Barta24

বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০১৯, ৩ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

সার্টিফিকেট

সার্টিফিকেট
অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ
তুষার আবদুল্লাহ


  • Font increase
  • Font Decrease

ফটো গ্যালারিতে হন্যে হয়ে খুঁজেও ছবিগুলো পাওয়া গেল না। নাকি আছে। এমন কোনো কোনো দিন হয়, প্রয়োজনের সময় খুঁজে পাওয়া যায় না। পরে গ্যালারিতে ঢুঁ দিলে প্রথমেই সেই ছবি ভেসে ওঠে। আজকের ব্যাপারটাও হয়তো তাই। ছবি খুঁজতে গিয়ে আইফোনের চার্জও ফুরিয়ে গেছে। মামুন হোসেন উঠে গিয়ে আইফোন চার্জে দিল। চার বছর হলো ডিএসএলআর ক্যামেরা হাতে তুলে নেন না তিনি। আইফোনের ক্যামেরাই সর্বক্ষণের সঙ্গী। ক্যানন মার্ক থ্রি পর্যন্ত ব্যবহার করেছেন। এখন ডিএসএলআরের স্বাদ আর ভালো লাগে না। লেন্স-বডি নিয়ে চলাচলের শক্তিটাও বুঝি ফুরিয়ে গেছে। শরীরের না মনের শক্তি। তাই তো শহর ছেড়ে আসা। ডামাডোলের বাইরে। কত মুখ ল্যান্সে ধরা পড়েছে, সবাইকে সামনে আনতে পারেননি। ডার্করুমেই মৃত্যু। ডিজিটাল যুগে এসে হার্ডডিস্কে বন্দী। মামুন হোসেন চাইলেই তো হবে না, পত্রিকার সম্পাদক, মালিকের চাওয়াটাই বড়। কখন কাকে সামনে নিয়ে আসবেন, তা তো তাদের বাণিজ্য-ভাবনা। বাজার দেখে মুখ তুলে আনা। কিংবা নিজের মতো করে বাজারে মুখ ছেড়ে দেওয়া। মামুন হোসেনকে এমন অনেক মুখের ছবি তুলতে হয়েছে। মন চায়নি, চোখ চায়নি। চোখ দেখেওনি। ল্যান্স যতটুকু দেখেছে, তাতেই বাজিমাত। চোখ দেখলে যে কী হতো!

আইফোনের ক্যামেরা অপশন নিয়ে মামুন হোসেনের দিন কাটে। কতভাবেই না ছবি তোলা যায় মুঠোতে মুখ গুঁজে থাকা এই ডিভাইস দিয়ে। বিস্ময়। সত্যি প্রতিমুহূর্তে তিনি বিস্মিত হন। গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ানোর সময় মানুষের মুখ, সবুজ কোনো পাতার করতলে জায়গা পাওয়া রোদ, একাকী মেঠোপথে ঝ’রে পড়া বৃষ্টি, কোনো কিছুই মামুন হোসেনের চোখ এড়ায় না। আইফোনের ল্যান্সেরও যেন পলক পড়ে না। মামুন হোসেনের কখনো মনে হয় রসুল্লাবাদ দিয়ে যখন তিনি হেঁটে যাচ্ছিলেন। কাঁধে রাইফেল। সঙ্গীরা তার পেছনে। এমন একটি ছবি যদি তোলা থাকত। রণাঙ্গনে অনেকের হাতেই ক্যামেরা ছিল। মামুন হোসেনের সঙ্গে ছিল একটা। কিন্তু নবীনগরে এক অপারেশন শেষে ওই ক্যামেরা আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। হারিয়ে গেছে ফিল্মগুলোও। গঙ্গা সাগর ব্রিজ উড়িয়ে দেবার অপারেশনের কিছু ছবি তোলা ছিল। আখাউরা রেলস্টেশন, গোকর্ণঘাট অপারেশনের ছবিও মামুন হোসেনের কাছে ছিল। আজ এই ছবিগুলো ইতিহাসের দলিল হয়ে থাকত। শ্যামগ্রাম স্কুলে কাটানো কয়েকটি রাতেও কথা আজও ভুলতে পারেনি মামুন হোসেন। রাতভর লোকমানের গান। চারুমিঞার পুঁথি। রওশন সকালে সন্ধ্যায় বানিয়ে নিয়ে আসত গুড়ের চা। হারিকেনের আলোয় সেই রাতগুলো পূর্ণিমা হয়ে উঠত গ্রামবাসী আর মুক্তিসেনাদের আড্ডায়।

