আমেরিকা বলে কোনো স্থান নেই



অনুবাদ : মিলু হাসান
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

গল্প বলে এমন একজনের গল্প ছিল আমার কাছে। আমি তাকে বলতে বলতে কান ঝালাফালা করে ফেলছি যে আপনের গল্পে আমার এক ছটাকও ঈমান নাই। আমি বলছি—আপনে মিছা কইতাছেন। আপনের আষাঢ়ের গপ্ আমার লগে কইয়েন না, বানাইয়া বানাইয়া, আমারে বিশ্বাস করানির জন্য। এসব বলার পরেও তার উপরে কোনো প্রভাব পড়ল না। তার কোনো ভাবান্তর হলো না, সে গল্প বলেই যাচ্ছে, তারপর আমি শেষে বললাম—আপনে মিথ্যুক, আপনে আজগুবি গপ্ কওয়া লোক, আপনে মিষ্টি মিষ্টি গপ্ ফাঁদেন একটার পর একটা, আপনে ধাপ্পাবাজ রসিক। সে একরোখা দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল অনেকক্ষণ, মাথা নেড়ে হুঁ হুঁ করল, একটা মনমরা হাসি দিল আর খুব নরম সুরে এমন কথা বলল যে আমি নিজে বেশ শরমিন্দা বোধ করলাম, শরমে পড়ে গেলাম, সে বলল : আমেরিকা বলে কোনো দ্যাশ নাই।

শুধু তারে বুঝ দেবার জন্য আমি তারে কথা দিছিলাম যে আমি তার গল্পটা লিখব। গল্পটা শুরু হয়েছিল পাঁচশো বছর আগে স্পেনের রাজার রাজদরবারে। তার মধ্যে আছে এক রাজপ্রসাদ, রেশম আর মখলম, সোনা, রুপা, দাড়ি, মুকুট, মোমবাতি, দাসদাসী, আছে তারা যারা সকাল হতে না হতে একে অন্যের ভুঁড়িতে ঢুকিয়ে দেয় তলোয়ার, যারা আগের রাতে পরস্পরের পায়ের কাছে দস্তানা ছুড়ে চ্যালেঞ্জ দেয় যুদ্ধের আর মিনারে পাহরাদার বাজায় শিঙা। আর আছে বার্তাবাহক এরা লাফিয়ে নামে ঘোড়া থেকে আর লাফিয়ে ওঠে জিনপড়ানো ঘোড়ায়, আছে রাজার সাচ্চা দোস্তরা আর ভণ্ড দোস্তরাও, আছে চোখ ধাঁধানো রূপবতী আর ছলচাতুরী আয়ত্ত করা বিপদজনক রমণী, আছে অঢেল সুরা আর রাজপ্রসাদের চারদিকে আছে এমন সব লোকজন যারা এইসব কিছুর জন্য দাম চুকানো ছাড়া ভালো কিছু করার কথা ভাবতেই পারে না। কিন্তু এরকম জীবন যাপন করা ছাড়া রাজা অন্য কোনো জীবন যাপনের কথা ভাবতেই পারে না, যেখানেই যে বেঁচে থাকুক থাকুক, খুব আলিশানভাবে আরাম-আয়েশে কিংবা দীনদরিদ্রে, মাদ্রিদ, বার্সেলোনা অথবা যেখানেই হোক, দিনশেষে সেই একঘেয়ে ডেইলি রুটিন, বিরক্তি চরমে উঠে যায়। যেমন যারা অন্যখানে থাকে তারা ভাবে বার্সেলোনা একটা চমৎকার জায়গা আর যারা বার্সেলোনা থাকে তারা ভাবে অন্য কোনোখানে গেলে বুঝি বাঁচে প্রাণ।

গরিবরা ভাবে রাজার মতো জীবন যাপন করা কতই না মজার আর এ ভেবে দিলে কষ্ট পায় যে রাজা ভাবে গরিবদের গরিব হওয়াই ঠিক আছে।

সকালে রাজা ঘুম থেকে উঠে আর রাত্রে বিছানায় নিদ্রা যায়, আর সারাটা দিন কাটে একঘেয়ে, বিরক্তিকর আর কত যে টেনশন—দাসদাসী নিয়ে টেনশন, সোনা, রুপা, মখমল, রেশম নিয়ে টেনশন আর তার উপরে মোমবাতিগুলোও তার একঘেয়ে লাগে। তার বিছানা পরিপাটি-সাজানো-গোছানো, জমকালো কিন্তু এতে ঘুম দেওয়া ছাড়া বিশেষ কিছু করবার কিছু নাই।

দাসদাসীরা সকালে তারে মাথা নুয়ে সম্মান করে—ঠিক ততটুক নোয় পরদিন সকালে, এতে রাজা অভ্যস্ত, এগুলা সে খেয়াল করে না। কেউ তাকে দেয় কাঁটা চামিচ, কেউ তাকে দেয় তলোয়ার, কেউ তার বসার জন্য কেদারা পেতে দেয়, আমজনতা তারে জাঁহাপনা বলে ডাকে আর সাথে জুড়ে দেয় কত কত লকব আর ব্যস, এই তো, এইসব। কেউ তাকে কখনোই বলেনি—আপনি ইডিয়েট, আপনি বোকারাম আর আজকে তার সাথে তারা যে বাতচিৎ করেছে, সেসব পুরানো প্যাঁচাল তারা গতকালও তার সাথে করেছে।

এই হলো গিয়ে অবস্থা।

আর এ জন্য রাজা মশাই রাজদরবারে ভাঁড় পালেন। ভাঁড়েরা যা খুশি করার অনুমতি দেওয়া আছে, যা খুশি তাইই বলতে পারে—রাজামশাইয়ের মুখে হাসি ফুটাবার জন্য, আর যখন তাদের কাণ্ডকীর্তি দেখে রাজা মশাইয়ের হাসি পায় না তখন তিনি তাদের কতল করার হুকুম জারি করেন কিংবা অইরকম কিছুই করার হুকুম দেন।

তো, একবার তার রাজদরবারে এক ভাঁড় ছিল যে কথাবার্তায় প্যাঁচগোছ লাগিয়ে দিত। রাজা মশাই এতে হাসির খোরাক খুঁজে পেতেন। ভাঁড় ‘রাজামশাই’ না বলে বলত ‘পাদমশাই’, ‘প্রসাদ’ না বলে বলত ‘পরসাদ’ আর ‘গুড মর্নিং’ না বলে বলতো ‘মুড গরিং’।

আমার মনে হয় ব্যাপারটা বোকাসোকা কিন্তু রাজা মশাই ভাবতেন ফানি। বছরের অর্ধেকটা সময়, ৭ জুলাই অব্দি, তিনি ভাবতেন ব্যাপারটা ফানি আর যখন ৮ তারিখ উনার ঘুম ভাঙল আর ভাঁড় বলল—‘মুড গরিং’, ‘পাদমশাই’—তখন রাজা মশাই বললেন—ওর থেকে আমারে রেহাই দাও।

আরেকজন ভাঁড় খাটো, মোটাসোটা যাকে সবাই পেপে বলে ডাকত, সে রাজামশাইকে মাত্র চারদিন খুশি রাখতে পেরেছিল। সে রাজদরবারের নারী, পুরুষ, রাজপুত্র, উজির-নাজির, সেনাপতির চেয়ারে মধু মেখে রাজার মুখে হাসি ফুটিয়েছিল। চতুর্থদিনে সে যখন রাজামশাইয়ের সিংহাসনে মধু মাখল, রাজামশাইয়ের হাসি পেল না আর পেপে ভাঁড় রইল না। তারপর রাজা মশাই দিন-দুনিয়ার সবচে ভয়ংকর ভাঁড়টিকে খরিদ করে আনলো৷ সে দেখতে কুৎসিত, একইসাথে হাড্ডিসার আবার নাদুস-নুদুস, লম্বা-রোগা আবার বেঁটে-মোটা। কেউ জানত না সে কথা বলতে পারে কিনা নাকি ইচ্ছা করেই চুপ করে থাকে কিংবা সে বোবা কিনা। তার চোখের নজরের ভাব ছিল বিদ্বেষপরায়ণ, তার মুখ ছিল দেখতে বদমেজাজি, তার একমাত্র মধুর দিক ছিল তার নাম : তাকে জনি বলে ডাকা হতো।

