গ্রন্থ সমালোচনা: ‘আমাদের অর্থে আমাদের পদ্মা সেতু’



প্রফেসর ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

এ পর্যন্ত পদ্মা সেতুকে নিয়ে যতগুলো গ্রন্থ বের হয়েছে, তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হচ্ছে: ‘আমাদের অর্থে আমাদের পদ্মা সেতু’। সুসম্পাদিত এ গ্রন্থখানি সম্পাদনা করেছেন বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। গ্রন্থটিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুটো ভাষণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এতে বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের ৫১টি প্রবন্ধ রয়েছে। ছড়া-কবিতা রয়েছে দশটি ও গান রয়েছে দুটি। একটি প্রামাণ্য ঘটনাপ্রবাহ রয়েছে। পাশাপাশি চারটি সাক্ষাৎকার রয়েছে এবং অ্যালবামে বেশকিছু দুর্লভ চিত্র রয়েছে।

গ্রন্থখানি ব্যতিক্রমধর্মী হিসেবে পাঠকদের কাছে হৃদয়গ্রাহী হয়ে ধরা দেয়। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে বাঙালি জাতির সৃজনশীল ও ধীশক্তিসম্পন্ন জননেত্রী শেখ হাসিনাকে। তিনি একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন অসামান্য নেত্রী। পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যিনি পদ্মা সেতু নির্মাণের কারিগর ও স্বপ্নদ্রষ্টা তিনি বলেছেন যে, ‘বাঙালি জাতি বীরের জাতি। বাঙালি ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে রঞ্জিত হয়েছে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা, অনেক রক্তধারায়’ (পৃ: ২৮)।

একটি কথা না বললেই নয়, বাংলা একাডেমির বাংলা অভিধানের সংস্কার প্রয়োজন। যেমন- অভিধান অনুসারে আজকাল উপলক্ষকে লেখা হয় উপলক্ষ্য। জোর দাবি জানাব, বাংলা একাডেমি বাংলা অভিধানের সংস্কার সাধন করা হোক। এ জন্য নতুন করে সংশোধনী কমিটি তৈরি করা উচিত।

এস এ মালেকের প্রবন্ধ ‘ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে স্বপ্নজয়ের পদ্মা সেতু’ অত্যন্ত চমৎকার হয়েছে। তিনি অত্যন্ত চমৎকারভাবে লিখেছেন যে, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণে মিথ্যা ও ষড়যন্ত্র পরাভূত হয়’ (পৃ: ৪৪)। প্রফেসর আব্দুল খালেকের সময়োপযোগী উচ্চারণ, ‘আত্মমর্যাদাসম্পন্ন বাঙালির গর্বের আরেকটা নতুন সংযোজন পদ্মা সেতু’ (পৃ: ৫৪)।

ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ মন্তব্য করেছেন যে, ‘বিশ্ব পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ এবং বাংলার মানুষের মর্যাদা উত্তরোত্তর আরও সমুন্নত হোক’ (পৃ: ৬৮)। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল উল্লেখ করেছেন যে, ‘এ দেশ নিজের অর্থায়নে এত বিশাল সেতু নির্মাণ করতে পারলে ধীরে ধীরে আরও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিজ অর্থেই সম্পন্ন করতে পারবে’ (পৃ: ৯২)।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন যথার্থ অর্থে মন্তব্য করেছেন যে, ‘শেখ হাসিনা পুরো বিশ্বকে প্রমাণিত করে দিয়েছেন যে, আমরা জাতি হিসেবে কতটা শক্তিশালী’ (পৃ: ৯৯)। সৈয়দ আবুল হোসেন তার কর্মকাণ্ড এবং তার প্রতি অন্যায় ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে, ‘দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের কারণে তা ৯ বছর পিছিয়ে গেল’ (পৃ: ১২৮-১২৯)।

ড. শরীফ এনামুল যথার্থ অর্থে উচ্চারণ করেছেন যে, ‘কাজেই এটা প্রমাণিত, বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় শেখ হাসিনার বিকল্প নেতৃত্ব মেলা ভার’ (পৃ: ১৭২)। মোশারফ হোসেন ভুইয়ার প্রতি মিথ্যা অভিযোগের কারণে যে হেনস্তা হয়েছে সেটি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। ষড়যন্ত্রকারীরা কখনো থেমে থাকে না। তাই তো দেখা যায় যে, সুভাষ সিংহ রায় তার প্রবন্ধে যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে, ‘দেশের মানুষ দেখেছে, পদ্মা সেতু নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র হয়েছে, বাধা এসেছে; শেষ পর্যন্ত সত্যেরই জয় হয়েছে’ (পৃ: ২৬৪)।

নিজের প্রবন্ধটি সম্পর্কে কোনো মন্তব্যে যাচ্ছি না। কবি মুহম্মদ নুরুল হুদার কবিতাখানি হৃদয় ছুঁয়েছে- যার থেকে চারটি পঙক্তি পাঠকের উদ্দেশে তুলে ধরি। সোনার দেশে সোনার মানুষ উড়াল সেতু ধরি/ আসা যাওয়ার পথে কুড়ায় সোনার কড়ি/ আলোর দেশে আলোর সেতু হাসছে আঁধার চিরে/ও নদী রে, পদ্মা নদী রে/ (পৃ:৩৪৯)।

সৈয়দ আবুল হোসেনের সাক্ষাৎকারখানি তথ্যবহুল। অর্থ উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমানের একটি সাক্ষাৎকার থাকলে ভালো হতো। অ্যালবামের চিত্রগুলো অত্যন্ত চমৎকার। আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমানের লেখাটিও সুন্দর হয়েছে। জাতি গ্রন্থের সুসম্পাদনার জন্য এ কে আব্দুল মোমেনের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে। এ গ্রন্থটির একটি ইংরেজি অনুবাদসহ বিভিন্ন ভাষায় হওয়া উচিত।

পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বাংলা একাডেমির বাংলা অভিধানের সংস্কার সাধন করা উচিত। কেবল ব্যাকরণনির্ভর অভিধান নয়। নতুন বাংলার নীতিমালা অনেক ক্ষেত্রেই বেমানান। এ বানান বর্তমানে সাধারণ মানুষের কাছে গলার ফাঁস হচ্ছে। অথচ বাংলা একাডেমির বোধোদয় হচ্ছে না।

অভিনন্দন জানাচ্ছি এ পর্যন্ত প্রকাশিত পদ্মা সেতু নিয়ে রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ এ কে আব্দুল মোমেন কর্তৃক রচনা করার জন্য। সাথে সাথে সহযোগী সম্পাদকদ্বয় দেবাশীষ দেব ও ইমদাদুল হককে ধন্যবাদ জানাই। পাশাপাশি সময়োপযোগী গ্রন্থ প্রকাশনার জন্য চন্দ্রাবতী একডেমীকে ধন্যবাদ এবং প্রচ্ছদশিল্পী ধ্রুব এষকে ধন্যবাদ।

