স্বাধীনতার সংবাদ ১৯৭১



ভূমিকা ও অনুবাদ আন্দালিব রাশদী
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সংবাদমাধ্যম এমনভাবে জড়িয়ে পড়েছিল, যে, শেষপর্যন্ত বিজয়টা যেন কেবল বাংলাদেশের নয়, গণমাধ্যমেরও বিজয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সংবাদপত্র বিভিন্নভাবে উচ্ছ্বাস প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। মূল সুরটির সূত্র একই—স্বাগত বাংলাদেশ, স্বাধীনতা অর্থবহ হোক, বৈরিতার অবসান ঘটুক, আঞ্চলিক শান্তি ও সংহতি ফিরে আসুক।


নিউ ইয়র্ক টাইমসে স্বাধীনতার সংবাদ
নয়াদিল্লি, ১৬ ডিসেম্বর।। পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা দখল করার পর এবং পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ কবুল করার পর ভারত আজ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সম্পূর্ণ অস্ত্রবিরতি ঘোষণা করেছে। পূর্বাংশে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে হাজার মাইল দূরে পশ্চিম রণাঙ্গনে পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো চুক্তি ছাড়াই বন্দুকের শব্দ থেমে গেছে, কাল রাত ৮টা থেকে অস্ত্রবিরতি কার্যকর হবে।

পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের কী মর্যাদা হবে, তা নিয়ে ১৪ দিনের তিক্ত যুদ্ধ শেষে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ‘আমাদের বিবেচনায় বর্তমান যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অর্থহীন।’

পাকিস্তানে ঘাটতির সমস্যা
দেশব্যাপী এক বেতার ভাষণে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান বলেন, ‘যুদ্ধ অব্যাহত আছে এবং আমরা লড়াই চালিয়েই যাব।’

নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকরা বিশ্বাস করেন (প্রেসিডেট যা-ই বলুন) পাকিস্তানের সরবরাহ লাইনে তীব্র সমস্যা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি ও গোলাবারুদের মজুদ পাকিস্তানকে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে টিকতে দেবে না।

পশ্চিম রণাঙ্গনে ছোট পাকিস্তানি শহর পাঞ্জাবের শাকারগড়ের কাছে এ দ্বন্দ্বে সবচেয়ে বড় ট্যাংকযুদ্ধে ভারত—পাকিস্তানের ৪৫টি ট্যাংক ধ্বংস করেছে বলে দাবি করেছে, অন্যদিকে ভারত হারিয়েছে ১৫টি ট্যাংক।

ভারত যখন পূর্বাঞ্চলে বিজয় উদযাপন করছে, চীন অভিযোগ করেছে ভারত তার প্রোটেক্টরেট সিকিম ও তিব্বতের সীমান্ত লঙ্ঘন করে চীনা ভূখণ্ডে অন্যায় অনুপ্রবেশ করেছে।

চীনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান
ভারতীয় কর্মকর্তারা বলেছেন, চীন সীমান্তে কোনো যুদ্ধই হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, পিকিং (এখন বেইজিং) পাকিস্তানের সমর্থক, তাদের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

পূর্ব পাকিস্তানে ভারতীয় আক্রমণ শুরু হয় ৪ ডিসেম্বর ভোরে এবং ৪ ডিভিশন পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদলের আত্মসমর্প্রণের মধ্য দিয়ে আজ বিকাল ৪টা ৩১ মিনিটে তা শেষ হয়।

ঢাকায় আত্মসমর্পণ দলিল সই করেন পাকিস্তান পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান লেফেটন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি এবং ভারতীয় পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা।

বিদ্রোহী বাংলাদেশ সরকারের চারজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কাল ঢাকা এসে পৌঁছবেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের কার্যক্রম শুরু করবেন।

আত্মসমর্পণ দলিলে বলা হয়, ভারতীয় বাহিনী আত্মসমর্পণকৃত সব পাকিস্তানি সৈন্য, বিদেশি নাগরিক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য এবং পশ্চিম পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত সবার নিরাপত্তা প্রদান করবে।

পশ্চিম পাকিস্তানি ও তাদের সমর্থক এবং বিহারিদের ওপর কোনো ধরনের প্রতিশোধমূলক নিপীড়ন এবং তাৎক্ষণিক বিচার ও হত্যা ঠেকাতে ভারত তার দৃঢ় সংকল্পের কথা ব্যক্ত করেছে। ১৯৭১-এর মার্চে পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলে বাঙালিরা আট মাস ধরে পশ্চিম পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে নির্মমভাবে লাঞ্ছিত হয়।

আজকের আত্মসমর্পণ সম্পূর্ণভাবে একটি সামরিক বিষয়—ভারত ও পাকিস্তানের সংকট সমাধানের কোনো রাজনৈতিক চুক্তি নয়। এমনকি আন্দোলনকারী বাঙালি ও পাকিস্তানের মধ্যেও নয়।

সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে, পূর্ব বাংলার ক্যারিশম্যাটিক রাজনৈতিক নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্যে কী ঘটবে, তা জানা। রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে তিনি এখনো পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে রয়েছেন।
শেখ মুজিব নামে বহুল পরিচিত এ নেতার মুক্তির জন্য ভারত পাকিস্তানের জেনারেল ইয়াহিয়ার ওপর যতটা বেশি সম্ভব চাপ দেবে। তাকেই আন্দোলনকারী বাঙালিরা প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছে এবং তাদের দেশের নাম দিয়েছে বাংলাদেশ। ভারতীয়রা আশঙ্কা করছে তাকে মুক্তি দেওয়া না হলে পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষমতার লড়াই এবং সংকট বিরাজ করবে।

ঢাকায় পাকিস্তানি কমান্ডার জেনারেল নিয়াজি ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র কনস্যুলেট অফিসের মাধ্যমে গতকাল আত্মসমর্পণের বার্তা পাঠালে জটিল দরকষাকষি পর্ব শেষ করে এ আত্মসমর্পণের আয়োজন করা হয়। ভারতীয় কর্মকর্তা আজ জানিয়েছেন জেনারেল নিয়াজি তার সৈন্যদের নির্ধারিত এলাকায় ‘রিগ্রুপ’ করতে চেয়েছেন অর্থাৎ লড়াই থামিয়ে সৈন্যদের স্ব স্ব অফিসারের নিয়ন্ত্রণে অস্ত্র সংবরণ করতে চেয়েছেন।

বোমাবর্ষণ বন্ধের নির্দেশ
কিন্তু তা ভারতীয়দের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। তারা সকাল ৯টায় মধ্যে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণের নির্দেশ পাঠায়। আত্মসমর্পণ উৎসাহিত করতে রাত থেকে বোমাবর্ষণ বন্ধ রাখা হয়। সকাল ৯টার আলটিমেটাম শেষ হওয়ার ৩০ মিনিট আগে জেনারেল নিয়াজি মিলিটারি রেডিওতে ভারতীয় আহবানের জবাব দেন। তিনি ৬ ঘণ্টা সময় প্রার্থনা করেন, তিনি একে বলেন সন্ধি। আত্মসমর্পণের বিস্তারিত দরকষাকষির জন্য একজন সিনিয়র ভারতীয় জেনারেলকে ঢাকায় আসার আমন্ত্রণ জানান।

ভারতীয় বাহিনী যখন উত্তর দিক থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে এগোচ্ছে এবং ঢাকার মাত্র দুই মাইলের মধ্যে চলে এসেছে, তখন ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব হেলিকপ্টারে ঢাকা এলেন।

জেনারেল জ্যাকব ও নিয়াজি যখন আত্মসমর্পণ চুক্তির শর্তাবলি নিয়ে সম্মতি জানালেন। জেনারেল জ্যাকবের ঊর্ধ্বতন কর্মকতা জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা ও অন্যান্য ভারতীয় কর্মকর্তা আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত দলিল সই করতে ঢাকায় এলেন।

ভারতীয় প্রতিনিধি দলে মুক্তিবাহিনী নামে খ্যাত বাঙালি বিদ্রোহী গেরিলাদের চিফ অব স্টাফ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন (এ অংশটি যথার্থ নয়)। তারপর আনন্দ-উচ্ছল বাঙালি জনতার সামনে দুটি ভারতীয় ব্যাটালিয়ন এবং দুটি বাঙালি ব্যাটালিয়ন ঢাকায় প্রবেশ করে এবং পাকিস্তানি বহিনীর কাছ থেকে সবকিছু বুঝে নেয়।

পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের কিছু সংখ্যক সৈন্য কেবল ঢাকায় অবস্থান করছিল, অন্যরা বিভিন্ন অঞ্চলে। নয়াদিল্লিতে ভারতীয় কর্মকর্তারা জানান, অস্ত্র সমর্পণ করার জন্য নিয়াজি সব ইউনিটে নির্দেশ পাঠিয়েছেন।

পূর্বাঞ্চলে যুদ্ধে নাটকীয় শেষ অধ্যায়ে ভারতীয় বাহিনী গত রাতে বিভিন্ন ধরনের সৈন্যদের একটি কম্পোজিট ফোর্সের মাধ্যমে ভারত তার প্রথম অ্যাম্ফিবিয়াস ল্যান্ডিং—উভচর অবতরণ করে, নৌ-সেনারা তীরে উঠে কক্সবাজারের দক্ষিণাঞ্চলে হালকা প্রতিরোধ নস্যাৎ করে দেয়।

এই অ্যাম্ফিবিয়াস ল্যান্ডিং এটা বুঝিয়ে দেয় যে একদা তুলনামূলকভাবে দুর্বল ও অসংগঠিত ভারতীয় বাহিনী অংশত সোভিয়েত সহায়তায় সাম্প্রতিক সময়ে অনেক উন্নতি সাধন করেছে। এ যুদ্ধে ভারত অগ্রগামী প্রযুক্তি ও প্রদ্ধতি ব্যবহার করেছে—হেলিকপ্টার থেকে আক্রমণ, বিপুল সংখ্যক প্যারাট্রুপার অবতরণ এবং নৌ-অবরোধ। মিসেস গান্ধী পশ্চিম রণাঙ্গনে যুদ্ধবিরতির নির্দেশের সঙ্গে জাতির উদ্দেশে তার বেতার ভাষণও পাঠিয়েছেন। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে অবস্থানরত তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার শরণ সিংকেও তা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ইন্দিরা গান্ধীর বার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে: ‘সীমান্ত সম্প্রসারণের কোনো আগ্রহ ভারতের নেই। এখন যেহেতু পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশে আত্মসমর্পণ করেছে এবং বাংলাদেশ মুক্ত, আমরা মনে করি এ অবস্থায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অর্থহীন।

ভারতীয় সংসদে আনন্দ
লেবু-বর্ণ শাড়ি পরে প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী যখন ভারতীয় পার্লামেন্টে পূর্ব পাকিস্তানে আত্মসমর্পণের সংবাদ দেন, লোকসভা উল্লাসে ফেটে পড়ে।

নয়াদিল্লিতে যদিও এ নিয়ে কোনো গণবিজয় উৎসব হয়নি, লোকজন যথারীতি কর্মক্ষেত্রে গিয়েছে। তাদের প্রশান্ত অবয়বের আড়ালে স্পষ্টতই আনন্দ-অহংকার ফুটে ওঠে। তারা ক্ষুব্ধও ছিল, প্রেসিডেন্ট নিক্সনের জন্য এক ধরনের ঘৃণা জমিয়ে রেখেছে। তারা মনে করেন—নিক্সন শেষ মুহূর্তে পাকিস্তানকে উদ্ধার করার জন্য বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহরের একটি টাস্কফোর্স পাঠিয়েছেন।

ভারতে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মান ও গুরুত্ব ধুলায় লুটিয়েছে, সোভিয়েত ইউনিয়ন সেখানে তাদের ক্রমাগত কূটনৈতিক সমর্থন এবং জাতিসংঘের অস্ত্রবিরতি প্রস্তাবে পুনঃ পুনঃ ভেটো দিয়ে জনগণের কাছে সম্মানের আসনে অবস্থান করছে।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জাতির উদ্দেশে যে ভাষণ দিয়েছেন, তা শুনে মনে হবে তিনি পশ্চিম রণাঙ্গনে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চাচ্ছেন।

পাকিস্তানের একটি পদাতিক ও দুটি সাঁজোয়া ডিভিশন রয়েছে, এদিকে সীমান্তে ভারতীয় পক্ষেও প্রায় সমান বহর রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এতে কদিনে ভারতীয় একজন কর্মকর্তার ভাষায় তারা পাঞ্জাবের পাকিস্তান অংশে শাকারগড় শহরে বিস্তারিত জরিপ চালিয়েছে এবং ৩৬০ বর্গমাইল পাকিস্তানি এলাকা নিজেদের দখলে নিয়েছে।

গত রাতে এবং আজ পাকিস্তান ভয়ঙ্কর পাল্টা আক্রমণ চালিয়েছে। ভারতীয় বাহিনী শাকারগড়ে রাভি নদীর পশ্চিম তীর পর্যন্ত পৌঁছেছে। এখনো শহর দখল করতে পারেনি।

ভারতীয়রা বলেছে, তারা ট্যাংকের স্কোয়াড্রন পাঠিয়ে পাল্টা আক্রমণ করেছে প্রতি স্কোয়াড্রনে ১৪টি ট্যাংক-একটার পর একটা স্কোয়াড্রন গিয়ে ভারতীয় বাহিনীতে শক্তি যোগ করছে। মুখপাত্র জানায়, এ কারণে আজ ভয়ঙ্কর ট্যাংক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে।

ভারতীয় বাহিনীর চিফ অব আর্মি স্টাফ জেনারেল এসএইচপিজে মানেকশ বলেছেন, আজ পূর্ব বাংলায় যে পাকিস্তানি সেনাদল আত্মসমর্পণ করেছে, তাদের সৈন্যদের জন্য উপযুক্ত এবং প্রাপ্ত মর্যাদা ও সম্মান দেওয়া হবে। পশ্চিম রণাঙ্গনে যুদ্ধ সম্পূর্ণ শেষ হয়ে না আসা পর্যন্ত পাকিস্তানি সৈন্যদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি ভাবা যাচ্ছে না।

যৌথ কমান্ড
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধার ও গণ সুযোগ-সুবিধাগুলো চালু করতে ভারতীয় ও বাঙালি সৈন্যদের যৌথ কমান্ড কাজ করবে, এতে বাঙালিরা সম্মত। যৌথ কমান্ডে ভারতীয়রা জ্যেষ্ঠ মর্যাদার।

একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা একান্তে বলেছেন, বিশ্বাস করুন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমরা বাংলাদেশ থেকে বেরিয়ে যেতে চাই। আমরা দখলদার বাহিনী হিসেবে থাকতে চাই না, কিংবা এমন মনে হোক এটাও চাই না।

ভারতীয় কর্মকর্তারা বলেছেন, ভারত সীমান্ত লঙ্ঘন করেছে বলে চীন যে অভিযোগ করেছে, তাতে বিচলিত হওয়ার কারণ নেই। একজন বলেছেন, চীনের এ কথায় অমঙ্গলের কোনো আশঙ্কা নেই, তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন চীন দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষাই করছে, এখন হস্তক্ষেপ করে পাকিস্তানের কোনো উপকার করতে পারবে না।

অন্য পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, চীন অবশ্যই আতঙ্কিত এবং তার দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারতের কূটনৈতিক সাফল্যে ক্রুদ্ধ। ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন এখন বন্ধুত্বের চুক্তিতে আবদ্ধ। ১৯৬২ সালে সংক্ষিপ্ত ও সীমিত আকারের সীমান্ত যুদ্ধে চীন ভারতকে ভালোভাবেই পরাস্ত করেছিল।

 

মর্নিং স্টার, লন্ডন
ইয়াহিয়ার সৈন্যদের পরাজয়ে বাংলাদেশ নৃত্য করেছে

বাংলাদেশে গণহত্যার দায় ভুট্টো সাহেবকেও বহন করতে হবে—সে দেশের জনগণ ও নেতৃত্ব স্বাধীন দেশের ঘোষণা দিযেছে। বহু বিদেশি দূতাবাসে কর্মরত বাঙালিরা বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্যের ঘোষণা দিয়েছে। পূর্ববাংলার মানুষ ভুট্টোকে ক্ষমা করবে আর রক্তাক্ত যুদ্ধটা ভুলে যাবে, তা হওয়ার নয়। দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে যে পরিবর্তন ঘটেছে, তা আর বদল হওয়ার নয়। সে কারণেই ইন্দোনেশিয়ার মুসলমান ছাত্র সংস্থা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে।

