Barta24

বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০১৯, ৩ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

সানফ্রানসিসকো এয়ারপোর্টের সুশি বার

সানফ্রানসিসকো এয়ারপোর্টের সুশি বার
মঈনুস সুলতান


  • Font increase
  • Font Decrease

ইস্পাতের চকচকে ট্রলিতে ক্যারিঅন লাগেজের ভারী ব্যাকপ্যাক ও ব্রিফকেস চাপিয়ে উঠে আসি সানফ্রানসিসকো শহরের আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের ডিপারচার লাউঞ্জে। একটু আগে ওয়াশিংটন ডিসি’র ড্যালাস থেকে এখানে উড়ে এসেছি। লাউঞ্জে সিংগাপুর এয়ার লাইন্সের কাউন্টার বন্ধ, খুলবে তা রাত ন’টার পর। আমার ফ্লাইট বারোটা পাঁচ মিনিটে। সানফ্রানসিসকো এয়ারপোর্টের ট্রানজিটে ঘণ্টা পাঁচেক কাটানোর কথা ভেবে হাই তুলতে তুলতে প্রসারিত ছাদের দিকে তাকাই। কাচের স্বচ্ছ কাঠামো ভেদ করে রুপালি ইস্পাতে তৈরি বিশাল এক মাছের প্রতীক সূর্যের অস্তরাগে ঝলসাচ্ছে রঙধনুর আভায়। অনেকক্ষণ একাকী বসে থাকা—তারপর এক নাগাড়ে ঘণ্টা ষোলো সিংগাপুর অব্দি উড়ে যাওয়ার কথা ভেবে আমার ভেতরে উৎসাহের আলো মরে যেতে থাকে সূর্যাস্তের ম্রিয়মাণ আভায়।

আজ খুব ভোরে মেক্সিকো সিটি থেকে বিমানে চেপেছি। ড্যালাসের ট্রানজিটেও খামোকা বসেছিলাম ঘণ্টাকয়েক। আমেরিকান এয়ার লাইন্সগুলো হালফিল আর যাত্রীদের খাবার দাবার কিছু সরবরাহ করে না। ড্যালাসেও মাইক্রোওয়েভ অভেনে গরম করা পিৎসা ভিন্ন বিশেষ কিছু জোটেনি। খানিক স্ন্যাক্সের সাথে একটু কফি পেলে ভালো হয়। একটি রেস্তোরাঁর তল্লাশে ট্রলি চালাতে গিয়ে দেখি, কাচের বিশাল সব কাসকেটে ডিসপ্লে করা হচ্ছে তালেভেরা নামক মেক্সিকোর সিরামিকে তৈরি তৈজসপত্র। এসব বাসন কোসন, ফুলদানী আর সোপ-ডিশ প্রভৃতি তৈরি হয় মেক্সিকোর পুয়েব্লা শহরে। ওখানে আমি বার দুয়েক গিয়েছিও। স্থানীয় আর্টিসানরা এসব পণ্য ফুটপাতে সাজিয়ে বসে থাকে পর্যটকদের অপেক্ষায়। একটু অবাক লাগে পুয়েব্লাতে যা ফুটপাতের পণ্য—সীমান্ত পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তা পরিণত হয়েছে প্রদর্শনযোগ্য শিল্প সামগ্রীতে। আমি মেক্সিকো একেবারে ছেড়ে এসেছি, আর হয়তো কখনো পুয়েব্লাতে যাওয়া হবে না ভেবে শূন্য লাগে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Aug/10/1533890364000.jpg
তালেভেরা সিরামিকের ডিসপ্লে

তালেভেরার বাসন কোসনের প্রদর্শনী পেরিয়ে আসতেই ফুডকোর্ট। স্টেইক্ হাউস, চীনা খাবার, হ্যামবার্গার ও ফ্রেঞ্চ-ফ্রাইয়ের ছবি সাঁটা পানশালা পেরিয়ে আসতেই চোখে পড়ে, জাপানি কেতার একটি সুশি বার। কালচে ধূসর পাথরে তৈরি তার নির্জন কাউন্টার। ছাদ থেকে ঝুলছে রুপালিতে কমলালেবু রঙের ছোপ দেওয়া দুটি তাজা মাছ। এদিকে কেউ নেই, তবে অন্যদিকের আরেকটি কাউন্টারে রাখা সতেজ ফুলের ইকেবানায় সাজানো উজ্জ্বল পরিবেশ। এদিকে খদ্দেরদের বেশ ভিড়। সবগুলো টেবিলেই খাবার নিয়ে বসে আছে কেউ না কেউ। ইকেবানার ওপাশে কিমানো পরা একটি মেয়ে সিরামিকের ছোট্ট ছোট্ট ডিশে সয়ি সচ্ ঢেলে তাদের পাশে পাশে রাখছে বাঁশপাতার ছবি আঁকা চপস্টিক। আমি দাঁড়াতেই সে যেন দেবতাকে পূজার নৈবেদ্য দিচ্ছে, এরকম নিবেদিত ভঙ্গিতে আমার হাতে তুলে দেয় খাবারের মেনু। আমি কিছুক্ষণ তা খুঁটিয়ে দেখে, তাজা টুনা মাছ কিংবা কাঁচা স্যামন মাছের বিষয়টি এভয়েড করে অর্ডার দিই নিগিরি জুশি বলে এক ধরনের ভাঁপে রান্না করা সুশি।

