Barta24

শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯, ৪ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

মেসার্স গঘ ব্রাদার্স

মেসার্স গঘ ব্রাদার্স
অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ
শফিকুল কবীর চনদন


  • Font increase
  • Font Decrease

‘তুমি ছাড়া সত্যিই আমার কোনো বন্ধু নেই, এবং অসুস্থ হলেও তুমি সর্বদাই আমার ভাবনা জুড়ে থাকো।’১

কী ছিল ভ্যান গঘের অনুপ্রেরণা? কিভাবে তিনি আধুনিক চিত্রশিল্পী হিসাবে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন? কারা তাঁর এই যাত্রার সহযোগী ছিলেন? তিনি তাঁর বহুবিধ সীমাবদ্ধতাকে কিভাবে অতিক্রম করেছিলেন? তিনি কি ভাগ্যবান প্রেমিক বা চিত্রশিল্পী ছিলেন? এমনই নানাবিধ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে ভিনসেন্টের এই নাতিদীর্ঘ জীবনজুড়ে খানাতল্লাশী দেওয়া যায়।

বিশ্ব-শিল্পের ইতিহাসে সবচে দৃঢ় ভ্রাতৃত্ব ‘ভ্যান গঘ ভাই’। একদিকে এক ছাদের নিচে ভ্ৰাতৃদ্বয়ের বসবাস যখন বিরক্তির চরমে তখনও বড়ভাই ভিনসেন্টের অনুপস্থিতি থিও’র কাছে অকার্যকর ও অসম্পূর্ণ যাপন হয়ে উঠেছিল। অবিচল পত্রালাপ আমাদের দেখিয়ে দেয়, তাঁরা শারীরিক সংস্থানে পৃথক হলেও সর্বদাই তাঁদের জীবনের জমা খরচের হিসাব নম্বর যেন যৌথই ছিল।

‘পরস্পরের কাছে আমাদের একনাগাড়ে চিঠি লিখে যেতে হবে।’২

থিও ছিলেন ভিনসেন্টের সর্বশ্রেষ্ঠ সমর্থক। উভয় ভাইয়েরই ছিল অস্থির জীবনযাপন। তাঁদের সম্পর্কের পরতে পরতে দৃষ্টি দিলে যে কারো চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠতে বাধ্য। তা আনন্দ বেদনার এক সমূহ তাৎপর্যে। সর্বকালের অন্যতম সেরা চিত্রকর হয়েও তিনি ছিলেন উদ্বেগাকুল ও বিষণ্ণ। তার সময়ে অনালোচিত। প্রথাগত প্রজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করেই তারা যে লড়েছিলেন সেসব নির্যাস নিয়েই একটি অভিসন্দর্ভ হয়ে ওঠে। থিও ভাইদ্বয়ের গল্প ছাড়া যা অসম্পূর্ণ।

এক ‘গঘ’ ঋণদাতা আরেক ‘গঘ’ ঋণ গ্রহীতা। একজন চিত্রকলা ব্যবসায়ী আরেকজন চিত্রকর্ম নির্মাতা। কেনা বেচার হিসাব মাথায় রেখেই যত আগাম দেনা পাওনা ‘গঘ ব্রাদার্সের’। যদি এই ব্যবসায় লক্ষ্মী হতো তাহলে গোপীল এন্ড কোং গঘ ব্রাদার্সে রূপ নিতে পারত! তবে এই ‘মেসার্স গঘ ব্রাদার্স’ তাদের অব্যবসায়িকতার শিল্পঋণ দিয়ে অনাগত ভবিষ্যত্বের জন্য দুনিয়াকে যে ঋণে আবদ্ধ করেছেন তা বলাই বাহুল্য।

সম্প্রতি এক গবেষণার হিসাবে দেখা যায় অনুজ ভ্রাতঃ থিও তাঁর জীবদ্দশায় আনুমানিক ১৮০০০ ডলার ভিনসেন্টের জন্য অকাতরে খরচ করেছেন। যার পুরোটাই সহায়তার মোড়কে। অসাধারণ তাই না? আমরা যদি আজকের মুদ্রাস্ফীতির হিসেবে কষে দেখি তাহলে সে অঙ্ক দাঁড়ায় চার লক্ষ ডলারের কাছাকাছি। আমরা এখানে সেই সত্যিকার ভ্রাতৃত্বের ভালোবাসার বন্ধনের কথাই আলাপে নিচ্ছি। অবশ্যই থিও সব সময় আলাপে এই অর্থকে দাতব্য হিসাবে নয়—বিনিয়োগ হিসাবেই দেখেছে। কিন্তু সংবেদনটা হলো, এমন ভাইয়ের সন্ধান সহজলভ্য নয় নিশ্চয়ই যে কিনা শিল্পলগ্নি থেকে অর্থ সমাগমের সম্ভাবনা নেই জেনেও ‘বিনিয়োগে’ ব্রতী হয়।

