Barta24

মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯, ১ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

দনিয়া আরমানদোর পর্ণকুটির

দনিয়া আরমানদোর পর্ণকুটির
মঈনুস সুলতান


  • Font increase
  • Font Decrease

মাস দুয়েক ধরে আমি নিকারাগুয়ার ইসতেলি বলে একটি মফস্বল শহরে বাস করছি। অদূর ভবিষ্যতে লাতিন আমেরিকায় পেশাদারী কাজের ধান্দায় আমার এসপানিওল বা স্প্যানিশ ভাষা শেখার প্রয়োজন হয়েছে। তো, ইসতেলি শহরে আছে ইসকুয়েলা হোরাইজনতি বলে চমৎকার একটি এসপানিওল ভাষা শেখার স্কুল। ওখানে আমি ছাত্র হিসাবে পড়াশোনা করছি। মি. চার্লসের সাথে ইসকুয়েলাতে আমার পরিচয় হয়েছে। তাঁর পুরো নাম চার্লস ডেভান। বয়স সত্তর, তবে ব্যায়াম করা পেটানো দেহের জন্য তাঁকে দেখায় মেরেকেটে বাষট্টির মতো। এক সময় কাজ করতেন আমেরিকান এয়ার ফোর্সে, বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত, ভ্রমণ করেন, নিজেকে হিস্টোরিয়ান হিসাবে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। কিসের ইতিহাস, কেন তিনি তা লিখছেন, ইত্যাদি এখনো আমি ভালো করে বুঝে উঠতে পারিনি।

মি. চার্লস বর্তমানে এসপানিওলের কোনো ক্লাসের ছাত্র নন। তবে বছর দেড়েক আগে তিনি এ ইসকুয়েলাতে এসে এসপানিওলের ওপর একটি কোর্স করেছেন। সে সূত্রে শিক্ষয়িত্রী সিনোরিতাদের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব খুবই মজবুত। তিনি প্রায়ই তাঁদের জন্য এক্সপেনসিভ চকোলেট বার নিয়ে আসেন। তারপর, আঙিনায় হোমওয়ার্ক করার জন্য পেতে রাখা চেয়ার-টেবিলে বসে পুরানো পত্রিকা খুঁটিয়ে পড়েন। এবং আমাকে অবসর দেখলে আলোচনা জুড়ে দেন। তাঁর আলাপের প্রিয় প্রসঙ্গ হচ্ছে—নিকারাগুয়ার বংশানুক্রমের ডিক্টেটর শাসক গোষ্ঠী তথা সমোজা পরিবারের রাজনৈতিক গলদ কোথায় ছিল? সান্দিনিস্তা বলে বামপন্থী বিপ্লবীরা ক্ষমতায় এসেছে মূলত কিসের জোরে? আর শহরের তরুণদের মধ্যে ইদানীং ছড়াচ্ছে যে ড্রাগস ও ভায়োলেন্স, তা রোধ করা যায় কিভাবে ইত্যাদি।

গ্যালারিতে মৃতদের ছবিগ্যালারিতে মৃতদের ছবি

ইসতেলি শহরে মি. চার্লস পর্যটক হিসাবে একটি হোটেলে মাসওয়ারি কড়ারে বসবাস করছেন। তিনি ক্যাটাগরিতে পর্যটক হলেও কী কারণে জানি শহরের আওয়ারা তরুণদের নানা কিসিমের প্রকল্পে যুক্ত করে মাতিয়ে রেখেছেন। এ ধরনের একটি প্রকল্প হচ্ছে—মস্ত রঙিন কাপড় পালের মতো উড়িয়ে তাদের রলারস্কেট করা শেখানো। তাঁর আস্তানা হচ্ছে বিপ্লবী যুদ্ধে আত্মাহুতি দেওয়া মৃতদের স্মরণে সৃষ্ট একটি গ্যালারি। নিকারাগুয়ার সাম্প্রতিক বিপ্লবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোদদপুষ্ট সমোজা চক্রকে সশস্ত্র সংগ্রামের ভেতর দিয়ে উৎখাত করে ক্ষমতায় আসে প্রগতিশীল বাম ধারার সান্দিনিস্তা পার্টি। এ যুদ্ধে ইসতেলি শহরের তিনশো মানুষ আত্মহুতি দেন। তাঁদের ফটোগ্রাফস্, পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের কাটিং, কাপড়-চোপড়, বুটজুতা ও বন্দুক দিয়ে দনিয়া নিনো আরমানদো বলে এক মহিলা গড়ে তুলেছেন এ স্মারক গ্যালারি।

যুদ্ধে দনিয়া নিনো’র দুটি ছেলের মৃত্যু হয়। প্রথমে তাঁর চৌদ্ধ বছর বয়সের ছোট ছেলেকে সমোজা চক্রের সৈনিকরা প্রকাশ্যে ধর্ষণ করে হত্যা করে। পরে মৃত্যু হয় আঠারো বছরের বড় ছেলের। বিপ্লবী ক্রিয়াকর্মের সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে তাঁর কাটা মুণ্ডু প্রদর্শিত হয় শহরের পার্কে।

