Barta24

বুধবার, ১৭ জুলাই ২০১৯, ২ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

ব্রাসেলসের মরোক্কান পল্লী

ব্রাসেলসের মরোক্কান পল্লী
মঈনুস সুলতান


  • Font increase
  • Font Decrease

ব্রাসেলসের টাউন হলের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে গ্র্যান্ড প্লেসের ফ্লোরাল কার্পেট ঘিরে ঘুরপাক করনেওয়ালা পর্যটকদের উল্লাস দেখতে বেশ ভালোই লাগে। টাউন হলে আমি এসেছি আমার জানপহচান সুহৃদ লুকাস ও তার গার্লফ্রেন্ড এঞ্জেলিকের সাথে। আজ ভোরবিহানে ব্রাসেলসে আমি বেড়াতে এসেছি ইবোলা উপদ্রুত সিয়েরা লেওন থেকে। মাস সাতেক আগে লুকাস ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসাবে সিয়েরা লেওনে আসে জনমানুষের জিন্দেগিতে ইবোলার কারণে সৃষ্ট দুঃখকষ্টের খতিয়ান সংগ্রহ করতে। তখন আমার সাথে তার দোস্তির সূত্রপাত। তার মারফতে এঞ্জেলিকের সাথে আমার বার কয়েক স্কাইপে কথাবার্তা হয়েছে। কিন্তু মেয়েটির সাথে সাক্ষাত দেখা হলো কেবলমাত্র আজ। আমি প্যারিস যাওয়ার পথে একরাত্রির জন্য ব্রাসেলসে থেমেছি। এঞ্জেলিক আমাকে তার এপার্টমেন্টে সোফাবেডে শুয়ে রাত কাটানোর আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

একটু আগে আমরা টাউন হলের সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসেছি দিন শেষ হয়ে আসলেও গ্র্যান্ড প্লেসের সর্বত্র মোলায়েম আলো খেলছে। এখানকার চত্তর জুড়ে হাজারবিজার তরতাঁজা ফুল দিয়ে একটু আগে তৈরি হয়েছে একটি ফ্লোরাল কার্পেট। তাতে ভলানটিয়ার হিসাবে কাজ করেছে এঞ্জেলিক। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে লুকাসের সাথে তার সম্পর্কে ধরেছে বেহদ চিড়। সিয়েরা লেওন থেকে ফিরে এসে লুকাস হিন্দুস্থানী এক গুরুদেবের কাছে সেলিবাসি বা সেক্স পরিহারের দীক্ষা নিয়েছে। সে হামেশা সকাল-সন্ধ্যা হরেক কিসিমের মেডিটেশন করে বেড়াচ্ছে। বিষয়টা এঞ্জেলিক একসেপ্ট করছে না। তাতে আমাদের সমবেথ মিথস্ক্রিয়ায় ছড়াচ্ছে টেনশন। লুকাসের আচরণে আমিও তাজ্জব হচ্ছি। ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতার উপার্জনে তার চলছে না। সুতরাং সে নাইটগার্ডের পার্টটাইম চাকরি নিয়েছে। এবং তাতে হাজিরা দেওয়ার আগে সে শহরের সেমিটারি বা গোরস্থানে বসে শবাসন করে সময় কাটাচ্ছে। সঙ্গত কারণে তার তাবৎ বিষয়াদি আমার কাছে আজব ঠেকছে।

/uploads/files/6tDrJKzPIvCCvvdwz0MhrWk5P48RWfCYlZ0b7iRT.jpegমলেনবেকের সড়কে হেজাব পরা নারী 

টানা চারঘণ্টা খুব কনসেনট্রেটেড্‌ভাবে ফ্লোরাল কার্পেট তৈরিতে মেহনত করে এঞ্জেলিক ক্লান্ত। তার খিদে পেয়েছে। সে ডিনার না করে এপার্টমেন্টে ফিরতে চায় না। যেহেতু তার ডেরাতে রাত কাটাতে যাচ্ছি তাই সৌজন্যবশত আমি লুকাস ও তাকে ডিনারে নিয়ে যেতে চাই। মরোক্কান রেস্টুরেন্টের প্রস্তাব করলে এঞ্জেলিক প্রাচ্যদেশীয় খাবারের মশলাদার খোশবুর কথা ভেবে এক্সাইটেড হয়। গ্র্যান্ড প্লেসের মিনিট তিরিশেকের হাঁটা দূরত্বে আছে ব্রাসেলসের মরোক্কান পল্লী মলেনবেক। ওদিকে যাওয়ার ডিরেকশন মৌখিকভাবে দিয়ে লুকাস কেটে পড়তে চাইলে—এঞ্জেলিক অনুনাসিক স্বরে আবদার করে, ‘কাম-অন ম্যান, বেচারা সুলতান কতদূর সিয়েরা লেওন থেকে এসেছে, লেটস্ হ্যাভ অ্যা মিল টুগেদার।’ লুকাস মিনিমিনিয়ে কী যেন একটা অজুহাত দিতে গেলে আমিও তাকে অনুরোধ করি, ‘ইউ রোউট এন ইনফরমেটিভ আর্টিকেল এবাউট মরোক্কানস্ লিভিং ইন মলেনবেক। মূলত তোমার প্রবন্ধ পড়ে আমি ব্রাসেলসে মরোক্কান পল্লীটি দেখতে আগ্রহী হয়েছি লুকাস। সো প্লিজ টেইক আস টু মলেনবেক।’ অনিচ্ছায় পথ দেখিয়ে আমাদের সামনে খুব নিরাসক্তভাবে হাঁটে লুকাস। এঞ্জেলিক আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘সিয়ারা লেওন থেকে ফিরে আসার পর থেকে সে এ রকমের মুডি আচরণ করতে শুরু করেছে।’ আমি কোনো জবাব না দিয়ে চোখের ইশারায় এঞ্জেলিককে বলতে চাই—লুকাসের উপস্থিতিতে আমি তার সাথে এ ধরনের সেনসেটিভ কথাবার্তায় এনগেইজড্ হতে চাই না। সে ঠোঁট বেঁকিয়ে অবজ্ঞা করার ফেমিনিন ভঙ্গি করে।

