Barta24

শনিবার, ২০ জুলাই ২০১৯, ৫ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

ঘানি

ঘানি
ছবি: বার্তা২৪
রেহানা বীথি


  • Font increase
  • Font Decrease

মসজিদের মিনার ডিঙিয়ে তেরছাভাবে রোদটা এসে পড়েছে একেবারে নুরু মোড়লের খড়ের চাল পেরিয়ে উঠোনটায়। কিছুক্ষণ আগেও ওখানে ছিলো জমজমাট কুয়াশা। ফজরের নামাজ পড়ে বিছানাতেই শুয়ে থাকে নুরু মোড়ল। বেটার বউরা কড়া করে নিষেধ করে দিয়েছে, এই শীতে অতো ভোরে বাইরে না বেরোতে। কিন্তু মনটা তাও আঁকুপাঁকু করে। কত আর শুয়ে থাকা যায়! চুপিচুপি বেরিয়ে গেছিলো দিন দশেক আগে। লাঠিতে ভর দিয়ে পায়ে পায়ে ঘর পেরিয়ে উঠোন, উঠোন পেরিয়ে বাঁশের ঝাঁপ টা সরিয়ে একেবারে রাস্তায়। কুয়াশায় সাদা চারপাশ। তারওপর ছানিপড়া চোখ। কিছুই দেখতে পেলো না ঠিকমতো। কিন্তু যা হওয়ার তাই হলো। বিকেল হতে না হতেই নাক, গলা সব বুঁজে এলো সর্দিতে, সাথে ধুম জ্বর। বুড়ো হাড়ে পৌষের হিম সইবে কেন? সেই থেকে বৌমারা চোখে চোখে রাখে। হেঁসেল থেকে গলা বাড়িয়ে দেখে নেয়, শ্বশুর ঘরে আছে তো? তারপর থেকে ভোরবেলাটা ঘরেই থাকে নুরু মোড়ল। পেচ্ছাব টেচ্ছাবের বেগ সে ফজরের নামাজের আগেই সেরে নিয়ে, বিছানায় বসে বসে নামাজ পড়ে শুয়ে যায় লেপ গায়ে দিয়ে। সারারাতে গরম হওয়া লেপটার ওমে তখন আরাম লাগে বেশ। আবারও জড়িয়ে আসে চোখ। যেন আধো ঘুম আধো জাগরণ। মৃদু ঝাঁঝালো কিন্তু খুব মিষ্টি একটা সুবাস নাকে ধাক্কা দেয় তার। চোখে ভাসে দিগন্তজোড়া হলুদ। পৌষের হিম হাওয়ায় দুলছে সেই হলুদ..... সেই সর্ষে ক্ষেত।

জেগে ওঠে নাতি নাতনিরা। বেটার বউরা হাঁস-মুরগিগুলো ছেড়ে দেয়। ছড়িয়ে দেয়া দানা খুটে খেয়ে বেরিয়ে যায় ওরা। পৌষেও জেগে ওঠে পাড়া। নুরু মোড়লও জেগে ওঠে পুরোপুরি। বিছানা থেকেই বার বার উঁকি দিয়ে দেখে কুয়াশার হালকা হওয়া। রোদটা যখনই মসজিদের মিনার ডিঙায়, টুক টুক করে এসে বসে সে উঠোনে। সূর্যের ওমে পিঠ পেতে দিয়ে দেখতে থাকে পথচারী চলাচল। টুংটাং সাইকেল রিকশা, দুই একটা অটোও যাওয়া আসা করে হেলেদুলে। মন্থরগতি গরুর গাড়িও দেখা যায়। তবে এখন খুব কমে গেছে সে গাড়ি। তার জায়গা দখল করে নিয়েছে ট্রলি নামক বিকট শব্দওয়ালা এক বাহন। সামনে বসানো শ্যালো মেশিনই যার ইঞ্জিনের কাজ করে। নুরু মোড়লের খুব রাগ হয় ওগুলো দেখে। কোথায় গরুর গাড়ি আর কোথায় এই ট্রলি! একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার বুক থেকে। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে নিজের শূন্য ঘানির ঘরটার দিকে চেয়েও। তিনদিকে মাটির শক্ত দেয়াল, ওপরে খড়ের চাল। অব্যবহৃত ঘানিটাও যেন তাকিয়ে আছে নুরু মোড়লের দিকে। বুকের ভেতরটা কেমন এক অজানা কষ্টে ভরে যায়। মনে পড়ে সেই ভোরবেলার ঘুমঘোর... সেই নাকে ধাক্কা দেয়া সর্ষেফুলের সুবাস!

