শামসুর রাহমানের শবযাত্রায়



সৈয়দ কামরুল হাসান
অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

শহীদ মিনার, শুক্রবার, ১৮ আগস্ট, ২০০৬, বেলা ১০-৩০ মি :

মানুষের এই দীর্ঘ সারিতে সবাই এসে দাঁড়িয়েছেন। যুবক, যুবতী, শিশু-কিশোর, মাঝবয়সী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধাও। হুইল চেয়ারে বসে প্রতিবন্ধীও লাইনে শামিল। কারো হাতে ফুল, কারুর বা মালা। যারা যুথবদ্ধ তারা ফুলের ডালি সাজিয়েছেন। শরতের ফিনফিনে নীল আকাশের নিচে ভাদ্রের উত্তপ্ত রৌদ্র শহীদ মিনারটায় আছড়ে পড়লেও তাকে কেউই আমলে নিচ্ছেন না। শহীদ মিনারটার একপাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ দেখছিলাম এই মৌন জনস্রোত। ভাবছিলাম মানুষের এই মিছিল যেন শামসুর রাহমানের রচিত কোনো এলিজি, হতে পারত তাঁরই কবিতার কোনো বিষয়বস্তু, যেখানে নিজেই তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন : ‘আমরা সবাই এখানে এসেছি কেন?/ এখানে কী কাজ আমাদের?’ মিছিল ধীরে এগিয়ে যায়। একসময় আমারো পালা আসে। রজনীগন্ধার ডাঁটাটি তাঁর পাশ দিয়ে শুইয়ে দিই। ফর্সা, ধবধবে কফিনে-মোড়ানো অবয়ব থেকে একটা জ্যোতির্ময় আভা যেন ঠিকরে পড়ছে। কবি নয়, শুয়ে আছেন যেন এক সন্তপুরুষ, মৃত নয় জীবন্ত যেন বা পুস্পকুণ্ডের ঘেরাটোপ থেকে তাকিয়ে আছেন তিনি। চারদিকে ছড়িয়ে-পড়া টিভি চ্যানেলের যত মাতামাতি, মাইকে কবির কবিতার পংক্তিমালায় নানান স্বরের ওঠানামা, শোকপুস্তকে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে মানুষের দীর্ঘ সারিতে দু’চরণ লেখার আকুতি—এ-সবকিছু তাঁর সামনে দিয়ে মেঘের মত ভেসে যায়। এক সফেদ শূন্যতায় শুয়ে আছেন কবি, যেন তাঁর ঠোঁট নড়ছে আর ঝরে পড়ছে উজ্জল পংক্তিমালা : “এখানে দরজা ছিল, দরজার ওপর মাধবী-লতার একান্ত শোভা।/ এখন এখানে কিছু নেই, কিচ্ছু নেই।/ শুধু এক বেকুব দেয়াল, শেল-খাওয়া, কেমন দাঁড়ানো, একা।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে তাঁর জানাজা হবে। জানাজা পড়ার উদ্দেশ্যে মিনারের বেদী থেকে নেমে এবার আমরা মিছিল নিয়ে রাজপথে এসে দাঁড়ালাম। শামসুর রাহমানের শবযাত্রার মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার মাঝ দিয়ে টিএসসিকে ডানে রেখে এগিয়ে চলল। এই পথ দিয়ে অনেক হেঁটেছেন তিনি। এই বিশ্ববিদ্যালয়, বটতলা, লাইব্রেরী, মধুর ক্যান্টিন, চারুকলা, রমনা, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান (রেসকোর্স), হাকিম চত্বর তাঁর পদস্পর্শের স্মৃতিতে এখনো সজীব। ওইতো টিএসসি কিংবা হাকিম চত্বর। এখানে জাতীয় কবিতা পরিষদের অনেক অনুষ্ঠানই উদ্বোধন করেছেন তিনি। কবিতা পড়েছেন দূর মফস্বল থেকে আসা অচেনা একেবারে অতি তরুণদের সাথে বসে একই মঞ্চে। তাদের পাশে থেকে অভয় দিয়েছেন রাজপথের গনগনে রোদ্দুরে, বর্ষায়, প্রতিবাদী মিছিলে। রাজপথের সেই তরুণটিকে তিনি এঁকেছেন তাঁর কবিতায়; ‘ছেলেটা পাগল নাকি ?’— প্রতিবেশী বুড়ো বললেন খনখনে কণ্ঠে তাঁর।/ ‘পাগল নিশ্চয় , নইলে ঘরের নির্জনে কেন দেয়নি সে ধরা’ ভাবেন লাঠিতে ভর দিয়ে বুড়ো,/ ‘নইলে কেউ বুঝি মিটিং-মিছিলে যায় যখন তখন? সব পুঁজি খোয়ায়, ঘরের খেয়ে তাড়ায় বনের মোষ?/ জীবনের সকালবেলায় গোলাপের মতো প্রাণ জনপথে হারায় হেলায়?’

