ভাদ্রপদী



মাহমুদ মেনন
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

এমন ঠ্যালা দরজা নাটক সিনেমায় অনেকবার দেখেছে সে। থানার ভিতরে ধর্ষণের দৃশ্যেই বেশি দেখেছে। থানার বড়কর্তা ধরে আনা মেয়েটিকে নিয়ে ভেতরে যান। এর কিছুক্ষণ পর দরজাটি ঠেলে শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে বাইরে বের হয়ে আসেন। তখন তার চোখে মুখে থাকে লালসা মেটানোর অভিব্যক্তি। এরকম দরজার কপাটদুটো একটার সাথে অন্যটা লটকে যায় না। ধাক্কায় ক্যাচ শব্দে খোলে বটে, কিন্তু পরক্ষণেই দুটি কপাট নিজে নিজেই একটা অন্যটার সমান হয়ে থেমে থাকে। ওপাশটাকে আড়াল করে দেয়। তেমনই আড়াল করা ওপাশটা সামনে রেখে বসে আছে ভাদু।

সাহেদ তাকে নিয়ে এসেছে এখানে। লিফট থেকে নেমে লম্বা একটা করিডোর। সাহেদের বাহুবন্দি সে। একটি ভারী পাল্লার দরজার সামনে থামে তারা। পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে দরজায় কার্ড পাঞ্চ করে সাহেদ। ভেতরে ঢুকেই একটি বড় কামরা। যার চারিদিকটা ঘিরে ভারী সোফা বসানো। সোফার বটলগ্রিন রঙটা চোখ জুড়িয়ে দেয়। তারই একটিতে তাকে বসিয়ে সাহেদ বললো,‘দু-দণ্ড বসো। আমি জাস্ট একটা কাজ সেরে ফিরছি।’ বলেই ঠ্যালা দরজাটি ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেল। খানিকটা ঝাপটা-ঝাপটি করে তার সামনে ওপাশটাকে আড়াল করে থেমে থাকল দুটি কপাট।

দু-দণ্ড বলে সাহেদ এরই মধ্যে ঠিক ৪১ মিনিট কাটিয়ে দিয়েছে। তার ফেরার নাম নেই। এই সময়ে দরজাটি ঠেলে আরো একজন ভেতরে ঢুকেছে, দুই জন বের হয়ে গেছে। এদের সকলেরই পরিপাটি সাজ। ভেতরে যে লোকটি গেল তার চেহারাটি খেয়াল করতে পারেনি, তবে পেছন থেকে দেখে বেশভুশায় চোস্ত মনে হলো। দরজা ঠেলে ওপাশে ঢুকে যখন যাচ্ছিলেন, তখনই চোখে পড়ল শার্টের ওপর সাসপেন্ডার পরেছে লোকটি। তবে এদের কাউকে নিয়ে আজ ভাবতে চায় না সে। বরং ঘুরেফিরে দরজাটিই তার ভাবনার কেন্দ্রে এসে ঠেকছে। আচ্ছা, এমন দরজার নাম কী? এই দরজাও ঠেললে খোলে। তবে অন্য দরজাগুলো থেকে আলাদা। অন্য দরজা খোলার পর আবার ঠেলে কিংবা চাপ দিয়ে লাগাতে হয়। এই দরজাটিতে তা লাগে না। কী একটা ব্যাপার—দু হাতের ধাক্কায় খুলে ফেলো। ঢুকে পড়ো। আর লাগানোর বালাই নেই। স্প্রিংয়ের কব্জাই টেনে নিয়ে যাবে। বার কয়েক এদিক ওদিক করে দুটি কপাট থেমে যাবে নিজে নিজে। এরপর অন্য কেউ এসে একইরকম ধাক্কা দিয়ে খুলবে, অবলীলায় ঢুকে যাবে কিংবা বের হয়ে আসবে।

ভাদু। যার আসল নাম ভাদ্রপদী। তার এবার মনে হতে লাগল—তার নিজের জীবনটা এই দরজাটারই মতো। খুব সহজেই খুলে ফেলা যায়। চাইলেই চিচিং-ফাঁক। অসংখ্যবার খোলা হয় সে দরজা। কিন্তু কেউ আর সে দরজা আটকে দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না। মনে মনে ভাবে দরজাটির একটা নাম সে দিতে পারে। কী হবে সে নাম—সহজ দরজা।

নাম ভাবতে ভাবতে কেটে গেল আরো ১৯মিনিট। কব্জি উল্টে সময় দেখে নিল ঘড়িতে। এখন ঠিক ৪টা ২৭ বাজে। তার দামি ব্র্যান্ডেড ঘড়িটি সময় দেয় ঠিক ঠিক। সময়টা তার মেপেও চলতে হয়। তার মতো মেয়েদের জন্য সময় মেপে চলাটাই সবচেয়ে বেশি জরুরি। সাহেদ যখন ‘দু-দণ্ড বসো’ বলে ভেতরে চলে গেল, তখন সে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখেছিল ৩টা ২৭। এবার একটু উদ্বিগ্ন বোধ করছে। কিছুটা মেজাজ খারাপও। রাতে ক্লায়েন্ট আছে। সূর্য ডোবার পর তার কাজ বাড়ে। সন্ধ্যা অবধি সাহেদের সাথে কাটাবে এই প্ল্যানটাই পাকা ছিল। একান্ত কিছুটা সময় কাটাবে বলেও ঠিক করে রেখেছে সে। ভেবে রেখেছে, বিকেলের দিকটা সাহেদের। ওকে নিয়ে যাবে নিজের ছোট্ট ভাড়া করা ফ্লাটে। নিজেকে উজার করে দিয়ে ভালোবাসবে ভালোমানুষ ছেলেটিরে। আহা! কী একটা শান্ত চেহারা! বুদ্ধিদীপ্তও! ভাবে সে।

সাহেদের সাথে যেদিন প্রথম দেখা হয় সেদিনটার কথা মনে করে ফিক করে হেসে ফেলে ভাদু। ভাদু মানে ভাদ্রপদী। তবে তাকে ভাদু নামে আর কেউ ডাকে না। সে নিজেই শুধু কখনো কখনো নিজেকে ভাদু ডাকে। বাবা যতদিন বেঁচেছিলেন, একমাত্র বাবাই তাকে ভাদু ডাকতেন। মা ডাকতেন সোনাটা। বাবার দেওয়া নামটি মায়ের পছন্দ ছিল না। মা আধুনিকা। মেয়ের একটা আধুনিক নাম চাই। ফলে ভরা ভাদরের পূর্ণিমা তিথিতে জন্ম নেওয়ায় বাবার দেওয়া ভাদ্রপদী নামটি মায়ের দেওয়া সোনাটায় চাপা পড়তে সময় নেয়নি। ফলে সোনাটাই তার নাম। এই নামেই পরিচয়। সোনাটা ইসলাম।

সেই সোনাটা নাম ধরেই সাহেদের সাথে তার পরিচয়। সেটি ছিল থার্টিফার্স্ট নাইট। নাইটক্লাবে পার্টিটা কেবল জমে উঠেছে। সোনাটা-লারা-ডেইজিরা পুরো ফ্লোর মাতিয়ে তুলেছে উদ্দাম নৃত্যানন্দে। স্বল্পবসনা ত্রয়ী বেশ যৌনাবেদন ছড়াচ্ছিল। এমন সময়েই কথা উঠল ফ্লোরে নামের আদ্যাক্ষর মিলিয়ে পুরুষ-নারী নাচবে। যে যারটা মিলিয়ে নিল। নাচের ফ্লোরে ঢেউ তুলল। কিন্তু সোনাটা তার নামের আদ্যাক্ষরের সাথে মিল হয় এমন কাউকে পাচ্ছিল না। বেশ খানিকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে বারের এককোনে নিজেকে আড়াল করে বসেছিল যে ছেলেটি, তার কাছে নাম জানতে চাইলে জানা গেল সে সাহেদ। ব্যাস আর যায় কোথা হৈহৈ করে কয়েকজন ছুটে গেল। আর অনেকটা চ্যাংদোলা করে তাকে নিয়ে এলো ড্যান্সফ্লোরে। সোনাটার তর সইছিল না। ছেলেটিকে বাহুতে জড়াল। কিন্তু তার মুখ ততক্ষণে পাংশু হয়ে আছে। আর প্রচণ্ড ঘেমে গেছে। একটু পরেই অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। ব্যাস পুরো পার্টি পণ্ড। হৈচৈ পড়ে গেল। একপাশে সরিয়ে নেওয়া হলো সাহেদকে। চোখে মুখে পানি ছেটানো হলো। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। পার্টি তো আর থেমে থাকবে না। সুতরাং তাকে পাশের একটি রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। ব্যাস সবাই আবার ডান্সফ্লোরে উদ্দাম নৃত্যে মেতেছে। সোনাটা দেখল তার নাচের পার্টনার নেই। সে আস্তে করে পাশের রুমটিতে ঢুকে পড়ল। দেখল সাহেদ নামের ছেলেটি তখনও অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। তার খুব মায়া হলো। সোনাটার আড়ালে যে ভাদ্রপদী, তারই আড়ালে যে মায়াভরা মন, এই মায়া সেজন্য কি? নাকি স্রেফ নাচের ফ্লোরে সে নেই। এ নিয়ে কথা হবে। এখানে তারা এসেছে নাচের বিনিময়ে পয়সা পাবে। তো, সে যদি না নাচে! আর ওরা যদি তাকে পয়সা না দেয়! সুতরাং এই ছেলেকে জাগাতেই হবে! এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একটা কাণ্ড করে বসল সে। কাজটি সে কেন করেছিল আজও ভেবে পায় না। প্রথম দিকে এমন একটা কাজ করার জন্য নিজেকে ধিক্কারও দিত সে। বিশেষ করে যখন তার মধ্য থেকে সোনাটা বিদায় নেয়, ভাদু দখল করে নেয় তার পুরোটা, তখন।

এই সোনাটা আর ভাদুর লড়াইয়ে কখনো সোনাটা জেতে, কখনো ভাদু। সেরাতে সোনাটার জয় হয়েছিল বলেই সে কাণ্ডটি করে, তা নয়—মনের গভীর থেকে আজও উপলব্ধি করে—ভাদুই তাকে দিয়ে কাজটি করিয়েছে। আর সে কারণে যখন সে একা হতো, শুধুই ভাদু হয়ে থাকত, মরমে মরে যেত। এমন কাজ সে তো সোনাটার পক্ষেই করা সম্ভব। ভাদু হয়ে সে কী করে কাজটা করল ইত্যাদি।