গ্র্যান্ড প্লেস ছাড়িয়ে একটি ব্লক অতিক্রম করতেই দেখি মধ্যবৃত্তদের এক সাদামাটা আবাসিক এলাকার পার্কিং লট জুড়ে বাজছে মস্ত মস্ত সাউন্ড বক্সে স্টিরিও। মন চনমন করা সুরেতালে নাগরিকরা মেতেছে নৃত্যে। অবস্থা দেখে মনে হয়, সারা ব্রাসেলস্ আজ মেতেছে ফ্লোরাল কার্পেট নির্মাণের আনন্দে। জোড়ায় জোড়ায় যুগলরা স্টেপ ফেলে ছন্দিত দেহে নিমজ্জিত হয়েছে সোয়িং ড্যান্সের রিদমিক আবহে। এঞ্জেলিক দাঁড়িয়ে পড়ে কোমরের ঊর্মি ছড়িয়ে নীরবে জানতে চায়—যুগল ডান্সে কারো আগ্রহ আছে কি না? ‘আই ডোন্ট রিয়েলি হ্যাভ মাচ্ টাইম, ডিনার সেরেই... আই রিয়েলি হ্যাভ টু রান,’ বলে এঞ্জেলিকের দেহমনে জ্বলে ওঠা নৃত্যপ্রবণ শিখাতে পানি ঢেলে দেয় লুকাস। তার নিরাসক্ত আচরণে স্যাফয়ার পাথরে আলো পড়ার মতো এঞ্জেলিকের নীল চোখ থেকে ঠিকরে বেরোয় ক্রোধ ও হতাশা মেশানো দ্যুতি।

/uploads/files/oexbK1qO9ynm1RSrq7xiDXVwOlwMejaLyf4kbGR1.jpegনাগরিকরা মেতেছে নৃত্যে

লুকাস আগ বাড়তে বাড়তে বলে, ‘আমরা এবার মরোক্কান পল্লী মলেনবেকে ঢুকতে যাচ্ছি। ব্রাসেলসে লক্ষাধিক মরোক্কানদের বাস। টু বি স্পেসিফিক, ২০০৭ সালে নেওয়া আদমশুমারীতে নাম ওঠে দুই লাখ চৌষট্টি হাজার মরোক্কান বংশোদ্ভূত মানুষের। এদের অনেকেই জন্ম হয়েছে বেলজিয়ামে।’ আমরা চলে আসি মলেনবেকের একটি সড়কে। রাস্তায় প্রচুর হেজাব পরা নারী দেখে এঞ্জেলিক মন্তব্য করে, ‘সিমস্ লাইক উই আর ওয়াকিং থ্রু অ্যা স্ট্রিট অব মিডিলইস্ট।’ আমারও মনে হতে থাকে আমরা যেন চলে এসেছি মুসলিম প্রধান কোনো দেশে। হাঁটতে হাঁটতে শুনি পথচারীদের আইফোনে বাজছে মাগরিবের আজানের ধ্বনি। আমাদের ঠিক সামনে সড়ক অতিক্রম করছে একটি মরোক্কান পরিবার। দাড়িওয়ালা পুরুষ ঠেলছে খালি স্ট্রলার। পিছনে শিশুর হাত ধরে হাঁটছে খয়েরি রঙের বোর্কা পরা নারী।

স্ট্রিটের দুপাশে পর পর কয়েকটি মরোক্কান রেস্তোরাঁ। আমাদের কেউ একজন যেন দাঁতের ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছি, আর লুকাস অনুগ্রহ করে অনিচ্ছায় আমাদের নিয়ে এসেছে ডেন্টিস্টের চেম্বারে, এ রকম ভঙ্গিতে সে আমাদের নিয়ে ঢুকে পড়ে একটি রেস্তোরাঁয়। ক্যানোপির চঁদোয়া তলে সাজিয়ে রাখা অনেকগুলো বেতের সোফা। কাবাবের সুরভি নাকে লাগতেই বাতাসে এরোমা শুঁকে এঞ্জেলিক বলে, ‘লেটস্ হ্যাভ গুড টাইম উইথ ওরিয়েন্টাল ফুড।’ দেখি বেতের সোফায় খুব রিলাক্সড্ কায়দায় বসে এক মরোক্কান প্রৌঢ় কাপোল শিশা হুঁকায় ধূমপান করছেন। স্যুট পরা আরব বংশোদ্ভূত সুদর্শন পুরুষের চুল পেকে সম্পূর্ণ রুপালি। তার সঙ্গী সম্ভবত কঙ্গোলীজ কোনো গোত্রের এক কৃষ্ণাঙ্গী মহিলা। আমাদের দেখতে পেয়ে তারা দুজনে মাথা মৃদু ঝুঁকিয়ে বাও করেন। রেস্তোরাঁর ভেতর সম্পূর্ণ নির্জন। এঞ্জেলিক খুব উৎসাহ নিয়ে ম্যানুতে খাবারের ছবি দেখে। স্টার্টার হিসাবে চট জলদি পরিবেশন করা হয় সাত ধরনের সিদ্ধ করা সব্জিতে তৈরি স্যালাদের সাথে গরম গরম রুটি। বেশ তারিয়ে তারিয়ে আমরা স্টার্টার চাখি। মেইন কোর্স হিসাবে এঞ্জেলিক ফিস চারমৌলা বলে গ্রিল করা মাছের সাথে কুসকুসের অর্ডার করে। আমি সবুজ অলিভের সাথে চাকতি করে কাটা লেবু মেশানো তাজিন পদ্ধতিতে রান্না করা চিকেনের কথা ভাবি। এঞ্জেলিক ফিসফিসিয়ে বলে—মেইন কোর্সের পর আমি কিন্তু হেভি একটা ডেজার্ট নিচ্ছি। আমার চাই সিনেমন মেশানো তিন তিনটি বাকলোবা। তার চোখেমুখে খেলছে এক ধরনের চটুল অভিব্যক্তি। আন্দাজ করি—ফ্লোরাল কার্পেট বুনটের জটিল কাজ সুন্দর মতো সমাপ্ত হওয়ায় সে সেলিব্রেশনের মুডে আছে। আমি বিষয়টা টুঁইয়ে দেয়ার জন্য, ‘হাউ এবাউট অ্যা এরোমেটিক শিশা আফটার দ্যা মিল?’ বললে সে উচ্ছ্বসিত হয়ে আমার কব্জি চেপে ধরে বলে, ‘লেটস্ গো ফর আ ওয়ার্ম স্মোক।’ আমাদের হাল্কা মুডের মিথস্ক্রিয়া বোধ করি লুকাসের পছন্দ হয় না। সে হুমাস ও রুটির ভেজিটারিয়ান কোর্স টেক-আউট হিসাবে প্যাকেট করে দিতে বলে। স্টাইরোফোমের প্যাকেট হাতে আসতেই সে—‘হ্যাভ অ্যা ফেবুলাস ইভিনিং.. .. ইউ টু,’ বলে কবরখানায় শবাসনের ক্রিয়াকলাপে যাতে দেরি না হয় এ অজুহাত দিয়ে উঠে পড়ে। লুকাস চৌকাঠ অতিক্রম করে রেস্তোরাঁর বাইরে যেতেই এঞ্জেলিক বিষণ্ণ চোখে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘লেট হিম স্ক্রু হিমসেল্ফ ইন দ্যা গ্রেভইয়ার্ড, আমি চাই না তার মুডের জন্য আমাদের সন্ধ্যাটা রুয়িন্ড হোক।’ আমি তার চোখের ভাষা পড়ে নিয়ে বাড়িয়ে দেওয়া হাত মুঠো করে ধরে একটু পর তা আলতো করে ঠোঁটে ছোঁয়াই। সাথে সাথে এঞ্জেলিকের গণ্ডদেশ ভরে ওঠে গোধূলির রক্তিমাভায়।

