Barta24

বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট ২০১৯, ৭ ভাদ্র ১৪২৬

English

আকবর আলীর তৃতীয় পাপের আগে

আকবর আলীর তৃতীয় পাপের আগে
অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ
রুমা মোদক


  • Font increase
  • Font Decrease

মোমেনা ঘরে এসে পাশে বসে কপালে হাত রাখতেই ধপ করে নিবে যায় ইলেকট্রিসিটি। আকবর আলীর মনে হয় তার প্রস্তুতির সাথে এই শত্রুতা পূর্বপরিকল্পিত, মোমেনা ঘরে আসার সাথে সাথে অন্ধকার নামা আর তার সাথে চোরের সাক্ষী গাঁটকাটা আবহাওয়া। দীর্ঘ প্রস্তুতির কঠোর আত্মনিয়ন্ত্রণের পথ বেয়ে আজ সে নিজেকে দাঁড় করিয়েছে যে হিমশীতল চূড়ান্ত গন্তব্যের কাছাকাছি, আকবর আলী টের পায় মোমেনার করতলের উষ্ণতা সংক্রামক হয়ে সেই হিমশীতলতা গ্রাস করে ছড়িয়ে পড়তে চাইছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে.....বিশেষ অঙ্গেও! কী লজ্জা!! হিমশীতলতার বরফ গলে গলে পরাজিত হতে চায় জীবনের উষ্ণতার কাছে, নৈতিক কিংবা অনৈতিক, পাপ কিংবা পূণ্য কোনো হিসাবের ধার না ধেরে বেহিসাবী দুর্নিবার হতে চায়। কিন্তু, কিন্তু  প্রাণপণ লড়াই করে নেওয়া প্রস্তুতিকে এত তাড়াতাড়ি পরাজিত হতে দেবে সে? হতেই পারে না।

ঠিক তখন স্বর্গ মর্ত্য পাতাল কাঁপিয়ে একটা ঠাডা পড়ে বাইরে, ইলেকট্রিসিটিহীন জমাট জমাট অন্ধকার ছিঁড়ে ফুড়ে যায় বিজলীচমকের ডালপালায়। বিছানা লাগোয়া জানালার শার্সির কাঁপন থামে না, সমতলে ছুঁড়ে দেওয়া পানির মতো ছড়িয়ে যায় জানালা লাগোয়া নিষ্প্রাণ খাট-বিছানা আর সপ্রাণ মানুষ পর্যন্ত। আকবর আলী পাশ ফিরে শোয়, আজ তার শেষ সিঁড়ির ধাপগুলো পার হওয়ার কথা। প্রস্তুতিকাল অনতিদীর্ঘ হলেও প্রস্তুতির লড়াইটা কঠিন। প্রতিনিয়ত নিজের সাথে। লড়াইটা তার জন্য কঠোর হয়েছে অনভ্যস্ততার কারণে। এমন নয় যে সে আগে জীবনের জন্য কোনো সিঁড়ি বানায়নি সিঁড়ি বানানোর জন্য কোনো পাপ করেনি। মূলত জীবনের অতি অনিবার্য প্রয়োজনগুলো পাড়ি দেওয়ার জন্যই আরো দুটি পাপ করতে হয়েছে তাকে, পাপের বিনিময়ে সিঁড়ি বানাতে হয়েছে। কিন্তু তখন পাশে সান্ত্বনা নিয়ে আশ্রয় দিয়ে পরামর্শ দিয়ে পাশে ছিল জহুরা, জহুরা খাতুন। জহুরা খাতুন ছাড়া সে ছিল অচল, অসহায়, কিংকর্তব্যবিমূঢ়।

জননী যেমন খুন করে আসা পুত্রকেও ক্ষমা করে আশ্রয় দেয়, জহুরা ঠিক তেমন আশ্রয় ছিল তার। কিন্তু এই অন্তিম সিঁড়ি বানানোর লড়াইটি সম্পূর্ণ তার একার। কেবলই একার। আর এই লড়াই সিঁড়ি বানিয়ে প্রয়োজন পাড়ি দেবার নয়। বরং সব প্রয়োজন শেষ করে পাপ থেকে মুক্তি পাবার। যে পাপের কথা যে লড়াইয়ের কথা জহুরাকে জানানো যায় না। জানায় নি সে।

মোমেনার গায়ের গন্ধ তাকে বিচ্যূত করছে লক্ষ্য থেকে, শেষ সিঁড়িতে পা রাখার সকল প্রস্তুতি তার নস্যাৎ করে দিচ্ছে সুচতুর রাজনীতিবিদের মতো। মেয়েটা নিষ্পাপ। আকবর আলী জানে। তাই যতই সে অন্তর থেকে চাইছে মোমেনা চলে যাক, চলে যাক এখান থেকে, মুখে বলতে পারছে না। থাকুক বসে মোমেনা। তীরে এসে তরী ডুবালে চলবে না তার। অগ্রাহ্য করতে হবে মোমেনার উপস্থিতি, অবিচল থাকতে হবে নিজের লক্ষ্যে। তৃতীয় এবং শেষ ধাপের সিঁড়ি বানানো শেষ তার, এবার শুধু পাড়ি দেবার পালা...বানানো যখন শেষ তখন পাড়ি দিতে আটকে গেলে চলবে? ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না শেষ জীবনের শেষ  লড়াই।

