Alexa

গাঙডুবি

গাঙডুবি

অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ

সাভার পার হওয়ার পর মোটামুটি ফাঁকা হয়ে গেল শুভযাত্রা। এই রুটে সাধারণত এটাই ঘটে থাকে। গুলিস্তান থেকে যাত্রী তুলতে তুলতে এগোতে থাকে বাস। বেশিরভাগই কাজ শেষে ঘরে ফেরা মানুষ। একেক জায়গা থেকে একেক ধরনের মানুষ ওঠে—গুলিস্তানে গাঁটরি সমেত কাপড় কিংবা জুতোর ব্যবসায়ী, শাহবাগ-সায়েন্সল্যাব থেকে চাকুরিজীবী কিংবা কলেজ-ভার্সিটির স্টুডেন্ট আবার কলাবাগান থেকে দুধের খালি টিনসহ দুধওয়ালা, শ্যামলীতে যারা ওঠে তাদের অধিকাংশই দিনমজুর শ্রেণীর এবং সরাসরি ছাদে উঠে যায়। হেমায়েতপুর এলেই লোকজনের নেমে যাওয়া ওঠার তুলনায় বেড়ে যায়। এরপর সাভারে মোটামুটি পুরনো যাত্রীরা পাল্টে গিয়ে নতুন যাত্রীরা ওঠে। এবং মৌমাছির চাকের মতোন সেই ভিড়টা থাকে না। ভিড়টা কমে যাওয়ায় সুবিধেই হলো, প্রায় ঘণ্টাখানেক বাদে লীনাকে দেখতে পাওয়া গেল। লীনা বসেছে সামনেই। বামদিকের দ্বিতীয় সারির সিটে। ডানে খানিকটা ঝুঁকে এখন কথা বলছে ত্রপার সাথে। ফলে ওর মুখের ডান পাশের খানিকটা দেখা গেল। যদিও ঝুঁকে থাকার কারণে খুচরো কিছু চুল এসে তারও বেশ কিছুটা ঢেকে ফেলেছে। কী আর করা। কী কথায় হাসতে শুরু করল লীনা। টোল-ফোল পড়ে একাকার অবস্থা। আর সহ্য করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। থাক বাবা! এই দেখাটুকুর জাবর কাটব বলে সামনের সিটে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বুজে ফেললাম চুলগুলোকে অভিশাপ দিতে দিতে। কিন্তু, হায়, আমি যে ওর সিল্কি আর ঈষৎ কটা চুলগুলোও দেখতে ভালোবাসি!

যাচ্ছি গাঙডুবি। এই ঘরের কাছের মানিকগঞ্জের একটা গ্রামে যাওয়ার উদ্দেশ্য কীর্তন শোনা। আমাদের দলে যারা আছি,  সবাই নানা-সূত্রে চেনা লোকজন। মূল-সূত্র অবশ্য একটাই—আড্ডাবাজি। দলের সিনিয়র রিয়াদ ভাইয়ের কাছেই গত মাসে শোনা এই কীর্তনের আসরের কথা। বন্ধু প্রীতমের দাদু বাড়িতে ফি বছর পউষের পয়লায় এই বাৎসরিক আয়োজন হয়। বৈষ্ণব ওঁরা। এই আসরকে কেন্দ্র করে ছোটোখাটো একটা মেলাও নাকি বসে। ঢাকা থেকে আমরা যাচ্ছি জেনে খুশিই হয়েছেন প্রীতমের দাদুবাড়ির লোকেরা।

জাহাঙ্গীরনগর পেছনে ফেলে নবীনগর ছাড়িয়ে গেল বাস।
আরিচামুখী সড়কটায় ওঠার আগে সোজা যে রাস্তাটা সেটার দিকে তাকিয়ে মন খারাপ হয়ে গেল। এবার শীতেও বাড়ি যাওয়া হচ্ছে না। ঢাকার এই পরবাসে থেকে কত বর্ষা-শীত-বসন্ত পার হয়ে যায়, টেরই পাই না। উত্তরের শীতের যে অনুভূতি সেটা তো কোনো উপায়েই পাওয়া সম্ভব না এদিকটায়। আহা সেইসব ঘন কুয়াশার সকাল, সর্ষে-গম খেতের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া হিম হাওয়া, গিঁট বেঁধে দেওয়া চাদর, নাড়ার আগুনে ‘পোড়’ তাপানো! শেষবিকেলে বেশ হিম বাতাস আসছে খোলা জানালা দিয়ে। পাশের সিটে বসা তারেকের জানালা টেনে দেওয়ার শব্দে উত্তর-ভাবনা ছুটে গেল। বাইরের দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছে। ক্রমে কংক্রিটের বিদ্ঘুটে উপস্থিতি কমে আসছে। রাস্তার পাশে কিছু বড় কারখানা ছাড়া তেমন দৃষ্টি-পীড়াদায়ক বিল্ডিং ইত্যাদি নেই। বেশ খোলামেলা। একটু পরপরই শীতের শীর্ণ নদীর দেখা পাওয়া যাচ্ছে। ব্রিজ এলেই বাসটা খানিকটা আওয়াজ করছে আর দৃষ্টি চলে যাচ্ছে নিচের নদীর দিকে। শীতের নদী কিন্তু আমার বেশ লাগে। ক্যামোন শান্ত হয়ে আসে। চাষীরা ধানের বিছন ফেলে দু’তীর ঘেঁষে। সেই চারার সবুজে ঘিরে থাকা নদীকে খুব মায়াবতী মনে হয়।

