Barta24

বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট ২০১৯, ৭ ভাদ্র ১৪২৬

English

জুতোর বাক্সে ভালোবাসা

জুতোর বাক্সে ভালোবাসা
সঞ্জয় দে


  • Font increase
  • Font Decrease

‘চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি, বেলা সত্যি’-র মতো সান ডিয়েগো শহরে একটা পেটে-ভাতে চাকরি জুগিয়ে ফেলেছি কয়েক মাস হলো; তবে এখন পর্যন্ত একটা চার চাকার যান কেনবার মতো পয়সা জুগিয়ে উঠতে পারিনি। ওদিকে এ-শহরে গাড়ি না থাকার মানে হচ্ছে হাত-পা গুটিয়ে বস্তাবন্দি হয়ে থাকা। ট্রাম-ট্রেন দূরে থাক, বাস টেম্পোরও কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে আমার কিন্তু সে-অর্থে তেমন কোনো ঝামেলা হচ্ছে না। হাউসমেট মিস্টার ব্রুস ওয়াং প্রতিদিন নিষ্ঠার সাথে আমাকে অফিস নেওয়া আর সপ্তাহান্তে কাছের এক ভিয়েতনামিজ দোকান ভিন হুং-এ নেবার কাজটি করে যাচ্ছেন। ভদ্রলোকের স্ত্রী আর তিন কন্যা থাকে টরেন্টোতে। আকালের বাজারে আমাকে শেষ মুহূর্তে পেয়ে বাড়িতে এনে তুলেছেন ভাড়া শেয়ার করার জন্যে। সাথে কথা দিয়েছেন, আমার যাতায়াতের ব্যাপারটি দেখবেন বলে। ভদ্রলোক যুবাকালে বেইজিং-এর কলেজ থেকে পাশ করার পর পরই দীর্ঘদিনের প্রণয়িনীর গলায় মালা পরান; আর তার পরের বছরই ওয়াং পত্নীর কোল জুড়ে আসে প্রথম কন্যাসন্তান। চীনে তখন চলছে ‘এক সন্তান, সুখী পরিবার’ নীতি। এই নীতি কিন্তু মিসেস ওয়াংকে সুখী করতে পারেনি। পরের বছরই তার সাধ হয় আরেকটি সন্তানের। কিন্তু চীনে বাস করে তেমন ইচ্ছে ফলালে জেল জরিমানার সম্ভাবনা প্রবল। অগত্যা ওয়াং শুধুমাত্র স্ত্রীর ইচ্ছে চরিতার্থের জন্যে পাড়ি জমালেন কানাডায়। সেখানে একটি নয়, আরো দু দুটি সন্তানের জন্ম হলো। এরপর তাঁদের মাথায় এলো ভিন্ন এক খায়েশ। তিন তিনটে সন্তান তো হলো, এবারে একটি সামনে-পেছনে উঠোনওয়ালা বিশাল বাড়ি চাই। টরেন্টোতে ওয়াং যে টাকা কামান, ও দিয়ে ওই আক্রার বাজারে বিশাল বাড়ি কেনা সম্ভব নয়। এবারে ওয়াংপত্নী তার পশ্চাৎদেশে খেজুরের কাঁটা দিয়ে খুঁচিয়ে বলতে লাগলেন, ‘তুমি না হয় এবারে আমেরিকায় একটা চাকরির চেষ্টা করো। শুনেছি, আমেরিকায় নাকি মেলা টাকা; আমেরিকা মানেই বিশাল গাড়ি, বিশাল বাড়ি।’ বৌয়ের এই অভিলাষে ত্যাক্ত হয়ে ওয়াং একদিন সত্যি সত্যি চাকরি নিয়ে আমেরিকায় পাড়ি জমান। তবে যে বৌয়ের ধাক্কায় তার এই আমেরিকা অবধি ছুটে আসা, সেই বৌকেই এখন পর্যন্ত এখানে আনতে পারেননি কী এক ভিসাপত্রের ঝামেলায়। মি. ওয়াং এখন খেয়ে না-খেয়ে টাকা জমাচ্ছেন; শুনছি, সামনের বসন্তে ওয়াংপত্নী বালবাচ্চা আর লোটা কম্বলসহ একেবারে ক্যানাডার পাট চুকিয়ে এখানে আসবেন। ততদিন পর্যন্ত এই ভাড়া ফ্ল্যাটের অতিরিক্ত গুমটিঘরটি নিশ্চিতভাবেই আমার নিবাস।

ওয়াংয়ের বাড়ির খুব কাছেই একটি কমিউনিটি লাইব্রেরি। সেখানে হেঁটেই যাওয়া যায়। আমি শনিবারের বিকেলগুলোতে সেখানে মাঝেসাঝে যাই। ঠিক বই পড়তে যাই, তেমন নয়। ওখানে বেশ কিছু ভালো ডিভিডির কালেকশন আছে। এইতো কিছুদিন আগে নিয়ে এলাম দ্যা সোভিয়েত স্টোরি আর দ্যা কোল্ড ওয়ার নামক দুটো ডকুমেন্টারির ডিভিডি। তো সেই লাইব্রেরিতেই একদিন একটি পোস্টার আমার নজরে আসে। করিডরের বাঁ-দিকের একটি দরজায় সাঁটা। সেখানে লেখা রয়েছে, নামমাত্র দক্ষিণার বিনিময়ে লাইব্রেরির একটি ঘরে নাচ শেখানো হবে। আগ্রহীরা সত্তর যোগাযোগ করুন। ভেবে দেখলাম, হাতে যেহেতু বেশ খানিকটা সময় আছে আর এটা যেহেতু হাঁটা পথের মাঝেই—নাচের ক্লাসে কয়েকদিন ঢুঁ মারলে মন্দ হয় না। ঢাকায় ধানমন্ডি লেকের ধারে রুশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে একসময় সালসা শিখেছিলাম। আমি হয়তো তাই পুরোপুরি আনাড়ি ছাত্র নই, হাতেখড়ি আছে আমার। তো সাহস করে একদিন পৌঁছে গেলাম নাচের ক্লাসে। শুরুতেই কিছুটা হতোদ্যম হতে হলো। ক্লাসের যারা ছাত্র ছাত্রী, তাঁদের প্রায় সকলেরই বয়স সত্তরের কোঠায়। অবসর জীবনের নিঃসঙ্গতা ঘোঁচাতে নাচের ক্লাসে মজেছেন। বুড়োরা ঝকমকে বাটিকের শার্ট আর বুড়িরা চড়া মেকআপ লাগিয়ে বাহুলগ্না হয়ে তুমুল ছন্দে নাচছেন। এতসব মানুষের মাঝে কেবল মাত্র দুজন রমণীর বয়স হয়তো ত্রিশের কোঠায়। চেহারা সুরতে মনে হলো দুজনেই হিস্পানিক। এঁদের একজনের গা দিয়ে ভুরভুর করে বেরোচ্ছে পেঁয়াজের গন্ধ। সে গন্ধ এতটাই প্রবল যে, তিনি আমাকে নাচের জন্যে জাপটে ধরলেও আমাকে পাশ কাটাতে হয়। সুতরাং রইল বাকি এক। এই যে একজন, ওর নাম ভেনেসা। আশপাশেই নাকি থাকে, আর কাজ করে একটি কোম্পানির কেরানি পদে। এ শহরে ভেনাসাও আমার মতোই নবাগত।  এতকাল ও ছিল ভেনচুরা কাউন্টি নামক শহরে। সেখানেই ওর পরিবার।

