Barta24

মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯, ৫ ভাদ্র ১৪২৬

English

খরগোশ ও মহামায়া

খরগোশ ও মহামায়া
অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ
ফারাহ্ সাঈদ


  • Font increase
  • Font Decrease

মার্বেলের মতো চোখ। ঠিক জ্বলজ্বলে নয় তবে গাঢ়। খরগোশটা শাদা। পাখির পালকের মতন। আমাদের ফ্ল্যাটে ঘুরঘুর করছে সকাল থেকেই। চেনা চেনা লাগে। হয়তো লিফটে দেখেছি কারো সঙ্গে? আমি ধরতে গেলে আম্মা থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘ওরে ধরিস না খিদা লাগছে, কিছু খাইতে দে।’

মেঝেতে রাখা এই ঝুড়িটা আমারই কেনা। কিছু গাজর রাখা, আর হলুদমতো একটা সবজি। খরগোশটা ঝুড়ির কাছে গিয়ে থামে। কিছু একটা মুখে তুলে নিল। খাচ্ছে সে।

‘এটা কি সবজি রাখার ঝুড়ি আম্মা? আমি তো আনছি সাজায়া রাখার জন্য। আপনে কী করছেন!’ আমি হেসে বলি।
‘তো কী হইছে, ছেলে আমার, কত্তকিছুর শখ তোর, আমি না হয় খরগোশটারে আদর কইরা খাওয়াইলাম। কিছু খুঁইজা পাইলাম না আর, এই ঝুড়িটা কি আর অন্য কাজে লাগে?’
‘আমারেও কিছু খাইতে দেন, তারপর ছাদে যায়া বসি। ঘরে আর ভালো লাগে না মা।’

একটু পর আম্মা একবাটি মুড়ি দেয় আমার হাতে, কড়কড়ে ভাজা। পেঁয়াজ বেরেস্তা দেওয়া। আমি খাচ্ছিলাম জানালার পাশে বসে। খরগোশটা আসে যায় চেয়ারের পাশে। মিনিটখানেক দাঁড়ায় তারপর আবার চলে যায়। মুড়ি খেতে দিলাম কিছু ওকে। নাহ খেলো না খরগোশটা! আম্মা আমার ঘরে এসে বলে, ‘তুই কী দিলি খাইতে? ওইসব খায় না খরগোশ।’ হাসতে থাকে আম্মা।

আমি ঘর থেকে বেরিয়ে লিফটের দিকে যাই। মিঠু ঘরে থাকলেও আম্মাই আমাকে এগিয়ে দেয়। ক্রাচে ভর করে হাঁটি বলে উনি ভাবেন আমি পড়ে যাব। তাই একা হাঁটতে দেন না।

ছাদে কেউ আছে বোধহয়। গুনগুন শব্দ পাই। কেউ গান গাইছে। আমি চেয়ারটাতে বসি। হঠাৎ তার সঙ্গে দেখা।

এক নিঃশ্বাসে কী কী সব বলল মেয়েটা। আমি শুনে যাচ্ছি তবে খুব হাসি পাচ্ছে আমার। সত্যি সত্যি! আমার হাসি থামিয়ে দিয়ে মেয়েটা বলে, ‘এইভাবে সবগুলা দাঁত দেখিয়ে হাসছেন যে? এটা হাসির কিছু না! আপনার কোনো চিন্তা লাগতেছে না? আপনার ওয়াইফ এভাবে আমার বরের সঙ্গে ঘুরে বেড়াবে আর আমি মেনে নেব?’ কথাগুলো বলে নিজেই হাসে মেয়েটা! তবে এটা বাঁকা হাসি। বিদ্রূপ আছে বৈকি। নামটাও জানি না তার। কী আর বলব।

প্রতিবেশিনীর চোখের দিকেই তাকাই আমি। ছাদে কাপড় শুকোতে দিতে এসে এ কী বলছে সে! ওর বরের সঙ্গে মিঠুর নাকি কী সব হচ্ছে আজকাল। আমার কি চিন্তায় পড়ে যাওয়ার কথা ছিল? এখনই ব্লাডপ্রেসার হাই হবার কথা? কই তেমন কিছুই হচ্ছে না। জানতে চাইলাম, ‘আপনি আমাদের উল্টাদিকের ফ্ল্যাটের না? আপনার নামটা?’
‘আমার নাম কণা।’
শুনেও মনে হয় শুনিনি। আরেকবার জানতে চাইব। আরেকবার।

ছাদে কাপড় মেলে দিচ্ছে সে। আমি তাকে দেখি আর ভাবি লিফটে কতবার ভেবেছি অন্তত নামটা জিজ্ঞেস করব। করিনি।

টপ টপ করে পানি পড়ে ধোয়া কাপড় থেকে। ছাদ একটু একটু ভিজে যাচ্ছে, ওর পায়ের কাছেও ছিটকে পড়ছে পানি। কাপড়গুলো ঠিকমত নিঙরানো হয়নি।
‘আপনাদের কাজের মানুষ নাই, আপনি কেন ছাদে?’
‘আপনাকে দেখতে আসছি!’ আবারও সেই বিদ্রূপ হাসি।
আমি কিছু বলি না। তার পায়ের কাছে পানির ঝরে যাওয়া দেখি। একপায়ে নূপুর। কেমন কালচেমতো। রুপালি রঙ ছিল বোধহয়, অনেকদিনে হয়তো কালচে হয়ে গেছে।
‘কী ভাবছেন? ব্যাপারটা ভেবে দেখেন, আর একটু খোঁজ টোজ নিয়েন, কী করে, কোথায় যায় ওরা? আশরাফকে আজকাল কেমন কেমন যেন মনে হয় আমার!’
‘আপনি তো খোঁজ নিচ্ছেন নিয়মিত, আমি আর কী করব?’
‘এটা তো আমার হাজব্যান্ড নিয়ে কথা না শুধু, আপনার ওয়াইফও জড়িত! দুজন কী করছে, আপনি খোঁজ নিবেন না? বউয়ের জন্য ভালোবাসা নাই?’
‘না নাই! তো?’ আমার হাসতে হাসতে চোখে পানি চলে আসে!

কী বলে এই মেয়েটা! আমার বিশ্বাস হয় না, মিঠু আর ওর বরকে নিয়ে কী সব রটনা! সত্যি, আমার বিশ্বাস হয় না। বিয়ের পর থেকে মিঠুকে যতটা চিনি এমন একটা কিছু ওর দ্বারা অসম্ভব! অন্যরকম মেয়ে সে। কণা মেয়েটা সন্দেহপ্রবণ খুব। তবে বোকা। তাও ওকে আমার ভালো লেগে। এক ধরনের ইন্নোসেন্স আছে! আমি তাও হাসি। কণাও হাসে তবে বিদ্রূপ হাসি।