আলোচনায় দুটো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা স্মরণ করছি: ঢাকা স্কুল অব ইকোনোমিক্স থেকে ‍উদ্যোক্তা অর্থনীতির ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষিকাদের নিয়ে গত বছরে ফিল্ড ট্রিপে যাই। সেখানে আমরা দেখেছি চমৎকারভাবে পদ্মা সেতুর নির্মাণ প্রক্রিয়া এগিয়ে চলা এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়া। পরবর্তী সময়ে সরকারের প্রয়াসের একটি গবেষণাপত্র তৈরি করা হয় এবং ঢাকা স্কুল অব ইকোনোমিক্স হাইব্রিড পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়।

আবার চলতি বছরের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে শরীয়তপুরে প্রোগ্রাম থাকায় যেতে গেলে সাড়ে তেরো ঘণ্টা মাওয়া ঘাটে কতিপয় ফেরিঘাট-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও নিরাপত্তায় নিয়োজিত লোকদের কারণে আটকে থাকি। এমনকি রাত একটার দিকে ফেরিতে যাওয়ার সিগন্যাল দিলে পার্শ্ববর্তী গাড়িতে এসে ঠিক সন্ত্রাসীর মতো একটি কাভার্ডে এক লোক ঝাঁপিয়ে আমার ভাড়া করা গাড়িতেও থাপ্পড় মারে। আজ পদ্মা সেতু খুলে দেওয়ায় সেই দুর্নীতিবাজরা তাদের ক্ষমতা দেখাতে পারবে না- যা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইতে হুঁশিয়ার করেছেন। সম্প্রতি আমার প্রিয় নেত্রীও সরকারি চাকুরেদের জনগণের পাশে দাঁড়াতে বলেছেন।

অথচ ১৭ মার্চ ২০২২-এর সকালটি কী অপূর্ব কেটেছিল। এটিএন বাংলায় বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে আমার লেখা গানটি প্রচারিত হয়েছিল এবং গ্লোবাল নিউজের প্রথম পাতায় বঙ্গবন্ধুর ওপর লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যকে যখন জানালাম হার্টের অসুখের কথা- ভাবলেশহীন হলো, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার একই উক্তি। ধরণী দ্বিধা হও।

আসলে আমাদের উন্নয়নের রূপরেখার মালিক হচ্ছেন শেখ হাসিনা- যিনি সূর্যের আলোর মতো আলোকিত করে চলেছেন। ধন্যবাদ গ্রন্থের সম্পাদক এ কে আব্দুল মোমেনকে। গ্রন্থটি এতই চমৎকার হয়েছে যে, বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হওয়া উচিত। বাংলা একাডেমি কি পারবে এ ধরনের অনুবাদের কাজ করতে? ভুল ও সাধারণ মানুষের কাছে অগ্রহণযোগ্য বাংলা একাডেমির বাংলা অভিধান। জাতীয় প্রতিষ্ঠানের উচিত দেশের মৌখিক ভাষাকে অভিধানে অন্তর্ভুক্ত করা।

একটি সুন্দর গ্রন্থ সম্পাদনা আমাদের মুগ্ধ করেছে। পাঠক হিসাবে হৃদয়কে সমৃদ্ধ করেছে। অভিনন্দন গ্রন্থের সাথে সংশ্লিষ্ট সবাইকে। এটি একটি জাতীয় ইতিহাসে অন্তর্ভুক্ত হবে। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, জয়তু শেখ হাসিনা।

‘আমাদের অর্থে আমাদের পদ্মা সেতু’ গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। প্রকাশক: চন্দ্রাবতী একাডেমী, প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ, প্রকাশকাল: জুলাই, ২০২২, মূল্য: ২০০০ টাকা, পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪০০।

লেখক: সমালোচক: প্রফেসর ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী, অর্থনীতিবিদ, কথাশিল্পী, ছড়াকার ও আইটি বিশেষজ্ঞ।

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-৮



মাহফুজ পারভেজ
ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-৮

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-৮

  • Font increase
  • Font Decrease

[অষ্টম কিস্তি]

“এই ছবিতে তুমি যে ঘাসের ওপর থেকে রংধনু শুরু করলে, কী করে তা বাস্তবের কাছাকাছি হবে?”

ম্যারির প্রশ্ন শুনে পল্লবী মাথা ঝুঁকিয়ে তার হাতের পেনসিলটা কাগজে এলোমেলো ঘষতে থাকে। কোনো উত্তর দেয় না। ক্যাম্পাসে পড়তে আসা দক্ষিণ এশীয় তরুণীটির দিকে অপলক চেয়ে থাকেন ম্যারি। পল্লবী মাথা ঝুঁকিয়ে রেখেই একসময় বিড়বিড় করে, “আমি তো কখনো সত্যিকারের রংধনু দেখিনি!”

ম্যারি চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রায় অর্ধস্ফুটে বলেন, “বুঝেছি। তবে আর কী।”

কথাটা বলে ম্যারি নিজের মনে ভাবলেন, মেয়েটিকে এভাবে বলা ঠিক হয় নি। পল্লবী আহত হতে পারে কিংবা তার মধ্যে না-পারার হতাশা আসতে পারে। এটা ঠিক কাজ নয়। শিক্ষার্থীর গুণ জাগ্রত করা তার দায়িত্ব। কোনো কিছু করার এবং পারার পথ দেখানো কর্তব্য। না-পারার বিষয়গুলো মনে করিয়ে তাকে আটকে দেওয়া মোটেও ঠিক হয় নি।

নিজের ভুল বুঝতে পেরে পল্লবীর পাশে বসে হাসতে হাসতে ম্যারি বলেন, “সব সময় বাস্তবকে হুবহু আঁকার দরকার নেই। দেখা জিনিস হুবহু আঁকতে নেই। স্বপ্ন, কল্পনা আর ইচ্ছে মিশিয়ে আঁকতে হয়। তবেই সেটা তোমার একান্ত নিজের সৃষ্টি হবে।”

পল্লবীর ঠোঁটের কোণ বেঁকে উঠতে উঠতেও ফের স্বাভাবিক হয়ে যায়। তার খুশির সঙ্গে শোনা যায় হাতের চুড়ির রিনিঠিনি শব্দ। ম্যারি সন্তর্পণে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেন।

অন্য ছেলেমেয়েগুলোর ড্রয়িং খাতা চেক করে ম্যারি খানিকটা আশাহত হন। কিন্তু তিনি সেটা নিজের মনেই লুকিয়ে রাখেন। এদের দোষ দেওয়ার কিছু নেই। সত্যি সত্যি রংধনু তারা দেখে নি। বইয়ে দেখা কিংবা ইউটিউবের রংধনু দেখে দেখে যতটুকু আঁকতে পেরেছে, সেটাই বেশি।

একটি বিষয় দেখে ম্যারি খুবই বিস্মিত হন। রংধনু পৃথিবীর সর্বত্র একই রকম হবে, এটাই বিজ্ঞানের সূত্র। কিন্তু ছেলেমেয়েদের রংধনুতে তেমন ছাপ নেই। আফ্রিকা থেকে আসা সারাহ রংধনু এঁকেছে কালচে আকাশের প্রেক্ষাপটে। চীনের ছেলে লি লালচে আকাশের পটভূমিতে যে রংধনু চিত্রিত করেছে, তাতে সাতটি রঙ স্পষ্টভাবে খোলে নি। ম্যারি টের পান, সবার মনে আলাদা আলাদা আকাশ, যা তারা কল্পনা করেছে নিজের দেশ ও পরিবেশের প্রভাবে। তাই পল্লবীকে আলাদাভাবে দোষ দেওয়া ঠিক নয়। তার রংধনু তারই নিজস্ব পরিবেশ ও অনুভূতির ফসল, যা তিনি এই প্রথম একেকজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে একেক রকমের দেখলেন। রংধনু অভিন্ন হলেও মানুষের মন আর কল্পনা যে সেটাকে আলাদা অবয়ব দিয়েছে, সেটা দিব্যি প্রকাশ পায় ম্যারির কাছে।