/uploads/files/ftwFm6xeBiG5wbihqODWF2ta782PpFUhCsRVBs9C.jpeg
নাচের ক্লাসে একই জনের সাথে বহুক্ষণ নাচা যায় না। কারণ, কিছুক্ষণ পর পরই নাচের মাস্টারের রব ভেসে ওঠে—‘জেন্টলম্যান রোটেট, রোটেট প্লিজ।’ মানে হলো, সঙ্গী বদল করে আর কাউকে ধরুন। একজনের সাথেই আঠার মতো লেগে থাকলে মন হয়তো নাচের ছন্দ থেকে পথ খুঁজে নেবে সঙ্গীর কোমরসন্ধিতে। যদিও এই রোটেশনের ব্যাপারটাতে আমার চরম অনীহা। আমি চেষ্টা করি, ঘুরে ফিরে ওই ভেনেসাতেই আটকে থাকতে। ওভাবেই ‘স্লো, স্লো, কুইক কুইক, স্লো’—এই রিদমের মাঝে সেরে নিই টুকটাক আলাপ। তৈরি হয় কিঞ্চিৎ ঘনিষ্ঠতা।

ভেনেসা একটি ছাই রঙের মাজদা গাড়ি চালায়। গাড়ির ছাদের ওপর মেছতা রোগীর মতো কালশিটে দাগ। আর সিটবেল্টের যে ধরন, ও থেকে অনুমান করা যায় গাড়িটি কম করে হলেও বিশ বছরের পুরনো। প্যাসেঞ্জার সিটের পায়ের কাছটায় কিছু দুমড়ানো মুচড়ানো কাগজের টুকরো। তা থেকে দু একটা উঁকি দেওয়া কাগজ জানান দেয়, তারা টেলিফোন কিংবা বিদ্যুতের বিল। মোটামুটি ভাগাড়ের মতো এই গাড়িটির সওয়ারি আজ আমি। গত সপ্তাহেই ভেনেসা আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ওর এই বাহনে চড়ে সান ডিয়েগোর হারবার এলাকায় যাবার। ঠিক বেড়াতে নয়। ওখানে ওর এক গাতক বন্ধুদল আসবে নানা বাদ্যযন্ত্রসহ। ভেনেসা ওখানে যাবে তাঁদেরকে কিছুটা সঙ্গ দিতে। আমাকে সে-কথা জানিয়ে সহযাত্রী হবার প্রস্তাব দিলে আমি এক কথায় লুফে নিই। ছুটির দিনে আমার তো আর করার মতো তেমন কিছু নেই! মি ওয়াং এই সময়টায় গম্ভীর মুখে চীনে সওদার দোকান থেকে আনা ফ্রি পত্রিকায় চীনে ভাষার পাজল মেলান। ও সময়ে তাঁর সাথে খেজুরে আলাপ করা যায় না। বাড়িতে বসে তাই অলস হাওয়া না খেয়ে যদি হারবারের  নোনা বাতাস খাওয়া যায়, তবে হয়তো মন্দ হয় না।

ভেনেসার পরনে আজ ফ্রি-কাট সাদা ধবধবে প্যান্ট, আর ঊর্ধ্বাঙ্গে সিল্কের টপস। হারবারে ঠিক এমনতর রক্ষণশীল পোশাকে খুব কম লোকেই যায়। এর পেছনে অবশ্য একটা ব্যাখ্যা আছে। কিছুদিন আগে কথায় কথায় জানিয়েছিল, ওর পরিবার কট্টর ক্যাথলিক। বড় ভাইটি স্থানীয় গির্জার প্যাস্টর। ক্যাথলিক মতে জন্মনিয়ন্ত্রণকে ‘না’ বলায় এখন পর্যন্ত পাঁচ পাঁচটি সন্তান তাঁর। তবে আর্থিক সঙ্গতি নাকি তেমন নয়। এ কথাগুলো ভেনেসার কাছ থেকে জেনেছি একদিন নাচের ক্লাসে ঢোকার আগে। সেদিন নিজের মায়ের সাথে করিডরে দাঁড়িয়ে বেশ চড়া গলায় বাৎচিত করছিল। টেলিফোন রাখার পর আমি কাছে গিয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এনিথিং রং?’ তাতে করে ও হড়বড়িয়ে মায়ের ওপর ঝাল ঝরিয়ে যা বলল তার সারাংশ হলো এই—ভেনেসার মা-বাবা ক্যাটারিংয়ের ব্যবসা চালাত। সেই ব্যবসা লাটে ওঠায় ভেনেসা প্রতি মাসে মা-বাবাকে কিছু পয়সা পাঠায়। কিন্তু বুড়োবুড়ি সেগুলো নিজেদের পেছনে খরচ না করে সব ঢালে এই বড় ভাইয়ের পাঁচ সন্তানকে এটা-সেটা কিনে দেবার কাজে। ক্রোধে রাঙামুখী হয়ে ভেনেসা বলে, ‘দে আর জাস্ট এক্সপ্লয়েটিং মাই প্যারেন্ট’স ইমোশন। সঙ্গতি না থাকার পরও একের পর এক বাচ্চা নেওয়ায় ওদের সংসারে অভাব লেগেই আছে। সেসব জানিয়ে আমার মা-বাপের কাছে এসে যখন ঘ্যান-ঘ্যান করে, তখন তাঁরাও নাতি পুতির মুখের দিকে তাকিয়ে সব টাকা খরচ করে ফেলে। ওদিকে সেই টাকাটা কিন্তু আমার পাঠানো টাকা। বোঝো অবস্থাটা।’ তো সেইসব আলাপের মাঝেই উঠে আসে ওর পরিবারের কিছু গোঁড়ামির কথা। ওর মায়ের নাকি ফতোয়া আছে, নন-ক্যাথলিকদের সাথে বন্ধুত্ব করাটাও এক ধরনের পাপ। যদিও পরিহাসের ব্যাপার হলো, ভেনেসার ছোট বোন, যে কিনা এই মুহূর্তে থাকে সান ফ্রানসিস্কোতে, সে কিন্তু চুটিয়ে এক সৌদি যুবকের সাথে লিভ টুগেদার করছে। সে কথা জানলে হয়তো ওর মায়ের হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হবার সম্ভাবনা আছে।

/uploads/files/pEy3FTXkOhpCyiJS9962bkBj1qmGCNawwOd72EFY.png
হারবারে পৌঁছে গাড়ি পার্ক করা নিয়ে বিরাট এক ঝামেলার মধ্যে পড়তে হয়। আজ তো শনিবার। রাজ্যের লোক যেন ভেঙে পড়েছে এখানে। পথের পাশের মিটার পার্কিংগুলো সব দখল। বেশ কয়েকবার ঘুরপাক খাবার পর নিতান্তই ভাগ্যবশে একটি জায়গা আমাদের মেলে। সেখানে স্যাত করে গাড়িটি পার্কিং করে ভেনেসা মিটারে পয়সা ভরতে যায়। আমি সেই ফাঁকে নেমে আশেপাশে নজর বুলাই। উল্টোদিকের ফুটপাথে দেখি, এক ভবঘুরে শপিং মলের কার্টে নিজেদের যাবতীয় সংসারটিকে ঠেলেঠুলে বসিয়ে পাশে বসে ঝিমুচ্ছেন। সামনে শিপিংবক্স থেকে কেটে নেওয়া এক টুকরো কাগজে লেখা, ‘মিথ্যে কেন বলব? বিয়ার খাবার জন্যেই কিছু পয়সা চাইছি।’ এর সামনে দিয়ে সে মুহূর্তে পাঁচ-দশটি ছোট কুকুরের দল নিয়ে হেঁটে যায় বাঁ-হাতে ফুল লতাপাতার উল্কি আঁকা এক যুবতী। দলের একেবারে শেষ কুকুরটির পেছনের পায়ে বাঁধা একটি হুইল। বাকিগুলো হাঁটছে কিছুটা খুঁড়িয়ে। মেয়েটি খুব সম্ভবত কোনো পঙ্গু কুকুর সেবা কেন্দ্রের স্বেচ্ছাসেবক। সবগুলো কুকুরের গলায় বাঁধা চেনের প্রান্তকে নিজের মুঠিতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে মেয়েটি ফুরফুরে মেজাজে সামনে এগিয়ে যায়।