গ্যালারিতে কোনো আর্থিক অনুদান নেই। মি. চার্লস ওখানে মৃত যোদ্ধাদের জননীদের সাক্ষাৎকার নিয়ে ল্যকেল হিস্ট্রি লেখার একটি প্রজেক্ট করছেন। তাঁর প্ররোচনায় আমিও গ্যালারিতে স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে কিছু কাজে সামিল হচ্ছি। এ সুবাদে গ্যালারির ব্যবস্থাপক দনিয়া নিনো আরমানদোর সাথে আমাদের দুজনের তৈরি হচ্ছে হার্দিক সম্পর্ক। আর সত্যি কথা বলতে—দনিয়া নিনোর আচরণে এমন কিছু আছে, যার জন্য তাঁকে আমার আত্মীয়-স্বজনদের মতো আপন মনে হয়। তিনি দিন দুয়েক গ্যালারিতে আসেননি। মহিলা সম্ভবত অসুস্থ। মি. চার্লস প্রস্তাব করেন—চলো সুলতান, তাঁর বাড়িতে যাই, দেখে আসি—কী রকম আছেন দনিয়া, কী হয়েছে তাঁর? দনিয়ার আর্থিক অবস্থা কেমন, তাঁর পরিবারের সকলে কিভাবে বসবাস করেন, এ বিষয়টি জানতে আমার আগ্রহ আছে। তার ওপর বিকালবেলা আমার কোনো কাজবাজ নেই, তাই আমি কোনো চিন্তা-ভাবনা না করে রওয়ানা হই, মি. চার্লসের সাথে দনিয়া নিনোর বসতবাড়ির দিকে।

ছাপড়া কফিশপের সামনে পাবলিক বাস

ছাপড়া কফিশপের সামনে পাবলিক বাস

খুবই সংক্ষিপ্ত শর্টকার্ট পথ ধরে মি. চার্লস আমাকে নিয়ে আসেন শহরের লাগোয়া মিরাফ্লোর পাহাড়ের বেইসে। পথের ধারের এক ছাপড়া কফিশপে বসে আমরা পাবলিক বাসের অপেক্ষা করি। একটা বিষয়ে খটকা লাগে—মি. চার্লস ছোট শহরের চিপাগলি ও কোনাকুনি সব শর্টকার্ট এত ভালো করে চেনেন কিভাবে? তিনি কফিশপ থেকে দনিয়া নিনো আরমানদোর বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য কিছু সালচিচা বা মশলাদার সসেজ কেনেন। পাবলিক বাসে ছাদের ওপরও কয়েকজন মানুষ বসে আছেন। ভেতরের ভিড়ে আমরা রড ধরে দাঁড়াই। মিরাফ্লোর পাহাড়ের গোড়ায় টিলা-টক্কর ও মাঠ-প্রান্তরে ছড়ানো বেইসটি বিশাল। চাষীরা মিষ্টিআলু, যব ও তামাকের ক্ষেতে কাজ করছে। পাহাড়ের গোড়া পেঁচিয়ে উঠে যাওয়া সড়ক ধরে খানিক আগ বাড়িয়ে বাসটি উল্টা দিকের সমতলে থামলে, আমরা নেমে পড়ে চষাক্ষেতের ওপর দিয়ে হেঁটে চলে আসি দনিয়া নিনোর বাড়িতে।

তাঁর বাড়ির হাতায় খোলামেলা বেশ কিছু জমি। তাতে ফলছে শাকসবজি, ঘাস খাচ্ছে কয়েকটি গরু ও ছাগল। দুটি মুর্গা কককক করে তাড়া করে এসে উড়াল দিয়ে উঠে বসে ঘরের চালে। তাঁর ঘরটি দ্বিতল হলেও অবস্থার নিরিখে তা পর্ণকুটির। অনেক বছর তাতে সারাই-মেরামত হয়নি বলে তা বেজায় রকম ঝুরঝুরে হয়ে আছে। মোরগের ককককে সজাগ হয়ে কে যেন কেশে গলা সাফ করে বলে ওঠেন—মিরা, কিয়েন ভিনো, বা দেখো তো কে আসলো? আমরা ততক্ষণে চলে এসেছি সামনের আঙিনায়। দাওয়ায় মাদুর পেতে শুয়েছিলেন দনিয়া নিনো, তিনি উঠে বসলে দেখি, তাঁর চুলে বেড় দিয়ে পেঁচানো একটি লতা, তাতে গোঁজা রঙিন পাখির পালক। শরীর তাঁর খারাপ করেছে সকাল থেকেই, তাই তিনি গ্যালারিতে যেতে পারেননি। মাঝেমাঝে তাঁর এরকম হয়—মাথার আধখানা জুড়ে তীব্র ব্যথা। এ রকম চলে যায় দিন দুয়েক। লতা দিয়ে পেঁচিয়ে পালক গুঁজলে একটু উপশম হয়।

মিরাফ্লোর পাহাড়ের দৃশ্য

মিরাফ্লোর পাহাড়ের দৃশ্য

বারান্দায় একটি চেয়ারে বসে তাঁর স্বামী ডন আরমানদো। তিনি বসে বসে মৃদু স্বরে শুনছেন ট্রানজিসটার রেডিও। তাঁর সামনের বেঞ্চে বসে মি. চার্লচ আমার সাথে ডন আরমানদোর পরিচয় করিয়ে দেন। তারপর, তাঁকে এক প্যাকেট মার্লবরো সিগ্রেট উপহার দেন। ডন আরমানদো একটি সিগ্রেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বলেন—সারা জীবন আমি স্লোগান দিয়েছি আবাহো এল ইমপিরিয়েলইজমো ইয়াংকি, বা নিপাত যাক মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, তবে অই দেশের একটা জিনিস আমি পছন্দ করি, তা হচ্ছে মার্লবরো সিগ্রেট, স্বাদে বড়ই মোলায়েম। তিনি আরেক দফা ধোঁয়া ছেড়ে আমার দিকে এক শলা বাড়িয়ে দেন। চোখ থেকে গড়িয়ে নেমে আসা জল মুছলে আমি খেয়াল করে বুঝতে পারি, তিনি দেখতে পান খুবই সামান্য, তাঁর চোখের মণি দুটোকে দেখায় শ্যাওলা মাখা মার্বেলের গুলির মতো। মি. চার্লস দনিয়া নিনোর সাথে আঙিনায় লাউ-কুমড়ার মাঁচা দেখতে গেলে, ডন আরমানদোর সাথে আমার কথাবার্তা বেশ জমে ওঠে।

