লকডাউন



আন্দালিব রাশদী
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

হাজার পঞ্চাশ স্কোয়ার ফিট মেঝের ওপর যদি তিন রুমের অ্যাপার্টমেন্ট হয়, তাতে যদি দুটো বাথরুম কিচেন ডাইনিং-ড্রইং স্পেসও থাকে তাহলে অনুমান করা যায় এককটা রুমে ডাবল খাট ফেলার পর ওয়ার্ডরোব ঢোকালে পা চালানোই মুশকিল। মাস্টার বেডে আবার বইয়ের আরমারি ঢুকানো হয়েছে। চুমকি বই পড়ে। ইংরেজি-বাংলা দুই ভাষার বই-ই।

কম কথা বলে, রাগ হলে মাথা ঝিমঝিম করে, পিরিয়ডের প্রথম দুটো দিন মেজাজ খারাপ থাকে, সবুজ রঙের কোনো কাপড় দুচক্ষে দেখতে পারে না, যেখানে ছোট বোন রুমকির সাথেই এক বিছানায় থাকতে ইচ্ছে করত না সেখানে একজন ব্যাটাছেলের সাথে ঘুমোতে হবে এটা ভাবতেই গাটা কেমন যেন করে ওঠে—এসব কথা আমাকে বিয়ের আগেই শুনিয়েছে। আমাদের বিয়ের আগে ঠিক প্রেম নয়—কথাটা বলার এই পর্বটি মাত্র চুয়াল্লিশ দিনের। তখনও সম্পর্কের ধরনটা আপনি সম্বোধন নির্ভর ছিল। বিয়ের ঠিক আগের দিন আমরা একই সঙ্গে তুমিতে নেমে আসি টেলিফোন আলাপের মাধ্যমে। ঢাকা শহরে আমার তেমন কোনো আত্মীয়-স্বজন না থাকায় কেবল ছবি তোলার জন্য তাদেরই বিল্ডিংয়ের ছাদে চুমকির একটা নামমাত্র গায়ে হলুদ হয়েছে।

বিয়ের পর তিনটা বছর আমাদের ভালো যায়নি। প্রথম বছরই আমরা দুজনই বুঝি ভুল হয়ে গেছে। চুমকি রাখঢাক না করে বলেছে যার ইন্টেলেকচুয়াল কোনো ডেপথ নেই তাকে বিয়ে করা আর মিরপুর চিড়িয়াখানার একটা শিং ভাঙা মহিষকে বিয়ে করা একই কথা।

মিরপুর চিড়িয়াখানায় শিং ভাঙা কোনো মহিষ আছে কিনা তাও আমি জানি না। তিন বছর কোনোভাবে কাটলেও পরের দুটা মাস আমাদের দুজনের জন্যই ছিল ভয়ঙ্কর। চুমকি বলল, তোমার লজ্জা করে না শ্বশুর বাড়িতে থাকো?

অবশ্যই করার কথা। সে জন্যই তো আমি আমার দেড় রুমের ভাড়া বাসা ছেড়ে আসতে চাইনি। বলেছি চালো আপাতত, এখানেই উঠি তারপর দেখেশুনে দু রুমের একটা বাসা নেব। ঘরজামাই থেকে আমার বাবাকেও যথেষ্ট লাঞ্ছিত হতে দেখেছি। আমি এর মধ্যে নেই। কেউ কিছু না বললেও আমার মনে হতো নিশ্চয়ই আমাকে কিছু একটা বলছে। মনে করে দেখো তুমি কী বলেছিলে।
কী বলেছিলাম?

বলেছিলে অ্যাপর্টমেন্টটা তো তোমার শ্বশুরের নয় যে তোমার ঘরজামাই ঘরজামাই লাগবে। বাবা দিলেও এটা আমার নামেই পাকাপাকি রেজিস্ট্রি করা। স্ত্রীর সম্পত্তি থাকলে ঘরজামাই বলার কোনো সুযোগই নেই।

তুমিই একটা পিকআপ ভ্যান নিয়ে আমার যা যা ছিল সব এনে তুললে তোমাদের অ্যাপার্টমেন্টে। জায়গা ছিল না বলে আমার প্রায় সব জিনিসপত্র রাখলে তোমাদের নামে বরাদ্দ গ্যারেজের জায়গাটিতে। তোমাদের গাড়ি ছিল না গ্যারেজ ছিল। কেবল আমার একটি ছোট্ট টেবিল আর রিভলভিং চেয়ারটা সিমকি তার রুমে ঢুকিয়েছে। তোমার ভাবি তোমার মাকে পছন্দ করতেন না বলে তিনি রয়ে গেলেন তোমার সাথে—মানে আমাদের সাথে। রুমকির অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া দিয়েছে। তোমার মা আর সিমকির যৌথভাবে একটি অ্যাপার্টমেন্ট সেখানে থেকেও ভাড়া আসে। ব্যবস্থা এমনভাবেই করা হয়েছে যেন তোমার মায়ের মৃত্যুর পর কেউ মায়ের সম্পত্তির ভাগ না চায়—এটা পেয়ে যাবে সিমকি।

এতসব কথা আমি বলিনি; এমনিই বিড়বিড় করেছি।
যা আমি স্পষ্ট করে বলেছি তা হচ্ছে বেশ আমি বেরিয়ে যাচ্ছি।

আরো আগে বেরোনো উচিত ছিল। ডিভোর্স আমিই দিচ্ছি, কাগজটা নিয়ে তবে যেয়ো। তুমি আমাকে ডিভোর্স করেছো এই অহঙ্কার করার সুযোগ চুমকি তোমাকে দেবে না।

তোমার সাথে থাকার প্রশ্নই আসে না।

সিমকি আটকাল, বলল, ফর গডস সেইক দুলাভাই যাবেন না। আমি মার রুমে চলে যাচ্ছি, তুমি এ রুমে থাকবে, তাহলে চুমকির সাথে থাকা হবে না। আমি তোমাকে মিস করতে চাই না।

কিছুক্ষণের মধ্যেই চুমকির অফিসের গাড়ি এসে পড়ে কাঁধে চামড়ার ব্যাগ ঝুলিয়ে এক হাতে খাবারের হটপট অন্যহাতে শাওমি স্মার্ট ফোন নিয়ে বেরিয়ে যায়। সিমকি বলল, চুমকির রুমের চাবি দাও তোমার জিনিসপত্রগুলো এখানে শিফট করি।