এখন অবশ্য মাসদুয়েক ধরে বিষয়টি নিয়ে যখন ভাবে, এক ধরনের রোমান্সই বোধ করে। এইক্ষণে এই ঠ্যালা দরজার এপাশে বসে, ওপাশে সাহেদকে আড়াল করে রেখে ভাদু ভাবে কী শুভক্ষণে কাজটা সে করে ফেলেছিল। যা তার জীবনকে এক সুন্দরের পথই হয়তো দেখিয়েছে। কিংবা দেখাতে চলেছে। জীবনটাকে নিয়ে তার নতুন একটা ভাবনাও তৈরি হয়েছে...। থার্টিফার্স্টের সেই রাতে নাচের পেমেন্টটা সে পায়নি। সে নিয়ে এতদিন ক্ষেদ কম ছিল না সোনাটার। এক রাতের ডান্সে হাজার পাঁচেক টাকা পেত, তার পুরোটাই গচ্চা।
ভাদুর মনে পড়ছে, চুমুটাতে কাজ হয়েছিল। এক চুমুতেই জ্ঞান ফিরল ছেলেটির। চোখদুটি বড় বড় করে তাকিয়ে দেখল এক অপ্সরা তার মুখের ওপর ঝুঁকে আছে। তার রুজমাখা গোলাপী গাল। মাসকারায় আঁকা দুটি বড় চোখ, কড়া লিপস্টিকে রাঙা দুটি ঠোঁট। সে লিপস্টিট কিছুটা ঠোঁটে লেপ্টে আছে মেয়েটির নিজেরই ঠোঁটে। তাতে তাকে আরো অপরূপ লাগছে। এবার নিজের অজান্তেই সাহেদ নিজের হাতের উল্টো দিক দিয়ে নিজের ঠোঁটের ওপর ঘষল। আর চোখের সামনে হাত এনে দেখল কড়া লাল রঙ তার কব্জির কাছে লেগে আছে। সাদা শার্টের হাতায়ও লেগেছে কিছুটা। তখনও ঘোর কাটেনি সাহেদের। তার নাসিকারন্ধ্র তখন ভরে আছে সুগন্ধির তীব্রতায়। তার ঘোরলাগা চোখদুটি গোল করে এদিক ওদিক তাকাল। স্বল্পবসনা সোনাটা তখনও সাহেদের বুকের ওপর ঝুঁকে। সুডোল বক্ষযুগলে চোখ পড়তেই আরেক দফা জ্ঞান হারাল সে।

সোনাটা বুঝে গেল ঘটনাটি কী ঘটেছে। সে দ্রুত নিজেকে তুলে নিল সাহেদের গায়ের ওপর থেকে। সে আরো বুঝে নিল এই রাতে তার আর নাচা হবে না। পয়সাও হয়তো মিলবে না। রুম থেকে বেরিয়ে দ্রুত চেঞ্জ রুমে গিয়ে নিজের কাপড়গুলো পরে ফেলল। আবার ছুটে এলো সাহেদের রুমে। এবার দেখতে পেল সাহেদের চোখ খোলা। তবে চাহুনিতে তখনও ঘোর। কিছুক্ষণ পর সাদা শার্ট নেভিব্লু প্যান্ট পরা ভীষণ স্মার্ট ছেলেটিকে বগলদাবা করে ক্লাব থেকে বাইরে চলে গেল কালো রঙের হিজাব পরা একটি মেয়ে। যার নাম সোনাটা। যার অপর নাম ভাদ্রপদী। যার জন্ম হয়েছিল ভাদ্রের ভরা পূর্ণিমায়। যার বাবা তাকে ভাদু নামে ডাকতেন। আর সে নিজেও নিজেকে কখনো কখনো ভাদু নামেই ডাকে। কেউ বুঝতেই পারল না এই দ্রুতপায়ে ছেলেটির হাত ধরে সোনাটা নয় ভাদুই বের হয়ে গেল।

বটলগ্রিন রঙের নরম গদির সোফায় শরীরটা গলিয়ে দেওয়া একটা আরাম আরাম ভাব নিয়ে বসে থাকা ভাদু সে রাতের কথাগুলো ভেবে সত্যিই ফিক করে হেসে দিল। মনের কথাটাই মুখে উচ্চারিত হলো—আহা বেচারা!

তবে যতই বেচারা হোক, সাহেদের ওপর এবার রাগই লাগছে ভাদুর। আজকের দিনটিতে সে সোনাটা হতে মোটেই চায়নি। আজ সে ভাদুই থাকতে চেয়েছে। ভোর থেকে তার ভাদুময় দিনটি যেভাবে শুরু হয়েছিল এবং এগুচ্ছিল তাতে সে ভীষণ খুশি। বিকেলটাও সে ভাদুময় করেই রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু এখানে এসে সাহেদ সেই যে ঠ্যালা দরজা ঠেলে ঢুকল। আর তো বেরুনোর নাম নেই। কত দেরি হবে তার? বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা যে ঘনিয়ে এলো।

দরজাটির দিকে দৃষ্টি ঘন করে তাকায় ভাদু। ভাবে এই বুঝি খুলে যাবে। বের হয়ে আসবে সাহেদ। তাকে বাহুবন্দী করে বলবে—চলো। নিচে সাহেদের মোটরবাইকটি রয়েছে। সেটিতে তারা দ্রুতই পৌঁছে যাবে শান্তিনগরের ফ্লাটে।

নিজের ছোট্ট ফ্ল্যাটটি সুন্দর করে সাজিয়েছে সে। এক বেডরুমের ফ্ল্যাটটি ভাড়ায় নেওয়া। কিন্তু নিজের মতো করেই সাজিয়ে নিয়েছে। সে সাজে আধুনিকতা নয়, আছে সৌন্দর্যের ধ্রুপদী বিন্যাস। বাবার পুরোনো হারমোনিয়ামটিই একমাত্র, যা সে মায়ের কাছ থেকে চেয়ে এনেছে। সেটি রাখা থাকে এককোনে। মাঝে মাঝে যখন কোনো কাজ থাকে না, মানে ক্লায়েন্ট থাকে না, ভাদ্রপদী ঘরেই কাটায়। টুকটাক রান্না করে খেয়ে নেয়। আর হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গায়। আপনমনে সে গাইতে থাকে নিজের পছন্দের গান—আজ জোসনা রাতে সবাই গেছে বনে। বেছে বেছে জোসনার গান গাইতেই তার ভালো লাগে। জোসনা তিথিতেই যে তার জন্ম। সে যে ভাদ্রপদী।

ভাদু ভাবে এসব গানেই সে আসলে নিজেকে খুঁজে পায়। আসলেই কি পায়? এই প্রশ্ন যেন সে নিজেকেই নিজে করে। এসব প্রশ্ন সোনাটার কাছে ভাদুর কিংবা ভাদুর কাছে সোনাটার চলতেই থাকে। কখনো কখনো যখন একা একা বসে থাকে, ভাবে, তখন এই সোনাটা আর ভাদুর লড়াইটা চলতে থাকে। সোনাটার স্বপ্নে গিয়ে ভাদু বাধা দিতে চায়। আবার ভাদুর স্বপ্নে এসে ধরা দিতে চায় সোনাটা। তবে এখন তার মনের মনিকোঠায় কেবল সোনাটা আর ভাদু এই দুইয়ের নয় তৃতীয় একটি নাম... সাহেদ উঁকি ঝুঁকি মারছে। ভেবে রেখেছিল আর আজ বিকেলে তৃতীয় এই ব্যক্তিটিকে পাকাপোক্ত করে দলে ভিড়িয়ে নেবে। আর সময় সুযোগ মতো সোনাটাকে বিদায় করে দিয়ে সে ভাদু হয়ে যাবে। শুধুই ভাদু। ভাদ্রপদী। সে যদি হয় ভরা পূর্ণিমার তিথি, সাহেদ হবে সেই তিথিতে পূর্ণিমার চাঁদ।

ভাবনায় আবারও আসে সেই রাতটি। সেই যে রাত ১০টার দিকে কালো হিজাবে নিজেকে আড়াল করে, সাদা শার্ট, নেভি ব্লু প্যান্ট পরা—টল ডার্ক অ্যান্ড হ্যান্ডসাম ছেলেটিকে অনেকটা বগলদাবা করে টেনে-হিচড়ে উবারে চেপে ছুটেছিল, সে রাতেও তার ইচ্ছা হয়েছিল—নিয়ে যাবে ছেলেটিরে নিজের ফ্লাটে। কাউকে কখনো নেয়নি, নেয়ও না। কিন্তু এই ছেলেটিকে দেখে তার কেনো যেন মনে হয়েছিল একে নেওয়া যায়। কিংবা একেই নেওয়া যায়। কিন্তু গাড়ি যখন মহাখালি ফ্লাইওভারে তখনই ঘোর কাটল সাহেদের। সে জানাল রাত দুটোয় তার ফ্লাইট। বাবা-মাসহ তারা রাতে আমেরিকা যাচ্ছে। তারা আমেরিকায় থাকে। ঢাকায় থার্টিফার্স্ট নাইটের অনেক গল্প শুনেছে, কেমন তা দেখতেই নিজে নিজে গুগল করে এই ক্লাবে এসে ঢুকেছিল, ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে দিয়ে সরাসরি এয়ারপোর্টে যাবে। বাকিরা লাগেজ নিয়ে পৌঁছুবে। তখন আর সময় নেই।

ভাদুর ভেতরের সোনাটা কিংবা সোনাটার ভেতরের ভাদুই তখন জানাল তারা আর কোথাও নয় এয়ারপোর্টের দিকেই যাচ্ছে। নিজের ফ্ল্যাটে নয়, মায়ের ছেলেটিকে মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তার কাজ। ফলে উবারের ড্রাইভার জাহাঙ্গীর গেট থেকে ইউটার্ন নিয়ে ছুটল এয়ারপোর্টের দিকে। পৌঁছতে সময় নিল না। থ্যাংক ইউ বলে সাহেদ নেমে দ্রুত এগিয়ে গেল আর্চওয়ের দিকে। আর সাহেদ নামতেই ভাদুর ভেতরের সোনাটা ভীষণভাবে বিরক্ত হয়ে উঠল। রাতের কামাই মাটি। উবার ছুটল উল্টোপথে। ওয়েস্টিনের দিকটাতে এই রাতেই একবার ঢুঁ মারতে পারে। রাতেও হুটহাট দুয়েকটা কাজ পাওয়া যায়। তাতে কিছুটা হলেও ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যাবে।

এই সোনাটা আর ভাদুর লড়াইটা মাঝে মাঝে বেশ ভালোই উপভোগ করে সে। কে যে কাকে কখন জিতে নেয়, সেটার ওপর তার নিজেরও খুব একটা নিয়ন্ত্রণ থাকে না। হঠাৎ দেখে ভাদুর ওপর সোনাটা ওভারপাওয়ার করছে। আবার কখনো কখনো সোনাটার ওপর ভাদু।

এই যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো আর তার ভেতর থেকে গোটা দিনের ভাদু এখন পলায়নপর। সোনাটা এসে ভর করতে শুরু করেছে। তাতে সাহেদের ওপর বিরক্তিটাই প্রকট হয়ে উঠেছে।