/uploads/files/LdPV8CYH7Yg86Kkt4CLZcnK20vE6L7Y3ny9Cr734.jpegশিশা হুঁকায় ধূমপান

নিরিবিলিতে আমরা খাবারের স্বাদ চাখি। গ্রিল করা ফিস চারমৌলা খেতে খেতে মাঝে মাঝে চোখের ঘন পাপড়ি তুলে আমার দিকে তাকাচ্ছে এঞ্জেলিক। মনে হয় তার মনে জমছে কিছু কথা কিংবা কৌতূহল, কিন্তু কিভাবে বিষয়টা পাড়বে ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। অলিভ মেশানো চিকেনের স্বাদ চমৎকার, তা তারিয়ে খেতে খেতে অনুভব করি শরীরে হঠাৎ করে জ্বর আসার মতো তার চমৎকার দেহবল্লরীর প্রতি আমার মধ্যে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের আকর্ষণ। লুকাস আমার খুব কাছের লোক, ইবোলাক্রান্ত সিয়েরা লেওনের কঠিন দিনগুলোতে তার সাথে আন্তরিকভাবে মিথস্ক্রিয়ায় লিপ্ত হয়েছি, তার সাথে এঞ্জেলিকের সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে ভেঙে যাওয়ার আগে তার গার্লফ্রেন্ডের শরীর নিয়ে ভাবা আপত্তিকর মনে হয়। তাই, মেয়েটির কাঁধের নিচে ভি শেইপের নিরাবরণ ত্বকে ছড়াচ্ছে লাবণ্যের যে জোছনা—তা থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে আমি বাকলভা ও মিন্ট টি’র অর্ডার করি। খানিক পর পরিবেশিত হয় শিশা হুঁকা। তার চিলিম থেকে ছড়াচ্ছে এপ্রিকটের ফ্লেভার মেশানো তামাকের সৌরভ। চায়ে চুমুক দিয়ে শিশায় দম দিতে গেলে দেখি—কেন জানি অবাক হয়ে এঞ্জেলিক আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

আর ঠিক তখনই রোস্তোরাঁর জানালা জুড়ে বেজে ওঠে নানা ধরনের বাদ্য-বাজনা। খোলা শার্সি দিয়ে দেখি—ওখানে এসে দাঁড়িয়েছে জরির জবরজং পোশাক ও লাল রঙের ট্যাসেল ঝোলানো টুপি মাথায় স্ট্রিট সিংগারদের ছোট্ট একটি দল। তার খুব জোশে বাজায়—‘ওয়া লাললা ফাতেমা/ জার রাব্বি গির কালিমা..।’ এঞ্জেলিক আমার হাত থেকে হুঁকার নল সরিয়ে নিয়ে জানতে চায়, ‘টেল মি দ্যা মিনিং অব দিস সঙ।’ জবাবে আমি বলি, ‘আই ডোন্ট রিয়েলি নো, রেস্তোরাঁর ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করো।’ সে এবার আমার চিবুক ছুঁয়ে আবদার করে, ‘আই নো ইউ আর অ্যা মুসলিম, ইউ মাস্ট নো দ্যা মিনিং, আমাকে গানের অর্থটা বলবে না।’ আমি তার হাত মুঠো করে ধরে উঠে দাঁড়ালে—সেও আমার শরীর সংলগ্ন হয়ে হেঁটে আসে জানালায়। স্ট্রিট সিংগারদের থালায় আমরা দুজনে দরাজ হাতে ইউরোর কিছু কয়েন ছুঁড়ে দেই। খুশি হয়ে কেবলমাত্র আমাদের দুজনের জন্য এক বাদক বাঁশরীতে বিশেষ টিউন বাজায়। তন্ময় হয়ে শুনতে গিয়ে খেয়াল করি—আমার হাত আলতো করে পেঁচিয়ে আছে এঞ্জেলিকের কোমর।

/uploads/files/WJDgSvOHmHrZKQ7TzMDWwPMxXKbY9DlaqoAj2Ovl.jpegস্ট্রিট সিংগারদের ছোট্ট দল 

