ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-৭



মাহফুজ পারভেজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

[সপ্তম কিস্তি]
ঘোরাক্রান্তের মতো ক্যাভিনের পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা করে নির্ধারিত সময়ের আগেই উইলিয়ামের হাতে তুলে দেন ম্যারি। ম্যারির শুধুই মনে হয়, বইটি ক্যাভিন সাধারণভাবে পাঠকের জন্য লিখতেও বিশেষভাবে লিখেছেন তার জন্য। এতো দিন একসাথে থেকে যে ক্যাভিনকে ম্যারি চিনতে পারেননি, তার বই সেই চেনাজানার দুরত্ব নিমেষে ঘুচিয়ে দিয়েছে।

সম্পাদনার কাজে বার বার বইটি পড়ে অনেক দিন বাদে ম্যারির মধ্যে তৃপ্তির ভাব তৈরি হয়েছে। আসলেই তো, ক্যাভিন মুখে না বললেও, যেমন আশা করেছে, ম্যারি না জেনেই তেমনটিই করেছে এতোদিন ধরে। প্রচণ্ড চেষ্টায় টমাসকে যত্ন করেছে। বাবার অভাব মোটেও বুঝতে দেয় নি। মাতৃত্বের পেলবতার সঙ্গে পিতৃত্বের দায়িত্বশীলতা মিশিয়ে আপত্য স্নেহে লালন করেছেন তিনি টমাসকে। নিজের পুরো জীবনকে তিনি সীমায়িক করেছেন টমাসকে ঘিরে। তার স্কুল, খেলার মাঠ, ঘুরতে যাওয়া সবকিছুতে সঙ্গে থেকেছেন ম্যারি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবার কথা বিশেষ একটা আলাপ করে না টমাস। শুধু অনুভব করে, বাবা আছেন।

ক্যাভিনকে হাতের কাছে না পেয়ে ম্যারি মনে মনে প্রায়ই তার সঙ্গে কথোপকথনে লিপ্ত হন:

“আমি চেষ্টা করেছি তোমার ছেলেকে তোমার অভাব বুঝতে না দিতে। কিন্তু তুমি কি জানো, আমার জীবনে এখনো তোমার অভাব আমি অনুভব করি।”

ম্যারি জানেন, এসব কথা কোনো দিনও ক্যাভিনকে বলা হবে না। আবার তিনি এটাও জানেন, ক্যাভিনকে একেবারেই ভুলে যাওয়া অসম্ভব। অনেক প্রাপ্তি ও স্মৃতির মতো ক্যাভিনের হাত ধরে রংধনু চেনার অভিজ্ঞতা জীবনে ভুলতে পারবেন না ম্যারি।

রংধনুর কথা ভাবলেই আকাশে রঙের বর্ণালী আর মাটিতে বহুবর্ণা ক্যাভিনের ইমেজ ম্যারির সামনে এসে দাঁড়ায়। ‘রংধনু’, যাকে নিয়ে কবি-ঔপন্যাসিকরা প্রচুর উপকথার মালা গেঁথেছেন এবং বিজ্ঞানীরা বের করেছেন রংধনুর আসল রহস্য। কিন্তু ম্যারিকে রংধনু চিনিয়েছে ক্যাভিন। ম্যারির হাতের তালুতে নিজের আঙুলের স্পর্শে ক্যাভিন ব্যাখ্যা করেছে রংধনুর একেকটি রঙ। ক্যাভিনের স্পর্শ মেখে রংধনুর রংগুলো চোখের সীমানা ছুঁয়ে পৌঁছে গিয়েছিল ম্যারির হৃদয়ের অতলে। সেই অনুভূতি এখনো ম্যারিকে সর্বাঙ্গে জড়িয়ে রেখেছে মাধবী লতার আবেশে।