বসার জন্য টেবিল খুঁজে পেতে একটু সমস্যা হয়। চোখ মিরমির করা মলিন চেহারার এক আধবুড়ো আমেরিকান সাহেব বসে আছেন বড়সড় এক গোলটেবিল ঘিরে—ঘোড়ার নালের মতো দেখতে চামড়ায় মোড়া বেঞ্চে। তার পাশে বসে বছর তিন চারেকের একটি জাপানি শিশু স্যুপ-বউল থেকে চপস্টিকে খুঁটে খাচ্ছে স্প্রাউট বা শিম-বিচির তাজা আংকুর। সাহেব হাতের ইশারায় আমাকে তাদের টেবিলে বসতে বলেন। ছোট মেয়েটি নড়েচড়ে ফিক করে হেসে আমার দিকে ড্রাগনের পাপেট ঠেলে দিলে ন্যাপকিনে ছলকে পড়ে কিছু স্যুপ। মেয়েটিকে জাপানি স্যুপ কিনে দিয়ে পাশে বসে সাহেব কেন জানি দীর্ঘশ্বাস ফেলে হ্যামবার্গারে কামড় দেন। চেহারা সুরত দেখে মনে হয় ভদ্রলোক আর্থিকভাবে দরিদ্র। হয়তো কোনো রোগশোকেও ভুগছেন। তার ফ্যাকাশে চোখেমুখে ছাইবর্ণের অস্বাস্থ্যকর আভা। আর মিরমিরে চোখের পাতার উপর বেশ কটি হলুদাভ ছোট ছোট গোটা। তিনি স্ফোটকগুলো কাঁপিয়ে আমার দিকে চেয়ে বেজায় ম্লান হয়ে হাসেন। জাপানি বাচ্চাটিকে তবে কি তিনি দত্তক নিয়েছেন—এ কথা ভাবতে ভাবতে আমি ড্রাগনের পাপেটে হাত দিতেই, মেয়েটি তা ঝপ করে সরিয়ে নিয়ে তাকে কানে কানে, ‘লিসেন ড্যাডি, আই অ্যাম ফুল। ইউ ইট দ্যা স্যুপ’, বলে খাবলা দিয়ে তুলে নেয় তার পাত থেকে কয়েকটি ফ্রেঞ্চ-ফ্রাই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Aug/10/1533890653954.jpg
সুশি বারের নির্জন কাউন্টার

সুশি বারটি তাজা মাছের টুকরা, সামুদ্রিক গুল্ম ও ফুলপাতা, পাথর ছড়ানো ইকেবানা এবং সিরামিকের তৈজসপত্রে এমনভাবে সাজানো যে, তাকে দেবতাকে উপাচার দেওয়া পূজাপাঠের বেদির মতো তকতকে পবিত্র মনে হয়। একদিকে সিরামিকের বিশাল খুঞ্চাতে সিফুডের উপাচার সাজাতে সাজাতে কিমানো পরা তরুণীটি আড়চোখে আমাকে দেখে। জাপানি বাচ্চা মেয়েটি কী কারণে খিলখিল করে হেসে টেবিল নাড়িয়ে আবার কিছু স্যুপ ছলকে দিয়ে ছুটে যায় সুশি বারের দিকে। চোখ মিরমিরিয়ে সাহেব উঠে তার পেছন পেছন ছোটেন। কাউন্টারের কাছে পিলার ঘিরে খানিক লুকোচুরি খেলতে খেলতে বাচ্চাটি ট্রে হাতে কিমানো পরা ওয়েট্রস মেয়েটিকে পাশ কাটিয়ে ছুটে যায় লাউঞ্জের অন্যদিকে।