মায়ার ব্যাপারটা সত্যিই অদ্ভুত। এই যে কয়েক হাত সামনে বসে থাকা লীনা, যাকে আমি চিনবার খুব বেশি হলে মাস ছয়েক, দেখা সাক্ষাতও হয় কদাচিৎ, যার সাথে বড়জোর দশ কাপ চা আর গোটা পাঁচ-সাত সিগ্রেট টানার যৌথ সময় পার করেছি মাত্র, তার জন্যও এত মায়ার বুদবুদ কেন যে ওঠে!

লীনার সাথে পরিচয়ের আগেও অনেক নারীর সাথেই পরিচয় হয়েছে আমার, তাদের কারো কারো সঙ্গে হয়তো পরিচয় গড়িয়েছে আন্তরিকতায়, আন্তরিকতা আরো গাঢ় ঘনিষ্ঠতায় ঠেকেছে এমন নজিরও আছে একটি-দু’টি। তারা সব কে কোথায় ভেসে গেছে কালস্রোতে—একদমই ক্লিশে পথে। লীনাকে দেখবার আগে অতোটা উজ্জ্বল অথচ টলটলে,  অতোটা দুষ্টুমি ভরা অথচ শান্ত চোখ খুব বেশি দেখেছি বলে মনে পড়ে না। বলতে সংকোচ নেই, লীনার বৈপরীত্যে ভরা দৃষ্টিতে খুন হতে আমাকে দ্বিতীয়বার তাকাতে হয়নি। যেমন এখনো পারছি না সরাসরি তাকাতে। অথচ, কোনো একটা অজুহাতে নাম ধরে ডাকলেই ও তাকাবে। আর আমিও পারি পুষে রাখা তীব্র তৃষ্ণা মেটাতে। জানতে পারি, আজকে ওর চোখের কাজলের পুরুত্ব কতটা!

কিংবা ধরা যাক এই গাঙডুবির কথাই। নামটা শোনামাত্রই আমি এর প্রেমে পড়েছি। অথচ গ্রামটি তো আর দশটা গ্রামের মতোই হওয়ার কথা। কিছু সহজ মানুষজন, খেত-খামার, নদী-বিল-ঝিল, মেটে কিংবা সরু পাকা রাস্তা, কিছু দোকানপাট বেশি হলে একটা ছোট্ট বাজার, আধাপাকা ইশকুলবাড়ি, ছোট্ট মিনারঅলা পুরনো মসজিদ, দেশছেড়ে যাওয়া কোনো দত্ত পরিবার-প্রতিষ্ঠিত শিব কিংবা কালীমন্দির, খুব উঁচু একটা তালগাছ কিংবা ঝুরি-নামা বুড়ো বট গ্রামে ঢোকার মুখে— এইসব নিয়ে। তবু গাঙডুবি নামটা শোনামাত্রই আমার প্রেমে পড়াটা অনিবার্য হয়ে ওঠে।