কিচেন একটা বাথরুম আর চুমকির মায়ের রুমটা ছাড়া সবগুলো লক করা থাকে। মাস্টারবেড, একটা চাবি আমার কাছেই থাকে। আমি রুম খুলে দিয়ে বেরিয়ে যাই। সিমকির দক্ষতা সম্পর্কে আমার সামান্য সন্দেহও নেই, অফিস থেকে ফিরে যখন এ রুমটাতে ঢুকব, এমনভাবে রুমটা গোছানো থাকবে যে এটাকে আমার রুমই মনে হবে। আমার অফিস দশ মিনিটের হাঁটা দূরত্বের মধ্যে। চুমকির গাড়িতে চল্লিশ মিনিট ফেরার সময় জ্যামে আটকা পড়লে আড়াই ঘণ্টাও লেগে যায়। আমি খাবার নিই না, অফিসের ক্যাফেটেরিয়াতে ভর্তুকি দামে পঁচিশ টাকায় ভরপেট খাওয়া যায়।

আমি স্থানান্তরিত হই ১৯ মার্চ রাতে। সিমকি সবই এনেছে পেস্ট-টুথব্রাশ, জিলেট শেভিং ফোম ও রেজর, ওল্ড স্পাইস আফটারশেভ লোশন, স্যান্ডেল, প্যান্টের বেল্ট প্যারাসিটামল ট্যাবলেট—যাতে আমাকে চুমকির ঘরের দরজায় ঢুকতে টোকা দিতে না হয়। তবুও বলল, অ্যাটাচডকাম নেই, তোমার কষ্ট হবে।

পরদিন শুক্রবার চুমকির সারাদিন বাসায় থাকার কথা, তার সাথে দেখা হয়ে যাওয়া এড়াতে নাস্তার আগেই বেরিয়ে যাই। বিহঙ্গ পরিবহনের একটি বাস সদরঘাট যাচ্ছে, আমি উঠে পড়ি। লঞ্চঘাটের কাছাকাছি একটি রেস্তোরাঁয় ঢুকে তন্দুর রুটি এবং খাসির পায়ার নেহারিতে একটি জবরদস্ত নাস্তা করি। টার্মিনালের ভেতর ঢুকে দূরগামী লঞ্চ দেখি, একবার ভাবি উঠে পড়ি কিন্তু শনিবার আমাকে অফিস করতে হয়।

মহসিন হলের আমার রুমমেট আবদুল হান্নানকে প্রায় চার মাস পর ফোন দিই, বুড়িগঙ্গার ওপারে জিঞ্জিরায় তার বাড়ি ও কসমেটিক্সের কারখানা। কারখানাটা বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ব্র্যান্ডের প্রসাধনদ্রব্য এখানে তৈরি হয়। শুধু বিদেশি খালি কৌটা পেলেই চলে। ফোন ধরতেই বললাম, সদরঘাটে আছি নদী পেরিয়ে তোর বাড়িতে আসছি।

হান্নান বলল, ফিরে আয়, স্কোয়ার হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটার সামনে হাঁটাহাটি করছি, নার্গিসের জোড়া বাচ্চা হবে, বুঝলি দোস্ত দেলাইয়া দিলাম দুইটাই মই। তোর মতো আঙ্গুল চুষলে আঙ্গুল ক্ষয় হবে, বাচ্চা বের হবে না।

সুতরাং জিঞ্জিরা যাওয়া হলো না। এখানে আধঘণ্টা ওখানে পৌনে এক এমন করতে করতে ‘সাবলেট চাই’-র অন্তত দশটি বিজ্ঞাপন দেখে—ছয়টি সরেজমিনে দেখে রাত সাড়ে দশটায় বাড়ি ফিরি। সিমকি বলল, চুমকি ফোনে কোনো এক উকিলের সাথে কথা বলেছে। তাতে তার ডিভোর্স কেইসটা শক্ত করার জন্য তোমার বিরুদ্ধে কয়েকটা পয়েন্ট দাঁড় করাচ্ছে।

১. শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেছো।
২. যৌতুকের জন্য মারধোর করেছো।
৩. স্ত্রীর ভরণপোষণ দিচ্ছো না।
৪. স্ত্রীর শারীরিক চাহিদা মেটানোর যে হক তা আদায় করছো না।
৫. সন্তানের আকাঙ্ক্ষা সত্ত্বেও তাকে গর্ভবর্তী বানাতে পারোনি।

আমি বললাম, আসল পয়েন্ট তো বাদ পড়ে গেছে তার স্বামীর চরিত্র খারাপ অন্য নারীতে আসক্ত। উদাহরণ হিসেবে সিমকির নাম উল্লেখ করতে পারত।

সিমকি বলল, তাহলে তার মনে করিয়ে দেবার দরকার নেই। কোনো কারণে কথাটা রাশেদের কানে গেলে ২৭ এপ্রিলের অনুষ্ঠানটা ভেস্তে যাবে।

সিমকির বিয়ে ২৭ এপ্রিল রাশেদের সাথে। ২৩ এপ্রিল কানাডার কুইবেক থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছাবে ২৫ তারিখ ঈদ করবে ২৭ তারিখ বিয়ে করবে, ৩০ তারিখে আবার চলে যাবে। রাশেদ কানাডার নাগরিকত্ব পেয়েছে মাত্র ছ’ মাস আগে। আমার সাথে ফোনে কথা হয়েছে, নিজে থেকেই বলেছে, দিনের বেলা কিছু পড়াশোনা করি, ফ্রেঞ্চ ভাষাটা ভালো করে শিখেছি বলে ওখানকার স্যোশাল ওয়েলফেয়ার ডিপার্টমেন্ট ইন্টারসেক্টর হিসেবে ডাকে, সন্ধ্যা ছ’টা থেকে রাত বারটা পর্যন্ত ক্যাব চালাই। সিমকিকে নিয়ে আসার পর টাইমটা আবার অ্যাডজাস্ট করে নেব। ফ্রেঞ্চটা সিমকিও কমবেশি শিখে নেবে। টরন্টো, আটায়া ও দিকটাতে ইংলিশ চলে, কিন্তু বাঙালি বেশি আমি বাঙালিদের কাছ থেকে দূরে থাকতে চাই।

রুমকির শাশুড়ির মৃত্যুশয্যায় শেষ দেখার জন্য রুমকি তার স্বামী রইস আহমেদ, তিন বছর বয়সী ছেলে ভিঞ্চি সাত দিনের জন্য ফ্রোরেন্স থেকে ঢাকা এয়ারপোর্টে নেমে সোজা চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার মুন্সিগঞ্জ নামের গ্রামে। তৃতয়ি দিনেই তার মৃত্যু হয়, ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের রাতে আবার তারা ফিরে যাবে ২৪ তারিখ সন্ধ্যায় চুমকি কিংবা সিমকিদের বাড়িতেই এসে হাজির, এখানে দু রাত পরের রাত তো উড়োজাহাজেই। যে রুমে আমার আশ্রয় হয়েছিল সেই রুমটিই ছেড়ে দিতে হলো।

তাহলে আমার রাতের আশ্রয় হবে কোথায়? একটাতে চুমকি, একটাতে রুমকি ও রইস আহমেদ এবং তাদের ভিঞ্চি। একটাতে আমার শাশুড়ি যার একটি বড় সময় শুয়েই কাটে, সাথে সিমকি। আমি কোথায়?

