Alexa

আমরা পারিনি বাংলাদেশ পেরেছে বাংলাকে রক্ষা করতে : নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

আমরা পারিনি বাংলাদেশ পেরেছে বাংলাকে রক্ষা করতে : নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। ছবি সৌজন্য: আনন্দবাজার আর্কাইভ

‘আমরা পারিনি, কিন্তু বাংলাদেশ পেরেছে বাংলাকে রক্ষা করতে’... এই মূল্যবান কথাটি বলেছিলেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।  এই প্রিয় মানুষটির সাথে মাসখানেক আগে তাঁর ...৮৩২ নম্বরে কথা হলো। এবার ফেব্রুয়ারিতে তাঁর ১২২ বাঙুর এভিনিউস্থ ফ্ল্যাটে যাব। দেখা করব। কিন্তু তা আর হলো না! কারণ, ২৫ ডিসেম্বর নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী নিজেই অমলকান্তির মতো রোদ্দুর হয়ে গেলেন!

আমার কলকাতার প্রকাশক বন্ধু মোরশেদ আলি তাঁকে আমার বইটি ‘ফরোমনের গন্ধে নেশাগ্রস্ত প্রজাপতি’ পাঠিয়েছেন। তা পেয়ে বললেন, ‘নামকরণে ভেবেছিলাম এটি কোনো বিজ্ঞান বিষয়ক বই হবে! পরে দেখি কবিতার বই! আমাকে আর পবিত্র বাবুকে উৎসর্গ করেছো! ভালো লেগেছে ধন্যবাদ।’
-    আমারও ভালো লেগেছে।
তারপর বললেন, ‘একটু অপেক্ষা করো। বইটা নিয়ে আসি।’
কাকে যেন ডেকে বললেন, ‘টেবিল থেকে ফরোমনের গন্ধ... বইটা দাও তো।’
-    ‘নামে একটা গন্ধ-ঘ্রাণ-সৌরভ আছে। তোমার ‘দিদিবাড়ি’ কবিতা পড়ে মন খারাপ হয়েছে।’
আমি বললাম, ‘দাদা আপনার কবিতা, আপনার গদ্য পড়ে আমরা বড় হয়েছি। শিখেছি কত কিছু। আমরাই আপনার কাছে ঋণী এবং কৃতজ্ঞ!’
-    তোমার পূর্ব বাংলার মানুষেরা আসলে অনেক বিনয়ী!
-    দাদা, পূর্ব বাংলা না। বাংলাদেশ!
-    হুম। তোমরা ইতিহাসের মানুষ। তাই হবে।
-    পশ্চিমবঙ্গের নাম তো মমতা ব্যানার্জি ‘বাংলা’ রাখতে চেয়েছিল।
-    হুম। তা কেন্দ্রীয় সরকার বাতিল করে দিয়েছে। ভালোই করেছে।
-    আপনি ফরিদপুরের সন্তান।
-    হুম। আমাদের গ্রামের নাম—চান্দ্রা।

খ.
তখন মনে পড়ল প্রথম আলোতে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারের কথা। সেখানে তাঁর বেড়ে ওঠার কথা। আলতাফ শাহনেওয়াজের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার শৈশবের পুরোটাই কেটেছে পূর্ববঙ্গে, ঠাকুরদা আর ঠাকুমার কাছে। ঠাকুরদা কর্মজীবন কাটিয়েছেন কলকাতায়। তিনি একটা কথা প্রায়ই বলতেন যে কলকাতা এমন একটি শহর, যেখানে রুজি-রোজগার, লেখাপড়া ইত্যাকার কারণে যেতে হয় কিন্তু ওখানে থাকতে নেই, থাকার জন্য শ্রেষ্ঠ হলো গ্রাম। বলতেন, আসলে কোনো বড় শহরেই থাকতে হয় না। কারণ, বড় শহরে মানুষের ব্যক্তিত্বের স্ফুরণ হয় না। এই কারণে কর্মজীবন শেষে ৫০ বছর বয়সে কলকাতার পাট চুকিয়ে ঠাকুরদা দেশের বাড়ি চান্দ্রা গ্রামে থিতু হয়েছিলেন। তবে আমার বাবা কলকাতাতেই থাকতেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন, সেখানকার একটি কলেজে ভাইস প্রিন্সিপালও ছিলেন। ফলে কলকাতায় আমাদের একটা বাসাবাড়ি রাখতেই হতো, কোনো উপায় ছিল না। আমার যখন দুই বছর বয়স, আমার মা তখন বাবার কাছে চলে এলেন, কলকাতায়। মা ভেবেছিলেন আমায় নিয়েই কলকাতা যাবেন। কিন্তু ঠাকুরদা-ঠাকুমা ছাড়লেন না আমাকে, তাঁদের সঙ্গে গ্রামেই রইলাম আমি। আমার ঠাকুরদার নাম লোকনাথ চক্রবর্তী। আমরা সবাই নাথ। তাই আমি মজা করে বলি, আমি নাথ বংশের শেষ কবি—রবীন্দ্রনাথ, সুধীন্দ্রনাথ তার পরেই তো নীরেন্দ্রনাথ, তাই না?