২৩ ডিসেম্বর ১৯৭১

উতুসান, মালয়েশিয়া
একটি নতুন জাতির জন্ম

গত রাতে ঢাকা শহর রাস্তায় ভেঙে পড়েছে। আনন্দে নৃত্য করেছে, ফুল ছিটিয়েছে, ভারতীয় সৈন্যদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। চিৎকার করে বলেছে, ‘বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্ব দীর্ঘজীবী হোক’।

বিচ্ছিন্ন পাকিস্তানি ইউনিটগুলোতে পাকবাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের খবর পৌঁছলে গোলন্দাজ গোলা ও ছোট অস্ত্রের গুলির শব্দ একাকার হয়ে যায়।

নতুন বাংলাদেশের জনপ্রশাসন আজ ঢাকায় পৌঁছার কথা—প্রাথমিক মেরামত ও পুনর্গঠন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত ভারতীয় সেনাবাহিনী থেকে যেতে পারে।
ভারতীয় পূর্বাঞ্চলের কমান্ডার জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা সেনাবাহিনী, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানদের নিয়ে ঢাকা শহরের মধ্যে রেসকোর্সে হাজির হন। এখানেই ভারতীয় ডেডলাইনের ১০ মিনিট আগে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ স্বাক্ষরিত হয়।
বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের পরও ওয়াশিংটন থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, পৃথিবীর বৃহত্তম উড়োজাহাজবাহী নৌযান এন্টারপ্রাইজে যুক্তরাষ্ট্রের টাস্কফোর্স বঙ্গোপসাগরের দিকে এগোচ্ছে।

১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১

আল সিয়াসা, কুয়েত
আবেগ ঝেড়ে এগিয়ে যাওয়া

জাতীয় পরিষদ আমাদের দেশের একটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। পাকিস্তানের যে জেনারেলরা অস্ত্রের জোরে ক্ষমতা দখল করেছে, আমাদের জাতীয় পরিষদ তাদের পাশে দাঁড়াক, এটা আমাদের প্রত্যাশিত ছিল না। এটাও প্রত্যাশিত ছিল না, আমাদের জাতীয় পরিষদ ভারতীয় গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে চলবে, যে সরকার ক্ষমতাসীন হয়েছে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও নির্বাচনের মাধ্যমে। অধিকন্তু পাকিস্তানি জেনারেলরাই পূর্ব পাকিস্তান থেকে গণতন্ত্রের অস্তিত্ব বিলোপ করতে চেয়েছিল—যখন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করল, মুজিবুর রহমানকে কারারুদ্ধ করা হলো, তার সঙ্গী গণপ্রতিনিধিদের সংসদ থেকে বের করে দেওয়া হলো আর জনগণকে করা হলো দেশছাড়া। আমরা কি সে জন্যই এখনো পাকিস্তানের পাশে দাঁড়িয়ে আছি?
এটা হতবাক করা একটা প্রশ্ন আর অবস্থাটাও অদ্ভুত। কাজেই আমাদের মনের দরজা খুলে মস্তিষ্ক ও যুক্তি ব্যবহার করে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে বিচার করতে হবে। এগোতে হবে আবেগকে ঝেড়ে ফেলে। (সাবেক জাতীয় পরিষদ সদস্য খালিদ খালিসের রচনা)।

১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১

ডেইলি নেপাল, কাঠমান্ডু
পাকিস্তানের পরাজয়ের প্রকৃত কারণ

পাকিস্তানের মানচিত্র থেকে পূর্ব পাকিস্তানের অবলুপ্তির কারণ শাসকদের ওপর পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের চরম বিতৃষ্ণা। পূর্বাংশের মানুষ ইসলামাবাদের উপেক্ষার শিকার। যদিও তারাই বৈদেশিক মুদ্রার অধিকাংশই উপার্জন করত। পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনামূলক বিবেচনায় কেন্দ্রীয় সরকার তাদের শিল্প বিকাশ ঘটতে দেয়নি।
কাজেই পাকিস্তান থেকে সরে আসার জন্য পূর্ব পাকিস্তানি জনগণের যে লালিত বাসনা সাম্প্রতিক পাক-ভারত যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ে তা অর্জিত হয়েছে। এই পরাজয়ের মধ্যে থেকে জন্ম নিয়েছে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ।
যুদ্ধ যে ধ্বংস সাধন করে গেছে তা পুনর্নির্মাণ ও মেরামতের জন্য সাড়ে সাত কোটি মানুষের আর্থিক সাহায্য ও সহযোগিতা লাগবে।...আমরা মুসলিম দেশগুলোর প্রতি আবেদন জানাচ্ছি তারা যেন বাংলাদেশে তাদের ভাইদের সাহায্য করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশের মানুষকে আশ্বস্ত করতে হবে যে তারা তাদের মাটিতে শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ জীবনযাপন করতে পারবেন।

২০ ডিসেম্বর ১৯৭১

নবীন খবর কাঠমান্ডু
বাংলাদেশ একটি বাস্তবতা

সাম্প্রতিক যুদ্ধে পাকিস্তানকে তার অর্ধেকের বেশি অংশ হারাতে হয়েছে। এর কারণগুলো বিবেচনা করা দরকার। কিন্তু তা না করে নবনিযুক্ত প্রেসিডেন্ট ভুট্টো সাহেব তার দেশের নামে বিবৃতি জারি করছেন, যে দেশ আমাদের কেবল হতাশাই বৃদ্ধি করেছে। সবাই জানেন পাকিস্তান ভেঙে যাওযার দায় ইয়াহিয়া খানের চেয়ে ভুট্টোর কম নয়। সাধারণ নির্বাচনের পর ভুট্টো যদি ইয়াহিয়া খানকে কুপরামর্শগুলো না দিতেন, পূর্ব পাকিস্তান তাহলে আজ আর আলাদা দেশে রূপান্তরিত হতো না। যেভাবেই হোক পূর্ব পাকিস্তানের সব নাগিরকের প্রত্যাশার মুখে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছে।

পৃথিবীর কোনো শক্তিই আর এ সত্যকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না। ভুট্টো সাহেবের উচিত সত্য অনুধাবন করা। আমরা তাকে সেই পরামর্শই দিই। গতকাল তিনি যে ভাষণ দিয়েছেন তা স্ববিরোধী ও হতাশাব্যঞ্জক। তিনি দাবি করেন, তিনি পাকিস্তানের নির্বাচিত নেতা। কিন্তু তাকে স্বীকার করতেই হবে নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী শেখ মুজিবুর রহমান তার চেয়ে আরো বড় নেতা। তিনি যদি নির্বাচনের রায়কে গণতান্ত্রিক মানসিকতা নিয়ে মেনে নিতেন তাহলে বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্য কোনো মুক্তিসংগ্রামের প্রয়োজন হতো না। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ লাগত না এবং এমনভাবে পাকিস্তানকে পরাজিতও হতে হতো না।

যাক, গত ক’মাসে যেসব ঘটনা ঘটেছে ভুট্টো সাহেব তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবেন এবং এখনো টিকে থাকা পশ্চিম পাকিস্তানের ঐক্য অটুট রেখে রক্ষা করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবেন বলে আশা করা যায়। অন্য কথায় তাকে অবশ্যই বাংলাদেশের অস্তিত্ব স্বীকার করে নিতে হবে। অপরপক্ষে তিনি যদি ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি নেন তাহলে ইয়াহিয়া যেভাবে পূর্ব পাকিস্তান হারিয়েছেন তাকেও তেমনি পশ্চিম পাকিস্তান হারানোর জন্য পৃথকভাবে সম্পূর্ণ দায়ী থাকতে হবে—পাকিস্তানের অপরাধের দায় তাকেই গ্রহণ করতে হবে। আর কোনো কারণে তিনি যদি তা না করেন, তাকেও তাহলে ইয়াহিয়া খানের ভাগ্যই বরণ করতে হবে।