আমি ফিসফিস করে সিমকিকে বলি, আমি কোনো এক বন্ধুর বাসায় চলে যাচ্ছি, চিন্তা করো না যোগাযোগ রাখব।

ভয়ঙ্কর দুঃসাহসী একটি কথা বলে বসল সিমকি। বলল, বেশ তুমি চুমকির সাথে ঘুমাবে না, এই তো। আমি মাকে চুমকির রুমে পাঠিয়ে দিচ্ছি, তুমি আমার সাথে ঘুমাবে। আমি হেসে উঠি এবং বলি, পাগলামির একটা সীমা থাকা চাই, কি রকম লঙ্কাকাণ্ড ঘটবে ভেবে দেখ।

সিমকি তখনই ঢুকল চুমকির রুমে, কী বলল আমি শুনিনি। কিন্তু দুতিন মিনিটের মধ্যেই চুমকি বেরিয়ে এসে আমার হাত ধরে প্রায় হেঁচকা টানে তার ঘরে নিয়ে বলল, কী নাটক শুরু করলে? রুমকির বরের সামনে এই বাহাদুরিটা না দেখালে হয় না?

পরের পাঁচ মিনিটের মধ্যে টুথপেস্ট ব্রাশ রেজার শেভিং ফোম, স্যান্ডেল সব এনে চুমকির রুমে আগে যেখানে যেটা যেভাবে ছিল রেখে আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে গুড নাইট বলে সিমকি বেরিয়ে গেল।

চুমকি বলল, অসুবিধে নেই, আমি আগেই সুইচ অফ করে দেব।

আমি বললাম, আলো থাকলে আমার সমস্যা হবে না যখন তোমার কাজ শেষ হবে তখনই অফ করো।

কাজ মানে উপন্যাস পড়া। ইংরেজি বাংলা দুই-ই। এক নজরে দেখলাম তার বইটার নাম লাভ স্টোরি। ওই এমনই হয়, নিজের জীবনে প্রেম না থাকলে লাভ স্টোরিই পড়তে হয়। এক সময় দেয়ালমুখো হয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

সকালে নাস্তার সময় রইস আহমেদ বললেন, সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমার তো চাকরি নিয়ে টানাটানি লেগে যাবে। টার্কিশ এয়ারওয়েজ—আসা বা ঢাকা থেকে যাওয়া সব ফ্লাইট বাতিল করে দিয়েছে।

রুমকি বলল, মানে? আমাদের টিকেট তো টার্কিশ এয়ারের।

তিনি বললেন ম্যাসেজ তো আগেই দিয়েছে, কিন্তু ওয়াইফাই জোনে না থাকায় দেখিনি, একটু আগে সিমকির কাছ থেকে তোমাদের বাড়ির পাসওয়ার্ড নিয়ে লগ-ইন করতেই একডজন ম্যাসেজ এলো। করোনা ভাইরাসকে প্যানডেমিক ডিক্লেয়ার করেছে। সার্সও তো প্যানডেমিক তখন তো এত ফ্লাইট ক্যানসেল হয়নি। এয়ারপোর্টে এটা-ওটা পরীক্ষা হয়েছে। রুমকি বলল, তোমার সিস্টেম ছাড়, অন্য যে এয়ারলাইনের টিকেট পাও সেটাই কেনো।

নাস্তার টেবিলে বসেই ফোন করলেন, কাকে করলেন তিনিই জানেন। কিন্তু এটা শুনলাম বার বার বলছেন, সর্বনাশ সর্বনাশ তাহলে কেমন করে যাব।

রুমকি বলল, মানে?

কোনো এয়ারলাইন্সই অপারেশনে নেই। ২৬ তারিখ থেকে টোটাল লকডাউন শুরু হয়ে যাচ্ছে। এয়ারপোর্টও বন্ধ।

এ বাড়িতে টেলিভিশন আছে। কিন্তু কেউ এমনকি হিন্দি সিরিয়ালও দেখে না। চুমকি একটু অবসর পেলে বই নিয়ে বসে, সিমকির হাতের মোবাইল ফেইসবুক হোয়াটসঅ্যাপ ভাইবার চলছেই, আমার শাশুড়ি বসে থাকলে ভার্টিগোতে পড়েন, এখন টিভির সামনেই আসেন না। পৃথিবী দেশ এসব নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই। আমি ভাবছি সাবলেটই ভালো, কিছু বাড়তি টাকা দিলে দুবেলা অফিসের খাবার ছ’ দিন তো আছেই, শুক্রবার দুপুরে বাইরে কোথাও মেরে দেবে। না খেলেও সমস্যা নেই। রাতে ভাত একটু বেশি টানবে।

রুমকি রিমোট কন্ট্রোল খুঁজে বের করে টিভি সার্ফ করতে শুরু করল। করোনা নিইে সবার কথা সিএনএন, বিবিসি, আলজাজিরা, বাংলাদেশ চ্যানেল বলছে ছাব্বিশ তারিখের পর থেকে সব অফিস আদালত বন্ধ। দেশে কমপ্লিট লক ডাউন। বাসা থেকেও কেউ বেরোতে পারবে না। বাসা থেকে বেরোনো ঠেকাতে পুলিশ র‌্যাব সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

রুমকি বলে, পৃথিবীটা কোন দিকে যাচ্ছে? আমি তো কখনো উহানের নাম শুনিনি। কেয়ামত এসে গেছে নাকি?

রাতের বেলা রুমকি বলল, ঐ দেখো টিভিতে চীনের বাংলাদেশিরা ফেরার জন্য কান্নাকাটি করছে, সরকার ব্যবস্থা করতে দেরি করছে বলে অভিশাপ দিচ্ছে। আরো দুটো খবর দিল রুমকি ইতালি আর আমেরিকার অবস্থা খারাপ। ও বাবা, এটা কি প্লেগ নাকি? ব্ল্যাক ডেথ?

