Barta24

বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯, ৬ ভাদ্র ১৪২৬

English

আলো আসে ওখানেও

আলো আসে ওখানেও
ছবি: বার্তা২৪
রেহানা বীথি


  • Font increase
  • Font Decrease

আতরের কড়া গন্ধটা ঘরময় ছড়ানো। কেমন যেন গা গুলিয়ে উঠছে ববিতার। মোচড় দিচ্ছে নাভির কাছাকাছি। চোকির ওপর টানটান হয়ে শুয়েছিলো ও। নাভির কাছে মোচড় দিতেই ডানহাতে তলপেটটা চেপে ধরে কুঁকড়ে ফেললো শরীরটা। মাথার কাছের ছোট্ট জানালাটা খোলাই তো আছে, তবু একটুও বাতাস আসছে না কেন? ঘাম চুঁয়ে পড়ছে কানের পাশ দিয়ে বালিশে। উঠে গিয়ে পানি খাবে, না হয় ফ্যানটা চালাবে একটু তার শক্তিও যেন নেই শরীরে।

খুটখুট করে হাসছে বুড়োটা। হামানদিস্তায় পান ছেঁচার মতো একটা শব্দ সেই হাসির। অসহ্য লাগে ববিতার। তাকে নিয়ে মস্করা! এই যে আতরের গন্ধে মোচড় উঠছে তার নাভিতে, তাই নিয়েও মস্করা! শান্তিতে থাকতে দিলো না বুড়োটা তাকে কোনোদিনই। দূর হ, দূর হ! দূর হয় না সহজে। দিনে কিংবা রাতে হানা দেয় যখন তখন ববিতার ঘুপচি ঘরটাতে। আতরের গা গুলানো কড়া গন্ধটা ছড়িয়ে দেয় ঘরময়। সুরমা দেয়া জুলজুলে চোখে শাসনের ভঙ্গিতে তাকায় ববিতার দিকে। ভয় দেখাতে চায়? পাবে না ভয় ববিতা। হাড়কিটকিটে বুড়ো কোথাকার, শাসন করার অধিকার সে পেলো কোত্থেকে!

বহুকষ্টে উঠে ফ্যানটা চালায় ববিতা। গায়ে হাওয়া লাগতেই অনেকটা হালকা লাগলো নিজেকে। ঘরের বাঁদিকে ড্রেনের ঠিক কাছাকাছি গোসলের জায়গা। টিনের বেড়া আর নীল রঙের মোটা পলিথিনে ঢাকা তার আসা যাওয়ার পথটা। সন্ধ্যে হতে দেরি নেই বেশি। গোসল করে নিলো সে। শুধু পেটিকোট আর ব্লাউজ পরেই চলে এলো ঘরে। আতরের গন্ধটা আর নেই এখন। লাল টুকটুকে একটা ফিনফিনে পাতলা শাড়িতে নিজেকে জড়িয়ে বসলো চারকোণার এককোণ ভাঙ্গা আয়নাটার সামনে। মনে হচ্ছে কেউ যেন বালি ঘসে দিয়েছে আয়নাটার ওপর। প্রায় ঝাপসা। তবুও কেমন মায়া ওর এটার ওপর। চাইলেই ফেলে দিয়ে নতুন আয়না কিনতে পারে। কিন্তু... ওই যে, মায়ায় আটকে আছে মন! ঘন কাজল এঁকে নিলো দু'চোখে। গাঢ় লাল লিপস্টিকে ঠোঁটদুটোকে টসটসে করে তুললো। দু'গালেও একটু ছোঁয়ালো সেই লাল। ঠোঁটের ওপরে চন্দ্রবিন্দুর ফোঁটার মতো কালো তিল বসিয়ে ভালো করে আয়নায় দেখলো নিজেকে। চোখে, ঠোঁটে, গালে কামনা উপচে পড়ছে যেন। সারা শরীরে উথাল পাথাল যৌবন। জানে সে, পুরুষের বুকের ভেতর কাঁপন ধরায় তার এই রূপ। তার ঘরের চৌকাঠ ডিঙ্গানো পুরুষের সংখ্যা দেখে ঈর্ষার আগুনে জ্বলে যায় আরতি, বাতাসি, চুমকিরা। বেশ বোঝে সে। ঘনিয়ে আসছে আঁধার। শুরু হয়ে যাবে আনাগোনা রাতের পাখিদের। ঘরের সাথে লাগোয়া একচিলতে বারান্দাটায় গিয়ে বসলো ববিতা। বসে আছে অন্যরাও নিজেদের ঘরের সামনে। খিলখিলিয়ে হাসছে উৎকট প্রসাধনে ঢাকা মুখগুলো।

লাইটপোস্টের আলোটা তেরছাভাবে এসে পড়েছে ববিতার মুখের ওপর। সেই আলোটা ঢেকে দিয়ে একটা লম্বা ছায়া এসে দাঁড়ালো একেবারে ওর পাশটিতে। বললো, যাবি?

হাতে দামি মোবাইল, ভীষণ সভ্য পোশাকের মানুষটাকে দেখে চমকে গেলো ববিতা। গলির মোড়ে দাঁড়ানো লাল টুকটুকে গাড়িটা দেখা যাচ্ছে এখান থেকেই। এই বস্তিতে এমন গাড়ির মালিক! স্বপ্ন দেখছে না তো! গায়ে চিমটি কেটে দেখবে নাকি? তখনই আবার শুনতে পেলো,

কী রে, যাবি না?

অন্ধকার ঘরটা দামি পারফিউমের সুগন্ধে ভরে গেলো। বাতি জ্বালাতে দেয়নি লোকটা। আঁধারেই অনুভবে আসে, লোকটা কাঙ্গাল। এতকিছু থেকেও নিঃস্ব একেবারে। আলোতে আসুক তার এই নিঃস্বতা হয়তো চায় না সে। তাই আঁধারে এসে আবার মিলিয়ে গেলো আঁধারেই, কে জানে! যাওয়ার আগে ফিসফিসিয়ে শুধু বলে গেলো...... শুনেছিলাম তুই জাদু জানিস। সত্যি, একদম সত্যি!

অবসন্ন শরীর নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো ববিতা। আজ রাতে আর কেউ পার হোক তার দরজার চৌকাঠ চায়নি সে। কয়েকটা কড়কড়ে হাজার টাকার নোট দিয়ে গেছে আঁধারে মিলিয়ে যাওয়া লোকটা। তাছাড়া শরীরটাও ঝিমিয়ে আছে সেই বিকেল থেকেই। চোখের পাতা ভারি হতে হতে যেন তলিয়ে গেলো কোনো এক অতল গহ্বরে। তলিয়ে যেতে যেতে হাজার প্রজাপতির ভীড়ে খুঁজে পেলো নিজেকে। যেন বকুল বিছানো একটা পথ, যেন জলে ধোয়া ঝকঝকে প্রকৃতি চারপাশে। নাম না জানা কত ফুল, আর অসংখ্য প্রজাপতি। মিলিয়ে যাবো যাবো করেও সূর্যটা রয়েই যাচ্ছে যেন। হাতছানি দিয়ে ডাকছে ওকে, ফুলি...........