বালতি নিয়ে চলে যাচ্ছে সে। তারে দেওয়া কাপড়গুলো বাতাসে নড়ে উঠলেও, ভারী চাদরটা নড়ছে না। হালকা প্রিন্টের আকাশী চাদর। ছাদের দরজা খুলে একবার পেছন ফিরে তাকায় কণা।
‘আবার দেখা হবে, আমি আসি।’ চলে যাচ্ছে সে। ছাদের সিঁড়িঘরের দরজা শব্দ করে বন্ধ করে কণা।
বলতে গিয়েও বলিনি, যেও না। আবার কী ভাবে! তুমি-টুমি করে বললে। আমি আসলে ওকে তুমি করে বলতেই পারি। বয়সে অনেক ছোট হবার কথা। দেখে তো তাই মনে হয়! নাকি শুকনো গড়নে বয়সটা ধরা যায় না। মুখটাও মিষ্টি। হাসলে গালে ছোট্ট একটা টোল পড়ে।

ঘরে ফিরে যাব তাই ছাদের চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়েছি কেবল। কণা এসে আমার ক্র্যাচটা তুলে দিলো। আস্তে আস্তে হেঁটে যাচ্ছি। লিফটের কাছে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। এক্সিডেন্টে দুটো পাই ভেঙেছে যদিও, তাও বাঁ পায়ে কিছুটা জোর পাই। ডান পায়ের ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলি মাঝে মাঝে। এখনই পড়ে যাচ্ছিলাম আর ও এসে হাতটা ধরল। আরো এগিয়ে আসে কণা। মেয়েটার ভয় করে না? এভাবে অজানা কারো এত কাছাকাছি আসতে? আমি পেছনে যাই, লিফট ঘেঁষে দাঁড়াই। আরো কিছুক্ষণ থেমে ছিল লিফট, আমি দোতলার বাটনটায় ঠেঁসে ধরি, আমাকে ঘরে যেতে হবে। কণার চুলের গন্ধে মাতাল হয়ে যাচ্ছি যে আমি! আবার হাসে, টোল পড়া গাল, চুলগুলো সারা মুখ ঢেকে আছে। আমি সরিয়ে দিতে গেলে বলে, ‘থাক, পড়ে যাবেন তো!’
‘আপনি সামলে নেবেন’, আমিও হাসি, লিফটের দরজা খুলে যায়। খরগোশটা কোথা থেকে দৌড়ে এসে কণার কোলে ওঠে। খালি বালতিটা ফেলে দিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে কণা। হুম! ও তাহলে কণার পোষা খরগোশ! আহ বেশ ভালো লাগছে কণার কোলে।

ইতোমধ্যে কণা এসেছিল আমাদের ফ্ল্যাটে দুবার, খরগোশটাকে নিয়ে যেতে, আম্মার সঙ্গে জমিয়ে আলাপ হলো ওর। কিছু সুপারি গুঁড়ো করে দিয়ে গেল সে। আম্মা আজকাল দাঁতের জন্য পান-সুপারি খেতেই পারে না বললে চলে। কণাকে খুব পছন্দ হয়েছে আম্মার।
‘মেয়েটা খুব সরল, আর এই খরগোশটাই বুঝি ওর জীবন।’ আম্মা হাসে আর বলে।

মিঠু ঘরে ফিরতে এখনো তিনঘণ্টা বাকি। ঘড়ি দেখি। এটা ঠিক আমার অপেক্ষা নয়। কিছু জমে থাকা কথার অপেক্ষা। সারাদিন কী কী হয় আমি বলে যাই, মিঠু শোনে, কিছুই বলে না, কোনোদিন দু’একটা হ্যাঁ-হু, কিংবা অষুধ খেয়েছি কিনা তাই জানতে চাওয়া।

টিভির অ্যাডগুলো এই দুই মাসে মুখস্থ হয়ে গেছে আমার। নেটেও থাকতে আর ভালো লাগে না। মানুষ কী সব বিষয় নিয়ে ক্যাচাল করে শুধু শুধু। ল্যাপটপে কিছু সিনেমা দেখি মাঝে মাঝে। বই-টই পড়ি না। তবে আমার অফিসের এক কলিগ তিন চারটা বই দিয়ে গেল সেদিন তাই উল্টে পাল্টে দেখছি আজকাল। গতকাল ডাক্তার বললেন, আরো দু’মাস হয়তো লাগবে ভালো হতে। এভাবে ঘরে বসে বসে আর ভালো লাগছে না। আমি পাগল হয়ে যাব। অফিসে বসকে বললাম বাড়িতে কিছু কাজ টাজ দেওয়া যায় কিনা। তিনি হেসে বলেন, ‘সাইফ বিশ্রাম নাও তুমি, দশ বছরে তোমাকে ছুটি নিতেও দেখিনি তেমন একটা। ফিরে এসে কাজ কোরো।’

আমি আর কী বলি। মন খারাপ করে বসে থাকি। ভাবছি নাহিদদের ওখানটায় যাবো। ওর চিটাগাংয়ের বাসায় যাওয়া হয়নি আমার।

নাহিদ আমার পিঠাপিঠি বোন। ছোট হলেও আমাকে বড়দের মতোই শাসন করে নাহিদ। এতবার যেতে বলছে বেড়াতে, হয়ে উঠেনি। ঘরে বসে আর ভালো লাগছে না। আম্মা যেতে রাজি হলেই হলো!

মিঠু অফিস থেকে ফিরেছে কেবল। চা খেতে খেতে আমি চিটাগাং যাওয়ার কথা বলি। আমাদের তিনজনের একসঙ্গে যাওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে ‘না’ বলে চুপ করে থাকে মিঠু।
‘কাউকে সঙ্গে নিয়ে যাও, মা একা তোমাকে সামলাতে পারবে না। আছে এমন কেউ?’
‘হুম আছে।’
‘কে সাইফ, তোমার অফিসের কোন স্টাফ? দুই তিনদিনের জন্য হলে তো যেতেই পারে।’
‘না অন্য কেউ।’
‘কে?’

আমি কণার কথা ভাবি। ও কি যাবে আমার সঙ্গে? মিঠুকে কিছুই বলি না যদিও। আবারও ভাবছি কণা যদি যেতে পারে। তাও কি হয়! ওর বর ওকে যেতে দেবে কি? কখনোই না!

খরগোশটা আবার কোথা থেকে যেন এলো। মিঠুর চেয়ারের পাশে এসে দাঁড়ায়। অনেকটা সময়।
‘ওকে দিয়ে আসি ওই ফ্ল্যাটে।’
‘তুমি জানো এটা কাদের খরগোশ?’
‘হ্যাঁ দেখেছি একটা মহিলার কাছে, মনে হয় উনি আমাদের উল্টো দিকেই থাকেন।’
‘তুমি চেনো ওদের মিঠু?’
‘না সেরকম না। আশারাফ সাহেবকে চিনো না? উনি তো আমাদের পাশের অফিসে কাজ করেন ‘
‘ওহ!’
আশারাফ মানে কণার বর! ওর থেকেই নামটা শোনা। আমি একবার ভাবি জিজ্ঞেস করব মিঠুকে। কিন্তু কী যে বলি!

মিঠু খরগোশটা কোলে তুলে নিয়ে যায়। আমিও যাই, তারপর কণাদের দরজার পাশে থেমে যাই। কণাকে ভাবছি এখন। ওর ফোন নম্বরটা জানা থাকলে চিটাগাং যাওয়ার কথা বলতাম। কী সব যে ভাবছি!

