আর্নেস্ট হেমিংওয়ের অগ্রন্থিত গল্প : অনুসৃতিই আনন্দ



অনুবাদ: রাজিয়া সুলতানা
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

‘ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি’ দিয়ে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে যেভাবে সাহিত্যে চিরস্থায়ী আসন পেয়েছিলেন, সেই একই কিউবার উপকূল থেকে শুরু ‘অনুসৃতিই আনন্দ’, এটিতেও আছে মার্লিনমাছের ঘটনা। মিশেছে আরো অনেক ঘটনাবলি। হেমিংওয়ের গুটি কয়েক গল্পই শুধুমাত্র অপ্রকাশিত আছে, এটি তার মধ্যে একটি। এটি লেখা হয়েছিল ১৯৩৬ থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে কোনো এক সময়ে। হেমিংওয়ের নাতির সূত্রে পাওয়া গেছে এই অমূল্য গল্পটি।

এই গল্পের মূল আকর্ষণ ‘ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি’ উপন্যাসিকার মার্লিনমাছ এবং হেমিংওয়ের আত্মজৈবনিক উপাদান। - বিভাগীয় সম্পাদক


সে বছর কিউবার উপকূলে আমরা মাসব্যাপী মার্লিনমাছ ধরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করি। সেই মাসটা শুরু হয়েছিল এপ্রিলের দশ তারিখ থেকে। মে মাসের দশ তারিখ পর্যন্ত আমরা পঁচিশটা মাছ ধরি এবং এই সময় আমাদের মাছধরার অনুমতিপত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। আমাদের উচিত ছিল কী ওয়েস্ট(১)-এ ফিরে যাওয়ার জন্য কিছু উপহারসামগ্রী কেনা আর এদিকওদিক ঘোরার জন্য প্রয়োজনের তুলনায় আরেকটু দামি কিউবান জ্বালানি অনিটায় ভরিয়ে নিয়ে, হিসেবপত্র চুকিয়ে বাড়ি ফেরা। কিন্তু তখনও বড়মাছগুলো আসা শুরু করেনি।

মি. জোসি জিজ্ঞেস করল, “আর একটা মাস কি ওকে রেখে চেষ্টা করে দেখতে চাও, ক্যাপ?” ক্যাপ অনিটার মালিক আর দিনে দশ ডলার করে ভাড়ায় টিকেট দিচ্ছিল। সে সময়ে ভাড়ায় স্ট্যান্ডার্ড টিকেটের মূল্য ছিল দিনে পঁয়ত্রিশ ডলার।

“যদি থাকতে চাও তো কমিয়ে নয় ডলার করতে পারি।”
“নয় ডলার আমরা কোথায় পাব?”
“যখন টাকা হাতে আসে তখন দিয়ো। ব্যুলোতে উপসাগর জুড়ে স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানির সঙ্গে তোমাদের লেনদেন ভালো। বিল পাওয়ার পর গতমাসের টিকেট বিক্রির টাকা থেকে ওদের পরিশোধ করতে পারব। আর আমরা যদি বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যে পড়ে যাই তাহলে তুমি কিছু একটা লিখে দিয়ো।”

আমি বললাম “বেশ।” এরপর আমরা আরো একমাস ধরে মাছ ধরলাম। এরমধ্যে আমরা বেয়াল্লিশটা মার্লিন ধরলেও তখনও বড় মাছগুলো আসছিল না। তখনও মরো(২)র কাছে বইছিল গভীর ভারী স্রোত। কোনো কোনো সময় একরের পর এক টোপ ফেলে রাখা হতো—উড়ন্ত মাছগুলো বোটের সামনের অংশের নিচ থেকে লাফ দিত আর সামুদ্রিক পাখিগুলো সেগুলোকে ধরতে চেষ্টা করত। প্রতিদিনই আমরা সাদা মার্লিনগুলো ধরছিলাম, কিছু কিছু আবার হাতছাড়াও হয়ে যাচ্ছিল, একদিন আমি পাঁচটা ধরেছিলাম কিন্তু একটা বিশাল মাছও আমরা ধরতে পারিনি।

তীরে পানির কিনারে আমরা খুব জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিলাম। কারণ, সবগুলো মাছ কেটে টুকরো করে ওখানে সবাইকে দিয়ে দিতাম আর যখন মার্লিনমাছের পতাকা উড়িয়ে মরো কেল্লা পার হয়ে খালের ওপর দিয়ে সানফ্রান্সিসকোর জেটির দিকে যেতাম তখন লোকজন পারঘাটার দিকে দৌড়ে আসত। সে বছর পাউন্ড প্রতি আট থেকে বারো সেন্ট করে কিনে দ্বিগুণ দামে বাজারে বিক্রি করতে পারত বলে জেলেদের জন্য তা ছিল লাভজনক। যেদিন আমরা পাঁচটা পতাকা উড়িয়ে তীরে এলাম, পুলিশ লোকজনদের লাঠিপেটা করেছিল। তীরে অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। সে বছরটাও ছিল মন্দ।

জোসি বলল, “শালার পুলিশ আমাদের নিয়মিত সব খদ্দেরকে তাড়িয়ে দিয়ে সব মাছ নিয়ে নিচ্ছে।” একজন পুলিশ ঝুঁকে পড়ে মার্লিনের দশপাউন্ড ওজনের একটা টুকরা তুলে নেওয়ার সময় জোসি বলল—“আচ্ছা মানুষ তো আপনি, দূর হোন।” পুলিশ বলেছিল—“এইরকম কুৎসিত চেহারা তো আমি এর আগে কখনো দেখি নাই। তোমার নাম কী হে?”

বলাবাহুল্য, পুলিশ ওর একটা নাম দিয়ে দিল।

“কমপ্রমিজো-বইয়ে ওনার নাম আছে নাকি, ক্যাপ?”

আমরা যাদের মাছ দেব বলে কথা দিতাম, তাদের নাম এই বইয়ে লিখে রাখতাম যার অর্থ হচ্ছে প্রতিশ্রুতি-বই।

“আরে নাহ।”

মি. জোসি বলল, “পরের সপ্তাহের তালিকায় ছোট একটা টুকরার জন্য ওর নামটা লিখে রাখো তো, ক্যাপ।” “আর এই যে পুলিশ, আপনে এখন পাটাতন থেকে নেমে দূর হোন, জাহান্নাম বা অন্য কোথাও যান আর এমন কাউকে লাঠিপেটা করেন যে আমাদের বন্ধু নয়। জীবনে অনেক হারামী পুলিশ দেখেছি। যান, ঘাটের পুলিশ না হলে লাঠি পিস্তল দুটোই নিয়ে দূর হোন।”

শেষে সমস্ত মাছ কেটে টুকরো করে বই অনুযায়ী যার যার মাছ আলাদা করে রেখেছিলাম আর পরের সপ্তাহের জন্য প্রতিশ্রুতি-বই নাম দিয়ে ভর্তি হয়ে গিয়েছিল।

“আম্বুজ মুন্ডোজ-এ গিয়ে ধুয়ে টুয়ে পরিষ্কার হয়ে নাও, ক্যাপ। স্নান সেরে নাও। তারপর ওখানে তোমার সঙ্গে কথা হবে। আমরা ফ্লোরিদিতায় গিয়েও কথাবার্তা সেরে নিতে পারব। ওই পুলিশ কর্মকর্তা আমার মেজাজটা বিগড়ে দিয়েছে।”
“তুমিও ওখানে আসতে পারো তো, শাওয়ার নিতে পারো। আমি এখানেই পরিষ্কার হয়ে নেব’খন। আজ আমি তোমার মতো অতটা ঘামিনি।”

আমি আম্বুজ মুন্ডোজ হোটেলের দিকে খোয়া দিয়ে বাঁধানো এই সংক্ষিপ্ত রাস্তাটা দিয়ে হেঁটে গিয়ে কোনো চিঠি এসেছে কিনা ডেস্কে খোঁজ নিয়ে লিফটে উঠে উপরের তলায় গেলাম। আমার রুমটা ছিল উত্তর-পূর্ব কোণে আর জানালা দিয়ে আয়নবায়ু এসে শীতল করে দিচ্ছিল। আমি জানলা দিয়ে পোতাশ্রয়ের চারিদিকে পুরনো শহরের ছাদগুলোর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম। দেখলাম মেক্সিকোর অরিজবা শহর তার সমস্ত বাতি নিয়ে ধীরে ধীরে পোতাশ্রয়ের নিচে নিভে যাচ্ছে। অত অত মাছ ধরে আমি তখন ভীষণ ক্লান্ত, ঘুম পাচ্ছিল খুব। আমি জানতাম শুলেই ঘুম এসে যাবে চোখে, তাই বিছানায় বসে জানলা দিয়ে তাকিয়ে রইলাম। তখন দেখতে পেলাম বাঁদুড়েরা শিকারে নেমেছে, আমি কাপড় খুলে স্নান সেরে পরিষ্কার কাপড় পরে নিচের তলায় গেলাম। মি. জোসি তখন হোটেলের দরোজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল।

সে বলল—“তুমি নিশ্চয়ই ক্লান্ত, আর্নেস্ট।”
”না”, আমি মিথ্যে বললাম।

সে বলল, “আমি ক্লান্ত। তোমার মাছ টেনে তোলা দেখতে দেখতেই আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আমাদের সর্বসময়ের রেকর্ড অনুযায়ী মাত্র তো দুইটা। সাত আর আট নাম্বার চোখ।” মি. জোসি আর আমি কখনোই আটনম্বর মাছের চোখ এভাবে বলতে পছন্দ করতাম না, কিন্তু সবসময় এভাবেই লিখে রাখতাম।

আমরা অবিস্পো স্ট্রিটের পাশের ছোট রাস্তাটা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম আর মি. জোসি দোকানের সমস্ত আলোকিত জানলাগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখছিল। বাড়ি ফিরে যাবার আগ পর্যন্ত সে কখনো কিছু কিনত না। কিন্তু মূল্যহ্রাসের পণ্যগুলো দেখতে পছন্দ করত। আমরা দুটো দোকান পেছনে ফেলে লটারির টিকেট বিক্রির অফিসে এসে পৌঁছালে ঠেলা দিয়ে ফ্লোরিদিতার ঝুলন্ত দরজাটা খুললাম।

মি. জোসি বলল— “তুমি বরং বসো, ক্যাপ,”
“না, আমার কাছে পানশালায় দাঁড়িয়ে থাকতেই ভালো লাগছে।”

মি. জোসি বলল, “বিয়ার, কোনটা? জার্মান বিয়ার খাচ্ছো, ক্যাপ?”
“চিনিহীন হিমায়িত ড্যাকোরি খাচ্ছি।” কন্সতান্তে যথেষ্ট পরিমাণে মালমশলা রেখে গেছে। আরো দুটো বানানো যাবে। আমি অপেক্ষা করছিলাম যে মি. জোসি কথা তুলবে। বিয়ার আসার সঙ্গে সঙ্গে সে বলতে শুরু করল।

বলল, “কার্লোস বলেছে ওদের পরের মাসে আসতে হবে।” কার্লোস ছিল আমাদের কিউবান সঙ্গী আর মার্লিনমাছের মস্তবড় ব্যবসায়ী জেলে। “এইরকম স্রোত নাকি ওরা আর কখনো দেখেনি। এবার ওরা এমনভাবে আসবে সেও নাকি আমরা কখনো দেখিনি। বলেছে পরের মাসে নাকি ওদের আসতেই হবে।”
“আমাকেও বলেছে।”
“ক্যাপ, তুমি যদি আরেকটা মাস থাকতে চাও তবে দিনে আট ডলারে অনিটাকে ভাড়া দিতে পারি আর স্যান্ডউইচ কিনে টাকা অপচয় করার চেয়ে আমি নিজেই রান্না করতে পারব। দুপুরের খাবার রান্নার জন্য ওই খাড়িতে গিয়ে ঝটপট রান্না সেরে ফেলতে পারব। গায়ে ঢেউখেলানো স্ট্রাইপঅলা বনিটো মাছগুলো তো সবসময়ই ধরছি। ছোট্ট টুনামাছের মতো খেতে দারুণ স্বাদ ওগুলোর! কার্লোস বাজারে মাছের আধার আনতে গেলে প্রয়োজনীয় বাজার সদাই করে আনবে বলেছে। রাতের খাবারটা আমরা পার্লা অব সানফ্রান্সিসকো রেস্তোরাঁতে খেতে পারি। গতরাতে আমি ওখানে পঁয়ত্রিশ সেন্ট দিয়ে ভালো মতন খেয়েছি।”
“আমি পয়সা বাঁচানোর জন্য গতরাতে না খেয়ে ছিলাম।” “তোমাকে খেতে হবে, ক্যাপ। সে জন্যেই মনে হয় তোমাকে আজ একটু ক্লান্ত লাগছে।”
“আমি জানি, কিন্তু তুমি কি নিশ্চিত যে আরেকটা মাস চেষ্টা করে দেখতে চাও?”
“অনিটাকে তাহলে একমাসের জন্য আর এখান থেকে বের হতে হবে না। বড় মাছগুলো এলে এই স্থান ছেড়ে কেন আমরা চলে যাব?”
“তোমার অন্য কোনোকিছু কি করার আছে?“
“না, তুমি কী করবে?”
“তোমার কি মনে হয়, মাছ সত্যি সত্যি আসবে?”
“কার্লোস বলেছে আসতেই হবে।”
“তাহলে ধরো, আমরা একটা বড় মাছ ধরলাম আর আমাদের শক্তি দিয়ে ওকে ধরে রাখতে পারলাম না।”
“পারতে হবে। ভালো মতন খাওয়া দাওয়া করলে সারাজীবনই ধরে রাখা যাবে ওকে। আর আমরা তো ভালো খাবও। আমি অন্য কিছুও ভাবছি।”
“কী?”
“তুমি যদি তাড়াতাড়ি ঘুমোতে যাও, আর কোনো সামাজিক জীবন না থাকে যদি তোমার, দিনের আলো ফুটে উঠতেই ঘুম থেকে উঠে লিখতে আরম্ভ করে আটটা পর্যন্ত লিখে সারাদিনের লেখালেখি শেষ করতে পারো যদি, তো যাবার আগে কার্লোস আর আমি সবকিছু রেডি করে রাখব, তুমি শুধু আমাদের সঙ্গে বোটে উঠে যাবে।”

