Barta24

রোববার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৫ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

মঈনুস সুলতানের গুচ্ছকবিতা

মঈনুস সুলতানের গুচ্ছকবিতা
অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ
মঈনুস সুলতান


  • Font increase
  • Font Decrease

হীরক চূর্ণের নীল দ্রবণ

জানি তোমার এ ঘুম ভাঙ্গিবে না—
                        ভাঙ্গিবে না আর কোনো দিন।

শিলালিপির মতো স্থবির তোমার স্মৃতি
দ্যাখো কেমন সবুজ সজীব আজও
মানুষ মুখর ঊর্মির মতো বিস্মৃতি ভালোবাসে বড়ো বেশি,
অথচ তুমি ভোলোনি
মনে হয় ভুলিবে না কোনো দিন
           সেই বৃষ্টিভেজা কাঠের বাড়ি
           টালির ছাদে গিরেবাজ কবুতরের গল্প;
সে কার জড়োয়া কাঁকন রিম ঝিম শব্দে চন্দ্রাহত বিধুর,
প্রত্যাশার আবলুস আন্ধারে আরশিতে আরতির দীপ জ্বালে!

তোমার পদ যুগল পর্যটনে ব্যস্ত
ধমনীতে লাফাচ্ছে রক্তিম উচ্ছ্বাস—
গতি এবং উষ্ণতা যদি জীবনের মর্মকথা হয়
তথাপি হতাহত মৃত তোমার হৃদয়;
তুমি পান করেছো চন্দ্রাহত হীরক চূর্ণের নীল দ্রবণ
মর্মান্তিক গোধূলির অন্তিম আবেগে স্তব্ধ তোমার ভ্রমণ!

জোনাকি, শিশির, শঙ্খে চিত্রিত পৃথিবী অনেক.. ..অনেক দূর
স্নায়ুতে শুক্লপক্ষের প্রগাঢ় তিমির
করতলে পতঙ্গের হরিৎ পাপড়ি, গোলাপের বিষণ্ণ ডানা
তুমি কোথায় যাবে?
কারা আলেয়ার মতো ডাকছে তোমাকে গভীর নিশীথে!
তুমি পান করেছো চন্দ্রাহত হীরকচূর্ণের নীল দ্রবণ.. ..

তোমার করোটিতে কষ্টের হিম স্পর্শ
ঝাউবনের মতো নেশায় গভীর নিসর্গ
মেঘালোকে ডোবা সবুজ পত্ররাজি—
যেন কার দীর্ঘশ্বাস হয়ে বয়ে যায় করুণ বাতাস!

মর্মর পাথরের চোখে নক্ষত্র অগ্নিতে জ্বলে অশ্রুর লাবণ্য
মনে হয় বুঝিবা পাষাণেরও প্রাণ আছে হর্ষ-বিধুর.. ..
তুমি শ্মশাণচারীর মতো নিদ্রাবিমুখ..ঘোর অমানিশায়
জানি তোমার এ ঘুম ভাঙ্গিবে না
                       ভাঙ্গিবে না আর কোনো দিন!

আবহাওয়ার রোজনামচা

সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে—ভেবে চিন্তে তৈরি করা
কাঠের লোহিত বরণে বার্নিশ সেতুটির মতো
রূপালি সলিলে ভাসা নির্ঝর সঙ্গীত,
যার শ্রবণে জোৎস্নার জাফরি গলে আমরা
ফিরে দেখতে পারি—ঐতিহ্যে মোড়া আমাদের অতীত,
মহাশূন্যের প্রতিফলনে ঋদ্ধ বর্ণের সমাহারে
সৃজিত কিছু চিত্র,
অগ্নিকুণ্ড ঘিরে বসার বৈঠকি পরিবেশ
গুল্পগুজব করার মতো কতিপয় মিত্র;

জাহাজ সমুদ্রে নাও ভাসতে পারে
ঝলসাবে না হয়তো সোনালি-নীলাভ আলো বাতিঘরে,
জরুরি হচ্ছে—
আবহাওয়ার রোজনামচা লেখা হররোজ বিশুদ্ধ অক্ষরে।

আগামীর ময়নাতদন্তে উঠে আসবে
সাতটি আগুন পাহাড়ে যুগপৎ বিষ্ফোরণের সংবাদ
ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা গড়বে রাজ্য—বিস্তৃত হবে জ্বালানীর বিবাদ,
কৃষ্ণপক্ষের কৃষ্ণাভ নীলিমায় উৎক্ষিপ্ত হবে
তপ্ত লাভার কমলালেবু রঙের ফানুস,
জরুরি হচ্ছে—জনপদে খোঁজা
রঙধনুর আবিরে সিক্ত মানুষ।