‘আমার কাজের অর্থমূল্য আছে কিনা সে বিষয়ে বলতে চাই যে, আমাকে তা খুবই বিস্মিত করবে যদি অন্যদের কাজের মতো আমার আঁকা ছবিগুলিও সময়মত  বিক্রয়যোগ্য হয়ে না ওঠে, ব্যাস এর বেশি আমার আর কোনো ভড়ং নেই।’৩

একসময় গঘ ভাইদের যৌথ প্রকল্প হিসাবেই ভিনসেন্টের চিত্রশিল্পী হিসাবে প্রতিষ্ঠাকল্পে থিও মানসিক, আর্থিক, শিল্প পরামর্শক হিসাবে স্বনিয়োজিত হন। অস্বীকার করার জো নেই যে আজকের বিশ্ববরেণ্য শিল্পীর প্রতিষ্ঠার পেছনে থিও’র নিরন্তর প্রণোদনাই মুখ্য হয়ে আছে। ভিনসেন্টের কাজের উদ্ভাবনী বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করেও শিল্প-ব্যবসায়ী থিও কোনো সংগ্রাহককেই উৎসাহী করে তুলতে না পারার ব্যর্থতা সত্ত্বেও, ছবি বিক্রি করতে না পারার অযোগ্যতা সত্ত্বেও নিঃসন্দেহে থিওই ভিনসেন্টের এক নম্বর সমর্থক হয়ে হাজির থেকেছেন সারাজীবন।

দুই দশকের চ্যালেঞ্জ-মুখর সময়ের মধ্যে দুই ভাইয়ের লেখা অসংখ্য চিঠি। ভিনসেন্টের হৃদয়ের কোরক থেকে উৎসারিত পত্রপুঞ্জের অধিকাংশ এমনকি আসন্ন মৃত্যুর অব্যাবহিত পূর্বে লেখা পত্রটিরও প্রাপক ছোটভাই থিও। থিও তাঁর ভাইয়ের হৃদয় নিঙড়ানো এসব শিকড় সমাচারের প্রাপক। ভিনসেন্ট নিজেরই গরজে তার অন্তর্জীবন ব্যক্ত করেছিলেন ভাই থিওর কাছে।

‘তোমার কাছে সেসব সুযোগ পেয়েছি তার সমতুল্য তত ভালো ছবি আমি এখনো এঁকে উঠতে পারিনি। কিন্তু বিশ্বাস করো, একদিন যদি সেটা করে উঠতে পারি তাহলে যেন তুমিও তাদের রচনা করেছো, কেননা আমরা দুজনেই সেসব ছবি এঁকে তুলেছি।’৪

‘থিও এই প্রশংসার উপযুক্ত পাত্র; নিজেকে করে তুলেছিলেন নিমিত্ত মাত্র আধার। সেজন্যেই ভাইয়ের শতপ্লাবী সৃষ্টির শরিক হিসেবে নিজেকে কখনোই দাবি করেননি। একমাত্র অহংকার ছিল তার; ভিনসেন্টের কাছ থেকে তিনি যত চিঠি পেয়েছেন এমন সৌভাগ্য আর কারো হয়নি।’৫

ভাই ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের জীবন ও রচনার ভাণ্ডারী হবার অধিকার তারই। ১৮৭৩ সাল থেকে পত্র বিনিময় ভাইয়ের সাথে। আত্মবিশ্বাসের বুনিয়াদ গড়ে ওঠে সেই থেকে ধীরে ধীরে। আর কখনো যে বনিবনার কোনো পরোয়াও করেনি তার লক্ষণও আছে পত্র চালাচালিতে। থিও মনে করেছিলেন তার ভাইয়ের মধ্যে দুটি পরস্পর বিরোধী সত্তা বিরাজিত—‘একজন বিস্ময়কর প্রতিভাদীপ্ত, পরিমার্জিত, দয়ালু এবং অন্যজন স্বার্থপর ও অনুভূতিহীন।’