তো, যা বলছিলাম, আমার ডাকনাম খোকা। মা মাঝেমধ্যেই আমাকে কলকাতায় পাঠানোর জন্য কান্নাকাটি করে ঠাকুমাকে চিঠি লিখতেন যে খোকাকে তাঁর কাছে পাঠিয়ে দিলে ভালো হয়। তবে গ্রামে আমার ছিল মহা স্বাধীনতা—ইচ্ছেমতো দৌড়ঝাঁপ করছি, যখন তখন গাছে উঠছি; গ্রামে আপন মনে নিজের মতো করে বেড়ে উঠছি। তাই গ্রামের বাড়ি ছেড়ে আসার কোনো ইচ্ছে আমারও ছিল না। এসবই কবি হিসেবে আমাকে তৈরি করেছে। বলতে গেলে এখনো শৈশবকে ভাঙিয়েই লিখে যাচ্ছি আমি। যে কয়েক বছর গ্রামে ছিলাম দেখেছি কখন ধান ওঠে, কিভাবে সেই ধানে মলন দিতে হয়। এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলি, পূর্ববঙ্গে কষ্ট করে বীজতলা তৈরি করতে হয় না, এটা আপনাতেই তৈরি হয়; কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বীজতলা বানাতে হয়। সব মিলিয়ে জীবন-সায়াহ্নে পৌঁছে আজ বলতে চাই, এ জীবনে যা লিখছি, তার পেছনে শৈশবের অবদান অসামান্য। তবে ঠাকুরদার মৃত্যুর পর গ্রাম ছেড়ে আমি কলকাতায় চলে এলাম। খুব কষ্ট হয়েছিল সে সময়।’ (দ্রঃ ‘ছন্দ জানা ভালো কিন্তু ছন্দের দাসবৃত্তি ভালো নয়’/নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। দৈনিক প্রথম আলো, ১১ এপ্রিল ২০১৪, ঢাকা। )

গ.
আমি কথা বলতে বলতে ভাবছিলাম—হ্যাঁ। পূর্ব বাংলার কথা! রবি ঠাকুরের খুলনা, জীবনানন্দের বরিশাল আর নীরেন বাবুর ফরিদপুরের কথা। আসলেই এসব ইতিহাস! দাদার প্রশ্নের আমার তন্ময়তা ভাঙ্গে।
-    তুমি কবে থেকে কানাডায়?
-    ২০০৫ থেকে।
-    কানাডিয়ান হয়ে গেছো?
-    পুরোটা না। অর্ধেক।
-    দ্বৈত নাগরিক। আমাদের মতো। আমরাও জন্মগত বাংলাদেশি। আর আদ্ধেক ভারতীয়!

এ-রকম এলোমেলো কথা হলো। সেদিন তাঁর মনটা বেশ ফুরফুরে ছিল বলে মনে হলো। অনেকক্ষণ আলাপ হলো। ব্যক্তিগত খবর নিলেন। বললাম, ‘দাদা এবার বইমেলায় আসছি। আপনার সাথে দেখা করব।’
-    এসো, এসো। আমিও অপেক্ষায় থাকলাম।
কিন্তু সেই অপেক্ষা দীর্ঘ হতে হতে অনন্তকালের দিকে রোদ্দুর হয়ে চলে গেল!