নুরুল ইসলাম নাম তার। কোনোকালে বংশে হয়তো কেউ মোড়ল ছিলো, সঠিক জানা নেই। তারই রেশ ধরে গাঁয়ের লোকজন মোড়ল ডাকে। পেশা ছিলো যার ঘানি ঘুরিয়ে তেল বানানো। বংশীয় পেশা। এ রূপমতী গাঁয়ে তো বটেই, আশেপাশের দু'তিন গাঁয়েও নুরু মোড়লদের ঘানিই ছিলো একমাত্র ভরসা। সেই ঘানিই কিনা অকেজো এখন। কী যুগ এলো! কারেন্টের আলোতে রাতগুলো দিনের মতো।চারিদিকে শুধু মেশিনের ছড়াছড়ি। জমিতে হাল দেয়া, ধান মাড়ানো, ধান ভাঙানো, আটা ভাঙানো, এমনকি সর্ষেও! সব মেশিন, সবই মেশিন। বড়ছেলেকে বলেছিলো, বংশের ধারাটা বজায় রাখতে। কে শোনে কার কথা? ঘানির বলদদুটোকে বেঁচে দিয়ে মুদিখানার দোকান দিলো । বাড়ির উঠোনটা ঘিরে রেখেছে যে চাটাইয়ের বেড়া,তারসাথে লাগানো সেই দোকান। বেচাবিক্রি ভালোই হয়। তা হোক,তবুও বংশের পেশা ছেড়ে দেয়ায় নুরু মোড়লের রাগ রাগ ভাবটা থেকেই গেছে ছেলের ওপর। ছোট দুই ছেলে যেটুকু জমিজিরাত আছে তাতেই করে কর্মে খায়। দুই মেয়ে বিয়ে হয়ে পরের ঘরে। বচ্ছরে দুই তিনবার ছেলেপুলে নিয়ে আসে বাপের বাড়িতে। 

থেকে যায় ক'দিন করে। বাড়িটা তখন নাতি নাতনিতে ভরপুর। বড় ভালো লাগে নুরু মোড়লের। ভালোলাগায় চোখ ভিজে যায়। বুড়ির কথাও মনে পড়ে তখন। কেন যে এ ভরা সংসার রেখে ওপারে চলে গেলো বুড়িটা তাকে ফেলে! রোদে পিঠ পেতে বসে থাকতে থাকতে কেমন যেন ঝিমুনি চলে আসে। সাদা হয়ে যাওয়া পাঁপড়িওলা চোখের পাতা বুঁজে আসতে চায়। দড়ির চৌপায়ায় বসা নুরু মোড়লের বৃদ্ধ শরীরটা গুটিয়ে এতটুকু। ঠিক যেন কাপড়চোপড়ের একটা পুঁটলি।

দাদা, চলো, মা ডাকে। খাবা না?

ধীরে ধীরে মুখ তুলে চায় নুরু মোড়ল। আবছা দৃষ্টিতেও নাতনির মুখটা বড় সুন্দর লাগে তার। যেন দাদির মুখটা কেটে বসানো ওই মুখে। তেমনই সোনার মতো গায়ের রঙ, পিঠে ছড়ানো ঘন কালো চুল। ঝকঝকে মুক্তোদানার মতো দাঁতগুলো মেলে যখন হাসে নাতনি, অবিকল যেন ওর দাদি, সেই যৌবনের জহুরা খাতুন!

-- আব্বারে একটু বুজাইলেও তো পারো। তোমারে খুব মায়া করে।

--  আমি পারুম না। ওই ঘর আব্বার জানের চাইতেই বেশি। শ্বাশুড়ি বুক দিয়া আগলাইয়া রাখছিলেন ওইডা। দুইজনে মিইলা ঘানি ঘুরাইয়াই তো তোমাগো মানুষ করছে।

--  মানুষ করছে না ছাই! লেহাপড়া শেখাই নাই। লেহাপড়া শিখাইলে আইজ....