সিমকি একটু পড়াশোনা করে বলল, শ্বাসকষ্টে মারা যাচ্ছে। সিমটম হচ্ছে জ্বর গলাব্যথা কাশি।

রুমকি বলল, ওহ মাই গড, আমার তো গলা ব্যথা, গত রাতে একটু জ্বরও ছিল। প্যারাসিটামল খেয়ে সামলেছি। করোনার নাকি কোনো ঔষধ নেই? আমি মরে গেলে ভিঞ্চির কী হবে?

রইস আহমেদ বললেন, চিন্তা করো না, তুমি মরে গেলে ভিঞ্চির কিন্ডারগার্টেনের অ্যাটেন্ডেন্ট ফ্রান্সেসকাকে বিয়ে করব, মেয়েটা ভিঞ্চির খুব টেইক কেয়ার করে।

হঠাৎ রুমকি খেপে গেল, গ্লাস ভর্তি পানি ছুঁড়ে মারল ভিঞ্চির বাবার ওপর। বলল, তোমার চোখের তারা কাকে দেখলে নেচে উঠে আমি কি সেটা জানি না? তুমি বিয়ে করবে ঐ প্রস্টিটিউটটাকে। ভিঞ্চির সেকেন্ড শিফটের বুয়া। অ্যাটেন্ডেন্ট আবার কী? বুয়া বলতে পারো না। তোমার রুচি কখনো বুয়ার উপর উঠেছে? পরিবারিক প্রস্তাবে রাশেদের সাথে সিমকির বিয়ে যোগাযোগটা রাখছেন সিমকিদের ছোটমামি হাফসা। রাশেদ হাফসার ক্লাসমেট, নিষেধাজ্ঞা হাফসারই। সিমকি রাশেদের সাথে কথা বলতে চাচ্ছিল। হাফসা বলেছে, প্রশ্নই আসে না। তাহলে সিমকির দাম কমে যাবে। বিয়ের পর কথা বলবে, তার আগে দু পক্ষের যত কথা সব হাফসাই বলবে। সিমকি রুমকিকে বলল, ভালোই হয়েছে আমি নিশ্চয়ই তোমাদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ নই যে প্লেনভাড়া দিয়ে আমার বিয়েতে আসবে। আটকা যখন পড়েছোই বিয়েটা অ্যাটেন্ড করে যাও। আজ তো এপ্রিলের ছয়, আর একুশ দিন।

রইস আহমেদ বলল, বিয়ে কি কাজী সাহেবকে করবে না পাত্রকে? কেন? কাজীকে কেন বিয়ে করব? পাত্র কি ঘাস কাটবে?

এছাড়া কোনো উপায় নেই। ওসব দেশে ঘাস অনেক বড় হয়। দুনিয়ার কোনো খোঁজখবর না রাখলে হবে কেমন করে? দেখো ফেডারেল এভিয়েশন অথোরিটি কী বলছে—জুনের আগে উত্তর আমেরিকার কোনো এয়ারপোর্ট থেকে ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট চালুর সম্ভাবনা নেই। একজন এভিয়েশন জার্নালিস্টের ভিডিও করা খবরটি দেখায়। হঠাৎ সিমকি মলিন হয়ে যায়।

রুমকি বলে, মন খারাপ করিস না। হেঁটে কিংবা রিকশায় কিংবা টেম্পোতে তো আর কুইবেক থেকে আসতে পারবে না। প্লেনে চড়তে হবে। রইস আহমেদ একটা বিকল্প পথ দেখায়। বিয়ের দিনই ভিডিও কনফারেন্স করে কাজীকে নিয়ে বিয়ের কাজটা সেরে ফেলতে পার। তারপর যখন আকাশে প্লেন উড়বে জামাই চলে আসবে।

সিমকি বলল, তাই হবে, আমি ছোটমামিকে বলছি।

এপ্রিলের ২১ তারিখ সিমকিদের ছোট মামা কান-হাতে গ্লাভস, মুখে ক্লিনিক্যাল মুখোশ পরে এলো। বলল, ফোনে বললে পারতাম, কিন্তু বিশ্বাস করাটা কষ্টকর হতো।

রুমকি জিজ্ঞেস করল, ছোট মামা কোনটা বিশ্বাস করতে বলছো? কানাডার লোকটার সাথে সিমকির বিয়ে হবে না। হতে পারে না। সে হচ্ছে হাফসার বয়ফ্রেন্ড। সিমকির বিয়ের নাম করে প্রত্যেকদিন তার সাথে দেড় দু ঘণ্টা কথা বলে, এদ্দিন পাত্তা দিইনি, কাল কিছুক্ষণ কান পেতে যা শুনলাম! আফসা তার সাথে থ্রি এক্স স্টাইলে কথা বলেছে পুরো পথ।

সিমকি বলল, তুমি এসব কী বলছো ছোট মামা? হাফসা যা বলছে তার একশ ভাগের একভাগও বলিনি। বলেছে সিমকিকে টাচ করার আগে হাফসার সাথে তার ঘুমোতে হবে, সব সুযোগ যেন তৈরি করে দেয়।

এই বিষয়ে প্রথম মুখ খুলল চুমকি। বলল, তুমি যে এসব জেনেছো ছোটমামি কি তা জানে?

জানবে তিন চারদিন পর। আমি এখন মুখে যা বলব সব অস্বীকার করবে, এমনকি আমাকে বলতে পারে মানসিক ডাক্তার দেখাও। এটা তোমার অবসেশন। আমি আজই সিক্রেট ভয়েস রেকর্ডার আমার এন্ড্রয়েড ফোনে ডাউনলোড করছি। ফোনটা সাইলেন্ট মোডে দিয়ে বেডরুমে কোথাও লুকিয়ে রাখব। আমি টিভি দেখার নাম করে চলে আসব। এভাবে তিনদিনের কথা রেকর্ড করে নিজে শুনে সিমকিকে এবং তোমাদের শুনিয়ে তারপর হাফসাফে বলব। যদি শুভ্র আর রুদ্র না থাকত আজই হতো হাফসার সাথে আমার শেষ দিন।

চুমকি বলল, ছোটমামা তুমি আসলেই মেন্টাল কেইস নয় তো?

চারদিন পর ডকুমেন্টসহ আসছি।

ছোটমামা সিমকিকে জিজ্ঞেস করল হেয়াট ইজ ইয়োর ডিসিশন?

সিমকি বলল, বিয়ে যেহেতু আমি ঠিক করিনি, তোমরা ঠিক করেছো, বিয়ের তারিখও তোমাদের ঠিক করা। আমাকে জিজ্ঞেস করছো কেন?