আতরের গন্ধটা নাকে ধাক্কা দিতেই ফিরে এলো সেই গহ্বর থেকে। বুড়োটা তাকিয়ে আছে সোজা ওর চোখের দিকে। এমন চাবুকের মতো সেই চাহনি, ভেতরটা কাঠ কাঠ হয়ে গেলো ববিতার। তবুও বুঝতে দিলো না বুড়োকে। বুড়োর ওই চাহনিকে তাচ্ছিল্যে উড়িয়ে দিয়ে বিছানা থেকে নেমে এলো। ঘরের পশ্চিমে, যেদিকে একটা কাঠের চেয়ার টেবিল আছে, দাঁড়ালো সেদিকটায় এসে। বুড়ো তাকিয়ে তেমনই।

--- অতো দূরে গেলা ক্যান ফুলি? কাছে আসো, তুমি না বউ আমার!

--- খবরদার কইতাসি, আর একটা কতা না। এক্ষণই বাইরান আমার ঘর থাইকা! পিরিত দেখাবার আইসেন? বুড়া মাইনষের এত পিরিত ক্যান? আমার জীবনডা শ্যাষ কইরাও শান্তি হয় নাই আপনের?

--- আহা, চ্যাতো ক্যান ফুলি? তুমার তো খুশি হওনের কতা, এত বড়লোকের সাতে বিয়া হইসে। কত আরাম আয়েশ তুমার। গয়না শাড়ি ভালো খাওন! কুনুদিন কি ভাববার পারসিলা, এইসব পাইবা? পারো নাই। তবুও পাইসো। পাইয়াও দিগদাড়ি করো। পরপুরুষের লগে রাইত কাটাও? এইডা আমি কেমনে মাইনা লই, কও তুমি?

--- মানতে না পারলে চক্ষু মুইদা থাকেন। কে কইছে আপনেরে দেখতে?

--- বেগানা পুরুষের লগে মেলামেশা ঠিক না ফুলি, আল্লাহ্ নারাজ হয়। দোজখের আগুনে ভাজা ভাজা হইবার চাও? এখনও সময় আছে, শুনো আমার কতা। বিয়ার পর কত হাউস কইরা তুমারে বোরখা বানাইয়া দিলাম, পর্দায় চলাফেরা করবা বইলা। বড় ঘরের বউ ঝি রা সারাক্ষণ পর্দা মাইনা চলে। বাইরের পুরুষের সামনে মুখ দেখানোও তাগো পাপ। আর তুমি কিনা......! যাউগ্গা, কই ফালাইসো সেই বোরখা খান। আবার বানায় লও। এহন তো আমি বানায় দিতে পারবো না। পারলে তোমারে এমুন বেপর্দা চলতে দিই? জোর কইরা আটকাইতাম। কিন্তু আল্লাহ্ আমারে তুইলা নিলো। বড় অসময়ে তুইলা নিলো! তুমার মতো কচি বউরে সাপখোপের মইদ্যে রাইখাই তুইলা নিলো। এই আপসোস আমার কুনুদিন ফুরাইবো না ফুলি! তাই তো ঘুইরা ফিইরা তুমার কাছে আসি। তুমি রাগ হও তাও আসি।

অতৃপ্তিতে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো বুড়ো। সুরমার আড়ালে একটু বোধহয় নোনাজলও উঁকি দিলো চোখে। দিক, তাতে ফুলির কী! শুধু টাকা পয়সাই সব? গলা পর্যন্ত কবরে যার সেই বুড়ো কিনা বিয়ে করলো চৌদ্দ বছরের ফুলিকে! কী? না, বউ মরেছে।

বুড়া বয়সে বউ তো মরতেই পারে। ছেলে, বৌমা,নাতি, নাতনিতে ভর্তি বাড়িঘর। তারা নাকি কেউ তার যত্ন নিতে পারবে না। বিয়ে করা লাগবেই।

পরনে একটা বেঢপ ঘটিপ্যান্ট আর কোমরের কুঁচি ছিঁড়ে ঝুলতে থাকা একটা চিটচিটে ময়লা জামা গায়ে ফুলি বেগম মায়ের আঙুল ধরে গিয়েছিলো আক্কাস মিয়ার বাড়িতে। সদ্য স্বামী হারানো তার মা কাজের আশায় গিয়েছিলো ওবাড়িতে। পানের রসে টইটুম্বুর মুখে আক্কাস মিয়ার স্ত্রী বলেছিলো, আইচ্ছা রাখলাম তুমারে, তয় মাইয়াডারে সাতে আইনো না। পোলাপান কামের সময় বড় ত্যক্ত করে।

--- বয়স কত তুমার মাইয়ার?

-- ছয়। তয় আম্মা, অরে রাখোনের কুনু জায়গা নাই। খুব ঠাণ্ডা মাইয়া, আপনেরে একটুও ত্যক্ত করবো না।

--- ঠিক আছে, আইনো তাইলে। তয় সাবধান কিন্তু।

তারপর রোজ মায়ের আঙুল ধরে ভোরবেলায় আসে ফুলি। খায় দায়, জামাকাপড়ও জোটে। একমাথা পাটের আঁশের মতো চুলগুলো তেলে চুপচুপে। সুগন্ধী সাবানে গায়ের কালো হয়ে আসা রঙ ধুয়ে মাজা মাজা শ্যামলা রঙটা হাসিমুখে বেরিয়ে পড়ে যেন। নজরে আসতে থাকে তার মায়া মায়া মুখটা। এই মায়াভরা মুখটার কারণেই হোক, আর ছুটে ছুটে এর তার ফাই ফরমাস খাটার কারণেই হোক, প্রিয় হয়ে গেলো সবার কাছে ফুলি বেগম। একে একে আটটি বছর কেটে গেলো তাদের এ বাড়িতে। সরকারের খাস জমির কুঁড়েঘর থেকে উচ্ছেদের পর এ বাড়ির রান্নাঘরের এক কোণায় জায়গা হয়েছিলো তাদের। কৃতজ্ঞতায় মা তার গদ গদ।

মালকিনের মৃত্যুর চল্লিশ দিন পার হতে যত দেরি, তারপরেই বৃদ্ধ আক্কাস মিয়া জেদ ধরে বিয়ে করার। ছেলেদের তো মাথায় হাত, বুড়ো বাপের এ কী ভীমরতি! ফুলি যে ফুলি, যে কিনা বেড়ে উঠলো চোক্ষের সামনে, তার চেয়েও বড় বয়সের নাতি নাতনি আক্কাস মিয়ার, তারে কিনা বিয়া করবার চায় সেই আক্কাস মিয়াই! তাগোরই বাপ! হায় আল্লাহ্!

নাহ্, আল্লাহ্ আক্কাস মিয়ার ছেলেমেয়েদের হাহাকারে সাড়া দেয়ার সুযোগই পায়নি। তার আগেই বাড়ির লাগোয়া দু'কাঠা ভিটে ফুলির নামে লিখে দেয়ায় হাত হয়ে গেলো ফুলির মা।

স্বপ্নেও ভুল করে কখনও চায়নি যা, পেয়ে গেলো। মালকিনের দুই একটা গয়না, সোনালী জরির ঝকমকে বেনারসি আরও কত কী! ফুলি তার রাজরাণী এখন। সুখে তার রাতের ঘুম যায় যায়।

