অনুগমন



মশিউল আলম
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

‘না রে ইদ্রিস, গাঁওত আর থাকমু না, শহরত চলে যামু। শহরত যায়া ইশকা চালামু আর খালি ছিনামা দেখমু।’ জয়নাল ভাত খেতে বসে বকবক করছে।

ইদ্রিস পাত্তা দিচ্ছে না। সে আপন মনে খাচ্ছে: ধবধবে সাদা ভাত, নতুন আলুর ভর্তা, বাঁধাকপি ভাজি, খেসারি কলাইয়ের ডাল, কাঁচা মরিচ, মিছরির মতো সাদা নুন।

ইদ্রিস যে জয়নালের কথায় ভ্রুক্ষেপ করছে না জয়নাল তা দেখতেই পাচ্ছে, কিন্তু তাতে জয়নালের কথা বলায় কোনো সমস্যা হচ্ছে না। কথা বলার জন্য তার শ্রোতার দরকার হয় না। শহরে গিয়ে সিনেমা দেখার স্বপ্নের কথা বলতে বলতেই সে বলছে অন্যের গৃহস্থালিতে আর কামলা খাটবে না, জমি আধি-পত্তন নিয়ে বর্গাচাষী হয়ে নিজের গৃহস্থালি গড়বে। আবার সঙ্গে সঙ্গেই বলছে যে অন্যের জমি আধি নিয়ে চাষাবাদ করতে গেলে নিজের হাল থাকতে হয়, নিজের গরু থাকতে হয়, কিন্তু তার এসবের কিছুই নাই। পত্তন নিয়ে চাষ করতে হলে আগে জমির মালিকের হাতে পত্তনির টাকা তুলে দিতে হয়, তার পরেই শুধু তার জমিতে নামা যায়।

‘মুই তো কিষান! গিরস্তবাড়িত কাম করে খাঁও। মুই ট্যাকা পামু কোন্টে জি জুমি পত্তন লিমু? হাল কিনমু, গরু কিনমু?’ জয়নাল বলল।

কিন্তু ইদ্রিসের দিক থেকে কোনো সাড়া এলো না। ইদ্রিস গোগ্রাসে ভাত খাচ্ছে।

‘আলু-পোটলের ব্যবসা করমু রে! ব্যাপারি হমু।’ জয়নাল বলল।

ইদ্রিস কাঁচা মরিচে কামড় দিয়ে কচমচ করে চিবুতে লাগল।

‘কিন্তুক ব্যবসা করতেও তো পুঞ্জি লাগবে। মুই ট্যাকা পামু কোন্টে?’ জয়নাল বলল।

ইদ্রিস এক ঢোক পানি খেয়ে বিরাট এক গ্রাস ভাত মুখে পুরল।

‘না রে, এইগুলা কেছু হোবে না। এইবার শিবগঞ্জের মেলাত যাত্রাপাটি অ্যালে ওরগে সাতে যোগ দিমু। দ্যাশ-বিদ্যাশ ঘুরে বেড়ামু। কী মজা হোবে রে! জিন্দেগি মোর ফাইন হয়া যাবে!’ জয়নাল বলে চলল। ইদ্রিস আপন মনে ভাত খেয়েই চলল।

জয়নাল চাচির ঘরে মানুষ। চাচার জমি-জিরাত না থাকায় জয়নাল গেরস্থদের গরু-ছাগল চরিয়ে, ঘাস কেটে আর বড় কিষানদের জন্য মাঠে পান্তা বহন করে বড় হয়েছে। এখন সে হেসে খেলে গেরস্থদের বাড়ি বাড়ি কামলা খেটে বেড়ায়। কিন্তু কাজেকর্মে তার মন খুব-একটা নাই, দরকারি কাজটা করার চেয়ে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াতেই তার আনন্দ বেশি। লোকে বলাবলি করে, ফুর্তিবাজ জয়নালটা কামকাজ করে কিসের ছাই, দিনমান খালি কুয়ারা-ফাজলামো লিয়ে আছে। খালি গপ্পগুজব করে আর গান গায় আর খালি গামলা গামলা ভাত খায়।

কিছুক্ষণ আগেও ধান কাটতে কাটতে গলা ছেড়ে গান গাইছিল, এখন ভাত খাচ্ছে। জমির আলের ওপর ল্যাটা মেরে বসে সঙ্গী ইদ্রিসের সঙ্গে ভাত খাচ্ছে আর গল্প করছে। গল্প হচ্ছে না, কারণ জয়নাল শুধু একাই বকবক করে চলেছে, ইদ্রিস তার কথায় কোনো সাড়া দিচ্ছে না, হুঁ-হাঁ কিছুই করছে না। কিন্তু জয়নাল বকতে বকতে যখন মুখে প্রায় ফেনা তুলে ফেলল, তখন আর সইতে না পেরে ইদ্রিস ঘেউ করে উঠল, ‘চুপ কর! ভাত খাবা দে।’

জয়নাল হে হে করে হাসতে হাসতে বলল, ‘মুখ বোন্দ করে খালি ভাত খায়াই যাবু? অ্যানা গপ্প-সপ্প করা লাগে না?’
‘ভাত খাওয়ার সমে কতা কওয়া হয় না। সুন্নতে মানা।’
‘তাই?’
‘হয়। খাওয়ার সমে কতা কলে গুনা হয়।’

জয়নাল চুপ করল। ইদ্রিসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভাত খেতে লাগল। কিন্তু একটু পরেই সে বুঝতে পারল শুধু খাওয়ায় সুখ নাই। গল্প করা ভাত খাওয়ার মতোই জরুরি ব্যাপার। এবার সে ইদ্রিসের মনোযোগ আকর্ষণের মতলবে বলল, ‘ক্যা রে দোস্ত, বিয়া করবু না?’

ইদ্রিস হেসে বলল, ‘হঠাৎ বিয়ার কতা?’
‘হঠাৎ কী রে? হঠাৎ কী? বয়েস কতটি হলো সে খিয়াল আছে?’

২.
তার পর ধান কাটার মৌসুম শেষ হলে বিরান মাঠের একাকী শিমুল গাছটা যখন মাতাল সাঁওতালদের চোখের মতো শতসহস্র টকটকে লাল ফুল নিয়ে ঝকঝক করে উঠল তখন একদিন জয়নাল কোত্থেকে একটা বউ নিয়ে হাজির। গাঁয়ের সব মানুষকে ডেকে ডেকে সে বলতে লাগল, ‘দ্যাখো বারে, হামার বউ দেখে যাও। তামান দুনিয়া ঢুঁড়ে ইংকা বউ তোমরা আর অ্যাডাও পাবিন না!’

বউ দেখে গ্রামের লোকে বলে, ‘কথা মিথ্যা লয়। ইংকা সুন্দর বউ তুই কোন্টে পালু রে জয়লাল?’

জয়নাল গদগদ হয়ে বলে, ‘সে কথা কয়ো না বাপু, আল্লা এক্কিবারে লিজ হাতে তুলে দিছে। আল্লা দিলে ইংকাই হয়। তে শোনো কাহিনী...’

জয়নাল রঙ চড়িয়ে তার বিয়ের গল্প বলতে শুরু করল : ‘কী মনে করে গেনু শিবগঞ্জের হাটত। কোনো কাম নাই, সাথে ট্যাকা-পসাও কেচ্চু নাই। ইমনিই গেনু বাপু। হাটের মদ্যে ঘুরে বেড়ানু খানিক। তে, সন্ধ্যাসমে হাটত থ্যাকে ফিরে আসোছোঁ, দেখনু এক বুড়া ব্যাটা যায় ঠুকঠুক কোরে, আর তার পিছে পিছে এক বেটিছল। কী আর কমু বাপু, কলে কবিন মিছা কথা, সন্ধ্যার আন্ধার উজালা কোরে বুড়ার পিছে পিছে হাঁটে পরির লাকান এক বেটিছল। মুই মনে মনে কনু, এডা মানুষ লয়, আসলেই বুঝি আসমানের পরি। মুই জুয়ান মরদ বাপু, চোখোত্ তো অ্যানা র্ঘুকি লাগবেই। আর তোমরা তো জানিনই, মুই মানুষটা ক্যাংকা ফাজিল। তা হাউস হলো বুড়ার সাথে অ্যানা কুয়ারা করোঁ। কী আর হোবে, বুড়া তো আর মোক মারা পারবে না। আর যুদিল চিগড়াচিগড়ি আরম্ভ করেই দ্যায়, দিমু না হয় কষে এক দৌড়। তে, এই মনে করে বুড়াক কনু, বুড়া ব্যাটা কোন্টে যায়? বুড়া থামে না, মাটির দিকে চায়া ঠুকঠুক কোরে হাঁটতে হাঁটতে কয়, কোন্টে আবার, বাড়িত। মুই কনু, বাড়ি কোন গাঁও? বুড়া তাও মাথা তোলে না, কয় শিমুলিয়া। এইবার মুই সাহস কোরে কনু, বেটিছল কে হয়? বুড়া কয় লাতিন। আর অ্যানা সাহস কোরে কনু, লাতিন তো সেনা হোছে, বিয়া দিবিন না? বুড়া এবার থামল, চোখ দুডা তুলে মোর দিকে তাকাল। মুই মনে মনে কনু, লাঠিডা দিয়ে একখান বাড়িই হাঁকায় নাকি! না, বুড়া আর কেছু কলো না। আবার হাঁটা ধরল। মুই পিছে পিছে যাতে যাতে আবার কনু, লাতিনক বিয়া দিবিন না? বুড়া এবার কয়, বিয়া তো দেমো, কিন্তুক ঘড়ি সাইকেল ট্যান্ডিস্টার আর লগদ ট্যাকা পামো কোন্টে? মুই এবার ফুসলাবার ধরনু, বুঝিছিন? মুই বুড়াক কনু, কেচ্ছু যদি দেওয়া না লাগে? শুনে বুড়া এইবার খাঁড়া হলো, মোর মুখের দিকে চায়া কলো, ঘড়ি সাইকেল ট্যান্ডিস্টার আর লগদ ট্যাকা ছাড়া হামার লাতিনক্ বিয়া করবে কে? মুই কনু, ক্যা? হামি যদি করি? বুড়া মোক্ পুছ করে, কোন গাঁয়ের মানুষ তুমি? মুই কনু মধুপুর। বুড়া কয়, সত্যিই বিয়া করবিন, না ইয়ার্কি মারোছিন? মুই কনু ইয়ার্কি লয়, সত্যি। বাস! আল্লা কবুল কোরে লিলো, বুঝিছিন বারে? আল্লা লিজ হাতে মোক্ বেহেশতের পরি দান করল। বুড়া কলো, আজই বিয়া করবিন? মুই চরপটাত্ থাবা ম্যারে লাফ দিয়ে উঠে কনু, হয় আজই, অ্যাক্‌খোনি! বুড়া কয়, তালে আসো হামার সাথে। বাস, তোমাগেরে জয়নালের বিয়া হয়া গেল বারে, ওই রাতত্ই। দেনমোহর একশ এক ট্যাকা। আল্লা মেহেরবান!’