২২ ডিসেম্বর ১৯৭১

আলতাখি, ইরাক
যুদ্ধের জন্য পাকিস্তানি সামরিক শাসকই দায়ী

পাঞ্জাবি শোষণের যে তিক্ত অভিজ্ঞতা বাঙালিরা দীর্ঘদিন ধরে সয়ে আসছে, বাঙালির বিরুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্যাতনের ইতিহাস এবং লাখ লাখ নাগরিকের শরণার্থী হিসেবে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ সবকিছু এমন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে—যার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে আপস-মীমাংসার আর কোনো সুযোগ রইল না—এটা এখন অসম্ভব।

১৮ ডিসেম্বর, ১৯৭১

দ্য ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর, বোস্টন
সবচেয়ে স্মরণীয় বিজয়

পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা বাংলাদেশের মানুষের সমস্যাকে যেভাবে উপেক্ষা করেছে, জনগণের অধিকার গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং গণতন্ত্রকে পদদলিত করে তা থেকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধের সৃষ্টি করেছে।
পাকিস্তান যদি কেবল দেশের পূর্বাঞ্চলের জনগণের আইনি ও স্বাভাবিক অধিকারগুলোর প্রতি নজর দিত, কখনোই পরিস্থিতির এমন বিস্ফোরণ ঘটত না।
কেবল জাতিগুলোর মধ্যে সাম্য ও পরস্পরের অধিকার সম্পর্কে শ্রদ্ধাই সত্যিকার সমাজ গড়ে তুলতে পারে।

১২ ডিসেম্বর ১৯৭১

তিনি (মিসেস ইন্দিরা গান্ধী) সবচেয়ে স্মরণীয় বিজয় লাভ করেছেন। পাকিস্তানের পেশাদার সৈন্যরা নারী হওয়ায় তাকে অবজ্ঞা করেছিল। এ মেয়েলোক যুদ্ধের কী জানে?
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর এমন সম্পূর্ণ ও সুনির্দিষ্ট বিজয় আর ঘটেনি, অহঙ্কারী পাকিস্তানি সৈন্যদের ধূলিতে নামিয়ে আনতে ঠিক দু’সপ্তাহ সময় লেগেছে, আর এ সময়েই পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্রের অভ্যুদয় ঘটেছে।
এভাবেই দুটি পাকিস্তানের সমাপ্তি ঘটল। এখন থেকে কেবল একটি পাকিস্তান, পশ্চিম।

১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১

আল এহরাম, কায়রো
সমঝোতার আর পথ নেই

পূর্ববাংলা প্রসঙ্গে যে কথাটি বলতেই হয়—বাংলাদেশ এখন বাস্তবতা। জেড এ ভুট্টোর সহযোগিতায় পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিকজান্তা পূর্ববাংলায় যে আক্রমণ করেছে তা কখনো ভুলে যাওয়ার নয়। এখন পাকিস্তানকে জেড এ ভুট্টোর স্বার্থেই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে হবে। আর তারই উচিত হবে শান্তি ও প্রগতির পথে পশ্চিম পাকিস্তানি জনগণের নেতৃত্বের দেওয়া।

১৮ ডিসেম্বর ৭১

ধারাবাহিক উপন্যাস ‘রংধনু’-২



মাহফুজ পারভেজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

[দ্বিতীয় কিস্তি]

মেয়ের ব্রোকেন ফ্যামিলির বেহাল দশার খবর জেনে একদিন ম্যারির মা এসে হাজির। যথেষ্ট বৃদ্ধ হলেও মিসেস অ্যানি গিলবার্ট, ম্যারির মা, এখনো বেশ শক্তপোক্ত ও কর্মঠ। মা আসায় বাড়িটি কিছুটা প্রাণ পেলো। মেয়ে আর নাতীকে নিয়ে মিসেস অ্যানি গিলবার্ট চারপাশে আনন্দময় একটি পরিবেশ গড়ে তুললেন। তারপর কিছুদিনের মধ্যেই তিনি রুদ্রমূর্তি ধারণ করলেন। ক্রুসেড ঘোষণার মতো তিনি বাড়ি থেকে ক্যাভিনের যাবতীয় স্মৃতি মুছে ফেলতে লাগলেন। তার পরিত্যক্ত জামা-কাপড়, বইপত্র, এমনকি দেয়ালে ঝুলানো একটি হাস্যোজ্জ্বল ছবিও মিসেস অ্যানি গিলবার্টের ক্ষোভ থেকে রেহাই পেলো না। তিনি সময় পেলেই গজগজ করে ক্যাভিনকে অভিসম্পাত করেন এবং তার মেয়ের সকল দুর্গতির জন্য তাকে আসামী করে অভিযোগ করতে থাকেন। মিসেস অ্যানি গিলবার্টের চোখে পৃথিবীর একমাত্র মন্দ লোক এবং তাদের চরম শত্রু ক্যাভিন।

ক্যাভিনের প্রতি মায়ের প্রচণ্ড ক্ষোভের কোনো প্রতিক্রিয়া জানান না ম্যারি। ক্যাভিন সম্পর্কে কোনো কিছু জানতে চাইলেও উত্তর দেন না। ক্যাভিনের প্রসঙ্গ এলেই ম্যারি নিশ্চুপ থাকেন। যদিও ক্যাভিনের পক্ষে বলার মতো কোনো যুক্তি কিংবা বাস্তবতা তার কাছে নেই। আবার ওর বিরুদ্ধে কিছু বলতেও ম্যারির মন সায় দেয় না। চুপচাপ ম্যারি ভাবেন, “সব কিছু মুছে ফেললে কিংবা সব জিনিস ফেলে দিলেই স্মৃতিরা হারিয়ে যাবে? স্মৃতি তো বস্তুগত বিষয় নয়। সত্ত্বার সঙ্গে মিশে থাকা স্মৃতি সহজে হারায় না।”

মিসেস অ্যানি গিলবার্ট কিছুদিনের মধ্যেই পুরো বাড়ি থেকে ক্যাভিনের অস্তিত্ব সাফ করে দিলেন। ক্যাভিন নামে একজন এই বাড়ির বাসিন্দা ছিল, এমন কোনো চিহ্নই আর রইল না। এখানেই থেমে থাকলেন না তিনি। পাড়ায়, বাজারে, যখন যেখানে যান, সেখানেই ক্যাভিনের একটি নিগেটিভ ইমেজ তৈরিতে ব্যস্ত হলেন। মিসেস অ্যানি গিলবার্ট আসলে খুব নেতিবাচক ও পরচর্চ্চাকারী মানুষ নন। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন, মেয়ের জীবন থেকে চলে যাওয়া ক্যাভিনের স্মৃতিগুলো ওর মন থেকে মুছে ফেলনে নতুন একটা পরিবেশ তৈরি হবে। ম্যারি হয়ত নতুন জীবনও শুরু করতে পারবে। তিনি মেয়ের জন্য গোপনে যুৎসই পাত্র খুঁজতেও তৎপর হলেন। মা হিসেবে এসব কাজকে তিনি তার দায়িত্ব মনে করেন।

মিসেস অ্যানি গিলবার্টকে দোষ দেওয়া যায় না। কন্যার স্বার্থচিন্তায় সব মায়েরাই এমন করেন। তিনি কোনো ষড়যন্ত্র বা গোপন লুকোছাপার আশ্রয় নেন নি, সব কিছু প্রকাশ্যেই করছেন। ম্যারিকেও তিনি পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছেন, “তোমাকে এভাবে একাকী ও নিঃসঙ্গভাবে কাটাতে আমি দেবো না। আমার জীবনে তুমি আর তোমার ভাই পিটার ছাড়া কেউ নেই। পিটার ফিলাডেলফিয়ায় চাকরি নিয়ে বেশ আছে। ওকে নিয়ে চিন্তা নেই। তোমার ছেলে টমাসকে নিয়ে আমি থাকবো আর তুমি নতুন করে জীবন শুরু করবে।”