ড্রয়িং খাতাগুলো নিয়ে কোনো নেতিবাচক মন্তব্য করা থেকে বিরত রইলেন ম্যারি। সবাইকে একটিই কমেন্ট করলেন তিনি, “গুড ওয়ার্ক, ট্রাই এগেইন।”

ম্যারি কিন্তু ঠিকই টের পান, ছেলেমেয়েগুলোর কাজে অবচেতনভাবে একটি বার্তাই ভেসে ওঠে, তা আসলে তাদেরই সঙ্কুল পরিস্থিতির প্রতিফলন। যে কারণে তাদের ছবির আকাশগুলো বদলে গিয়েছে। কোনও একটি হয়েছে কালচে, কিছু লালচে কিংবা পিঙ্গল। চোখের সামনের আর্থসামাজিক বাস্তবতাই তাদের অনুভতি ছুঁয়ে ভিসুয়াল রিপ্রেজ়েন্টেশনের গভীরে বিশেষ ভাবে নিহিত রয়েছে। উত্তাল পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে যার জন্ম, তার ছবির আত্মদর্শী চৈতন্যের মধ্যে সেই বীজমন্ত্র লুক্কায়িত থাকবেই।

চিত্রকর্ম বোঝার ও বিশ্লেষণের আলাদা চোখ আছে ম্যারির। কারণ, একসময় ম্যারি নিজেই ছিলেন ক্যাম্পাসের চলমান শিল্প আন্দোলনের অন্যতম হোতা। শিল্পকে মানুষের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার সেই অবিরত প্রচেষ্টার ফসল তুলেছিলেন তিনি আর তার সঙ্গে এক জেদি যুবক, ক্যাভিন। তাদের চাঞ্চল্যে ক্যাম্পাসের গথিক স্থাপত্যের গম্বুজওয়ালা ভবনগুলো ছুটির দিনের বৈকালিক আড্ডায় গমগম করত। এক শিল্পশোভিত ক্যাম্পাসের উদ্ভাস হতো কবি-সাহিত্যিক-চিত্রকর-ভাস্কর-গায়ক-সমালোচক-সম্পাদকদের ভিড়ে। সঙ্গে থাকতো আর্ট, পত্রপত্রিকা ও বই বিষয়ক আড্ডা। চলতো আবৃত্তি, কবিতাপাঠ, গান ও গল্পপাঠের মশগুল আসর।

প্রায়ই মহান শিল্পীদের ছবির প্রদর্শনী, নতুন উদীয়মান শিল্পীদের কাজ সংগ্রহ, মার্কিন দেশের লিথো প্রেসগুলোর সন্ধান, পুরনো ছাপচিত্রের খোঁজে অহর্নিশ অন্বেষণ ইত্যাদি ছিল তার যাপনের অবিচ্ছেদ অংশ। শিল্প ইতিহাসের সন্ধিক্ষণ তখন থেকেই তাঁর অবচেতনে তৈরি করে ফেলেছিল চিত্রকর্মের এক মহার্ঘ মিউজ়িয়াম।

একবার অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের সহায়তায় তিনটি কক্ষ নিয়ে ম্যারির কাজগুলোর একটি প্রদর্শনীর পরিকল্পনা ও আয়োজন করেছিল তাঁরই সাথী ও বন্ধুসম ক্যাভিন। প্রায় দেড়শোটি নানা মাধ্যমের কাজ ও বিবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষার সে এক মহাযজ্ঞ! এই উপলক্ষে তাঁর শিল্প নিয়েই একটি ডকু-ফিল্ম রিলিজ় করে বন্ধুরা। সমালোচকরা বলেছিলেন, অভিনবত্বে একটি আলাদা মাত্রার সংযোজন ঘটেছে ম্যারির কাজে। যেন রূপবন্ধ নতুন ভাবে পুনর্বিন্যাসের ফলে সিম্ফনি ও স্টাইল, বক্তব্য ও বর্ণনা, কম্পোজ়িশন ও ক্যাজ়ুয়ালিটি, মেসেজ ও মেটাফর একে অপরের পরিপূরক হয়ে প্রকাশিত হয়েছে ম্যারির আঁকা ছবিগুলোর পরতে পরতে।

হবে না কেন? ড্রয়িং, ছাপচিত্রের রঙিন পুনর্নির্মাণ, জলরং, ইঙ্ক, তেলরং, গ্রাফিক্স, মিশ্র মাধ্যম, রঙিন পেন্সিল, উডকাট, লিনোকাট, সেরিগ্রাফ, নিউজ পেপার ম্যাটে মিশ্র মাধ্যম, অ্যাক্রিলিক, এচিং, ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য— কী করেননি ম্যারি? শিল্পের যাবতীয় নিরীক্ষায় সৌন্দর্যের সবগুলো পথ পেরিয়ে এসেছেন তিনি। তারপর এক সময় নিঃসঙ্গ ও একেলা হয়ে পড়েছেন নিজেরই অজান্তে।

রংধনু নিয়ে অ্যাসাইনমেন্টে ব্যস্ত ছেলেমেয়েদের ছবিগুলোর সঙ্গে মেতে ম্যারির চাপা-শিল্পীসত্তা গুপ্ত লাভাস্রোতের মতো বের হয়ে এলো। সবাই চলে যাওয়ার পর তিনি আলাদাভাবে পল্লবীকে নিয়ে বসলেন। মেয়েটির সঙ্গে তিনি একটি অদ্ভুত নিবিড়তা অনুভব করেন। সবার চেয়ে বেশি সখ্যতাও তিনি বোধ করেন পূর্বদেশের এই মেয়েটির সঙ্গে। ঘরবাড়ি ছেড়ে মার্কিন দেশের ক্যাম্পাসে পড়তে আসা বেশকিছু ছেলেমেয়ের মধ্যে পল্লবী নামের এই তরুণীর জন্য কেন ম্যারি অনেক বেশি নৈকট্য অনুভব করেন, তা তিনি নিজেও ঠিকঠিক জানেন না। এই মেয়েটি পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে নানা বিষয়ে তার সঙ্গে এসে কথা বলে। তার প্রশ্নের ধরণ, জিজ্ঞাসার তীব্রতা ও কথা বলার আন্তরিক সুর ম্যারিকে মুগ্ধ করে। প্রাচ্য দেশের সংস্কৃতিতে বড় হওয়া মেয়েটির মধ্যে অপার কৌতূহল। গান শুনতে আর বই পড়তেও ভীষণ ভালোবাসে সে। ম্যারি প্রায়ই তাকে একমনে লাইব্রেরিতে পড়তে দেখে। বিচিত্র সব বই ইস্যু করে পড়ার জন্য বেছে নেয় পল্লবী। জানাশোনা কিছুটা গভীর হলে পল্লবী কিছু গান প্রেজেন্ট করে ম্যারিকে। গানের কথাগুলো বাংলায় কিন্তু সুর হৃদয়-ছোঁয়া। বিশেষ করে একটি গান ম্যারিকে আচ্ছন্ন করে প্রবলভাবে। গানটির প্রথম লাইন “তোমারও পরাণ যাহা চায়।”

ম্যারি একবার জিজ্ঞেস করেছিল পল্লবীকে, “এতোজন থাকতে তুমি আমাকে তোমার দেশের তোমার ভাষার গান উপহার দিলে কেন?”