দৃষ্টি স্বল্পতা নিয়ে জন্মাননি তিনি। পেশায় চাষী ডন আরমানদো বিপ্লবের আগে মিরাফ্লোরে মরালেস পরিবারের বিশাল কফি এস্টেট ফিনকা নেবলিনাতে কাজ করতেন। মূলত কফি চাষের লোক হলেও এস্টেটের ডাকসাঁইটে মালিক সিনিওর মরালেস যখন মিষ্টিআলু ইত্যাদির এক্সটেনশন শুরু করেন, ক্ষেতে রসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রভৃতি দেওয়ার ভার পড়ে ডন আরমানদোর ওপর। একবার সিনিওর মরালেস আমেরিকান এক কোম্পানির কাছ থেকে সংগ্রহ করেন এনহাইড্রাস এমোনিয়া বলে এ ধরনের সার। এটি স্প্রে করার সময় অসাবধানতায় কিছু ফিউম বা বিষাক্ত বাষ্প লিক করে বাতাসের ঝাপটায় এসে লাগে ডন আরমানদোর চোখমুখে। কিছুক্ষণের ভেতর তিনি চোখে ঝাপসা দেখতে শুরু করেন। ফুলে ওঠে তাঁর চোখমুখ, জ্বালা-যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে এক পর্যায়ে সজ্ঞাহীন হলে প্রতিবেশি চাষীরা তাঁকে হ্যামোকে শুইয়ে নিয়ে যায় স্থানীয় হাসপাতালে। পাঁচদিন পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে। দিন পনের পর তাঁর চোখে কিছু আলো ফিরে আসে বটে, কিন্তু আগের মতো দেখার পুরাপুরি ক্ষমতা তিনি আর ফিরে পাননি কখনো। সে থেকেই ডন আরমানদো অর্ধেক অন্ধ, কাজকর্ম আর কিছু করতে পারেননি তেমন করে। মূলত বেকার ঘর-বৈঠকি জীবন যাপন করছেন প্রায় তেইশ-চব্বিশ বছর হলো।

দনিয়া নিনো বারান্দার কোনায় স্টোভ জ্বেলে ফ্রাইপ্যানে ভাজছেন লালচে কফি বিন। তাঁর পাশে টুলে বসে ঘরের মানুষের মতো সহজাত ভঙ্গিতে গালগল্প করছেন মি. চার্লস। আমরাও একটু-আধটু কথা বলি। বিপ্লবের আগে এ বাড়িটিও ছিল মরালেস পরিবারের কফি এস্টেটের সম্পত্তি। চাষী হিসাবে ডন ও দনিয়া তাদের বালবাচ্চা নিয়ে এখানেই বাস করছিলেন। দৃষ্টিক্ষমতা খানিক ফিরে আসতেই সিনিওর মরালেসের কর্মচারীরা এসে তাঁকে আবার ক্ষেতে বিষাক্ত এনহাইড্রাস এমোনিয়া স্প্রে করার জন্য চাপ দিতে থাকে। তিনি এ রসায়নিক স্পর্শ করতে অস্বীকার করলে তাঁর পরিবারকে একুশ দিনের উকিল নোটিশ দিয়ে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। একই সাথে ফিনকা নেবলিনাতে চাষী হিসাবে কাজ করার অধিকারও হারান তিনি।

দনিয়া আরমানদোর পর্ণকুটির

দনিয়া আরমানদোর পর্ণকুটির

তারপর দেশে বিপ্লব হলো। মরালেস পরিবারের এস্টেট সমাজতান্ত্রিক সরকার হুকুম-দখল করে নিলে ডন ও দনিয়া এ বাড়িতে ফিরে আসার আইনীস্বত্ব লাভ করেন। ফিনকা নেবলিনাও ইদানীং ভাগ করে দেওয়া হয়েছে যেসব চাষী বিপ্লবে শরীক ছিলেন তাঁদের মধ্যে। এ পরিবারের দুটি ছেলে যেহেতু মুক্তিসংগ্রামে আত্মাহুতি  দিয়েছে; তার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁরা পেয়েছেন ফিনকা নেবলিনায় পাঁচ একরের কফি প্ল্যানটেশনের একটি প্লট। তাদের মেঝো ছেলে ওই পাঁচ একরে চাষবাস করে। সে বাসও করছে মিরাফ্লোরের মিডল লেয়ারে।

বারান্দার মাঝামাঝি ছোট্ট একটি টেবিলের ওপর কাঠের ক্রুশের পাশে পানি ভরা বউলে রাখা কিছু তাজা ফুল। তাতে এসে বসে একটি প্রজাপতি। আমি এ বেদির ওপর দেয়ালে টাঙানো জোড়া ফটোগ্রাফসের দিকে তাকাই। আত্মাহুতি দেওয়া ছেলে দুটোর ছবি আমি গ্যালারিতে দেখেছি, তাই তাঁদের চিনতে কোনো অসুবিধা হয় না। হামানদিস্তায় আধপোড়া কফি বিন কুটছেন দনিয়া নিনো, চারদিকে ছড়াচ্ছে তীব্র স্মোকি সৌরভ। ডন কাশতে কাশতে আরেকটি মার্লবরো ধরিয়ে চোখের জল মুছে বলেন—দেশে বিপ্লব হলো, যে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়েছিলাম সেখানেও ফিরে এসেছি, আমাদের মেঝো ছেলের কফি বিক্রি করে অবস্থাও খারাপ যাচ্ছে না; তারপরও আমরা ঠিক ইনসাফ পেলাম না। চুপাসংগ্রেজ বা ব্লাডসাকার সিনিওর মরালেস এখনো বেঁচেবর্তে আছে। এ আনসিয়ানো রিএকশনারিও, বা এ বুড়া প্রতিক্রিয়াশীলের নাতনি এখানকার একটি ভাষা বিদ্যালয় ইসকুয়েলা হোরাইজনতিতে বিদেশিদের এসপানিওল শেখায়।