আমি বললাম, “ঠিক আছে। মেনে নিচ্ছি আমার কোনো সামাজিক জীবন থাকবে না।”
“ওই সামাজিক জীবনই তো তোমাকে শেষ করে দিচ্ছে, ক্যাপ। তাই বলে বলছি নে সামাজিক জীবন একেবারেই থাকবে না। শনিবার রাতগুলোতে থাকতে পারে।”
“ঠিক আছে।” আমি বললাম। “শুধু শনিবার রাতগুলোতে সামাজিক জীবন চলবে। কী নিয়ে লিখব এ ব্যাপারে তোমার কোনো পরামর্শ?”
“সে তোমার ব্যাপার, ক্যাপ। আমি এ নিয়ে কিছু বলব না। তুমি যখন কোনো কাজ করো, সবসময়ই ভালোভাবে করো।”
“তোমার কী পড়তে পছন্দ?”
“ইউরোপ বা পাশ্চাত্য নিয়ে ভালো ছোট গল্প লেখো না কেন অথবা যখন নিষ্কর্মা ছিলে বা যুদ্ধে ছিলে—এই জাতীয় বিষয় নিয়ে। শুধু তুমি আর আমি জানি এমন কোনো বিষয় নিয়ে লেখো না কেন? অনিটা যা যা দেখেছে তা নিয়ে লিখতে পারো। যথেষ্ট সামাজিক জীবন দিয়ে ভরিয়ে লিখবে যেন সবার কাছে তা আবেদন সৃষ্টি করে।”
“আমি সামাজিক জীবন একেবারে বাদ দিয়ে দিচ্ছি।”
“অবশ্যই বাদ দেবে, ক্যাপ। কিন্তু তোমার তো মনে রাখার অনেককিছু আছে। সামাজিক জীবন এখন না থাকলে কোনো ক্ষতি হবে না।”

আমি বললাম, “না। অনেক অনেক ধন্যবাদ তোমাকে মি. জোসি। আগামীকাল সকাল থেকে আমি লেখার কাজ শুরু করে দেব।”
“আমি ভাবছি নতুন এই নিয়ম শুরু করার আগে আমাদের যা করা উচিত তা হচ্ছে আজ রাতে তোমার বিরল কোনো মাছের বড় একটা টুকরা খাওয়া উচিত। তাহলে কাল সকালে উঠে শরীরে অনেক শক্তি পাবে আর মাছ ধরার জন্য এই শক্তি কাজ দেবে খুব। কার্লোস বলেছে বড় মাছগুলো যে কোনো সময়ে আসতে শুরু করে দেবে। ক্যাপ, তোমার সর্বশক্তি দিয়ে ওদের ধরে রাখতে হবে কিন্তু।”
“তোমার কি মনে হয় আর একটা ড্যাকোরি বেশি গিললে কোনো ক্ষতি হবে?”
“ধূর! কী যে বলো না, ক্যাপ। এর মধ্যে রাম দেয় একটু, একটু লেবুর রস আর মেরাশচিনো। কোনো ক্ষতি হবে না।”

ঠিক তখন আমাদের পরিচিত দুটো মেয়ে পানশালায় এলো। সেই সন্ধ্যেয় খুব ফ্রেশ লাগছিল ওদের আর দেখতে খুব সুন্দরী ছিল ওরা।

ওদের একজন স্প্যানিশ ভাষায় বলল, “এরা জেলে দেখছি।”

অন্য মেয়েটা বলল, “হু, সমুদ্র থেকে আসা বিশালদেহী দুজন স্বাস্থ্যবান জেলে।”

মি. জোসি আমাকে বলল, “এন.এস.এল”।

আমিও নিশ্চিত করতে বললাম , “নো সোশাল লাইফ (এন.এস.এল)। মেয়ে দুজনার একজন বলল—“তোমাদের গোপন কোনো ব্যাপার আছে নাকি?” এই মেয়েটা ছিল অসম্ভব রূপবতী, চেহারায় কোথাও এতটুকুন খুঁত ছিল না। ওর আগের কোনো বন্ধুর ডান হাত ওর অমন সুন্দর টানটান নাকের রেখাটা নষ্ট করে দিয়েছে।

মি. জোসি মেয়ে দুটোকে বলল, “ক্যাপ আর আমি কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলাপ করছি।” এরপর তারা পানশালার দূরবর্তী কোণের দিকে চলে গেল। মি. জোসি আমাকে বলল, “ব্যাপারটা কী সহজ হয়ে গেল, দেখেছো? আমি সামাজিক দিকটার পুরোটাই সামলাব, তোমাকে শুধু ভোরবেলা উঠে লেখালেখির কাজ সেরে ফেলে মাছ ধরতে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে হবে। শারীরিকভাবে সবসময় শক্তিসামর্থ্য রাখতে হবে। বিশাল মাছগুলো, যেগুলোর ওজন হাজার পাউন্ড অথবা তার চেয়েও বেশি, সেগুলোর সঙ্গে পেরে উঠতে হবে।”

আমি বললাম—“চলো, আমরা কাজ বদল করি। আমি সামাজিক দিকটা দেখব’খন। তুমি খুব সকালে উঠে লিখবে। হাজার পাউন্ড ওজন ছাড়িয়ে যাওয়া বড় মাছগুলোকে সামলানোর জন্য শরীরটাকে তৈরি রাখবে সবসময়।”

জোসি সিরিয়াস হয়ে বলল, “তাহলে আমি তো খুশিই হই, ক্যাপ। কিন্তু আমাদের দুজনের মধ্যে তুমিই তো শুধু লিখতে পা্রো। তুমি আমার চেয়ে বয়সেও ছোট। আর মাছ সামলানোর জন্য তুমিই বেশি উপযুক্ত। যেভাবে আমি বোট চালাই, তাতে আমি মনে করি ওই মাছ আমি বোটে তোলা মানে ইঞ্জিনের বারোটা বাজানো।”

“তা জানি, আমিও চেষ্টা করব লেখালেখির কাজটা ভালো করে করতে।” আমি বললাম। মি. জোসি বলল—“আমি তোমাকে নিয়ে গর্ব করতে চাই। আর চাই যে শালার, মহাসমুদ্রে আমরা পৃথিবীর সবচে বড় মার্লিনটা ধরি, ভালোভাবে ওটার ওজন করি আর কেটে টুকরা করে ওই শালার ব্যাটা ডাণ্ডাবাজ পুলিশকে নয়, বরং গ্রামে আমাদের পরিচিত দরিদ্র লোকদের মধ্যে বিলিয়ে দিই।”
“আমরা তাই করব।”

ঠিক তখন মেয়েদুটোর একজন পানশালার দূরের কোণ থেকে আমাদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ল। সেই রাতে ব্যবসা মন্দা ছিল। আমরা ছাড়া আর কেউ সেখানে ছিল না। মি. জোসি বললেন, “এন. এস.এল।” আমিও অভ্যেসমতন পুনরাবৃত্তি করলাম। বললাম—“এন.এস.এল (নো সোশাল লাইফ।)”

“কন্সতান্তে,” মি. জোসি বললেন, “আর্নেস্তো একজন ওয়েটার চাচ্ছে। আমরা বিরল মাছের দুটো বড় টুকরা অর্ডার দিতে যাচ্ছি।”

কন্সতান্তে মৃদু হেসে আঙুল দিয়ে ওয়েটারের জন্য ইশারা করল।

মেয়েদুজনার পাশ দিয়ে ডাইনিংরুমে যাবার সময় ওদের একজন হাত বাড়িয়ে দিলে আমি হ্যান্ডশেক করলাম আর গম্ভীরভাবে স্প্যানিশ ভাষায় বললাম—“এন. এস. এল।”

অন্য মেয়েটি বলল, “হায় ঈশ্বর, এরা তো রাজনীতি করে আর এরকম একটা বছরে।” ওদের মধ্যে কিছুটা মুগ্ধতা, কিছুটা আতঙ্ক কাজ করছিল।

উপসাগর জুড়ে সকালের প্রথম আলো যখন আমাকে জাগিয়ে দিল, আমি উঠে গিয়ে মি. জোসির যেন পছন্দ হয় এই আশায় একটা ছোটগল্প লিখতে শুরু করলাম। সেই গল্পে অনিটার কথা ছিল, সমুদ্রতীরের কথা ছিল, আর যা যা ঘটেছিল সেইসব কথা ছিল। প্রতিদিন আমি সমুদ্রের অনুভূতিটা, সেখানে যা যা দেখেছি, শুনেছি, যা কিছুর গন্ধ শুঁকেছি, অনুভব করেছি—তার সবই লেখায় তুলে আনার চেষ্টা করেছিলাম। প্রতিদিন সকালে উঠে আমি গল্পটা লিখতাম, মাছ ধরতে যেতাম আর ভালো ভালো মাছ ধরতাম। মাছ ধরার জন্য আমি কঠিন প্রশিক্ষণ দিতাম আর চেয়ারে বসে না থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাছ ধরতাম। এরপরও বড় মাছগুলো আসছিল না। একদিন আমরা এক লোককে ব্যবসায়ী জেলেদের একটা ডিঙি নৌকা দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে যেতে দেখলাম।স্পিডবোট যেমন বোটের সামনে ঢেউ তুলে পানি ছড়িয়ে চলে যায়, তেমনি করে প্রত্যেকবার লাফানোর সময় মার্লিনমাছও সেভাবে পানি ছিটিয়ে যাচ্ছিল। ওই ডিঙি-নৌকাটা ভেঙে গিয়েছিল।

আরেকদিন, দমকা হাওয়া আর বৃষ্টির মধ্যে আমরা দেখলাম চারজন লোক গাঢ় বেগুনি রঙের গভীর প্রশস্ত একটা মাছ একটা ডোঙাতে তোলার চেষ্টা করছে। কেটে নাড়িভুড়ি ফেলে দেওয়ার পর সেই মার্লিনটার ওজন হয়েছিল পাঁচশ পাউন্ড আর পুরনো বাজারের মার্বেলপাথরের ফলকের ওপর কাটতে দেখেছিলাম সেই মাছের বিশাল বিশাল চাকা।

তারপর আরেক রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে খুব কাছ থেকে পোতাশ্রয়ের মুখে দেখেছিলাম গভীর কালো স্রোত। পরিষ্কার সেই পানির দুই বাঁও গভীরে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলাম ওরা ঝাঁকে ঝাঁকে আসছে। আমাদের প্রথম বড়মাছটা ধরা পড়ে মরোর পাশেই। সেইসব দিনগুলোতে পাল খাটাবার কোনো খুঁটি ছিল না, রড ধারণ করার কিছু ছিল না। খালে হালকা একটা খুঁটি দিয়ে বড় একটা মাছ ধরার আশায় ছিলাম। আর তখনই এই মাছটা ধরা পড়েছিল। বিরাট একটা ঢেউ তুলে এসেছিল সে, বিলিয়ার্ড কিউ-এর বন্ধ করাতের মতো দাঁত আর সেই দাঁতের পেছনে তার বিশাল মাথাটা ছিল ডিঙি নৌকার মতো প্রশস্ত। তারপর বোটের সমান্তরালে সুতো টানতে টানতে দ্রুত সে আমাদের থেকে দূরে চলে গেল । বড়শির রিল এত দ্রুত ফুরিয়ে গেল যে ছুঁতে গেলে হাতে গরম লাগছিল। পনেরটা সুতোর প্যাঁচ দিয়ে একেকটা থ্রেড তৈরি আর রিলে ভরা হয়েছিল এই থ্রেডের চারশ গজ—আমি অনিটার সামনের দিকটায় ভেতরে আসতে আসতে যার অর্ধেকটাই ফুরিয়ে গিয়েছিল।