“তোমাকে খুব দুখী ও বিষণ্ন মনে হয় আমার। গানগুলো শুনলে তোমার ভালো লাগবে।” কালবিলম্ব না করেই জানিয়েছিল পল্লবী।

ম্যারি ভীষণ অবাক হন। তারুণ্য ও যৌবনের সন্ধিক্ষণের সঙ্কুল পরিস্থিতিতে রয়েছে এই মেয়ে। অথচ কেমন করে তার মনের গভীরে ডুব দিয়েছে মেয়েটি। অলক্ষ্যে আপন হয়ে যাওয়া এমন একটি মেয়েকে মন থেকে ভালো না বেসে পারেন না ম্যারি।

এসব কথা ভাবতে ভাবতে ম্যারি বাস্তবে ফিরে আসেন। পল্লবীর আঁকার সরঞ্জাম গুছিয়ে দিতে দিতে বলেন, “তোমার যেমন ইচ্ছে হয়, তেমনভাবেই আঁকো তোমার রংধনু। আমি সেই ছবির নাম দেবো ‘পল্লবীর রংধনু’।"

উচ্ছ্বল ঝরণার মতো আনন্দে উজ্জ্বল হয় পল্লবীর সমস্ত মুখমণ্ডল। পল্লবী হাসতে হাসতে উঠে পড়ে। আঁকার খাতা আর রঙের বাক্স দু’হাতে নিয়ে সে রওনা দেয় নিজের হোস্টেলের দিকে। যেতে যেতে বলে,

“মিস, আমি তোমাকে একটা চমৎকার রংধনু উপহার দেবো, যা আমি শুধু তোমার কথা ভেবে আঁকবো। আমি নিশ্চিত, তুমি খুবই পছন্দ করবে আমার রংধনু।”

পল্লবীর চলে যাওয়া দেখতে দেখতে ম্যারি একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। পথের শেষে অদৃশ পল্লবীর ছায়াও আর নেই। সেখানে মনে হয় আবছায়ায় দেখা যাচ্ছে ক্যাভিনকে, যে লোকটি জীবনে প্রথম তাকে রংধনুর রঙের অরণ্যে পাগল করেছিল। ম্যারি তার একান্ত ভাবনায় ছেদ টেনে আকাশের দূর দিগন্তে তাকান। তারপর নিজেকে কিছুটা ঘুরিয়ে পশ্চিম আকাশে দৃষ্টি দেন তিনি। ক্যানভাসের মতো রংবহুল আকাশে তখন প্রদোষের আবিরমাখা উল্লাস। এখনই দিবাবসানে হাত ধরে শুরু হবে অন্ধকার রাতের।

ম্যারি অস্তগামী রশ্মির দিকে তাকিয়ে একাকী কি যেন চিন্তা করেন। তার ঘটনাবহুল জীবনের কোনো খণ্ডাংশের ছায়াপাত কি দেখতে পান তিনি আকাশের উদার শরীরে? তার স্থির ও অবিচল দৃষ্টি আটকে যায় অস্তাচলের দূর দিগন্তে। এক সময় তিনি অস্পষ্ট শব্দের মায়াজালে কোনক্রমে উচ্চারণ করেন, “তাঁর জীবনে অস্তবেলার রঙ-টা অন্যরকমও হতে পারত।”

পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার।

আরও পড়ুন: ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-৭

;

দেশভাগ, স্মৃতি, সত্তা, ভবিষ্যৎ



সুমন ভট্টাচার্য
ইনসেটে লেখক  সুমন ভট্টাচার্য

ইনসেটে লেখক সুমন ভট্টাচার্য

  • Font increase
  • Font Decrease

[৭৫ বছর আগে বাংলাদেশের যশোর ছিল তাঁর অস্তিত্বের শিকড়। সাহিত্যিক নিমাই ভট্টাচার্যের বংশধারার তৃতীয় প্রজন্ম তিনি। কলকাতার সাহিত্য আন্দোলন ও সাংবাদিকতায় ব্যাপৃত তাঁর জীবন। শিকড়ের সন্ধানে ফিরে দেখেছেন স্মৃতি ও সত্তার পদচিহ্ন। বয়ান করেছেন অনুভূতি ও ভবিষ্যতের চিত্রকল্প।]

আমাদের পূর্বপুরুষদের বাড়ি ছিল যশোরের নড়াইলে। এখন বোধহয় বাংলাদেশে নড়াইল একটা আলাদা জেলা হয়ে গিয়েছে। পরে জেনেছি যশোরের সঙ্গে আরো অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব বা রাজনীতিকদেরও একটা শিকড়ের সম্পর্ক ছিল। যেমন ভারতবর্ষের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় কিংবা পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি, সাবেক সাংসদ সোমেন মিত্র।

ঘটনাচক্রে আমার পিতৃপুরুষদের ভিটে ছিল যেখানে, সেই যশোরের সঙ্গে আমার মাতুলালয়েরও নাড়ির টান ছিল। অর্থাৎ আমার মায়ের দিক থেকে দাদু, যিনি সাহিত্যিক হিসেবে সুবিখ্যাত, সেই নিমাই ভট্টাচার্যের শিকড় ছিল যশোরে। কিছুদিন আগে আমার বাংলাদেশ প্রবাসী এক বন্ধু, সাংবাদিক এবং চলচ্চিত্র পরিচালক হাসিবুর রেজা কল্লোল একটা ছবি তুলে পাঠিয়েছিলেন, যে যশোরে কোন একটি রাস্তার নামকরণ নিমাই ভট্টাচার্যের নামে করা হয়েছে। সেটা অবশ্যই আমার কাছে বা হয়তো বৃহত্তর অর্থে আমার পরিবারের কাছে যথেষ্ট আনন্দের এবং গর্বের ঘটনা ছিল।

আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগে যেবার আমি প্রথম বাংলাদেশ যাই, সেইবার যশোর গিয়েছিলাম এবং সেই সুযোগে যশোর শহরের এক ব্যবসায়ী আমাকে আমার পিতৃপুরুষের ভিটে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। অবশ্যই সেটা একটা আলাদা আবেগের, উত্তেজনার এবং শিহরণ জাগানো ঘটনা ছিল। গত শতকের ৯ এর দশকের সেই সময়েও নড়াইলের ওই গ্রামে এমন কিছু বৃদ্ধ মানুষ ছিলেন, যাঁদের আমাদের পিতৃপুরুষদের স্মৃতি মনে ছিল।