ক্যাভিন বলেছিল, “রংধনু হিসেবে আমরা যা দেখতে পাই তা আপাতদৃষ্টিতে ধনুকের মতো অর্ধচন্দ্রাকার হলেও তা আসলে গোল। বৃত্তাকার। অবাক লাগলো? অবাক লাগা এরকম অনেক কিছু ব্যাপার আছে রংধনুতে। যেমন বৈচিত্র্য আছে প্রতিটি মানুষের চরিত্রে ও ব্যক্তিত্বে, চিন্তায় ও চৈতন্যে।”

কোনো বই বা বিশেষজ্ঞ নন, ক্যাভিনই একবার নেপালের পোখরায় রংধনু-আবিষ্ট আকাশের নিচে সঙ্গোপনে পাশে এসে কানে কানে বলেছিল, “সূর্য থেকে যে আলোর রশ্মি পৃথিবীতে আসে তার রঙ মূলত সাদা। এই সাদা রঙের ভেতরে বেগুনী, নীল, আসমানি, সবুজ হলুদ, কমলা ও লাল এই সাতটি রং বিদ্যমান থাকে। সাদা আলোর একটি বিশেষ ধর্ম আছে। প্রিজমের মধ্য দিয়ে গমন করলে সাদা আলো সাতটি ভিন্ন রঙে বিশ্লেষিত হয়ে যায়।"

ক্যাভিন আরো বলেছিল, "আকাশে যখন বৃষ্টি পড়ে তখন বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ভাসমান প্রিজমের মতো কাজ করে। সূর্য হতে আলো, বৃষ্টির ফোঁটার একপাশ দিয়ে প্রবেশ করে বের হবার সময় সাত রঙা বর্ণালী সৃষ্টি করে। বৃষ্টির ফোঁটার প্রিজমসুলভ বৈশিষ্ট্যের কারণেই সৃষ্টি হয় রংধনু। বৃষ্টির ফোঁটা হতে বের হওয়া সাত রঙের আলো আমাদের চোখে এসে পৌঁছায় বলেই আমরা রংধনুকে দেখতে পাই।”

“মানুষও আসলে একটি অদৃশ রংধনু। তার হাসি, কান্না, আনন্দ, বেদনার আলাদা আলাদা রং আছে। আমরা তা দেখতে পাই না। কখনো কখনো কোনো শিল্পী কালো রঙে দুঃখ, সবুজে আনন্দ, হলুদে উৎসব, লালে দ্রোহ চিত্রিত করেন। এগুলোই এখন সাধারণভাবে মান্যতা পেয়েছে”, বলেছিল ক্যাভিন।

সেদিন কথাগুলোর গভীরতা ম্যারি বুঝেন নি। এখন বোঝেন, যখন ক্যাভিন পাশে নেই।

ক্যাভিন বুঝিয়েছিল, "আসলে মানুষ একরৈখিক নয়। কিছুটা বাঁকা। নানা কারণে এমন বক্রতা। কখনো স্বভাবের কারণে, কখনো পরিস্থিতির কারণে মানুষ বক্র হতে বাধ্য হয়। যেমন রংধনুও ধনুকের মতো বাঁকানো। কিন্ত কেন? এরও সুনির্দিষ্ট কারণ আছে। বৃষ্টির ফোঁটা থেকে আসা বিভিন্ন রঙের আলো চোখের সাথে সামান্য কোণ উৎপন্ন করে। ত্রিমাত্রিক জগতে সেই কোণ চোখের চারদিকেই উৎপন্ন হয়। ফলে তা দেখতে অনেকটা চোঙের মতো হয়। চোঙের উপরিপৃষ্ঠ বৃত্তাকার হয়। চোখের সাপেক্ষে চোখের চারদিকে রঙধনুর চোঙও বৃত্তাকার। সেজন্য রংধনুকে দেখতে বাঁকানো মনে হয়। তবে কেউ যদি রংধনুর পুরো বৃত্ত দেখতে চায় তাহলে তাকে উপরে উঠতে হবে। হতে পারে সেটা প্লেনে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে। সূর্য এবং রংধনু এই দুইয়ের মাঝে অবস্থান করলে বৃত্তাকার রংধনু দেখা যাবে।"