মায়ের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে পরিকল্পনাগুলো শুনেন ম্যারি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় সম্মতি কিংবা অসম্মতি জানান না। তিনি জানেন, বিধবা মায়ের সঙ্গে তর্ক অর্থহীন। তিনি এসেছেন সাহার্য্য করতে। তাকে মোটেও বিমুখ করা যাবে না। তর্ক-বিতর্ক করে পরিবেশ বিষিয়ে লাভ নেই। বরং চুপ থাকলে এক সময় মা হাল ছেড়ে দেবেন।

কিন্তু মিসেস অ্যানি গিলবার্ট কঠিন প্রকৃতির মানুষ। সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন মোটেই। তিনি চা কিংবা কফি পানের জন্য চেনাজানা তরুণদের বাসায় আমন্ত্রণ জানাতে শুরু করেন। ভদ্রতা স্বরূপ ম্যারিকে তাদের সঙ্গ দিতে হয়। তবে নতুন জীবন শুরুর প্রসঙ্গ এলেই ম্যারি প্রসঙ্গান্তরে কিংবা আলোচনা থেকে কোনো উছিলায় সন্তর্পণে সরে আসেন।

বিরক্ত মিসেস অ্যানি গিলবার্ট এক সময় মেয়ের কাছে সোজাসুজি জানতে চান,

“তোমার আসল পরিকল্পনা আমাকে বলো? মধ্য ত্রিশ বয়সের একজন নারী হিসেবে বাকী জীবন একা থাকা তোমার পক্ষে দুরূহ।”

“আমি জানি। কিন্তু এখনই নতুন করে আবার জীবন শুরুর ব্যাপারে আমি মনস্থির করতে পারি নি। আমাকে কিছু সময় দাও।”

এরপর আর কথা চলে না। মিসেস অ্যানি গিলবার্ট চুপ করে ঘরের কাজে মন দেন। তার সন্দেহ হয়, তবে কি ক্যাভিন গোপনে এখনো যোগাযোগ রাখছে? কৌশলে নানা রকমের তদন্ত করে তিনি শঙ্কামুক্ত হন। না, ক্যাভিনের বিন্দুমাত্র সন্ধান এই তল্লাটের কেউ জানে না। ম্যারির সঙ্গেও সামান্যতম যোগাযোগ নেই বেচারার। তাহলে ম্যারি এমন করছে কেন? কেন তার সিদ্ধান্তহীনতা? মিসেস অ্যানি গিলবার্ট এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে মেয়ের আচরণ ও চাল-চলনের দিকে বিশেষ মনোযোগী হন।

প্রথম প্রথম মিসেস অ্যানি গিলবার্ট কিছুই টের পান নি। তার গভীর ঘুমের বাতিক। একবার ঘুমালে কিছুই টের পান না তিনি। একরাতের মধ্য প্রহরে ঘুম ভেঙে দেখেন ম্যারি ঘরে নেই। টমাস একাকী ঘুমাচ্ছে বিছানায়। বাথরুম থেকেও কোনো শব্দ আসছে না। চিন্তিত মিসেস অ্যানি গিলবার্ট অবশেষে ম্যারির দেখা পেলেন বাগানে পাইন গাছের নিচে। জানালা দিয়ে অন্ধকারে ডুবে থাকা চরাচরে ঈষৎ আলোর ঝলকানির মতো ম্যারিকে দেখা যাচ্ছে। ম্যারির কফি রঙা খয়েরি চুল কালো বাতাসে অনামা রঙের আদলে অদ্ভুত শিহরণে দুলছে।

পর পর কয়েক রাত ঘাপটি মেরে মিসেস অ্যানি গিলবার্ট মেয়ের গতিবিধি অনুসন্ধান করেন। অবশেষে তিনি নিশ্চিত হন যে, রাতের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে দিয়ে বাড়ির দেওয়ালঘড়ি মধ্যরাত্রির জানান দিলে ম্যারি বিছানা ছেড়ে দেয়। ঠিক বারোটায় চকিতে উঠে দাঁড়ায় ম্যারি। তারপর ধীর পায়ে পৌঁছে যায় বাগানে। খানিক পায়চারী পর স্থির হয় পাইনের তলে।

আরও পড়ুন: ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১

মিসেস অ্যানি গিলবার্টের স্মরণ শক্তি বেশ। তাই তিনি খুবই হতবাক হন ম্যারি মধ্যরাতের অদ্ভুত অভ্যাসের কারণে। কারণ, তিনি বিলক্ষণ জানেন, ম্যারি ছোটবেলা থেকেই ভীষণ ভাবে ভূত বিশ্বাস করে। গ্রামের দিকে তো বটেই, খাস শহরেও সন্ধ্যার পর ঘরের বাইরে বের হতে ভয় পেতো তার মেয়ে। তাদের এই ক্যাম্পাস সিটির আবাসকে নামেমাত্র শহর বললেও আসলে এটি এক প্রত্যন্ত গ্রাম। সুনির্দিষ্টভাবে একে গ্রাম বলাও ভুল হবে। শহর পেরিয়ে পাহাড়তলির ওপর ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা কয়েকটা কাঠের বাড়ির একটি আবাসিক ব্লক আর চারপাশে সীমাহীন বন-জঙ্গল। সাঁঝবেলাতেই নিঝুম রাত নেমে আসে জায়গাটিতে। এখানে তার নিজেরও কেমন একটা ভয়-ভয় করে। অথচ তার ভীতু মেয়েটি দ্বিধাহীন পদক্ষেপে দিব্যি মাঝরাতে বাগানে ঘুরছে?

পরদিন নাস্তার টেবিলে ম্যারিকে চেপে ধরেন মিসেস অ্যানি গিলবার্ট।

“ওতো রাতে বাগানে তোমার কি কাজ থাকে?”

ম্যারি প্রশ্ন শুনেও খানিক চমকিত হলেও নির্বিকার থাকেন। তার অভিব্যক্তিতে মনে হয়, ঘটনাটি যেন অতি স্বাভাবিক বিষয়। এতে অবাক হওয়া বা প্রশ্ন করার মতো কিছু নেই। মায়ের কৌতূহল নিবৃত্ত করতে তিনি সংক্ষিপ্ত উত্তর দেন,

“আমি পাইন গাছের সান্নিধ্যে যাই।”

“পাইন গাছের কাছে? কেন? তা-ও এতো রাতের বেলা?”

“কারণ আমি খুবই একেলা। পাইন গাছের মতো একাকী।”

মিসেস অ্যানি গিলবার্টের চোখে বিস্ময়। তার মুখ লা-জওয়াব। মেয়ের এমন কথার কি উত্তর দেবেন তিনি জানেন না। এরকম কথা কখনো কারো কাছে শুনেছেন বলে তিনি মনে করতে পারেন না। সম্বিৎ হারানোর মতো অবস্থা হলেও মিসেস অ্যানি নিজেকে সামলে নিয়ে মেয়ের সঙ্গে আলাপ জারি রাখেন।

“সব মানুষই কম-বেশি একাকী। পাইনের মতো একেলা হওয়ার কি আছে?”

“আমি আসলেই পাইনের মতো একেলা। না পারছি কাউকে ছায়া দিতে। না পারছি ঝড়-বাদল-দুর্যোগ সামাল দিতে। রাত হলে আমি আমার দোসর পাইনের কাছে চলে যাই নিঃসঙ্গতা কাটাতে।”

মিসেস ম্যারি আর কোনো কথা বলতে পারেন না। তার চোখ ছলছল করছে। তিনি ঘরের অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে মেয়ের কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করেন।

[পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার]

;

আমেরিকার স্বাধীনতার প্রতীক লিবার্টি বেল



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

পেনসিলভেনিয়াকে বলা হয় আমেরিকার জন্মস্থান। পেনসিলভানিয়া একসময় একটি বৃটিশ উপনিবেশ ছিল এবং এরকম মোট ১৩টি বৃটিশ উপনিবেশ মিলেই তৈরি হয়েছে আজকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা আমেরিকা। ১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে আমেরিকায় ইউরোপিয়ান সাম্রাজ্যবাদীদের বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ক শুরু হয়। যদিও ভাইকিংসরা কলম্বাসের অনেক অনেক আগেই আমেরিকায় পৌঁছেছিল কিন্তু কলম্বাসের পদার্পণের পরেই এই মহাদেশ ইউরোপিয়ানদের আকর্ষিত করে এবং এক সময় ইংরেজদের দখলে চলে যায় আজকের এই আমেরিকা। ১৭৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ৪ জুলাই উত্তর আমেরিকার ১৩টি উপনিবেশের প্রতিনিধি পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়ায় সম্মেলনে আয়োজন করে আনুষ্ঠানিকভাবে ইংরেজদের থেকে ‘স্বাধীনতা ঘোষণা’ করেন।