যদ্দূর জেনেছি এই নামে একটা জলাশয় আছে গ্রামে। বিল টাইপেরই হওয়ার কথা। এই গাঙডুবির প্রেমে পড়ার পেছনেও আছে মায়া। গাঙডুবি নামের ওপরে আছে একধরনের মাখন নরোম মায়ার কোটিং। যেন সেই কোনোকালে ডুব দেওয়ার সময় ডুব দেওয়া গাঙটি ফেলে গেছে জলজ শ্যাঁওলার সবজেটে নরোম মায়ার আস্তরণ। আর সেই মায়ায় ডুবে আছে সমস্ত গাঙডুবি গাঁও, গাঁয়ের পথঘাট, জলা, ফসলের খেত, মানুষজন। অতএব, আমাকে গাঙডুবির প্রেমে পড়তেই হয়। তারেকের খোঁচা খেয়ে তাকিয়ে দেখি, আমাদের দলটা নামতে শুরু করেছে। মানে বানিয়াজুড়ি এসে গেছি আমরা। সবাই নেমে গেলে বাস থেকে নামি আমিও। বানিয়াজুড়ি থেকে আমাদের ফুলঝুরি পর্যন্ত যেতে হবে। এদিকটায় ভ্যানই ভরসা। দুটো ভ্যান নিয়ে ফুলঝুরির দিকে এগোই আমরা। দিনের আলো ফুরিয়ে এসেছে প্রায়। ডানে সূয্যি মামা পাটে! ফলে তার দিকে তাকানো যাচ্ছে। এখন মামা লালচে রঙের চাদর জড়িয়ে আছেন। সূর্যকে খুব সকালে উদয়লগ্নে আর শেষবেলায় অস্ত যাওয়ার মুখেই সূয্যি মামা ডাকা যায়। সরু-পিচ রাস্তাটার কন্ডিশন বেশ ভালোই। বাস-ট্রাকের চলাচল নেই বলেই হয়তো। দু’ধারে অল্প উঁচু তাল গাছের সারি। অনুমিত বটের দেখা পাইনি এখনো। সেটা সামনে কোথাও নিশ্চয়ই আছে। রিয়াদ ভাই মারফত জানা গেল—ফুলঝুরি থেকে আরো কিলোখানেক হাঁটলে গাঙডুবি। এবং সে গ্রামে যাওয়ার পথ সাইকেল-রিকশা চলার মতো প্রশস্ত হলেও কখনোই চলার উপযুক্ত থাকে না। বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর রাস্তা জেগে ওঠে বটে, তবে অজস্র খানাখন্দের ক্ষত নিয়েই।

ফুলঝুরি নামবার পর তাই শ্রীচরণযুগলই ভরসা। ফুলঝুরি বাজারে ভ্যান থেকে নেমেই প্রীতমকে পাই। আমাদের এগিয়ে নিতে এসেছে। ছোটোখাটো, আর্দ্র স্বরের প্রীতম। ঢাকা থেকে রওনা দেওয়ার পর ঘণ্টা দুই কেটে গেছে। সন্ধ্যা নেমেছে। চায়ের তেষ্টা পেয়েছে সবারই। বাজারের সবচেয়ে খ্যাত চায়ের দোকানে নিয়ে যায় প্রীতম। পেঁয়াজু সহযোগে মসলা চা খাই আমরা। আমাদের শহুরে ব্র্যান্ড ছেড়ে শস্তার দিশি সিগ্রেটই টানতে হলো। লীনা, ত্রপা পিপাসু দৃষ্টি নিয়ে তাকায়। সিগ্রেট টানবার লোভ দৃষ্টিতে। এই গ্রামের বাজারে দু’জন যুবতীর সিগ্রেট টানার দৃশ্যটা ঠিক যাবে না—ওরা সেটা জানে। আমিও। কাজেই জিভে চুকচুক আওয়াজ তুলে ওদের টিজ করি। তারেক, সাজিদ, প্রীতম, রিয়াদ ভাই সবাই এক সাথে হেসে দিলে ওরা দুজনেই কপট রাগ করে। প্রীতমের তাড়ায় উঠে পড়ি আমরা। হাঁটা শুরু করার পরই লীনার নিকটে যাই। কানের কাছে বলি—পুষিয়ে দেব। লীনা গ্রীবা বাঁকিয়ে তাকায়। ওর চোখে কী ছিল,  এই ঈষৎ কুয়াশা আর আবছা আলোয় সেটা দেখতে পাই না আমি।