আমি কলকাতায় ফিরে এসে আমার বাবা-মা এবং ঠাকুমাকে যশোরের গল্প বলেছিলাম। ঠাকুমা অবশ্য যশোর গিয়েছিলেন বিয়ের পর। গত শতকের ৩ এর দশকে সেই সময় নাকি কলকাতা থেকে নৌকো করে যশোর পর্যন্ত যাওয়া যেত। সেটা ভারতের স্বাধীনতার অন্তত এক দশকেরও বেশি সময়ের আগের ঘটনা, তাই ঠাকুমার কাছে যশোরের স্মৃতি মাথায় গেঁথেছিল।

আমি প্রায় পঞ্চাশ বছরের ব্যবধানে সেই যশোরে, সেই নড়াইলে ফিরে গিয়েছিলাম এটা অবশ্যই ঠাকুমা, লীলা ভট্টাচার্যকে স্মৃতিমেদুর করেছিল। বাবা এবং মা খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য, নড়াইল দেখার জন্য। কিন্তু এটা আমার দুর্ভাগ্য, ব্যক্তিগতভাবে অপরাধ যে, সময় এবং সুযোগ করে আমার তাঁদের পিতৃপুরুষের ভিটে দেখাতে নিয়ে যাওয়ার ফুসরত হয়ে ওঠেনি।

বাবার জন্য যন্ত্রণাটা একটু অন্যরকম ছিল। কারণ ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময় বাবা যশোর পর্যন্ত গিয়েছিলেন বলে আমায় অনেকবার বলেছেন। আবার কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা, সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পর্ক তাঁকে একাত্তরের ওই সময়টায় কোন কাজে সীমান্ত পেরিয়ে যশোর পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল। কিন্তু সময়টাই এমন ছিল যে বাবা খুঁজে খুঁজে নড়াইল পর্যন্ত যেতে পারেননি। যশোর পৌঁছেও নড়াইল না দেখার যন্ত্রণা বাবাকে সারা জীবন বহণ করতে হয়েছে। এবং হয়তো সেই যন্ত্রণা নিয়েই তিনি চলেও গিয়েছেন।

আসলে আমার দাদুরা চার ভাইই গত শতকের ২এর দশকে চাকরি নিয়ে একে একে কলকাতায় চলে এসেছিলেন। এবং কোনও আশ্চর্য সমাপতনে দাদুরা চার ভাই গত শতকের ৩এর দশকেই সরকারি চাকরি এবং কলকাতা শহরে নিজেদের মতো বাড়ি করে ফেলেছিলেন। তাই হয়তো যশোরের সঙ্গে দাদুদের নাড়ির টান থাকলেও যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং খুব সত্যি কথা বলতে গেলে কি, আমার ছোটবেলায় দাদু ঠাকুমা কারও কাছেই আমি এই নিয়ে সাংঘাতিক হাহুতাশ করতে দেখিনি।

আজকের ভারতবর্ষের রাজনীতিতে যে বিষয়টিকে কেন্দ্র করে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থান এবং যে আহত ক্ষতকে উসকে দিয়ে ভারতবর্ষের একটি প্রধান রাজনৈতিক দল নিজেদের জনসমর্থন বাড়াতে চায়, সেই আবেগ কোনদিন আমাদের বাড়িতে ছিল না। স্যামুয়েল হান্টিংটনের 'ক্ল্যাশ অফ দা সিভিলাইজেশন'-এর যাবতীয় তত্বের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমার পরিবার আমার শিক্ষা দিয়েছিল, যে তাঁদের মাইগ্রেশনের কারণ ছিল উন্নততর অর্থনীতির এবং নাগরিক জীবনের সন্ধান করা| ধর্মীয় বিদ্বেষ বা সেই সংক্রান্ত লুকানো ক্ষত নিয়ে কোনওদিন আমি বড় হইনি। দাদু কিংবা দাদুর ভাইরা যশোরের ফেলে আসা জমি পুকুরের কথা হয়তো স্মৃতিচারণে বলতেন, কিন্তু উত্তর কলকাতার বাড়ি, বেলেঘাটার ঠিকানা এবং সরকারি চাকরি নিয়ে তাঁরা কলকাতাতে ভালো ছিলেন। এবং এই মাইগ্রেশনটা সম্পূর্ণ হয়ে গেছিল দেশভাগের অনেক আগে।

এটাও হয়তো সমাপতন যে, পরবর্তীকালে যে মুসলিম পরিবারটির সঙ্গে আমার বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হলো, তাঁদেরও একটা বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। ভুল বললাম, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সাতক্ষীরাতে আমার শ্বশুরবাড়ির একটা জমি জায়গা বা শিকড় ছিল। কিন্তু আমার স্ত্রীর দাদামশাই, সৈয়দ সিরাজ আলি যেহেতু জিন্নাহর চাইতে মৌলানা আবুল কালাম আজাদকে বেশি নেতা বলে মানতেন, তাই ভারতবর্ষে অর্থাৎ বর্ধমানে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

এইসব কারণেই হয়তো আমার বড় হয়ে ওঠা থেকে আজ এই হাফ সেঞ্চুরির জীবনে পৌঁছে যাওয়া পর্যন্ত হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষের ন্যারেটিভ কিংবা বাংলাদেশের ফেলে আসা জমি নিয়ে হতাশা গ্রাস করেনি। বাবা তাঁর সোশ্যাল ডেমোক্রেট রাজনীতি দিয়ে জানতেন যে, তাঁর বাবা যশোর থেকে কলকাতায় এসে মাইগ্রেশনের যে সূচনা করেছিলেন, আমি কলকাতা থেকে দিল্লি পৌঁছে হয়তো তার আর একটা ধাপকে সম্পূর্ণ করেছিলাম!

কে জানে আমার পরবর্তী প্রজন্মের কেউ লন্ডন কিংবা নিউইয়র্কে পৌঁছে যশোর কিংবা সাতক্ষীরা থেকে আসা আরেকজন কোনও অনাবাসীর সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাবে না!

;

একজন নিসর্গী মুশফিক হোসাইন



মোহাম্মদ আলম চৌধুরী
একজন নিসর্গী মুশফিক হোসাইন

একজন নিসর্গী মুশফিক হোসাইন

  • Font increase
  • Font Decrease

মুশফিক হোসাইন জানুয়ারি ৬, ১৯৫৫ সালে চট্টগ্রাম শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে ১৯৭৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন এবং এরপর ব্যাংকিং পেশায় যুক্ত হয়ে কৃতিত্বের সাথে অবসর গ্রহণ করেন।

শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে প্রাণ-প্রকৃতির প্রতি অনুরাগ ছিল। নিসর্গ প্রেম সম্পর্কে তিনি বলেন,  ‘কৈশোরে একদিন কুয়াশামাখা ভোরে চোখ মেলে দেখি কর্ণফুলীর কোলে সূর্যমামা চোখ রাঙিয়ে হাসছে। দৌড়ে যাই নদীর কূলে। জোয়ারের নোনা জলে দুলছে হারগোজা। লতা-পাতা আর কাঁটার ফাঁকে নীলাভ ফুলেরা। রঙিন পক্ষীকুলের বিচিত্র সুর ও স্বর আমাকে তাদের প্রেমে মগ্ন করে। মৌমাছির রহস্যময় জীবন উদ্ঘাটনে আমি ব্যস্ত হয়ে পড়ি আর বৃক্ষকুল হয়ে ওঠে আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ’।

