জয়নব আরা বেগমের কবিতায় মনস্বিতা



মমতাজ উদ্দিন আহমদ
জয়নব আরা বেগমের কবিতায় মনস্বিতা

জয়নব আরা বেগমের কবিতায় মনস্বিতা

  • Font increase
  • Font Decrease

 

জয়নব আরা বেগম (২৭ ডিসেম্বর ১৯৭৮) বাংলা কবিতার রথে উঠে আসা একটি নাম। পেশায় শিক্ষক হলেও লিখনিতে সিদ্ধহস্ত অর্জন করছেন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। তাঁর কবিতায় ধরা পড়েছে প্রনষ্ট সময়ের অভিঘাতের বিষন্নতা। আবার কখনোবা প্রকাশ ঘটে নস্টালজিয়া, কখনো অন্তর্বিহীন মৌন-নিস্তব্ধতা, মানবীয় ভালোবাসার অন্তর্লীনতা এবং নির্মোহ সম্পর্কের গভীর আকাঙ্ক্ষার পূর্ণ প্রকাশ।

জয়নব আরা বেগমের কবিতায় রয়েছে স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। কবিতাগুলো অনুরাগী পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অনতিদীর্ঘ, অনলস, তেজস্বী ও মনস্বী অনুশীলনের চাপ লক্ষ্যণীয় তাঁর কবিতায়। প্রচলিত আধুনিক কবিতার ধারায় রচিত হয়েছে তাঁর কাব্যের শরীর। এতে রয়েছে গভীর রসবোধ, সমাজচিন্তন, নারী-পুরুষের চিরকালীন প্রেম-বিরহ ও উদার-নৈতিকতার সুসমন্বয়। কবিতাগুলোতে রয়েছে বিদগ্ধ আত্মমগ্নতা। আবার কখনো বা ইহজাগতিক ভাবনার সাথে পরলৌকিকতার সংমিশ্রণ।

সাহিত্যের নানান শাখার তুলনায় বোদ্ধা মহলে কবিতার আলোচনাই সর্বাধিক। কবিতা অনন্ত শক্তির উৎসধারাও বটে। তাই কবিতার সংজ্ঞা পুরোপুরি দেয়া কঠিন। কবিতার কল্পনার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা কী কবিও দিতে পারেন কিনা তা পাঠকমাত্রই সন্দিহান থাকেন। জয়নব আরা বেগমের আধুমিক কবিতাগুলো পড়লে মনে লাগে সুর-ছন্দের তীব্র আকস্মিক শব্দতীর, পৌঁছে যায় অন্তরেরও ভেতর!

‘কবিতা অনন্ত শক্তির উৎসধারা’। সে ভাবনা থেকে বলা যায়, জয়নব আরা বেগমের প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘সমর্পিত শব্দাবলী’ ও ‘আঁধার ক্ষেতে বুনেছি ভোরের বীজ’ এর কবিতাগুলোয় রয়েছে নিজস্ব একটি গতিধারা। আছে ভাবের প্রাচুর্য। তাঁর প্রতিটি কবিতায় যে তৃষ্ণাবোধ রয়েছে তা দৃশ্যমান বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কবিতায় রয়েছে দৃশ্যমান বাস্তবতা থেকে ভিন্ন দৃশ্য তৈরীর সক্ষমতা।

কবি অসাধারণ সব শব্দের বুননে তৈরী করেন নিজের ক্ষুরধার লিখনীতে কবিতামালা। সাধারণ কল্পনার উর্ধ্বে উঠে কবিতায় তিনি নিজস্ব কল্পনায় শিল্পবুনেন। কবি মূহূর্তের অভিজ্ঞতা থেকে চলে যান সুদূরে। মাঝে মাঝে কল্পলোকের সিংহধারে পৌঁছে বেদনার বেদীমুলে অনর্থক শাপবর্ষণ করেন প্রিয়জনের উদ্দেশ্যে। সেখানে থাকে না বাস্তবতার কোন সীমারেখাও! সেখানে শুধুই কল্পলোকের ঘরবসতি!

বসন্তের নিদাঘ-শোভা আমাদের শরীর-মনকে জাগিয়ে তোলে। সে অনুভূতি যৌবনের। কবিতায়ও বসন্তের দৃশ্য ও বাতাসের ঝড়োগতি ও আত্মজাগরণ নিয়ে আসতে পারেন কবিরা। যেমন- আমাদের জাতীয় কবির ‘বিদ্রোহী’ কবিতা একটি আত্মজাগরণের কবিতা। সুদৃঢ় আত্মবিশ্বাসের জয়গান ‘বিদ্রোহী’ কবিতার চরণে চরণে সুস্পষ্টরূপে দেদীপ্যমান। এ কবিতায় ১২১ বার ‘আমি’ শব্দ ব্যবহার করে কবি প্রতীয়মান করেছেন মানুষ অসম শক্তির অধিকারী!

কবি মূলতঃ অনন্ত কল্পনা শক্তি দিয়ে শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে ছন্দ-মাত্রায় কবিতা বুনেন। এটি অত্যন্ত দূরহ কাজ বটে। জয়নব আরা বেগম তাঁর কবিতায় সাম্য, সত্য-সততা, প্রেম-অনুরাগ, ক্ষোভ, চাওয়া-পাওয়া, আশাহত জীবনের ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধতা এবং সমাজের মিল-অমিল বিষয়গুলোকে ফুটিয়ে তুলেছেন নিজ মনের আয়নার ফ্র্রেমে।

কবিতায় মনের ভাবপ্রকাশের অবদান বিশ্ববিশ্রুত। কবির কবিতা শরীর-মনের চারদিকে অনুভূতি জাগিয়ে দিতে সক্ষম। সে অনুভূতি যৌবনের, সে অনুভূতি পাওয়া-না পাওয়ার বেদনাকাব্য। পল্লী মানুষের জীবন নির্ভর আধুনিক কবিতায় সিদ্ধহস্ত কবি জয়নব আরা বেগম।

ছোট্ট পরিসরে কবিতার সংজ্ঞা দেওয়া কঠিন। কবিতার শক্তির উৎসধারার নাগাল খুব কম মানুষই পান। কবিতার রূপ-আকৃতি-প্রকৃতি একেক জনের কাছে একেকভাবে ধরা দেয়। তাই প্রত্যেক কবির আলাদা আলাদা ভাবের জগতের সাথে আমরা পরিচিত। মৌলিক কবির ভাবের জগৎ সর্বদাই আলাদা। যেমন গত শতকে রবীন্দ্র বলয়ে প্রদক্ষিণ করেও নজরুল তাঁর স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই হয়েছেন কালজয়ী।

কবিতা কি! কী তার পরিচয়? তার সহজ বর্ণনা পাই কবি আল মাহমুদের ‘কবিতা এখন’ কবিতাটি পাঠে। কবিতাটির শেষাংশটি এমন-

‘কবিতা চরের পাখি, কুড়ানো হাঁসের ডিম, গন্ধভরা ঘাস

ম্লান মুখ বউটির দড়ি ছেঁড়া হারানো বাছুর

গোপন চিঠির প্যাডে নীল খামে সাজানো অক্ষর

কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার।’

কবিতা এক-একজনের কাছে ধরা দিয়েছে ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতি দিয়ে। কবিতার সহজ বর্ণনায় যেভাবে ‘মক্তবের চুলখোলা আয়েশা আক্তার’ এর বর্ণনা উঠে আসে তেমনি আমরা দেখতে পাই জটিল-কঠিন বর্ণনার পক্তিমালাও। যাঁর মাথামু-ু সাধারণ পাঠকের বোধগম্যতাই বাইরে। এদিক দিয়ে কবি জয়নবের কবিতাগুলোর শব্দগাঁথুনি বেশ সাবলিল ও ঝরঝরে।

কবি জয়নব আরা বেগমের কাব্যগ্রন্থ ‘সমর্পিত শব্দাবলী’র কবিতা ‘শব্দের তাঁতী’তে কবিতার রূপ ধরা পড়েছে এভাবে-

‘সোনার সুতোয় রূপোর গিট মেরে

বুনন করি রেশমী কবিতা।

অজানার অতৃপ্তি ঘুচাতে

নিজেকে পিপাসার্ত করে তৃষ্ণা নিবারণের জন্য

গণ্ডুষ ভরে পান করি

সাহিত্য-সংস্কৃতির রস।

তারপর নিজের মত কলম ঘুরাই

কখনো স্বপ্নে হারাই।’

তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘আঁধার ক্ষেতে বুনেছি ভোরের বীজ’ এর ২৫-২৬ পৃষ্ঠার একটি কবিতার নাম ‘কবিতা’। এ কবিতাটির শেষাংশে ‘কবিতা’র পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে এভাবে-