কিন্তু ভিনসেন্ট তার জীবনের সমুদয় কর্জ করেছেন ভাই থিও’রই কাছ থেকে। তিনি প্রশান্তির জন্য মাথাও গুঁজেছেন ভাইয়েরই মমত্বের কাছে তার মুরোদকে ফিরিয়ে আনতে।

গরিমা, লালসা, ছলনা ছিল না, দুর্ভাগার পরনির্ভরশীলতার আশ্রয় যেমন হয়, তেমনি খ্যাতি, অর্থলিপ্সার জন্য নয়, এক অনন্যোপায় ভাবি-চিত্রীর মর্ম প্রকাশের একমাত্র উপায় হয়ে ওঠেন থিও। সেও নিষ্কলুষ ভ্রাতৃপ্রেম চিত্ত বিজড়িত পরিপূর্ণ অনুভব সাদা-নীল-হলুদের তারা ভরা রাতের মাহাত্ম্যকে রঙ চুবিয়ে টাঙিয়ে দেন ভবিষ্যতের প্রদর্শন দেয়ালে।

‘জীবনে কোনো মহৎ ঘটনায় আকস্মিকভাবে ঘটতে পারে না, তাকে ইচ্ছাশক্তিতেই ঘটাতে হয়।’৬

গঘ ভাইদ্বয় তাঁদের জবানে চিত্রশিল্পের সাথে ভ্রাতৃত্বের সহযোগিতার এমন এক প্রবল শক্তি ও আকর্ষণ দান করেছেন যা অনাগত ভবিষ্যৎ জুড়ে অসংখ্য শিল্পপ্রেমীদের হৃদয়কে আলোড়িত করবে।

ভিনসেন্টের জীবন-গগন জুড়ে নিনাদিত রং রেখার অবয়বচিত্রের থিও—বাস্তবের মনোজগতের মোহনচিত্র আঁকানোরও কারিগর। ভিনসেন্টের জীবনানুসন্ধান যে মগ্ন চৈতন্যের গভীরে তার কিনার ঘেঁষে অবস্থান থিও’র। রক্তক্ষরণের দাগে প্রকৃতি এঁকেছেন ভিনসেন্ট, তার ভাইকে এঁকেছেন শত শত পত্রের অসংখ্য বর্ণ  শব্দ ও বাক্যের মোহনীয় বিস্তারে।

‘আমার আশা তোমার সাহায্য ও সহানুভূতি কোনোভাবেই প্রত্যাহৃত হবে না এবং আমরা ভ্রাতৃত্ববোধে একে অপরের হাত ধরে থাকব বরাবরের মতো, যতই থাকুক না কেন সেসব জিনিস “জগৎ” যাদের বিরোধিতা করে।’৭

থিও ভিনসেন্টের আশ্রয়ের প্রতীক। প্রশ্রয়ের নীড়। প্রেমের জানালা। ক্ষরণের দাগ মেখে জীবনকে চেতনার সামর্থ্যে বাগে রাখার দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে, নিজেদের বোধ ও উপলব্ধির জাগরণে।

আর্থিক শূন্যতায় হাত রেখে প্রকরণে চোখ রেখে এঁকেছেন ভিনসেন্ট ভ্যানগঘ। সহনস্বরের প্রত্যয়ে লেখা পত্র থিওকে, অথচ প্রতিকৃতি? নিজের পঁয়ত্রিশটি আত্মপ্রতিকৃতির সন্ধান পাওয়া গেলেও থিওকে এঁকেছেন মাত্রই একবার। যা আবার আবিষ্কৃত হয়েছে ২০১১ সালে। এতদিন যা আত্মপ্রতিকৃতি হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসছিল। কেন প্রতিকৃতি রচনায় থিও বিষয় হয়ে উঠে আসেনি? নাকি নিজেকে আরো পরিশীলিত করে থিওকে আঁকার কোশেশের বাসনা ছিল?