বোটের ছাদের দিকে ধরার জন্য যে হ্যান্ডলক আমরা আগেই বানিয়ে রেখেছিলাম সেগুলো ধরে ধরে আমি সেইদিকে এগুলাম। এইটা আমরা আগেই অনুশীলন করেছিলাম। বোটের কানসেতে পা রেখে দ্রুত ঠেলা দিয়ে পাটাতনে উঠে যাওয়া যায়। কিন্তু লোকাল স্টেশনের সাবওয়ে এক্সপ্রেসের মতো যে মাছ দ্রুত পার হয়ে চলে যায় সেই মাছের সঙ্গে তো আর প্র্যাকটিসটা করা হয়নি। একহাত দিয়ে রডটা ধরে ছিলাম কিন্তু রডের প্রান্তটা নিচে ওটা রাখার জায়গাটিতে ঘষা খাচ্ছিল, খুঁড়ছিল। আর রডের সুতোর টানে আমার অন্যহাতটি, খালি দুইপা বোটের মেঝেতে এসে ধাক্কা খেয়ে থেমে গিয়েছিল।

আমি চিৎকার করে বললাম, “হুক দিয়ে ওকে গেঁথে ফেলো, জোসি। রিলের সবটুকু সুতোই টেনে নিচ্ছে দেখছি।”
“গাঁথা হয়েছে তো, ক্যাপ, দেখো না কী অবস্থা।”

তখন অনিটার কানসের ওপর এক পা, বোটের ডানদিকে নোঙ্গরের ওপর আরেক পা দিয়ে আমি প্রতিরোধ করতে ব্যস্ত। কার্লোস আমার কোমর পেঁচিয়ে ধরেছে আর আমাদের সামনে মাছটা লাফাচ্ছে। এই অবস্থায় মাছটাকে দেখতে লাগছে মদের ব্যারেলের মতো। সূর্যের উজ্জ্বল আলোয় ওকে রূপোলি দেখাচ্ছিল আর আমি ওর গায়ের পাথালে ওপর থেকে নিচে নেমে যাওয়া বড় বড় বেগুনি রঙের স্ট্রাইপগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম। প্রত্যেকবার লাফানোর সময় মনে হচ্ছিল পাহাড়ের চূড়া থেকে যেন কোনো ঘোড়া নিচে লাফিয়ে পড়ছে। মাছটা লাফাতেই থাকল, লাফাতেই থাকল, লাফাতেই থাকল। অনিটা পূর্ণ গতিতে মাছের পিছনে পিছনে ছুটলেও রিল এতটাই গরম হয়ে যাচ্ছিল যে হাত দিয়ে ধরে রাখা যাচ্ছিল না আর সুতোর মাঝখানটা টানের প্রবল বেগে ক্রমশই পাতলা হয়ে আসছিল।

আমি চিৎকার করে মি. জোসিকে বললাম, “অনিটার গতি কি আরো একটু বাড়ানো যায়?”
“এই পৃথিবীতে তা সম্ভব নয়। আর সুতো নেই?”
“খুবই সামান্য আছে।”

কার্লোস বলল, “মাছটা অনেক বড়। এত বড় মার্লিন আমি জীবনে দেখি নি। শুধু যদি থামত একবার আর নিচের দিকে যেত, তাহলে ওর কাছে যেতে পারতাম আমরা, যথেষ্ট সুতোও পেয়ে যেতাম।”

মরো ক্যাসেল থেকে ন্যাশনাল হোটেলের বিপরীত দিকে মাছটা তখন এক পাক দেওয়া শেষ করেছে। আমরাও ওর পিছে পিছে একইভাবে গিয়েছি। রিলে তখন বিশ গজের মতো সুতো আছে। এমন সময় মাছটা থামল। আমরা সুতো উদ্ধার করতে করতে দ্রুত ওর কাছে গেলাম। আমার মনে আছে, আমাদের সামনে ছিল সুতো সরবরাহকারী একটা গ্রেস লাইন জাহাজ। কালো রঙের একটা পাইলট বোট সেদিকে যাচ্ছিল। এদিকেই যেহেতু আসছিল, আমার ভয় হচ্ছিল আমরা না আবার ওটার গতিপথের মধ্যে পড়ে যাই। রিলে সুতো পেঁচাতে পেঁচাতে আমি তাই চেয়ে চেয়ে দেখছিলাম এবং আমাদের বোটের সামনে ফিরে এসেছিলাম। দেখেছিলাম বোটটা গতি বাড়িয়ে দিয়েছিল তখন, বেশ দূর থেকে আমাদের এদিকেই আসছিল তবে আমাদের সঙ্গে পাইলট বোটের ফাজলামো করার প্রশ্নই আসে না।

তখন আমি চেয়ারে বসে আর মাছটা সোজা উপর নিচ হয়ে আর রিলে চড়ছিল তৃতীয় সুতোটা। রিলের তাপ কমানোর জন্য ওতে সমুদ্রের পানি ঢালছিল কার্লোস; বালতিতে করে আমার মাথা আর ঘাড়েও ঢালছিল।

মি. জোসি জিজ্ঞেস করল, “কেমন আছো তুমি, ক্যাপ?”
“ঠিকঠাক মতন আছি।”
“বোটের সামনে লেগে কোথাও আঘাত পাওনি তো?”
“না।”
“তুমি কি ভেবেছিলে কখনো ওখানে ওইরকম একটা মাছ থাকতে পারে?”
“না।”

কার্লোস চিৎকার করে বলতে লাগল, “গ্রান্ডে গ্রান্ডে,” বিরাট শিকারী কুকুরের মতো কাঁপছিল সে আর বলছিল, “জীবনে এইরকম মাছ দেখিনি আর। কখনোই দেখিনি। কক্ষনো না, না দেখিনি।”

পরে একঘণ্টা কুড়ি মিনিট মাছটার কোনো খবর ছিল না। প্রথম যেখানে ও শব্দ করেছিল, প্রবল স্রোত সেখান থেকে আমাদেরকে ছয়মাইল দূরে কোজিমারের উল্টোদিকে টেনে নিয়ে গেল। আমি ক্লান্ত হয়ে পড়লেও আমার হাত আর পায়ের অবস্থা ভালো ছিল। রিল থেকে ওকে সুতো ছাড়ছিলাম একই গতিতে, সাবধানে ছিলাম যেন জোরে টান না খায় অথবা ঝাঁকুনি না লাগে। আমি কিন্তু সরাতেও পারতাম ওকে ওখান থেকে। কিন্তু কাজটা সহজ হতো না মোটেও। তবে ব্রেকিং পয়েন্টের এইপাশে সুতো ধরে রাখতে পারলে তা সম্ভব হতো।

“ও আসবে। বড় মাছগুলো কখনো এমন করে,” কার্লোস বলল, “তবে যুদ্ধংদেহী হয়ে ওঠার আগেই হুকঅলা ডান্ডা দিয়ে ওকে কাবু করে ফেলতে পারো।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ও আসবে কেন এখন?”

কার্লোস বলল, “ওর মাথা আউলায় গেছে আর তুমি তো ওর গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করছো। কী হচ্ছে তার কিছুই কিন্তু বুঝতে পাচ্ছে না ও।”

আমি বললাম, “ওকে একটুও বুঝতে দিয়ো না কিন্তু।”

কার্লোস বলল, “নাড়িভুড়ি কেটে ফেলে দেওয়ার পর ওর ওজন নয়শ পাউন্ডেরও বেশি হবে।”

মি. জোসি বলল, “এ নিয়ে আর কোনো কথা বলবে না।”
“অন্য কোনোভাবে চেষ্টা করতে চাও, ক্যাপ?”
“না।”

আমরা যখন কাছে গেলাম মাছটার, দেখলাম বিশাল দেহ ওর। ভয়ংকর রকমের নয় তবে অসম্ভব বড় ছিল মাছটা। দেখলাম সে ধীর আর শান্ত হয়ে আছে। বলতে গেলে কাস্তে ব্লেডের মতো দেখতে বেগুনি রঙের দারুণ দুটো পাখনা নিয়ে সে পানিতে চুপ করে আছে। এরপর আমাদের বোটটা ও যেই না দেখে ফেলল, অমনি সুতো রিল থেকে প্রচণ্ড বেগে ছুটল যেন কোনো মটরগাড়ির সঙ্গে হুক দিয়ে আমাদের লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। লাফাতে লাফাতে ও উত্তরপশ্চিম দিকে যাচ্ছিল আর প্রত্যেক লাফের সঙ্গে গা থেকে পানি বেয়ে বেয়ে পড়ছিল।

আবার আমাকে বোটের ভেতরে সামনের দিকে যেতে হয়েছিল। মাছটা যতক্ষণ না শব্দ করা বন্ধ করল ততক্ষণ আমরা ওকে ধাওয়া করে গেলাম। এইবার সে মরোর উল্টোদিকের ভাটিতে চলে গেল। আবার আমাকে বোট চালিয়ে সামনে আসতে হলো।

“কোনো ড্রিংকস লাগবে তোমার, ক্যাপ?” মি. জোসি জিজ্ঞেস করল।

আমি বললাম, “না, কার্লোসকে বলো রিলে তেল মাখতে, তেল যেন বাইরে না পড়ে আর আমার ওপর কিছু লবণাক্ত পানি ঢালো।”
“কিছুই কি দিতে পারব না তোমাকে, ক্যাপ?”
“পারো, দুটো হাত আর একটা নতুন পিঠ দিতে পারো।” আমি বললাম।
“কুকুরীর বাচ্চাটার তেজ এখনো কমে নাই। শুরুতে যেমন সতেজ ছিল এখনো তাই রয়ে গেছে।”

এরপর দেড়ঘণ্টা পর ওকে দেখা গেল কজিমা পার হয়ে বেশ খানিকটা দূরে। সে লাফিয়ে লাফিয়ে দৌড়াতে শুরু করেছে। ওকে ধাওয়া করতে করতে আমাকে বোটের ভেতরে সামনের অংশে যেতে হয়েছিল।

ফিরে এসে যখন সামনে বসছিলাম তখন মি. জোসি বলল, “মাছটা কেমন, ক্যাপ?”
“সবসময় যেমন, তেমন। তবে রডের অবস্থা বেশি ভালো না।”

রডটা প্রথমে সুন্দর পূর্ণ একটা ধনুকের মতো বেঁকে গেল, কিন্তু যখন তুললাম যেরকম সোজা হবার কথা ছিল, সেরকম আর হলো না।

মি. জোসি বলল, “ওর আরো কিছু শক্তি বাকি আছে। মনে হচ্ছে ওর পেছনে তোমাকে লেগে থাকতে হবে অনন্তকাল, ক্যাপ। তোমার মাথায় আরো পানি ঢালতে বলছ?”