‘বোমার আগুনে ধ্বংস ও বিরান হয়ে যাওয়া

দগ্ধ প্রান্তরে

নতুন আশ্বাসের বাণী শোনায়।

জীবনের সঞ্চিনী বাড়ায়-

বিমর্ষ তালিকার নাম মুছে দিয়ে।

সে অন্য কেউ নয়- ‘কবিতা’।’ (চম্বুক অংশ: কবিতা, আঁধার ক্ষেতে বুনেছি ভোরের বীজ)।

তাঁর কবিতায় মাঝে মাঝে ধরা পড়ে শিল্পিত ভাবনার স্বাধীন প্রকাশ। কবির বিরহী ভাবনা, কবিতার ঝাঁঝালো ভাষা আর পঙতি যেন এক একটি বুলেট। এতে ধরা পড়ে তাঁর অন্তরের প্রবল শক্তি। যে শক্তি জ্ঞানগম্মিদের ধারণারও উর্ধ্বে। কবি তাঁর ‘অশ্রুপ্লাবন’ কবিতায় লিখেন-

‘বিশ্বাসের একাগ্রতায় আমার বুকে

তোমার প্রেমকে ধারণ করে

প্রাণের মধ্যে খুঁজেছি প্রাণের বাঁধন।’ 

তখন পাঠকমাত্রেই হৃদয়ের অলিন্দে খুঁজে পান কবির প্রেমারাধানার সাধনা আর ভাবনার সীমারেখা। একইসাথে খুঁজে পান কবির ব্যথিত হৃদয়ের প্রকাশের ব্যাপ্তির গভীরতা। আবার যখন দেখি-

‘পাষাণে পরান বেঁধে,

ম্লান বেশে সজল নয়নে

নিজের বোবা দৃষ্টির শূন্য চাহনি

আজ আমাকে করছে ক্ষত-বিক্ষত’।

                                (‘অশ্রপ্লাবন’ : সমর্পিত শব্দাবলী)

এখানে পাঠকমাত্রই কবির হৃদয়ে বেদনার অনুরণন দেখে ব্যথিত হন। যখন কবি বলেন, ‘বেদনার শতদল হয়ে ফুটে আছি যন্ত্রণা দিঘীর মাঝখানে‘ তখন পাঠকের হৃদয়ে কবির যন্ত্রণা দিঘীতে শাপলা ফুটানোর আকুলতা সৃষ্টি করে। কবি পাঠকের মনকে আকাঙ্খিত করে তোলেন কষ্টের দিঘীতে শাপলা ফোটানোর। কবি যখন লেখেন-

‘অকারণে শুধু আজ মনে বাজে বেদনার তান,

বুকে বাজে হাহাকার করতালি-

অশ্রুপ্লাবনে হাবুডুবু খাই বেদনার উপকূলে’।

                                (‘অশ্রুপ্লাবন’ : সমর্পিত শব্দাবলী)

কবি এখানে নিজেই স্বীকার করেছেন ‘অকারণে আজ মনে বাজে বেদনার তান’। এখানে কবির কল্পনা ধরা পড়ে। কবির দুঃখের কারণে যোগ হয়েছে অকারণ ভাবনা-কল্পনা। কবির এ বিরহের মধ্যে বাস্তব অনুষঙ্গ নেই। আছে শুধু প্রিয়জনের প্রতি অকারণ দ্বেষ আর অনুচিত শাপবর্ষণ। কবির বিরহ এখানে শুধুই কল্পনাপ্রসুত। যাতে বাস্তবতার সংশ্লেষ নেই।

কবি জয়নব আরা বেগমের কাব্যগ্রন্থ ‘সমর্পিত শব্দাবলী’ এবং ‘আঁধার ক্ষেতে বুনেছি ভোরের বীজ’ এর ১০৩ টি কবিতার মধ্যে অনেকগুলো কবিতাই বেশ উঁচুমর্গের বলে মনে হয়। সাহিত্য সমালোচকের পাশাপাশি বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন বিখ্যাত কবিও কবিতাকে দেখেছেন বিভিন্ন রূপে। সেদিক দিয়ে তাঁর কবিতার মূল অনুষঙ্গ কি তা সময়ই বলে দেবে একদিন।

কবিতাই কবির মননের পরিচয় বহন করে। দু’টি কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোয় পরিবেশ-প্রকৃতি, প্রেম, সমাজ-সভ্যতা, সুখ-দুঃখ, প্রতিবাদ, ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধতা-মৌনতা, রাগ-অনুরাগ, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের নানান প্রসঙ্গ ফুটে উঠেছে শব্দ-তরঙ্গে।

নারী প্রেমিকা; নারী কবিতার শক্তির উৎস। কবিতার অন্যতম উপজীব্যও বটে নারী। যেমনিভাবে নারী কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম লিখেন-

‘নারীর বিরহে, নারীর মিলনে, নর পেল কবি-প্রাণ,

যত কথা তার হইল কবিতা, শব্দ হইল গান।

নর দিল ক্ষুধা, নারী দিল সুধা, সুধায় ক্ষুধায় মিলে’

জন্ম লভিছে মহামানবের মহাশিশু তিলে তিলে!’

কিন্তু নারীই যখন হয়ে উঠেন কবি তখনও প্রাধান্য পায় এমন কাউকে ঘিরে। যা তার মানসসঙ্গী! কবি জয়নব আরা বেগম লিখলেন,

‘হৃদয়ের সোনালী কুঞ্চন ভেঙ্গে

নক্ষত্র হয়ে এসেছিলে তুমি

কোন এক বুধবার সন্ধ্যায়।

স্নায়ুর ভেতর টগবগ করেছিলো রক্তরস।

স্বাদে-গন্ধে সিক্ত হয়েছিলাম,

নিমফুলের স্নিগ্ধ গন্ধের মতো

একটা গন্ধ আমাকে মাতিয়ে রেখেছিলো;

ধুকপুক হৃদয়ে অনুভব করেছিলাম

এক রহস্যময় ভালোলাগা।

(প্রথম স্পর্শ : সমর্পিত শব্দাবলী)

তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘আঁধার ক্ষেতে বুনেছি ভোরর বীজ’ এর কবিতা ‘অস্তিত্বের রেণু’তে কবি লিখলেন-

‘যদি কখনো তোমার প্রত্যাখানের কৃষ্ণবলয়

আমাকে এসে গ্রাস করে,

তবে সেই দিন যেন পৃথিবীর

অন্তিম দিন হয় আমার।

আমার যাত্রা-পথের দিন-রাত্রির

উত্থান-পতনে তুমি রোমাঞ্চ পুলক।

তোমার ভালোবাসার রহস্য সৃজনের পঞ্চভূত

আমার বুকের তপস্যা।’

এ কবিতাগ্রন্থ দু’টির কবিতাগুলোয় প্রেম-পরিবেশ-প্রকৃতি ধরা পড়েছে বেশ আধুনিক কবিতার পঙ্তিমালায়। পাঠককে দোলা দেয় কবিতাগুলো। পাশাপাশি তাঁর কবিতায় শিল্প-প্রকরণ, আদর্শ-চেতনা, চিন্তা প্রভৃতির গভীরতা অনেকখানি গভীর। কবিতায় তার অন্তর্নিহিত শক্তি ও বলিষ্ঠতা এবং ইচ্ছাশক্তির প্রচ-তা কবিতার শব্দের ভারী ওজন প্রভৃতি গুণ আমরা ভবিষ্যতেও লক্ষ্য করবো বলে আশা করি। এছাড়া ভাষার-বৈচিত্র্য এবং নিজস্বতায় আলাদা সুর সৃষ্টি হোক তাঁর কবিতায় এ প্রত্যাশা।

মানুষ ঐতিহ্য অনুসন্ধানে এবং দেশপ্রেমে আগ্রহী। ঐতিহ্যসন্ধান মানেই তার অস্তিত্ব অনুসন্ধান করা। দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ। সমাজের চারপাশকে ঘিরে গড়ে ওঠে সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতির সঙ্গে মানুষের জীবনাচরণ। কবি তাঁর চারপাশ থেকে কবিতার উপকরণ সংগ্রহ করেন। প্রকাশ করেন নিজস্ব ভঙ্গিতে। ‘স্বদেশ’ কবিতায় কবি জয়নব আরা বেগম লিখলেন-

‘বটের ডালে কালো কোকিল

ডাকছে কুহুতানে,

তারই সুরে মন ভরে যায়

স্বপ্ন জাগে প্রাণে-

এমনি সুখের স্বপ্ন পারে

ভাসছি সুখের তারে।’

দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে অন্তবির্হিন মৌননিস্তব্ধ সৌন্দর্যের দিগন্ত বিস্তৃত গ্রন্থিল পাহাড়ি জনপদ বান্দরবান। এই অপরূপ বান্দরবান জেলাকে নিয়ে কবি জয়নব আরা বেগম লিখেছেন ১০০ লাইনের ৫০০ শব্দের দীর্ঘ একটি কবিতা। কবিতাটি শুরু এবং শেষের পঙ্তিগুলো এই-