সেই রাজপথে পা ফেলতেই পথ আমাকে টেনে নিয়ে গেল আরো পেছনের দিনগুলোতে।

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ, আমরা যারা মফস্বল শহরের নবীন লিখিয়ে আধুনিক কবিতার খোঁজখবর করতে শুরু করেছি, চাঁদা তুলে ছাপছি একুশের সংকলন, হাতে লিখে বের করছি দেয়াল পত্রিকা—সেসকল দিনে একদা ছোট্ট কিশোরগঞ্জ শহরে ঈশা খাঁর উত্তর পুরুষদের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত পাবলিক লাইব্রেরীর বিপুল সংগ্রহশালায় খুঁজে পাই শামসুর রাহমানের দু’টি কবিতার বই ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে,’ এবং ‘রৌদ্র করোটিতে’। পরে জেনেছি এ দুটি কবির প্রথম প্রকাশিত বই। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের আধুনিক কবিতার ওপর হাসান হাফিজুর রহমানের বিখ্যাত আলোচনা পড়ে ফেলেছি, কিন্তু এত প্রশংসা যে শামসুর রাহমানকে নিয়ে তাকেই পড়া হয়নি। তখনও পড়িনি আল মাহমুদ কিংবা শহীদ কাদরী। শামসুর রাহমানের ওই দুটি বই পড়ার পর মনে হলো একেবারে নতুন স্বাদের কবিতা ভিন্ন এক কাব্য ভাষায়। কেমন একটা ঘোর-লাগা জগত্— মধ্যবিত্তের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের অনুষঙ্গে কাব্যময় সেই জগত্—যেখানে নিয়ত খেলা করে রোদ ও জ্যোছনা, পার্কের নি:সঙ্গ বেঞ্চ, সেখানে ভাগাভাগি করে ঘুমায় এক নি:সঙ্গ খঞ্জ, রোঁওয়া-ওঠা-কুকুর আর ঝরাপাতা। মাথা থেকে কিছুতেই তাড়াতে পারি না যে দৃশ্যাবলী এঁকেছেন তিনি কবিতায়; ‘রোয়াওঠা কুকুরের সাহচর্য্যে গ্রীষ্মের গোধূলি হয়তো লাগবে ভালো / রাত্রি এলে চাঁদ হয়তো অদ্ভুত স্বপ্ন দেবে তার সত্তার মাটিতে / বিষাদের ঘরে কেউ জাগাবেনা তাকে/ পার্কের নি:সঙ্গ খঞ্জটাকে।’ মনের মধ্যে আজো দাগ কেটে বসে আছে রৌদ্র করোটির সেই বিখ্যাত চরণ; ‘আমাদের বারান্দায় ঘরের চৌকাঠে / কড়িকাঠে চেয়ারে টেবিলে আর খাটে/ দু:খ তার লেখে নাম’। শামসুর রাহমানের ওই দুটি কাব্যগ্রন্থ পড়ার সুবাদে একালের কবিতার প্রাসাদে উঠবার একটা সিঁড়ি পেয়ে গেলাম, তিনি যেন অঙ্গুলি নির্দেশে দেখিয়ে দিলেন আধুনিক কবিতার যাত্রাপথটা। একে একে তাঁর বইগুলি পড়তে থাকি— ‘বিধ্বস্ত নীলিমা’, ‘নিরালোকে দিব্যরথ’, ‘নিজ বাসভূমে’, ‘বন্দী শিবির থেকে’, ‘ইকারুসের আকাশ’, ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’, ‘আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি’, ‘মাতাল ঋত্তিক’, ‘উদভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’, ‘শূন্যতায় তুমি শোকসভা’—যা কিছু প্রকাশ পাচ্ছে তার সবকিছু। পড়লাম তাঁর লেখা অনবদ্য