Barta24

বুধবার, ২৪ জুলাই ২০১৯, ৮ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

‘পোয়েট লরিয়েট’ হলেন না যে কবি!

‘পোয়েট লরিয়েট’ হলেন না যে কবি!
ইমতিয়াজ ধরকর; ‘পোয়েট লরিয়েট’ হলেন না যে কবি/ ছবি: সংগৃহীত
ড. মাহফুজ পারভেজ
কন্ট্রিবিউটিং এডিটর
বার্তা২৪.কম


  • Font increase
  • Font Decrease

ব্রিটেনের ইতিহাসে রাজকীয় কবি ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদ গ্রহণের ক্ষেত্রে অসম্মতি ও অপরাগতা প্রকাশের ঘটনা ইমতিয়াজ ধরকরই প্রথম ঘটালেন? নাকি অতীতে এমন সাহসিকতা অন্য কেউ দেখিয়েছিলেন, সে তথ্য এখনো কেউ নিশ্চিত করতে পারেননি। তবে তার এমন সিদ্ধান্ত আলোড়ন তুলেছে লিটারেরি সার্কেলে। সবাই অবাক চোখে আরেক বার তাকাচ্ছেন এই দৃঢ়চেতা কবির দিকে। অতি সম্মত ও নমঃ নমঃ সমাজে ‘না’ করতে পারার সাহস ও ঋজুতার জন্য তিনি আদায় করেছেন শ্রদ্ধা ও সমীহ। বিশেষত, তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন এমন একটি পদ, যা ঐতিহাসিক, বিশ্ববিশ্রুত এবং যে পদটি গ্রহণ করলে তিনি হতে পারতেন ইতিহাসের প্রথম এশীয়/প্রথম এশীয় নারী ব্রিটিশ রাজকীয় কবি ‘পোয়েট লরিয়েট’।

‘পোয়েট লরিয়েট’ হলেন না যে কবি, ইমতিয়াজ ধরকর দক্ষিণ এশিয়ায় জন্ম নিলেও এক বছরের কম বয়সে পিতামাতার সঙ্গে চলে আসেন ইউরোপে। বাস করতে থাকেন গ্লাসগোতে। তারপর ব্রিটেনের নানা জায়গায় শিক্ষা ও কর্ম উপলক্ষে থেকেছেন তিনি। পড়াশোনা করেছেন লন্ডন, মুম্বাই। তবে সব সময়ই তিনি কাব্যচর্চা ও শৈল্পিক তৎপরতাকেই নিজের জীবনের প্রথম কাজ বলে চিহ্নিত করেছেন এবং সে কাজেই নিমগ্ন থেকেছেন।

সমকালে ব্রিটেনের অন্যতম প্রধান ও শ্রেষ্ঠ কবি রূপে স্বীকৃতি দেওয়া হয় ইমতিয়াজকে, যে কারণে তাকে তালিকার ওপরের দিকে স্থান দেয় রাজকীয় কবি ‘পোয়েট লরিয়েট’ খুঁজে বের করার কমিটি। তার কবিতা যে কেবল ব্রিটেনের স্কুল-কলেজ বা সাধারণ মহলে পাঠ্য, তাই নয়, ২০১১ সাল থেকে তিনি ‘রয়্যাল সোসাইটি অব লিটারেচার’-এর ফেলো। এই সোসাইটি যাকে-তাকে ফেলোশিপ দেয় না, বহু যাচাই-বাছাই করেই ফেলো নির্বাচন করে। ইমতিয়াজ ধরকর স্বকীয় যোগ্যতা ও কবি-কৃতিত্বে পদটি পেয়েছেন।

এখানেই শেষ নয়, রয়্যাল ফেলোশিপের আগে তিনি হয়েছিলেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত সম্মানজনক ‘পোয়েট ইন রেসিডেন্স’। কবি হিসেবে ট্র্যাক রেকর্ড ও ক্যারিয়ার এতোটাই ঝকমকে ইমতিয়াজ ধরকরের, যা তাকে রাজকীয় কবি ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদের জন্য উপযুক্ত প্রার্থী হিসেবেই দাঁড় করিয়েছিল।