মিটারে পয়সা ভরে ভেনেসা ফিরে আসে। আমরা হাঁটতে থাকি কংক্রিটে বাঁধানো পথ ধরে। খুব কাছেই এসে একটি রিকশা হার্ড ব্রেক করে। এ সেই বঙ্গদেশের রিকশা নয়। বরং ও ধরনের কিছু একটা। এঁদের অনুমতি আছে কেবল এই হারবারের আশপাশে লোকেদের নিয়ে ঘুরবার। রিক্সার পাদানির জায়গাটি থাকা টেপরেকর্ডার থেকে ভেসে আসছে আরবি গান। যানটি চালাচ্ছে ফ্যাশন দুরস্ত এক যুবা। জেল দিয়ে পেছনে ব্যাকব্রাশ করা চুল। হাতের কবজিতে বেঁধে রাখা কয়েকটি মালা। আমরা তো আর এখানে প্রমোদ ভ্রমণে আসিনি, তাই গাঁটের টাকা খরচ করে রিকশায় চড়বার মানে হয় না; আর ও জিনিসে তো এ জীবনে কম চড়িনি!

হারবারের ডান দিকে বিশাল এক যুদ্ধজাহাজ। নানা যুদ্ধ শেষ করে অবসর নিয়ে এটি এখন ডেরা বেঁধেছে এই হারবারের কোণে। কম পয়সায় খাটবার মতো লোক নিয়ে জাহাজ ভাঙা শিল্প এদেশে গড়ে ওঠেনি, ওদিকে দৈত্যের মতো এমন এক জাহাজকে ডুবিয়েও দেওয়া যায় না। তাই একসময় ঠিক হলো, জাহাজটিকে যদি এই হারবারে বেঁধে রেখে একটা জাদুঘর মতন করা যায়, তবে হয়তো জাহাজটি মরে গিয়েও বেঁচে যায়। সেটাই হলো পরে। লোকে এখন পয়সা খরচ করে ভেতরে গিয়ে দেখে আসে নাবিকদের থাকার স্থল আর যুদ্ধ বিমানের কংকালগুলো। এই জাহাজের পাশ দিয়ে হাঁটার সময়ে নিজেকে হস্তীর সম্মুখে পিপীলিকাসম মনে হয়। হয়তো সেসব নিয়েই ভাবছিলাম কয়েক মুহূর্ত। কোন সময়ে যে একজন চৈনিক ভদ্রলোক হাতে একখানা লিফলেট গুঁজে দিয়ে গেছে টের পাইনি। এখন সম্বিত ফিরে পেয়ে তাতে নজর বুলিয়ে যা বুঝলাম—এঁরা ফালুন গং নামক চীন দেশের এক সাধক সম্প্রদায়। তা চীনের বর্তমান কম্যুনিস্ট সরকার এঁদের ওপর ব্যাপক নাখোশ। সুযোগ পেলেই পাইকারি হারে ঢুকিয়ে দেয় জেলে। সেটুকুও হয়তো মেনে নেয়া যেত। কিন্তু ফালুন গং গ্রুপ জেল থেকে পলাতক কয়েক সদস্যের মাধ্যমে জেনেছে—জেলে অন্তরিন বাকি সদস্যদের শরীর থেকে অনেক সময়েই সরিয়ে ফেলা হয় কিডনির মতো মূল্যবান প্রত্যঙ্গ। আর সেজন্যেই এই দল চাচ্ছে ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে ঘটনাটিকে বিশ্ববাসীর নজরে আনতে।

/uploads/files/1deJKH6VHifKemIs4JlwnP0l5VpioCwmSVuoZuAH.jpeg
ভেনেসা ততক্ষণে সরে গেছে কিছুটা ডান দিকের কোণে। সেখানে চার জনে মিলে বসিয়ে ফেলেছে গানের জমজমাট আসর। তাঁদের হাতে বেহালা, গিটার, একর্ডিয়ান আর চেলো। যিনি লিড গায়ক তার গায়ে একটি ছাই রঙের টি শার্ট। মাথায় প্রথাগত মেক্সিকান খড়ের টুপি। বিশাল সেই টুপির চাতালে ঢাকা পড়েছে মুখের একাংশ। পাশেই রাখা সাউন্ডবক্স থেকে ঝুলে থাকা মাইক্রোফোনটি আঁকড়ে ধরে ভদ্রলোক দুলে দুলে গান করেন; আর গানের মাঝে সকল দর্শকের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে ভেনেসার দিকে তাকিয়ে হাসেন। সেই অর্থপূর্ণ হাসি দেখে আন্দাজ করি, এ-ই হয়তো ওর সেই গাতক বন্ধুদল।  দলের সামনে পেতে রাখা গিটারের শূন্য বাক্স। লোকে দু চার মিনিট গান শুনে সেখানে রেখে যাচ্ছে কয়েকটি কয়েন।

আমি স্প্যানিশ বুঝি না। ভেনেসা তাই তর্জমা করে গানের কয়েকটি লাইন আমাকে শোনায়—‘আই ডু নট নো হোয়াট টু ডু, আই ফেল ইন লাভ উইথ ইউ ইন এ ডে, এন্ড ডু নট নো হোয়াই, ইউ মেইড মাই লাইফ রিবর্ন।’ সে তো বুঝলাম, কিন্তু একদিনের মাঝেই হাবুডুবু প্রেমে পড়া কি আদৌ সম্ভব?—মুচকি হেসে ভেনেসাকে জিজ্ঞেস করি। আমার কথার জবাব দেবার মতো কোনো ব্যাগ্রতা ওর মাঝে ক্রিয়া করে না, বরং ওর দৃষ্টি ব্যস্ত থাকে লিড গায়কের সাথে অদৃশ্য তরঙ্গ স্থাপনে। আমি তাই ওকে কিছুটা স্পেস ছেড়ে দিয়ে বাঁ-পাশে আরো কিছুটা দূরে এক ভাস্কর্যের দিকে হেঁটে যাই। এটির সামনে প্রচুর মানুষের জটলা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর জাহাজে করে নৌ সেনারা যখন নিউ ইয়র্কে ফিরে এলো, তখন তাঁরা যুদ্ধ জয়ের আনন্দে উদ্বেলিত, প্রজ্জ্বল; তাঁদেরকে এক নজর দেখতে আর ফুল ছুঁড়ে দিতে বন্দরে সমবেত হলো হাজারও নারী। সেই নৌ সেনাদের মাঝে একজন তেমনই এক যুবতীকে ঠেসে ধরে ওষ্ঠাধরে প্রগাঢ় চুম্বনের প্রলেপ এঁকে দিলো। সেই মুহূর্তটিকে ক্যামেরায় বন্দি করে নিল টাইমস ম্যাগাজিনের এক সাংবাদিক। পরে যুদ্ধ পরিসমাপ্তির যে আনন্দ, তার সমার্থক হয়ে গেল টাইমের কভার পেইজে ছাপা সেই ছবিটি। আরো পরে সেই ছবিটিকে সম্বল করেই গড়া হলো বিশাল ভাস্কর্য। নিয়ম হয়ে গেল, ভাস্কর্যটি কয়েক বছর করে আমেরিকার বিভিন্ন শহরে থাকবে। সেই ঘূর্ণনের সাথী হয়ে ভাস্কর্যটি এ-মুহূর্তে এ শহরের হারবারে। লোকে তাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে এর সামনে ছবি তোলার জন্যে। অনেকে আবার প্রেয়সীকে জাপটে ধরে সেই ভাস্কর্যের নাবিকের ভঙ্গিমাতেই ছবি তুলছে। পত্রবিহীন কোরাল গাছের তলে দাঁড়িয়ে যখন এসব তামাশা দেখছি, তখন হঠাৎ পেছন থেকে ভেনেসার কণ্ঠ শুনতে পাই—‘ইসনট ইট এ লাভলি স্ট্যাচু?’ আমি মাথা দোলাই। তারপর দূরের গানের দলের দিকে ইঙ্গিত করে বলি, ‘তুমি চাইলে ওদিকটায় আরো কিছু সময় কাটাতে পারো। আমি আছি এখানে।’ ‘দ্যাটস ওকে, চলো আমরা এই ট্রেইলে কিছুটা দূর হাঁটি। ওরা ওখানে বহুক্ষণ গান করবে। ফিরে আসার পথে না হয় আবার থামা যাবে।’