বুড়োর সাদা জোব্বা থেকে আতরের গন্ধটা বাতাসে ভেসে ভেসে যেন ববিতার মাথার চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। অসহ্য....অসহ্য! দু'হাতে মাথা চেপে ধরে ধপ করে চেয়ারটায় বসে পড়লো সে। হামানদিস্তায় পান ছেঁচা হাসিটা বেশ কায়দা করে এমন সময়েই হাসলো বুড়ো। এক ঝটকায় উঠে ঘরের বাতিটা জ্বেলে দিলো ববিতা। কেউ নেই। বুক ভরে শ্বাস নিলো ও, আহ্..... আতরের গন্ধটাও নেই! রাত বাকি আছে আরও কিছুটা। বাইরে অন্ধকার এখনও অনেক গাঢ়। নিবিড় এই আঁধারে কিছু মুহূর্ত খুব মিষ্টি পরশ বুলিয়ে দিলো যেন ববিতার চোখে। যদিও মুহূর্তগুলো পেরিয়ে এসেছে অনেকটা সময়। তবুও সেগুলো ভালোলাগার প্রলেপ দিলো ওর বেদনায়। সদ্য পাঁপড়ি মেলা গন্ধরাজের মতো বউটাকে সবসময় চোখে চোখে রাখতো বুড়ো। জড়িয়ে ধরে আদর করতে চাইতো যখন তখন। কিন্তু চাইলেই কি আর হয়? ঝিমিয়ে যাওয়া যৌবন তার কেন যেন জাগতেই চাইতো না! নিষ্ফল চেষ্টার পরিশ্রমে ঘুমে ঢলে পড়তো বুড়ো। দু'হাতের শক্ত বাঁধনে জড়িয়ে রাখা ফুলি আলগা হয়ে যেতো কখন টেরই পেতো না! চুপিচুপি সেই বাঁধন আরও খানিকটা আলগা করে ফুলি তখন উঠে পড়তো। বুড়োর ঘরের সাথে লাগানো বাথরুমে গিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে ঠান্ডা পানির ধারা বইয়ে দিতো শরীরে। সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে বুড়োর ব্যবহৃত আতরের গন্ধ দূর করার চেষ্টা করতো প্রাণপণে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে গাঢ় নিঃশ্বাসের শব্দে নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়তো ফুলিও। একদিন কি ভেবে সিঁড়িভেঙ্গে উঠে পড়লো ছাদে। বিশাল ছাদ। আগে কত উঠেছে, কিন্তু বিয়ের পর বুড়োর কড়া বারণ। দীর্ঘ বিরতির পর হঠাৎ ছাদে যেতে কেমন যেন ভয় ভয় করছিলো ফুলির। তারওপর আবার গভীর রাত। বুড়ো টের পেলে কি হবে কে জানে! তবুও উঠে গিয়েছিলো ও। ভীষণ আঁধার চোখে সয়ে যাওয়ার পর তো ফুলি তাজ্জব! তার আগেই কে যেন এসে বসে আছে ছাদে। একটা ছায়া যেন নড়ে উঠলো তার আভাস পেয়ে। ঘুরে এক্কেবারে ফুলির দিকেই তাকালো। আতঙ্কে ছুটে সিঁড়ির দিকে চলে আসতে চাইলো ফুলি, কিন্তু পারলো না। তার আগেই জাপটে ধরলো ফুলিকে সেই ছায়া। চিৎকার করতে চাইলো ফুলি, কিন্তু শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া ফুলির গলা দিয়ে কোনো আওয়াজই বের হলো না। ছায়াটি ততক্ষণে ওকে ধরে বসিয়ে দিয়ে বললো, এত ভয় পেলে চলে? বলে হাসতে লাগলো।

বুঝলো ফুলি, আক্কাস মিয়ার মেজো নাতি। মেলা বড় পাশ দিবো বইলা যে শহরেই থাকে। ছুটি ছাটায় বাড়িতে আসে। লজ্জায় ফুলি আরও কাঠ হয়ে গেলো।

--- তুমি কি রোজ রাতেই ছাদে আসো?

ফুলি মাথা নাড়ে জোরে জোরে। এই পোরথম, বিশ্বাস করেন বিয়ার পর এই পোরথম!

--- ও আচ্ছা, এত ভয় পাচ্ছো কেন?

--- দোহাই লাগে, আপনের দাদাজানরে কিছু কইয়েন না। আর কুনুদিন আসুম না আমি!

আবার হেসে উঠলো আক্কাস মিয়ার নাতি।

--- বলবো না। কিন্তু কাল রাতে যদি আবার আসো তবে। তা না হলে বলে দিতে পারি!

ধান্দায় পড়ে গেলো ফুলি। এই পোলা তারে রাইতের কালে ছাদে ডাকে ক্যান? ভুল কইরা একদিন নাহয় আইসা পড়সে, তাই বইলা আবার! যদি ধরা পইড়া যায়! কিন্তু..... না আইলে যদি কইয়া দেয়! এই দোটানায় দুলতে দুলতে সিঁড়ি দিয়ে নিচে চলে আসে। নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়ে ঘাপটি মেরে। নাহ্, জাগেনি বুড়ো। কিন্তু হৃদয়ে কেমন যেন তোলপাড় হতে থাকে। বাকি রাত দুই চক্ষে আর নামে না ঘুম। বড় অস্থির... বড়ই অস্থির ফুলি আজ। অচেনা..... ভীষণ অচেনা এক ইচ্ছে জেগে উঠছে বুকের ভেতর। এক অজানা কাঁপন টের পাচ্ছে সে। প্রস্ফুটিত যৌবন তার যেন বাঁধন আলগা করে জেগে উঠতে চাইছে ভীষণভাবে। বুড়োর স্পর্শে কোনোদিন এমন হয়নি তো! কিন্তু.... ও যে বুড়ো আক্কাস মিয়ার বিয়ে করা বউ। তবে কেন অন্য কারো ছোঁয়ায় কাঁপছে তার বুক ভালোলাগায়? শরীরে তার এত আবেশ কেন জাগলো ওই ছোঁয়ায়? কী করবে ও এখন? পরপুরুষের কথা ভাবনায় আনাও যে পাপ। কিন্তু শরীর যে চাইছে! অচেনাকে জানার প্রবল ইচ্ছেটাকে কেমন করে চেপে রাখবে ফুলি? অন্ধকার ছাদ যে তাকে ডাকছে বার বার! সেই ডাক উপেক্ষা করার শক্তি আছে কি তার? না নেই। আর কেনই বা উপেক্ষা করবে ফুলি সেই ডাক? যাবে সে। কাল রাতে যাবে সে ছাদের অন্ধকারে।

পরের রাতে গিয়েছিলো ফুলি সেই অন্ধকার ছাদে। মিয়ার নাতি যেন অপেক্ষায় ছিলো ভীষণ। ফুলি যেতেই এমনভাবে জড়িয়ে ধরেছিলো যেন দম আটকে যাবে। যেন তার গরম নিঃশ্বাসে পুড়িয়ে দেবে ফুলিকে। সারাগায়ে গতরাতের সেই অদ্ভুত শিহরণ টের পেয়েছিলো ফুলি। আগে কখনও এমন শিহরণ অনুভবে আসেনি তার। সেই শিহরণে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে ফুলি যেন নিজের ভেতর দেখতে পেলো একটা দু'কূল ছাপানো নদী। আর সেই নদীর ছলাৎছল ঢেউয়ে দুলতে দুলতে চলে গেলো সে বহুদূর... বহুদূর! যেন হারিয়ে গেলো।

তারপরে ছুটির প্রায় প্রতিটি রাত ছিলো ওদের হারিয়ে যাওয়ার রাত। হারাতে হারাতে ফুলি শুনতে পেতো সেই যুবকের প্রেমের কথা, ভালোবাসার কথা। হতবাক ফুলি তখন চৌদ্দ ছেড়ে আঠারোয়। তবুও শরীরের সাথে লেপ্টে থাকা যুবকের কথাগুলো কেমন যেন দুর্বোধ্য লাগতো তার কাছে। কেমন যেন ভয়, তবুও অদ্ভুত এক আবেশ। সেই আবেশের প্রতীক্ষায় থাকতো দু'জনেই সবার অলক্ষে।