"মানুষকেও পরিপূর্ণভাবে দেখতে হয় দূর থেকে। যেমন, হিমালয়ের পায়ের কাছে দাঁড়ায়ে একটি প্রস্তরীভূত দেয়াল দেখা যাবে। যতদূরে যাওয়া যাবে, ততই হিমালয়ের পূর্ণ অবয়ব প্রকাশিত হবে। কাছের মানুষ থেকে দূরের মানুষকে আমরা অনেক বেশি ভালো করে দেখতে ও বুঝতে পারি।" এই ছিল ক্যাভিনের অভিমত।

“এটা কেমনে সম্ভব?’ প্রশ্ন করেছিল ম্যারি।

“খুবই সম্ভব। সারাজীবন পাশাপাশি থেকেও মানুষেরা নিজেদের চিনতে পারে না। স্বামী স্ত্রীকে, পিতা পুত্রকে, পুত্র পিতাকে খুব কমই চিনে। যদি সত্যিই চিনতো, তাহলে এতো বেদনা, ভুল বোঝাবুঝি মোটেও হতো না।”

ম্যারি আর তর্ক করার যুক্তি পান না। চুপ করে থাকেন। ক্যাভিন খানিকক্ষন ভেবে বলে,

“রংধনুতে রঙের ভেতর বাহির আছে। মানুষেরও ভেতর আর বাহির আছে। মানুষ নিজেই নিজের সবটুকু দেখে না, বোঝে না। অন্য মানুষ কি করে বুঝবে বলো?”

কিছুটা সময় নিয়ে বিষয়টি ম্যারিকে বুঝিয়ে বলে ক্যাভিন। আসলে সাধারণভাবে মানুষের একটি বা দুটি দিক প্রাধান্য পায় আর সেটাকেই অন্যরা মানুষাটির সবটুকু বলে ধরে নেয়। মনে করে, তিনি একজন রাগী মানুষ কিংবা ভীতু মানুষ অথবা লোভী মানুষ। এমন ধারণা সর্বাংশে সঠিক নয়। রাগী মানুষটিও কারো কারো প্রতি স্নেহশীল। ভীতু লোকটিও অকস্মাৎ প্রচণ্ড সাহসী হয়ে উঠতে পারে। কিংবা কোনো লোভী লোকও গোপনে দানশীল হতে পারে। এসব সাধারণের চোখে হয়ত দৃশ্যমান নয়। রংধনুতে যেমন সবসময় লাল রঙ রংধনু-বৃত্তের বাইরে অবস্থান করে আর বেগুনি রঙ ভেতরের দিকে থাকে। বাকি রঙগুলোও একটি নির্দিষ্ট ক্রমানুসারে সাজানো থাকে, তেমনি মানুষের কিছু বৈশিষ্ট্য বাইরের দিকে বা প্রকাশ্যে থাকে আর কিছু অন্তরালে।

মানব বৈশিষ্ট্যের একটি ক্রম আছে রংধনুর রঙগুলোর মতোই। সব সময় এবং পৃথিবীর সর্বত্র রংধনুর রঙ-সজ্জার ক্রমের এদিক সেদিক হয় না। একেবারেই নিয়মতান্ত্রিকতায় বেষ্টিত রঙগুলো। মানুষও কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য দ্বারা এমনভাবে পরিবেষ্টিত থাকে যে, তার চরিত্রকে অন্যভাবে কল্পনা করা যায় না। এজন্য দায়ী তরঙ্গ দৈর্ঘ্য। রংধনুর ক্ষেত্রে প্রতিটি রঙেরই একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গ দৈর্ঘ্য আছে। সাতটি রঙকে তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের ক্রমানুসারে সাজালে এই ক্রমটি পাওয়া যাবে- বেগুনী, নীল, আসমানী, সবুজ, হলুদ, কমলা, লাল। তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের পরিমাণ কম বেশি হলে প্রিজমের মধ্যে তাদের বেঁকে যাবার পরিমাণও কম বেশি হয়। মানে বেঁকে যাবার দিক থেকে সাতটি আলোই আলাদা।

