Barta24

সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ৪ ভাদ্র ১৪২৬

English

বিশ্বজোড়া তোমার নাম

বিশ্বজোড়া তোমার নাম
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ছবি: সংগৃহীত
মহাদেব সাহা


  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে জন্ম তোমার, বাংলাদেশ
তোমার ঘর
বাংলা তোমার তুমি বাংলার, তুমি
বাংলার মুজিবর;
তোমার মতো আর কে আছে আপন
দেশের প্রাণ
বাঙালির তুমি হৃদয়ে হৃদয়ে
শেখ মুজিবুর রহমান,
বিশ্বজোড়া তোমার নাম, তোমার
কীর্তি বিশ্বময়
পদ্মা–মেঘনা–যমুনা সতত গাইছে জয়;
দেশের মাটিতে মিশে আছ তুমি, দেশের
মাটিতে হৃদয় পাতা
তোমার কীর্তি তোমার নাম কোটি কোটি
হৃদয়ে গাঁথা,
সারা বিশ্ব একনামে চেনে তুমিই
বাংলার মুজিবর
তুমি বন্ধু, তুমিই পিতা, তুমি বিশ্বে
চির–অমর।

সৌজন্যে: প্রথম আলো ও সমকাল

আপনার মতামত লিখুন :

রেমব্রান্ট ও ভারমিয়ার : সপ্তদশ শতকের দুই ডাচ শিল্পী

রেমব্রান্ট ও ভারমিয়ার : সপ্তদশ শতকের দুই ডাচ শিল্পী
ইউহানেস ভারমিয়ার┇রেমব্রান্ট

রেমব্রান্ট
১৬০৬-১৬৬৯

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114164805.jpg
◤ রেমব্রান্ট ◢


ছবি আঁকা শিখতে হলে কাকে গুরু মানবেন? রেমব্রান্ট বলেছেন, কেবল একমাত্র গুরু—প্রকৃতি। তিনি আরো বলেছেন পেইন্টিং হচ্ছে প্রকৃতির দৌহিত্র, এর সাথে ঈশ্বরের সম্পর্ক। কিংবা একটি পেইন্টিংকে তখনই সমাপ্ত বলা হয়েছে যখন এর ওপর ঈশ্বরের ছায়া পড়ে।

চিত্র-সমালোচকদের জন্য রেমব্রান্ট বলেছেন, পেইন্টিং নাকে শুকবার জন্য নয়। নতুন শিল্পীদের জন্য তাঁর কথা : যা জানো তার চর্চা করতে থাকো, এটাই তোমার কাছে স্পষ্ট করে দেবে তুমি কী জানো না। যে সব বড় শিল্পীর সাথে এক নিঃশ্বাসে রেমব্রান্টের নাম উচ্চারিত হয় তারা ইতালির। রেমব্রেন্ট ডাচ; হল্যান্ডের মানুষ।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114291988.jpg

◤ মিনার্ভা ◢


 ১৬০৬ : জন্ম ১৫ জুলাই, লেইডেনে। বাবামার দশ সন্তানের অষ্টম। পুরো নাম রেমব্রান্ট হার্মেনসুন ভ্যান রিইন।
১৬১৩ : ল্যাটিন স্কুলে ভর্তি।
১৬২০ : ১৪তম জন্মদিনের ২ মাস আগে লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, তখনও ল্যাটিন স্কুলের পাঠ অব্যাহত।
১৬২৪ : ইতিহাস, অলঙ্কার-শাস্ত্র অধ্যয়ন।
১৬২৫ : লেইডেনে নিজস্ব স্টুডিও স্থাপন, দ্য স্টোনিং অব স্টেপেন অঙ্কন
১৬২৯ : প্রথম আত্মপ্রতিকৃতি অঙ্কন।
১৬৩৪ : সাস্কিয়া উইলেনবার্গকে বিয়ে।
১৬৪২ : সাস্কিয়ার মৃত্যু, শিশুপুত্র টাইটাসের জন্য গির্জে ডির্কসকে আয়া নিয়োগ; নাইট ওয়াচ অঙ্কন।
১৬৪৭-১৬৫০ : ডির্কসের সাথে শারীরিক সম্পর্ক, বিরোধ, সাস্কিয়ার অলঙ্কার বন্ধক দেওয়ার কারণে রেমব্রান্টের চেষ্টায় তাকে সংশোধনাগারে প্রেরণ।
১৬৫৪ : নতুন হাউসমেইড হেন্ডরিক স্টোফেলস-এর সাথে সম্পর্ক, কন্যা সন্তান কর্নেলিয়ার জন্ম, বাথশেইবা অ্যাট হার বাথ অঙ্কন।
১৬৫৬ : দেওলিয়া ঘোষণা, ক্রোক পরোয়ানা জারি।
১৬৫৮ : বাড়ি বেচে ভাড়া বাড়িতে গমন।
১৬৬৯ : মৃত্যু ২ নভেম্বর। ওয়েস্টরকার্ক সিমেট্রিতে ভাড়া করা অজানা কবরে সমাহিত। 」