এরপরের ঘটনাগুলো ঘটে যায় খুব দ্রুত। যেন স্বপ্ন! এক জ্যোৎস্নারাতে আক্কাস মিয়া এ সংসারের মায়া ছেড়ে, তার টলোমলো যৌবনবতী বউকে ছেড়ে চলে গেলো ওপারে। মিয়াসাহেবের ছেলেরা তাদের বাপের বউটাকে আর স্বীকারই করতে চাইলো না! জোর করে সাদা কাগজে বুড়ো আঙুলের টিপ নিয়ে তাড়িয়ে দিলো ফুলিকে। ফুলির মা বুক চাপড়িয়ে অভিশাপ দিতে দিতে বেরিয়ে এসেছিলো ও বাড়ি থেকে মেয়ের আঙুল ধরে। মিয়ার সেই নাতি চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখেছিলো সব। এমন ভাব যেন ফুলিকে সে চেনেই না! কেন যেন একটুও কাঁদেনি ফুলি। শক্তমুখে মায়ের আঙুল ধরে বেরিয়ে এসে হাঁটা দিয়েছিলো অজানার পথে। গাঁয়ের শেষ মাথায় শাপলা বোঝাই দীঘিটার পাড়ে যে বিরাট আমগাছটা, তার নিচে যে মাটির বাড়িটা, সেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে একজন জানতে চেয়েছিলো সমাচার। কেঁদেকেটে ফুলির মা বলেছিলো সব। সেই একজনকে ভাই বলেও সম্বোধন করছিলো ফুলির মা। সেই ভাই সব শুনে বললো, শহরে কামের ছড়াছড়ি। মাইয়ারে পাঠাও আমার লগে। হাজার হাজার টাকা কামাইয়া পরে তুমার মাইয়াই লইয়া যাইবো তুমারে। ততদিন তুমি আমাগো বাড়িতেই থাকো, চিন্তার কিসু নাই। কোন দূর সম্পর্কের ভাই, যাকে ফুলি তো দূরের কথা, ফুলির মাও কোনোদিন তাদের খোঁজখবর নিতে দেখেনি। না নিক, এই অসময়ে তাদের পাশে তো দাঁড়াতে চাইছে, কম কী! একেবারে গলে গিয়ে ফুলির মা পাঠিয়ে দিলো মেয়েকে। মায়ের সেই ভাই ফুলিকে শহরে নিয়ে এসে বেঁচে দিলো এই রঙমাখা বস্তিতে। মা তার জানতেই পারলো না, ফুলি তার কখন কখন ববিতা হয়ে গেলো!

এতকিছু হয়ে যাওয়ার পরেও কেন যেন ভুলতে পারে না ববিতা সেই আঁধার ছাদের শিহরণ। দুখে ভরপুর জীবনে সেটুকুই একটু সুখের স্মৃতি বলেই হয়তো! একথা মনে হতেই আর রাগ থাকে না তাকে কয়েকদিনের আদরে ভরিয়ে দেয়া সেই যুবকের ওপর। কিন্তু বুড়ো আক্কাস মিয়া! বুঝতো না বলে বিয়েটা তখন বড় প্রাপ্তি মনে হয়েছিলো ফুলি আর তার মায়ের। কিন্তু ঠকেছে তো সে বুড়োর কারণেই! দু'কাঠা মাটির লোভে ঠকানো হয়নি তাকে! অবশ্য বউ বলে একটু আধটু ভালোও কি বাসতো বুড়ো তাকে? কে জানে! সবসময় তো চোখে চোখে রেখে জীবন অতীষ্ট করে তুলেছিলো। এখন আবার তার ঘুপচি ঘরে এসে তাকে শাসন করার চেষ্টা! টিপছাপ নিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিলো যখন, তখন তো কব্বর থেকে একবারও আসেনি সে! এখন আবার শাসন দেখায়! কিসের শাসন! না খেয়ে মরবে নাকি ববিতা? তাছাড়া এখন তো সে ফুলি নয়, ববিতা। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত একটু ঘনালেই কত টাকা আসে তার হাতে! সেই যে বিক্রি হয়ে গেলো ফুলি, তারপর আর যায়নি গাঁয়ে। কোন মুখে যাবে? টাকা পয়সা পাঠিয়েছে মাকে। পরে যখন একটা মোবাইলের মালিক হলো সে, কথাও হতো তখন মায়ের সাথে। তবে খুব কম। মায়ের সেই ভাই ফোন দিতে চাইতো না মাকে, নানান টালবাহানা। খুব কাহিল গলায় কথা বলতো ওর মা। টাকা পেয়েছে কিনা জানতে চাইলে কেমন আমতা আমতা করে বলতো, পেয়েছে।

হঠাৎ একদিন শুনতে পেলো, মরে গেছে ফুলির মা। সেদিন খুব কেঁদেছিলো ফুলি। আর কেউই যে রইলো না তার!

দু'চোখ জ্বালা করে উঠলো ববিতার। বাতিটা নিভিয়ে বিছানার পাশের জানালাটা খুলে দিলো। কোথাও শিউলী ফুটেছে কী? ফোটারই কথা। একটু যেন হিম হিম বাতাসে ভেসে এলো তার সুবাস! দূর্বা ঘাসে জমে কি এখনও শিশির সেই গাঁয়ে? পথের ধারের কলমিঝোপে এখনও ফোটে কি সাদা কিন্তু সাদা নয়, ঠিক বেগুনীও নয় আবার গোলাপীও নয়, এমন কলমি ফুলগুলো?

আহ্..... ধীরে ধীরে বাড়ছে শিউলীর সুবাসটা। গুমোট ঘরটা তার ভরে যাচ্ছে মিষ্টি গন্ধে। বুক ভরে স্বাস নিলো ববিতা। একবার, দুইবার, তিনবার.......

হঠাৎ আবার সেই অনুভূতি। সেই আতরের গন্ধ, সেই মোচড় নাভির চারপাশে। নাহ্, একেবারে পেয়ে বসেছে যেন তাকে গন্ধটা! গা গুলিয়ে ওঠার আগেই বেরিয়ে আসতে হবে ওখান থেকে। আর চায় না পেতে ও সেই গন্ধ, সেই হামানদিস্তায় পানছেঁচা হাসিটাও শুনতে চায় না আর। ওসব ওর অতীত। যে অতীতে ফুলি ছিলো। এখন নেই। এখন ববিতা আছে, আছে রাতের বস্তি, খিলখিল হাসি। এখানেও ভোর আসে, শিউলীর সুবাস আসে, আলো আসে জানালা দিয়ে । ওই যে, একটু একটু ফর্সা হচ্ছে আকাশের পুব দিকটা............