আজকাল ছাদে প্রায়ই দেখা হয় ওর সঙ্গে। টুকটাক গল্প করি। প্রতিবারই আমাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যায় কণা। আজ সিঁড়িঘরেই দেখা হলো কণার সঙ্গে। আমি চিটাগাং যাওয়ার কথা বলতেই রাজি হয়ে গেল! ওর বর বা বাড়ির অন্যরা কে কী বলবে এ কথা বলতেই কণা বলে, ‘টিকিট কবে করবেন? আর ভাবতে হবে না ওর কথা, আমি ম্যানেজ করে নেব।’
‘বলেন কী! আমি তো এমনি এমনি বললাম আপনাকে। আমার বোনের বাড়িতে যাব, আম্মা বুড়ো মানুষ, কেউ সঙ্গে গেলে হেল্প হতো একটু। তাই ভাবলাম আপনি যদি যেতে চান!’
‘ভাবতে হবে না, আমি যাব বলেছি তো!’
‘আচ্ছা মিঠুকে কী বলব আমি, বলেন তো?’
‘সেটাও কি আমাকে বলে দিতে হবে?’ সে কি হাসি কণার!

আমি জানি না কণা কী চায়। আমি অস্থির হয়ে আছি। কী করব বুঝতে পারছি না। আম্মাকে রাজি করালাম, ইনফেক্ট আমার ছোটবোন নাহিদই রাজি করাল আম্মাকে ফোনে। মিঠু তেমন কিছু বলল না। তবে কণার কথা কাউকে কিছু বলিনি।

‘নাহিদরা স্টেশন থেকেই নিয়ে যাবে আমাদের কথা চিন্তা করো না।’
‘তুমি কষ্ট করে যেতে পারলে আমার কী বলো? আমি তো যেতে পারব না তুমি জানো। অফিসে অনেক কাজ আমার।’

মিঠুর কথা শুনে এখন আর কষ্ট পাই না। নীরবতা বলি কিংবা নিষ্ঠুরতা এ আমার সয়ে গেছে! বিশেষ করে এই দু’মাসে আমার সবকিছুই কেমন অভ্যাস হয়ে গেছে।

কণা সঙ্গে যেতে চায় এ কথাটা আম্মাকে বলব কিনা ভাবছি। না থাক। কী হয় দেখি। আমার তো বিশ্বাসই হয় না স্বামী সংসার রেখে ও আমাদের সঙ্গে যেতে পারবে। তাছাড়া নাহিদের বাড়িতেই বা কী বলব, কণার কি পরিচয় দেবো সেখানে?

খরগোশটা আজ সকাল সকাল এসে হাজির। অনেকটা সময় ও চুপচাপ আম্মার পাশে বসে আছে, এটা আমার অদ্ভুত লাগে। আমি বসে থাকি। ছেলেটা আর কতটা সময় মায়ের পাশে থাকে, তবে এবার এই এক্সিডেন্টের পর মা আমাকে অনেকটা আগলে রেখেছেন।

মিঠু শুধু শুক্রবারে বাড়িতে থাকে, তাও কতটুকু আর দেখি আমি। সারাটা শুক্রবার ঘুমিয়ে কিংবা টিভি দেখেই কেটে যায় ওর।

ব্যাগ গুছিয়েছি। ফাইনালি কাল চিটাগাং যাচ্ছি আমি আর আম্মা। বিকালে কণার সঙ্গে ছাদে দেখা। ও আমাদের সঙ্গে যাবে তো? ভাবছি। কিন্তু আম্মাকে তখনও বলিনি কিছুই আমি কণাও বারণ করল।
‘কণা, আম্মাকে এখন না বললে, পরে যখন আসবেন, তখন?’
‘সে আমি তখন ম্যানেজ করে নেব, খালাম্মা আমাকে পছন্দ করেন, আপনি কি জানেন না?’
‘তা ঠিক আছে, কিন্তু কণা আপনি কোনো সমস্যায় পড়বেন না তো?’
‘নাহ, এটা আমার ব্যাপার।’

অজানা এক ভীতি কাজ করে আমার মাঝে সারারাত, মিঠু কিংবা কণার বরকে নিয়ে নয় বরং নিজেকে নিয়ে। আমার এইসব কী হচ্ছে আজকাল। কণাও আমাকে প্রশ্রয় দিয়েছে। বুঝি না কিছুই, কণা তো এমনিতেই ওর বর আর মিঠুকে নিয়ে আমার কাছে নালিশ করে প্রায়। তাহলে ও কেন প্রশ্রয় দিচ্ছে আমায়? জানি না, বুঝি না কিছুই।

সকালে গাড়ি আসে নয়টায়। আমি আর আম্মা লিফটে নিচে নেমে আসি। মিঠু বারান্দা থেকেই দাঁড়িয়ে দেখে। শুক্রবার আজ। অফিস নেই মিঠুর। গাড়িতে ব্যাগ তোলা হয়েছে। কিন্তু কণাকে কোথাও দেখতে পেলাম না। গাড়িটা বেরিয়ে যেতে লাগল, আমি ছিলাম গেইটের দিকে তাকিয়ে। কণা যদি আসে। ড্রাইভারকে থামালাম একবার। দেরি হয়ে যাবে ভেবে আম্মা বলেন, ‘কিসের অপেক্ষা করোস?’
‘না কিছু না।’
গাড়িটা গলির মোড় ঘুরতেই কণাকে দেখতে পেলাম! সঙ্গে সুটকেস। আরে সে কি! ও এখানে। গাড়ি থামিয়ে বললাম, ‘এখানে যে?’
‘নিচে অপেক্ষাই করছিলাম আপনাদের। তারপর পানির বোতল কিনতে এই দোকানে এলাম, আপনি তো দেখি আমাকে না নিয়েই চলে যাচ্ছিলেন।’
‘উঠে পড়েন গাড়িতে দেরি হয়ে যাবে।’

আমাকে আর কিছু বলতে হলো না। কণাই মাকে কী সব বোঝালো পেছনের সিটে বসে বসে। আম্মাকে শুধু বলতে শুনলাম, ‘ভালো করছো, আমি তো এত চিন্তায় ছিলাম, সাইফকে একা নিয়ে বাসে এভাবে যাব কী করে তাই ভাবতেছিলাম।

‘আমার এত খারাপ অবস্থা না তো আম্মা, একটু কষ্ট হয় কিন্তু আমি তো চলাফেরা করতে পারি!’
‘কণা আসাতে আরো ভালো হইছে না?’ আম্মার কথা শুনে মুচকি হাসে কণা, টোল পড়ে ওর গালে। রোদে মুখ ঢাকে শাড়ির আঁচলে।

বাসস্ট্যান্ডে চলে এলাম। অফিসের ড্রাইভারকে বকশিস দিলো কণা। সিটগুলো ভালো পেয়েছি আমরা, তবে প্রায় ঘণ্টাখানেক পর বাস ছাড়বে। নাহিদের সঙ্গে একবার কথা হলো আম্মার, কণার কথা বলেছে কিনা আমি জানি না।

বাসে উঠতে অসুবিধা হলো। কণার কাঁধে ভর করে উঠতে গিয়ে ইতস্তত লাগে আমার। তবে চুলের মিষ্টি গন্ধটা এতটা কাছাকাছি কখনো পাইনি কণার। ধীরে ধীরে উঠি আমরা। আম্মার খুশি খুশি চেহারার কারণ আমি জানি না কিন্তু আমার ভেতর তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে!