ডান পাশের এক ফিশ রেস্তোরাঁ থেকে তাজা মাছ ভাজার চনমনে গন্ধ ভেসে আসছে। তার সামনে খদ্দেরদের লাইন। আমরা সেটিকে পেরিয়ে আরো কিছুটা দূর হেঁটে গেলে এক কাকাতুয়া পাখিওয়ালা আমাকে হাত নেড়ে ডাকেন। তার আদরের পাখিটি নাকি আমার হাতে কিছুক্ষণের জন্যে বিশ্রাম নিতে চায়। অগত্যা সেই পাখিটিকে ডান কবজিতে আশ্রয় দিতে হলো। সেটি দেবার বিনিময়ে আমাকে খোয়াতে হলো জামার সবচেয়ে উপরের বোতামটি। সেয়ানা কাকাতুয়া কোন সময়ে যে ঠোকর দিয়ে বোতামখানি খেয়ে ফেলেছে টেরই পাইনি। দেখি, ভেনেসা খিক খিক করে হাসছে আমার দশা দেখে। আমি কিছুটা অপ্রস্তুত অবস্থায় পাখিটিকে মূল মালিকের হাওলায় ছেড়ে এসে পাশের এক দূর্বা ঘাসের জমিনে ধপ করে বসে পড়ি।

/uploads/files/rCFdf4gX5jRTfbo4jBLZ0i13EeFg9maFxDOyKxKV.jpeg
অনতিদূরে খাড়ির মাঝে বেঁধে রাখা কয়েকটি নৌকো। ঢেউয়ের আঘাতে তারা প্রবলভাবে দুলছে। আর তীরের কাছটায় নোটিশ টানিয়ে লেখা, ‘এখানে সাঁতার কাটা কিংবা মাছ ধরা নিষিদ্ধ।’ আমার থেকে একটু দূরে ঘাসের মাঝেই হঠাৎ মাথা ফুঁড়ে দাঁড়িয়ে গেছে বিশাল আরবান ট্রি। তার তলে আকাশের দিকে মুখ করে শুয়ে সুতো টেনে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে দু যুবক-যুবতী। যেন আকাশের দিকে তুলি টেনে কিছু একটা আঁকার চেষ্টা। ভেনেসার নাকের অগ্রভাগে বিন্দু বিন্দু স্বেদ। সাগরের নীল জলের প্রতিফলন সেই বিন্দুতে সমাপতিত হয়ে সৃষ্টি করে উজ্জ্বল আলোকস্ফটিক। আমি ঘাসের ওপর শুয়ে ভেনেসার দিকে মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করি, ‘সো দিস সিঙ্গার গাই, ইজ হি জাস্ট এ ফ্রেন্ড অফ ইওরস?’ কামরাঙার কোয়ার মতো ঠোঁটটিকে উলটে কৌতুকপূর্ণ স্বরে ও জবাব দেয়, ‘কেন তুমি কি ভেবেছিলে ও আমার নাগর?’ এ বলে ভেনেসা খলখলিয়ে হেসে ওঠে। তারপর বহু দূরের অস্পষ্ট করোনাড দ্বীপের সেতুর দিকে তাকিয়ে সেই লিড গায়ক আর ওর জীবনের কিছু যোগবিন্দুকে আমার সামনে তুলে ধরে।

ভেনেসার পরিবার ওর খুব ছোটবেলায় মেক্সিকো থেকে আমেরিকায় চলে এলেও ও রয়ে গিয়েছিল দিদার কাছে গুয়াদেলরাহা শহরে। সেই শহরের হাইস্কুলে ওর সহপাঠী ছিল এই লিড গায়ক, আলবার্তো। বলা চলে, ও ছিল আলবার্তোর হাইস্কুল সুইটহার্ট। তবে এর মাঝেই জীবন অন্য দিকে মোড় নেয়। আলবার্তোর মায়ের তখন এক অদ্ভুত মানসিক রোগ ছিল। ছেলেকে সে সহ্য করতে পারত না। কারণে-অকারণে বেধড়ক পেটাত। মায়ের অত্যাচারে অতীষ্ট হয়ে হাইস্কুলের গণ্ডি পেরুবার আগেই একদিন আলবার্তো ঘর ছেড়ে ফেরারি হয়। ওদিকে ভেনেসা এর কয়েক বছর পর মা-বাপের কাছে আমেরিকায় চলে আসে। আলবার্তো ওর জীবন থেকে বেমালুম হারিয়ে যায়। ভেনেসার জীবনও নানা চোরাগলিতে ঘুরপাক খায় এতটা বছর। তারপর এই দু বছর আগে মেক্সিকোতে নিজ শহরে বেড়াতে গিয়ে ভেনেসা যায় গির্জার রবিবাসরীয় প্রার্থনায়। সেখানে গিয়ে দেখে, যুবা বয়েসী যাজকদের একজনকে বড্ড যেন চেনা চেনা লাগে।

আলবার্তোর মায়ের পরে পাকস্থলীর ক্যান্সার ধরা পড়েছিল। কী করে যেন আলবার্তোর কানে ঠিকই পৌঁছে যায় মায়ের এই অন্তিম দশার কথা। যেই মায়ের কারণে তাঁকে ঘর ছাড়তে হয়েছিল, সেই মাকেই শেষ সময়টায় আলবার্তো প্রাণ সঁপে দিলো। কিন্তু ভদ্রমহিলা শেষতক বাঁচলেন না। জীবনের এই লুকোচুরি খেলায় শ্রান্ত হয়ে আলবার্তো শরণ নিল যীশুর। গুয়াদেলরাহার সেই সমুদ্রমুখী গির্জাতে সেভাবেই ভেনেসার সাথে আলবার্তোর পুনর্মিলন।

শৈশবের সেই কুসুম কুসুম রোমান্টিকতা এখন আর নেই। তার বদলে এখন দু জনের মাঝে যা আছে, সেটি নিখাদ বন্ধুত্বপূর্ণ মমতা। আর সেই মমতা এক সময় খুঁজে পায় সমধারা। আলবার্তো গির্জার অধীনে কাজ করছিল স্থানীয় দরিদ্র শিশুদের নিয়ে। ওদিকে প্রথম যৌবনে ঘটানো একটি গর্ভপাতের পর ভেনেসার আর কোনোদিন মা হয়ে ওঠা হয়নি। তাই পথশিশুদের নিয়ে কিছু একটা করার উদগ্র বাসনা তার মাঝেও ছিল। ভেনেসা আলবার্তোকে প্রস্তাব দেয়, এই শিশুদের জন্যে আমেরিকা থেকে কিছু অর্থ সাহায্য উত্তোলন করলে কেমন হয়? আলবার্তো তো এমনিতেই ওর সেই ভবঘুরে জীবনে গিটার বাজিয়ে পয়সা তুলত। এবারেও না হয় তেমন কিছু করুক ক’টা দিন আমেরিকায় এসে। তারপর যে টাকা পাওয়া যাবে তা নিয়ে ভেনেসা আলবার্তোর দলের সাথে পৌঁছে যাবে গুয়াদেলরাহায়। ওখানে বাচ্চাদের জন্যে খেলনা কেনা হবে। স্থানীয় এক জুতোর দোকানদার বলেছেন, বিনা মূল্যে তিনি কিছু জুতোর বাক্স দেবেন। তারপর সেই বাক্সে খেলনা ভরে বিলানো হবে শহরের প্রায় কয়েকশো দরিদ্র শিশুর মাঝে।