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114473772.jpg

◤ আব্রহাম’স স্যাক্রিফাইস ◢


চিত্রশিল্পের ইতিহাসের দিকে যাদের নজর তারা খুব ভালোভাবেই জানেন সপ্তদশ শতকের ‘ডাচ গোল্ডেন এজ’-এর স্রষ্টাদের নাম বলতে শুরু করলেই রেমব্রান্টের নাম এসে যায় এবং প্রায় সকলে সেই সোনালি যুগে আঁকা নাইট ওয়াচ চিত্রটির উদাহরণ দেন। অথচ এ ছবিটির জন্য তিনি লাঞ্ছিত হয়েছেন। ছবির বিষয় রাতের প্রহরা, অর্থের বিনিময়ে যাদের জন্য এটি আঁকতে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন তারা কেউই রেমব্রান্টের কাজটি পছন্দ করেননি।

এই ছবিতে আলো পড়েছে ঠিক মাঝখানে, দুজন অফিসারের উপর আর বর্ষাধারী রক্ষীরা সব আঁধারে অস্পষ্ট। ফরমায়েশটা তাদেরই, অথচ তাদের ভালো করে দেখা যাবে না আর তারা চাঁদা তুলে শিল্পীর টাকা দেবে এটা তো হতে পারে না। খুব বদনাম হলো শিল্পীর। ছবি আঁকার ফরমায়েশ পাওয়া মারাত্মক হ্রাস পেল। স্বচ্ছল পরিবার থেকে আসা একটু বেহিসেবি গোছের এই শিল্পী দেওলিয়া হয়ে গেলেন, বাড়ি বিক্রি করলেন, পারিবারিক অশান্তিও তাঁকে ছাড়ল না। সেই নাইট ওয়াচ-এর দাম এখন কত মিলিয়ন ডলার হতে তা গবেষণার বিষয়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114622015.jpg
◤ দ্য নাইট ওয়াচ ◢


রেমব্রান্টের স্মরণীয় উক্তি : ওরা আমাকে নিয়ে যেভাবে ছবি আঁকাতে চায় আমি সেভাবে আঁকতে পারি না, এটা ওরাও জানে।

শিল্পীদের বিশ্বাস নেই
রেমব্রান্ট জেনোয়া থেকে দুটি ছবির ফরমায়েশ পেয়েছিলেন, একটি বাণিজ্যিক জাহাজের ক্যাপ্টেন ভিভিয়ানো দরদাম এবং সরবরাহের তারিখ ঠিক করেন। তিনি এসে দেখেন কাজ শেষ হয়নি, অধিকন্তু শিল্পী বেশি দাম হাঁকছেন। ক্যাপ্টেন পোর্ট অব আমস্টার্ডাম থেকে ক্রেতাকে লিখলেন : কাজের গতি অত্যন্ত মন্থর, শিল্পীরা সাধারণত তাই করে থাকে, তাছাড়া এই লোকটির বিশ্বাস নেই। এখন দুটি ছবির জন্য ৩০০০ গিল্ডার চাইছেন, অথচ আমার সাথে দর ঠিক হয়েছিল ১২০০ ডলার। তার উপর ভরসা রাখা যায় না।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114664684.jpg

◤ বাথশেইবা অ্যাট হার বাথ ◢


রেমব্রান্টের ছবির ওপর চোরের নজর, গবেষকেরও
১৬৩০-এ আঁকা রেমব্রান্টের বাবার পোর্টেট—‘পোর্ট্রেট অব দ্য ফাদার’ ২০০৬ সালে জাদুঘর থেকে চুরি হয়; সাত বছর পর সার্বিয়ার একটি গির্জায় ৪ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ছবিটি উদ্ধার করা হয়। এর আগে একবার চুরি হয়েছিল, ১৯৯৬ সালে, উদ্ধার হয় স্পেনে।

রেমব্রান্টের মাস্টারপিস ‘ওল্ডম্যান ইন মিলিটারি কস্টিউম’ ছবিটির ওপর ইনফ্রারেড আলো, নিউট্রন ও এক্স-রে প্রয়োগ করে গবেষণা ২০১৩ সালে নিশ্চিত হয়েছে অন্য একটি ছবি রঙ দিয়ে ঢেকে রেমব্রান্ট এটি এঁকেছেন। নিচের ছবিটিও উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114702139.jpg

◤ দ্য অ্যানাটমি লেসন অব ডক্টর নিকোলাস টাল্প ◢


বার্ধক্য ও যৌবন
রেমব্রান্ট ৬৩ বছর বেঁচে ছিলেন। বার্ধক্যের সঙ্কট তিনি মোকাবেলা করেছেন, তবুও বলেছেন : বার্ধক্য সৃজনশীলতার অন্তরায় কিন্তু বার্ধক্য আমার যৌবন-স্পৃহাকে দমিয়ে রাখতে পারে না।

কয়েকটি সেরা ছবি : সেল্ফ পোর্ট্রেট সিরিজ, দ্য নাইট ওয়াচ, দ্য রিটার্ন অব দ্য প্রডিগাল সান, দ্য অ্যানাটমি লেসন অব ডক্টর নিকোলাস টাল্প, দ্য জুইশ ব্রাইড, দ্য স্টর্ম অব দ্য সি অব গ্যালিলি, মিনার্ভা, আব্রহাম’স স্যাক্রিফাইস, বেলথাজার্স ফিস্ট, ডায়ানা, ফিলোসোফার ইন মেডিটেশন, বাথশেইবা অ্যাট হার বাথ, দ্য ব্লাইডিং অব স্যামসন, দ্য কন্সপিরেসি অব ক্লডিয়াস সিভিল, লুক্রেশিয়া।