ইনডিপেন্ডেন্স হল

আজকের আমেরিকা প্রতিষ্ঠার বিপ্লবে পেনসিলভানিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় মহাদেশীয় কংগ্রেস আহবান করা হয়েছিল পেনসিলভেনিয়ার অন্যতম জনবহুল শহর ফিলাডেলফিয়াতে। ফিলাডেলফিয়ার তৎকালীন স্টেট হাউজে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র লেখা ও স্বাক্ষরিত হয় যা বর্তমানের ইন্ডিপেন্ডেন্স হল নামে পরিচিত । ১৭৫৩ খ্রিষ্টাব্দে স্টেট হাউজে স্থাপন করা হয় এক প্রকান্ড বেল বা ঘণ্টা। বেলটি কেবল বিশেষ বিশেষ মুহূর্তেই বাজানো হত। সেই বেল বা ঘণ্টাটি বাজিয়ে আইন প্রনেতারা তাদের মিটিং ডাকতেন এবং শহরের লোকজনকে একসঙ্গে জড়ো করতেন তাদের ঘোষণা বা নির্দেশনা শোনানোর জন্য। পরবর্তিতে ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে সেই ঘণ্টাই লিবার্টি বেল হিসেবে স্বীকৃত হয়। বেলটি লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল বেল ফাউন্ড্রি দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল। সেই সময়ে প্রায় ১০০ পাউন্ডে কেনা হয়েছিল এবং ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে আমেরিকার ফিলাডেলফিয়া শহরে ডেলিভারি করা হয়েছিল। লিবার্টি বেলের ওজন প্রায় ২০৮০ পাউন্ড বা ৯৪৩ কেজি। বেলের নিচের অংশের পরিধি ১২ ফুট এবং উপরের দিকে মুকুটের পরিধি ৩ ফুট। আমেরিকাতে আনার পর বেলটি প্রথমবার পরীক্ষামূলক বাজানোর সময়ই ফেটে যায়, স্থানীয় কারিগর মিঃ জন পাস এবং মিঃ জন স্টো ঘণ্টাটি গলিয়ে আবার নতুন করে তৈরি করেছিলেন।

লিবার্টি বেল

পেনসিলভানিয়া পৌঁছেই আমরা পরিকল্পনা করলাম প্রথমেই আমেরিকার স্বাধীনতার সূতিকাগার ইনডিপেন্ডেস হল এবং লিবার্টি বেল দেখতে যাবো। আমেরিকাতে গিয়ে আমরা উঠেছিলাম ভায়রা ভাই আহমেদ মাহিয়ান মিথুনের বাসায়, খুব সুন্দর ৩ তলা বিশিষ্ট ইনডিভিজুয়াল হাউজ সাথে বিশাল ব্যাকইয়ার্ড। ব্যাকইয়ার্ডের সবুজ ঘাস যেন তুলতুলে কার্পেট, আমার ছোট মেয়ের দারুন পছন্দ হলো তার খালামনির বাসা। এবারের আমেরিকা যাত্রা কিছুটা আমার ছোট মেয়ের ইচ্ছেতেই হয়েছে, ৫ বছর বয়সে সে বাবার থেকে বড় ট্রাভেলার হয়েছে। কয়েকদিন পর পর কান্নাজুড়ে দিত আমেরিকা যাবে বলে, তাই হয়তো আমেরিকা যেতে পেরে তার খালামনির বড়সড় বাড়িতে লাফাতে-ঝাঁপাতে পেরে সে মহাখুশি। ঢাকাতে আমাদের  ছোট্ট ফ্লাটে বাচ্চাদের লাফঝাঁপের সুযোগ একেবারে নেই। যেদিন আমেরিকা পৌঁছলাম তার পরেরদিন বরিশালের এক ছোটভাই পলাশ আমাদের সবাইকে গাড়িতে করে নিয়ে গেল ৫২৬ মার্কেট স্ট্রিটের ইনডিপেন্ডেন্স হল এরিয়াতে, লক্ষ্য লিবার্টি বেল দেখা!

লিবার্টি বেল

লিবার্টি বেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার একটি প্রতীক। অনেকেই বলেন ৪ জুলাই ১৭৭৬ তারিখে, মহাদেশীয় কংগ্রেসের স্বাধীনতার ঘোষণা গ্রহণের সংকেত দেওয়ার জন্য ঘণ্টা বাজানো হয়েছিল আসলে তা সঠিক নয়। প্রকৃত ইতিহাস হলো তার ৪ দিন পরে ৮ জুলাই স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র পাঠ উদযাপনের জন্য বাজানো হয়েছিল। বেলটি ১৮৪৬ সালে জর্জ ওয়াশিংটনের জন্মদিন উদযাপন করার জন্য বাজানোর সময় এমনভাবে ফেটে যায় যা ঠিক করা সম্ভব হয়নি।

১৭৭৬ সালে আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা হলেও বৃটিশদের সাথে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ চলে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত। যুদ্ধ চলাকালে ১৯৭৭ সালে অতিরিক্ত শক্তি সঞ্চয় করে ব্রিটিশ বাহিনী যখন ফিলাডেলফিয়ায় প্রবেশ করে, তখন কিন্তু এই বেলটি পেনসিলভানিয়ার অ্যালেনটাউন গির্জায় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৮৩৫ সালে আবার এটিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ইন্ডিপেন্ডেন্স হলে। ২০০৩ সালে ইনডিপেন্ডেন্স হল সংলগ্ন ইনডিপেন্ডেস ন্যাশনাল হিস্টোরিক পার্কের এক পাশে লিবার্টি বেল সেন্টার তৈরি করে সেখানে স্থানান্তর করা হয়। লিবার্টি বেল সেন্টারে প্রবেশে কোন টিকিট কাটতে হয় না। তবে প্রবেশে বেশ কড়াকড়ি রয়েছে, ভালরকম সিকিউরিটি চেক সম্পন্ন হবার পরেই ঢুকতে পাবেন সেখানে। হলের গেটে পৌঁছে সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ঢুকে পরলাম হলে। শুরুতেই নানান পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে রুম। এরকম কয়েকটা রুম পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম বেলটির কাছে। বেলটির কাছে বেশ ভিড় পেলাম, সবাই বেলের সাথে ছবি তোলার জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু সময় অপেক্ষা করে আমরাও ছবি তুললাম আমেরিকার স্বাধীনতা এবং মুক্তির প্রতীকের সাথে। প্রতি বছর প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষ এই বিখ্যাত লিবার্টি বেল দেখতে আসে। আমেরিকার পেনসিলভানিয়ায় ঘুরতে গেলে অবশ্যই দেখতে যাবেন আমেরিকার ইতিহাস এবং স্বাধীনতার এই প্রতীক লিবার্টি বেল।

;

পার্বত্য চট্টগ্রাম 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ' গ্রন্থের প্রিঅর্ডার রকমারি'তে



কনক জ্যোতি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের।

প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের।

  • Font increase
  • Font Decrease

 

প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের। এক বছরের মাঠ পর্যায়ের নিবিড় গবেষণার ভিত্তিতে রচিত হয়েছে গ্রন্থটি, যার প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে রকমারি.কম-এ। গ্রন্থটির লেখক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বার্তা২৪.কম-এর অ্যাসোসিয়েট এডিটর ড. মাহফুজ পারভেজ।

গ্রন্থ সম্পর্কে লেখক ড. মাহফুজ পারভেজ জানান, বাঙালিসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আবাসস্থল পার্বত্য চট্টগ্রাম আয়তনে বাংলাদেশের দশ ভাগের এক ভাগ হলেও এমন বৈচিত্র্যময় অঞ্চল পৃথিবীতে খুব কমই আছে, যেখানে এতোগুলো জনজাতি জড়াজড়ি করে একসঙ্গে রয়েছে অনেক বছর ধরে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিঃসন্দেহে প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে একটি অত্যন্ত মূল্যবান ঐতিহ্যগত অঞ্চল।