আম্মা জানালার পাশে বসেন। তারপর কণা আর আমি বসেছি আইলের এপাশে। কণা আর আমার মাঝে এটুকু জায়গাও খালি থাকে না প্রায়। লোকজন চলাফেরা করছে একটু পরপর। মাঝামাঝিতে বসলে যা হয় আর কি।

পায়ের নুপুরটা খুঁজছি আমি। কী করে যে বলি কণাকে। একটু দেখতে পেলে ভালো লাগে। ডান পায়ে দেখতে পেলাম না তো।
‘পায়ের নুপুরটা পরেননি বুঝি আজকে?’
‘এই তো, কেন?’ বাঁ পা দেখিয়ে বলে কণা, ‘পছন্দ তাই, তোমাকে মানায়।’
কণা মুচকি হেসে জানালার দিকে ঘুরে তাকায়।

পথে থেমেছি আমরা। রেস্টুরেন্টে আমাদের জন্য খাবার অর্ডার দিচ্ছে কণা। আমার ফোন বেজে ওঠে। মিঠুর ফোন। আমি একটু দূরে সরে গিয়ে কথা বলি।
‘তোমরা কোথায়? কতদুর গিয়েছো?’
‘একটু দেরিতে বাস ছাড়ল, পৌঁছুতে দেরি হবে। থেমেছি একটা হোটেলে। খাচ্ছি আমরা।’
‘যা একটা ঘটনা হয়েছে আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে সাইফ!’
‘কোথায়?’
‘যাদের ফ্ল্যাটে খরগোশ আছে।’
‘কী বলো!’
মিঠু এক নিঃশ্বাসে অনেক কিছু বলে ফেলল। কণার কথাই বলছিল আসলে। আমি শুধু কান পেতে শুনি। ‘আশরাফের সাহেবের এক কাজিন ছিল যে, ওই খরগোশটা যার। সে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, একটা চিঠি লিখে। আর নাকি ফিরবে না কখনো!’
‘আশরাফের ওয়াইফ তো সে?’
‘আরে না তুমি কিছুই খবর রাখো না সাইফ, ওই মেয়েটা তো উনার দূরসম্পর্কের খালাতো বোন, ওর বাবা মা নেই। এদের বাড়িতেই থাকে, আশরাফ সাহেব কি ম্যারিড নাকি? ওর বড়ভাইয়ের বউ আছে। ও বিয়ে করেনি এখনো। তুমি কিছুই জানো না!’
আরো বলতে থাকে, ‘ওরা মেয়েটার ফোন বন্ধ পাচ্ছে অনেকক্ষণ থেকে, এখন নাকি থানায় যাবে ডায়রি করতে, মেয়েটা নাকি কী সব পাগলামী করে মাঝে মাঝে। তবে জানো ওর খরগোশটা কিন্তু আমাদের বাসায় এখন। দেখি আমি খুঁজে কিছু একটা খেতে দিই। মায়া লাগছে খরগোশটার জন্য।’

আমাদের বাসটা ছেড়েছে এইমাত্র। আম্মার বোধহয় ঘুম পাচ্ছে, চোখ বন্ধ করে আছেন তিনি। আমি কণার সিটের পাশে এসে দাঁড়াই।
‘বরকে কি বলেছো কণা?’
‘বলিনি কিছু আশরাফকে।’ রান্না করে এসেছি ওর পছন্দের রূপচাদা মাছ। কেউ ছিল না ঘরে, ওরা দু’ভাই বাজারে যায় শুক্রবার সকালে। আর বড় ভাবী তো ঘুমে ছিল, একটা চিঠি রেখে এসেছি ডাইনিং টেবিলে।
‘কী লিখলে?’
‘লিখেছি আর ফিরব না।’ আর হ্যাঁ খরগোশটাকে আপনাদের ফ্ল্যাটের দিকে এগিয়ে দিয়েছি সেই ভোরে। দরজা খোলাই ছিল।’
‘না ফিরে কই যাবে তুমি?’
‘আপনার সঙ্গেই যাচ্ছি আমি, আমরা ফিরে আর আসব না ঢাকায়, তাই না?’
‘খরগোশটাকে মনে পড়ছে না তোমার?’
‘না , ও তো মহামায়া, যাকে ছেড়ে দিতে হয়। সারাজীবন কাছে রাখতে নেই।’
‘আশরাফ সাহেবও কি তাই?’
কণা কিছু বলে না, খুব কাছে এসে চুলটা ঠিক করে দেয় আমার।

মিঠুর ফোনের কথা বলিনি আমি কণাকে। আম্মাকেও না। আম্মার হাতে পান দিয়ে কণা উঠে দাঁড়ায়। আমার কাছাকাছি। ওর মোবাইল ফোনটা কোল থেকে মাটিতে পরে ব্যাটারি খুলে যায়। আমি তুলতে গেলে কণা আমার হাত ধরে বারণ করে। আমার পকেটে থাকা ফোনটাও আলগোছে বন্ধ করে দিই আমি।

সন্ধ্যা হয়ে আসে। আকাশটা রক্তিম। অশান্ত। আমরা পৌঁছে গেছি। এগিয়ে যাচ্ছি, আমি আর কণা। আমার দুটো পায়েই শক্তি পাই। হেঁটে চলার শক্তি।

তবুও কণাকে ছুঁতে পারব বলে একটু খুঁড়িয়ে হাঁটতে ইচ্ছে হলো আরো কিছুকাল।

আপনার মতামত লিখুন :

জহির রায়হান : দেশপ্রেমিক ও সমাজ-সচেতন এক শিল্পী-প্রতিকৃতি

জহির রায়হান : দেশপ্রেমিক ও সমাজ-সচেতন এক শিল্পী-প্রতিকৃতি
অসাধারণ চলচ্চিত্র ও শৈল্পিক সাহিত্যকর্মের স্রষ্টা হিসেবে আজও স্মরণীয় জহির রায়হান

মাত্র ৩৬ বছর বয়সের জীবনেই জহির রায়হান নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী একজন কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র-পরিচালক হিসেবে। প্রচণ্ড বক্তব্যধর্মী ও জীবনমুখী তাঁর চলচ্চিত্রগুলো নান্দনিকতা ও কৌশলগত মানের দিক থেকে এখনো স্মরণীয় হয়ে টিকে আছে। অনুপ্রাণিত করছে বর্তমান ও ভবিষ্যতের চলচ্চিত্রকারদের। তেমনি মাত্র আটটি উপন্যাস লিখেই তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লেখক হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছেন। ‘হাজার বছর ধরে’ দেশের সাহিত্য ও চলচ্চিত্রাঙ্গনে তাঁর পথ চলার কথা থাকলেও, ১৯৭২ সালে নিরুদ্দেশের ‘বরফ গলা নদীতে’ হারিয়ে যাওয়ার পর ফিরে আসেননি আর। আজ এই বহুপ্রজ বিরল প্রতিভার ৮৪তম জন্মদিন।