কিন্তু তার সবচেয়ে জঘন্য ব্যাপার ছিল তার হাসবার ভঙ্গি৷ হাসিটা শুরু হতো ছোট আকারে, তার পেটের মাঝখান থেকে স্বচ্ছন্দে ধীরে ধীরে, ফুলে ফেঁপে উঠে, আস্তে আস্তে তা ঢেঁকুরে পরিণতি লাভ করে জনির দম আটকে চোখ-মুখ লাল হয়ে বিস্ফোরণের মতন ফেটে পড়ত, এক ভয়ংকর গর্জনের মতন চেঁচিয়ে একাকার হয়ে যেত; তারপর সে জোরে জোরে শব্দ করে মাটিতে পা ঠুকত, নাচত আর হাসতেই থাকত হো-হো করে আর এতে রাজা মশাই বেশ মজা পেতেন আর অন্যদের মুখ বেজার হয়ে যেত আর ভয়ে কলিজা চুপসে যেত। আর রাজপ্রাসাদের সব জায়গায় যখন এ হাসির আওয়াজের শব্দ পেত লোকেরা তখন দরজা-জানলা বন্ধ করে দিত, শাটার নামিয়ে নিত, বাচ্চাদের বিছানায় ঘুম পাড়িয়ে দিত আর কর্ণে গুঁজে দিত তুলা।

জনির হাসবার ভঙ্গি ছিলো দিন-দুনিয়ার সবচে ভয়ংকর ব্যাপার।

আর রাজা মশাই যাই বলতেন জনি হাসতোই। একদিন রাজা মশাই বললেন : জনি আমি তোরে ফাঁসিতে ঝুলাব। আর জনি তা শুনে হাসতেই থাকল হি-হি-হা-হা-হি-হি-হো-হো করে হাসতেই থাকল, এরকম হাসি সে আগে কখনোই হাসেনি।

তারপর রাজা মশাই সিদ্ধান্ত নিল আগামীকাল জনিকে ফাঁসিতে ঝুলাবে। রাজা ফাঁসিকাষ্ঠ বানালেন, তিনি তার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে ছিলেন সিরিয়াস, ফাঁসিকাষ্ঠের সামনে কেমন করে হাসে জনি তা দেখবার খায়েশ জেগেছিল উনার মনে।

তিনি হুকুম জারি করলেন আমজনতাকে এ ন্যক্কারজনক মজমা দেখতে আসার জন্য। কিন্তু লোকেরা সব লুকিয়ে পড়ল, দরজার খিল লাগিয়ে দিল আর সকালে রাজা মশাই দেখলেন তিনি আর জল্লাদ, জল্লাদের হেল্পার আর হাস্যরত জনি।

আর রাজা তার দাসদাসীকে চিল্লাইয়া বললেন—লোকজনরে ধরে আন্। দাসদাসীরা পুরো শহর খুঁজে কাউকে পাইল না, রাজা রাগে কিরমির করতেছিল আর জনি হাসছিল। অবশেষে দাসদাসীরা খুঁজে আনলো একটা বালককে, তারা টেনে হিঁচড়ে তাকে রাজার সামনে আনলো। বালকটি ছিল দেখতে ছোট্ট, গোমড়ামুখ আর লাজুক। রাজা তাকে ফাঁসিকাষ্ঠের দিকে নির্দেশ করে সেদিকে তাকিয়ে থাকতে বললেন। বালকটি ফাঁসিকাষ্ঠের দিকে তাকাল, হাসল আর হাততালি দিতে থাকল আর বিস্ময় নিয়ে বলল—আপনে নিশ্চয়ই খুব ভালা রাজা, পায়রা বসনের জন্য দাঁড় বানাইছেন, দ্যাখেন, দ্যাখেন, অলরেডি দুইটা আইসা বইছে।
রাজা বলল—তুই একটা ইডিয়েট। তোর নাম কী?
: আমি ইডিয়েট, রাজামশাই, আমার নাম কোলম্বো, আমারে মায় কোলুম্বিনে কইয়া ডাকে।
রাজা বলল—তুই ইডিয়েট। এখানে একজনকে ফাঁসিতে ঝুলানো হবে।
কোলুম্বিনে জিজ্ঞাসা করল—উনার নাম কী? যখন সে তার নাম শুনল, সে বলল—কী সুন্দর একটা নাম, তাহলে তার নাম জনি। এত সুন্দর একটা নাম যার তারে কেউ ফাঁসিতে ঝুলাইতে পারে?
রাজা বললেন—কারণ ওর হাসি ভয়ংকর, বেজায় বিচ্ছিরি। রাজা জনিকে হাসতে বললেন আর জনি আগের চেয়ে দ্বিগুণ ভয়ংকর, বেজায় বিচ্ছিরি করে হেসে উঠল। কোলুম্বিনে তাজ্জব হয়ে গেল আর উনাকে জিজ্ঞেস করল—জনাব, রাজা মশাই, আপনার কাছে উনার হাসি হাছা- হাছাই ভয়ংকর লাগতাছে ? রাজা অবাক হলেন, কোনো উত্তর উনার মাথায় এলো না আর কোলুম্বিনে বলতে থাকল—ওর হাসির ভঙ্গিটা আমার পছন্দ লাগতাছে না, কিন্তু দ্যাখেন, দ্যাখেন, পায়রাগুলি এহনো ফাঁসিকাষ্ঠে বইসা আছে। ওর হাসি শুইন্না ডরায় নাই। তাদের কাছে উনার হাসি ভয়ংকর লাগেনি। পায়রাদের কান খুবই স্পর্শকাতর। জনিকে আপনার ছাইড়া দিতে হবে। রাজা ব্যাপারটা ভেবে-চিন্তে বললেন—যা, জনি, তোরে ছেড়ে দিলাম। আর জনি পহেলাবারের মতো একটা কথা উচ্চারণ করল কোলুম্বিনের উদ্দেশ্যে—শুকরিয়া। তারপর ভালো মানুষের মতো একটা মুচকি হাসি দিয়ে চলে গেল। রাজার আর কোনো ভাঁড় রইল না।
রাজামশাই কোলুম্বিনেকে বলল—আমার লগে চল্।
রাজ-দাসদাসী, রাজদরবারের সবাই ভাবল যে, কোলুম্বিনে রাজদরবারের নতুন ভাঁড়।

কিন্তু কোলুম্বিনে এতে মোটেও খুশি হলো না। সে দাঁড়িয়ে রইল, তাজ্জব। কালেভাদ্রে একটা কথা বলবে কি বলবে না, হো হো করে হাসেও না, শুধু একটা মুচকি হাসল আর কেউ এতে হাসল না। লোকজন বলল—সে তো ভাঁড় না, সে ইডিয়েট। কোলুম্বিনে বলল—আমি ভাঁড় নই, আমি ইডিয়েটই।

তখন লোকজন তাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করল। রাজা যদি জানতেন কোলুম্বিনেকে নিয়ে লোকে হাসি-তামাশা করছে, তাহলে তিনি রাগান্বিত হয়ে পড়তেন, কিন্তু কোলুম্বিনে রাজার কাছে তা বলল না। কারণ তাকে নিয়ে কেউ হাসি-তামাশা করলে সে কিচ্ছুই মনে করে না। রাজদরবারে আছে পালোয়ান, চালাক-চতুর লোক, রাজা তো রাজাই, রুপসী আওরাত, সাহসী পুরুষ, অনুগত ধর্মযাজক আর রান্নাঘরের দাসীরা বেশ পরিশ্রমী—কেবল কোলুম্বিনে, এই কোলুম্বিনে কিচ্ছুই না। যখন কেউ একজন বলে—আয়, কোলুম্বিনে আমার লগে কুস্তি লাগ্, কোলুম্বিনে উত্তর দেয়—আমার শইলে আপনের মতন জোর নাই। যখন কেউ বলে—সাত গুণ দুই কত রে? কোলুম্বিনে উত্তর দিত—আমি আপনের চেয়ে বেশি মুর্খচোদা। যখন কেউ একজন বলে—তোমার কি ঝরনা থেকে লাফ দেওয়ার সাহস আছে ? কোলুম্বিনে জবাব দিত—আমি ভীতুর ডিম। আমার সেরম সাহস নাই।

