কুমিল্লা থেকে ডুয়ার্স: বিস্মৃতপ্রায় ডুয়ার্স গান্ধীর গল্প



ড. রূপ কুমার বর্মণ
কুমিল্লা থেকে ডুয়ার্স: বিশ্মৃতপ্রায় ডুয়ার্স গান্ধীর গল্প

কুমিল্লা থেকে ডুয়ার্স: বিশ্মৃতপ্রায় ডুয়ার্স গান্ধীর গল্প

  • Font increase
  • Font Decrease

উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের প্রথমার্ধে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলির বিরুদ্ধে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির মুক্তিসংগ্রাম আধুনিক বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বহুচর্চিত বিষয়। স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা-আন্দোলণের বহুকৌণিক বিশ্লেষণের পাশাপাশি সমান্তরাল ধারা হিসাবে সৃষ্টি হয়েছে রাজনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত প্রধান নেতৃবর্গকে “আইকন” বানানোর প্রয়াস। এর অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ বিশ শতকের ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের জাতীয় ইতিহাসে “ব্যক্তির ভূমিকা” শ্রেণিকক্ষের পাঠ্যপুস্তকের সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমেরও আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। এর জন্যই আমরা রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩) শুরু করে ‘বঙ্গবন্ধু’ পর্যন্ত আরোও অন্যান্য জাতীয় চরিত্রকে আমাদের দৈনন্দিন আলোচনার বৃত্তে নিয়ে আসি। আর এক্ষেত্রে যার কথা সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় তিনি হলেন “অহিংস আন্দোলনের পূজারি” মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী বা মহাত্মা গান্ধী (১৮৬৯-১৯৪৮)। বস্তুতঃ ‘সত্যাগ্রহ আন্দোলন’ (১৯১৭), ‘অসহযোগ আন্দোলন’ (১৯২০-১৯২২),  ‘আইন-অমান্য আন্দোলন’ (১৯৩০-৩২) ও ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলনের’ (১৯৪২-১৯৪৪) মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছিলেন গণ-আন্দোলনের প্রতীক। তাঁর নেতৃত্ব ও সকলকে একত্রিত করে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন করার পদ্ধতি তৎকালীন ভারতকে (১৯২০-১৯৪৮) এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর মতো সংগ্রামী নেতা-নেত্রীদের তুলনার ক্ষেত্রে গান্ধীই হয়ে উঠেছিলেন Point of Reference। ফলে ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ তিন দশকে ভারতীয় উপমহাদেশ হয়ে উঠেছিল ‘বহু গান্ধীর দেশ’। স্বাভাবিকভাবেই “সীমান্ত গান্ধী” (খাঁন আব্দুল গফফর খাঁন: ১৮৯০-১৯৮৮), মেদিনীপুরের “গান্ধী বুড়ি” (মাতঙ্গিনী হাজরা : ১৮৭০-১৯৪২), “উড়িষ্যা গান্ধী” (গোপবন্ধু দাস : ১৮৭৭-১৯২৮) বা “বিহারি গান্ধীর” (রাজেন্দ্র প্রাসাদ: ১৮৮৪-১৯৬৩) মতো আর অনেক স্থানীয় গান্ধীই স্থান পেয়েছেন ইতিহাসের পাতায়। তবে অনেক গান্ধীই রয়ে গেছেন ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তকের বাইরে। কেউবা আবার হারিয়ে গেছেন স্মৃতির অতল গহ্বরে। এরকমই একজন প্রায় বিস্মৃত গান্ধী ছিলেন “ডুয়ার্স গান্ধী” বা নলিনীমোহন পাকরাশী (১৮৯৪-১৯৭৬)।

নলিনীমোহন পাকরাশীর (ভট্টাচার্য) জন্ম ১৮৯৪ সালে ব্রিটিশ-শাসিত অবিভক্ত বাংলার কুমিল্লা (তিপ্রা/ত্রিপুরা) জেলায়। বহু পণ্ডিত ও সংগ্রামীর জন্মস্থান বাংলার অন্যতম সংস্কৃতিবান এই জেলার গুরুত্বপূর্ণ মহকুমা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থানা এলাকায় ছিল তাঁর পৈত্রিক বাড়ি। মিথিলা থেকে ‘ন্যায়রত্ন’ উপাধিপ্রাপ্ত তাঁর পিতা নবীনচন্দ্রের যখন মৃত্যু হয় (১৯০৪ সালে) তখন নলিনীমোহনের বয়স তখন মাত্র ১১ বছর। স্বাধীনচেতা নলিনীমোহন বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের (১৯০৫) সময় থেকেই জাতীয়তাবাদী কার্যকলাপের প্রতি আকৃষ্ট হন। তাঁর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ও পারিবারিক দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে নলিনীমোহনকে পাঠানো হয় ময়মনসিংহে। জমিদার, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম পীঠস্থান ময়মনসিংহে এসে নলিনীমোহন জড়িয়ে পড়লেন যুগান্তর দলের সঙ্গে। যুগান্তর দলের সুরেন্দ্র মোহন ঘোষের [১৮৯৩-১৯৭৬) সান্নিধ্যে এসে তিনি ঔপনিবেশিক শক্তির বিরোধিতার মনোভাবকে আরও শক্তিশালী করেন। কিন্তু পারিবারিক পরিস্থিতির চাপে নলিনীমোহনকে চলে আসতে হয় রংপুরে। এখানে উচু বেতনে কাজ নেন এক ঠিকাদারি সংস্থায়। তাঁর তত্বাবধানে তৈরি হয় রংপুরের কারমাইকেল কলেজের [Carmichael College (1916)] বাড়ি।