--  কী কও? চুপ করো। তোমাগো দৌড় জানা আছে। শ্বাশুড়ির মুখে শুনছি, চেষ্টা কিছু কম করে নাই। তোমরা ভাইগুলানই বলদ । ঘানির বলদগুলারও কিছু বুদ্দি থাকে, তোমাগো তাও নাই। থাকলে ঠিকই লেহাপড়া শিখবার পারতা।

বউয়ের ধমক খেয়ে কিছুটা চুপসে যায় মাসুদ আলী। ঠিকই তো। মা মেলা চেষ্টা করছিলো বটে। তয় তাগো মাথায় আসলেই গোবর। নাইলে অন্ততঃ ম্যাট্রিকটা তো পাশ করবার পারতো! যাক, না পারলে কী আছে, দোকান আর জমি দিয়া তো তাগো ভালোই চইলা যায়। তয় এখন খরচ বাড়তাছে। পোলা মাইয়াগুলা লেহাপড়া করে। তাগো বই খাতা পেরাইভেটের খরচ। মাইয়াডা আইএ ক্লাসে পড়ে। দূরে কলেজ, হাঁইটা যাইতে কষ্ট খুব। অটোতে যায়, ভাড়া লাগে। পোলাডা বি এ পাশ কইরা এম এ ভর্তি হইলো। তারও মেলা খরচ। সে অবশ্য সাইকেলেই চলাফেরা করে। দুই ভাইয়ের বাচ্চারাও বড় হইতেছে। খরচও বাইড়া গেছে। জমির ধান খাইয়া আর বেচতে পারে কই? তারওপর ধানের দামও কম। বেইচাও খুব একটা লাভ হয় না।

গাঁয়ের মানুষ এখন খুব সৌখিন হইছে। আগের মতোন দুইখান কাপড়েই বচ্ছর চালায় না। যাগো ট্যাকা আছে তারা সারাবচ্ছরই কিনতে থাকে। ঈদ পরব তো আছেই।

তাই মাসুদ আলীর শখ জেগেছে মনে মনে, একখান গার্মেন্টস এর দোকান দেয়। রেডিমেড জামাকাপড় শহর থেকে এনে বেচে সেই দোকানে। শহরেও ভাড়া নিয়ে দোকান দেয়া যায়, কিন্তু ভাড়া যে মেলা! তারচাইতে নিজের বাড়িতেই যদি ওই অকেজো ঘানির ঘরটা পাওয়া যায়, ঠিকঠাক করে ওখানেই দোকান দেবে বড় করে। গাঁয়ের লোকজনকে আর কষ্ট করে শহরে যেতে হবে না কাপড় কিনতে।বউটাকে মনের সে কথা জানায় সে। বউটাও নিমরাজি, কিন্তু শ্বশুরকে ওই ঘরের কথা বলতে পারবে না কিছুতেই।

চুপসে গেলেও বউকে শুনিয়ে শুনিয়ে গজ গজ করতে থাকে মাসুদ, কি হইবো ওই ঘর রাইখা। ঘানি তো আর ঘুরবো না কুনুদিন। কে ঘুরাইবো ঘানি?

--  না ঘুরলে কী? শ্বশুর কয়, শ্বাশুড়ির আত্মা ঘোরে ঘরখানায়। দেখো না, লাঠি ঠকঠকাইয়া মাজে মদ্যেই কি যেন খুইজ্যা বেড়ায় ওইখানে। দূর থাইকাও কেমুন উদাস চাইয়া থাকে। বড় মায়া লাগে গো! বুড়া মানুষটার জইন্যে খুব মায়া লাগে। কত বছর হইলো বউ মরছে, তবুও দেহো, কেমুন ভালোবাসে এহনও বউরে!

বলে একটু আদুরে অভিমানী গলায় বলে স্বামীকে, আমারে তো তুমি একটুও ভালোবাসো না। বাসলে বুঝতা বাপের মনডা।

তাছাড়া দোকানের মাল কিনতেও তো ট্যাকা লাগবো, পাইবা কই?