একটি মুখ মনে পড়ে মামুন হোসেনের। মনে পড়ে বলা বুঝি ঠিক হলো না। সব সময় মুখটি তার সঙ্গে চলছে সেই একাত্তর থেকে। শ্যামগ্রামেই পরিচয়। অনিমা গোস্বামী। ওদের বাড়িতে প্রায় রাতেই খাবারের আয়োজন হতো। অনিমা এসে দাওয়াত দিয়ে যেত। খাবারের চেয়েও মামুন হোসেনের লোভ ছিল অনিমার গানের প্রতি। রবীন্দ্র-সংগীত প্রাণ দিয়ে গাইতো ও। শাহপুরে যেদিন হানাদার বাহিনী হামলা করে, সেদিন শ্যামগ্রাম জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। যদি হানাদার বাহিনী এই গ্রামে এসে হাজির হয়। গ্রাম-ভর্তি হিন্দুদের ঘরবাড়ি। এ-গ্রামের তিন চারটি পরিবার মেঘনা পাড়ি দিয়ে  ভৈরব হয়ে আগরতলার দিকে চলে গেছে। বাকিরা যাননি। মামুনদের দলটি শ্যামগ্রাম আসার পর এখানে দীর্ঘ সময় অবস্থান নেওয়ার কারণ হিন্দু পরিবারগুলোকে রক্ষা করা। শ্যামগ্রামের চারদিক ঘিরে তারা পাহাড়ায়। এদিকে কোনো সড়ক পথ নেই। আসতে হলে জলপথে আসতে হবে হানাদার  বাহিনীকে। সেইদিক থেকে শ্যামগ্রাম অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। হানাদার বাহিনী হুট করে চলে আসতে পারবে না। তবে সেপ্টেম্বরে মামুন হোসেনসহ চারজনকে শ্যামগ্রাম ছেড়ে যেতেই হয়।

হোমনায় যেতে হয় তাদের। যেদিন শ্যামগ্রাম ছেড়ে যাবেন মামুন হোসেনরা, সেদিন পুরনো মঠে অনিমা ডেকে নিয়ে গেছিল মামুন হোসেনকে। অমাবশ্যা রাতে আলো ছড়াচ্ছিল অনিমা। অনিমার আলোয় পথ দেখে চলছিল মামুন হোসেন। পুরনো মঠের ভেতরে ঢুকে অনেকক্ষণ মামুন হোসেনের হাত ধরে দাঁড়িয়েছিল অনিমা। অনেকক্ষণ পর মুখ ফুটে বলে—যাচ্ছো তাহলে? মামুন হোসেন কাঁধ ঝাঁকায়। অনিমা মেহেদী পাতা বেটে এনেছিল। মামুন হোসেনের ডানহাতের করতলে ‘অ’ এঁকে দিয়ে বলে—যাও। সঙ্গে রেখো আমাকে। ওই ‘অ’ কবেই মুছে গেছে। কিন্তু অনিমার মুখটি তো এক মুহূর্তের জন্য আড়াল হলো না।

যুদ্ধের পরে যখন ক্যামেরা হাতে তুলে নিলেন, তারপর তো কম রমণীকে লেন্সে আটকাতে হয়নি। মামুন হোসেনের প্রতিবারই মনে হয়েছে, এখনো হয়-তিনি অনিমা গোস্বামীর ছবিই তুলে যাচ্ছেন। এত বছরে অনিমা এতটুকু বদলে যায়নি। ঠিক আগের মতোই আছে। কপালের টিপ আছে তেমনই। অনিমার কপালে বাংলাদেশ। মামুন হোসেন এমনটাই বিশ্বাস করেন। অনিমার সবুজ কপালে লাল টিপ। যখন কোথাও পতাকা ওড়ে, মামুন হোসেন পতাকা নয় দেখতে পান অনিমাকে। জুলাইর কোনো একদিন বটেশ্বরী গ্রামে যেতে হয়েছিল। বিশেষ কোনো কাজে নয়। নীল কমল দেখতে। কতদিন নীল কমল দেখা হয় না । মামুন হোসেনের ঢাকার বাড়ির ছাদে অপরাজিতা ও নীলকমল ভাই-বোনের মতো ফুটে থাকত। জলপুর এবং আশপাশের গ্রামে তাল আর খেজুর গাছ। উঠোনে ফুল ফোটে, ঝুমকো  ও লাল জবা আর মাধবীলতার বাইরে খুব বেশি ফুল দেখা যায় না। বনফুল তো আছেই। ফড়িং দেখতে গেলে বনফুলও দেখা হয়ে যায়। কয়েকদিন খুব নীলকমল দেখতে ইচ্ছে করছিল। তাই বটেশ্বরীতে যাওয়া। বিকেলে ফিরে আসার সময় বিহগলের সুর কানে আসে। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, গ্রামের একজন মুক্তিযোদ্ধা মারা গেছেন। তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানিয়ে বিদায় জানানো হচ্ছে। মামুন হোসেন পৌঁছানোর আগেই আনুষ্ঠানিকতা শেষ। কিন্তু মরদেহের ওপর বিছানো জাতীয় পতাকার দিকে স্থির হয়ে যায় তাঁর চোখ। আইফোনে কয়েকটি ছবি তুলে নেন। মামুন হোসেনের কাছে এ এক অপূর্ব ছবি। মরদেহ ঢেকে আছে বাংলাদেশে। মরদেহ ঢেকে আছে অনিমায়। মামুন হোসেনের চোখ জলে ভেসে যায়। কেউ একজন পাশ থেকে হয়তো বলল—আপনার চেনা মানুষ, কিছু লাগত? মামুন হোসেন কিছু বলেন না। ওই ময়দান থেকে সরে আসেন। বাজারে এসে চায়ের দোকানে বসেন। এদিকে এলে গরুর দুধের চা খাওয়া মামুনের হোসেনের সখ। চিনি ছাড়াই খান। মাঝে মধ্যে অবশ্য গুড়ের জিলিপিও চলে। আজ মন কেন যেন সায় দিচ্ছে না কিছু খেতে। তারপরও দুধ চিনি ছাড়া চা-ই নিলেন আজ।