যখন রাজা তাকে জিজ্ঞেস করল—কোলুম্বিনে তুমি কী হতে চাও? কোলুম্বিনে জবাবে বলল—আমি কিচ্ছুই হইবার চাই না। আমি তো অলরেডি একটা কিচ্ছু হয়েই আছি৷ আমি কোলুম্বিনে। রাজা মশাই বললেন—কিন্তু তোমাকে তো একটা কিছু হতেই হবে। কোলুম্বিনে বলল—একটা মানুষ কী কী হইবার পারে?
তারপর রাজা মশাই বললেন—ওই যে, দাড়িওলা লোকটি দেখতাছো, তামাটে রঙের, শুকনো ও কুঁচকানো মুখশ্রী, সে হলো নাবিক। সে নাবিকই হতে চেয়েছে আর তাই-ই হয়েছে। সে পাল খাটানো জাহাজে করে সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায় আর রাজা মশাইয়ের জন্য নতুন নতুন দেশ আবিষ্কার করে। কোলুম্বিনে বলল—রাজা মশাই যদি চান, তাহলে আমিও নাবিক হব। এ কথা শুনে রাজদরবারে হাসির রোল পড়ে গেল। কোলুম্বিনে রাজদরবার থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেল আর উচুস্বরে কাঁদতে কাঁদতে চেঁচিয়ে বলল—আমি একটা দ্যাশ আবিষ্কার করমু, আমি একটা দেশ আবিষ্কার করমু। লোকজন পরস্পরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করল আর মাথা ঝাঁকাল আর কোলুম্বিনে রাজপ্রাসাদ থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। শহরের ওপর দিয়ে, মাঠের ওপর দিয়ে আর মাঠে যেসব কৃষকেরা ছিল তারা তাকে দ্রুত ছুটতে দেখছিল, সে তাদেরকে ডেকে বলল—আমি একটা দ্যাশ আবিষ্কার করমু, আমি একটা দ্যাশ আবিষ্কার করমু। আর সে দৌড়াতে দৌড়াতে এক অরণ্যে এসে পৌঁছল। আর সপ্তাহে পর সপ্তাহ অরণ্যের ঝোঁপঝাড়ে লুকিয়ে রইল এবং ওই সপ্তাহগুলিতে কেউ কোলুম্বিনের কোনো খোঁজ পেল না৷ রাজা মশাই বেশ বিমর্ষ হয়ে পড়লেন, নিজকে নিজে ধিক্কার দিতে থাকলেন আর রাজদরবারের লোকেরা যারা কোলুম্বিনেকে নিয়ে হাসি-তামাশা করেছিল তারা শরমিন্দায় ভুগতে থাকল। আর সেজন্য মিনারের পাহারাদার যখন শিঙায় ফুঁ দিল তখন কোলুম্বিনেকে মাঠ পেরিয়ে, শহর পেরিয়ে, রাজফটক পার হয়ে রাজা মশাইয়ের কাছে আসতে দেখল সবাই বেশি আনন্দিত হলো আর কোলুম্বিনে রাজা মশাইকে বলল—জাঁহাপনা, কোলুম্বিনে, একটা দ্যাশ আবিষ্কার করছে। রাজদরবারের কেউ কোলুম্বিনেকে নিয়ে যেহেতু হাসি-তামাশা করতে চাচ্ছিল না, তাই তারা গম্ভীর মুখের ভান করে সওয়াল করল—নাম কী দ্যাশের? কোনহানে এইটা? কোলুম্বিনে জবাব দিল—এইটার এহনো নাম হয় নাই, এই তো মাত্র দ্যাশটার সন্ধান পাইলাম, এইটা মেলা দূর, সমুদ্রের ভিত্তে। এরপর দাড়িওলা নাবিক জোশ নিয়ে উঠে দাঁড়াল আর বলল—ঠিক আছে, কোলুম্বিনে। আমি, আমেরিকাগো ভিসপুচ্চি। আমি দ্যাশটা খুঁজতে যামু, তুমি খালি কও কেমনে যাইতে হবে।
কোলুম্বিনে জবাব দিল—পাল খাটানো জাহাজ লইয়া সমুদ্রে বেরিয়ে পড়বেন, তারপরে সোজা সামনে যাইতেই থাকবেন, যাইতেই থাকবেন, যদ্দিন না দ্যাশটার দেখা না পান, হাল ছাইড়া ফিরা আইলে কিন্তু হবে না। কোলুম্বিনে ডর পেয়ে গেল, কারণ সে ছিল মিথ্যুক, সে জানত যে ওরকম কোনো দেশ নাই। সেই টেনশনে কোলুম্বিনের রাতের আরামের ঘুম হারাম হলো। কিন্তু আমেরিকাগো ভেসপুচ্চি দেশটার খোঁজে বেড়িয়ে পড়ল। কেউ জানত না সে পাল খাটানো জাহাজ নিয়ে কোথায় গেছে।

হয়তো সে অরণ্যে লুকিয়ে ছিল। আর যখন শিঙায় ফুঁ দেওয়া হলো আমেরিকাগো ফিরে আসল।

কোলুম্বিনের মুখ লজ্জায় লালে লাল হয়ে গেল আর এত নামজাদা-এত বড় নাবিকের দিকে তাকাবার সাহস পর্যন্ত সে পাচ্ছিল না। ভেসপুচ্চি রাজা মশাইয়ের সামনে দাঁড়াল, কোলুম্বিনের দিকে চেয়ে চোখ টিপ্পি দিয়ে গভীর নিঃশ্বাস নিল, কোলুম্বিনের দিকে চেয়ে আবার চোখ টিপল, শোনা যায় এরকম জোরে স্পষ্টভাবে বলল—রাজামশাই, সে বলল—রাজা মশাই, এরকম একটা দ্যাশ আছে। ভেসপুচ্চি আমেরিকাগো গোমর ফাঁস না করার কারণে কোলুম্বিনে এতই খুশি হলো যে দৌড়িয়ে গিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরল আর বলল—আমেরিকাগো, আমার জান আমেরিকাগো। আর লোকে ধরে নিল এটাই বুঝি দেশটার নাম আর তারা যে দেশটা নাই তার নাম দিল—আমেরিকা।

রাজামশাই বলল—এখন তুই বড় মানুষ হইছস্ আর এখন থেকে তোর নাম—কলম্বাস। কলম্বাস নামজাদা হয়ে গেল, সবাই তার দিকে হা করে চেয়ে থাকত আর পরস্পর ফিশফিশ্ করে বলত—বুঝলা, হে-ই আমেরিকা আবিষ্কার করছে। প্রত্যেকে আমেরিকা বলে যে একটা দেশ আছে এটা বিশ্বাস করল, শুধু কলম্বাস এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন না, সারাটা জীবন তার সন্দেহে কাটল আর তার সাহসে কুলালো না নাবিককে জিজ্ঞাসা করতে যে সত্যিটা কী তা যেন তাকে বলে।