স্বাধীন রাজনৈতিক চিন্তা ও বহু মানুষকে একত্রিতভাবে কাজ করানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে নলিনীমোহন ডুয়ার্স অঞ্চলে আসেন ১৯২১ সালে। ততদিন ডুয়ার্সের রাজাভাতখাওয়ায় গড়ে উঠেছে জঙ্গলের কাঠ বিক্রির Auction Centre। বাবু রামরূপ সিংহের অধীনে ১৫০ টাকার বেতনে চাকরি নিয়ে ১৯২৯ থেকে নলিনীমোহন পাকাপাকিভাবে আলিপুরদুয়ারে বসবাস শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে ডুয়ার্স অঞ্চলের জাতীয় আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে ভূটান থেকে অধিকৃত ডুয়ার্সকে নিয়ে ১৯৬৯ সালে গঠিত হয় জলপাইগুড়ি জেলা। জলপাইগুড়ি মহকুমার সঙ্গে আলিপুরদুয়ার মহকুমার বক্সা, ফালাকাটা, আলিপুরদুয়ার, কুমারগ্রাম, শামুকতলা, মহাকালগুড়ি, কামাখ্যাগুড়ি ও অন্যান্য অঞ্চলেও নতুন ধরনের ভুমি বন্দোবস্ত শুরু হয়। শুরু হয় কৃষিজমি, নদী, ঘাট ও হাট থেকে খাজনা আদায়ের নতুন প্রথা।

পাশাপাশি ইংল্যান্ডের “শিল্পায়নজনিত উদ্বৃত্ত মুলধনের” বিনিয়োগ করার জন্য আসাম ও ডুয়ার্স হয়ে ওঠে চা-বাগিচার বিকাশের কেন্দ্রবিন্দু। ডুয়ার্স রূপান্তরিত হয় “ঔপনিবেশিক শক্তির বাগানে” (Garden of the Empire)। আলিপুরদুয়ার মহকুমার ভুটান ঘেঁষা অঞ্চলে দেশীয় ও ইউরোপীয় উদ্যোগীদের প্রচেষ্টায় স্থাপিত বেশ কিছু চা-বাগান। কালচিনি, হ্যামিলটনগঞ্জ, মাদারিহাট, রাজাভাতখাওয়া, কার্তিক, রায়ডাক, তুরিতুরি ও কুমারগ্রামের চা-বাগানগুলি ভরে ওঠে আদিবাসী শ্রমিক ও বাঙালি ‘বাবুদের’ ভিড়ে।

চা-বাগান অর্থনীতি, কাঠ ও প্রশাসনিক কারনে জলপাইগুড়ি হয়ে ওঠে এক গুরুত্বপূর্ণ জেলা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, চা-নিলাম কেন্দ্র, আদালত, নগরায়ন ও ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার কেন্দ্ররূপে বিশ শতকের প্রথমার্ধে জলপাইগুড়ি শহর পরিণত হয় তার  প্রাণকেন্দ্রে। রাজনৈতিক চেতনা ও শিক্ষা-সংস্কৃতির মূল ধারক হয়ে ওঠে জলপাইগুড়ি শহরের পাশ্চত্য শিক্ষায় আলোকিত আইনজীবী ও তাদের সহযোগী শ্রেণি। খুব সংগত কারণেই ডুয়ার্সের চা-বাগানের শ্রমিক ও “উৎপাদনের প্রাথমিক ক্ষেত্রে নিযুক্ত” স্থানীয় জাতি-জনজাতি সম্প্রদায়গুলি থেকে যায় জলপাইগুড়ির “অভিজাত- নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ক্ষমতার বৃত্তের” বাইরে।

অন্যদিকে, জলপাইগুড়ি শহর থেকে অনেক দূরে অবস্থিত আলিপুরদুয়ার মহকুমা শহর ছিল অপেক্ষাকৃত অনুন্নত। গুটিকয় হাইস্কুল গড়ে উঠলেও এই শহরে ছিল না কোন কলেজ। পাশ্ববর্তী গ্রামগুলির অবস্থা ছিল আরও শোচনীয়। বিশ শতকের গোড়ায় মিশনারিদের চেষ্টায় বেশ কিছু প্রাইমারি ও মিডল ইংলিশ স্কুল গড়ে উঠলেও কুমারগ্রাম, মহাকালগুড়ি, কামাখ্যাগুড়ি, শামুকতলা, ফালাকাটা, মাদারহাটি ও বীরপাড়ার স্থানীয় মানুষেরা উচ্চশিক্ষায় সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। তাঁদের পক্ষে এলিট-রাজনীতির কেন্দ্রে প্রবেশ করা বা রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া ছিল একেবারেই অসম্ভব।