দনিয়া নিনো ও মি. চার্লস আমাদের জন্য নিয়ে আসেন দু পেয়ালা কফি। আমি চুমুক দিতে গিয়ে দেখি, ডন আরমানদো উবু হয়ে হাতড়ে চেয়ারের নিচ থেকে বের করে আনছেন পোড়ামাটির এক সানকি। তাতে বেশ খানিকটা কফি ঢেলে শিস দিয়ে তিনি কাকে যেন ডাকেন। আঙিনা থেকে তাঁর কাছে  চলে আসে একটি ছাগল। সে ঘোলাচোখে ঘাড় কাত করে আমাদের কথাবার্তা শোনে। তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমি চমকে উঠি, চুন লাগা পাথরের মতো তার রঙ। অন্ধ প্রাণীটি ডন আরমানদোর হাতে ধরা সানকি থেকে চেটে চকাস চকাস করে কালো কফি খায়। আর তিনি আপসোস করে বলেন—বিপ্লবের সময় আমরা ট্রেড ইউনিওন করেছি, কথা হয়েছিল লিবারেশনের পর দেশ থেকে উচ্ছেদ করা হবে বিষাক্ত রসায়নিক সার ও কীটনাশক, কিছু হলো কি? শুনি আজকাল আমেরিকান কোম্পানিগুলো ফিরে এসেছে, কৃষকদের তারা দিচ্ছে কিছু ফ্রি কীটনাশক। এগুলো মিশে যাচ্ছে পশুচারণ ভূমির পানির উৎসে। এতে অন্ধ হয়ে গেছে এ এলাকার বেশ কিছু গরু ও ছাগল। এ ছাগলটি অন্ধ হলে আমার প্রতিবেশি একে কসাইখানায় বিক্রি করে দিতে চেয়েছিল। আমি শুনতে পেয়ে তাকে কিনে নেই। ছাগলটি ঘাড় বাঁকা করে যেন আলাপের সরোৎসার বুঝতে পেরে চেটে দেয় ডন আরমানদোর হাত।

আপনার মতামত লিখুন :

মৌসুমি বায়ু আসে

মৌসুমি বায়ু আসে
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

নাদিরার আজ অন্য রূপ।
অন্যদিন নাদিরা আমার কাছে আসত ক্যাজুয়ালি। লিপস্টিক যদিও থাকে তার ঠোঁটে। লাল টকটকে রাশান লিপস্টিক মেখে আসে সে। ওর ফর্সা ত্বকের সঙ্গে লাল রঙটা খুব যায়। কিন্তু এটুকুই। একটা সালোয়ার বা একটা টপ পরে আলুথালু চুলে নাদিরা আমার কাছে আসত। আজ রোজার মধ্যেই লিপস্টিকের সাজ না দিলেও সে পরিপাটি। অন্তত চুল বাঁধা। নাদিরার চুল স্ট্রেট অ্যান্ড সিল্কি। মিহি চুলগুলা কিছুটা ব্রাউনিশ। এগুলো সে বেশিরভাগ সময় ছেড়ে আসত। বা খোঁপা যদি একটা বাঁধতও তো আশপাশে চুল উড়ত। কিন্তু আজ সে টাইট করে চুল বেঁধে এসেছে। ক্লিপ দিয়েছে, মাথাটা একটু উঁচা উঁচা লাগছে। আরো একটা ব্যাপার আছে। নাদিরা আজ আমাকে খাওয়াবে। বলতে গেলে এই প্রথম সে আমাকে খাওয়াবে মানে ইফতার করাবে। এই ট্রিটটা সে কেন দেবে জানি না। কারণও বলে নাই। ওকে কিছু জিজ্ঞাস করলে অনেক কথায় উত্তর দেয়। বলে, ‘তোরে কী আমি খাওয়াইতে পারি না একটা দিন? তুই আমারে কী ভাবিস’—এসব।

কিন্তু যে বিষয়টা নাদিরার রূপ সবচেয়ে কড়াভাবে বদলে দিয়েছে, তা হলো সে আজ শিশিরের নাম একবারও উচ্চারণ করে নাই। অন্যদিন নাদিরার আলাপের মূল বিষয় শিশির। তাকে নাদিরা গুরু ডাকে। শিশির নাদিরার জীবনের দার্শনিক। তাকে সে অন্য চোখে দ্যাখে। শিশিরকে সে নিজের জীবনদর্শনের একটা উঁচা জায়গায় রেখে দিয়েছে। গুরুর হাজার প্রসংশা, ন্যূনতম সমালোচনা আর অল্প-স্বল্প বিরক্তি মিলিয়ে সারাক্ষণ গুরুই নাদিরার আলোচ্য বিষয়। আমার দিক থেকে নাদিরার সঙ্গ পাওয়ার জন্য গুরুর আলাপ শুনতে হয়। ওকে যদিও একটু খাওয়াতে হয়। কিন্তু আমার নারীসঙ্গ ভালো লাগে বলে ওর জন্য এই খরচটুকু সামান্যই। তবে বোনাসও আছে সঙ্গে। সেটা শিশিরের বা অন্যদের খবর পাওয়া। শিশিরের কাছে না গিয়ে, বাংলার চলমান সাহিত্যের কারো কাছে না গিয়েও, ওদের বিষয়ে আমার আগ্রহ নাই বাইরে বাইরে এটা দেখিয়ে চলা অব্যাহত রেখেও সহজে ওদের বিষয়ে জানার উপায় নাদিরা। এবং আমাদের এসব সাক্ষাত বা আলাপ গোপন রাখাটা ছিল নিজেদের মধ্যে একমাত্র শর্ত।