তারপর অন্যান্য লোকেরা পাল খাটিয়ে আমেরিকার উদ্দেশ্য রওনা করল, ফিরেও আসলো অনেকে আর তারা ফিরে এসে বলল যে—আমেরিকা বইলা একটা দ্যাশ আছে।
যে লোকটা আমাকে গল্পটা বলেছিল সে বলল—আমার কথাই যদি ধরো, এই আমি কখনো আমেরিকা যাইনি।
জানিও না এ আমেরিকা নামে কোনো দেশ আছে কিনা। সম্ভবত লোকজন ভান করে যে এরকম দেশ আছে যাতে করে কলম্বাসের দিলে কষ্ট না লাগে। যখন দুজন লোক আমেরিকার ব্যাপারে কথা বলে তারা খুব কম ‘আমেরিকা’ বলে, সচরাচর তারা ধোঁয়াশা করে বলে—একটা দেশ বা ওই দেশ অথবা ওইরকম একটা কিছু—আকার ইঙ্গিতে কথা বলে।

সম্ভবত যারা আমেরিকা যেতে চায় তাদের প্লেনে অথবা জাহাজে কোলুম্বিনের গল্পটা শোনানো হয়, পরে তারা কোথাও লুকিয়ে থাকে এবং ফিরে এসে বলে—কাউবয়, স্কাইস্ক্র্যাপার, নয়াগ্রা জলপ্রপাত, মিশিসিপি, নিউ ইয়র্ক, সান ফ্রান্সসিককো সম্পর্কে খোশগল্প ফাঁদে আর বলে।

যাই হোক তারা সকলে একই গল্প বলে, এমন গল্প বলে যা তারা আমেরিকা যাওয়ার আগেই জানত, এটা তুমি মঞ্জুর করে নিবে যে এটা একটা সন্দেহ জাগানো ব্যাপার। কিন্তু লোকজন এখনো তর্কাতর্কি করে এ নিয়ে যে কলম্বাস আসলে কে ছিল।
আমি জানি সে আসলে কে ছিল।

ধারাবাহিক উপন্যাস ‘রংধনু’-২



মাহফুজ পারভেজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

[দ্বিতীয় কিস্তি]

মেয়ের ব্রোকেন ফ্যামিলির বেহাল দশার খবর জেনে একদিন ম্যারির মা এসে হাজির। যথেষ্ট বৃদ্ধ হলেও মিসেস অ্যানি গিলবার্ট, ম্যারির মা, এখনো বেশ শক্তপোক্ত ও কর্মঠ। মা আসায় বাড়িটি কিছুটা প্রাণ পেলো। মেয়ে আর নাতীকে নিয়ে মিসেস অ্যানি গিলবার্ট চারপাশে আনন্দময় একটি পরিবেশ গড়ে তুললেন। তারপর কিছুদিনের মধ্যেই তিনি রুদ্রমূর্তি ধারণ করলেন। ক্রুসেড ঘোষণার মতো তিনি বাড়ি থেকে ক্যাভিনের যাবতীয় স্মৃতি মুছে ফেলতে লাগলেন। তার পরিত্যক্ত জামা-কাপড়, বইপত্র, এমনকি দেয়ালে ঝুলানো একটি হাস্যোজ্জ্বল ছবিও মিসেস অ্যানি গিলবার্টের ক্ষোভ থেকে রেহাই পেলো না। তিনি সময় পেলেই গজগজ করে ক্যাভিনকে অভিসম্পাত করেন এবং তার মেয়ের সকল দুর্গতির জন্য তাকে আসামী করে অভিযোগ করতে থাকেন। মিসেস অ্যানি গিলবার্টের চোখে পৃথিবীর একমাত্র মন্দ লোক এবং তাদের চরম শত্রু ক্যাভিন।

ক্যাভিনের প্রতি মায়ের প্রচণ্ড ক্ষোভের কোনো প্রতিক্রিয়া জানান না ম্যারি। ক্যাভিন সম্পর্কে কোনো কিছু জানতে চাইলেও উত্তর দেন না। ক্যাভিনের প্রসঙ্গ এলেই ম্যারি নিশ্চুপ থাকেন। যদিও ক্যাভিনের পক্ষে বলার মতো কোনো যুক্তি কিংবা বাস্তবতা তার কাছে নেই। আবার ওর বিরুদ্ধে কিছু বলতেও ম্যারির মন সায় দেয় না। চুপচাপ ম্যারি ভাবেন, “সব কিছু মুছে ফেললে কিংবা সব জিনিস ফেলে দিলেই স্মৃতিরা হারিয়ে যাবে? স্মৃতি তো বস্তুগত বিষয় নয়। সত্ত্বার সঙ্গে মিশে থাকা স্মৃতি সহজে হারায় না।”

মিসেস অ্যানি গিলবার্ট কিছুদিনের মধ্যেই পুরো বাড়ি থেকে ক্যাভিনের অস্তিত্ব সাফ করে দিলেন। ক্যাভিন নামে একজন এই বাড়ির বাসিন্দা ছিল, এমন কোনো চিহ্নই আর রইল না। এখানেই থেমে থাকলেন না তিনি। পাড়ায়, বাজারে, যখন যেখানে যান, সেখানেই ক্যাভিনের একটি নিগেটিভ ইমেজ তৈরিতে ব্যস্ত হলেন। মিসেস অ্যানি গিলবার্ট আসলে খুব নেতিবাচক ও পরচর্চ্চাকারী মানুষ নন। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন, মেয়ের জীবন থেকে চলে যাওয়া ক্যাভিনের স্মৃতিগুলো ওর মন থেকে মুছে ফেলনে নতুন একটা পরিবেশ তৈরি হবে। ম্যারি হয়ত নতুন জীবনও শুরু করতে পারবে। তিনি মেয়ের জন্য গোপনে যুৎসই পাত্র খুঁজতেও তৎপর হলেন। মা হিসেবে এসব কাজকে তিনি তার দায়িত্ব মনে করেন।

মিসেস অ্যানি গিলবার্টকে দোষ দেওয়া যায় না। কন্যার স্বার্থচিন্তায় সব মায়েরাই এমন করেন। তিনি কোনো ষড়যন্ত্র বা গোপন লুকোছাপার আশ্রয় নেন নি, সব কিছু প্রকাশ্যেই করছেন। ম্যারিকেও তিনি পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছেন, “তোমাকে এভাবে একাকী ও নিঃসঙ্গভাবে কাটাতে আমি দেবো না। আমার জীবনে তুমি আর তোমার ভাই পিটার ছাড়া কেউ নেই। পিটার ফিলাডেলফিয়ায় চাকরি নিয়ে বেশ আছে। ওকে নিয়ে চিন্তা নেই। তোমার ছেলে টমাসকে নিয়ে আমি থাকবো আর তুমি নতুন করে জীবন শুরু করবে।”

মায়ের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে পরিকল্পনাগুলো শুনেন ম্যারি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় সম্মতি কিংবা অসম্মতি জানান না। তিনি জানেন, বিধবা মায়ের সঙ্গে তর্ক অর্থহীন। তিনি এসেছেন সাহার্য্য করতে। তাকে মোটেও বিমুখ করা যাবে না। তর্ক-বিতর্ক করে পরিবেশ বিষিয়ে লাভ নেই। বরং চুপ থাকলে এক সময় মা হাল ছেড়ে দেবেন।

কিন্তু মিসেস অ্যানি গিলবার্ট কঠিন প্রকৃতির মানুষ। সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন মোটেই। তিনি চা কিংবা কফি পানের জন্য চেনাজানা তরুণদের বাসায় আমন্ত্রণ জানাতে শুরু করেন। ভদ্রতা স্বরূপ ম্যারিকে তাদের সঙ্গ দিতে হয়। তবে নতুন জীবন শুরুর প্রসঙ্গ এলেই ম্যারি প্রসঙ্গান্তরে কিংবা আলোচনা থেকে কোনো উছিলায় সন্তর্পণে সরে আসেন।

বিরক্ত মিসেস অ্যানি গিলবার্ট এক সময় মেয়ের কাছে সোজাসুজি জানতে চান,

“তোমার আসল পরিকল্পনা আমাকে বলো? মধ্য ত্রিশ বয়সের একজন নারী হিসেবে বাকী জীবন একা থাকা তোমার পক্ষে দুরূহ।”