স্মৃতিগদ্য—‘স্মৃতির শহর’, এমনকি বই হয়ে বাজারে আসার আগেই কোনো এক ঈদসংখ্যায় পড়ে ফেললাম তাঁর উপন্যাস ‘অক্টোপাস’। ততদিনে উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। কলাভবনের করিডোরে আমাদের প্রথম যৌবন উচ্চকিত উন্মাদনায় নতুন নতুন ব্যঞ্জনায় শামসুর রাহমানকে আবিষ্কার করছে। হরতাল, মিছিল, দাবী-দাওয়া, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ভরা শামসুর রাহমানের কবিতা। ২-৪ টে নয়, অসংখ্য উজ্জ্বল পঙ্ক্তিমালা তাঁর হাতে কবিতার দুর্লভ লালিত্যে ধরা দিয়েছে। তিনি যেন আমাদের নেরুদা, আমাদের নাজিম হিকমত। বর্ণমালা, আমার দু:খিনী বর্ণমালায় তিনি বর্ণমালাকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন : ‘তোমাকে উপড়ে নিলে, বলো তবে কী থাকে আমার ?’ মুক্তিযুদ্ধের অবরুদ্ধ দিনে ‘বন্দি শিবির থেকে’ সেই শব্দকে তিনি দেখেছেন: ‘আমার প্রতিটি শব্দ পিষ্ট ফৌজি ট্রাকের তলায়,/ প্রতিটি অক্ষরে গোলা বারুদের/ গাড়ির ঘর্ঘর,/ দাঁতের তুমুল ঘষ্টানি,/ প্রতিটি পঙ্ক্তিতে শব্দে প্রতিটি অক্ষরে/ কর্কশ সবুজ ট্যাঙ্ক চরে, যেনবা ডাইনোসর।’ তাঁর চারপাশের সে-সময়কার চিত্র তিনি যেভাবে এঁকেছেন, তা হয়ে উঠেছে নৃশংস নরহত্যার অমোচনীয় ছবি : ‘সমস্ত শহরে সৈন্যেরা টহল দিচ্ছে,/ যথেচ্ছ করছে গুলি, দাগছে কামান/ এবং চালাচ্ছে ট্যাংক যত্রতত্র। মরছে মানুষ,/ পথে ঘাটে ঘরে, যেন প্লেগবিদ্ধ রক্তাক্ত ইঁদুর।’ কিন্তু যে কোনো মহৎ কবির মত তিনি মানুষের আত্মাহুতিতে দেখেছেন অবিনশ্বর প্রেরণার আভাস। তিনিইতো ‘আসাদের শার্র্ট’-এ লিখেছেন—‘ডালিম গাছের মৃদু ছায়া আর রোদ্দুর-শোভিত / মায়ের উঠোন ছেড়ে এখন সে-শার্ট/ শহরের প্রধান সড়কে/ কারখানার চিমনি-চূড়োয়/ গমগমে এভেন্যুর আনাচে-কানাচে/ উড়ছে, উড়ছে অবিরাম।’ আর স্বাধীনতা নিয়ে এতদঞ্চলের মানুষের হাজার বছরের যে স্বপ্ন, যে স্বপ্ন বাস্তবায়নে একদা নজরুল ‘বিদ্রোহী’ লিখেছিলেন, সেই স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বাংলাসাহিত্যের সেরা আধুনিক কবিতাটি তো তারঁই হাত দিয়ে বেরিয়ে এসেছিলো। পাঠকের পক্ষে (কিংবা স্বাধীনতাকামী যে কারুর পক্ষেই) এই দীর্ঘ কবিতার মোহ অগ্রাহ্য করা কঠিন: ‘স্বাধীনতা তুমি পিতার কোমল জায়নামাজের উদার জমিন/ স্বাধীনতা তুমি উঠানে ছড়ানো মায়ের শুভ্র শাড়ির কাঁপন,/ স্বাধীনতা তুমি বোনের হাতের নম্র পাতায় মেহেদির রঙ।… স্বাধীনতা তুমি বাগানের ঘর, কোকিলের গান/ বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা,/ যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা।’

