Barta24

শনিবার, ২০ জুলাই ২০১৯, ৫ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

জীবনের অনুভব ও অনুরণনে শীতের কবিতা

জীবনের অনুভব ও অনুরণনে শীতের কবিতা
অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ
গোলাম কিবরিয়া পিনু


  • Font increase
  • Font Decrease

বছরের পৌষ মাসের শেষে আর মাঘ মাসের প্রথমে সারা দেশের ওপর দিয়ে কোনো কোনো বছর মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়! পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে আসে। কিছু কিছু এলাকার মানুষ ঘরবন্দী হয়ে পড়ে। শীতার্ত মানুষের বিভিন্ন দুর্ভোগও সেইসাথে লেপ্টে থাকে। এরমাঝে আমরা যারা ঢাকায় বসবাস করি, তারাও কনকনে শীত অনুভব করে থাকি। হিমেল বাতাসও কাউকে কাউকে কাবু করে। এমন পরিবেশে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য জায়গায় কবি সম্মেলনে কবিরা ছুটে গিয়ে কবিতা পড়ে। এই সময়টায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বেড়ে যায়, বিভিন্ন পেশার মানুষ তার সুযোগ ও সাধ্য অনুযায়ী বিভিন্ন উৎসবে অংশ নেয়। এমন অবস্থায় আমরা যারা কবিতা লিখি বা পড়ি, তারা তো কবিতা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকি না, কবিতার কণ্ঠলগ্ন থেকে যাই, এই শীতেও।

এই শীতে বেছে বেছে খুঁজে খুঁছে বেশকিছু শীতের কবিতা পড়লাম, আর তা থেকে পাঠস্পৃহার উষ্ণতা পেলাম। এই শীতকে নিয়ে পুরো কবিতা লিখেছেন কোনো কোনো কবি, আবার কোনো কোনো কবি শীতের অনুষঙ্গ টেনে নিয়ে কবিতার কোনো পঙ্ক্তি সাজিয়েছেন। শীতের বর্ণনা ও অনুষঙ্গ পেয়ে যাই বাংলা কবিতার ধারাবাহিকতায়, সেই চর্যাপদের কবি থেকে আজকের তরুণতম কবির কবিতায়।

আমরা তো জানি—বাংলা কবিতা বহু বিষয় নিয়ে লেখা হয়েছে। এই কবিতায় তো মিশে আছে এদেশের মানুষের চৈতন্য-বুদ্ধি-আবেগ-কল্পনা ও বহুবিধ বোধ। আমরা পাঠক হিসেবে খুঁজে পাই জীবনের খণ্ড খণ্ড রূপ, খুঁজে পাই নিজের মুখ এবং দেশ ও প্রকৃতির মুখ।

ঋতুর বৈচিত্র্য একেক দেশে একেকভাবে উন্মুখ হতে দেখা যায়। বাংলাদেশের ঋতু বৈচিত্র্য প্রকৃতির এক স্বকীয়তা নিয়ে আছে। ছয় ঋতুর দেশ এই বাংলাদেশ। একেক ঋতু একেক আবহ ও রূপবৈশিষ্ট্য নিয়ে আমাদের জীবনের সাথে একাকার হয়ে আছে। শীত আমাদের ছয় ঋতুর মধ্যে অন্যতম। হেমন্তের পর বসন্তের আগে শীতের অবস্থান। পৌষ-মাঘ মাস নিয়ে শীত ঋতু আমাদের দিনপঞ্জির হিসেবে থাকলেও—শীত শুরু হয় কিছু আগে ও সমাপ্তিও কিছু পরে হতে দেখা যায়। বসন্ত জাগিয়ে দিয়ে শীত যেন চলে যায়।