টেবিলের উপর আমার জন্য আনা নিগিরি জুশি নামের ওসাবি সচের সাথে আঁটালো ভাতের ভেতর শশার টুকরা ও খোসা ছড়ানো চিংড়ি মাছ দেওয়া সুশির চিত্রিত ট্রে রাখতে রাখতে মেয়েটি যেন স্বপ্নের ঘোরে আমার দিকে তাকায়। আমি ধন্যবাদ দিতে গেলে সে আমার হাতে ধরিয়ে দেয় ‘সুশি এটিকেট’ লেখা একখানা কাগজ। কাগজখানা পড়ে কিভাবে সুশি খেতে হয় সে বিষয়ে বেশ খানিকটা অবগত হই। চপস্টিক দিয়ে এক খণ্ড সুশি তুলে নিয়ে সয়ি সচে ডিপ্ দিয়ে তা চিবিয়ে মুখে পুরি জিনজারের পাতলা পরত।

কাঁপতে কাঁপতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ফিরে আসেন মলিন চেহারার সাহেব। না, তিনি বাচ্চা মেয়েটিকে ক্যাচ্ করতে পারেন নি। তা, সে গেল কোথায়? তার সন্ধানে আমিও এদিক ওদিক তাকাই। ক্লান্ত সাহেব স্ট্রো দিয়ে একটু কোক্ খেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘বাচ্চা-কাচ্চা লালন পালন করতে হয় কম বয়সে। আই অ্যাম এপ্রোচিং সিক্সটি সেভেন। এই বয়সে আর ছোটাছুটি ভালো লাগে না।’ আমি তাকে ‘ডোন্ট ওয়ারি’, বলে আশ্বস্ত করে বাচ্চাটির খোঁজে এবার উঠে পড়ি। তাকে পাওয়া যায় তালেবেরা সিরামিকের বাসন কোসনের ডিসপ্লে কাউন্টারের পেছনে। কিন্তু সে আমার সাথে আসবে না। আমি ফিরে এসে সাহেবকে তার সুলুক সন্ধান দিলে—তিনি উঠতে উঠতে যেন জনান্তিকে বলেন, ‘হোয়েন আই ওয়াজ ইয়াং, আমার যা চেহারা-সুরত তাতে বাচ্চা দূরে থাক ফিমেল পার্টনারই জুটাতে পারলাম না.. ..আর এ বয়সে এডাপ্ট করেও হয়েছে মুশকিল, আই ডোন্ট নো হাউ টু রেইজ দিস হাইপার এক্টিভ গার্ল।’

জাপানি বাচ্চাটির সন্ধানে গিয়ে সাহেব আর ফিরে আসেন না। ওয়েট্রেস তরুণীটি এসে টেবিল পরিস্কার করে। তার কব্জিতে জড়ানো জপমালা। আমি মনে মনে অপেক্ষা করি, কিন্তু সে এবার ফিরেও তাকায় না। তার গলায় ঝুলছে সামুদ্রিক কোনো মাছের দাঁতে তৈরি লকেট। ন্যাপকিন দিয়ে টেবিল মুছতে গেলে আমি তাতে এনগ্রেইব করে আঁকা পদ্মাসনরত বুদ্ধের মুখ দেখতে পাই। তার ঠোঁট নড়ে—মনে হয় সে বুঝি জপছে ত্রিপিটকের কোনো সূত্র।

আমাকে আরো অনেক সময় কাটাতে হবে। কিন্তু সুশি বার ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা হয় না। সে বছর খানেক আগে—প্রথম যে বার মেক্সিকোর পুয়েব্লা শহরে যাই, সে কথা মনে পড়ে। ফুটপাতে আর্টিসানরা তালেভেরার বর্ণাঢ্য সব সিরামিকের বাসন কোসন নিয়ে বসেছেন। এক আর্টিসানের কাছ থেকে শুনি যে—তাদের পূর্বপুরুষ ষোড়শ শতাব্দীতে স্পেনের তালেভেরা বলে এক স্থান থেকে এসে এ শহরে বসতি শুরু করেন। সে থেকে তারা মাটি পুড়িয়ে সিরামিকের শিল্পদ্রব্য তৈরি করছেন। কথা বলতে বলতে পিঞ্জিরা থেকে বেরিয়ে একটি পাখি উড়ে এসে আমার বাহুতে বসেছিল। তাতে ফুটপাতের আর্টিসানরা সকলে হেসে উঠেছিল জোরেসোরে। তখনও স্প্যানিশ ভাষা আমার সড়গড় হয়ে আসেনি। ঠিক বুঝতে পারিনি—খেচরের এ আচরণের কোনো প্রতীকী তাৎপর্য আছে কি না। তালেভেরার একটি চিত্রিত ওয়াল প্লেট কিনেছিলাম। কাকে দেবো, কার কথা ভেবে কিনেছিলাম, এখন আর ঠিক মনেও পড়ে না।