 ✨

ইউহানেস ভারমিয়ার
১৬৩২-১৬৭৫

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114784531.jpg
◤ ইউহানেস ভারমিয়ার ◢


‘যে প্রভাতে পৃথিবী সৃষ্টি হয়, তখন ঈশ্বরের সামনে নিশ্চয়ই ভারমিয়ারের শিল্পকর্মগুলো ছিল’—ফ্রেডেরিক সোমার এভাবেই শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ডাচ চিত্রশিল্পের স্বর্ণযুগের শিল্পী ইউহানেস ভারমিয়ারকে। অথচ এই শিল্পীর কাজের খবর তাঁর জীবদ্দশায় নিজ শহর ডেলফট-এর বাইরে কোথাও পৌঁছেনি। তিনি ইয়ান বা ইউহান ভারমিয়ার নামেও পরিচিত। তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কিংবা কোনো শিল্পগুরুর কাছে শিক্ষালাভ করার সুযোগ হয়নি, তিনি নিজেও কোনো স্কুল খোলেননি বা নিজ হাতে অনুগত আঁকিয়ে শিষ্যও তৈরি করেননি। অন্যদিকে তাঁর ছবিগুলো কেবল একজন ক্রেতাই নিজ সংগ্রহে রাখায় শিল্প-সমঝদারদের অন্য কেউ তাঁর সম্পর্কে জানতেও পারেননি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114892303.jpg

◤ গার্ল উইথ অ্যা ইয়ার রিং ◢


১৬৩২ : অক্টোবরে জন্ম, ৩১ অক্টোবর ব্যাপটাইজড।
১৬৫২ : বাবার মৃত্যু।
১৬৫৩ : ক্যাথরিনা বোলনেসকে বিয়ে এপ্রিলে; বিয়ের আগে ক্যাথলিক চার্চে দীক্ষা গ্রহণ; চিত্রশিল্পী সংসদে যোগদান।
১৬৫৭ : পিটার ভ্যান রুভেন নামক একজন প্যাট্রন লাভ।
১৬৬১ : পেইন্টার্স গিল্ডের সভাপতি নির্বাচিত ; ১৬৬৩ ১৬৭০, ১৬৭১-এ পুনর্নির্বাচিত।
১৬৭২ : কিছু ইতালীয় চিত্রকলার যথার্থতা সনাক্ত করতে হেগ গমন।
১৬৭৫ : আর্থিক দুরবস্থা কাটাতে ১০০০ গিল্ডার ধার গ্রহণ, সে বছরই মৃত্যু। ১৫ ডিসেম্বর ওল্ড চার্চে সমাহিত। 」

গার্ল উইথ এ পার্ল ইয়াররিং
গার্ল উইথ এ পার্ল ইয়াররিং-কানে মুক্তোর দুল পরিহিত এ ছবিটি ভারমিয়ারের সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ। সপ্তদশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই ছবিকে বলা হয় ‘দ্য মোনালিসা অব দ্য নর্থ’ কিংবা ‘ডাচ মোনালিসা’। কারো ফরমায়েশে তিনি এ ছবিটি এঁকেছেন বা নিজস্ব কোনো নারীকে চিত্রায়িত করেছেন তা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।

১৮৮১ সালে হেগে অনুষ্ঠিত একটি নিলামে মাত্র দুই গিল্ডার ৩০ সেন্টে ছবিটি বিক্রি হয়ে যায়। ক্রেতার কোনো উত্তরাধিকার না থাকায় শেষ পর্যন্ত আজকের এ বিশ্বখ্যাত ছবিটি ১৯০২ সালে মরিতসুইস জাদুঘরে দান করে দেওয়া হয়।

ট্র্যাসি ক্যাভেনিয়র এ ছবিটিকে নিয়ে একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনা করেন গার্ল উইথ এ পার্ল ইয়াররিং (১৯৯৯) নামে। ২০০৩ সালে চলচ্চিত্রায়িত হলে তা গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড লাভ করে।

গার্ল উইথ এ রেড হ্যাট-লাল টুপি পরা এই মেয়েটিও এখন শিল্পরসিকদের কাছে পরিচিত মুখ। ভারমিয়ারের ছোট আকৃতির তেলচিত্রগুলোর একটি হয়ে ওঠে এই লাল টুপির মেয়ে। উনবিংশ শতকেই অল্প কটি ছবির শিল্পী হলেও ভারমিয়ারের প্রভাব নবীন শিল্পীদের ওপর পড়তে শুরু করে।

সালভাদর দালি ভারমিয়ারের দ্য লেসমেকার নিজের মতো করে এঁকেছেন। দালির ১৯৩৪ সালের একটি অমর কাজ-‘ভারমিয়ারের প্রেতাত্মা, যা টেবিল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।’