“আমি জানি। কিন্তু এখনই নতুন করে আবার জীবন শুরুর ব্যাপারে আমি মনস্থির করতে পারি নি। আমাকে কিছু সময় দাও।”

এরপর আর কথা চলে না। মিসেস অ্যানি গিলবার্ট চুপ করে ঘরের কাজে মন দেন। তার সন্দেহ হয়, তবে কি ক্যাভিন গোপনে এখনো যোগাযোগ রাখছে? কৌশলে নানা রকমের তদন্ত করে তিনি শঙ্কামুক্ত হন। না, ক্যাভিনের বিন্দুমাত্র সন্ধান এই তল্লাটের কেউ জানে না। ম্যারির সঙ্গেও সামান্যতম যোগাযোগ নেই বেচারার। তাহলে ম্যারি এমন করছে কেন? কেন তার সিদ্ধান্তহীনতা? মিসেস অ্যানি গিলবার্ট এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে মেয়ের আচরণ ও চাল-চলনের দিকে বিশেষ মনোযোগী হন।

প্রথম প্রথম মিসেস অ্যানি গিলবার্ট কিছুই টের পান নি। তার গভীর ঘুমের বাতিক। একবার ঘুমালে কিছুই টের পান না তিনি। একরাতের মধ্য প্রহরে ঘুম ভেঙে দেখেন ম্যারি ঘরে নেই। টমাস একাকী ঘুমাচ্ছে বিছানায়। বাথরুম থেকেও কোনো শব্দ আসছে না। চিন্তিত মিসেস অ্যানি গিলবার্ট অবশেষে ম্যারির দেখা পেলেন বাগানে পাইন গাছের নিচে। জানালা দিয়ে অন্ধকারে ডুবে থাকা চরাচরে ঈষৎ আলোর ঝলকানির মতো ম্যারিকে দেখা যাচ্ছে। ম্যারির কফি রঙা খয়েরি চুল কালো বাতাসে অনামা রঙের আদলে অদ্ভুত শিহরণে দুলছে।

পর পর কয়েক রাত ঘাপটি মেরে মিসেস অ্যানি গিলবার্ট মেয়ের গতিবিধি অনুসন্ধান করেন। অবশেষে তিনি নিশ্চিত হন যে, রাতের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে দিয়ে বাড়ির দেওয়ালঘড়ি মধ্যরাত্রির জানান দিলে ম্যারি বিছানা ছেড়ে দেয়। ঠিক বারোটায় চকিতে উঠে দাঁড়ায় ম্যারি। তারপর ধীর পায়ে পৌঁছে যায় বাগানে। খানিক পায়চারী পর স্থির হয় পাইনের তলে।

আরও পড়ুন: ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১

মিসেস অ্যানি গিলবার্টের স্মরণ শক্তি বেশ। তাই তিনি খুবই হতবাক হন ম্যারি মধ্যরাতের অদ্ভুত অভ্যাসের কারণে। কারণ, তিনি বিলক্ষণ জানেন, ম্যারি ছোটবেলা থেকেই ভীষণ ভাবে ভূত বিশ্বাস করে। গ্রামের দিকে তো বটেই, খাস শহরেও সন্ধ্যার পর ঘরের বাইরে বের হতে ভয় পেতো তার মেয়ে। তাদের এই ক্যাম্পাস সিটির আবাসকে নামেমাত্র শহর বললেও আসলে এটি এক প্রত্যন্ত গ্রাম। সুনির্দিষ্টভাবে একে গ্রাম বলাও ভুল হবে। শহর পেরিয়ে পাহাড়তলির ওপর ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা কয়েকটা কাঠের বাড়ির একটি আবাসিক ব্লক আর চারপাশে সীমাহীন বন-জঙ্গল। সাঁঝবেলাতেই নিঝুম রাত নেমে আসে জায়গাটিতে। এখানে তার নিজেরও কেমন একটা ভয়-ভয় করে। অথচ তার ভীতু মেয়েটি দ্বিধাহীন পদক্ষেপে দিব্যি মাঝরাতে বাগানে ঘুরছে?

পরদিন নাস্তার টেবিলে ম্যারিকে চেপে ধরেন মিসেস অ্যানি গিলবার্ট।

“ওতো রাতে বাগানে তোমার কি কাজ থাকে?”

ম্যারি প্রশ্ন শুনেও খানিক চমকিত হলেও নির্বিকার থাকেন। তার অভিব্যক্তিতে মনে হয়, ঘটনাটি যেন অতি স্বাভাবিক বিষয়। এতে অবাক হওয়া বা প্রশ্ন করার মতো কিছু নেই। মায়ের কৌতূহল নিবৃত্ত করতে তিনি সংক্ষিপ্ত উত্তর দেন,

“আমি পাইন গাছের সান্নিধ্যে যাই।”

“পাইন গাছের কাছে? কেন? তা-ও এতো রাতের বেলা?”

“কারণ আমি খুবই একেলা। পাইন গাছের মতো একাকী।”

মিসেস অ্যানি গিলবার্টের চোখে বিস্ময়। তার মুখ লা-জওয়াব। মেয়ের এমন কথার কি উত্তর দেবেন তিনি জানেন না। এরকম কথা কখনো কারো কাছে শুনেছেন বলে তিনি মনে করতে পারেন না। সম্বিৎ হারানোর মতো অবস্থা হলেও মিসেস অ্যানি নিজেকে সামলে নিয়ে মেয়ের সঙ্গে আলাপ জারি রাখেন।

“সব মানুষই কম-বেশি একাকী। পাইনের মতো একেলা হওয়ার কি আছে?”

“আমি আসলেই পাইনের মতো একেলা। না পারছি কাউকে ছায়া দিতে। না পারছি ঝড়-বাদল-দুর্যোগ সামাল দিতে। রাত হলে আমি আমার দোসর পাইনের কাছে চলে যাই নিঃসঙ্গতা কাটাতে।”

মিসেস ম্যারি আর কোনো কথা বলতে পারেন না। তার চোখ ছলছল করছে। তিনি ঘরের অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে মেয়ের কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করেন।

[পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার]

;

আমেরিকার স্বাধীনতার প্রতীক লিবার্টি বেল



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

পেনসিলভেনিয়াকে বলা হয় আমেরিকার জন্মস্থান। পেনসিলভানিয়া একসময় একটি বৃটিশ উপনিবেশ ছিল এবং এরকম মোট ১৩টি বৃটিশ উপনিবেশ মিলেই তৈরি হয়েছে আজকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা আমেরিকা। ১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে আমেরিকায় ইউরোপিয়ান সাম্রাজ্যবাদীদের বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ক শুরু হয়। যদিও ভাইকিংসরা কলম্বাসের অনেক অনেক আগেই আমেরিকায় পৌঁছেছিল কিন্তু কলম্বাসের পদার্পণের পরেই এই মহাদেশ ইউরোপিয়ানদের আকর্ষিত করে এবং এক সময় ইংরেজদের দখলে চলে যায় আজকের এই আমেরিকা। ১৭৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ৪ জুলাই উত্তর আমেরিকার ১৩টি উপনিবেশের প্রতিনিধি পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়ায় সম্মেলনে আয়োজন করে আনুষ্ঠানিকভাবে ইংরেজদের থেকে ‘স্বাধীনতা ঘোষণা’ করেন।