বিশ শতকের গোড়ার দিকের আলিপুরদুয়ারের এরকম পরিস্থিতিতে ১৯২১ এ নলিনীমোহন আলিপুরদুয়ারে এসে দেখলেন যে এখানে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ(১৮৮৩), কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজ (১৮৯৯)  বা রংপুরের কারমাইকেল কলেজের মতো কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। নেই পূর্ববাংলার জমিদার শ্রেণির কৃষক শোষণ। এমনকি পূর্ববাংলার মতো রাজনীতি চেতনাও নেই। তবে এখানে আছে অন্য ধরনের শাসন ও শোষণ। শাসিতের হয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার মানুষের বড় অভাব। জলপাইগুড়ির এলিট নেতৃবর্গের ডুয়ার্সের সাধারণ মানুষের সমস্যা নিয়ে চিন্তাভাবনা করার মতো মানসিকতাই ছিলোনা। এরকম পরিস্থিতিতে নলিনীমোহন চুপ থাকতে পাড়েননি। মাসিক ১৫০ টাকা বেতনের কাজ ছেড়ে নলিনীমোহন ঝাঁপিয়ে পড়লেন জনগণকে সংগঠিত করার কাজে। নিজেকে উৎসর্গ করলেন ডুয়ার্সের সাধারণ মানুষকে নেতৃত্ব  দেওয়ার জন্য। তাঁর নেতৃত্বে শামুকতলার শুক্রবারের হাটে সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলন (১৯২৯) ও ফালাকাটায় আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩০) তাঁকে ডুয়ার্সের রাজনৈতিক মহলে পরিচিত করে তোলে। কুমারগ্রামদুয়ার থেকে মাদারিহাট, ভলকা থেকে ফালাকাটা---ডুয়ার্সের সবত্রই নলিনীমোহন হয়ে ওঠেন “নলিনী ঠাকুর”। কুমারগ্রামদুয়ার, আলিপুরদুয়ার, ফালাকাটা ও মাদারিহাটের অন্যান্য কৃষক সম্প্রদায়ের ব্রিটিশ-বিরোধী মনোভাবকে সংগঠিত করেন নলিনীমোহন।

ভারত শাসন আইন (The Government of India Act, 1935) গৃহিত হওয়ার পরে ১৯৩৭ এর বিধানসভার নির্বাচনে ডুয়ার্সের নির্বাচনী রাজনীতিতে ভাগ বসানোর জন্য এগিয়ে আসেন জলপাইগুড়ির এলিট-রাজনীতিকগন। প্রসন্নদেব রায়কত, খগেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত (১৮৯৮-১৯৮৫) ও উপেন্দ্রনাথ বর্মন (১৮৯৮-১৯৮৮) জলপাইগুড়ি থেকে বাংলার বিধানসভায় প্রবেশ করেন। জলপাইগুড়ি-শিলিগুড়ি বিধানসভা ক্ষেত্রের তপশিলিজাতির প্রতিনিধি উপেন্দ্রনাথ ফজলুল হকের দ্বিতীয় মন্ত্রীসভার (১৯৪১-৪৩) মন্ত্রী হয়ে ডুয়ার্স অঞ্চলের কৃষকদের খাজনা কমানোর আর্জি জানিয়েছিলেন বিধানসভায়। কিন্তু এটা বাস্তবায়িত হয়নি। ডুয়ার্স অঞ্চলের মাটি পূর্ববাংলা বা দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলির মতো এতোটা উর্বর ছিল না। ফলে এখানকার জোত জমির কৃষকদের পক্ষে ভূমি রাজস্বের হার হয়ে উঠেছিল একটা বড় বোঝা। কৃষকদের মনে দানা বাঁধতে শুরু করেছিল খাজনা না দেওয়ার প্রবণতা।  “No Rent” বা খাজনার বন্ধের আন্দোলন কুমারগ্রামদুয়ার এলাকায় প্রখর রূপ ধারন করেছিল নলিনীমোহনের নেতৃত্বে। কুমারগ্রামের জোতদার মঘা দেওয়ানী বা মদন সিং বরুয়ার মতো কংগ্রেসি কৃষকেরা খাজনা বন্ধের আন্দোলনকে গণ-আন্দোলনে রূপান্তরিত করেছিলেন। খাজনা বন্ধের প্রভাব পড়েছিল কুমারগ্রামের কুলকুলি, দলদলি ও শামুকতলার হাটেও।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন (১৯৩৯-১৯৪৫) ভারতের রাজনীতির জটিল পরিস্থিতিতে ১৯৪২ এর ৮ই আগস্ট জাতীয় কংগ্রেসের “ভারত ছাড়ো” (Quite India) আন্দোলনের ডাক দেয়। “করেঙ্গে-ইয়ে-মরেঙ্গে” ধ্বনিতে ভেসে ওঠে ভারতের আকাশ বাতাস। ৯ই আগস্ট গান্ধীজী সহ জাতীয় কংগ্রেসের কেন্দ্রিয় নেতৃবর্গকে গ্রেফতার করা হয়। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অভাবে স্থানীয় কংগ্রেসী নেতৃবর্গ তাঁদের নিজস্ব মত ও কর্মপন্থানুযায়ী ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতায় মেতে উঠেন। ব্রিটিশ শাসনের প্রতীক (বিশেষত রেললাইন, টেলিগ্রাফ, পোস্ট অফিস ও যোগাযোগ ব্যবস্থা) সমূহের উৎপাটনে মেতে উঠে উন্মত্ত জনতা। ডুয়ার্সের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলেও তাঁর প্রভাব অনুভূত হল। নলিনীমোহনের নেতৃত্বে কুমারগ্রাম থানা আক্রমন করে টেলিগ্রাম লাইন কেটে দিয়ে কাঠের তৈরি সেতুগুলির পাটাতন উপরে দিয়ে কুমারগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করেছিলেন এখানকার স্থানীয় জনগণ। ‘তারকাটা আন্দোলন’ নামে পরিচিত এই গন-আন্দোলনের পর নলিনীমোহন ডুয়ার্সের সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত হলেন “ডুয়ার্স গান্ধী” নামে।

ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ইতিহাসের পরবর্তী পর্যায় আমাদের সকলেই জানা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর ভারতের রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের আলাপ-আলোচনার ফলস্বরূপ বিভিন্ন পরিকল্পনা গৃহিত হয়। ১৯৪৬ এর নির্বাচনের পর ভারতে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে গঠিত হয় ভারতের সংবিধান সভা (The Constituent Assembly)। ১৯৪৭ এর আগষ্ট মাসে ব্রিটিশ-ভারত দ্বিখন্ডিত হয়ে জন্ম নেয় ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটি জাতিরাষ্ট্র (Nation State)। পশ্চিম বাংলার অন্যান্য জেলার মতো জলপাইগুড়িও ভরে যায় পূর্ববঙ্গীয় উদ্বাস্তুদের ভিড়ে। পূর্ববাংলার ময়মনসিংহ, পাবনা ও রংপুর থেকে উৎখ্যাত মানুষের ভিড়ে দ্রুত পাল্টে যায় ডুয়ার্সের জনবৈচিত্র। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ডুয়ার্সের জনগণ নলিনীমোহনকে ভুলতে শুরু করেন। পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শংকর রায় (১৯৭২-১৯৭৭) কোচবিহারে এসে নলিনীমোহনকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেও বা তাঁকে ‘স্বাধীনতা সংগ্রামীর’ পদক দিয়ে ভারত সরকার সম্মানিত করলেও পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্টের শাসনকালে (১৯৭৭-২০১১) নলিনীমোহনের মতো ‘ডুয়ার্স গান্ধী’ চলে যান বিস্মৃতির অন্তরালে।

লক্ষ্য করার বিষয় হল জাতিয়তাবাদী দৃষ্টিতে লেখা পাঠ্যপুস্তকে ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিবাচক সুযোগ থেকে বঞ্চিত ও ঔপনিবেশিক শাসনের দ্বারা সরাসরি শোষিত ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চল, কৃষক, আদিবাসী, শ্রমিক ও অন্যান্য প্রান্তিক মানুষেরা গুরুত্ত্ব পান নি। মার্ক্সবাদী ও নিম্নবর্গীয় ঐতিহাসিকেরা কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলনকে ইতিহাসের আলোচনায় স্থান দিলেও তাঁরা ডুয়ার্স অঞ্চলের ঔপনিবেশিক শক্তির বিরোধিতার আন্দোলন বা নলিনীমোহনের মতো নিস্বার্থ দেশসেবকের অবদানকে স্বীকৃতি দেননি। তবে ঔপনিবেশিক শাসন-সৃষ্ট আধুনিক শিক্ষা, মুদ্রনযন্ত্র, সংবাদ পত্র ও সাহিত্যের দ্বারা প্রভাবহীন ডুয়ার্সের সাধারণ মানুষের ঔপনিবেশিক শক্তির বিরোধিতাকে অনুভব করতে হলে ‘কুমিল্লা থেকে আসা নলিনীমোহনের ডুয়ার্স গান্ধী হয়ে ওঠাকে’ স্মরণ করতে হবে ।

ড. রূপ কুমার বর্মণ, কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আম্বেদকর চর্চা কেন্দ্রের সমন্বয়ক

একুশে গ্রন্থমেলায় অঞ্জন আচার্যের গল্পগ্রন্থ ‘বাতাসের তলোয়ার’



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

অমর একুশে গ্রন্থমেলা উপলক্ষে প্রকাশিত হলো কবি ও গল্পকার অঞ্জন আচার্যের তৃতীয় গল্পগ্রন্থ ‘বাতাসের তলোয়ার’।

বইটি প্রকাশ করেছে বিদ্যাপ্রকাশ। ধ্রুব এষের প্রচ্ছদে বইটির মূল্য রাখা হয়েছে ২০০ টাকা।

এরআগে ২০১৭ সালে ‘দেশ পাবলিকেশন্স’ থেকে লেখকের প্রথম গল্পের বই ‘ঊনমানুষের গল্প’ এবং ২০২২ সালে ‘বিদ্যাপ্রকাশ’ থেকে দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘চক্রব্যূহ’ প্রকাশিত হয়, যা ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পায়।

বিদ্যাপ্রকাশের প্রকাশক মজিবর রহমান খোকা বলেন, “অঞ্জন আচার্য এ সময়ের একজন প্রতিশ্রুতিশীল লেখক। তার লেখা বরাবরই নিরীক্ষামূলক ও ভিন্নধর্মী। কোনো সস্তা চটকদার জনপ্রিয়তার পেছনে ছোটা মানুষ তিনি নন। অঞ্জন হলেন লম্বা রেসের ঘোড়া। সমহিমায় সাহিত্য অঙ্গনে দীর্ঘ দিন থাকতে এসেছেন তিনি। সমকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক যাবতীয় প্রাসঙ্গিক অসঙ্গতি অঞ্জনের লেখায় শৈল্পিকভাবে ফুটে ওঠে। এ বইয়ের গল্পগুলোতেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি।”