শীতে বিভিন্ন রকমের শাকসবজির দেখা মেলে। বন্যার ছোবল থাকে না। নতুন ধানের আনন্দে কৃষক যেন খুঁজে পায় জীবনের সৌন্দর্য। শীত হয়ে ওঠে অন্যান্য ঋতুর চেয়ে আরো বেশি উৎসবলগ্ন। কত রকম পিঠা খাওয়ার ধুম। শীতে পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠান জেগে ওঠে। কোথাও পালাগান, কোথাও যাত্রাগান, কোথাও সাংস্কৃতিক উৎসব ও মেলা। এসব বাংলাদেশের মানুষের সামাজিক ঐকভূমি নিয়ে জীবনকে প্রবহমান রাখছে যুগ যুগ ধরে।

কবিরা তার দেশ, প্রকৃতি ও ঋতু অনুভব করেন—তাদের অনুভূতি দিয়ে, অভিজ্ঞতা  দিয়ে ও প্রজ্ঞা দিয়ে। এ-কারণে কবিতা হয়ে ওঠে শব্দের দ্যোতনায় পাঠকের কাছে সুখপ্রদ ও চৈতন্যআশ্রয়ী এক শিল্প। আমরা যদি আমাদের ঋতুর বৈভব ও বিভিন্ন অনুষঙ্গ অনুভব করতে যাই—তাহলে বাংলা কবিতার কাছে যেতে হবে। আমি এই শীতে বেশকিছু শীতের কবিতার কাছে গিয়ে এক ভিন্ন ভূগোল পেয়েছিলাম, তারই ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন ভূ-ভাগ তুলে ধরছি।

সেই চর্যাপদের এক কবি লিখেছেন :

‘করুণা মেহ নিরন্তর ফরিয়া
ভাবাভাব দুংদুল দুলিআ।’ (কবি ভুসুকুপাদালাম)

আধুনিক বাংলায় রূপান্তর করা  হয়েছে এভাবে :
‘ভাব-অভাবের কুয়াশা দলিত করে করুণা মেঘ
নিরন্তর স্ফুরিত হচ্ছে।’

মধ্যযুগের বাংলা কবিতায় শীতের ব্যঞ্জনা পাই এভাবে :
‘শিশিরক অন্তরে আওয়ে বসন্ত।’

এখনকার বাংলায় তা হয়ে এমন :
‘শীতকালের পর বসন্ত আসে।’

‘চণ্ডিমঙ্গল’ কাব্যে কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী লিখেছেন শীতসময়ের  কথা, যেমন :
‘শুনো দুঃখের কাহিনী শুনো দুঃখের কাহিনী
পুরান দোপাটা গায়ে দিতে করি পানি
পউষে প্রবল শীত সুখী যগজন।
তুলি পাড়ি পাছড়ি শীতের নিবারণ
হরিণী বদলে পাই পুরান খোসলা।’

মাইকেল মধুসূদন দত্ত-র ‘মেঘনাদবধ’ কাব্যে খুঁজে পাই এক ভিন্নমাত্রার শীতের কাব্য-সুষমা :
‘আলু থালু হায়, তবে কবরীবন্ধন!
আভরণহীণ দেহ, হিমানীতে যথা
কুসুমরতন-হীন  বন-সুশোভিনী
লতা!’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় বাংলাদেশের বিভিন্ন ঋতুর অনুষঙ্গ এসেছে বৈচিত্র্যের সাথে। বাংলাদেশের প্রকৃতির বন্দনা তাঁর কবিতায় বিভিন্নভাবে প্রাণ পেয়েছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘চিত্রা’ কাব্যগ্রন্থের ‘সিন্ধুপারে’ কবিতায় লিখেছেন :
‘পউষ প্রখরে শীতে জর্জর, ঝিল্লিমুখর রাতি
নিদ্রিত পুরী, নির্জন ঘর, নির্বাণদীপ বাতি।’

কিংবা ‘শীতে ও বসন্তে’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ শীতের স্পর্শমান কাঁপুনির কথা বলেছেন, এভাবে :
‘প্রথম শীতের মাসে
শিশির লাগিল ঘাসে,
হু হু করে হাওয়া আসে,
       হি হি করে কাঁপে গাত্র।

কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় :
‘পউষ এলো গো!
পউষ এলো অশু-পাথার হিম-পারাবার পারায়ে।
ঐ যে এলো গো—
কুজ্ঝটিকায় ঘোমটা-পরা দিগন্তরে দাঁড়ায়ে।’

