থাকেন। মিসেস অ্যানি গিলবার্টের চোখে পৃথিবীর একমাত্র মন্দ লোক এবং তাদের চরম শত্রু ক্যাভিন।

ক্যাভিনের প্রতি মায়ের প্রচণ্ড ক্ষোভের কোনো প্রতিক্রিয়া জানান না ম্যারি। ক্যাভিন সম্পর্কে কোনো কিছু জানতে চাইলেও উত্তর দেন না। ক্যাভিনের প্রসঙ্গ এলেই ম্যারি নিশ্চুপ থাকেন। যদিও ক্যাভিনের পক্ষে বলার মতো কোনো যুক্তি কিংবা বাস্তবতা তার কাছে নেই। আবার ওর বিরুদ্ধে কিছু বলতেও ম্যারির মন সায় দেয় না। চুপচাপ ম্যারি ভাবেন, “সব কিছু মুছে ফেললে কিংবা সব জিনিস ফেলে দিলেই স্মৃতিরা হারিয়ে যাবে? স্মৃতি তো বস্তুগত বিষয় নয়। সত্ত্বার সঙ্গে মিশে থাকা স্মৃতি সহজে হারায় না।”

মিসেস অ্যানি গিলবার্ট কিছুদিনের মধ্যেই পুরো বাড়ি থেকে ক্যাভিনের অস্তিত্ব সাফ করে দিলেন। ক্যাভিন নামে একজন এই বাড়ির বাসিন্দা ছিল, এমন কোনো চিহ্নই আর রইল না। এখানেই থেমে থাকলেন না তিনি। পাড়ায়, বাজারে, যখন যেখানে যান, সেখানেই ক্যাভিনের একটি নিগেটিভ ইমেজ তৈরিতে ব্যস্ত হলেন। মিসেস অ্যানি গিলবার্ট আসলে খুব নেতিবাচক ও পরচর্চ্চাকারী মানুষ নন। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন, মেয়ের জীবন থেকে চলে যাওয়া ক্যাভিনের স্মৃতিগুলো ওর মন থেকে মুছে ফেলনে নতুন একটা পরিবেশ তৈরি হবে। ম্যারি হয়ত নতুন জীবনও শুরু করতে পারবে। তিনি মেয়ের জন্য গোপনে যুৎসই পাত্র খুঁজতেও তৎপর হলেন। মা হিসেবে এসব কাজকে তিনি তার দায়িত্ব মনে করেন।

মিসেস অ্যানি গিলবার্টকে দোষ দেওয়া যায় না। কন্যার স্বার্থচিন্তায় সব মায়েরাই এমন করেন। তিনি কোনো ষড়যন্ত্র বা গোপন লুকোছাপার আশ্রয় নেন নি, সব কিছু প্রকাশ্যেই করছেন। ম্যারিকেও তিনি পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছেন, “তোমাকে এভাবে একাকী ও নিঃসঙ্গভাবে কাটাতে আমি দেবো না। আমার জীবনে তুমি আর তোমার ভাই পিটার ছাড়া কেউ নেই। পিটার ফিলাডেলফিয়ায় চাকরি নিয়ে বেশ আছে। ওকে নিয়ে চিন্তা নেই। তোমার ছেলে টমাসকে নিয়ে আমি থাকবো আর তুমি নতুন করে জীবন শুরু করবে।”

মায়ের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে পরিকল্পনাগুলো শুনেন ম্যারি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় সম্মতি কিংবা অসম্মতি জানান না। তিনি জানেন, বিধবা মায়ের সঙ্গে তর্ক অর্থহীন। তিনি এসেছেন সাহার্য্য করতে। তাকে মোটেও বিমুখ করা যাবে না। তর্ক-বিতর্ক করে পরিবেশ বিষিয়ে লাভ নেই। বরং চুপ থাকলে এক সময় মা হাল ছেড়ে দেবেন।

কিন্তু মিসেস অ্যানি গিলবার্ট কঠিন প্রকৃতির মানুষ। সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন মোটেই। তিনি চা কিংবা কফি পানের জন্য চেনাজানা তরুণদের বাসায় আমন্ত্রণ জানাতে শুরু করেন। ভদ্রতা স্বরূপ ম্যারিকে তাদের সঙ্গ দিতে হয়। তবে নতুন জীবন শুরুর প্রসঙ্গ এলেই ম্যারি প্রসঙ্গান্তরে কিংবা আলোচনা থেকে কোনো উছিলায় সন্তর্পণে সরে আসেন।