কবির সাথে মুখোমুখি সাক্ষাতের সুযোগ ঘটলো এর পরপরই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাবস্থায়ই অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক সচিত্র সন্ধানীতে (গাজী শাহাবুদ্দিন আহমেদ সম্পাদিত) সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করার সুবাদে একেবারে যেন সংস্কৃতির বৈঠকখানায় এসে পা রাখলাম। সেখানে এসে সবাইকে পাওয়া গেলো শওকত ওসমান কি পটুয়া কামরুল হাসান; কে নেই সেখানে? দেখলাম সেখানেও দিব্যি আলো ছড়িয়ে আছেন এই রাজসিক কবি। হ্যাঁ সন্ধানীর বিশেষ সংখ্যার জন্য লেখা সংগ্রহের ছুতোয় তাঁর ওখানে যাওয়ার সুযোগ ঘটলো প্রথম, দৈনিক বাংলায় তাঁর বিশাল সম্পাদকীয় কক্ষে। চেহারা ছবি তো মুখস্থই ছিল, কিন্তু তাঁর অপূর্ব গৌরকান্তি, রুচিশীল পরিপাটি বেশভূষা আর নম্র, সুরেলা কাঁপা কাঁপা গলার আওয়াজ কাছ থেকে উপভোগ করলাম। নির্ধারিত তারিখে লেখা দিয়ে দিয়েছেন তিনি, কখনোই তারিখ ভুল হয়নি তাঁর। পরে সাক্ষাৎকারও নিয়েছি পুরনো ঢাকায় সৈয়দ আওলাদ হোসেন লেনের বাসায় গিয়ে। একদিন তাঁর শ্যামলীর বাসায়ও গিয়েছিলাম। পিজি হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় তাঁর দীর্ঘ লড়াইয়ের দিনগুলিতে দেশবাসীর মতো আমিও কাটিয়েছি উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় ভরা প্রতিটি প্রহর। কে জানে শেষ শয্যায় তাঁর চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়েছিলো কিনা! তিনিই তো লিখেছিলেন : ‘কবির অশ্রুর চেয়ে দামি মায়াময় অন্য কিছু আছে কি জগতে?’

শবযাত্রার মিছিলটি একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদে এসে শেষ হলো। বিশাল মসজিদ উপচানো মুসল্লীরা সবুজ লন ছাপিয়ে রাস্তায়, জানাজায় শরীক। তাঁর কফিনের ফুলবাহী বিশাল ট্রাকবহর মিছিলের পিছু পিছু এসেছে। জানাজা শেষে বনানী যাবে, মায়ের পাশে কবির শেষ শয্যায়।

অপরাহ্নের আলো এসে তীর্যক হয়ে ছুঁয়েছে জনাকীর্ণ শাহবাগের রাজপথ। সে আলোয় জনস্রোতে নিজেকে মিশিয়ে দিই। ঘোর-লাগা চেতনায় টাপুর টুপুর ঝরে পড়ে কবির অমর পংক্তিমালা : ‘আবার ফুটেছে দ্যাখো কৃষ্ণচূড়া থরে থরে শহরের পথে/ কেমন নিবিড় হয়ে। কখনো মিছিলে কখনো-বা/ একা হেঁটে যেতে যেতে মনে হয়—ফুল নয়, ওরা/ শহীদের ঝলকিত রক্তের বুদ্বুদ, স্মৃতিগন্ধে ভরপূর।’ ফিসফিসিয়ে বললাম—‘বিদায় রাহমান ভাই’।

[আধুনিক বাংলা কবিতার বরপুত্র, স্বাধীনতা ও মুক্তি চেতনার কবি শামসুর রাহমান ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট সন্ধ্যায় ইহলোক ত্যাগ করেন। মৃত্যুর আগে পিজি হাসপাতালে দীর্ঘ ১২ দিন তিনি কোমায় ছিলেন। পরদিন ১৮ আগস্ট বেলা ১০টায় তাঁর মরদেহ সর্বসাধারণের জন্য শহীদ মিনারে আনা হয়। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জানাজা শেষে বনানী গোরস্থানে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হন। কবিকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য সেদিন শহীদ মিনার ছিল লোকে লোকারণ্য, শবমিছিলে মানুষের ঢল নেমেছিলো। অন্যান্যদের সাথে লেখক ছিলেন সেই শবযাত্রায়। সেই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে এই স্মৃতিচারণা। ]

