Alexa

খরগোশ ও মহামায়া

খরগোশ ও মহামায়া

অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ

মার্বেলের মতো চোখ। ঠিক জ্বলজ্বলে নয় তবে গাঢ়। খরগোশটা শাদা। পাখির পালকের মতন। আমাদের ফ্ল্যাটে ঘুরঘুর করছে সকাল থেকেই। চেনা চেনা লাগে। হয়তো লিফটে দেখেছি কারো সঙ্গে? আমি ধরতে গেলে আম্মা থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘ওরে ধরিস না খিদা লাগছে, কিছু খাইতে দে।’

মেঝেতে রাখা এই ঝুড়িটা আমারই কেনা। কিছু গাজর রাখা, আর হলুদমতো একটা সবজি। খরগোশটা ঝুড়ির কাছে গিয়ে থামে। কিছু একটা মুখে তুলে নিল। খাচ্ছে সে।

‘এটা কি সবজি রাখার ঝুড়ি আম্মা? আমি তো আনছি সাজায়া রাখার জন্য। আপনে কী করছেন!’ আমি হেসে বলি।
‘তো কী হইছে, ছেলে আমার, কত্তকিছুর শখ তোর, আমি না হয় খরগোশটারে আদর কইরা খাওয়াইলাম। কিছু খুঁইজা পাইলাম না আর, এই ঝুড়িটা কি আর অন্য কাজে লাগে?’
‘আমারেও কিছু খাইতে দেন, তারপর ছাদে যায়া বসি। ঘরে আর ভালো লাগে না মা।’

একটু পর আম্মা একবাটি মুড়ি দেয় আমার হাতে, কড়কড়ে ভাজা। পেঁয়াজ বেরেস্তা দেওয়া। আমি খাচ্ছিলাম জানালার পাশে বসে। খরগোশটা আসে যায় চেয়ারের পাশে। মিনিটখানেক দাঁড়ায় তারপর আবার চলে যায়। মুড়ি খেতে দিলাম কিছু ওকে। নাহ খেলো না খরগোশটা! আম্মা আমার ঘরে এসে বলে, ‘তুই কী দিলি খাইতে? ওইসব খায় না খরগোশ।’ হাসতে থাকে আম্মা।

আমি ঘর থেকে বেরিয়ে লিফটের দিকে যাই। মিঠু ঘরে থাকলেও আম্মাই আমাকে এগিয়ে দেয়। ক্রাচে ভর করে হাঁটি বলে উনি ভাবেন আমি পড়ে যাব। তাই একা হাঁটতে দেন না।

ছাদে কেউ আছে বোধহয়। গুনগুন শব্দ পাই। কেউ গান গাইছে। আমি চেয়ারটাতে বসি। হঠাৎ তার সঙ্গে দেখা।

এক নিঃশ্বাসে কী কী সব বলল মেয়েটা। আমি শুনে যাচ্ছি তবে খুব হাসি পাচ্ছে আমার। সত্যি সত্যি! আমার হাসি থামিয়ে দিয়ে মেয়েটা বলে, ‘এইভাবে সবগুলা দাঁত দেখিয়ে হাসছেন যে? এটা হাসির কিছু না! আপনার কোনো চিন্তা লাগতেছে না? আপনার ওয়াইফ এভাবে আমার বরের সঙ্গে ঘুরে বেড়াবে আর আমি মেনে নেব?’ কথাগুলো বলে নিজেই হাসে মেয়েটা! তবে এটা বাঁকা হাসি। বিদ্রূপ আছে বৈকি। নামটাও জানি না তার। কী আর বলব।