অঙ্কনই জীবনের ব্রত
অর্থনৈতিক মন্দা, মহামারি প্লেগ এবং ছবি আঁকার পেছনে ব্যয়—পনের সন্তানের জনক ভারমিয়ারের জীবনকে বিপন্ন করে তোলে। তারপরও তিনি সেকালের সবচেয়ে দামি রঙ কিনে ছবি আঁকতেন। দারিদ্র্য জর্জরিত অবস্থায় মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে মৃত্যু, তবুও তিনি বিস্মৃত হয়ে গেলেন। তাঁর শাশুড়ির বাড়িতে দুটি কক্ষে ছবিগুলো পড়ে থাকে। গুস্তাভ ফ্লেডরিখ ভাগান ও থিওফাইল থোর-বার্জার তাঁকে পুনরাবিষ্কার করেন এবং ৬৬টি ছবি সনাক্ত করেন। তবে এর মধ্যে ৩৪টি ছবি নিয়ে সার্বজনীন সম্মতি রয়েছে যে এগুলো তাঁরই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114986807.jpg

◤ দ্য মিল্কমেইড ◢


২০০ বছর পর
তখনকার চিত্রশিল্পের ইতিহাসে তিনি প্রায় সম্পূর্ণভাবে অনুল্লিখিত ও উপেক্ষিত রয়ে যান। মৃত্যুর ২০০ বছর পর ভারমিয়ারের পুনর্জাগরণ ঘটে এবং শিল্পবোদ্ধারা স্বীকার করেন তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের একজন। গুস্তাফ ফ্রেডরিখ ভাগান এবং থিউফাইল থোরে-বার্জার পুনরাবিষ্কৃত ভারমিয়ারের ওপর প্রবন্ধ রচনা করেন। তখন থেকেই ভারমিয়ার পুনর্মূল্যায়িত হতে শুরু করেন এবং কার্যত তাঁর পুনর্জাগরণ ঘটে। তিনি হয়ে ওঠেন ডাচ স্বর্ণযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী।

তাঁর প্রায় সব ছবিই ক্যানভাসে তৈল রঙ। অত্যন্ত দামি ল্যাপিস লাজুলাই, প্রাকৃতিক আলট্রামেরিন এবং অ্যম্বর রঙ ব্যবহার করতেন। সপ্তদশ শতকের কোনো শিল্পী রঙের পেছনে এত ব্যয় করতেন না, তাঁর দারিদ্র্যের সাথে এটা মেলানো যায় না। রঙের ঔজ্জ্বল্য তাঁর ছবি চিনিয়ে দেয়।

লক্ষীমন্ত নারী ক্যাথরিনা বোলনেসকে বিয়ে করেন। তাদের চৌদ্দটি সন্তানের মধ্যে দশজন বেঁচে থাকে। আর্থিক সংকটের কারণে ক্যাথরিনা স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে তার মায়ের বাড়ি ওঠেন। সে বাড়িরই দোতলার সামনের একটি কক্ষ হয়ে ওঠে ভারমিয়ারের স্টুডিও। সেই বাড়ির একেবারে গা ঘেঁষা একটি চার্চও ছিল, তাঁর ল্যান্ডস্কেপে চার্চের উপস্থিতি দেখা যায়। ভারমিয়ারের কেবল তিনটি ছবিতে অঙ্কনের সময়কাল লেখা হয়েছে : দ্য প্রোকিউরেস (১৬৫৮), দ্য অ্যাস্ট্রোনোমার (১৬৮৮) এবং দ্য জিওগ্রাফার (১৬৬৯)।

দারিদ্র্যের ভার
দারিদ্র্য ঘোচাতে তিনি রাতভর সরাইখানাও চালিয়েছেন, কিন্তু দারিদ্র্য ঘোচেনি। সন্তানদের ভার ও দারিদ্র্যের চাপ তাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। স্ত্রী ক্যাথরিনা বলেছেন, অর্থকষ্টের চাপ সহ্য করতে না পেরে মাত্র দেড় দিনের প্রচণ্ড উন্মত্ত আচরণের পর তাঁর স্বামী মৃত্যুবরণ করেছেন। সে সময় ক্যাথরিনা ও তাঁর মায়ের দখলে এসে যায় তার ১৯টি ছবি। এর মধ্যে দুটো ছবি বিক্রি করে ঋণ শোধ করা হয়।

‘ভারমিয়ারের মতো আর কেউ নেই’—জোনাথান রিচম্যানের এই গানটি সংগীত প্রেমিকদের কাছে একজন চিত্রশিল্পীকে পৌঁছে দিয়েছে। ট্রান্সট্রোমারের কবিতাও ভারমিয়ারকে নতুন করে চিনিয়েছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566115170809.jpg

◤ গার্ল উইথ অ্যা রেড হ্যাট ◢


কয়েকটি সেরা ছবি : ডিউ ফ্রম ডেলফ্ট, দ্য ক্যাপটিভ, গার্ল উইথ অ্যা ইয়ার রিং, গার্ল ইন অ্যান্টিক কস্টিউম, গার্ল উইথ অ্যা রেড হ্যাট, দ্য গিটার প্লেয়ার, ওমেন রিডিং, অ্যা লেটার, ডায়ানা অ্যান্ড হার নিম্ফস, ইয়াং ওমেন উইথ অ্যা পিচার, দ্য লাভ লেটার, দ্য মিল্কমেইড।

মৃত্যুর কাছাকাছি আলোর মশাল

মৃত্যুর কাছাকাছি আলোর মশাল
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

-- আপনাকে তো আগে দেখিনি এপথে। নতুন বুঝি এ এলাকায়?