/uploads/files/E9MegAiKnkSqvFEYywFIyrMhu0yMzyRtZpHqAaP2.jpeg
ভেনেসার বয়ানটি শেষ হলে আমি আকাশে উড়তে থাকা বাহারি ঘুড়িগুলোর দিকে তাকাই। সেই মুহূর্তে একটি ঘুড়ি আরেকটির হাতে ধরাশায়ী হয়ে সুতো ছিঁড়ে উড়ে যাচ্ছে দূর সমুদ্রের দিকে। তবে সেটিকে কেউ তাড়া করছে না। বরং ঘাসের চাদরে শুয়ে থাকা ঘুড়ির মালিক বেশ আমোদ নিয়ে দৃশ্যটি দেখছেন। পাশেই রোদ চশমা পরে পা ভাঁজ করে বসে থাকা প্রেয়সী কিছুটা যেন সরে আসে তার দিকে। তারপর ভালোবাসা অনিবার্য পথ খুঁজে নেয় তাঁদের দ্বৈত ওষ্ঠাধরে।

আপনার মতামত লিখুন :

বাংলা অনুবাদ সাহিত্যে তারুণ্যের জাগরণ

বাংলা অনুবাদ সাহিত্যে তারুণ্যের জাগরণ
প্রসিদ্ধ প্রকাশনীর বড় ভরসা অনুবাদ সাহিত্যগুলো

বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার মধ্যে অনুবাদ সাহিত্য অনেক আগেই তৈরি করে নিয়েছে শক্তিশালী এক অবস্থান। গত এক দশকজুড়ে এই মাধ্যমটা হয়েছে আরো শক্তিশালী। বিভিন্ন প্রসিদ্ধ প্রকাশনীর বড় ভরসা অনুবাদ সাহিত্যগুলো। তেমনি অপেক্ষাকৃত ছোট ও কম খ্যাতিমান প্রকাশনীগুলোও অনুবাদ বই বের করতে বিনিয়োগ করছে এই আশায় যে, তাদের টাকাটা অন্তত কিছু লাভসহ উঠে আসবে। আর এই অনুবাদ সাহিত্যের জগতে, উল্লেখ্য এই সময়টাতে, ভালো অনুবাদক হিসেবে পাঠকদের মনে জায়গা করে নিয়েছেন বেশ কিছু তরুণ অনুবাদক। প্রকাশক ও পাঠক—উভয়েই ভরসা করতে পারছেন দক্ষ এসব তরুণ অনুবাদকদের ওপর।

এই তরুণ অনুবাদকদের বয়স ২০ থেকে ৩৫-এর মধ্যে। তাদের অনেকেই এখনো ছাত্র। কিন্তু, এরই মধ্যে তাদের অনেকের অনুবাদ করা বই অর্জন করেছে দারুণ পাঠকপ্রিয়তা। একই সাথে অনুবাদক হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছেন তারাও। বিশ্বের বিখ্যাত ও বড় বড় লেখকদের বই তারা অনুবাদ করে হাজির করছেন বিশ্বসাহিত্যে আগ্রহী দেশের পাঠককূলের কাছে। তাদের কারণেই অনেক বিখ্যাত ও মাস্টারপিস সাহিত্যকর্ম আস্বাদন করতে পারছেন দেশের বিপুল সংখ্যক পাঠক। কেননা, ভাষার সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে ইংরেজি বা অন্যান্য ভাষায় সেসব বই পড়া সম্ভব হয় না দেশের বেশিরভাগ পাঠকের। তাই, তাদের ভরসা অনুবাদ। আর একাজে আসলেই অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করছেন দেশের তরুণ অনুবাদকেরা। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকাশনীর অনুবাদকদের বেশিরভাগই আসলে এই বয়সী তরুণরাই।

বাংলাদেশে তরুণ অনুবাদকদের এই কর্মস্পৃহাকে স্বাগত জানান অন্বেষা প্রকাশনীর প্রকাশক ও সত্ত্বাধিকারী মোহাম্মদ শাহাদত হোসেন। তিনি বলেন, “তরুণ অনুবাদকদের অনেকেই ভালো করছে। আমাদের অন্বেষা প্রকাশনীতে মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ, সান্তা রিকি, আদনান আহমেদ রিজনের মতো তরুণ অনুবাদকেরা যথেষ্ট ভালো মানের অনুবাদ বই উপহার দিচ্ছেন, এবং সাড়াও পাচ্ছেন পাঠকদের কাছ থেকে। আর দেশে তরুণ অনুবাদক যারা আছেন, তারা যদি অনুবাদকে আরো অর্থবহ করে তোলার সক্ষমতা অর্জন করেন, তাহলে তা অনুবাদ ও প্রকাশনা শিল্প—দুটোর জন্যই ভালো। বেশ কিছু তরুণ অনুবাদক এখন দুর্দান্ত কাজ করছেন। নিকট ভবিষ্যতে দেশের অনুবাদসাহিত্যকে আরো ভালো জায়গায় তারা নিয়ে যাবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।”

এসময়ের একজন জনপ্রিয় তরুণ অনুবাদক মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ। ২০১৫ থেকে এপর্যন্ত তার অনুবাদ গ্রন্থ বের হয়েছে ৪০টির মতো। এপ্রসঙ্গে তিনি বলেন, “একসময় দেশে ভালো মানের অনুবাদ বই বের হতো বেশ কম। এইক্ষেত্রে তরুণরা যে এগিয়ে এসেছে এবং দারুণ কাজ দেখাচ্ছে, তা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। আর্থিক ব্যাপারের থেকে এক্ষেত্রে তাদের কাজ করার প্যাশনটাই অনেক বড়। এই পরিবর্তনটা আসলেই দরকার ছিল।”

বাংলা অনুবাদ সাহিত্য আসলে শুরু হয়েছিল কবির চৌধুরী, কাজী আনোয়ার হোসেন, শেখ আব্দুল হাকিম, রকিব হাসান প্রমুখের হাত ধরে। বিদেশি সাহিত্যকে সহজ ভাষায় দেশের মানুষের কাছে উপস্থাপন করতে বড় ভূমিকা ছিল সেবা প্রকাশনীর। তবে, তাদের বইগুলো ছিল নিউজপ্রিন্ট কাগজের। এরপর ৯০ দশকের শেষার্ধ্ব ও ২০০০-এর প্রথম দশকে বোর্ড বাঁধাই ও হোয়াইট প্রিন্ট কাগজে অনুবাদ বইয়ের প্রচলন ঘটে। এক্ষেত্রে অগ্রগণ্য ভূমিকা রেখেছে সন্দেশ, অন্যধারা, রোদেলা, বাতিঘর, অন্বেষা, ঐতিহ্য ইত্যাদি প্রকাশনী।