প্রতিবেশিনীর চোখের দিকেই তাকাই আমি। ছাদে কাপড় শুকোতে দিতে এসে এ কী বলছে সে! ওর বরের সঙ্গে মিঠুর নাকি কী সব হচ্ছে আজকাল। আমার কি চিন্তায় পড়ে যাওয়ার কথা ছিল? এখনই ব্লাডপ্রেসার হাই হবার কথা? কই তেমন কিছুই হচ্ছে না। জানতে চাইলাম, ‘আপনি আমাদের উল্টাদিকের ফ্ল্যাটের না? আপনার নামটা?’
‘আমার নাম কণা।’
শুনেও মনে হয় শুনিনি। আরেকবার জানতে চাইব। আরেকবার।

ছাদে কাপড় মেলে দিচ্ছে সে। আমি তাকে দেখি আর ভাবি লিফটে কতবার ভেবেছি অন্তত নামটা জিজ্ঞেস করব। করিনি।

টপ টপ করে পানি পড়ে ধোয়া কাপড় থেকে। ছাদ একটু একটু ভিজে যাচ্ছে, ওর পায়ের কাছেও ছিটকে পড়ছে পানি। কাপড়গুলো ঠিকমত নিঙরানো হয়নি।
‘আপনাদের কাজের মানুষ নাই, আপনি কেন ছাদে?’
‘আপনাকে দেখতে আসছি!’ আবারও সেই বিদ্রূপ হাসি।
আমি কিছু বলি না। তার পায়ের কাছে পানির ঝরে যাওয়া দেখি। একপায়ে নূপুর। কেমন কালচেমতো। রুপালি রঙ ছিল বোধহয়, অনেকদিনে হয়তো কালচে হয়ে গেছে।
‘কী ভাবছেন? ব্যাপারটা ভেবে দেখেন, আর একটু খোঁজ টোজ নিয়েন, কী করে, কোথায় যায় ওরা? আশরাফকে আজকাল কেমন কেমন যেন মনে হয় আমার!’
‘আপনি তো খোঁজ নিচ্ছেন নিয়মিত, আমি আর কী করব?’
‘এটা তো আমার হাজব্যান্ড নিয়ে কথা না শুধু, আপনার ওয়াইফও জড়িত! দুজন কী করছে, আপনি খোঁজ নিবেন না? বউয়ের জন্য ভালোবাসা নাই?’
‘না নাই! তো?’ আমার হাসতে হাসতে চোখে পানি চলে আসে!

কী বলে এই মেয়েটা! আমার বিশ্বাস হয় না, মিঠু আর ওর বরকে নিয়ে কী সব রটনা! সত্যি, আমার বিশ্বাস হয় না। বিয়ের পর থেকে মিঠুকে যতটা চিনি এমন একটা কিছু ওর দ্বারা অসম্ভব! অন্যরকম মেয়ে সে। কণা মেয়েটা সন্দেহপ্রবণ খুব। তবে বোকা। তাও ওকে আমার ভালো লেগে। এক ধরনের ইন্নোসেন্স আছে! আমি তাও হাসি। কণাও হাসে তবে বিদ্রূপ হাসি।

বালতি নিয়ে চলে যাচ্ছে সে। তারে দেওয়া কাপড়গুলো বাতাসে নড়ে উঠলেও, ভারী চাদরটা নড়ছে না। হালকা প্রিন্টের আকাশী চাদর। ছাদের দরজা খুলে একবার পেছন ফিরে তাকায় কণা।
‘আবার দেখা হবে, আমি আসি।’ চলে যাচ্ছে সে। ছাদের সিঁড়িঘরের দরজা শব্দ করে বন্ধ করে কণা।
বলতে গিয়েও বলিনি, যেও না। আবার কী ভাবে! তুমি-টুমি করে বললে। আমি আসলে ওকে তুমি করে বলতেই পারি। বয়সে অনেক ছোট হবার কথা। দেখে তো তাই মনে হয়! নাকি শুকনো গড়নে বয়সটা ধরা যায় না। মুখটাও মিষ্টি। হাসলে গালে ছোট্ট একটা টোল পড়ে।