সাবওয়ে ধরে আন্ডারগ্রাউন্ডের দুটি স্টেশন পাড়ি দিয়ে আমরা চলে আসি এঞ্জেলিকের এপার্টমেন্টের কাছাকাছি। স্টেশনের পাশেই ফুটপাত থেকে সামান্য দূরে পার্ক করে রাখা তার মিনিয়েচার মডেলের ইলেকট্রিক কার। কায়ক্লেশে কেবলমাত্র দুজনের বসার উপযোগী গাড়িটিকে কিউট দেখায়। আমি ব্যাকপ্যাক কোলে নিয়ে তার পাশে বসলে এঞ্জেলিক স্টিয়ারিং হুইলে হাত রেখে বিমর্ষ ভঙ্গিতে জানতে চায়, ‘ক্যান আই আস্ক ইউ ওয়ান স্ট্রেইট কোয়েশ্চন?’ আমি মাথা হেলিয়ে সম্মতি দিয়ে বলি, ‘প্লিজ গো এহেড।’ ব্লক হয়ে যাওয়া ওয়াটার টেপে হঠাৎ করে তোড়ে জল এসে যাওয়ার মতো আবেগ নিয়ে সে জানতে চায়, ‘হোয়াট হেপেনড্ টু লুকাস? সিয়েরা লেওনে সে কী করে সময় কাটিয়েছে? ডু ইউ নো হোয়াই হি লস্ট ইন্টারেস্ট ইন মি?’ আমি সরাসরি এ প্রশ্নের জবাব না দিলে সে মন্তব্য করে, ‘ইউ নো দ্যা হৌল থিং, বাট ইউ আর নট টেলিং মি দ্যা ট্রুথ। নিশ্চয়ই সে কারো সাথে জড়িয়েছে।’ কথা না বলে আমি নিশ্চুপ থাকলে সে আমার হাত মুঠো করে চেপে ধরে। তার করতল ছড়াচ্ছে শরীরে জ্বর আসার মতো উত্তাপ। সে আমার চোখে চোখ রেখে জানতে চায়, ‘বা’ গাল ও গলার এক পাশ পুড়ে যাওয়া ব্লন্ড চুলের নারীটি কে? টেল মি হু দ্যা হেল ইজ শি?’ বর্ণনা থেকে আমি চিনতে পারি এঞ্জেলিক লরা শেলক্রসের কথা বলছে। আমি জবাব দেই, ‘লরা সিয়েরা লেওনে ইবোলা রিকভারি প্রোগ্রামে কাজ করছে। এর আগে কয়েক বার সে ইরাকে ত্রাণ সরবরাহের কাজে যুক্ত ছিল। রোড-সাইড বোমার বিস্ফোরণে তার শরীরের বা’ দিকের বেশ খানিকটা ঝলসে গেছে।’ তারপর উল্টা জানতে চাই, ‘তুমি লরার কথা জানলে কিভাবে?’ এঞ্জেলিক জবাব দেয়, ‘লুকাসের আইফোনে আমি তার ছবি দেখেছি, নাউ টেল মি হোয়াট ইজ দ্যা স্টোরি উইথ লরা?’ আমি রেসপন্সে বলি, ‘অনেস্ট টু গড আই ডোন্ট নো, তবে লরা তার কটেজে নানা ধরনের মেডিটেশনের আয়োজন করে থাকে। শুনেছি লোকাস তার সাথে মেডিটেশন প্র্যকটিশ করত।’ এঞ্জেলিক এবার প্রশ্ন করে, ‘লরা কি হিপনোটিজমের চর্চা করে?’ আমি জবাব দিই, ‘ইয়েস, শুনেছি সম্মোহনের অনেক কলাকৌশল তার জানা আছে। ইবোলা দূরীকরণের কাজ করতে গিয়ে যারা স্ট্রেসড্ আউট হয়েছে, এদের কাউকে কাউকে লরা আত্মসম্মোহনের প্রসেস্ শিখিয়েছে যাতে তারা স্ট্রেস্ ম্যানেজ করতে পারে।’ এবার হিস্টিরিয়া রোগীর মতো ঝরঝরিয়ে কেঁদে এঞ্জেলিক বলে, ‘নাউ আই নো দ্যা ট্রুথ, দ্যাট বিচ্ লরা লুকাসকে হিপনোটাইজড্ করেছে, সে এখনো সম্মোহনের ঘোরের মাঝে আছে। দিস ইজ এবাউট সিক্স মান্থ, সে আমার দিকে ফিরেও তাকায়নি... আই অ্যাম শিওর কবরখানায় শবাসনে বসে সে লরার ধ্যান করছে। আই রিয়েলি হেইট হিজ মেডিটেশন এন্ড স্টুপিড সেলিবাসি বিজনেস।’

/uploads/files/OKXwJV6PnnZ1JgeOh6ryDUe3oMHo12kncCgpxpvp.jpegএঞ্জেলিকের ছোট্টমোট্ট ইলেকট্রিক কার

ব্যাকরোড ধরে গলিগুঁজির ভেতর দিয়ে ভ্রমর গুঞ্জনের মতো ধ্বনি তুলে ছোট্টমোট্ট ইলেকট্রিক কারটি মিনিট বিশেকের মাঝে চলে আসে এঞ্জেলিকের এপার্টমেন্টের কাছে। পার্ক করে গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে সে আফসোস করে মন্তব্য করে, ‘লুকাস আবহাওয়া দূষণের কারণে পেট্রোল চালিত গাড়ি পছন্দ করে না। তাই খুব আগ্রহ নিয়ে বিদ্যুত-চালিত ছোট্ট এ গাড়িটি কিনেছিলাম। ভেবেছিলাম দেশে ফেরা লুকাসকে হোমকামিং হিসাবে সারপ্রাইজ দেবো। সে কিন্তু একদিন পাশে বসেও এ গাড়িটা ট্রাই করেনি। সিয়েরা লেওন থেকে ফিরে এয়ারপোর্টে আমার চুমো ফিরিয়ে না দিয়ে কোল্ড ভয়েসে জানাল যে, সে সেলিবাসির দীক্ষা নিয়েছে। আই গিভ অ্যা ড্যাম টু হিজ স্টুপিড সেলিবাসি।’ তারপর এপার্টমেন্টের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আমার দিকে চেয়ে ফিক করে হেসে বলে, ‘আমি তো সেলিবাসির দীক্ষা নেইনি, কয়েক মাস তার জন্য অপেক্ষা করলাম, নাউ টেল মি হোয়াই শুড আই স্টার্ভ?’ আমিও হেসে হাল্কা মুডে জবাব দেই, ‘তোমার অনাহারে থাকার তেমন কোনো কারণ তো আমি দেখতে পাচ্ছি না।’

‘হিয়ার ইউ গো’, বলে এঞ্জেলিক এপার্টমেন্টের তালা খোলে।

আপনার মতামত লিখুন :

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

আরো হাঁস

এইরূপ কান্দে কন্যা নিরালা বসিয়া
হাঁসের লাগিয়া কন্যা ধুড়িল শহর

কান আশে হইছে বিয়া স্বপ্নের ভিতর
ঘটকালি করে আপন মামতো ভাই

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর
কারা পানখিলি খাইয়া গপ মারে তাই

সজিনার তলে বসি কান্দিল তামাম
এর কিবা মানে শুন কান খাড়া করি
চিক চিক করে মনে এ বিয়ার জরি।

হেমন্তের হাঁস

আমার হয়নি ধোয়া ওগো শিশিরের তলে
আমার হয়নি নাচা মিশি যাওয়া ঊর্মিদলে।

আমার মিটিনি নেশা অলিকোলে শোয়া বাকি
আমায় ঢালিনি মৌন নূর বধির জোনাকি!