সাহেদ ঢাকায় এসেছে দুই সপ্তাহ হলো। বলেছে স্রেফ তার সঙ্গে দেখা করতেই পৃথিবীর অপর পিঠ থেকে উড়ে এসেছে সে। এতে ভাদু ভীষণ খুশি হয়েছে। এর আগেই তাদের মধ্যে ফেসবুকে যোগাযোগ হয়েছে। সাহেদই মূলত তাকে খুঁজে নিয়েছে। জানিয়েছে ইমেজ সার্চিংয়ের মাধ্যমে সে তাকে খুঁজে বের করেছে ভার্চুয়াল জগতে।

সে রাতে উবারের গাড়িটি যখন এয়ারপোর্টের দিকে সাঁই সাঁই করে এগুচ্ছিল তখন সাহেদ যেনো তার নিজস্বতায় ফিরেছে। বারবার ধন্যবাদের বন্যায় ভাসিয়ে দিচ্ছিল সোনাটাকে। বলছিল, আজ জীবনকে সে নতুন করে চিনেছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। সাধারণত কারো সেলফি তোলার আহ্বানে সাড়া দেয় না সোনাটা। ভাদুও নয়। কিন্তু গাড়িটি যখন বনানী ফ্লাইওভার দিয়ে যাচ্ছিল সাহেদ তার পকেট থেকে মোবাইল ফোনটি বের করে পট করে একটি সেলফি তুলে নিল। কাউকে না বলে ছবি তোলাটা অভদ্রতা। ছেলেটা নাকি আমেরিকায় থাকে। এই সামান্য বিষয়টা কী সে জানে না! বিরক্ত হয় সোনাটা। সেলফি তোলাটা তার পছন্দ নয়। তবে যা কিছুই বলল তা মনে মনে। প্রকাশ্যে কিছু বলল না। আর ভাদু, যার সেলফিতে ভীষণ অ্যালার্জিই বলা চলে, সেও কোনো আপত্তি করল না। নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে রেখেই সাহেদ সেলফিটি তুলে নিয়েছিল। তো সেই সেলফি থেকেই সোনাটার ইমেজ সার্চ করে তার সন্ধান বের করে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায় সাহেদ। সোনাটা তা সহজেই গ্রহণও করে। টল-ডার্ক-হ্যান্ডসাম ছেলেটিকে না করার শক্তি তার ছিল না। বস্তুত কারোরই ছিল না। না সোনাটার, না ভাদুর। এরপর কত কী যে চলে। কথা বলাবলি, ছবি চালাচালি। কত ছাইপাশ—আবোল তাবোল। এসব নিয়েও সোনাটার সাথে ভাদুকে কম লড়তে হয়নি।

মেজাজটা ক্রমেই খিঁচড়ে যাচ্ছে। অনেক্ষণ ধরে ঠ্যালা দরজাটির দিকে তাকিয়ে সে। দরজাটির মাঝের অংশ দিয়েই ওপাশটা আড়াল করা। নিচের দিক থেকে ওদিকটার মেঝেতে অনেকটা দেখা যায়। কড়া নীল রঙের কার্পেট বিছানো। একটি দুটো আসবাবের খানিকটা অংশ চোখে পড়ে। উপরের ফাঁকা থেকেও চোখে পড়ে একটি ঝাড়বাতির কিছুটা অংশ। ব্যাস এই। মাঝে দুই দিক থেকে আসা দুটি কপাট। ঠিক সমান হয়ে এমনভাবে লেগে আছে যে ফাঁক গলিয়ে কিছু দেখা যায় না। ভাদু জানে, সামান্য ধাক্কাতেই দরজাটি খুলে যাবে। একটি অতি সহজ দরজা, যা চাইলেই খুলে ফেলা যায়। কিন্তু সেই দরজাটিই তার থেকে আড়াল করে রেখেছে সাহেদকে। হঠাৎ মনে হলো এই দুটি সামান্য কপাট যেন তার কাছ থেকে একটা পৃথিবীকে আড়াল করে রেখেছে। যে পৃথিবীটি গত কিছুদিন ধরে সে সাজিয়েছে। যে পৃথিবীটি হয়ে উঠেছিল ভাদুর। কিংবা বলা চলে, ভাদু ও সাহেদের।

দু সপ্তাহ আগে সাহেদ যখন তাকে জানাল সে দেশে আসছে। এবং শুধু তারই জন্য। তখন থেকেই সে তাদের জন্য এই নতুন পৃথিবীটি সাজাতে শুরু করেছে। আর এই দুই সপ্তাহে পৃথিবীটা অনেকটা সাজিয়েও ফেলেছে। এখনো তার নিজের পেশা সে ছাড়েনি বটে, তবে আজ বিকেলেই সে সিদ্ধান্তটিও পাকাপাকি নিয়ে নেবে বলেই মনোস্থির করে রেখেছে। এখন কেন যেন তার মনে হচ্ছে দুই সপ্তাহ ধরে যে পৃথিবীটা সে সাজিয়েছে ওই সহজ দরজাটির ওপারে সেটিই ঢাকা পড়ে আছে।

আচ্ছা! করছেটা কী সাহেদ, ওপাশে? প্রশ্ন তার মনে। গত প্রায় দেড়ঘণ্টায় রুমটি থেকে আর কেউ বের হয়নি, কেউ ঢোকেওনি। যে ভবনটিতে তারা উঠেছে তাতে লিফটে ঠিক কততলায় উঠেছে তাও সে মনে করতে পারছে না। মনে করবে কী করে? আসলে সে দেখেওনি সাহেদ ঠিক কততলার বাটনটি চাপ দিয়েছিল। মাথাটা ক্রমেই ফাঁকা হয়ে আসছে।

ঠিক তখনই দরজাটি খুলে গেল এক ধাক্কায়। একটা রোগা পাতলা কিশোর বয়সী ছেলে তার কাছে এগিয়ে এসে অদ্ভুত একটা ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, আপনারে ভিত্রে ডাহে।

সাহেদ কোথায়?

ক্যাডায় সাহেদ?

যার সাথে আমি এসেছি।

সবাই ভিত্রেই আছে। আপনারে যাইতে কইছে। তয় সাহেদ নামে কেউ নাই। আপনারে যে নিয়া আইছে হের নাম জিম।

মানে কী?

ছেলেটির ফ্যাসফ্যাসে স্বর, আর তাকানো ভঙ্গি তার ভালো লাগল না। এক নিমিষে মাথা ঝিম ধরে গেল ভাদুর। তবে সে কেবল ভাদুই নয়। সে সোনাটাও। যে সোনাটা সাহসী। কিছুটা বিপদের আচ করলেও ভাবল এমন বিপদে কম পড়তে হয়নি তাকে। কত মন্ত্রী-এমপি দেখে এলো, কী আর হবে। মনে মনে একটু হাসলও সে। ভাবল বাহ! বেশতো তার নিজের মতো এই ছেলেটারও দুটো নাম। সাহেদ আর জিম।

ভাবতে ভাবতে সামনে এগুলো। সহজ দরজা ঠেলে আগে আগে ঢুকল ছেলেটি। আর তার নাকের ডগায় ঝপাট করে কপাটদুটো আটকে গেল। এ এমন এক দরজা ভেতরে যেতে হলে নিজেকেই ঠেলে যেতে হবে। ভাদুও ঢুকল, সহজ দরজার আলগা কপাট ঠেলে।

কে ঢুকল? ভাদু নাকি সোনাটা? সে নিজেও বুঝতে পারল না। তবে কিশোর ছেলেটি তার লিকলিকে পা ফেলে কিছুটা সামনে এগিয়ে গেছে। নীল মোটা কার্পেটে তার খালি পা অনেকটা দেবে দেবে যাচ্ছে। হিল পরে থাকলেও সেই কার্পেটে নিঃশব্দেই এগুচ্ছে সোনাটাও। বড় হলঘরে নিচে কার্পেট আর উপরে একটার পর একটা বড় ঝাড়বাতি ছাড়া আর কিছু তেমন নেই। ঠিক সামনে একটি টেবিল পাতা। তাতে গোটা তিনেক চেয়ার। বাকিটা ফাঁকা। হলওয়ে পার করে একটি কাচের দরজা ঠেলে ছেলেটি বলল, যান।

যাব?

হ যান, সবাই ভিত্রে আছে!

ছেলেটির কথা বলার ভঙ্গি ভীষণ বিরক্তিকর। কষে চড় লাগিয়ে দিতে ইচ্ছা হলো তার। সেটা না করে বিরক্তি নিয়েই ভিতরে ঢুকল সে। আর ঢুকতেই দরজাটি বন্ধ হয়ে গেল অটো সেন্সরে। কট করে দরজা বন্ধ হওয়ার একটি শব্দ এসে বুকে ধাক্কা দিল। সোনাটা দেখল জনা চারেক লোক একটি টেবিল ঘিরে বসে আছে। তাদের মধ্যে দুই জন সাদা চামড়ার বিদেশি। সামার ব্লেজার পরা। একজন দেশি। ভদ্রবেশি মধ্যবয়সী। চেক প্যান্ট, গোলাপি শার্টের ওপর সাসপেন্ডার পরে আছেন। সোনাটা বুঝতে পারল—একেই সে ঢুকতে দেখেছে। আর কেমন যেন চেনা চেনা মনে হলো। আর চিনেও ফেলল। থার্টিফার্স্ট নাইটে যে ব্যক্তি ডান্স ফ্লোরে নামের আদ্যাক্ষর মিলিয়ে যুগলনাচ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন ইনি সেই জন। অপরজন সাহেদ। সে পরে আছে থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট ও টি-শার্ট। কিছুক্ষণ আগে যে পোশাকে ছিল সে পোশাকে নয়, একদম ঘরোয়া পোশাকে। এতে ভাদুর ঝিমধরা ভাবটি তীব্র হলো। ঠিক তখনই পেছন থেকে সাসপেন্ডার পরা লোকটা এগিয়ে এসে কুৎসিতভাবে জড়িয়ে ধরল তাকে। এমন কিছুর জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না সোনাটা। ভাদু তো নয়ই। আর ঘোর কাটলে, কি হচ্ছে বুঝে ওঠার আগেই আবিষ্কার করল টেবিলের ওপরে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে তাকে। শাড়িটা তার গায়ে নেই। আলোচনা হচ্ছে বাকি চার জনে।

‘নট ব্যাড,’ বলল দুই বিদেশির মধ্যে আকাশি রঙা সামারকোট পরা জন।

‘ইয়াহ! বাট উই নিড টু টেক অ্যা মেজারমেন্ট,’ বলল অপর বিদেশি।

‘রাইট!’ বলে সক্রিয় হলো সাহেদ। তার হাতে একটি মেজারিং টেপ। ঝুকে পড়ল সোনাটার দিকে। প্রথমে তার বুক মাপল। মুখে বলল, ‘থার্টি ফাইভ।’ এরপর কোমর—টুয়েন্টি সিক্স। আর নিতম্বের দিকটায় আবার থার্টি ফাইভ।