গ্রামের মানুষ বউ দেখে খুশি। কিন্তু জয়নালের চাচা-চাচির বড্ড আফসোস। গরীব হলে কী হয়, পুরুষ মানুষ বিয়ে করলে টাকা-পয়সা, দান-টান কিছু না কিছু তো পায়, কিন্তু জয়নাল খালি-হাতে শুধু বউটাকেই নিয়ে এসেছে, যে কিনা এখন বসে বসে সানকি সানকি ভাত গিলবে। চাচি কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘হারামজাদাক খায়া-না-খায়া মানুষ করনু, আর বিয়া কোরে লিয়ে অ্যালো একলাই। অ্যাডা কথা কলোও না।’ চাচা আহাজারি করতে লাগল: ‘আহারে মোর আর কেউ নাই, লিয়ে-দিয়ে এক ভাস্তা। সেই নিমকহারামডাই বিয়া কোরে লিয়ে অ্যালো একলাই, ডিমান-ডুমান কেচ্চু পালো না। আহ্হারে মোর কপাল।’

জয়নাল চাচা-চাচির হাতে-পায়ে ধরে মাফ চেয়ে বলল, ‘তোমরা ব্যাজার হয়ো না বাপু, মাপ কোরে দ্যাও। যা হওয়ার হয়া গেছে।’

যা হবার হয়ে গেল বটে, কিন্তু বউকে নিয়ে জয়নালের নাচানাচির শেষ নাই। বউকে সে মাথায় করে রাখবে না কাঁধে নিয়ে নিয়ে নাচবে তার দিশা পায় না। সড়কের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকে, লোকজনকে ডেকে ডেকে বলে, ‘ও চাচা, ও ভাই, হামার বউ দেখে যাও। ইংকা বউ তোমরা তামান দুনিয়া ঢুঁড়ে আর অ্যাডাও পাবিন না!’

বউকে ঘরে রেখে মাঠে গিয়ে কাজ করতে ইচ্ছা করে না জয়নালের। কোনো কোনো দিন সে বউকে সঙ্গে নিয়েই মাঠে যায়। জমির আলের উপর তাকে বসিয়ে রেখে সে হাল বয় আর গলা ছেড়ে গান গায়। আর ঘুরে ফিরে বারবার বউয়ের কাছে এসে বসে গল্প জুড়ে দেয়। তার গল্পের শেষ নাই, মুখে তার সারাক্ষণ কথার খই ফোটে।

হঠাৎ হঠাৎ সে বলে ওঠে, ‘বউ, তুই কী চাস?’

বউ হেসে মাথা নেড়ে জানায় সে কিছু চায় না।

জয়নাল শিমুলের গাছ দেখিয়ে বউকে বলে, ‘ফুল চাস? ফুল লিবু?’

বউ হেসে মাথা দোলায়, আর জয়নাল নিতম্ব বের করে মালকোঁচা বেঁধে দৌড়ে চলে যায় শিমুল গাছের তলায়। গিয়ে দেখে, ওহ হো, শিমুল গাছে তো চড়া যায় না, কাঁটা! তখন সে পাগলের মতো গাছে ঢিল ছুঁড়তে শুরু করে। ঢিল ছুঁড়তে ছুঁড়তে হাপসে যায় আর লজ্জা পেয়ে হাসে, পড়ে থাকা ফুলগুলো চুপি চুপি কুড়িয়ে কাছা ভর্তি করে।

আমগাছের মগডালে পাখির বাসা দেখে সে বউকে শুধায়, ‘পক্কির বাচ্চা লিবু, বউ?’
বউ হেসে মাথা নাড়ে, আর জয়নাল পাছা বের করে মালকোঁচা বেঁধে দুই নিতম্বে দুই চাপড় মেরে দুহাতের তালুতে থুথু নিয়ে দুই তালু ঘষে তরতর করে গাছে উঠে যায়। কিন্তু পাখির বাসায় গোখরোর উদ্যত ফণা দেখে পড়ি-মরি নেমে আসে ছড় ছড় করে, তার দুই ঊরু আর বুকের ছাল-চামড়া ছড়ে গিয়ে দর দর করে রক্ত ছোটে, কিন্তু সে দাঁত বের করে হাসে।

সন্ধ্যায় সে বউকে নিয়ে খালের পাড়ে বসে গল্প জুড়ে দেয়। খালের অন্য পাড়ে মহুয়া গাছ। সেখানে অজস্র বাঁদুড়ের আনাগোনা। একটু দূরেই বাঁশঝাড়, সেখানে ঘুটঘুট্টি অন্ধকারে থোকায় থোকায় জোনাকি জ্বলে। জয়নাল সেদিকে চেয়ে বউকে বলে, ‘জানিস, জোনাক পোকা জ্বলে ক্যান?’

অবোধ কিশোরী বউ অবাক হয়ে শুধায়, ‘ক্যান জ্বলে?’

জয়নাল বলে, ‘জোনাক পোকার গোয়াত এডিয়াম থাকে, এডিয়াম। এডিয়াম কী জিনিস? এডিয়াম হলো এক ধরনের জিনিস, আন্ধারের মদ্যে জ্বলে। তাই ঘড়ির মধ্যে এডিয়াম থাকে। আন্ধারের মধ্যে দেখা যায় কয়টা বাজল।’

আকাশের বেশুমার তারা দেখিয়ে সে বউকে বলে, ‘দেখিছু, কত তারা? তারাভরা আকাশের দিকে চায়া থাকতে তোর ক্যাংকা লাগে, বউ? মোর কলে খুবই ভালো লাগে। মনে হয় ওই তারার দ্যাশত্ উড়ে চলে যাঁও।’

বউ মিটি মিটি হাসে।

তার হাসি দেখে জয়নাল বলে, ‘তুই বুঝি মনে মনে কোস, মোর মাথার ঠিক নাই, লয়? মুই অ্যাডা পাগলা? হয় বউ, কওয়া পারিস তোক্ পায়া মুই পাগলাই হয়া গেছুঁ। আল্লা লিজ হাতে তোক মোক দান করিছে। মোর মাওডা বুঝি কোনো সওয়াব করিছেল।’

বউ বলে, ‘আম্মার কথা তোমার মনে আছে?’

জয়নাল মাথা নাড়ে: মায়ের কোনো স্মৃতি তার মনে পড়ে না। চাচিই তাকে মায়ের মতো বড় করে তুলেছে। চাচির এক মেয়ে মারা যাওয়ার পর আর কোনো সন্তান হয়নি। জয়নাল চাচির বুকের দুধ খেয়ে বড় হয়েছে।

তার পরে আকাশ জুড়ে বড় সড় একটা চাঁদ ওঠে। খালের স্থির পানিতে চাঁদের ছবি দেখে জয়নাল বউকে বলে, ‘ওই দ্যাখ, খালের বিছনাত চাঁন শুতে আছে। দেখিস, এই ঘণ্টাখানেকের মদ্যেই ওই চাঁন লাফ দিয়ে উঠে চলে যাবে বাঁশের আগাত। বাঁশের আগা ঝুঁকে পড়বে, দেখে মনে হোবে বড়শির মাথাত ধরে আছে একখানা সোনার মাছ।’

তার পর সে এই গল্প ফাঁদে : ‘কাল পাছাআত্রিরে কী স্বপন দেখনু, জানিস? দেখনু, খালের পারত তুই আর মুই বসে আছোঁ, এই এখনকার মতন। খালের পানিত চাঁন দেখে তুই বায়না ধরলু, চাঁন চাই, চাঁন অ্যানে দ্যাও। মুই কনু চাঁদ ত ধরা যায় না। কিন্তুক তুই কোনো কতাই শুনিস না, তোর ওই একই বায়না। কী আর করা, মুই ঝাঁপ দিনু খালের পানিত। নিয়াশ বোন্দ কোরে দিনু এক ডুব। কিন্তুক কোন্টে তোর চাঁন? চাঁন নাই। মুই চাঁন ঢুঁড়তে ঢুঁড়তে পাতালপুরিত নামবার লাগ্নু। ঢুঁড়ে ঢুঁড়ে মুই এক্কিবারে হয়রান, তাও চান্দের দ্যাখা নাই। শ্যাষম্যাষ খালি হাতে মন ব্যাজার কোরে ফিরে আনু। খালের পানিত ভুশ্ করে মাথা তুলে দেখবার পানু কী, খালের পারত বসে আছো তুই, আর তোর কোল জুড়ে ঝলমল করে হাসোছে আকাশের চাঁন। চারদিকে এক্কিবারে ধবধবা হয়া গেছে চান্দের আলোত।’

বানোয়াট গপ্প শুনে বউ মৃদু মৃদু হাসে, আবছায়ায় জয়নাল তা দেখতে পায় না। বাঁশঝাড়ে একটা বক ডেকে ওঠে। রাতচোরা পাখিরা তার জবাবে নানা রকম শব্দ করতে থাকে। অনেক দূরে শিয়ালের ঝাঁক এক সঙ্গে হুক্কাহুয়া রবে চিৎকার শুরু করে আর তার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের অলিগলির ভিতরে কুকুরের ঘেউ ঘেউ শুরু হয়।
জয়নাল বলে চলে, ‘শোনেক বউ, ওই পরিবার পরিকল্পনার মেয়ামানুষগুলা কিন্তুক কয়দিন পরেই অ্যাসে ঘুরঘুর করবা লাগবে। তুই কিন্তুক ওরগেরে কথা কানোতই লিবু না। ওরা ফুসলায়া ফাসলায়া তোক কিন্তুক হাসপাতালত লিয়ে যাবে, কেছু অ্যাডা করবে, তার পরে আর হামাগেরে ছলপলই হোবে না। খবরদার শুনবু না ওরগেরে কথা। কিসের জন্মনিয়ন্ত্রণ? শোনেক, হামরা কলে ওগলানের মদ্যে নাই। দশ-বারোটা ব্যাটাবেটি হোবে হামাগেরে। গাঁও ভরে ফালামু তুই আর মুই, বুঝলু? ভোটের আগে শেখ হাসিনা আর খালেদা জিয়া আসলে কমু, আইদা, মদুপুরের জয়নাল কথা কয়। তার বাড়িত বিশজন ভোটার, হুঁশ কোরে কথা কবেন। হাটেবাজারে যেটে সেটে মানুষ হামাগেরে ব্যাটাগরক পুছ করবে, কার ব্যাটা তুই? খালি শুনবা পাবে, জয়নালের, জয়নালের ব্যাটা হামি। বারোটা ভাই হামরা, হুঁশ কোরে কথা কয়ো।’ হা হা করে হেসে ওঠে জয়নাল। বউ লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে হাসে।