আমারে চিনিয়া চিনে নাই হেমন্তের হাঁস
আমার পানের পাত্রে বাদ গেছে শ্যামা ঘাস।

আমার ইউসুফ শোনে নাই ভাইদের শোকর
বকুল তলায় আসি হাঁপায় প্রকৃত ভোর।

হাঁসের জলেরা

হাঁসের পায়ের জল
শুকায়, তাই তারা ফের জলে নামে।
একটা কথা আমি ভুলি যাই
হাঁসের কোনো ইচ্ছা নাই।
হাঁসের জলে আমি ভাসি
হাঁসের পায়ের জলে
আমি মুখ ধুইছি,
আমার নিজের মুখ কেন মোর যেনতেন মোকাম ন রে!
আমার চোখে এই ফেরেবি জল ধরা দেয়
যেন বখিল আমি তার কিছু নির্ভরতাময় তর্জমা করি!
দাদি যেই ছাড়ে হাঁস
তারা আমার মরা দাদির জইফ হাঁস!
স্বপ্ন তারা আমার নিকট
তাদের নিকট
আমি তেমন বাস্তব ন রে!

এই বাড়িতে

দেয়ালের পর কাঠবিড়ালির দৌড় দেখি
যেন রইদ নাকফুল হয়,
তারপর সারা সকালটা গড়ায় দেয়াল ধরি,
একটা দোয়েল ডিম জারি হইলে
অনেক দোয়েল চিল্লায়ে ধরে বা গান,
একদিন আসে আসে করি শেষে আসে,
তারার মতন গোল চোখ ঘুঘু তার
চোখের বর্ডার আলতার রঙ পাছে
পায়ের রঙের সাথে মিশিবার চায়,
এ বাড়িতে আসি যেই হাঁসগুলি দুলি দুলি ও বাড়ি ত যায়,
ওদের ঘ্রাণের ভিতর ঘুরি ঘুরি থামি,
বাতাস হবেনে আসল শরিক
আডিয়াকলার ঝাড়ের নিকটে আসি,
আমি শুনি জলের মর্মর কলপাড়ে তড়পায়,
তারে ঢাকিবার আরো মিহি ধ্বনি আছে
এ বাড়ির অনেক অ-বাক কণ্ঠস্বর আছে!


প্রত্যাবর্তনের লজ্জা
(কবি আল মাহমুদকে)

ভাইয়ের ডাক শুনি উঠি রাতদুপারে স্বপ্নের ভিতর। যেন
বাতাসের ডাক শুনি ঢেউ উঠে তৎপর।
দেখি আব্বা আগেই উঠছেন, নিজ হাতে আতাফল, গাছপাকা তরমুজ
পরম আদরে ছেনি দিই কাটি কাটি ফালি ফালি করি খাওয়াইতেছেন,
খা, আহারে কতদিন খাস নাই!
আম্মা তজবিহ হাতে এক হাতে ভাইরে বাতাস করতেছে, আয়েশা ফুল তোলা
একটা রুমাল দিই কইলো, এইটা দিয়া মুখ মুইছো, মাথা মুইছো, চোখের কান্দন মুইছো না গো ভাই!
অথচ ভাই মারা গেছে তার চল্লিশাও পার হয় নাই। উনি কবরতে উঠি আসছেন, উনার চোখ দুইটা
তারার নিভু নিভু, এট্টু সর্দি লাগছে ক্যাল, ভাই হাঁকি কইলো, বকনা বাছুরটারে খ্যাতের আইলে
বান্ধিলি অইডা তো দড়ি ছিড়ি সব পাকাধান সাবাড় করবেনে!
আম্মা কান্দে আর ইশারা করে, ঠোঁট টিপে আঙুলে, কন, একদম চুপ!
ভাই যে মারা গেল শুক্রবার, ভাই নিজেই জানে না!
তাই আমাদের সংসারে কাঁঠাল পাতার নারকেল ছায়ার লোভে
পড়ি ঝোঁকে ঝোঁকে আইস্যে আগের মতো ধমক দিতেছে আমাদের সংসারে
জায়গা মতো, আব্বা কইলেন, খবরদার তোরা চুপ থাক,
ও যেন না জানে পাছে, ও মরি গেছে, পাছে বেচারা কষ্ট পাবে!

মৌসুমি বায়ু আসে

মৌসুমি বায়ু আসে
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

নাদিরার আজ অন্য রূপ।
অন্যদিন নাদিরা আমার কাছে আসত ক্যাজুয়ালি। লিপস্টিক যদিও থাকে তার ঠোঁটে। লাল টকটকে রাশান লিপস্টিক মেখে আসে সে। ওর ফর্সা ত্বকের সঙ্গে লাল রঙটা খুব যায়। কিন্তু এটুকুই। একটা সালোয়ার বা একটা টপ পরে আলুথালু চুলে নাদিরা আমার কাছে আসত। আজ রোজার মধ্যেই লিপস্টিকের সাজ না দিলেও সে পরিপাটি। অন্তত চুল বাঁধা। নাদিরার চুল স্ট্রেট অ্যান্ড সিল্কি। মিহি চুলগুলা কিছুটা ব্রাউনিশ। এগুলো সে বেশিরভাগ সময় ছেড়ে আসত। বা খোঁপা যদি একটা বাঁধতও তো আশপাশে চুল উড়ত। কিন্তু আজ সে টাইট করে চুল বেঁধে এসেছে। ক্লিপ দিয়েছে, মাথাটা একটু উঁচা উঁচা লাগছে। আরো একটা ব্যাপার আছে। নাদিরা আজ আমাকে খাওয়াবে। বলতে গেলে এই প্রথম সে আমাকে খাওয়াবে মানে ইফতার করাবে। এই ট্রিটটা সে কেন দেবে জানি না। কারণও বলে নাই। ওকে কিছু জিজ্ঞাস করলে অনেক কথায় উত্তর দেয়। বলে, ‘তোরে কী আমি খাওয়াইতে পারি না একটা দিন? তুই আমারে কী ভাবিস’—এসব।