চোখের দৃষ্টিতে কি যেন খেলে গেলো মাসুদের। বউয়ের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বললো, আব্বারে কইয়া দশ কাঠা জমি বেইচা দিমু!

অবাক হয়ে স্বামীর দিকে তাকায় শেফালি। এইডা কী কইতাছো, আব্বা রাজি হইবো না। যেটুক জমি আছে, পাঁচ ভাই বইনের। তুমি বেচবার চাও কোন সাহসে? তুমার কি মাথা খারাপ হইয়া গেলো?

--  মাথা খারাপ হইবো ক্যান? দোকানের ইনকাম কি অরা খাইবো না? আর ওই ঘরখান, বুকের মইদ্যে ঘানি লইয়া খাড়ায় আছে, কি দাম আছে তার? খামাখা ফালায়া রাইখা হইবোডা কী? যত্তসব ফালতু!

বিছানা থেকে নেমে মাটি কাঁপিয়ে হেঁটে বাতিটা নিভিয়ে দিলো মাসুদ আলী। বিছানায় এসে জোরের সাথে লেপটা টেনে গায়ে জড়িয়ে শুয়ে পড়লো বউয়ের দিকে উল্টো হয়ে।

এশার নামাজ পড়ে বিছানাতেই গুটিসুটি শুয়েছিলো নুরু মোড়ল। তসবি গুনতে গুনতে কানে এলো আবছা, ছাড়া ছাড়া কিছু কথা। খুবই আবছা, তবুও বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠলো কথাগুলো শুনে। এ কী বলছে ছেলে! নাকি ভুল শুনছে সে? ভুলও হতে পারে। ছেলে তার এমন কথা ভাবতেই পারে না। ঘানি চালাতে রাজি হয়নি বটে, তবে ঘরটা তো এতদিন যেমন ছিলো তেমনই রয়েছে। একদিনও তো ছেলেরা ভেঙে ফেলতে চায়নি তা! একদিনও তো বলেনি কেউ, ওটার কোনো দরকার নেই, মুছে ফেলি ওই স্মৃতি! তাহলে আজ কেন পাশের ঘরের আওয়াজ ভেসে এলো মাটির দেয়াল ভেদ করে? ভুল ভুল, নিশ্চয়ই ভুল! 

কোনটা ভুল, ছেলের কথাগুলো নাকি নুরু মোড়লের ভাবনা? হতেও পারে। পুরোনো স্মৃতিকে এভাবে আঁকড়ে থাকাটা ভুল হতেও পারে। সত্যিই তো! সংসার বেড়েছে, বেড়েছে খরচও। ওই ঘরটা যদি কাজে লাগায় ছেলে নিজের মতো করে, ক্ষতি কী? গাঁয়ের অনেক মাটির বাড়ি এখন পাকা। তার ছেলেরাও তো চাইতে পারে উন্নতি হোক। মাটির দেয়াল ভেঙে ইট সিমেন্টের ভিত উঠুক ভিটেতে তাদের। খারাপ তো কিছু চাইছে না ছেলে। না না, ভুল তারই। ওই ঘর, ওই ঘানি তার বংশের ইতিহাস। সে ইতিহাস পাল্টাতেও তো পারে। শুরু হতে পারে নতুন গল্প, নতুন ইতিহাস। জহুরার বাস তো তার অন্তরে। অন্তরেই থাকবে। ছেলেরাও তো তাকে কখনও অযত্ন করেনি। ছেলের বউরাও যেন নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছে তাকে। মৃত শ্বাশুড়ির কথাও তো তারা স্মরণ করে সম্মানের সাথে। ওদের মনে কষ্ট লাগে এমন কিছু হোক চায় না তা নুরু মোড়ল। ওরা ভালো থাক, নাতি নাতনিরা মানুষ হোক, এর বাইরে আর কি চাওয়ার থাকতে পারে তার? সকালে উঠেই ছেলেকে বলতে হবে, আপত্তি নেই, সাজিয়ে তুলুক দোকান সে নিজের মতো করে। ভবিষ্যত গড়ে তুলুক তাদের সন্তানদের।