জহির রায়হানের প্রকৃত নাম মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। জন্ম ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর মজুপুর গ্রামে। জহির রায়হান তাঁর সাহিত্যিক নাম। এ নামেই তিনি সুপরিচিত। তাঁর শৈশব কেটেছে কলকাতায়। দেশ বিভাগের পর ঢাকায় আসেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে বাংলায় এমএ করেন জহির। ছাত্রাবস্থায়ই তাঁর সাহিত্যিক ও সাংবাদিক জীবন শুরু হয়। ১৯৫০ সালে তিনি যুগের আলো পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি খাপছাড়া, যান্ত্রিক, সিনেমা ইত্যাদি পত্রিকাতেও কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি সম্পাদক হিসেবে প্রবাহ পত্রিকায় যোগ দেন। এই সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাই হয়তো তাঁর ভেতরে আরো শক্তভাবে গেঁড়ে দেয় লেখক হওয়ার বুনিয়াদ।

১৯৫৫ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’ প্রকাশিত হয়। কিন্তু, তিনি যে ছিলেন একজন বহুমাত্রিক মানুষ। চলচ্চিত্রের প্রতি ছিল তাঁর মনের ভেতরে গভীর ভালোবাসা। তাই, চলে আসলেন চলচ্চিত্রাঙ্গনে। চলচ্চিত্র জগতে তার পদার্পণ ঘটে ১৯৫৭ সালে, ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে। সহকারী হিসেবে আরো কাজ করেন সালাউদ্দীনের ছবি—‘যে নদী মরুপথে’-তেও। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম তাকে ‘এ দেশ তোমার আমার’-এ কাজ করার আমন্ত্রণ জানান; এ ছবির নামসংগীত রচনা জহির রায়হানের হাতেই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207266898.jpg

◤ ‘বেহুলা’ সিনেমার সেটে নির্দেশনা দিচ্ছেন জহির ◢


সহকারী পরিচালক হিসেবে সফলভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে পরিচালক হিসেবে কাজ করার প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল। ১৯৬১ সালে তিনি রুপালি জগতে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’ নির্মাণ করেন। এটি অবশ্য ছিল উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র। পরের বছর মুক্তি পায় তার প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র ‘বাহানা’। এরপর ১৯৬৬ সালে ‘বেহুলা’, ১৯৬৭-তে ‘আনোয়ারা’, ১৯৭০-এ ‘জীবন থেকে নেওয়া’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘লেট দেয়ার বি লাইট’-এর মতো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। 

চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি, সাহিত্যিক হিসেবেও তাঁর কলম সচল ছিল মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত। অনেক কালজয়ী উপন্যাস তিনি উপহার দিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে : ‘বরফ গলা নদী’, ‘আর কত দিন’, ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, ‘হাজার বছর ধরে’, ‘আরেক ফাল্গুন’, ‘কয়েকটি মৃত্যু’, ‘তৃষ্ণা’, ‘সূর্যগ্রহণ’ ইত্যাদি। সংগ্রামমুখর নাগরিক জীবন, আবহমান বাংলার জনজীবন, মধ্যবিত্তের আশা-আকাঙ্ক্ষা-বেদনা প্রভৃতি তাঁর রচনায় শিল্পরূপ পেয়েছে। সাহিত্যকৃতীর স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (মরণোত্তর) দেওয়া হয়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207304659.jpg
◤ প্রথম স্ত্রী সুমিতা দেবীর সাথে জহির রায়হান ◢


ব্যক্তিজীবনে দুবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন জহির রায়হান। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন চিত্রনায়িকা সুমিতা দেবী। ১৯৬১ সালে বিয়ে করেন তারা। প্রথম পরিবারে অনল রায়হান এবং বিপুল রায়হান নামে দুই পুত্র সন্তানের জন্ম হয়।

সুমিতা দেবীর সাথে বিচ্ছেদের পর ১৯৬৮ সালে আরেক জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা সুচন্দার সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন তিনি। দ্বিতীয় পরিবারে রয়েছেন তার দুই সন্তান অপু ও তপু। তার বড় ভাই প্রয়াত লেখক শহীদুল্লা কায়সার। তিনি লেখক ও রাজনীতিক পান্না কায়সারের স্বামী এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী শমী কায়সারের বাবা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207352881.jpg

◤ জহির রায়হানের আলোচিত, নন্দিত ও প্রভাবশালী চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’র পোস্টার ◢


শুধুমাত্র কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার হিসেবে জহির রায়হানকে দেখলে সবটুকু যেন বলা হয় না তাঁর ব্যাপারে। একজন সমাজ ও রাজনীতি সচেতন শিল্পী ছিলেন তিনি। নিজেও স্বশরীরে অংশ নিয়েছেন দেশ মাতৃকার বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন জহির রায়হান। উপস্থিত ছিলেন একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আমতলা সমাবেশে। এসময় তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে জেলে পুরে দেয়। এই জেলে বসেই তিনি ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’ রচনা করেন। ভাষা আন্দোলন তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যার ছাপ দেখতে পাওয়া যায় তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেওয়া’–তে। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। কলকাতায় তার নির্মিত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেওয়ার বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয় এবং চলচ্চিত্রটি দেখে ভূয়সী প্রশংসা করেন সত্যজিত রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা এবং ঋত্বিক ঘটক প্রমুখ খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকাররা। সে সময়ে তিনি চরম আর্থিক দৈন্যের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হতে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করে দেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207399680.jpg
◤ প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’, যা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত তৈরিতে রাখে দারুণ ভূমিকা ◢


মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী নিধনের এক অসাধারণ প্রামাণ্য দলিল ‘স্টপ জেনোসাইড’ তৈরি করেন জহির রায়হান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী বাঙালিদের দুঃখ-দুর্দশা, হানাদার পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, ভারতে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের দিনকাল প্রভৃতি এই তথ্যচিত্রে তুলে ধরা হয়েছিল। এর প্রথম প্রদর্শনী হয় এক অজ্ঞাত স্থানে, যেখানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রীপরিষদের সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরি করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছিল ‘স্টপ জেনোসাইড’। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে এখন পর্যন্ত নির্মিত ছবিগুলোর মধ্যে শিল্পগত ও গুণগত সাফল্যের দিক থেকে শীর্ষে স্থান দেওয়া হয়ে থাকে এই চলচ্চিত্রটিকে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর জহির রায়হান ঢাকায় ফেরেন। ফিরে জানতে পারেন, মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে পাক হানাদার বাহিনীর দোসর রাজাকার আল বদর বাহিনী তার বড় ভাই প্রখ্যাত লেখক শহীদুল্লাহ কায়সারকে অপহরণ করেছে। নিখোঁজ ভাইকে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করেন জহির। ১৯৭২ সালের ২৮ জানুয়ারি সকালে এক রহস্যময় ব্যক্তি তাকে ফোন করে জানান, তার ভাইকে মিরপুর ১২ নাম্বারে একটি হাউজিং সেক্টরে আটকে রাখা হয়েছে। একথা শুনেই তিনি ভাইয়ের খোঁজে মিরপুর যান এবং আর ফিরে আসেননি।

জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে অনেক ধরনের থিওরি রয়েছে। এমন বলা হয় যে, তিনি একটি সার্চ পার্টি নিয়ে মিরপুরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। সেখানে পাক হানাদার বাহিনীর কিছু সদস্য ছদ্মবেশে ছিল। তারা তাকে লুকিয়ে আটক করে হত্যা ও গুম করে ফেলে। তার ছোট ভাই হাবীবের ভাষ্যমতে, তিনি জহির রায়হানকে মিরপুর পুলিশ স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে এসেছিলেন। এরপর আর তার দেখা পাননি। এমন খবরও শোনা যায়, মিরপুর পুলিশ স্টেশন থেকে জহির রায়হানকে জানানো হয়েছিল, মিরপুর ১২ নাম্বারে কিছু পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকার ছদ্মবেশে লুকিয়ে আছে। সেখানে না গিয়ে আগে তাকে কল ট্রেস করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর তিনি নাকি ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশ স্টেশন থেকে বেরিয়ে যান। আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207448145.jpg

◤ ১৯৭২-এর পর ‘আরেক ফাল্গুন’ হয়তো ‘কখনো আসেনি’ তবে দেশ ও সমাজ-সচেতন শিল্পীদের এগিয়ে যাওয়ার বড় প্রেরণা তিনিই ◢


এ ব্যাপারে বিভিন্ন সময় আরো অনেক গুজব ছড়িয়েছে। এগুলোর কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা, তা যাচাই করা মুশকিল। তাঁর মৃতদেহও কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই নিশ্চিত হওয়া যায়নি কিভাবে মারা গিয়েছেন তিনি। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি তার মৃত্যুদিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

স্বাধীনতার ঠিক পরপর, সেই ৭২ সালেই জহির রায়হান চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলেও তাঁর অসাধারণ, শৈল্পিক ও নান্দনিক সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্রের জন্য জাতি ঠিকই তাকে স্বরণে রেখেছে। চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য কয়েক বছর পর, ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে প্রদান করে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদক (মরণোত্তর)। ১৯৯২ সালে প্রদান করে সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার। আজও তাঁর সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্রগুলো টিকে আছে অমূল্য সম্পদ হয়ে। ১৯৭২-এর পর ‘আরেক ফাল্গুন’ হয়তো ‘কখনো আসেনি’ জহির রায়হানের জীবনে; তবে দেশ ও সমাজ সচেতন শিল্পীদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার বড় প্রেরণা তিনিই। এই ক্ষণজন্মা প্রতিভার জন্মদিনে তাঁর প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম!

রেমব্রান্ট ও ভারমিয়ার : সপ্তদশ শতকের দুই ডাচ শিল্পী

রেমব্রান্ট ও ভারমিয়ার : সপ্তদশ শতকের দুই ডাচ শিল্পী
ইউহানেস ভারমিয়ার┇রেমব্রান্ট

রেমব্রান্ট
১৬০৬-১৬৬৯

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114164805.jpg
◤ রেমব্রান্ট ◢


ছবি আঁকা শিখতে হলে কাকে গুরু মানবেন? রেমব্রান্ট বলেছেন, কেবল একমাত্র গুরু—প্রকৃতি। তিনি আরো বলেছেন পেইন্টিং হচ্ছে প্রকৃতির দৌহিত্র, এর সাথে ঈশ্বরের সম্পর্ক। কিংবা একটি পেইন্টিংকে তখনই সমাপ্ত বলা হয়েছে যখন এর ওপর ঈশ্বরের ছায়া পড়ে।

চিত্র-সমালোচকদের জন্য রেমব্রান্ট বলেছেন, পেইন্টিং নাকে শুকবার জন্য নয়। নতুন শিল্পীদের জন্য তাঁর কথা : যা জানো তার চর্চা করতে থাকো, এটাই তোমার কাছে স্পষ্ট করে দেবে তুমি কী জানো না। যে সব বড় শিল্পীর সাথে এক নিঃশ্বাসে রেমব্রান্টের নাম উচ্চারিত হয় তারা ইতালির। রেমব্রেন্ট ডাচ; হল্যান্ডের মানুষ।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114291988.jpg

◤ মিনার্ভা ◢


 ১৬০৬ : জন্ম ১৫ জুলাই, লেইডেনে। বাবামার দশ সন্তানের অষ্টম। পুরো নাম রেমব্রান্ট হার্মেনসুন ভ্যান রিইন।
১৬১৩ : ল্যাটিন স্কুলে ভর্তি।
১৬২০ : ১৪তম জন্মদিনের ২ মাস আগে লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, তখনও ল্যাটিন স্কুলের পাঠ অব্যাহত।
১৬২৪ : ইতিহাস, অলঙ্কার-শাস্ত্র অধ্যয়ন।
১৬২৫ : লেইডেনে নিজস্ব স্টুডিও স্থাপন, দ্য স্টোনিং অব স্টেপেন অঙ্কন
১৬২৯ : প্রথম আত্মপ্রতিকৃতি অঙ্কন।
১৬৩৪ : সাস্কিয়া উইলেনবার্গকে বিয়ে।
১৬৪২ : সাস্কিয়ার মৃত্যু, শিশুপুত্র টাইটাসের জন্য গির্জে ডির্কসকে আয়া নিয়োগ; নাইট ওয়াচ অঙ্কন।
১৬৪৭-১৬৫০ : ডির্কসের সাথে শারীরিক সম্পর্ক, বিরোধ, সাস্কিয়ার অলঙ্কার বন্ধক দেওয়ার কারণে রেমব্রান্টের চেষ্টায় তাকে সংশোধনাগারে প্রেরণ।
১৬৫৪ : নতুন হাউসমেইড হেন্ডরিক স্টোফেলস-এর সাথে সম্পর্ক, কন্যা সন্তান কর্নেলিয়ার জন্ম, বাথশেইবা অ্যাট হার বাথ অঙ্কন।
১৬৫৬ : দেওলিয়া ঘোষণা, ক্রোক পরোয়ানা জারি।
১৬৫৮ : বাড়ি বেচে ভাড়া বাড়িতে গমন।
১৬৬৯ : মৃত্যু ২ নভেম্বর। ওয়েস্টরকার্ক সিমেট্রিতে ভাড়া করা অজানা কবরে সমাহিত। 」

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114473772.jpg

◤ আব্রহাম’স স্যাক্রিফাইস ◢


চিত্রশিল্পের ইতিহাসের দিকে যাদের নজর তারা খুব ভালোভাবেই জানেন সপ্তদশ শতকের ‘ডাচ গোল্ডেন এজ’-এর স্রষ্টাদের নাম বলতে শুরু করলেই রেমব্রান্টের নাম এসে যায় এবং প্রায় সকলে সেই সোনালি যুগে আঁকা নাইট ওয়াচ চিত্রটির উদাহরণ দেন। অথচ এ ছবিটির জন্য তিনি লাঞ্ছিত হয়েছেন। ছবির বিষয় রাতের প্রহরা, অর্থের বিনিময়ে যাদের জন্য এটি আঁকতে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন তারা কেউই রেমব্রান্টের কাজটি পছন্দ করেননি।