মামুন হোসেনের সামনের টেবিলগুলো ফাঁকা। টিনের একটা গ্লাস, পুরনো দিনের একটা কাপ রাখা সামনের টেবিলে। তাদের ডিঙিয়ে চোখ চলে যায় মাঠের সরিষা ফুলের দিকে। আইফোনে এভাবেই ছবিটা ধরতে চাইলেন। কিন্তু ফ্রেমের ভেতর একটা মুখ ঢুকে পড়ল। মামুন হোসেনের চোখে বিরক্তি দেখে মুখটি হেসে বলতে থাকে—আমি এমনই বেহুদা ঢুইকা পড়ি। আবার তুলেন। আর ঢুকব না কেউ। মামুন হোসেন এবার ঠিকঠাকমতো ছবি নিতে পারলেন। সেই মুখ জগ থেকে পানি ঢেলে দুইগ্লাস খেয়ে নিলেন। তারপর মামুন হোসেনের দিকে তাকিয়ে বলেন—সবাই স্যালুট দিতে গেছিল ভাই। আমি দূর থিকা দেখলাম। মুক্তিযোদ্ধারে স্যালুট দিল। লাশ পতাকা দিয়া ঢাকল। আমার মুখে একটা প্রশ্ন আসছিল কাউকে বলতে পারলাম না। চলে আসলাম। পানি দিয়া প্রশ্ন গিলা ফেললাম। মামুন হোসেন উঠে পড়েন। দোকান থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে থেমে যান। ফিরে এসে ওই মুখটির কাছে জানতে চান—কোন প্রশ্ন গিলে ফেললেন আপনি? মুখটি সন্দেহ নিয়ে তাকায় মামুন হোসেনের দিকে। তারপর বলেন—ও কবে যুদ্ধে গেল? ও তো গ্রামে বইয়া বিয়া করল আর মুদির দোকান চালাইল পুরা যুদ্ধের বছর। পেছন থেকে একজন বললেন—ওর তো সার্টিফিকেট আছে। রেগে যায় মুখ—রিলিফের মতো সার্টিফিকেট বিক্রি হয় নাই, তোমরা জানো না? মামুন হোসেন দোকান থেকে নেমে আসেন। ফেরার পথে রিকশা ভ্যান নিলেন না। হাঁটতে থাকেন। যতদূর হেঁটে যাওয়া যায়। পৌষের বিকেলের বাতাস শরীরে ভালোই আদর দিচ্ছে। মামুন হোসেন দেখতে পান পতাকায় মোড়া মরদেহ গোরস্তানের দিকে যাচ্ছে। তিনি সামনের পথ দেখতে পাচ্ছেন না। শুধু শুনতে পাচ্ছেন চারদিকে বিহগল বাজছে। সজ্জিত পুলিশের দল তাঁকে স্যালুট দেওয়ার জন্য তৈরি। হঠাৎ শোরগোল উঠল। ফিসফিসানি—মামুন হোসেনের সার্টিফিকেট নাই। গোরস্তানের দিকে উন্মুক্ত খাটিয়ায় যেতে যেতে মামুন হোসেন দেখতে পাচ্ছেন—সজ্জিত পুলিশের দল বিহগল নিয়ে চুপিচুপি পালিয়ে যাচ্ছে। ওদের পালিয়ে যাওয়া দেখে  মামুন হোসেনের সেকি অট্টহাসি। গোরস্তান গেইট থেকে কবরে পৌঁছাতে  সজনে পাতায় ঢেকে যায় মামুন হোসেনের শব।

আপনার মতামত লিখুন :

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

আরো হাঁস

এইরূপ কান্দে কন্যা নিরালা বসিয়া
হাঁসের লাগিয়া কন্যা ধুড়িল শহর

কান আশে হইছে বিয়া স্বপ্নের ভিতর
ঘটকালি করে আপন মামতো ভাই

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর
কারা পানখিলি খাইয়া গপ মারে তাই

সজিনার তলে বসি কান্দিল তামাম
এর কিবা মানে শুন কান খাড়া করি
চিক চিক করে মনে এ বিয়ার জরি।

হেমন্তের হাঁস

আমার হয়নি ধোয়া ওগো শিশিরের তলে
আমার হয়নি নাচা মিশি যাওয়া ঊর্মিদলে।

আমার মিটিনি নেশা অলিকোলে শোয়া বাকি
আমায় ঢালিনি মৌন নূর বধির জোনাকি!

