Barta24

রোববার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

স্বপ্নপর্বের তিন কাহন

স্বপ্নপর্বের তিন কাহন
অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ
ইকবাল হাসান


  • Font increase
  • Font Decrease

স্বপ্নপর্ব

নুরনাহার বানু ঘরে ঢুকেই চমকে উঠলেন!
দেখেন, তার স্বামী আবদুর রশীদ পাটোয়ারী বারান্দায় মুরগি কোলে নিয়ে বসে আছেন।
এমত দৃশ্যে যে কোনো মানুষেরই চমকে ওঠার কথা।
স্থবির নুরনাহার বানু ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভাবার চেষ্টা করলেন, বাড়িতে কী হচ্ছে এসব!

প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, তার স্বামীর কোলে কাপড়ের পোঁটলা। মাঝেমধ্যে রশীদ পাটোয়ারী গরম লাগলে গায়ের চাদর, শাল কিংবা সোয়েটার খুলে পোঁটলা করে কোলের ওপর রাখেন। দূর থেকে মনে হতে পারে, একটুকরো অন্ধকার কোলে নিয়ে বসে আছেন তিনি। আজও তাই ভেবেছিলেন, কিন্তু দৃশ্যের ভেতরে তৃতীয় প্রাণীর উপস্থিতি টের পেয়ে মুরগি কক্ কক্ করে ডেকে উঠলে এমত ভ্রম ভেঙে যায় নুরনাহার বানুর।
মুরগী জানান দেয়, ‘কাপড়ের পোঁটলা নয়, অন্ধকারও নয়। আমি, আমি বসে আছি তোমার স্বামীর কোলে। অসুবিধা আছে?’
নুরনাহার বানুর বিস্ময়ের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। বাসায় তো মুরগি পালা হয় না। তাছাড়া এপার্টমেন্ট বাড়িতে সে সুযোগও নেই। তাহলে এ-ধরনের কথা বলা মুরগি এলো কোত্থেকে? বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান নুরনাহার বানু।

তখন সন্ধ্যাবেলা।
বারান্দায় আলো আঁধারির দ্বিধাদ্বন্দ্বের ভেতর আবদুর রশীদ পাটোয়ারী দোল-চেয়ারে মুরগি কোলে নিয়ে দোল খাচ্ছেন। তাঁর চোখ বন্ধ। ছায়ার মতো নিঃশব্দে পেছনে এসে দাঁড়ান নুরনাহার বানু। দেখেন, তাঁর স্বামীর কোলের ভেতর মুরগিটিও পরম নিশ্চিন্তে চোখ বুজে আছে। এমতাবস্থায় তার কী করা উচিত সহসা বুঝে উঠতে পারলেন না তিনি। তবে এরকম দৃশ্য অমরত্বের দাবি রাখে। একথা মনে হতে না হতেই তিনি নিঃশব্দে স্বামীর পেছন থেকে সরে আসেন।

‘বৌমা, ও বৌমা দরজা খোলো।’
একটু আগে বাইরে থেকে ফিরে নিজের ঘরে কাপড় পাল্টাচ্ছিল পুত্রবধু ঋতু। দরজা খুলে দিতেই নুরনাহার বানু ফিসফিস করে বলেন, তাড়াতাড়ি ক্যামেরা নিয়ে আসো বৌমা। একটা ছবি তুলতে হবে, এমন দৃশ্য জীবনেও পাবে না।
বারান্দার দৃশ্যটির দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে ঋতু। তারপর অবাক বিস্ময়ে জানতে চায়, বাবার কী হয়েছে? ওরকম কোলের মধ্যে মুরগি নিয়ে বসে আছেন কেন?
এসব প্রশ্নের জবাব তাঁর কাছ থেকেই জেনে নিও। এখন বাহাস না করে ঝটপট কয়েকটি ছবি তুলে ফেলো। আজই ফেসবুকে দিতে হবে।
আমি এ ছবি তুলতে পারব না মা। বাবা জানতে পারলে মাইন্ড করবেন। আপনি তোলেন বরং। আপনাকে কিছু বলবেন না। 

   ২.
ঋতুর কথায় কপট রাগ দেখালেন নুরনাহার বানু। বললেন, হয়েছে হয়েছে। তোমাকে বাহাস করতে হবে না। আমিই তুলছি। এই বলে তিনি কয়েকটি ছবি তুলে ফেললেন। আর তখন ক্যামেরার ফ্লাশ জ্বলে উঠতেই মুরগিটি কক্ কক্ শব্দ করে উঠল। আবদুর রশীদ পাটোয়ারী চোখ মেলে তাকালেন। তারপর গুরুগম্ভীর স্বরে বললেন, কী হচ্ছে এসব?
আপনাদের অমর করে রাখার ব্যবস্থা হচ্ছে।
মানে?
আপনাদের দুজনের ছবি তোলা হচ্ছে।
নুরনাহার বানু কিছু বলার আগেই ঋতু বলল, আপনাদের দুজন, মানে আপনার আর মুরগির ছবি তুলেছেন মা। ফেসবুকে দেবেন।
ননসেন্স। আবার চোখ বন্ধ করলেন আবদুর রশীদ পাটোয়ারী।
দৃশ্যটি থেকে ঋতু সরে গেলে স্বামীর পাশে এসে বসেন নুরনাহার বানু।
রাগের পরিবর্তে তার অবয়বে এখন কৌতূহল। ইতোমধ্যে বারান্দার আলো জ্বালানো হয়েছে।
তোমার কি শরীর খারাপ?
না।
মন? মন খারাপ?
না।
এই সন্ধ্যাবেলা বাইরে না গিয়ে বারান্দায় মুরগি কোলে নিয়ে বসে আছো কেন? মুরগি কোথায় পেলে?
মুরগি কোথায় পাওয়া যায়? বাজার থেকে কিনে এনেছি।
মুরগির মাংস খেতে ইচ্ছে করছে?
না।
তাহলে?
এই মুরগি কিছুদিনের মধ্যেই সোনার ডিম পাড়বে। তখন বুঝবে মুরগি কেন কেনা হয়েছে।

আবদুর রশীদ পাটোয়ারী ও নুরনাহার বানুর এই কথপোকথনের সময় মুরগী পুনরায় কক্ কক্ করে উঠলে তাঁদের কথাবার্তা বাধাগ্রস্ত হয়।
নুরনাহার বানু স্বামীর সঙ্গে অযথা তর্কে জড়াতে চান না।
বললেন, তুমি মুরগি মনে করে লাল ঝুঁটিঅলা যাকে কোলে নিয়ে বসে আছো, তাকিয়ে দেখো, তিনি আসলে একজন মোরগ। তার মাথায় সম্রাট আলেকজান্ডারের লালঝুঁটি। মোরগ ডিম পাড়ে না। সোনার ডিম পাড়া তো দূর কি বাৎ হায়।
এ কথায় কিছুটা উদাসীন হয়ে ওঠেন আবদুর রশীদ পাটোয়ারী।
বললেন, মোরগ হোক আর মুরগি হোক কথা একই।
একই মানে, মোরগ আর মুরগি এক কথা হলো?