বিরক্ত মিসেস অ্যানি গিলবার্ট এক সময় মেয়ের কাছে সোজাসুজি জানতে চান,

“তোমার আসল পরিকল্পনা আমাকে বলো? মধ্য ত্রিশ বয়সের একজন নারী হিসেবে বাকী জীবন একা থাকা তোমার পক্ষে দুরূহ।”

“আমি জানি। কিন্তু এখনই নতুন করে আবার জীবন শুরুর ব্যাপারে আমি মনস্থির করতে পারি নি। আমাকে কিছু সময় দাও।”

এরপর আর কথা চলে না। মিসেস অ্যানি গিলবার্ট চুপ করে ঘরের কাজে মন দেন। তার সন্দেহ হয়, তবে কি ক্যাভিন গোপনে এখনো যোগাযোগ রাখছে? কৌশলে নানা রকমের তদন্ত করে তিনি শঙ্কামুক্ত হন। না, ক্যাভিনের বিন্দুমাত্র সন্ধান এই তল্লাটের কেউ জানে না। ম্যারির সঙ্গেও সামান্যতম যোগাযোগ নেই বেচারার। তাহলে ম্যারি এমন করছে কেন? কেন তার সিদ্ধান্তহীনতা? মিসেস অ্যানি গিলবার্ট এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে মেয়ের আচরণ ও চাল-চলনের দিকে বিশেষ মনোযোগী হন।

প্রথম প্রথম মিসেস অ্যানি গিলবার্ট কিছুই টের পান নি। তার গভীর ঘুমের বাতিক। একবার ঘুমালে কিছুই টের পান না তিনি। একরাতের মধ্য প্রহরে ঘুম ভেঙে দেখেন ম্যারি ঘরে নেই। টমাস একাকী ঘুমাচ্ছে বিছানায়। বাথরুম থেকেও কোনো শব্দ আসছে না। চিন্তিত মিসেস অ্যানি গিলবার্ট অবশেষে ম্যারির দেখা পেলেন বাগানে পাইন গাছের নিচে। জানালা দিয়ে অন্ধকারে ডুবে থাকা চরাচরে ঈষৎ আলোর ঝলকানির মতো ম্যারিকে দেখা যাচ্ছে। ম্যারির কফি রঙা খয়েরি চুল কালো বাতাসে অনামা রঙের আদলে অদ্ভুত শিহরণে দুলছে।

পর পর কয়েক রাত ঘাপটি মেরে মিসেস অ্যানি গিলবার্ট মেয়ের গতিবিধি অনুসন্ধান করেন। অবশেষে তিনি নিশ্চিত হন যে, রাতের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে দিয়ে বাড়ির দেওয়ালঘড়ি মধ্যরাত্রির জানান দিলে ম্যারি বিছানা ছেড়ে দেয়। ঠিক বারোটায় চকিতে উঠে দাঁড়ায় ম্যারি। তারপর ধীর পায়ে পৌঁছে যায় বাগানে। খানিক পায়চারী পর স্থির হয় পাইনের তলে।

আরও পড়ুন: ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১

মিসেস অ্যানি গিলবার্টের স্মরণ শক্তি বেশ। তাই তিনি খুবই হতবাক হন ম্যারি মধ্যরাতের অদ্ভুত অভ্যাসের কারণে। কারণ, তিনি বিলক্ষণ জানেন, ম্যারি ছোটবেলা থেকেই ভীষণ ভাবে ভূত বিশ্বাস করে। গ্রামের দিকে তো বটেই, খাস শহরেও সন্ধ্যার পর ঘরের বাইরে বের হতে ভয় পেতো তার মেয়ে। তাদের এই ক্যাম্পাস সিটির আবাসকে নামেমাত্র শহর বললেও আসলে এটি এক প্রত্যন্ত গ্রাম। সুনির্দিষ্টভাবে একে গ্রাম বলাও ভুল হবে। শহর পেরিয়ে পাহাড়তলির ওপর ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা কয়েকটা কাঠের বাড়ির একটি আবাসিক ব্লক আর চারপাশে সীমাহীন বন-জঙ্গল। সাঁঝবেলাতেই নিঝুম রাত নেমে আসে জায়গাটিতে। এখানে তার নিজেরও কেমন একটা ভয়-ভয় করে। অথচ তার ভীতু মেয়েটি দ্বিধাহীন পদক্ষেপে দিব্যি মাঝরাতে বাগানে ঘুরছে?

পরদিন নাস্তার টেবিলে ম্যারিকে চেপে ধরেন মিসেস অ্যানি গিলবার্ট।

“ওতো রাতে বাগানে তোমার কি কাজ থাকে?”