আমারে চিনিয়া চিনে নাই হেমন্তের হাঁস
আমার পানের পাত্রে বাদ গেছে শ্যামা ঘাস।

আমার ইউসুফ শোনে নাই ভাইদের শোকর
বকুল তলায় আসি হাঁপায় প্রকৃত ভোর।

হাঁসের জলেরা

হাঁসের পায়ের জল
শুকায়, তাই তারা ফের জলে নামে।
একটা কথা আমি ভুলি যাই
হাঁসের কোনো ইচ্ছা নাই।
হাঁসের জলে আমি ভাসি
হাঁসের পায়ের জলে
আমি মুখ ধুইছি,
আমার নিজের মুখ কেন মোর যেনতেন মোকাম ন রে!
আমার চোখে এই ফেরেবি জল ধরা দেয়
যেন বখিল আমি তার কিছু নির্ভরতাময় তর্জমা করি!
দাদি যেই ছাড়ে হাঁস
তারা আমার মরা দাদির জইফ হাঁস!
স্বপ্ন তারা আমার নিকট
তাদের নিকট
আমি তেমন বাস্তব ন রে!

এই বাড়িতে

দেয়ালের পর কাঠবিড়ালির দৌড় দেখি
যেন রইদ নাকফুল হয়,
তারপর সারা সকালটা গড়ায় দেয়াল ধরি,
একটা দোয়েল ডিম জারি হইলে
অনেক দোয়েল চিল্লায়ে ধরে বা গান,
একদিন আসে আসে করি শেষে আসে,
তারার মতন গোল চোখ ঘুঘু তার
চোখের বর্ডার আলতার রঙ পাছে
পায়ের রঙের সাথে মিশিবার চায়,
এ বাড়িতে আসি যেই হাঁসগুলি দুলি দুলি ও বাড়ি ত যায়,
ওদের ঘ্রাণের ভিতর ঘুরি ঘুরি থামি,
বাতাস হবেনে আসল শরিক
আডিয়াকলার ঝাড়ের নিকটে আসি,
আমি শুনি জলের মর্মর কলপাড়ে তড়পায়,
তারে ঢাকিবার আরো মিহি ধ্বনি আছে
এ বাড়ির অনেক অ-বাক কণ্ঠস্বর আছে!


প্রত্যাবর্তনের লজ্জা
(কবি আল মাহমুদকে)

ভাইয়ের ডাক শুনি উঠি রাতদুপারে স্বপ্নের ভিতর। যেন
বাতাসের ডাক শুনি ঢেউ উঠে তৎপর।
দেখি আব্বা আগেই উঠছেন, নিজ হাতে আতাফল, গাছপাকা তরমুজ
পরম আদরে ছেনি দিই কাটি কাটি ফালি ফালি করি খাওয়াইতেছেন,
খা, আহারে কতদিন খাস নাই!
আম্মা তজবিহ হাতে এক হাতে ভাইরে বাতাস করতেছে, আয়েশা ফুল তোলা
একটা রুমাল দিই কইলো, এইটা দিয়া মুখ মুইছো, মাথা মুইছো, চোখের কান্দন মুইছো না গো ভাই!
অথচ ভাই মারা গেছে তার চল্লিশাও পার হয় নাই। উনি কবরতে উঠি আসছেন, উনার চোখ দুইটা
তারার নিভু নিভু, এট্টু সর্দি লাগছে ক্যাল, ভাই হাঁকি কইলো, বকনা বাছুরটারে খ্যাতের আইলে
বান্ধিলি অইডা তো দড়ি ছিড়ি সব পাকাধান সাবাড় করবেনে!
আম্মা কান্দে আর ইশারা করে, ঠোঁট টিপে আঙুলে, কন, একদম চুপ!
ভাই যে মারা গেল শুক্রবার, ভাই নিজেই জানে না!
তাই আমাদের সংসারে কাঁঠাল পাতার নারকেল ছায়ার লোভে
পড়ি ঝোঁকে ঝোঁকে আইস্যে আগের মতো ধমক দিতেছে আমাদের সংসারে
জায়গা মতো, আব্বা কইলেন, খবরদার তোরা চুপ থাক,
ও যেন না জানে পাছে, ও মরি গেছে, পাছে বেচারা কষ্ট পাবে!