হাঁটুঅব্দি লম্বা জ্যাকেটের হুডটা যেমন ছিল তেমনই রইলো। হুডের ভেতর থেকে উত্তর এলো,

-- বলতে পারেন নতুন, আবার না-ও বলতে পারেন।

-- ঠিক বুঝলাম না। আপনি কি আগে এ মহল্লায় থাকতেন?

দুলে দুলে হাসতে লাগলো লম্বা জ্যাকেটের হুডতোলা লোকটা। অদ্ভুত তো! কে এটা? হাইজ্যাকার নয় তো? পঁয়তাল্লিশের জাকির হঠাৎ করেই কিছুটা ভয় পেয়ে গেলো। নিজের অজান্তেই তার বাম হাতটা চলে গেলো প্যান্টের পকেটে। ওখানে বেশ কিছু টাকা আছে, আর আছে দামি মোবাইলটা।

লোকটা কি তাকে অনুসরণ করছে? কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটছে অবশ্য পাশাপাশি। একবারের জন্যও জাকিরের সাথে কথা বলার কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না। জাকির যে একটু পর পর শঙ্কামিশ্রিত চাহনি ফেলছে তার ওপর সেটাও লক্ষ্য করছে না একেবারেই। আপনমনে হাঁটছে তো হাঁটছেই। দেখতে দেখতে ওরা চলে এলো পাড়ার শেষমাথার বিশাল দীঘিটার কাছে। এই দীঘির ধার ঘেঁষে পথটা একটু বেঁকে গিয়ে মিশেছে অন্য এক মহল্লায়। জাকির প্রতিদিন সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষণ আয়েশ করে। আয়েশ করতে করতে সন্ধ্যা পেরিয়ে যখন রাত ছুঁই ছুঁই তখন বের হয় হাঁটতে। এটা তার প্রতিদিনের অভ্যেস। কারণ সে বেশ স্বাস্থ্য সচেতন। সে চায় একটুও মেদ যেন না জমে তার শরীরে। তাহলে প্রাতঃভ্রমণ না করে সান্ধ্যভ্রমণ কেন?

তার উত্তরও আছে, ওই সামান্য আলসেমিটা তার ছোটবেলা থেকেই, ভোরবেলায় বিছানা ছাড়তে পারে না সহজে। আর এই পৌষের শীতে সেটাতো একেবারেই অসম্ভব। তাই সে অনেক ভাবনা চিন্তা করে এই সান্ধ্যভ্রমণটাই বেছে নিয়েছে। এ সময় কেউ বের হয় না ভ্রমণে, পথটাও নিরিবিলি। তারওপর এখন শীতকাল। লোকজন বাড়িমুখী হয় তাড়াতাড়িই। পাড়ার পথেঘাটে নেমে আসে নিরবতা। সুনসান নিরবতা, মাঝে মধ্যে দুই একটা সাইকেলের টুংটাং কেমন যেন সুখ এনে দেয় মনে।

-- বাহ্, দীঘিটা তো খুব সুন্দর! আসুন , দু'জনে এখানে বসি একটু।

অবাক হয় জাকির এই আহ্বানে। ভয় ভাব তো রয়েছে। একজন সম্পূর্ণ অচেনা মানুষ, যার চরিত্র নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে, চোর না ছ্যাঁচ্চোড় জানা নেই, সে কী না দীঘির সৌন্দর্য উপভোগ করতে ডাকছে জাকিরকে! প্রায় মিনিট বিশেক হয়ে গেলো, একবারও লোকটার জ্যাকেটের হুড নড়েনি একটুও। হুড না নড়লে তো চেহারা দেখার কোনো উপায়ও নেই। লোকটার বয়স সম্পর্কে কোনো ধারনাই করা যাচ্ছেনা। তবে বেশ লম্বা। পরনের ওই লম্বা কালো জ্যাকেটের কারণে কিনা কে জানে, আরও বেশি লম্বা দেখাচ্ছে। ঢেকে রাখা চেহারায় প্রায় রহস্যময় এক অবয়ব। কিন্তু হাইজ্যাক করার ইচ্ছে বোধহয় তার নেই। যদি ইচ্ছে থাকতো, এতক্ষণে সে তা করে ফেলতো। এত সময়ক্ষেপণ করবে কেন সে? এসব ভাবতে ভাবতে দীঘল দীঘিটা পেরিয়ে যাবার উপক্রম। পাশ দিয়ে একটা ফাঁকা রিক্সা চলে গেলো। রিক্সাওয়ালা গান গাইছে গুনগুন করে। ধীরে ধীরে সে মিলিয়ে গেলো সামনের ঘন কুয়াশায়। জাকির যখন বেরিয়েছিল তখন কুয়াশা হালকা ছিল। এখন তা ক্রমশঃ বেড়েই চলেছে। ডানহাতে ধরা উলের টুপিটা মাথায় পরে নিলো সে। আর এগোনো কি ঠিক হবে? আজ ফিরে যাই বরং ... ভাবতেই আবার শুনতে পেলো,

-- আসুন না, বসি একটু!