কিন্তু অতীতে অনেকগুলো পদে সম্মত হলেও ইমতিয়াজ ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদটি গ্রহণ করলেন না। প্রথম বারের মতো অস্বীকৃতি জানালেন এমন একটি রাজকীয় পদ গ্রহণে, যা তাকে ঐতিহাসিক সম্মান ও রেকর্ডের অধিকারী করতো। এই ঘটনায় প্রমাণ হলো, তিনি প্রকৃতই একজন কবি। তিনি না বলেও যা জানালেন, তা হলো, শুদ্ধ সাহিত্যের বাইরে সরকারি বা রাষ্ট্রীয় পদ গ্রহণ করা কবির কাজ নয়। হট্টগোল ও পাবলিক অ্যাফেয়ার্সেও তিনি যেতে চাইলেন না নিজের নিভৃতি ভেঙে। কারণ কবিতা রচনার জন্য তার চাই নিজস্ব টাইম, স্পেস ও সাইলেন্স।

নিজে ইতিহাস না গড়েও ইতিহাসের কাছে কিছু উল্লেখযোগ্য বিষয় লিপিবদ্ধ করে রাখলেন ইমতিয়াজ। নিষ্ঠাবান একজন কবিকে কেমন করে পদ, পদবী ও পদকের মোহ ত্যাগ করে নিজের স্বকীয়তা, প্রাইভেসি রক্ষা করতে হয়, সে শিক্ষাটিই লিপিবদ্ধ করে রাখলেন কবি ইমতিয়াজ ধরকর।

ব্রিটিশ রাজকীয় কবি ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদ গ্রহণে অসম্মত ৬৫ বছর বয়সী কবি ইমতিয়াজ ধরকর ১৯৫৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাজধানী লাহোরে, যে শহরটিকে বিবেচনা করা হয় দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক কেন্দ্ররূপে। জাতিগত পরিচয়ে একজন পাঞ্জাবি হিসেবে তার সঙ্গে দেশ ও জনপদের অতীত-ঐতিহ্য বলতে রয়েছে স্বজনদের গুচ্ছ গুচ্ছ স্মৃতিকথা, পূর্ব-পুরুষদের বয়ান আর নস্টালজিয়া। কারণ মাত্র এক বছরেরও কম বয়সে তিনি পরিবারের সঙ্গে স্বভূমি ছেড়ে অভিবাসন করেন।

মাইগ্রেন্টদের প্রায়-সবাই যখন গ্রেট ব্রিটেনের মূল কেন্দ্রে বসতি গড়ছিল, ইমতিয়াজের পবিরার তখন বেছে নেন ইংল্যান্ড বা স্কটল্যান্ডের বদলে ওয়েলশ। গ্লাসগো শহরে বড় হলেন তিনি। পড়াশোনা করেছেন বিলাতের অনেকগুলো নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ভারতেও আসা-যাওয়া করেছেন পড়াশোনা ও কাজের সূত্রে। তখনই তিনি বিয়ে করেছিলেন মুম্বাইয়ের অনিল ধরকরকে, যিনি একজন লেখক ও কবি। বিশেষত ‘মুম্বাই ইন্টারন্যাশনাল লিটারেরি ফেস্টিভ্যাল’ -এর তিনি প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক।

অনিল ধরকর মুম্বাইয়ে আন্তর্জাতিক কাব্য সন্মেলন ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন স্থানে কবিদের নিয়ে কাজ করেন। তাদের কাব্য ও চর্চা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন নতুন কবিকে তুলে ধরেন। ‘রোমান্স অব সল্ট’ নামে একটি বইও আছে তার। চলচ্চিত্রেও অনিলের দখল আছে এবং কিছুদিন দিন তিনি লন্ডন, গ্লাসগোয় শিক্ষকতাও করেছেন, যার সঙ্গে ইমতিয়াজ জড়িয়ে ছিলেন প্রেমে, যাপনে, দাম্পত্যে। যে সম্পর্ক না টিকলেও ইমতিয়াজ পারিবারিক পদবী হিসেবে অনিলের কাছ থেকে প্রাপ্ত ধরকর ব্যবহার করেন।