ম্যারি প্রশ্ন শুনেও খানিক চমকিত হলেও নির্বিকার থাকেন। তার অভিব্যক্তিতে মনে হয়, ঘটনাটি যেন অতি স্বাভাবিক বিষয়। এতে অবাক হওয়া বা প্রশ্ন করার মতো কিছু নেই। মায়ের কৌতূহল নিবৃত্ত করতে তিনি সংক্ষিপ্ত উত্তর দেন,

“আমি পাইন গাছের সান্নিধ্যে যাই।”

“পাইন গাছের কাছে? কেন? তা-ও এতো রাতের বেলা?”

“কারণ আমি খুবই একেলা। পাইন গাছের মতো একাকী।”

মিসেস অ্যানি গিলবার্টের চোখে বিস্ময়। তার মুখ লা-জওয়াব। মেয়ের এমন কথার কি উত্তর দেবেন তিনি জানেন না। এরকম কথা কখনো কারো কাছে শুনেছেন বলে তিনি মনে করতে পারেন না। সম্বিৎ হারানোর মতো অবস্থা হলেও মিসেস অ্যানি নিজেকে সামলে নিয়ে মেয়ের সঙ্গে আলাপ জারি রাখেন।

“সব মানুষই কম-বেশি একাকী। পাইনের মতো একেলা হওয়ার কি আছে?”

“আমি আসলেই পাইনের মতো একেলা। না পারছি কাউকে ছায়া দিতে। না পারছি ঝড়-বাদল-দুর্যোগ সামাল দিতে। রাত হলে আমি আমার দোসর পাইনের কাছে চলে যাই নিঃসঙ্গতা কাটাতে।”

মিসেস ম্যারি আর কোনো কথা বলতে পারেন না। তার চোখ ছলছল করছে। তিনি ঘরের অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে মেয়ের কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করেন।

[পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার]

;

আমেরিকার স্বাধীনতার প্রতীক লিবার্টি বেল



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

পেনসিলভেনিয়াকে বলা হয় আমেরিকার জন্মস্থান। পেনসিলভানিয়া একসময় একটি বৃটিশ উপনিবেশ ছিল এবং এরকম মোট ১৩টি বৃটিশ উপনিবেশ মিলেই তৈরি হয়েছে আজকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা আমেরিকা। ১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে আমেরিকায় ইউরোপিয়ান সাম্রাজ্যবাদীদের বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ক শুরু হয়। যদিও ভাইকিংসরা কলম্বাসের অনেক অনেক আগেই আমেরিকায় পৌঁছেছিল কিন্তু কলম্বাসের পদার্পণের পরেই এই মহাদেশ ইউরোপিয়ানদের আকর্ষিত করে এবং এক সময় ইংরেজদের দখলে চলে যায় আজকের এই আমেরিকা। ১৭৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ৪ জুলাই উত্তর আমেরিকার ১৩টি উপনিবেশের প্রতিনিধি পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়ায় সম্মেলনে আয়োজন করে আনুষ্ঠানিকভাবে ইংরেজদের থেকে ‘স্বাধীনতা ঘোষণা’ করেন।

ইনডিপেন্ডেন্স হল

আজকের আমেরিকা প্রতিষ্ঠার বিপ্লবে পেনসিলভানিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় মহাদেশীয় কংগ্রেস আহবান করা হয়েছিল পেনসিলভেনিয়ার অন্যতম জনবহুল শহর ফিলাডেলফিয়াতে। ফিলাডেলফিয়ার তৎকালীন স্টেট হাউজে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র লেখা ও স্বাক্ষরিত হয় যা বর্তমানের ইন্ডিপেন্ডেন্স হল নামে পরিচিত । ১৭৫৩ খ্রিষ্টাব্দে স্টেট হাউজে স্থাপন করা হয় এক প্রকান্ড বেল বা ঘণ্টা। বেলটি কেবল বিশেষ বিশেষ মুহূর্তেই বাজানো হত। সেই বেল বা ঘণ্টাটি বাজিয়ে আইন প্রনেতারা তাদের মিটিং ডাকতেন এবং শহরের লোকজনকে একসঙ্গে জড়ো করতেন তাদের ঘোষণা বা নির্দেশনা শোনানোর জন্য। পরবর্তিতে ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে সেই ঘণ্টাই লিবার্টি বেল হিসেবে স্বীকৃত হয়। বেলটি লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল বেল ফাউন্ড্রি দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল। সেই সময়ে প্রায় ১০০ পাউন্ডে কেনা হয়েছিল এবং ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে আমেরিকার ফিলাডেলফিয়া শহরে ডেলিভারি করা হয়েছিল। লিবার্টি বেলের ওজন প্রায় ২০৮০ পাউন্ড বা ৯৪৩ কেজি। বেলের নিচের অংশের পরিধি ১২ ফুট এবং উপরের দিকে মুকুটের পরিধি ৩ ফুট। আমেরিকাতে আনার পর বেলটি প্রথমবার পরীক্ষামূলক বাজানোর সময়ই ফেটে যায়, স্থানীয় কারিগর মিঃ জন পাস এবং মিঃ জন স্টো ঘণ্টাটি গলিয়ে আবার নতুন করে তৈরি করেছিলেন।