শীতল অথচ গমগমে কণ্ঠস্বর ভেসে এলো যেন কোনো গভীর কুয়ো থেকে। এই কণ্ঠস্বর জাকিরের ভেতরটা কাঁপিয়ে দিলো একেবারে।

প্রতি লোমকূপ সজাগ হয়ে উঠলো মুহূর্তেই।

লোকটা এগিয়ে আসছে পায়ে পায়ে। এসে জাকিরের মুখোমুখি দাঁড়াতেই যেন একরাশ কুয়াশা এসে পাক খেতে লাগলো ওদেরকে ঘিরে। এভাবে কুয়াশা কেন ঘিরে ধরলো হঠাৎ! কখনও তো কুয়াশার এমন আচরণ চোখে পড়েনি আগে! চোখের সামনে চেনা জায়গাটা কেমন যেন অচেনা মনে হলো। কুয়াশার ভেতর থেকে আবারও ভেসে এলো শীতল কণ্ঠটা।

-- আপনার সাথে আমার কথা হওয়া জরুরি। আর তার জন্য এই জায়গাটা ভীষণ পছন্দ হয়েছে আমার। কিন্তু বার বার আমার আহ্বান আপনি উপেক্ষা করছেন কেন? আপনি হয়তো জানেন না, আপনাকে বাধ্য করা আমার জন্য খুব সহজ ব্যাপার।

-- কে আপনি? এ..এভাবে কথা বলছেন কেন আমার সাথে? জানেন আমি কে? ভয় দেখাতে চাইছেন? এক্ষুণি ফোন করছি দাঁড়ান। থানা বেশি দূরে নয়, পাঁচ মিনিটও লাগবে না পুলিশ আসতে।

আবারও দুলে দুলে হাসতে লাগলো লোকটা। বড় নিষ্ঠুর সেই হাসি। পকেট হাতড়াতে লাগলো জাকির। মোবাইলটা পাচ্ছে না। দু'টো পকেটই তো প্যান্টের, মোবাইলটা পাচ্ছে না কেন সে? হাতড়াতে হাতড়াতে অবশেষে পেলো একসময় ।

হাতে নিয়ে আঙুল ছুঁইয়ে কী-প্যাড বের করার চেষ্টা করতেই বুঝতে পারলো, কাজ করছে না মোবাইল। সুস্থ সবল মোবাইল তার। বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগেই দেখেছে, চার্জ ফুল ছিল, এখন কাজ করছে না কেন? যদিও হাতদুটো তার ভীষণরকম কাঁপছে, তবুও আবারও চেষ্টা করলো।

নাহ্, ঠাণ্ডা মেরে আছে একেবারেই!

কিন্তু লোকটা যে একদম নিকটে! পালাতে গেলেও জাপটে ধরবে সাথে সাথে। কেউ তো নেই আশেপাশে! কুয়াশা অসম্ভব রকমের জমাট ধরেছে। দীঘির কাছাকাছি কয়েকটা বাড়িঘর ছিল , সেগুলো কি হাওয়ায় মিলিয়ে গেল?

কিছুই দেখতে পাচ্ছে না কেন সে? দীঘিটাই স্পষ্ট শুধু। ধোঁয়া ধোঁয়া কুয়াশা দুলছে ঢেউয়ের মতো। দুলছে দীঘির টলটলে জল। লাইটপোস্টের মৃদু আলো জ্যাকেটধারীর লম্বা দেহের ধাক্কায় বেঁকে গিয়ে পড়েছে সেই জলে। নরম সোনালী রঙ ছড়িয়ে পড়ছে ছোট ছোট ঢেউয়ের মাঝে।

এতক্ষণ মূর্তির মতো দাঁড়িয়েছিল লোকটা। সামান্য নড়ে উঠলো এবার। দুই হাত দুইদিকে এমনভাবে প্রসারিত করলো যেন উড়াল দেবে এখনই।

শোঁ শোঁ করে বইছে হিমেল হাওয়া। জাকিরের প্রতিটি অঙ্গ কাঁপতে লাগলো ঠকঠক করে। লোকটা এগিয়ে এলো তার দিকে দু'বাহু প্রসারিত করেই। বললো,

-- এসো, সঙ্গী হও আমার, আমি যে তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি!

-- কোথায়?

-- যেখানে গেলে কেউ খুঁজে পাবে না তোমায়!

-- খুঁজে পাবে না!! কেন?

-- খুঁজে পাওয়ার কথা নয় তাই! কেউ খুঁজে পায় না, কেউ ফিরেও আসে না ওখান থেকে।

-- কিন্তু কেন যাবো? আমাকে কেউ খুঁজে পাবে না, এমন জায়গায় আমি কেন যাবো?

-- আমি চাইছি তাই!