মৌসুমি বায়ু আসে

মৌসুমি বায়ু আসে
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

নাদিরার আজ অন্য রূপ।
অন্যদিন নাদিরা আমার কাছে আসত ক্যাজুয়ালি। লিপস্টিক যদিও থাকে তার ঠোঁটে। লাল টকটকে রাশান লিপস্টিক মেখে আসে সে। ওর ফর্সা ত্বকের সঙ্গে লাল রঙটা খুব যায়। কিন্তু এটুকুই। একটা সালোয়ার বা একটা টপ পরে আলুথালু চুলে নাদিরা আমার কাছে আসত। আজ রোজার মধ্যেই লিপস্টিকের সাজ না দিলেও সে পরিপাটি। অন্তত চুল বাঁধা। নাদিরার চুল স্ট্রেট অ্যান্ড সিল্কি। মিহি চুলগুলা কিছুটা ব্রাউনিশ। এগুলো সে বেশিরভাগ সময় ছেড়ে আসত। বা খোঁপা যদি একটা বাঁধতও তো আশপাশে চুল উড়ত। কিন্তু আজ সে টাইট করে চুল বেঁধে এসেছে। ক্লিপ দিয়েছে, মাথাটা একটু উঁচা উঁচা লাগছে। আরো একটা ব্যাপার আছে। নাদিরা আজ আমাকে খাওয়াবে। বলতে গেলে এই প্রথম সে আমাকে খাওয়াবে মানে ইফতার করাবে। এই ট্রিটটা সে কেন দেবে জানি না। কারণও বলে নাই। ওকে কিছু জিজ্ঞাস করলে অনেক কথায় উত্তর দেয়। বলে, ‘তোরে কী আমি খাওয়াইতে পারি না একটা দিন? তুই আমারে কী ভাবিস’—এসব।

কিন্তু যে বিষয়টা নাদিরার রূপ সবচেয়ে কড়াভাবে বদলে দিয়েছে, তা হলো সে আজ শিশিরের নাম একবারও উচ্চারণ করে নাই। অন্যদিন নাদিরার আলাপের মূল বিষয় শিশির। তাকে নাদিরা গুরু ডাকে। শিশির নাদিরার জীবনের দার্শনিক। তাকে সে অন্য চোখে দ্যাখে। শিশিরকে সে নিজের জীবনদর্শনের একটা উঁচা জায়গায় রেখে দিয়েছে। গুরুর হাজার প্রসংশা, ন্যূনতম সমালোচনা আর অল্প-স্বল্প বিরক্তি মিলিয়ে সারাক্ষণ গুরুই নাদিরার আলোচ্য বিষয়। আমার দিক থেকে নাদিরার সঙ্গ পাওয়ার জন্য গুরুর আলাপ শুনতে হয়। ওকে যদিও একটু খাওয়াতে হয়। কিন্তু আমার নারীসঙ্গ ভালো লাগে বলে ওর জন্য এই খরচটুকু সামান্যই। তবে বোনাসও আছে সঙ্গে। সেটা শিশিরের বা অন্যদের খবর পাওয়া। শিশিরের কাছে না গিয়ে, বাংলার চলমান সাহিত্যের কারো কাছে না গিয়েও, ওদের বিষয়ে আমার আগ্রহ নাই বাইরে বাইরে এটা দেখিয়ে চলা অব্যাহত রেখেও সহজে ওদের বিষয়ে জানার উপায় নাদিরা। এবং আমাদের এসব সাক্ষাত বা আলাপ গোপন রাখাটা ছিল নিজেদের মধ্যে একমাত্র শর্ত।

শিশির গল্প লেখে। সে বিয়ে করে নাই। আমি করেছি এবং গল্প লেখি না। কিন্তু নাদিরার আমি বন্ধু। আর নাদিরা শিশিরের বোজম। ওদের বন্ধুত্বের শুরুটা বইমেলা থেকে। আরেক বন্ধুর হাত ধরে। আমার সঙ্গে নাদিরার বন্ধুত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর সেই বন্ধুত্ব ক্ষুণ্ন হয়। আমরা একে অন্যের থেকে দূরে সরে যাই। এরপর আমাদের দেখা ঘটবার কারণ ছিল আমার শ্বশুরবাড়ি। আর সেটা ময়মনসিংহ। ঠিক ময়মনসিংহও না নেত্রকোনা সীমানায়। সেখানে নাদিরাদেরও বাড়ি। নাদিরার সঙ্গে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, একান্তে আড্ডা দেওয়া কিম্বা খাওয়ানোর মতো সম্পর্ক ছিল না। ইনফ্যাক্ট আমি তাকে দেখেছি কিন্তু আলাপ হয় নাইয়ের মতো একটা সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্কটা একই বিশ্ববিদ্যালয়ে যতটা থাকে ততটা আরকি। আছেও আবার নাইও সম্পর্ক। বিয়ের পর বউয়ের কাছ থেকে ওদের এলাকাগত নৈকট্য জানার পর নাদিরা আবার ফিরে এলো আমার জীবনে। ফেসবুকে আমি তাকে অনেকদিন পর, বিশ্ববিদ্যালয় পার হয়ে যাওয়ারও সেই কত পরে, জিজ্ঞেস করলাম, কেমন আছিস?