তিনি ছিলেন ছন্দের মাষ্টার। লিখেছেন—কবিতার কী ও কেন, কবিতার ক্লাশ। কিন্তু ছন্দ সম্পর্কে আবার ভিন্ন কথাও বলেছেন। ছন্দ আসলে সব কিছুতেই আছে। একটা লোক রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে—এর মধ্যে যেমন ছন্দ আছে, তেমনি পাথরে হঠাৎ হোঁচট খেয়ে পা টলে গেল যার—তারও একটা ছন্দ আছে। কথা হলো, প্রথাগত ছন্দটা জেনে রাখা ভালো। কিন্তু এর দাসবৃত্তি করা ভালো নয়।

ঘ.
নানা কারণে তিনি আমার প্রিয় মানুষ, শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। এই নম্র মনের মানুষটির সাথে বেশ কিছু স্মৃতি আছে আমার। কখনো দেখা হয়েছে নিউ ইয়র্কে, কখনো কলকাতায়। কলকাতায় বাংলা আকাদেমীর হল রুমে বাংলাদেশের সত্তর দশকের কবিদের নিয়ে অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথি ছিলেন দুজন মন্ত্রী আর উদ্বোধক ছিলেন কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। উপস্থাপক (সম্ভবতঃ) পংকজ সাহা বললেন, ‘নীরেন দা বসেই বক্তব্য দিবেন।’ তিনি উঠে দাঁড়িয়ে রসিকতা করে বললেন, ‘আমার বয়স মাত্র সত্তর। তাই সত্তর দশকের বন্ধুদের অনুষ্ঠানে এসেছি। সত্তর বলেই কি আমাকে বসিয়ে দেবে? তা হবে না!’

সময়টা ছিল কোনো এক ডিসেম্বরে। আমি আমার বক্তব্যে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা জানালাম। তখন উপস্থাপক বললেন, ‘আমি গত পরশু লন্ডন থেকে এলাম। হিথ্রোতে শুনলাম, বাংলা ঘোষণা! গর্বে বুকটা ভরে গেল!' তখন নীরেন দা তাতে যোগ করলেন, ‘আমরা পারিনি। বাংলাদেশ পেরেছে বাংলাকে রক্ষা করতে। বাংলাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদায় উত্তীর্ণ করতে। সে জন্য আমরা বাংলাদেশের কাছে কৃতজ্ঞ!’

গত ১৯ অক্টোবর ছিল তাঁর জন্মদিন। জন্মদিনে কবিবন্ধু সুবোধ সরকার লিখেছেন—‘আপনি আজ ইতিহাস। আপনি এই উপমহাদেশের কবিতাকে স্বাধীন করেছেন। স্বাধীন করলেই হয় না, খেতে দিয়েছেন। বাংলা কবিতাকে “লিরিকের জেলখানা” থেকে বের করে সর্বসমক্ষে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। নতুন ছন্দ দিয়েছেন, চাবুকের মতো গদ্য দিয়েছেন। ছন্দ নতুন হয় না, ছন্দকে নতুন করে নিতে হয়। সেটাই ম্যাজিক। ৯৪ বছর বয়েসে ভারতবর্ষে আর কেউ কবিতা লেখেননি।... কণ্ঠস্বর মুচড়ে গেছে, কিন্তু মাথা পরিষ্কার। ভাষা আপনাকে ছেড়ে যায়নি, ভাষা যেন এখনো আপনার ভৃত্য এবং ভগবান, দুজনেই কবির নির্দেশ পালন করে চলেছে।’

আমার ‘ফরোমনের গন্ধে নেশাগ্রস্ত প্রজাপতি’ বইটি যৌথভাবে উৎসর্গ করেছি পবিত্র সরকারকে। পবিত্র দা বলেছেন—‘কবিতা-ছড়ার পাশাপাশি তিনি অসাধারণ বাংলা গদ্য লিখতেন। সব মানুষের কাছে হৃদয়গ্রাহী করে কিভাবে কথা বলতে হয়, সেটাও নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী আমাদের শিখিয়ে গিয়েছেন। নির্ভুল এবং নিঁখুত লেখার ভাষা নির্মাণ করতে হলে, অনেক কিছু জানতে হয়। বানান, শব্দের প্রয়োগ ইত্যাদি। কঠিন শব্দকেও কিভাবে সহজের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া যায়, যার ফলে শৈলিতে একটা ঢেউ তৈরি হয়, এটা নীরেনদা ছাড়া সত্যি সত্যি আর কেউ পারতেন না।’ (দ্রঃ দৈনিক আনন্দ বাজার, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৮, কলকাতা)।

দীর্ঘকায় মানুষটির কাজের খতিয়ানও কম দীর্ঘ নয়! এই দুজনের মূল্যায়ন থেকে খুব সহজেই অনুমেয় যে, বাংলা কবিতা এবং ভাষা চর্চায় নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর অবদান অতুলণীয় এবং তা ভোলার নয়!

আপনার মতামত লিখুন :