-- তুমি চাইবার কে? তোমাকে তো আমি চিনি না! যাদেরকে আমি চিনি, তাদেরকে ছেড়ে যাবো না আমি তোমার সাথে।

-- কাকে চেনো তুমি? কে আছে এমন, যাকে তুমি চিনে গেছো খুব ভালোভাবে?

-- কে নেই? আমার বাবা-মা, একমাত্র বোন, দশবছর আগে বিয়ে করা আমার বউ, আমার ছোট্ট তুলতুলে কন্যাটা, কে নেই! আরও আছে বন্ধু- বান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষী।

-- এদের সবাইকে চেনো তুমি? কোনো দ্বিধা নেই মনে?

-- দ্বিধা থাকবে কেন? সব্বাইকে চিনি আমি। তোমার সাথে গিয়ে যদি হারিয়ে যাই, খুঁজে বেড়াবে ওরা হন্যে হয়ে।

-- কিছুদিন খুঁজবে, তারপর ভুলে যাবে। তারপর ভুলে যায়। তোমার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হবে না।

-- না হোক, তবুও আমি হারাতে চাই না এত তাড়াতাড়ি। চেনার ঘাটতি থাকলেও না। আমার ছোট্ট মেয়েটা যখন হারমোনিয়ামে বসে দুলে দুলে গান করে, দু'চোখ জুড়িয়ে যায় আমার! ওর একমাথা কোঁকড়া চুলে বিলি কেটে কেটে ঘুম পাড়াই আমি। তা নাহলে মেয়েটা যে আমার ঘুমোতেই চায় না!

-- এ সবই মিথ্যে মায়া, তুমি তা ভালো করেই জানো। যত জড়াবে তত বেদনা বাড়বে, বাড়বে মোহ।

-- বাড়ুক! মায়ায় জড়িয়ে যে বেদনা, সে বেদনাতেও সুখ খুঁজে নিতে জানি আমি।

-- হা হা হা! কোথায় সুখ? সে তো অধরা! প্রতিদিন নতুন চাওয়া, না পেলে বেদনা ভর করা, পেয়ে গেলেও আবার নতুন কোনো চাওয়া। সুখ ধরা দেয় কখনও? মিছেমিছি সময় ব্যয়।

-- দেয় দেয়, এসবের মাঝেই সুখ ধরা দেয়। অতি তুচ্ছ তুচ্ছ বিষয়েও লুকিয়ে থাকে সুখের ঠিকানা।

-- যত্তসব! আর সময় দিতে পারবোনা। তুমি আমার সাথে যাবে কিনা বলো।

-- না যাবো না।

-- অসহ্য দুঃসাহস তোমার।

-- জানি। আমি এও জানি, তুমি ভীতু।

চারিদিক প্রকম্পিত করে বিকট শব্দে হেসে উঠলো লোকটা। মনে হলো তার হাসির শব্দে জমাট কুয়াশারা ভেঙে যাচ্ছে ছোট ছোট টুকরোয়। আর সেই টুকরোগুলো অসহ্য এক যন্ত্রণা হয়ে ঝরে পড়ছে জাকিরের ওপর। লোকটা আরও এক ধাপ এগিয়ে এসে প্রবল তাচ্ছিল্য ছুঁড়ে দিয়ে বললো,

-- আমি ভীতু!! আমি???

-- অবশ্যই! ভীতু না হলে নিজেকে ওভাবে আড়াল করে রেখেছো কেন?

-- আমাকে দেখলে সাথে সাথে সংজ্ঞা হারাবে তুমি, নির্বোধ কোথাকার!

-- তাহলে দেখাও! ভয়ই তো পাওয়াতে চাইছো তুমি আমাকে!

-- শুধু তোমাকে নয়, সবাইকেই। সবাই ভয় পায় আমায়।

-- আমি পাই না। তোমার মতো মামুলি একটা লোককে ভয় পাওয়ার কি আছে?

-- ওহ্, তাই? শুরুতে তো ভীষণ কাঁপাকাঁপি করছিলে।

-- শুরুতে ওরকম হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। তবে যত সময় গেছে, ভয়কে দূরে ঠেলতে সক্ষম হয়েছি আমি, অস্বীকার করতে পারো?

-- না, তা পারি না।

-- তাহলে বিদেয় হও।

-- বিদেয় হবো? দেখবে না আমাকে? হুডে ঢাকা আমার চেহারা নিয়ে তোমার যে সংশয়, দূর করবে না তা?

-- নাহ্

-- কেন?

-- কী হবে সংশয় দূর করে? হয়তো আড়াল সরে গেলেই ভয়াবহ কিছু দেখবো। দেখে হয়তো আতঙ্কে শিউরে উঠবো। দেখতে চাই না আমি তা। যা কিছু ভয়াবহ তা আড়ালেই থাক। সামনে আসুক শুধুই সুন্দর... শুধুই মনোরম কিছু।

-- কিন্তু তোমাকে না নিয়ে যে আমি যেতে পারি না। অযথা সময় নষ্ট করেছো অনেক। চলো এবার!

-- কতবার বলবো? এখনই যাবো না আমি। অযথা সময় তো তুমি নষ্ট করছো। বহু আগেই তোমাকে চলে যেতে বলিনি?