পদার্থবিদ্যার নিয়ম সবখানে সবসময় এক। তাই সবসময় লাল রঙ রংধনুর বৃত্তের বাইরে অবস্থান করে। আর বেগুনী রঙ বৃত্তের ভেতরের দিকে অবস্থান করে। তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ক্রমানুসারে প্রতিবার বিশ্লিষ্ট হয়ে একই ক্রম-রঙের রংধনু সৃষ্টি করে। মানুষও অভিজ্ঞতায়, আচরণে, কাজকর্মে এমনই একটি ক্রম নিজের মধ্যে তৈরি করে ফেলে। ফলে মেজাজ দেখানো লোকটি ইচ্ছা থাকলেও এক সময়ে সর্বসম্মুখে আর স্নেহ দেখাতে পারে না কিংবা দেখালেও অতি সঙ্গোপনে দেখান। এসব সীমাবদ্ধতা ও আচরণগত দাসত্বের কারণে খুব ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও বহুলোক সত্য কথা বলতে পারে না। ভালোবাসার মানুষটিকে ভেতরে ভেতরে গভীরভাবে ভালোবাসলেও সে কথাটি খোলাখুলি জানাতে পারে না।

তবে বৃষ্টি হলে যেমন রংধনু দেখা যায়, তেমনি সঙ্কটে, আবেগে, বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে মানুষের চরিত্রের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা বিচিত্র রঙগুলো দেখতে পাওয়া যায়। তখন একজন মানুষের সবগুলো দিক সামনে চলে আসে। তবে বৃষ্টি হলেই যেমন রংধনু তৈরি হয় না আকাশে, তার জন্য সূর্যের উপস্থিতি থাকা লাগে, তেমনি বিশেষ পরিস্থিতি বা ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ কোনো মানুষের উপস্থিতির দরকার হয় একজন মানুষের সামগ্রিক চরিত্রের পূর্ণতর উন্মোচনের জন্যে।

কাভিনের শেষ কথাগুলো বর্শার মতো বিদ্ধ হয়ে আছে ম্যারির মগজে,

“ভালভাবে রংধনু দেখতে হলে আমাদের অবস্থান এমন হতে হবে যেন সূর্য আমাদের পেছনে আর রংধনু সামনে থাকে। একজন মানুষকে ভালোভাবে দেখতে ও বুঝতে হলে বিভিন্ন পরিস্থিতি ও আরো অনেকে মানুষের প্রয়োজন হবে। তখনই তুলনা করে দেখা যাবে সম্পূর্ণ মানুষটিকে তার নানা বৈশিষ্ট্যের আলোকে। এজন্যই কাছে থাকার মতো দূরে থাকাও জরুরি।”

ম্যারি এসব পুরনো কথা ভেবে শিহরিত হন যে, এমন একজন মানুষ তার জীবনে এসেছিল, যে কাছে থাকলে মনে হয় দূরের আর দূরে থাকলে অনুভব করা যায় অতি কাছের একজনের মতো।

পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার।

আরও পড়ুন: ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-৬

হাসান হাফিজের এক গুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
হাসান হাফিজের এক গুচ্ছ কবিতা