শীতের কত কবিতা লিখেছেন কবিরা, ভিন্নভিন্ন আদলে, আঙ্গিকে ও বোধভাষ্যি নিয়ে। বিষ্ণু দে-র কবিতায় প্রতীকী ব্যঞ্জনায় শীতের শব্দমালা পায় ভিন্নমাত্রা :
‘হিমের হাওয়া বয়ে তো গেল
                      দোঁহার মাঝে।
নীলোৎপল হয়েছে আজ কাঠগোলাপ।’

জীবনানন্দ দাশের কবিতায় শীতের কুয়াশা, রোদ, শিশির, ভেজাঘাস আরো অনেক শীতের অনুষঙ্গ বিভিন্নভাবে এসেছে, যা অন্য কবিদের কবিতায় ততটা দেখা যায় না। জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতায় আমরা পাই এমন পঙ্ক্তি :
‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;’

তাঁর ‘শঙ্খমালা’ কবিতায় উপমা নিয়ে শীত :
‘বেতের ফলের মতো নীলাভ ব্যথিত তোমার দুই চোখ
খুঁজেছি নক্ষত্রে আমি—কুয়াশার পাখনায়—’

কবি সমর সেনের কবিতায় নগরজীবন রয়েছে এক মূল বিষয় হিসেবে, আর সেই জীবনের ক্লান্তি, বেদনাহত ক্লেদ ও বিভিন্ন অনুষঙ্গ এসেছে। একই পাটাতনে লেখা তার ‘মৃত্যু’ নামের কবিতাটি :
‘সূর্য অস্ত গেল, সূর্যদেব কোন দেশে—
এখানে সন্ধ্যা নামল,
শীতের আকাশে অন্ধকার ঝুলছে শূকরের চামড়ার মতো,
গলিতে গলিতে কেরোসিনের তীব্র গন্ধ
হাওয়ায় ওড়ে শুধু শেষহীন ধূলোর ঝড়;
এখানে সন্ধ্যা নামল শীতের শকুনের মতো।’

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য শোষণ ও শৃঙ্খল-মুক্তির দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শ্রমজীবী মানুষের সংবেদনায় কবিতা লিখেছেন, তারই প্রতিভাস ‘প্রার্থী’ নামক কবিতায় :
‘হে সূর্য! শীতের সূর্য!
হিম শীতল সুদীর্ঘ রাত তোমার প্রতীক্ষায়
                       আমরা থাকি
যেমন প্রতীক্ষা করে থাকে কৃষকের চঞ্চল চোখ
                         ধান কাটার রোমাঞ্চকর দিনগুলির জন্য।’

আর কবি শামসুর রাহমানের কবিতায় এসে শীতের অস্তিত্ব পাই অন্য এক অনুভবে :
‘একদার কুয়াশায় লীন কোনো পৌষের হিমেল
রাত আজো অস্তিত্বের গীর্জের চূড়োয়
ঝরায় শিশির কণা।’
(শীতরাত্রির সংলাপ)

কবি আহসান হাবীব তাঁর ‘শীতের সকাল’ কবিতায় এক ভিন্ন চিত্রকল্পে শীতের ছবি টেনে এনেছেন :
‘রাত্রিশেষ!
কুয়াশায় ক্লান্ত শীতের সকাল—
পাতার ঝরোকা খুলে ডানা ঝাড়ে ক্লান্ত হরিয়াল।’

কবি শহীদ কাদরী শীতের শব্দ টেনে এনে মানবিকতার বন্ধনকে কবিতায় প্রাণ দিতে কুণ্ঠিত হন না, বরং সামাজিক জীবনকে সংহত করার জন্য কাব্যশক্তিকে অভিজ্ঞতায় ও কাব্য-সুষমায় উজ্জ্বল করেন :
‘অথচ এ-শীতে একা, উদ্ধত আমি,
আমি শুধু পোহাই না ম্লান রোদ
...
নিয়ত উত্তাপ দেই বন্ধু পরিজনে।’
(এইশীতে)