   ৩. 
একই কথা। কারণ, মুরগি এখানে একটি প্রতীকমাত্র। এখন আমাকে বিরক্ত না করে আমার সামনে থেকে দূর হও।
নুরনাহার বানু কোনো কিছুর সঙ্গে কোনো কিছুই মেলাতে পারছেন না আর। তিনি স্বপ্ন দেখছেন না তো? কোনো কোনো সন্ধ্যায় ইদানীং এমন হচ্ছে। বাস্তব ব্যাপারগুলোকে স্বপ্ন মনে হয়। স্বপ্নগুলোকে বাস্তব! কেমন একটা ঘোর ঘোর লাগে। এই যেমন এখন লাগছে। তাঁর স্বামী আবদুর রশীদ পাটোয়ারী কি দিন দিন পাগল হয়ে যাচ্ছেন?
ঋতু বলল, বাবা পাগল হবেন কেন? তিনি ভালো আছেন। নাথিং রং উইথ হিম।
কী বলছো বৌমা! দেখলে না, সন্ধ্যাবেলা তোমার শ্বশুরবাবাজি কোলের মধ্যে লাল ঝুঁটিওয়ালা একটি মোরগ নিয়ে বসে আছেন।
কী যে বলেন মা!
তাহলে আমি কি ভুল কিছু দেখলাম? কী জানি, হবে হয়তো।

স্বপ্নপর্ব ২

তখন অন্ধকার।
অমাবশ্যার রাত্রির কালো থাবা চারদিকে।
আমি ছুটছি। গন্তব্য বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। নদী নালা খাল বিল বন-বাদাড় পেরিয়ে অবশেষে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট। এসে শুনি, কারা যেন বলাবলি করছে, পাটুরিয়া ঘাট থেকে ছেড়ে মাঝনদীতে আটকা পড়েছে ফেরি। আজ রাতে তো হবেই না, কাল সকালে ফেরির দেখা মিললেও মিলতে পারে। তখন তোমার শাশুড়িআম্মা, তিনি হঠাৎ দৃশ্যের ভেতর উদয় হলেন, বললেন, চলেন হেঁটে নদী পার হই।
আমরা পাটুরিয়া ঘাটে এসে উঠলাম। তারপর আবার ঢাকার পথে দৌড়।
রাস্তায় চেকপোস্টে আমাদের থামানো হলো বার-কয়েক। পকেটে যা ছিল দিয়ে দিতে হলো। এরপর যেন দোজখের পুলসিরাত, এটা পার হতে পারলেই আপাতত ঝামেলা শেষ। আমরা তখন শেরেবাংলা নগরের কাছাকাছি। হঠাৎ দেখি, আমার পাশ থেকে নুরনাহার বানু উধাও। অথচ সাতচল্লিশ বছর আগে যখন কোর্টে বিয়ে করি, তখন আমাদের মধ্যে ডিল হয়েছিল, আমরা বিপদে-আপদে কেউ কাউকে ছেড়ে যাব না।
আম্মার এই কাজটি করা ঠিক হয়নি। ঋতু বলল, আই মিন, আপনাকে ওইভাবে একা ফেলে রেখে...
কথার মধ্যে বা’হাত দিও না বৌমা।
কোথায় যাচ্ছেন? রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারেও কালো চশমা পরা লোকটা জানতে চাইল। চেকপোস্টে তার পাশে আরো চারজন। বললাম, ঢাকা যাচ্ছি।
আপনি ঢাকায়ই আছেন। 
ও।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Dec/02/1543706704976.jpg
ইকবাল হাসান

 

   ৪.
আপনার চাদরের নিচে নড়াচড়া করছে ওটা কী?
মনে হলো, লোকটা অন্ধকারেও আমার নাড়িভুঁড়ি দেখতে পাচ্ছে। এখন কোনো ধরনের রাখঢাক করা ঠিক হবে না।
বললাম, মুরগি।
অন্ধকারের ভেতর সাদা দাঁত দেখে মনে হলো, লোকটা হাসল।
মুরগি? মুরগি মানে? আপনি এত রাতে মুরগি নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন?
যাচ্ছি নির্বাচন কমিশন অফিসে। মুরগি প্রতীক বরাদ্দ নিতে। অফিসটা তো কাছাকাছি কোথাও?
লোকটা প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বরং আমার কথায় বেকুবের মতো হাসল আবার।
পাশ থেকে ওই চারজনের একজন বলল, স্যার, মুরগিটা রেখে দেব?
এই, মুরগি রাখবে মানে? আমাকে চেনো? আমি একজন রিটায়ার্ড সচিব, আমার সঙ্গে ফাজলামো হচ্ছে?
না স্যার। আপনার মুরগি আপনার কাছেই রাখুন। তবে ওই যে অফিসটার কথা বললেন, ওটা এখন আর ওখানে নেই। কোথায় গেছে কেউ বলতে পারে না।
আপনারা জানেন না? তাহলে চাকুরি করছেন কেন?
সবার পক্ষে তো আর সবকিছু জানা সম্ভব নয় স্যার। এই যেমন ধরুন, আপনিও জানেন না স্যার ওই অফিসটা কোথায় গেছে! কিংবা আপনার বাড়িটি এখান থেকে ঠিক কত কিলোমিটার দূরে।
তা ঠিক। মনে মনে ভাবলাম, এই অসময়ে এদের সঙ্গে তর্কে জড়ানো মোটেই সঙ্গত নয়। বললাম, আমি এখন যেতে পারি।
জ্বি মুরুব্বি, আপনি এখন যেতে পারেন। কালো চশমাওয়ালার পাশে দাঁড়ানো লোকটা বলে উঠল। একটু আগে এই লোকটাই তো মুরগিটা রেখে দেবার কথা বলছিল।