হাসান হাফিজের এক গুচ্ছ কবিতা

  • Font increase
  • Font Decrease

ছায়ামায়া বিচ্ছিন্নতা

আবার কখনো হয়তো দেখা হবে
ম্যানিলায়, স্যান মিগুয়েল ড্রাইভে
অদেখার চাপা কষ্ট হয়তো মুছে যাবে
যেহেতু এখন বিশ্ব গ্লোবাল ভিলেজ
ভালো থেকো ম্যানিলাসুন্দরী
তোমার চিকুরে গ-ে মূর্ত হবে
অস্তগামী রোদ্দুরের আভা
কনে দেখা আবছায়া আলোয় মল্লারে
অঙ্কুরিত হতে হতে মরে যাওয়া,
ভালোবাসা ফুল্ল হবে সঘন বন্দিশে
সেই ঐশী মুহূর্তের অপেক্ষায়
পোড়খাওয়া দিন রাত্রি যায়
যুগল মনকে মেখে আবেগে জড়ায়
আধখানা পায় যদি আধেক হারায়
টেলিপ্যাথি দু’জনাকে কাছে এনে
আবারও বিচ্ছিন্ন করে ছায়ায় মায়ায়!

আমাদের জানা নেই

জন্ম থেকে মৃত্যু অব্দি
কতো ক্লান্তি টানাহেঁচড়া এবং ধকল
সমুদয় ফুলের কুঁড়িরা
এই ব্যথা লগ্নি করে নিঝুম নিস্তেজ।
তারাও তো নীলকণ্ঠ
চুপেচাপে হজম করেছে কতো
অপ্রাপ্তি ও লাঞ্ছনার বিষ
মানবজন্মও মূলে লানতের সিঁড়ি
পতনেরই সম্মোহন আছে
আরোহণ অধরা বস্তুত।

জন্ম-মৃত্যু কোন্ প্রশ্নে একাকার লীন
সম্পূরক একজনা অপর জনার
অবিমিশ্র খাঁটি সত্য আমরা জানি না
অন্ধের আন্দাজশক্তি হাতড়িয়ে নিঃসঙ্গতা
বৃদ্ধি করে আরো, আলো ছুঁতে ব্যর্থ অপারগ।

পাই বা না পাই চাই

হাত ধরেছো অন্ধকারে
এইটুকুনি, এর বেশি তো নয়
কেন কেঁপে উঠতে গেলাম
কী ছিল সেই ভয়?
হাতের শিরায় উপশিরায়
মেদুর সে কম্পন
হৃৎযন্ত্রেই পৌঁছে গেল
সীমার যে লংঘন
করলে তুমি জেনেশুনে
অবাস্তবের স্বপ্ন বুনে
কে কার আপনজন
নির্ধারিত হওয়ার আগেই
লুন্ঠন কাজ শেষ
নিষিদ্ধ প্রেম বজ্রঝিলিক
হয়নি নিরুদ্দেশ,
জাঁকিয়ে বসে আরো
মারবে আমায়? মারো-
মারতে মারতে জীবনশক্তি
ফুরিয়ে নিঃশেষ
চাই তোমাকে, পাই বা না পাই
নিমজ্জমান হতেই তো চাই
হোক যতো শ্রম ক্লেশ।

মৃত্যুগাঙে ঢেউয়ের সংসারে

গাঙের মাঝি গাঙেরে কি চিনে?
এই প্রশ্ন হয় না মনে উদয়
গাঙের ঢেউয়ে আছাড় পিছাড়
দ্বন্দ্ব দ্বিধা টানাপড়েন আশঙ্কা সংশয়
গাঙ যে মাঝির পরানসখা, বন্ধুতা তার বিনে
অন্য কোনো রয় কি পরিচয়?
গাঙে উঠলে মৃত্যুমাতাল ঢেউ
পায় না রেহাই কেউ
মাঝগাঙ্গে সে ডুইব্যা মরে, কীভাবে উদ্ধার
চারদিকেতে ঢেউয়েরই সংসার
মাঝি ও গাঙ, অন্য কেহই নাই
চিরকালীন দুইয়ের সখ্য, কোন্ ইশারা পাই
গাঙের মাঝি গাঙের গূঢ় গোপন কথার
শরিক হইতে চায়
কত্তটুকুন পারে ক্ষুদ্র এই জীবনে
আয়ু ক্ষইয়ে যায়
অল্প কিছুই সুলুক সন্ধান
সন্তোষ নাই তায়