সুশি এটিকেট লেখা কাগজটি এবার মনোযোগ দিয়ে পড়ি। জাপানি কিছু প্রতিশব্দের ধ্বনি আমার ভালো লাগে। জাপানে যাওয়ার আমার কোনো পরিকল্পনা নেই। দেশটি অত্যন্ত এক্সপেনসিভ, ওখানে পর্যটন আমার সাধ্যেও কুলাবে বলে মনে হয় না। তারপরও কিছু শব্দ যেমন জাপানি ভাষায় জিনজারকে বলা হয় ‘গারি’, চিংড়ি মাছকে ‘এবি’, আর ভাতকে বলা হয় ‘গহান’ ইত্যাদি নোটবুকে টুকে রাখি। কিমানো পরা ওয়েট্রেস কী কারণে যেন কাউন্টার থেকে বেরিয়ে এসে ছাদের দিকে অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে জপমালা টিপে। আমি তার কাছে গিয়ে ‘আগারি’ বা এক পেয়ালা গ্রিনটি চাইলে—আমি যে সবুজ চায়ের জাপানি প্রতিশব্দ ব্যবহার করছি, তাতে সে অবাক হয় না এক বিন্দু। আমার দিকে—যেন মন্দিরে পূরাকালের কষ্টিপাথরে তৈনি কোনো মূর্তি দেখছে—এমন এক নির্মোহ দৃষ্টিতে একটুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে চলে যায় চা করতে।

পোড়ামাটির টি-পট থেকে আমি নিসর্গ আঁকা বাটিতে সবুজ চা ঢালি। প্রজাপতির মতো শেইপ দেওয়া মস্ত একটি উড্ডীন বেলুনের পেছন পেছন জোরেশোরে কথাবার্তায় হাসিঠাট্টায় হই হই করে স্টেইক্ হাউসের দিক থেকে সুশি বারে এসে উপস্থিত হয় আস্ত একটি পারিবার। তাদের সামনে গাব্দাগোব্দা গোছের একটি কিশোরী সুতোয় টেনে টেনে প্রজাপতিকে নিয়ে যাচ্ছে এদিক ওদিক। আর হুইলচেয়ারে বসা—বোধ করি তার বোন, বয়সে এক বছরের ছোট কিংবা বড় হবে; খুব মায়া মাখানো মুখের এ মেয়েটি হুইলচেয়ার চালিয়ে এঁকেবেঁকে স্পর্শ করতে চাচ্ছে বাটারফ্লাই শেপের বেলুনটি। হুইলচেয়ার মৃদু ধাক্কায় গার্বেজের ট্র্যাশবিন একদিকে হেলিয়ে দিলে সারা পরিবার হেসে ওঠে রইরই করে। তার পিতা—থুতনিতে সজারুর কাঁটার মতো কিছু দড়ো দাড়ি, কুংফু পালোয়ানের বিক্রমে ট্র্যাশবিনের ঘেঁটি ধরে তা বসিয়ে দেন ঠিক জায়গায়। গাব্দাগোব্দা কিশোরীটি খুবই দুষ্টু, সে বড়শি লাগা মাছকে খেলানোর মতো করে প্রজাপতিকে টেনে খেলাচ্ছে। হুইলচেয়ারে বসা মেয়েটিও ছাড়বে না। যান্ত্রিক চেয়ারটি এঁকেবেঁকে গেলে, তার পরনের উজ্জ্বল বর্ণের স্কার্টে তার শরীরের রেখা ব্লার হয়ে আমার চোখে যেন ভিজ্যুয়েল ইল্যুশন সৃষ্টি করে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Aug/10/1533890792320.JPG
সিরামিকের ডিশে সি-ফুড

নরোম সরোম চেহারার মা এ পরিবারের আরো দুটি ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে পাশের টেবিলে বসে তাদের চুল আঁচড়িয়ে ক্লিপ ও রিবন পরিয়ে দিচ্ছেন। তুলনামূলকভাবে শান্ত স্বভাবের মেয়ে দুটিকে চেহারাসুরতে যমজ মনে হয়। বাবা সুশি বার থেকে গ্রিলড্ ফিস্, সুশি, মিসো স্যুপ, সিউইড ও সেসমি সিড দেওয়া ভাত ইত্যাদি মিলিয়ে প্রচুর পরিমাণে খাবার নিয়ে টেবিলে আসেন। এদের চেহারা স্পষ্টত মঙ্গোলিয়ান। কিন্তু পিতামাতার কালো গাত্রবর্ণের জন্য ঠিক জাপানি বলেও মনে হয় না। তারা খেতে খেতে যে ভাষায় কথা বলছে, তার এক বর্ণও আমি বুঝতে পারি না; তাই ভাবি—তবে কি এ পরিবার কোরিয়ান? খেতে খেতে থেকে থেকে তারা কী কারণে যেন হেসে হইচই করে ওঠে।