আমি বললাম, “এখুনিই না। রডটা নিয়ে আমার দুশ্চিন্তা হচ্ছে। ওর ওজন এত বেশি যে এইমাত্র রডের শক্তি নিঃশেষ করে দিয়েছে।”

একঘণ্টা পর মাছটা আবার এগিয়ে আসছিল, ধীর বৃত্তাকার একটা স্থির গতিতে ভালোই এগুচ্ছিল সে। বড় একটা বৃত্ত তৈরি করে শ্লথ গতিতে আসছিল।

কার্লোস বলল, “ও ক্লান্ত হয়ে গেছে। এখন গা ছেড়ে দেবে। লাফালাফি করে ওর বাতাসের থলেগুলো পূর্ণ হয়ে গেছে। গভীরে যাবার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। আর পারবে না।”

আমি বললাম, “রডের অবস্থাও শেষ। বেঁকেছে তো বেঁকেছে। আর সোজা হতে পারছে না মোটেও।”

সত্যিই তাই। রডের মাথাটা পানির উপরিভাগ ছুঁয়েছে, মাছটা ওপরে তোলার জন্য রড ওঠালে, রিলে সুতো ওঠানো রড আর নিতে পারছে না। রড আর রড নেই। যেন সুতোর অভিক্ষেপ শুধু। যদিও প্রত্যেকবার উঁচুতে তোলার সময় তখনও কয়েক ইঞ্চি সুতো ফিরে পাওয়া সম্ভব ছিল। তবে ওইটুকুই, এর বেশি নয়।


বার্তা২৪.কম-এর শিল্প-সাহিত্য বিভাগে লেখা পাঠানোর ঠিকানা
[email protected]


মাছটা বৃত্তাকারে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল। অর্ধেক বৃত্ত পূর্ণ করে যখন বাইরের দিকে যাচ্ছিল তখন রিল থেকে সুতোর প্যাঁচ খুলে আসছিল। যখন ভেতরের দিকে আবার বৃত্তে ফিরে আসছিল তখন সুতো আবার উদ্ধার হচ্ছিল। কিন্তু রডের অবস্থা খারাপ হওয়ার জন্য ওকে তো আর শাস্তি দিতে পারো না। আর ওর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণই বা করবে কিভাবে।

আমরা একে অন্যকে ক্যাপ বলে সম্বোধন করতাম। আমি মি. জোসিকে বললাম, “খুব খারাপ। ও যদি ডুব দিয়ে মরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে তবে ওকে আর কখনোই ওপরে তুলতে পারব না আমরা।”

“কার্লোস বলেছে ও উপরে আসছে। বলেছে ও লাফাতে লাফাতে শরীরে এত বেশি বাতাস নিয়ে ফেলেছে যে চাইলেও অত গভীরে যেয়ে মরতে পারবে না। বড় মাছগুলো অতিরিক্ত লাফালাফি করে শেষে এসে এরকমই করে। আমি গুনে দেখেছি ছত্রিশবার লাফ দিয়েছে মাছটা, মনে হয় একবার গুনতে ভুলেও গেছি।”

আমার জীবনে শোনা সবচে লম্বা বক্তৃতাগুলোর মধ্যে এটি একটি। মি. জোসি যেভাবে বলল তাতে আমি একেবারে মুগ্ধ। ঠিক তখনই মাছটা ধীরে ধীরে সাঁতার কেটে নিচের দিকে যেতে শুরু করল। আমি দুহাত দিয়ে রিলের সুতো ছাড়ছিলাম আর ব্রেকিং পয়েন্ট থেকে সুতোকে রক্ষা করায় ব্যস্ত ছিলাম। রিলে ড্রামের ধাতুটা আমার আঙুলের নিচে ছোট ছোট ঝাঁকুনি খেয়ে ঘুরছিল।

আমি মি. জোসিকে জিজ্ঞেস করলাম, “সময় কেমন কাটছে? তিনঘণ্টা পঞ্চাশ মিনিট ধরে তো ওর সঙ্গে আছ।”

কার্লোসকে বললাম, “আমি তো ভাবলাম তুমি বলেছো ও নিচে গিয়ে মরতে পারবে না।”

“হেমিংওয়ে, ওকে যে উপরে আসতেই হবে। আমি জানি, ওকে আসতেই হবে।”

আমি বললাম, “ওকে বলো না কেন আসতে।”

মি. জোসি বলল, “ওকে পানি দাও তো কার্লোস।” “আর তুমি কথা বোলো না তো, ক্যাপ।”

বরফপানি খুব ভালো লাগছিল। কিছু পানি মুখ থেকে বের করে কব্জির ওপর ছেড়ে দিলাম আর কার্লোসকে বললাম গ্লাসের বাকি পানিটা আমার ঘাড়ের পেছনে ঢেলে দিতে। ঘাড়ে খালি চামড়ায় যেখানে হার্নেসের ঘষা লেগেছিল সেখানে ঘামের লবণ মেখে ছিল কিন্তু সূর্যের তাপ এতটাই প্রখর ছিল যে রক্তের কোনো তাপ অনুভব করিনি। জুলাই মাসের এক দুপুর ছিল সেটা।

“ওর মাথায় স্পঞ্জ দিয়ে আরো কিছু লবণাক্ত পানি ঢালো।” মি.জোসি বলল।

ঠিক তখন মাছটা সুতো টানা ছেড়ে দিল। কতক্ষণ স্থির হয়ে রইল, মনে হলো শানের কোনো জেটির সঙ্গে আমাকে বেঁধে ফেলা হয়েছে। তারপর ধীরে ধীরে সে আবার নড়তে শুরু করল। আমি শুধু হাতের কব্জি দিয়ে এমনভাবে সুতো উদ্ধার করতে লেগে গেলাম যেন রডে কোনো স্প্রিং ছিল না আর এতটাই নেতিয়ে পড়েছিল সেটা, মনে হচ্ছিল যেন ক্রন্দনরত কোনো উইলো গাছ।

পানির ওপর থেকে প্রায় একবাঁও নিচে আমরা ওর অভিক্ষিপ্ত লম্বা বেগুনি রঙের চমৎকার দাগযুক্ত পাখনা দুটো দেখতে পেলাম। মনে হলো যেন একটা ডোঙা। তখন সে ধীরে ধীরে বৃত্তাকারে ঘুরতে শুরু করে দিল। ঘুরতে খুব যেন সুবিধা করতে না পারে সেজন্য আমি ওকে সাধ্যমতন চাপে রাখলাম। এতটাই চাপ প্রয়োগ করলাম যে সুতো ছিঁড়ে যাবার যোগাড় হলো আর এই অবস্থায় পড়লে রড ছেড়ে না দিয়ে আর কোনো উপায় থাকে না। সঙ্গে সঙ্গে রড ভাঙল না বটে কিন্তু শক্তি হারিয়ে নষ্ট হয়ে গেল।

কার্লোসকে বললাম, “বড় খুঁটি থেকে ত্রিশ বাঁও সুতো কেটে নাও। বৃত্তে ঘুরে আসার সময় আমি ওকে ধরব, আর যখন এদিকে আসতে শুরু করবে তখন যথেষ্ট পরিমাণে সুতো হাতে আসবে। সুতো যেহেতু কম পড়বে না, তখন আমি রডটা বদলে ফেলব।”

রড যখন ভেঙে গেছে এখন তো আর মাছ ধরায় বিশ্ব রেকর্ড বা অন্য কোনো রেকর্ড সৃষ্টির প্রশ্নই আসে না। কিন্তু মাছটা তো কাবু হয়ে গেছে, তাই এখন ওর পেছনে উঠে পড়ে লেগে ওকে ধরা উচিত। কিন্তু সমস্যা একটাই—বড় রডটা পনের প্যাঁচের সুতোর জন্য বেশিরকম শক্ত। এখন আমাকে এই সমস্যার সমাধান বের করতে হবে।

নামকরা হার্ডি কোম্পানির রিল থেকে কার্লোস রডে সুতো তোলার গাইড ব্যবহার করে ছত্রিশটা সাদা থ্রেড-লাইন খুলছিল আর হাত দিয়ে মাপছিল। ওর হাত থেকে রিলটা বোটের মেঝেতে পড়ে গেল। নষ্ট হয়ে যাওয়া রডটা দিয়ে যথাসাধ্য মাছটাকে ধরে রাখার চেষ্টা করলাম। দেখলাম কার্লোস সাদা সুতো কেটে রডের গাইডের সাহায্যে অনেকখানি সুতো তুলল।

আমি মি. জোসিকে বললাম, “ক্যাপ, বেশ তাহলে এই সুতো নাও। মাছটা বৃত্তাবর্তে ফিরে আসবে যখন তখন সুতো যথেষ্ট টেনে নিলেও কার্লোস দ্রুত সুতোর দুটো থ্রেড বানিয়ে ফেলতে পারবে। আর কিছু ভাববার প্রয়োজন নেই। শুধু নরম আর সহজভাবে সুতো টানবে।”

ঘুরে ঘুরে মাছটা আসতেই থাকল আর মি. জোসি একফুট একফুট করে সুতো উদ্ধার করে কার্লোসকে দিচ্ছিল, কার্লোস সাদা সুতোর সঙ্গে সেই সুতোর গিঁট দিচ্ছিল। মি. জোসি বলল, “ও তো ওগুলো বেঁধেই ফেলেছে।” তখনও প্রায় গজ খানেক সবুজ রঙের পনের প্যাঁচের সুতোটা ব্যবহার করা বাকি, মাছটা ওর বৃত্ত সীমার মধ্যে এলে সে আঙুল দিয়ে সুতোটাকে ধরে রাখল। আমি ছোট রডটা থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে ওটা নিচে রাখলে কার্লোস বড় রডটা আমার হাতে দিল।

আমি কার্লোসকে বললাম—“তুমি যখন প্রস্তুত হও, ওটা কেটে ফেলো।” মি. জোসিকে বললাম, “ক্যাপ, তুমি আস্তে আস্তে নরম করে ঢিলা দিতে থাকো। যখন সময় হবে, বুঝতে পারব, তখন আমি আস্তে আস্তে টানতে শুরু করব।”

কার্লোস যখন সুতো কাটছিল আমি তখন সবুজ রঙের সুতোর লাইন আর বিশাল মাছটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম। তখন এমন জোরে এক চিৎকার শুনলাম এর আগে কখনো কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষকে এভাবে চিৎকার করতে শুনিনি। যেন সমস্ত হতাশাকে জড়ো করে এমন শব্দে রূপ দেওয়া। তারপর প্রত্যক্ষ করলাম সবুজ সুতোর লাইনটা ধীরে ধীরে মি. জোসির আঙুলের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এরপর দেখলাম মাছটা যাচ্ছে তো যাচ্ছেই এবং একসময় সে দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেল। কার্লোস গিঁট দেয়া সুতোয় ভুল লুপ কেটেছিল।

মি. জোসি বলল, “ক্যাপ।” তাকে ঠিক ভালো দেখাচ্ছিল না। এরপর হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে জোসি বলল, “চারঘণ্টা বাইশ মিনিট হয়ে গেছে।”

আমি নিচে কার্লোসকে দেখতে গেলাম সেখানে সে বমি করে ভাসিয়ে দিচ্ছিল। আমি চিন্তা করতে নিষেধ করে বললাম, যে কারো এরকম হতে পারে। তাঁর বাদামি রঙের মুখটা তখন স্নায়ুচাপে পীড়িত। অদ্ভুত নিচু গলায় কথা বলছিল সে, আমি ঠিকমতন শুনতেও পাচ্ছিলাম না।

“আমি সারাজীবন মাছ ধরে আসছি কখনো এইরকম মাছ দেখিনি। এইবারই প্রথম। আমি আমার, তোমার দুজনার জীবনই নষ্ট করে দিয়েছি।”

আমি বললাম, “কী যে বলো! বাজে বোকো না তো। আমরা আরো বড় বড় মাছ ধরব।” কিন্তু কখনোই বড় মাছ ধরতে পারিনি আমরা।

মি. জোসি আর আমি বোটের পেছনের দিকে গিয়ে বসে অনিটাকে বাতাসের টানে এগুতে দিলাম। উপসাগরে সেটি ছিল চমৎকার একটা দিন। মৃদুমন্দ বাতাস বইছিল। আমরা তীর আবার তারও পেছনে ছোট ছোট পাহাড়গুলো দেখছিলাম। মি. জোসি আমার ঘাড়ে, হাতে যে জায়গাগুলোতে রড আটকে গিয়েছিল, সেই জায়গাগুলোতে মারকিউরোক্রোম মালিশ করে দিচ্ছিল। আবার পায়ের পাতাও ঘষা লেগে ছিলে গিয়েছিল বলে সেখানেও মলমটা লাগিয়ে দিচ্ছিল। এরপর সে দুটো হুইস্কি গাঁজাতে নিল।

“কার্লোস কেমন আছে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“ওর অবস্থা বেশি ভালো না। গুড়ি মেরে বসে আছে।”
“আমি বলেছিলাম নিজের ওপর দোষ না নিতে।”
“নিশ্চয়। সে তো ওখানে বসে থেকে নিজেকেই দোষারোপ করছে।”
“বড় মাছগুলোকে কেমন লাগছে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

মি. জোসি বলল, “আমি সবসময় এই-ই করতে চেয়েছি আসলে।”
“আমি কি ওকে ঠিকমতন সামলাতে পেরেছি, ক্যাপ?”
“পেরেছো মানে! খুব ভালো পেরেছো।”
“না। আমাকে সত্যি করে বলো।”
“আজকে তো আমাদের টিকেটের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। তুমি চাইলে আমি পয়সা ছাড়াই মাছ ধরতে পারি।”
“না”
“আমি পয়সা ছাড়াই বরং মাছ ধরতে চাচ্ছি। কিভাবে যে মাছটা ন্যাশনাল হোটেলের দিকে গেল যেন কোনোদিকে হুঁশ ছিল না ওর, মনে আছে তোমার?”
“ওর সবকিছু আমার মনে আছে।”
“তোমার লেখালেখির কী খবর, ক্যাপ, ভালো চলছে? খুব ভোরে উঠে লেখা মনে হয় তেমন কঠিন কোনো ব্যাপার না, তাই কি?”
“সাধ্যমতো চেষ্টা করছি ভালো লিখতে।”
“তুমি চালিয়ে যাও। আর প্রতিদিন নিয়ম করে লিখলে কখনোই সমস্যা হবার কথা না।”
“আগামীকাল সকাল থেকে বাদ দিয়ে দিতে পারি।”
“কেন?”
“আমার পিঠে সমস্যা।”
“তোমার মাথা তো ঠিক আছে, নয় কি? পিঠ দিয়ে তো আর লেখো না।”
“হাত ব্যথা হয়ে থাকবে।”
“ধুত্তোরি! পেন্সিল তো ধরতে পারবে। সকালে উঠে দেখবে, ঠিক হয়ে গেছে। তখন পারবে।”