রাত বাড়ে, পৌষের হিমে ঘন হয়ে আসে আঁধার। শান্ত হয়ে আসে নুরু মোড়লের বুকের উথাল পাথাল। মনটা তার হালকা লাগছে অনেক। যেন অনেকটাই নিশ্চিন্ত লাগে নিজেকে। ছেলেরা তাদের নিজেদের জীবন বুঝে নিতে শিখেছে, এর চেয়ে বড় সুখের আর কী হতে পারে? এবার সে নিশ্চিন্তে চলে যেতে পারে ওপারে। ওখানে যে জহুরা তার অপেক্ষায় আছে! ওই তো ডাকছে তাকে জহুরা। ডেকে ডেকে মিলিয়ে গেলো যেন কোথায়! কোথায় যেন মিলিয়ে গেলো ঘানির জোয়ালের ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ। মিলিয়ে গেলো যেন ফোটায় ফোটায় তেল পড়ার শব্দ । সর্ষের তেলের ঝাঁঝও যেন মিলিয়ে গেলো বাতাসে, নতুন কোনো গল্প হয়ে।

আপনার মতামত লিখুন :

হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে

হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে
হুমায়ূন আহমেদ

 

তিনি বলেছিলেন, তার মৃত্যুতে কেউ যেন না কাঁদে। বিষাদ কণ্ঠে গেয়েছিলেন গান, ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায় রে জাদু ধন। মরিলে কান্দিস না আমার দায়।’

কিন্তু সাত বছর আগে সুদূর আমেরিকায় তিনি যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন পুরো বাংলাদেশ কেঁদেছিল তার জন্য। শুধু সেদিনই নয়, বাংলা সাহিত্যের ভক্ত-অনুরাগীরা প্রতিটি দিনই তাকে স্মরণ করেন। তার কথা ভাবেন। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে।

১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর জন্ম নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন ২০১২ সালের ১৯ জুলাই। জীবনের প্রতিটি দিন তিনি ছিলেন সৃষ্টিশীল ও কর্মমুখর। জীবনকে উপভোগ করেছেন তিনি সৃজনের বিবিধ উপাচারে।

হাওর-বাওর-গানের দেশ বৃহত্তর ময়মনসিংহের নেত্রকোণার মোহনগঞ্জের নানাবাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। একই জেলার কেন্দুয়ার কুতুবপুর তার পিতৃভূমি।

পিতার চাকরির সুবাদে হুমায়ূনের শৈশব-কৈশোর কেটেছে বাংলাদেশের বহু স্থানে। সিলেটের মীরাবাজার, চট্টগ্রাম শহর, পিরোজপুরের মনকাড়া প্রকৃতিতে। যেসব কথা তার লেখায় বারবার ফিরে এসেছে।

স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নের স্নাতকোত্তর পাশ করেন তিনি। পিএইচডি ডিগ্রি নেন আমেরিকার থেকে। শুরু করেন অধ্যাপনা।

কিন্তু তার ভাগ্য মিশে ছিল সাহিত্যে। সার্বক্ষণিক লেখালেখি, নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণকে তিনি বেছে নেন। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ও ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসের মাধ্যমে যে লেখক জীবনের সূচনা ঘটে, তা পরিণত হয় বাংলা সাহিত্যের অবিস্মরণীয়-জনপ্রিয় লেখক সত্তায়।

গল্প-উপন্যাসের জাদুকরী ক্ষমতায় অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করেন তিনি। মানুষ লাইন ধরে কেনে তার বই। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি হয় হাজার হাজার কপি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন ঘটনা ছিল অভূতপূর্ব।

আর তিনি ছিলেন মেধা, প্রতিভা ও জনপ্রিয়তার এক বিরল ব্যক্তিত্ব। সমকাল তো বটেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি গড়েছিলেন পাঠকপ্রিয়তার তুঙ্গস্পর্শী রেকর্ড। যে রেকর্ড কারো পক্ষে ভাঙা আদৌ সম্ভব হবে না।

‘অচিনপুর’, ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’, ‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে’, ‘লীলাবতী’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘অচিনপুর’, ‘বাদশাহ নামদার’, ‘দেয়াল’, এমন তিন শতাধিক পাঠকনন্দিত উপন্যাসের রচয়িতা হুমায়ূন আহমেদ বাংলা কথাসাহিত্যে অর্জন করেন নিজস্ব পরিচিতি ও ভূগোল। একা লড়াই করে সাহিত্যের পাঠক সৃষ্টির পাশাপাশি মৃতপ্রায় প্রকাশনাকে বাঁচিয়ে দেন তিনি।