শৈশবের সোনাঝরা দিনগুলোতে প্রকৃতির সেবায় নিজেকে নিয়োগ করেছেন। এখনও অষ্টাদশ বয়সী তরুণের মতো খুঁজে বেড়ান প্রাণ-প্রকৃতির রহস্য। বৃক্ষশিশুর চারা রোপণে নিরলস খেটে যাচ্ছেন। শহরের আনাচে-কানাচে উৎসবহীন পরিবেশে নীরবে রোপন করেছেন অগুণিত বৃক্ষচারা। চট্টগ্রাম কলেজের প্রধান গেইটে সাক্ষী হয়ে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর রোপণ করা রুদ্রপলাশ বৃক্ষ। 

পাখিকুলের আবাস ধ্বংসে তাঁর মনে রক্তক্ষরণ হয়। তাই পাখিদের জন্য মাটির কলসিতে বাসা তৈরি করে বৃক্ষ শাখায় বেধে দেন। রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগেই ব্যালকনিতে পানি রাখেন বেড়াতে আসা পাখিদের জন্য।

উপকুল ও সাগর-মোহনার পাখিদের প্রতি বিশেষ দরদ থাকলেও যে কোনো পাখির সুর তাঁকে আকুল করে তোলে। তাই পাখি দেখা ও পাখি চেনার আয়োজন করে নতুন প্রজন্মকে তিনি উদ্বুদ্ধ করেন। চট্টগ্রাম শহরে পাখি উদ্ধারকারীর অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এ বয়সেও।

মুশফিক হোসাইনের শরীরে বহমান লোহিতকণিকায় প্রকৃতি-প্রেম রয়েছে। তাঁর মাতা-পিতারও ছিলো প্রাণ-প্রকৃতির প্রতি এমন নিখাদ দরদ। তাঁর সাথে প্রগাঢ় আলোচনায় জেনেছি শৈশবে প্রকৃতি-প্রেমে মগ্ন হওয়ার বিশদ কাহিনী।

তাঁরই নিরলস ভূমিকায় ও সম্পাদনায় চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত হয় প্রকৃতি ও প্রকৃতিসংরক্ষণ বিষয়ক প্রকাশনা ‘প্রকৃতি’। অভিজ্ঞতাধর্মী ও গবেষণামূলক এ প্রকাশনা ইতোমধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণ আন্দোলনে ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছে। আমি এ প্রকাশনার সহযোগী সম্পাদক-হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেখেছি, বৃক্ষদেহে পেরেকের আঘাত দেখে আবেগ-প্রবণ হয়ে তাঁর অশ্রু-বিসর্জনের দৃশ্য। এ সম্পর্কে তিনি আমাকে বলেছেন, ‘মনুষ্যদেহে যেমন আঘাত ও কষ্ট অনুভূত হয়, বৃক্ষদেহেও ঠিক তেমনি আঘাত ও কষ্ট অনুভূত হয়। উভয়েরই অনুভূতি শক্তি প্রবল। পার্থক্য শুধু একগোষ্ঠীর বাকশক্তি আছে আর অপর গোষ্ঠীর তা নেই’।

বৈকালিক পদচারণায় পরিচিত-অপরিচিত কারো সাথে আলোচনার সুযোগ হলে তিনি অনবরত বলে যান নিমপাতা, জলপাই, বহেরা, আমলকি আর সজনে-ডাটার কথা। চট্টগ্রাম শহরের জামাল খান মোড়, প্রেসক্লাব কিংবা আড্ডারত মুহুর্তে আমি বহুবার এ-দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছি। নতুন প্রজন্মের কথা ভেবে এখন তিনি প্রকৃতিপাঠ মঞ্চের উদ্যোগে বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে গিয়ে প্রকৃতি ও প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রকৃতি দল নিয়ে সরব রয়েছেন।

‘বেড়াতে গিয়েছি মৃতদের বাড়িতে’ নামে তাঁর কাব্যগ্রন্থে মানব-মানবীর প্রেম যেমন রয়েছে ঠিক তেমনি প্রকৃতি প্রেমও রয়েছে। প্রকৃতির প্রেম ছাড়া কোনো প্রেমই আদতে প্রেম হয় না। মানবপ্রেমের লুকানো ইতিহাস প্রকৃতিতেই রয়েছে।     

প্রকৃতি-প্রেমে ব্যাকুল হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বসন্তে জরা-ক্ষরা আর অশুভকে দূর করার জন্য বাড়ির চৌকাঠে মালা গেঁথে ঝুলিয়ে রাখা হয় ‘বিউফুল’ আর সাথে থাকে তার বোন নিমপাতাগুচ্ছ। যা আমাকে মুগ্ধ করে আর ভালোবেসেছি জলজ পাখি, ফুল, প্রজাপতি ও জলডোরা সাপ। মায়ার বাধনে বেঁধেছি গাছ, পাখির বাসা, ডিম ও ছানা। এই ভালোবাসার নামই প্রকৃতি’।

বীজ, চারাসংগ্রহ ও বিতরণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শ্মশান, কবরগাহসহ পতিত ভূমিতে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় ৬০ বছর ধরে তিনি নিয়োজিত। এ সম্পর্কে তাঁর ঘনিষ্টজন, সহপাঠী ও চা শিল্প-নির্বাহী আমিনুর রশীদ কাদেরী বলেন, ‘মুশফিক হোসাইনের সমগ্র অন্তরাত্মা জুড়ে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা। বীজের অঙ্কুরোদগম দেখে যেমন থমকে দাঁড়ায় তেমনি পাখির বাচ্চার  উড়াউড়ি দেখেও মুগ্ধ হয় আবার কখনো কখানো বয়স্ক বৃক্ষের দিকে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে’।

মুশফিক হোসাইন ‘চিটাগাং বী সোসাইটি’র প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে ‘প্রকৃতি’র সম্পাদক, ‘প্রকৃতি পাঠমঞ্চ’- এর এডমিন এবং প্রবীণদের নিয়ে ‘প্রবীন নাগরিক ফোরাম চট্টগ্রাম’ ও মাস্টার্স ৭৬-এর আহ্বায়ক। জনসচেতনতায় পত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে কলাম ও সচিত্র প্রতিবেদন লেখালেখি করেন। মনন - সৃজন ও বিশ্লেষণের বাংলা মাসিক ‘দখিনা’র ব্যবস্থাপনা সম্পাদকের দায়িত্বরত আর সাময়িকী ও স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ ও সম্পাদনায় যুক্ত।

প্রকৃতি সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নিসর্গী মুশফিক হোসাইন ‘সিটি ব্যাংক -তরুপল্লব দ্বিজেন শর্মা নিসর্গ পুরস্কার ২০২২’ এ বৃক্ষসখা পুরস্কার অর্জন করায় তাঁকে উষ্ণ অভিনন্দন।

লেখক: প্রফেসর, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

;

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-৭



মাহফুজ পারভেজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

[সপ্তম কিস্তি]
ঘোরাক্রান্তের মতো ক্যাভিনের পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা করে নির্ধারিত সময়ের আগেই উইলিয়ামের হাতে তুলে দেন ম্যারি। ম্যারির শুধুই মনে হয়, বইটি ক্যাভিন সাধারণভাবে পাঠকের জন্য লিখতেও বিশেষভাবে লিখেছেন তার জন্য। এতো দিন একসাথে থেকে যে ক্যাভিনকে ম্যারি চিনতে পারেননি, তার বই সেই চেনাজানার দুরত্ব নিমেষে ঘুচিয়ে দিয়েছে।