ভাবতে অবাক লাগলেও পরদিন সকালে আমি লিখতে পেরেছিলাম এবং বেশ ভালোই লিখেছি। সকাল আটটায় পোতাশ্রয়ের দিকে রওনা দিয়েছিলাম। আরেকটা চমৎকার দিন ছিল সেটি। মৃদুমন্দ বাতাস বইছিল। মরো ক্যাসেলের কাছে স্রোত ছিল আগের দিনের মতো। পরিষ্কার পানির কাছে গিয়ে পৌঁছালে কোনো খুঁটির বাতি নিভাইনি আমরা। একবারই তা করেছিলাম, আর নয়। চার পাউন্ড ওজনের বিরাট একটা সেরো ম্যাকরল ধরেছিলাম আমি, রডটা ছিল অনেক বড় আর ভারী, হার্ডি কোম্পানির রড ছিল সেটা; রিলে ছিল ছত্রিশটা সাদা সুতোর প্যাঁচের থ্রেড লাইন। কার্লোস আগের দিন ত্রিশ বাঁওয়ের যে সুতোটা খুলে নিয়েছিল, সেটা আবার যুক্ত করেছে আর পাঁচ ইঞ্চি রিল সম্পূর্ণ ভর্তি ছিল। তবে সমস্যা ছিল রড নিয়ে। রডটা খুবই শক্ত ছিল। বড় মাছ ধরার ক্ষেত্রে বেশি শক্ত রড জেলের বারোটা বাজিয়ে দেয় আর যে রড ঠিকমতন বাঁকা হয়, সেই রড মাছের বারোটা বাজিয়ে ছাড়ে।

কার্লোসের সঙ্গে কথা বললে তবেই সে কথা বলে এবং সে তার কষ্ট নিয়েই ছিল। আমার শরীরে এত ব্যথা ছিল যে, কষ্টের কথা ভাবার সময় পাইনি আর মি. জোসি এমন শক্ত লোক যে, সে এসবকে পাত্তাই দেয়নি।

সে বলল, “শালার, সারাটা সকাল মাথা ঝোঁকাতেই গেছে ওর। এরকম করলে মাছ ধরতে পারবে না ও।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কেমন আছো, ক্যাপ?”

মি. জোসি বলল, “আমি তো মনে করি ভালোই আছি। গতরাতে শহরে গিয়েছিলাম। সেখানে স্কয়ারে মেয়েদের অর্কেস্ট্রা শুনেছি। কয়েক বোতল বিয়ার গলাধঃকরণ করে ডনোভ্যানের ওখানে গিয়েছিলাম। কী যে জঘন্য ব্যাপার ঘটেছে সেখানে।”
“কী জঘন্য ব্যাপার?”
“ভালো না। খুব খারাপ। আমি খুশি যে তুমি সেখানে ছিলে না, ক্যাপ।”

পাশে, দূরে উঁচুতে রডটা ধরে বড় ম্যাকরলটাকে পেছনে ঢেউয়ের তোড় থেকে সরে যেতে সাহায্য করতে করতে বললাম, “কী ঘটেছিল আমাকে বলো।” কাবানা দূর্গ বরাবর স্রোতের কিনার অনুসরণ করার জন্য কার্লোস অনিটাকে ঘোরাল। পেছনে উত্থিত স্রোতে মাছকে প্রলুব্ধ করার জন্য যে সাদা রঙের টিজার ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই সাদা সিলিন্ডার বোটের সঙ্গে সঙ্গে ছুটছিল, স্রোতের তোড়ে মাঝে মাঝে লাফাচ্ছিল, উড়ছিল। মি. জোসি এবার বোটের পেছনে একপাশে চেয়ারে বসে মাছ ধরছিল। তার বড়শিতে বড় একটা ম্যাকরল আধার খাচ্ছে।

“ডনোভ্যানে এক লোক নিজেকে সিক্রেট পুলিশের ক্যাপ্টেন বলে দাবি করছিল। সে বলল আমার মুখটা নাকি তার পছন্দ। সেজন্য সে আমাকে একটা উপহার দেবে, আর সেই উপহার হিসেবে সে যে কোনো এক লোককে খুন করবে। আমি তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু নাছোড়বান্দা সে, বলছিল আমাকে পছন্দ করেছে এবং এইটা প্রমাণ করার জন্য একজনকে সে হত্যা করবেই। সে ছিল মাচাদো বিশেষ নতুন মেরিন পুলিশ অফিসারদের একজন। ওই যে ডাণ্ডাবাজ পুলিশ।”
“আমি তো ওদের চিনি।”
“চিনতেও পারো, ক্যাপ। তবে আমি খুশি যে তুমি সেখানে ছিলে না।”
“কী করেছে সে?”
“আমাকে সে কতটা পছন্দ করে তা প্রমাণ করার জন্য সে কাউকে হত্যা করার কথা বলেই চলল। আমি বললাম তার কোনো প্রয়োজন নেই বরং একটু ড্রিংক করে সে কথা ভুলে যাওয়া যেতে পারে। একটু শান্ত হতে না হতেই সে আবার একই কথা বলতে শুরু করল।”
“লোকটা নিশ্চয়ই ভালো।”
“ক্যাপ, আরে নাহ। কোনো কাজের লোক না সে। আমি তাকে এসব ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য মাছের কথা বলতে চেষ্টা করলাম।”

সে বলল, “আপনার মাছের ওপর আমি পায়খানা করে দিই। তাহলে মাছ আর নাই। হলো তো?”

আমি বললাম, “ঠিক আছে। মাছের ওপর হাগু। আপনার কথাই রইল। চলেন এবার দুজনেই বাড়ি যাই।”
“বাড়ি যাব? কী যা তা বলছেন? আপনার জন্য আমি কাউকে হত্যা করবই। আর মাছের ওপর কিন্তু হাগবই। তাহলে মাছ বাদ হয়ে যাবে। বুঝতে পেরেছেন?” সে বলল।

তো ক্যাপ, আমি তাকে শুভরাত জানিয়ে ডনোভ্যানকে টাকা দিলাম কিন্তু এই পুলিশ সেই টাকা ফট করে মেঝেতে ফেলে দিয়ে তা পা দিয়ে চেপে ধরল আর বলল, “মাথা বিগড়ায় দিয়েন না, কইলাম। আপনি আমার বন্ধু, আপনি এখানে থাকবেন।” এরপরও আমি তাকে শুভরাত বললাম। ডনোভ্যানকে বললাম, “ডনোভ্যান, আমি দুঃখিত যে আপনার টাকাটা মেঝেতে।”

আমি বুঝতে পারছিলাম না এই পুলিশ কী করতে যাচ্ছে; অবশ্য সে ব্যাপারে মাথাব্যথাও ছিল না আমার। আমি বাড়ি যাবার জন্য মনস্থ করে যেই পা বাড়িয়েছি, অমনি পুলিশটা পিস্তল বের করে বেচারা গ্যালিগোর দিকে ধরে। গ্যালিগো চুপচাপ বিয়ার খাচ্ছিল। সারারাত একটিবারের জন্য একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি সে। কেউ পুলিশটাকে কিচ্ছু করেনি, বলেনি। আমিও কিছু করিনি। কী যে লজ্জা হচ্ছে বলতে আমার, ক্যাপ।”

আমি বললাম, “বেশিক্ষণ এই অবস্থা চলার কথা না।”
“আমি জানি। কারণ, তা চলতে পারে না। কিন্তু যে কথাটা আমি মোটেও পছন্দ করতে পারিনি তা হচ্ছে আমার মুখ তার পছন্দ। আমার মুখের কী শ্রী বলো তো, ক্যাপ যে একজন পুলিশ বলবে সে পছন্দ করেছে?”

মি. জোসির চেহারাটা আমিও খুব পছন্দ করতাম। আমার পরিচিত যে কোনো মুখের চেয়ে তার মুখটা আমার বেশি পছন্দ ছিল। কারণ, দ্রুত বা সহজ সাফল্য লাভের জন্য এই মুখ পাথরে খোদাই করা হয়নি। পানশালার লাভজনক দিকটায়, অন্যান্য জুয়াড়ির সঙ্গে কার্ড খেলতে খেলতে, বিরাট ঝুঁকির এন্টারপ্রাইজ বুঝতে পেরেও ঠান্ডা মস্তিষ্কের নির্ভুল বুদ্ধিমত্তায়, সমুদ্রে যার জন্ম—সেই মুখ তো পছন্দ করবই। চোখ ছাড়া মুখের আর কোনো অংশ দেখতে অমন সুশ্রী নয়; কোনো উজ্জ্বলতম ঝকঝকে পরিষ্কার দিনে ভূমধ্যসাগরের চেয়েও নীলাভ অদ্ভুত সেই চোখের রঙ। চেহারা সুন্দর নয় মোটেও শুধু আশ্চর্য দুটো চোখ—এখন ফোস্কা ওঠা চামড়ার মতো হয়ে গেছে।

আমি বললাম, “আপনার চেহারাও সুন্দর, ক্যাপ।”
“হ্যাঁ, মনে হয় ওই একটা ভালো জিনিসই ওই কুকুরীর বাচ্চাটা দেখতে পেয়েছিল।”

মি. জোসি বলল, “এখন আমাদের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সামাজিক জীবন নিয়ে মাথা ঘামাব না।”
“স্কয়ারে বসে মেয়েদের অর্কেস্ট্রা আর যে মেয়েটা গাইছিল, শুনতে ভালোই লাগছিল, চমৎকার লাগছিল। সত্যি করে বলো তো কেমন লাগছে তোমার ক্যাপ?”

“আমি তো বলেছি, ভালো না, খুব খারাপ।”
“ভেতরে অন্ত্রে কোথাও লাগেনি তো? বোটের সামনে যতক্ষণ ছিলে, তোমার জন্য দুশ্চিন্তা করেছি আমি।”

আমি বললাম, “না, পেছনে একদম পিঠের গোড়ায়।”
“হাত পা কোনো কাজে আসেনি, একেবারে হার্নেস পর্যন্ত পট্টি দিয়ে বেঁধে দিলাম,” জোসি বলল। “এখন আর অত ঘষা লাগবে না। তুমি কি আসলেই ঠিকঠাকমতন পেরেছিলে, ক্যাপ?”
“অবশ্যই, অভ্যেস করা যেমন কঠিন, অভ্যেসে পরিণত হলে এত্থেকে বের হয়ে আসাটাও তেমনটাই কঠিন।”

“আমি জানি, অভ্যেস খুব খারাপ একটা ব্যাপার।” মি. জোসি বলল, “আর অন্য কোনো অভ্যেস নয়, সম্ভবত কাজই বেশিরভাগ মানুষকে মেরে ফেলে। কিন্তু তোমার বেলায় সে কথা খাটে না। তুমি যখন কিছু করো তখন অন্যকিছুর তোয়াক্কা করো না।”

আমি তীরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম বিচের কাছাকাছি অতল গভীর পানির সন্নিকটে একটা চুনাপাথরের ভাঁটি যেখানে উপসাগরীয় প্রবাহ প্রায় তীরের কাছে এসে মিশেছে। ভাঁটি থেকে সামান্য ধোঁয়া উঠছিল। দেখতে পেলাম তীর বেয়ে ধুলো উড়িয়ে একটা ট্রাক পাথুরে রাস্তা দিয়ে সামনে অগ্রসর হচ্ছে। কিছু পাখি বড়শির আধারের একটা দলা খুবলে খাচ্ছিল। তখনই শুনলাম কার্লোস, “মার্লিন, মার্লিন!” বলে চিৎকার করছে।

সবাই একসঙ্গে ওকে দেখতে পেলাম। পানিতে কী গভীর সেই রঙ ওর। আমি দেখলাম ওর ঠোঁটটা বিরাট ম্যাকরলটার পেছন থেকে পানির ওপর ভেসে উঠল। বেঁটে, গোলাকার, পুরু, কুৎসিত একটা ঠোঁট। তারই পেছনে পানির নিচে স্তূপীকৃত ওর শরীর।