‘ওন্ট গো,’ বলল অফ হোয়াইট সামার কোট পরা বিদেশিটি।

সাসপেন্ডার টেনে ধরে কেতা দুরস্ত বাঙালিটি বলল, ‘হোয়ায়াই... হোয়াটস রং। শি ইজ ফাইন। উই হ্যাভ বিন চেজিং হার সিন্স কোয়ায়েট অ্যা লং। শি ইজ পারফেক্ট অব দ্য পারফেক্টস।’

‘ইউ নো ম্যান, ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ইজ থার্টি ফাইভ-টুয়েন্টি ফাইভ-থার্টি ফাইভ। ওয়ান ইঞ্চ ফ্যাটার।’

কী হচ্ছে এসব, তার কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারল সোনাটা। বুঝতে পারল কোনো ইন্টারন্যাশনাল চক্রের খপ্পরে পড়েছে সে। অন্ধকার জগতের খবরাখবর কিছুটা সে পায়। আগেও শুনেছে, ঢাকায় এমন একটি চক্র কাজ করছে। বুঝে নিল, হয়তো তার জন্য বিদেশি ক্লায়েন্ট খোঁজা হচ্ছে। নয়তো হতে পারে আন্তর্জাতিক বাজারেই তাকে চালান করে দেবে এরা। সাহেদকে নিয়ে গড়া নতুন স্বপ্নের পৃথিবীটা তখন আর দেখতেই পাচ্ছে না সে। ভেতরের ভাদুটা কিছুক্ষণ লড়াই করে সোনাটার সাথে পেরেই উঠল না। ফলে প্রতিবাদ কিছু হলো না। বরং সোনাটা ভাবল দেশের বাজারের চেয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বিকোলে তাতে মন্দ কী? সুতরাং চুপ করে থাকাই ভালো। দেখি না কী হয়!

সাসপেন্ডারওয়ালা এবার দুই বিদেশির কাঁধে দুই হাত রেখে দুজনকে ‘কামওন মেন’ বলে একসাথে ধাক্কা মেরে একটু দূরে সরিয়ে নিয়ে গেল। এরপর তারা ফিসফিস করে কী যেন বলল। আর একটু পরেই হাসি হাসি মুখ করে ফিরে এলো।

‘ওহ ইটস ফ্রি!’ বলে নীলরঙা সামারকোটধারী নিমেষেই কোটটি খুলে ফেলল। আর অল্প সময়ই নিল পুরো বিবস্ত্র হতে। এমনটার জন্য আদৌ প্রস্তুত ছিল না ভাদু। তাই আলগোছে টেবিল থেকে নেমে পড়ল সে। কিন্ত সোনাটা এতে অভ্যস্ত। সুতরাং লেট ইট গো। কিউতে দ্বিতীয় ছিল সাসপেন্ডারধারী বাংলাদেশিটি। হ্যাংলাটা যতটা না আসল কাজের কাজী—তার চেয়ে নোংরামো বেশি। একবার ভাবল দেয় থুথু ছিটিয়ে লোকটির মুখে। কিন্তু না! সোনাটার সামনে তখন বিদেশ বিভূঁইয়ের স্বপ্ন। রেড লাইট জোন। পোল ডান্স। ন্যুড ক্লাব। কত কিছু শুনেছে। সেখানে নাকি সোনালি-রুপালি জীবন। শরীর নয়, স্বপ্ন নিয়েই ভাবছে সে। এদিকে চার জনের মধ্যে তৃতীয়জন হয়ে দ্বিতীয় বিদেশিটি যখন তার ওপর চড়াও হলো তখন সে জ্ঞান হারাল। জ্ঞানের তোয়াক্কাও করছিল না সোনাটা। তার কাছে রূপালি স্বপ্নটাই বড় হয়ে থাকল। কিছুক্ষণ পর যখন জ্ঞান যখন ফিরল তখন সাহেদ কিংবা সাহেদবেশী জিম তার উপরে। এবার তার মনে এলো সেই রাতটির কথা। থার্টিফার্স্টের সেই রাত। কিন্তু সে স্মৃতি ক্রমেই তার ম্লান হয়ে গেল। বরং টের পেল গত দিন সাতেক ধরে যে নতুন জগতটি সে মনে মনে সাজিয়েছে, সোনাটা থেকে পুরোপুরি ভাদু হয়ে যাওয়ার স্বপ্নভরা সেই জগত, যাতে সাহেদও ছিল, সেই পুরো জগতটিই জগদ্দলের মতো তার ওপর চেপে বসেছে। হঠাৎ এদিক ওদিক চোখ ঘুরিয়ে কাকে যেন খুঁজতে লাগল। কাকে খুঁজছে সে? ভাদুকে? ভাদ্রপদী। ভাদ্রের ভরা পূর্ণিমায় যার জন্ম। ঘোলা চোখেই কাচের দরজা ভেদ করে সে দেখতে পেল সামনের সেই সহজ ঠ্যালা দরজাটি ঠেলে ভাদ্রপদী বের হয়ে গেল। এখানে পড়ে রইল শুধুই সোনাটা। এতদিন পেটের তাগিদে, নিজের ইচ্ছায় যে কাজটি সে করে এসেছে তাতে তার ক্ষেদ ছিল না। ভয়ও ছিল না। ভাদুকে বুঝিয়ে শুনিয়ে রাখত নিজের কাছে। সুযোগ মতো ভাদু হয়ে যেত। কিন্তু আজ এই সন্ধ্যায় সোনাটার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের স্বপ্নের কাছে ভাদ্রপদীর সুন্দর স্বপ্নটার যখন চূড়ান্ত পরাজয় হয়ে গেল তখন দরজা ঠেলে চিরদিনের মতোই কী চলে গেল ভাদ্রপদী?

সে কথা ভাবতেই শিউরে উঠল সোনাটা। নিজেকে ভীষণ কলঙ্কিত বোধ করতে লাগল সে। ভাদ্রপদীকে সে আর কোনোদিনই ফিরে পাবে না। চার-চারটি পিশাচের ক্ষুধা মিটিয়ে তখনও যেটুকু বোধ ও দৃষ্টিশক্তি তার অবশিষ্ট তা দিয়ে সে আবছা দেখতে পেল, সহজ দরজার কপাট দুটো তখনও নড়ছে। বার কয়েক ঝাপটিয়ে পুরোপুরি সমান হয়ে স্থির হয়ে গেল। আর আড়াল করে দিল ওপাশটা। এপাশটায় তার জন্য পড়ে রইল নতুন এক অন্ধকার জগত। আরেকবার জ্ঞান হারাল সোনাটা। হ্যাঁ সোনাটাই।

আর ভাদ্রপদী! সে চলে গেল ভবনটির ছাদে। দেখল ভাদ্রমাসের পূর্ণিমার তিথিতে গোল একটি চাঁদ পূব আকাশে ভীষণ আলো ছড়াচ্ছে। ‘বাবা আমি আসছি’—বলে ঝাঁপ দিল সেই জোছনায়। সেই থেকে ভাদ্রপদী নামের আর কেউ থাকল না। খবর বেরুলো—কলগার্ল সোনাটার আত্মহত্যা।

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-৮



মাহফুজ পারভেজ
ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-৮

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-৮

  • Font increase
  • Font Decrease

[অষ্টম কিস্তি]

“এই ছবিতে তুমি যে ঘাসের ওপর থেকে রংধনু শুরু করলে, কী করে তা বাস্তবের কাছাকাছি হবে?”

ম্যারির প্রশ্ন শুনে পল্লবী মাথা ঝুঁকিয়ে তার হাতের পেনসিলটা কাগজে এলোমেলো ঘষতে থাকে। কোনো উত্তর দেয় না। ক্যাম্পাসে পড়তে আসা দক্ষিণ এশীয় তরুণীটির দিকে অপলক চেয়ে থাকেন ম্যারি। পল্লবী মাথা ঝুঁকিয়ে রেখেই একসময় বিড়বিড় করে, “আমি তো কখনো সত্যিকারের রংধনু দেখিনি!”

ম্যারি চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রায় অর্ধস্ফুটে বলেন, “বুঝেছি। তবে আর কী।”

কথাটা বলে ম্যারি নিজের মনে ভাবলেন, মেয়েটিকে এভাবে বলা ঠিক হয় নি। পল্লবী আহত হতে পারে কিংবা তার মধ্যে না-পারার হতাশা আসতে পারে। এটা ঠিক কাজ নয়। শিক্ষার্থীর গুণ জাগ্রত করা তার দায়িত্ব। কোনো কিছু করার এবং পারার পথ দেখানো কর্তব্য। না-পারার বিষয়গুলো মনে করিয়ে তাকে আটকে দেওয়া মোটেও ঠিক হয় নি।

নিজের ভুল বুঝতে পেরে পল্লবীর পাশে বসে হাসতে হাসতে ম্যারি বলেন, “সব সময় বাস্তবকে হুবহু আঁকার দরকার নেই। দেখা জিনিস হুবহু আঁকতে নেই। স্বপ্ন, কল্পনা আর ইচ্ছে মিশিয়ে আঁকতে হয়। তবেই সেটা তোমার একান্ত নিজের সৃষ্টি হবে।”

পল্লবীর ঠোঁটের কোণ বেঁকে উঠতে উঠতেও ফের স্বাভাবিক হয়ে যায়। তার খুশির সঙ্গে শোনা যায় হাতের চুড়ির রিনিঠিনি শব্দ। ম্যারি সন্তর্পণে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেন।

অন্য ছেলেমেয়েগুলোর ড্রয়িং খাতা চেক করে ম্যারি খানিকটা আশাহত হন। কিন্তু তিনি সেটা নিজের মনেই লুকিয়ে রাখেন। এদের দোষ দেওয়ার কিছু নেই। সত্যি সত্যি রংধনু তারা দেখে নি। বইয়ে দেখা কিংবা ইউটিউবের রংধনু দেখে দেখে যতটুকু আঁকতে পেরেছে, সেটাই বেশি।