কিন্তু যে বিষয়টা নাদিরার রূপ সবচেয়ে কড়াভাবে বদলে দিয়েছে, তা হলো সে আজ শিশিরের নাম একবারও উচ্চারণ করে নাই। অন্যদিন নাদিরার আলাপের মূল বিষয় শিশির। তাকে নাদিরা গুরু ডাকে। শিশির নাদিরার জীবনের দার্শনিক। তাকে সে অন্য চোখে দ্যাখে। শিশিরকে সে নিজের জীবনদর্শনের একটা উঁচা জায়গায় রেখে দিয়েছে। গুরুর হাজার প্রসংশা, ন্যূনতম সমালোচনা আর অল্প-স্বল্প বিরক্তি মিলিয়ে সারাক্ষণ গুরুই নাদিরার আলোচ্য বিষয়। আমার দিক থেকে নাদিরার সঙ্গ পাওয়ার জন্য গুরুর আলাপ শুনতে হয়। ওকে যদিও একটু খাওয়াতে হয়। কিন্তু আমার নারীসঙ্গ ভালো লাগে বলে ওর জন্য এই খরচটুকু সামান্যই। তবে বোনাসও আছে সঙ্গে। সেটা শিশিরের বা অন্যদের খবর পাওয়া। শিশিরের কাছে না গিয়ে, বাংলার চলমান সাহিত্যের কারো কাছে না গিয়েও, ওদের বিষয়ে আমার আগ্রহ নাই বাইরে বাইরে এটা দেখিয়ে চলা অব্যাহত রেখেও সহজে ওদের বিষয়ে জানার উপায় নাদিরা। এবং আমাদের এসব সাক্ষাত বা আলাপ গোপন রাখাটা ছিল নিজেদের মধ্যে একমাত্র শর্ত।

শিশির গল্প লেখে। সে বিয়ে করে নাই। আমি করেছি এবং গল্প লেখি না। কিন্তু নাদিরার আমি বন্ধু। আর নাদিরা শিশিরের বোজম। ওদের বন্ধুত্বের শুরুটা বইমেলা থেকে। আরেক বন্ধুর হাত ধরে। আমার সঙ্গে নাদিরার বন্ধুত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর সেই বন্ধুত্ব ক্ষুণ্ন হয়। আমরা একে অন্যের থেকে দূরে সরে যাই। এরপর আমাদের দেখা ঘটবার কারণ ছিল আমার শ্বশুরবাড়ি। আর সেটা ময়মনসিংহ। ঠিক ময়মনসিংহও না নেত্রকোনা সীমানায়। সেখানে নাদিরাদেরও বাড়ি। নাদিরার সঙ্গে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, একান্তে আড্ডা দেওয়া কিম্বা খাওয়ানোর মতো সম্পর্ক ছিল না। ইনফ্যাক্ট আমি তাকে দেখেছি কিন্তু আলাপ হয় নাইয়ের মতো একটা সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্কটা একই বিশ্ববিদ্যালয়ে যতটা থাকে ততটা আরকি। আছেও আবার নাইও সম্পর্ক। বিয়ের পর বউয়ের কাছ থেকে ওদের এলাকাগত নৈকট্য জানার পর নাদিরা আবার ফিরে এলো আমার জীবনে। ফেসবুকে আমি তাকে অনেকদিন পর, বিশ্ববিদ্যালয় পার হয়ে যাওয়ারও সেই কত পরে, জিজ্ঞেস করলাম, কেমন আছিস?

নাদিরা অন্য রকম মেয়ে। খোলামেলা, উড়ু উড়ু। একটা ছেলের সঙ্গে ওর চৌদ্দ বছরের সম্পর্ক ছিল। বিয়ের পর নাদিরাকে চাকরি করতে দেবে না বলে সেই বিয়ে আর হলো না। নাদিরা সেই থেকে একা থাকে। ওই ছেলে বিদেশ। চৌদ্দ বছরের সম্পর্ককে নাদিরা নিজের স্বাধীনতার জন্য বিসর্জন দিয়ে এলো। ওর জীবনে অনেক কাহিনী। প্রেমছাড়া হওয়ার পর বেশিরভাগ কাহিনীর সঙ্গে শিশিরের যোগাযোগ। অথচ আজ আর সে শিশিরের কথা বলতেছিল না একদমই। খালি নিজের এসব কথা আবার করে বলতেছিল। চৌদ্দ বছরের সম্পর্কের কথা। কত ঘুরেছে তারা। এই ঢাকা শহরের হেন রাস্তা নাই তারা রিকশায় ঘুরে নাই। পুরান ঢাকা টু বনানী—হেন রেস্টুরেন্ট নাই তারা খায় নাই। চৌদ্দ বছরের তুলনায় ঢাকা খুব ছোট একটা শহর। তবু তাদের প্রেম তো দমে নাই, ঘুরাঘুরি থামে নাই, শোয়াতে কম পড়ে নাই। অথচ চাকরির জন্য সব বিসর্জনে গেল। এই যে কত কথা, কত ঘটনা, অনুরাগ সব কিছুই কি ফ্যালনা? আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়া জানতে চাইল নাদিরা।

: বুঝলি মানুষ সবচেয়ে হারামি প্রাণী আর এর মধ্যে পুরুষরা বেশি হারামি। তুই আবার রাগ করিস না। তোর সাথে যে কেন আমার আগে দেখা হলো না। আমার আসলে তোদের সঙ্গে বেশি মেলে বুঝলি। ওই যে একটু বুদ্ধিজীবী টাইপ। নানা বিষয় নিয়ে কথা বলবে। তোদের মধ্যে এই ফ্রি ফ্রি ভাবটা আমার বেশ লাগে। কিন্তু আমি কিনা সম্পর্ক করলাম একটা গেরস্থ ছেলের সঙ্গে আর সেটা বুঝতে আমার চৌদ্দ বছর লাগবে?