শীতের সময়ে উল্লিখিত কবিসহ অন্যান্য কবিদের শীতের কবিতা পড়তে পড়তে মনে হয়—কী এক জাদুকরী প্রতিভাসে শীতের অনুষঙ্গ টেনে এনেছেন কবিরা, কাব্যের শিল্পশর্তে কবিতাকে করেছেন সমৃদ্ধ, আর তা থেকে পাঠক হিসেবে আমরা বিভিন্ন বোধের সাজুয্যে পেয়ে যাই আমাদের শীত, স্বদেশ ও জীবন।

আপনার মতামত লিখুন :

হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে

হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে
হুমায়ূন আহমেদ

 

তিনি বলেছিলেন, তার মৃত্যুতে কেউ যেন না কাঁদে। বিষাদ কণ্ঠে গেয়েছিলেন গান, ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায় রে জাদু ধন। মরিলে কান্দিস না আমার দায়।’

কিন্তু সাত বছর আগে সুদূর আমেরিকায় তিনি যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন পুরো বাংলাদেশ কেঁদেছিল তার জন্য। শুধু সেদিনই নয়, বাংলা সাহিত্যের ভক্ত-অনুরাগীরা প্রতিটি দিনই তাকে স্মরণ করেন। তার কথা ভাবেন। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে।

১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর জন্ম নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন ২০১২ সালের ১৯ জুলাই। জীবনের প্রতিটি দিন তিনি ছিলেন সৃষ্টিশীল ও কর্মমুখর। জীবনকে উপভোগ করেছেন তিনি সৃজনের বিবিধ উপাচারে।

হাওর-বাওর-গানের দেশ বৃহত্তর ময়মনসিংহের নেত্রকোণার মোহনগঞ্জের নানাবাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। একই জেলার কেন্দুয়ার কুতুবপুর তার পিতৃভূমি।

পিতার চাকরির সুবাদে হুমায়ূনের শৈশব-কৈশোর কেটেছে বাংলাদেশের বহু স্থানে। সিলেটের মীরাবাজার, চট্টগ্রাম শহর, পিরোজপুরের মনকাড়া প্রকৃতিতে। যেসব কথা তার লেখায় বারবার ফিরে এসেছে।

স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নের স্নাতকোত্তর পাশ করেন তিনি। পিএইচডি ডিগ্রি নেন আমেরিকার থেকে। শুরু করেন অধ্যাপনা।

কিন্তু তার ভাগ্য মিশে ছিল সাহিত্যে। সার্বক্ষণিক লেখালেখি, নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণকে তিনি বেছে নেন। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ও ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসের মাধ্যমে যে লেখক জীবনের সূচনা ঘটে, তা পরিণত হয় বাংলা সাহিত্যের অবিস্মরণীয়-জনপ্রিয় লেখক সত্তায়।

গল্প-উপন্যাসের জাদুকরী ক্ষমতায় অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করেন তিনি। মানুষ লাইন ধরে কেনে তার বই। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি হয় হাজার হাজার কপি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন ঘটনা ছিল অভূতপূর্ব।

আর তিনি ছিলেন মেধা, প্রতিভা ও জনপ্রিয়তার এক বিরল ব্যক্তিত্ব। সমকাল তো বটেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি গড়েছিলেন পাঠকপ্রিয়তার তুঙ্গস্পর্শী রেকর্ড। যে রেকর্ড কারো পক্ষে ভাঙা আদৌ সম্ভব হবে না।

‘অচিনপুর’, ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’, ‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে’, ‘লীলাবতী’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘অচিনপুর’, ‘বাদশাহ নামদার’, ‘দেয়াল’, এমন তিন শতাধিক পাঠকনন্দিত উপন্যাসের রচয়িতা হুমায়ূন আহমেদ বাংলা কথাসাহিত্যে অর্জন করেন নিজস্ব পরিচিতি ও ভূগোল। একা লড়াই করে সাহিত্যের পাঠক সৃষ্টির পাশাপাশি মৃতপ্রায় প্রকাশনাকে বাঁচিয়ে দেন তিনি।