ঘরে ফিরে যাব তাই ছাদের চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়েছি কেবল। কণা এসে আমার ক্র্যাচটা তুলে দিলো। আস্তে আস্তে হেঁটে যাচ্ছি। লিফটের কাছে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। এক্সিডেন্টে দুটো পাই ভেঙেছে যদিও, তাও বাঁ পায়ে কিছুটা জোর পাই। ডান পায়ের ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলি মাঝে মাঝে। এখনই পড়ে যাচ্ছিলাম আর ও এসে হাতটা ধরল। আরো এগিয়ে আসে কণা। মেয়েটার ভয় করে না? এভাবে অজানা কারো এত কাছাকাছি আসতে? আমি পেছনে যাই, লিফট ঘেঁষে দাঁড়াই। আরো কিছুক্ষণ থেমে ছিল লিফট, আমি দোতলার বাটনটায় ঠেঁসে ধরি, আমাকে ঘরে যেতে হবে। কণার চুলের গন্ধে মাতাল হয়ে যাচ্ছি যে আমি! আবার হাসে, টোল পড়া গাল, চুলগুলো সারা মুখ ঢেকে আছে। আমি সরিয়ে দিতে গেলে বলে, ‘থাক, পড়ে যাবেন তো!’
‘আপনি সামলে নেবেন’, আমিও হাসি, লিফটের দরজা খুলে যায়। খরগোশটা কোথা থেকে দৌড়ে এসে কণার কোলে ওঠে। খালি বালতিটা ফেলে দিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে কণা। হুম! ও তাহলে কণার পোষা খরগোশ! আহ বেশ ভালো লাগছে কণার কোলে।

ইতোমধ্যে কণা এসেছিল আমাদের ফ্ল্যাটে দুবার, খরগোশটাকে নিয়ে যেতে, আম্মার সঙ্গে জমিয়ে আলাপ হলো ওর। কিছু সুপারি গুঁড়ো করে দিয়ে গেল সে। আম্মা আজকাল দাঁতের জন্য পান-সুপারি খেতেই পারে না বললে চলে। কণাকে খুব পছন্দ হয়েছে আম্মার।
‘মেয়েটা খুব সরল, আর এই খরগোশটাই বুঝি ওর জীবন।’ আম্মা হাসে আর বলে।

মিঠু ঘরে ফিরতে এখনো তিনঘণ্টা বাকি। ঘড়ি দেখি। এটা ঠিক আমার অপেক্ষা নয়। কিছু জমে থাকা কথার অপেক্ষা। সারাদিন কী কী হয় আমি বলে যাই, মিঠু শোনে, কিছুই বলে না, কোনোদিন দু’একটা হ্যাঁ-হু, কিংবা অষুধ খেয়েছি কিনা তাই জানতে চাওয়া।

টিভির অ্যাডগুলো এই দুই মাসে মুখস্থ হয়ে গেছে আমার। নেটেও থাকতে আর ভালো লাগে না। মানুষ কী সব বিষয় নিয়ে ক্যাচাল করে শুধু শুধু। ল্যাপটপে কিছু সিনেমা দেখি মাঝে মাঝে। বই-টই পড়ি না। তবে আমার অফিসের এক কলিগ তিন চারটা বই দিয়ে গেল সেদিন তাই উল্টে পাল্টে দেখছি আজকাল। গতকাল ডাক্তার বললেন, আরো দু’মাস হয়তো লাগবে ভালো হতে। এভাবে ঘরে বসে বসে আর ভালো লাগছে না। আমি পাগল হয়ে যাব। অফিসে বসকে বললাম বাড়িতে কিছু কাজ টাজ দেওয়া যায় কিনা। তিনি হেসে বলেন, ‘সাইফ বিশ্রাম নাও তুমি, দশ বছরে তোমাকে ছুটি নিতেও দেখিনি তেমন একটা। ফিরে এসে কাজ কোরো।’

আমি আর কী বলি। মন খারাপ করে বসে থাকি। ভাবছি নাহিদদের ওখানটায় যাবো। ওর চিটাগাংয়ের বাসায় যাওয়া হয়নি আমার।

নাহিদ আমার পিঠাপিঠি বোন। ছোট হলেও আমাকে বড়দের মতোই শাসন করে নাহিদ। এতবার যেতে বলছে বেড়াতে, হয়ে উঠেনি। ঘরে বসে আর ভালো লাগছে না। আম্মা যেতে রাজি হলেই হলো!