ইনডিপেন্ডেন্স হল

আজকের আমেরিকা প্রতিষ্ঠার বিপ্লবে পেনসিলভানিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় মহাদেশীয় কংগ্রেস আহবান করা হয়েছিল পেনসিলভেনিয়ার অন্যতম জনবহুল শহর ফিলাডেলফিয়াতে। ফিলাডেলফিয়ার তৎকালীন স্টেট হাউজে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র লেখা ও স্বাক্ষরিত হয় যা বর্তমানের ইন্ডিপেন্ডেন্স হল নামে পরিচিত । ১৭৫৩ খ্রিষ্টাব্দে স্টেট হাউজে স্থাপন করা হয় এক প্রকান্ড বেল বা ঘণ্টা। বেলটি কেবল বিশেষ বিশেষ মুহূর্তেই বাজানো হত। সেই বেল বা ঘণ্টাটি বাজিয়ে আইন প্রনেতারা তাদের মিটিং ডাকতেন এবং শহরের লোকজনকে একসঙ্গে জড়ো করতেন তাদের ঘোষণা বা নির্দেশনা শোনানোর জন্য। পরবর্তিতে ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে সেই ঘণ্টাই লিবার্টি বেল হিসেবে স্বীকৃত হয়। বেলটি লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল বেল ফাউন্ড্রি দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল। সেই সময়ে প্রায় ১০০ পাউন্ডে কেনা হয়েছিল এবং ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে আমেরিকার ফিলাডেলফিয়া শহরে ডেলিভারি করা হয়েছিল। লিবার্টি বেলের ওজন প্রায় ২০৮০ পাউন্ড বা ৯৪৩ কেজি। বেলের নিচের অংশের পরিধি ১২ ফুট এবং উপরের দিকে মুকুটের পরিধি ৩ ফুট। আমেরিকাতে আনার পর বেলটি প্রথমবার পরীক্ষামূলক বাজানোর সময়ই ফেটে যায়, স্থানীয় কারিগর মিঃ জন পাস এবং মিঃ জন স্টো ঘণ্টাটি গলিয়ে আবার নতুন করে তৈরি করেছিলেন।

লিবার্টি বেল

পেনসিলভানিয়া পৌঁছেই আমরা পরিকল্পনা করলাম প্রথমেই আমেরিকার স্বাধীনতার সূতিকাগার ইনডিপেন্ডেস হল এবং লিবার্টি বেল দেখতে যাবো। আমেরিকাতে গিয়ে আমরা উঠেছিলাম ভায়রা ভাই আহমেদ মাহিয়ান মিথুনের বাসায়, খুব সুন্দর ৩ তলা বিশিষ্ট ইনডিভিজুয়াল হাউজ সাথে বিশাল ব্যাকইয়ার্ড। ব্যাকইয়ার্ডের সবুজ ঘাস যেন তুলতুলে কার্পেট, আমার ছোট মেয়ের দারুন পছন্দ হলো তার খালামনির বাসা। এবারের আমেরিকা যাত্রা কিছুটা আমার ছোট মেয়ের ইচ্ছেতেই হয়েছে, ৫ বছর বয়সে সে বাবার থেকে বড় ট্রাভেলার হয়েছে। কয়েকদিন পর পর কান্নাজুড়ে দিত আমেরিকা যাবে বলে, তাই হয়তো আমেরিকা যেতে পেরে তার খালামনির বড়সড় বাড়িতে লাফাতে-ঝাঁপাতে পেরে সে মহাখুশি। ঢাকাতে আমাদের  ছোট্ট ফ্লাটে বাচ্চাদের লাফঝাঁপের সুযোগ একেবারে নেই। যেদিন আমেরিকা পৌঁছলাম তার পরেরদিন বরিশালের এক ছোটভাই পলাশ আমাদের সবাইকে গাড়িতে করে নিয়ে গেল ৫২৬ মার্কেট স্ট্রিটের ইনডিপেন্ডেন্স হল এরিয়াতে, লক্ষ্য লিবার্টি বেল দেখা!

লিবার্টি বেল

লিবার্টি বেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার একটি প্রতীক। অনেকেই বলেন ৪ জুলাই ১৭৭৬ তারিখে, মহাদেশীয় কংগ্রেসের স্বাধীনতার ঘোষণা গ্রহণের সংকেত দেওয়ার জন্য ঘণ্টা বাজানো হয়েছিল আসলে তা সঠিক নয়। প্রকৃত ইতিহাস হলো তার ৪ দিন পরে ৮ জুলাই স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র পাঠ উদযাপনের জন্য বাজানো হয়েছিল। বেলটি ১৮৪৬ সালে জর্জ ওয়াশিংটনের জন্মদিন উদযাপন করার জন্য বাজানোর সময় এমনভাবে ফেটে যায় যা ঠিক করা সম্ভব হয়নি।

১৭৭৬ সালে আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা হলেও বৃটিশদের সাথে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ চলে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত। যুদ্ধ চলাকালে ১৯৭৭ সালে অতিরিক্ত শক্তি সঞ্চয় করে ব্রিটিশ বাহিনী যখন ফিলাডেলফিয়ায় প্রবেশ করে, তখন কিন্তু এই বেলটি পেনসিলভানিয়ার অ্যালেনটাউন গির্জায় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৮৩৫ সালে আবার এটিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ইন্ডিপেন্ডেন্স হলে। ২০০৩ সালে ইনডিপেন্ডেন্স হল সংলগ্ন ইনডিপেন্ডেস ন্যাশনাল হিস্টোরিক পার্কের এক পাশে লিবার্টি বেল সেন্টার তৈরি করে সেখানে স্থানান্তর করা হয়। লিবার্টি বেল সেন্টারে প্রবেশে কোন টিকিট কাটতে হয় না। তবে প্রবেশে বেশ কড়াকড়ি রয়েছে, ভালরকম সিকিউরিটি চেক সম্পন্ন হবার পরেই ঢুকতে পাবেন সেখানে। হলের গেটে পৌঁছে সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ঢুকে পরলাম হলে। শুরুতেই নানান পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে রুম। এরকম কয়েকটা রুম পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম বেলটির কাছে। বেলটির কাছে বেশ ভিড় পেলাম, সবাই বেলের সাথে ছবি তোলার জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু সময় অপেক্ষা করে আমরাও ছবি তুললাম আমেরিকার স্বাধীনতা এবং মুক্তির প্রতীকের সাথে। প্রতি বছর প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষ এই বিখ্যাত লিবার্টি বেল দেখতে আসে। আমেরিকার পেনসিলভানিয়ায় ঘুরতে গেলে অবশ্যই দেখতে যাবেন আমেরিকার ইতিহাস এবং স্বাধীনতার এই প্রতীক লিবার্টি বেল।

;

পার্বত্য চট্টগ্রাম 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ' গ্রন্থের প্রিঅর্ডার রকমারি'তে



কনক জ্যোতি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের।

প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের।

  • Font increase
  • Font Decrease

 

প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের। এক বছরের মাঠ পর্যায়ের নিবিড় গবেষণার ভিত্তিতে রচিত হয়েছে গ্রন্থটি, যার প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে রকমারি.কম-এ। গ্রন্থটির লেখক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বার্তা২৪.কম-এর অ্যাসোসিয়েট এডিটর ড. মাহফুজ পারভেজ।

গ্রন্থ সম্পর্কে লেখক ড. মাহফুজ পারভেজ জানান, বাঙালিসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আবাসস্থল পার্বত্য চট্টগ্রাম আয়তনে বাংলাদেশের দশ ভাগের এক ভাগ হলেও এমন বৈচিত্র্যময় অঞ্চল পৃথিবীতে খুব কমই আছে, যেখানে এতোগুলো জনজাতি জড়াজড়ি করে একসঙ্গে রয়েছে অনেক বছর ধরে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিঃসন্দেহে প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে একটি অত্যন্ত মূল্যবান ঐতিহ্যগত অঞ্চল।

চিরায়তভাবে শান্তিপূর্ণ অঞ্চলটি একসময় অশান্ত হয়ে উঠেছিল। অনেক রক্তপাত ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের পর অবশেষে ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি সম্পাদন হওয়ায় শান্তি, সম্প্রীতি, উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থানের উদার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। সশস্ত্র বিদ্রোহী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে অস্ত্র সমর্পণ করেছেন। বাস্তুচ্যুৎ ও শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অশান্ত পার্বত্যাঞ্চলে নিশ্চিত হয়েছে জনগণের শান্তি, সমৃদ্ধি, উন্নয়ন, জনঅংশগ্রহণ ও স্থিতিশীলতা, যা দুইযুগ স্পর্শ করেছে ২০২১ সালে।