সম্পাদনার কাজে বার বার বইটি পড়ে অনেক দিন বাদে ম্যারির মধ্যে তৃপ্তির ভাব তৈরি হয়েছে। আসলেই তো, ক্যাভিন মুখে না বললেও, যেমন আশা করেছে, ম্যারি না জেনেই তেমনটিই করেছে এতোদিন ধরে। প্রচণ্ড চেষ্টায় টমাসকে যত্ন করেছে। বাবার অভাব মোটেও বুঝতে দেয় নি। মাতৃত্বের পেলবতার সঙ্গে পিতৃত্বের দায়িত্বশীলতা মিশিয়ে আপত্য স্নেহে লালন করেছেন তিনি টমাসকে। নিজের পুরো জীবনকে তিনি সীমায়িক করেছেন টমাসকে ঘিরে। তার স্কুল, খেলার মাঠ, ঘুরতে যাওয়া সবকিছুতে সঙ্গে থেকেছেন ম্যারি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবার কথা বিশেষ একটা আলাপ করে না টমাস। শুধু অনুভব করে, বাবা আছেন।

ক্যাভিনকে হাতের কাছে না পেয়ে ম্যারি মনে মনে প্রায়ই তার সঙ্গে কথোপকথনে লিপ্ত হন:

“আমি চেষ্টা করেছি তোমার ছেলেকে তোমার অভাব বুঝতে না দিতে। কিন্তু তুমি কি জানো, আমার জীবনে এখনো তোমার অভাব আমি অনুভব করি।”

ম্যারি জানেন, এসব কথা কোনো দিনও ক্যাভিনকে বলা হবে না। আবার তিনি এটাও জানেন, ক্যাভিনকে একেবারেই ভুলে যাওয়া অসম্ভব। অনেক প্রাপ্তি ও স্মৃতির মতো ক্যাভিনের হাত ধরে রংধনু চেনার অভিজ্ঞতা জীবনে ভুলতে পারবেন না ম্যারি।

রংধনুর কথা ভাবলেই আকাশে রঙের বর্ণালী আর মাটিতে বহুবর্ণা ক্যাভিনের ইমেজ ম্যারির সামনে এসে দাঁড়ায়। ‘রংধনু’, যাকে নিয়ে কবি-ঔপন্যাসিকরা প্রচুর উপকথার মালা গেঁথেছেন এবং বিজ্ঞানীরা বের করেছেন রংধনুর আসল রহস্য। কিন্তু ম্যারিকে রংধনু চিনিয়েছে ক্যাভিন। ম্যারির হাতের তালুতে নিজের আঙুলের স্পর্শে ক্যাভিন ব্যাখ্যা করেছে রংধনুর একেকটি রঙ। ক্যাভিনের স্পর্শ মেখে রংধনুর রংগুলো চোখের সীমানা ছুঁয়ে পৌঁছে গিয়েছিল ম্যারির হৃদয়ের অতলে। সেই অনুভূতি এখনো ম্যারিকে সর্বাঙ্গে জড়িয়ে রেখেছে মাধবী লতার আবেশে।

ক্যাভিন বলেছিল, “রংধনু হিসেবে আমরা যা দেখতে পাই তা আপাতদৃষ্টিতে ধনুকের মতো অর্ধচন্দ্রাকার হলেও তা আসলে গোল। বৃত্তাকার। অবাক লাগলো? অবাক লাগা এরকম অনেক কিছু ব্যাপার আছে রংধনুতে। যেমন বৈচিত্র্য আছে প্রতিটি মানুষের চরিত্রে ও ব্যক্তিত্বে, চিন্তায় ও চৈতন্যে।”

কোনো বই বা বিশেষজ্ঞ নন, ক্যাভিনই একবার নেপালের পোখরায় রংধনু-আবিষ্ট আকাশের নিচে সঙ্গোপনে পাশে এসে কানে কানে বলেছিল, “সূর্য থেকে যে আলোর রশ্মি পৃথিবীতে আসে তার রঙ মূলত সাদা। এই সাদা রঙের ভেতরে বেগুনী, নীল, আসমানি, সবুজ হলুদ, কমলা ও লাল এই সাতটি রং বিদ্যমান থাকে। সাদা আলোর একটি বিশেষ ধর্ম আছে। প্রিজমের মধ্য দিয়ে গমন করলে সাদা আলো সাতটি ভিন্ন রঙে বিশ্লেষিত হয়ে যায়।"

ক্যাভিন আরো বলেছিল, "আকাশে যখন বৃষ্টি পড়ে তখন বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ভাসমান প্রিজমের মতো কাজ করে। সূর্য হতে আলো, বৃষ্টির ফোঁটার একপাশ দিয়ে প্রবেশ করে বের হবার সময় সাত রঙা বর্ণালী সৃষ্টি করে। বৃষ্টির ফোঁটার প্রিজমসুলভ বৈশিষ্ট্যের কারণেই সৃষ্টি হয় রংধনু। বৃষ্টির ফোঁটা হতে বের হওয়া সাত রঙের আলো আমাদের চোখে এসে পৌঁছায় বলেই আমরা রংধনুকে দেখতে পাই।”

“মানুষও আসলে একটি অদৃশ রংধনু। তার হাসি, কান্না, আনন্দ, বেদনার আলাদা আলাদা রং আছে। আমরা তা দেখতে পাই না। কখনো কখনো কোনো শিল্পী কালো রঙে দুঃখ, সবুজে আনন্দ, হলুদে উৎসব, লালে দ্রোহ চিত্রিত করেন। এগুলোই এখন সাধারণভাবে মান্যতা পেয়েছে”, বলেছিল ক্যাভিন।

সেদিন কথাগুলোর গভীরতা ম্যারি বুঝেন নি। এখন বোঝেন, যখন ক্যাভিন পাশে নেই।

ক্যাভিন বুঝিয়েছিল, "আসলে মানুষ একরৈখিক নয়। কিছুটা বাঁকা। নানা কারণে এমন বক্রতা। কখনো স্বভাবের কারণে, কখনো পরিস্থিতির কারণে মানুষ বক্র হতে বাধ্য হয়। যেমন রংধনুও ধনুকের মতো বাঁকানো। কিন্ত কেন? এরও সুনির্দিষ্ট কারণ আছে। বৃষ্টির ফোঁটা থেকে আসা বিভিন্ন রঙের আলো চোখের সাথে সামান্য কোণ উৎপন্ন করে। ত্রিমাত্রিক জগতে সেই কোণ চোখের চারদিকেই উৎপন্ন হয়। ফলে তা দেখতে অনেকটা চোঙের মতো হয়। চোঙের উপরিপৃষ্ঠ বৃত্তাকার হয়। চোখের সাপেক্ষে চোখের চারদিকে রঙধনুর চোঙও বৃত্তাকার। সেজন্য রংধনুকে দেখতে বাঁকানো মনে হয়। তবে কেউ যদি রংধনুর পুরো বৃত্ত দেখতে চায় তাহলে তাকে উপরে উঠতে হবে। হতে পারে সেটা প্লেনে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে। সূর্য এবং রংধনু এই দুইয়ের মাঝে অবস্থান করলে বৃত্তাকার রংধনু দেখা যাবে।"