ছোট মামা বেরোবার আধঘণ্টার মধ্যে র‌্যাব চুমিকদের বাড়ি ঘিরে ফেলে। মাইকে জোর গলায় বলল, এই ভবনে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী সনাক্ত হয়েছে। এই বাড়ি সম্পূর্ণ লকডাউন করা হয়েছে। কেউ বেরোতে চেষ্টা করলে গ্রেফতার করা হবে। হ্যান্ডমাইকে আরো ঘোষণা করা হলো, এটি একটি প্রাণঘাতী ছোঁয়াচে রোগ। করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর নাম মোদাব্বের হোসেন বয়স সত্তরের উপরে, তিনি এই বিল্ডিংয়ের চারতলার ডানপাশের ফ্লাটে থাকতেন। এই ফ্লাটের বাসিন্দা ছাড়া অন্য কেউ যদি তার সংস্পর্শে এসে থাকেন তিনিও বিপদজনক ভাইরাস বহন করে থাকতে পারেন। অবিলম্বে তাকে সনাক্ত করুন এবং আমাদের কাছে হস্তান্তর করুন।

মোদাব্বের হোসেন দূরের কেউ নন, সিমকিদের একমাত্র ভাই রাতুলের শ্বশুর, ডায়নার বাবা। নভোচারীর মতো পোশাক পরা লোকজন মোদাব্বের হোসেনকে চারতলা থেকে নামিয়ে এ্যাম্বুলেন্সে তুলতে তিনি চিৎকার করছিলেন, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে আল্লাহ আমাকে বাঁচাও।

ডায়না ভাবির সাথে তার শ্বাশুড়ির খারাপ সম্পর্ক থাকলেও ডায়নার বাবা আসার পর তিনি তার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন। আবার মায়ের সাথে এক বিছানায় ঘুমিয়েছে সিমকি। চুমকি এবার চড়াও হলো মা ও বোনের ওপর, তোমরা কোয়ারেন্টাইনে চলে যাও। চৌদ্দ দিনের আইসোলেশনের পর যদি সুস্থ থাকো তবেই কথাবার্তা হবে নতুবা এই-ই শেষ। আল বিদা।

তারপর রুমকির সামনে করোনাভাইরাস কত ভয়ঙ্কর রোগ, শ্বাসকষ্টে কেমন দুঃষহ মৃত্যু ঘটে তার একটি বর্ণনা দিল। ভয়ঙ্কর এক ধমক দিল আমাকে সাবধান রুম থেকে বেরোবে না, তুমি অনেক অশান্তি আমাকে দিয়েছো, দয়া করে এইবার মা আর সিমকির কাছ থেকে করোনাভাইরাস এনে আমাকে দিয়ো না।

রুমকি তার স্বামীকে বলল, যেভাবেই হোক ভিঞ্চিকে বাঁচাতে হবে, একটা ট্যাক্সিক্যাব ডাকো, আমরা আবার চুয়াডাঙ্গা চলে যাব। সমস্ত নষ্টের মূল হচ্ছে আমার মা। কী দরকার ছিল ঐ ঘাটের মরাটাকে দেখতে যাবার?

রইস আহমেদ বলল, লকডাউন মানে বোঝো? প্লেন যেমন বন্ধ ট্যাক্সিক্যাবও। তাছাড়া কাল দেখোনি টিভিতে রাস্তায় বেরোলে পুলিশ কান ধরে উঠবস করাচ্ছে।

হঠাৎ আমাদেরটা ফ্ল্যাটটা ভুতুরে ফ্লাট হয়ে উঠল।

টোকা দিলে শুধুমাত্র রুমকি আর ভিঞ্চির জন্য আমাদরে রুমের দরজা খোলা হয়, দুজন আমাদের বাথরুম শেয়ার করে।

রুমকি যখনই ঢোকে তখনই একটা না একটা মৃত্যুসংবাদ দেয়। ইতালির মিশানে মারা গেছে রইসের বড়মামা কামাল আহমেদ, নিউ ইয়র্কে রুমকির বন্ধবীর বড়বোন ও তার খালা শাশুড়ি।

সিমকির বিয়ে নিয় আলোচনা হঠাৎ থেমে গেছে। আমাকে ডিভোর্স করার নোটিশের ড্রাফট চূড়ান্ত হয়ে আছে। অনেকদিন ধরেই, করোনাভাইরাসের প্রকোপ হবার আগে থেকেই আমি ও চুমকি বিছানাতেও স্যোশাল ডিসট্যান্স রক্ষা করে চলেছি। এখন তো আরো স্ট্রিক্ট হতে হচ্ছে। আমি দেয়ালের দিকে মুখ করেই ঘুমোই সকালে ঘুম ভাঙলে দেখি চোখের সামনে দেয়াল। চুমকি দেখে চোখের সামনে জানালা।

জ্বরটা হঠাৎ করেই এলো, বাড়লও খুব দ্রুত। মাঝরাত কি তার পরে আমি কাঁপতে শুরু করলাম। আমার লেপ দরকার কিন্তু এত রাতে কাকে বলি—চুমকির সাথে এক বিছানায় থাকলেও আমাদের টকিং টার্ম নেই। আমি দেয়ালের দিক থেকে চাদরসহ তোশকটা টেনে নিজেকে এর ভেতর সেঁটিয়ে দিই। কিন্তু তাতে আমাকে বিছানার প্রায় মাঝামাঝি চলে আসতে হয় তারপর ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমের মধ্যে আমার হাত চুমকির ওপর পড়েছে না চুমকির হাত আমার ওপর বলতে পারব না, কিন্তু ঘুমটা, যখন ভাঙে বুঝতে পারি আমরা দুজন দুজনকে আঁকড়ে ধরে আছি। তারপর বহু যুগের অভুক্ত নরনারীর বেলায় যেমন হয়, পরস্পরের শরীরে এখানে ওখানে ধরতে ধরতে আমাদের মধ্যে ব্যাপারটা ঘটে গেল।

তারপর চুমকি বলল শরীর এত গরম কেনো? করোনাভাইরাস ঢোকেনি তো? আমাকে আবার ইনফেকটেড করছো না তো?