আমি সবুজ চায়ে চুমুক দিতে দিতে তাদের অবজার্ভ করি। বাবা-মা ও বড় মেয়েটির গাত্র বর্ণ কালো হলেও যমজ দুটি ও হুইলচেয়ারে বসা মেয়েটির শরীর থেকে যেন গোলাপি বর্ণের দ্যুতি ছড়ায়। তবে কি এদের এ পরিবারে দত্তক নেওয়া হয়েছে?  হুইলচেয়ারটি খুবই দামী ও ভারী। সুতরাং আন্দাজ করি—বালিকাটির শরীরিক অক্ষমতা পার্মানেন্ট। সে এখন টেবিলে ম্যাগনেটিক দাবার সেট পেতে তার কিশোরী বোনের সাথে খেলতে খেলতে চপস্টিকে তুলে সুশি খাচ্ছে। যমজ দুটি খাবার দাবারে মোটেই নজর দিচ্ছে না। তারা পরস্পরের হাতে হাতে তালি বাজিয়ে বোধ করি ছড়া কাটছে। আর বাতাসে আওয়ারা ভেসে ভেসে বেলুনের প্রজাপতিটি দেখছে গোলাপি-কালো বর্ণের পরিবারের আনন্দ উচ্ছল পারস্পরিক ইন্টারেকশন।

দাবার গুটি চালতে গিয়ে হুইলচেয়ারে বসা মেয়েটি বোধ করি তার বোনকে মাত করে দিয়ে খিলখিল করে আমার দিকে মুখ ফেরালে, আমি দেখি তার মুখখানা বেজায় বাঁকানো। তবে কি তার স্ট্রোক হয়ে লুপ্ত হয়েছে শরীরের চলৎশক্তি? তার বোন তার দিকে কপট ক্রোধে তেড়ে আসলে, সে তড়িৎ গতিতে হুইল চেয়ার চালিয়ে পিছিয়ে যায়। তখন আমি বুঝতে পারি, তার সমস্ত শরীর আধখানা হয়ে বেঁকে আছে। হাসতে হাসতে হুইলচেয়ারের আরেকটি ধাক্কায় সে ফিরে যায় দাবার বোর্ডে। তাতে তার শরীরের রেখা আবারও আমার চোখে ব্লার হয়ে আসে। চকিতে পিকাসোর আঁকা কিউবিস্ট ছাদের একটি পোর্ট্রেটের কথা মনে পড়ে—যেখানে মুখচ্ছবি বাঁকা হয়ে ভেঙে যেন হয়ে গেছে দুটি মুখচ্ছবি।

আমি আরো কয়েকটি জাপানি প্রতিশব্দ নোটবুকে টুকি। কিমানো পরা ওয়েট্রেসটি গেল কোথায়? কিছুক্ষণের জন্য সুশি বারের কাউন্টারে কাউকে দেখা যায় না। একটু পর হামানদিস্তায় কিছু কুটতে কুটতে কাউন্টারে এসে দাঁড়ায় আরেকটি মেয়ে। তার কানে গাঁথা আইপডের মাইক্রোফোন জাতীয় সাদা বোতাম। সে কিছু শুনতে শুনতে একা একা হাসে। তার টপের বৃত্তাকার স্ফীতিতে আঁকা নিসর্গের খণ্ড চিত্রটি অবিকল সবুজ চায়ের বাটির ছবির মতো। সে মৃদু হাসতে হাসতে রাইসক্রেকার চিবায়। ঘটাৎকচের মতো স্থূলকায় মাথা মুড়ানো এপ্রোন পরা শেফ এসে তার পাশে দাঁড়িয়ে দু’হাত নাড়িয়ে খুব এনিমেটেড্ হয়ে কিছু বলে। আমি দূর থেকে তার বচন কিছু শুনি না। কিন্তু তার হাতের নড়াচড়ায় মনে হয় সে সমুদ্রে হারপুন দিয়ে তিমি মাছ শিকারের দৃশ্য আঁকছে। মেয়েটি কান থেকে আইপডের মাইক্রোফোন খুলে নিয়ে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলে, শেফ এপ্রোনে হাত মুছে তার খোঁপা থেকে খুলে নেয় একটি চপস্টিক। তাতে ঘাড় অব্দি নেমে আসে কালোচুলের রাশ।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Aug/10/1533890875108.JPG
ডিশে সাজানো সুশি

ডার্কস্যুটে আস্তিনে রুপালি কাফলিং পরা ধুপদুরূস্থ এক জাপানি জেন্টোলম্যান এসে কাউন্টারের কাছে দাঁড়ান। তার পেছনে ওয়াকারে ভর দিয়ে থুরথুরিয়ে কাঁপছেন খুব বৃদ্ধ এক মহিলা। তারা একটু পর সুশি ও স্যুপের ট্রে নিয়ে বসার জন্য চারদিকে তাকিয়ে টেবিল খোঁজেন। আমার টেবিলে বিস্তর খালি জায়গা। তাই আমি তাদের এখানে এসে বসতে আহ্বান জানাই।