ইমতিয়াজের একমাত্র সন্তান, কন্যা আয়েশা (জন্ম ১৯৭৭, মুম্বাই) অনিল ধরকরের সঙ্গে দাম্পত্যের ফসল। আয়েশা আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত একজন অভিনেত্রী। চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, মঞ্চ নাটকে তার সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান অভিনেত্রীদের মধ্যে আয়েশা নাম করেছেন তামিল ছবি ‘দ্য টেরোরিস্ট’-এ অভিনয়ের নৈপুণ্যে। তার আরেক উল্লেখযোগ্য ছবি হলো ‘স্টার ওয়ারস’। কায়রো চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত আয়েশা ২০১০ সালে পরিচালক-অভিনেতা রবার্ট টেইলরকে বিয়ে করে পুরোদস্তুর চলচ্চিত্রে-অভিনয়ে মেতে আছেন।

ইমতিয়াজ পরে বিয়ে করেন সাইমন পাওয়েলকে। সাইমন গ্লাসগো শহরে ‘পোয়েট্রি লাইভ’ নামে একটি সাহিত্য সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা। ১১ বছর ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করে ২০০৯ সালের অক্টোবরে এই কাব্যপ্রেমী মারা যান। একই শহরে ইমতিয়াজ ও সাইমন যৌথজীবনের শক্তিতে কবিতার জন্য কাজ করেছেন। সমগ্র ব্রিটেনের কাব্যচর্চাকে প্রভাবিত করতে এই যুগলের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। তারা স্কুল, কলেজের সিলেবাসে কবিতার অন্তর্ভূক্তি, আধুনিক ও সমকালীন কবিতার বিকাশ, আলোচনা ও চর্চায় অগ্রণী অবদান রাখেন।

আরও পড়ুন: অবশেষে নতুন ‘পোয়েট লরিয়েট’

আপনার মতামত লিখুন :

পদাবলি পঞ্চক

পদাবলি পঞ্চক
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

লালবাগের কেল্লার শিথানে

বাসের টিকিট কাটার মুরাদ ছিল না আমাদের
হেঁটে আসি শিয়া মসজিদ থেকে হাইকোর্টের মাজার অবধি,
জমেনি মজমা—মৃদু স্বরে সুর ভাঁজতে ভাঁজতে তুমি বললে
ফিরবে না মোহন মৌতাত—সমুখে না থাকলে বুড়িগঙ্গা নদী।
ফের পয়দলে কার্জন হলের লাগোয়া ফুটপাত ধরে পথচলা
দেখি—মিডফোর্ডের বয়োবৃদ্ধ বৃক্ষটি ঝড়ে হয়েছে উন্মূল
এত রাতে যাবই বা কোথায়—শহীদ মিনারের বেদিতে বসি,
পোড়া চন্দনে মেশে চামেলি—আমাদের গন্তব্য চান খাঁর পুল।

কিভাবে যে পা থেকে নিখোঁজ হলো জোড়া পাদুকা
হেঁটে আসি—নাঙা পায়ে ইমাম বাড়ায়,
নগরীতে তিরোহিত হয়েছে বিজুলি—উড়ছে বাদুড়
একটি মুমূর্ষু মোম টিমটিমিয়ে জ্বলে ঝরোকায়।

নিরিখ করে বলা মুশকিল—কিভাবে যেন উঠে পড়ি
পরীবিবির মাজারের কাছে এক পুরাতাত্ত্বিক সাম্পানে,
দূরে—কামরাঙির চরে ফুটেছে চন্দনে চামেলি
উজালা হয়েছে জোছানার অনন্ত বিধুর অনুদানে।

আমাদের চেতনায় দোল তোলে মূর্ত হয়
সুরা ও সংগীতের বিমূর্ত ছলনা,
অই রাতে ওপারে গেলে তুমি—আর এপারে
বসত করেও আমার কোনো গতি কিছু হলো না।