বাজার থেকে বের হয়ে আমরা একটা মেটে পথ ধরে হাঁটতে থাকি। খুব বেশি সময় লাগে না গাঙডুবির গ্রামসীমানায় ঢুকতে। গাঙডুবি বিলের পরিসীমার ভেতরে উঁচু ভিটেয় গড়ে উঠেছে লোকেদের গুচ্ছ-গুচ্ছ ঘরদোর। এখন এই শীতে বর্ষায় দ্বীপের মতোন জেগে থাকা বাড়ির গুচ্ছকে টিলা মনে হচ্ছে। শুকিয়ে যাওয়া বিলের কিয়দংশে এখনো জল জমে আছে। বাকি সিংহভাগ জুড়েই রবি শস্যের আবাদ। সর্ষের ফুল এসেছে। একটা মিষ্টি আঠালো গন্ধ ভাসছে কুয়াশায়। কৃষ্ণা দ্বিতীয়ার চাঁদ উঠি-উঠি করছে। দক্ষিণ-পশ্চিমে হাঁটতে থাকা আমাদের ছায়ার একটা ছায়াও কুয়াশায় মিশে গেল। মৃদু আলাপে মগ্ন সবাই। প্রীতমের কাছে খুঁটিনাটি জেনে নিচ্ছে তারেক। রিয়াদ ভাই কিছু একটা বলছেন সাজিদ-ত্রপাকে। লীনা নিঃশব্দ। একটা বেড়ালনির মতোন হাঁটছে। কেবল ওর শরীরের প্রায় মরে আসা পারফ্যুমের গন্ধটা ফাইট দিচ্ছে সর্ষের সুগন্ধের সাথে। একটা বাদুড় উড়ে গেল কৃষ্ণা দ্বিতীয়ার চাঁদের দিকে। দু’টো। তিনটে। চারটে। লীনা বাদুড়ের উড়ে যাওয়া দেখল মুখ তুলে। আমি লীনার চুলের দৈর্ঘ্য বেড়ে যেতে দেখলাম পিঠে। দৃশ্যটা ঠিকঠাক উপভোগ করতে একটা সিগ্রেট জ্বালিয়ে হাঁটতে থাকলাম।

প্রীতমের দাদুবাড়ি পৌঁছবার বেশ আগেই পাওয়া গেল খোল-করতালের আওয়াজ। মাটি কেটে তৈরি করা সিঁড়ি দিয়ে উঠেই বিশাল উঠোন। শরীকী যে বোঝা যায়। উঠোনের এক ধারে ছোট্ট মন্দির। মন্দিরের খোলা বারান্দায় বসেছে কীর্তনীয়ার দল। সামনে তেরপলের শামিয়ানার নিচে শ’ দেড়েকের জমায়েত। ধুপ-ধুনোর গন্ধে মজে আছে পুরো আসরের চৌহদ্দি। আমাদের দলটা বসে পড়ে জমায়েতের সাথে। ঘণ্টাখানেক উড়ে গেল কীর্তনের ঘোরে। প্রসাদ আসে। প্রসাদ-পর্ব শেষে একটু বিরতি দেওয়া হয়। প্রীতমের মামা এসে কথা-টথা বলেন। এই বিরতিতে মেলা দেখানোর কথা মনে করিয়ে দেন প্রীতমকে। প্রীতম আমাদের মেলায় নিয়ে যায়। বাড়ির সামনের চকে মেলা বসেছে। অবশেষে সেই বটগাছের দেখা পাই আমরা। বটগাছটাকে কেন্দ্রে রেখে দোকানপাট বসেছে। কুপির আলোয় উজ্জ্বল অস্থায়ী দোকান। যদিও চাঁদের আলো এখন বেশ উজ্জ্বলই, সওদাপাতি যাচাই বাছাইয়ের দরকারে এই অতিরিক্ত আলোর ব্যবস্থা। জিলিপির দোকানে গিয়ে গরম জিলিপি খাই আমরা। সাজিদ আপাদমস্তক শহুরে। গরম জিলিপি খেতে গিয়ে জিভ পুড়িয়ে ফেলে। ওকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সবাই। এর মধ্যে লীনাকে দেখি না আমি। কোথায় গেল, দেখতে জিলিপির দোকান থেকে সরে আসি। লীনাকে পাওয়া গেল টিপ-চুড়ি-ফিতের দোকানে। এতক্ষণে খেয়াল হলো লীনা আজকে টিপ পরেনি। কাছে দাঁড়াতেই লীনা ঠান্ডা চোখে তাকায়। যার অর্থ করা যায়, বাহ, পেছন পেছন ঠিক চলে এসেছেন দেখছি! লীনা বেছে টিপ কেনে। পরে। বেশ বড়সড়ো হলদে টিপ। দোকানে বেশি সময় থাকবার কিছু নেই দেখে লীনা সামনে এগোয়। আমরা পাশাপশি হাঁটি। ‘সিগ্রেট জ্বালাব?’—জিজ্ঞেস করি। ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায় লীনা। সিগ্রেট জ্বালিয়ে ওকে দিই। মেলাস্থল থেকে বাড়ির উল্টো দিকে হাঁটি আমরা।