আমাদের পুরো ব্যাপারটাই অন্ধকারে ঘটে। নীলাভ ডিমলাইটের সুইচ অন করে চুমকি দুটো প্যারাসিটামল বের করে আনে। পানিসহ ট্যাবলেট এগিয়ে দেয়। বলে, আগে টেম্পারেচার কন্ট্রোলে আসুক।

সকালে যখন ঘুম ভাঙে, অনেক অনেকদিন পর আবিস্কার করি আমরা মুখোমুখি শুয়ে আছি।

দুই.
চৌদ্দ দিন পর সিমকি এবং তার মা আইসোলেশন থেকে মুক্ত হয়। ডায়ানার বাবা হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরতে পারেননি। সরকারের পিপিই পরা লোকজন তাকে খিলগাওয়ে কোনো একটি কবরস্থানে সমাহিত করেছে। সিমকি মুক্ত হবার তিন কি চারদিন পর ছোটমামি হাফসা মাস্ক গ্লাভস এসব পরে বাসায় এসে সবাইকে শুনেয়েই বলে, আল্লাহর রহমতের শেষ নেই। যদি এই ভাইরাসটার কারণে লকডাউন না থাকত সিমকি তোর অনেক ভোগান্তি হতো। ভাগ্যিস এয়ারপোর্ট বন্ধ। বুঝলি রাশেদের কথায় আমার খুব সন্দেহ হচ্ছিল এজন্য কদিন ধরে পটিয়ে পটিয়ে বের করলাম তার একটা বউ আছে, বউয়ের নাম পেনিলোপ ক্রুজ। আমি মুখের উপর বলে দিয়েছি, থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ, নো ফারদার টক। সিমকিকে তোমার মতো বদমাশের কাছে বিয়ে দেব না।

সে রাতেই ছোটমামা ফোন করে বললেন, একচুয়ালি হাফসা নিজেই প্রতারিত বোধ করে আনেকক্ষণ কান্নাকাটি করেছে।

২৫ মে ঈদ উল ফিতরের সকালে চুমকি বলল, দিলে তো আমাকে ফাঁসিয়ে। পিরিয়ড মিস হলো। ভাবলাম যে কোনো সময় শুরু হবে। এখন ইউরিনে স্ট্রিপ চুবিয়ে দেখি পজিটিভ—এই দেখো, টেস্ট লাইনের রঙটা দেখো। আমি এখন কোনটা সামলাব—প্রেগন্যান্সি না ডিভোর্স?

টুয়েন্টি টুয়েন্টির করোনাভাইরাস সংক্রমণকালের লকডাউনে শেষ পর্যন্ত আমি ও চুমকি সোশাল ডিস্ট্যান্স বজায় রাখতে পারিনি। চুমকির পিরিয়ড মিসের সূত্র ধরে আমরা একটি বাবুর জন্মের অপেক্ষায় আছি।

আমাদের অনিবার্য তালাক অনির্দিষ্ট কালের জন্য পিছিয়ে গেছে।

আসছে ভাওয়াল বীরের ‘জীবনালেখ্য’, লিখলেন ইজাজ মিলন



রাহাত রাব্বানী
আসছে ভাওয়াল বীরের ‘জীবনালেখ্য’, লিখলেন ইজাজ মিলন

আসছে ভাওয়াল বীরের ‘জীবনালেখ্য’, লিখলেন ইজাজ মিলন

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের রাজনীতির এক কিংবদন্তী হয়ে উঠে ছিলেন আহসান উল্লাহ মাস্টার। গ্রাম থেকে উঠে আসা লড়াকু এই স্কুল শিক্ষক মানুষকে ভালোবাসা দিতে এসেছিলেন,মানুষের ভালোবাসা পেতে এসেছিলেন। হৃদয় উজাড় করা ভালোবাসা বিলিয়ে মানুষের পরিপূর্ণ ভালোবাসা পেয়ে মাত্র ৫৪ বছর বয়সে ঘাতকের বুলেটে নিভে যায় তার জীবন প্রদীপ। সুফী সাধক বাবার ঘরে জন্ম নেওয়া আহসান উল্লাহ মাস্টারের চলার পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। কাঁটা বিছানো সেই পথে হেঁটে হেঁটে সফলতার চূড়ান্ত বিন্দু স্পর্শ করেছিলেন।

শিক্ষকতা পেশার নিয়োজিত ভাওয়াল বীর খ্যাত আহসান উল্লাহ মাস্টার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান থেকে মানুষের ভালোবাসাকে পূঁজি করে দুই বার সংসদ সদস্য হয়েছেন। সংসদ সদস্য থাকাকালেই ঘাতকরা তাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। জাতির পিতার আদর্শ বুকে ধারণ করে ৬৬ এর ৬ দফা , ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০ নির্বাচনে ভূমিকা রাখা, ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণসহ বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি আন্দোলনেই সরাসরি অংশ নিয়েছেন তিনি। বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়। বঙ্গবন্ধুর আশীর্বাদ পাওয়া আহসান উল্লাহ মাস্টার শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় আজীবন আন্দোলন করেছেন, তাদের পক্ষে কথা বলেছেন। মাদকের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছিলেন সেই ৯০ এর দশকের গোড়ার দিকেই। তুমুল জনপ্রিয় এক নেতৃত্বে পরিণত হন তিনি। জাতির পিতার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু ঘাতকরা সেটা সহ্য করতে পারেনি। মাটি ও মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন সারা জীবন। টঙ্গীর হায়দারাবাদ গ্রামে জন্ম নেওয় আহসান উল্লাহ মাস্টারের জনপ্রিয়তাই কাল হয়ে দাঁড়ায়। আহসান উল্লাহ মাস্টারের দেখা স্বপ্ন পূরণে কাজ করছেন তারই পুত্র যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল। টানা ৪ বারের সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল বাবার মতোই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারণ করে জাতির পিতার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশিত পথেই হেঁটে চলছেন।

রাজনীতির মাঠে আহসান উল্লাহ পাথর ঘঁষে আগুন জ্বলানো এক রাজনীতিক। তার আলোয় আলোকিত হয়েছিল গাজীপুর। কিন্তু কেমন ছিল আপদমস্তক এ রাজনীতিকের জীবন, গ্রাম থেকে উঠে এসে কীভাবে জাতীয় রাজনীতিতে জায়গা করে নিয়েছিলেন, তার জন্ম শৈশব কৈশোর, যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে আসা- এমন নানা অজানা অধ্যায় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক ইজাজ আহমেদ মিলন লিখেছেন ‘আহসান উল্লাহ মাস্টার: জীবনালেখ্য’। গ্রন্থের পা-ুলিপি পড়ার সুযোগ হয়েছে আমার। পাণ্ডুলিপি পড়ে আমার মনে হয়েছে এ যেন বাংলাদেশেরই জীবনালেখ্য। তরুণ প্রজন্মের কাছে আহসান উল্লাহ মাস্টার এক আদর্শের নাম। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকের এই বইটা পড়া উচিৎ। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে আগ্রহী করে তুলবে বইটি।

দীর্ঘদিন গবেষণা করে সাহিত্যিক ও সাংবাদিক ইজাজ আহমেদ মিলন রচনা করেছেন ‘জীবনালেখ্য’। অন্যপ্রকাশ থেকে বইটি বেরোচ্ছে খুব শিগগিরই। চমৎকার প্রচ্ছদ করেছেন চারু পিন্টু।