‘পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে সবুজের মেলা,

তারি সাথে মেঘ খেলে লুকোচুরি খেলা।

ঝর্ণা-পাহাড়-নদী আর সবুজ বন,

অপরূপ রূপ দেখে হারায় এ মন।

---

পাহাড়ি-বাঙ্গালী সম্প্রীতি অটুট এখানে

ছুটে আসে সব সুখ তাই এই পানে।

জন্মেছি এইখানে কী চাই আর,

আমার জেলা ‘বান্দরবান’ আমার অহংকার।’

(বান্দরবান : আঁধার ক্ষেতে বুনেছি ভোরের বীজ)।

কবি জয়নব আরা বেগম লোকজ-উপাদানে শৈল্পিক করে সাজিয়েছেন তার কবিতার অবয়ব। মা, বাবা, গন্তব্য, প্রথম স্পর্শ, সুঁই সুতো, বেদনার শব্দ, নালিশ, মিনতি, হৃদমাঝার, বাজখাই অধিকার, বিশ্বাসের ঝুলি, অনন্ত তৃপ্তি, স্বর্গীয় পুলক, স্বপ্নস্নান, অনন্ত সুখ, জৈব বিষ, আমি মুক্তি চাই, সোনালী সূর্য, ধিক্কার ধ্বনী, শব্দের তাঁতী, হিরক রাজা, মন পদ্মের ঢেউ, তোমাকে ভালোবাসি বলে, ভীনগ্রহবাসী, সলজ্জ আস্তানা, বান্দরবান, চন্দ্রালোকের সিঁড়ি, আগামীর প্রত্যাশা , অথৈ যমুনা, যন্ত্রণার ঐশ্বর্য্য, স্বদেশ, সর্বগ্রাসী, নারী, বিশ্বাস, দৈবধন, ভালোবাসা ও ঘৃণা, নিন্দাবাদের বৃন্দাবন, হে অমানিশা, অস্তিত্বের রেণু, সুপ্রিয়’ ইত্যাদি কবিতায় ব্যবহৃত হয়েছে স্মৃতিকথার উপাদান। কয়েকটি নস্টালজিক কবিতা পড়লে পাঠক ফিরে যাবেন অতীতে।

কবি জয়নব আরা বেগমের কবিতায় ইসলামী মিথ এবং পুরাণের ব্যবহার তেমন লক্ষ্যণীয় নয়। বাঙ্গালী মুসলিম কবিদের মাঝে যাঁরা তাঁদের কবিতায় ইসলামী মিথের ব্যবহার করেছেন তারা বাঙ্গালী মুসলিম মনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। তদ্রুপভাবে কবিতায় পুরানের ব্যবহারও বাঙ্গালী মানসকে সমানভাবে আকর্ষণ করে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে কবি আল মাহমুদ তাঁর কবিতায় এ দু’টি মিথ এর দারুণ সমন্বয় করেছেন। ফলে তার অনেক কবিতাই মানুষের বোধ-বিশ্বাস, অস্তি-মজ্জার কথা বলে বিধায় কবিতাগুলো নিত্য প্রাসঙ্গিক।

পাশাপাশি কবিতায় ইংরেজি, আরবি, উর্দু-ফারসি, প্রাচীন সংস্কৃত ও সাধু ভাষার শব্দের জুঁতসই ব্যবহার করলে কবিতাগুলো আরো সুখপাঠ্য হয়ে উঠবে বলে মনে করি। তাঁর কবিতায় উঠে আসুক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দুঃখ-বেদনা, হাসি-কান্না, অনুভব-অনুভূতির শৈল্পিক বুনন। লোকজ শব্দ, ঐহিত্য চেতনা, ধর্মাশ্রয়ী কবিতা সৃষ্টির মাধ্যমে তাঁর কাব্যের দুয়ার আরো খোলে অপূর্ব সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হোক! ‘সমর্পিত শব্দাবলী’ কবির প্রথম দিকের কবিতার সমারোহের গ্রন্থিত রূপ।

কবি জয়নব আরা বেগম পেশায় একজন শিক্ষক। ১৯ বছরের শিক্ষকতা জীবনে তাঁর রয়েছে অনেক অর্জন। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন পরিচালিত ‘শিক্ষক বাতায়নে’ একজন সক্রিয় ও সেরা শিক্ষক। ২০১৪ সালে শিক্ষামন্ত্রী থেকে সেরা শিক্ষক এ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। তাঁর তৈরি মাল্টিমিডিয়া মডেল কন্টেন্টগুলো দেশের মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরূমে পাঠোপযোগী। মাল্টিমিডিয়া কন্টেন্ট প্রতিযোগিতা ২০১৭-এ এটুআই কর্তৃক তিনি দেশসেরা শিক্ষক নির্বাচিত হন। বান্দরবান জেলায় একাধিকবার তিনি শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক তাঁকে স্টাডি ট্যুরে মালয়েশিয়া সফরে পাঠানো হয়।

গ্লোবাল লার্নিং এর উপর উচ্চতর অভিজ্ঞতার জন্য ২০১৫ সালে তিনি লন্ডন সফর করেন। তাঁর এ সফরের ব্যয়ভার বহন করে সরকার ও ব্রিটিশ কাউন্সিল। লন্ডনের স্কটস প্রাইমারি স্কুলে তিনি অতিথি শিক্ষক ছিলেন। ইউকে ভিজিটকালে লন্ডনের হেভারিং এর মেয়র ব্রায়ান ইগলিং তাঁর কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে রানীর পোষাক পরিয়ে সম্মাননা এবং এ্যাওয়ার্ড প্রদান করেন। এছাড়াও কবি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পেয়েছেন একাধিক সম্মাননা।

একটি সভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জয়নব আরা বেগমের জন্ম ও বেড়ে উঠা। পৈত্রিক বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার পূর্ব কাকারা গ্রামে। বাবা জয়নাল আবেদীন একজন ব্যবসায়ী। মাতা হোছনে আরা বেগম গৃহিনী। চাকুরিসূত্রে তিনি বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দা।

লেখক: মমতাজ উদ্দিন আহমদ, সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-৮



মাহফুজ পারভেজ
ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-৮

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-৮

  • Font increase
  • Font Decrease

[অষ্টম কিস্তি]

“এই ছবিতে তুমি যে ঘাসের ওপর থেকে রংধনু শুরু করলে, কী করে তা বাস্তবের কাছাকাছি হবে?”

ম্যারির প্রশ্ন শুনে পল্লবী মাথা ঝুঁকিয়ে তার হাতের পেনসিলটা কাগজে এলোমেলো ঘষতে থাকে। কোনো উত্তর দেয় না। ক্যাম্পাসে পড়তে আসা দক্ষিণ এশীয় তরুণীটির দিকে অপলক চেয়ে থাকেন ম্যারি। পল্লবী মাথা ঝুঁকিয়ে রেখেই একসময় বিড়বিড় করে, “আমি তো কখনো সত্যিকারের রংধনু দেখিনি!”

ম্যারি চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রায় অর্ধস্ফুটে বলেন, “বুঝেছি। তবে আর কী।”

কথাটা বলে ম্যারি নিজের মনে ভাবলেন, মেয়েটিকে এভাবে বলা ঠিক হয় নি। পল্লবী আহত হতে পারে কিংবা তার মধ্যে না-পারার হতাশা আসতে পারে। এটা ঠিক কাজ নয়। শিক্ষার্থীর গুণ জাগ্রত করা তার দায়িত্ব। কোনো কিছু করার এবং পারার পথ দেখানো কর্তব্য। না-পারার বিষয়গুলো মনে করিয়ে তাকে আটকে দেওয়া মোটেও ঠিক হয় নি।

নিজের ভুল বুঝতে পেরে পল্লবীর পাশে বসে হাসতে হাসতে ম্যারি বলেন, “সব সময় বাস্তবকে হুবহু আঁকার দরকার নেই। দেখা জিনিস হুবহু আঁকতে নেই। স্বপ্ন, কল্পনা আর ইচ্ছে মিশিয়ে আঁকতে হয়। তবেই সেটা তোমার একান্ত নিজের সৃষ্টি হবে।”

পল্লবীর ঠোঁটের কোণ বেঁকে উঠতে উঠতেও ফের স্বাভাবিক হয়ে যায়। তার খুশির সঙ্গে শোনা যায় হাতের চুড়ির রিনিঠিনি শব্দ। ম্যারি সন্তর্পণে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেন।

অন্য ছেলেমেয়েগুলোর ড্রয়িং খাতা চেক করে ম্যারি খানিকটা আশাহত হন। কিন্তু তিনি সেটা নিজের মনেই লুকিয়ে রাখেন। এদের দোষ দেওয়ার কিছু নেই। সত্যি সত্যি রংধনু তারা দেখে নি। বইয়ে দেখা কিংবা ইউটিউবের রংধনু দেখে দেখে যতটুকু আঁকতে পেরেছে, সেটাই বেশি।