এবার চাঁদের মুখোমুখি। সামনে সর্ষে খেত। খেতের ওপর কুয়াশা ঝুলছে। বেশ ঘন এখন। পায়ের তলায় ঘাস নেতিয়ে পড়েছে শিশির ভারে। চাদরটা টেনেটুনে জড়িয়ে নেয় লীনা। সিগ্রেট বাড়ায়। ওর ঠোঁটের স্পর্শ পাওয়া সিগ্রেটে ঠোঁট রাখতেই ছ্যাঁকা খাই আমি। লীনা সশব্দে হেসে ওঠে। ‘আপনি কি মনে করেন আমি কিছু বুঝি না?’—আচমকা প্রশ্ন ছুড়ে দেয় লীনা। আমি ঘামতে শুরু করি। কিছু বলি না। জোরে টান দিই সিগ্রেটে। লীনা আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে। লীনার মাথার উপর দিয়ে আমি ঈষৎ ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদ দেখি।

লীনার কপালের হলদে টিপ যেন উড়ে গিয়ে বসেছে কুয়াশা প্রান্তরের শেষপ্রান্তে। লীনার চোখে সম্মোহন। ‘একটা স্টিক আছে। টানবে?’—লীনা কিছু বলে না। আমি স্টিকটা ব্যাগ থেকে বের করি। জ্বালাব বলে লাইটার জ্বালি। লীনা লাইটারটা কেড়ে নেয়। নিজে স্টিকটা জ্বালায়। কষে টান দেয়। যেনো প্রচণ্ড রাগ কমানোর জন্য মেডিটেশন করছে। জোর দম নিচ্ছে। অর্ধেকের নিচে নেমে আসে ছোট্ট স্টিকটা। বাকিটা আমি ওড়াই। এতক্ষণে চাঁদ আরেকটু উপরে উঠেছে। আরেকটু উজ্জ্বল। কুয়াশার রঙ ঈষৎ নীল হয়ে এসেছে। লীনার হাতে হাত রাখি। উষ্ণ। নরোম। ওর হাতে মৃদু চাপ দিই। লীনা নুয়ে পড়ে যেন। ওর ঠোঁট আমার ঠোঁটের বিপজ্জনক কাছাকাছি আসে। হাত ছেড়ে লীনার ক্ষীণ কটি জড়াই দু’হাতে। ডুব দিই। গাঙডুবির বুকের কুয়াশারা ঘন নীল জলের মতোন ঘিরে ধরে আমাদের। আমরা এগোতে থাকি। দাঁড়িয়ে পড়ি। চুমু খাই। দিগভ্রান্তের মতো দিগন্তের শেষ খুঁজি। চাঁদটা আরো উজ্জ্বল হতে থাকে। কুয়াশারা গাঢ়তর। কতটা সময় পেরিয়েছে তারপর জানি না। দেখি রাত নেই। হলদে চাঁদ নেই। পুব আকাশে সূয্যি উঠছে কুয়াশা ঠেলে। অরূণিমা ছড়িয়ে পড়ছে সারা তল্লাটে। লীনা আর আমি মুখোমুখি। কিছু দূরে ইছামতি। লীনার পায়ের কাছে তামার কলসি। ডুরে শাড়ির আঁচলে গিঁট দিয়ে বাঁধা চাবির গোছা। ‘এতো বেহায়া ক্যা আপনে? আইলসার আইলসা। নিজেও কামকাজ কিছু করব না, আমারেও করতে দিব না। ঘরের বউয়ের লাইগা এমুন পাগল হয় মাইনষে!’ আমি ওর গজরানি শুনতে থাকি বেকুবের মতোন। লীনা আঁচলে ঠোঁট মুছে চলে যায়। ওর শরীর দুলে ওঠে। বুঝতে পারি, হাসি আটকাতে গিয়ে এই দশা। আমিও একটা ভাঁটগাছ তুলে নিয়ে দাঁতন বানিয়ে ঘাটের পথ ধরি। লীনা তামার কলসি বালি দিয়ে মাজে। জলে ডুব দেয়। কলসি ভরে। আমি দাঁড়িয়ে তাই-ই দেখি। সূয্যিকিরণের দাপটে ইছামতির বুকের কুয়াশারা শুকোতে থাকে। বাড়ির উঠোনে অপেক্ষমাণ হালের বলদেরা গলা নাড়লে ঘণ্টি বাজতে থাকে। আমার দেরি করতে ভালো লাগে!

আপনার মতামত লিখুন :