অপরাজিতার নীল রোদে রাগ ভূপালি

আমার পৃথিবী জুড়ে ফুটেছিল একদিন
অজস্র অপরাজিতা—থোকা থোকা নিখাদ নীল,
শিরদাড়া সোজা করে বেরিকেড দিয়েছিলাম
বেঈনসাফের পথ পরিক্রমায়
অসহিষ্ণু শদ্দাদের হুকুম করিনি তামিল।

ছেড়েছি ঘর একদিন, খুঁজেছি নীলিমা
স্নোরক্যাল পরে করোটিতে—
জলতলে ছুঁয়েছি সমুদ্রের প্রবাল,
আমাজনের বহতা তীর বিছারি খুঁড়েছি মাটি
বেরিয়ে এসেছে পুর্তগীজ পাইরেটদের গড়া কাথিড্রাল।

পরিযায়ী হওয়া হরিণের পিছু পিছু গিয়েছি হেঁটে
মুস প্রজাতির বিপুল শিংগাল মুখ ডুবিয়েছে ঝিলে,
পিঁপড়ার সামনে রেখেছি শর্করা মেশানো ককোর প্রলোভন
সৃজন করেছি সহমর্মী রহম এ দগ্ধদিলে।

বসেছি রেলগাড়ির জানালায়
জলমগ্ন ধানের ক্ষেত—আলে শাদা বক
ব্যাঙাচির সাঁতারে কেঁপেছে তালগাছের স্থির ছায়া,
ভেবেছি একদিন তর্জমা করতে শিখব
নিসর্গের মরমি তসবির ধরে রাখে কী যে মায়া।

মন্দিরের আঙিনায় শিশির ভেজা শিউলি কুড়িয়ে
উঠে দাঁড়িয়েছে কিশোরী—হাতে তার নৈবদ্যের থালি,
আমার হৃদয় সায়রে মেঘনা কুলকার্নি একদিন
গেয়ে উঠেছিল বিদুর তানপুরায় রাগ ভূপালি।

আবির মাখা কবুতর

পৈঠায় পা রেখে..খুব ধীরে..উঠে বসো
জাফরানি রঙের পানসিতে—
খুঁজেছো যা .. ..অনন্তের নক্ষত্রবীথি
আকুল হয়ে সারা দিনমান
বুনেছি বস্ত্র সুইসুতাহীন নিরস্ত্র.. ..
পারিনি দিতে;

পাটাতনে বনঘুঘুর ডিম—
বাগিচায় খুঁড়ে পাওয়া কাঠবিড়ালীর জীবাষ্ম,
ভালোবাসায় নিরংকুশ
            সন্ন্যাসীর জটাজুটের মুখোশ...
তন্দুলে মাখানো ছাইভষ্ম;

হালে হাত রেখে তাকাও..
দূরে—দেখতে কি পাও
হৃদয়ে নীলাভ হয়ে আসা সংযত দিগন্ত,
হাঁস ছানা ধান ..
কুয়াশায় অধীর
         হারিয়ে যাচ্ছে দস্তা-মদির অনন্ত..

কথা বলার কিছু নেই
চুপচাপ থাকাটাই ভালো,
গলুই ছুঁয়ে পানকৌড়ির পাখায় ওড়ে
রূপার আলো,
এ সময় আমাদের অতল নির্জন
বলা চলে তুমুল নির্বাক,
কান পেতে শোনো—
মাস্তুলের ওপর গুঞ্জন করে পোষা মৌচাক;

ভাসছে না—
চলছে দনকলস সর্ষের শুভ্রহরিৎ মাড়িয়ে
তালকুঞ্জের ওপর দিয়ে আশ্চর্য এ জলযান,
এ যাত্রায় বাহন আমাদের এমফিবিয়ান;

এসে তো পড়েছি—
সোনাঝরা সবুজ সায়র..ঘাসের গাঢ় রীজে
সুপারির স্মৃতিময় সারি,
ভবের হাটে মননের মন্দ্র মনসিজে—

নাও..এগিয়ে দিচ্ছি পানদান.. হাত বাড়াও
দেখতে কি পাও—
তবকে মোড়া রূপালি
সৌরভ ছড়ানো জোড়া সরোবর,
জলে ভাসে আবির মাখা দুটি কাজলা কবুতর।