বেঁচে থাকা বলে কাকে

জীবন তো ব্ল্যাকবোর্ড ছাড়া কিছু নয়।
ঘটনা বা অঘটন যাই থাকে
নিপুণ শিল্পীর মতো মুছে দেয়,
বাকি বা অক্ষত রাখে সামান্যই।
অদৃশ্যে কে ক্রিয়াশীল আমরা জানি না,
কিবা তার পরিচয়, সাকিন মোকাম কোথা
কিছুরই হদিস নাই। উদ্ধারেরও সম্ভাবনা নাই।
ব্ল্যাকবোর্ড এবং ডাস্টার। জন্ম ও মৃত্যুর খতিয়ান
তুচ্ছতা ঔজ্জ্বল্যে ঋদ্ধ থরোথরো লাবণ্য স্মৃতির
মস্তিষ্কের নিউরন নিখুঁত সেন্সর করে
কারুকে বাঁচিয়ে রাখে, অন্যদের
সরাসরি মৃত্যু কার্যকর
ভোঁতা এক অনুভূতি সহায় সম্বল করে
আমরা ক্লীব টিকে থাকি
একে তোমরা ‘বেঁচে থাকা’ বলো?

আমাদেরও নিয়ে নাও নদী

হৃদয়বাহিত হয়ে তোমার কষ্টের কান্না
সংক্রমিত হয়ে পড়ে হৃৎপিন্ডে আমার
নিদান আছে কী কিছু ?
নাই কোনো স্টেরয়েড এ্যান্টিবায়োটিক
সেহেতু শরণ লই ভেষজ উদ্ভিদে
গুল্মলতা তোমার নির্যাসরসে প্রাকৃতিক হই
বুনোবৃষ্টি মাথাচাড়া দিতে চায় দিক
অঝোর বর্ষণে আমরা সিক্ত হই যথাসাধ্য
নিঃস্ব রিক্ত পুলকিত হই যুগপৎ
নদী খুঁজে পেয়ে যায় আকাক্সিক্ষত সাগরমোহানা
লীন হয়,বাঞ্ছিতকে আলিঙ্গনে ভারাতুরও হয়
এই প্রাপ্তি তপস্যারই পরিণতি,আছে কী সংশয়
কখন হারিয়ে ফেলে এইমতো রয়েছেও ভয়

হৃদয়বাহিত হয়ে নদীস্রোতে যায় বয়ে পরিস্রুত হয়ে
আমাকে তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাক করুণা প্রশ্রয়ে

;

শিশুসাহিত্যিক আলী ইমাম মারা গেছেন



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশিষ্ট লেখক, শিশুসাহিত্যিক, সংগঠক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আলী ইমাম মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর।

সোমবার (২১ নভেম্বর) বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডির ইবনে সিনা বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। আলী ইমাম শ্বসনতন্ত্রের সমস্যা, নিউমোনিয়াসহ নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আলী ইমামের পেজে তার ছেলের দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি জানানো হয়।

আলী ইমাম ১৯৫০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছয়শতাধিক বই লিখেছেন। কর্মজীবনের শেষপ্রান্তে একাধিক স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের আগে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন (২০০৪-২০০৬) ও অধুনালুপ্ত চ্যানেল ওয়ানের (২০০৭-২০০৮) মহাব্যবস্থাপক ছিলেন।

দেশের শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য আলী ইমাম ২০০১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০১২ সালে শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার পান। এছাড়াও অনেক পুরস্কার পান তিনি। শিশুসাহিত্যিক হিসেবে জাপান ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে ২০০৪ সালে তিনি জাপান ভ্রমণ করেন।