মিঠু অফিস থেকে ফিরেছে কেবল। চা খেতে খেতে আমি চিটাগাং যাওয়ার কথা বলি। আমাদের তিনজনের একসঙ্গে যাওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে ‘না’ বলে চুপ করে থাকে মিঠু।
‘কাউকে সঙ্গে নিয়ে যাও, মা একা তোমাকে সামলাতে পারবে না। আছে এমন কেউ?’
‘হুম আছে।’
‘কে সাইফ, তোমার অফিসের কোন স্টাফ? দুই তিনদিনের জন্য হলে তো যেতেই পারে।’
‘না অন্য কেউ।’
‘কে?’

আমি কণার কথা ভাবি। ও কি যাবে আমার সঙ্গে? মিঠুকে কিছুই বলি না যদিও। আবারও ভাবছি কণা যদি যেতে পারে। তাও কি হয়! ওর বর ওকে যেতে দেবে কি? কখনোই না!

খরগোশটা আবার কোথা থেকে যেন এলো। মিঠুর চেয়ারের পাশে এসে দাঁড়ায়। অনেকটা সময়।
‘ওকে দিয়ে আসি ওই ফ্ল্যাটে।’
‘তুমি জানো এটা কাদের খরগোশ?’
‘হ্যাঁ দেখেছি একটা মহিলার কাছে, মনে হয় উনি আমাদের উল্টো দিকেই থাকেন।’
‘তুমি চেনো ওদের মিঠু?’
‘না সেরকম না। আশারাফ সাহেবকে চিনো না? উনি তো আমাদের পাশের অফিসে কাজ করেন ‘
‘ওহ!’
আশারাফ মানে কণার বর! ওর থেকেই নামটা শোনা। আমি একবার ভাবি জিজ্ঞেস করব মিঠুকে। কিন্তু কী যে বলি!

মিঠু খরগোশটা কোলে তুলে নিয়ে যায়। আমিও যাই, তারপর কণাদের দরজার পাশে থেমে যাই। কণাকে ভাবছি এখন। ওর ফোন নম্বরটা জানা থাকলে চিটাগাং যাওয়ার কথা বলতাম। কী সব যে ভাবছি!

আজকাল ছাদে প্রায়ই দেখা হয় ওর সঙ্গে। টুকটাক গল্প করি। প্রতিবারই আমাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যায় কণা। আজ সিঁড়িঘরেই দেখা হলো কণার সঙ্গে। আমি চিটাগাং যাওয়ার কথা বলতেই রাজি হয়ে গেল! ওর বর বা বাড়ির অন্যরা কে কী বলবে এ কথা বলতেই কণা বলে, ‘টিকিট কবে করবেন? আর ভাবতে হবে না ওর কথা, আমি ম্যানেজ করে নেব।’
‘বলেন কী! আমি তো এমনি এমনি বললাম আপনাকে। আমার বোনের বাড়িতে যাব, আম্মা বুড়ো মানুষ, কেউ সঙ্গে গেলে হেল্প হতো একটু। তাই ভাবলাম আপনি যদি যেতে চান!’
‘ভাবতে হবে না, আমি যাব বলেছি তো!’
‘আচ্ছা মিঠুকে কী বলব আমি, বলেন তো?’
‘সেটাও কি আমাকে বলে দিতে হবে?’ সে কি হাসি কণার!