চার্চে সান্দ্রা মরালেস

হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটে গেরিলা—ঘাসবনে গিরগিটি
গ্রাসহপারের ওড়াউড়িতে ছড়ায় বর্ণ অশেষ,
বাহারি দিনযাপনে আসে কাকো পানের বার্তা
গির্জায় সলো গাইবে আজ সান্দ্রা মরালেস;
গথিক কেতার শাদা দালানে জমবে কনসার্ট
আফ্রো ক্যারিবিয়ান সুরবাহার,
লিমোজিন হাঁকিয়ে চলে আসি চার্চে
বজায় রেখে কূটনৈতিক শিষ্টাচার;
বাটিকের কাফতান পরে দাঁড়িয়ে ছিল
অনমনা সে—বেদির সিঁড়িতে,
জ্বলে মোমবাতি কাচ ঝলসানো জানালায়
ক্রুশবৃক্ষের তলায় বৃদ্ধ যাজক বসে মেহগিনির পিড়িতে,

জননী মরিয়মের শরীরে জড়িয়ে মাকড়শার জাল,
লিম্বা গোত্রের তিন কাফ্রি ঢোলকে তোলে তাল;
সুরস্থাপত্যের মরমরঙীন দোলাচলে আমি নাজেহাল;

গাইছে সান্দ্রা আজ মন্দ্র স্বরে জ্যাজ ও ব্লুজ
তার পরে কান্ট্রি মিউজিক,
সমজদারি মন আমার উন্নাসিক,
জড়োয়ার রূপালি নীল স্ফটিকে ঠোকর খায়
আলোর জাফরানি সংঘাত,
গথিক গুম্ভুজে মনের মর্মান্তিক মুজরায়
বাজে প্রতিধ্বনির অভিঘাত।

আপনার মতামত লিখুন :

হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে

হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে
হুমায়ূন আহমেদ

 

তিনি বলেছিলেন, তার মৃত্যুতে কেউ যেন না কাঁদে। বিষাদ কণ্ঠে গেয়েছিলেন গান, ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায় রে জাদু ধন। মরিলে কান্দিস না আমার দায়।’

কিন্তু সাত বছর আগে সুদূর আমেরিকায় তিনি যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন পুরো বাংলাদেশ কেঁদেছিল তার জন্য। শুধু সেদিনই নয়, বাংলা সাহিত্যের ভক্ত-অনুরাগীরা প্রতিটি দিনই তাকে স্মরণ করেন। তার কথা ভাবেন। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে।

১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর জন্ম নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন ২০১২ সালের ১৯ জুলাই। জীবনের প্রতিটি দিন তিনি ছিলেন সৃষ্টিশীল ও কর্মমুখর। জীবনকে উপভোগ করেছেন তিনি সৃজনের বিবিধ উপাচারে।

হাওর-বাওর-গানের দেশ বৃহত্তর ময়মনসিংহের নেত্রকোণার মোহনগঞ্জের নানাবাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। একই জেলার কেন্দুয়ার কুতুবপুর তার পিতৃভূমি।

পিতার চাকরির সুবাদে হুমায়ূনের শৈশব-কৈশোর কেটেছে বাংলাদেশের বহু স্থানে। সিলেটের মীরাবাজার, চট্টগ্রাম শহর, পিরোজপুরের মনকাড়া প্রকৃতিতে। যেসব কথা তার লেখায় বারবার ফিরে এসেছে।

স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নের স্নাতকোত্তর পাশ করেন তিনি। পিএইচডি ডিগ্রি নেন আমেরিকার থেকে। শুরু করেন অধ্যাপনা।

কিন্তু তার ভাগ্য মিশে ছিল সাহিত্যে। সার্বক্ষণিক লেখালেখি, নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণকে তিনি বেছে নেন। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ও ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসের মাধ্যমে যে লেখক জীবনের সূচনা ঘটে, তা পরিণত হয় বাংলা সাহিত্যের অবিস্মরণীয়-জনপ্রিয় লেখক সত্তায়।

গল্প-উপন্যাসের জাদুকরী ক্ষমতায় অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করেন তিনি। মানুষ লাইন ধরে কেনে তার বই। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি হয় হাজার হাজার কপি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন ঘটনা ছিল অভূতপূর্ব।