‘তোমার আন্তরিক সাহায্য যতটুকুই পাই না কেন, তা আমি যতটা ভালো করে পারি কাজে লাগাব, কাজে উন্নতি ঘটাবার জন্য আমি সর্বাধিক প্রচেষ্টা চালাব।’৮

গঘ ভাতৃদ্বয়ের সজীব ধারাভাষ্য তাঁদেরই মর্জির নিরীক্ষণের অনপনেয় স্বাক্ষর। তাতে সম্পর্ক জড়িয়ে রাখার মেহন্নত আছে। যা একজনকে টপকে গিয়ে আরেকজনকে প্রত্যক্ষ করার জো নেই। আছে বিবেকের যথোচিত প্রশ্রয়ের দাগ। যা মুদ্রিত হয়ে থাকে ভ্রাতৃপ্রেমের উজ্জ্বলতার আখরে। তাঁর শিল্পেরই মতো ভাই সম্পর্কের সমস্ত পূর্বধার্য্য সীমানাকে মানবিক উচ্চতায় সম্পর্কের অপাপবরণে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে স্থাপন করেন।

নিজেকে তিনি কোনোদিন সস্তা শ্রমে বিক্রয় করেননি। যদিও তাঁর সাধ ছিল চিত্রিত আলেখ্য যেভাবেই হোক বিক্রিবাট্টা করে আহার সংস্থান। এমনই ছিল তাঁর মর্জি। সৃষ্টিরাও তো চূড়ান্ত মর্জি মাফিক। তাঁর গোটা জীবন জুড়ে মেহন্নতের অনপনেয় স্বাক্ষর। শিল্পের নতুন ধারার পূর্বগামী হতে গিয়ে পত্রলেখক, ভ্রাতৃপ্রেম, সহোদরের সাথে চুক্তি, এসবই আসলে আপাত অস্থিরচিত্তের মানুষটার সৃষ্টিকাজের বৈভব মেনে নেওয়ার পথে অন্তরায় নয়।

‘....আঁকাচর্চা আরো আন্তরিকভাবে যদি করতে পারি সেটাই হবে বেশি কাজের, অন্তত তাঁর ওইসব বিক্রিযোগ্য অবিক্রিযোগ্য ইত্যাদি কথাবার্তার চাইতে কাজের কাজ। ওইসব বিক্রিটিক্রি ব্যাপার নিয়ে তাঁর যা মনে হচ্ছে সেসব জ্ঞান ট্যান আমার না শুনলেও চলবে।’৯

চিত্রকলা সমঝদার ব্যবসায়ী হয়েও থিও’র—ভাইয়ের প্রতি পক্ষপাত তো ছিলই, উপরন্তু যৌথ জীবন কারবারের এক প্রতিনিধির প্রতি ভালোবাসার শক্তির এক অন্তর্গত প্রবর্তনাও কি থিও’র দান নয়? ফলে এসব বাণিজ্য কায়কারবার ছাপিয়ে সহানুভূতি সেখানে কালান্তরে প্রসারিত হয়ে গিয়েছে। ফলত ‘মেসার্স গঘ ব্রাদার্স’-এর শিল্প পূর্বধার্য্য সীমানা চুরমার করে দিয়ে আত্মিক শিল্পায়নের দিকে তাঁদের যাত্রাপথের নিশানা সাব্যস্ত করেন।

‘প্রিয় ভাই, এটা তোমার কাছে পরিষ্কার করে দেওয়া ভালো যে, তোমার বিশ্বস্ত সাহায্যের জন্য কত দৃঢ় ও তীব্রভাবে অনুভব করি যে তোমার কাছে আমি বিশালভাবে ঋণী।’১০

ফলে আলাদা নজর দেওয়ার কথা ওঠানোই পরিমিত জ্ঞান কেননা ঘনিষ্ঠ পরিসরে এক চিত্রকলা ব্যবসায়ী আরেক চিত্রকর্মী শরিককে কী-রকম প্রসন্ন উদ্বেগে প্রত্যক্ষ করেছেন সেদিকে আমাদের দরদ-মন যেমন আদ্র হয়, উষ্ণতায়ও ছাপিয়ে সেদিকে মন পড়ে থাকে। আর ‘গঘ ব্রাদার্স’-এর সর্বব্যাপী অস্তিত্বের সংগ্রাম ভাবসঙ্গে জেগে থাকে।