শিশির গল্প লেখে। সে বিয়ে করে নাই। আমি করেছি এবং গল্প লেখি না। কিন্তু নাদিরার আমি বন্ধু। আর নাদিরা শিশিরের বোজম। ওদের বন্ধুত্বের শুরুটা বইমেলা থেকে। আরেক বন্ধুর হাত ধরে। আমার সঙ্গে নাদিরার বন্ধুত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর সেই বন্ধুত্ব ক্ষুণ্ন হয়। আমরা একে অন্যের থেকে দূরে সরে যাই। এরপর আমাদের দেখা ঘটবার কারণ ছিল আমার শ্বশুরবাড়ি। আর সেটা ময়মনসিংহ। ঠিক ময়মনসিংহও না নেত্রকোনা সীমানায়। সেখানে নাদিরাদেরও বাড়ি। নাদিরার সঙ্গে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, একান্তে আড্ডা দেওয়া কিম্বা খাওয়ানোর মতো সম্পর্ক ছিল না। ইনফ্যাক্ট আমি তাকে দেখেছি কিন্তু আলাপ হয় নাইয়ের মতো একটা সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্কটা একই বিশ্ববিদ্যালয়ে যতটা থাকে ততটা আরকি। আছেও আবার নাইও সম্পর্ক। বিয়ের পর বউয়ের কাছ থেকে ওদের এলাকাগত নৈকট্য জানার পর নাদিরা আবার ফিরে এলো আমার জীবনে। ফেসবুকে আমি তাকে অনেকদিন পর, বিশ্ববিদ্যালয় পার হয়ে যাওয়ারও সেই কত পরে, জিজ্ঞেস করলাম, কেমন আছিস?

নাদিরা অন্য রকম মেয়ে। খোলামেলা, উড়ু উড়ু। একটা ছেলের সঙ্গে ওর চৌদ্দ বছরের সম্পর্ক ছিল। বিয়ের পর নাদিরাকে চাকরি করতে দেবে না বলে সেই বিয়ে আর হলো না। নাদিরা সেই থেকে একা থাকে। ওই ছেলে বিদেশ। চৌদ্দ বছরের সম্পর্ককে নাদিরা নিজের স্বাধীনতার জন্য বিসর্জন দিয়ে এলো। ওর জীবনে অনেক কাহিনী। প্রেমছাড়া হওয়ার পর বেশিরভাগ কাহিনীর সঙ্গে শিশিরের যোগাযোগ। অথচ আজ আর সে শিশিরের কথা বলতেছিল না একদমই। খালি নিজের এসব কথা আবার করে বলতেছিল। চৌদ্দ বছরের সম্পর্কের কথা। কত ঘুরেছে তারা। এই ঢাকা শহরের হেন রাস্তা নাই তারা রিকশায় ঘুরে নাই। পুরান ঢাকা টু বনানী—হেন রেস্টুরেন্ট নাই তারা খায় নাই। চৌদ্দ বছরের তুলনায় ঢাকা খুব ছোট একটা শহর। তবু তাদের প্রেম তো দমে নাই, ঘুরাঘুরি থামে নাই, শোয়াতে কম পড়ে নাই। অথচ চাকরির জন্য সব বিসর্জনে গেল। এই যে কত কথা, কত ঘটনা, অনুরাগ সব কিছুই কি ফ্যালনা? আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়া জানতে চাইল নাদিরা।

: বুঝলি মানুষ সবচেয়ে হারামি প্রাণী আর এর মধ্যে পুরুষরা বেশি হারামি। তুই আবার রাগ করিস না। তোর সাথে যে কেন আমার আগে দেখা হলো না। আমার আসলে তোদের সঙ্গে বেশি মেলে বুঝলি। ওই যে একটু বুদ্ধিজীবী টাইপ। নানা বিষয় নিয়ে কথা বলবে। তোদের মধ্যে এই ফ্রি ফ্রি ভাবটা আমার বেশ লাগে। কিন্তু আমি কিনা সম্পর্ক করলাম একটা গেরস্থ ছেলের সঙ্গে আর সেটা বুঝতে আমার চৌদ্দ বছর লাগবে?

আজ যেন নাদিরা কেঁদে দিবে। জ্যৈষ্ঠের শেষ দিকে ভাসতে ভাসতে আকাশে জমতে থাকা নতুন মেঘের মতো দলা দলা না-পাওয়ার বেদনা ওর চোখেমুখে। কাজল দেওয়া চোখে ভাব জমেছে। আমরা বসছি শুক্রাবাদের ‘হটহাট’-এ। এই জায়গাটা নাদিরার সবচেয়ে পছন্দ। ঢাকা ছোট হলেও এর মধ্যে এত চিপাচাপা যে অগম্যতা থেকেই যায়। চৌদ্দ বছরের দীর্ঘ প্রেমের পরও হটহাট-এ তাদের পায়ের চিহ্ন পড়ে নাই। এটা আমি নাদিরাকে প্রথম চেনাই। সে তো দেখেই অবাক। এমন নিরিবিলি, ছিমছাম একটা রেস্টুরেন্ট সে আগে দেখে নাই। এরপর থেকে এটা আমার আর নাদিরার কমন জায়গা। এখানে বসে সে শিশিরের কথা বলত আমাকে এতদিন।