"মানুষকেও পরিপূর্ণভাবে দেখতে হয় দূর থেকে। যেমন, হিমালয়ের পায়ের কাছে দাঁড়ায়ে একটি প্রস্তরীভূত দেয়াল দেখা যাবে। যতদূরে যাওয়া যাবে, ততই হিমালয়ের পূর্ণ অবয়ব প্রকাশিত হবে। কাছের মানুষ থেকে দূরের মানুষকে আমরা অনেক বেশি ভালো করে দেখতে ও বুঝতে পারি।" এই ছিল ক্যাভিনের অভিমত।

“এটা কেমনে সম্ভব?’ প্রশ্ন করেছিল ম্যারি।

“খুবই সম্ভব। সারাজীবন পাশাপাশি থেকেও মানুষেরা নিজেদের চিনতে পারে না। স্বামী স্ত্রীকে, পিতা পুত্রকে, পুত্র পিতাকে খুব কমই চিনে। যদি সত্যিই চিনতো, তাহলে এতো বেদনা, ভুল বোঝাবুঝি মোটেও হতো না।”

ম্যারি আর তর্ক করার যুক্তি পান না। চুপ করে থাকেন। ক্যাভিন খানিকক্ষন ভেবে বলে,

“রংধনুতে রঙের ভেতর বাহির আছে। মানুষেরও ভেতর আর বাহির আছে। মানুষ নিজেই নিজের সবটুকু দেখে না, বোঝে না। অন্য মানুষ কি করে বুঝবে বলো?”

কিছুটা সময় নিয়ে বিষয়টি ম্যারিকে বুঝিয়ে বলে ক্যাভিন। আসলে সাধারণভাবে মানুষের একটি বা দুটি দিক প্রাধান্য পায় আর সেটাকেই অন্যরা মানুষাটির সবটুকু বলে ধরে নেয়। মনে করে, তিনি একজন রাগী মানুষ কিংবা ভীতু মানুষ অথবা লোভী মানুষ। এমন ধারণা সর্বাংশে সঠিক নয়। রাগী মানুষটিও কারো কারো প্রতি স্নেহশীল। ভীতু লোকটিও অকস্মাৎ প্রচণ্ড সাহসী হয়ে উঠতে পারে। কিংবা কোনো লোভী লোকও গোপনে দানশীল হতে পারে। এসব সাধারণের চোখে হয়ত দৃশ্যমান নয়। রংধনুতে যেমন সবসময় লাল রঙ রংধনু-বৃত্তের বাইরে অবস্থান করে আর বেগুনি রঙ ভেতরের দিকে থাকে। বাকি রঙগুলোও একটি নির্দিষ্ট ক্রমানুসারে সাজানো থাকে, তেমনি মানুষের কিছু বৈশিষ্ট্য বাইরের দিকে বা প্রকাশ্যে থাকে আর কিছু অন্তরালে।

মানব বৈশিষ্ট্যের একটি ক্রম আছে রংধনুর রঙগুলোর মতোই। সব সময় এবং পৃথিবীর সর্বত্র রংধনুর রঙ-সজ্জার ক্রমের এদিক সেদিক হয় না। একেবারেই নিয়মতান্ত্রিকতায় বেষ্টিত রঙগুলো। মানুষও কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য দ্বারা এমনভাবে পরিবেষ্টিত থাকে যে, তার চরিত্রকে অন্যভাবে কল্পনা করা যায় না। এজন্য দায়ী তরঙ্গ দৈর্ঘ্য। রংধনুর ক্ষেত্রে প্রতিটি রঙেরই একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গ দৈর্ঘ্য আছে। সাতটি রঙকে তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের ক্রমানুসারে সাজালে এই ক্রমটি পাওয়া যাবে- বেগুনী, নীল, আসমানী, সবুজ, হলুদ, কমলা, লাল। তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের পরিমাণ কম বেশি হলে প্রিজমের মধ্যে তাদের বেঁকে যাবার পরিমাণও কম বেশি হয়। মানে বেঁকে যাবার দিক থেকে সাতটি আলোই আলাদা।

পদার্থবিদ্যার নিয়ম সবখানে সবসময় এক। তাই সবসময় লাল রঙ রংধনুর বৃত্তের বাইরে অবস্থান করে। আর বেগুনী রঙ বৃত্তের ভেতরের দিকে অবস্থান করে। তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ক্রমানুসারে প্রতিবার বিশ্লিষ্ট হয়ে একই ক্রম-রঙের রংধনু সৃষ্টি করে। মানুষও অভিজ্ঞতায়, আচরণে, কাজকর্মে এমনই একটি ক্রম নিজের মধ্যে তৈরি করে ফেলে। ফলে মেজাজ দেখানো লোকটি ইচ্ছা থাকলেও এক সময়ে সর্বসম্মুখে আর স্নেহ দেখাতে পারে না কিংবা দেখালেও অতি সঙ্গোপনে দেখান। এসব সীমাবদ্ধতা ও আচরণগত দাসত্বের কারণে খুব ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও বহুলোক সত্য কথা বলতে পারে না। ভালোবাসার মানুষটিকে ভেতরে ভেতরে গভীরভাবে ভালোবাসলেও সে কথাটি খোলাখুলি জানাতে পারে না।

তবে বৃষ্টি হলে যেমন রংধনু দেখা যায়, তেমনি সঙ্কটে, আবেগে, বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে মানুষের চরিত্রের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা বিচিত্র রঙগুলো দেখতে পাওয়া যায়। তখন একজন মানুষের সবগুলো দিক সামনে চলে আসে। তবে বৃষ্টি হলেই যেমন রংধনু তৈরি হয় না আকাশে, তার জন্য সূর্যের উপস্থিতি থাকা লাগে, তেমনি বিশেষ পরিস্থিতি বা ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ কোনো মানুষের উপস্থিতির দরকার হয় একজন মানুষের সামগ্রিক চরিত্রের পূর্ণতর উন্মোচনের জন্যে।

কাভিনের শেষ কথাগুলো বর্শার মতো বিদ্ধ হয়ে আছে ম্যারির মগজে,

“ভালভাবে রংধনু দেখতে হলে আমাদের অবস্থান এমন হতে হবে যেন সূর্য আমাদের পেছনে আর রংধনু সামনে থাকে। একজন মানুষকে ভালোভাবে দেখতে ও বুঝতে হলে বিভিন্ন পরিস্থিতি ও আরো অনেকে মানুষের প্রয়োজন হবে। তখনই তুলনা করে দেখা যাবে সম্পূর্ণ মানুষটিকে তার নানা বৈশিষ্ট্যের আলোকে। এজন্যই কাছে থাকার মতো দূরে থাকাও জরুরি।”

ম্যারি এসব পুরনো কথা ভেবে শিহরিত হন যে, এমন একজন মানুষ তার জীবনে এসেছিল, যে কাছে থাকলে মনে হয় দূরের আর দূরে থাকলে অনুভব করা যায় অতি কাছের একজনের মতো।

পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার।

আরও পড়ুন: ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-৬

;