আর তিনি ছিলেন মেধা, প্রতিভা ও জনপ্রিয়তার এক বিরল ব্যক্তিত্ব। সমকাল তো বটেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি গড়েছিলেন পাঠকপ্রিয়তার তুঙ্গস্পর্শী রেকর্ড। যে রেকর্ড কারো পক্ষে ভাঙা আদৌ সম্ভব হবে না।

‘অচিনপুর’, ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’, ‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে’, ‘লীলাবতী’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘অচিনপুর’, ‘বাদশাহ নামদার’, ‘দেয়াল’, এমন তিন শতাধিক পাঠকনন্দিত উপন্যাসের রচয়িতা হুমায়ূন আহমেদ বাংলা কথাসাহিত্যে অর্জন করেন নিজস্ব পরিচিতি ও ভূগোল। একা লড়াই করে সাহিত্যের পাঠক সৃষ্টির পাশাপাশি মৃতপ্রায় প্রকাশনাকে বাঁচিয়ে দেন তিনি।

টিভি নাটকেও জনপ্রিয়তার ইতিহাস গড়েন তিনি। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘অয়োময়’, ‘দূরে কোথাও’, এমন হৃদয়ছোঁয়া নাটকের মাধ্যমে ছোটপর্দায় টেনে আনেন হাজার হাজার দর্শক।

চলচ্চিত্র নির্মাণ করেও সোনা ফলিয়েছেন হুমায়ূন। সিনেমাহলমুখী করেছেন মানুষকে। তার নির্মিত ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘ঘেটু পুত্র কমলা’র মতো ছবি বাণিজ্য সফল ও পুরস্কৃত হয়েছে।

নাটক ও চলচ্চিত্রে তিনি লোকবাংলার বহু গান চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার কথা বলেছেন। মানব-মানবীর অন্তর্গত হৃদয়ের দাহ ও বিষাদকে তুলে ধরেছেন অনন্য সুষমায়। তাকে ঘিরে শিল্প, সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্রের এক নান্দনিক জগত উন্মোচিত হয়েছিল।

প্রেম ও রহস্যময় বেদনার প্রতীক নগ্নপদে হলুদপাঞ্জাবির ‘হিমু’ তার অনবদ্য সৃষ্টি। যুক্তিবাদী বিশ্লেষক মিসির আলীর মতো চরিত্রও তিনি সৃষ্টি করেছেন। হুমায়ূনের এই দুই চরিত্রের কথা বাংলা সাহিত্যের পাঠক সহজে ভুলবে না। ভুলবে না এমন আরো অনেক মানবিক চরিত্র ও কাহিনীর নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদকেও।

মুক্তিযুদ্ধের মহান শহীদ, পুলিশ অফিসার বাবার জেষ্ঠ্য সন্তান হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টির পুরোটা জুড়েই আছে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ। হুমায়ূনের উপন্যাস ‘১৯৭১’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘উতল হাওয়া’ এবং চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’ বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের হৃদয়স্পর্শী কাহিনীচিত্র। যুদ্ধাপরাধ, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লেখার পাশাপাশি আন্দোলনও করেছেন তিনি।

প্রেম ও বিরহ হুমায়ূনের লেখার মূল উপজীব্য হলেও তিনি তার লেখায় অপরূপ দক্ষতায় স্পর্শ করেছেন রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক ঘটনাবলি। লেখার মায়াবী টানে তিনি পৌঁছে গেছেন মানুষের নিবিড় সান্নিধ্যে। নীল জোছনায় বেদনাহত একটি তরুণ কিংবা নীলপদ্ম হাতে একটি তরুণীর স্মৃতি-সত্তা পেরিয়ে হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন মানুষের চেতনার গহীন প্রদেশে। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে।

কাঙ্গাল হরিনাথের ১৮৬তম জন্মবার্ষিকী

কাঙ্গাল হরিনাথের ১৮৬তম জন্মবার্ষিকী
ছবি: সংগৃহীত

সাংবাদিকতার পথিকৃৎ, সাহিত্যিক, সমাজসেবক ও নারী জাগরণের অন্যতম দিকপাল কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের ১৮৬তম জন্মদিন আজ শনিবার (২০ জুলাই)। 

কালজয়ী এই সাংবাদিক ১২৪০ সালের ৫ই শ্রাবণ (ইংরেজি ১৮৩৩) কুষ্টিয়া জেলার (তদানীন্তন নদীয়া) কুমারখালী শহরের কুন্ডুপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম হলধর মজুমদার ও মায়ের নাম  কমলিনী দেবী।