অসুরবানিপালের কিতাবখানা

অঘটনের প্রতীক্ষায় বসে আছি
বনানী আমার পুড়ছে
লোহিতে নীলাভ শিখা ছড়ানো অনলে
এ বিরাণভূমি ছেড়ে..ভাবি—চলে যাব একদিন
ভিন্নগ্রহে কোনো না কোনো কৌশলে।
হাঁটব ক্রিস্টালের চূর্ণে দ্যুতিময় সৈকতে
যেখানে মারমেইডরা ম্লান হেসে রোদ পোহায়
দিবস ও নিশিরাতের ফারাক নেই কোনো
নিহত নক্ষত্ররা অবলীলায় ঝরবে তাম্র পরিখায়।

আমাকেও আর তৈরি করতে হবে না পাণ্ডুলিপি
থাকবে না কামের কালোয়াতি
যশের জগতঘনিষ্ঠ প্রলোভন
থাকবে না আতঙ্ক
কখন কে বা করে এ হৃৎপিণ্ড হরণ।

আমার নিজস্ব নিশিথে তিনটি স্বর্ণবিধুর চন্দ্র
ক্রিমসনের জারকে ধোয়া নীলিমায়
তৈরি করবে কসমিক এক ত্রিভুজ
তোমরা যারা তালাশ করছো অনেক আকাশে
এভাবে পাবে না কিছু
কালপুরুষের শিকারি—চুম্বক তুফানে হবে নিখোঁজ।

স্ফটিকের একটি অশ্ব—যার জন্ম হয়নি
ঠুকবে নাল আমার নিভৃত ব্যাবিলনে
কথা ছিল তুন্দ্রার তুষার মাখা হরিণ হব
কেন এ মানব জন্ম—কেন বা খুঁজছি
অসুরবানিপালের কেতাব খানা
ভিন্নগ্রহের মন্দির প্রাঙ্গণে।

ঋষিবৃক্ষের রূপালি ছায়ায়

ভালো হয়েছে, এসেছো আজ গল্ফ ক্লাবে
বসেছো কার্ড টেবিলে পরদেশি তিন যুবকের সাথে
বলছো কথা মৃদু স্বরে শোভন সদভাবে;

কালকেও দেখেছি তোমাকে
মামবা পয়েন্টে পানশালায়
বসে ছিলে ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর পাশে একা,
ঘুরে ফিরে ফ্রিটাউনের হরেক চবুতরায়
নানা মাইফেলে বারবার
আমাদের হয়ে যাচ্ছে দেখা;

মোমের আলোয় অদৃষ্ট ছুঁয়ে কাল বেজায় বিষণ্ণ ছিলে
বার কাউন্টার থেকে যখন ড্রিংকস নিলে
মৃদু হেঁটে মৎসকন্যার লাস্যে
কটিতটে দোলনচাপার ছন্দ মাধুরী রটে
চোখে চোখে অভাজনের ধারাভাষ্যে;

আজকে সাবলীল ক্লাবখানায়
নৃত্যের মেহগিনি পাটাতনে
দেহে তোমার বক্ররেখা নিসর্গের খেয়ালে,
আঙিনায় ঋষিবৃক্ষের পাতা কাঁপে আনমনে
বাটিকের চিত্রিত বনে আদিম গুহার দেয়ালে
আঁকা গুল্মময় ত্রিভুজ
সারাসিনের স্থাপথ্য বিশেষ
বুকে ধরে রাখো কম্পমান জোড়া গুম্ভুজ;

এসো, কথা বলি
কিনে দেই কাটগ্লাসে টলটলে ককটেল,
এভাবে হয় জেনো, মাছের ছায়া দেখে
সৈকতে শুভ্র সিগাল উদ্বেল;

কাছে এসো, বাইরে যাই
সিগ্ধ আঙিনাতে ঋষিবৃক্ষের রুপালি ছায়ায়
একটু দাঁড়াই,
দ্যাখো—ঘাসের সবুজ ধনেখলিতে
পপকর্নের মতো ঝরছে জেসমিন,
তুমি ভালোবাসো ধ্বনি
পাঁজরের আইপডে মৃদুস্বরে শোনো
হৃদয়ের তাধিন;