 

আপনার মতামত লিখুন :

জহির রায়হান : দেশপ্রেমিক ও সমাজ-সচেতন এক শিল্পী-প্রতিকৃতি

জহির রায়হান : দেশপ্রেমিক ও সমাজ-সচেতন এক শিল্পী-প্রতিকৃতি
অসাধারণ চলচ্চিত্র ও শৈল্পিক সাহিত্যকর্মের স্রষ্টা হিসেবে আজও স্মরণীয় জহির রায়হান

মাত্র ৩৬ বছর বয়সের জীবনেই জহির রায়হান নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী একজন কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র-পরিচালক হিসেবে। প্রচণ্ড বক্তব্যধর্মী ও জীবনমুখী তাঁর চলচ্চিত্রগুলো নান্দনিকতা ও কৌশলগত মানের দিক থেকে এখনো স্মরণীয় হয়ে টিকে আছে। অনুপ্রাণিত করছে বর্তমান ও ভবিষ্যতের চলচ্চিত্রকারদের। তেমনি মাত্র আটটি উপন্যাস লিখেই তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লেখক হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছেন। ‘হাজার বছর ধরে’ দেশের সাহিত্য ও চলচ্চিত্রাঙ্গনে তাঁর পথ চলার কথা থাকলেও, ১৯৭২ সালে নিরুদ্দেশের ‘বরফ গলা নদীতে’ হারিয়ে যাওয়ার পর ফিরে আসেননি আর। আজ এই বহুপ্রজ বিরল প্রতিভার ৮৪তম জন্মদিন।

জহির রায়হানের প্রকৃত নাম মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। জন্ম ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর মজুপুর গ্রামে। জহির রায়হান তাঁর সাহিত্যিক নাম। এ নামেই তিনি সুপরিচিত। তাঁর শৈশব কেটেছে কলকাতায়। দেশ বিভাগের পর ঢাকায় আসেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে বাংলায় এমএ করেন জহির। ছাত্রাবস্থায়ই তাঁর সাহিত্যিক ও সাংবাদিক জীবন শুরু হয়। ১৯৫০ সালে তিনি যুগের আলো পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি খাপছাড়া, যান্ত্রিক, সিনেমা ইত্যাদি পত্রিকাতেও কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি সম্পাদক হিসেবে প্রবাহ পত্রিকায় যোগ দেন। এই সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাই হয়তো তাঁর ভেতরে আরো শক্তভাবে গেঁড়ে দেয় লেখক হওয়ার বুনিয়াদ।

১৯৫৫ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’ প্রকাশিত হয়। কিন্তু, তিনি যে ছিলেন একজন বহুমাত্রিক মানুষ। চলচ্চিত্রের প্রতি ছিল তাঁর মনের ভেতরে গভীর ভালোবাসা। তাই, চলে আসলেন চলচ্চিত্রাঙ্গনে। চলচ্চিত্র জগতে তার পদার্পণ ঘটে ১৯৫৭ সালে, ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে। সহকারী হিসেবে আরো কাজ করেন সালাউদ্দীনের ছবি—‘যে নদী মরুপথে’-তেও। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম তাকে ‘এ দেশ তোমার আমার’-এ কাজ করার আমন্ত্রণ জানান; এ ছবির নামসংগীত রচনা জহির রায়হানের হাতেই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207266898.jpg

◤ ‘বেহুলা’ সিনেমার সেটে নির্দেশনা দিচ্ছেন জহির ◢


সহকারী পরিচালক হিসেবে সফলভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে পরিচালক হিসেবে কাজ করার প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল। ১৯৬১ সালে তিনি রুপালি জগতে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’ নির্মাণ করেন। এটি অবশ্য ছিল উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র। পরের বছর মুক্তি পায় তার প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র ‘বাহানা’। এরপর ১৯৬৬ সালে ‘বেহুলা’, ১৯৬৭-তে ‘আনোয়ারা’, ১৯৭০-এ ‘জীবন থেকে নেওয়া’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘লেট দেয়ার বি লাইট’-এর মতো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। 

চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি, সাহিত্যিক হিসেবেও তাঁর কলম সচল ছিল মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত। অনেক কালজয়ী উপন্যাস তিনি উপহার দিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে : ‘বরফ গলা নদী’, ‘আর কত দিন’, ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, ‘হাজার বছর ধরে’, ‘আরেক ফাল্গুন’, ‘কয়েকটি মৃত্যু’, ‘তৃষ্ণা’, ‘সূর্যগ্রহণ’ ইত্যাদি। সংগ্রামমুখর নাগরিক জীবন, আবহমান বাংলার জনজীবন, মধ্যবিত্তের আশা-আকাঙ্ক্ষা-বেদনা প্রভৃতি তাঁর রচনায় শিল্পরূপ পেয়েছে। সাহিত্যকৃতীর স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (মরণোত্তর) দেওয়া হয়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207304659.jpg
◤ প্রথম স্ত্রী সুমিতা দেবীর সাথে জহির রায়হান ◢


ব্যক্তিজীবনে দুবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন জহির রায়হান। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন চিত্রনায়িকা সুমিতা দেবী। ১৯৬১ সালে বিয়ে করেন তারা। প্রথম পরিবারে অনল রায়হান এবং বিপুল রায়হান নামে দুই পুত্র সন্তানের জন্ম হয়।

সুমিতা দেবীর সাথে বিচ্ছেদের পর ১৯৬৮ সালে আরেক জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা সুচন্দার সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন তিনি। দ্বিতীয় পরিবারে রয়েছেন তার দুই সন্তান অপু ও তপু। তার বড় ভাই প্রয়াত লেখক শহীদুল্লা কায়সার। তিনি লেখক ও রাজনীতিক পান্না কায়সারের স্বামী এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী শমী কায়সারের বাবা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207352881.jpg

◤ জহির রায়হানের আলোচিত, নন্দিত ও প্রভাবশালী চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’র পোস্টার ◢


শুধুমাত্র কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার হিসেবে জহির রায়হানকে দেখলে সবটুকু যেন বলা হয় না তাঁর ব্যাপারে। একজন সমাজ ও রাজনীতি সচেতন শিল্পী ছিলেন তিনি। নিজেও স্বশরীরে অংশ নিয়েছেন দেশ মাতৃকার বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন জহির রায়হান। উপস্থিত ছিলেন একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আমতলা সমাবেশে। এসময় তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে জেলে পুরে দেয়। এই জেলে বসেই তিনি ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’ রচনা করেন। ভাষা আন্দোলন তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যার ছাপ দেখতে পাওয়া যায় তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেওয়া’–তে। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। কলকাতায় তার নির্মিত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেওয়ার বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয় এবং চলচ্চিত্রটি দেখে ভূয়সী প্রশংসা করেন সত্যজিত রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা এবং ঋত্বিক ঘটক প্রমুখ খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকাররা। সে সময়ে তিনি চরম আর্থিক দৈন্যের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হতে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করে দেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207399680.jpg
◤ প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’, যা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত তৈরিতে রাখে দারুণ ভূমিকা ◢


মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী নিধনের এক অসাধারণ প্রামাণ্য দলিল ‘স্টপ জেনোসাইড’ তৈরি করেন জহির রায়হান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী বাঙালিদের দুঃখ-দুর্দশা, হানাদার পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, ভারতে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের দিনকাল প্রভৃতি এই তথ্যচিত্রে তুলে ধরা হয়েছিল। এর প্রথম প্রদর্শনী হয় এক অজ্ঞাত স্থানে, যেখানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রীপরিষদের সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরি করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছিল ‘স্টপ জেনোসাইড’। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে এখন পর্যন্ত নির্মিত ছবিগুলোর মধ্যে শিল্পগত ও গুণগত সাফল্যের দিক থেকে শীর্ষে স্থান দেওয়া হয়ে থাকে এই চলচ্চিত্রটিকে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর জহির রায়হান ঢাকায় ফেরেন। ফিরে জানতে পারেন, মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে পাক হানাদার বাহিনীর দোসর রাজাকার আল বদর বাহিনী তার বড় ভাই প্রখ্যাত লেখক শহীদুল্লাহ কায়সারকে অপহরণ করেছে। নিখোঁজ ভাইকে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করেন জহির। ১৯৭২ সালের ২৮ জানুয়ারি সকালে এক রহস্যময় ব্যক্তি তাকে ফোন করে জানান, তার ভাইকে মিরপুর ১২ নাম্বারে একটি হাউজিং সেক্টরে আটকে রাখা হয়েছে। একথা শুনেই তিনি ভাইয়ের খোঁজে মিরপুর যান এবং আর ফিরে আসেননি।

জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে অনেক ধরনের থিওরি রয়েছে। এমন বলা হয় যে, তিনি একটি সার্চ পার্টি নিয়ে মিরপুরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। সেখানে পাক হানাদার বাহিনীর কিছু সদস্য ছদ্মবেশে ছিল। তারা তাকে লুকিয়ে আটক করে হত্যা ও গুম করে ফেলে। তার ছোট ভাই হাবীবের ভাষ্যমতে, তিনি জহির রায়হানকে মিরপুর পুলিশ স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে এসেছিলেন। এরপর আর তার দেখা পাননি। এমন খবরও শোনা যায়, মিরপুর পুলিশ স্টেশন থেকে জহির রায়হানকে জানানো হয়েছিল, মিরপুর ১২ নাম্বারে কিছু পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকার ছদ্মবেশে লুকিয়ে আছে। সেখানে না গিয়ে আগে তাকে কল ট্রেস করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর তিনি নাকি ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশ স্টেশন থেকে বেরিয়ে যান। আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207448145.jpg

◤ ১৯৭২-এর পর ‘আরেক ফাল্গুন’ হয়তো ‘কখনো আসেনি’ তবে দেশ ও সমাজ-সচেতন শিল্পীদের এগিয়ে যাওয়ার বড় প্রেরণা তিনিই ◢


এ ব্যাপারে বিভিন্ন সময় আরো অনেক গুজব ছড়িয়েছে। এগুলোর কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা, তা যাচাই করা মুশকিল। তাঁর মৃতদেহও কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই নিশ্চিত হওয়া যায়নি কিভাবে মারা গিয়েছেন তিনি। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি তার মৃত্যুদিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

স্বাধীনতার ঠিক পরপর, সেই ৭২ সালেই জহির রায়হান চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলেও তাঁর অসাধারণ, শৈল্পিক ও নান্দনিক সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্রের জন্য জাতি ঠিকই তাকে স্বরণে রেখেছে। চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য কয়েক বছর পর, ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে প্রদান করে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদক (মরণোত্তর)। ১৯৯২ সালে প্রদান করে সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার। আজও তাঁর সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্রগুলো টিকে আছে অমূল্য সম্পদ হয়ে। ১৯৭২-এর পর ‘আরেক ফাল্গুন’ হয়তো ‘কখনো আসেনি’ জহির রায়হানের জীবনে; তবে দেশ ও সমাজ সচেতন শিল্পীদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার বড় প্রেরণা তিনিই। এই ক্ষণজন্মা প্রতিভার জন্মদিনে তাঁর প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম!

রেমব্রান্ট ও ভারমিয়ার : সপ্তদশ শতকের দুই ডাচ শিল্পী

রেমব্রান্ট ও ভারমিয়ার : সপ্তদশ শতকের দুই ডাচ শিল্পী
ইউহানেস ভারমিয়ার┇রেমব্রান্ট

রেমব্রান্ট
১৬০৬-১৬৬৯

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114164805.jpg
◤ রেমব্রান্ট ◢


ছবি আঁকা শিখতে হলে কাকে গুরু মানবেন? রেমব্রান্ট বলেছেন, কেবল একমাত্র গুরু—প্রকৃতি। তিনি আরো বলেছেন পেইন্টিং হচ্ছে প্রকৃতির দৌহিত্র, এর সাথে ঈশ্বরের সম্পর্ক। কিংবা একটি পেইন্টিংকে তখনই সমাপ্ত বলা হয়েছে যখন এর ওপর ঈশ্বরের ছায়া পড়ে।

চিত্র-সমালোচকদের জন্য রেমব্রান্ট বলেছেন, পেইন্টিং নাকে শুকবার জন্য নয়। নতুন শিল্পীদের জন্য তাঁর কথা : যা জানো তার চর্চা করতে থাকো, এটাই তোমার কাছে স্পষ্ট করে দেবে তুমি কী জানো না। যে সব বড় শিল্পীর সাথে এক নিঃশ্বাসে রেমব্রান্টের নাম উচ্চারিত হয় তারা ইতালির। রেমব্রেন্ট ডাচ; হল্যান্ডের মানুষ।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114291988.jpg

◤ মিনার্ভা ◢


 ১৬০৬ : জন্ম ১৫ জুলাই, লেইডেনে। বাবামার দশ সন্তানের অষ্টম। পুরো নাম রেমব্রান্ট হার্মেনসুন ভ্যান রিইন।
১৬১৩ : ল্যাটিন স্কুলে ভর্তি।
১৬২০ : ১৪তম জন্মদিনের ২ মাস আগে লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, তখনও ল্যাটিন স্কুলের পাঠ অব্যাহত।
১৬২৪ : ইতিহাস, অলঙ্কার-শাস্ত্র অধ্যয়ন।
১৬২৫ : লেইডেনে নিজস্ব স্টুডিও স্থাপন, দ্য স্টোনিং অব স্টেপেন অঙ্কন
১৬২৯ : প্রথম আত্মপ্রতিকৃতি অঙ্কন।
১৬৩৪ : সাস্কিয়া উইলেনবার্গকে বিয়ে।
১৬৪২ : সাস্কিয়ার মৃত্যু, শিশুপুত্র টাইটাসের জন্য গির্জে ডির্কসকে আয়া নিয়োগ; নাইট ওয়াচ অঙ্কন।
১৬৪৭-১৬৫০ : ডির্কসের সাথে শারীরিক সম্পর্ক, বিরোধ, সাস্কিয়ার অলঙ্কার বন্ধক দেওয়ার কারণে রেমব্রান্টের চেষ্টায় তাকে সংশোধনাগারে প্রেরণ।
১৬৫৪ : নতুন হাউসমেইড হেন্ডরিক স্টোফেলস-এর সাথে সম্পর্ক, কন্যা সন্তান কর্নেলিয়ার জন্ম, বাথশেইবা অ্যাট হার বাথ অঙ্কন।
১৬৫৬ : দেওলিয়া ঘোষণা, ক্রোক পরোয়ানা জারি।
১৬৫৮ : বাড়ি বেচে ভাড়া বাড়িতে গমন।
১৬৬৯ : মৃত্যু ২ নভেম্বর। ওয়েস্টরকার্ক সিমেট্রিতে ভাড়া করা অজানা কবরে সমাহিত। 」

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114473772.jpg

◤ আব্রহাম’স স্যাক্রিফাইস ◢


চিত্রশিল্পের ইতিহাসের দিকে যাদের নজর তারা খুব ভালোভাবেই জানেন সপ্তদশ শতকের ‘ডাচ গোল্ডেন এজ’-এর স্রষ্টাদের নাম বলতে শুরু করলেই রেমব্রান্টের নাম এসে যায় এবং প্রায় সকলে সেই সোনালি যুগে আঁকা নাইট ওয়াচ চিত্রটির উদাহরণ দেন। অথচ এ ছবিটির জন্য তিনি লাঞ্ছিত হয়েছেন। ছবির বিষয় রাতের প্রহরা, অর্থের বিনিময়ে যাদের জন্য এটি আঁকতে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন তারা কেউই রেমব্রান্টের কাজটি পছন্দ করেননি।