: শিশির বুঝলি খুব শার্প একটা ছেলে। অন্য রকম একটা জায়গা আছে ওর মধ্যে। এই যে আমি যাই ওর বাসায়, কেউ থাকে না সেখানে তারপরও আমাকে একবারও ছুঁয়ে দেখে নাই। ওর চাহনির মধ্যেই এসব নাই আমার প্রতি। ওর গল্পের মধ্যে দেখিস না কেমন একটা বিয়োন্ড দ্য বাউন্ডারি ব্যাপার আছে। গল্পটা তো আসলে ইমাজিনেশনই বল। মানে এই যে তুই আর আমি গল্প করতেছি, কিন্তু এটা কি গল্প? গল্পে কল্পনাটা থাকতে হয়। শিশিরের আছে। ওর চোখ দুইটাই যেন কল্পনার রাজ্য বুঝলি।

এভাবে শিশিরের গুণকীর্তন আমার শুনে যাইতে হয়। সেটা নাদিরার কারণেই। ওর শরীরটা আমি দেখি, ওর হাসি, গহীন চোখ এসব দেখার জন্যই আমি নাদিরার ডাকে সাড়া দেই। ওরে ডাকি। কফি খাই। রাস্তার দিকে তাকাই। শুক্রাবাদের জঞ্জাল পার হয়ে কেমনে মানুষ যায়? নাদিরা থাকে ওর মায়ের সঙ্গে। বাবার লগে সেপারেশন হয়ে গেছে। নাদিরার বাবার অন্য মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। সেটা তিনি গোপন করতেন। বাসায় সবসময় খিটখিট করতেন। সবাইকে সাপ্রেশনে রাখতেন। প্রতিদিন দিনের একটা সময়ে তিনি বাসার বাইরে থাকতেন। একদিন নাদিরা তার এক বন্ধুকে বলল ফলো করতে। দেখা গেল তিনি একজন বোরখা পরা মহিলাকে নিয়ে ঘুরছেন রিকশায়। নাদিরা তার বাবাকে কখনো পান-সিগারেট খেতে দেখেনি। রিকশায় বসে তিনি পান চিবাচ্ছেন আর সিগারেট খাচ্ছেন। বোরখা পরা মহিলার চেহারা দেখা যাচ্ছে না। চোখ দেখা যাচ্ছে শুধু। ফলো করতে করতে নাদিরার বন্ধু আদাবর পর্যন্ত গেল। সেখানে একটা ফ্যাকাশে চার তলা বিল্ডিংয়ে ঢুকলেন।

এসব আমাকে যতবার বলে, তত রাগে নাদিরার গা জ্বলে।
ফলো করতে করতে সেদিন ওই বাসার নিচে একটা চায়ের দোকানে বসে থাকে তার বন্ধু ঘণ্টার পর ঘণ্টা। দুপুরের পরে বেরিয়ে আসেন তার বাবা। নাদিরার বন্ধু নিজ বুদ্ধিতে নিজেকে আড়াল করার জন্য বোরখা পরে ছিল। সঙ্গে সঙ্গে নেকাব বেঁধে নেয়। দুধর্ষ সেসব অভিযানের দিনে শিশির ছিল নাদিরার পরামর্শদাতা, সহসদাতা। এসব ঘটনায় নাদিরার পরাজয় নাই, বরং জয় আছে—শিশির এভাবে তাকে মানসিক সান্ত্বনা দিত।

পঞ্চম দিনে নাদিরার বন্ধু নিজ সাহস ও বুদ্ধিতে হাতেনাতে ধরে ফেলে তার বাবাকে। ফলো করে উঠে যায় চারতলায়। কলিংবেল বাজিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে। তারপর বোরখার নেকাব খুলে দেখিয়ে দেয় নাদিরার বাবাকে নিজের মেয়ের বন্ধুর মুখ। নিজেও দেখে নেয় সেই মহিলাকে। তাদেরই বয়সী একটা মেয়ে। গ্রাম্য। একটা গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করত। নাদিরার বাবা তাকে একটা প্রকাশনা হাউসে চাকরি নিয়ে দিয়েছিলেন। মেয়েটা দেখতে শ্যামলা। কিন্তু শরীরটা ছিল পোক্ত। ঠাস করে নাদিরার সেই বন্ধুর গালে একটা চড় লাগিয়ে দেয় তার বাবা। ছেলেটা হকচকিয়ে যায়। কিন্তু নাদিরার বাবা হৈ চৈ শুরু করে দেন। নিজের মেয়ের ফন্দিতে এসব হচ্ছে জেনে তিনি চোখের সামনে অস্বীকার করে বসেন তার কোনো মেয়ে নাই। এবং এই ছেলে অনুপ্রবেশকারী। এই মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নিরাপদ রাখার জন্য লোকাল কিছু গুণ্ডাকে পুষতেন তিনি। তাদের ডেকে আনলেন। বললেন ছেলেটাকে পিটিয়ে ঘর থেকে বের করে দিতে। অপমানে, লজ্জায়, অসহায়ত্বে কুঁকড়ে গিয়ে রিক্ত, নিঃস্ব, সর্বশান্ত নাদিরা সেদিন এসব ঘটনার পর আবার বাড়ি ফিরে গেলেও সেটা ছিল তার কাছে ভাঙা হাটের মতো।

সেই থেকে শিশিরের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা। এতে ভীষণ আপ্লুত নাদিরা। এসব বিবরণ নাদিরা আমাকে দিয়েছে। শিশির তো পারত সেদিন তার দুর্বলতার সুযোগ নিতে। নাদিরা কি ফেলনা কিছু? সে দেখে না যে ছেলেরা তার দিকে কেমন করে তাকায়? কিন্তু শিশির, ও যেন সন্ত!