নাদিরা অন্য রকম মেয়ে। খোলামেলা, উড়ু উড়ু। একটা ছেলের সঙ্গে ওর চৌদ্দ বছরের সম্পর্ক ছিল। বিয়ের পর নাদিরাকে চাকরি করতে দেবে না বলে সেই বিয়ে আর হলো না। নাদিরা সেই থেকে একা থাকে। ওই ছেলে বিদেশ। চৌদ্দ বছরের সম্পর্ককে নাদিরা নিজের স্বাধীনতার জন্য বিসর্জন দিয়ে এলো। ওর জীবনে অনেক কাহিনী। প্রেমছাড়া হওয়ার পর বেশিরভাগ কাহিনীর সঙ্গে শিশিরের যোগাযোগ। অথচ আজ আর সে শিশিরের কথা বলতেছিল না একদমই। খালি নিজের এসব কথা আবার করে বলতেছিল। চৌদ্দ বছরের সম্পর্কের কথা। কত ঘুরেছে তারা। এই ঢাকা শহরের হেন রাস্তা নাই তারা রিকশায় ঘুরে নাই। পুরান ঢাকা টু বনানী—হেন রেস্টুরেন্ট নাই তারা খায় নাই। চৌদ্দ বছরের তুলনায় ঢাকা খুব ছোট একটা শহর। তবু তাদের প্রেম তো দমে নাই, ঘুরাঘুরি থামে নাই, শোয়াতে কম পড়ে নাই। অথচ চাকরির জন্য সব বিসর্জনে গেল। এই যে কত কথা, কত ঘটনা, অনুরাগ সব কিছুই কি ফ্যালনা? আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়া জানতে চাইল নাদিরা।

: বুঝলি মানুষ সবচেয়ে হারামি প্রাণী আর এর মধ্যে পুরুষরা বেশি হারামি। তুই আবার রাগ করিস না। তোর সাথে যে কেন আমার আগে দেখা হলো না। আমার আসলে তোদের সঙ্গে বেশি মেলে বুঝলি। ওই যে একটু বুদ্ধিজীবী টাইপ। নানা বিষয় নিয়ে কথা বলবে। তোদের মধ্যে এই ফ্রি ফ্রি ভাবটা আমার বেশ লাগে। কিন্তু আমি কিনা সম্পর্ক করলাম একটা গেরস্থ ছেলের সঙ্গে আর সেটা বুঝতে আমার চৌদ্দ বছর লাগবে?

আজ যেন নাদিরা কেঁদে দিবে। জ্যৈষ্ঠের শেষ দিকে ভাসতে ভাসতে আকাশে জমতে থাকা নতুন মেঘের মতো দলা দলা না-পাওয়ার বেদনা ওর চোখেমুখে। কাজল দেওয়া চোখে ভাব জমেছে। আমরা বসছি শুক্রাবাদের ‘হটহাট’-এ। এই জায়গাটা নাদিরার সবচেয়ে পছন্দ। ঢাকা ছোট হলেও এর মধ্যে এত চিপাচাপা যে অগম্যতা থেকেই যায়। চৌদ্দ বছরের দীর্ঘ প্রেমের পরও হটহাট-এ তাদের পায়ের চিহ্ন পড়ে নাই। এটা আমি নাদিরাকে প্রথম চেনাই। সে তো দেখেই অবাক। এমন নিরিবিলি, ছিমছাম একটা রেস্টুরেন্ট সে আগে দেখে নাই। এরপর থেকে এটা আমার আর নাদিরার কমন জায়গা। এখানে বসে সে শিশিরের কথা বলত আমাকে এতদিন।

: শিশির বুঝলি খুব শার্প একটা ছেলে। অন্য রকম একটা জায়গা আছে ওর মধ্যে। এই যে আমি যাই ওর বাসায়, কেউ থাকে না সেখানে তারপরও আমাকে একবারও ছুঁয়ে দেখে নাই। ওর চাহনির মধ্যেই এসব নাই আমার প্রতি। ওর গল্পের মধ্যে দেখিস না কেমন একটা বিয়োন্ড দ্য বাউন্ডারি ব্যাপার আছে। গল্পটা তো আসলে ইমাজিনেশনই বল। মানে এই যে তুই আর আমি গল্প করতেছি, কিন্তু এটা কি গল্প? গল্পে কল্পনাটা থাকতে হয়। শিশিরের আছে। ওর চোখ দুইটাই যেন কল্পনার রাজ্য বুঝলি।

এভাবে শিশিরের গুণকীর্তন আমার শুনে যাইতে হয়। সেটা নাদিরার কারণেই। ওর শরীরটা আমি দেখি, ওর হাসি, গহীন চোখ এসব দেখার জন্যই আমি নাদিরার ডাকে সাড়া দেই। ওরে ডাকি। কফি খাই। রাস্তার দিকে তাকাই। শুক্রাবাদের জঞ্জাল পার হয়ে কেমনে মানুষ যায়? নাদিরা থাকে ওর মায়ের সঙ্গে। বাবার লগে সেপারেশন হয়ে গেছে। নাদিরার বাবার অন্য মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। সেটা তিনি গোপন করতেন। বাসায় সবসময় খিটখিট করতেন। সবাইকে সাপ্রেশনে রাখতেন। প্রতিদিন দিনের একটা সময়ে তিনি বাসার বাইরে থাকতেন। একদিন নাদিরা তার এক বন্ধুকে বলল ফলো করতে। দেখা গেল তিনি একজন বোরখা পরা মহিলাকে নিয়ে ঘুরছেন রিকশায়। নাদিরা তার বাবাকে কখনো পান-সিগারেট খেতে দেখেনি। রিকশায় বসে তিনি পান চিবাচ্ছেন আর সিগারেট খাচ্ছেন। বোরখা পরা মহিলার চেহারা দেখা যাচ্ছে না। চোখ দেখা যাচ্ছে শুধু। ফলো করতে করতে নাদিরার বন্ধু আদাবর পর্যন্ত গেল। সেখানে একটা ফ্যাকাশে চার তলা বিল্ডিংয়ে ঢুকলেন।