কার্লোস চিৎকার করে বলল, “ও খাক, ওকে ওটা খেতে দাও, মুখের ভেতরে নিয়েছে তো।”

মি. জোসি রিলে আধারের সুতোটা পেঁচিয়ে আনছিল। আমি সেই তীব্র টানটার জন্য অপেক্ষা করছিলাম যার অর্থ হচ্ছে মার্লিন ম্যাকরলটাকে গিলে ফেলেছে।


অনুবাদকের নোট

১.কী ওয়েস্ট—কিউবার প্রায় নব্বই মাইল উত্তরে আমেরিকার একটি দ্বীপ শহর
২. মরো—হাবানা উপসাগর প্রতিরক্ষাদূর্গ

ধারাবাহিক উপন্যাস ‘রংধনু’-২



মাহফুজ পারভেজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

[দ্বিতীয় কিস্তি]

মেয়ের ব্রোকেন ফ্যামিলির বেহাল দশার খবর জেনে একদিন ম্যারির মা এসে হাজির। যথেষ্ট বৃদ্ধ হলেও মিসেস অ্যানি গিলবার্ট, ম্যারির মা, এখনো বেশ শক্তপোক্ত ও কর্মঠ। মা আসায় বাড়িটি কিছুটা প্রাণ পেলো। মেয়ে আর নাতীকে নিয়ে মিসেস অ্যানি গিলবার্ট চারপাশে আনন্দময় একটি পরিবেশ গড়ে তুললেন। তারপর কিছুদিনের মধ্যেই তিনি রুদ্রমূর্তি ধারণ করলেন। ক্রুসেড ঘোষণার মতো তিনি বাড়ি থেকে ক্যাভিনের যাবতীয় স্মৃতি মুছে ফেলতে লাগলেন। তার পরিত্যক্ত জামা-কাপড়, বইপত্র, এমনকি দেয়ালে ঝুলানো একটি হাস্যোজ্জ্বল ছবিও মিসেস অ্যানি গিলবার্টের ক্ষোভ থেকে রেহাই পেলো না। তিনি সময় পেলেই গজগজ করে ক্যাভিনকে অভিসম্পাত করেন এবং তার মেয়ের সকল দুর্গতির জন্য তাকে আসামী করে অভিযোগ করতে থাকেন। মিসেস অ্যানি গিলবার্টের চোখে পৃথিবীর একমাত্র মন্দ লোক এবং তাদের চরম শত্রু ক্যাভিন।

ক্যাভিনের প্রতি মায়ের প্রচণ্ড ক্ষোভের কোনো প্রতিক্রিয়া জানান না ম্যারি। ক্যাভিন সম্পর্কে কোনো কিছু জানতে চাইলেও উত্তর দেন না। ক্যাভিনের প্রসঙ্গ এলেই ম্যারি নিশ্চুপ থাকেন। যদিও ক্যাভিনের পক্ষে বলার মতো কোনো যুক্তি কিংবা বাস্তবতা তার কাছে নেই। আবার ওর বিরুদ্ধে কিছু বলতেও ম্যারির মন সায় দেয় না। চুপচাপ ম্যারি ভাবেন, “সব কিছু মুছে ফেললে কিংবা সব জিনিস ফেলে দিলেই স্মৃতিরা হারিয়ে যাবে? স্মৃতি তো বস্তুগত বিষয় নয়। সত্ত্বার সঙ্গে মিশে থাকা স্মৃতি সহজে হারায় না।”

মিসেস অ্যানি গিলবার্ট কিছুদিনের মধ্যেই পুরো বাড়ি থেকে ক্যাভিনের অস্তিত্ব সাফ করে দিলেন। ক্যাভিন নামে একজন এই বাড়ির বাসিন্দা ছিল, এমন কোনো চিহ্নই আর রইল না। এখানেই থেমে থাকলেন না তিনি। পাড়ায়, বাজারে, যখন যেখানে যান, সেখানেই ক্যাভিনের একটি নিগেটিভ ইমেজ তৈরিতে ব্যস্ত হলেন। মিসেস অ্যানি গিলবার্ট আসলে খুব নেতিবাচক ও পরচর্চ্চাকারী মানুষ নন। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন, মেয়ের জীবন থেকে চলে যাওয়া ক্যাভিনের স্মৃতিগুলো ওর মন থেকে মুছে ফেলনে নতুন একটা পরিবেশ তৈরি হবে। ম্যারি হয়ত নতুন জীবনও শুরু করতে পারবে। তিনি মেয়ের জন্য গোপনে যুৎসই পাত্র খুঁজতেও তৎপর হলেন। মা হিসেবে এসব কাজকে তিনি তার দায়িত্ব মনে করেন।

মিসেস অ্যানি গিলবার্টকে দোষ দেওয়া যায় না। কন্যার স্বার্থচিন্তায় সব মায়েরাই এমন করেন। তিনি কোনো ষড়যন্ত্র বা গোপন লুকোছাপার আশ্রয় নেন নি, সব কিছু প্রকাশ্যেই করছেন। ম্যারিকেও তিনি পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছেন, “তোমাকে এভাবে একাকী ও নিঃসঙ্গভাবে কাটাতে আমি দেবো না। আমার জীবনে তুমি আর তোমার ভাই পিটার ছাড়া কেউ নেই। পিটার ফিলাডেলফিয়ায় চাকরি নিয়ে বেশ আছে। ওকে নিয়ে চিন্তা নেই। তোমার ছেলে টমাসকে নিয়ে আমি থাকবো আর তুমি নতুন করে জীবন শুরু করবে।”

মায়ের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে পরিকল্পনাগুলো শুনেন ম্যারি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় সম্মতি কিংবা অসম্মতি জানান না। তিনি জানেন, বিধবা মায়ের সঙ্গে তর্ক অর্থহীন। তিনি এসেছেন সাহার্য্য করতে। তাকে মোটেও বিমুখ করা যাবে না। তর্ক-বিতর্ক করে পরিবেশ বিষিয়ে লাভ নেই। বরং চুপ থাকলে এক সময় মা হাল ছেড়ে দেবেন।

কিন্তু মিসেস অ্যানি গিলবার্ট কঠিন প্রকৃতির মানুষ। সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন মোটেই। তিনি চা কিংবা কফি পানের জন্য চেনাজানা তরুণদের বাসায় আমন্ত্রণ জানাতে শুরু করেন। ভদ্রতা স্বরূপ ম্যারিকে তাদের সঙ্গ দিতে হয়। তবে নতুন জীবন শুরুর প্রসঙ্গ এলেই ম্যারি প্রসঙ্গান্তরে কিংবা আলোচনা থেকে কোনো উছিলায় সন্তর্পণে সরে আসেন।

বিরক্ত মিসেস অ্যানি গিলবার্ট এক সময় মেয়ের কাছে সোজাসুজি জানতে চান,

“তোমার আসল পরিকল্পনা আমাকে বলো? মধ্য ত্রিশ বয়সের একজন নারী হিসেবে বাকী জীবন একা থাকা তোমার পক্ষে দুরূহ।”

“আমি জানি। কিন্তু এখনই নতুন করে আবার জীবন শুরুর ব্যাপারে আমি মনস্থির করতে পারি নি। আমাকে কিছু সময় দাও।”

এরপর আর কথা চলে না। মিসেস অ্যানি গিলবার্ট চুপ করে ঘরের কাজে মন দেন। তার সন্দেহ হয়, তবে কি ক্যাভিন গোপনে এখনো যোগাযোগ রাখছে? কৌশলে নানা রকমের তদন্ত করে তিনি শঙ্কামুক্ত হন। না, ক্যাভিনের বিন্দুমাত্র সন্ধান এই তল্লাটের কেউ জানে না। ম্যারির সঙ্গেও সামান্যতম যোগাযোগ নেই বেচারার। তাহলে ম্যারি এমন করছে কেন? কেন তার সিদ্ধান্তহীনতা? মিসেস অ্যানি গিলবার্ট এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে মেয়ের আচরণ ও চাল-চলনের দিকে বিশেষ মনোযোগী হন।

প্রথম প্রথম মিসেস অ্যানি গিলবার্ট কিছুই টের পান নি। তার গভীর ঘুমের বাতিক। একবার ঘুমালে কিছুই টের পান না তিনি। একরাতের মধ্য প্রহরে ঘুম ভেঙে দেখেন ম্যারি ঘরে নেই। টমাস একাকী ঘুমাচ্ছে বিছানায়। বাথরুম থেকেও কোনো শব্দ আসছে না। চিন্তিত মিসেস অ্যানি গিলবার্ট অবশেষে ম্যারির দেখা পেলেন বাগানে পাইন গাছের নিচে। জানালা দিয়ে অন্ধকারে ডুবে থাকা চরাচরে ঈষৎ আলোর ঝলকানির মতো ম্যারিকে দেখা যাচ্ছে। ম্যারির কফি রঙা খয়েরি চুল কালো বাতাসে অনামা রঙের আদলে অদ্ভুত শিহরণে দুলছে।

পর পর কয়েক রাত ঘাপটি মেরে মিসেস অ্যানি গিলবার্ট মেয়ের গতিবিধি অনুসন্ধান করেন। অবশেষে তিনি নিশ্চিত হন যে, রাতের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে দিয়ে বাড়ির দেওয়ালঘড়ি মধ্যরাত্রির জানান দিলে ম্যারি বিছানা ছেড়ে দেয়। ঠিক বারোটায় চকিতে উঠে দাঁড়ায় ম্যারি। তারপর ধীর পায়ে পৌঁছে যায় বাগানে। খানিক পায়চারী পর স্থির হয় পাইনের তলে।

আরও পড়ুন: ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১

মিসেস অ্যানি গিলবার্টের স্মরণ শক্তি বেশ। তাই তিনি খুবই হতবাক হন ম্যারি মধ্যরাতের অদ্ভুত অভ্যাসের কারণে। কারণ, তিনি বিলক্ষণ জানেন, ম্যারি ছোটবেলা থেকেই ভীষণ ভাবে ভূত বিশ্বাস করে। গ্রামের দিকে তো বটেই, খাস শহরেও সন্ধ্যার পর ঘরের বাইরে বের হতে ভয় পেতো তার মেয়ে। তাদের এই ক্যাম্পাস সিটির আবাসকে নামেমাত্র শহর বললেও আসলে এটি এক প্রত্যন্ত গ্রাম। সুনির্দিষ্টভাবে একে গ্রাম বলাও ভুল হবে। শহর পেরিয়ে পাহাড়তলির ওপর ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা কয়েকটা কাঠের বাড়ির একটি আবাসিক ব্লক আর চারপাশে সীমাহীন বন-জঙ্গল। সাঁঝবেলাতেই নিঝুম রাত নেমে আসে জায়গাটিতে। এখানে তার নিজেরও কেমন একটা ভয়-ভয় করে। অথচ তার ভীতু মেয়েটি দ্বিধাহীন পদক্ষেপে দিব্যি মাঝরাতে বাগানে ঘুরছে?

পরদিন নাস্তার টেবিলে ম্যারিকে চেপে ধরেন মিসেস অ্যানি গিলবার্ট।

“ওতো রাতে বাগানে তোমার কি কাজ থাকে?”

ম্যারি প্রশ্ন শুনেও খানিক চমকিত হলেও নির্বিকার থাকেন। তার অভিব্যক্তিতে মনে হয়, ঘটনাটি যেন অতি স্বাভাবিক বিষয়। এতে অবাক হওয়া বা প্রশ্ন করার মতো কিছু নেই। মায়ের কৌতূহল নিবৃত্ত করতে তিনি সংক্ষিপ্ত উত্তর দেন,

“আমি পাইন গাছের সান্নিধ্যে যাই।”

“পাইন গাছের কাছে? কেন? তা-ও এতো রাতের বেলা?”

“কারণ আমি খুবই একেলা। পাইন গাছের মতো একাকী।”

মিসেস অ্যানি গিলবার্টের চোখে বিস্ময়। তার মুখ লা-জওয়াব। মেয়ের এমন কথার কি উত্তর দেবেন তিনি জানেন না। এরকম কথা কখনো কারো কাছে শুনেছেন বলে তিনি মনে করতে পারেন না। সম্বিৎ হারানোর মতো অবস্থা হলেও মিসেস অ্যানি নিজেকে সামলে নিয়ে মেয়ের সঙ্গে আলাপ জারি রাখেন।

“সব মানুষই কম-বেশি একাকী। পাইনের মতো একেলা হওয়ার কি আছে?”