৩.
জয়নালের চাচা মূরলীপুরের ইউনুস ফকিরের সঙ্গে চিল্লা দিতে গেছে। চাচিবুড়ি তালকুদারদের বাড়িতে ঝিগিরি করে। ভোরবেলা উঠে সে তালুকদারবাড়ি চলে যায়, সেখানেই সকালের পান্তা খেয়ে কাজ শুরু করে। দুপুরে ভাত খায়, রাতেও ওই বাড়িতেই খেয়ে-দেয়ে নিজের বাড়ি ফিরে আসে। জয়নাল কাজ করে মন্ডলদের বাড়িতে, তারও সেখানেই খাওয়া-দাওয়া। জয়নালের বউ একা একা কী রাঁধে কী খায় তার কোনো ঠিক নাই। গেরস্থদের বাড়িতে তাকেও ঝিগিরি করতে হবে, এ ছাড়া কোনো উপায় নাই। কিন্তু জয়নাল বলেছে সে নতুন বউ, তাকে অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতে পাঠাতে সে পারবে না। কিন্তু বেচারি বউ কী খেয়ে সারাদিন কাটায় তার খোঁজ জয়নাল রাখে না। ইচ্ছা করে নয়, আসলে জয়নাল আলাভোলা লোক বলে এমনটা ঘটে। তা ছাড়া এমন নয় যে জয়নালের ঘরে চাল থাকে না। এই গ্রামে যার ঘরে এক বেলা ভাত রাঁধার চাল আছে তার আর কোনো অভাব আছে বলে মনে করা হয় না। জয়নালের বউটা বাড়ির পাশের জঙ্গল থেকে কচুঘেঁচু তুলে এনে দুপুরে রেঁধে খায়, রাতে জয়নাল মন্ডলদের বাড়ি থেকে ভাত নিয়ে আসে। দুজনে তাই ভাগ করে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

হতদরিদ্র জয়নাল এই অবস্থার মধ্যেও বউকে যখন-তখন বলে, ‘বউ তুই কী চাস?’ এক রাতে বউ লজ্জার মাথা খেয়ে বলে ফেলে, ‘মুরগির গোশত দিয়ে ভাত খাবা মন চায়।’

পরদিন সকালে জয়নাল মন্ডলবাড়িতে গিয়ে মন্ডলকে বলল, ‘চাচা মিয়া, একশডা ট্যাকা দ্যাও বারে, খুবি দরকার।’

মন্ডল নিমের দাঁতন দিয়ে দাঁত ঘষছিল, দাঁতনটা মুখ থেকে বের করে বলল, ‘লিত্যি লিত্যি ট্যাকা চাস কিসক্? উদিনকা না ঘর ছাওয়ার কথা কয়া পাঁচশ ট্যাকা লিলু, তার পর কাম র্কলু কয়দিন রে?’

জয়নাল ছ্যাবলার মতো হাসতে হাসতে বলে, ‘সারা বছর পড়ে আছে চাচা, কাম কোরে ব্যাবাক শোধ দিমু।’
‘তা ত দিবু। কিন্তু আষাঢ়-শাওন চলে গেল, বিষ্টিটিষ্টি বোধহয় আর হোবে না। পাঁথারত্ পানি নাই, এখন তোর কামডা কী? গান গায়া আর বউয়ের সাতে পিরিতের গপ্প করে দিন কাটাবু আর কয়দিন পরপর ট্যাকা চাবু, তালে ক্যাংকা কোরে হয়?’

জয়নাল মনে মনে স্বীকার করে, মাঠে পানি নাই, জমি চাষ করা যাচ্ছে না, ধান রোপাও সম্ভব নয়। এখন আসলে মন্ডলবাড়িতে তার কোনো কাজ নাই। এই অবস্থায় গ্রামের গৃহস্থরা তাদের বাঁধা কিষানদের ছেড়ে দেয়। মন্ডল যে এখনো তাকে বিদায় করে দেয়নি সেটা তার একান্তই ভালোমানুষী।

জয়নাল চুপ করে রইল।

মন্ডল বলল, ‘এখন তোর কামডা কী তুইই ক?’

জয়নাল উত্তর দিতে পারল না।

‘কাল থে তুই আর আসিস না বাপু। বিষ্টিটিষ্টি হোক, তার পর আসিস।’

জয়নাল এক পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, বুকের কাছে দুটি হাত জড়ো করে বলল, ‘একশডা ট্যাকা দিলে বড়ই উপকার হলো হিনি চাচা।’

মন্ডল এবার বিরক্ত হয়ে উঠল, ‘এই অবস্থায় তুই ট্যাকা চাস কোন মুখে?’

জয়নালের দমে যাওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট। কেউ তাকে নিজে ইচ্ছা করে কিছু না দিলে জীবনে কোনো দিন কারো কাছ থেকে সে কিছু আদায় করতে পারেনি। বরং নানা ছুঁতানাতায় অনেক ন্যায্য পাওনা থেকেই অনেকে তাকে বঞ্চিত করেছে।
কাল থেকে আর কাজে আসবে না। কিন্তু আজ সকালের পান্তাটা, দপুরের ও রাতের খোরাকিটুকু থেকে মন্ডল নিশ্চয়ই তাকে বঞ্চিত করবে না। জয়নাল এ রকম ভাবছে, আর পান্তার জন্যে মনে মনে অপেক্ষা করছে। কিন্তু মন্ডল তাকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরো বিরক্ত হয়ে উঠল: ‘কাম না থাকলে খালি খালি মানুষ থোয় কোন গিরস্থ? খোঁজ লিয়ে দ্যাখ দিনি, এই গাঁওত্ এখন কোনো গিরস্থের বাড়িত্ তোর মতন জুয়ান কোনো মরদ বসে বসে তিন বেলা ভাত গিলোছে নাকি? কী রে? খাঁড়া হয়া থাকলু ক্যা?’

জয়নাল আর কোনো কথা না বলে মন্ডলবাড়ির চৌকাঠ ডিঙিয়ে গলিতে নেমে এল।

অভুক্ত অবস্থায় প্রায় বিতাড়িত হয়ে মন্ডলবাড়ি থেকে ফিরে আসার সময় জয়নালের মনটা একটু খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু নিজের বাড়ির পথে হাঁটতে হাঁটতে বউয়ের মুখটা মনে পড়ায় তার বিষণ্নতা কেটে গিয়ে বরং একটা ফুর্তির ভাব জেগে উঠল। এখন সারাদিন বউয়ের সঙ্গে ইয়ার্কি-ফাজলামো আর গল্প-গুজব নিয়ে থাকা যাবে এই চিন্তা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। অভাব-অনটন জয়নালের জীবনে নতুন কিছু নয়, কিন্তু তার স্বভাবটা এমন যে এ নিয়ে তার খুব-একটা দুশ্চিন্তা হয় না।

কিন্তু বউ মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খেতে চেয়েছে এই কথাটা হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়ায় একটুখানি মুশকিল বোধ হলো। হাতে গোটা বিশেক টাকা আছে, কিন্তু তা দিয়ে তো একটা মুরগির বাচ্চাও কিনতে পাওয়া যাবে না। বউয়ের হাউসটা তাহলে সে মেটায় কী করে?

আচ্ছা ঠিক আছে, উপায় একটা বের হবেই—এ রকম ভাবতে ভাবতে জয়নাল বাড়ির পথে হেঁটে চলল।

বাড়ি পৌঁছ দেখতে পেল বউ নাই, ঘরে শিকল তোলা। জয়নাল মনে মনে বলল, এই সকাল বেলা নতুন বউটা তার কোথায় যেতে পারে? সে গলা খাঁকরে ডেকে উঠল, ‘ও বউ, কোন্টে গেলু তুই?’

কোনো সাড়া মিলল না।

জয়নাল এবার বলে উঠল, ‘ব্যাপার কী? অ্যাখোনি পাড়া বেড়াবা আরম্ভ কোরে দিলু নাকি?’

বউ কোথায় যেতে পারে তা ঠাহর করতে না পেরে সে ঘরের সামনে মাটির বারান্দায় বসে পড়ল। তার পেটে ক্ষুধা মোচড় দিয়ে উঠল। প্রতিদিন এই সময় তার পেট পান্তা হজমের কাজ করে অভ্যস্থ, এখন পান্তার অভাবে নাড়িভূড়িই যেন হজম করতে শুরু করে দিল। পেটের এই অন্যায় ব্যবহার জয়নালকে ক্রুদ্ধ করে তুলল। সে চিৎকার করে উঠল, ‘বউ, তুই গেলু কোন্টে?’

ঘরের পিছনে শুকনা লতাপাতায় শব্দ হলো, জয়নালের চোখ সেই দিকে ছুটে গেল। কাউকে দেখতে পেল না সে। তার মনে হলো কেউ যেন এইমাত্র ঘরের পিছনের ঝোপঝাড়ের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। সে ঝট করে উঠে সেদিকে ধেয়ে গেল। কিন্তু কাউকেই দেখতে পেল না।

জয়নালের স্বভাবে যা নাই, এবার তার মনের মধ্যে তাই জেগে উঠল। একটা ক্ষীণ সংশয় তার বুকের মধ্যে চিকন এক যন্ত্রণা এনে দিল : কেউ কি লুকিয়ে লুকিয়ে এ বাড়িকে লক্ষ করে? আরো সহজ করে প্রশ্নটা সে সাজাল : প্রতিদিন সকালে সে কাজে চলে যাওয়ার পর বউ যখন একা থাকে তখন কি কোনো পুরুষ চুপি চুপি এই বাড়িতে আসে? যে মেয়ে এমন সুন্দরী তার দিকে লোভী পুরুষদের কুনজর তো পড়তেই পারে। কিন্তু বউটা? সেও কি স্বামীকে ফাঁকি দিয়ে পরপুরুষের সঙ্গে ব্যাভিচারে লিপ্ত হয়? জয়নালের ক্ষুধার্ত পেটটা মোচড়াতে আরম্ভ করল, তার সহজ সরল মনটা বিষিয়ে উঠল সে পায়ের বুড়া আঙুল দিয়ে উঠানের মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে অপ্রীতিকর ও অশুভ চিন্তা করতে লাগল।

একটু পরে পায়ের শব্দে জয়নাল ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখতে পেল বউ বাড়ি ঢুকছে, তার এক হাতে ডাঁটাশুদ্ধ তিনটা কচু গাছ, অন্য হাতে কিছু বুনো শাক। মুহূর্তেই জয়নালের মন থেকে সব অশুভ চিন্তা দূর হয়ে গেল, একটা করুণ মমতা তার মনকে সিক্ত করে ফেলল : আহারে! বউটা মোর গরু-ছাগলের মতন খাস খায়া থাকে!

বউ অসময়ে স্বামীকে বারান্দায় অকর্মার মত বসে থাকতে দেখে অবাক হয়ে বলল, ‘কী হলো? ফিরে আলিন ক্যা?’

জয়নাল ফের ছ্যাবলা হয়ে গেল, ইয়ার্কি মেরে বলল, ‘মোর চাকরিডা চলে গেছে বউ!’
‘চাকরি? কিসের চাকরি?’