আসছে ভাওয়াল বীরের ‘জীবনালেখ্য’, লিখলেন ইজাজ মিলন



রাহাত রাব্বানী
আসছে ভাওয়াল বীরের ‘জীবনালেখ্য’, লিখলেন ইজাজ মিলন

আসছে ভাওয়াল বীরের ‘জীবনালেখ্য’, লিখলেন ইজাজ মিলন

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের রাজনীতির এক কিংবদন্তী হয়ে উঠে ছিলেন আহসান উল্লাহ মাস্টার। গ্রাম থেকে উঠে আসা লড়াকু এই স্কুল শিক্ষক মানুষকে ভালোবাসা দিতে এসেছিলেন,মানুষের ভালোবাসা পেতে এসেছিলেন। হৃদয় উজাড় করা ভালোবাসা বিলিয়ে মানুষের পরিপূর্ণ ভালোবাসা পেয়ে মাত্র ৫৪ বছর বয়সে ঘাতকের বুলেটে নিভে যায় তার জীবন প্রদীপ। সুফী সাধক বাবার ঘরে জন্ম নেওয়া আহসান উল্লাহ মাস্টারের চলার পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। কাঁটা বিছানো সেই পথে হেঁটে হেঁটে সফলতার চূড়ান্ত বিন্দু স্পর্শ করেছিলেন।

শিক্ষকতা পেশার নিয়োজিত ভাওয়াল বীর খ্যাত আহসান উল্লাহ মাস্টার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান থেকে মানুষের ভালোবাসাকে পূঁজি করে দুই বার সংসদ সদস্য হয়েছেন। সংসদ সদস্য থাকাকালেই ঘাতকরা তাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। জাতির পিতার আদর্শ বুকে ধারণ করে ৬৬ এর ৬ দফা , ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০ নির্বাচনে ভূমিকা রাখা, ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণসহ বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি আন্দোলনেই সরাসরি অংশ নিয়েছেন তিনি। বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়। বঙ্গবন্ধুর আশীর্বাদ পাওয়া আহসান উল্লাহ মাস্টার শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় আজীবন আন্দোলন করেছেন, তাদের পক্ষে কথা বলেছেন। মাদকের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছিলেন সেই ৯০ এর দশকের গোড়ার দিকেই। তুমুল জনপ্রিয় এক নেতৃত্বে পরিণত হন তিনি। জাতির পিতার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু ঘাতকরা সেটা সহ্য করতে পারেনি। মাটি ও মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন সারা জীবন। টঙ্গীর হায়দারাবাদ গ্রামে জন্ম নেওয় আহসান উল্লাহ মাস্টারের জনপ্রিয়তাই কাল হয়ে দাঁড়ায়। আহসান উল্লাহ মাস্টারের দেখা স্বপ্ন পূরণে কাজ করছেন তারই পুত্র যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল। টানা ৪ বারের সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল বাবার মতোই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারণ করে জাতির পিতার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশিত পথেই হেঁটে চলছেন।

রাজনীতির মাঠে আহসান উল্লাহ পাথর ঘঁষে আগুন জ্বলানো এক রাজনীতিক। তার আলোয় আলোকিত হয়েছিল গাজীপুর। কিন্তু কেমন ছিল আপদমস্তক এ রাজনীতিকের জীবন, গ্রাম থেকে উঠে এসে কীভাবে জাতীয় রাজনীতিতে জায়গা করে নিয়েছিলেন, তার জন্ম শৈশব কৈশোর, যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে আসা- এমন নানা অজানা অধ্যায় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক ইজাজ আহমেদ মিলন লিখেছেন ‘আহসান উল্লাহ মাস্টার: জীবনালেখ্য’। গ্রন্থের পা-ুলিপি পড়ার সুযোগ হয়েছে আমার। পাণ্ডুলিপি পড়ে আমার মনে হয়েছে এ যেন বাংলাদেশেরই জীবনালেখ্য। তরুণ প্রজন্মের কাছে আহসান উল্লাহ মাস্টার এক আদর্শের নাম। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকের এই বইটা পড়া উচিৎ। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে আগ্রহী করে তুলবে বইটি।

দীর্ঘদিন গবেষণা করে সাহিত্যিক ও সাংবাদিক ইজাজ আহমেদ মিলন রচনা করেছেন ‘জীবনালেখ্য’। অন্যপ্রকাশ থেকে বইটি বেরোচ্ছে খুব শিগগিরই। চমৎকার প্রচ্ছদ করেছেন চারু পিন্টু।

;

ধারাবাহিক উপন্যাস ‘রংধনু’-৩



মাহফুজ পারভেজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

[তৃতীয় কিস্তি]

