Barta24

বুধবার, ২৪ জুলাই ২০১৯, ৮ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

জাকারিয়া মন্ডলের বহুমাত্রিক ভ্রমণ বৃত্তান্ত

জাকারিয়া মন্ডলের বহুমাত্রিক ভ্রমণ বৃত্তান্ত
জাকারিয়া মন্ডল ও তার গ্রন্থের প্রচ্ছদ / ছবি: সংগৃহীত
ড. মাহফুজ পারভেজ
কন্ট্রিবিউটিং এডিটর
বার্তা২৪.কম


  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের অনলাইন সাংবাদিকতার পথিকৃৎ ও অসংখ্য তরুণ সাংবাদিকের জনক হিসেবে খ্যাত আলমগীর হোসেন জানেন, কাকে দিয়ে কোনো বিষয়ে ভালো লেখা পাওয়া যাবে। লেখক সৃষ্টির অলৌকিক কৌশল ও সূত্রটি করতলগত বলেই শুধু সার্বক্ষণিক সাংবাদিকদের নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, তরুণ কবি, বিদেশে অধ্যয়নরত গবেষক এবং এমনকি আপাত ভবঘুরের সুপ্ত সম্ভাবনাকেও বের করে আনেন একালের অনলাইন-মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতার কিংবদন্তিতুল্য-ব্যক্তিত্ব আলমগীর হোসেন, যার ফলিত প্রমাণ পাওয়া গেছে জাকারিয়া মন্ডলের বহুমাত্রিক ভ্রমণ বৃত্তান্তে।

ঝরঝরে ভাষা, নিখুঁত বর্ণনা, সরেজমিন পর্যবেক্ষণ এবং ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পৌরাণিক তথ্যসম্ভারের আলোকে রচিত ভ্রমণালেখ্যগুলো নিয়ে জাকারিয়া মন্ডল তার প্রথম গ্রন্থ ‘পাহাড়ের ভাঁজে মহাকাব্য’ প্রকাশ করেছেন চলতি বছরের বইমেলায়। এর কিছুদিন পর প্রকাশ করেন আরেক ভ্রমণ গ্রন্থ ‘বাড়ির পাশে তীর্থ’, যাতে উন্মোচিত হয়েছে চারপাশের জানা ভূগোলের অজানা ইতিবৃত্ত।

জাকারিয়া মন্ডলের বই দু’টিতে স্থান পেয়েছে দেশ-বিদেশের মোট ১৯টি ভ্রমণ আখ্যান, যা কেবল মাত্র স্থান-দর্শন নয়, ব্যাপকার্থে প্রত্নতত্ত্ব ও ঐতিহাসিক পর্যটন। তার গভীর ও বীক্ষণসমৃদ্ধ ভ্রমণকথাগুলো ঋদ্ধ হয়েছে ইতিহাসের তথ্যনিষ্ঠ মেলবন্ধনে।

বাংলা সাহিত্যের গতানুগতিক ভ্রমণ রচনার ধারায় জাকারিয়ার পরিশ্রমী ও গবেষণামনস্ক লেখাগুলো অনন্য ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এইজন্য যে তার সরেজমিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে সভ্যতা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভূগোল, কিংবদন্তি, পুরাতত্ত্ব ও মহাকাব্যের বিশ্লেষণ যুক্ত হয়ে নির্মাণ করেছে ভ্রমণের বহুমাত্রিক, স্বাদু ও সুগভীর ন্যারেশান। অভিজ্ঞতাবাদী জ্ঞান ও তত্ত্বগত উপাদানের জারিত রসায়নে তিনি যে টেক্স তৈরি করেছেন, তা পরিণত হয়েছে ‘ট্র্যাভেল থ্রু হিস্টি’ নামক এক ‘মাল্টিডাইমেনশনাল পার্সপেক্টিভ’-এ।