শিশিরের সঙ্গে যোগাযোগ ওর প্রথম প্রেমিকের সূত্রেই। শিশির যদিও বাম ছিল না কখনো। কিন্তু নাদিরার প্রথম ও জ্ঞাত একমাত্র প্রেমিক ছিল বাম। আজিজ সুপার মার্কেট, কাঁটাবন, শাহবাগ, তোপখানা রোড—এসব জায়গা ঢাকার বাম ও সাহিত্যিকদের জন্য কমন জায়গা।

আমি অবশ্য মফস্বল থেকে আসা। শিশিররা বরাবরই ঢাকার ছেলে। ওদের একটা চাপ আছে, ওরা পরিচিত, অনেক কিছু চেনে-জানে। আমার যেমন চিনতে-চিনতেই অনেক সময় চলে গেছে। এমনকি শিশিরকে চিনতেও। ঢাকায় সাহিত্য করতে এসে ঢাকার লোকদের না চিনে সাহিত্য করা যায় না। কিন্তু আমাকে না চিনে সাহিত্য করা যায়। ওদের ইন্টারোগেশনের চৌকাঠ পাড়ায়ে তারপর সাহিত্যিক স্বীকৃতি মেলা।

যাই হোক এসব জায়গার কোথাও শিশিরের সঙ্গে পরিচয় নাদিরার। তারপর হয়তো ফেসবুক, ওর সাহিত্যিক মনোযোগ—এগুলা করতে করতে প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্ক ছুটে গেলেও শিশিরের সঙ্গে রয়ে গেছে। সেই শিশির তার দুশ্চরিত্র বাবার স্বরূপ উন্মোচন কাহিনীর রচনাকার।

এরপর থেকে বাবার বিষয়ে তার ধারণা পাল্টে গেল। মেয়ের বিষয়েও বাবার আচরণ পাল্টে গেল। সে এক বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার। আর পুরোটা সময়ে নাদিরাকে শিশির সাপোর্ট দিয়েছে। আর্থিক, মানসিক—সব। আর সেই নাদিরা আজ একবারও শিশিরের নাম মুখে নিচ্ছে না এতক্ষণ হয়ে গেল। যেন ওই নামে কেউ নাই দুনিয়ায়। আমি একটু অবাক। কিছুটা ভাবছিও ব্যাপারটা কী হতে পারে। নাদিরা এরপর ওইসব সিনেম্যাটিক ঘটনার পর আবার বাসায় স্বাভাবিকভাবে থাকতে শুরু করেছে। এখন সে ব্যাংকে চাকরি আর নিজের মাকে নিয়ে থাকছে। শিশির বা আমি ছাড়া তার অন্যত্র যাওয়া আছে কিনা আমার জানা নাই। জানলেও কিছু করার কী আছে আমার, কিছুটা মনেমনে জ্বলা ছাড়া। আমার সঙ্গে যোগাযোগ সে কেন রাখে জানি না। হয়তো শিশিরের কথা কাউকে না কাউকে তো বলতে হবে এই বিবেচনায়। কিম্বা দ্বিতীয় পুরুষ হিসেবে আমাকে সে গোনায় ধরে। এমনও হতে পারে ওর তো বকবক করা স্বভাব, তা কার সঙ্গে করবে? কিন্তু এই কারণ নিয়ে আমি বিচলিত না।

বরং আজ কেন শিশির আলোচনাতেই নাই তা নিয়ে আমি বেশি চিন্তিত। অনেকক্ষণ আবার নাদিরার পুরান আলাপ, জীবনের গভীর বেদনার কথা শোনার পর জানতে চাইলাম শিশিরের কী খবর।

নাদিরা কিছুটা বিরক্ত মনে হইল। বলল—
: আছে ওর মতো। ওই যে অস্ট্রেলিয়ান গাভীটা আছে না রেহনুমা। ও ফিরছে। ওরে নিয়া আছে। আমার খোঁজ আর লাগে না তার। রেহনুমারে নিয়া নাকি একটা উপন্যাস লিখবে সে। আচ্ছা তুই বল, আমার জীবন কি কম ড্র্যামাটিক। এই যে এত ঘটনা ঘটল, সব তো সে জানে। কিন্তু ওই পুতুপুতু রেহনুমার মধ্যে কী আছে। ও ইউরোপ গেছে বইলাই কি সব! বুঝলি ছেলেরা খুব হারামি হয়। ওদের বুঝে উঠা যায় না। তুই অবশ্য আলাদা। তোর মতো ছেলের সঙ্গে যে আমার আগে কেন দেখা হয় নাই। তোর সঙ্গে মিশতে মিশতে তোরে ভালো লাগে। শিশির অবশ্য শুরুতেই ভালো লাগে। কিন্তু জানিস কি ভরসা করা যায় না ছেলেদের ওপর। আমার মতো মেয়েদের জন্য ছেলে পাওয়া খুব কষ্ট। তোর সঙ্গেই যা একটু-আধটু গল্পগুজব করি বল। নইলে তো আমার সারাটা দিন বেকার যায়। তোর বউ কেমনরে, ফ্রি খুব? অন্য মেয়েদের সঙ্গে মিশলে কিছু বলে না? আমার সঙ্গে যে মিশিস তা তো জানে না। জানে না যখন তখন তুই এত দূরে দূরে রাখিস কেন আমাকে বল তো?