এই ছবিতে আলো পড়েছে ঠিক মাঝখানে, দুজন অফিসারের উপর আর বর্ষাধারী রক্ষীরা সব আঁধারে অস্পষ্ট। ফরমায়েশটা তাদেরই, অথচ তাদের ভালো করে দেখা যাবে না আর তারা চাঁদা তুলে শিল্পীর টাকা দেবে এটা তো হতে পারে না। খুব বদনাম হলো শিল্পীর। ছবি আঁকার ফরমায়েশ পাওয়া মারাত্মক হ্রাস পেল। স্বচ্ছল পরিবার থেকে আসা একটু বেহিসেবি গোছের এই শিল্পী দেওলিয়া হয়ে গেলেন, বাড়ি বিক্রি করলেন, পারিবারিক অশান্তিও তাঁকে ছাড়ল না। সেই নাইট ওয়াচ-এর দাম এখন কত মিলিয়ন ডলার হতে তা গবেষণার বিষয়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114622015.jpg
◤ দ্য নাইট ওয়াচ ◢


রেমব্রান্টের স্মরণীয় উক্তি : ওরা আমাকে নিয়ে যেভাবে ছবি আঁকাতে চায় আমি সেভাবে আঁকতে পারি না, এটা ওরাও জানে।

শিল্পীদের বিশ্বাস নেই
রেমব্রান্ট জেনোয়া থেকে দুটি ছবির ফরমায়েশ পেয়েছিলেন, একটি বাণিজ্যিক জাহাজের ক্যাপ্টেন ভিভিয়ানো দরদাম এবং সরবরাহের তারিখ ঠিক করেন। তিনি এসে দেখেন কাজ শেষ হয়নি, অধিকন্তু শিল্পী বেশি দাম হাঁকছেন। ক্যাপ্টেন পোর্ট অব আমস্টার্ডাম থেকে ক্রেতাকে লিখলেন : কাজের গতি অত্যন্ত মন্থর, শিল্পীরা সাধারণত তাই করে থাকে, তাছাড়া এই লোকটির বিশ্বাস নেই। এখন দুটি ছবির জন্য ৩০০০ গিল্ডার চাইছেন, অথচ আমার সাথে দর ঠিক হয়েছিল ১২০০ ডলার। তার উপর ভরসা রাখা যায় না।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114664684.jpg

◤ বাথশেইবা অ্যাট হার বাথ ◢


রেমব্রান্টের ছবির ওপর চোরের নজর, গবেষকেরও
১৬৩০-এ আঁকা রেমব্রান্টের বাবার পোর্টেট—‘পোর্ট্রেট অব দ্য ফাদার’ ২০০৬ সালে জাদুঘর থেকে চুরি হয়; সাত বছর পর সার্বিয়ার একটি গির্জায় ৪ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ছবিটি উদ্ধার করা হয়। এর আগে একবার চুরি হয়েছিল, ১৯৯৬ সালে, উদ্ধার হয় স্পেনে।

রেমব্রান্টের মাস্টারপিস ‘ওল্ডম্যান ইন মিলিটারি কস্টিউম’ ছবিটির ওপর ইনফ্রারেড আলো, নিউট্রন ও এক্স-রে প্রয়োগ করে গবেষণা ২০১৩ সালে নিশ্চিত হয়েছে অন্য একটি ছবি রঙ দিয়ে ঢেকে রেমব্রান্ট এটি এঁকেছেন। নিচের ছবিটিও উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114702139.jpg

◤ দ্য অ্যানাটমি লেসন অব ডক্টর নিকোলাস টাল্প ◢


বার্ধক্য ও যৌবন
রেমব্রান্ট ৬৩ বছর বেঁচে ছিলেন। বার্ধক্যের সঙ্কট তিনি মোকাবেলা করেছেন, তবুও বলেছেন : বার্ধক্য সৃজনশীলতার অন্তরায় কিন্তু বার্ধক্য আমার যৌবন-স্পৃহাকে দমিয়ে রাখতে পারে না।

কয়েকটি সেরা ছবি : সেল্ফ পোর্ট্রেট সিরিজ, দ্য নাইট ওয়াচ, দ্য রিটার্ন অব দ্য প্রডিগাল সান, দ্য অ্যানাটমি লেসন অব ডক্টর নিকোলাস টাল্প, দ্য জুইশ ব্রাইড, দ্য স্টর্ম অব দ্য সি অব গ্যালিলি, মিনার্ভা, আব্রহাম’স স্যাক্রিফাইস, বেলথাজার্স ফিস্ট, ডায়ানা, ফিলোসোফার ইন মেডিটেশন, বাথশেইবা অ্যাট হার বাথ, দ্য ব্লাইডিং অব স্যামসন, দ্য কন্সপিরেসি অব ক্লডিয়াস সিভিল, লুক্রেশিয়া।

 ✨

ইউহানেস ভারমিয়ার
১৬৩২-১৬৭৫

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114784531.jpg
◤ ইউহানেস ভারমিয়ার ◢


‘যে প্রভাতে পৃথিবী সৃষ্টি হয়, তখন ঈশ্বরের সামনে নিশ্চয়ই ভারমিয়ারের শিল্পকর্মগুলো ছিল’—ফ্রেডেরিক সোমার এভাবেই শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ডাচ চিত্রশিল্পের স্বর্ণযুগের শিল্পী ইউহানেস ভারমিয়ারকে। অথচ এই শিল্পীর কাজের খবর তাঁর জীবদ্দশায় নিজ শহর ডেলফট-এর বাইরে কোথাও পৌঁছেনি। তিনি ইয়ান বা ইউহান ভারমিয়ার নামেও পরিচিত। তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কিংবা কোনো শিল্পগুরুর কাছে শিক্ষালাভ করার সুযোগ হয়নি, তিনি নিজেও কোনো স্কুল খোলেননি বা নিজ হাতে অনুগত আঁকিয়ে শিষ্যও তৈরি করেননি। অন্যদিকে তাঁর ছবিগুলো কেবল একজন ক্রেতাই নিজ সংগ্রহে রাখায় শিল্প-সমঝদারদের অন্য কেউ তাঁর সম্পর্কে জানতেও পারেননি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114892303.jpg

◤ গার্ল উইথ অ্যা ইয়ার রিং ◢


১৬৩২ : অক্টোবরে জন্ম, ৩১ অক্টোবর ব্যাপটাইজড।
১৬৫২ : বাবার মৃত্যু।
১৬৫৩ : ক্যাথরিনা বোলনেসকে বিয়ে এপ্রিলে; বিয়ের আগে ক্যাথলিক চার্চে দীক্ষা গ্রহণ; চিত্রশিল্পী সংসদে যোগদান।
১৬৫৭ : পিটার ভ্যান রুভেন নামক একজন প্যাট্রন লাভ।
১৬৬১ : পেইন্টার্স গিল্ডের সভাপতি নির্বাচিত ; ১৬৬৩ ১৬৭০, ১৬৭১-এ পুনর্নির্বাচিত।
১৬৭২ : কিছু ইতালীয় চিত্রকলার যথার্থতা সনাক্ত করতে হেগ গমন।
১৬৭৫ : আর্থিক দুরবস্থা কাটাতে ১০০০ গিল্ডার ধার গ্রহণ, সে বছরই মৃত্যু। ১৫ ডিসেম্বর ওল্ড চার্চে সমাহিত। 」