একটি বিষয় দেখে ম্যারি খুবই বিস্মিত হন। রংধনু পৃথিবীর সর্বত্র একই রকম হবে, এটাই বিজ্ঞানের সূত্র। কিন্তু ছেলেমেয়েদের রংধনুতে তেমন ছাপ নেই। আফ্রিকা থেকে আসা সারাহ রংধনু এঁকেছে কালচে আকাশের প্রেক্ষাপটে। চীনের ছেলে লি লালচে আকাশের পটভূমিতে যে রংধনু চিত্রিত করেছে, তাতে সাতটি রঙ স্পষ্টভাবে খোলে নি। ম্যারি টের পান, সবার মনে আলাদা আলাদা আকাশ, যা তারা কল্পনা করেছে নিজের দেশ ও পরিবেশের প্রভাবে। তাই পল্লবীকে আলাদাভাবে দোষ দেওয়া ঠিক নয়। তার রংধনু তারই নিজস্ব পরিবেশ ও অনুভূতির ফসল, যা তিনি এই প্রথম একেকজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে একেক রকমের দেখলেন। রংধনু অভিন্ন হলেও মানুষের মন আর কল্পনা যে সেটাকে আলাদা অবয়ব দিয়েছে, সেটা দিব্যি প্রকাশ পায় ম্যারির কাছে।

ড্রয়িং খাতাগুলো নিয়ে কোনো নেতিবাচক মন্তব্য করা থেকে বিরত রইলেন ম্যারি। সবাইকে একটিই কমেন্ট করলেন তিনি, “গুড ওয়ার্ক, ট্রাই এগেইন।”

ম্যারি কিন্তু ঠিকই টের পান, ছেলেমেয়েগুলোর কাজে অবচেতনভাবে একটি বার্তাই ভেসে ওঠে, তা আসলে তাদেরই সঙ্কুল পরিস্থিতির প্রতিফলন। যে কারণে তাদের ছবির আকাশগুলো বদলে গিয়েছে। কোনও একটি হয়েছে কালচে, কিছু লালচে কিংবা পিঙ্গল। চোখের সামনের আর্থসামাজিক বাস্তবতাই তাদের অনুভতি ছুঁয়ে ভিসুয়াল রিপ্রেজ়েন্টেশনের গভীরে বিশেষ ভাবে নিহিত রয়েছে। উত্তাল পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে যার জন্ম, তার ছবির আত্মদর্শী চৈতন্যের মধ্যে সেই বীজমন্ত্র লুক্কায়িত থাকবেই।

চিত্রকর্ম বোঝার ও বিশ্লেষণের আলাদা চোখ আছে ম্যারির। কারণ, একসময় ম্যারি নিজেই ছিলেন ক্যাম্পাসের চলমান শিল্প আন্দোলনের অন্যতম হোতা। শিল্পকে মানুষের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার সেই অবিরত প্রচেষ্টার ফসল তুলেছিলেন তিনি আর তার সঙ্গে এক জেদি যুবক, ক্যাভিন। তাদের চাঞ্চল্যে ক্যাম্পাসের গথিক স্থাপত্যের গম্বুজওয়ালা ভবনগুলো ছুটির দিনের বৈকালিক আড্ডায় গমগম করত। এক শিল্পশোভিত ক্যাম্পাসের উদ্ভাস হতো কবি-সাহিত্যিক-চিত্রকর-ভাস্কর-গায়ক-সমালোচক-সম্পাদকদের ভিড়ে। সঙ্গে থাকতো আর্ট, পত্রপত্রিকা ও বই বিষয়ক আড্ডা। চলতো আবৃত্তি, কবিতাপাঠ, গান ও গল্পপাঠের মশগুল আসর।

প্রায়ই মহান শিল্পীদের ছবির প্রদর্শনী, নতুন উদীয়মান শিল্পীদের কাজ সংগ্রহ, মার্কিন দেশের লিথো প্রেসগুলোর সন্ধান, পুরনো ছাপচিত্রের খোঁজে অহর্নিশ অন্বেষণ ইত্যাদি ছিল তার যাপনের অবিচ্ছেদ অংশ। শিল্প ইতিহাসের সন্ধিক্ষণ তখন থেকেই তাঁর অবচেতনে তৈরি করে ফেলেছিল চিত্রকর্মের এক মহার্ঘ মিউজ়িয়াম।

একবার অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের সহায়তায় তিনটি কক্ষ নিয়ে ম্যারির কাজগুলোর একটি প্রদর্শনীর পরিকল্পনা ও আয়োজন করেছিল তাঁরই সাথী ও বন্ধুসম ক্যাভিন। প্রায় দেড়শোটি নানা মাধ্যমের কাজ ও বিবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষার সে এক মহাযজ্ঞ! এই উপলক্ষে তাঁর শিল্প নিয়েই একটি ডকু-ফিল্ম রিলিজ় করে বন্ধুরা। সমালোচকরা বলেছিলেন, অভিনবত্বে একটি আলাদা মাত্রার সংযোজন ঘটেছে ম্যারির কাজে। যেন রূপবন্ধ নতুন ভাবে পুনর্বিন্যাসের ফলে সিম্ফনি ও স্টাইল, বক্তব্য ও বর্ণনা, কম্পোজ়িশন ও ক্যাজ়ুয়ালিটি, মেসেজ ও মেটাফর একে অপরের পরিপূরক হয়ে প্রকাশিত হয়েছে ম্যারির আঁকা ছবিগুলোর পরতে পরতে।

হবে না কেন? ড্রয়িং, ছাপচিত্রের রঙিন পুনর্নির্মাণ, জলরং, ইঙ্ক, তেলরং, গ্রাফিক্স, মিশ্র মাধ্যম, রঙিন পেন্সিল, উডকাট, লিনোকাট, সেরিগ্রাফ, নিউজ পেপার ম্যাটে মিশ্র মাধ্যম, অ্যাক্রিলিক, এচিং, ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য— কী করেননি ম্যারি? শিল্পের যাবতীয় নিরীক্ষায় সৌন্দর্যের সবগুলো পথ পেরিয়ে এসেছেন তিনি। তারপর এক সময় নিঃসঙ্গ ও একেলা হয়ে পড়েছেন নিজেরই অজান্তে।

রংধনু নিয়ে অ্যাসাইনমেন্টে ব্যস্ত ছেলেমেয়েদের ছবিগুলোর সঙ্গে মেতে ম্যারির চাপা-শিল্পীসত্তা গুপ্ত লাভাস্রোতের মতো বের হয়ে এলো। সবাই চলে যাওয়ার পর তিনি আলাদাভাবে পল্লবীকে নিয়ে বসলেন। মেয়েটির সঙ্গে তিনি একটি অদ্ভুত নিবিড়তা অনুভব করেন। সবার চেয়ে বেশি সখ্যতাও তিনি বোধ করেন পূর্বদেশের এই মেয়েটির সঙ্গে। ঘরবাড়ি ছেড়ে মার্কিন দেশের ক্যাম্পাসে পড়তে আসা বেশকিছু ছেলেমেয়ের মধ্যে পল্লবী নামের এই তরুণীর জন্য কেন ম্যারি অনেক বেশি নৈকট্য অনুভব করেন, তা তিনি নিজেও ঠিকঠিক জানেন না। এই মেয়েটি পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে নানা বিষয়ে তার সঙ্গে এসে কথা বলে। তার প্রশ্নের ধরণ, জিজ্ঞাসার তীব্রতা ও কথা বলার আন্তরিক সুর ম্যারিকে মুগ্ধ করে। প্রাচ্য দেশের সংস্কৃতিতে বড় হওয়া মেয়েটির মধ্যে অপার কৌতূহল। গান শুনতে আর বই পড়তেও ভীষণ ভালোবাসে সে। ম্যারি প্রায়ই তাকে একমনে লাইব্রেরিতে পড়তে দেখে। বিচিত্র সব বই ইস্যু করে পড়ার জন্য বেছে নেয় পল্লবী। জানাশোনা কিছুটা গভীর হলে পল্লবী কিছু গান প্রেজেন্ট করে ম্যারিকে। গানের কথাগুলো বাংলায় কিন্তু সুর হৃদয়-ছোঁয়া। বিশেষ করে একটি গান ম্যারিকে আচ্ছন্ন করে প্রবলভাবে। গানটির প্রথম লাইন “তোমারও পরাণ যাহা চায়।”

ম্যারি একবার জিজ্ঞেস করেছিল পল্লবীকে, “এতোজন থাকতে তুমি আমাকে তোমার দেশের তোমার ভাষার গান উপহার দিলে কেন?”