এসব আমাকে যতবার বলে, তত রাগে নাদিরার গা জ্বলে।
ফলো করতে করতে সেদিন ওই বাসার নিচে একটা চায়ের দোকানে বসে থাকে তার বন্ধু ঘণ্টার পর ঘণ্টা। দুপুরের পরে বেরিয়ে আসেন তার বাবা। নাদিরার বন্ধু নিজ বুদ্ধিতে নিজেকে আড়াল করার জন্য বোরখা পরে ছিল। সঙ্গে সঙ্গে নেকাব বেঁধে নেয়। দুধর্ষ সেসব অভিযানের দিনে শিশির ছিল নাদিরার পরামর্শদাতা, সহসদাতা। এসব ঘটনায় নাদিরার পরাজয় নাই, বরং জয় আছে—শিশির এভাবে তাকে মানসিক সান্ত্বনা দিত।

পঞ্চম দিনে নাদিরার বন্ধু নিজ সাহস ও বুদ্ধিতে হাতেনাতে ধরে ফেলে তার বাবাকে। ফলো করে উঠে যায় চারতলায়। কলিংবেল বাজিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে। তারপর বোরখার নেকাব খুলে দেখিয়ে দেয় নাদিরার বাবাকে নিজের মেয়ের বন্ধুর মুখ। নিজেও দেখে নেয় সেই মহিলাকে। তাদেরই বয়সী একটা মেয়ে। গ্রাম্য। একটা গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করত। নাদিরার বাবা তাকে একটা প্রকাশনা হাউসে চাকরি নিয়ে দিয়েছিলেন। মেয়েটা দেখতে শ্যামলা। কিন্তু শরীরটা ছিল পোক্ত। ঠাস করে নাদিরার সেই বন্ধুর গালে একটা চড় লাগিয়ে দেয় তার বাবা। ছেলেটা হকচকিয়ে যায়। কিন্তু নাদিরার বাবা হৈ চৈ শুরু করে দেন। নিজের মেয়ের ফন্দিতে এসব হচ্ছে জেনে তিনি চোখের সামনে অস্বীকার করে বসেন তার কোনো মেয়ে নাই। এবং এই ছেলে অনুপ্রবেশকারী। এই মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নিরাপদ রাখার জন্য লোকাল কিছু গুণ্ডাকে পুষতেন তিনি। তাদের ডেকে আনলেন। বললেন ছেলেটাকে পিটিয়ে ঘর থেকে বের করে দিতে। অপমানে, লজ্জায়, অসহায়ত্বে কুঁকড়ে গিয়ে রিক্ত, নিঃস্ব, সর্বশান্ত নাদিরা সেদিন এসব ঘটনার পর আবার বাড়ি ফিরে গেলেও সেটা ছিল তার কাছে ভাঙা হাটের মতো।

সেই থেকে শিশিরের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা। এতে ভীষণ আপ্লুত নাদিরা। এসব বিবরণ নাদিরা আমাকে দিয়েছে। শিশির তো পারত সেদিন তার দুর্বলতার সুযোগ নিতে। নাদিরা কি ফেলনা কিছু? সে দেখে না যে ছেলেরা তার দিকে কেমন করে তাকায়? কিন্তু শিশির, ও যেন সন্ত!

শিশিরের সঙ্গে যোগাযোগ ওর প্রথম প্রেমিকের সূত্রেই। শিশির যদিও বাম ছিল না কখনো। কিন্তু নাদিরার প্রথম ও জ্ঞাত একমাত্র প্রেমিক ছিল বাম। আজিজ সুপার মার্কেট, কাঁটাবন, শাহবাগ, তোপখানা রোড—এসব জায়গা ঢাকার বাম ও সাহিত্যিকদের জন্য কমন জায়গা।

আমি অবশ্য মফস্বল থেকে আসা। শিশিররা বরাবরই ঢাকার ছেলে। ওদের একটা চাপ আছে, ওরা পরিচিত, অনেক কিছু চেনে-জানে। আমার যেমন চিনতে-চিনতেই অনেক সময় চলে গেছে। এমনকি শিশিরকে চিনতেও। ঢাকায় সাহিত্য করতে এসে ঢাকার লোকদের না চিনে সাহিত্য করা যায় না। কিন্তু আমাকে না চিনে সাহিত্য করা যায়। ওদের ইন্টারোগেশনের চৌকাঠ পাড়ায়ে তারপর সাহিত্যিক স্বীকৃতি মেলা।