বৃদ্ধার দাঁত বলতে কিছু আর অবশিষ্ট নেই। স্যুপের দিকে তাকিয়ে তার হাত ও মুখের পেশী কেবলই কাঁপে। সঙ্গী তার ছেলে মহিলার গলায় বিভ জাতীয় বড়সড় রুমাল বেঁধে দিয়ে মাকে চামচ দিয়ে স্যুপ খাওয়ান। তাদের সাথে টুকটাক কথাবার্তাও হয়। জাপানি কোনো কর্পোরেটের কর্তা ছেলে মাকে নিয়ে ওয়াশিংটন ডিসিতে এসেছিলেন চেরী ফুলের শোভা দেখাতে। সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারের পর জাপানের সম্রাট যুক্তরাষ্ট্রে উপহার হিসাবে পাঠান অনেকগুলো চেরী ফুলের চারা। চারাগুলো লাগানো হয় ওয়াশিংটন ডিসির একটি সরোবরের চারপাশে। বৃদ্ধার বাবা জাপ সম্রাটের নার্সারিতে চারাগুলোর যত্ন নিতেন। তিনি স্বয়ং ওয়াশিংটনে এসেছিলেন গাছগুলো লাগিয়ে দেয়ার জন্য। সে ছোটবেলা থেকে মহিলার ইচ্ছা একবার ওয়াশিংটন আসেন, তার বাবার লাগানো চেরী ফুলের গোলাপি সজ্জা দেখতে। কিন্তু জীবন যাপনের নানা ধান্দায় সে অবকাশ আর হয়ে ওঠেনি এতদিন। এখন তো বৃদ্ধা জীবনের প্রান্তিকে এসে পৌঁছেছেন, তাই ছেলে মাকে নিয়ে এসেছিলেন ওয়াশিংটন ডিসিতে চেরী ফুলে ঘেরা সরোবর দেখাতে।

মাইক্রোফোনে একটি ঘোষণা শুনে আমি চমকে উঠি। ভালো করে দ্বিতীয়বার আমার নাম শুনে আমি জাপ মা-পুত্রের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে উঠে পড়ি। মাইক্রোফোনে এবার স্প্যানিশ ভাষায় বলা হচ্ছে—আমার জন্য একটি জরুরি ম্যাসেজ অপেক্ষা করছে সিংগাপুর এয়ালাইন্সের কাউন্টারে। একটু নার্ভসনেসের সাথে আমি ওই দিকে দ্রুত হাঁটি।

আপনার মতামত লিখুন :

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস ও কল্পনা

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস ও কল্পনা
বাংলায় ঐতিহাসিক নাটকের আদিগুরু অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়

দক্ষিণ এশিয়ার বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস রচনা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক আছে। নৈর্ব্যক্তিক ইতিহাস কতটুকু রচিত হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপিত হয় মাঝেমধ্যে। কবির কল্পনা না প্রকৃত ইতিহাস সত্য, এই দ্বন্দ্বের মীমাংসা হয় না।

কারণ, এ অঞ্চলের মানুষ ইতিহাস জেনেছে গল্প, উপন্যাস, নাটকে। শাহজাহান, সিরাজদ্দৌলা, মীর কাসিম সম্পর্কে তথ্যনিষ্ঠ ইতিহাস মানুষ যত কম জানে, তারচেয়ে ঢের বেশি জানে নাটকের আবেগাপ্লুত সংলাপ। ঐতিহাসিক সত্য চাপা পড়ে সাহিত্যিক কৃতকৌশল ও কল্পনার স্তূপের তলে।

ফলে সৃজনে অগ্রাধিকার কার? কবি যা রচিবে তাই কি সত্য? নাকি স্রষ্টাকে ইতিহাসের সত্যের কাছে নতজানু হতেই হবে? এসব প্রশ্ন বারবার গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ইতিহাস প্রসঙ্গে।

দক্ষিণ এশিয়া তো বটেই, ঔপনিবেশিক বাংলায় পণ্ডিত সমাজের চিন্তা-চেতনার আবহে এসব প্রশ্ন খুব বড় হয়ে উঠেছিল। বিশেষত অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় রচিত নাটকগুলোকে কেন্দ্র করে বিতণ্ডার সূত্রপাত ঘটেছিল।

অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ছিলেন ঐতিহাসিক নাটকের আদিগুরু। তিনি নিজেকে মনে করতেন, ইতিহাসের সত্য-প্রতিষ্ঠার একনিষ্ঠ সাধক। এ বক্তব্যের দৃষ্টান্তও তিনি রেখেছেন। সিরাজদ্দৌলা (১৩০৪ বঙ্গাব্দ) ও মীর কাসিম (১৩১২ ব.) বই দুটিতে তিনি তথ্যের ভিত্তিতে এই দুই নবাব সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা ভেঙে দিতে সচেষ্ট হন।

ইংরেজগণ এই দুই দেশপ্রেমিক নায়কের প্রতি যে মিথ্যাচার ও কলঙ্কলেপন করেছিলেন, অক্ষয়কুমার সেগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে গবেষকের নিবিষ্টতায় প্রকৃত সত্য উপস্থাপন করেন। তবে তিনি ইতিহাস রচনা করেননি, নাটক লিখেছিলেন। এবং সাহিত্যে ঐতিহাসিক সত্যের সন্নিকটে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। এমনকি, সমকালীন সাহিত্যিকদেরকেও সত্যানুসন্ধানী হতে প্রণোদিত করেছিলেন।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ‘চন্দ্রশেখর’ উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র, মীর কাসিম ও তকি খাঁর চরিত্রচিত্রণে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়েছেন বলে তীব্র ভাষায় অভিযোগ করতেও দ্বিধা করেননি অক্ষয়কুমার। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় যে বিতণ্ডা শুরু হয়, তাতে রবীন্দ্রনাথ অক্ষয়কুমারের সমর্থনে কলম ধরেন।

তবে কৌশলী রবীন্দ্রনাথ এ কথাও বলেন যে, “ইতিহাসের রসটুকুর প্রতিই ঔপন্যাসিকের লোভ, তার সত্যের প্রতি তাঁর কোনো খাতির নেই।”

রবীন্দ্রনাথের এ কথায় ঔপন্যাসিক কল্পনার অধিকার পেলেও ‘ইতিহাসের মূল রসটুকু’ বা নির্যাস এড়িয়ে যাওয়ার এখতিয়ার পান না। এটাই মোটামুটি মানদণ্ড হয়ে গেছে। অর্থাৎ, ইতিহাসের নির্যাসটুকু নিয়ে কল্পনার আশ্রয় নিয়ে সাহিত্য রচনা করা যেতে পারে। তবে সেটা সাহিত্য নামেই চিহ্নিত ও ব্যক্ত হতে হবে, ইতিহাস নামে নয়।

অক্ষয়কুমারের যুগ পেরিয়ে শতবর্ষ অতিক্রান্ত হলেও ইতিহাস ও সাহিত্যের মিশ্রণ থেমে থাকেনি। বরং আরো বেড়েছে। অতি সাম্প্রতিক লেখকদের কথা উহ্য রেখে একটু পুরনো হিসেবে দৃষ্টান্ত দেওয়া যায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের। তার ‘সেই সময়’, ‘পূর্ব পশ্চিম’, ‘প্রথম আলো’ ইত্যাদি উপন্যাস মানুষকে আলোড়িত করেছে। বই আকারে বের হওয়ার আগে ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশের সময় লেখাগুলোর তথ্য ও সত্যাসত্য নিয়ে এন্তার চিঠি ও ভিন্নমত ছাপা হয়েছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/18/1563451116521.jpg

একজন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আমরা এত পরিশ্রম করে, কত তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে ইতিহাস রচনা করি। কিন্তু মানুষ সেগুলো খুব একটা পড়ে না। ইতিহাসের বই জনপ্রিয় হয় না। আর আপনি ইতিহাসকে উপন্যাসের মধ্যে নিয়ে এত জনপ্রিয় হলেন কেমন করে?’

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় খুব সুন্দর উত্তর দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘মানুষ ইতিহাসের মূল গল্পটি শুনতে চায়। আমি আমার মতো করে গল্পটি বলি।’

মানুষ যত দিন ইতিহাসের মধ্যে শুধু গল্পটি শুনতে চাইবে, ততদিন ইতিহাসের নির্জলা সত্যটি তার কাছে আসতে পারবে না। ইতিহাস আর কল্পনার মাখামাখি চলতেই থাকবে। এটাই সম্ভবত দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ঐতিহাসিক অদৃষ্ট বা হিস্টরিকাল ফেট!