“তোমাকে খুব দুখী ও বিষণ্ন মনে হয় আমার। গানগুলো শুনলে তোমার ভালো লাগবে।” কালবিলম্ব না করেই জানিয়েছিল পল্লবী।

ম্যারি ভীষণ অবাক হন। তারুণ্য ও যৌবনের সন্ধিক্ষণের সঙ্কুল পরিস্থিতিতে রয়েছে এই মেয়ে। অথচ কেমন করে তার মনের গভীরে ডুব দিয়েছে মেয়েটি। অলক্ষ্যে আপন হয়ে যাওয়া এমন একটি মেয়েকে মন থেকে ভালো না বেসে পারেন না ম্যারি।

এসব কথা ভাবতে ভাবতে ম্যারি বাস্তবে ফিরে আসেন। পল্লবীর আঁকার সরঞ্জাম গুছিয়ে দিতে দিতে বলেন, “তোমার যেমন ইচ্ছে হয়, তেমনভাবেই আঁকো তোমার রংধনু। আমি সেই ছবির নাম দেবো ‘পল্লবীর রংধনু’।"

উচ্ছ্বল ঝরণার মতো আনন্দে উজ্জ্বল হয় পল্লবীর সমস্ত মুখমণ্ডল। পল্লবী হাসতে হাসতে উঠে পড়ে। আঁকার খাতা আর রঙের বাক্স দু’হাতে নিয়ে সে রওনা দেয় নিজের হোস্টেলের দিকে। যেতে যেতে বলে,

“মিস, আমি তোমাকে একটা চমৎকার রংধনু উপহার দেবো, যা আমি শুধু তোমার কথা ভেবে আঁকবো। আমি নিশ্চিত, তুমি খুবই পছন্দ করবে আমার রংধনু।”

পল্লবীর চলে যাওয়া দেখতে দেখতে ম্যারি একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। পথের শেষে অদৃশ পল্লবীর ছায়াও আর নেই। সেখানে মনে হয় আবছায়ায় দেখা যাচ্ছে ক্যাভিনকে, যে লোকটি জীবনে প্রথম তাকে রংধনুর রঙের অরণ্যে পাগল করেছিল। ম্যারি তার একান্ত ভাবনায় ছেদ টেনে আকাশের দূর দিগন্তে তাকান। তারপর নিজেকে কিছুটা ঘুরিয়ে পশ্চিম আকাশে দৃষ্টি দেন তিনি। ক্যানভাসের মতো রংবহুল আকাশে তখন প্রদোষের আবিরমাখা উল্লাস। এখনই দিবাবসানে হাত ধরে শুরু হবে অন্ধকার রাতের।

ম্যারি অস্তগামী রশ্মির দিকে তাকিয়ে একাকী কি যেন চিন্তা করেন। তার ঘটনাবহুল জীবনের কোনো খণ্ডাংশের ছায়াপাত কি দেখতে পান তিনি আকাশের উদার শরীরে? তার স্থির ও অবিচল দৃষ্টি আটকে যায় অস্তাচলের দূর দিগন্তে। এক সময় তিনি অস্পষ্ট শব্দের মায়াজালে কোনক্রমে উচ্চারণ করেন, “তাঁর জীবনে অস্তবেলার রঙ-টা অন্যরকমও হতে পারত।”

পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার।

আরও পড়ুন: ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-৭

;

দেশভাগ, স্মৃতি, সত্তা, ভবিষ্যৎ



সুমন ভট্টাচার্য
ইনসেটে লেখক  সুমন ভট্টাচার্য

ইনসেটে লেখক সুমন ভট্টাচার্য

  • Font increase
  • Font Decrease

[৭৫ বছর আগে বাংলাদেশের যশোর ছিল তাঁর অস্তিত্বের শিকড়। সাহিত্যিক নিমাই ভট্টাচার্যের বংশধারার তৃতীয় প্রজন্ম তিনি। কলকাতার সাহিত্য আন্দোলন ও সাংবাদিকতায় ব্যাপৃত তাঁর জীবন। শিকড়ের সন্ধানে ফিরে দেখেছেন স্মৃতি ও সত্তার পদচিহ্ন। বয়ান করেছেন অনুভূতি ও ভবিষ্যতের চিত্রকল্প।]

আমাদের পূর্বপুরুষদের বাড়ি ছিল যশোরের নড়াইলে। এখন বোধহয় বাংলাদেশে নড়াইল একটা আলাদা জেলা হয়ে গিয়েছে। পরে জেনেছি যশোরের সঙ্গে আরো অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব বা রাজনীতিকদেরও একটা শিকড়ের সম্পর্ক ছিল। যেমন ভারতবর্ষের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় কিংবা পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি, সাবেক সাংসদ সোমেন মিত্র।

ঘটনাচক্রে আমার পিতৃপুরুষদের ভিটে ছিল যেখানে, সেই যশোরের সঙ্গে আমার মাতুলালয়েরও নাড়ির টান ছিল। অর্থাৎ আমার মায়ের দিক থেকে দাদু, যিনি সাহিত্যিক হিসেবে সুবিখ্যাত, সেই নিমাই ভট্টাচার্যের শিকড় ছিল যশোরে। কিছুদিন আগে আমার বাংলাদেশ প্রবাসী এক বন্ধু, সাংবাদিক এবং চলচ্চিত্র পরিচালক হাসিবুর রেজা কল্লোল একটা ছবি তুলে পাঠিয়েছিলেন, যে যশোরে কোন একটি রাস্তার নামকরণ নিমাই ভট্টাচার্যের নামে করা হয়েছে। সেটা অবশ্যই আমার কাছে বা হয়তো বৃহত্তর অর্থে আমার পরিবারের কাছে যথেষ্ট আনন্দের এবং গর্বের ঘটনা ছিল।

আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগে যেবার আমি প্রথম বাংলাদেশ যাই, সেইবার যশোর গিয়েছিলাম এবং সেই সুযোগে যশোর শহরের এক ব্যবসায়ী আমাকে আমার পিতৃপুরুষের ভিটে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। অবশ্যই সেটা একটা আলাদা আবেগের, উত্তেজনার এবং শিহরণ জাগানো ঘটনা ছিল। গত শতকের ৯ এর দশকের সেই সময়েও নড়াইলের ওই গ্রামে এমন কিছু বৃদ্ধ মানুষ ছিলেন, যাঁদের আমাদের পিতৃপুরুষদের স্মৃতি মনে ছিল।

আমি কলকাতায় ফিরে এসে আমার বাবা-মা এবং ঠাকুমাকে যশোরের গল্প বলেছিলাম। ঠাকুমা অবশ্য যশোর গিয়েছিলেন বিয়ের পর। গত শতকের ৩ এর দশকে সেই সময় নাকি কলকাতা থেকে নৌকো করে যশোর পর্যন্ত যাওয়া যেত। সেটা ভারতের স্বাধীনতার অন্তত এক দশকেরও বেশি সময়ের আগের ঘটনা, তাই ঠাকুমার কাছে যশোরের স্মৃতি মাথায় গেঁথেছিল।

আমি প্রায় পঞ্চাশ বছরের ব্যবধানে সেই যশোরে, সেই নড়াইলে ফিরে গিয়েছিলাম এটা অবশ্যই ঠাকুমা, লীলা ভট্টাচার্যকে স্মৃতিমেদুর করেছিল। বাবা এবং মা খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য, নড়াইল দেখার জন্য। কিন্তু এটা আমার দুর্ভাগ্য, ব্যক্তিগতভাবে অপরাধ যে, সময় এবং সুযোগ করে আমার তাঁদের পিতৃপুরুষের ভিটে দেখাতে নিয়ে যাওয়ার ফুসরত হয়ে ওঠেনি।

বাবার জন্য যন্ত্রণাটা একটু অন্যরকম ছিল। কারণ ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময় বাবা যশোর পর্যন্ত গিয়েছিলেন বলে আমায় অনেকবার বলেছেন। আবার কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা, সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পর্ক তাঁকে একাত্তরের ওই সময়টায় কোন কাজে সীমান্ত পেরিয়ে যশোর পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল। কিন্তু সময়টাই এমন ছিল যে বাবা খুঁজে খুঁজে নড়াইল পর্যন্ত যেতে পারেননি। যশোর পৌঁছেও নড়াইল না দেখার যন্ত্রণা বাবাকে সারা জীবন বহণ করতে হয়েছে। এবং হয়তো সেই যন্ত্রণা নিয়েই তিনি চলেও গিয়েছেন।

আসলে আমার দাদুরা চার ভাইই গত শতকের ২এর দশকে চাকরি নিয়ে একে একে কলকাতায় চলে এসেছিলেন। এবং কোনও আশ্চর্য সমাপতনে দাদুরা চার ভাই গত শতকের ৩এর দশকেই সরকারি চাকরি এবং কলকাতা শহরে নিজেদের মতো বাড়ি করে ফেলেছিলেন। তাই হয়তো যশোরের সঙ্গে দাদুদের নাড়ির টান থাকলেও যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং খুব সত্যি কথা বলতে গেলে কি, আমার ছোটবেলায় দাদু ঠাকুমা কারও কাছেই আমি এই নিয়ে সাংঘাতিক হাহুতাশ করতে দেখিনি।