বইয়ের বিষয়বস্তু সম্পর্কে অঞ্জন আচার্য বলেন, “প্রতিটি জীবনই আলাদা! আঙুলের ছাপের মতো আলাদা। তবুও মিলে যায় অন্য কারো সঙ্গে। যেভাবে মিল থাকে অচেনা কারো চেহারার আদলে। তবে যার যার মতো অন্যরকম। সাদা পাতায় সবাই কষে যায় নিজের জীবনের নকশার অঙ্ক। ফলাফল কখনো মেলে, কখনো-বা থাকে অসমাপ্ত। বইয়ের গল্পগুলোও তেমনই। রিপুতাড়িত মানুষের জীবনের রসায়ন-আখ্যান। তারই সমীকরণ মেলানোর প্রাণান্ত চেষ্টা। তারপরেও কোথাও নিষ্পত্তি নেই। তাই বলে সব গল্পই কি অমীমাংসিত? না, সেটাও নয়। সমাপ্তি-দাঁড়ির পর বাকিটুকু টেনে নেবেন পাঠকেরা। হয়তো ‘কোথাও মায়া রহিয়া গেল’।”

অঞ্জন আচার্য আরও বলেন, “বইটিতে অন্তর্ভুক্ত ১৫টি গল্পের প্রতিটি চরিত্র ও ঘটনাই কাল্পনিক। কোনো দেশের কোনো মানুষের বা বাস্তব কোনো ঘটনার সঙ্গে যদি এর মিল খুঁজে পাওয়া যায়, সেটা নিতান্তই কাকতালীয়।”

‘বাতাসের তলোয়ার’ বইটি পাওয়া যাচ্ছে বইমেলায় বিদ্যাপ্রকাশের স্টলে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, স্টল নং: ৩০৭—৩১০), বাংলাবাজারের বিদ্যাপ্রকাশের নিজস্ব শো-রুমে এবং অনলাইন বুকশপগুলোতে।

অঞ্জন আচার্যের এ পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৫টি। এর মধ্যে কাব্যগ্রন্থ ৫টি: জলের উপর জলছাপ (শুদ্ধস্বর), আবছায়া আলো-অন্ধকারময় নীল (বিজয় প্রকাশ), তুমুল কোলাহলে কুড়াই নৈঃশব্দ্য (অনুপ্রাণন প্রকাশন), নামহীন মৃত্যুর শিরোনাম (অনুপ্রাণন প্রকাশন), স্বপ্নের চোখে ঘুম (বেহুলাবাংলা)।

গল্পগ্রন্থ ৩টি: ঊনমানুষের গল্প (দেশ পাবলিকেশন্স), চক্রব্যূহ (বিদ্যাপ্রকাশ), বাতাসের তলোয়ার (বিদ্যাপ্রকাশ)। গবেষণা-প্রবন্ধ গ্রন্থ ১টি: রবীন্দ্রনাথ : জীবনে মৃত্যুর ছায়া (মূর্ধন্য)। গবেষণাগ্রন্থটি সংশোধিত ও পরিমার্জিতরূপে পশ্চিমবঙ্গের আত্মজা পাবলিশার্স প্রকাশ করে ‘রবির জীবনে মৃত্যুশোক’ নামে।

জীবনীগ্রন্থ ২টি: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (কথাপ্রকাশ), একই বই আত্মজা পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হয় ‘আমি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়’ নামে, আমিই অ্যালবার্ট আইনস্টাইন (উৎস প্রকাশন)। প্রবন্ধগ্রন্থ ১টি: কথাপ্রসঙ্গে যৎসামান্য (অগ্রদূত অ্যান্ড কোম্পানি)। এছাড়া দুই বাংলার লেখক-প্রকাশক-সম্পাদক-চিত্রশিল্পীদের একটি ডিরেক্টরি সম্পাদনা করেন ‘সংযোগ-সূত্র’ (দ্যু প্রকাশন) নামে।

সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ এখন পর্যন্ত অঞ্জন আচার্য পেয়েছেন ‘শতকথার শতগল্প সেরা লেখক ২০১৮’, ‘অনুপ্রাণন লেখক সম্মাননা ২০২২’, ‘বামিহাল তরুণ লেখক সাহিত্য পুরস্কার ২০২২’, ‘ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিল (ডিএসইসি) লেখক সম্মাননা ২০২২’।

;

এবার বইমেলায় ফারজানা করিমের নতুন বই



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
এবার বইমেলায় ফারজানা করিমের নতুন বই

এবার বইমেলায় ফারজানা করিমের নতুন বই

  • Font increase
  • Font Decrease

ফারজানা করিম। পেশাগত জীবনে তিনি বহুদিন ধরেই সংবাদ উপস্থাপনা করছে। পেশাগত জীবনের পাশাপাশি সংস্কৃতির বহুমাত্রিকতার সঙ্গে জড়িত ফারজানা করিম। লিখেছেন শতাধিক কবিতা। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পাখি পৃথিবী'।