;

ধারাবাহিক উপন্যাস ‘রংধনু’-৩



মাহফুজ পারভেজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

[তৃতীয় কিস্তি]

ম্যারির গোপন কষ্ট অনুভব করলেও আবেগাক্রান্ত হন না মিসেস অ্যানি। তার মতামত ও মনোভাব অন্যরকম এবং বহুলাংশে বাস্তবসম্মত। বহু মায়ের মতো তিনিও বিশ্বাস করেন, আবার নতুন সংসার শুরু করলে ম্যারির একাকীত্বের কষ্ট ও অন্যান্য সমস্যার সুরাহা হয়ে যাবে। সে লক্ষ্যে তিনি তার চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। অন্যদিকে, তাকে ঘিরে মায়ের এসব তৎপরতার কারণে ম্যারি সারাক্ষণ তটস্থ থাকেন। অবশেষে মায়ের আতিশয্য ও উৎসাহী প্রেমিকবৃন্দের উপদ্রব থেকে বাঁচতে তিনি বাড়িতে কম সময় কাটানোর পথ খুঁজতে থাকেন। টমাস দিনে দিনে বড় হচ্ছে। একা একাই সে তার কাজকর্ম করতে পারে। এদিকে তার স্কুলিং শুরু হয়ে গেছে। ম্যারি ভাবলেন, যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়। বাড়িতে মায়ের একতরফা কথা শোনা আর উৎসাহী প্রেমিকদের আনুষ্ঠানিক ও আতঙ্কজনক আগমনের জন্য ক্লান্তিকর অপেক্ষায় দিন কাটানোর কোনো মানে হয় না। তার যতটুকু পড়াশোনা, তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোটখাট চাকরি জুটে যাওয়ার কথা। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনি প্রাক্তনী এবং তার সাবেক স্বামী এখানে অধ্যাপনা করেছেন। নিজের পরিবারের মতোই বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক। ফলে অল্প-বিস্তর খোঁজ-খবর করতেই বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে অনায়াসে চাকরি হয়ে গেলো ম্যারির। ম্যারি আপাতত হাফ ছেড়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেওয়ার ফুসরত পেলেন।

দিনের বেশির ভাগ অংশ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে লাইব্রেরির কাজে কাটিয়ে পড়ন্ত বিকেলে ক্লান্ত ম্যারি বাড়ি ফিরলে মিসেস অ্যানি ম্যার্গারেট কথাবার্তা বলার সাহস পান না। তার পরিশ্রান্ত মেয়ের দিকে তাকিয়ে কথাবার্তা বলার ভাবনায় ইতি টানেন। এদিকে, লাইব্রেরির কাজে যোগ দিয়ে এক অতলান্ত জগতের দেখা পেয়েছেন ম্যারি। কাজের ফাঁকে ফাঁকে পড়ছেন অসাধারণ নানা বই। বাস্তব জগতের কষ্ট-বেদনা থেকে তিনি যেন মুক্তির স্বাদ পান বইয়ের প্রশান্ত পাতায়। লাইব্রেরিয়ান মিসেস ন্যান্সি অনেক আগে থেকেই ম্যারিকে চেনেন। তার ব্যক্তিগত জীবনের ভাঙাগড়াও মিসেস ন্যান্সির অজানা নয়। তিনি নিজে আগ্রহী হয়ে ম্যারিকে চমৎকার সব বই পড়ার জন্য বেছে দেন। কিছু অর্ধ-পঠিত বই ম্যারি সঙ্গে করে বাসায় নিয়ে আসেন। বিশ্রাম ও নিজের কিছু কাজকর্ম করার পর সেগুলো নিয়ে বিছানায় যান তিনি। ক্রমশ তার যাপনের আটপৌরে রুটিনে বড় ধরনের রূপান্তর ঘটে। তিনি আর বই একাকার হতে থাকে দিনে দিনে। ম্যারির এমন রুটিন ভেদ করে মা কথা বলার সুযোগ পান খুবই কম। এমন পরিস্থিতি ম্যারির জন্য কম স্বস্তির বিষয় নয়।

ফলে আজকাল মিসেস অ্যানি মার্গারেট ডিনারের সময়টাতেই শুধু ম্যারির সঙ্গে আলাপের সুযোগ নিতে পারেন। তারও কাজ কম নয়। দৌড়াদৌড়িতে তার দিন শুরু হয় মেয়ে লাইব্রেরি ও নাতীর স্কুলে যাবার তাড়ার মধ্যে। তখন দম ফেলার মতো অবস্থায় থাকে না কেউই। বাকী দিন সবাই থাকে সবার কাজে ব্যস্ত। অতএব রাতের খাবারের সময়ই কিছুটা আলাপের অবসর মেলে। তখন টুকটাক কথার বেশি কিছু বলাও সম্ভব হয় না। দিনে দিনে মিসেস অ্যানি মার্গারেটের বকবকানি অনেকটাই হ্রাস পেতে থাকে। পরিস্থিতির পরিবর্তনে মনে মনে খুশি হন ম্যারি।    

কিন্তু রাত নামতেই ম্যারির নিজের মধ্যে দ্বিধা এসে ভর করে। তার মন-প্রাণ চলে যায় অন্ধকারের কালো চাদরে আচ্ছাদিত বাগানে। তিনি নিশ্চিত হতে পারেন না যে, বাগানের পাইন গাছটি তাকে টানে, নাকি তিনি নিজেই কাছে টেনে নেন পাইনকে? নাকি ক্যাভিনের স্মৃতি, যা আচ্ছন্ন হয়ে আছে পাইনের চারপাশে, তা গাছটির সঙ্গে মিলেমিশে তাকে অলক্ষ্যে ডাকে মধ্যরাতের নিশুতি প্রহরে? ম্যারি এসব প্রশ্নের মীমাংসা করতে পারেন না। তার দ্বিধা ও সংশয় বাড়তে থাকে। তথাপি তন্দ্রাচ্ছন্ন, ভূতে পাওয়া মানুষের মতো রাতের কালচে অন্ধকারে, বেগুনী, নীলাভ ফুলকির মাঝ দিয়ে তিনি প্রতিরাতে চলে আসেন বাগানে, পাইনের নৈকট্যে। 