আজকের ভারতবর্ষের রাজনীতিতে যে বিষয়টিকে কেন্দ্র করে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থান এবং যে আহত ক্ষতকে উসকে দিয়ে ভারতবর্ষের একটি প্রধান রাজনৈতিক দল নিজেদের জনসমর্থন বাড়াতে চায়, সেই আবেগ কোনদিন আমাদের বাড়িতে ছিল না। স্যামুয়েল হান্টিংটনের 'ক্ল্যাশ অফ দা সিভিলাইজেশন'-এর যাবতীয় তত্বের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমার পরিবার আমার শিক্ষা দিয়েছিল, যে তাঁদের মাইগ্রেশনের কারণ ছিল উন্নততর অর্থনীতির এবং নাগরিক জীবনের সন্ধান করা| ধর্মীয় বিদ্বেষ বা সেই সংক্রান্ত লুকানো ক্ষত নিয়ে কোনওদিন আমি বড় হইনি। দাদু কিংবা দাদুর ভাইরা যশোরের ফেলে আসা জমি পুকুরের কথা হয়তো স্মৃতিচারণে বলতেন, কিন্তু উত্তর কলকাতার বাড়ি, বেলেঘাটার ঠিকানা এবং সরকারি চাকরি নিয়ে তাঁরা কলকাতাতে ভালো ছিলেন। এবং এই মাইগ্রেশনটা সম্পূর্ণ হয়ে গেছিল দেশভাগের অনেক আগে।

এটাও হয়তো সমাপতন যে, পরবর্তীকালে যে মুসলিম পরিবারটির সঙ্গে আমার বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হলো, তাঁদেরও একটা বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। ভুল বললাম, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সাতক্ষীরাতে আমার শ্বশুরবাড়ির একটা জমি জায়গা বা শিকড় ছিল। কিন্তু আমার স্ত্রীর দাদামশাই, সৈয়দ সিরাজ আলি যেহেতু জিন্নাহর চাইতে মৌলানা আবুল কালাম আজাদকে বেশি নেতা বলে মানতেন, তাই ভারতবর্ষে অর্থাৎ বর্ধমানে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

এইসব কারণেই হয়তো আমার বড় হয়ে ওঠা থেকে আজ এই হাফ সেঞ্চুরির জীবনে পৌঁছে যাওয়া পর্যন্ত হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষের ন্যারেটিভ কিংবা বাংলাদেশের ফেলে আসা জমি নিয়ে হতাশা গ্রাস করেনি। বাবা তাঁর সোশ্যাল ডেমোক্রেট রাজনীতি দিয়ে জানতেন যে, তাঁর বাবা যশোর থেকে কলকাতায় এসে মাইগ্রেশনের যে সূচনা করেছিলেন, আমি কলকাতা থেকে দিল্লি পৌঁছে হয়তো তার আর একটা ধাপকে সম্পূর্ণ করেছিলাম!

কে জানে আমার পরবর্তী প্রজন্মের কেউ লন্ডন কিংবা নিউইয়র্কে পৌঁছে যশোর কিংবা সাতক্ষীরা থেকে আসা আরেকজন কোনও অনাবাসীর সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাবে না!

;

একজন নিসর্গী মুশফিক হোসাইন



মোহাম্মদ আলম চৌধুরী
একজন নিসর্গী মুশফিক হোসাইন

একজন নিসর্গী মুশফিক হোসাইন

  • Font increase
  • Font Decrease

মুশফিক হোসাইন জানুয়ারি ৬, ১৯৫৫ সালে চট্টগ্রাম শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে ১৯৭৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন এবং এরপর ব্যাংকিং পেশায় যুক্ত হয়ে কৃতিত্বের সাথে অবসর গ্রহণ করেন।

শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে প্রাণ-প্রকৃতির প্রতি অনুরাগ ছিল। নিসর্গ প্রেম সম্পর্কে তিনি বলেন,  ‘কৈশোরে একদিন কুয়াশামাখা ভোরে চোখ মেলে দেখি কর্ণফুলীর কোলে সূর্যমামা চোখ রাঙিয়ে হাসছে। দৌড়ে যাই নদীর কূলে। জোয়ারের নোনা জলে দুলছে হারগোজা। লতা-পাতা আর কাঁটার ফাঁকে নীলাভ ফুলেরা। রঙিন পক্ষীকুলের বিচিত্র সুর ও স্বর আমাকে তাদের প্রেমে মগ্ন করে। মৌমাছির রহস্যময় জীবন উদ্ঘাটনে আমি ব্যস্ত হয়ে পড়ি আর বৃক্ষকুল হয়ে ওঠে আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ’।

শৈশবের সোনাঝরা দিনগুলোতে প্রকৃতির সেবায় নিজেকে নিয়োগ করেছেন। এখনও অষ্টাদশ বয়সী তরুণের মতো খুঁজে বেড়ান প্রাণ-প্রকৃতির রহস্য। বৃক্ষশিশুর চারা রোপণে নিরলস খেটে যাচ্ছেন। শহরের আনাচে-কানাচে উৎসবহীন পরিবেশে নীরবে রোপন করেছেন অগুণিত বৃক্ষচারা। চট্টগ্রাম কলেজের প্রধান গেইটে সাক্ষী হয়ে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর রোপণ করা রুদ্রপলাশ বৃক্ষ। 

পাখিকুলের আবাস ধ্বংসে তাঁর মনে রক্তক্ষরণ হয়। তাই পাখিদের জন্য মাটির কলসিতে বাসা তৈরি করে বৃক্ষ শাখায় বেধে দেন। রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগেই ব্যালকনিতে পানি রাখেন বেড়াতে আসা পাখিদের জন্য।

উপকুল ও সাগর-মোহনার পাখিদের প্রতি বিশেষ দরদ থাকলেও যে কোনো পাখির সুর তাঁকে আকুল করে তোলে। তাই পাখি দেখা ও পাখি চেনার আয়োজন করে নতুন প্রজন্মকে তিনি উদ্বুদ্ধ করেন। চট্টগ্রাম শহরে পাখি উদ্ধারকারীর অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এ বয়সেও।

মুশফিক হোসাইনের শরীরে বহমান লোহিতকণিকায় প্রকৃতি-প্রেম রয়েছে। তাঁর মাতা-পিতারও ছিলো প্রাণ-প্রকৃতির প্রতি এমন নিখাদ দরদ। তাঁর সাথে প্রগাঢ় আলোচনায় জেনেছি শৈশবে প্রকৃতি-প্রেমে মগ্ন হওয়ার বিশদ কাহিনী।

তাঁরই নিরলস ভূমিকায় ও সম্পাদনায় চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত হয় প্রকৃতি ও প্রকৃতিসংরক্ষণ বিষয়ক প্রকাশনা ‘প্রকৃতি’। অভিজ্ঞতাধর্মী ও গবেষণামূলক এ প্রকাশনা ইতোমধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণ আন্দোলনে ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছে। আমি এ প্রকাশনার সহযোগী সম্পাদক-হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেখেছি, বৃক্ষদেহে পেরেকের আঘাত দেখে আবেগ-প্রবণ হয়ে তাঁর অশ্রু-বিসর্জনের দৃশ্য। এ সম্পর্কে তিনি আমাকে বলেছেন, ‘মনুষ্যদেহে যেমন আঘাত ও কষ্ট অনুভূত হয়, বৃক্ষদেহেও ঠিক তেমনি আঘাত ও কষ্ট অনুভূত হয়। উভয়েরই অনুভূতি শক্তি প্রবল। পার্থক্য শুধু একগোষ্ঠীর বাকশক্তি আছে আর অপর গোষ্ঠীর তা নেই’।

বৈকালিক পদচারণায় পরিচিত-অপরিচিত কারো সাথে আলোচনার সুযোগ হলে তিনি অনবরত বলে যান নিমপাতা, জলপাই, বহেরা, আমলকি আর সজনে-ডাটার কথা। চট্টগ্রাম শহরের জামাল খান মোড়, প্রেসক্লাব কিংবা আড্ডারত মুহুর্তে আমি বহুবার এ-দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছি। নতুন প্রজন্মের কথা ভেবে এখন তিনি প্রকৃতিপাঠ মঞ্চের উদ্যোগে বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে গিয়ে প্রকৃতি ও প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রকৃতি দল নিয়ে সরব রয়েছেন।