রূপজীবা নও তুমি
না-আঁকা চিত্রপটের বিমূর্ত ভাবনায় বিভোর ভার্জিন,
ওভাবে চাইনি তো তোমাকে
শুধু পরশের পাপড়িতে বিভোর হয়েছি
অচল মুদ্রার মতো বহু ব্যবহারে আমি অর্বাচীন;

ঠোঁটে ধরে আছো যে সিক্ততা
তিতমধুর সুরভীতে ভরা ভারমুথ,
গ্রীবার আকাশনীলে কিভাবে যেন
আঁকা হয়ে যায়
মহুয়ার মোহরের ছাপ নিখুঁত;

কালকে আবার এসো
সমুদ্রপাড়ে ক্যাফে সাফরানে বসি আমি
দুপুরবেলা প্রতিনিয়ত,
সৈকতসূর্যের নিরিবিলিতে পান করো
এক পেয়ালা মাকিয়াতো,
জানা যাবে আগ্রহ তোমার প্রণয় না পারফিউমে,
আমি আছি প্রাচীন মুদ্রা মানচিত্র
আর অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির ভলিয়ুমে;

আসবে কিন্তু
জানো তো ফ্রিটাউনে উড়ছে আজকাল অজস্র বাঁদুড়
তাদের কালো ডানায় ছড়াচ্ছে কলংকিনী ইবোলা,
বলা তো যায় না কখন কিভাবে রদ হয়ে যায়
আমাদের পথচলা।

কাঠের বাড়ি

খোয়াবে কদাচিৎ যেমন দেখা দেন প্রয়াত কুটুমখেশ
তেম্নি কাঠের বাড়িটি উঁকি দেয় অবচেতনের সায়রে
যেন বা ঠারেঠুরে নিরিখ করে দেখে নিতে চায়
তাকে মানে আছে কিনা
ঘরখানি খালি কেন—গিরথাইন গিয়েছেন বুঝি নাইওরে
ফেরেশতার লেবাসের মতো সফেদ চুনখাপ সবুজ হয়েছে শ্যাওলায়
সব্জিখেতে এখনো ফলে কী ধনেপাতা, পেঁয়াজকলি—সুগন্ধ ছড়ায় পুদিনা।

ভাঙা পাল্কির রন্ধ্রে রন্ধ্রে নীড় বেঁধেছে ডানাহীন উঁইপোকা
তলায় ঘন অন্ধকারে বসে আছে জোড় ব্যাঙ
গজিয়েছে ঝালর শোভিত একগুচ্ছ ভুঁইফোড় ছত্রাক
পিঁপড়ার ব্যস্ত চলাচলে গড়ে উঠছে ঘরবাড়ি সাঁকো ও পরিখা
বিজুলি চমকের বাজপড়া হাঁকে পুকুর থেকে উজিয়ে আসে কৈ মাছের ঝাঁক।

জানালার রঙিন কাচে জমেছে কুয়াশা—বসে নেই কেউ মজা দিঘির ঘাটে

বাতায়নে দৈত্যচক্ষু নক্ষত্রের মতো বিস্ফোরিত হয় লাল ও নীল বর্ণের তজল্লা
ঘরে থাকতে চায় না মন—বাইরে যাবই বা কোথায় কোন তিমিরের তল্লাটে
খড়ের গাদার তলায় লুকিয়ে ডিম গলার পালক ফুলিয়ে তিতির দুটি ছড়ায় হল্লা।

কাঠের বাড়িখানি ভালোবাসে গ্রীষ্মের দাবদাহ
আঙিনায় হরেক কিসিমের আমের বৌল ফুটিয়ে মাতায় আঘ্রাণে
চুনসুরকির এ পড়ো দালানে তাইয়ার হয় মেজবানীর দিলখোলা আবহ
নিদাগ দুপুরে আমকুড়ালির অর্কিড ফুটিয়ে পাহাড়ি ময়নার ঝাঁক ডেকে আনে।

নদীজলে কটনউড বৃক্ষের সোনালি ছায়া

সারাদিন—যেখানেই যাই না কেন
যে পাহাড়ে করি সাহসী হাইক
অজানা হ্রদে খুঁজি চক্রবাক
যে ট্রেইলে হাঁকাই না কেন মাউন্টেন বাইক
ফিরে আসি অপরাহ্ণে রিও গ্র্যান্ড নদীটির তীরে
পাড়ে এক সারি কটনউডের গাছ
অটামের সোনালি পত্রালির ছায়া ভাসে
তার বহতা নীরে।