‘থিও না থাকলে আমার কাজের যথাযথ মূল্যায়ন করা কখনোই সম্ভব হতো না।’১১

ভিনসেন্টের মৃত্যুর পর থিও ভাই হারানোর বেদনায় তাঁর মৃত্যুর দায় অনুভব করেছিলেন? নিজেকে দোষী ভেবেছিলেন? একজনের গৃহী ব্যবসায়ী জীবন অন্যজনের শিল্পী জীবনের আপাত ভিন্ন জীবন হলেও গঘ ভাইদের জীবন এক সমাবৃত্তে এসে মীমাংসিত হয়ে যায়! থিও’র সমর্থন জারি থাকে। আওভারসের অদূরে বিস্তীর্ণ তৃণভূমির সবুজ কোমলে ঘেরা সমাধিক্ষেত্রে পাশাপাশি অন্তিম শয়নের মধ্য দিয়ে যৌথ যাপন, যৌথ হিসাব, যৌথ শিল্প প্রকল্প ‘মেসার্স গঘ ব্রাদার্স’-এর শহিদত্বের এজমালি স্মারক হয়ে।

কর্জ স্বীকার
০১. থিও ভ্যানগঘ, ২২ জুলাই, ১৮৮৩ হেগ
০২. ভিনসেন্ট ভ্যানগঘ, ১৩ ডিসেম্বর ১৮৭২
০৩. ভিনসেন্ট ভ্যানগঘ, জুলাই ৩১, ১৮৮২ হেগ  
০৪. ভিনসেন্ট ভ্যানগঘ, পত্র সংখ্যা ৫৩৮
০৫. ট্রুডবার্টা দাশগুপ্ত, আলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত
০৬. ভিনসেন্ট ভ্যানগঘ
০৭. ভিনসেন্ট ভ্যানগঘ, মে ১৮৮২, হেগ
০৮. ভিনসেন্ট ভ্যানগঘ, মার্চ ১৮৮৩, হেগ
০৯. ভিনসেন্ট ভ্যানগঘ, মার্চ ১৮৮২, হেগ
১০. ভিনসেন্ট ভ্যানগঘ, মার্চ ১৮৮৩, হেগ
১১. ভিনসেন্ট ভ্যানগঘ, অক্টবর ১৮৮৭, প্যারিস

আপনার মতামত লিখুন :

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস ও কল্পনা

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস ও কল্পনা
বাংলায় ঐতিহাসিক নাটকের আদিগুরু অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়

দক্ষিণ এশিয়ার বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস রচনা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক আছে। নৈর্ব্যক্তিক ইতিহাস কতটুকু রচিত হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপিত হয় মাঝেমধ্যে। কবির কল্পনা না প্রকৃত ইতিহাস সত্য, এই দ্বন্দ্বের মীমাংসা হয় না।

কারণ, এ অঞ্চলের মানুষ ইতিহাস জেনেছে গল্প, উপন্যাস, নাটকে। শাহজাহান, সিরাজদ্দৌলা, মীর কাসিম সম্পর্কে তথ্যনিষ্ঠ ইতিহাস মানুষ যত কম জানে, তারচেয়ে ঢের বেশি জানে নাটকের আবেগাপ্লুত সংলাপ। ঐতিহাসিক সত্য চাপা পড়ে সাহিত্যিক কৃতকৌশল ও কল্পনার স্তূপের তলে।

ফলে সৃজনে অগ্রাধিকার কার? কবি যা রচিবে তাই কি সত্য? নাকি স্রষ্টাকে ইতিহাসের সত্যের কাছে নতজানু হতেই হবে? এসব প্রশ্ন বারবার গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ইতিহাস প্রসঙ্গে।

দক্ষিণ এশিয়া তো বটেই, ঔপনিবেশিক বাংলায় পণ্ডিত সমাজের চিন্তা-চেতনার আবহে এসব প্রশ্ন খুব বড় হয়ে উঠেছিল। বিশেষত অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় রচিত নাটকগুলোকে কেন্দ্র করে বিতণ্ডার সূত্রপাত ঘটেছিল।

অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ছিলেন ঐতিহাসিক নাটকের আদিগুরু। তিনি নিজেকে মনে করতেন, ইতিহাসের সত্য-প্রতিষ্ঠার একনিষ্ঠ সাধক। এ বক্তব্যের দৃষ্টান্তও তিনি রেখেছেন। সিরাজদ্দৌলা (১৩০৪ বঙ্গাব্দ) ও মীর কাসিম (১৩১২ ব.) বই দুটিতে তিনি তথ্যের ভিত্তিতে এই দুই নবাব সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা ভেঙে দিতে সচেষ্ট হন।