আলী ইমামের শিশুসাহিত্য চর্চার শুরু শৈশব থেকে। ১৯৬৮ সালে তিনি তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান শিক্ষা সপ্তাহে বিতর্ক এবং উপস্থিত বক্তৃতায় চ্যাম্পিয়ন হন। ১৯৮৬ সালে ইউনেস্কো আয়োজিত শিশুসাহিত্য বিষয়ক প্রকাশনা কর্মশালায় অংশ নেন। এছাড়া বাংলাদেশ স্কাউটসের প্রকাশনা বিভাগের ন্যাশনাল কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

;

কবি সুফিয়া কামালের মৃত্যুবার্ষিকী আজ



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

নারীমুক্তি আন্দোলনের পুরাধা ব্যক্তিত্ব গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের অগ্রদূত জননী সাহসিকা কবি বেগম সুফিয়া কামালের ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ রোববার।

এ উপলক্ষে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে।

মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালির সমস্ত প্রগতিশীল আন্দেলনে ভূমিকা পালনকারী সুফিয়া কামাল ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর শনিবার সকালে বার্ধক্যজনিত কারণে ইন্তেকাল করেন। সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার ইচ্ছানুযায়ী তাকে আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

তার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে উল্লেখ করেন, কবি সুফিয়া কামাল ছিলেন নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ এবং সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে এক অকুতোভয় যোদ্ধা। তার জন্ম ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালে। তখন বাঙালি মুসলমান নারীদের লেখাপড়ার সুযোগ একেবারে সীমিত থাকলেও তিনি নিজ চেষ্টায় লেখাপড়া শেখেন এবং ছোটবেলা থেকেই কবিতাচর্চা শুরু করেন। সুললিত ভাষায় ও ব্যঞ্জনাময় ছন্দে তার কবিতায় ফুটে উঠত সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ ও সমাজের সার্বিক চিত্র। তিনি নারীসমাজকে অজ্ঞানতা ও কুসংস্কারের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। মহান ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার, মুক্তিযুদ্ধসহ গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিটি আন্দোলনে তিনি আমৃত্যু সক্রিয় ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, ছিলেন তার অন্যতম উদ্যোক্তা।

তিনি বলেন, কবি সুফিয়া কামাল পিছিয়ে পড়া নারী সমাজের শিক্ষা ও অধিকার আদায়ের আন্দোলন শুরু করেছিলেন এবং গড়ে তোলেন ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ’। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অবদানের জন্য তাকে ‘জননী সাহসিকা’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি বেগম সুফিয়া কামালের সাহিত্যে সৃজনশীলতা ছিল অবিস্মরণীয়। শিশুতোষ রচনা ছাড়াও দেশ, প্রকৃতি, গণতন্ত্র, সমাজ সংস্কার এবং নারীমুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার লেখনী আজও পাঠককে আলোড়িত ও অনুপ্রাণিত করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা হোস্টেলকে ‘রোকেয়া হল’ নামকরণের দাবি জানান তিনি । ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করলে এর প্রতিবাদে গঠিত আন্দোলনে কবি যোগ দেন। বেগম সুফিয়া কামাল শিশু সংগঠন ‘কচি-কাঁচার মেলা’ প্রতিষ্ঠা করেন। আওয়ামী লীগ সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নামে ছাত্রী হল নির্মাণ করেছে।

কবি বেগম সুফিয়া কামাল যে আদর্শ ও দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা যুগে যুগে বাঙালি নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পঁচাত্তরের পনেরই আগস্টে নির্মমভাবে হত্যা করে যখন এদেশের ইতিহাস বিকৃতির পালা শুরু হয়, তখনও তার সোচ্চার ভূমিকা বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের গণতান্ত্রিক শক্তিকে নতুন প্রেরণা যুগিয়েছিল।