আবার দৌড়। রাস্তাঘাট শূন্য বলা চলে। মনুষ্যপ্রাণীর টিকিটিও দেখা যাচ্ছে না কোথাও। একসময় মনে হলো, আমি রাস্তাঘাট সব হারিয়ে ফেলেছি। ক্রমশ অচেনা হয়ে উঠছে সবকিছু। তবে অন্ধকার আর নেই, এখন আমার চারপাশ ঘিরে আছে ঘন কুয়াশা। আর সহসাই সেই জমাটবাঁধা কুয়াশায়, যেন স্বপ্নের ভেতরে আরেক স্বপ্নের মতো ভেসে উঠল বাড়িটি। আমি আনন্দে প্রায় চিৎকার করে উঠলাম, নির্বাচন কমিশন!
তবে আমি অবাক হলাম। বাড়িটিকে মনে হলো একটি ভূতুড়ে বাড়ি। কোথাও কোনো লোকজন নেই। পুরো সাইনবোর্ড ধুলোর আস্তরণে ঢাকা। দু একটি বর্ণ উঁকি দিচ্ছে মাত্র। পরিত্যক্ত পোড়োবাড়ি যেন। ফিল্মে ভূতের বাড়ি যেমন হয়। চারদিক মাকড়শার জালে ঘেরা। যেন দীর্ঘকাল সংস্কারের অভাবে এখন একটি কংকালের মতো। বাড়ির কাঠামো আছে ঠিকই, তবে ভেতরে বাড়িটি নেই।
বাবা আপনি ভয় পেলেন না? ঋতু বলল, আমার তো শুনেই হাত পা হিম হয়ে আসছে!
বৌমা, তোমাকে কতবার বলব, কথার মধ্যে বা’হাত দিও না।
মাকড়শার জাল সরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার শা’দত আলী খানের অফিস।

   ৫.
তিনি অফিসে নেই। এই মুহূর্তে ‘বাংলা ভাষা উন্নয়নে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা’ শীর্ষক টক শো-তে ব্যস্ত আছেন । তবে তাঁর চেয়ারে একখানা পাথরের মূর্তি বসিয়ে রেখে গেছেন। আমি বসলাম মূর্তির বিপরীতে। আমাদের মাঝখানে ধাতব টেবিল, শূন্য। ধুলোয় ধুলোময়।
হোয়াট ড্যু ইউ ওয়ান্ট? কথা বলে উঠলেন পাথুরে শা’দত আলী খান।
প্রতীক বরাদ্দের জন্যে এসেছি।
হোয়াট ড্যু ইউ মিন? দিস ইজ নট অ্যান ইলেকশন টাইম। ইউ হ্যাভ টু ওয়েট এনাদার টু টু থ্রি ইয়ারর্স।
তা হোক। আমি এখন থেকেই প্রচারাভিযান চালাতে চাই। অসুবিধা আছে?
নো। ফ্রম মাই সাইড, নো প্রব্লেম অ্যাট অল। হোয়াট সিম্বল ড্যু ইউ ওয়ান্ট? এন্ড ফ্রম হুইজ পার্টি?
মুরগি। মুরগি মার্কা নিয়ে দাঁড়াতে চাই। কোনো দল থেকে না। আমি জানি, বড় দল আমাকে নমিনেশন দেবে না।
এই সময় আমি চাদরের ভেতর থেকে বের করে মুরগিটিকে ধাতব টেবিলের ওপর বসতে দিলাম। বেচারা এতদূর জার্নি করে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। 
টেল মি ওয়ান থিং, হোয়াই ইউ ওয়ান্ট টু চুজ চিকেন এ্যাজ ইওর সিম্বল?
কারণ একবার এমপি হতে পারলে অই মুরগি প্রতিদিন একটা করে সোনার ডিম পাড়বে। বছরে ৩৬৫টি সোনার ডিম। পাঁচ বছরে ৩৬৫ * ৫ = ১৮২৫টি। ভাবা যায়! তার ওপর কাবিখা, টেন্ডার বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য, তদবির বাণিজ্য এসব উপরি তো আছেই।
আই সি।
মুরগি প্রতীক বরাদ্দে আপনার কোনো সমস্যা আছে?
নো।
যদি না থাকে তাহলে আমাকে প্রতীক বরাদ্দ করুন, আমি চলে যাই।
ওকে।
ঠিক এ-সময় মুরগিটি ধাতব টেবিলের ওপর হাগু করে দেয়, যা শা’দত আলী খানকে সহসা উত্তেজিত করে তোলে।
নাউ ক্লিন দ্য টেবল এন্ড গেট লস্ট।
আমি পকেট থেকে রুমাল বের করে মুরগির হাগু পরিষ্কার করে পকেটে রাখলাম।
মুরগির হাগু পকেটে রাখার কথা শুনে ঋতু বলল, ইয়াক্!
ইয়াক্ ইয়াক্ করছো কেন? বিদেশে দেখেছি, মানুষ কফের দলা, কুকুরের হাগু পকেটে নিয়ে ঘোরে, যেখানে সেখানে ফেলে না।
শা’দত আলী খানের রাগত চোখ তখনও আমার দিকে।
বললাম, ভাষার মাসে আপনি আমার সঙ্গে ইংরেজি না বললেও পারতেন।

   ৬.
ভাষার মাস, সো হোয়াট! আই হ্যাভ টু সে বাংলা উইথ ইউ? হোয়াট ক্যান ইউ ড্যু ইফ আই স্পিক ইংলিশ? মাই ফ্রেন্ড বিগ্রেডিয়ার হরিদাশ পাল, নাউ রিটায়ার্ড, ওয়েন্ট টু চিটাগং শহীদ মিনার উইথ হিজ স্যুজ অন। নাথিং হ্যাপেন্ড টু হিম আফটারওয়ার্ড। আই এম ডান উইথ ইউ, নাউ গেট লস্ট।

স্বপ্নপর্ব ৩

অতি প্রত্যুষে দূর থেকে আবদুর রশীদ পাটোয়ারী দেখেন, তাঁর এপার্টমেন্ট ভবনের সামনের রাস্তা লোকে লোকারণ্য। এম্বুলেন্স, র‌্যাব-পুলিশের গাড়ি, টিভি চ্যানেল, সাংবাদিক, দোকানদার, ঝাড়ুদার, গোয়েন্দা, উৎসুক মানুষের ভিড় সব মিলিয়ে যেন একাকার পুরো এলাকা। কী হচ্ছে কিছুই বোঝার উপায় নেই। তবে একটা কিছু যে হয়েছে তা নিশ্চিত। এই ভিড় ঠেলে ওদিকে না যাওয়াই সাব্যস্ত করেন আবদুর রশীদ পাটোয়ারী।
একজন পথচারীকে এগিয়ে আসতে দেখে তাঁর উদ্বেগ কিছুটা কমে যায়।
কী হয়েছে ওখানে? জানতে চাইলেন রশীদ পাটোয়ারী।
এমন কিছু না। ও বাড়ির এক সাহেব গুম হয়েছেন।
বলেন কী! কী নাম তার জানেন?
আমি ভাই অতো-শত জানি না। তবে শুনলাম, সাহেব কাল সন্ধ্যায় মুরগি নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে আর ঘরে ফেরেননি। গুম হয়ে গেছেন।
কারা তাকে গুম করল শুনেছেন কিছু?
কাল সন্ধ্যার একটু পরে কালো মাইক্রোবাসে সাদা পোশাকে ছয়জন লোক তাঁকে ওই বাড়ির সামনের থেকে তুলে নিয়ে গেছে। পাশের এপার্টমেন্টের বারান্দা থেকে মিজান নামে একজন সব দেখেছে। সবার হাতে তাক করা ছিল আগ্নেয়াস্ত্র।
কী ভয়ঙ্কর!
আবদুর রশীদ পাটোয়ারী এখন বারান্দার দোল-চেয়ারে বসে স্মরণে আনার চেষ্টা করছেন, কারা তাঁকে গুম করল! কিংবা গতকাল সন্ধ্যার পর আদৌ তিনি গুম হয়েছিলেন কিনা!