ফিরে আসি নদী ও বৃক্ষের নিরালায়
নীলিমা মুখরিত হয় চক্রাকারে উড়া চিলে
কটনউডের সরণিতে হাঁটি আনমনা
দেখি—ঝরাপাতা ভেসে যায় স্বচ্ছ সলিলে।

ভাটিতে সাংগ্রে ডে খিস্ত পাহাড়ের
শিলাপাথরে গড়া নাজারাতের গির্জার ইমারত
অপরাহ্ণের আলো পড়ে দীর্ঘ ছায়ায় উদ্ভাসিত হয়
ক্রুশ কাঁধে যিশুর অন্তিম যাত্রাপথ।

রিও গ্র্যান্ডের পাড়ে বসে আমি আজ
রুপার চামচে করি
ক্যকটাস নিঙড়ানো পেওটি সেবন
নদী ও পাহাড়ের পুরাতাত্ত্বিক অবয়বে
আঁকা হয় বিবলিক্যাল ফ্রেস্কোরাজি
আমার করোটিতে তৈরি হয় মন্সটারি—দিব্য তপোবন।

ক্যাকটাসের মায়াবী নির্যাস ছড়িয়ে যায় শরীরে
স্নায়ুতন্ত্রে হয় তা ক্রিয়াশীল
বেলা যায়—বুকের পাঁজরে নেমে আসে আকাশ
গোধূলি ছড়ায় লোহিতে থোকা থোকা নীল।

নদীটি সাঁজের বর্ণিল আভায় সেরে নেয় প্রসাধন
পরে সে বিয়ের কনের জলজ রুপালি গাউন
পাশে কটনউডের বৃক্ষগুলো
ব্রাইড মেইড সেজে ছড়ায় সোনালি আগুন
তারা উঠে যায় কল্পিত নাজারথের গির্জায়—
ফুলের সাঁজি হাতে দাঁড়ায় বেদির সিঁড়িতে
বিয়ের মহড়া চলে—তৈরি হয় প্রতিশ্রুতির খসড়া
দিব্য বরের প্রতীক্ষায় ইঞ্জিল শরীফ হাতে
আমি বসে থাকি মেহগিনির পিঁড়িতে।

সবিনয়ে গাছ নুয়ে আসার স্মৃতি

সবিনয়ে  গাছ নুয়ে আসার স্মৃতি
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

যে বাতাস চেনে তোমার কার্বনশ্বাস

তোমার অমর্জিতে নামা সন্ধ্যারে পাশ কাটায়ে
আলিসার কোনায় গিয়া বসো
—ভর করা বাতাসে হেলান দিয়া।
করুণার মতো কইরা তাকাও
তবু যে পাখি ঘরে ফিরতাছে না ঠিক সময়ে—তার দিকে,
যেন কোনো নিদান নাই,
কোনো সময় তৈয়ার হয় নাই তখনও
অসময়ের ভেতর-বাহিরে,
এমন তো হরহামেশাই ঘটে বইলা চোখ ফিরাও নাই অ-দৃশ্যের থিকা,
যেন তারা থাকে এইসব দৃশ্যাবলিরে জড়ায়ে।
তুমি তবু অহেতুক পাখির মন ভাবো নিজেরে নিদারুণ নির্জনে।

কেমন কষ্ট!