ড. মাহফুজ পারভেজ বলেন, শান্তিচুক্তির দুইযুগের অভিজ্ঞতায় শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের গতিবেগে সমগ্র পার্বত্য জনপদ ও বাসিন্দারা মুখরিত হলেও সেখানে নানা কারণে সঙ্কটের আগুন ধূমায়িত হচ্ছে। বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাস, নাশকতা, হত্যা, গুম, চাঁদাবাজি, অপহরণ প্রভৃতি সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তা ও জনজীবনের শান্তি বিঘ্নিত করার মাধ্যমে উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের মতো ঘটনা ঘটছে মহল বিশেষের উস্কানি ও অপতৎপরতায়। ফলে মাঝে মধ্যেই উত্তপ্ত ও অস্থির পার্বত্যাঞ্চলে কখনো কখনো শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের ইতিবাচক অর্জনসমূহ বিনষ্টের অপচেষ্টা চলছে।

তাই নিবিড় গবেষণার আওতায় এনে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে চলমান পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্জনসমূহ পর্যালোচনা এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলো শনাক্তকরণ ও সমাধানের রূপরেখা প্রণয়ন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ।

১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি প্রণীত হওয়ার পর প্রথম গবেষণা গ্রন্থ ‘বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি’ (১৯৯৯) প্রকাশ করেন বর্তমান লেখক-গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ। ২০০০ সালে লেখকের ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানবাধিকার’ বিষয়ক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করে ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লাইড এন্থ্রোপলজি। ২০০৩ সালে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) উন্নয়ন পরিকল্পনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে সামাজিক বিষয়ে গবেষণায় যুক্ত থাকেন লেখক। তিনি ২০০৬ সালে সফল ভাবে সম্পন্ন করেন পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাত ও শান্তি বিষয়ক পিএইচডি গবেষণা। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের অর্থায়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরেকটি গবেষণা পরিচালনা করেন তিনি। দীর্ঘ গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের ধারাবাহিকতায় ‘শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রামÑবিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা’ শীর্ষক অংশগ্রহণ ও পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিপূর্ণ উত্তরণ ও অর্জনের পথে বিদ্যমান সমস্যাগুলো ও এর সমাধান তুলে ধরা হয়েছে, যা সমাজ, রাজনীতি, জাতিগত চর্চা, শান্তি ও সংঘাত বিষয়ক অধ্যয়ন এবং নীতিপ্রণেতাদের কাজে লাগার পাশাপাশি সাধারণ পাঠকের আগ্রহ মিটাবে বলে গবেষক মনে করেন।

গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ (জন্ম: ৮ মার্চ ১৯৬৬, কিশোরগঞ্জ শহর)-এর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: গবেষণা-প্রবন্ধ: বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি; দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো; দ্বিশত জন্মবর্ষে বিদ্যাসাগর; প্রকাশনা শিল্প, স্টুডেন্ট ওয়েজ, মোহাম্মদ লিয়াকতউল্লাহ। উপন্যাস: পার্টিশনস; নীল উড়াল। ভ্রমণ: রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে। গল্প: ইতিহাসবিদ; ন্যানো ভালোবাসা ও অন্যান্য গল্প; বুড়ো ব্রহ্মপুত্র। কবিতা: মানব বংশের অলংকার; আমার সামনে নেই মহুয়ার বন; গন্ধর্বের অভিশাপ। অগ্রসর ও জনপ্রিয় মাল্টিমিডিয়া নিউজ পোর্টাল বার্তা২৪.কম-এর প্রকাশিত হচ্ছে তার নতুন উপন্যাস 'রংধনু', যা অচিরেই গ্রন্থাকারে প্রকাশ পাবে।

ড. মাহফুজ পারভেজ রচিত 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' গ্রন্থ প্রিঅর্ডার করা যাবে রকমারি.কম-এর লিংকে

;

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১



মাহফুজ পারভেজ
ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১

  • Font increase
  • Font Decrease

১.

আমেরিকার নামজাদা এই ক্যাম্পাস সিটিতে ভর্তি হয়ে যারা পড়তে এসেছে, তারা কেউ জীবনে নিজের চোখে রংধনু দেখে নি। এক উইকঅ্যান্ডে হাউস টিচার ম্যারি মার্গারেট নিকটবর্তী এক ঝর্ণার পাশে উপত্যকায় শিক্ষার্থী দলটিকে নিয়ে ঘুরতে গিয়ে তথ্যটি জানতে পারেন। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সবাই একটু বিষণ্ণভাবে অসম্মতিতে মাথা নাড়ায়। শিক্ষার্থীদের কেউ নবাগত ফরাসি, কেউ অভিবাসী ইহুদি, কয়েকজন মধ্যপ্রাচ্যের রিফিউজি। সবাই বড় হয়েছে নাগরিক ঘেরাটোপে ও জাগতিক কোলাহলে। সবার উত্তরের মর্মার্থ হলো, “সত্যি রংধনু তো দেখিনি কখনও! স্টিল ছবি দেখেছি। আর কখনো কখনো ইউটিউবে ক্লিপ।”

ম্যারি বাচ্চাদের দোষ দেন না। কত কষ্ট করে প্রতিযোগিতায় টিকে ওরা পড়তে এসেছে বিশ্বের লিডিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। অভিভাবকদের জীবন-সংগ্রামের সমান্তরালের কঠিন পরিস্থিতিতে বইপত্র নিয়ে পড়াশুনার সময় পেয়েছে ছেলেমেয়েগুলো। বাইরের প্রকৃতি ও পরিবেশের দিকে তাকানোর ফুসরত পেয়েছে কমই। তাছাড়া প্রকৃতির নানা দিক ওরা দেখবেই-বা কী করে? এই পোড়া পৃথিবীতে কি আর আকাশ আছে? সবুজ আছে? রক্ষা পাচ্ছে প্রাণ ও জীববৈচিত্র্য? নিজের মনে বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করে ম্যারি রাচ্চাদের দোষ দিতে পারেন না।  

ম্যারি খেয়াল করেন, রংধনু দেখতে না পারার জন্য কেউই বিশেষ দুঃখিত নয়। তবু তিনি রেইনবো ইস্যুটি তাদের মগজের ভাঁজে রাখতে চান। তিনি জানেন, প্রকৃতি ও নিসর্গের নানা প্রপঞ্চ দেখার অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের ইমাজিনেশন ও ভিজ্যুয়াল পাওয়ার বাড়াবে। তিনি সবাইকে কাছে ডেকে আনেন। কথা দেন একদিন রংধনু দেখাবেন। “একটা মজার বিষয় জেনো রাখো। রংধনুর শুরু আর শেষ দেখা যায় না, সেগুলো থাকে বাড়ি কিংবা গাছের আড়ালে। মনে থাকবে?” ম্যারির প্রশ্নে সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। 

শেষ বিকেলে ফিরে আসার পর নিজের ঘরের জানালা দিয়ে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থাকেন ম্যারি। এই সামারে দিন অনেক বড়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেও আকাশ স্বচ্ছ। তিনি জানেন, বর্ষা না এলে রংধনু দেখা অসম্ভব। তবু তিনি যেন আনমনে দিগন্তের কোণে কোণে রংধনু খোঁজেন।

রংধনুর সঙ্গে ম্যারি সম্পর্কটাই বেশ অদ্ভুত। কিছুটা নস্টালজিক আর কিছুটা সুপারন্যাচারাল। নিজের দেশের চেয়ে অনেক বেশি রংধনু তিনি দেখতে পেয়েছেন বিদেশের নানা স্থানে। একবারও প্ল্যান করে রংধনু দেখেন নি তিনি। রংধনু নিজেই নিজের খেয়ালে এসে ধরা দিয়েছে তার চোখে। ম্যারি নিজের ঘরের সীমানা পেরিয়ে চরাচরের আলো-অন্ধকারের সন্ধিক্ষণে তন্ময় হয়ে থাকেন রংধনুর সাত রঙে।