আপনার মতামত লিখুন :

জমিলার দেশ কিরঘিজস্তানে

জমিলার দেশ কিরঘিজস্তানে
ছবি. লেখক

সেই যে কবে সুকুমার রায় লিখেছিলেন না—“পুলিশ এলে ডরাই না আর, পালাই নে আর ভয়ে, আরশোলা কি ফড়িং এলে থাকতে পারি সয়ে।”—আমি কিন্তু তেমন নই। আরশোলা আর ফড়িংকে সয়ে নিলেও, পুলিশকে আমি ষোল আনা ডরাই। তাই কিরঘিজস্তানের রাজধানী বিশকেক শহরের আব্দুররাহমানিভ স্ট্রিটে চলার সময়ে যখন দুজন পুলিশ দু দিক থেকে আমাকে ঘিরে ধরে, আতঙ্কিত না হয়ে পারি না। তাদের সাথে আছেন সাদা পোশাকের আরো দুজন পুলিশ। আমাকে তারা এমনভাবে চারদিক থেকে বেষ্টন করে দাঁড়ালেন, চাইলেও সেই চক্রব্যূহ ভেদ করে ভোঁ দৌড় দেবার কোনো উপায় নেই। মুখে তাই সরল একটা অপাপবিদ্ধ অভিব্যক্তি নিয়ে তাদের জেরার অপেক্ষায় সেখানে দাঁড়িয়ে যাই। এ অঞ্চলে শুনেছি পুলিশ খুব একটা সততানিষ্ঠ নয়, তাই আমাকে পাকড়াও করে মিথ্যে অভিযোগ দিয়ে কোনো পয়সা দাবি করে কিনা, সেরকম একটা সন্দেহও মনে উঁকি দেয়। তো সেই দলে থাকা একমাত্র নারীসদস্য আমার সমস্ত ভুল ভাঙিয়ে আশ্বস্ত করে জানালেন, তারা আসলে ট্যুরিস্ট পুলিশ। কিছুদিন হলো এই বিশেষ বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু কাজ নেই তেমন। ট্যুরিস্ট যেমন কম, তার চেয়েও কম অপরাধের মাত্রা। ফলে ইনাদের একপ্রকার মাছি তাড়াবার অবস্থা। আমাকে দেখে এই দলটির আগ্রহ হয়েছে আমার কাছ থেকে দু চারটি কথা জানবার। এই যেমন কোথা থেকে এসেছি, কদিন থাকব, কেমন লাগছে বিশকেক, কোথায় কোথায় যাবার পরিকল্পনা আছে, এই সব আরকি। সবশেষে তাদের অভিলাষ হলো, আমার সাথে একটি ছবি তুলবেন। বেশ, তুলুন। ভেতরে ভেতরে বেশ উৎফুল্ল বোধ করছি ততক্ষণে। কোথায় ভেবেছিলাম উৎকোচ দাবি করা অসৎ পুলিশ, আর শেষে কিনা আবিষ্কার করলাম সদালাপী বন্ধুভাবাপন্ন ভিন্ন ধরনের পুলিশ, তাই অবাক আর উৎফুল্ল না হয়ে উপায় আছে?

আজ এখানে মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়া। ছেড়ে ছেড়ে বৃষ্টি হচ্ছে। গতকালও এমনই ছিল। তবে বৃষ্টির তেজ ছিল আরো বেশি। তার মাঝেই এয়ারপোর্ট থেকে আসতে হয়েছে। সে-নিয়ে বেশ রকমের ঝক্কি পোহাতে হয়েছে। বিশকেকের এয়ারপোর্ট মূল শহর থেকে বেশ দূরে, প্রায় পঞ্চাশ মিনিটের পথ। গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা দু লেনের মন্থর পিচঢালা পথ ধরে সেখানে পৌঁছাতে হয়। আমি এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সি নিইনি। ভূতুড়ে জনমানবহীন সেই এয়ারপোর্টের বাইরে আসতেই দেখা পেয়েছিলাম ‘মারসুতকা’র, যেটি আদতে হলো ভাড়ায় খাটা মাইক্রোবাস। ভাড়া ট্যাক্সির দশ ভাগের এক ভাগ। যদিও যাত্রীবোঝাই হবার জন্যে অপেক্ষা করতে হলো বেশ খানিকটা সময়। এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই ঝুমবৃষ্টি। বৃষ্টির ভারি পর্দাকে উপেক্ষা করে জোরসে ওয়াইপার চালিয়ে শম্বুকগতিতে মারসুতকা ছুটে চলে। মিনিট পনের পথ আসার পর দেখি দু পাশটা প্রায়ান্ধকার। ঝুপ করেই যেন নেমে এসেছে বিদায়ীবেলার সন্ধ্যা। আর সামনের রাস্তায় এপাশের মাঠ উপচিয়ে তীব্র গতিতে জল ছুটে যাচ্ছে উল্টো দিকের মাঠের দিকে। এর মাঝ দিয়ে গাড়ি ছোটালে জলের স্রোতে কলার ভেলার মতো ভেসে যাবার সম্ভাবনা প্রবল। আমাদের ড্রাইভার বিশাল এক সিডার গাছের কোণে গাড়িটিকে দাঁড় করিয়ে পরিস্থিতির ব্যাপকতা কিছুটা বুঝে নেবার চেষ্টা করে। ওখানেই আমরা আটকে থাকি বেশ কিছুক্ষণ। কিছুটা শঙ্কা জাগে, যদি বৃষ্টি আর না থামে? যদি জলের তোড় এসে পৌঁছায় এ গাড়ি অবধি, তাহলে? আশেপাশে গ্রামের কিছু চাষিবাড়ি ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ছে না। এখানে বিপদে পড়লে সাহায্য করবার কেউ এগিয়ে আসবে কি?