ম্যারির গোপন কষ্ট অনুভব করলেও আবেগাক্রান্ত হন না মিসেস অ্যানি। তার মতামত ও মনোভাব অন্যরকম এবং বহুলাংশে বাস্তবসম্মত। বহু মায়ের মতো তিনিও বিশ্বাস করেন, আবার নতুন সংসার শুরু করলে ম্যারির একাকীত্বের কষ্ট ও অন্যান্য সমস্যার সুরাহা হয়ে যাবে। সে লক্ষ্যে তিনি তার চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। অন্যদিকে, তাকে ঘিরে মায়ের এসব তৎপরতার কারণে ম্যারি সারাক্ষণ তটস্থ থাকেন। অবশেষে মায়ের আতিশয্য ও উৎসাহী প্রেমিকবৃন্দের উপদ্রব থেকে বাঁচতে তিনি বাড়িতে কম সময় কাটানোর পথ খুঁজতে থাকেন। টমাস দিনে দিনে বড় হচ্ছে। একা একাই সে তার কাজকর্ম করতে পারে। এদিকে তার স্কুলিং শুরু হয়ে গেছে। ম্যারি ভাবলেন, যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়। বাড়িতে মায়ের একতরফা কথা শোনা আর উৎসাহী প্রেমিকদের আনুষ্ঠানিক ও আতঙ্কজনক আগমনের জন্য ক্লান্তিকর অপেক্ষায় দিন কাটানোর কোনো মানে হয় না। তার যতটুকু পড়াশোনা, তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোটখাট চাকরি জুটে যাওয়ার কথা। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনি প্রাক্তনী এবং তার সাবেক স্বামী এখানে অধ্যাপনা করেছেন। নিজের পরিবারের মতোই বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক। ফলে অল্প-বিস্তর খোঁজ-খবর করতেই বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে অনায়াসে চাকরি হয়ে গেলো ম্যারির। ম্যারি আপাতত হাফ ছেড়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেওয়ার ফুসরত পেলেন।

দিনের বেশির ভাগ অংশ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে লাইব্রেরির কাজে কাটিয়ে পড়ন্ত বিকেলে ক্লান্ত ম্যারি বাড়ি ফিরলে মিসেস অ্যানি ম্যার্গারেট কথাবার্তা বলার সাহস পান না। তার পরিশ্রান্ত মেয়ের দিকে তাকিয়ে কথাবার্তা বলার ভাবনায় ইতি টানেন। এদিকে, লাইব্রেরির কাজে যোগ দিয়ে এক অতলান্ত জগতের দেখা পেয়েছেন ম্যারি। কাজের ফাঁকে ফাঁকে পড়ছেন অসাধারণ নানা বই। বাস্তব জগতের কষ্ট-বেদনা থেকে তিনি যেন মুক্তির স্বাদ পান বইয়ের প্রশান্ত পাতায়। লাইব্রেরিয়ান মিসেস ন্যান্সি অনেক আগে থেকেই ম্যারিকে চেনেন। তার ব্যক্তিগত জীবনের ভাঙাগড়াও মিসেস ন্যান্সির অজানা নয়। তিনি নিজে আগ্রহী হয়ে ম্যারিকে চমৎকার সব বই পড়ার জন্য বেছে দেন। কিছু অর্ধ-পঠিত বই ম্যারি সঙ্গে করে বাসায় নিয়ে আসেন। বিশ্রাম ও নিজের কিছু কাজকর্ম করার পর সেগুলো নিয়ে বিছানায় যান তিনি। ক্রমশ তার যাপনের আটপৌরে রুটিনে বড় ধরনের রূপান্তর ঘটে। তিনি আর বই একাকার হতে থাকে দিনে দিনে। ম্যারির এমন রুটিন ভেদ করে মা কথা বলার সুযোগ পান খুবই কম। এমন পরিস্থিতি ম্যারির জন্য কম স্বস্তির বিষয় নয়।