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

আরো হাঁস

এইরূপ কান্দে কন্যা নিরালা বসিয়া
হাঁসের লাগিয়া কন্যা ধুড়িল শহর

কান আশে হইছে বিয়া স্বপ্নের ভিতর
ঘটকালি করে আপন মামতো ভাই

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর
কারা পানখিলি খাইয়া গপ মারে তাই

সজিনার তলে বসি কান্দিল তামাম
এর কিবা মানে শুন কান খাড়া করি
চিক চিক করে মনে এ বিয়ার জরি।

হেমন্তের হাঁস

আমার হয়নি ধোয়া ওগো শিশিরের তলে
আমার হয়নি নাচা মিশি যাওয়া ঊর্মিদলে।

আমার মিটিনি নেশা অলিকোলে শোয়া বাকি
আমায় ঢালিনি মৌন নূর বধির জোনাকি!

আমারে চিনিয়া চিনে নাই হেমন্তের হাঁস
আমার পানের পাত্রে বাদ গেছে শ্যামা ঘাস।

আমার ইউসুফ শোনে নাই ভাইদের শোকর
বকুল তলায় আসি হাঁপায় প্রকৃত ভোর।

হাঁসের জলেরা

হাঁসের পায়ের জল
শুকায়, তাই তারা ফের জলে নামে।
একটা কথা আমি ভুলি যাই
হাঁসের কোনো ইচ্ছা নাই।
হাঁসের জলে আমি ভাসি
হাঁসের পায়ের জলে
আমি মুখ ধুইছি,
আমার নিজের মুখ কেন মোর যেনতেন মোকাম ন রে!
আমার চোখে এই ফেরেবি জল ধরা দেয়
যেন বখিল আমি তার কিছু নির্ভরতাময় তর্জমা করি!
দাদি যেই ছাড়ে হাঁস
তারা আমার মরা দাদির জইফ হাঁস!
স্বপ্ন তারা আমার নিকট
তাদের নিকট
আমি তেমন বাস্তব ন রে!

এই বাড়িতে

দেয়ালের পর কাঠবিড়ালির দৌড় দেখি
যেন রইদ নাকফুল হয়,
তারপর সারা সকালটা গড়ায় দেয়াল ধরি,
একটা দোয়েল ডিম জারি হইলে
অনেক দোয়েল চিল্লায়ে ধরে বা গান,
একদিন আসে আসে করি শেষে আসে,
তারার মতন গোল চোখ ঘুঘু তার
চোখের বর্ডার আলতার রঙ পাছে
পায়ের রঙের সাথে মিশিবার চায়,
এ বাড়িতে আসি যেই হাঁসগুলি দুলি দুলি ও বাড়ি ত যায়,
ওদের ঘ্রাণের ভিতর ঘুরি ঘুরি থামি,
বাতাস হবেনে আসল শরিক
আডিয়াকলার ঝাড়ের নিকটে আসি,
আমি শুনি জলের মর্মর কলপাড়ে তড়পায়,
তারে ঢাকিবার আরো মিহি ধ্বনি আছে
এ বাড়ির অনেক অ-বাক কণ্ঠস্বর আছে!


প্রত্যাবর্তনের লজ্জা
(কবি আল মাহমুদকে)

ভাইয়ের ডাক শুনি উঠি রাতদুপারে স্বপ্নের ভিতর। যেন
বাতাসের ডাক শুনি ঢেউ উঠে তৎপর।
দেখি আব্বা আগেই উঠছেন, নিজ হাতে আতাফল, গাছপাকা তরমুজ
পরম আদরে ছেনি দিই কাটি কাটি ফালি ফালি করি খাওয়াইতেছেন,
খা, আহারে কতদিন খাস নাই!
আম্মা তজবিহ হাতে এক হাতে ভাইরে বাতাস করতেছে, আয়েশা ফুল তোলা
একটা রুমাল দিই কইলো, এইটা দিয়া মুখ মুইছো, মাথা মুইছো, চোখের কান্দন মুইছো না গো ভাই!
অথচ ভাই মারা গেছে তার চল্লিশাও পার হয় নাই। উনি কবরতে উঠি আসছেন, উনার চোখ দুইটা
তারার নিভু নিভু, এট্টু সর্দি লাগছে ক্যাল, ভাই হাঁকি কইলো, বকনা বাছুরটারে খ্যাতের আইলে
বান্ধিলি অইডা তো দড়ি ছিড়ি সব পাকাধান সাবাড় করবেনে!
আম্মা কান্দে আর ইশারা করে, ঠোঁট টিপে আঙুলে, কন, একদম চুপ!
ভাই যে মারা গেল শুক্রবার, ভাই নিজেই জানে না!
তাই আমাদের সংসারে কাঁঠাল পাতার নারকেল ছায়ার লোভে
পড়ি ঝোঁকে ঝোঁকে আইস্যে আগের মতো ধমক দিতেছে আমাদের সংসারে
জায়গা মতো, আব্বা কইলেন, খবরদার তোরা চুপ থাক,
ও যেন না জানে পাছে, ও মরি গেছে, পাছে বেচারা কষ্ট পাবে!

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র