প্রকাশের পর ব্যাপক সাড়া পান তিনি। জলকণা , না বলা কথা, মী , শূন্যতা , ভালোবাসার আড়ালে, জলে ভাসা পদ্য , শেষ বিকেলের আলো, দূরে কোথাওসহ বেশকিছু গ্রন্থ প্রকাশ হয় তার। এবারের বইমেলাতেও শোভা পাবে তাঁর নতুন এক গ্রন্থ। নাম- বিচ্ছিন্ন কবিতারা। আসছে তাম্রলিপি প্রকাশনী থেকে,২১ নম্বর প্যাভিলিয়ন। পাওয়া যাবে ১০ তারিখ থেকে।

গতকাল ফেসবুকের এক পোস্টে ফারজানা করিম লিখেন, এবারে কাজের ভিড়ে আমার কবিতাগুলো বেশ কষ্ট পেয়েছে। ওদের শরীরে হাত দিয়েছি , ওদের ঠিকঠাক গড়ে নিয়েছি বেশ কষ্ট করে। আচ্ছা ওরা তো আমার সন্তান। ওদের কে কি আমি মানুষের ভালোবাসার পাত্র করে গড়ে তুলতে পারলাম শেষ পর্যন্ত? ছেড়ে দিলাম আমার প্রিয় পাঠকদের জন্য। তাঁরাই আলোচনা সমালোচনা করে নাহয় ঠিক করে নেবেন। বিচ্ছিন্ন কবিতারা আপনাদের ছোঁয়ার অপেক্ষায় প্রিয় পাঠক। দেখা হবে বইমেলায় যদি বেঁচে থাকি।

উল্লেখ্য, ফারজানা করিমের জন্ম ১৩ জুলাই চট্টগ্রামে। বেড়ে ওঠা এবং পড়ালেখা সবই চট্টগ্রামে। পড়ালেখা শেষ করেছেন ইংরেজি সাহিত্য এবং ফিল্ম এন্ড মিডিয়া থেকে। ২০০৩ সাল থেকে এখন অবধি সংবাদ পাঠক হিসেবে কাজ করছেন।

;

হাসান হাফিজের কবিতাগুচ্ছ



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

অমর একুশে তুমি আত্মপরিচয়

তুমি এক অগ্নিক্ষরা ইতিহাস আবেগের দিন
নক্ষত্রস্পর্ধায় তুমি জ্বলজ্বলে উদার আকাশ
তুমি শুধু বাঙালিরই নও, এই ঋদ্ধি রক্তঋণ
মাতৃভাষা ভালোবাসা স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণের প্রকাশ
আজ তুমি বিশ্বমানবের, গোটা বিশ্বসভ্যতার
তারুণ্যের দুঃসাহসে অহঙ্কৃত প্রাণ বলিদান
একুশে তোমার পুণ্য শাশ্বত সুরেলা গান
নয় মাত্র বাঙালির সম্পত্তি ও ঐতিহ্য একার-
ব্রহ্মা-ের কোন্ দূরে প্রান্তদেশ সিয়েরা লিওনে
রাষ্ট্রভাষা হয়েছো তুমিও ছন্দে নূপুরে নিক্কণে
বাংলাভাষা তোমার ধ্রুপদী লয় সুছন্দিত তান
নতুন সংস্কৃতিগর্ব বহুমূল্য জাগৃতি ও জয়গান
অক্ষয় অপরাজেয় উপেক্ষিত ভাষার সম্মান
আন্দোলনে অভ্যুদয়ে মুক্তিযুদ্ধে স্বয়ম্ভু সোপান
দোতারা শাপলা ফুল দোয়েলের চঞ্চলতা শিস
বাঘের হুঙ্কারে দর্পী স্বৈরাচার ভয়ে নিরুদ্দিশ।

একুশ প্রকৃত অর্থে মুক্তছন্দা বহতা নদীর নাম
এই সত্য বিশ্ববুকে আমরাই এঁকে রাখলাম।
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষা যতো পায় যেন সপ্রীতি লালন
বিকাশেরও সমান সুযোগ শ্রদ্ধা স্থিতি সংরক্ষণ
একুশে অমূল্য এক পাথেয় প্রেরণা উৎসভূমি
আত্মপরিচয় পেতে দুর্বিনীত বিদ্রোহও তুমি॥

পোড়ানো ও নিমজ্জন

ভুল করে ভালোবাসলে
দণ্ড ও লাঞ্ছনা
প্রাপ্য হবে, হোক।
তোমাকে পুড়িয়ে দিক
আমার দু’চোখ।
নদী যদি হতে পারো
ডুবে মরবো আনন্দেই-
সুতরাং নদী হতে
কোনো বাধা বিপত্তি তো নেই!

মেরুদণ্ড

হাতড়ে দেখি, নেই।
আমারও নেই, তোমারও নেই,
রাজ্যব্যাপী কারোরই নেই।
কোথায় গেল? কোথায় গেল
রিমান্ড চেয়ে তলব করো,
ফায়দা যে কী, তাও বুঝি না।

তত্ত্ব তালাশ করতে গিয়ে
হদ্দ বেকুব বনছি রে ভাই
এই শরমের শুমার যে নাই
কোন্ বনে যাই দুঃখ শুকাই
লজ্জা পেয়ে কোন্ঠে লুকাই
ক্ষতস্থানের নাই প্রশমন
বুঝলি সোনা ও পোড়া মন
ধুঁকছি জাড়ে শীতকামড়ে
কিন্তু আগুন? কোথায় মেলে?
ছুটছি আশার স্বপ্ন ফেলে
নাহ কিছু নাই বুঝলি রে ভাই
ফায়দা তোলার মওকাও নাই
হাতড়ে দেখি সাঁতরে দেখি
আজব কাণ্ড হচ্ছে এ কি
ভীরুতার স্বগত সংলাপ