চিরায়তভাবে শান্তিপূর্ণ অঞ্চলটি একসময় অশান্ত হয়ে উঠেছিল। অনেক রক্তপাত ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের পর অবশেষে ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি সম্পাদন হওয়ায় শান্তি, সম্প্রীতি, উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থানের উদার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। সশস্ত্র বিদ্রোহী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে অস্ত্র সমর্পণ করেছেন। বাস্তুচ্যুৎ ও শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অশান্ত পার্বত্যাঞ্চলে নিশ্চিত হয়েছে জনগণের শান্তি, সমৃদ্ধি, উন্নয়ন, জনঅংশগ্রহণ ও স্থিতিশীলতা, যা দুইযুগ স্পর্শ করেছে ২০২১ সালে।

ড. মাহফুজ পারভেজ বলেন, শান্তিচুক্তির দুইযুগের অভিজ্ঞতায় শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের গতিবেগে সমগ্র পার্বত্য জনপদ ও বাসিন্দারা মুখরিত হলেও সেখানে নানা কারণে সঙ্কটের আগুন ধূমায়িত হচ্ছে। বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাস, নাশকতা, হত্যা, গুম, চাঁদাবাজি, অপহরণ প্রভৃতি সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তা ও জনজীবনের শান্তি বিঘ্নিত করার মাধ্যমে উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের মতো ঘটনা ঘটছে মহল বিশেষের উস্কানি ও অপতৎপরতায়। ফলে মাঝে মধ্যেই উত্তপ্ত ও অস্থির পার্বত্যাঞ্চলে কখনো কখনো শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের ইতিবাচক অর্জনসমূহ বিনষ্টের অপচেষ্টা চলছে।

তাই নিবিড় গবেষণার আওতায় এনে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে চলমান পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্জনসমূহ পর্যালোচনা এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলো শনাক্তকরণ ও সমাধানের রূপরেখা প্রণয়ন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ।

১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি প্রণীত হওয়ার পর প্রথম গবেষণা গ্রন্থ ‘বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি’ (১৯৯৯) প্রকাশ করেন বর্তমান লেখক-গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ। ২০০০ সালে লেখকের ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানবাধিকার’ বিষয়ক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করে ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লাইড এন্থ্রোপলজি। ২০০৩ সালে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) উন্নয়ন পরিকল্পনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে সামাজিক বিষয়ে গবেষণায় যুক্ত থাকেন লেখক। তিনি ২০০৬ সালে সফল ভাবে সম্পন্ন করেন পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাত ও শান্তি বিষয়ক পিএইচডি গবেষণা। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের অর্থায়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরেকটি গবেষণা পরিচালনা করেন তিনি। দীর্ঘ গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের ধারাবাহিকতায় ‘শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রামÑবিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা’ শীর্ষক অংশগ্রহণ ও পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিপূর্ণ উত্তরণ ও অর্জনের পথে বিদ্যমান সমস্যাগুলো ও এর সমাধান তুলে ধরা হয়েছে, যা সমাজ, রাজনীতি, জাতিগত চর্চা, শান্তি ও সংঘাত বিষয়ক অধ্যয়ন এবং নীতিপ্রণেতাদের কাজে লাগার পাশাপাশি সাধারণ পাঠকের আগ্রহ মিটাবে বলে গবেষক মনে করেন।

গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ (জন্ম: ৮ মার্চ ১৯৬৬, কিশোরগঞ্জ শহর)-এর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: গবেষণা-প্রবন্ধ: বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি; দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো; দ্বিশত জন্মবর্ষে বিদ্যাসাগর; প্রকাশনা শিল্প, স্টুডেন্ট ওয়েজ, মোহাম্মদ লিয়াকতউল্লাহ। উপন্যাস: পার্টিশনস; নীল উড়াল। ভ্রমণ: রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে। গল্প: ইতিহাসবিদ; ন্যানো ভালোবাসা ও অন্যান্য গল্প; বুড়ো ব্রহ্মপুত্র। কবিতা: মানব বংশের অলংকার; আমার সামনে নেই মহুয়ার বন; গন্ধর্বের অভিশাপ। অগ্রসর ও জনপ্রিয় মাল্টিমিডিয়া নিউজ পোর্টাল বার্তা২৪.কম-এর প্রকাশিত হচ্ছে তার নতুন উপন্যাস 'রংধনু', যা অচিরেই গ্রন্থাকারে প্রকাশ পাবে।

ড. মাহফুজ পারভেজ রচিত 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' গ্রন্থ প্রিঅর্ডার করা যাবে রকমারি.কম-এর লিংকে

;

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১



মাহফুজ পারভেজ
ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১

  • Font increase
  • Font Decrease

১.

আমেরিকার নামজাদা এই ক্যাম্পাস সিটিতে ভর্তি হয়ে যারা পড়তে এসেছে, তারা কেউ জীবনে নিজের চোখে রংধনু দেখে নি। এক উইকঅ্যান্ডে হাউস টিচার ম্যারি মার্গারেট নিকটবর্তী এক ঝর্ণার পাশে উপত্যকায় শিক্ষার্থী দলটিকে নিয়ে ঘুরতে গিয়ে তথ্যটি জানতে পারেন। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সবাই একটু বিষণ্ণভাবে অসম্মতিতে মাথা নাড়ায়। শিক্ষার্থীদের কেউ নবাগত ফরাসি, কেউ অভিবাসী ইহুদি, কয়েকজন মধ্যপ্রাচ্যের রিফিউজি। সবাই বড় হয়েছে নাগরিক ঘেরাটোপে ও জাগতিক কোলাহলে। সবার উত্তরের মর্মার্থ হলো, “সত্যি রংধনু তো দেখিনি কখনও! স্টিল ছবি দেখেছি। আর কখনো কখনো ইউটিউবে ক্লিপ।”

ম্যারি বাচ্চাদের দোষ দেন না। কত কষ্ট করে প্রতিযোগিতায় টিকে ওরা পড়তে এসেছে বিশ্বের লিডিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। অভিভাবকদের জীবন-সংগ্রামের সমান্তরালের কঠিন পরিস্থিতিতে বইপত্র নিয়ে পড়াশুনার সময় পেয়েছে ছেলেমেয়েগুলো। বাইরের প্রকৃতি ও পরিবেশের দিকে তাকানোর ফুসরত পেয়েছে কমই। তাছাড়া প্রকৃতির নানা দিক ওরা দেখবেই-বা কী করে? এই পোড়া পৃথিবীতে কি আর আকাশ আছে? সবুজ আছে? রক্ষা পাচ্ছে প্রাণ ও জীববৈচিত্র্য? নিজের মনে বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করে ম্যারি রাচ্চাদের দোষ দিতে পারেন না।  

ম্যারি খেয়াল করেন, রংধনু দেখতে না পারার জন্য কেউই বিশেষ দুঃখিত নয়। তবু তিনি রেইনবো ইস্যুটি তাদের মগজের ভাঁজে রাখতে চান। তিনি জানেন, প্রকৃতি ও নিসর্গের নানা প্রপঞ্চ দেখার অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের ইমাজিনেশন ও ভিজ্যুয়াল পাওয়ার বাড়াবে। তিনি সবাইকে কাছে ডেকে আনেন। কথা দেন একদিন রংধনু দেখাবেন। “একটা মজার বিষয় জেনো রাখো। রংধনুর শুরু আর শেষ দেখা যায় না, সেগুলো থাকে বাড়ি কিংবা গাছের আড়ালে। মনে থাকবে?” ম্যারির প্রশ্নে সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। 

শেষ বিকেলে ফিরে আসার পর নিজের ঘরের জানালা দিয়ে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থাকেন ম্যারি। এই সামারে দিন অনেক বড়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেও আকাশ স্বচ্ছ। তিনি জানেন, বর্ষা না এলে রংধনু দেখা অসম্ভব। তবু তিনি যেন আনমনে দিগন্তের কোণে কোণে রংধনু খোঁজেন।