টিভি নাটকেও জনপ্রিয়তার ইতিহাস গড়েন তিনি। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘অয়োময়’, ‘দূরে কোথাও’, এমন হৃদয়ছোঁয়া নাটকের মাধ্যমে ছোটপর্দায় টেনে আনেন হাজার হাজার দর্শক।

চলচ্চিত্র নির্মাণ করেও সোনা ফলিয়েছেন হুমায়ূন। সিনেমাহলমুখী করেছেন মানুষকে। তার নির্মিত ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘ঘেটু পুত্র কমলা’র মতো ছবি বাণিজ্য সফল ও পুরস্কৃত হয়েছে।

নাটক ও চলচ্চিত্রে তিনি লোকবাংলার বহু গান চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার কথা বলেছেন। মানব-মানবীর অন্তর্গত হৃদয়ের দাহ ও বিষাদকে তুলে ধরেছেন অনন্য সুষমায়। তাকে ঘিরে শিল্প, সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্রের এক নান্দনিক জগত উন্মোচিত হয়েছিল।

প্রেম ও রহস্যময় বেদনার প্রতীক নগ্নপদে হলুদপাঞ্জাবির ‘হিমু’ তার অনবদ্য সৃষ্টি। যুক্তিবাদী বিশ্লেষক মিসির আলীর মতো চরিত্রও তিনি সৃষ্টি করেছেন। হুমায়ূনের এই দুই চরিত্রের কথা বাংলা সাহিত্যের পাঠক সহজে ভুলবে না। ভুলবে না এমন আরো অনেক মানবিক চরিত্র ও কাহিনীর নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদকেও।

মুক্তিযুদ্ধের মহান শহীদ, পুলিশ অফিসার বাবার জেষ্ঠ্য সন্তান হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টির পুরোটা জুড়েই আছে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ। হুমায়ূনের উপন্যাস ‘১৯৭১’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘উতল হাওয়া’ এবং চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’ বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের হৃদয়স্পর্শী কাহিনীচিত্র। যুদ্ধাপরাধ, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লেখার পাশাপাশি আন্দোলনও করেছেন তিনি।

প্রেম ও বিরহ হুমায়ূনের লেখার মূল উপজীব্য হলেও তিনি তার লেখায় অপরূপ দক্ষতায় স্পর্শ করেছেন রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক ঘটনাবলি। লেখার মায়াবী টানে তিনি পৌঁছে গেছেন মানুষের নিবিড় সান্নিধ্যে। নীল জোছনায় বেদনাহত একটি তরুণ কিংবা নীলপদ্ম হাতে একটি তরুণীর স্মৃতি-সত্তা পেরিয়ে হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন মানুষের চেতনার গহীন প্রদেশে। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে।

কাঙ্গাল হরিনাথের ১৮৬তম জন্মবার্ষিকী

কাঙ্গাল হরিনাথের ১৮৬তম জন্মবার্ষিকী
ছবি: সংগৃহীত

সাংবাদিকতার পথিকৃৎ, সাহিত্যিক, সমাজসেবক ও নারী জাগরণের অন্যতম দিকপাল কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের ১৮৬তম জন্মদিন আজ শনিবার (২০ জুলাই)। 

কালজয়ী এই সাংবাদিক ১২৪০ সালের ৫ই শ্রাবণ (ইংরেজি ১৮৩৩) কুষ্টিয়া জেলার (তদানীন্তন নদীয়া) কুমারখালী শহরের কুন্ডুপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম হলধর মজুমদার ও মায়ের নাম  কমলিনী দেবী।

হরিনাথ মজুমদার ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। শৈশবেই মাতৃ ও পিতৃহারা হয়ে চরম দারিদ্র্যতার মধ্যদিয়ে বেড়ে উঠেন তিনি। তিনি অত্যাচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে ছিলেন আপসহীন।