“খেতে এসো।”

ডাইনিং টেবিল সাজাতে সাজাতে মৃদ্যু কণ্ঠে ডাক দেন মিসেস অ্যানি গিলবার্ট, ম্যারির মা। ধ্যান-ভেঙে ম্যারি জানলার পাশ থেকে ডাইনিং স্পেসে চলে আসেন। মা ছাড়া আর কেউ নেই তার দুনিয়ায়। দিন শেষে মায়ের আশ্রয়ে ম্যারি পুনর্জন্ম লাভ করেন। মায়ের হাত চেপে তিনি একটি চেয়ারে বসেন দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল জীবন পেরিয়ে আসা ষাটের কাছাকাছি বয়সের দ্বারপ্রান্তের এক ক্লান্ত রমণীর মতো। বিবাহ বিচ্ছেদের পর অনেকগুলো বছর একা থাকতে থাকতে যখন অস্থির ও দিশাহীন অবস্থায় হাবুডুবু খাচ্ছিলেন ম্যারি, তখনই মা এসে তার পাশে পাহাড়ের মতো অটল আস্থায় দাঁড়ান। সারাদিন আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পড়তে আসা ছাত্র-ছাত্রী আর বাকীটা সময় মা তার জীবনের চৌহদ্দী ও সাহস। অথচ একসময় তারও জীবন ছিল রংধনু রঙে রাঙা, যখন ক্যাভিন ছিল পাশে আর টমাস কোলে। এখন সবাই যার যার জীবনের বিবরে আবদ্ধ। সবাই সবার মতো নিজের কাজে ব্যস্ত। বিশাল আকাশের গভীরে রংধনুর রঙগুলোর মতো লুকিয়ে রয়েছে সবাই। কেউ কারো পাশাপাশি আসতে পারছে না। বৃষ্টি শেষে রংধনুর মতো খানিকক্ষণের জন্যেও দেখা হয় না ম্যারি আর তার জীবনের একদা রঙিন মানুষগুলোর সঙ্গে।    

অন্যমনস্ক ম্যারিকে দেখতে দেখতে মেয়ের মনের মধ্যে চাপা বেদনা টের পান মিসেস অ্যানি গিলবার্ট। চেষ্টা করেন কথা বলে সান্তনা দিতে।

“ওদের সঙ্গে কথা হয়েছে?”

“না।”

“হবে কেমন করে? যেমন বাপ তেমনই ছেলে। কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই।”

মায়ের ক্ষোভ সঙ্গত। তবু সায় দিতে মন মানে না ম্যারির। ক্যাভিন তো এমনই। চরম বোহেমিয়ান। কখন কোথায় থাকবে, সে নিজেও জানে না। বাতাসের ঝাপ্টায় বেসামাল একখণ্ড ভাসমান মেঘের মতো আকাশের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোই যেন তার স্বভাব। নিয়তিও তাকে তেমনই ভানিয়ে বেড়াচ্ছে। তবুও ভেসে ভেসেই জীবন তাদেরকে নিয়ে যৌথতায় বেশ চলছিল। ক্যাভিন একদিন বললো, “তুসি স্থিত হও। আমার মতো ঠিকানাবিহীন হলে তোমার চলবে না।” ততদিনে টমান এসে গেছে। ম্যারির মাতৃত্ব ও নারীত্ব একটি স্থায়ী ও নিরাপদ আশ্রয়ের প্রত্যাশা করছিল মনে মনে। ক্যাভিন তার ইচ্ছের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হয়ে বলে, “কিন্তু আমি তো এক জায়গায় স্থির থাকতে পারবো না। তুমি বরং নিজের মতো শুরু করো। আমার শুভেচ্ছা থাকেবে।”

পরদিন ঘুম থেকে উঠে ক্যাভিনের দেখা নেই। নেই মানে নেই। ঘরে নেই, আশেপাশে কোথাও নেই। রাতে বিছানা ঠিক করতে গিয়ে বালিশে চাপা ক্যাভিনের চিঠিটি হাতে আসে ম্যারির। চিঠির ভাষ্য অতি সংক্ষিপ্ত। “প্রকৃত অর্থে সঙ্গে না থেকে তোমাকে আটকে রাখা অনৈতিক। সেপারেশন ইউলে সাইন করে দিলাম। আর ব্যাঙ্কের নমিনি। আশা করি মাঝে মাঝে দেখা ও কথা হবে।”

ম্যারি জানতেন ক্যাভিনের পক্ষে কোনো কিছু করাই অসম্ভব নয়। বিশ্বের সবচেয়ে বিপদজ্জনক সেতুতে ঝুঁলে থাকা, মাঝরাতের অন্ধকারে প্যাসিফিকে সুইমিং করা, হিমালয়ের কোনো গুহায় একাকী কয়েকদিন ধ্যানমগ্ন হওয়া তার কাছে নস্যি। এতো কমিটেড প্রেম, যৌথজীবন, এক লহমায় উড়িয়ে দিয়ে দিব্যি হাওয়া হয়ে গিয়েছে ক্যাভিন। সদ্যজাত পুত্র টমাসের জন্যেও বিন্দুমাত্র পিছুটান অনুভব করে নি লোকটি। রাগে, ক্ষোভে, প্রত্যাখ্যানের অপমানে সারা রাত ঘুমাতে পারে নি ম্যারি। যদিও জানে কোনো ফল হবে না, তবু ছোট্ট ক্যাম্পাস টাউনের আনাচেকানাচে দিনভর ক্যাভিনের খোঁজ করেন ম্যারি। না, তার কোনো খোঁজ নেই। তার গতিবিধির সন্ধানও কেউ জানে না। যদি মন চায়, হয়ত ক্যাভিন নিজেই জানাবে তার হদিস। শত চেষ্টা করেও ম্যারি আর তার কোনো খোঁজ পাবে না। নিজের প্রতিক্রিয়াগুলোও জানাতে পারবে না। ক্যাখিনের খোঁজে ব্যর্থ হয়ে ম্যারি দিন শেষে ঘরে ফিরে আসে চরম হতাশায়। এসেই মনে হয়, পুরো বাড়িটা বড্ড হাহাকার করছে। ঘরগুলো খুবই ফাঁকা আর দমবন্ধ মনে হয় তার। টমাসকে কোলে নিয়ে তিনি চলে আসেন বাড়ির লনে। সাজানো বাগানের মধ্যে একটা লম্বা পাইন ম্যারির খুব প্রিয়। ক্যাভিনকে নিয়ে রাতের পর রাত গল্প করে কাটিয়েছেন তিনি নিঃসঙ্গ পাইনের কাছে। বিচ্ছেদ বেদনা নিয়ে তিনি রাতের অন্ধকারে পাইনের নিচে বসে থাকেন।

রাতের আকাশে রংধনু থাকার কথা নয়। তবু মাঝরাতের দিকে ম্যারির মনে হয় তিনি যেন আবছা আলোয় একটি অস্পষ্ট রংধুন দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও তিনি রঙিন আলোর জগতকে ছুঁতে পারছেন না। যন্ত্রণার বুক-চাপা কষ্টে আস্ত একটি রাত নির্ঘুম কেটে যায় তার জীবন থেকে। তিনি অনুভব করেন, প্রিয় মানুষের অভাবে এমন অনেক ঘুমহীন রাত তার জীবনের শূন্যতা পূর্ণ করবে। তার স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ ছিন্ন হয়ে যাবে। তিনি বেঁচে থাকবেন ঘুম ও জাগরণের মাঝখানে নিঃসঙ্গ ও একেলা। ঠিক যেন বাগানের সঙ্গীবিহীন পাইন গাছের মতো।   

[পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার]

;