আমরা ক’জন জানি, মুসলিম দেশ মালয়েশিয়ায় রয়েছে ভারতীয় পৌরাণিক-মহাকাব্য রামায়ণের কাহিনী চিত্রিত এক প্রাচীন পর্বতগাত্র! রাজধানী কুয়ালালামপুরের উত্তরে গমবাক জেলায় অবস্থিত বাতু কেভ বা গুহায় সেই কাব্যিক বিবরণের বর্তমান বিন্যাস ও কাঠামো লেখায় আর ছবিতে অপরূপ ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন জাকারিয়া। বাতু কেভের অতিকায় মুরুগান মূর্তি নিয়েও উপস্থাপন করেছেন ঐতিহাসিক তথ্য আর বাস্তব ভ্রমণ অভিজ্ঞতা। অতিনিকটের মালয়েশিয়ার অন্তর্মূলে বিচিত্র সংস্কৃতি ও প্রত্নতত্ত্বের যে অতীত গৌরব আর ঐতিহ্যের বিভা ছড়িয়ে রয়েছে, জাকারিয়ার আগে খুব কম লেখকই তা উন্মোচিত করতে পেরেছেন।

নিকট প্রতিবেশী নেপালের ক্ষেত্রেও জাকারিয়ার সাবলীল কলম ভ্রমণের পায়ে পায়ে ছুটে চলেছে বর্তমান পেরিয়ে অতীতের অন্তর্গত আলোকমালায়। কাঠমান্ডুর প্রধান দ্রষ্টব্য স্বয়ম্ভূকে কেন্দ্র করে তিনি সে দেশ, নগর আর জনজাতির বিশ্বাস, লোককথা স্পর্শ করেছেন। বাঘমতী আর বিষ্ণুমতী নদীতে ঘেরা উপত্যকাময় জনপদ একদা বৌদ্ধ ধর্মের জন্মস্থান হলেও কিছুদিন আগেও ছিল সাংবিধানিকভাবে ঘোষিত বিশ্বের একমাত্র হিন্দুরাষ্ট্র। রথ, ঢোল, ঘণ্টা, বাঁশি, উৎসব মুখরিত নেপালে ফুল, চন্দন, ধূপ, ধুনা, সৌরভের সমান্তরালে ধর্ম ও জনবিশ্বাসে আবর্তিত যে সংস্কৃতি ও জনজীবন প্রবহমান, তার সচল-সজীব প্রতিচিত্রটুকু অনন্য ভাষা ও শৈলীতে তুলে ধরেছেন জাকারিয়া মন্ডল।

একই কৃতিত্বে জাকারিয়া পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার অন্যতম সুমেরীয় সভ্যতার এক অদেখা ঝলক তুলে আনেন মধ্যপ্রাচ্যের বাহরাইন থেকে। বোর্নিও দ্বীপের অবারিত প্রকৃতি আর জিন দেবতা, বাড়ির পাশের ত্রিপুরার অনিন্দ্যসুন্দর লোকালয়, জনজাতির বিচিত্র জীবনাচার, বিশ্বাস ও প্রত্নতত্ত্ব সম্পদের বর্ণিল বিবরণ দিয়েছেন তিনি।
‘পাহাড়ের ভাঁজে মহাকাব্য’ গ্রন্থে জাকারিয়া ত্রিপুরা, নেপাল, মালয়েশিয়া, বোর্নিও ও বাহরাইনের যে প্রাঞ্জল্য, তথ্যপূর্ণ, বহুমাত্রিক ভ্রমণালেখ্য উপস্থাপন করেছেন, তা দেশগুলো সম্পর্কে এক সুগভীর জ্ঞান সঞ্চার করে।

জাকারিয়া মন্ডল ‘বাড়ির পাশে তীর্থ’ গ্রন্থে বাংলাদেশের কয়েকটি অপূর্ব ও সমৃদ্ধ জনপদের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক জীবনকে ভ্রমণের মাধ্যমে তুলে এনেছেন। জাকারিয়ার দেশ ও বিদেশের ভ্রমণ বিষয়ক লেখাগুলো পড়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। তাহলো উত্তর জনপদের নান্দনিক ত্রিভুজ বিরামপুর-দিনাজপুরের জাতক জাকারিয়া মন্ডল ঢাকার নটরডেম কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং শান্তি ও সংঘর্ষ নিয়ে উচ্চতর পর্যায়ে অধ্যয়ন করলেও, এটা নিশ্চিত যে তার অন্যতম আগ্রহ ইতিহাস ও সভ্যতা এবং তার অনুসন্ধানের পদ্ধতিগত অ্যাপ্রোচ নৃতত্ত্বীয়। যে কারণে তার ভ্রমণ ও বীক্ষণ ইতিহাসের গভীরতা ছুঁয়ে জনজীবনের সঙ্গে আন্তরিক সংশ্লেষ ও বন্ধনের দীপ্তিতে উজ্জ্বল এক বহুবর্ণা চিত্র উদ্ভাসিত করে।