আমি জানি না কণা কী চায়। আমি অস্থির হয়ে আছি। কী করব বুঝতে পারছি না। আম্মাকে রাজি করালাম, ইনফেক্ট আমার ছোটবোন নাহিদই রাজি করাল আম্মাকে ফোনে। মিঠু তেমন কিছু বলল না। তবে কণার কথা কাউকে কিছু বলিনি।

‘নাহিদরা স্টেশন থেকেই নিয়ে যাবে আমাদের কথা চিন্তা করো না।’
‘তুমি কষ্ট করে যেতে পারলে আমার কী বলো? আমি তো যেতে পারব না তুমি জানো। অফিসে অনেক কাজ আমার।’

মিঠুর কথা শুনে এখন আর কষ্ট পাই না। নীরবতা বলি কিংবা নিষ্ঠুরতা এ আমার সয়ে গেছে! বিশেষ করে এই দু’মাসে আমার সবকিছুই কেমন অভ্যাস হয়ে গেছে।

কণা সঙ্গে যেতে চায় এ কথাটা আম্মাকে বলব কিনা ভাবছি। না থাক। কী হয় দেখি। আমার তো বিশ্বাসই হয় না স্বামী সংসার রেখে ও আমাদের সঙ্গে যেতে পারবে। তাছাড়া নাহিদের বাড়িতেই বা কী বলব, কণার কি পরিচয় দেবো সেখানে?

খরগোশটা আজ সকাল সকাল এসে হাজির। অনেকটা সময় ও চুপচাপ আম্মার পাশে বসে আছে, এটা আমার অদ্ভুত লাগে। আমি বসে থাকি। ছেলেটা আর কতটা সময় মায়ের পাশে থাকে, তবে এবার এই এক্সিডেন্টের পর মা আমাকে অনেকটা আগলে রেখেছেন।

মিঠু শুধু শুক্রবারে বাড়িতে থাকে, তাও কতটুকু আর দেখি আমি। সারাটা শুক্রবার ঘুমিয়ে কিংবা টিভি দেখেই কেটে যায় ওর।

ব্যাগ গুছিয়েছি। ফাইনালি কাল চিটাগাং যাচ্ছি আমি আর আম্মা। বিকালে কণার সঙ্গে ছাদে দেখা। ও আমাদের সঙ্গে যাবে তো? ভাবছি। কিন্তু আম্মাকে তখনও বলিনি কিছুই আমি কণাও বারণ করল।
‘কণা, আম্মাকে এখন না বললে, পরে যখন আসবেন, তখন?’
‘সে আমি তখন ম্যানেজ করে নেব, খালাম্মা আমাকে পছন্দ করেন, আপনি কি জানেন না?’
‘তা ঠিক আছে, কিন্তু কণা আপনি কোনো সমস্যায় পড়বেন না তো?’
‘নাহ, এটা আমার ব্যাপার।’

অজানা এক ভীতি কাজ করে আমার মাঝে সারারাত, মিঠু কিংবা কণার বরকে নিয়ে নয় বরং নিজেকে নিয়ে। আমার এইসব কী হচ্ছে আজকাল। কণাও আমাকে প্রশ্রয় দিয়েছে। বুঝি না কিছুই, কণা তো এমনিতেই ওর বর আর মিঠুকে নিয়ে আমার কাছে নালিশ করে প্রায়। তাহলে ও কেন প্রশ্রয় দিচ্ছে আমায়? জানি না, বুঝি না কিছুই।