এই ছবিতে আলো পড়েছে ঠিক মাঝখানে, দুজন অফিসারের উপর আর বর্ষাধারী রক্ষীরা সব আঁধারে অস্পষ্ট। ফরমায়েশটা তাদেরই, অথচ তাদের ভালো করে দেখা যাবে না আর তারা চাঁদা তুলে শিল্পীর টাকা দেবে এটা তো হতে পারে না। খুব বদনাম হলো শিল্পীর। ছবি আঁকার ফরমায়েশ পাওয়া মারাত্মক হ্রাস পেল। স্বচ্ছল পরিবার থেকে আসা একটু বেহিসেবি গোছের এই শিল্পী দেওলিয়া হয়ে গেলেন, বাড়ি বিক্রি করলেন, পারিবারিক অশান্তিও তাঁকে ছাড়ল না। সেই নাইট ওয়াচ-এর দাম এখন কত মিলিয়ন ডলার হতে তা গবেষণার বিষয়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114622015.jpg
◤ দ্য নাইট ওয়াচ ◢


রেমব্রান্টের স্মরণীয় উক্তি : ওরা আমাকে নিয়ে যেভাবে ছবি আঁকাতে চায় আমি সেভাবে আঁকতে পারি না, এটা ওরাও জানে।

শিল্পীদের বিশ্বাস নেই
রেমব্রান্ট জেনোয়া থেকে দুটি ছবির ফরমায়েশ পেয়েছিলেন, একটি বাণিজ্যিক জাহাজের ক্যাপ্টেন ভিভিয়ানো দরদাম এবং সরবরাহের তারিখ ঠিক করেন। তিনি এসে দেখেন কাজ শেষ হয়নি, অধিকন্তু শিল্পী বেশি দাম হাঁকছেন। ক্যাপ্টেন পোর্ট অব আমস্টার্ডাম থেকে ক্রেতাকে লিখলেন : কাজের গতি অত্যন্ত মন্থর, শিল্পীরা সাধারণত তাই করে থাকে, তাছাড়া এই লোকটির বিশ্বাস নেই। এখন দুটি ছবির জন্য ৩০০০ গিল্ডার চাইছেন, অথচ আমার সাথে দর ঠিক হয়েছিল ১২০০ ডলার। তার উপর ভরসা রাখা যায় না।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114664684.jpg

◤ বাথশেইবা অ্যাট হার বাথ ◢


রেমব্রান্টের ছবির ওপর চোরের নজর, গবেষকেরও
১৬৩০-এ আঁকা রেমব্রান্টের বাবার পোর্টেট—‘পোর্ট্রেট অব দ্য ফাদার’ ২০০৬ সালে জাদুঘর থেকে চুরি হয়; সাত বছর পর সার্বিয়ার একটি গির্জায় ৪ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ছবিটি উদ্ধার করা হয়। এর আগে একবার চুরি হয়েছিল, ১৯৯৬ সালে, উদ্ধার হয় স্পেনে।

রেমব্রান্টের মাস্টারপিস ‘ওল্ডম্যান ইন মিলিটারি কস্টিউম’ ছবিটির ওপর ইনফ্রারেড আলো, নিউট্রন ও এক্স-রে প্রয়োগ করে গবেষণা ২০১৩ সালে নিশ্চিত হয়েছে অন্য একটি ছবি রঙ দিয়ে ঢেকে রেমব্রান্ট এটি এঁকেছেন। নিচের ছবিটিও উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114702139.jpg

◤ দ্য অ্যানাটমি লেসন অব ডক্টর নিকোলাস টাল্প ◢


বার্ধক্য ও যৌবন
রেমব্রান্ট ৬৩ বছর বেঁচে ছিলেন। বার্ধক্যের সঙ্কট তিনি মোকাবেলা করেছেন, তবুও বলেছেন : বার্ধক্য সৃজনশীলতার অন্তরায় কিন্তু বার্ধক্য আমার যৌবন-স্পৃহাকে দমিয়ে রাখতে পারে না।

কয়েকটি সেরা ছবি : সেল্ফ পোর্ট্রেট সিরিজ, দ্য নাইট ওয়াচ, দ্য রিটার্ন অব দ্য প্রডিগাল সান, দ্য অ্যানাটমি লেসন অব ডক্টর নিকোলাস টাল্প, দ্য জুইশ ব্রাইড, দ্য স্টর্ম অব দ্য সি অব গ্যালিলি, মিনার্ভা, আব্রহাম’স স্যাক্রিফাইস, বেলথাজার্স ফিস্ট, ডায়ানা, ফিলোসোফার ইন মেডিটেশন, বাথশেইবা অ্যাট হার বাথ, দ্য ব্লাইডিং অব স্যামসন, দ্য কন্সপিরেসি অব ক্লডিয়াস সিভিল, লুক্রেশিয়া।

 ✨

ইউহানেস ভারমিয়ার
১৬৩২-১৬৭৫

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114784531.jpg
◤ ইউহানেস ভারমিয়ার ◢


‘যে প্রভাতে পৃথিবী সৃষ্টি হয়, তখন ঈশ্বরের সামনে নিশ্চয়ই ভারমিয়ারের শিল্পকর্মগুলো ছিল’—ফ্রেডেরিক সোমার এভাবেই শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ডাচ চিত্রশিল্পের স্বর্ণযুগের শিল্পী ইউহানেস ভারমিয়ারকে। অথচ এই শিল্পীর কাজের খবর তাঁর জীবদ্দশায় নিজ শহর ডেলফট-এর বাইরে কোথাও পৌঁছেনি। তিনি ইয়ান বা ইউহান ভারমিয়ার নামেও পরিচিত। তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কিংবা কোনো শিল্পগুরুর কাছে শিক্ষালাভ করার সুযোগ হয়নি, তিনি নিজেও কোনো স্কুল খোলেননি বা নিজ হাতে অনুগত আঁকিয়ে শিষ্যও তৈরি করেননি। অন্যদিকে তাঁর ছবিগুলো কেবল একজন ক্রেতাই নিজ সংগ্রহে রাখায় শিল্প-সমঝদারদের অন্য কেউ তাঁর সম্পর্কে জানতেও পারেননি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114892303.jpg

◤ গার্ল উইথ অ্যা ইয়ার রিং ◢


১৬৩২ : অক্টোবরে জন্ম, ৩১ অক্টোবর ব্যাপটাইজড।
১৬৫২ : বাবার মৃত্যু।
১৬৫৩ : ক্যাথরিনা বোলনেসকে বিয়ে এপ্রিলে; বিয়ের আগে ক্যাথলিক চার্চে দীক্ষা গ্রহণ; চিত্রশিল্পী সংসদে যোগদান।
১৬৫৭ : পিটার ভ্যান রুভেন নামক একজন প্যাট্রন লাভ।
১৬৬১ : পেইন্টার্স গিল্ডের সভাপতি নির্বাচিত ; ১৬৬৩ ১৬৭০, ১৬৭১-এ পুনর্নির্বাচিত।
১৬৭২ : কিছু ইতালীয় চিত্রকলার যথার্থতা সনাক্ত করতে হেগ গমন।
১৬৭৫ : আর্থিক দুরবস্থা কাটাতে ১০০০ গিল্ডার ধার গ্রহণ, সে বছরই মৃত্যু। ১৫ ডিসেম্বর ওল্ড চার্চে সমাহিত। 」