লিবার্টি বেল

পেনসিলভানিয়া পৌঁছেই আমরা পরিকল্পনা করলাম প্রথমেই আমেরিকার স্বাধীনতার সূতিকাগার ইনডিপেন্ডেস হল এবং লিবার্টি বেল দেখতে যাবো। আমেরিকাতে গিয়ে আমরা উঠেছিলাম ভায়রা ভাই আহমেদ মাহিয়ান মিথুনের বাসায়, খুব সুন্দর ৩ তলা বিশিষ্ট ইনডিভিজুয়াল হাউজ সাথে বিশাল ব্যাকইয়ার্ড। ব্যাকইয়ার্ডের সবুজ ঘাস যেন তুলতুলে কার্পেট, আমার ছোট মেয়ের দারুন পছন্দ হলো তার খালামনির বাসা। এবারের আমেরিকা যাত্রা কিছুটা আমার ছোট মেয়ের ইচ্ছেতেই হয়েছে, ৫ বছর বয়সে সে বাবার থেকে বড় ট্রাভেলার হয়েছে। কয়েকদিন পর পর কান্নাজুড়ে দিত আমেরিকা যাবে বলে, তাই হয়তো আমেরিকা যেতে পেরে তার খালামনির বড়সড় বাড়িতে লাফাতে-ঝাঁপাতে পেরে সে মহাখুশি। ঢাকাতে আমাদের  ছোট্ট ফ্লাটে বাচ্চাদের লাফঝাঁপের সুযোগ একেবারে নেই। যেদিন আমেরিকা পৌঁছলাম তার পরেরদিন বরিশালের এক ছোটভাই পলাশ আমাদের সবাইকে গাড়িতে করে নিয়ে গেল ৫২৬ মার্কেট স্ট্রিটের ইনডিপেন্ডেন্স হল এরিয়াতে, লক্ষ্য লিবার্টি বেল দেখা!

লিবার্টি বেল

লিবার্টি বেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার একটি প্রতীক। অনেকেই বলেন ৪ জুলাই ১৭৭৬ তারিখে, মহাদেশীয় কংগ্রেসের স্বাধীনতার ঘোষণা গ্রহণের সংকেত দেওয়ার জন্য ঘণ্টা বাজানো হয়েছিল আসলে তা সঠিক নয়। প্রকৃত ইতিহাস হলো তার ৪ দিন পরে ৮ জুলাই স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র পাঠ উদযাপনের জন্য বাজানো হয়েছিল। বেলটি ১৮৪৬ সালে জর্জ ওয়াশিংটনের জন্মদিন উদযাপন করার জন্য বাজানোর সময় এমনভাবে ফেটে যায় যা ঠিক করা সম্ভব হয়নি।

১৭৭৬ সালে আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা হলেও বৃটিশদের সাথে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ চলে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত। যুদ্ধ চলাকালে ১৯৭৭ সালে অতিরিক্ত শক্তি সঞ্চয় করে ব্রিটিশ বাহিনী যখন ফিলাডেলফিয়ায় প্রবেশ করে, তখন কিন্তু এই বেলটি পেনসিলভানিয়ার অ্যালেনটাউন গির্জায় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৮৩৫ সালে আবার এটিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ইন্ডিপেন্ডেন্স হলে। ২০০৩ সালে ইনডিপেন্ডেন্স হল সংলগ্ন ইনডিপেন্ডেস ন্যাশনাল হিস্টোরিক পার্কের এক পাশে লিবার্টি বেল সেন্টার তৈরি করে সেখানে স্থানান্তর করা হয়। লিবার্টি বেল সেন্টারে প্রবেশে কোন টিকিট কাটতে হয় না। তবে প্রবেশে বেশ কড়াকড়ি রয়েছে, ভালরকম সিকিউরিটি চেক সম্পন্ন হবার পরেই ঢুকতে পাবেন সেখানে। হলের গেটে পৌঁছে সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ঢুকে পরলাম হলে। শুরুতেই নানান পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে রুম। এরকম কয়েকটা রুম পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম বেলটির কাছে। বেলটির কাছে বেশ ভিড় পেলাম, সবাই বেলের সাথে ছবি তোলার জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু সময় অপেক্ষা করে আমরাও ছবি তুললাম আমেরিকার স্বাধীনতা এবং মুক্তির প্রতীকের সাথে। প্রতি বছর প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষ এই বিখ্যাত লিবার্টি বেল দেখতে আসে। আমেরিকার পেনসিলভানিয়ায় ঘুরতে গেলে অবশ্যই দেখতে যাবেন আমেরিকার ইতিহাস এবং স্বাধীনতার এই প্রতীক লিবার্টি বেল।