বৃষ্টি থেমেছিল শেষ অবধি, সেই সাথে মন্থর হয়েছিল প্লাবনের তেজ। কিন্তু এতসব ডামাডোলে আমরা যখন আলাতু বাজারের কোণে এসে পৌঁছাই, ততক্ষণে চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। এখান থেকে আমার হোটেল যে কোন দিকে, কিংবা কত দূরে, কিছুই ধারণা নেই আমার। কিছুটা ক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। মাথার উপরের বুড়ো ওক গাছ থেকে টপ টপ করে ঝড়ে পড়ে বিকেলের বৃষ্টির জমে থাকা ফোঁটাগুলো। পাশ দিয়ে হেঁটে যাবার সময়ে হঠাৎ এক যুবক দাঁড়িয়ে যায়। আমার অবস্থা আঁচ করতে পেরে নিজ থেকেই বলে, ‘ট্যাক্সি খুঁজে দেব তোমায়?’ আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলি। ছেলেটি পকেট থেকে ফোন বার করে দ্রুত কিছু টেপাটেপি করে জানায়, ‘মিনিট পাঁচেকের ভেতরেই ট্যাক্সি এসে পড়বে। ততক্ষণ আমি তোমার সাথে আছি। আমি এখানকার টিভি স্টেশনে গ্রাফিক্সের কাজ করি। আজ আমার বিকেলের শিফটে কাজ ছিল। ফেরার সময়ে দূর থেকে দেখলাম, তুমি এখানে সুটকেস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছো। তাই ভাবলাম, তোমার হয়তো কোনো সাহায্য প্রয়োজন।’ অজানা একটি দেশে এমন একজন অপরিচিত জনের কাছ থেকে বাড়িয়ে দেওয়া সাহায্যের হাত পেয়ে মুহূর্তেই মনটা ভালো হয়ে গেল।

আলাতু স্কয়ারের কোণের দিকটায় টিউলিপের বাগান। সকালের বৃষ্টির ফোঁটা লুকিয়ে আছে আধবোজা টিউলিপের জঠরে। সেই সাথে আশেপাশে ফুটে আছে বেশকিছু ধবধবে সাদা ড্যাফোডিল। টিউলিপের বাগানের পেছনেই আইরিশ পাব। তবে সকালের দিক বিধায় পাবের দরজাটি বন্ধ। আর বাগানের শেষপ্রান্তে গোয়ালঘরের মতো দেখতে টিনের চালের লম্বা বারান্দা। বিশাল সেই চাতালে দুজন মাত্র মানুষ নানা আকারের পেইন্টিং এনে ঝুলিয়ে রাখছেন। বিক্রির উদ্দেশ্যে। অবাক হয়ে খেয়াল করি, সেসব পেইন্টিংয়ের মাঝে লেনিন যেমন আছেন, তেমনি বেঁচে আছেন স্তালিনও। কিরঘিজ রমণীদের বেশ কিছু চিত্রকর্ম আছে। তবে তাদের অনেকটিতে শিল্পী নেত্রদানপর্ব সমাপ্ত করেননি। সেটি কোনো ধর্মীয় কারণে কি? এর আগে তাসখন্দে পরিচয় হওয়া একজন চিত্রশিল্পী তেমন একটি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে এখানে সেসব আলোচনা সম্ভব নয়। কারণ, যে দু যুবক ছবিগুলো চটের ছালা থেকে বের করে ঝুলিয়ে রাখার কাজ করছে, তাদেরকে মূল চিত্রকর বলে মনে হয় না। আর তাছাড়া ওরা মহাব্যস্ত। এই যে আমি খুঁটিয়ে ছবিগুলো দেখছি, এর মাঝে কিন্তু একবারও তারা জিজ্ঞেস করেনি, আমি কোনো সম্ভাব্য ক্রেতা কিনা। অতঃপর তাদেরকে ছুটোছুটিতে ব্যস্ত রেখে আমি মূল স্কয়ারের দিকে এগিয়ে যাই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705573218.jpg

কংক্রিটে ঢাকা বিশাল উন্মুক্ত সেই স্কয়ারটিকে অভিভাবকের মতো আগলে রেখেছে উঁচু বেদিতে ঘোড়া ছুটিয়ে চলা এক বীর। এই বীর পৌরাণিক কাব্যগ্রন্থ ‘মানাস’-এ উল্লিখিত বীর। এই কিরঘিজ দেশটির নানা ক্ষেত্রে মানাস-এর উজ্জ্বল উপস্থিতি। এদের এয়ারপোর্ট, এমনকি জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থার নামও মানাস। দূরদেশের রাজার সঙ্গে যুদ্ধ করে কী করে বিজয়ীর বেশে ফিরেছিলেন সেই বীর, সেটি-ই কাব্যের ছন্দে শত শত বছর ধরে পঠিত হয়েছে ধূসর স্তেপের দেশ কিরঘিজস্তানে।

আজ উদ্দাম হাওয়াকে উপেক্ষা করে স্কয়ারের উন্মুক্ত স্থানটিতে বেশ কিছু লোকের সমাগম। তারা মুগ্ধ হয়ে দেখছে সামরিক বাহিনীর কসরত। তাদের দু দিকে ব্যান্ড দলের বাদ্যের তালে তালে নাচছে স্কুলের একদল কিশোর কিশোরী। কিশোরদের মাথায় ঐতিহ্যবাহী কিরঘিজ টুপি—কালপাক। তাদের কয়েক জনার হাতে স্থানীয় বাদ্যযন্ত্র কমুজ। ত্রি-তার বিশিষ্ট কমুজ দেখতে অনেকটা গিটারের মতোই, তবে আকারে অনেক ছোট আর শীর্ণ। সেনা আর সেই স্কুলের কিশোর কিশোরীদের সাজ সাজ রব দেখে বোঝা যাচ্ছে, সামনের কোনো এক দিনে হয়তো উৎসব পালনের ঘটা আছে। তাই প্রস্তুতি হিসেবেই এই মহড়া। আমি নিজেও হাওয়া উপেক্ষা করে কিছুক্ষণ শিশুদের মহড়া দেখি।

এই স্কয়ারটির পেছন দিকে একটি সবুজ উদ্যান। নাম—দুবভি পার্ক। সে উদ্যানের সমুখেই আকাশের দিকে উদ্বাহু হয়ে সপ্রতাপে দাঁড়িয়ে আছেন লেনিন। মধ্য এশিয়ায় টিকে থাকা একমাত্র লেনিন-ভাস্কর্য। বাকিগুলোকে অনেক আগেই ধনতন্ত্রের আগমনের মধুলগ্নে সমূলে উৎপাটন করা হয়েছে। কিন্তু এখানকার এরা সমাজতন্ত্র থেকে মুক্তি নিলেও বোধকরি অতীত স্মৃতিকে এক ঝটকায় ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করতে পারেননি। এমনকি স্বাধীনতার বেশ কিছুকাল পর অবধি লেনিন ভাস্কর্যটি স্কয়ারের সম্মুখ চত্বরেই ছিল। এই কিছু বছর আগে ওটিকে সরিয়ে এনে স্থান দেওয়া হয় ভবনের পেছন দিকে। লেনিনের প্রতি মানুষের মায়ামোহ এখনো যে কিছুটা টিকে আছে, তার আরেক প্রমাণ হলো—ভাস্কর্যের বেদিতে পড়ে থাকা গোলাপ আর টিউলিপের ম্লান গুচ্ছ।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705392582.jpg