যাই হোক এসব জায়গার কোথাও শিশিরের সঙ্গে পরিচয় নাদিরার। তারপর হয়তো ফেসবুক, ওর সাহিত্যিক মনোযোগ—এগুলা করতে করতে প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্ক ছুটে গেলেও শিশিরের সঙ্গে রয়ে গেছে। সেই শিশির তার দুশ্চরিত্র বাবার স্বরূপ উন্মোচন কাহিনীর রচনাকার।

এরপর থেকে বাবার বিষয়ে তার ধারণা পাল্টে গেল। মেয়ের বিষয়েও বাবার আচরণ পাল্টে গেল। সে এক বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার। আর পুরোটা সময়ে নাদিরাকে শিশির সাপোর্ট দিয়েছে। আর্থিক, মানসিক—সব। আর সেই নাদিরা আজ একবারও শিশিরের নাম মুখে নিচ্ছে না এতক্ষণ হয়ে গেল। যেন ওই নামে কেউ নাই দুনিয়ায়। আমি একটু অবাক। কিছুটা ভাবছিও ব্যাপারটা কী হতে পারে। নাদিরা এরপর ওইসব সিনেম্যাটিক ঘটনার পর আবার বাসায় স্বাভাবিকভাবে থাকতে শুরু করেছে। এখন সে ব্যাংকে চাকরি আর নিজের মাকে নিয়ে থাকছে। শিশির বা আমি ছাড়া তার অন্যত্র যাওয়া আছে কিনা আমার জানা নাই। জানলেও কিছু করার কী আছে আমার, কিছুটা মনেমনে জ্বলা ছাড়া। আমার সঙ্গে যোগাযোগ সে কেন রাখে জানি না। হয়তো শিশিরের কথা কাউকে না কাউকে তো বলতে হবে এই বিবেচনায়। কিম্বা দ্বিতীয় পুরুষ হিসেবে আমাকে সে গোনায় ধরে। এমনও হতে পারে ওর তো বকবক করা স্বভাব, তা কার সঙ্গে করবে? কিন্তু এই কারণ নিয়ে আমি বিচলিত না।

বরং আজ কেন শিশির আলোচনাতেই নাই তা নিয়ে আমি বেশি চিন্তিত। অনেকক্ষণ আবার নাদিরার পুরান আলাপ, জীবনের গভীর বেদনার কথা শোনার পর জানতে চাইলাম শিশিরের কী খবর।

নাদিরা কিছুটা বিরক্ত মনে হইল। বলল—
: আছে ওর মতো। ওই যে অস্ট্রেলিয়ান গাভীটা আছে না রেহনুমা। ও ফিরছে। ওরে নিয়া আছে। আমার খোঁজ আর লাগে না তার। রেহনুমারে নিয়া নাকি একটা উপন্যাস লিখবে সে। আচ্ছা তুই বল, আমার জীবন কি কম ড্র্যামাটিক। এই যে এত ঘটনা ঘটল, সব তো সে জানে। কিন্তু ওই পুতুপুতু রেহনুমার মধ্যে কী আছে। ও ইউরোপ গেছে বইলাই কি সব! বুঝলি ছেলেরা খুব হারামি হয়। ওদের বুঝে উঠা যায় না। তুই অবশ্য আলাদা। তোর মতো ছেলের সঙ্গে যে আমার আগে কেন দেখা হয় নাই। তোর সঙ্গে মিশতে মিশতে তোরে ভালো লাগে। শিশির অবশ্য শুরুতেই ভালো লাগে। কিন্তু জানিস কি ভরসা করা যায় না ছেলেদের ওপর। আমার মতো মেয়েদের জন্য ছেলে পাওয়া খুব কষ্ট। তোর সঙ্গেই যা একটু-আধটু গল্পগুজব করি বল। নইলে তো আমার সারাটা দিন বেকার যায়। তোর বউ কেমনরে, ফ্রি খুব? অন্য মেয়েদের সঙ্গে মিশলে কিছু বলে না? আমার সঙ্গে যে মিশিস তা তো জানে না। জানে না যখন তখন তুই এত দূরে দূরে রাখিস কেন আমাকে বল তো?

বলতে বলতে কেমন মিইয়ে আসে নাদিরা। আমি রেস্টুরেন্টের গ্লাসের বাইরে তাকাই। আমার বউ বিষয়ে কখনো কিছু জানতে চায় নাই সে। আজ জানতে চাইল কেন ভাবছি।

কয়দিন আগে মোরা নামে একটা ঝড় খুব আতঙ্ক জাগাইছিল। কিন্তু যত গর্জাইল তত বর্ষাইল না। এতে অবশ্য ভালোই হলো। মৌসুমী বায়ুও ধরা দিল। এখন একটা একটানা বাতাস পাওয়া যায়। সন্ধ্যা নামতে শুরু করছে। কেমন একটা সোনালি আলো শুক্রাবাদের আকাশে দম ধরে আছে। রাতে হয়তো বৃষ্টি নামবে। নাদিরা একদম নাকি বৃষ্টিতে ভিজতে পারে না, ওর জ্বর চলে আসে।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র