বিশেষত ‘বাড়ির পাশে তীর্থ’ গ্রন্থে পাহাড়ে, হাওরে, প্রত্যন্ত জনপদের সুগভীর ভাঁজে ভাঁজে লুক্কায়িত প্রকৃতি, লোকাচার ও বিশ্বাসের সন্ধান করা হয়েছে ভ্রমণ পথের রেখায় । সনাতন ধর্ম ও চিরায়ত সংস্কৃতির বিবর্তন ও বর্তমান বিশ্বাসের জায়গাটুকু আর আচারিক অনুষঙ্গগুলো একজন গবেষকের নিবিষ্টতায় জাকারিয়া তুলে এনেছেন। তার দেখা ও লেখায় পার্বত্য চন্দ্রনাথ মন্দির, পাহাড়ি দ্বীপের বা জলজ ভূগোলের বিভিন্ন দেব, দেবি, আখড়ায় লোকচক্ষুর অন্তরালে যে জীবন ও যাপন প্রবহমান, তা বর্ণপ্রভায় প্রস্ফুটিত হয়েছে।

ইতিহাস, লোককথা, সংস্কৃতি, পুরাতত্ত্বের গভীর জ্ঞান ও পরিশ্রমী সরেজমিন ভ্রমণের যে সুসমন্বিত ও মিলিত রূপ জাকারিয়া মন্ডল উপস্থাপন করেছেন, তাকে মূলগত অর্থে ভ্রমণ আখ্যান বললেও এতে রয়েছে নান্দনিক বহুমাত্রিকতা, ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ, সাংস্কৃতিক সমীক্ষণ, পৌরাণিকত্বের তুলনামূলক পর্যালোচনা।

ভ্রমণ যে শুধু ‘দেখে এসে লিখে ফেলা নয়’ গভীর অনুধ্যান ও গবেষণার বিষয়, জাকারিয়া তা সপ্রমাণিত করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি ও অসংখ্য রঙিন ছবির সমাবেশে তিনি ভ্রমণের যে ঐতিহাসিক ও ভিজ্যুয়াল মাত্রাগুলো রয়েছে, তাও সংযোজিত করেছেন প্রতিটি লেখার শরীর ও কাঠামোতে।

মোদ্দা কথায়, ভ্রমণ সাহিত্য, ইতিহাস অন্বেষা ও লোকজীবন আর সংস্কৃতির নৃতাত্ত্বিক অন্বেষার মিলিতশৈলীতে একটি নবতর রচনাধারা সৃষ্টির প্রচেষ্টা জাকারিয়া মন্ডলের বইগুলোতে প্রতীয়মান। তদুপরি, বাংলাদেশের ভ্রমণ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক-ঐতিহাসিক গবেষণা এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় জাকারিয়া মন্ডল নিজের অগ্রসর ও আলাদা লেখকসত্ত্বাকেও প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন।

আপনার মতামত লিখুন :

পদাবলি পঞ্চক

পদাবলি পঞ্চক
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

লালবাগের কেল্লার শিথানে

বাসের টিকিট কাটার মুরাদ ছিল না আমাদের
হেঁটে আসি শিয়া মসজিদ থেকে হাইকোর্টের মাজার অবধি,
জমেনি মজমা—মৃদু স্বরে সুর ভাঁজতে ভাঁজতে তুমি বললে
ফিরবে না মোহন মৌতাত—সমুখে না থাকলে বুড়িগঙ্গা নদী।
ফের পয়দলে কার্জন হলের লাগোয়া ফুটপাত ধরে পথচলা
দেখি—মিডফোর্ডের বয়োবৃদ্ধ বৃক্ষটি ঝড়ে হয়েছে উন্মূল
এত রাতে যাবই বা কোথায়—শহীদ মিনারের বেদিতে বসি,
পোড়া চন্দনে মেশে চামেলি—আমাদের গন্তব্য চান খাঁর পুল।

কিভাবে যে পা থেকে নিখোঁজ হলো জোড়া পাদুকা
হেঁটে আসি—নাঙা পায়ে ইমাম বাড়ায়,
নগরীতে তিরোহিত হয়েছে বিজুলি—উড়ছে বাদুড়
একটি মুমূর্ষু মোম টিমটিমিয়ে জ্বলে ঝরোকায়।