“আমি আসলেই পাইনের মতো একেলা। না পারছি কাউকে ছায়া দিতে। না পারছি ঝড়-বাদল-দুর্যোগ সামাল দিতে। রাত হলে আমি আমার দোসর পাইনের কাছে চলে যাই নিঃসঙ্গতা কাটাতে।”

মিসেস ম্যারি আর কোনো কথা বলতে পারেন না। তার চোখ ছলছল করছে। তিনি ঘরের অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে মেয়ের কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করেন।

[পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার]

;

আমেরিকার স্বাধীনতার প্রতীক লিবার্টি বেল



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

পেনসিলভেনিয়াকে বলা হয় আমেরিকার জন্মস্থান। পেনসিলভানিয়া একসময় একটি বৃটিশ উপনিবেশ ছিল এবং এরকম মোট ১৩টি বৃটিশ উপনিবেশ মিলেই তৈরি হয়েছে আজকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা আমেরিকা। ১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে আমেরিকায় ইউরোপিয়ান সাম্রাজ্যবাদীদের বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ক শুরু হয়। যদিও ভাইকিংসরা কলম্বাসের অনেক অনেক আগেই আমেরিকায় পৌঁছেছিল কিন্তু কলম্বাসের পদার্পণের পরেই এই মহাদেশ ইউরোপিয়ানদের আকর্ষিত করে এবং এক সময় ইংরেজদের দখলে চলে যায় আজকের এই আমেরিকা। ১৭৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ৪ জুলাই উত্তর আমেরিকার ১৩টি উপনিবেশের প্রতিনিধি পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়ায় সম্মেলনে আয়োজন করে আনুষ্ঠানিকভাবে ইংরেজদের থেকে ‘স্বাধীনতা ঘোষণা’ করেন।

ইনডিপেন্ডেন্স হল

আজকের আমেরিকা প্রতিষ্ঠার বিপ্লবে পেনসিলভানিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় মহাদেশীয় কংগ্রেস আহবান করা হয়েছিল পেনসিলভেনিয়ার অন্যতম জনবহুল শহর ফিলাডেলফিয়াতে। ফিলাডেলফিয়ার তৎকালীন স্টেট হাউজে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র লেখা ও স্বাক্ষরিত হয় যা বর্তমানের ইন্ডিপেন্ডেন্স হল নামে পরিচিত । ১৭৫৩ খ্রিষ্টাব্দে স্টেট হাউজে স্থাপন করা হয় এক প্রকান্ড বেল বা ঘণ্টা। বেলটি কেবল বিশেষ বিশেষ মুহূর্তেই বাজানো হত। সেই বেল বা ঘণ্টাটি বাজিয়ে আইন প্রনেতারা তাদের মিটিং ডাকতেন এবং শহরের লোকজনকে একসঙ্গে জড়ো করতেন তাদের ঘোষণা বা নির্দেশনা শোনানোর জন্য। পরবর্তিতে ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে সেই ঘণ্টাই লিবার্টি বেল হিসেবে স্বীকৃত হয়। বেলটি লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল বেল ফাউন্ড্রি দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল। সেই সময়ে প্রায় ১০০ পাউন্ডে কেনা হয়েছিল এবং ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে আমেরিকার ফিলাডেলফিয়া শহরে ডেলিভারি করা হয়েছিল। লিবার্টি বেলের ওজন প্রায় ২০৮০ পাউন্ড বা ৯৪৩ কেজি। বেলের নিচের অংশের পরিধি ১২ ফুট এবং উপরের দিকে মুকুটের পরিধি ৩ ফুট। আমেরিকাতে আনার পর বেলটি প্রথমবার পরীক্ষামূলক বাজানোর সময়ই ফেটে যায়, স্থানীয় কারিগর মিঃ জন পাস এবং মিঃ জন স্টো ঘণ্টাটি গলিয়ে আবার নতুন করে তৈরি করেছিলেন।

লিবার্টি বেল

পেনসিলভানিয়া পৌঁছেই আমরা পরিকল্পনা করলাম প্রথমেই আমেরিকার স্বাধীনতার সূতিকাগার ইনডিপেন্ডেস হল এবং লিবার্টি বেল দেখতে যাবো। আমেরিকাতে গিয়ে আমরা উঠেছিলাম ভায়রা ভাই আহমেদ মাহিয়ান মিথুনের বাসায়, খুব সুন্দর ৩ তলা বিশিষ্ট ইনডিভিজুয়াল হাউজ সাথে বিশাল ব্যাকইয়ার্ড। ব্যাকইয়ার্ডের সবুজ ঘাস যেন তুলতুলে কার্পেট, আমার ছোট মেয়ের দারুন পছন্দ হলো তার খালামনির বাসা। এবারের আমেরিকা যাত্রা কিছুটা আমার ছোট মেয়ের ইচ্ছেতেই হয়েছে, ৫ বছর বয়সে সে বাবার থেকে বড় ট্রাভেলার হয়েছে। কয়েকদিন পর পর কান্নাজুড়ে দিত আমেরিকা যাবে বলে, তাই হয়তো আমেরিকা যেতে পেরে তার খালামনির বড়সড় বাড়িতে লাফাতে-ঝাঁপাতে পেরে সে মহাখুশি। ঢাকাতে আমাদের  ছোট্ট ফ্লাটে বাচ্চাদের লাফঝাঁপের সুযোগ একেবারে নেই। যেদিন আমেরিকা পৌঁছলাম তার পরেরদিন বরিশালের এক ছোটভাই পলাশ আমাদের সবাইকে গাড়িতে করে নিয়ে গেল ৫২৬ মার্কেট স্ট্রিটের ইনডিপেন্ডেন্স হল এরিয়াতে, লক্ষ্য লিবার্টি বেল দেখা!

লিবার্টি বেল

লিবার্টি বেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার একটি প্রতীক। অনেকেই বলেন ৪ জুলাই ১৭৭৬ তারিখে, মহাদেশীয় কংগ্রেসের স্বাধীনতার ঘোষণা গ্রহণের সংকেত দেওয়ার জন্য ঘণ্টা বাজানো হয়েছিল আসলে তা সঠিক নয়। প্রকৃত ইতিহাস হলো তার ৪ দিন পরে ৮ জুলাই স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র পাঠ উদযাপনের জন্য বাজানো হয়েছিল। বেলটি ১৮৪৬ সালে জর্জ ওয়াশিংটনের জন্মদিন উদযাপন করার জন্য বাজানোর সময় এমনভাবে ফেটে যায় যা ঠিক করা সম্ভব হয়নি।

১৭৭৬ সালে আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা হলেও বৃটিশদের সাথে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ চলে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত। যুদ্ধ চলাকালে ১৯৭৭ সালে অতিরিক্ত শক্তি সঞ্চয় করে ব্রিটিশ বাহিনী যখন ফিলাডেলফিয়ায় প্রবেশ করে, তখন কিন্তু এই বেলটি পেনসিলভানিয়ার অ্যালেনটাউন গির্জায় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৮৩৫ সালে আবার এটিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ইন্ডিপেন্ডেন্স হলে। ২০০৩ সালে ইনডিপেন্ডেন্স হল সংলগ্ন ইনডিপেন্ডেস ন্যাশনাল হিস্টোরিক পার্কের এক পাশে লিবার্টি বেল সেন্টার তৈরি করে সেখানে স্থানান্তর করা হয়। লিবার্টি বেল সেন্টারে প্রবেশে কোন টিকিট কাটতে হয় না। তবে প্রবেশে বেশ কড়াকড়ি রয়েছে, ভালরকম সিকিউরিটি চেক সম্পন্ন হবার পরেই ঢুকতে পাবেন সেখানে। হলের গেটে পৌঁছে সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ঢুকে পরলাম হলে। শুরুতেই নানান পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে রুম। এরকম কয়েকটা রুম পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম বেলটির কাছে। বেলটির কাছে বেশ ভিড় পেলাম, সবাই বেলের সাথে ছবি তোলার জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু সময় অপেক্ষা করে আমরাও ছবি তুললাম আমেরিকার স্বাধীনতা এবং মুক্তির প্রতীকের সাথে। প্রতি বছর প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষ এই বিখ্যাত লিবার্টি বেল দেখতে আসে। আমেরিকার পেনসিলভানিয়ায় ঘুরতে গেলে অবশ্যই দেখতে যাবেন আমেরিকার ইতিহাস এবং স্বাধীনতার এই প্রতীক লিবার্টি বেল।

;

পার্বত্য চট্টগ্রাম 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ' গ্রন্থের প্রিঅর্ডার রকমারি'তে



কনক জ্যোতি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের।

প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের।

  • Font increase
  • Font Decrease

 

প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের। এক বছরের মাঠ পর্যায়ের নিবিড় গবেষণার ভিত্তিতে রচিত হয়েছে গ্রন্থটি, যার প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে রকমারি.কম-এ। গ্রন্থটির লেখক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বার্তা২৪.কম-এর অ্যাসোসিয়েট এডিটর ড. মাহফুজ পারভেজ।

গ্রন্থ সম্পর্কে লেখক ড. মাহফুজ পারভেজ জানান, বাঙালিসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আবাসস্থল পার্বত্য চট্টগ্রাম আয়তনে বাংলাদেশের দশ ভাগের এক ভাগ হলেও এমন বৈচিত্র্যময় অঞ্চল পৃথিবীতে খুব কমই আছে, যেখানে এতোগুলো জনজাতি জড়াজড়ি করে একসঙ্গে রয়েছে অনেক বছর ধরে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিঃসন্দেহে প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে একটি অত্যন্ত মূল্যবান ঐতিহ্যগত অঞ্চল।

চিরায়তভাবে শান্তিপূর্ণ অঞ্চলটি একসময় অশান্ত হয়ে উঠেছিল। অনেক রক্তপাত ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের পর অবশেষে ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি সম্পাদন হওয়ায় শান্তি, সম্প্রীতি, উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থানের উদার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। সশস্ত্র বিদ্রোহী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে অস্ত্র সমর্পণ করেছেন। বাস্তুচ্যুৎ ও শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অশান্ত পার্বত্যাঞ্চলে নিশ্চিত হয়েছে জনগণের শান্তি, সমৃদ্ধি, উন্নয়ন, জনঅংশগ্রহণ ও স্থিতিশীলতা, যা দুইযুগ স্পর্শ করেছে ২০২১ সালে।

ড. মাহফুজ পারভেজ বলেন, শান্তিচুক্তির দুইযুগের অভিজ্ঞতায় শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের গতিবেগে সমগ্র পার্বত্য জনপদ ও বাসিন্দারা মুখরিত হলেও সেখানে নানা কারণে সঙ্কটের আগুন ধূমায়িত হচ্ছে। বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাস, নাশকতা, হত্যা, গুম, চাঁদাবাজি, অপহরণ প্রভৃতি সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তা ও জনজীবনের শান্তি বিঘ্নিত করার মাধ্যমে উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের মতো ঘটনা ঘটছে মহল বিশেষের উস্কানি ও অপতৎপরতায়। ফলে মাঝে মধ্যেই উত্তপ্ত ও অস্থির পার্বত্যাঞ্চলে কখনো কখনো শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের ইতিবাচক অর্জনসমূহ বিনষ্টের অপচেষ্টা চলছে।

তাই নিবিড় গবেষণার আওতায় এনে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে চলমান পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্জনসমূহ পর্যালোচনা এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলো শনাক্তকরণ ও সমাধানের রূপরেখা প্রণয়ন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ।

১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি প্রণীত হওয়ার পর প্রথম গবেষণা গ্রন্থ ‘বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি’ (১৯৯৯) প্রকাশ করেন বর্তমান লেখক-গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ। ২০০০ সালে লেখকের ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানবাধিকার’ বিষয়ক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করে ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লাইড এন্থ্রোপলজি। ২০০৩ সালে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) উন্নয়ন পরিকল্পনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে সামাজিক বিষয়ে গবেষণায় যুক্ত থাকেন লেখক। তিনি ২০০৬ সালে সফল ভাবে সম্পন্ন করেন পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাত ও শান্তি বিষয়ক পিএইচডি গবেষণা। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের অর্থায়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরেকটি গবেষণা পরিচালনা করেন তিনি। দীর্ঘ গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের ধারাবাহিকতায় ‘শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রামÑবিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা’ শীর্ষক অংশগ্রহণ ও পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিপূর্ণ উত্তরণ ও অর্জনের পথে বিদ্যমান সমস্যাগুলো ও এর সমাধান তুলে ধরা হয়েছে, যা সমাজ, রাজনীতি, জাতিগত চর্চা, শান্তি ও সংঘাত বিষয়ক অধ্যয়ন এবং নীতিপ্রণেতাদের কাজে লাগার পাশাপাশি সাধারণ পাঠকের আগ্রহ মিটাবে বলে গবেষক মনে করেন।

গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ (জন্ম: ৮ মার্চ ১৯৬৬, কিশোরগঞ্জ শহর)-এর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: গবেষণা-প্রবন্ধ: বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি; দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো; দ্বিশত জন্মবর্ষে বিদ্যাসাগর; প্রকাশনা শিল্প, স্টুডেন্ট ওয়েজ, মোহাম্মদ লিয়াকতউল্লাহ। উপন্যাস: পার্টিশনস; নীল উড়াল। ভ্রমণ: রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে। গল্প: ইতিহাসবিদ; ন্যানো ভালোবাসা ও অন্যান্য গল্প; বুড়ো ব্রহ্মপুত্র। কবিতা: মানব বংশের অলংকার; আমার সামনে নেই মহুয়ার বন; গন্ধর্বের অভিশাপ। অগ্রসর ও জনপ্রিয় মাল্টিমিডিয়া নিউজ পোর্টাল বার্তা২৪.কম-এর প্রকাশিত হচ্ছে তার নতুন উপন্যাস 'রংধনু', যা অচিরেই গ্রন্থাকারে প্রকাশ পাবে।

ড. মাহফুজ পারভেজ রচিত 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' গ্রন্থ প্রিঅর্ডার করা যাবে রকমারি.কম-এর লিংকে

;

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১



মাহফুজ পারভেজ
ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১

  • Font increase
  • Font Decrease

১.