গ্রামের সরল কিশোরী চাকরি বলতে বোঝে শহরের অফিস-আদালতে উচ্চ বেতনে কাজ করা। মন্ডলদের বাড়িতে খোরাকিসমেত মাসিক ছয়শ টাকা মজুরির কাজকেই যে তার স্বামী চাকরি বলছে এই রসিকতাটুকু বুঝতে তার সময় লাগবে। জয়নাল যখন বলতে আরম্ভ করল যে মাঠে পানি নাই, ক্ষেতে কাজ নাই, তাই মন্ডল আর অকাজে ভাত ধ্বংস করার লোক রাখতে চায় না বলে তাকে বিদায় করে দিল, তখন তার বউয়ের ছোট্ট সুন্দর মুখখানা চুপসে গিয়ে আরো ছোট ও মলিন হয়ে গেল। তা দেখে জয়নাল বলে উঠল, ‘তা এত চিন্তা করার কী আছে? মন্ডলের বাড়িত কাম নাই বলে কি দুনিয়াত আর কোনো কাম নাই?’

বউ কিছু না বলে রোদের মধ্যে চুলার পাড়ে বঁটি নিয়ে কচু কাটতে বসল। জয়নাল বউয়ের গা ঘেঁষে বসে বলল, ‘তুই দেখি কতা বোন্দ কোরে দিলু?’

বউ মাথা নিচু করে কচুর ডাঁটা কাটতে কাটতে বলল, ‘পন্তা খায়া আসিছিন?’
‘না না! চাকরি চলে গেল, পন্তা খামু কী? কাম না করলে কেউ খাবা দেয়?’
‘খিদা লাগেনি?’
‘লাগিছেল। কিন্তু এখন আর খিদা নাই।’

এটুকু বলেই জয়নাল উঠে দাঁড়াল। ‘তুই তরকারি কোট্, মুই অ্যানা ঘুরে আসোঁ’ বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলো।

বউ বলল, ‘কোন্টে যাওছিন?’
‘তুই তরকারি কোটেক, আজ হামরা দুবরে সমে ভুল্কানি ভাত খামো। মুরগির গোশ্ত দিয়ে!’

বউকে পরের প্রশ্নটা করার সুযোগ না দিয়েই জয়নাল ছুটে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

৪.
জয়নাল তিন মাইল দূরে উপজেলা সদরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। তার ধারণা সেখানে গেলে নতুন কোনো বুদ্ধি পাওয়া যেতে পারে। যারা জমিতে কাজকর্ম করে তারা অফসিজনে উপজেলা সদরে ভ্যানগাড়ি আর রিকশা চালায়। জয়নাল সাইকেল চালাতে জানে না বলে রিকশা বা ভ্যান চালাবার কথা কখনো ভাবেনি, যদিও এখন তার মনে হচ্ছে দুই চাকার সাইকেলের চেয়ে তিন চাকার রিকশা বা ভ্যানগাড়ি চালানো নিশ্চয়ই সহজ। ইদ্রিস রিকশা চালাতে ঢাকা চলে গেছে। পনের দিন রিকশা চালিয়ে নগদ এক হাজার টাকা সঙ্গে নিয়ে চলে আসে। দিন কয়েক বসে বসে খায়, তার পর আবার চলে যায়। জয়নাল তো সাইকেলই চালাতে শেখেনি; ঢাকা শহরে অত লোকের ভিড় আর বাস-ট্রাকের মধ্যে সে রিকশা চালাতে পারবে না বলে ইদ্রিসের প্রলুব্ধকর কথাবার্তা শুনেও যেতে রাজি হয়নি। ইদ্রিস বুঝে নিয়েছে জয়নালের সমস্যাটা ঢাকার ভিড় বা রিকশা চালাতে না-জানা নয়। আসল কথাটা হলো, নতুন বউকে ছেড়ে ঢাকায় গিয়ে একটানা পনের দিন থাকা জয়নালের পক্ষে সম্ভব হবে না।

উপজেলা সদরে ঢুকে মাইকের চিৎকারে জয়নালের কানে প্রায় তালা লেগে গেল। এক সঙ্গে যে কত মাইক বাজছে তার হিসাব নাই। মাইকে ভোট চাওয়া হচ্ছে। ধানের শিষ আর নৌকা মার্কার পক্ষে চিৎকার বেশি। লাঙ্গল মার্কায়ও ভোট চাওয়া হচ্ছে। মাইকগুলো পরস্পরকে চাপা দেওয়ার জন্যে চিৎকারের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ভোটপ্রার্থী ক্যানভাসারদের গলা ভেঙে ফাটা বাঁশের মতো হয়ে গেছে, তবু তারা গলার রগ ফুলিয়ে অবিরাম চিৎকার করে চলেছে।

একটা বটগাছের তলায় কতকগুলি আদিবাসী নারীপুরুষ। ডালি-কোদাল নিয়ে কেউ বসে আছে, কেউ দাঁড়িয়ে আছে। জয়নালের বুঝতে অসুবিধা হলো না যে তারা মজুর, কোথাও মাটি কাটার কাজ করছে। কিন্তু এই বেলা এগারোটায় তারা কিসের অপেক্ষা করছে তা সে বুঝতে পারল না। ইতস্তত পায়ে জয়নাল তাদের দিকে এগিয়ে গেল। একজনের কাছে গিয়ে বলল, ‘তোমরা কোন্টে কাম করোছিন?’

লোকটা শ্লেষাত্মক হেসে বলল, ‘কাম বারাওছে এবার। দুই দলে এইছা মারামারি লাগিছে..।’
‘কোন্টে মারামারি লাগিছে, ভাই?’ জয়নাল জিজ্ঞাসা করল। কিন্তু লোকটা আর কিছু বলল না।

জয়নাল ফিরে এলো। রাস্তা থেকে একটু দূরে একটা ঘরের সামনে প্রচুর ভিড় দেখতে পেল। ঘরটার ছাদে বড়সড় একটা নৌকা, আগাগোড়াই সেটি ছবিওয়ালা কাগজে মোড়ানো। শেখ সাহেবের ছবি, তার বেটির ছবি এবং এই এলাকার যিনি নৌকা মার্কার টিকেট পেয়েছেন তাঁর ছবি। জয়নাল এক পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে নৌকাটির দিকে নির্বোধের মতো চেয়ে রইল। সে ভোটার, কিন্তু কাকে ভোট দেবে এখনো জানে না। মন্ডল এখনো বলেনি কাকে ভোট দিতে হবে। কেউ জয়নালের কাছে ভোট চাইতেও যায়নি।

‘এই, কে রে তুই?’ এক যুবক ধমকের সুরে জিজ্ঞাসা করল জয়নালকে। জয়নাল কী উত্তর দেবে বুঝতে পারল না।

যুবক তাকে বলল, ‘বাড়ি কোন্টে?’

জয়নাল বলল, ‘মধুপুর, ভাই।’
‘কী দেখিস?’
‘কেছু লয় ভাই, ইমনি। নৌকাডা সুন্দর হোছে।’
‘কী করিস?’
‘মান্ষের বাড়িত কাজকাম করি। এখন কাম নাই, মাঠত পানি নাই তো!’
‘নৌকা মার্কার হয়া কাম কর, আয়।’
‘কী করা লাগবে, ভাই?’

যুবকটি জয়নালকে তাদের নির্বাচনী অফিস ঘরে ডেকে নিয়ে গেল। একশটা পোস্টারের একটা বান্ডিল তার হাতে দিয়ে একটা মাটির ভাঁড় দেখিয়ে বলল, ‘এডা লে। মুকুর হুটাল চিনিস? মুকুর হুটালত যায়া এক কেজি ময়দা লিবু, পানি দিয়ে ময়দা আঠা আঠা করে গুল্বু। তার পর এই পোস্টারগুলা দেয়ালে দেয়ালে লাগাবু। লাগান শ্যাষ হলে ফিরে আসবু। একশ ট্যাকা পাবু। যা।’

জয়নালের হাতে তো পয়সা নাই। ময়দা কিনবে কী দিয়ে? কিন্তু সে কথা সে যুবককে বলতে পারল না। ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইল।

‘কী রে? বুঝিসনি?’

জয়নাল মাথা নেড়ে জানাল সে তার কর্তব্য বুঝেছে, কিন্তু তার পরও সে দাঁড়িয়েই রইল।

যুবক বলল, ‘সমস্যা কী? যা!’

জয়নাল এবার বলল, ‘মোর কাছে ট্যাকা নাই ভাই, ময়দা কিনমু কী দিয়ে?’

যুবক বলল, ‘আরে পাগলা, ময়দা কিনা লাগবে না। মুকুক্ যায়া কবু, তালেই দিয়ে দিবে। যা, তাড়াতাড়ি যা।’

৫.
একটা চিকন গলির মধ্যে দাঁড়িয়ে দেওয়ালে পোস্টার সাঁটছে জয়নাল। তিন তরুণ তার দুপাশে এসে দাঁড়াল। এক তরুণ তাকে বলল, ‘থাম থাম। এত কষ্ট করা লাগবে না। কয় ট্যাকা দিছে?’
জয়নাল ভয়ে ভয়ে বলল, ‘ট্যাকা অ্যাখোনো দ্যায়নি, ভাই। কাম শ্যাষ হলে দিবে।’
‘কয় ট্যাকা দিবে?’
‘একশ ট্যাকা, ভাই।’
‘পোস্টার কতগুলা?’
‘একশডা।’
‘পোস্টারগুলা এদিকে দে। আর তুই বাড়িত চলে যা। খবরদার, কাক্কো কবু না। সোজা বাড়িত চলে যাবু।’

মানি ব্যাগ থেকে দুটি একশ টাকার নোট বের করে তরুণ বলল, ‘এই লে, একশ লয়, দুই শ ট্যাকা।’

জয়নাল কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘না ভাই, অরা মোক্ মারবে।’
‘ভয় নাই। কেউ জানা পাবে না। ধর, ট্যাকা লে। লিয়ে সোজা বাড়িত চলে যা। এই তল্লাটে তোক যান আর না দেখি।’ তরুণটি তার সঙ্গীদের ইঙ্গিত করল, তাদের একজন পোস্টারের গোলাকার বান্ডিলটা তুলে নিয়ে বগলদাবা করল।

জয়নাল কাঁপা কাঁপা ডান হাতটা বাড়িয়ে নোট দুটো খামচে ধরে মুঠির মধ্যে নিয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ করে এমনভাবে দৌড়ে গলির ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো, যেন তাকে কোনো হিংস্র জন্তু তাড়া করছে।

দুপুরের একটু পরে লাল টকটকে ঝুঁটিওয়ালা একটা মোরগ নিয়ে জয়নাল বত্রিশটা দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বাড়িতে ঢুকল।

৬.
এই দরিদ্র অঞ্চলে গরীব ভূমিহীন স্বপ্নহীন ক্ষেতমজুদের বউরা খুব তাড়াতাড়ি পুরোনো ও কুশ্রী হয়ে যায়। তাদের স্বামীরা অচিরেই তাদেরকে গৃহস্থদের বাড়িতে ঝিগিরি করতে পাঠায়, কারণে-অকারণে প্রহার করতে শুরু করে। কিন্তু দুই মাস পেরিয়ে গেছে, জয়নাল তার বউয়ের গায়ে হাত তুলেছে এমন কথা কেউ একদিনও শুনতে পায়নি। আর পরের বাড়িতে কাজ করতে পাঠানো? জয়নাল মনে হয় সেটা জীবনেও করবে না। গ্রামের লোকেরা বলে জয়নাল বিয়ে করে আরো ফূর্তিবাজ হয়েছে। তারা বলে যে জয়নালের মতো বউপাগলা পুরুষ এ গাঁয়ে কখনো জন্মায়নি।