বাতিঘর প্রকাশনীর যাত্রা শুরু ২০০৩ সালে মোহাম্মদ নাজিমউদ্দিনের হাত ধরে। তার অনূদিত ও বাতিঘর থেকেই প্রকাশিত ‘দ্য ডা ভিঞ্চি কোড’ বইটি বাংলা অনুবাদ সাহিত্যের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। জনপ্রিয়তা ও বিক্রয় সংখ্যা—দুই দিক থেকেই। ২০০৫-এ এই বইটি অনুবাদ করার সময় নাজিমউদ্দিনও নিজেই ছিলেন একজন তরুণ অনুবাদকই। এর ঠিক আগের সময়টাতে অনুবাদক হিসেবে দারুণ জনপ্রিয়তা পান অনীশ দাশ অপু। বলাই বাহুল্য, তিনিও অনুবাদ করতে ও জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেন তরুণ বয়স থেকেই।

তাদেরই পথ ধরে গত কয়েক বছরে অনুবাদ সাহিত্যে খুব ভালো কাজ দেখিয়েছেন অনেক তরুণ অনুবাদক। এদের মধ্যে পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছেন সায়েম সোলায়মান, মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ, শাহেদ জামান, সালমান হক, কিশোর পাশা ইমন, আদনান আহমেদ রিজন, সাইম শামস, অসীম পিয়াস, কৌশিক জামান, সান্তা রিকি মাকসুদুজ্জামান খান, ডিউক জন প্রমুখ। অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পেয়েছে সায়েম সোলায়মানের ‘কুইন অব দ্য ডন’, ‘কালো কফি’, ‘দ্য ওয়ান্ডারার্স নেকলেস’ (সেবা প্রকাশনী) ইত্যাদি থ্রিলার ঘরানার বই, সালমান হকের বাতিঘর প্রকাশনী থেকে বের হওয়া ‘থ্রিএএম’ সিরিজের বই ও ‘দ্য বয় ইন দ্য স্ট্রাইপড পাজামা’ বইটি, শাহেদ জামানের ‘দ্য পিলগ্রিম’ (বাতিঘর প্রকাশনী), ‘দ্য ফর্টি রুলস অব লাভ’ (রোদেলা প্রকাশনী) ও ‘দ্য ফরবিডেন উইশ (নালন্দা প্রকাশনী), মো. ফুয়াদ আল ফিদাহর ‘সিরিয়াল কিলার’, ‘গেম ওভার’ (সেবা প্রকাশনী) ও ‘সাইকো ২’ (আদি প্রকাশনী), কিশোর পাশা ইমনের ‘দ্য গার্ল অন দ্য ট্রেন’ (বাতিঘর প্রকাশনী), ‘দ্য পাওয়ার অব হ্যাবিট’ (নালন্দা প্রকাশনী), আদনান আহমেদ রিজনের ‘দ্য প্রেসিডেন্ট ইজ মিসিং’ ও ‘দ্য গার্ল ইন রুম ওয়ান জিরো ফাইভ’ (আদি প্রকাশনী), মাকসুদুজ্জামান খানের ‘দ্য আলকেমিস্ট’ (রোদেলা প্রকাশনী) ও ‘অ্যাঞ্জেল অ্যান্ড ডেমনস’ (অন্বেষা প্রকাশনী), ডিউক জনের ‘সুলতান সুলেমান’ ও ‘বিউলফ’ (সেবা প্রকাশনী), কৌশিক জামানের ‘নরওয়েজিয়ান উড’ (বাতিঘর প্রকাশনী), সান্তা রিকির ‘দ্য সার্জন’ (বাতিঘর প্রকাশনী)।

উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, কিছুদিন আগেও যেখানে বাংলা অনুবাদে আক্ষরিক অনুবাদের আধিক্য ছিল, সেখানে বর্তমানের তরুণ অনুবাদকেরা বইয়ের ভাবানুবাদটাই বেশি করেন। একারণে তাদের অনুবাদ হচ্ছে বেশি পরিমাণে সহজ, সাবলীল ও প্রাঞ্জল। আর, পাঠকদের বেশিরভাগই যেহেতু তরুণ, এক্ষেত্রে অনুবাদক-পাঠকের চিন্তাধারাও মিলে যাচ্ছে একই সমান্তরালে।

এই তরুণ অনুবাদকদের অন্য যে বৈশিষ্ট্য সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তা হচ্ছে এদের অনেকেই বই অনুবাদের কাজ শেষ করেন অত্যন্ত দ্রুত। এদের কারো কারো উদাহরণ রয়েছে ২ বছরে ১২টা অথবা দেড় বছরে ৯টি অনুবাদ বই বের করার। কিন্তু মানের দিক থেকে খারাপ হচ্ছে না বা হয়নি তাদের বইগুলো, এমনটাই মনে করছেন পাঠক ও সাহিত্যপ্রেমীরা। অত্যন্ত দ্রুত এবং মান ঠিক রেখে অনুবাদ করার ক্ষেত্রে পাঠক, প্রকাশক ও সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে আলাদাভাবে চিহ্নিত হয়ে আছেন ফুয়াদ আল ফিদা, শাহেদ জামান, সালমান হক, আদনান আহমেদ রিজনেরা। অনেকেই তাদের মতো দ্রুতগতির অনুবাদকদের ভালোবেসে ‘মেশিন ম্যান’ বলে আখ্যা দেন। কিন্তু অনেকের কাছে এই ব্যাপারটাই আবার রহস্য। নেতিবাচক-ইতিবাচক দুরকম মতামতই রয়েছে এ ব্যাপারে। সাহিত্যাঙ্গন নিয়ে কাজ করছেন এবং এক্ষেত্রে ভালো অবস্থানে আছেন, এরকম অনেকেই বিষয়টাকে ইতিবাচক চোখে দেখেন না। তাদের মতামত হচ্ছে, “বর্তমানে অনেক তরুণ অনুবাদকই দেখা যায় একমাসে একটা বই অনুবাদ করছেন। এতে অনুবাদে ভুলত্রুটি থেকে যাচ্ছে অনেক।” এক্ষেত্রে তারা জি এইচ হাবীবের মতো স্বনামধন্য অনুবাদকের উদাহরণ দিয়ে বলেন, তিনি তো সোফির জগত বইটি অনুবাদ করেছিলেন ৩-৪ বছর সময় নিয়ে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/21/1566394777242.jpg
 প্রকাশক, লেখক ও অনুবাদক মোহাম্মদ নাজিমুদ্দিনের হাত দিয়ে গত কয়েক বছরে উঠে এসেছে বেশকিছু ভালোমানের তরুণ অনুবাদক ◢


এই ব্যাপারটাকে কিভাবে দেখছেন প্রকাশনা শিল্পের কর্ণধাররা? যোগাযোগ করা হলে বাতিঘর প্রকাশনীর প্রকাশক, বিশিষ্ট লেখক ও অনুবাদক মোহাম্মদ নাজিমউদ্দিন বলেন, “আমি মনে করি না দ্রুত অনুবাদের কাজ শেষ করলেই তার মান খারাপ হয়। আমি নিজেও খুব দ্রুত কিছু বইয়ের অনুবাদের কাজ করেছি। বর্তমানে আমরা অনুবাদের কাজে প্রযুক্তির সহায়তা অনেক পরিমাণে পাচ্ছি। আগে হাতে লিখে তারপরে হয়তো কম্পোজ করা হতো। তবে, বর্তমানে পার্সোনাল গেজেটেই আমরা করি সেই অনুবাদের কাজটা। আগে হয়তো ডিকশনারিতে খুঁজে খুঁজে ইংরেজি শব্দের অর্থ বের করতাম আমরা। কিন্তু এখন ই-ডিকশনারি থেকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অর্থটা বের করতে পারি আমরা। এডিট করতেও সময় লাগছে আগের তুলনায় অনেক কম। কাজেই দ্রুত কাজ করেও অনুবাদের মান ভালো রাখা যায় বলেই মনে করি।”