লেনিন ভাস্কর্যের উল্টোদিকের সেই পার্কটির একটি বেঞ্চে গিয়ে বসি। বাঁ ধারে কিরঘিজ নারীর প্রমাণ সাইজের ভাস্কর্য। মধ্যবয়েসি এক নারী। মাথায় হেঁসেলের পাতিলের মতো দেখতে প্রথাগত মেয়েলি কিরঘিজ টুপি—এলিশেক। প্রায় দশ হাত দীর্ঘ সূতি কাপড় পাগড়ির মতো করে পেঁচিয়ে তৈরি করা হয় এ টুপি। তবে বিশাল সাইজের এই কেশাচ্ছাদনকারী পরে হাঁটতে এযাবত কোনো নারীকে এ শহরে দেখিনি। হয়তো গাঁ গ্রামে এখনো এর কিছু চল থাকতে পারে। তবে পাথরের বেদির উপর সেই স্মিতহাস্যময়ী নারীর ভাস্কর্যটি দেখে আমার হঠাৎ জমিলার কথা মনে হয়। প্রখ্যাত সাহিত্যিক চিঙ্গিস আইৎমাতভ সৃষ্ট অমর চরিত্র—জমিলা। বলা চলে, জমিলার গল্পের মাধ্যমেই এই কিরঘিজ দেশটির সাথে আমার পরিচয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জমিলার স্বামী মায়ের কাছে বৌকে রেখে ফ্রন্টে যায়। সদ্য কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে উপনীত জমিলার সঙ্গী হয়ে থাকে বালক বয়সের দেবর। এর মাঝেই গ্রামের সমবায় ফার্মে কাজের জন্যে ডাক পড়ে তার। গ্রামের পুরুষরা যেহেতু সবাই যুদ্ধে, তাই সমর্থ নারীরা শস্যভাণ্ডার না সামলালে ফ্রন্টের সৈনিকদের মুখে খাবার জুটবে কী করে? জমিলা কাজে যোগ দেয়, সাথে বন্ধুর মতো লেগে থাকে সেই দেবরটি। এর মাঝেই সেখানে উদয় হয় জমিলার সমবয়েসী আরেক যুবক। জমিলা আর সেই যুবক দুজনেই একে অপরের প্রতি নৈকট্য অনুভব করে। আর সেভাবেই কাহিনী গড়ায়। ছোট গল্প। কিন্তু কী গভীর তার আকুতি! কিরঘিজ গ্রামীণ সমাজের সেই সময়কার চিত্রকে যেন জমিলার জীবনের কাহিনীর মধ্যদিয়েই আইৎমাতভ উপস্থাপন করেছেন আমাদের সামনে। আমি সেই ভাস্কর্যটির দিকে তাকিয়ে ভাবি—তুমিই কি তবে গিরিপথ পেরিয়ে গ্রাম ছেড়ে প্রেমিকের হাত ধরে দূর দেশে পালিয়ে যাওয়া সেই জমিলা?

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705311264.jpg

ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা অব্যাহত থাকায় চায়ের তেষ্টা জেগে ওঠে। আমি রাস্তা পেরিয়ে স্কয়ারের উল্টোদিকে যাই। ওদিকটাতে বেশ কিছু ক্যাফে-বেকারির দোকান আছে। বলা চলে, এ রাস্তাই শহরের সবচেয়ে বনেদি এলাকা। খুব বেশি দূর হাঁটতে হয় না। অল্প দূরেই লোহার দরজা ঘেরা মেট্রো পাব নজরে আসে। সেটির বাইরে চক বোর্ডে লেখা—‘তুমি+আমি+কফি= আনন্দ’। যদিও আমার ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, আমি আছি, কফিও হয়তো থাকবে, কিন্তু কোনো ‘তুমি’ নেই। তাই আনন্দের সঙ্কুলান হবে কিনা, জানি না। তবুও অনন্যোপায় না থাকায় সেই দশাতেই ভেতরে ঢুকতে হয়। ভেতরটা গুমোট অন্ধকার। বাইরের দরজার সাথে মিল রেখেই চারধারে ছড়ানো লোহার টেবিল চেয়ার। সড়কের দিকে মুখ করা জানালাগুলো ঘোলাটে কাচে ঢাকা। দেয়ালে টানানো নোটিশ বোর্ডে লেখা—টেবিল ছেড়ে উঠে গেলে মালামাল নিজ দায়িত্বে রাখুন। কোণের দিকটিতে বার। তবে সেটি বোধ করি জমজমাট হয়ে ওঠে আঁধার নামার পর। এই ভর দুপুরবেলায় কেই-বা এখানে মদ গিলতে আসবে? ওয়াটার এগিয়ে এলে আমি চায়ের অর্ডার করে পাশের টেবিলের দিকে তাকাই। সেখানে মাঝবয়েসী দু মার্কিন ভদ্রলোক আলাপ করছেন। নিচুস্বরে কথা বলায় তাদের আলাপন আমি ডিকোড করতে পারি না। ভাবতে থাকি এরা কি কোনো কনট্রাক্টর? একথা ভাবছি, কারণ, ঠিক এই মুহূর্তে না হলেও কয়েক বছর আগ অবধি এই বিশকেক শহরটিতে আনগোনা ছিল বিপুল সংখ্যক মার্কিনীর। নাইন ইলেভেনের পর আফগানিস্তানে মার্কিন অভিযান শুরু হলে তারা কিরঘিজস্তানের মানাস এয়ারপোর্টে বিমান বাহিনীর ঘাঁটি বানাবার জন্যে জায়গা চেয়ে বসে। চরম অর্থনৈতিক মন্দা চলতে থাকা কিরগিজস্তানের পক্ষে সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল না। তারা রাজি হয়ে যায়। সেই থেকে বিমান বাহিনীর লোক, তাদেরকে কেন্দ্র করে সাপ্লায়ার কোম্পানি ইত্যাদি নানা সংস্থার কাজ করা বিপুলসংখ্যক লোকেদের মচমচে পয়সায় গড়ে ওঠে এ এলাকার হোটেল, ডিস্ক, পাব, আর ক্যাফেগুলো। তবে কয়েক বছর আগে ক্ষমতায় আসা নয়া কিরঘিজ সরকারের চাপে মার্কিন বিমান বাহিনী এখানকার ঘাঁটিটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে বিদেয় নিলে মাথায় হাত পড়ে এ এলাকার ব্যবসায়ীদের। তারা সরকারের কাছে আর্জি জানায়—ফিরিয়ে আনুন আবার সেই মার্কিনীদের। নয়তো আমরা চলব কী করে? তাদের এই উদ্বিগ্নতার হেতুটা আমি বুঝি। এ পর্যন্ত বিশকেক শহরের নানা পথে হেঁটে যতদূর বুঝেছি, সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বেরুবার পর এখানকার নতুন কোনো শ্রীবৃদ্ধি হয়নি। বিদ্যুৎচালিত যে সরকারি বাসগুলো রাস্তায় চলছে সেগুলো রঙচটা, লক্কড়-ঝক্কর মার্কা। রাস্তায় এখানে-ওখানে খানাখন্দ। রাজধানীর পাড়াগুলো শ্রীহীন। দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা উষর, চাষাবাদ-অনুপযোগী। খনিজ সম্পদের মধ্যে আছে একটি ছোট সোনার খনি। ভারি শিল্প নেই বললেই চলে। সে কারণেই দেশটির বিপুল জনগোষ্ঠী কাজের সন্ধানে ছুটে যায় রাশিয়ায়। অর্থনীতির এমন একটি ত্রিশঙ্কু অবস্থায় মার্কিন ঘাঁটির প্রস্থানে তাই স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বিচলিত না হয়ে পারেনি। তবে ঘাঁটিটি গুটিয়ে নিলেও সব কর্মকাণ্ড হয়তো পুরোপুরি বিদেয় নেয়নি। কিছু কনট্রাক্টর, কিছু ফড়ে দালাল হয়তো এখনো রয়ে গেছে। অদূরের টেবিলে ভুঁড়ি ঠেকিয়ে বসা সেই দুই মার্কিনী তেমন কেউ কিনা কে জানে!