ফলে আজকাল মিসেস অ্যানি মার্গারেট ডিনারের সময়টাতেই শুধু ম্যারির সঙ্গে আলাপের সুযোগ নিতে পারেন। তারও কাজ কম নয়। দৌড়াদৌড়িতে তার দিন শুরু হয় মেয়ে লাইব্রেরি ও নাতীর স্কুলে যাবার তাড়ার মধ্যে। তখন দম ফেলার মতো অবস্থায় থাকে না কেউই। বাকী দিন সবাই থাকে সবার কাজে ব্যস্ত। অতএব রাতের খাবারের সময়ই কিছুটা আলাপের অবসর মেলে। তখন টুকটাক কথার বেশি কিছু বলাও সম্ভব হয় না। দিনে দিনে মিসেস অ্যানি মার্গারেটের বকবকানি অনেকটাই হ্রাস পেতে থাকে। পরিস্থিতির পরিবর্তনে মনে মনে খুশি হন ম্যারি।    

কিন্তু রাত নামতেই ম্যারির নিজের মধ্যে দ্বিধা এসে ভর করে। তার মন-প্রাণ চলে যায় অন্ধকারের কালো চাদরে আচ্ছাদিত বাগানে। তিনি নিশ্চিত হতে পারেন না যে, বাগানের পাইন গাছটি তাকে টানে, নাকি তিনি নিজেই কাছে টেনে নেন পাইনকে? নাকি ক্যাভিনের স্মৃতি, যা আচ্ছন্ন হয়ে আছে পাইনের চারপাশে, তা গাছটির সঙ্গে মিলেমিশে তাকে অলক্ষ্যে ডাকে মধ্যরাতের নিশুতি প্রহরে? ম্যারি এসব প্রশ্নের মীমাংসা করতে পারেন না। তার দ্বিধা ও সংশয় বাড়তে থাকে। তথাপি তন্দ্রাচ্ছন্ন, ভূতে পাওয়া মানুষের মতো রাতের কালচে অন্ধকারে, বেগুনী, নীলাভ ফুলকির মাঝ দিয়ে তিনি প্রতিরাতে চলে আসেন বাগানে, পাইনের নৈকট্যে। 

পাইনের কাছে এলে তার শরীর ও মনে অবাক কাণ্ড ঘটে। তিনি নিবিড়ভাবে টের পান স্মৃতির অমোচনীয় স্পর্শ। আগুন দেখে পতঙ্গের ছুটে যাওয়ার মতো তিনি যেন অজানা টানে অন্ধকার বাগানে পাইন গাছের তলে চলে আসেন নিজেরই স্মৃতিকুণ্ডলীতে। তখন নিজের উপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তিনি অতীতের লেলিহান শিখায় অনুভব করেন স্মৃতির দুর্দমনীয় দাপট। তার মনে পড়তে থাকে পাইনের তলে ক্যাভিনের সঙ্গে অতিক্রান্ত অসংখ্য দিবস ও রজনীর টুকরো টুকরো কথা ও অভিজ্ঞান। 

ক্যাভিনের সঙ্গে ম্যারি যখন প্রথম এই বাড়িতে আসেন, তখন প্রায়-জংলার মতো আগাছায় ভরা ছিল পুরো বাগান। অবহেলায় বাড়ন্ত শিশু পাইন গাছটি ছিল ঝোপের আড়ালে। বেশ কয়েক দিন কঠোর পরিশ্রম করে ক্যাভিন বাগানের চেহারা পাল্টে দেন। আগাছার কবল থেকে উদ্ধার করেন পাইন গাছটিকে। গাছের চারপাশটা সুন্দর করে গুছিয়ে বসার চমৎকার পরিবেশ তৈরি করে ফেলেন ক্যাভিন। বইপড়া, চা-খাওয়া, ম্যারির সঙ্গের গল্পের সময়গুলো তিনি কাটাতে থাকেন পাইনের তলে। সবসময় ক্যাভিনের একটি সতর্ক নজর থাকে পাইন গাছটির দিকে। গাছটির কখন কি প্রয়োজন, তা নিয়ে ক্যাভিনের আগ্রহের অন্ত নেই।

ম্যারি খেয়াল করেন পাইন নিয়ে ক্যালিনের ব্যস্ততা ও আগ্রহের বিষয়টি। একদিন তিনি সরাসরি জানতে চান,

‘পাইন গাছটিকে এতো ভালোবাসো তুমি? পাইন কি তোমার প্রিয় বৃক্ষ?’

‘না। আমার প্রিয় বৃক্ষ ঝাঁকড়া মাথার জলপাই। আমার পূর্বপুরুষ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে এসেছিল। জলপাই তাদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। এই পাইনকে ভালোবাসি অন্য কারণে।’

‘কি সেই কারণ?’