‘বেড়াতে গিয়েছি মৃতদের বাড়িতে’ নামে তাঁর কাব্যগ্রন্থে মানব-মানবীর প্রেম যেমন রয়েছে ঠিক তেমনি প্রকৃতি প্রেমও রয়েছে। প্রকৃতির প্রেম ছাড়া কোনো প্রেমই আদতে প্রেম হয় না। মানবপ্রেমের লুকানো ইতিহাস প্রকৃতিতেই রয়েছে।     

প্রকৃতি-প্রেমে ব্যাকুল হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বসন্তে জরা-ক্ষরা আর অশুভকে দূর করার জন্য বাড়ির চৌকাঠে মালা গেঁথে ঝুলিয়ে রাখা হয় ‘বিউফুল’ আর সাথে থাকে তার বোন নিমপাতাগুচ্ছ। যা আমাকে মুগ্ধ করে আর ভালোবেসেছি জলজ পাখি, ফুল, প্রজাপতি ও জলডোরা সাপ। মায়ার বাধনে বেঁধেছি গাছ, পাখির বাসা, ডিম ও ছানা। এই ভালোবাসার নামই প্রকৃতি’।

বীজ, চারাসংগ্রহ ও বিতরণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শ্মশান, কবরগাহসহ পতিত ভূমিতে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় ৬০ বছর ধরে তিনি নিয়োজিত। এ সম্পর্কে তাঁর ঘনিষ্টজন, সহপাঠী ও চা শিল্প-নির্বাহী আমিনুর রশীদ কাদেরী বলেন, ‘মুশফিক হোসাইনের সমগ্র অন্তরাত্মা জুড়ে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা। বীজের অঙ্কুরোদগম দেখে যেমন থমকে দাঁড়ায় তেমনি পাখির বাচ্চার  উড়াউড়ি দেখেও মুগ্ধ হয় আবার কখনো কখানো বয়স্ক বৃক্ষের দিকে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে’।

মুশফিক হোসাইন ‘চিটাগাং বী সোসাইটি’র প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে ‘প্রকৃতি’র সম্পাদক, ‘প্রকৃতি পাঠমঞ্চ’- এর এডমিন এবং প্রবীণদের নিয়ে ‘প্রবীন নাগরিক ফোরাম চট্টগ্রাম’ ও মাস্টার্স ৭৬-এর আহ্বায়ক। জনসচেতনতায় পত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে কলাম ও সচিত্র প্রতিবেদন লেখালেখি করেন। মনন - সৃজন ও বিশ্লেষণের বাংলা মাসিক ‘দখিনা’র ব্যবস্থাপনা সম্পাদকের দায়িত্বরত আর সাময়িকী ও স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ ও সম্পাদনায় যুক্ত।

প্রকৃতি সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নিসর্গী মুশফিক হোসাইন ‘সিটি ব্যাংক -তরুপল্লব দ্বিজেন শর্মা নিসর্গ পুরস্কার ২০২২’ এ বৃক্ষসখা পুরস্কার অর্জন করায় তাঁকে উষ্ণ অভিনন্দন।

লেখক: প্রফেসর, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

;

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-৭



মাহফুজ পারভেজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

[সপ্তম কিস্তি]
ঘোরাক্রান্তের মতো ক্যাভিনের পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা করে নির্ধারিত সময়ের আগেই উইলিয়ামের হাতে তুলে দেন ম্যারি। ম্যারির শুধুই মনে হয়, বইটি ক্যাভিন সাধারণভাবে পাঠকের জন্য লিখতেও বিশেষভাবে লিখেছেন তার জন্য। এতো দিন একসাথে থেকে যে ক্যাভিনকে ম্যারি চিনতে পারেননি, তার বই সেই চেনাজানার দুরত্ব নিমেষে ঘুচিয়ে দিয়েছে।

সম্পাদনার কাজে বার বার বইটি পড়ে অনেক দিন বাদে ম্যারির মধ্যে তৃপ্তির ভাব তৈরি হয়েছে। আসলেই তো, ক্যাভিন মুখে না বললেও, যেমন আশা করেছে, ম্যারি না জেনেই তেমনটিই করেছে এতোদিন ধরে। প্রচণ্ড চেষ্টায় টমাসকে যত্ন করেছে। বাবার অভাব মোটেও বুঝতে দেয় নি। মাতৃত্বের পেলবতার সঙ্গে পিতৃত্বের দায়িত্বশীলতা মিশিয়ে আপত্য স্নেহে লালন করেছেন তিনি টমাসকে। নিজের পুরো জীবনকে তিনি সীমায়িক করেছেন টমাসকে ঘিরে। তার স্কুল, খেলার মাঠ, ঘুরতে যাওয়া সবকিছুতে সঙ্গে থেকেছেন ম্যারি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবার কথা বিশেষ একটা আলাপ করে না টমাস। শুধু অনুভব করে, বাবা আছেন।

ক্যাভিনকে হাতের কাছে না পেয়ে ম্যারি মনে মনে প্রায়ই তার সঙ্গে কথোপকথনে লিপ্ত হন:

“আমি চেষ্টা করেছি তোমার ছেলেকে তোমার অভাব বুঝতে না দিতে। কিন্তু তুমি কি জানো, আমার জীবনে এখনো তোমার অভাব আমি অনুভব করি।”

ম্যারি জানেন, এসব কথা কোনো দিনও ক্যাভিনকে বলা হবে না। আবার তিনি এটাও জানেন, ক্যাভিনকে একেবারেই ভুলে যাওয়া অসম্ভব। অনেক প্রাপ্তি ও স্মৃতির মতো ক্যাভিনের হাত ধরে রংধনু চেনার অভিজ্ঞতা জীবনে ভুলতে পারবেন না ম্যারি।

রংধনুর কথা ভাবলেই আকাশে রঙের বর্ণালী আর মাটিতে বহুবর্ণা ক্যাভিনের ইমেজ ম্যারির সামনে এসে দাঁড়ায়। ‘রংধনু’, যাকে নিয়ে কবি-ঔপন্যাসিকরা প্রচুর উপকথার মালা গেঁথেছেন এবং বিজ্ঞানীরা বের করেছেন রংধনুর আসল রহস্য। কিন্তু ম্যারিকে রংধনু চিনিয়েছে ক্যাভিন। ম্যারির হাতের তালুতে নিজের আঙুলের স্পর্শে ক্যাভিন ব্যাখ্যা করেছে রংধনুর একেকটি রঙ। ক্যাভিনের স্পর্শ মেখে রংধনুর রংগুলো চোখের সীমানা ছুঁয়ে পৌঁছে গিয়েছিল ম্যারির হৃদয়ের অতলে। সেই অনুভূতি এখনো ম্যারিকে সর্বাঙ্গে জড়িয়ে রেখেছে মাধবী লতার আবেশে।

ক্যাভিন বলেছিল, “রংধনু হিসেবে আমরা যা দেখতে পাই তা আপাতদৃষ্টিতে ধনুকের মতো অর্ধচন্দ্রাকার হলেও তা আসলে গোল। বৃত্তাকার। অবাক লাগলো? অবাক লাগা এরকম অনেক কিছু ব্যাপার আছে রংধনুতে। যেমন বৈচিত্র্য আছে প্রতিটি মানুষের চরিত্রে ও ব্যক্তিত্বে, চিন্তায় ও চৈতন্যে।”

কোনো বই বা বিশেষজ্ঞ নন, ক্যাভিনই একবার নেপালের পোখরায় রংধনু-আবিষ্ট আকাশের নিচে সঙ্গোপনে পাশে এসে কানে কানে বলেছিল, “সূর্য থেকে যে আলোর রশ্মি পৃথিবীতে আসে তার রঙ মূলত সাদা। এই সাদা রঙের ভেতরে বেগুনী, নীল, আসমানি, সবুজ হলুদ, কমলা ও লাল এই সাতটি রং বিদ্যমান থাকে। সাদা আলোর একটি বিশেষ ধর্ম আছে। প্রিজমের মধ্য দিয়ে গমন করলে সাদা আলো সাতটি ভিন্ন রঙে বিশ্লেষিত হয়ে যায়।"

ক্যাভিন আরো বলেছিল, "আকাশে যখন বৃষ্টি পড়ে তখন বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ভাসমান প্রিজমের মতো কাজ করে। সূর্য হতে আলো, বৃষ্টির ফোঁটার একপাশ দিয়ে প্রবেশ করে বের হবার সময় সাত রঙা বর্ণালী সৃষ্টি করে। বৃষ্টির ফোঁটার প্রিজমসুলভ বৈশিষ্ট্যের কারণেই সৃষ্টি হয় রংধনু। বৃষ্টির ফোঁটা হতে বের হওয়া সাত রঙের আলো আমাদের চোখে এসে পৌঁছায় বলেই আমরা রংধনুকে দেখতে পাই।”