এমন অনেক কিছু নিয়াই চলি প্রতিদিন, চলতে হয় তাই।
চাবি, মোবাইল, মানিব্যাগ, খুচরা কয়েন, গত মাসে ব্যাংকে ১০ ডলার জমা দেয়ার রসিদ,
ব্যবহৃত ডাকটিকেট, দেশলাই, সিগারেট, মেট্রোকার্ড,
চুইংগামের খোসা, বাজারের-ফর্দসহ বিবিধ আপঝাপ জিনিস থাকে হাতে পকেটে।
তার মাঝে যেইটা নিয়া চলতে সবচেয়ে কষ্ট হয় “তোমারে ছাইড়া আসার কষ্ট”
ওগো মা আমার—মাতৃভূমি—
তোমারে ছাইড়া আসার কষ্ট
এক পৃথিবীতে যত মানুষ থাকে তত পৃথিবী সমান।

অসুখ

এইসব নিয়া বইসা থাকতে থাকতে ক্লান্ত হইলে
নদীটা ডুবতে থাকে,
যেন—অনেক উঁচা থাইকা পালক খইসা পড়ে হেইলা দুইলা,
—যেন আলগোছে কেউ রাখল ঢেউ সিথানে, তেমন একটা পাতা
গন্ধকের মতো রটে
আলোকে সালোকে সংশ্লেষণে—
অথচ একটা সুর মরতে গেলে
পাখির দায় নিয়া ঘুমাইতে চায় সহজ উদ্ভিদ,
পাখনার পাশে মেলে ধরে—
পিঠে পিঠ বেয়ে উঠা জরাক্লান্ত স্বেদ, বাতাসের কনিকা,
একটা সবুজ অ্যাম্বুলেন্স ভর্তি চারা গাছের কংকাল,
আমাদের হীমবাহিত জলজ অসুখেরা
এবং
সবিনয়ে
গাছ নুয়ে
আসার স্মৃতি।

ঘনঘোর

মিল্কিওয়ে যখন তার একান্ত সূর্যদের নিয়া পৃথিবী সমেত পার হইতাছিল ছায়াপথ—
আমি তখন আরো ট্রিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের ভিন্ন পৃথিবী হইতে
পৃথক কোনো উপগ্রহের ছায়ায় নিজেরে আরো একটু সরায়ে নিয়া তাকাইলাম—
দেখি দূর আরো দূর কোনো মহাকাশ স্টেশন,
যেখানে আমার যাইতে হবে,
যেন সেই স্টেশন ওত পাইতা থাকবে পৃথিবী—মিল্কিওয়ে যাওয়ার পথে।
সেই স্টেশনে থামলে পরে আমি উঠব পৃথিবীতে,
যেন ভ্রমণ করার ছলে দেইখা যাব আমার বিগত পৃথিবী,
যেখানে আমি ছিলাম, নাকি ছিলাম না?
কোনো কালে কি সেখানে থাকতে যাব আমি?
যাই হোক, এমন ভাবনা আমি ভাবতেই পারি কী ছিলাম কী ছিলাম না,
তাতে সেই পৃথিবীতে সত্যিকারভাবে থাইকা যাওয়ার বাসনা ঘোরে রূপ নিতে থাকলে—
আমি নাইমা আসব, স্টেশনে, যেন আমি স্টেশনের, যেন আমিই স্টেশন।
যেন একটা স্টেশন অপেক্ষা করে স্টেশনে অন্য একটা স্টেশনের।
আসলে আমরা সবাই এক একটা স্টেশনের অপেক্ষায় আছি।
পৃথিবী হইল সেই সব স্টেশনে যাইবার এক্সপ্রেস ট্রেইন,
বাসনার ঘোরে নাইমা গেলে অপেক্ষা অনন্তের।

আবাল প্রজা

এখন দেখো ভীষণ রৌদ্র, জ্বলো
এখন আষাঢ় ভাদ্র কিংবা ফাগুন
তোমার বুকে জ্বলছে করুণ আগুন
বাতাসে কি দারুণ ঘূর্ণি ধুলো।

এখন প্রজার নেইকো কিছু বলার
এখন প্রজা মুখ বুজে সব সয়
রাজ্যে এখন কম্পিউটিক শান্তি
বললে রাজা হাসতে সবার হয়।

রাজা বললে দিনটি হবে রাত
বললে সে তো তালগাছটিও তোমার
কিন্তু বেটার বুদ্ধি ভর্তি জামার
সেলাই করে প্রজার কঠিন হাত।

সেই হাতে নেই শাবল গাইতি কোনো
সেই হাত আজ করছে মালিশ তেল
আমরা সবাই মাতাল রকম ন্যাড়া
মাথার উপর ঝুলছে পাকা বেল।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র