আজ যেন নাদিরা কেঁদে দিবে। জ্যৈষ্ঠের শেষ দিকে ভাসতে ভাসতে আকাশে জমতে থাকা নতুন মেঘের মতো দলা দলা না-পাওয়ার বেদনা ওর চোখেমুখে। কাজল দেওয়া চোখে ভাব জমেছে। আমরা বসছি শুক্রাবাদের ‘হটহাট’-এ। এই জায়গাটা নাদিরার সবচেয়ে পছন্দ। ঢাকা ছোট হলেও এর মধ্যে এত চিপাচাপা যে অগম্যতা থেকেই যায়। চৌদ্দ বছরের দীর্ঘ প্রেমের পরও হটহাট-এ তাদের পায়ের চিহ্ন পড়ে নাই। এটা আমি নাদিরাকে প্রথম চেনাই। সে তো দেখেই অবাক। এমন নিরিবিলি, ছিমছাম একটা রেস্টুরেন্ট সে আগে দেখে নাই। এরপর থেকে এটা আমার আর নাদিরার কমন জায়গা। এখানে বসে সে শিশিরের কথা বলত আমাকে এতদিন।

: শিশির বুঝলি খুব শার্প একটা ছেলে। অন্য রকম একটা জায়গা আছে ওর মধ্যে। এই যে আমি যাই ওর বাসায়, কেউ থাকে না সেখানে তারপরও আমাকে একবারও ছুঁয়ে দেখে নাই। ওর চাহনির মধ্যেই এসব নাই আমার প্রতি। ওর গল্পের মধ্যে দেখিস না কেমন একটা বিয়োন্ড দ্য বাউন্ডারি ব্যাপার আছে। গল্পটা তো আসলে ইমাজিনেশনই বল। মানে এই যে তুই আর আমি গল্প করতেছি, কিন্তু এটা কি গল্প? গল্পে কল্পনাটা থাকতে হয়। শিশিরের আছে। ওর চোখ দুইটাই যেন কল্পনার রাজ্য বুঝলি।

এভাবে শিশিরের গুণকীর্তন আমার শুনে যাইতে হয়। সেটা নাদিরার কারণেই। ওর শরীরটা আমি দেখি, ওর হাসি, গহীন চোখ এসব দেখার জন্যই আমি নাদিরার ডাকে সাড়া দেই। ওরে ডাকি। কফি খাই। রাস্তার দিকে তাকাই। শুক্রাবাদের জঞ্জাল পার হয়ে কেমনে মানুষ যায়? নাদিরা থাকে ওর মায়ের সঙ্গে। বাবার লগে সেপারেশন হয়ে গেছে। নাদিরার বাবার অন্য মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। সেটা তিনি গোপন করতেন। বাসায় সবসময় খিটখিট করতেন। সবাইকে সাপ্রেশনে রাখতেন। প্রতিদিন দিনের একটা সময়ে তিনি বাসার বাইরে থাকতেন। একদিন নাদিরা তার এক বন্ধুকে বলল ফলো করতে। দেখা গেল তিনি একজন বোরখা পরা মহিলাকে নিয়ে ঘুরছেন রিকশায়। নাদিরা তার বাবাকে কখনো পান-সিগারেট খেতে দেখেনি। রিকশায় বসে তিনি পান চিবাচ্ছেন আর সিগারেট খাচ্ছেন। বোরখা পরা মহিলার চেহারা দেখা যাচ্ছে না। চোখ দেখা যাচ্ছে শুধু। ফলো করতে করতে নাদিরার বন্ধু আদাবর পর্যন্ত গেল। সেখানে একটা ফ্যাকাশে চার তলা বিল্ডিংয়ে ঢুকলেন।

এসব আমাকে যতবার বলে, তত রাগে নাদিরার গা জ্বলে।
ফলো করতে করতে সেদিন ওই বাসার নিচে একটা চায়ের দোকানে বসে থাকে তার বন্ধু ঘণ্টার পর ঘণ্টা। দুপুরের পরে বেরিয়ে আসেন তার বাবা। নাদিরার বন্ধু নিজ বুদ্ধিতে নিজেকে আড়াল করার জন্য বোরখা পরে ছিল। সঙ্গে সঙ্গে নেকাব বেঁধে নেয়। দুধর্ষ সেসব অভিযানের দিনে শিশির ছিল নাদিরার পরামর্শদাতা, সহসদাতা। এসব ঘটনায় নাদিরার পরাজয় নাই, বরং জয় আছে—শিশির এভাবে তাকে মানসিক সান্ত্বনা দিত।

পঞ্চম দিনে নাদিরার বন্ধু নিজ সাহস ও বুদ্ধিতে হাতেনাতে ধরে ফেলে তার বাবাকে। ফলো করে উঠে যায় চারতলায়। কলিংবেল বাজিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে। তারপর বোরখার নেকাব খুলে দেখিয়ে দেয় নাদিরার বাবাকে নিজের মেয়ের বন্ধুর মুখ। নিজেও দেখে নেয় সেই মহিলাকে। তাদেরই বয়সী একটা মেয়ে। গ্রাম্য। একটা গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করত। নাদিরার বাবা তাকে একটা প্রকাশনা হাউসে চাকরি নিয়ে দিয়েছিলেন। মেয়েটা দেখতে শ্যামলা। কিন্তু শরীরটা ছিল পোক্ত। ঠাস করে নাদিরার সেই বন্ধুর গালে একটা চড় লাগিয়ে দেয় তার বাবা। ছেলেটা হকচকিয়ে যায়। কিন্তু নাদিরার বাবা হৈ চৈ শুরু করে দেন। নিজের মেয়ের ফন্দিতে এসব হচ্ছে জেনে তিনি চোখের সামনে অস্বীকার করে বসেন তার কোনো মেয়ে নাই। এবং এই ছেলে অনুপ্রবেশকারী। এই মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নিরাপদ রাখার জন্য লোকাল কিছু গুণ্ডাকে পুষতেন তিনি। তাদের ডেকে আনলেন। বললেন ছেলেটাকে পিটিয়ে ঘর থেকে বের করে দিতে। অপমানে, লজ্জায়, অসহায়ত্বে কুঁকড়ে গিয়ে রিক্ত, নিঃস্ব, সর্বশান্ত নাদিরা সেদিন এসব ঘটনার পর আবার বাড়ি ফিরে গেলেও সেটা ছিল তার কাছে ভাঙা হাটের মতো।

সেই থেকে শিশিরের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা। এতে ভীষণ আপ্লুত নাদিরা। এসব বিবরণ নাদিরা আমাকে দিয়েছে। শিশির তো পারত সেদিন তার দুর্বলতার সুযোগ নিতে। নাদিরা কি ফেলনা কিছু? সে দেখে না যে ছেলেরা তার দিকে কেমন করে তাকায়? কিন্তু শিশির, ও যেন সন্ত!