-- বলেছো। তুমি বললেই চলে যাবো ভাবছো কেন? তুমি একটা অতি সাধারণ আজ্ঞাবাহী মানুষ। এই পৃথিবীতে তোমার মেয়াদ শেষ। আর তোমার ইচ্ছে অনিচ্ছেয় তো তোমার যাওয়াটা নির্ভরশীল নয়। যখন ডাকা হবে তখনই যেতে বাধ্য তুমি।

-- বললেই হলো? জীবনের সৌন্দর্য পেখম মেলছে একে একে, এখনই চলে যাবো? বাবা-মা ক্রমশঃ বৃদ্ধ হচ্ছেন। তাঁরা শিশুকাল থেকে যেমন করে আগলে রেখে বড় করেছেন আমায়, আমারও তো কর্তব্য বার্ধক্যে যেন তাঁরা অসহায় বোধ না করেন, সে ব্যাপারে খেয়াল রাখা। চলে গেলে সেটা কে দেখবে শুনি?

-- সেটা জানা আমার কাজ নয়। আমার কাজ তোমাকে নিয়ে যাওয়া। যেভাবেই হোক নিয়ে যেতে হবে । কিন্তু তুমি বড় বেশি অবাধ্য, বড় বেশি সাহস তোমার। জানো, অবাধ্যদের কঠোরতম শাস্তির ব্যবস্থা আছে?

-- জানি জানি। জেনেও অবাধ্য হবো। যাও, ভাগো এখান থেকে!

ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে গেলো যেন লোকটা। দু'হাত মুষ্টিবদ্ধ করে আঘাত করতে লাগলো নিজের বুকে। তারপর এমনভাবে একটা হাত এগিয়ে নিয়ে এলো যেন চেপে ধরবে জাকিরের কণ্ঠনালী। এক ঝটকায় কিছুটা পেছনে সরে এসে জাকির বললো,

-- খবরদার, ছোঁবে না আমাকে! যাও, চলে যাও!

-- ওহ্!! অবাধ্য মানুষ! তুচ্ছ মানুষ! আমার হাতের ছোট্ট একটা ধাক্কায় ছিটকে পড়বে তুমি ওই শান্ত দীঘির জলে। কিছুক্ষণ তোলপাড় উঠে থেমে যাবে সব। একসময় ভেসে উঠবে তোমার নিথর দেহ। কিছুই করতে পারবে না তুমি।

-- পারবো। কারণ আমার আছে ভালোবাসার শক্তি। আমি এই পৃথিবীকে, আমার স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা সবাইকে ভালোবাসি ভীষণ। সেটাই আমার শক্তি। সেই শক্তির কাছে পরাজিত হবেই তুমি। শূন্য হাতেই ফিরে যেতে হবে তোমাকে।

-- কী নির্বোধ! কী ভীষণ নির্বোধ তুমি! আমি আর সহ্য করতে পারছি না তোমার এই নির্বুদ্ধিতা। প্রচণ্ড রাগে জ্বলে যাচ্ছে আমার সারাদেহ। এত সহজে হেরে যাবো ভেবেছো? কেউ হারাতে পারেনি আমাকে কোনোদিন, তুমিও পারবে না।

কোনো কথা বললো না এরপর জাকির। কোনো কথা বলারই আর প্রয়োজন নেই এরপর। পরাজিতরা আড়ালেই থাকে। আড়ালে থাকতে থাকতেই ওরা আরও আড়াল হয়ে যায়, ডুবে যায় অন্ধকারে। জাকিরের দৃষ্টি স্থির। ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি। সে হাসিতে স্পষ্ট, হারবে না সে। লড়ে যাবে শেষ মুহূর্তটি পর্যন্ত। কালো জ্যাকেটের আড়ালে লোকটার দিশেহারা ভাব। হয়তো এই প্রথমবার সে হেরে যেতে বসেছে। হয়তো কেন? অবশ্যই হেরে গেছে সে। নিশ্চিত হার.... নিশ্চিত হার- এ সে এখন ক্ষতবিক্ষত, বিধ্বস্ত!

হঠাৎ যেন মৃদু গুঞ্জন ভেসে এলো কানে। সমবেত গুঞ্জন। ধীরে ধীরে সেই গুঞ্জন নিকটে... আরও আরও নিকটে চলে এলো। কুয়াশা ফুঁড়ে দৃশ্যমান হলো আলোর মশাল। সমবেত গুঞ্জন সেই মশাল হাতে জাকিরের কাছাকাছি এসে থেমে গেলো। জাকির বললো,

-- কোথায় যাও তোমরা, মশাল হাতে?

-- আলো বিলিয়ে বেড়াই। সব কালো দূর করি মশালের আলোয়!

ভালোলাগায় ভরে গেলো জাকিরের মন। ও দাঁড়িয়ে রইল ভালোলাগায় বুঁদ হয়ে। একসময় দেখলো, হুডে ঢাকা লোকটা কোথাও নেই । নেই সমবেত গুঞ্জন আর মশালের আলো কাছাকাছি।ওই আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে দূরে বহুদূরে....ঢেউয়ের মতো।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র