হরিনাথ মজুমদার ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। শৈশবেই মাতৃ ও পিতৃহারা হয়ে চরম দারিদ্র্যতার মধ্যদিয়ে বেড়ে উঠেন তিনি। তিনি অত্যাচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে ছিলেন আপসহীন।

তৎকালীন সময়ে তিনি (১৮৫৭ সাল) প্রাচীন জনপদ কুমারখালীর নিভৃত গ্রাম থেকে হাতে লেখা পত্রিকা 'মাসিক গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা' প্রকাশ করেন। গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকায় তিনি ইংরেজ নীলকর, জমিদার ও শোষক শ্রেণির অত্যাচার, জুলুম, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার ও সামাজিক কু-প্রথার বিরুদ্ধে খবর প্রকাশ করেন। হাজারো বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে তিনি পত্রিকাটি প্রায় একযুগ প্রকাশ করেছিলেন।পরবর্তীতে মাসিক থেকে পাক্ষিক এবং ১৮৬৩ সালে সাপ্তাহিক আকারে কলকাতার গিরিশচন্দ্র বিদ্যারত্ন প্রেস থেকে নিয়মিত প্রকাশ করেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/20/1563602039922.jpg
কাঙ্গাল হরিনাথের লেখা পত্রিকা 'মাসিক গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা' 

 

১৮৭৩ সালে কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার তঁর সুহৃদ অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়’র বাবা মথুরনাথ মৈত্রয়’র আর্থিক সহায়তায় কুমারখালীতে এম, এন প্রেস স্থাপন করে, গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’র প্রকাশনা অব্যাহত রাখেন।

কুষ্টিয়ার প্রবীণ সাংবাদিক আবদুর রশীদ চৌধুরী বলেন, সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার ৬৩ বছরে জীবনকালে তিনি সাংবাদিকতা, আধ্যাত্ম সাধন, সাহিত্যচর্চা সহ নানাধরণের সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। মূলত তিনি ছিলেন সাংবাদিকতা পেশার একজন সংগ্রামী মানুষ।

কালজয়ী এই সাংবাদিক জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আজ শনিবার (২০ জুলাই) কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর মিলনায়তনে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/20/1563602126966.jpg
কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর মিলনায়তন

 

কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর য়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন, কুষ্টিয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার সেলিম আলতাফ জর্জ।

বিশেষ অতিথি থাকবেন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সচিব (যুগ্ম সচিব) মোঃ আবদুল মজিদ, কুমারখালী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ আব্দুল মান্নান খান, পৌর সভার মেয়র মোঃ সামছুজ্জামান অরুণ। অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসাবে থাকবেন, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড.আবুল আহসান চৌধুরী।

সাংবাদিক কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার প্রায় ৪০টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তবে বেশিরভাগ অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। তাঁর গ্রন্থগুলোর মধ্যে বিজয় বসন্ত একটি সফল উপন্যাস। গবেষকদের মতে, কাঙ্গাল হরিনাথ রচিত বিজয় বসন্ত উপন্যাসটিই বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম উপন্যাস। 

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/20/1563602157692.jpg
কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর মিলনায়তনের সামনের চিত্র 

 

গ্রামীণ সাংবাদিকতার এবং দরিদ্র কৃষক ও অসহায় সাধারণ মানুষের সুখ-দু:খের একমাত্র অবলম্বন কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের স্মৃতি রক্ষার্থে সরকারি উদ্যোগে কুমারখালীতে সাংবাদিক কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ করা হলেও এখনো অবহেলিত রয়েছে এই কালজয়ী সাংবাদিকের জন্মভিটা (বাস্তুভিটা)।

স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীসহ কবি-সাহিত্যিকদের ভাষ্যমতে, কাঙ্গাল হরিনাথ ব্যবহৃত ও গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’র সেই মুদ্রণ যন্ত্রটি এখনো অযত্ন অবহেলায় অন্ধকার একটি ভাঙা ঘরে পড়ে রয়েছে। তাই অনতিবিলম্বে ঐতিহ্যবাহী এই মুদ্রণ যন্ত্রটি কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘরে স্থানান্তর এবং কাঙ্গালের সমাধিসহ জন্মভিটা (বাস্তুভিটা) সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।  

কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার বাংলা ১৩০৩ সালের ৫ বৈশাখ (ইংরেজি ১৮৯৬ সাল, ১৬ এপ্রিল) নিজ বাড়িতে দেহত্যাগ করেন। 

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র