একটি বিষয় দেখে ম্যারি খুবই বিস্মিত হন। রংধনু পৃথিবীর সর্বত্র একই রকম হবে, এটাই বিজ্ঞানের সূত্র। কিন্তু ছেলেমেয়েদের রংধনুতে তেমন ছাপ নেই। আফ্রিকা থেকে আসা সারাহ রংধনু এঁকেছে কালচে আকাশের প্রেক্ষাপটে। চীনের ছেলে লি লালচে আকাশের পটভূমিতে যে রংধনু চিত্রিত করেছে, তাতে সাতটি রঙ স্পষ্টভাবে খোলে নি। ম্যারি টের পান, সবার মনে আলাদা আলাদা আকাশ, যা তারা কল্পনা করেছে নিজের দেশ ও পরিবেশের প্রভাবে। তাই পল্লবীকে আলাদাভাবে দোষ দেওয়া ঠিক নয়। তার রংধনু তারই নিজস্ব পরিবেশ ও অনুভূতির ফসল, যা তিনি এই প্রথম একেকজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে একেক রকমের দেখলেন। রংধনু অভিন্ন হলেও মানুষের মন আর কল্পনা যে সেটাকে আলাদা অবয়ব দিয়েছে, সেটা দিব্যি প্রকাশ পায় ম্যারির কাছে।

ড্রয়িং খাতাগুলো নিয়ে কোনো নেতিবাচক মন্তব্য করা থেকে বিরত রইলেন ম্যারি। সবাইকে একটিই কমেন্ট করলেন তিনি, “গুড ওয়ার্ক, ট্রাই এগেইন।”

ম্যারি কিন্তু ঠিকই টের পান, ছেলেমেয়েগুলোর কাজে অবচেতনভাবে একটি বার্তাই ভেসে ওঠে, তা আসলে তাদেরই সঙ্কুল পরিস্থিতির প্রতিফলন। যে কারণে তাদের ছবির আকাশগুলো বদলে গিয়েছে। কোনও একটি হয়েছে কালচে, কিছু লালচে কিংবা পিঙ্গল। চোখের সামনের আর্থসামাজিক বাস্তবতাই তাদের অনুভতি ছুঁয়ে ভিসুয়াল রিপ্রেজ়েন্টেশনের গভীরে বিশেষ ভাবে নিহিত রয়েছে। উত্তাল পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে যার জন্ম, তার ছবির আত্মদর্শী চৈতন্যের মধ্যে সেই বীজমন্ত্র লুক্কায়িত থাকবেই।

চিত্রকর্ম বোঝার ও বিশ্লেষণের আলাদা চোখ আছে ম্যারির। কারণ, একসময় ম্যারি নিজেই ছিলেন ক্যাম্পাসের চলমান শিল্প আন্দোলনের অন্যতম হোতা। শিল্পকে মানুষের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার সেই অবিরত প্রচেষ্টার ফসল তুলেছিলেন তিনি আর তার সঙ্গে এক জেদি যুবক, ক্যাভিন। তাদের চাঞ্চল্যে ক্যাম্পাসের গথিক স্থাপত্যের গম্বুজওয়ালা ভবনগুলো ছুটির দিনের বৈকালিক আড্ডায় গমগম করত। এক শিল্পশোভিত ক্যাম্পাসের উদ্ভাস হতো কবি-সাহিত্যিক-চিত্রকর-ভাস্কর-গায়ক-সমালোচক-সম্পাদকদের ভিড়ে। সঙ্গে থাকতো আর্ট, পত্রপত্রিকা ও বই বিষয়ক আড্ডা। চলতো আবৃত্তি, কবিতাপাঠ, গান ও গল্পপাঠের মশগুল আসর।

প্রায়ই মহান শিল্পীদের ছবির প্রদর্শনী, নতুন উদীয়মান শিল্পীদের কাজ সংগ্রহ, মার্কিন দেশের লিথো প্রেসগুলোর সন্ধান, পুরনো ছাপচিত্রের খোঁজে অহর্নিশ অন্বেষণ ইত্যাদি ছিল তার যাপনের অবিচ্ছেদ অংশ। শিল্প ইতিহাসের সন্ধিক্ষণ তখন থেকেই তাঁর অবচেতনে তৈরি করে ফেলেছিল চিত্রকর্মের এক মহার্ঘ মিউজ়িয়াম।

একবার অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের সহায়তায় তিনটি কক্ষ নিয়ে ম্যারির কাজগুলোর একটি প্রদর্শনীর পরিকল্পনা ও আয়োজন করেছিল তাঁরই সাথী ও বন্ধুসম ক্যাভিন। প্রায় দেড়শোটি নানা মাধ্যমের কাজ ও বিবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষার সে এক মহাযজ্ঞ! এই উপলক্ষে তাঁর শিল্প নিয়েই একটি ডকু-ফিল্ম রিলিজ় করে বন্ধুরা। সমালোচকরা বলেছিলেন, অভিনবত্বে একটি আলাদা মাত্রার সংযোজন ঘটেছে ম্যারির কাজে। যেন রূপবন্ধ নতুন ভাবে পুনর্বিন্যাসের ফলে সিম্ফনি ও স্টাইল, বক্তব্য ও বর্ণনা, কম্পোজ়িশন ও ক্যাজ়ুয়ালিটি, মেসেজ ও মেটাফর একে অপরের পরিপূরক হয়ে প্রকাশিত হয়েছে ম্যারির আঁকা ছবিগুলোর পরতে পরতে।

হবে না কেন? ড্রয়িং, ছাপচিত্রের রঙিন পুনর্নির্মাণ, জলরং, ইঙ্ক, তেলরং, গ্রাফিক্স, মিশ্র মাধ্যম, রঙিন পেন্সিল, উডকাট, লিনোকাট, সেরিগ্রাফ, নিউজ পেপার ম্যাটে মিশ্র মাধ্যম, অ্যাক্রিলিক, এচিং, ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য— কী করেননি ম্যারি? শিল্পের যাবতীয় নিরীক্ষায় সৌন্দর্যের সবগুলো পথ পেরিয়ে এসেছেন তিনি। তারপর এক সময় নিঃসঙ্গ ও একেলা হয়ে পড়েছেন নিজেরই অজান্তে।

রংধনু নিয়ে অ্যাসাইনমেন্টে ব্যস্ত ছেলেমেয়েদের ছবিগুলোর সঙ্গে মেতে ম্যারির চাপা-শিল্পীসত্তা গুপ্ত লাভাস্রোতের মতো বের হয়ে এলো। সবাই চলে যাওয়ার পর তিনি আলাদাভাবে পল্লবীকে নিয়ে বসলেন। মেয়েটির সঙ্গে তিনি একটি অদ্ভুত নিবিড়তা অনুভব করেন। সবার চেয়ে বেশি সখ্যতাও তিনি বোধ করেন পূর্বদেশের এই মেয়েটির সঙ্গে। ঘরবাড়ি ছেড়ে মার্কিন দেশের ক্যাম্পাসে পড়তে আসা বেশকিছু ছেলেমেয়ের মধ্যে পল্লবী নামের এই তরুণীর জন্য কেন ম্যারি অনেক বেশি নৈকট্য অনুভব করেন, তা তিনি নিজেও ঠিকঠিক জানেন না। এই মেয়েটি পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে নানা বিষয়ে তার সঙ্গে এসে কথা বলে। তার প্রশ্নের ধরণ, জিজ্ঞাসার তীব্রতা ও কথা বলার আন্তরিক সুর ম্যারিকে মুগ্ধ করে। প্রাচ্য দেশের সংস্কৃতিতে বড় হওয়া মেয়েটির মধ্যে অপার কৌতূহল। গান শুনতে আর বই পড়তেও ভীষণ ভালোবাসে সে। ম্যারি প্রায়ই তাকে একমনে লাইব্রেরিতে পড়তে দেখে। বিচিত্র সব বই ইস্যু করে পড়ার জন্য বেছে নেয় পল্লবী। জানাশোনা কিছুটা গভীর হলে পল্লবী কিছু গান প্রেজেন্ট করে ম্যারিকে। গানের কথাগুলো বাংলায় কিন্তু সুর হৃদয়-ছোঁয়া। বিশেষ করে একটি গান ম্যারিকে আচ্ছন্ন করে প্রবলভাবে। গানটির প্রথম লাইন “তোমারও পরাণ যাহা চায়।”

ম্যারি একবার জিজ্ঞেস করেছিল পল্লবীকে, “এতোজন থাকতে তুমি আমাকে তোমার দেশের তোমার ভাষার গান উপহার দিলে কেন?”

“তোমাকে খুব দুখী ও বিষণ্ন মনে হয় আমার। গানগুলো শুনলে তোমার ভালো লাগবে।” কালবিলম্ব না করেই জানিয়েছিল পল্লবী।

ম্যারি ভীষণ অবাক হন। তারুণ্য ও যৌবনের সন্ধিক্ষণের সঙ্কুল পরিস্থিতিতে রয়েছে এই মেয়ে। অথচ কেমন করে তার মনের গভীরে ডুব দিয়েছে মেয়েটি। অলক্ষ্যে আপন হয়ে যাওয়া এমন একটি মেয়েকে মন থেকে ভালো না বেসে পারেন না ম্যারি।

এসব কথা ভাবতে ভাবতে ম্যারি বাস্তবে ফিরে আসেন। পল্লবীর আঁকার সরঞ্জাম গুছিয়ে দিতে দিতে বলেন, “তোমার যেমন ইচ্ছে হয়, তেমনভাবেই আঁকো তোমার রংধনু। আমি সেই ছবির নাম দেবো ‘পল্লবীর রংধনু’।"

উচ্ছ্বল ঝরণার মতো আনন্দে উজ্জ্বল হয় পল্লবীর সমস্ত মুখমণ্ডল। পল্লবী হাসতে হাসতে উঠে পড়ে। আঁকার খাতা আর রঙের বাক্স দু’হাতে নিয়ে সে রওনা দেয় নিজের হোস্টেলের দিকে। যেতে যেতে বলে,

“মিস, আমি তোমাকে একটা চমৎকার রংধনু উপহার দেবো, যা আমি শুধু তোমার কথা ভেবে আঁকবো। আমি নিশ্চিত, তুমি খুবই পছন্দ করবে আমার রংধনু।”

পল্লবীর চলে যাওয়া দেখতে দেখতে ম্যারি একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। পথের শেষে অদৃশ পল্লবীর ছায়াও আর নেই। সেখানে মনে হয় আবছায়ায় দেখা যাচ্ছে ক্যাভিনকে, যে লোকটি জীবনে প্রথম তাকে রংধনুর রঙের অরণ্যে পাগল করেছিল। ম্যারি তার একান্ত ভাবনায় ছেদ টেনে আকাশের দূর দিগন্তে তাকান। তারপর নিজেকে কিছুটা ঘুরিয়ে পশ্চিম আকাশে দৃষ্টি দেন তিনি। ক্যানভাসের মতো রংবহুল আকাশে তখন প্রদোষের আবিরমাখা উল্লাস। এখনই দিবাবসানে হাত ধরে শুরু হবে অন্ধকার রাতের।