সত্যি। দারিদ্র্য আর উদয়াস্ত হাড়ভাঙা খাটুনির মধ্যেও জয়নালের চোখের সামনের পৃথিবীটা যেন এক ঘোরলাগা রঙিন জগৎ। চাঁদের আলোয় সে দেখতে পায় উঠানের ডালিম গাছে মুক্তা ঝুলে আছে। সকালে চোখ মেলে সে দেখে, এক অদ্ভুত রাঙা আলোয় ভরে আছে সমস্ত পৃথিবী। জীবনের ঘোর তার কিছুতেই কাটে না, তার চারপাশের রঙিন পর্দাটি কিছুতেই সরে না।

৭.
শুক্রবার দুপুরবেলা জুম্মাঘরের সামনের চত্বরে সরকারি টিউবঅয়েলটি ঘিরে এক দঙ্গল ছেলে বুড়া ইচ্চিপিচ্চির ভিড়। গোসল করার ধুম চলছে। দুই-একজন গোসল করছে আর অপেক্ষমাণ অন্যরা নিজেদের পালা না আসা পর্যন্ত বসে বসে গল্প করছে। তাদের কারো কাঁধে, কারো কোমরে গামছা, মাথায় পাগড়ির মতো গোল করে বাঁধা লুঙ্গি। কেউ এসেছে বালতি নিয়ে, কেউ বদনা।

এখন এক সঙ্গে গোসল করছে জয়নাল, আমজাদ আর সলিমুদ্দি। সলিমুদ্দির ছোট্ট ছেলেটা বাপের কোমর চেপে ধরে তার নাভির সঙ্গে গাল পেতে আছে, সলিমুদ্দি বালতিভর্তি পানি ঢালছে নিজের মাথায়—বাপ-বেটার গোসল হয়ে যাচ্ছে এক সঙ্গে। আমজাদ দুই বালতি পানি ইতিমধ্যে নিজের গায়ে ঢেলেছে, এখন বালতি ভরে নিয়ে একটু দুরে এসে গা কচলাচ্ছে। এই ফাঁকে তিন-চারটা শিশু হামলে পড়ল টিউবঅয়েলের হাতলের ওপর। তাদের একজন হাতল ধরে দোল খাচ্ছে আর অন্যগুলি টিউবঅয়েলের মুখের পানির ধারার নিচে বসার যুদ্ধে তুমুল ঠেলাঠেলি করছে। জয়নাল হাতলটা কেড়ে নিয়ে বলে উঠল, ‘এই চ্যাংরাপ্যাংরাগুলার অত্যাচারে আর শান্তিমতন ডুব পারা গেল না বারে। এই, যাও যাও, সরো।’

আমজাদ দুষ্ট শিশুর দলকে বলল, ‘এই পকর যাও, পকর যাও।’

জয়নাল আমজাদকে সমর্থন করে শিশুদের ভর্ৎসনা করতে লাগল, ‘এই উকরি-পুকরির দল, তোরাই কি ভদ্রলোক হছিন নাকি রে? পকর গেলে হয়?’

এক দুষ্ট ছেলে প্রতিবাদে চটাং করে লাফ দিয়ে উঠল : ‘ক্যা, পকর যামো ক্যা? কল থাকতে পকরত্ ডুব দিয়ে চুলকানি-পচারি ধরামো নাকি? তোমরাই পকর যাওয়া পারিন না?’

এত ছোট ছেলের মুখে এমন প্রতিবাদ শুনে জয়নাল হতবাক। সে সলিমুদ্দির দিকে চেয়ে বলল: ‘শুনিছু সলিমদ্দি ভাই, খাতুর ব্যাটা কয় কী শুনিছু?’

খাতু নামক পিতার প্রতিবাদী পুত্রটি একটু দূরে দাঁড়িয়ে আবার জয়নালকে মুখঝামটা মারল: ‘ক্যা? কমো না ক্যা? কল কি তোর বাপের নাকি?’

জয়নাল রেগে গিয়ে চটে গিয়ে ধমক দিয়ে উঠল, ‘খাতুর ব্যাটা, লল্লিত টিপা দিয়ে এক্কিবারে ম্যারে ফালামু।’

খাতুর বেটা আর একটু সরে গিয়ে কোমরে দুহাত রেখে বাহাদুর মরদের মতো জয়নালকে যুদ্ধে আহ্বান করল, ‘আয় দিনি?’

জয়নাল বালতিটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে খাতুর বেটার দিকে ধেয়ে গেল। খাতুর ব্যাটা উল্টা দিকে ঘুরে পিছনের পথটা দেখে নিল, তার পর মুখ ফিরিয়ে জয়নালের দিকে চেয়ে বলল, ‘তোর বউয়ের গোয়া!’ বলেই লাগাল ভোঁ দৌড়। জয়নালের কানদুটোতে ঝাঁ করে আগুন ধরে গেল, তার উপর আমজাদ যখন দাঁত বের করে ‘এক্কিরে জয়নাল, তোর লতুন বউডার মান-ইজ্জত থুলো না’ ইত্যাদি বলতে বলতে উপস্থিত লোকজনদের মুখের দিকে তাকাতে লাগল, তখন ভেজা গায়ে ভেজা লুঙ্গিতে ফটাস ফটাস শব্দ তুলে জয়নাল খাতুর বাড়ির দিকে ছুটে গেল।

খাতুর বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মাটিতে গুঁড়ি মারতে মারতে জয়নাল চিৎকার ছাড়ল, ‘খাতু ভাই, খাতু ভাই, তোর ব্যাটাক্ যদি তুই শাসন না করিস মোর শাসন কিন্তুক সহ্য করা পারবে না।’

খাতু বেরিয়ে এসে জানতে চাইল কী হয়েছে, জয়নালের এমন উত্তেজনার কারণ কী।

কিন্তু জয়নালের মুখ থেকে আর কথা বেরোল না। সে রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘খুব ব্যাদ্দপ হয়া গেছে তোর ব্যাটা।’

খাতু বুঝতে পারল না কী এমন বেয়াদপি করেছে তার ছেলে যার জন্য জয়নালকে গোসল ছেড়ে এমন ভেজা কাপড়ে দৌড়ে তার বাড়ির দরজা পর্যন্ত আসতে হয়েছে। খাতু এবার স্পষ্ট করে জানতে চায়, ‘তা কী করিছে মোর ব্যাটা?’
‘খুব ব্যাদ্দপ হয়া গেছে!’
‘তা কী ব্যাদ্দপি করিছে সিডা কস না ক্যা?’

খাতুর বেটা যে কথা বলে জয়নালের বউয়ের ইজ্জত মেরে দিয়েছে সে কথা জয়নাল নিজমুখে কিভাবে উচ্চারণ করতে পারে? সে একটা দম ফেলে আবার দম নিয়ে রাগে মাটিতে গুঁড়ি মারতে মারতে বাড়ি ফিরে গেল।

৮.
জয়নাল বাড়ি ফিরে দেখতে পেল বউ বিছানায় পড়ে ছটফট করছে। বউয়ের ছটফটানি আর লালচে মুখ দেখে জয়নাল ভয় পেয়ে ছুটে গিয়ে তার কপালে হাত রেখে চিৎকার করে উঠল, ‘ক্যা চাচি, বউয়ের গাও জ্বরে পুড়ে যায়, আর তোর হুশজ্ঞান নাই?’

কিন্তু চাচা-চাচির কোনো সাড়াশব্দ এলো না। চাচা হয়তো জুম্মাঘরে নামাজ পড়তে গেছে, আর চাচি, যে এখন আর তালুকদার বাড়িতে কাজে যায় না, সে যে কোথায় গেছে কে জানে। বউ জ্বরে কাতরাচ্ছে, যন্ত্রণায় ছটফট করছে—এই দৃশ্য দেখে জয়নালের বুকের ভিতরটা যন্ত্রণায় মোচড় খেতে শুরু করল। সে বারবার ‘চাচি হারামজাদিটা গেল কোন্টে’ বলতে বলতে দাঁত কামড়ায়। বউয়ের কপালে হাত রেখে তার মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে ‘বউ, ও বউ, কী হলো তোর’ বলে ঝাঁকায়, সারা ঘর দাপিয়ে বেড়ায়, ঘর থেকে বেরিয়ে চিৎকার ছাড়ে, ‘চাচি, ওই চাচিবুড়ি, গেলু কোন্টে তুই?’

জয়নাল বউয়ের মাথায় পানি ঢালে, তার শিয়রের কাছে বসে থাকে সারারাত। এক চুলও নড়ে না। তার এই অবস্থা দেখে চাচা-চাচি বিরক্ত হয়। চাচি বলে, ‘আহ্লাদের আর শ্যাষ নাই।’ চাচা বলে, ‘জ্বরজারি কি মানষের হয় না?’

জয়নাল তাদের কোনো কথাই মানে না। সে সারাঘর শুধু পায়চারি করে আর ফিরে ফিরে এসে বউয়ের মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে বলে, ‘কী হলো! ও বউ, তোর কী হলো!’

শেষ রাতে বউ বলল, ‘তুমি নিন যাও। কাল সকালেই হামার জ্বর ভালো হয়া যাবে।’

জয়নাল অবুঝ বালকের মতো উদগ্রীব হয়ে বলল, ‘সত্যিই ভালো হয়া যাবে তো?’
‘হয়, তুমি নিন যাও।’

বউ এমন নিশ্চিত সুরে কথাটা বলল যে জয়নালের স্বস্তি বোধ হলো। সে বউয়ের পাশে আস্তে করে শুয়ে পড়ল, তার কপালে স্নেহভরা হাত রেখে বলল, ‘ভাল হয়া যাবু। কাল সকালেই আল্লা তোক ভাল করে দিবে, দেখিস।’

বউ লক্ষ্মী মেয়ের মতো বলল, ‘আচ্ছা।’

জয়নাল আবার কাল সন্ধ্যায় সুস্থ বউকে নিয়ে খালের পাড়ে বসে জোনাকি জ্বলা দেখবে, তার সঙ্গে মজার মজার সব গল্প করবে—এইসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল।

কিন্তু সকালে ঘুম ভাঙার পরে সে দেখতে পেল বউ আবার যন্ত্রণায় ছটফট করছে। তার ফর্সা মুখটা পুড়ে তামাটে হয়ে গেছে। কপালে হাত রেখে সে টের পেল, প্রচণ্ড জ্বরে গা সত্যিই পুড়ে যাচ্ছে। জয়নাল চৌকিতে মাথা ঠুকতে লাগল: ‘ও বউ, কী হলো তোর! ও আল্লা, কী পাপ করনু মুই, মাপ কোরে দে।’

চাচি বলল, ‘কপালত জলপট্টি দেওয়া লাগবে।’

জয়নাল চিৎকার করে উঠল, ‘দেওয়া লাগবে তে আগে কসনি ক্যা?’ তার পর সে গামলা ভরে পানি এনে গামছা ভিজিয়ে বউয়ের কপালে চেপে ধরে বিড়বিড় করে আল্লাহকে ডাকতে লাগল: ‘ও আল্লা, মাপ করে দে। মাপ কার দে মাবুদ। দরগাতলিত্ শিন্নি দিমু, মাপ কেরে দে। মোর বউক্ ভাল কোরে দে।’ তার পর সে তার বউকে ধরে ঝাঁকায় আর বলে, ‘ও বউ, আল্লা আল্লা কর, আল্লা আল্লা কর।

বউ কাতরায়, মাকে ডাকে, আল্লাকে ডাকে। জয়নাল বলে, ‘হয় হয়, বেশি করে আল্লা আল্লা কর। ভাল হয়া যাবু, আল্লামাবুদ তোক্ ভাল কোরে দিবে। আল্লা, রহম করিস মাবুদ!’