পাইনের কাছে এলে তার শরীর ও মনে অবাক কাণ্ড ঘটে। তিনি নিবিড়ভাবে টের পান স্মৃতির অমোচনীয় স্পর্শ। আগুন দেখে পতঙ্গের ছুটে যাওয়ার মতো তিনি যেন অজানা টানে অন্ধকার বাগানে পাইন গাছের তলে চলে আসেন নিজেরই স্মৃতিকুণ্ডলীতে। তখন নিজের উপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তিনি অতীতের লেলিহান শিখায় অনুভব করেন স্মৃতির দুর্দমনীয় দাপট। তার মনে পড়তে থাকে পাইনের তলে ক্যাভিনের সঙ্গে অতিক্রান্ত অসংখ্য দিবস ও রজনীর টুকরো টুকরো কথা ও অভিজ্ঞান। 

ক্যাভিনের সঙ্গে ম্যারি যখন প্রথম এই বাড়িতে আসেন, তখন প্রায়-জংলার মতো আগাছায় ভরা ছিল পুরো বাগান। অবহেলায় বাড়ন্ত শিশু পাইন গাছটি ছিল ঝোপের আড়ালে। বেশ কয়েক দিন কঠোর পরিশ্রম করে ক্যাভিন বাগানের চেহারা পাল্টে দেন। আগাছার কবল থেকে উদ্ধার করেন পাইন গাছটিকে। গাছের চারপাশটা সুন্দর করে গুছিয়ে বসার চমৎকার পরিবেশ তৈরি করে ফেলেন ক্যাভিন। বইপড়া, চা-খাওয়া, ম্যারির সঙ্গের গল্পের সময়গুলো তিনি কাটাতে থাকেন পাইনের তলে। সবসময় ক্যাভিনের একটি সতর্ক নজর থাকে পাইন গাছটির দিকে। গাছটির কখন কি প্রয়োজন, তা নিয়ে ক্যাভিনের আগ্রহের অন্ত নেই।

ম্যারি খেয়াল করেন পাইন নিয়ে ক্যালিনের ব্যস্ততা ও আগ্রহের বিষয়টি। একদিন তিনি সরাসরি জানতে চান,

‘পাইন গাছটিকে এতো ভালোবাসো তুমি? পাইন কি তোমার প্রিয় বৃক্ষ?’

‘না। আমার প্রিয় বৃক্ষ ঝাঁকড়া মাথার জলপাই। আমার পূর্বপুরুষ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে এসেছিল। জলপাই তাদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। এই পাইনকে ভালোবাসি অন্য কারণে।’

‘কি সেই কারণ?’

‘কারণ, এই পাইন আমাদের প্রথম সন্তানের মতো। তোমার, আমার নতুন জীবনে, এই নতুন বাসগৃহে প্রথম আমরা যাকে পেয়েছি, তা এই পাইন গাছ।’

ক্যাভিনের উত্তরে দারুণ চমকে উঠেন ম্যারি। তার ভেতর মাতৃত্বের প্রবল ঢেউ আলোড়ন জাগায়। তিনি গভীর মমতায় শিশু থেকে তারুণ্যের পথে বর্ধিষ্ণু পাইনের দিকে মগ্ন চোখে তাকিয়ে থাকেন। বেশ অনেকক্ষণ পর ক্যাভিনের কথায় ম্যারির ধ্যান ভাঙে।

‘জানো তো, মা-বাবার নিবিড় সান্নিধ্যে থাকলে সন্তানের বিকাশ ভালো হয়। তাদের শৈশব, কৈশোর, বেড়ে ওঠা, সবকিছু চাপমুক্ত হয়। আমরাও যত বেশি পাইনের কাছে থাকবো, ততদ্রুত গাছটিও সাহসী মানুষের মতো সুস্থ ও সবলভাবে বড় হবে।’

এইসব স্মৃতি ও কথোপকথন প্রবলভাবে মনে পড়ে পাইনের কাছে এলে। ম্যারির কষ্টগুলোও বুনো বাতাসের  মতো হু হু করে বাড়তে থাকে। পাইনের সমান্তরালে নিজের সন্তান টমাসের অবয়ব ভাসে চোখে। পিছনের দৃশ্যপটে ক্যাভিনের উপস্থিতি। ম্যারি ভীষণ অবাক হন। যে পিতা একটি অনাথ ও অবহেলিত পাইন গাছকে পিতৃত্ব-মাতৃত্ব দিয়ে লালন করার স্বপ্ন দেখতো, দিন-রাতের অধিকাংশ সময় পাইনের আশেপাশে থাকতো, সে কি করে ঔরসজাত সন্তানের কাছ থেকে স্বেচ্ছায় দূরে চলে গেলো! এই প্রশ্নের উত্তর তিনি অনেক ভেবেও খুঁজে পান না।

ম্যারি নানাভাবে বুঝতে চেষ্টা করেন, 'আকর্ষণ' কত দূর অবধি গেলে শুধুই 'আকর্ষণ' থাকে, আবার কত দূর চলে গেলে 'অবসেশনে' পরিণত হয়? 'অবসেশন’ ও 'আকর্ষণ'-এর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ঠিক ঠিক জানতে না পারলেও মানুষ আকর্ষণ, বিকর্ষণ, অবসেশন নিয়েই বেঁচে থাকে। কখনো কোনো মানুষের কাছে আসে, কখনো দূরে যায়। মানুষের একা কিংবা যৌথ জীবনে এক রহস্যময় ত্রিভুজের মতো আকর্ষণ, বিকর্ষণ, অবসেশন ঘিরে থাকে।

এক সময় বাগান থেকে ঘরে ফিরে আসেন ম্যারি। বিছানায় শুয়ে টের পান তার মাথায় আগ্নেয়গিরির লাভাস্রোতের মতো বইছে প্রশ্নের স্রোত। তার আর ঘুম আসে না। সাইড টেবিল থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখেন সকাল হতে অনেক বাকী। তিনি ফোনের মিউজিক অপশনে গিয়ে একটি গান বেছে নেন। তাদের ক্যাম্পাসে পড়তে আসা পল্লবী নামের এক দক্ষিণ এশীয় তরুণী গানটি তাকে প্রেজেন্ট করেছে। গানের কথাগুলো বাংলায় হলেও সুর তাকে আচ্ছন্ন করে প্রবলভাবে। কখনো সুযোগ হলে গানটি তিনি ইংরেজিতে তর্জমা করার ইচ্ছা রাখেন। তিনি গানটি চালু করে চোখ বন্ধ করেন। কিন্তু তার হৃদয় যেন গানের কথাগুলোর সঙ্গে যৌথতায় গাইছে:

'যদি আর কারে ভালবাসো

যদি আর ফিরে নাহি আসো

তবে তুমি যাহা চাও তাই যেন পাও

আমি যত দুঃখ পাই গো।'

[পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার]

আরও পড়ুন: ধারাবাহিক উপন্যাস ‘রংধনু’-২

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১

;

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;