ম্যারি অস্তগামী রশ্মির দিকে তাকিয়ে একাকী কি যেন চিন্তা করেন। তার ঘটনাবহুল জীবনের কোনো খণ্ডাংশের ছায়াপাত কি দেখতে পান তিনি আকাশের উদার শরীরে? তার স্থির ও অবিচল দৃষ্টি আটকে যায় অস্তাচলের দূর দিগন্তে। এক সময় তিনি অস্পষ্ট শব্দের মায়াজালে কোনক্রমে উচ্চারণ করেন, “তাঁর জীবনে অস্তবেলার রঙ-টা অন্যরকমও হতে পারত।”

পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার।

আরও পড়ুন: ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-৭

;

দেশভাগ, স্মৃতি, সত্তা, ভবিষ্যৎ



সুমন ভট্টাচার্য
ইনসেটে লেখক  সুমন ভট্টাচার্য

ইনসেটে লেখক সুমন ভট্টাচার্য

  • Font increase
  • Font Decrease

[৭৫ বছর আগে বাংলাদেশের যশোর ছিল তাঁর অস্তিত্বের শিকড়। সাহিত্যিক নিমাই ভট্টাচার্যের বংশধারার তৃতীয় প্রজন্ম তিনি। কলকাতার সাহিত্য আন্দোলন ও সাংবাদিকতায় ব্যাপৃত তাঁর জীবন। শিকড়ের সন্ধানে ফিরে দেখেছেন স্মৃতি ও সত্তার পদচিহ্ন। বয়ান করেছেন অনুভূতি ও ভবিষ্যতের চিত্রকল্প।]

আমাদের পূর্বপুরুষদের বাড়ি ছিল যশোরের নড়াইলে। এখন বোধহয় বাংলাদেশে নড়াইল একটা আলাদা জেলা হয়ে গিয়েছে। পরে জেনেছি যশোরের সঙ্গে আরো অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব বা রাজনীতিকদেরও একটা শিকড়ের সম্পর্ক ছিল। যেমন ভারতবর্ষের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় কিংবা পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি, সাবেক সাংসদ সোমেন মিত্র।

ঘটনাচক্রে আমার পিতৃপুরুষদের ভিটে ছিল যেখানে, সেই যশোরের সঙ্গে আমার মাতুলালয়েরও নাড়ির টান ছিল। অর্থাৎ আমার মায়ের দিক থেকে দাদু, যিনি সাহিত্যিক হিসেবে সুবিখ্যাত, সেই নিমাই ভট্টাচার্যের শিকড় ছিল যশোরে। কিছুদিন আগে আমার বাংলাদেশ প্রবাসী এক বন্ধু, সাংবাদিক এবং চলচ্চিত্র পরিচালক হাসিবুর রেজা কল্লোল একটা ছবি তুলে পাঠিয়েছিলেন, যে যশোরে কোন একটি রাস্তার নামকরণ নিমাই ভট্টাচার্যের নামে করা হয়েছে। সেটা অবশ্যই আমার কাছে বা হয়তো বৃহত্তর অর্থে আমার পরিবারের কাছে যথেষ্ট আনন্দের এবং গর্বের ঘটনা ছিল।

আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগে যেবার আমি প্রথম বাংলাদেশ যাই, সেইবার যশোর গিয়েছিলাম এবং সেই সুযোগে যশোর শহরের এক ব্যবসায়ী আমাকে আমার পিতৃপুরুষের ভিটে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। অবশ্যই সেটা একটা আলাদা আবেগের, উত্তেজনার এবং শিহরণ জাগানো ঘটনা ছিল। গত শতকের ৯ এর দশকের সেই সময়েও নড়াইলের ওই গ্রামে এমন কিছু বৃদ্ধ মানুষ ছিলেন, যাঁদের আমাদের পিতৃপুরুষদের স্মৃতি মনে ছিল।

আমি কলকাতায় ফিরে এসে আমার বাবা-মা এবং ঠাকুমাকে যশোরের গল্প বলেছিলাম। ঠাকুমা অবশ্য যশোর গিয়েছিলেন বিয়ের পর। গত শতকের ৩ এর দশকে সেই সময় নাকি কলকাতা থেকে নৌকো করে যশোর পর্যন্ত যাওয়া যেত। সেটা ভারতের স্বাধীনতার অন্তত এক দশকেরও বেশি সময়ের আগের ঘটনা, তাই ঠাকুমার কাছে যশোরের স্মৃতি মাথায় গেঁথেছিল।

আমি প্রায় পঞ্চাশ বছরের ব্যবধানে সেই যশোরে, সেই নড়াইলে ফিরে গিয়েছিলাম এটা অবশ্যই ঠাকুমা, লীলা ভট্টাচার্যকে স্মৃতিমেদুর করেছিল। বাবা এবং মা খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য, নড়াইল দেখার জন্য। কিন্তু এটা আমার দুর্ভাগ্য, ব্যক্তিগতভাবে অপরাধ যে, সময় এবং সুযোগ করে আমার তাঁদের পিতৃপুরুষের ভিটে দেখাতে নিয়ে যাওয়ার ফুসরত হয়ে ওঠেনি।

বাবার জন্য যন্ত্রণাটা একটু অন্যরকম ছিল। কারণ ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময় বাবা যশোর পর্যন্ত গিয়েছিলেন বলে আমায় অনেকবার বলেছেন। আবার কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা, সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পর্ক তাঁকে একাত্তরের ওই সময়টায় কোন কাজে সীমান্ত পেরিয়ে যশোর পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল। কিন্তু সময়টাই এমন ছিল যে বাবা খুঁজে খুঁজে নড়াইল পর্যন্ত যেতে পারেননি। যশোর পৌঁছেও নড়াইল না দেখার যন্ত্রণা বাবাকে সারা জীবন বহণ করতে হয়েছে। এবং হয়তো সেই যন্ত্রণা নিয়েই তিনি চলেও গিয়েছেন।

আসলে আমার দাদুরা চার ভাইই গত শতকের ২এর দশকে চাকরি নিয়ে একে একে কলকাতায় চলে এসেছিলেন। এবং কোনও আশ্চর্য সমাপতনে দাদুরা চার ভাই গত শতকের ৩এর দশকেই সরকারি চাকরি এবং কলকাতা শহরে নিজেদের মতো বাড়ি করে ফেলেছিলেন। তাই হয়তো যশোরের সঙ্গে দাদুদের নাড়ির টান থাকলেও যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং খুব সত্যি কথা বলতে গেলে কি, আমার ছোটবেলায় দাদু ঠাকুমা কারও কাছেই আমি এই নিয়ে সাংঘাতিক হাহুতাশ করতে দেখিনি।

আজকের ভারতবর্ষের রাজনীতিতে যে বিষয়টিকে কেন্দ্র করে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থান এবং যে আহত ক্ষতকে উসকে দিয়ে ভারতবর্ষের একটি প্রধান রাজনৈতিক দল নিজেদের জনসমর্থন বাড়াতে চায়, সেই আবেগ কোনদিন আমাদের বাড়িতে ছিল না। স্যামুয়েল হান্টিংটনের 'ক্ল্যাশ অফ দা সিভিলাইজেশন'-এর যাবতীয় তত্বের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমার পরিবার আমার শিক্ষা দিয়েছিল, যে তাঁদের মাইগ্রেশনের কারণ ছিল উন্নততর অর্থনীতির এবং নাগরিক জীবনের সন্ধান করা| ধর্মীয় বিদ্বেষ বা সেই সংক্রান্ত লুকানো ক্ষত নিয়ে কোনওদিন আমি বড় হইনি। দাদু কিংবা দাদুর ভাইরা যশোরের ফেলে আসা জমি পুকুরের কথা হয়তো স্মৃতিচারণে বলতেন, কিন্তু উত্তর কলকাতার বাড়ি, বেলেঘাটার ঠিকানা এবং সরকারি চাকরি নিয়ে তাঁরা কলকাতাতে ভালো ছিলেন। এবং এই মাইগ্রেশনটা সম্পূর্ণ হয়ে গেছিল দেশভাগের অনেক আগে।

এটাও হয়তো সমাপতন যে, পরবর্তীকালে যে মুসলিম পরিবারটির সঙ্গে আমার বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হলো, তাঁদেরও একটা বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। ভুল বললাম, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সাতক্ষীরাতে আমার শ্বশুরবাড়ির একটা জমি জায়গা বা শিকড় ছিল। কিন্তু আমার স্ত্রীর দাদামশাই, সৈয়দ সিরাজ আলি যেহেতু জিন্নাহর চাইতে মৌলানা আবুল কালাম আজাদকে বেশি নেতা বলে মানতেন, তাই ভারতবর্ষে অর্থাৎ বর্ধমানে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

এইসব কারণেই হয়তো আমার বড় হয়ে ওঠা থেকে আজ এই হাফ সেঞ্চুরির জীবনে পৌঁছে যাওয়া পর্যন্ত হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষের ন্যারেটিভ কিংবা বাংলাদেশের ফেলে আসা জমি নিয়ে হতাশা গ্রাস করেনি। বাবা তাঁর সোশ্যাল ডেমোক্রেট রাজনীতি দিয়ে জানতেন যে, তাঁর বাবা যশোর থেকে কলকাতায় এসে মাইগ্রেশনের যে সূচনা করেছিলেন, আমি কলকাতা থেকে দিল্লি পৌঁছে হয়তো তার আর একটা ধাপকে সম্পূর্ণ করেছিলাম!

কে জানে আমার পরবর্তী প্রজন্মের কেউ লন্ডন কিংবা নিউইয়র্কে পৌঁছে যশোর কিংবা সাতক্ষীরা থেকে আসা আরেকজন কোনও অনাবাসীর সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাবে না!