“মানুষও আসলে একটি অদৃশ রংধনু। তার হাসি, কান্না, আনন্দ, বেদনার আলাদা আলাদা রং আছে। আমরা তা দেখতে পাই না। কখনো কখনো কোনো শিল্পী কালো রঙে দুঃখ, সবুজে আনন্দ, হলুদে উৎসব, লালে দ্রোহ চিত্রিত করেন। এগুলোই এখন সাধারণভাবে মান্যতা পেয়েছে”, বলেছিল ক্যাভিন।

সেদিন কথাগুলোর গভীরতা ম্যারি বুঝেন নি। এখন বোঝেন, যখন ক্যাভিন পাশে নেই।

ক্যাভিন বুঝিয়েছিল, "আসলে মানুষ একরৈখিক নয়। কিছুটা বাঁকা। নানা কারণে এমন বক্রতা। কখনো স্বভাবের কারণে, কখনো পরিস্থিতির কারণে মানুষ বক্র হতে বাধ্য হয়। যেমন রংধনুও ধনুকের মতো বাঁকানো। কিন্ত কেন? এরও সুনির্দিষ্ট কারণ আছে। বৃষ্টির ফোঁটা থেকে আসা বিভিন্ন রঙের আলো চোখের সাথে সামান্য কোণ উৎপন্ন করে। ত্রিমাত্রিক জগতে সেই কোণ চোখের চারদিকেই উৎপন্ন হয়। ফলে তা দেখতে অনেকটা চোঙের মতো হয়। চোঙের উপরিপৃষ্ঠ বৃত্তাকার হয়। চোখের সাপেক্ষে চোখের চারদিকে রঙধনুর চোঙও বৃত্তাকার। সেজন্য রংধনুকে দেখতে বাঁকানো মনে হয়। তবে কেউ যদি রংধনুর পুরো বৃত্ত দেখতে চায় তাহলে তাকে উপরে উঠতে হবে। হতে পারে সেটা প্লেনে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে। সূর্য এবং রংধনু এই দুইয়ের মাঝে অবস্থান করলে বৃত্তাকার রংধনু দেখা যাবে।"

"মানুষকেও পরিপূর্ণভাবে দেখতে হয় দূর থেকে। যেমন, হিমালয়ের পায়ের কাছে দাঁড়ায়ে একটি প্রস্তরীভূত দেয়াল দেখা যাবে। যতদূরে যাওয়া যাবে, ততই হিমালয়ের পূর্ণ অবয়ব প্রকাশিত হবে। কাছের মানুষ থেকে দূরের মানুষকে আমরা অনেক বেশি ভালো করে দেখতে ও বুঝতে পারি।" এই ছিল ক্যাভিনের অভিমত।

“এটা কেমনে সম্ভব?’ প্রশ্ন করেছিল ম্যারি।

“খুবই সম্ভব। সারাজীবন পাশাপাশি থেকেও মানুষেরা নিজেদের চিনতে পারে না। স্বামী স্ত্রীকে, পিতা পুত্রকে, পুত্র পিতাকে খুব কমই চিনে। যদি সত্যিই চিনতো, তাহলে এতো বেদনা, ভুল বোঝাবুঝি মোটেও হতো না।”

ম্যারি আর তর্ক করার যুক্তি পান না। চুপ করে থাকেন। ক্যাভিন খানিকক্ষন ভেবে বলে,

“রংধনুতে রঙের ভেতর বাহির আছে। মানুষেরও ভেতর আর বাহির আছে। মানুষ নিজেই নিজের সবটুকু দেখে না, বোঝে না। অন্য মানুষ কি করে বুঝবে বলো?”

কিছুটা সময় নিয়ে বিষয়টি ম্যারিকে বুঝিয়ে বলে ক্যাভিন। আসলে সাধারণভাবে মানুষের একটি বা দুটি দিক প্রাধান্য পায় আর সেটাকেই অন্যরা মানুষাটির সবটুকু বলে ধরে নেয়। মনে করে, তিনি একজন রাগী মানুষ কিংবা ভীতু মানুষ অথবা লোভী মানুষ। এমন ধারণা সর্বাংশে সঠিক নয়। রাগী মানুষটিও কারো কারো প্রতি স্নেহশীল। ভীতু লোকটিও অকস্মাৎ প্রচণ্ড সাহসী হয়ে উঠতে পারে। কিংবা কোনো লোভী লোকও গোপনে দানশীল হতে পারে। এসব সাধারণের চোখে হয়ত দৃশ্যমান নয়। রংধনুতে যেমন সবসময় লাল রঙ রংধনু-বৃত্তের বাইরে অবস্থান করে আর বেগুনি রঙ ভেতরের দিকে থাকে। বাকি রঙগুলোও একটি নির্দিষ্ট ক্রমানুসারে সাজানো থাকে, তেমনি মানুষের কিছু বৈশিষ্ট্য বাইরের দিকে বা প্রকাশ্যে থাকে আর কিছু অন্তরালে।

মানব বৈশিষ্ট্যের একটি ক্রম আছে রংধনুর রঙগুলোর মতোই। সব সময় এবং পৃথিবীর সর্বত্র রংধনুর রঙ-সজ্জার ক্রমের এদিক সেদিক হয় না। একেবারেই নিয়মতান্ত্রিকতায় বেষ্টিত রঙগুলো। মানুষও কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য দ্বারা এমনভাবে পরিবেষ্টিত থাকে যে, তার চরিত্রকে অন্যভাবে কল্পনা করা যায় না। এজন্য দায়ী তরঙ্গ দৈর্ঘ্য। রংধনুর ক্ষেত্রে প্রতিটি রঙেরই একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গ দৈর্ঘ্য আছে। সাতটি রঙকে তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের ক্রমানুসারে সাজালে এই ক্রমটি পাওয়া যাবে- বেগুনী, নীল, আসমানী, সবুজ, হলুদ, কমলা, লাল। তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের পরিমাণ কম বেশি হলে প্রিজমের মধ্যে তাদের বেঁকে যাবার পরিমাণও কম বেশি হয়। মানে বেঁকে যাবার দিক থেকে সাতটি আলোই আলাদা।

পদার্থবিদ্যার নিয়ম সবখানে সবসময় এক। তাই সবসময় লাল রঙ রংধনুর বৃত্তের বাইরে অবস্থান করে। আর বেগুনী রঙ বৃত্তের ভেতরের দিকে অবস্থান করে। তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ক্রমানুসারে প্রতিবার বিশ্লিষ্ট হয়ে একই ক্রম-রঙের রংধনু সৃষ্টি করে। মানুষও অভিজ্ঞতায়, আচরণে, কাজকর্মে এমনই একটি ক্রম নিজের মধ্যে তৈরি করে ফেলে। ফলে মেজাজ দেখানো লোকটি ইচ্ছা থাকলেও এক সময়ে সর্বসম্মুখে আর স্নেহ দেখাতে পারে না কিংবা দেখালেও অতি সঙ্গোপনে দেখান। এসব সীমাবদ্ধতা ও আচরণগত দাসত্বের কারণে খুব ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও বহুলোক সত্য কথা বলতে পারে না। ভালোবাসার মানুষটিকে ভেতরে ভেতরে গভীরভাবে ভালোবাসলেও সে কথাটি খোলাখুলি জানাতে পারে না।

তবে বৃষ্টি হলে যেমন রংধনু দেখা যায়, তেমনি সঙ্কটে, আবেগে, বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে মানুষের চরিত্রের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা বিচিত্র রঙগুলো দেখতে পাওয়া যায়। তখন একজন মানুষের সবগুলো দিক সামনে চলে আসে। তবে বৃষ্টি হলেই যেমন রংধনু তৈরি হয় না আকাশে, তার জন্য সূর্যের উপস্থিতি থাকা লাগে, তেমনি বিশেষ পরিস্থিতি বা ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ কোনো মানুষের উপস্থিতির দরকার হয় একজন মানুষের সামগ্রিক চরিত্রের পূর্ণতর উন্মোচনের জন্যে।

কাভিনের শেষ কথাগুলো বর্শার মতো বিদ্ধ হয়ে আছে ম্যারির মগজে,

“ভালভাবে রংধনু দেখতে হলে আমাদের অবস্থান এমন হতে হবে যেন সূর্য আমাদের পেছনে আর রংধনু সামনে থাকে। একজন মানুষকে ভালোভাবে দেখতে ও বুঝতে হলে বিভিন্ন পরিস্থিতি ও আরো অনেকে মানুষের প্রয়োজন হবে। তখনই তুলনা করে দেখা যাবে সম্পূর্ণ মানুষটিকে তার নানা বৈশিষ্ট্যের আলোকে। এজন্যই কাছে থাকার মতো দূরে থাকাও জরুরি।”

ম্যারি এসব পুরনো কথা ভেবে শিহরিত হন যে, এমন একজন মানুষ তার জীবনে এসেছিল, যে কাছে থাকলে মনে হয় দূরের আর দূরে থাকলে অনুভব করা যায় অতি কাছের একজনের মতো।

পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার।

আরও পড়ুন: ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-৬

;