‘কারণ, এই পাইন আমাদের প্রথম সন্তানের মতো। তোমার, আমার নতুন জীবনে, এই নতুন বাসগৃহে প্রথম আমরা যাকে পেয়েছি, তা এই পাইন গাছ।’

ক্যাভিনের উত্তরে দারুণ চমকে উঠেন ম্যারি। তার ভেতর মাতৃত্বের প্রবল ঢেউ আলোড়ন জাগায়। তিনি গভীর মমতায় শিশু থেকে তারুণ্যের পথে বর্ধিষ্ণু পাইনের দিকে মগ্ন চোখে তাকিয়ে থাকেন। বেশ অনেকক্ষণ পর ক্যাভিনের কথায় ম্যারির ধ্যান ভাঙে।

‘জানো তো, মা-বাবার নিবিড় সান্নিধ্যে থাকলে সন্তানের বিকাশ ভালো হয়। তাদের শৈশব, কৈশোর, বেড়ে ওঠা, সবকিছু চাপমুক্ত হয়। আমরাও যত বেশি পাইনের কাছে থাকবো, ততদ্রুত গাছটিও সাহসী মানুষের মতো সুস্থ ও সবলভাবে বড় হবে।’

এইসব স্মৃতি ও কথোপকথন প্রবলভাবে মনে পড়ে পাইনের কাছে এলে। ম্যারির কষ্টগুলোও বুনো বাতাসের  মতো হু হু করে বাড়তে থাকে। পাইনের সমান্তরালে নিজের সন্তান টমাসের অবয়ব ভাসে চোখে। পিছনের দৃশ্যপটে ক্যাভিনের উপস্থিতি। ম্যারি ভীষণ অবাক হন। যে পিতা একটি অনাথ ও অবহেলিত পাইন গাছকে পিতৃত্ব-মাতৃত্ব দিয়ে লালন করার স্বপ্ন দেখতো, দিন-রাতের অধিকাংশ সময় পাইনের আশেপাশে থাকতো, সে কি করে ঔরসজাত সন্তানের কাছ থেকে স্বেচ্ছায় দূরে চলে গেলো! এই প্রশ্নের উত্তর তিনি অনেক ভেবেও খুঁজে পান না।

ম্যারি নানাভাবে বুঝতে চেষ্টা করেন, 'আকর্ষণ' কত দূর অবধি গেলে শুধুই 'আকর্ষণ' থাকে, আবার কত দূর চলে গেলে 'অবসেশনে' পরিণত হয়? 'অবসেশন’ ও 'আকর্ষণ'-এর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ঠিক ঠিক জানতে না পারলেও মানুষ আকর্ষণ, বিকর্ষণ, অবসেশন নিয়েই বেঁচে থাকে। কখনো কোনো মানুষের কাছে আসে, কখনো দূরে যায়। মানুষের একা কিংবা যৌথ জীবনে এক রহস্যময় ত্রিভুজের মতো আকর্ষণ, বিকর্ষণ, অবসেশন ঘিরে থাকে।

এক সময় বাগান থেকে ঘরে ফিরে আসেন ম্যারি। বিছানায় শুয়ে টের পান তার মাথায় আগ্নেয়গিরির লাভাস্রোতের মতো বইছে প্রশ্নের স্রোত। তার আর ঘুম আসে না। সাইড টেবিল থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখেন সকাল হতে অনেক বাকী। তিনি ফোনের মিউজিক অপশনে গিয়ে একটি গান বেছে নেন। তাদের ক্যাম্পাসে পড়তে আসা পল্লবী নামের এক দক্ষিণ এশীয় তরুণী গানটি তাকে প্রেজেন্ট করেছে। গানের কথাগুলো বাংলায় হলেও সুর তাকে আচ্ছন্ন করে প্রবলভাবে। কখনো সুযোগ হলে গানটি তিনি ইংরেজিতে তর্জমা করার ইচ্ছা রাখেন। তিনি গানটি চালু করে চোখ বন্ধ করেন। কিন্তু তার হৃদয় যেন গানের কথাগুলোর সঙ্গে যৌথতায় গাইছে:

'যদি আর কারে ভালবাসো

যদি আর ফিরে নাহি আসো

তবে তুমি যাহা চাও তাই যেন পাও

আমি যত দুঃখ পাই গো।'

[পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার]

আরও পড়ুন: ধারাবাহিক উপন্যাস ‘রংধনু’-২

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১

;

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;