শিশিরের সঙ্গে যোগাযোগ ওর প্রথম প্রেমিকের সূত্রেই। শিশির যদিও বাম ছিল না কখনো। কিন্তু নাদিরার প্রথম ও জ্ঞাত একমাত্র প্রেমিক ছিল বাম। আজিজ সুপার মার্কেট, কাঁটাবন, শাহবাগ, তোপখানা রোড—এসব জায়গা ঢাকার বাম ও সাহিত্যিকদের জন্য কমন জায়গা।

আমি অবশ্য মফস্বল থেকে আসা। শিশিররা বরাবরই ঢাকার ছেলে। ওদের একটা চাপ আছে, ওরা পরিচিত, অনেক কিছু চেনে-জানে। আমার যেমন চিনতে-চিনতেই অনেক সময় চলে গেছে। এমনকি শিশিরকে চিনতেও। ঢাকায় সাহিত্য করতে এসে ঢাকার লোকদের না চিনে সাহিত্য করা যায় না। কিন্তু আমাকে না চিনে সাহিত্য করা যায়। ওদের ইন্টারোগেশনের চৌকাঠ পাড়ায়ে তারপর সাহিত্যিক স্বীকৃতি মেলা।

যাই হোক এসব জায়গার কোথাও শিশিরের সঙ্গে পরিচয় নাদিরার। তারপর হয়তো ফেসবুক, ওর সাহিত্যিক মনোযোগ—এগুলা করতে করতে প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্ক ছুটে গেলেও শিশিরের সঙ্গে রয়ে গেছে। সেই শিশির তার দুশ্চরিত্র বাবার স্বরূপ উন্মোচন কাহিনীর রচনাকার।

এরপর থেকে বাবার বিষয়ে তার ধারণা পাল্টে গেল। মেয়ের বিষয়েও বাবার আচরণ পাল্টে গেল। সে এক বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার। আর পুরোটা সময়ে নাদিরাকে শিশির সাপোর্ট দিয়েছে। আর্থিক, মানসিক—সব। আর সেই নাদিরা আজ একবারও শিশিরের নাম মুখে নিচ্ছে না এতক্ষণ হয়ে গেল। যেন ওই নামে কেউ নাই দুনিয়ায়। আমি একটু অবাক। কিছুটা ভাবছিও ব্যাপারটা কী হতে পারে। নাদিরা এরপর ওইসব সিনেম্যাটিক ঘটনার পর আবার বাসায় স্বাভাবিকভাবে থাকতে শুরু করেছে। এখন সে ব্যাংকে চাকরি আর নিজের মাকে নিয়ে থাকছে। শিশির বা আমি ছাড়া তার অন্যত্র যাওয়া আছে কিনা আমার জানা নাই। জানলেও কিছু করার কী আছে আমার, কিছুটা মনেমনে জ্বলা ছাড়া। আমার সঙ্গে যোগাযোগ সে কেন রাখে জানি না। হয়তো শিশিরের কথা কাউকে না কাউকে তো বলতে হবে এই বিবেচনায়। কিম্বা দ্বিতীয় পুরুষ হিসেবে আমাকে সে গোনায় ধরে। এমনও হতে পারে ওর তো বকবক করা স্বভাব, তা কার সঙ্গে করবে? কিন্তু এই কারণ নিয়ে আমি বিচলিত না।

বরং আজ কেন শিশির আলোচনাতেই নাই তা নিয়ে আমি বেশি চিন্তিত। অনেকক্ষণ আবার নাদিরার পুরান আলাপ, জীবনের গভীর বেদনার কথা শোনার পর জানতে চাইলাম শিশিরের কী খবর।

নাদিরা কিছুটা বিরক্ত মনে হইল। বলল—
: আছে ওর মতো। ওই যে অস্ট্রেলিয়ান গাভীটা আছে না রেহনুমা। ও ফিরছে। ওরে নিয়া আছে। আমার খোঁজ আর লাগে না তার। রেহনুমারে নিয়া নাকি একটা উপন্যাস লিখবে সে। আচ্ছা তুই বল, আমার জীবন কি কম ড্র্যামাটিক। এই যে এত ঘটনা ঘটল, সব তো সে জানে। কিন্তু ওই পুতুপুতু রেহনুমার মধ্যে কী আছে। ও ইউরোপ গেছে বইলাই কি সব! বুঝলি ছেলেরা খুব হারামি হয়। ওদের বুঝে উঠা যায় না। তুই অবশ্য আলাদা। তোর মতো ছেলের সঙ্গে যে আমার আগে কেন দেখা হয় নাই। তোর সঙ্গে মিশতে মিশতে তোরে ভালো লাগে। শিশির অবশ্য শুরুতেই ভালো লাগে। কিন্তু জানিস কি ভরসা করা যায় না ছেলেদের ওপর। আমার মতো মেয়েদের জন্য ছেলে পাওয়া খুব কষ্ট। তোর সঙ্গেই যা একটু-আধটু গল্পগুজব করি বল। নইলে তো আমার সারাটা দিন বেকার যায়। তোর বউ কেমনরে, ফ্রি খুব? অন্য মেয়েদের সঙ্গে মিশলে কিছু বলে না? আমার সঙ্গে যে মিশিস তা তো জানে না। জানে না যখন তখন তুই এত দূরে দূরে রাখিস কেন আমাকে বল তো?

বলতে বলতে কেমন মিইয়ে আসে নাদিরা। আমি রেস্টুরেন্টের গ্লাসের বাইরে তাকাই। আমার বউ বিষয়ে কখনো কিছু জানতে চায় নাই সে। আজ জানতে চাইল কেন ভাবছি।

কয়দিন আগে মোরা নামে একটা ঝড় খুব আতঙ্ক জাগাইছিল। কিন্তু যত গর্জাইল তত বর্ষাইল না। এতে অবশ্য ভালোই হলো। মৌসুমী বায়ুও ধরা দিল। এখন একটা একটানা বাতাস পাওয়া যায়। সন্ধ্যা নামতে শুরু করছে। কেমন একটা সোনালি আলো শুক্রাবাদের আকাশে দম ধরে আছে। রাতে হয়তো বৃষ্টি নামবে। নাদিরা একদম নাকি বৃষ্টিতে ভিজতে পারে না, ওর জ্বর চলে আসে।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র