Alexa

প্রত্যাবর্তন

প্রত্যাবর্তন

অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ

ছোট মেয়ের পাতের দিকে তাকিয়ে সুভাষ বাবু চোখ সরিয়ে আনলেন। এই মেয়েটা বড্ড আবদার করত; কে জানে কী বুঝে আজকাল বাবার কাছে আসে কম। মেয়ের মা কিছু বলার কথা না। জানলে তো সে বলবে। তবুও পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্যও টের পায় হয়তো কিছু আঁচ আর সমূহ সংকেত। নয়তো মাছ ছাড়া খেতে পারত না যে মেয়ে সে চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে কাঁঠাল বিচি ভর্তায় শুকনো ভাতের দলা। মেয়েগুলোর মাধ্যমিক পরীক্ষা সামনেই, এই সময় একটু দুধ ডিম না হলে হয়! বড় মেয়েটা বড় হয়ে গেল দেখতে দেখতে। মায়ের মতো সুন্দর চোখ আর গায়ের রঙ। তার খাওয়া ভালো না হলেও হয়, কেবল ঘুম হলেও হয়ে যায়। মেয়েগুলো কেমন বড় হয়ে গেল, ফান্ডের টাকাগুলো মেয়েদের সাথেই বেড়ে উঠছিল।

বাবা তোমার ভাতে মশা, মেয়ের কথায় সুভাষ বাবু মশা সরিয়ে আবার খেয়ে নিলেন। এই মেয়েটা এমনই, কথা ছাড়া সে থাকতেই পারে না। কাল শুক্রবার, সকালেই আসবে বাবার কাছে, একটা একটা পাকাচুল পঞ্চাশ পয়সা করে টানা চলবে, বাবার চুল আনা। এটি পাঁচ টাকায় গিয়ে ঠেকবে। আর হিসেব খুলে বলবে, বাবা ত্রিশ টাকা পাই তোমার কাছে, কবে দিবা? হুম আরো আনেকেই টাকা পায় রে মা, ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে  পরলেন সুভাষ বাবু। 

বৃহস্পতিবার রাতে ফিরে আসতেন ঢাকা থেকে, মা তখন জীবিত, মরণ চান্দের দই ছাড়া বাড়ি গেলে সারারাত বকতেন ছেলে আর বউকে। বউ পাইয়া মা ভুলছে, ভুল ভুল, মরলে বুঝবি। অনেকদিন পর মা আসলেন আজ।
- মা।
- বল বাবা।
- আজ দই আনি নাই মা।
- হা হা পাগল।
- না মা, তুমি আমায় বকো আবার।
- মরা মানুষ বকে রে বোকা।
- কথা কউ যে তাইলে।
- তর কী হইছে বাবা?
- মা আমি আর ঢাকা যাই না, বাড়ি থেকে বের হয়ে হাঁটি, হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যা করি মা। আবার বাড়িতে  ফিরি। চাল শেষ মা, আর বাকিতে দিবে না, মেয়েগুলোর স্কুল ড্রেস ছিঁড়ে গেছে মা, জুতাগুলো দিয়ে আঙুল বেড়িয়ে আসে। মা মেয়েটা তোমার মতো মাছ খেতে চায়, হাসতে চায়। আমার মেয়েগুলো কী তোমার  মতো ছেড়ে যাবে আমায়!
- আমি তো যাই নাই বাবা। এই যে তোর কাছে, মা ডাকলেই পাবি।
- আসে মা, ছোট মেয়েটা আসে তোমারে ডাকলেই, মা মা মা।

‘বাবা উঠো, কী হলো তোমার! বাবা বাবা...’

সুভাষ বাবুর আরো একটা  সকাল হয়ে উঠল, এটা ছুটির দিন। বাজারের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ল সে।  বটগাছ সমেত শ্মশান মন্দিরে এলে সারাদিন কাটানো যায়। নেশা আর পেশায় কাতর অকাতর মানুষের ভিড়ে হারায় এখানে আশ্চর্য ভাবনারা। ভাবতে ভাবতে এসে থেমে যায় সুভাষ। শেফালী কী ভাবে এই দিনগুলোতে, মায়া চোখে মধ্য বয়সে আরো গম্ভীর হয়ে উঠেছে এই নারী। কেরানি স্বামীর ত্রিশ দিনের হিসেব তার জানা। তবু কেমন নিস্পৃহ যাপন, কোনো প্রশ্ন না করে রেখে যায় শীতলতা। শ্মশান ছাপিয়ে দূরের কুয়াশায় ভেসে আসা শেফালীর মুখের আদল যেন ছুঁয়ে যায়। ভর বিকেলে বট গাছের ছায়ায় ঠান্ডা লাগলে সুভাষ বাবু উঠে ফিরবে বলে ভাবে।

বাড়ি বলতে ঘর আর সন্তানের দেয়াল জুড়ে টানাটানি। ফিরে আসার তাড়ায় সে ছুটতে শুরু করে, সুভাষ এক পা নিয়ে দৌড়ায় ঢাকার ট্রেনের কামড়ায়, হিঁচড়ে যায় তার সহিষ্ণু চামড়া, ছুটে যায় সে শ্মশানের ভয়ে, প্রেতাত্মার আতঙ্ক আর ধোঁয়ায় নিজেকে না পোড়ানোর মতো শক্তি নিয়ে জেগে ওঠে, চিমটি কাটে ঠিক কনুইয়ের ভাঁজে, জ্বলজ্বল করা বিড়ালের তাড়া খেয়ে বেরিয়ে আসে পৃথিবীর আলোয়। পৃথিবীর এই কোণায় তখন  অস্ত যাবে তেজী সূর্য।

কারখানা বন্ধ হয়েছে আড়াই মাস। সেদিন শনিবার। অফিস ঢুকতে গিয়ে দেখে বিশাল তালা ঝুলছে গেট বরাবর। তিন মাসের বেতন আর প্রফিডেন্টের টাকা, দুইটা বোনাস রয়ে গেল তখনও জমা।

সুভাষ আবারও দৌড়াচ্ছে। এবার তালা বন্ধ হবার আগেই সে বাড়ি পৌঁছে যেতে চায়।

আপনার মতামত লিখুন :