টিভি নাটকেও জনপ্রিয়তার ইতিহাস গড়েন তিনি। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘অয়োময়’, ‘দূরে কোথাও’, এমন হৃদয়ছোঁয়া নাটকের মাধ্যমে ছোটপর্দায় টেনে আনেন হাজার হাজার দর্শক।

চলচ্চিত্র নির্মাণ করেও সোনা ফলিয়েছেন হুমায়ূন। সিনেমাহলমুখী করেছেন মানুষকে। তার নির্মিত ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘ঘেটু পুত্র কমলা’র মতো ছবি বাণিজ্য সফল ও পুরস্কৃত হয়েছে।

নাটক ও চলচ্চিত্রে তিনি লোকবাংলার বহু গান চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার কথা বলেছেন। মানব-মানবীর অন্তর্গত হৃদয়ের দাহ ও বিষাদকে তুলে ধরেছেন অনন্য সুষমায়। তাকে ঘিরে শিল্প, সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্রের এক নান্দনিক জগত উন্মোচিত হয়েছিল।

প্রেম ও রহস্যময় বেদনার প্রতীক নগ্নপদে হলুদপাঞ্জাবির ‘হিমু’ তার অনবদ্য সৃষ্টি। যুক্তিবাদী বিশ্লেষক মিসির আলীর মতো চরিত্রও তিনি সৃষ্টি করেছেন। হুমায়ূনের এই দুই চরিত্রের কথা বাংলা সাহিত্যের পাঠক সহজে ভুলবে না। ভুলবে না এমন আরো অনেক মানবিক চরিত্র ও কাহিনীর নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদকেও।

মুক্তিযুদ্ধের মহান শহীদ, পুলিশ অফিসার বাবার জেষ্ঠ্য সন্তান হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টির পুরোটা জুড়েই আছে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ। হুমায়ূনের উপন্যাস ‘১৯৭১’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘উতল হাওয়া’ এবং চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’ বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের হৃদয়স্পর্শী কাহিনীচিত্র। যুদ্ধাপরাধ, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লেখার পাশাপাশি আন্দোলনও করেছেন তিনি।

প্রেম ও বিরহ হুমায়ূনের লেখার মূল উপজীব্য হলেও তিনি তার লেখায় অপরূপ দক্ষতায় স্পর্শ করেছেন রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক ঘটনাবলি। লেখার মায়াবী টানে তিনি পৌঁছে গেছেন মানুষের নিবিড় সান্নিধ্যে। নীল জোছনায় বেদনাহত একটি তরুণ কিংবা নীলপদ্ম হাতে একটি তরুণীর স্মৃতি-সত্তা পেরিয়ে হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন মানুষের চেতনার গহীন প্রদেশে। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে।

কাঙ্গাল হরিনাথের ১৮৬তম জন্মবার্ষিকী

কাঙ্গাল হরিনাথের ১৮৬তম জন্মবার্ষিকী
ছবি: সংগৃহীত

সাংবাদিকতার পথিকৃৎ, সাহিত্যিক, সমাজসেবক ও নারী জাগরণের অন্যতম দিকপাল কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের ১৮৬তম জন্মদিন আজ শনিবার (২০ জুলাই)। 

কালজয়ী এই সাংবাদিক ১২৪০ সালের ৫ই শ্রাবণ (ইংরেজি ১৮৩৩) কুষ্টিয়া জেলার (তদানীন্তন নদীয়া) কুমারখালী শহরের কুন্ডুপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম হলধর মজুমদার ও মায়ের নাম  কমলিনী দেবী।

হরিনাথ মজুমদার ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। শৈশবেই মাতৃ ও পিতৃহারা হয়ে চরম দারিদ্র্যতার মধ্যদিয়ে বেড়ে উঠেন তিনি। তিনি অত্যাচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে ছিলেন আপসহীন।