;

পার্বত্য চট্টগ্রাম 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ' গ্রন্থের প্রিঅর্ডার রকমারি'তে



কনক জ্যোতি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের।

প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের।

  • Font increase
  • Font Decrease

 

প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের। এক বছরের মাঠ পর্যায়ের নিবিড় গবেষণার ভিত্তিতে রচিত হয়েছে গ্রন্থটি, যার প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে রকমারি.কম-এ। গ্রন্থটির লেখক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বার্তা২৪.কম-এর অ্যাসোসিয়েট এডিটর ড. মাহফুজ পারভেজ।

গ্রন্থ সম্পর্কে লেখক ড. মাহফুজ পারভেজ জানান, বাঙালিসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আবাসস্থল পার্বত্য চট্টগ্রাম আয়তনে বাংলাদেশের দশ ভাগের এক ভাগ হলেও এমন বৈচিত্র্যময় অঞ্চল পৃথিবীতে খুব কমই আছে, যেখানে এতোগুলো জনজাতি জড়াজড়ি করে একসঙ্গে রয়েছে অনেক বছর ধরে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিঃসন্দেহে প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে একটি অত্যন্ত মূল্যবান ঐতিহ্যগত অঞ্চল।

চিরায়তভাবে শান্তিপূর্ণ অঞ্চলটি একসময় অশান্ত হয়ে উঠেছিল। অনেক রক্তপাত ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের পর অবশেষে ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি সম্পাদন হওয়ায় শান্তি, সম্প্রীতি, উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থানের উদার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। সশস্ত্র বিদ্রোহী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে অস্ত্র সমর্পণ করেছেন। বাস্তুচ্যুৎ ও শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অশান্ত পার্বত্যাঞ্চলে নিশ্চিত হয়েছে জনগণের শান্তি, সমৃদ্ধি, উন্নয়ন, জনঅংশগ্রহণ ও স্থিতিশীলতা, যা দুইযুগ স্পর্শ করেছে ২০২১ সালে।

ড. মাহফুজ পারভেজ বলেন, শান্তিচুক্তির দুইযুগের অভিজ্ঞতায় শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের গতিবেগে সমগ্র পার্বত্য জনপদ ও বাসিন্দারা মুখরিত হলেও সেখানে নানা কারণে সঙ্কটের আগুন ধূমায়িত হচ্ছে। বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাস, নাশকতা, হত্যা, গুম, চাঁদাবাজি, অপহরণ প্রভৃতি সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তা ও জনজীবনের শান্তি বিঘ্নিত করার মাধ্যমে উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের মতো ঘটনা ঘটছে মহল বিশেষের উস্কানি ও অপতৎপরতায়। ফলে মাঝে মধ্যেই উত্তপ্ত ও অস্থির পার্বত্যাঞ্চলে কখনো কখনো শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের ইতিবাচক অর্জনসমূহ বিনষ্টের অপচেষ্টা চলছে।

তাই নিবিড় গবেষণার আওতায় এনে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে চলমান পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্জনসমূহ পর্যালোচনা এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলো শনাক্তকরণ ও সমাধানের রূপরেখা প্রণয়ন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ।

১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি প্রণীত হওয়ার পর প্রথম গবেষণা গ্রন্থ ‘বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি’ (১৯৯৯) প্রকাশ করেন বর্তমান লেখক-গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ। ২০০০ সালে লেখকের ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানবাধিকার’ বিষয়ক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করে ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লাইড এন্থ্রোপলজি। ২০০৩ সালে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) উন্নয়ন পরিকল্পনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে সামাজিক বিষয়ে গবেষণায় যুক্ত থাকেন লেখক। তিনি ২০০৬ সালে সফল ভাবে সম্পন্ন করেন পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাত ও শান্তি বিষয়ক পিএইচডি গবেষণা। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের অর্থায়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরেকটি গবেষণা পরিচালনা করেন তিনি। দীর্ঘ গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের ধারাবাহিকতায় ‘শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রামÑবিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা’ শীর্ষক অংশগ্রহণ ও পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিপূর্ণ উত্তরণ ও অর্জনের পথে বিদ্যমান সমস্যাগুলো ও এর সমাধান তুলে ধরা হয়েছে, যা সমাজ, রাজনীতি, জাতিগত চর্চা, শান্তি ও সংঘাত বিষয়ক অধ্যয়ন এবং নীতিপ্রণেতাদের কাজে লাগার পাশাপাশি সাধারণ পাঠকের আগ্রহ মিটাবে বলে গবেষক মনে করেন।

গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ (জন্ম: ৮ মার্চ ১৯৬৬, কিশোরগঞ্জ শহর)-এর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: গবেষণা-প্রবন্ধ: বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি; দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো; দ্বিশত জন্মবর্ষে বিদ্যাসাগর; প্রকাশনা শিল্প, স্টুডেন্ট ওয়েজ, মোহাম্মদ লিয়াকতউল্লাহ। উপন্যাস: পার্টিশনস; নীল উড়াল। ভ্রমণ: রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে। গল্প: ইতিহাসবিদ; ন্যানো ভালোবাসা ও অন্যান্য গল্প; বুড়ো ব্রহ্মপুত্র। কবিতা: মানব বংশের অলংকার; আমার সামনে নেই মহুয়ার বন; গন্ধর্বের অভিশাপ। অগ্রসর ও জনপ্রিয় মাল্টিমিডিয়া নিউজ পোর্টাল বার্তা২৪.কম-এর প্রকাশিত হচ্ছে তার নতুন উপন্যাস 'রংধনু', যা অচিরেই গ্রন্থাকারে প্রকাশ পাবে।

ড. মাহফুজ পারভেজ রচিত 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' গ্রন্থ প্রিঅর্ডার করা যাবে রকমারি.কম-এর লিংকে

;

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১



মাহফুজ পারভেজ
ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১

  • Font increase
  • Font Decrease

১.

আমেরিকার নামজাদা এই ক্যাম্পাস সিটিতে ভর্তি হয়ে যারা পড়তে এসেছে, তারা কেউ জীবনে নিজের চোখে রংধনু দেখে নি। এক উইকঅ্যান্ডে হাউস টিচার ম্যারি মার্গারেট নিকটবর্তী এক ঝর্ণার পাশে উপত্যকায় শিক্ষার্থী দলটিকে নিয়ে ঘুরতে গিয়ে তথ্যটি জানতে পারেন। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সবাই একটু বিষণ্ণভাবে অসম্মতিতে মাথা নাড়ায়। শিক্ষার্থীদের কেউ নবাগত ফরাসি, কেউ অভিবাসী ইহুদি, কয়েকজন মধ্যপ্রাচ্যের রিফিউজি। সবাই বড় হয়েছে নাগরিক ঘেরাটোপে ও জাগতিক কোলাহলে। সবার উত্তরের মর্মার্থ হলো, “সত্যি রংধনু তো দেখিনি কখনও! স্টিল ছবি দেখেছি। আর কখনো কখনো ইউটিউবে ক্লিপ।”

ম্যারি বাচ্চাদের দোষ দেন না। কত কষ্ট করে প্রতিযোগিতায় টিকে ওরা পড়তে এসেছে বিশ্বের লিডিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। অভিভাবকদের জীবন-সংগ্রামের সমান্তরালের কঠিন পরিস্থিতিতে বইপত্র নিয়ে পড়াশুনার সময় পেয়েছে ছেলেমেয়েগুলো। বাইরের প্রকৃতি ও পরিবেশের দিকে তাকানোর ফুসরত পেয়েছে কমই। তাছাড়া প্রকৃতির নানা দিক ওরা দেখবেই-বা কী করে? এই পোড়া পৃথিবীতে কি আর আকাশ আছে? সবুজ আছে? রক্ষা পাচ্ছে প্রাণ ও জীববৈচিত্র্য? নিজের মনে বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করে ম্যারি রাচ্চাদের দোষ দিতে পারেন না।  

ম্যারি খেয়াল করেন, রংধনু দেখতে না পারার জন্য কেউই বিশেষ দুঃখিত নয়। তবু তিনি রেইনবো ইস্যুটি তাদের মগজের ভাঁজে রাখতে চান। তিনি জানেন, প্রকৃতি ও নিসর্গের নানা প্রপঞ্চ দেখার অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের ইমাজিনেশন ও ভিজ্যুয়াল পাওয়ার বাড়াবে। তিনি সবাইকে কাছে ডেকে আনেন। কথা দেন একদিন রংধনু দেখাবেন। “একটা মজার বিষয় জেনো রাখো। রংধনুর শুরু আর শেষ দেখা যায় না, সেগুলো থাকে বাড়ি কিংবা গাছের আড়ালে। মনে থাকবে?” ম্যারির প্রশ্নে সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। 