ইংরেজগণ এই দুই দেশপ্রেমিক নায়কের প্রতি যে মিথ্যাচার ও কলঙ্কলেপন করেছিলেন, অক্ষয়কুমার সেগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে গবেষকের নিবিষ্টতায় প্রকৃত সত্য উপস্থাপন করেন। তবে তিনি ইতিহাস রচনা করেননি, নাটক লিখেছিলেন। এবং সাহিত্যে ঐতিহাসিক সত্যের সন্নিকটে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। এমনকি, সমকালীন সাহিত্যিকদেরকেও সত্যানুসন্ধানী হতে প্রণোদিত করেছিলেন।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ‘চন্দ্রশেখর’ উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র, মীর কাসিম ও তকি খাঁর চরিত্রচিত্রণে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়েছেন বলে তীব্র ভাষায় অভিযোগ করতেও দ্বিধা করেননি অক্ষয়কুমার। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় যে বিতণ্ডা শুরু হয়, তাতে রবীন্দ্রনাথ অক্ষয়কুমারের সমর্থনে কলম ধরেন।

তবে কৌশলী রবীন্দ্রনাথ এ কথাও বলেন যে, “ইতিহাসের রসটুকুর প্রতিই ঔপন্যাসিকের লোভ, তার সত্যের প্রতি তাঁর কোনো খাতির নেই।”

রবীন্দ্রনাথের এ কথায় ঔপন্যাসিক কল্পনার অধিকার পেলেও ‘ইতিহাসের মূল রসটুকু’ বা নির্যাস এড়িয়ে যাওয়ার এখতিয়ার পান না। এটাই মোটামুটি মানদণ্ড হয়ে গেছে। অর্থাৎ, ইতিহাসের নির্যাসটুকু নিয়ে কল্পনার আশ্রয় নিয়ে সাহিত্য রচনা করা যেতে পারে। তবে সেটা সাহিত্য নামেই চিহ্নিত ও ব্যক্ত হতে হবে, ইতিহাস নামে নয়।

অক্ষয়কুমারের যুগ পেরিয়ে শতবর্ষ অতিক্রান্ত হলেও ইতিহাস ও সাহিত্যের মিশ্রণ থেমে থাকেনি। বরং আরো বেড়েছে। অতি সাম্প্রতিক লেখকদের কথা উহ্য রেখে একটু পুরনো হিসেবে দৃষ্টান্ত দেওয়া যায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের। তার ‘সেই সময়’, ‘পূর্ব পশ্চিম’, ‘প্রথম আলো’ ইত্যাদি উপন্যাস মানুষকে আলোড়িত করেছে। বই আকারে বের হওয়ার আগে ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশের সময় লেখাগুলোর তথ্য ও সত্যাসত্য নিয়ে এন্তার চিঠি ও ভিন্নমত ছাপা হয়েছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/18/1563451116521.jpg

একজন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আমরা এত পরিশ্রম করে, কত তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে ইতিহাস রচনা করি। কিন্তু মানুষ সেগুলো খুব একটা পড়ে না। ইতিহাসের বই জনপ্রিয় হয় না। আর আপনি ইতিহাসকে উপন্যাসের মধ্যে নিয়ে এত জনপ্রিয় হলেন কেমন করে?’

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় খুব সুন্দর উত্তর দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘মানুষ ইতিহাসের মূল গল্পটি শুনতে চায়। আমি আমার মতো করে গল্পটি বলি।’

মানুষ যত দিন ইতিহাসের মধ্যে শুধু গল্পটি শুনতে চাইবে, ততদিন ইতিহাসের নির্জলা সত্যটি তার কাছে আসতে পারবে না। ইতিহাস আর কল্পনার মাখামাখি চলতেই থাকবে। এটাই সম্ভবত দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ঐতিহাসিক অদৃষ্ট বা হিস্টরিকাল ফেট!

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

আরো হাঁস

এইরূপ কান্দে কন্যা নিরালা বসিয়া
হাঁসের লাগিয়া কন্যা ধুড়িল শহর

কান আশে হইছে বিয়া স্বপ্নের ভিতর
ঘটকালি করে আপন মামতো ভাই

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর
কারা পানখিলি খাইয়া গপ মারে তাই

সজিনার তলে বসি কান্দিল তামাম
এর কিবা মানে শুন কান খাড়া করি
চিক চিক করে মনে এ বিয়ার জরি।

হেমন্তের হাঁস

আমার হয়নি ধোয়া ওগো শিশিরের তলে
আমার হয়নি নাচা মিশি যাওয়া ঊর্মিদলে।

আমার মিটিনি নেশা অলিকোলে শোয়া বাকি
আমায় ঢালিনি মৌন নূর বধির জোনাকি!