নিরিখ করে বলা মুশকিল—কিভাবে যেন উঠে পড়ি
পরীবিবির মাজারের কাছে এক পুরাতাত্ত্বিক সাম্পানে,
দূরে—কামরাঙির চরে ফুটেছে চন্দনে চামেলি
উজালা হয়েছে জোছানার অনন্ত বিধুর অনুদানে।

আমাদের চেতনায় দোল তোলে মূর্ত হয়
সুরা ও সংগীতের বিমূর্ত ছলনা,
অই রাতে ওপারে গেলে তুমি—আর এপারে
বসত করেও আমার কোনো গতি কিছু হলো না।

অসুরবানিপালের কিতাবখানা

অঘটনের প্রতীক্ষায় বসে আছি
বনানী আমার পুড়ছে
লোহিতে নীলাভ শিখা ছড়ানো অনলে
এ বিরাণভূমি ছেড়ে..ভাবি—চলে যাব একদিন
ভিন্নগ্রহে কোনো না কোনো কৌশলে।
হাঁটব ক্রিস্টালের চূর্ণে দ্যুতিময় সৈকতে
যেখানে মারমেইডরা ম্লান হেসে রোদ পোহায়
দিবস ও নিশিরাতের ফারাক নেই কোনো
নিহত নক্ষত্ররা অবলীলায় ঝরবে তাম্র পরিখায়।

আমাকেও আর তৈরি করতে হবে না পাণ্ডুলিপি
থাকবে না কামের কালোয়াতি
যশের জগতঘনিষ্ঠ প্রলোভন
থাকবে না আতঙ্ক
কখন কে বা করে এ হৃৎপিণ্ড হরণ।

আমার নিজস্ব নিশিথে তিনটি স্বর্ণবিধুর চন্দ্র
ক্রিমসনের জারকে ধোয়া নীলিমায়
তৈরি করবে কসমিক এক ত্রিভুজ
তোমরা যারা তালাশ করছো অনেক আকাশে
এভাবে পাবে না কিছু
কালপুরুষের শিকারি—চুম্বক তুফানে হবে নিখোঁজ।

স্ফটিকের একটি অশ্ব—যার জন্ম হয়নি
ঠুকবে নাল আমার নিভৃত ব্যাবিলনে
কথা ছিল তুন্দ্রার তুষার মাখা হরিণ হব
কেন এ মানব জন্ম—কেন বা খুঁজছি
অসুরবানিপালের কেতাব খানা
ভিন্নগ্রহের মন্দির প্রাঙ্গণে।

ঋষিবৃক্ষের রূপালি ছায়ায়

ভালো হয়েছে, এসেছো আজ গল্ফ ক্লাবে
বসেছো কার্ড টেবিলে পরদেশি তিন যুবকের সাথে
বলছো কথা মৃদু স্বরে শোভন সদভাবে;

কালকেও দেখেছি তোমাকে
মামবা পয়েন্টে পানশালায়
বসে ছিলে ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর পাশে একা,
ঘুরে ফিরে ফ্রিটাউনের হরেক চবুতরায়
নানা মাইফেলে বারবার
আমাদের হয়ে যাচ্ছে দেখা;

মোমের আলোয় অদৃষ্ট ছুঁয়ে কাল বেজায় বিষণ্ণ ছিলে
বার কাউন্টার থেকে যখন ড্রিংকস নিলে
মৃদু হেঁটে মৎসকন্যার লাস্যে
কটিতটে দোলনচাপার ছন্দ মাধুরী রটে
চোখে চোখে অভাজনের ধারাভাষ্যে;

আজকে সাবলীল ক্লাবখানায়
নৃত্যের মেহগিনি পাটাতনে
দেহে তোমার বক্ররেখা নিসর্গের খেয়ালে,
আঙিনায় ঋষিবৃক্ষের পাতা কাঁপে আনমনে
বাটিকের চিত্রিত বনে আদিম গুহার দেয়ালে
আঁকা গুল্মময় ত্রিভুজ
সারাসিনের স্থাপথ্য বিশেষ
বুকে ধরে রাখো কম্পমান জোড়া গুম্ভুজ;

এসো, কথা বলি
কিনে দেই কাটগ্লাসে টলটলে ককটেল,
এভাবে হয় জেনো, মাছের ছায়া দেখে
সৈকতে শুভ্র সিগাল উদ্বেল;