শেষ বিকেলে ফিরে আসার পর নিজের ঘরের জানালা দিয়ে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থাকেন ম্যারি। এই সামারে দিন অনেক বড়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেও আকাশ স্বচ্ছ। তিনি জানেন, বর্ষা না এলে রংধনু দেখা অসম্ভব। তবু তিনি যেন আনমনে দিগন্তের কোণে কোণে রংধনু খোঁজেন।

রংধনুর সঙ্গে ম্যারি সম্পর্কটাই বেশ অদ্ভুত। কিছুটা নস্টালজিক আর কিছুটা সুপারন্যাচারাল। নিজের দেশের চেয়ে অনেক বেশি রংধনু তিনি দেখতে পেয়েছেন বিদেশের নানা স্থানে। একবারও প্ল্যান করে রংধনু দেখেন নি তিনি। রংধনু নিজেই নিজের খেয়ালে এসে ধরা দিয়েছে তার চোখে। ম্যারি নিজের ঘরের সীমানা পেরিয়ে চরাচরের আলো-অন্ধকারের সন্ধিক্ষণে তন্ময় হয়ে থাকেন রংধনুর সাত রঙে।

“খেতে এসো।”

ডাইনিং টেবিল সাজাতে সাজাতে মৃদ্যু কণ্ঠে ডাক দেন মিসেস অ্যানি গিলবার্ট, ম্যারির মা। ধ্যান-ভেঙে ম্যারি জানলার পাশ থেকে ডাইনিং স্পেসে চলে আসেন। মা ছাড়া আর কেউ নেই তার দুনিয়ায়। দিন শেষে মায়ের আশ্রয়ে ম্যারি পুনর্জন্ম লাভ করেন। মায়ের হাত চেপে তিনি একটি চেয়ারে বসেন দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল জীবন পেরিয়ে আসা ষাটের কাছাকাছি বয়সের দ্বারপ্রান্তের এক ক্লান্ত রমণীর মতো। বিবাহ বিচ্ছেদের পর অনেকগুলো বছর একা থাকতে থাকতে যখন অস্থির ও দিশাহীন অবস্থায় হাবুডুবু খাচ্ছিলেন ম্যারি, তখনই মা এসে তার পাশে পাহাড়ের মতো অটল আস্থায় দাঁড়ান। সারাদিন আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পড়তে আসা ছাত্র-ছাত্রী আর বাকীটা সময় মা তার জীবনের চৌহদ্দী ও সাহস। অথচ একসময় তারও জীবন ছিল রংধনু রঙে রাঙা, যখন ক্যাভিন ছিল পাশে আর টমাস কোলে। এখন সবাই যার যার জীবনের বিবরে আবদ্ধ। সবাই সবার মতো নিজের কাজে ব্যস্ত। বিশাল আকাশের গভীরে রংধনুর রঙগুলোর মতো লুকিয়ে রয়েছে সবাই। কেউ কারো পাশাপাশি আসতে পারছে না। বৃষ্টি শেষে রংধনুর মতো খানিকক্ষণের জন্যেও দেখা হয় না ম্যারি আর তার জীবনের একদা রঙিন মানুষগুলোর সঙ্গে।    

অন্যমনস্ক ম্যারিকে দেখতে দেখতে মেয়ের মনের মধ্যে চাপা বেদনা টের পান মিসেস অ্যানি গিলবার্ট। চেষ্টা করেন কথা বলে সান্তনা দিতে।

“ওদের সঙ্গে কথা হয়েছে?”

“না।”

“হবে কেমন করে? যেমন বাপ তেমনই ছেলে। কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই।”

মায়ের ক্ষোভ সঙ্গত। তবু সায় দিতে মন মানে না ম্যারির। ক্যাভিন তো এমনই। চরম বোহেমিয়ান। কখন কোথায় থাকবে, সে নিজেও জানে না। বাতাসের ঝাপ্টায় বেসামাল একখণ্ড ভাসমান মেঘের মতো আকাশের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোই যেন তার স্বভাব। নিয়তিও তাকে তেমনই ভানিয়ে বেড়াচ্ছে। তবুও ভেসে ভেসেই জীবন তাদেরকে নিয়ে যৌথতায় বেশ চলছিল। ক্যাভিন একদিন বললো, “তুসি স্থিত হও। আমার মতো ঠিকানাবিহীন হলে তোমার চলবে না।” ততদিনে টমান এসে গেছে। ম্যারির মাতৃত্ব ও নারীত্ব একটি স্থায়ী ও নিরাপদ আশ্রয়ের প্রত্যাশা করছিল মনে মনে। ক্যাভিন তার ইচ্ছের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হয়ে বলে, “কিন্তু আমি তো এক জায়গায় স্থির থাকতে পারবো না। তুমি বরং নিজের মতো শুরু করো। আমার শুভেচ্ছা থাকেবে।”