ভয় পাই নিজেকেই।
কীভাবে যে মুখোমুখি হবো!
কতো পাপ প্রস্তরের ঋণ
জমা হয়ে আছে।
এই কষ্ট বলি কার কাছে?
নিজের ভুবনই ক্রমে
অনাত্মীয় অচেনা হয়েছে
এই দ্বন্দ্ব সংশয়ের কাঁটা
মনে ও মগজে বেঁধে
নীরবে ঝরায় রক্ত
শক্ত কোনো প্রতিরোধ
গড়বার সামর্থ্য যে নেই
নিঃস্বতার সঙ্গে বসবাস
করে করে বাকি আয়ু
শেষ হবে হোক!

আকুল আর্তি

রঙধনু রঙ
যায় মিলিয়ে
তোমার স্মৃতি
জাগনা থাকে
মিলায় না সে
খুঁড়তে থাকে
ছুঁড়তে থাকে
পাথর নুড়ি
ভুলবো তোমায়?
কেমন করে
নাই যে তেমন
হ্যাডম কিংবা সিনাজুরি!

রঙধনু রঙ
হবেই ফিকে
তোমার ছোঁড়া
তীর নিশানা
আসবে ফিরে
আমার দিকে,
এফোঁড় ওফোঁড়
হলেম যদি
কার কি কিছু
যায় বা আসে?
দিন রজনী
কাঁপছে ত্রাসে
চাইছে যেতে
বনের বাসে
কিন্তু সাহস
হচ্ছে না তার
তোমার বিজয়
অঙ্কিত রয়
সাঁঝ সকালের
দূর্বাঘাসে

রঙধনু গো
তোমার সঙ্গী
করবে আমায়
এ পোড়ামুখ
কোথায় রাখি?
আঁধার নেমে
এই চরাচর
সন্ধ্যাতারায়
বিষণœ স্বর
কোথায় পাখি
কোথায় পালক
যাচ্ছে বেড়ে
দহন ও ধক্
ও রঙধনু
তোমার মতোন
হতেম যদি
স্মৃতির ছোবল
এড়িয়ে যাবার
সুযোগ হতো
দিন প্রতিদিন
মরার কষ্ট
আর হতো না!

চরাচরে প্রশ্নই প্রবল

বসন্ত আসবে বলে
অপেক্ষায় ছিলে তুমি
শীতকাল বড়ো বেশি প্রলম্বিত
সব গাছ রুক্ষ শীর্ণ
ঝরাপাতা ধুলোর সংসারে
অপেক্ষার বন্দিশে বেজেছে
বিচ্ছেদী বেহাগ...
কোনোদিন উঠবে না রোদ?
গাছ কবে ফিরে পাবে পাতা
প্রতীক্ষার পালা হবে শেষ
আয়ু সলতে নিভে নিভে যায়
গাঙপাড়ে স্তব্ধতার এলানো চাদর
নৌকা আছে মাঝি নাই
ওম খুঁজছে তালি তাপ্পি সংবলিত
গরিবি কাঁথায়
পারাপার কবে শুরু ফের?
এ প্রশ্নের বিশদ উত্তর
ধরাধামে কারো জানা নেই
---

;

একুশের বইমেলায় সিইসি'র বই স্টুডেন্ট ওয়েজে



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
একুশের বইমেলায় সিইসি'র বই স্টুডেন্ট ওয়েজ প্যাভিলয়নে।

একুশের বইমেলায় সিইসি'র বই স্টুডেন্ট ওয়েজ প্যাভিলয়নে।

  • Font increase
  • Font Decrease

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের শুরু থেকেই প্রশাসন বা আমলাতন্ত্রের সদস্যগণ জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে মৌলিক ও সৃজনশীল লেখালেখিতে লিপ্ত রয়েছেন। অনেকের লেখা কালজয়ী সাহিত্যের অংশেও পরিণত হয়েছে। বিশেষত, তাদের স্মৃতি, বিশ্লেষণ, তথ্য ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের স্বচ্ছ ও সচল ধারাভাষ্য রূপে গৃহীত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে এমন বইয়ের সংখ্যা কম নয়, যা পাঠকপ্রিয়তা ও বৈশিষ্ট্যময়তায় মৌলিক সম্পদ রূপে বিবেচিত।

কাজী হাবিবুল আউয়াল (জন্ম: ২১ জানুয়ারি ১৯৫৬) বাংলাদেশের ত্রয়োদশ প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এবং সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব। পেশাগত জীবনের গুরু দায়িত্ব সামাল দিয়েও তিনি রচনা করেছেন বেশ কয়েকটি গ্রন্থ।

কাজী হাবিবুল আউয়ালের প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে 'জীবন পাতার জলছাপ' (আত্ম-চরিত), 'ট্রাজেকটরি অব এ জুডিশিয়াল অফিসার' এবং 'মেমোরিজ অফ আরলি লাইফ'। এবারের একুশের বইমেলায় অভিজাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান 'স্টুডেন্ট ওয়েজ' কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে জীবনস্মৃতি ভিত্তিক গ্রন্থ 'জীবন খাতার কয়েক পাতা'।