তৎকালীন সময়ে তিনি (১৮৫৭ সাল) প্রাচীন জনপদ কুমারখালীর নিভৃত গ্রাম থেকে হাতে লেখা পত্রিকা 'মাসিক গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা' প্রকাশ করেন। গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকায় তিনি ইংরেজ নীলকর, জমিদার ও শোষক শ্রেণির অত্যাচার, জুলুম, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার ও সামাজিক কু-প্রথার বিরুদ্ধে খবর প্রকাশ করেন। হাজারো বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে তিনি পত্রিকাটি প্রায় একযুগ প্রকাশ করেছিলেন।পরবর্তীতে মাসিক থেকে পাক্ষিক এবং ১৮৬৩ সালে সাপ্তাহিক আকারে কলকাতার গিরিশচন্দ্র বিদ্যারত্ন প্রেস থেকে নিয়মিত প্রকাশ করেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/20/1563602039922.jpg
কাঙ্গাল হরিনাথের লেখা পত্রিকা 'মাসিক গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা' 

 

১৮৭৩ সালে কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার তঁর সুহৃদ অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়’র বাবা মথুরনাথ মৈত্রয়’র আর্থিক সহায়তায় কুমারখালীতে এম, এন প্রেস স্থাপন করে, গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’র প্রকাশনা অব্যাহত রাখেন।

কুষ্টিয়ার প্রবীণ সাংবাদিক আবদুর রশীদ চৌধুরী বলেন, সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার ৬৩ বছরে জীবনকালে তিনি সাংবাদিকতা, আধ্যাত্ম সাধন, সাহিত্যচর্চা সহ নানাধরণের সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। মূলত তিনি ছিলেন সাংবাদিকতা পেশার একজন সংগ্রামী মানুষ।

কালজয়ী এই সাংবাদিক জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আজ শনিবার (২০ জুলাই) কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর মিলনায়তনে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/20/1563602126966.jpg
কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর মিলনায়তন

 

কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর য়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন, কুষ্টিয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার সেলিম আলতাফ জর্জ।

বিশেষ অতিথি থাকবেন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সচিব (যুগ্ম সচিব) মোঃ আবদুল মজিদ, কুমারখালী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ আব্দুল মান্নান খান, পৌর সভার মেয়র মোঃ সামছুজ্জামান অরুণ। অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসাবে থাকবেন, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড.আবুল আহসান চৌধুরী।

সাংবাদিক কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার প্রায় ৪০টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তবে বেশিরভাগ অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। তাঁর গ্রন্থগুলোর মধ্যে বিজয় বসন্ত একটি সফল উপন্যাস। গবেষকদের মতে, কাঙ্গাল হরিনাথ রচিত বিজয় বসন্ত উপন্যাসটিই বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম উপন্যাস। 

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/20/1563602157692.jpg
কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর মিলনায়তনের সামনের চিত্র 

 

গ্রামীণ সাংবাদিকতার এবং দরিদ্র কৃষক ও অসহায় সাধারণ মানুষের সুখ-দু:খের একমাত্র অবলম্বন কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের স্মৃতি রক্ষার্থে সরকারি উদ্যোগে কুমারখালীতে সাংবাদিক কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ করা হলেও এখনো অবহেলিত রয়েছে এই কালজয়ী সাংবাদিকের জন্মভিটা (বাস্তুভিটা)।

স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীসহ কবি-সাহিত্যিকদের ভাষ্যমতে, কাঙ্গাল হরিনাথ ব্যবহৃত ও গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’র সেই মুদ্রণ যন্ত্রটি এখনো অযত্ন অবহেলায় অন্ধকার একটি ভাঙা ঘরে পড়ে রয়েছে। তাই অনতিবিলম্বে ঐতিহ্যবাহী এই মুদ্রণ যন্ত্রটি কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘরে স্থানান্তর এবং কাঙ্গালের সমাধিসহ জন্মভিটা (বাস্তুভিটা) সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।  

কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার বাংলা ১৩০৩ সালের ৫ বৈশাখ (ইংরেজি ১৮৯৬ সাল, ১৬ এপ্রিল) নিজ বাড়িতে দেহত্যাগ করেন। 

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র