সকালে গাড়ি আসে নয়টায়। আমি আর আম্মা লিফটে নিচে নেমে আসি। মিঠু বারান্দা থেকেই দাঁড়িয়ে দেখে। শুক্রবার আজ। অফিস নেই মিঠুর। গাড়িতে ব্যাগ তোলা হয়েছে। কিন্তু কণাকে কোথাও দেখতে পেলাম না। গাড়িটা বেরিয়ে যেতে লাগল, আমি ছিলাম গেইটের দিকে তাকিয়ে। কণা যদি আসে। ড্রাইভারকে থামালাম একবার। দেরি হয়ে যাবে ভেবে আম্মা বলেন, ‘কিসের অপেক্ষা করোস?’
‘না কিছু না।’
গাড়িটা গলির মোড় ঘুরতেই কণাকে দেখতে পেলাম! সঙ্গে সুটকেস। আরে সে কি! ও এখানে। গাড়ি থামিয়ে বললাম, ‘এখানে যে?’
‘নিচে অপেক্ষাই করছিলাম আপনাদের। তারপর পানির বোতল কিনতে এই দোকানে এলাম, আপনি তো দেখি আমাকে না নিয়েই চলে যাচ্ছিলেন।’
‘উঠে পড়েন গাড়িতে দেরি হয়ে যাবে।’

আমাকে আর কিছু বলতে হলো না। কণাই মাকে কী সব বোঝালো পেছনের সিটে বসে বসে। আম্মাকে শুধু বলতে শুনলাম, ‘ভালো করছো, আমি তো এত চিন্তায় ছিলাম, সাইফকে একা নিয়ে বাসে এভাবে যাব কী করে তাই ভাবতেছিলাম।

‘আমার এত খারাপ অবস্থা না তো আম্মা, একটু কষ্ট হয় কিন্তু আমি তো চলাফেরা করতে পারি!’
‘কণা আসাতে আরো ভালো হইছে না?’ আম্মার কথা শুনে মুচকি হাসে কণা, টোল পড়ে ওর গালে। রোদে মুখ ঢাকে শাড়ির আঁচলে।

বাসস্ট্যান্ডে চলে এলাম। অফিসের ড্রাইভারকে বকশিস দিলো কণা। সিটগুলো ভালো পেয়েছি আমরা, তবে প্রায় ঘণ্টাখানেক পর বাস ছাড়বে। নাহিদের সঙ্গে একবার কথা হলো আম্মার, কণার কথা বলেছে কিনা আমি জানি না।

বাসে উঠতে অসুবিধা হলো। কণার কাঁধে ভর করে উঠতে গিয়ে ইতস্তত লাগে আমার। তবে চুলের মিষ্টি গন্ধটা এতটা কাছাকাছি কখনো পাইনি কণার। ধীরে ধীরে উঠি আমরা। আম্মার খুশি খুশি চেহারার কারণ আমি জানি না কিন্তু আমার ভেতর তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে!

আম্মা জানালার পাশে বসেন। তারপর কণা আর আমি বসেছি আইলের এপাশে। কণা আর আমার মাঝে এটুকু জায়গাও খালি থাকে না প্রায়। লোকজন চলাফেরা করছে একটু পরপর। মাঝামাঝিতে বসলে যা হয় আর কি।

পায়ের নুপুরটা খুঁজছি আমি। কী করে যে বলি কণাকে। একটু দেখতে পেলে ভালো লাগে। ডান পায়ে দেখতে পেলাম না তো।
‘পায়ের নুপুরটা পরেননি বুঝি আজকে?’
‘এই তো, কেন?’ বাঁ পা দেখিয়ে বলে কণা, ‘পছন্দ তাই, তোমাকে মানায়।’
কণা মুচকি হেসে জানালার দিকে ঘুরে তাকায়।