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/21/1566394941196.jpg
◤ গত কয়েক বছরে জনপ্রিয়তা পেয়েছে তরুণ অনুবাদক সালমান হকের ‘থ্রিএএম সিরিজ’-এর অনুবাদসহ অন্যান্য অনুবাদ বই ◢


একই মতামত জনপ্রিয় তরুণ অনুবাদক সালমান হকের। তিনি বলেন, “অনেক আগে থেকেই, রকিব হাসান, শেখ আবদুল হাকিমেরাও কিন্তু অনেক দ্রুত কাজ করেন। আমি মনে করি এটা কোনো সমস্যা নয়। আর যারা দ্রুত অনুবাদ করছে, তাদের কারো কারো অনুবাদের মান খারাপ হতেই পারে। তবে, আমি মনে করি এই ধারায় ভালোর পরিমাণই বেশি। কারণ, জোয়ারের সময় অন্যান্য আজেবাজে জিনিসের সাথে কিন্তু পলিমাটিও এসে জমা হয়। আর সম্পাদনার কাজটা যদি ভালো করে বেশ কয়েকবার করা যায়, তাহলে অনুবাদ বইটি অবশ্যই ভালো হবে।”

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/21/1566394866820.jpg
◤ গত কয়েক বছরে পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে তরুণ অনুবাদক আদনান আহমেদ রিজনের বেশ কিছু অনুবাদ বই ◢


তবে, তরুণদের অনূদিত সব বই যে মানসম্মত হচ্ছে, তেমনটাও নয়। এই ফাঁকে নিশ্চিতভাবে কিছু সাব-স্ট্যান্ডার্ড অনুবাদ বই বের হচ্ছে বলে মনে করেন অনুবাদ সাহিত্য-সংশ্লিষ্টরা। জনপ্রিয় তরুণ অনুবাদক আদনান আহমেদ রিজন বলেন, “তরুণরা যে অনুবাদ সাহিত্যে এত বেশি পরিমাণে এগিয়ে আসছে, এতে নিম্নমানের কাজের চেয়ে ভালো মানের কাজই বেশি পরিমাণে বের হচ্ছে। অনুবাদে আসতে হলে সাহিত্যকে ভালোবাসতে হবে। আর যাদের অনুবাদ ভালো হচ্ছে না, সেক্ষেত্রে বলতে হবে অনুবাদ ভালো করে করার যোগ্যতাটাই হয়তো তাদের নেই। সেজন্য অনুবাদে আসতে হলে নিজেদেরকে ভালো করে যোগ্য করে তারপরে আসতে হবে।”

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/21/1566395064592.jpg

◤ একজন অনুবাদকের নিজেকে ঠিকভাবে অ্যাসেসমেন্টের ক্ষমতা থাকতে হবে বলে মনে করেন তরুণ অনুবাদক মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ ◢


তা কিভাবে তরুণ অনুবাদকেরা নিজেদের প্রস্তুত করতে পারে? হতে পারে একজন ভালো অনুবাদক? এই প্রসঙ্গে মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ বলেন, “বই অনুবাদে আসার আগে আমি নিয়মিত লিখতাম রহস্যপত্রিকায়। লেখা ছাপা হওয়ার পর দেখতাম সম্পাদনামণ্ডলী ওখানে কী কী চেঞ্জ এনেছে। এভাবে একজন অনুবাদকের নিজেকে অ্যাসেসমেন্টের যোগ্যতা থাকতে হবে। আর ভালো অনুবাদ যারা করছে, তাদের কাউকে মানদণ্ড ধরে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও ফলাফলটা ভালোই হবে।”

ইতোমধ্যেই তরুণ অনুবাদকেরা অত্যন্ত ভালো ও স্মার্ট কাজ দেখিয়ে অর্জন করেছেন পাঠক ও প্রকাশকের আস্থা। আর তরুণেরা যদি নিজেদেরকে আরো প্রস্তুত করে অনুবাদ জগতে আসেন এবং নিজেদের কাজের মানোন্নয়নে সচেষ্ট থাকেন, তাহলে অনুবাদ সাহিত্যে তরুণ অনুবাদকদের অবদান নিঃসন্দেহে পৌঁছে যাবে নতুন উচ্চতায়।

জহির রায়হান : দেশপ্রেমিক ও সমাজ-সচেতন এক শিল্পী-প্রতিকৃতি

জহির রায়হান : দেশপ্রেমিক ও সমাজ-সচেতন এক শিল্পী-প্রতিকৃতি
অসাধারণ চলচ্চিত্র ও শৈল্পিক সাহিত্যকর্মের স্রষ্টা হিসেবে আজও স্মরণীয় জহির রায়হান

মাত্র ৩৬ বছর বয়সের জীবনেই জহির রায়হান নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী একজন কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র-পরিচালক হিসেবে। প্রচণ্ড বক্তব্যধর্মী ও জীবনমুখী তাঁর চলচ্চিত্রগুলো নান্দনিকতা ও কৌশলগত মানের দিক থেকে এখনো স্মরণীয় হয়ে টিকে আছে। অনুপ্রাণিত করছে বর্তমান ও ভবিষ্যতের চলচ্চিত্রকারদের। তেমনি মাত্র আটটি উপন্যাস লিখেই তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লেখক হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছেন। ‘হাজার বছর ধরে’ দেশের সাহিত্য ও চলচ্চিত্রাঙ্গনে তাঁর পথ চলার কথা থাকলেও, ১৯৭২ সালে নিরুদ্দেশের ‘বরফ গলা নদীতে’ হারিয়ে যাওয়ার পর ফিরে আসেননি আর। আজ এই বহুপ্রজ বিরল প্রতিভার ৮৪তম জন্মদিন।

জহির রায়হানের প্রকৃত নাম মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। জন্ম ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর মজুপুর গ্রামে। জহির রায়হান তাঁর সাহিত্যিক নাম। এ নামেই তিনি সুপরিচিত। তাঁর শৈশব কেটেছে কলকাতায়। দেশ বিভাগের পর ঢাকায় আসেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে বাংলায় এমএ করেন জহির। ছাত্রাবস্থায়ই তাঁর সাহিত্যিক ও সাংবাদিক জীবন শুরু হয়। ১৯৫০ সালে তিনি যুগের আলো পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি খাপছাড়া, যান্ত্রিক, সিনেমা ইত্যাদি পত্রিকাতেও কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি সম্পাদক হিসেবে প্রবাহ পত্রিকায় যোগ দেন। এই সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাই হয়তো তাঁর ভেতরে আরো শক্তভাবে গেঁড়ে দেয় লেখক হওয়ার বুনিয়াদ।

১৯৫৫ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’ প্রকাশিত হয়। কিন্তু, তিনি যে ছিলেন একজন বহুমাত্রিক মানুষ। চলচ্চিত্রের প্রতি ছিল তাঁর মনের ভেতরে গভীর ভালোবাসা। তাই, চলে আসলেন চলচ্চিত্রাঙ্গনে। চলচ্চিত্র জগতে তার পদার্পণ ঘটে ১৯৫৭ সালে, ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে। সহকারী হিসেবে আরো কাজ করেন সালাউদ্দীনের ছবি—‘যে নদী মরুপথে’-তেও। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম তাকে ‘এ দেশ তোমার আমার’-এ কাজ করার আমন্ত্রণ জানান; এ ছবির নামসংগীত রচনা জহির রায়হানের হাতেই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207266898.jpg