;

একজন নিসর্গী মুশফিক হোসাইন



মোহাম্মদ আলম চৌধুরী
একজন নিসর্গী মুশফিক হোসাইন

একজন নিসর্গী মুশফিক হোসাইন

  • Font increase
  • Font Decrease

মুশফিক হোসাইন জানুয়ারি ৬, ১৯৫৫ সালে চট্টগ্রাম শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে ১৯৭৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন এবং এরপর ব্যাংকিং পেশায় যুক্ত হয়ে কৃতিত্বের সাথে অবসর গ্রহণ করেন।

শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে প্রাণ-প্রকৃতির প্রতি অনুরাগ ছিল। নিসর্গ প্রেম সম্পর্কে তিনি বলেন,  ‘কৈশোরে একদিন কুয়াশামাখা ভোরে চোখ মেলে দেখি কর্ণফুলীর কোলে সূর্যমামা চোখ রাঙিয়ে হাসছে। দৌড়ে যাই নদীর কূলে। জোয়ারের নোনা জলে দুলছে হারগোজা। লতা-পাতা আর কাঁটার ফাঁকে নীলাভ ফুলেরা। রঙিন পক্ষীকুলের বিচিত্র সুর ও স্বর আমাকে তাদের প্রেমে মগ্ন করে। মৌমাছির রহস্যময় জীবন উদ্ঘাটনে আমি ব্যস্ত হয়ে পড়ি আর বৃক্ষকুল হয়ে ওঠে আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ’।

শৈশবের সোনাঝরা দিনগুলোতে প্রকৃতির সেবায় নিজেকে নিয়োগ করেছেন। এখনও অষ্টাদশ বয়সী তরুণের মতো খুঁজে বেড়ান প্রাণ-প্রকৃতির রহস্য। বৃক্ষশিশুর চারা রোপণে নিরলস খেটে যাচ্ছেন। শহরের আনাচে-কানাচে উৎসবহীন পরিবেশে নীরবে রোপন করেছেন অগুণিত বৃক্ষচারা। চট্টগ্রাম কলেজের প্রধান গেইটে সাক্ষী হয়ে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর রোপণ করা রুদ্রপলাশ বৃক্ষ। 

পাখিকুলের আবাস ধ্বংসে তাঁর মনে রক্তক্ষরণ হয়। তাই পাখিদের জন্য মাটির কলসিতে বাসা তৈরি করে বৃক্ষ শাখায় বেধে দেন। রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগেই ব্যালকনিতে পানি রাখেন বেড়াতে আসা পাখিদের জন্য।

উপকুল ও সাগর-মোহনার পাখিদের প্রতি বিশেষ দরদ থাকলেও যে কোনো পাখির সুর তাঁকে আকুল করে তোলে। তাই পাখি দেখা ও পাখি চেনার আয়োজন করে নতুন প্রজন্মকে তিনি উদ্বুদ্ধ করেন। চট্টগ্রাম শহরে পাখি উদ্ধারকারীর অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এ বয়সেও।

মুশফিক হোসাইনের শরীরে বহমান লোহিতকণিকায় প্রকৃতি-প্রেম রয়েছে। তাঁর মাতা-পিতারও ছিলো প্রাণ-প্রকৃতির প্রতি এমন নিখাদ দরদ। তাঁর সাথে প্রগাঢ় আলোচনায় জেনেছি শৈশবে প্রকৃতি-প্রেমে মগ্ন হওয়ার বিশদ কাহিনী।

তাঁরই নিরলস ভূমিকায় ও সম্পাদনায় চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত হয় প্রকৃতি ও প্রকৃতিসংরক্ষণ বিষয়ক প্রকাশনা ‘প্রকৃতি’। অভিজ্ঞতাধর্মী ও গবেষণামূলক এ প্রকাশনা ইতোমধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণ আন্দোলনে ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছে। আমি এ প্রকাশনার সহযোগী সম্পাদক-হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেখেছি, বৃক্ষদেহে পেরেকের আঘাত দেখে আবেগ-প্রবণ হয়ে তাঁর অশ্রু-বিসর্জনের দৃশ্য। এ সম্পর্কে তিনি আমাকে বলেছেন, ‘মনুষ্যদেহে যেমন আঘাত ও কষ্ট অনুভূত হয়, বৃক্ষদেহেও ঠিক তেমনি আঘাত ও কষ্ট অনুভূত হয়। উভয়েরই অনুভূতি শক্তি প্রবল। পার্থক্য শুধু একগোষ্ঠীর বাকশক্তি আছে আর অপর গোষ্ঠীর তা নেই’।

বৈকালিক পদচারণায় পরিচিত-অপরিচিত কারো সাথে আলোচনার সুযোগ হলে তিনি অনবরত বলে যান নিমপাতা, জলপাই, বহেরা, আমলকি আর সজনে-ডাটার কথা। চট্টগ্রাম শহরের জামাল খান মোড়, প্রেসক্লাব কিংবা আড্ডারত মুহুর্তে আমি বহুবার এ-দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছি। নতুন প্রজন্মের কথা ভেবে এখন তিনি প্রকৃতিপাঠ মঞ্চের উদ্যোগে বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে গিয়ে প্রকৃতি ও প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রকৃতি দল নিয়ে সরব রয়েছেন।

‘বেড়াতে গিয়েছি মৃতদের বাড়িতে’ নামে তাঁর কাব্যগ্রন্থে মানব-মানবীর প্রেম যেমন রয়েছে ঠিক তেমনি প্রকৃতি প্রেমও রয়েছে। প্রকৃতির প্রেম ছাড়া কোনো প্রেমই আদতে প্রেম হয় না। মানবপ্রেমের লুকানো ইতিহাস প্রকৃতিতেই রয়েছে।     

প্রকৃতি-প্রেমে ব্যাকুল হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বসন্তে জরা-ক্ষরা আর অশুভকে দূর করার জন্য বাড়ির চৌকাঠে মালা গেঁথে ঝুলিয়ে রাখা হয় ‘বিউফুল’ আর সাথে থাকে তার বোন নিমপাতাগুচ্ছ। যা আমাকে মুগ্ধ করে আর ভালোবেসেছি জলজ পাখি, ফুল, প্রজাপতি ও জলডোরা সাপ। মায়ার বাধনে বেঁধেছি গাছ, পাখির বাসা, ডিম ও ছানা। এই ভালোবাসার নামই প্রকৃতি’।

বীজ, চারাসংগ্রহ ও বিতরণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শ্মশান, কবরগাহসহ পতিত ভূমিতে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় ৬০ বছর ধরে তিনি নিয়োজিত। এ সম্পর্কে তাঁর ঘনিষ্টজন, সহপাঠী ও চা শিল্প-নির্বাহী আমিনুর রশীদ কাদেরী বলেন, ‘মুশফিক হোসাইনের সমগ্র অন্তরাত্মা জুড়ে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা। বীজের অঙ্কুরোদগম দেখে যেমন থমকে দাঁড়ায় তেমনি পাখির বাচ্চার  উড়াউড়ি দেখেও মুগ্ধ হয় আবার কখনো কখানো বয়স্ক বৃক্ষের দিকে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে’।

মুশফিক হোসাইন ‘চিটাগাং বী সোসাইটি’র প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে ‘প্রকৃতি’র সম্পাদক, ‘প্রকৃতি পাঠমঞ্চ’- এর এডমিন এবং প্রবীণদের নিয়ে ‘প্রবীন নাগরিক ফোরাম চট্টগ্রাম’ ও মাস্টার্স ৭৬-এর আহ্বায়ক। জনসচেতনতায় পত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে কলাম ও সচিত্র প্রতিবেদন লেখালেখি করেন। মনন - সৃজন ও বিশ্লেষণের বাংলা মাসিক ‘দখিনা’র ব্যবস্থাপনা সম্পাদকের দায়িত্বরত আর সাময়িকী ও স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ ও সম্পাদনায় যুক্ত।

প্রকৃতি সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নিসর্গী মুশফিক হোসাইন ‘সিটি ব্যাংক -তরুপল্লব দ্বিজেন শর্মা নিসর্গ পুরস্কার ২০২২’ এ বৃক্ষসখা পুরস্কার অর্জন করায় তাঁকে উষ্ণ অভিনন্দন।

লেখক: প্রফেসর, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

;

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-৭



মাহফুজ পারভেজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

[সপ্তম কিস্তি]
ঘোরাক্রান্তের মতো ক্যাভিনের পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা করে নির্ধারিত সময়ের আগেই উইলিয়ামের হাতে তুলে দেন ম্যারি। ম্যারির শুধুই মনে হয়, বইটি ক্যাভিন সাধারণভাবে পাঠকের জন্য লিখতেও বিশেষভাবে লিখেছেন তার জন্য। এতো দিন একসাথে থেকে যে ক্যাভিনকে ম্যারি চিনতে পারেননি, তার বই সেই চেনাজানার দুরত্ব নিমেষে ঘুচিয়ে দিয়েছে।

সম্পাদনার কাজে বার বার বইটি পড়ে অনেক দিন বাদে ম্যারির মধ্যে তৃপ্তির ভাব তৈরি হয়েছে। আসলেই তো, ক্যাভিন মুখে না বললেও, যেমন আশা করেছে, ম্যারি না জেনেই তেমনটিই করেছে এতোদিন ধরে। প্রচণ্ড চেষ্টায় টমাসকে যত্ন করেছে। বাবার অভাব মোটেও বুঝতে দেয় নি। মাতৃত্বের পেলবতার সঙ্গে পিতৃত্বের দায়িত্বশীলতা মিশিয়ে আপত্য স্নেহে লালন করেছেন তিনি টমাসকে। নিজের পুরো জীবনকে তিনি সীমায়িক করেছেন টমাসকে ঘিরে। তার স্কুল, খেলার মাঠ, ঘুরতে যাওয়া সবকিছুতে সঙ্গে থেকেছেন ম্যারি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবার কথা বিশেষ একটা আলাপ করে না টমাস। শুধু অনুভব করে, বাবা আছেন।

ক্যাভিনকে হাতের কাছে না পেয়ে ম্যারি মনে মনে প্রায়ই তার সঙ্গে কথোপকথনে লিপ্ত হন:

“আমি চেষ্টা করেছি তোমার ছেলেকে তোমার অভাব বুঝতে না দিতে। কিন্তু তুমি কি জানো, আমার জীবনে এখনো তোমার অভাব আমি অনুভব করি।”

ম্যারি জানেন, এসব কথা কোনো দিনও ক্যাভিনকে বলা হবে না। আবার তিনি এটাও জানেন, ক্যাভিনকে একেবারেই ভুলে যাওয়া অসম্ভব। অনেক প্রাপ্তি ও স্মৃতির মতো ক্যাভিনের হাত ধরে রংধনু চেনার অভিজ্ঞতা জীবনে ভুলতে পারবেন না ম্যারি।

রংধনুর কথা ভাবলেই আকাশে রঙের বর্ণালী আর মাটিতে বহুবর্ণা ক্যাভিনের ইমেজ ম্যারির সামনে এসে দাঁড়ায়। ‘রংধনু’, যাকে নিয়ে কবি-ঔপন্যাসিকরা প্রচুর উপকথার মালা গেঁথেছেন এবং বিজ্ঞানীরা বের করেছেন রংধনুর আসল রহস্য। কিন্তু ম্যারিকে রংধনু চিনিয়েছে ক্যাভিন। ম্যারির হাতের তালুতে নিজের আঙুলের স্পর্শে ক্যাভিন ব্যাখ্যা করেছে রংধনুর একেকটি রঙ। ক্যাভিনের স্পর্শ মেখে রংধনুর রংগুলো চোখের সীমানা ছুঁয়ে পৌঁছে গিয়েছিল ম্যারির হৃদয়ের অতলে। সেই অনুভূতি এখনো ম্যারিকে সর্বাঙ্গে জড়িয়ে রেখেছে মাধবী লতার আবেশে।