সুফিয়া কামাল ১৯১১ সালের ২০ জুন বেলা ৩টায় বরিশালের শায়েস্তাবাদস্থ রাহাত মঞ্জিলে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর সুফিয়া কামাল পরিবারসহ কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন। ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং এই আন্দোলনে নারীদের উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি ১৯৫৬ সালে শিশু সংগঠন কচিকাঁচার মেলা প্রতিষ্ঠা করেন।

পাকিস্তান সরকার ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র সঙ্গীত নিষিদ্ধের প্রতিবাদে সংগঠিত আন্দোলনে তিনি জড়িত ছিলেন এবং তিনি ছায়ানটের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে মহিলা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেন।

১৯৭০ সালে তিনি মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনে নারীদের মিছিলে নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ধানমন্ডির বাসভবন থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা দেন। স্বাধীন বাংলাদেশে নারী জাগরণ ও নারীদের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও তিনি উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণসহ কার্ফু উপেক্ষা করে নীরব শোভাযাত্রা বের করেন।

সাঁঝের মায়া, মন ও জীবন, শান্তি ও প্রার্থনা, উদাত্ত পৃথিবী ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। এ ছাড়া সোভিয়েতের দিনগুলি এবং একাত্তরের ডায়েরী তার অন্যতম ভ্রমণ ও স্মৃতিগ্রন্থ।

সুফিয়া কামাল দেশ-বিদেশের ৫০টিরও বেশি পুরস্কার লাভ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার, সোভিয়েত লেনিন পদক, একুশে পদক, বেগম রোকেয়া পদক, জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার ও স্বাধীনতা দিবস পদক।

সুফিয়া কামালের পাঁচ সন্তান। তারা হলেন, আমেনা আক্তার, সুলতানা কামাল, সাঈদা কামাল, শাহেদ কামাল ও সাজেদ কামাল।

;

বিশেষ ব্যক্তিদের সম্মাননা দিলো 'চয়ন সাহিত্য প্রকাশনী'



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

"চয়ন সাহিত্য ক্লাব" এর ২০ তম বার্ষিকী এবং সাহিত্য পত্রিকা "চয়ন ও দশদিগন্ত" এর ৩০ তম  প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী  ১৮ নভেম্বর, ২০২২, বিকাল ৩ টায় জাতীয় জাদুঘরের কাজী সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় ।

অনুষ্ঠানে ‘চয়ন সাহিত্য ক্লাব স্বর্ণপদক-২০২২’ তুলে দেওয়া হয়। লিলি হক রচিত "কবিতার প্রজাপতির নীড়ে " বইটি " চয়ন প্রকাশন" থেকে প্রকাশিত হয়, একই সময়ে কবিতা পাঠের পাশাপাশি অন্যান্য আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন জাতীয় জাদুঘর প্রযত্ন পর্ষদ এর সভাপতি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত কথা সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক হাসনাত আব্দুল হাই, বিশেষ অতিথি, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব ম. হামিদ, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটির এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ ফসিউল্লাহ্। উপস্থিত ছিলেন উৎসব কমিটির চেয়ারম্যান, সুসাহিত্যক সেলিনা হোসেন। 

পদকপ্রাপ্ত গুণীজন আর্ন্তজাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফ্যাশন আইকন বিবি রাসেল, প্রখ্যাত বাচিকশিল্পী গোলাম সারোয়ার ,কথাসাহিত্যিক আবু সাঈদ, সুসাহিত্যক এবং বাংলা একাডেমীরই আজীবন সদস্য  গুলশান-ই-ইয়াসমীন।

সঙ্গীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী বুলবুল মহলানবীশ, মনোয়ার হোসেন খান, ও আনজুমান আরা বকুল। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন ছড়াশিল্পী ওয়াসীম হক। সার্বিক পরিচালনায় ছিলেন অনুবাদক মোঃ নুরুল হক। হৈমন্তী সন্ধ্যায় অনুষ্ঠানটি এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।

;