আমারে চিনিয়া চিনে নাই হেমন্তের হাঁস
আমার পানের পাত্রে বাদ গেছে শ্যামা ঘাস।

আমার ইউসুফ শোনে নাই ভাইদের শোকর
বকুল তলায় আসি হাঁপায় প্রকৃত ভোর।

হাঁসের জলেরা

হাঁসের পায়ের জল
শুকায়, তাই তারা ফের জলে নামে।
একটা কথা আমি ভুলি যাই
হাঁসের কোনো ইচ্ছা নাই।
হাঁসের জলে আমি ভাসি
হাঁসের পায়ের জলে
আমি মুখ ধুইছি,
আমার নিজের মুখ কেন মোর যেনতেন মোকাম ন রে!
আমার চোখে এই ফেরেবি জল ধরা দেয়
যেন বখিল আমি তার কিছু নির্ভরতাময় তর্জমা করি!
দাদি যেই ছাড়ে হাঁস
তারা আমার মরা দাদির জইফ হাঁস!
স্বপ্ন তারা আমার নিকট
তাদের নিকট
আমি তেমন বাস্তব ন রে!

এই বাড়িতে

দেয়ালের পর কাঠবিড়ালির দৌড় দেখি
যেন রইদ নাকফুল হয়,
তারপর সারা সকালটা গড়ায় দেয়াল ধরি,
একটা দোয়েল ডিম জারি হইলে
অনেক দোয়েল চিল্লায়ে ধরে বা গান,
একদিন আসে আসে করি শেষে আসে,
তারার মতন গোল চোখ ঘুঘু তার
চোখের বর্ডার আলতার রঙ পাছে
পায়ের রঙের সাথে মিশিবার চায়,
এ বাড়িতে আসি যেই হাঁসগুলি দুলি দুলি ও বাড়ি ত যায়,
ওদের ঘ্রাণের ভিতর ঘুরি ঘুরি থামি,
বাতাস হবেনে আসল শরিক
আডিয়াকলার ঝাড়ের নিকটে আসি,
আমি শুনি জলের মর্মর কলপাড়ে তড়পায়,
তারে ঢাকিবার আরো মিহি ধ্বনি আছে
এ বাড়ির অনেক অ-বাক কণ্ঠস্বর আছে!


প্রত্যাবর্তনের লজ্জা
(কবি আল মাহমুদকে)

ভাইয়ের ডাক শুনি উঠি রাতদুপারে স্বপ্নের ভিতর। যেন
বাতাসের ডাক শুনি ঢেউ উঠে তৎপর।
দেখি আব্বা আগেই উঠছেন, নিজ হাতে আতাফল, গাছপাকা তরমুজ
পরম আদরে ছেনি দিই কাটি কাটি ফালি ফালি করি খাওয়াইতেছেন,
খা, আহারে কতদিন খাস নাই!
আম্মা তজবিহ হাতে এক হাতে ভাইরে বাতাস করতেছে, আয়েশা ফুল তোলা
একটা রুমাল দিই কইলো, এইটা দিয়া মুখ মুইছো, মাথা মুইছো, চোখের কান্দন মুইছো না গো ভাই!
অথচ ভাই মারা গেছে তার চল্লিশাও পার হয় নাই। উনি কবরতে উঠি আসছেন, উনার চোখ দুইটা
তারার নিভু নিভু, এট্টু সর্দি লাগছে ক্যাল, ভাই হাঁকি কইলো, বকনা বাছুরটারে খ্যাতের আইলে
বান্ধিলি অইডা তো দড়ি ছিড়ি সব পাকাধান সাবাড় করবেনে!
আম্মা কান্দে আর ইশারা করে, ঠোঁট টিপে আঙুলে, কন, একদম চুপ!
ভাই যে মারা গেল শুক্রবার, ভাই নিজেই জানে না!
তাই আমাদের সংসারে কাঁঠাল পাতার নারকেল ছায়ার লোভে
পড়ি ঝোঁকে ঝোঁকে আইস্যে আগের মতো ধমক দিতেছে আমাদের সংসারে
জায়গা মতো, আব্বা কইলেন, খবরদার তোরা চুপ থাক,
ও যেন না জানে পাছে, ও মরি গেছে, পাছে বেচারা কষ্ট পাবে!

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র