গার্ল উইথ এ পার্ল ইয়াররিং
গার্ল উইথ এ পার্ল ইয়াররিং-কানে মুক্তোর দুল পরিহিত এ ছবিটি ভারমিয়ারের সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ। সপ্তদশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই ছবিকে বলা হয় ‘দ্য মোনালিসা অব দ্য নর্থ’ কিংবা ‘ডাচ মোনালিসা’। কারো ফরমায়েশে তিনি এ ছবিটি এঁকেছেন বা নিজস্ব কোনো নারীকে চিত্রায়িত করেছেন তা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।

১৮৮১ সালে হেগে অনুষ্ঠিত একটি নিলামে মাত্র দুই গিল্ডার ৩০ সেন্টে ছবিটি বিক্রি হয়ে যায়। ক্রেতার কোনো উত্তরাধিকার না থাকায় শেষ পর্যন্ত আজকের এ বিশ্বখ্যাত ছবিটি ১৯০২ সালে মরিতসুইস জাদুঘরে দান করে দেওয়া হয়।

ট্র্যাসি ক্যাভেনিয়র এ ছবিটিকে নিয়ে একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনা করেন গার্ল উইথ এ পার্ল ইয়াররিং (১৯৯৯) নামে। ২০০৩ সালে চলচ্চিত্রায়িত হলে তা গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড লাভ করে।

গার্ল উইথ এ রেড হ্যাট-লাল টুপি পরা এই মেয়েটিও এখন শিল্পরসিকদের কাছে পরিচিত মুখ। ভারমিয়ারের ছোট আকৃতির তেলচিত্রগুলোর একটি হয়ে ওঠে এই লাল টুপির মেয়ে। উনবিংশ শতকেই অল্প কটি ছবির শিল্পী হলেও ভারমিয়ারের প্রভাব নবীন শিল্পীদের ওপর পড়তে শুরু করে।

সালভাদর দালি ভারমিয়ারের দ্য লেসমেকার নিজের মতো করে এঁকেছেন। দালির ১৯৩৪ সালের একটি অমর কাজ-‘ভারমিয়ারের প্রেতাত্মা, যা টেবিল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।’

অঙ্কনই জীবনের ব্রত
অর্থনৈতিক মন্দা, মহামারি প্লেগ এবং ছবি আঁকার পেছনে ব্যয়—পনের সন্তানের জনক ভারমিয়ারের জীবনকে বিপন্ন করে তোলে। তারপরও তিনি সেকালের সবচেয়ে দামি রঙ কিনে ছবি আঁকতেন। দারিদ্র্য জর্জরিত অবস্থায় মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে মৃত্যু, তবুও তিনি বিস্মৃত হয়ে গেলেন। তাঁর শাশুড়ির বাড়িতে দুটি কক্ষে ছবিগুলো পড়ে থাকে। গুস্তাভ ফ্লেডরিখ ভাগান ও থিওফাইল থোর-বার্জার তাঁকে পুনরাবিষ্কার করেন এবং ৬৬টি ছবি সনাক্ত করেন। তবে এর মধ্যে ৩৪টি ছবি নিয়ে সার্বজনীন সম্মতি রয়েছে যে এগুলো তাঁরই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114986807.jpg

◤ দ্য মিল্কমেইড ◢


২০০ বছর পর
তখনকার চিত্রশিল্পের ইতিহাসে তিনি প্রায় সম্পূর্ণভাবে অনুল্লিখিত ও উপেক্ষিত রয়ে যান। মৃত্যুর ২০০ বছর পর ভারমিয়ারের পুনর্জাগরণ ঘটে এবং শিল্পবোদ্ধারা স্বীকার করেন তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের একজন। গুস্তাফ ফ্রেডরিখ ভাগান এবং থিউফাইল থোরে-বার্জার পুনরাবিষ্কৃত ভারমিয়ারের ওপর প্রবন্ধ রচনা করেন। তখন থেকেই ভারমিয়ার পুনর্মূল্যায়িত হতে শুরু করেন এবং কার্যত তাঁর পুনর্জাগরণ ঘটে। তিনি হয়ে ওঠেন ডাচ স্বর্ণযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী।

তাঁর প্রায় সব ছবিই ক্যানভাসে তৈল রঙ। অত্যন্ত দামি ল্যাপিস লাজুলাই, প্রাকৃতিক আলট্রামেরিন এবং অ্যম্বর রঙ ব্যবহার করতেন। সপ্তদশ শতকের কোনো শিল্পী রঙের পেছনে এত ব্যয় করতেন না, তাঁর দারিদ্র্যের সাথে এটা মেলানো যায় না। রঙের ঔজ্জ্বল্য তাঁর ছবি চিনিয়ে দেয়।

লক্ষীমন্ত নারী ক্যাথরিনা বোলনেসকে বিয়ে করেন। তাদের চৌদ্দটি সন্তানের মধ্যে দশজন বেঁচে থাকে। আর্থিক সংকটের কারণে ক্যাথরিনা স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে তার মায়ের বাড়ি ওঠেন। সে বাড়িরই দোতলার সামনের একটি কক্ষ হয়ে ওঠে ভারমিয়ারের স্টুডিও। সেই বাড়ির একেবারে গা ঘেঁষা একটি চার্চও ছিল, তাঁর ল্যান্ডস্কেপে চার্চের উপস্থিতি দেখা যায়। ভারমিয়ারের কেবল তিনটি ছবিতে অঙ্কনের সময়কাল লেখা হয়েছে : দ্য প্রোকিউরেস (১৬৫৮), দ্য অ্যাস্ট্রোনোমার (১৬৮৮) এবং দ্য জিওগ্রাফার (১৬৬৯)।

দারিদ্র্যের ভার
দারিদ্র্য ঘোচাতে তিনি রাতভর সরাইখানাও চালিয়েছেন, কিন্তু দারিদ্র্য ঘোচেনি। সন্তানদের ভার ও দারিদ্র্যের চাপ তাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। স্ত্রী ক্যাথরিনা বলেছেন, অর্থকষ্টের চাপ সহ্য করতে না পেরে মাত্র দেড় দিনের প্রচণ্ড উন্মত্ত আচরণের পর তাঁর স্বামী মৃত্যুবরণ করেছেন। সে সময় ক্যাথরিনা ও তাঁর মায়ের দখলে এসে যায় তার ১৯টি ছবি। এর মধ্যে দুটো ছবি বিক্রি করে ঋণ শোধ করা হয়।

‘ভারমিয়ারের মতো আর কেউ নেই’—জোনাথান রিচম্যানের এই গানটি সংগীত প্রেমিকদের কাছে একজন চিত্রশিল্পীকে পৌঁছে দিয়েছে। ট্রান্সট্রোমারের কবিতাও ভারমিয়ারকে নতুন করে চিনিয়েছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566115170809.jpg

◤ গার্ল উইথ অ্যা রেড হ্যাট ◢


কয়েকটি সেরা ছবি : ডিউ ফ্রম ডেলফ্ট, দ্য ক্যাপটিভ, গার্ল উইথ অ্যা ইয়ার রিং, গার্ল ইন অ্যান্টিক কস্টিউম, গার্ল উইথ অ্যা রেড হ্যাট, দ্য গিটার প্লেয়ার, ওমেন রিডিং, অ্যা লেটার, ডায়ানা অ্যান্ড হার নিম্ফস, ইয়াং ওমেন উইথ অ্যা পিচার, দ্য লাভ লেটার, দ্য মিল্কমেইড।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র