কাছে এসো, বাইরে যাই
সিগ্ধ আঙিনাতে ঋষিবৃক্ষের রুপালি ছায়ায়
একটু দাঁড়াই,
দ্যাখো—ঘাসের সবুজ ধনেখলিতে
পপকর্নের মতো ঝরছে জেসমিন,
তুমি ভালোবাসো ধ্বনি
পাঁজরের আইপডে মৃদুস্বরে শোনো
হৃদয়ের তাধিন;

রূপজীবা নও তুমি
না-আঁকা চিত্রপটের বিমূর্ত ভাবনায় বিভোর ভার্জিন,
ওভাবে চাইনি তো তোমাকে
শুধু পরশের পাপড়িতে বিভোর হয়েছি
অচল মুদ্রার মতো বহু ব্যবহারে আমি অর্বাচীন;

ঠোঁটে ধরে আছো যে সিক্ততা
তিতমধুর সুরভীতে ভরা ভারমুথ,
গ্রীবার আকাশনীলে কিভাবে যেন
আঁকা হয়ে যায়
মহুয়ার মোহরের ছাপ নিখুঁত;

কালকে আবার এসো
সমুদ্রপাড়ে ক্যাফে সাফরানে বসি আমি
দুপুরবেলা প্রতিনিয়ত,
সৈকতসূর্যের নিরিবিলিতে পান করো
এক পেয়ালা মাকিয়াতো,
জানা যাবে আগ্রহ তোমার প্রণয় না পারফিউমে,
আমি আছি প্রাচীন মুদ্রা মানচিত্র
আর অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির ভলিয়ুমে;

আসবে কিন্তু
জানো তো ফ্রিটাউনে উড়ছে আজকাল অজস্র বাঁদুড়
তাদের কালো ডানায় ছড়াচ্ছে কলংকিনী ইবোলা,
বলা তো যায় না কখন কিভাবে রদ হয়ে যায়
আমাদের পথচলা।

কাঠের বাড়ি

খোয়াবে কদাচিৎ যেমন দেখা দেন প্রয়াত কুটুমখেশ
তেম্নি কাঠের বাড়িটি উঁকি দেয় অবচেতনের সায়রে
যেন বা ঠারেঠুরে নিরিখ করে দেখে নিতে চায়
তাকে মানে আছে কিনা
ঘরখানি খালি কেন—গিরথাইন গিয়েছেন বুঝি নাইওরে
ফেরেশতার লেবাসের মতো সফেদ চুনখাপ সবুজ হয়েছে শ্যাওলায়
সব্জিখেতে এখনো ফলে কী ধনেপাতা, পেঁয়াজকলি—সুগন্ধ ছড়ায় পুদিনা।

ভাঙা পাল্কির রন্ধ্রে রন্ধ্রে নীড় বেঁধেছে ডানাহীন উঁইপোকা
তলায় ঘন অন্ধকারে বসে আছে জোড় ব্যাঙ
গজিয়েছে ঝালর শোভিত একগুচ্ছ ভুঁইফোড় ছত্রাক
পিঁপড়ার ব্যস্ত চলাচলে গড়ে উঠছে ঘরবাড়ি সাঁকো ও পরিখা
বিজুলি চমকের বাজপড়া হাঁকে পুকুর থেকে উজিয়ে আসে কৈ মাছের ঝাঁক।

জানালার রঙিন কাচে জমেছে কুয়াশা—বসে নেই কেউ মজা দিঘির ঘাটে

বাতায়নে দৈত্যচক্ষু নক্ষত্রের মতো বিস্ফোরিত হয় লাল ও নীল বর্ণের তজল্লা
ঘরে থাকতে চায় না মন—বাইরে যাবই বা কোথায় কোন তিমিরের তল্লাটে
খড়ের গাদার তলায় লুকিয়ে ডিম গলার পালক ফুলিয়ে তিতির দুটি ছড়ায় হল্লা।

কাঠের বাড়িখানি ভালোবাসে গ্রীষ্মের দাবদাহ
আঙিনায় হরেক কিসিমের আমের বৌল ফুটিয়ে মাতায় আঘ্রাণে
চুনসুরকির এ পড়ো দালানে তাইয়ার হয় মেজবানীর দিলখোলা আবহ
নিদাগ দুপুরে আমকুড়ালির অর্কিড ফুটিয়ে পাহাড়ি ময়নার ঝাঁক ডেকে আনে।