বলতে বলতে কেমন মিইয়ে আসে নাদিরা। আমি রেস্টুরেন্টের গ্লাসের বাইরে তাকাই। আমার বউ বিষয়ে কখনো কিছু জানতে চায় নাই সে। আজ জানতে চাইল কেন ভাবছি।

কয়দিন আগে মোরা নামে একটা ঝড় খুব আতঙ্ক জাগাইছিল। কিন্তু যত গর্জাইল তত বর্ষাইল না। এতে অবশ্য ভালোই হলো। মৌসুমী বায়ুও ধরা দিল। এখন একটা একটানা বাতাস পাওয়া যায়। সন্ধ্যা নামতে শুরু করছে। কেমন একটা সোনালি আলো শুক্রাবাদের আকাশে দম ধরে আছে। রাতে হয়তো বৃষ্টি নামবে। নাদিরা একদম নাকি বৃষ্টিতে ভিজতে পারে না, ওর জ্বর চলে আসে।

আধুনিক গদ্যের রূপকার আন্তন চেখভ

আধুনিক গদ্যের রূপকার আন্তন চেখভ
আন্তন চেখভ

কিংবদন্তি রুশ কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার আন্তন চেখভকে বাংলা সাহিত্যে প্রথমবারের মতো পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সম্ভবত সৈয়দ মুজতবা আলী। ‘পঞ্চতন্ত্র’ গ্রন্থে তিনি চেখভকে নিয়ে স্বতন্ত্র প্রবন্ধ রচনা করেন। এবং রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্যদের সাথে তূলনামূলক একটি রচনাও সেখানে স্থান পায়। চেখভ হলেন বিশ্বের সেসকল অল্প কিছু প্রভাব বিস্তারকারী সাহিত্যিকদের একজন, যাদের নামেই পরবর্তী বিশ্বসাহিত্যে একটি স্বতন্ত্র শৈলি তৈরি হয়।

চেখভের শুরুর জীবন ছিল দুঃখ কষ্টে জর্জরিত। শৈশব থেকেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার সাথে নিজেকে মানিয়ে একরকম সংগ্রাম করে বেড়ে উঠেছেন তিনি। তাকে বলা যায় গদ্যের চার্লি চ্যাপলিন৷ চেখভ তার অনেক গল্পই লিখেছেন কমেডির আদলে; কিন্তু চেখভের পাঠকেরা জানেন, এরই আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর দুঃখবোধ ও বেদনার আবহ।

১৮৬০ সালের ২৯ জানুয়ারি দক্ষিণ রাশিয়ার আজভ সাগর সংলগ্ন তাগানরোগ শহরে জন্মগ্রহণ করেন চেখভ। বাবা ছিলেন প্রাক্তন ভূমিদাস কৃষক। তিনি তাগানরোগে একটি দোকান চালাতেন। পাশাপাশি গির্জার ধর্মসংগীতে নেতৃত্বদানকারী গায়কদের পরিচালক ছিলেন। তাঁর স্বভাব ছিল ভীষণ রূঢ় ও কঠোর। মা জেভলোনিয়া জাকোভলেভনা ছিলেন ঠিক উল্টো। অত্যন্ত স্নেহবৎসল আর চমৎকার গল্পকথক; অবিকল রুশ উপন্যাসের মায়েদের মতো। তবে চেখভের বাবা ছিলেন মেধাবী ও তৎপর একজন ব্যক্তি। অভাবের সংসার চালিয়ে নিতে তাকে অনেক পরিশ্রম করতে হতো। চেখভ বলেছিলেন, আমরা আমাদের মেধা বাবার কাছ থেকে পেয়েছি আর হৃদয় মা’র কাছ থেকে।

চেখভের শৈশব-কৈশোর কেটেছে সীমাহীন দারিদ্র্যে। গৃহশিক্ষকতা, পাখি ধরে বিক্রি আর খবরের কাগজে ছোট ছোট স্কেচ এঁকে তিনি নিজের লেখাপড়ার খরচ যোগাতেন। সেই সাথে প্রচুর পড়তেন। মাধ্যমিকেই পড়ে ফেলেছিলেন তুর্গেনিভ, গনসারভ ও শোপেনহাওয়ার। ১৮৭৯ সালে ভর্তি হন মস্কো বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল কলেজে। পাশাপাশি চলছিল গল্প লেখা। তবে প্রথম দিকের গল্পগুলো লিখেছিলেন জীবনযাপন ও লেখাপড়ার খরচ যোগাতে। পরবর্তীকালে তা-ই হয়ে উঠল অন্তরের তাগিদ। ডাক্তারি পাশ করলেও সেই পেশা ছেড়ে পুরোপুরি সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন চেখভ। তাঁর রচিত গল্পগুলোর মধ্যে : ‘স্তেপ’, ‘চাষী’, ‘ওয়ার্ড নম্বর ছয়’, ‘বিষণ্ণ কাহিনি’ উল্লেখযোগ্য।

নাটক লিখেছেন অনেক। তবে নাট্যকার হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এসেছে ‘থ্রি সিস্টার্স’, ‘দ্য সিগাল’ এবং ‘দ্য চেরি অরচার্ড’ নাটকের মাধ্যমে। চেখভের কাহিনি অবলম্বনে মঞ্চস্থ হয়েছে বহু নাটক। এদিক থেকে শেকসপিয়র ও ইবসেনের পাশাপাশি চেখভের নাম উল্লেখ্য।

সাহিত্যচর্চায় চেখভের স্বকীয় রীতি আধুনিক ছোটগল্পের বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখে। চেখভের রচনা শৈলির ওপর দাঁড়িয়ে যায় ‘চেকভিয়ান ম্যানার’। পরবর্তীকালে জেমস জয়েস ও অন্যান্য আধুনিক কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে প্রকটভাবে চেখভের প্রভাব লক্ষ করা যায়।

১৯০৪ সালের ১৫ জুলাই আজকের এই দিনে চেখভ প্রয়াত হন।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র