৯.
দুপুরের দিকে জ্বর একটু পড়ে এলো। বউ ইশারায় জয়নালকে ডাকল। জয়নাল কাছে গিয়ে ঝুঁকে পড়ে বউয়ের মুখের দিকে চেয়ে বলল, ‘কী কস, বউ?’ বউ নিস্তেজ কণ্ঠে বলল, ‘ট্যাংরা মাছ দিয়ে চারটা ভাত খাবার মন চায়।’

জয়নাল লাফ দিয়ে উঠে তৌরা জালটা কাঁধে নিয়ে বাড়ি থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল। যেতে যেতে মনে মনে বলল, দুনিয়ার ব্যাবাক ট্যাংরা মাছ আজ ধরে লিয়ে আসমু।
জয়নাল ঝপাৎ শব্দে খালের পানিতে জাল ছুড়ে দিল, দিয়ে হাঁপাতে থাকল, কোমর হেলিয়ে সামনে ঝুঁকে দুই হাঁটুতে দুহাতে ভর দিয়ে দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বড় বড় চোখে খালের পানির দিকে চেয়ে রইল। খালের পানি কাঁপতে কাঁপতে স্থির হয়ে এলো। এবার সে জাল টানতে শুরু করল।

জালে মাছ উঠল না। শামুক ঝিনুক গুগলি ব্যাঙ কাঁকড়া রাজ্যের আবর্জনা উঠে এলো। জয়নাল জাল ঝেড়ে আবর্জনা পরিষ্কার করে আবার ছুড়ে দিল। আবার টেনে তুলল। মাছ উঠল না। আবার জাল ঝাড়ল, আবার ছুড়ে দিল, আবার টেনে তুলল। কিন্তু নিষ্ফল। এই নিষ্ফলতার চক্রে ঘুরপাক খেতে খেতে জয়নাল বিড়বিড় করে বলল, ‘মাছ গ্যালো কোন্টে? কোন্টে গ্যালো দুনিয়ার ব্যাবাক মাছ?’

ভেজা জালটা কাঁধে নিয়ে এবার সে খালের পাড় ধরে হাঁটতে শুরু করল। তার মনে হলো, খালটা বাড়ির এত কাছে বলেই কোনো মাছ নাই, লোকজন সব মাছ ধরে খেয়ে ফেলেছে। দূরে গেলে নিশ্চয়ই কিছু মাছ পাওয়া যাবে। দূরে গিয়ে সে জাল ফেলল। কিন্তু দূরেও মাছ নাই। সে বেকুব বনে গেল। জাল রেখে মালকোঁচা বেঁধে খালের পানিতে নেমে পড়ল। জালেই যেখানে মাছ আটকা পড়ছে না, সেখানে সে শুধু দুই হাত দিয়ে মাছ ধরতে চায়। সে খালের তলার কাদামাটি হাড়তে বেড়াল। হাতে শামুক ঠেকল, কাঁকড়ার সুচালো ঠ্যাং ফুটে গেল।

‘ঘটনা কী? কোন্টে গ্যালো দুনিয়ার ব্যাবাক মাছ?’

জয়নালের মনে হলো, সে এক অলীক জগতে ঢুকে পড়েছে, এখানে যা-কিছু ঘটছে তার কিছুই সত্য নয়। দুনিয়ার সব মাছ উধাও হয়ে গেছে এটা হতে পারে না, তার সারা জিন্দেগিতে কখনো এরকম হয়নি।

সে শূন্য হাতে খালের পাড়ে উঠে দাঁড়াল। মালকোঁচা খুলে লুঙ্গি চিপে পানি নিংড়াতে নিংড়াতে ভাবল, এখন খালি হাতে ক্যাংকা করে বাড়িত ফিরে যাই? আহারে, বউডা মোর ট্যাংরা মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খাবা চায়। সে হঠাৎ চিৎকার উঠল: ‘ও ট্যাংরা মাছের গ্যাতিগুষ্টি, কোন্টে গেলিন তোমরা সকলে? ইংকা নিমকহারামি কোরো না হামার সাথে।’

খালপাড়ের সড়ক ধরে কাঁধে লাঠি জাল খালুই নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে খয়বর জেলে।

জয়নাল হাঁক ছেড়ে ডেকে উঠল, ‘খয়বর ভাই, কোন্টে যাস? মাছ মারবা?’

খয়বর সাড়া দিল না। মাথা নিচু করে আপন মনে দুলকি চালে হেঁটে চলল।

জয়নাল বলে উঠল, ‘মাছ ত নাই। উধাও হয়া গেছে শুয়োরের বাচ্চারা।’
‘মাছ ধরবা জানা লাগে।’ ফুটানি প্রকাশের সুরে বলল খয়বর জেলে। নিজের পথে নাচতে নাচতে হেঁটে চলল হাটের পথে।

জয়নাল দৌড়ে তার দিকে যেতে যেতে বলল, ‘থাম থাম! মিচ্চি অ্যানা থাম রে ভাই।’

খয়বর একটুও থামল না।

তার পিছু পিছু যেতে যেতে জয়নাল বলল, ‘তালে তোর খলইত্ মাছ আছে?’

খয়বর বলল, ‘মাছার খলইত মাছ থাকবে না তে কার কাছে থাকবে?’
‘এনা থাম রে, ভাই।’
‘ক্যা?’
‘মুই মাছ কিনমু।’
‘মৎস্য বেন্নাগেরে খাদ্য লয়।’ খয়বর একই তালে এগিয়ে চলল।

এবার জয়নাল চিৎকার করে উঠল, ‘থাম কনু, থামেক!’

খয়বর থমকে দাঁড়াল। সে অবাক।

জয়নাল বলল, ‘কয় ট্যাকার মাছ আছে তোর খলইত্?’
‘ক্যা? তোর আবার ট্যাকার গরম হলো কোন্টে থিনি?’
‘বেশি কতা কস না। খলই নামা।’
‘লে দ্যাখ। দেখেই হাউস মিটা। কিনার মুরাদ হোবে না।’

জয়নাল দেখল, তেলাপিয়া, সিলভার কার্প, কই, পুঁটি এবং বড় বড় ট্যাংরায় খয়বরের খলুইটি রীতিমতো ধনী।

‘ট্যাংরা কত্টি আছে?’ জয়নাল জানতে চাইল।
‘স্যারখানেক হোবে, ক্যা?’
‘দাম কত?’
‘ক্যা? কিনবু নাকি?’
‘দাম কত তাই ক।’
‘আশি ট্যাকা।’

জয়নাল তার জালটা দেখিয়ে বলল, ‘মোর এই জালের দাম কটিৎ হোবে?’
‘ক্যা?’
‘আগে ক কত হোবে? লতুন জাল।’
‘শত্খানেক হবার পারে।’
‘গুলতানি মারিস না। খালি সুতার দামই আছে দ্যাড়শ ট্যাকা! তার উপর আছে কাঁটির দাম, আছে বুনানির খরচ।’
‘এই হিসাব দিয়ে মুই কী করমু?’
‘মোর এই জালডা তুই লিয়ে লে। আর ট্যাংরা মাছ যতগুলা আছে ঢাল মোর খলইত্। পনচাশ ট্যাকা পরে ফেরত দেস।’
‘না, জাল মুই নিমু না। মোর জাল আছে।’
‘ঠিক আছে লে, ট্যাকা ফেরত দেওয়া লাগবে না। লে লে, তাড়াতাড়ি কর।’

খয়বর জেলে বেছে বেছে শুধু ট্যাংরা মাছগুলো নিজের খলুই থেকে জয়নালের খলুইতে পার করে দিল। তার পর জয়নালের জালটা নিজের লাঠির এক মাথায় বেঁধে নিয়ে নিজের খালুইটি অন্য মাথায় নিজের জালের পাশে ঝুলিয়ে লাঠিটা কাঁধে ফেলে নাচতে নাচতে চলে গেল হাটের পথে।

জয়নাল ট্যাংরা মাছসুদ্ধ ছোট্ট খালুইটা হাতে নিয়ে বাড়ির দিকে দৌড়াতে শুরু করল। ইতোমধ্যে বেলা পড়ে গেছে, জয়নালের মনটা ছট ফট করে উঠল : ‘আহারে, বউটার বুঝি কত খিদা লাগিছে!’

১০.
জয়নাল দূর থেকে দেখতে পেল তাদের বাড়ির সামনে লোকজনের ভিড়। সে একটু থেমে দাঁড়াল, তার পর আবার হাঁটতে থাকল। বাড়ির দরজার কাছে পৌঁছলে লোকজন সরে গিয়ে তাকে পথ করে দিল। কিন্তু কারো মুখে কোনো কথা নাই। ভিড়ের পেছনের দিকে দুয়েকজন চাপা স্বরে ফিস ফিস করে কিছু বলল।

জয়নাল বাড়ির ভিতরে ঢুকে দেখতে পেল, উঠানের মাঝখানে খা খা রোদে একটা চৌকি পাতা হয়েছে। চৌকির উপর একটা লাশ, মাথা থেকে পা পর্যন্ত ময়লা কাঁথায় ঢাকা। চৌকির এক কোণে থুতনি রেখে চুপ করে আছে চাচি। কাঁদছে না, ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে।

জয়নাল হাতের খলুইটা মাটিতে রেখে আঙিনা থেকে সামান্য উঁচু মাটির বারান্দার কিনারে বসল। দুই হাঁটুতে কনুই ঠেস দিয়ে গলাটা লম্বা করে ছেড়ে দিল, তার মাথাটা ঝুলে পড়ল। লোকজন গোল হয়ে ঘিরে ধরল তাকে, কিন্তু কেউ কোনো কথা বলল না। তাদের কারো কারো মনে হলো, জয়নাল এক্ষুনি ডুকরে কেঁদে উঠবে, তার কান্নার শব্দে আসমানটা ফালা ফালা হয়ে যাবে।

কিন্তু জয়নাল কাঁদল না, চোখ বন্ধ করে বসে রইল। তার মাথাটা দুই বাহুর মাঝখানের ফাঁকে ঝুলে রইল।

চাচা কাছে এসে বলে, ‘কী জয়নাল, বসে থাকলু ক্যান, বাপ? দাফন-কাফনের জোগাড়পাতি করা লাগে ত!’