◤ ‘বেহুলা’ সিনেমার সেটে নির্দেশনা দিচ্ছেন জহির ◢


সহকারী পরিচালক হিসেবে সফলভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে পরিচালক হিসেবে কাজ করার প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল। ১৯৬১ সালে তিনি রুপালি জগতে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’ নির্মাণ করেন। এটি অবশ্য ছিল উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র। পরের বছর মুক্তি পায় তার প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র ‘বাহানা’। এরপর ১৯৬৬ সালে ‘বেহুলা’, ১৯৬৭-তে ‘আনোয়ারা’, ১৯৭০-এ ‘জীবন থেকে নেওয়া’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘লেট দেয়ার বি লাইট’-এর মতো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। 

চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি, সাহিত্যিক হিসেবেও তাঁর কলম সচল ছিল মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত। অনেক কালজয়ী উপন্যাস তিনি উপহার দিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে : ‘বরফ গলা নদী’, ‘আর কত দিন’, ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, ‘হাজার বছর ধরে’, ‘আরেক ফাল্গুন’, ‘কয়েকটি মৃত্যু’, ‘তৃষ্ণা’, ‘সূর্যগ্রহণ’ ইত্যাদি। সংগ্রামমুখর নাগরিক জীবন, আবহমান বাংলার জনজীবন, মধ্যবিত্তের আশা-আকাঙ্ক্ষা-বেদনা প্রভৃতি তাঁর রচনায় শিল্পরূপ পেয়েছে। সাহিত্যকৃতীর স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (মরণোত্তর) দেওয়া হয়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207304659.jpg
◤ প্রথম স্ত্রী সুমিতা দেবীর সাথে জহির রায়হান ◢


ব্যক্তিজীবনে দুবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন জহির রায়হান। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন চিত্রনায়িকা সুমিতা দেবী। ১৯৬১ সালে বিয়ে করেন তারা। প্রথম পরিবারে অনল রায়হান এবং বিপুল রায়হান নামে দুই পুত্র সন্তানের জন্ম হয়।

সুমিতা দেবীর সাথে বিচ্ছেদের পর ১৯৬৮ সালে আরেক জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা সুচন্দার সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন তিনি। দ্বিতীয় পরিবারে রয়েছেন তার দুই সন্তান অপু ও তপু। তার বড় ভাই প্রয়াত লেখক শহীদুল্লা কায়সার। তিনি লেখক ও রাজনীতিক পান্না কায়সারের স্বামী এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী শমী কায়সারের বাবা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207352881.jpg

◤ জহির রায়হানের আলোচিত, নন্দিত ও প্রভাবশালী চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’র পোস্টার ◢


শুধুমাত্র কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার হিসেবে জহির রায়হানকে দেখলে সবটুকু যেন বলা হয় না তাঁর ব্যাপারে। একজন সমাজ ও রাজনীতি সচেতন শিল্পী ছিলেন তিনি। নিজেও স্বশরীরে অংশ নিয়েছেন দেশ মাতৃকার বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন জহির রায়হান। উপস্থিত ছিলেন একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আমতলা সমাবেশে। এসময় তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে জেলে পুরে দেয়। এই জেলে বসেই তিনি ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’ রচনা করেন। ভাষা আন্দোলন তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যার ছাপ দেখতে পাওয়া যায় তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেওয়া’–তে। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। কলকাতায় তার নির্মিত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেওয়ার বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয় এবং চলচ্চিত্রটি দেখে ভূয়সী প্রশংসা করেন সত্যজিত রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা এবং ঋত্বিক ঘটক প্রমুখ খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকাররা। সে সময়ে তিনি চরম আর্থিক দৈন্যের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হতে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করে দেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207399680.jpg
◤ প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’, যা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত তৈরিতে রাখে দারুণ ভূমিকা ◢


মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী নিধনের এক অসাধারণ প্রামাণ্য দলিল ‘স্টপ জেনোসাইড’ তৈরি করেন জহির রায়হান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী বাঙালিদের দুঃখ-দুর্দশা, হানাদার পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, ভারতে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের দিনকাল প্রভৃতি এই তথ্যচিত্রে তুলে ধরা হয়েছিল। এর প্রথম প্রদর্শনী হয় এক অজ্ঞাত স্থানে, যেখানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রীপরিষদের সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরি করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছিল ‘স্টপ জেনোসাইড’। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে এখন পর্যন্ত নির্মিত ছবিগুলোর মধ্যে শিল্পগত ও গুণগত সাফল্যের দিক থেকে শীর্ষে স্থান দেওয়া হয়ে থাকে এই চলচ্চিত্রটিকে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর জহির রায়হান ঢাকায় ফেরেন। ফিরে জানতে পারেন, মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে পাক হানাদার বাহিনীর দোসর রাজাকার আল বদর বাহিনী তার বড় ভাই প্রখ্যাত লেখক শহীদুল্লাহ কায়সারকে অপহরণ করেছে। নিখোঁজ ভাইকে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করেন জহির। ১৯৭২ সালের ২৮ জানুয়ারি সকালে এক রহস্যময় ব্যক্তি তাকে ফোন করে জানান, তার ভাইকে মিরপুর ১২ নাম্বারে একটি হাউজিং সেক্টরে আটকে রাখা হয়েছে। একথা শুনেই তিনি ভাইয়ের খোঁজে মিরপুর যান এবং আর ফিরে আসেননি।

জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে অনেক ধরনের থিওরি রয়েছে। এমন বলা হয় যে, তিনি একটি সার্চ পার্টি নিয়ে মিরপুরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। সেখানে পাক হানাদার বাহিনীর কিছু সদস্য ছদ্মবেশে ছিল। তারা তাকে লুকিয়ে আটক করে হত্যা ও গুম করে ফেলে। তার ছোট ভাই হাবীবের ভাষ্যমতে, তিনি জহির রায়হানকে মিরপুর পুলিশ স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে এসেছিলেন। এরপর আর তার দেখা পাননি। এমন খবরও শোনা যায়, মিরপুর পুলিশ স্টেশন থেকে জহির রায়হানকে জানানো হয়েছিল, মিরপুর ১২ নাম্বারে কিছু পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকার ছদ্মবেশে লুকিয়ে আছে। সেখানে না গিয়ে আগে তাকে কল ট্রেস করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর তিনি নাকি ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশ স্টেশন থেকে বেরিয়ে যান। আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207448145.jpg

◤ ১৯৭২-এর পর ‘আরেক ফাল্গুন’ হয়তো ‘কখনো আসেনি’ তবে দেশ ও সমাজ-সচেতন শিল্পীদের এগিয়ে যাওয়ার বড় প্রেরণা তিনিই ◢


এ ব্যাপারে বিভিন্ন সময় আরো অনেক গুজব ছড়িয়েছে। এগুলোর কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা, তা যাচাই করা মুশকিল। তাঁর মৃতদেহও কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই নিশ্চিত হওয়া যায়নি কিভাবে মারা গিয়েছেন তিনি। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি তার মৃত্যুদিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

স্বাধীনতার ঠিক পরপর, সেই ৭২ সালেই জহির রায়হান চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলেও তাঁর অসাধারণ, শৈল্পিক ও নান্দনিক সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্রের জন্য জাতি ঠিকই তাকে স্বরণে রেখেছে। চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য কয়েক বছর পর, ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে প্রদান করে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদক (মরণোত্তর)। ১৯৯২ সালে প্রদান করে সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার। আজও তাঁর সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্রগুলো টিকে আছে অমূল্য সম্পদ হয়ে। ১৯৭২-এর পর ‘আরেক ফাল্গুন’ হয়তো ‘কখনো আসেনি’ জহির রায়হানের জীবনে; তবে দেশ ও সমাজ সচেতন শিল্পীদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার বড় প্রেরণা তিনিই। এই ক্ষণজন্মা প্রতিভার জন্মদিনে তাঁর প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম!

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র