আমেরিকার নামজাদা এই ক্যাম্পাস সিটিতে ভর্তি হয়ে যারা পড়তে এসেছে, তারা কেউ জীবনে নিজের চোখে রংধনু দেখে নি। এক উইকঅ্যান্ডে হাউস টিচার ম্যারি মার্গারেট নিকটবর্তী এক ঝর্ণার পাশে উপত্যকায় শিক্ষার্থী দলটিকে নিয়ে ঘুরতে গিয়ে তথ্যটি জানতে পারেন। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সবাই একটু বিষণ্ণভাবে অসম্মতিতে মাথা নাড়ায়। শিক্ষার্থীদের কেউ নবাগত ফরাসি, কেউ অভিবাসী ইহুদি, কয়েকজন মধ্যপ্রাচ্যের রিফিউজি। সবাই বড় হয়েছে নাগরিক ঘেরাটোপে ও জাগতিক কোলাহলে। সবার উত্তরের মর্মার্থ হলো, “সত্যি রংধনু তো দেখিনি কখনও! স্টিল ছবি দেখেছি। আর কখনো কখনো ইউটিউবে ক্লিপ।”

ম্যারি বাচ্চাদের দোষ দেন না। কত কষ্ট করে প্রতিযোগিতায় টিকে ওরা পড়তে এসেছে বিশ্বের লিডিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। অভিভাবকদের জীবন-সংগ্রামের সমান্তরালের কঠিন পরিস্থিতিতে বইপত্র নিয়ে পড়াশুনার সময় পেয়েছে ছেলেমেয়েগুলো। বাইরের প্রকৃতি ও পরিবেশের দিকে তাকানোর ফুসরত পেয়েছে কমই। তাছাড়া প্রকৃতির নানা দিক ওরা দেখবেই-বা কী করে? এই পোড়া পৃথিবীতে কি আর আকাশ আছে? সবুজ আছে? রক্ষা পাচ্ছে প্রাণ ও জীববৈচিত্র্য? নিজের মনে বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করে ম্যারি রাচ্চাদের দোষ দিতে পারেন না।  

ম্যারি খেয়াল করেন, রংধনু দেখতে না পারার জন্য কেউই বিশেষ দুঃখিত নয়। তবু তিনি রেইনবো ইস্যুটি তাদের মগজের ভাঁজে রাখতে চান। তিনি জানেন, প্রকৃতি ও নিসর্গের নানা প্রপঞ্চ দেখার অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের ইমাজিনেশন ও ভিজ্যুয়াল পাওয়ার বাড়াবে। তিনি সবাইকে কাছে ডেকে আনেন। কথা দেন একদিন রংধনু দেখাবেন। “একটা মজার বিষয় জেনো রাখো। রংধনুর শুরু আর শেষ দেখা যায় না, সেগুলো থাকে বাড়ি কিংবা গাছের আড়ালে। মনে থাকবে?” ম্যারির প্রশ্নে সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। 

শেষ বিকেলে ফিরে আসার পর নিজের ঘরের জানালা দিয়ে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থাকেন ম্যারি। এই সামারে দিন অনেক বড়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেও আকাশ স্বচ্ছ। তিনি জানেন, বর্ষা না এলে রংধনু দেখা অসম্ভব। তবু তিনি যেন আনমনে দিগন্তের কোণে কোণে রংধনু খোঁজেন।

রংধনুর সঙ্গে ম্যারি সম্পর্কটাই বেশ অদ্ভুত। কিছুটা নস্টালজিক আর কিছুটা সুপারন্যাচারাল। নিজের দেশের চেয়ে অনেক বেশি রংধনু তিনি দেখতে পেয়েছেন বিদেশের নানা স্থানে। একবারও প্ল্যান করে রংধনু দেখেন নি তিনি। রংধনু নিজেই নিজের খেয়ালে এসে ধরা দিয়েছে তার চোখে। ম্যারি নিজের ঘরের সীমানা পেরিয়ে চরাচরের আলো-অন্ধকারের সন্ধিক্ষণে তন্ময় হয়ে থাকেন রংধনুর সাত রঙে।

“খেতে এসো।”

ডাইনিং টেবিল সাজাতে সাজাতে মৃদ্যু কণ্ঠে ডাক দেন মিসেস অ্যানি গিলবার্ট, ম্যারির মা। ধ্যান-ভেঙে ম্যারি জানলার পাশ থেকে ডাইনিং স্পেসে চলে আসেন। মা ছাড়া আর কেউ নেই তার দুনিয়ায়। দিন শেষে মায়ের আশ্রয়ে ম্যারি পুনর্জন্ম লাভ করেন। মায়ের হাত চেপে তিনি একটি চেয়ারে বসেন দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল জীবন পেরিয়ে আসা ষাটের কাছাকাছি বয়সের দ্বারপ্রান্তের এক ক্লান্ত রমণীর মতো। বিবাহ বিচ্ছেদের পর অনেকগুলো বছর একা থাকতে থাকতে যখন অস্থির ও দিশাহীন অবস্থায় হাবুডুবু খাচ্ছিলেন ম্যারি, তখনই মা এসে তার পাশে পাহাড়ের মতো অটল আস্থায় দাঁড়ান। সারাদিন আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পড়তে আসা ছাত্র-ছাত্রী আর বাকীটা সময় মা তার জীবনের চৌহদ্দী ও সাহস। অথচ একসময় তারও জীবন ছিল রংধনু রঙে রাঙা, যখন ক্যাভিন ছিল পাশে আর টমাস কোলে। এখন সবাই যার যার জীবনের বিবরে আবদ্ধ। সবাই সবার মতো নিজের কাজে ব্যস্ত। বিশাল আকাশের গভীরে রংধনুর রঙগুলোর মতো লুকিয়ে রয়েছে সবাই। কেউ কারো পাশাপাশি আসতে পারছে না। বৃষ্টি শেষে রংধনুর মতো খানিকক্ষণের জন্যেও দেখা হয় না ম্যারি আর তার জীবনের একদা রঙিন মানুষগুলোর সঙ্গে।    

অন্যমনস্ক ম্যারিকে দেখতে দেখতে মেয়ের মনের মধ্যে চাপা বেদনা টের পান মিসেস অ্যানি গিলবার্ট। চেষ্টা করেন কথা বলে সান্তনা দিতে।

“ওদের সঙ্গে কথা হয়েছে?”

“না।”

“হবে কেমন করে? যেমন বাপ তেমনই ছেলে। কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই।”

মায়ের ক্ষোভ সঙ্গত। তবু সায় দিতে মন মানে না ম্যারির। ক্যাভিন তো এমনই। চরম বোহেমিয়ান। কখন কোথায় থাকবে, সে নিজেও জানে না। বাতাসের ঝাপ্টায় বেসামাল একখণ্ড ভাসমান মেঘের মতো আকাশের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোই যেন তার স্বভাব। নিয়তিও তাকে তেমনই ভানিয়ে বেড়াচ্ছে। তবুও ভেসে ভেসেই জীবন তাদেরকে নিয়ে যৌথতায় বেশ চলছিল। ক্যাভিন একদিন বললো, “তুসি স্থিত হও। আমার মতো ঠিকানাবিহীন হলে তোমার চলবে না।” ততদিনে টমান এসে গেছে। ম্যারির মাতৃত্ব ও নারীত্ব একটি স্থায়ী ও নিরাপদ আশ্রয়ের প্রত্যাশা করছিল মনে মনে। ক্যাভিন তার ইচ্ছের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হয়ে বলে, “কিন্তু আমি তো এক জায়গায় স্থির থাকতে পারবো না। তুমি বরং নিজের মতো শুরু করো। আমার শুভেচ্ছা থাকেবে।”

পরদিন ঘুম থেকে উঠে ক্যাভিনের দেখা নেই। নেই মানে নেই। ঘরে নেই, আশেপাশে কোথাও নেই। রাতে বিছানা ঠিক করতে গিয়ে বালিশে চাপা ক্যাভিনের চিঠিটি হাতে আসে ম্যারির। চিঠির ভাষ্য অতি সংক্ষিপ্ত। “প্রকৃত অর্থে সঙ্গে না থেকে তোমাকে আটকে রাখা অনৈতিক। সেপারেশন ইউলে সাইন করে দিলাম। আর ব্যাঙ্কের নমিনি। আশা করি মাঝে মাঝে দেখা ও কথা হবে।”

ম্যারি জানতেন ক্যাভিনের পক্ষে কোনো কিছু করাই অসম্ভব নয়। বিশ্বের সবচেয়ে বিপদজ্জনক সেতুতে ঝুঁলে থাকা, মাঝরাতের অন্ধকারে প্যাসিফিকে সুইমিং করা, হিমালয়ের কোনো গুহায় একাকী কয়েকদিন ধ্যানমগ্ন হওয়া তার কাছে নস্যি। এতো কমিটেড প্রেম, যৌথজীবন, এক লহমায় উড়িয়ে দিয়ে দিব্যি হাওয়া হয়ে গিয়েছে ক্যাভিন। সদ্যজাত পুত্র টমাসের জন্যেও বিন্দুমাত্র পিছুটান অনুভব করে নি লোকটি। রাগে, ক্ষোভে, প্রত্যাখ্যানের অপমানে সারা রাত ঘুমাতে পারে নি ম্যারি। যদিও জানে কোনো ফল হবে না, তবু ছোট্ট ক্যাম্পাস টাউনের আনাচেকানাচে দিনভর ক্যাভিনের খোঁজ করেন ম্যারি। না, তার কোনো খোঁজ নেই। তার গতিবিধির সন্ধানও কেউ জানে না। যদি মন চায়, হয়ত ক্যাভিন নিজেই জানাবে তার হদিস। শত চেষ্টা করেও ম্যারি আর তার কোনো খোঁজ পাবে না। নিজের প্রতিক্রিয়াগুলোও জানাতে পারবে না। ক্যাখিনের খোঁজে ব্যর্থ হয়ে ম্যারি দিন শেষে ঘরে ফিরে আসে চরম হতাশায়। এসেই মনে হয়, পুরো বাড়িটা বড্ড হাহাকার করছে। ঘরগুলো খুবই ফাঁকা আর দমবন্ধ মনে হয় তার। টমাসকে কোলে নিয়ে তিনি চলে আসেন বাড়ির লনে। সাজানো বাগানের মধ্যে একটা লম্বা পাইন ম্যারির খুব প্রিয়। ক্যাভিনকে নিয়ে রাতের পর রাত গল্প করে কাটিয়েছেন তিনি নিঃসঙ্গ পাইনের কাছে। বিচ্ছেদ বেদনা নিয়ে তিনি রাতের অন্ধকারে পাইনের নিচে বসে থাকেন।

রাতের আকাশে রংধনু থাকার কথা নয়। তবু মাঝরাতের দিকে ম্যারির মনে হয় তিনি যেন আবছা আলোয় একটি অস্পষ্ট রংধুন দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও তিনি রঙিন আলোর জগতকে ছুঁতে পারছেন না। যন্ত্রণার বুক-চাপা কষ্টে আস্ত একটি রাত নির্ঘুম কেটে যায় তার জীবন থেকে। তিনি অনুভব করেন, প্রিয় মানুষের অভাবে এমন অনেক ঘুমহীন রাত তার জীবনের শূন্যতা পূর্ণ করবে। তার স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ ছিন্ন হয়ে যাবে। তিনি বেঁচে থাকবেন ঘুম ও জাগরণের মাঝখানে নিঃসঙ্গ ও একেলা। ঠিক যেন বাগানের সঙ্গীবিহীন পাইন গাছের মতো।   

[পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার]

;