তৎকালীন সময়ে তিনি (১৮৫৭ সাল) প্রাচীন জনপদ কুমারখালীর নিভৃত গ্রাম থেকে হাতে লেখা পত্রিকা 'মাসিক গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা' প্রকাশ করেন। গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকায় তিনি ইংরেজ নীলকর, জমিদার ও শোষক শ্রেণির অত্যাচার, জুলুম, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার ও সামাজিক কু-প্রথার বিরুদ্ধে খবর প্রকাশ করেন। হাজারো বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে তিনি পত্রিকাটি প্রায় একযুগ প্রকাশ করেছিলেন।পরবর্তীতে মাসিক থেকে পাক্ষিক এবং ১৮৬৩ সালে সাপ্তাহিক আকারে কলকাতার গিরিশচন্দ্র বিদ্যারত্ন প্রেস থেকে নিয়মিত প্রকাশ করেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/20/1563602039922.jpg
কাঙ্গাল হরিনাথের লেখা পত্রিকা 'মাসিক গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা' 

 

১৮৭৩ সালে কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার তঁর সুহৃদ অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়’র বাবা মথুরনাথ মৈত্রয়’র আর্থিক সহায়তায় কুমারখালীতে এম, এন প্রেস স্থাপন করে, গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’র প্রকাশনা অব্যাহত রাখেন।

কুষ্টিয়ার প্রবীণ সাংবাদিক আবদুর রশীদ চৌধুরী বলেন, সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার ৬৩ বছরে জীবনকালে তিনি সাংবাদিকতা, আধ্যাত্ম সাধন, সাহিত্যচর্চা সহ নানাধরণের সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। মূলত তিনি ছিলেন সাংবাদিকতা পেশার একজন সংগ্রামী মানুষ।

কালজয়ী এই সাংবাদিক জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আজ শনিবার (২০ জুলাই) কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর মিলনায়তনে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/20/1563602126966.jpg
কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর মিলনায়তন

 

কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর য়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন, কুষ্টিয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার সেলিম আলতাফ জর্জ।

বিশেষ অতিথি থাকবেন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সচিব (যুগ্ম সচিব) মোঃ আবদুল মজিদ, কুমারখালী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ আব্দুল মান্নান খান, পৌর সভার মেয়র মোঃ সামছুজ্জামান অরুণ। অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসাবে থাকবেন, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড.আবুল আহসান চৌধুরী।

সাংবাদিক কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার প্রায় ৪০টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তবে বেশিরভাগ অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। তাঁর গ্রন্থগুলোর মধ্যে বিজয় বসন্ত একটি সফল উপন্যাস। গবেষকদের মতে, কাঙ্গাল হরিনাথ রচিত বিজয় বসন্ত উপন্যাসটিই বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম উপন্যাস। 

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/20/1563602157692.jpg
কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর মিলনায়তনের সামনের চিত্র 

 

গ্রামীণ সাংবাদিকতার এবং দরিদ্র কৃষক ও অসহায় সাধারণ মানুষের সুখ-দু:খের একমাত্র অবলম্বন কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের স্মৃতি রক্ষার্থে সরকারি উদ্যোগে কুমারখালীতে সাংবাদিক কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ করা হলেও এখনো অবহেলিত রয়েছে এই কালজয়ী সাংবাদিকের জন্মভিটা (বাস্তুভিটা)।

স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীসহ কবি-সাহিত্যিকদের ভাষ্যমতে, কাঙ্গাল হরিনাথ ব্যবহৃত ও গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’র সেই মুদ্রণ যন্ত্রটি এখনো অযত্ন অবহেলায় অন্ধকার একটি ভাঙা ঘরে পড়ে রয়েছে। তাই অনতিবিলম্বে ঐতিহ্যবাহী এই মুদ্রণ যন্ত্রটি কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘরে স্থানান্তর এবং কাঙ্গালের সমাধিসহ জন্মভিটা (বাস্তুভিটা) সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।  

কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার বাংলা ১৩০৩ সালের ৫ বৈশাখ (ইংরেজি ১৮৯৬ সাল, ১৬ এপ্রিল) নিজ বাড়িতে দেহত্যাগ করেন। 

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র