নদীজলে কটনউড বৃক্ষের সোনালি ছায়া

সারাদিন—যেখানেই যাই না কেন
যে পাহাড়ে করি সাহসী হাইক
অজানা হ্রদে খুঁজি চক্রবাক
যে ট্রেইলে হাঁকাই না কেন মাউন্টেন বাইক
ফিরে আসি অপরাহ্ণে রিও গ্র্যান্ড নদীটির তীরে
পাড়ে এক সারি কটনউডের গাছ
অটামের সোনালি পত্রালির ছায়া ভাসে
তার বহতা নীরে।

ফিরে আসি নদী ও বৃক্ষের নিরালায়
নীলিমা মুখরিত হয় চক্রাকারে উড়া চিলে
কটনউডের সরণিতে হাঁটি আনমনা
দেখি—ঝরাপাতা ভেসে যায় স্বচ্ছ সলিলে।

ভাটিতে সাংগ্রে ডে খিস্ত পাহাড়ের
শিলাপাথরে গড়া নাজারাতের গির্জার ইমারত
অপরাহ্ণের আলো পড়ে দীর্ঘ ছায়ায় উদ্ভাসিত হয়
ক্রুশ কাঁধে যিশুর অন্তিম যাত্রাপথ।

রিও গ্র্যান্ডের পাড়ে বসে আমি আজ
রুপার চামচে করি
ক্যকটাস নিঙড়ানো পেওটি সেবন
নদী ও পাহাড়ের পুরাতাত্ত্বিক অবয়বে
আঁকা হয় বিবলিক্যাল ফ্রেস্কোরাজি
আমার করোটিতে তৈরি হয় মন্সটারি—দিব্য তপোবন।

ক্যাকটাসের মায়াবী নির্যাস ছড়িয়ে যায় শরীরে
স্নায়ুতন্ত্রে হয় তা ক্রিয়াশীল
বেলা যায়—বুকের পাঁজরে নেমে আসে আকাশ
গোধূলি ছড়ায় লোহিতে থোকা থোকা নীল।

নদীটি সাঁজের বর্ণিল আভায় সেরে নেয় প্রসাধন
পরে সে বিয়ের কনের জলজ রুপালি গাউন
পাশে কটনউডের বৃক্ষগুলো
ব্রাইড মেইড সেজে ছড়ায় সোনালি আগুন
তারা উঠে যায় কল্পিত নাজারথের গির্জায়—
ফুলের সাঁজি হাতে দাঁড়ায় বেদির সিঁড়িতে
বিয়ের মহড়া চলে—তৈরি হয় প্রতিশ্রুতির খসড়া
দিব্য বরের প্রতীক্ষায় ইঞ্জিল শরীফ হাতে
আমি বসে থাকি মেহগিনির পিঁড়িতে।

সবিনয়ে গাছ নুয়ে আসার স্মৃতি

সবিনয়ে  গাছ নুয়ে আসার স্মৃতি
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

যে বাতাস চেনে তোমার কার্বনশ্বাস

তোমার অমর্জিতে নামা সন্ধ্যারে পাশ কাটায়ে
আলিসার কোনায় গিয়া বসো
—ভর করা বাতাসে হেলান দিয়া।
করুণার মতো কইরা তাকাও
তবু যে পাখি ঘরে ফিরতাছে না ঠিক সময়ে—তার দিকে,
যেন কোনো নিদান নাই,
কোনো সময় তৈয়ার হয় নাই তখনও
অসময়ের ভেতর-বাহিরে,
এমন তো হরহামেশাই ঘটে বইলা চোখ ফিরাও নাই অ-দৃশ্যের থিকা,
যেন তারা থাকে এইসব দৃশ্যাবলিরে জড়ায়ে।
তুমি তবু অহেতুক পাখির মন ভাবো নিজেরে নিদারুণ নির্জনে।

কেমন কষ্ট!