পথে থেমেছি আমরা। রেস্টুরেন্টে আমাদের জন্য খাবার অর্ডার দিচ্ছে কণা। আমার ফোন বেজে ওঠে। মিঠুর ফোন। আমি একটু দূরে সরে গিয়ে কথা বলি।
‘তোমরা কোথায়? কতদুর গিয়েছো?’
‘একটু দেরিতে বাস ছাড়ল, পৌঁছুতে দেরি হবে। থেমেছি একটা হোটেলে। খাচ্ছি আমরা।’
‘যা একটা ঘটনা হয়েছে আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে সাইফ!’
‘কোথায়?’
‘যাদের ফ্ল্যাটে খরগোশ আছে।’
‘কী বলো!’
মিঠু এক নিঃশ্বাসে অনেক কিছু বলে ফেলল। কণার কথাই বলছিল আসলে। আমি শুধু কান পেতে শুনি। ‘আশরাফের সাহেবের এক কাজিন ছিল যে, ওই খরগোশটা যার। সে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, একটা চিঠি লিখে। আর নাকি ফিরবে না কখনো!’
‘আশরাফের ওয়াইফ তো সে?’
‘আরে না তুমি কিছুই খবর রাখো না সাইফ, ওই মেয়েটা তো উনার দূরসম্পর্কের খালাতো বোন, ওর বাবা মা নেই। এদের বাড়িতেই থাকে, আশরাফ সাহেব কি ম্যারিড নাকি? ওর বড়ভাইয়ের বউ আছে। ও বিয়ে করেনি এখনো। তুমি কিছুই জানো না!’
আরো বলতে থাকে, ‘ওরা মেয়েটার ফোন বন্ধ পাচ্ছে অনেকক্ষণ থেকে, এখন নাকি থানায় যাবে ডায়রি করতে, মেয়েটা নাকি কী সব পাগলামী করে মাঝে মাঝে। তবে জানো ওর খরগোশটা কিন্তু আমাদের বাসায় এখন। দেখি আমি খুঁজে কিছু একটা খেতে দিই। মায়া লাগছে খরগোশটার জন্য।’

আমাদের বাসটা ছেড়েছে এইমাত্র। আম্মার বোধহয় ঘুম পাচ্ছে, চোখ বন্ধ করে আছেন তিনি। আমি কণার সিটের পাশে এসে দাঁড়াই।
‘বরকে কি বলেছো কণা?’
‘বলিনি কিছু আশরাফকে।’ রান্না করে এসেছি ওর পছন্দের রূপচাদা মাছ। কেউ ছিল না ঘরে, ওরা দু’ভাই বাজারে যায় শুক্রবার সকালে। আর বড় ভাবী তো ঘুমে ছিল, একটা চিঠি রেখে এসেছি ডাইনিং টেবিলে।
‘কী লিখলে?’
‘লিখেছি আর ফিরব না।’ আর হ্যাঁ খরগোশটাকে আপনাদের ফ্ল্যাটের দিকে এগিয়ে দিয়েছি সেই ভোরে। দরজা খোলাই ছিল।’
‘না ফিরে কই যাবে তুমি?’
‘আপনার সঙ্গেই যাচ্ছি আমি, আমরা ফিরে আর আসব না ঢাকায়, তাই না?’
‘খরগোশটাকে মনে পড়ছে না তোমার?’
‘না , ও তো মহামায়া, যাকে ছেড়ে দিতে হয়। সারাজীবন কাছে রাখতে নেই।’
‘আশরাফ সাহেবও কি তাই?’
কণা কিছু বলে না, খুব কাছে এসে চুলটা ঠিক করে দেয় আমার।

মিঠুর ফোনের কথা বলিনি আমি কণাকে। আম্মাকেও না। আম্মার হাতে পান দিয়ে কণা উঠে দাঁড়ায়। আমার কাছাকাছি। ওর মোবাইল ফোনটা কোল থেকে মাটিতে পরে ব্যাটারি খুলে যায়। আমি তুলতে গেলে কণা আমার হাত ধরে বারণ করে। আমার পকেটে থাকা ফোনটাও আলগোছে বন্ধ করে দিই আমি।

সন্ধ্যা হয়ে আসে। আকাশটা রক্তিম। অশান্ত। আমরা পৌঁছে গেছি। এগিয়ে যাচ্ছি, আমি আর কণা। আমার দুটো পায়েই শক্তি পাই। হেঁটে চলার শক্তি।

তবুও কণাকে ছুঁতে পারব বলে একটু খুঁড়িয়ে হাঁটতে ইচ্ছে হলো আরো কিছুকাল।

আপনার মতামত লিখুন :