গার্ল উইথ এ পার্ল ইয়াররিং
গার্ল উইথ এ পার্ল ইয়াররিং-কানে মুক্তোর দুল পরিহিত এ ছবিটি ভারমিয়ারের সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ। সপ্তদশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই ছবিকে বলা হয় ‘দ্য মোনালিসা অব দ্য নর্থ’ কিংবা ‘ডাচ মোনালিসা’। কারো ফরমায়েশে তিনি এ ছবিটি এঁকেছেন বা নিজস্ব কোনো নারীকে চিত্রায়িত করেছেন তা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।

১৮৮১ সালে হেগে অনুষ্ঠিত একটি নিলামে মাত্র দুই গিল্ডার ৩০ সেন্টে ছবিটি বিক্রি হয়ে যায়। ক্রেতার কোনো উত্তরাধিকার না থাকায় শেষ পর্যন্ত আজকের এ বিশ্বখ্যাত ছবিটি ১৯০২ সালে মরিতসুইস জাদুঘরে দান করে দেওয়া হয়।

ট্র্যাসি ক্যাভেনিয়র এ ছবিটিকে নিয়ে একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনা করেন গার্ল উইথ এ পার্ল ইয়াররিং (১৯৯৯) নামে। ২০০৩ সালে চলচ্চিত্রায়িত হলে তা গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড লাভ করে।

গার্ল উইথ এ রেড হ্যাট-লাল টুপি পরা এই মেয়েটিও এখন শিল্পরসিকদের কাছে পরিচিত মুখ। ভারমিয়ারের ছোট আকৃতির তেলচিত্রগুলোর একটি হয়ে ওঠে এই লাল টুপির মেয়ে। উনবিংশ শতকেই অল্প কটি ছবির শিল্পী হলেও ভারমিয়ারের প্রভাব নবীন শিল্পীদের ওপর পড়তে শুরু করে।

সালভাদর দালি ভারমিয়ারের দ্য লেসমেকার নিজের মতো করে এঁকেছেন। দালির ১৯৩৪ সালের একটি অমর কাজ-‘ভারমিয়ারের প্রেতাত্মা, যা টেবিল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।’

অঙ্কনই জীবনের ব্রত
অর্থনৈতিক মন্দা, মহামারি প্লেগ এবং ছবি আঁকার পেছনে ব্যয়—পনের সন্তানের জনক ভারমিয়ারের জীবনকে বিপন্ন করে তোলে। তারপরও তিনি সেকালের সবচেয়ে দামি রঙ কিনে ছবি আঁকতেন। দারিদ্র্য জর্জরিত অবস্থায় মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে মৃত্যু, তবুও তিনি বিস্মৃত হয়ে গেলেন। তাঁর শাশুড়ির বাড়িতে দুটি কক্ষে ছবিগুলো পড়ে থাকে। গুস্তাভ ফ্লেডরিখ ভাগান ও থিওফাইল থোর-বার্জার তাঁকে পুনরাবিষ্কার করেন এবং ৬৬টি ছবি সনাক্ত করেন। তবে এর মধ্যে ৩৪টি ছবি নিয়ে সার্বজনীন সম্মতি রয়েছে যে এগুলো তাঁরই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114986807.jpg

◤ দ্য মিল্কমেইড ◢


২০০ বছর পর
তখনকার চিত্রশিল্পের ইতিহাসে তিনি প্রায় সম্পূর্ণভাবে অনুল্লিখিত ও উপেক্ষিত রয়ে যান। মৃত্যুর ২০০ বছর পর ভারমিয়ারের পুনর্জাগরণ ঘটে এবং শিল্পবোদ্ধারা স্বীকার করেন তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের একজন। গুস্তাফ ফ্রেডরিখ ভাগান এবং থিউফাইল থোরে-বার্জার পুনরাবিষ্কৃত ভারমিয়ারের ওপর প্রবন্ধ রচনা করেন। তখন থেকেই ভারমিয়ার পুনর্মূল্যায়িত হতে শুরু করেন এবং কার্যত তাঁর পুনর্জাগরণ ঘটে। তিনি হয়ে ওঠেন ডাচ স্বর্ণযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী।

তাঁর প্রায় সব ছবিই ক্যানভাসে তৈল রঙ। অত্যন্ত দামি ল্যাপিস লাজুলাই, প্রাকৃতিক আলট্রামেরিন এবং অ্যম্বর রঙ ব্যবহার করতেন। সপ্তদশ শতকের কোনো শিল্পী রঙের পেছনে এত ব্যয় করতেন না, তাঁর দারিদ্র্যের সাথে এটা মেলানো যায় না। রঙের ঔজ্জ্বল্য তাঁর ছবি চিনিয়ে দেয়।

লক্ষীমন্ত নারী ক্যাথরিনা বোলনেসকে বিয়ে করেন। তাদের চৌদ্দটি সন্তানের মধ্যে দশজন বেঁচে থাকে। আর্থিক সংকটের কারণে ক্যাথরিনা স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে তার মায়ের বাড়ি ওঠেন। সে বাড়িরই দোতলার সামনের একটি কক্ষ হয়ে ওঠে ভারমিয়ারের স্টুডিও। সেই বাড়ির একেবারে গা ঘেঁষা একটি চার্চও ছিল, তাঁর ল্যান্ডস্কেপে চার্চের উপস্থিতি দেখা যায়। ভারমিয়ারের কেবল তিনটি ছবিতে অঙ্কনের সময়কাল লেখা হয়েছে : দ্য প্রোকিউরেস (১৬৫৮), দ্য অ্যাস্ট্রোনোমার (১৬৮৮) এবং দ্য জিওগ্রাফার (১৬৬৯)।

দারিদ্র্যের ভার
দারিদ্র্য ঘোচাতে তিনি রাতভর সরাইখানাও চালিয়েছেন, কিন্তু দারিদ্র্য ঘোচেনি। সন্তানদের ভার ও দারিদ্র্যের চাপ তাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। স্ত্রী ক্যাথরিনা বলেছেন, অর্থকষ্টের চাপ সহ্য করতে না পেরে মাত্র দেড় দিনের প্রচণ্ড উন্মত্ত আচরণের পর তাঁর স্বামী মৃত্যুবরণ করেছেন। সে সময় ক্যাথরিনা ও তাঁর মায়ের দখলে এসে যায় তার ১৯টি ছবি। এর মধ্যে দুটো ছবি বিক্রি করে ঋণ শোধ করা হয়।

‘ভারমিয়ারের মতো আর কেউ নেই’—জোনাথান রিচম্যানের এই গানটি সংগীত প্রেমিকদের কাছে একজন চিত্রশিল্পীকে পৌঁছে দিয়েছে। ট্রান্সট্রোমারের কবিতাও ভারমিয়ারকে নতুন করে চিনিয়েছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566115170809.jpg

◤ গার্ল উইথ অ্যা রেড হ্যাট ◢


কয়েকটি সেরা ছবি : ডিউ ফ্রম ডেলফ্ট, দ্য ক্যাপটিভ, গার্ল উইথ অ্যা ইয়ার রিং, গার্ল ইন অ্যান্টিক কস্টিউম, গার্ল উইথ অ্যা রেড হ্যাট, দ্য গিটার প্লেয়ার, ওমেন রিডিং, অ্যা লেটার, ডায়ানা অ্যান্ড হার নিম্ফস, ইয়াং ওমেন উইথ অ্যা পিচার, দ্য লাভ লেটার, দ্য মিল্কমেইড।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র