এমন অনেক কিছু নিয়াই চলি প্রতিদিন, চলতে হয় তাই।
চাবি, মোবাইল, মানিব্যাগ, খুচরা কয়েন, গত মাসে ব্যাংকে ১০ ডলার জমা দেয়ার রসিদ,
ব্যবহৃত ডাকটিকেট, দেশলাই, সিগারেট, মেট্রোকার্ড,
চুইংগামের খোসা, বাজারের-ফর্দসহ বিবিধ আপঝাপ জিনিস থাকে হাতে পকেটে।
তার মাঝে যেইটা নিয়া চলতে সবচেয়ে কষ্ট হয় “তোমারে ছাইড়া আসার কষ্ট”
ওগো মা আমার—মাতৃভূমি—
তোমারে ছাইড়া আসার কষ্ট
এক পৃথিবীতে যত মানুষ থাকে তত পৃথিবী সমান।

অসুখ

এইসব নিয়া বইসা থাকতে থাকতে ক্লান্ত হইলে
নদীটা ডুবতে থাকে,
যেন—অনেক উঁচা থাইকা পালক খইসা পড়ে হেইলা দুইলা,
—যেন আলগোছে কেউ রাখল ঢেউ সিথানে, তেমন একটা পাতা
গন্ধকের মতো রটে
আলোকে সালোকে সংশ্লেষণে—
অথচ একটা সুর মরতে গেলে
পাখির দায় নিয়া ঘুমাইতে চায় সহজ উদ্ভিদ,
পাখনার পাশে মেলে ধরে—
পিঠে পিঠ বেয়ে উঠা জরাক্লান্ত স্বেদ, বাতাসের কনিকা,
একটা সবুজ অ্যাম্বুলেন্স ভর্তি চারা গাছের কংকাল,
আমাদের হীমবাহিত জলজ অসুখেরা
এবং
সবিনয়ে
গাছ নুয়ে
আসার স্মৃতি।

ঘনঘোর

মিল্কিওয়ে যখন তার একান্ত সূর্যদের নিয়া পৃথিবী সমেত পার হইতাছিল ছায়াপথ—
আমি তখন আরো ট্রিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের ভিন্ন পৃথিবী হইতে
পৃথক কোনো উপগ্রহের ছায়ায় নিজেরে আরো একটু সরায়ে নিয়া তাকাইলাম—
দেখি দূর আরো দূর কোনো মহাকাশ স্টেশন,
যেখানে আমার যাইতে হবে,
যেন সেই স্টেশন ওত পাইতা থাকবে পৃথিবী—মিল্কিওয়ে যাওয়ার পথে।
সেই স্টেশনে থামলে পরে আমি উঠব পৃথিবীতে,
যেন ভ্রমণ করার ছলে দেইখা যাব আমার বিগত পৃথিবী,
যেখানে আমি ছিলাম, নাকি ছিলাম না?
কোনো কালে কি সেখানে থাকতে যাব আমি?
যাই হোক, এমন ভাবনা আমি ভাবতেই পারি কী ছিলাম কী ছিলাম না,
তাতে সেই পৃথিবীতে সত্যিকারভাবে থাইকা যাওয়ার বাসনা ঘোরে রূপ নিতে থাকলে—
আমি নাইমা আসব, স্টেশনে, যেন আমি স্টেশনের, যেন আমিই স্টেশন।
যেন একটা স্টেশন অপেক্ষা করে স্টেশনে অন্য একটা স্টেশনের।
আসলে আমরা সবাই এক একটা স্টেশনের অপেক্ষায় আছি।
পৃথিবী হইল সেই সব স্টেশনে যাইবার এক্সপ্রেস ট্রেইন,
বাসনার ঘোরে নাইমা গেলে অপেক্ষা অনন্তের।

আবাল প্রজা

এখন দেখো ভীষণ রৌদ্র, জ্বলো
এখন আষাঢ় ভাদ্র কিংবা ফাগুন
তোমার বুকে জ্বলছে করুণ আগুন
বাতাসে কি দারুণ ঘূর্ণি ধুলো।

এখন প্রজার নেইকো কিছু বলার
এখন প্রজা মুখ বুজে সব সয়
রাজ্যে এখন কম্পিউটিক শান্তি
বললে রাজা হাসতে সবার হয়।

রাজা বললে দিনটি হবে রাত
বললে সে তো তালগাছটিও তোমার
কিন্তু বেটার বুদ্ধি ভর্তি জামার
সেলাই করে প্রজার কঠিন হাত।

সেই হাতে নেই শাবল গাইতি কোনো
সেই হাত আজ করছে মালিশ তেল
আমরা সবাই মাতাল রকম ন্যাড়া
মাথার উপর ঝুলছে পাকা বেল।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র