জয়নাল মাথা তুলল না। চুপচাপ ঝিম মেরে বসেই রইল।

চাচা তাড়া দিল, ‘ওঠ্ বাপ, মউতা বেশিক্ষণ থোওয়া ঠিক লয়, আজাব হয়।’

জয়নাল এবার মাথা তুলল। সবাই তার মুখের দিকে উৎসুক চোখে তাকাল। তারা দেখতে পেল: কিছু হয় নাই জয়নালের। মরদ শক্ত আছে!

বাঁশ কেটে খাটিয়া বানানো হলো, মউতাকে গোসল করানো হলো, গোলাপজল ছিটানো হলো, ধূপকাঠি জ্বালানো হলো, খুব তাড়াতাড়ি সব বন্দোবস্ত হয়ে গেল। মধুপুরের কোথাও কোনো বিকার দেখা গেল না। জয়নালের বউয়ের মরে যাওয়া কারো কান্নার উদ্রেক করল না: মেয়েটি এখনো এ গাঁয়ে নতুন। শুধু জয়নালের চাচির বুঝি মেয়েটির জন্যে মায়া পড়ে গিয়েছিল, শুধু সে বুড়িই মাঝেমাঝে নাকি স্বরে কেঁদে উঠছে। শুধু তখনই মনে হচ্ছে যে বাড়িটা একটা মরাবাড়ি।

খাটিয়া গোরস্থানের পথে রওয়ানা দেওয়ার আগমুহূর্তে দোস্ত ইদ্রিস জয়নালকে বলল, ‘জয়লাল, দোস্ত, বউয়ের মুখটা একবার দেখবু না?’

জয়নাল অবশেষে মুখ খুলল: ‘মুখ দেখে আর কী হোবে? এমন বেয়াক্কালা মেয়ামানুষ আর দুনিয়াত নাই। মরেই যদি যাবু, তালে কলু ক্যান যাও মাছ ধরে আনো! ক্যান কলু না কাছে থাকো!’

বউকে কবরে রেখে এসে জয়নাল আবার বারান্দার কিনারে বসে ঘাড় শিথিল করে মাথাটা ঝুলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করল। তার পর ঝপ করে রাত নেমে এলো। পাড়াপ্রতিবেশীরা একে একে চলে যেতে লাগল, যাওয়ার সময় নিজেদের মধ্যে বলাবলি করল :
‘হামাগেরে জয়নাল শক্ত মরদ আছে।’
‘আরে বাপু, বউ মরা কোনো ব্যাপার হলো? এক বউ মলে দশটা বউ পাওয়া যায়।’
‘হয় হয়, দ্যাশ জুড়ে কত মেয়া, আর হামাগেরে জয়নাল যে তাগড়া জুয়ান, আজই হয় করলে কালই কত মেয়ার বাপ ঘড়ি সাইকেল ট্যান্ডিস্টার লিয়ে দৌড়ে আসপে...!’

অনেকক্ষণ পর জয়নাল মাথা তুলে বিড় বিড় করে বলল, ‘মরেই যদি যাবু, তালে মোক্ মাছ ধরবা পাঠালু ক্যান? ক্যান কলু না কাছে থাকো?’

গলির মোড়ে কুকুর কেঁদে উঠল। দূরে শিয়ালের ঝাঁক হুক্কাহুয়া শুরু করল। বাঁশঝাড়ে একটা পেঁচা ডেকে উঠল।

চাচি জয়নালকে ভাত খেতে ডাকল। জয়নাল আবার মাথা ঝুলিয়ে অন্ধকার মাটির দিকে চেয়ে বলল, ‘খিদা নাই।’

অনেকক্ষণ সে নীরব অন্ধকারে একা একা বসে রইল। তার পর কোমরে হাত দিয়ে উঠে দাঁড়াল, আকাশের দিকে তাকাল। চাঁদ নাই, একটা তারা পর্যন্ত নাই। আকাশ ভাতরাঁধা মাটির পাতিলের তলার মতো কালো। কোথাও কোনো আলো নাই।

জয়নাল নিজের ঘরে গেল। দরজায় খিল না এঁটেই শুয়ে পড়ল।

জয়নাল ঘুমিয়ে পড়ল। আর জাগল না। সে আর কোনো দিন জেগে ওঠেনি।

আসছে ভাওয়াল বীরের ‘জীবনালেখ্য’, লিখলেন ইজাজ মিলন



রাহাত রাব্বানী
আসছে ভাওয়াল বীরের ‘জীবনালেখ্য’, লিখলেন ইজাজ মিলন

আসছে ভাওয়াল বীরের ‘জীবনালেখ্য’, লিখলেন ইজাজ মিলন

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের রাজনীতির এক কিংবদন্তী হয়ে উঠে ছিলেন আহসান উল্লাহ মাস্টার। গ্রাম থেকে উঠে আসা লড়াকু এই স্কুল শিক্ষক মানুষকে ভালোবাসা দিতে এসেছিলেন,মানুষের ভালোবাসা পেতে এসেছিলেন। হৃদয় উজাড় করা ভালোবাসা বিলিয়ে মানুষের পরিপূর্ণ ভালোবাসা পেয়ে মাত্র ৫৪ বছর বয়সে ঘাতকের বুলেটে নিভে যায় তার জীবন প্রদীপ। সুফী সাধক বাবার ঘরে জন্ম নেওয়া আহসান উল্লাহ মাস্টারের চলার পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। কাঁটা বিছানো সেই পথে হেঁটে হেঁটে সফলতার চূড়ান্ত বিন্দু স্পর্শ করেছিলেন।

শিক্ষকতা পেশার নিয়োজিত ভাওয়াল বীর খ্যাত আহসান উল্লাহ মাস্টার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান থেকে মানুষের ভালোবাসাকে পূঁজি করে দুই বার সংসদ সদস্য হয়েছেন। সংসদ সদস্য থাকাকালেই ঘাতকরা তাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। জাতির পিতার আদর্শ বুকে ধারণ করে ৬৬ এর ৬ দফা , ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০ নির্বাচনে ভূমিকা রাখা, ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণসহ বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি আন্দোলনেই সরাসরি অংশ নিয়েছেন তিনি। বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়। বঙ্গবন্ধুর আশীর্বাদ পাওয়া আহসান উল্লাহ মাস্টার শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় আজীবন আন্দোলন করেছেন, তাদের পক্ষে কথা বলেছেন। মাদকের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছিলেন সেই ৯০ এর দশকের গোড়ার দিকেই। তুমুল জনপ্রিয় এক নেতৃত্বে পরিণত হন তিনি। জাতির পিতার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু ঘাতকরা সেটা সহ্য করতে পারেনি। মাটি ও মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন সারা জীবন। টঙ্গীর হায়দারাবাদ গ্রামে জন্ম নেওয় আহসান উল্লাহ মাস্টারের জনপ্রিয়তাই কাল হয়ে দাঁড়ায়। আহসান উল্লাহ মাস্টারের দেখা স্বপ্ন পূরণে কাজ করছেন তারই পুত্র যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল। টানা ৪ বারের সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল বাবার মতোই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারণ করে জাতির পিতার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশিত পথেই হেঁটে চলছেন।

রাজনীতির মাঠে আহসান উল্লাহ পাথর ঘঁষে আগুন জ্বলানো এক রাজনীতিক। তার আলোয় আলোকিত হয়েছিল গাজীপুর। কিন্তু কেমন ছিল আপদমস্তক এ রাজনীতিকের জীবন, গ্রাম থেকে উঠে এসে কীভাবে জাতীয় রাজনীতিতে জায়গা করে নিয়েছিলেন, তার জন্ম শৈশব কৈশোর, যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে আসা- এমন নানা অজানা অধ্যায় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক ইজাজ আহমেদ মিলন লিখেছেন ‘আহসান উল্লাহ মাস্টার: জীবনালেখ্য’। গ্রন্থের পা-ুলিপি পড়ার সুযোগ হয়েছে আমার। পাণ্ডুলিপি পড়ে আমার মনে হয়েছে এ যেন বাংলাদেশেরই জীবনালেখ্য। তরুণ প্রজন্মের কাছে আহসান উল্লাহ মাস্টার এক আদর্শের নাম। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকের এই বইটা পড়া উচিৎ। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে আগ্রহী করে তুলবে বইটি।

দীর্ঘদিন গবেষণা করে সাহিত্যিক ও সাংবাদিক ইজাজ আহমেদ মিলন রচনা করেছেন ‘জীবনালেখ্য’। অন্যপ্রকাশ থেকে বইটি বেরোচ্ছে খুব শিগগিরই। চমৎকার প্রচ্ছদ করেছেন চারু পিন্টু।

;

ধারাবাহিক উপন্যাস ‘রংধনু’-৩



মাহফুজ পারভেজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

[তৃতীয় কিস্তি]

ম্যারির গোপন কষ্ট অনুভব করলেও আবেগাক্রান্ত হন না মিসেস অ্যানি। তার মতামত ও মনোভাব অন্যরকম এবং বহুলাংশে বাস্তবসম্মত। বহু মায়ের মতো তিনিও বিশ্বাস করেন, আবার নতুন সংসার শুরু করলে ম্যারির একাকীত্বের কষ্ট ও অন্যান্য সমস্যার সুরাহা হয়ে যাবে। সে লক্ষ্যে তিনি তার চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। অন্যদিকে, তাকে ঘিরে মায়ের এসব তৎপরতার কারণে ম্যারি সারাক্ষণ তটস্থ থাকেন। অবশেষে মায়ের আতিশয্য ও উৎসাহী প্রেমিকবৃন্দের উপদ্রব থেকে বাঁচতে তিনি বাড়িতে কম সময় কাটানোর পথ খুঁজতে থাকেন। টমাস দিনে দিনে বড় হচ্ছে। একা একাই সে তার কাজকর্ম করতে পারে। এদিকে তার স্কুলিং শুরু হয়ে গেছে। ম্যারি ভাবলেন, যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়। বাড়িতে মায়ের একতরফা কথা শোনা আর উৎসাহী প্রেমিকদের আনুষ্ঠানিক ও আতঙ্কজনক আগমনের জন্য ক্লান্তিকর অপেক্ষায় দিন কাটানোর কোনো মানে হয় না। তার যতটুকু পড়াশোনা, তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোটখাট চাকরি জুটে যাওয়ার কথা। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনি প্রাক্তনী এবং তার সাবেক স্বামী এখানে অধ্যাপনা করেছেন। নিজের পরিবারের মতোই বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক। ফলে অল্প-বিস্তর খোঁজ-খবর করতেই বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে অনায়াসে চাকরি হয়ে গেলো ম্যারির। ম্যারি আপাতত হাফ ছেড়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেওয়ার ফুসরত পেলেন।