ক্যাভিন বলেছিল, “রংধনু হিসেবে আমরা যা দেখতে পাই তা আপাতদৃষ্টিতে ধনুকের মতো অর্ধচন্দ্রাকার হলেও তা আসলে গোল। বৃত্তাকার। অবাক লাগলো? অবাক লাগা এরকম অনেক কিছু ব্যাপার আছে রংধনুতে। যেমন বৈচিত্র্য আছে প্রতিটি মানুষের চরিত্রে ও ব্যক্তিত্বে, চিন্তায় ও চৈতন্যে।”

কোনো বই বা বিশেষজ্ঞ নন, ক্যাভিনই একবার নেপালের পোখরায় রংধনু-আবিষ্ট আকাশের নিচে সঙ্গোপনে পাশে এসে কানে কানে বলেছিল, “সূর্য থেকে যে আলোর রশ্মি পৃথিবীতে আসে তার রঙ মূলত সাদা। এই সাদা রঙের ভেতরে বেগুনী, নীল, আসমানি, সবুজ হলুদ, কমলা ও লাল এই সাতটি রং বিদ্যমান থাকে। সাদা আলোর একটি বিশেষ ধর্ম আছে। প্রিজমের মধ্য দিয়ে গমন করলে সাদা আলো সাতটি ভিন্ন রঙে বিশ্লেষিত হয়ে যায়।"

ক্যাভিন আরো বলেছিল, "আকাশে যখন বৃষ্টি পড়ে তখন বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ভাসমান প্রিজমের মতো কাজ করে। সূর্য হতে আলো, বৃষ্টির ফোঁটার একপাশ দিয়ে প্রবেশ করে বের হবার সময় সাত রঙা বর্ণালী সৃষ্টি করে। বৃষ্টির ফোঁটার প্রিজমসুলভ বৈশিষ্ট্যের কারণেই সৃষ্টি হয় রংধনু। বৃষ্টির ফোঁটা হতে বের হওয়া সাত রঙের আলো আমাদের চোখে এসে পৌঁছায় বলেই আমরা রংধনুকে দেখতে পাই।”

“মানুষও আসলে একটি অদৃশ রংধনু। তার হাসি, কান্না, আনন্দ, বেদনার আলাদা আলাদা রং আছে। আমরা তা দেখতে পাই না। কখনো কখনো কোনো শিল্পী কালো রঙে দুঃখ, সবুজে আনন্দ, হলুদে উৎসব, লালে দ্রোহ চিত্রিত করেন। এগুলোই এখন সাধারণভাবে মান্যতা পেয়েছে”, বলেছিল ক্যাভিন।

সেদিন কথাগুলোর গভীরতা ম্যারি বুঝেন নি। এখন বোঝেন, যখন ক্যাভিন পাশে নেই।

ক্যাভিন বুঝিয়েছিল, "আসলে মানুষ একরৈখিক নয়। কিছুটা বাঁকা। নানা কারণে এমন বক্রতা। কখনো স্বভাবের কারণে, কখনো পরিস্থিতির কারণে মানুষ বক্র হতে বাধ্য হয়। যেমন রংধনুও ধনুকের মতো বাঁকানো। কিন্ত কেন? এরও সুনির্দিষ্ট কারণ আছে। বৃষ্টির ফোঁটা থেকে আসা বিভিন্ন রঙের আলো চোখের সাথে সামান্য কোণ উৎপন্ন করে। ত্রিমাত্রিক জগতে সেই কোণ চোখের চারদিকেই উৎপন্ন হয়। ফলে তা দেখতে অনেকটা চোঙের মতো হয়। চোঙের উপরিপৃষ্ঠ বৃত্তাকার হয়। চোখের সাপেক্ষে চোখের চারদিকে রঙধনুর চোঙও বৃত্তাকার। সেজন্য রংধনুকে দেখতে বাঁকানো মনে হয়। তবে কেউ যদি রংধনুর পুরো বৃত্ত দেখতে চায় তাহলে তাকে উপরে উঠতে হবে। হতে পারে সেটা প্লেনে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে। সূর্য এবং রংধনু এই দুইয়ের মাঝে অবস্থান করলে বৃত্তাকার রংধনু দেখা যাবে।"

"মানুষকেও পরিপূর্ণভাবে দেখতে হয় দূর থেকে। যেমন, হিমালয়ের পায়ের কাছে দাঁড়ায়ে একটি প্রস্তরীভূত দেয়াল দেখা যাবে। যতদূরে যাওয়া যাবে, ততই হিমালয়ের পূর্ণ অবয়ব প্রকাশিত হবে। কাছের মানুষ থেকে দূরের মানুষকে আমরা অনেক বেশি ভালো করে দেখতে ও বুঝতে পারি।" এই ছিল ক্যাভিনের অভিমত।

“এটা কেমনে সম্ভব?’ প্রশ্ন করেছিল ম্যারি।

“খুবই সম্ভব। সারাজীবন পাশাপাশি থেকেও মানুষেরা নিজেদের চিনতে পারে না। স্বামী স্ত্রীকে, পিতা পুত্রকে, পুত্র পিতাকে খুব কমই চিনে। যদি সত্যিই চিনতো, তাহলে এতো বেদনা, ভুল বোঝাবুঝি মোটেও হতো না।”

ম্যারি আর তর্ক করার যুক্তি পান না। চুপ করে থাকেন। ক্যাভিন খানিকক্ষন ভেবে বলে,

“রংধনুতে রঙের ভেতর বাহির আছে। মানুষেরও ভেতর আর বাহির আছে। মানুষ নিজেই নিজের সবটুকু দেখে না, বোঝে না। অন্য মানুষ কি করে বুঝবে বলো?”

কিছুটা সময় নিয়ে বিষয়টি ম্যারিকে বুঝিয়ে বলে ক্যাভিন। আসলে সাধারণভাবে মানুষের একটি বা দুটি দিক প্রাধান্য পায় আর সেটাকেই অন্যরা মানুষাটির সবটুকু বলে ধরে নেয়। মনে করে, তিনি একজন রাগী মানুষ কিংবা ভীতু মানুষ অথবা লোভী মানুষ। এমন ধারণা সর্বাংশে সঠিক নয়। রাগী মানুষটিও কারো কারো প্রতি স্নেহশীল। ভীতু লোকটিও অকস্মাৎ প্রচণ্ড সাহসী হয়ে উঠতে পারে। কিংবা কোনো লোভী লোকও গোপনে দানশীল হতে পারে। এসব সাধারণের চোখে হয়ত দৃশ্যমান নয়। রংধনুতে যেমন সবসময় লাল রঙ রংধনু-বৃত্তের বাইরে অবস্থান করে আর বেগুনি রঙ ভেতরের দিকে থাকে। বাকি রঙগুলোও একটি নির্দিষ্ট ক্রমানুসারে সাজানো থাকে, তেমনি মানুষের কিছু বৈশিষ্ট্য বাইরের দিকে বা প্রকাশ্যে থাকে আর কিছু অন্তরালে।

মানব বৈশিষ্ট্যের একটি ক্রম আছে রংধনুর রঙগুলোর মতোই। সব সময় এবং পৃথিবীর সর্বত্র রংধনুর রঙ-সজ্জার ক্রমের এদিক সেদিক হয় না। একেবারেই নিয়মতান্ত্রিকতায় বেষ্টিত রঙগুলো। মানুষও কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য দ্বারা এমনভাবে পরিবেষ্টিত থাকে যে, তার চরিত্রকে অন্যভাবে কল্পনা করা যায় না। এজন্য দায়ী তরঙ্গ দৈর্ঘ্য। রংধনুর ক্ষেত্রে প্রতিটি রঙেরই একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গ দৈর্ঘ্য আছে। সাতটি রঙকে তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের ক্রমানুসারে সাজালে এই ক্রমটি পাওয়া যাবে- বেগুনী, নীল, আসমানী, সবুজ, হলুদ, কমলা, লাল। তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের পরিমাণ কম বেশি হলে প্রিজমের মধ্যে তাদের বেঁকে যাবার পরিমাণও কম বেশি হয়। মানে বেঁকে যাবার দিক থেকে সাতটি আলোই আলাদা।

পদার্থবিদ্যার নিয়ম সবখানে সবসময় এক। তাই সবসময় লাল রঙ রংধনুর বৃত্তের বাইরে অবস্থান করে। আর বেগুনী রঙ বৃত্তের ভেতরের দিকে অবস্থান করে। তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ক্রমানুসারে প্রতিবার বিশ্লিষ্ট হয়ে একই ক্রম-রঙের রংধনু সৃষ্টি করে। মানুষও অভিজ্ঞতায়, আচরণে, কাজকর্মে এমনই একটি ক্রম নিজের মধ্যে তৈরি করে ফেলে। ফলে মেজাজ দেখানো লোকটি ইচ্ছা থাকলেও এক সময়ে সর্বসম্মুখে আর স্নেহ দেখাতে পারে না কিংবা দেখালেও অতি সঙ্গোপনে দেখান। এসব সীমাবদ্ধতা ও আচরণগত দাসত্বের কারণে খুব ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও বহুলোক সত্য কথা বলতে পারে না। ভালোবাসার মানুষটিকে ভেতরে ভেতরে গভীরভাবে ভালোবাসলেও সে কথাটি খোলাখুলি জানাতে পারে না।

তবে বৃষ্টি হলে যেমন রংধনু দেখা যায়, তেমনি সঙ্কটে, আবেগে, বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে মানুষের চরিত্রের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা বিচিত্র রঙগুলো দেখতে পাওয়া যায়। তখন একজন মানুষের সবগুলো দিক সামনে চলে আসে। তবে বৃষ্টি হলেই যেমন রংধনু তৈরি হয় না আকাশে, তার জন্য সূর্যের উপস্থিতি থাকা লাগে, তেমনি বিশেষ পরিস্থিতি বা ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ কোনো মানুষের উপস্থিতির দরকার হয় একজন মানুষের সামগ্রিক চরিত্রের পূর্ণতর উন্মোচনের জন্যে।

কাভিনের শেষ কথাগুলো বর্শার মতো বিদ্ধ হয়ে আছে ম্যারির মগজে,

“ভালভাবে রংধনু দেখতে হলে আমাদের অবস্থান এমন হতে হবে যেন সূর্য আমাদের পেছনে আর রংধনু সামনে থাকে। একজন মানুষকে ভালোভাবে দেখতে ও বুঝতে হলে বিভিন্ন পরিস্থিতি ও আরো অনেকে মানুষের প্রয়োজন হবে। তখনই তুলনা করে দেখা যাবে সম্পূর্ণ মানুষটিকে তার নানা বৈশিষ্ট্যের আলোকে। এজন্যই কাছে থাকার মতো দূরে থাকাও জরুরি।”

ম্যারি এসব পুরনো কথা ভেবে শিহরিত হন যে, এমন একজন মানুষ তার জীবনে এসেছিল, যে কাছে থাকলে মনে হয় দূরের আর দূরে থাকলে অনুভব করা যায় অতি কাছের একজনের মতো।

পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার।

আরও পড়ুন: ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-৬

;