Alexa

'সুবর্ণরেখা': নদী ও মানুষের আখ্যান

'সুবর্ণরেখা': নদী ও মানুষের আখ্যান

ড. মাহফুজ পারভেজ

নদী আর মানুষের জীবন চলে সমান্তরালে। হাত ধরাধরি করে এই যুগলযাত্রা উৎকীর্ণ হয় ইতিহাসের পাতায়। মানুষের ইতিবৃত্তে তাই নদীর আখ্যান বড়ই প্রাসঙ্গিক। বিশেষত গাঙ্গেয় বদ্বীপময় বিশাল বাংলায়নদী ও মানুষ কথা বলে একই সুরে।

'পদ্মা নদীর মাঝি', 'তিতাস একটি নদীর নাম', 'তিস্তা বৃত্তান্ত' প্রভৃতি উপন্যাস আসলে নদীবাহিত মানুষেরই উপাখ্যান। বাংলাদেশের কবি ও কথাকারগণ নদী আর মানুষকে কখনোই আলাদা করে দেখেননি। নদীর কালস্রোতের ধারাক্রমেই বিবৃত করেছেন মানবজীবন ও মননের আখ্যান।

নদীবহুল পূর্ববঙ্গের তুলনায় বাংলার পশ্চিমাংশের অপেক্ষাকৃত কম নদীময়তার কারণে সেখানকার সাহিত্যে নদী ও মানুষের কথা ও কাহিনী স্থান পেয়েছে স্বল্পই। তবুও সাম্প্রতিক সময়ে 'সুবর্ণরেখা' নদীটিকে কেন্দ্র করে উন্মোচিত হয়েছে এক অজানা জনপদ ও জনজীবনের ভাষ্য।

'সুবর্ণরেখা' নামে আগে একটি অসাধারণ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন স্মরণীয় পরিচালক ঋত্বিক ঘটক। ছবির মূল উপজীব্য ছিল ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং উদ্বাস্তু, ছিন্নমূল মানুষের মর্মন্তুদ আর্তি। শেকড়-ছেঁড়া উন্মূল মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামী আর্তনাদ শোনা গেছে শিল্পিত সিনেমাটিতে।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা ছুঁয়ে যাওয়া বৃহৎ বঙ্গের প্রান্তিক নদী 'সুবর্ণরেখা' নিয়ে গবেষণা বা আখ্যান রচিত হয়েছে কমই। তালসারি নামক স্থানে বঙ্গোপসাগরে পতিত নদীটির নামের মধ্যেই রয়েছে স্বর্ণের স্পর্শ। সোনার মতো চকচক করে এই নদীর বালি, যা ছেঁকে পাওয়া যায় স্বর্ণালী উপাদান।

অসংখ্য জাতি, উপজাতি বসবাস করে 'সুবর্ণরেখা' নদীর তীরে তীরে। সোনা সংগ্রহ, মৎস্য আহরণ তাদের উপজীবিকা। বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র হুডু জলপ্রপাত ছাড়াও তামা খনি ও স্বাস্থ্যকর নিবাসের জন্য খ্যাত ঘাটশিলা অঞ্চল 'সুবর্ণরেখা'র তীরে অবস্থিত। 'সুবর্ণরেখা'র তীর ঘেঁষে আরও রয়েছে গ্রামীণ ও আদিবাসী জনপদের অকৃতিম বহুবিচিত্র সংস্কৃতি।

'সুবর্ণরেখা': নদী ও মানুষের আখ্যান
'সুবর্ণরেখা' নদী, ছবি: সংগৃহীত

 

'সুবর্ণরেখা' নদী তীরে, উৎস থেকে মোহনায়, কত জনপদ, জনজীবন আর কত শত পরিবার বসতি গড়েছে, তার ইয়াত্তা নেই। এমনই এক পরিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা, বিবর্ধিত ও আলোড়িত এক আশ্চর্য আখ্যান বলেছেন দলিত সাহিত্যিক নলিনী বেরা। তার এই আশ্চর্য আখ্যানের অভিনবত্ব মনোযোগ কেড়েছে বোদ্ধা পাঠকদের।

পশ্চিমবঙ্গের নামকরা প্রকাশনা সংস্থা প্রবর্তিত 'আনন্দ পুরস্কার ১৪২৫' পেয়েছে নলিনী বেরা রচিত উপন্যাস 'সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা’, যাতে মানবজীবনের মেলবন্ধনে নদীর উপাখ্যান উন্মোচিত করা হয়েছে।

আনন্দ পুরস্কার ১৪২৫- এর দৌড়ে ছিল তিনটি বই: দীপেশ চক্রবর্তীর ‘মনোরথের ঠিকানা’, সন্মাত্রানন্দের ‘নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা’ এবং নলিনী বেরার ‘সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা’। অবশেষে ১৪২৫ সালের আনন্দ পুরস্কার পেলেন সাহিত্যিক নলিনী বেরা নদীস্পর্শী মানুষ ও জনপদের শিল্পিত পরিব্রাজনের মাধ্যমে।

নদীর মতোই মানুষও জীবনের অন্বেষণে ঘুরতে ঘুরতে কোথা থেকে কোথায় যে পৌঁছে যায়, তা সে নিজেও জানে না। উৎস থেকে মোহনায় এসে সমুখে শান্তি পারাবার দেখে ধাবমান মানুষের মধ্যে স্থিরতা আসে, মানুষের মনে পড়ে শেকড়ের কথা। মানুষের জীবনে সমূহ গতি ও পেছনে ফেরার টানের বিপ্রতীপে এক অনিবার্য দ্বৈরথ চলতেই থাকে।

'সুবর্ণরেখা': নদী ও মানুষের আখ্যান
নলিনী বেরা ও তার রচিত উপন্যাস, ছবি: সংগৃহীত

 

ফলে মানুষ শেকড়ের খোঁজে ফিরতে চায় স্মৃতি-বিস্মৃতির পথ বেয়ে তার অতীত সরণীর প্রত্ন-ইতিহাসে ও আত্মপরিচয়ের বৃত্তে। যে আইডেনটিটি ভিত্তিক ইতিহাস চর্চা থেকে উঠে আসে প্রান্তিক জনপদের কাহিনি, সাম্প্রতিককালে যা 'সাবল্টার্ন ইতিহাস' নামে চর্চিত। অন্ত্যজ ও প্রান্তিক মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির অন্বেষণে নৃবিজ্ঞান এ পথে চলছে আজকাল, নলিনী বেরা সে পথেই 'সুবর্ণরেখা' নদী ধরে খুঁজেছেন মূলস্রোতের বাইরে অবস্থিত মানবগোষ্ঠীর যাপিত জীবনের যাবতীয় প্রপঞ্চ ও পরিচিতি।

১৯৫৮ সাল থেকে শুরু হওয়া ৬১ বছরের প্রাচীন আনন্দ পুরস্কার প্রাপ্তিতে নলিনী বেরা নানা কারণে ও বিষয় বৈচিত্র্যে ব্যতিক্রমী। তার আগে বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, সুকুমার সেন, প্রমথনাথ বিশী, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আবুল বাশার, জয় গোস্বামী, আনিসুজ্জামান প্রমুখ লেখক সম্মানিত হয়েছেন আনন্দ পুরস্কারে। এই তালিকায় নলিনী বেরার নাম আলাদাভাবে চিহ্নিত থাকবে বাংলার প্রান্তিক নদী 'সুবর্ণরেখা' ও সেই নদী তীরের মানবমণ্ডলীর বিভাময় জীবনালেখ্য চিত্রণ-কৃতিত্বের সঙ্গত কারণে।

আপনার মতামত লিখুন :