দিনের বেশির ভাগ অংশ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে লাইব্রেরির কাজে কাটিয়ে পড়ন্ত বিকেলে ক্লান্ত ম্যারি বাড়ি ফিরলে মিসেস অ্যানি ম্যার্গারেট কথাবার্তা বলার সাহস পান না। তার পরিশ্রান্ত মেয়ের দিকে তাকিয়ে কথাবার্তা বলার ভাবনায় ইতি টানেন। এদিকে, লাইব্রেরির কাজে যোগ দিয়ে এক অতলান্ত জগতের দেখা পেয়েছেন ম্যারি। কাজের ফাঁকে ফাঁকে পড়ছেন অসাধারণ নানা বই। বাস্তব জগতের কষ্ট-বেদনা থেকে তিনি যেন মুক্তির স্বাদ পান বইয়ের প্রশান্ত পাতায়। লাইব্রেরিয়ান মিসেস ন্যান্সি অনেক আগে থেকেই ম্যারিকে চেনেন। তার ব্যক্তিগত জীবনের ভাঙাগড়াও মিসেস ন্যান্সির অজানা নয়। তিনি নিজে আগ্রহী হয়ে ম্যারিকে চমৎকার সব বই পড়ার জন্য বেছে দেন। কিছু অর্ধ-পঠিত বই ম্যারি সঙ্গে করে বাসায় নিয়ে আসেন। বিশ্রাম ও নিজের কিছু কাজকর্ম করার পর সেগুলো নিয়ে বিছানায় যান তিনি। ক্রমশ তার যাপনের আটপৌরে রুটিনে বড় ধরনের রূপান্তর ঘটে। তিনি আর বই একাকার হতে থাকে দিনে দিনে। ম্যারির এমন রুটিন ভেদ করে মা কথা বলার সুযোগ পান খুবই কম। এমন পরিস্থিতি ম্যারির জন্য কম স্বস্তির বিষয় নয়।

ফলে আজকাল মিসেস অ্যানি মার্গারেট ডিনারের সময়টাতেই শুধু ম্যারির সঙ্গে আলাপের সুযোগ নিতে পারেন। তারও কাজ কম নয়। দৌড়াদৌড়িতে তার দিন শুরু হয় মেয়ে লাইব্রেরি ও নাতীর স্কুলে যাবার তাড়ার মধ্যে। তখন দম ফেলার মতো অবস্থায় থাকে না কেউই। বাকী দিন সবাই থাকে সবার কাজে ব্যস্ত। অতএব রাতের খাবারের সময়ই কিছুটা আলাপের অবসর মেলে। তখন টুকটাক কথার বেশি কিছু বলাও সম্ভব হয় না। দিনে দিনে মিসেস অ্যানি মার্গারেটের বকবকানি অনেকটাই হ্রাস পেতে থাকে। পরিস্থিতির পরিবর্তনে মনে মনে খুশি হন ম্যারি।    

কিন্তু রাত নামতেই ম্যারির নিজের মধ্যে দ্বিধা এসে ভর করে। তার মন-প্রাণ চলে যায় অন্ধকারের কালো চাদরে আচ্ছাদিত বাগানে। তিনি নিশ্চিত হতে পারেন না যে, বাগানের পাইন গাছটি তাকে টানে, নাকি তিনি নিজেই কাছে টেনে নেন পাইনকে? নাকি ক্যাভিনের স্মৃতি, যা আচ্ছন্ন হয়ে আছে পাইনের চারপাশে, তা গাছটির সঙ্গে মিলেমিশে তাকে অলক্ষ্যে ডাকে মধ্যরাতের নিশুতি প্রহরে? ম্যারি এসব প্রশ্নের মীমাংসা করতে পারেন না। তার দ্বিধা ও সংশয় বাড়তে থাকে। তথাপি তন্দ্রাচ্ছন্ন, ভূতে পাওয়া মানুষের মতো রাতের কালচে অন্ধকারে, বেগুনী, নীলাভ ফুলকির মাঝ দিয়ে তিনি প্রতিরাতে চলে আসেন বাগানে, পাইনের নৈকট্যে। 

পাইনের কাছে এলে তার শরীর ও মনে অবাক কাণ্ড ঘটে। তিনি নিবিড়ভাবে টের পান স্মৃতির অমোচনীয় স্পর্শ। আগুন দেখে পতঙ্গের ছুটে যাওয়ার মতো তিনি যেন অজানা টানে অন্ধকার বাগানে পাইন গাছের তলে চলে আসেন নিজেরই স্মৃতিকুণ্ডলীতে। তখন নিজের উপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তিনি অতীতের লেলিহান শিখায় অনুভব করেন স্মৃতির দুর্দমনীয় দাপট। তার মনে পড়তে থাকে পাইনের তলে ক্যাভিনের সঙ্গে অতিক্রান্ত অসংখ্য দিবস ও রজনীর টুকরো টুকরো কথা ও অভিজ্ঞান। 

ক্যাভিনের সঙ্গে ম্যারি যখন প্রথম এই বাড়িতে আসেন, তখন প্রায়-জংলার মতো আগাছায় ভরা ছিল পুরো বাগান। অবহেলায় বাড়ন্ত শিশু পাইন গাছটি ছিল ঝোপের আড়ালে। বেশ কয়েক দিন কঠোর পরিশ্রম করে ক্যাভিন বাগানের চেহারা পাল্টে দেন। আগাছার কবল থেকে উদ্ধার করেন পাইন গাছটিকে। গাছের চারপাশটা সুন্দর করে গুছিয়ে বসার চমৎকার পরিবেশ তৈরি করে ফেলেন ক্যাভিন। বইপড়া, চা-খাওয়া, ম্যারির সঙ্গের গল্পের সময়গুলো তিনি কাটাতে থাকেন পাইনের তলে। সবসময় ক্যাভিনের একটি সতর্ক নজর থাকে পাইন গাছটির দিকে। গাছটির কখন কি প্রয়োজন, তা নিয়ে ক্যাভিনের আগ্রহের অন্ত নেই।

ম্যারি খেয়াল করেন পাইন নিয়ে ক্যালিনের ব্যস্ততা ও আগ্রহের বিষয়টি। একদিন তিনি সরাসরি জানতে চান,

‘পাইন গাছটিকে এতো ভালোবাসো তুমি? পাইন কি তোমার প্রিয় বৃক্ষ?’

‘না। আমার প্রিয় বৃক্ষ ঝাঁকড়া মাথার জলপাই। আমার পূর্বপুরুষ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে এসেছিল। জলপাই তাদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। এই পাইনকে ভালোবাসি অন্য কারণে।’

‘কি সেই কারণ?’

‘কারণ, এই পাইন আমাদের প্রথম সন্তানের মতো। তোমার, আমার নতুন জীবনে, এই নতুন বাসগৃহে প্রথম আমরা যাকে পেয়েছি, তা এই পাইন গাছ।’

ক্যাভিনের উত্তরে দারুণ চমকে উঠেন ম্যারি। তার ভেতর মাতৃত্বের প্রবল ঢেউ আলোড়ন জাগায়। তিনি গভীর মমতায় শিশু থেকে তারুণ্যের পথে বর্ধিষ্ণু পাইনের দিকে মগ্ন চোখে তাকিয়ে থাকেন। বেশ অনেকক্ষণ পর ক্যাভিনের কথায় ম্যারির ধ্যান ভাঙে।

‘জানো তো, মা-বাবার নিবিড় সান্নিধ্যে থাকলে সন্তানের বিকাশ ভালো হয়। তাদের শৈশব, কৈশোর, বেড়ে ওঠা, সবকিছু চাপমুক্ত হয়। আমরাও যত বেশি পাইনের কাছে থাকবো, ততদ্রুত গাছটিও সাহসী মানুষের মতো সুস্থ ও সবলভাবে বড় হবে।’

এইসব স্মৃতি ও কথোপকথন প্রবলভাবে মনে পড়ে পাইনের কাছে এলে। ম্যারির কষ্টগুলোও বুনো বাতাসের  মতো হু হু করে বাড়তে থাকে। পাইনের সমান্তরালে নিজের সন্তান টমাসের অবয়ব ভাসে চোখে। পিছনের দৃশ্যপটে ক্যাভিনের উপস্থিতি। ম্যারি ভীষণ অবাক হন। যে পিতা একটি অনাথ ও অবহেলিত পাইন গাছকে পিতৃত্ব-মাতৃত্ব দিয়ে লালন করার স্বপ্ন দেখতো, দিন-রাতের অধিকাংশ সময় পাইনের আশেপাশে থাকতো, সে কি করে ঔরসজাত সন্তানের কাছ থেকে স্বেচ্ছায় দূরে চলে গেলো! এই প্রশ্নের উত্তর তিনি অনেক ভেবেও খুঁজে পান না।

ম্যারি নানাভাবে বুঝতে চেষ্টা করেন, 'আকর্ষণ' কত দূর অবধি গেলে শুধুই 'আকর্ষণ' থাকে, আবার কত দূর চলে গেলে 'অবসেশনে' পরিণত হয়? 'অবসেশন’ ও 'আকর্ষণ'-এর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ঠিক ঠিক জানতে না পারলেও মানুষ আকর্ষণ, বিকর্ষণ, অবসেশন নিয়েই বেঁচে থাকে। কখনো কোনো মানুষের কাছে আসে, কখনো দূরে যায়। মানুষের একা কিংবা যৌথ জীবনে এক রহস্যময় ত্রিভুজের মতো আকর্ষণ, বিকর্ষণ, অবসেশন ঘিরে থাকে।

এক সময় বাগান থেকে ঘরে ফিরে আসেন ম্যারি। বিছানায় শুয়ে টের পান তার মাথায় আগ্নেয়গিরির লাভাস্রোতের মতো বইছে প্রশ্নের স্রোত। তার আর ঘুম আসে না। সাইড টেবিল থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখেন সকাল হতে অনেক বাকী। তিনি ফোনের মিউজিক অপশনে গিয়ে একটি গান বেছে নেন। তাদের ক্যাম্পাসে পড়তে আসা পল্লবী নামের এক দক্ষিণ এশীয় তরুণী গানটি তাকে প্রেজেন্ট করেছে। গানের কথাগুলো বাংলায় হলেও সুর তাকে আচ্ছন্ন করে প্রবলভাবে। কখনো সুযোগ হলে গানটি তিনি ইংরেজিতে তর্জমা করার ইচ্ছা রাখেন। তিনি গানটি চালু করে চোখ বন্ধ করেন। কিন্তু তার হৃদয় যেন গানের কথাগুলোর সঙ্গে যৌথতায় গাইছে:

'যদি আর কারে ভালবাসো

যদি আর ফিরে নাহি আসো

তবে তুমি যাহা চাও তাই যেন পাও

আমি যত দুঃখ পাই গো।'

[পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার]

আরও পড়ুন: ধারাবাহিক উপন্যাস ‘রংধনু’-২

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১

;

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;