রংধনুর সঙ্গে ম্যারি সম্পর্কটাই বেশ অদ্ভুত। কিছুটা নস্টালজিক আর কিছুটা সুপারন্যাচারাল। নিজের দেশের চেয়ে অনেক বেশি রংধনু তিনি দেখতে পেয়েছেন বিদেশের নানা স্থানে। একবারও প্ল্যান করে রংধনু দেখেন নি তিনি। রংধনু নিজেই নিজের খেয়ালে এসে ধরা দিয়েছে তার চোখে। ম্যারি নিজের ঘরের সীমানা পেরিয়ে চরাচরের আলো-অন্ধকারের সন্ধিক্ষণে তন্ময় হয়ে থাকেন রংধনুর সাত রঙে।

“খেতে এসো।”

ডাইনিং টেবিল সাজাতে সাজাতে মৃদ্যু কণ্ঠে ডাক দেন মিসেস অ্যানি গিলবার্ট, ম্যারির মা। ধ্যান-ভেঙে ম্যারি জানলার পাশ থেকে ডাইনিং স্পেসে চলে আসেন। মা ছাড়া আর কেউ নেই তার দুনিয়ায়। দিন শেষে মায়ের আশ্রয়ে ম্যারি পুনর্জন্ম লাভ করেন। মায়ের হাত চেপে তিনি একটি চেয়ারে বসেন দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল জীবন পেরিয়ে আসা ষাটের কাছাকাছি বয়সের দ্বারপ্রান্তের এক ক্লান্ত রমণীর মতো। বিবাহ বিচ্ছেদের পর অনেকগুলো বছর একা থাকতে থাকতে যখন অস্থির ও দিশাহীন অবস্থায় হাবুডুবু খাচ্ছিলেন ম্যারি, তখনই মা এসে তার পাশে পাহাড়ের মতো অটল আস্থায় দাঁড়ান। সারাদিন আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পড়তে আসা ছাত্র-ছাত্রী আর বাকীটা সময় মা তার জীবনের চৌহদ্দী ও সাহস। অথচ একসময় তারও জীবন ছিল রংধনু রঙে রাঙা, যখন ক্যাভিন ছিল পাশে আর টমাস কোলে। এখন সবাই যার যার জীবনের বিবরে আবদ্ধ। সবাই সবার মতো নিজের কাজে ব্যস্ত। বিশাল আকাশের গভীরে রংধনুর রঙগুলোর মতো লুকিয়ে রয়েছে সবাই। কেউ কারো পাশাপাশি আসতে পারছে না। বৃষ্টি শেষে রংধনুর মতো খানিকক্ষণের জন্যেও দেখা হয় না ম্যারি আর তার জীবনের একদা রঙিন মানুষগুলোর সঙ্গে।    

অন্যমনস্ক ম্যারিকে দেখতে দেখতে মেয়ের মনের মধ্যে চাপা বেদনা টের পান মিসেস অ্যানি গিলবার্ট। চেষ্টা করেন কথা বলে সান্তনা দিতে।

“ওদের সঙ্গে কথা হয়েছে?”

“না।”

“হবে কেমন করে? যেমন বাপ তেমনই ছেলে। কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই।”

মায়ের ক্ষোভ সঙ্গত। তবু সায় দিতে মন মানে না ম্যারির। ক্যাভিন তো এমনই। চরম বোহেমিয়ান। কখন কোথায় থাকবে, সে নিজেও জানে না। বাতাসের ঝাপ্টায় বেসামাল একখণ্ড ভাসমান মেঘের মতো আকাশের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোই যেন তার স্বভাব। নিয়তিও তাকে তেমনই ভানিয়ে বেড়াচ্ছে। তবুও ভেসে ভেসেই জীবন তাদেরকে নিয়ে যৌথতায় বেশ চলছিল। ক্যাভিন একদিন বললো, “তুসি স্থিত হও। আমার মতো ঠিকানাবিহীন হলে তোমার চলবে না।” ততদিনে টমান এসে গেছে। ম্যারির মাতৃত্ব ও নারীত্ব একটি স্থায়ী ও নিরাপদ আশ্রয়ের প্রত্যাশা করছিল মনে মনে। ক্যাভিন তার ইচ্ছের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হয়ে বলে, “কিন্তু আমি তো এক জায়গায় স্থির থাকতে পারবো না। তুমি বরং নিজের মতো শুরু করো। আমার শুভেচ্ছা থাকেবে।”

পরদিন ঘুম থেকে উঠে ক্যাভিনের দেখা নেই। নেই মানে নেই। ঘরে নেই, আশেপাশে কোথাও নেই। রাতে বিছানা ঠিক করতে গিয়ে বালিশে চাপা ক্যাভিনের চিঠিটি হাতে আসে ম্যারির। চিঠির ভাষ্য অতি সংক্ষিপ্ত। “প্রকৃত অর্থে সঙ্গে না থেকে তোমাকে আটকে রাখা অনৈতিক। সেপারেশন ইউলে সাইন করে দিলাম। আর ব্যাঙ্কের নমিনি। আশা করি মাঝে মাঝে দেখা ও কথা হবে।”

ম্যারি জানতেন ক্যাভিনের পক্ষে কোনো কিছু করাই অসম্ভব নয়। বিশ্বের সবচেয়ে বিপদজ্জনক সেতুতে ঝুঁলে থাকা, মাঝরাতের অন্ধকারে প্যাসিফিকে সুইমিং করা, হিমালয়ের কোনো গুহায় একাকী কয়েকদিন ধ্যানমগ্ন হওয়া তার কাছে নস্যি। এতো কমিটেড প্রেম, যৌথজীবন, এক লহমায় উড়িয়ে দিয়ে দিব্যি হাওয়া হয়ে গিয়েছে ক্যাভিন। সদ্যজাত পুত্র টমাসের জন্যেও বিন্দুমাত্র পিছুটান অনুভব করে নি লোকটি। রাগে, ক্ষোভে, প্রত্যাখ্যানের অপমানে সারা রাত ঘুমাতে পারে নি ম্যারি। যদিও জানে কোনো ফল হবে না, তবু ছোট্ট ক্যাম্পাস টাউনের আনাচেকানাচে দিনভর ক্যাভিনের খোঁজ করেন ম্যারি। না, তার কোনো খোঁজ নেই। তার গতিবিধির সন্ধানও কেউ জানে না। যদি মন চায়, হয়ত ক্যাভিন নিজেই জানাবে তার হদিস। শত চেষ্টা করেও ম্যারি আর তার কোনো খোঁজ পাবে না। নিজের প্রতিক্রিয়াগুলোও জানাতে পারবে না। ক্যাখিনের খোঁজে ব্যর্থ হয়ে ম্যারি দিন শেষে ঘরে ফিরে আসে চরম হতাশায়। এসেই মনে হয়, পুরো বাড়িটা বড্ড হাহাকার করছে। ঘরগুলো খুবই ফাঁকা আর দমবন্ধ মনে হয় তার। টমাসকে কোলে নিয়ে তিনি চলে আসেন বাড়ির লনে। সাজানো বাগানের মধ্যে একটা লম্বা পাইন ম্যারির খুব প্রিয়। ক্যাভিনকে নিয়ে রাতের পর রাত গল্প করে কাটিয়েছেন তিনি নিঃসঙ্গ পাইনের কাছে। বিচ্ছেদ বেদনা নিয়ে তিনি রাতের অন্ধকারে পাইনের নিচে বসে থাকেন।

রাতের আকাশে রংধনু থাকার কথা নয়। তবু মাঝরাতের দিকে ম্যারির মনে হয় তিনি যেন আবছা আলোয় একটি অস্পষ্ট রংধুন দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও তিনি রঙিন আলোর জগতকে ছুঁতে পারছেন না। যন্ত্রণার বুক-চাপা কষ্টে আস্ত একটি রাত নির্ঘুম কেটে যায় তার জীবন থেকে। তিনি অনুভব করেন, প্রিয় মানুষের অভাবে এমন অনেক ঘুমহীন রাত তার জীবনের শূন্যতা পূর্ণ করবে। তার স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ ছিন্ন হয়ে যাবে। তিনি বেঁচে থাকবেন ঘুম ও জাগরণের মাঝখানে নিঃসঙ্গ ও একেলা। ঠিক যেন বাগানের সঙ্গীবিহীন পাইন গাছের মতো।   

[পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার]

;