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563704741206.jpg

ওয়েটার চা এনে রেখে যায়। চায়ের প্লেটে দুধবিহীন লিকার চায়ের পাশে রাখা থাকে মুসুম্বির কয়েকটি টুকরো। আমি সেই টুকরো দুটোকে চায়ে ভাসিয়ে দিই। সেই সাথে ভাবতে থাকি—দুপুরের খাবারটা সারা যায় কোথায়? খাবার নিয়ে এ অঞ্চলে বেশ হুজ্জতে পড়েছি। ইংরেজি জানা লোক এখানে নেই বললেই চলে। সবজি চাইলে এনে দেয় মাংস, আর মাংস চাইলে এনে দেয় সবজি। যেটা বুঝলাম, নিজের ইচ্ছেমতো খাবার চাইলে এ দেশে আসবার আগে টুকিটাকি রুশ শিখে আসাটা বাধ্যতামূলক। ও হ্যাঁ, এরা কিন্তু এখনো রুশ ভাষাকেই ধরে রেখেছে। আর এদের বর্ণমালাও সিরিলিক বর্ণমালা।

কফি পান শেষে আমি এগলি-ওগলি হেঁটে হায়াত রিজেন্সি হোটেলটা খুঁজতে থাকি। না, এ গরিব বান্দার সেখানে ওঠবার মতো সামর্থ্য নেই। আমি আসলে ওটি খুঁজছি, কারণ এর ঠিক পেছনেই নাকি কিরঘিজ জাতীয় নাট্যশালা। সেখানে যাবার কারণ আছে। সকালে হোটেলের খাবার ঘরে প্রাতরাশ সারার পর বেরিয়ে আসার সময়ে শুনছিলাম ম্যানেজার মেয়েটি কাকে যেন বলছে—আজ এখানে বিরাট অপেরা কনসার্ট হবার কথা। ভিয়েনা থেকে এদ্রিয়ান আর হাইদেমারিয়া নামক দুজন স্বনামধন্য শিল্পী আসবেন। সাথে থাকবে স্থানীয় বাদ্যযন্ত্রীদের একটি দল। তারা বাজাবেন—পিয়ানো, চেলো, ভায়োলিন আর বাস। অপেরা শিল্পীরা কিন্তু অনেক সময় গানের সুরের সাথে কোনো একটি অভিনয়ও মঞ্চস্থ করেন। অনেকটা আমাদের গীতিনাট্যের মতো। তবে ভিয়েনা থেকে আসা অপেরা শিল্পীরা কেবলই গাইবেন, অভিনয়ে অংশ নেবেন না। এর আগে ভিয়েনায় গিয়ে পথেঘাটে এই অপেরা কনসার্টের টিকিট বিক্রি হতে দেখেছি। সিনেমা হলের সামনে দাঁড়িয়ে ব্ল্যাকে টিকেট বেচা দালালদের মতোই ওখানকার থিয়েটারগুলোর আশেপাশের রাস্তায় আছে বেশ কিছু টিকেটবিক্রেতা। ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণের নিমিত্তে তাদের অনেকের পরনে পুরনো আমলের ঝলমলে পোশাক। এমন কয়েকজনের কাছে টিকেটের মূল্য শুনে আমার একেবারে অক্কা পাবার দশা হয়েছিল। প্রায় দেড়শ ইউরোর নিচে ভালো কোনো টিকেটই নেই। তাই অপেরা কনসার্টের তীর্থস্থল ভিয়েনায় অবস্থানকালে সেটির সুধা আস্বাদন আর সম্ভব হয়নি। তবে সেখানকার শিল্পীরা এখানে এসে অনুষ্ঠান করায় আমি অনুমান করি—টিকেটের মূল্য হয়তো তেমন একটা আকাশচুম্বী হবে না। ম্যানেজার মেয়েটিকে কোথা থেকে টিকেট কাটা যায়, এ নিয়ে প্রশ্ন করলে সে কিছুটা তাগিদের কণ্ঠে জানায়, “আজ রাতের এই শো যদি ধরতে চাও, তাহলে তোমাকে দুপুরের মধ্যে গিয়ে টিকেট কেটে আসতেই হবে। শোয়ের ঠিক আগে ওখানে টিকেট পাবে না।” মেয়েটির সেই কথাকে আমলে নিয়েই আমার এই নাট্যশালা খুঁজতে পথে নামা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705117000.jpg

গথিক স্থাপত্যে নির্মিত বিশাল সেই নাট্যশালাটি দু গলি পরেই পেয়ে যাই। চূড়োতে এখনো নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে যাওয়া তারাটি দেখেই বোঝা যায়, দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যের এই ভবনটি সোভিয়েত সময়ের অবদান। সামনের বারান্দায় উঠে দেখি, সেখানে এসে প্রতিফলিত হচ্ছে ভেতরের প্যাসেজে জ্বলতে থাকা ঝাড়বাতির আলোকছটা। সেই আলোর রেখা অনুসরণ করে ভেতরে যাবার মুখে কাঠের ভারি দরজাটির হাতলে চাপ দিই। কিন্তু সেটি আমার প্রত্যাশাকে প্রত্যাখ্যান করে। আমি বুঝে যাই, সন্ধ্যের আগে এই দোর খুলবার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাহলে টিকেট পাব কোথায়? নাকি এতটা পথ এসে আশাহত হয়ে ফিরে যেতে হবে? সেই সময়ে খেয়াল করি, বারান্দার একেবারে শেষ প্রান্তে দু পাল্লার জানালা। একটি পাল্লা খোলা, অপরটি বন্ধ। মুখে হাসি ফুটে ওঠে আমার, টিকেটের একটা বন্দোবস্ত হয়তো হয়ে গেল।

হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে

হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে
হুমায়ূন আহমেদ

 

তিনি বলেছিলেন, তার মৃত্যুতে কেউ যেন না কাঁদে। বিষাদ কণ্ঠে গেয়েছিলেন গান, ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায় রে জাদু ধন। মরিলে কান্দিস না আমার দায়।’

কিন্তু সাত বছর আগে সুদূর আমেরিকায় তিনি যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন পুরো বাংলাদেশ কেঁদেছিল তার জন্য। শুধু সেদিনই নয়, বাংলা সাহিত্যের ভক্ত-অনুরাগীরা প্রতিটি দিনই তাকে স্মরণ করেন। তার কথা ভাবেন। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে।

১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর জন্ম নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন ২০১২ সালের ১৯ জুলাই। জীবনের প্রতিটি দিন তিনি ছিলেন সৃষ্টিশীল ও কর্মমুখর। জীবনকে উপভোগ করেছেন তিনি সৃজনের বিবিধ উপাচারে।

হাওর-বাওর-গানের দেশ বৃহত্তর ময়মনসিংহের নেত্রকোণার মোহনগঞ্জের নানাবাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। একই জেলার কেন্দুয়ার কুতুবপুর তার পিতৃভূমি।

পিতার চাকরির সুবাদে হুমায়ূনের শৈশব-কৈশোর কেটেছে বাংলাদেশের বহু স্থানে। সিলেটের মীরাবাজার, চট্টগ্রাম শহর, পিরোজপুরের মনকাড়া প্রকৃতিতে। যেসব কথা তার লেখায় বারবার ফিরে এসেছে।

স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নের স্নাতকোত্তর পাশ করেন তিনি। পিএইচডি ডিগ্রি নেন আমেরিকার থেকে। শুরু করেন অধ্যাপনা।

কিন্তু তার ভাগ্য মিশে ছিল সাহিত্যে। সার্বক্ষণিক লেখালেখি, নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণকে তিনি বেছে নেন। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ও ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসের মাধ্যমে যে লেখক জীবনের সূচনা ঘটে, তা পরিণত হয় বাংলা সাহিত্যের অবিস্মরণীয়-জনপ্রিয় লেখক সত্তায়।

গল্প-উপন্যাসের জাদুকরী ক্ষমতায় অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করেন তিনি। মানুষ লাইন ধরে কেনে তার বই। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি হয় হাজার হাজার কপি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন ঘটনা ছিল অভূতপূর্ব।

আর তিনি ছিলেন মেধা, প্রতিভা ও জনপ্রিয়তার এক বিরল ব্যক্তিত্ব। সমকাল তো বটেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি গড়েছিলেন পাঠকপ্রিয়তার তুঙ্গস্পর্শী রেকর্ড। যে রেকর্ড কারো পক্ষে ভাঙা আদৌ সম্ভব হবে না।

‘অচিনপুর’, ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’, ‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে’, ‘লীলাবতী’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘অচিনপুর’, ‘বাদশাহ নামদার’, ‘দেয়াল’, এমন তিন শতাধিক পাঠকনন্দিত উপন্যাসের রচয়িতা হুমায়ূন আহমেদ বাংলা কথাসাহিত্যে অর্জন করেন নিজস্ব পরিচিতি ও ভূগোল। একা লড়াই করে সাহিত্যের পাঠক সৃষ্টির পাশাপাশি মৃতপ্রায় প্রকাশনাকে বাঁচিয়ে দেন তিনি।

টিভি নাটকেও জনপ্রিয়তার ইতিহাস গড়েন তিনি। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘অয়োময়’, ‘দূরে কোথাও’, এমন হৃদয়ছোঁয়া নাটকের মাধ্যমে ছোটপর্দায় টেনে আনেন হাজার হাজার দর্শক।

চলচ্চিত্র নির্মাণ করেও সোনা ফলিয়েছেন হুমায়ূন। সিনেমাহলমুখী করেছেন মানুষকে। তার নির্মিত ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘ঘেটু পুত্র কমলা’র মতো ছবি বাণিজ্য সফল ও পুরস্কৃত হয়েছে।

নাটক ও চলচ্চিত্রে তিনি লোকবাংলার বহু গান চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার কথা বলেছেন। মানব-মানবীর অন্তর্গত হৃদয়ের দাহ ও বিষাদকে তুলে ধরেছেন অনন্য সুষমায়। তাকে ঘিরে শিল্প, সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্রের এক নান্দনিক জগত উন্মোচিত হয়েছিল।

প্রেম ও রহস্যময় বেদনার প্রতীক নগ্নপদে হলুদপাঞ্জাবির ‘হিমু’ তার অনবদ্য সৃষ্টি। যুক্তিবাদী বিশ্লেষক মিসির আলীর মতো চরিত্রও তিনি সৃষ্টি করেছেন। হুমায়ূনের এই দুই চরিত্রের কথা বাংলা সাহিত্যের পাঠক সহজে ভুলবে না। ভুলবে না এমন আরো অনেক মানবিক চরিত্র ও কাহিনীর নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদকেও।

মুক্তিযুদ্ধের মহান শহীদ, পুলিশ অফিসার বাবার জেষ্ঠ্য সন্তান হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টির পুরোটা জুড়েই আছে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ। হুমায়ূনের উপন্যাস ‘১৯৭১’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘উতল হাওয়া’ এবং চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’ বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের হৃদয়স্পর্শী কাহিনীচিত্র। যুদ্ধাপরাধ, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লেখার পাশাপাশি আন্দোলনও করেছেন তিনি।

প্রেম ও বিরহ হুমায়ূনের লেখার মূল উপজীব্য হলেও তিনি তার লেখায় অপরূপ দক্ষতায় স্পর্শ করেছেন রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক ঘটনাবলি। লেখার মায়াবী টানে তিনি পৌঁছে গেছেন মানুষের নিবিড় সান্নিধ্যে। নীল জোছনায় বেদনাহত একটি তরুণ কিংবা নীলপদ্ম হাতে একটি তরুণীর স্মৃতি-সত্তা পেরিয়ে হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন মানুষের চেতনার গহীন প্রদেশে। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র