কাজী হাবিবুল আউয়াল ১৯৫৬ সালের ২১ জানুয়ারি পিতার কর্মস্থল কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈত্রিক নিবাস চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপের সারিকাইত ইউনিয়নের সারিকাইত গ্রামে। তার পিতা কাজী আবদুল আউয়াল কারা উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন্স) ও জেলখানায় জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলার বাদী ছিলেন। তার মাতা বেগম নাফিসা খাতুন।

১৯৭২ সালে খুলনার সেন্ট জোসেফ’স হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৭৪ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৬ সালে এল এল.বি (অনার্স) ও ১৯৭৮ সালে এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন। বাংলাদেশ বার কাউন্সিল থেকে সনদ পান ১৯৮০ সালে এবং সে বছর ঢাকা জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হন।
কাজী হাবিবুল আউয়াল বিসিএস ১৯৮১ ব্যাচের বিচার ক্যাডারে যোগদান করেন। কর্মজীবন শুরু করেন উপজেলা মুন্সেফ হিসেবে। তিনি প্রেষণে সহকারী সচিব ও উপ সচিব হিসেবে আইন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন।

১৯৯৭ সালে তিনি জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে পদোন্নতি পান। ২০০০ সালে তিনি আইন মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি ২০০৪ সালে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। ২০০৭ সালের ২৮ জুন তিনি আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে পদোন্নতি পান। সেখান থেকে তাকে রাষ্ট্রপতির ১০ শতাংশ কোটায় ২০০৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত আইন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের পর ২০১০ সালের ২৪ এপ্রিল তাকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব করা হয়। পরে ২০১৪ সালের ১৮ জুন তার চাকরির মেয়াদ এক বছর বাড়ায় সরকার।

২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) যাওয়ার কথা ছিল হাবিবুল আউয়ালের। কিন্তু ২০১৫ সালের ২১ জানুয়ারি পিআরএল বাতিল করে তাকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেয় সরকার। পরে সেই চুক্তির মেয়াদ আরো এক বছর বাড়ানো হয়। তিনি ২০১৭ সালে জ্যেষ্ঠ সচিব হিসেবে অবসরগ্রহণ করেন। সরকারি চাকরি থেকে পরিপূর্ণ অবসরে যাওয়ার পর তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন।

বর্তমানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শহরের পরিবেশে জন্ম ও বেড়ে উঠলেও পৈত্রিক জনপদ বিচ্ছিন্ন দ্বীপ সন্দ্বীপের গ্রামীণ জীবন ও পরিবেশকে বিস্মৃত হন নি। গ্রন্থে তিনি বিগত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে নগরজীবন আর গ্রামীণ বাস্তবতাকে উপস্থাপন করেছেন।

প্রকাশক মাশফিকউল্লাহ তন্ময় বার্তা২৪.কমকে জানান, পিতার সরকারি চাকরির বদলিজনিত কারণে লেখক দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে শৈশব ও কৈশোর কাটিয়েছেন। বইতে তিনি পরিবার ও নিকটজনদের পরিচয় দিয়েছেন। পাশাপাশি শৈশব ও কৈশোরে দেখা সমাজ, পারির্পাশ্বিকতা, অভাব, দারিদ্র এবং প্রার্চুযহীন অবিলাসী, নিরাভরণ, সাধারণ ও সরল জীবনাচরণের চিত্র তুলে ধরেছেন। শিকড়ের টানে তিনি পিতৃপুরুষদের জন্মস্থান সন্দ্বীপের গ্রামের বাড়িতে একাধিকবার বেড়াতে গেছেন এবং গ্রামের বাড়ি, গ্রাম ও সন্দ্বীপের বিবিধ বিবরণ তুলে ধরেছেন গভীর মমতায়। তিনি নিজের দেখা ইতিহাসের উপজীব্য রাজনীতির বির্বতন এবং বাংলাদেশের স্বাধীকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেছেন বস্তুনিষ্ঠ ও উপভোগ্য ভাষায়।

লেখক স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠিদের কথা বলতে গিয়ে সমকালীন নগরজীবন, পারির্পাশ্বিকতা ও অনেক ঘটনার রসালো বিবরণ দিয়েছেন, যা পাঠকের বিনোদনের খোরাক হতে পারে।

প্রকাশক আরও জানান, এটি লেখকের আত্মজীবনী নয়, শৈশব ও কৈশোরের খানিকটা স্মৃতিচারণ। নিজ জীবনের বিগত একটি সময়ের দৃশ্যপট তিনি সময়ান্তরে অনাগত আরেকটি সময়ে তুলনায় উপস্থাপন করেছেন। ফলে বইটি গ্রামীণ ও শহরের বিন্যাস, সাংস্কৃতিক পালাবদল ও ঘটমান রাজনৈতিক রূপান্তরকে কাঠামোবদ্ধ করেছে এবং সাম্প্রতিক অতীতের প্রাণবন্ত দলিলে পরিণত হয়েছে। এবারের একুশের বইমেলার প্রথম দিন থেকেই বইটি পাওয়া যাবে স্টুডেন্ট ওয়েজ-এর ২৬ নম্বর প্যাভিলিয়নে।

;