পরদিন ঘুম থেকে উঠে ক্যাভিনের দেখা নেই। নেই মানে নেই। ঘরে নেই, আশেপাশে কোথাও নেই। রাতে বিছানা ঠিক করতে গিয়ে বালিশে চাপা ক্যাভিনের চিঠিটি হাতে আসে ম্যারির। চিঠির ভাষ্য অতি সংক্ষিপ্ত। “প্রকৃত অর্থে সঙ্গে না থেকে তোমাকে আটকে রাখা অনৈতিক। সেপারেশন ইউলে সাইন করে দিলাম। আর ব্যাঙ্কের নমিনি। আশা করি মাঝে মাঝে দেখা ও কথা হবে।”

ম্যারি জানতেন ক্যাভিনের পক্ষে কোনো কিছু করাই অসম্ভব নয়। বিশ্বের সবচেয়ে বিপদজ্জনক সেতুতে ঝুঁলে থাকা, মাঝরাতের অন্ধকারে প্যাসিফিকে সুইমিং করা, হিমালয়ের কোনো গুহায় একাকী কয়েকদিন ধ্যানমগ্ন হওয়া তার কাছে নস্যি। এতো কমিটেড প্রেম, যৌথজীবন, এক লহমায় উড়িয়ে দিয়ে দিব্যি হাওয়া হয়ে গিয়েছে ক্যাভিন। সদ্যজাত পুত্র টমাসের জন্যেও বিন্দুমাত্র পিছুটান অনুভব করে নি লোকটি। রাগে, ক্ষোভে, প্রত্যাখ্যানের অপমানে সারা রাত ঘুমাতে পারে নি ম্যারি। যদিও জানে কোনো ফল হবে না, তবু ছোট্ট ক্যাম্পাস টাউনের আনাচেকানাচে দিনভর ক্যাভিনের খোঁজ করেন ম্যারি। না, তার কোনো খোঁজ নেই। তার গতিবিধির সন্ধানও কেউ জানে না। যদি মন চায়, হয়ত ক্যাভিন নিজেই জানাবে তার হদিস। শত চেষ্টা করেও ম্যারি আর তার কোনো খোঁজ পাবে না। নিজের প্রতিক্রিয়াগুলোও জানাতে পারবে না। ক্যাখিনের খোঁজে ব্যর্থ হয়ে ম্যারি দিন শেষে ঘরে ফিরে আসে চরম হতাশায়। এসেই মনে হয়, পুরো বাড়িটা বড্ড হাহাকার করছে। ঘরগুলো খুবই ফাঁকা আর দমবন্ধ মনে হয় তার। টমাসকে কোলে নিয়ে তিনি চলে আসেন বাড়ির লনে। সাজানো বাগানের মধ্যে একটা লম্বা পাইন ম্যারির খুব প্রিয়। ক্যাভিনকে নিয়ে রাতের পর রাত গল্প করে কাটিয়েছেন তিনি নিঃসঙ্গ পাইনের কাছে। বিচ্ছেদ বেদনা নিয়ে তিনি রাতের অন্ধকারে পাইনের নিচে বসে থাকেন।

রাতের আকাশে রংধনু থাকার কথা নয়। তবু মাঝরাতের দিকে ম্যারির মনে হয় তিনি যেন আবছা আলোয় একটি অস্পষ্ট রংধুন দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও তিনি রঙিন আলোর জগতকে ছুঁতে পারছেন না। যন্ত্রণার বুক-চাপা কষ্টে আস্ত একটি রাত নির্ঘুম কেটে যায় তার জীবন থেকে। তিনি অনুভব করেন, প্রিয় মানুষের অভাবে এমন অনেক ঘুমহীন রাত তার জীবনের শূন্যতা পূর্ণ করবে। তার স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ ছিন্ন হয়ে যাবে। তিনি বেঁচে থাকবেন ঘুম ও জাগরণের মাঝখানে নিঃসঙ্গ ও একেলা। ঠিক যেন বাগানের সঙ্গীবিহীন পাইন গাছের মতো।   

[পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার]

;