Alexa

যারা বাসা বাঁধতে এসেছিল

যারা বাসা বাঁধতে এসেছিল

তানিয়া চক্রবর্তী/ছবি: বার্তা২৪

এই পৃথিবী সকলের, মানুষ যেমন আধুনিক হয়েছে এই যুগে তেমনি নির্বোধও। তারা ভেবেছে এই পৃথিবী তাদের, আর কারোই সেখানে অধিকার নেই, এই ভ্রান্ত ভাবনায় তারা অন্য জীবদের হেলাফেলা করে। আসলে নিজেদের মানবিকতাকেই হেলাফেলা করে। সেই ভাবনা ধরেই শিশুমনের ভেতরে এই ভাবনার প্রসার ঘটানো উচিত এই পৃথিবী আমাদের পশু, পাখি, মানুষ, গাছ সকলের। 

লিপি ক্লাস ফোরে পড়ে। ওরা থাকে একটা ফ্ল্যাটে। চারদিকের হইচই ঘেরা তবু যেন বন্দি বন্দি জীবন। এই ফ্ল্যাটে লিপির সবচেয়ে প্রিয় জায়গা হল ঘরলাগোয়া বারান্দাটি। মা শখ করে সেখানে অনেক টবে গাছ রেখেছে। সবচেয়ে সুন্দর আর বড় গাছটি হল বোগেনভ্যালিয়া বাংলায় যাকে বলে বাগানবিলাস। মাঝে মাঝে বারান্দার গাছগুলো দেখে লিপির বড় দুঃখ হয়! ওরা যেন লিপির মতো সেজেগুজে ঘরের মধ্যে বসে আছে, গ্রিল ছাড়িয়ে বেরিয়ে গেছে বাগানবিলাসের ডাল-পাতা-ফুল। লিপি ভুল জেদ করলে বাবা আর মা যেমন ধমক দেয়, বাগানবিলাসকে দেখে ওর মনে হয় কোনো জেদ ছাড়াই বারান্দার গ্রিলরা ওকে যেন ধমকাচ্ছে। না! মাকে বলতেই হবে এমনভাবে গাছ না রাখাই ভালো কিন্তু ওরা না থাকলে মাঝে মাঝে বারান্দায় ও যেমন অন্যরকম পাখি দেখে সেগুলো নির্ঘাত কমে যাবে! গাছ না থাকলে পাখি আসবেই বা কেন! তাই ভেবেও আর মাকে বলা হয় না। কিন্তু একদিন একটা দারুণ ঘটনা ঘটল।

বারান্দার জামা-কাপড় মেলার তারে কাঠ-খড়-সুতো –মাকড়সার জাল-মাটি জাতীয় কিছু দিয়ে বেশ একটা গোল্লা মতো মন্ড ঝুলতে দেখা গেল। তার কয়েক দিন আগে থেকে লিপি অবশ্য খেয়াল করেছিল একজোড়া টুনটুনি, একটি একটু বড় ও কালচে আরেকটি বেশ মিষ্টি ও ছোট (সাধারণ টুনটুনির থেকে রংটা একটু আলাদা) তারা মাঝে মাঝেই ওদের বারান্দায় বার কয়েক ঘুরে যায়। বোঝা গেল এটা তাদেরই বাসা। বাসার আয়তনটা ছোটোই তবে দিনে দিনে বাড়ছে। আর তাদের বাসা বানানোর কায়দায় বারান্দার মেঝে বেশ ময়লা হয়ে থাকছে প্রতিদিন কাজের দিদি এসে একটু-আধটু অভিযোগ করছে যে এটা পরিষ্কার করে দিলেই তো হয়! কিন্তু লিপি আর লিপির মা তাদের বাড়ির বারান্দার এই কর্মযজ্ঞে খুব খুশি। এত ফ্ল্যাট রয়েছে কজনের ফ্ল্যাটের বারান্দায় আর এমন টুনটুনি বাসা করতে আসে! এর জন্য গাছগুলোর নিশ্চয় ভূমিকা আছে। তাদের দেখেই কিনা নিরাপদে ছানাদের জন্য বাসা করতে এসেছে মা আর বাবা টুনটুনি। সেই রাজাকে নাস্তানাবুদ করা দুষ্টু টুনটুনি! তাই লিপি বারান্দায় গেলেও খুব আস্তে আস্তে যায় যাতে টুনটুনিদের এই জায়গাটে নিরাপদই লাগে। মাও তাকে এ-বিষয়ে সমর্থন করেছে। কিন্তু একদিন হল কি, কাউকে কিছু না জানিয়ে কাজের দিদিটি সমূলে সেই বাসা সরিয়ে দিল পরিষ্কারের অজুহাতে, সেদিন সকাল থেকে লিপির মন খুব খারাপ। কাজের দিদিকে বাড়িতেও বকাঝকা করা হল কিন্তু তাতে আর কি! এদিকে কিছুক্ষণ পর পর টুনটুনি জোড়া বারান্দায় এসে তুমুল হাঁকাহাঁকি করছে। বোধহয় ভাবছে কোথায় গেল বাসা! ওদের দুঃখে লিপির আর স্কুল যাওয়া হল না সেদিন।পরের দিনও টুনটুনিরা এসেছিল কিন্তু না ওরা আর বাসা বানায় নি এই বারান্দায় কোনোদিন! এত বড় পৃথিবীর ছোট্ট একটা কোণও যে মানুষ তাদের কাছ থেকে সরিয়ে নেবে তারা কি জানত! তবে লিপি ওর কষ্ট থেকে একটা জিনিস খুব বুঝেছিল, সবসময় চোর-ডাকাতরা চুরি করে না, মানুষই অজান্তে চুরি করে,কেউ দায়ে আর কেউ বাড়তি সুখের জন্য যেমন অজান্তে চুরি হয়ে গেল এই পাখির বাসাটি। এত বড় পৃথিবীতে প্রতিদিন আমরা এইভাবে চুরি করছি পশুপাখিদের কত কত জায়গা! ওপরে ওপরে মানুষ নিজের সব ঠিক করতে গিয়ে অন্যকে যে দুঃখ দেয় তা বুমেরাং হয়েই ফিরে আসে। তাই সবাই সবাইকে জায়গা দিয়ে ভালোবেসে থাকলে অনেকবেশী খুশি থাকা যায়, টুনটুনিরা তো চলে যেতোই কিন্তু ওরা যদি ছানাদের বড় করে এখান থেকে যেত তাহলে লিপির কষ্টটা অনেক কম হত...

 

আপনার মতামত লিখুন :