আকবার আলী পা রাখে সিঁড়ির প্রথম ধাপে। ঠিক তখন দেখতে পায় একদম শেষ প্রান্তে, চূড়ান্ত গন্তব্যে হাত বাড়িয়ে বসে আছে জহুরা খাতুন। আশ্চর্য! জহুরা খাতুন কী টের পেয়ে গেল? সে তো এই বলেনি জহুরা খাতুনকে। তবে কেন সে হাত বাড়িয়ে বসে আছে বাউন্ডুলে ছেলের ঘরে ফেরার অপেক্ষায় থাকা মায়ের মতো?

সেই প্রথমবার প্রথম পাপটি করে বাড়ি ফেরার পরও জহুরা চেহারা দেখেই বুঝে ফেলেছিল কিছু একটা ঘটেছে। কিন্তু তারপরও সারা বিকাল-সন্ধ্যা তাঁকে ঘাটায়নি কিন্তু রাত গভীর হলে, নিঃশব্দ হলে, আদিম প্রবৃত্তি যখন উত্তাল হয় বিপরীত লিঙ্গের সান্নিধ্যের নেশায়, তখন জহুরা একে একে শরীরের ভাঁজ খুলে খুলে জানতে চায়—কী হইছে কন দেহি তোবারকের বাপ। আকবর আলী জানে জহুরার কাছে লুকাবার কোনো উপায় নেই। প্রয়োজনও নেই। স্বীকারোক্তি নয়। বরং বলাটা প্রয়োজন। কারণ জহুরাই একমাত্র আশ্রয় তার। নিজেকে নির্দোষ কিংবা মহান প্রমাণপূর্বক সামান্য সহানুভূতি প্রত্যাশার ভান না করেই সে বলে, সদ্য অবসরপ্রাপ্ত হেড কেরানি কেরামত খানের পেনশনের ফাইল আটকে পঞ্চাশ হাজার টাকা উৎকোচ নেবার ঘটনাটা। জহুরা  দু’ হাতে আকবর আলীকে শরীরের অলিন্দে অলিন্দে টেনে নিতে নিতে ফিসফিস করে—খুব ভালা করছো। খুব ভালা কাম করছো। ব্যাটার কামটাও হইল, আম্রারটাও। জহুরা খাতুনের উৎসাহে সেদিন আকবর আরীর শিরায় শিরায় যেন নতুন যৌবনের টগবগে ঘোড়ার জোয়ার নামে। উদ্দাম হয়ে পড়ে সে......জহুরাও ফোঁস ফোঁস শব্দে আত্মসাৎ করে স্বামীর মধ্যযৌবনের উপচে ওঠা জোয়ার। দুজনেই পরমতৃপ্ত। এই পঞ্চাশ হাজার টাকা এই মূহুর্তে না হলে বড় মেয়ের বিয়ের খরচের শুরুটা করা যাচ্ছিল না।

এই ছেলে যে দুনিয়াতে কেমনে করে খাবে—এই চিন্তায় চিন্তায় শেষ শয্যায় গেছে আকবার আলীর বাপ-মা। তিন ছেলের মধ্যে আকবর আলী সবচেয়ে সরল-সহজ। পাড়ার ছেলেরা তারে মূল দলে না নিয়ে সাইড লাইনে বসিয়ে তারই ফুটবল দিয়ে দিব্যি খেলে যায়। বন্ধুত্বের খাতিরে সময় সময় তার মাথায় হাত বুলিয়ে বাড়ির ভিতর ঢুকে কড়া বৈশাখের রোদে গাছের সব কাঁচা আম, শেষ মাঘের শীতে কোঁচড়  ভরে কুল পেড়ে নিয়ে যায়। পরীক্ষার আগের রাতে পড়া বই সে সহপাঠীর বাসায় দিয়ে আসে সহপাঠীর কান্নায় গলে। এই ছেলে দুনিয়াতে খাবে কেমনে—বাপ-মায়ের পুনপুন এই আক্ষেপ প্রোথিত হয়েছিল তার বিশ্বাসেও। দুনিয়াতে চলে-ফিরে খাবার যোগ্যতা তার নাই।

কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ্ সে ঠেকে নাই। টেনেটুনে মাধ্যমিক এবং বার কয়েকের মাথায় ভাগ্যক্রমে বাহাত্তার সনে সদ্য স্বাধীন দেশে বই খুলে পাশের হিড়িকের সুযোগে উচ্চমাধ্যমিকের ঘরও। আর দিব্যি একখানা চাকরি আর চাকরির খাতিরে জহুরার মতো বুদ্ধিমতী-কৌশলী স্ত্রীও জুটে গেছে। যার অপরিসীম বুদ্ধি আর সুনিপুণ দক্ষতায় চাকরির গোনা টাকায় দিব্যি সংসার চলে গেছে। তার গায়ে কোনো আঁচই লাগেনি কোনো সংকট-উত্তাপের। বাসা ভাড়া থেকে ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, ঈদে গরু কেনা থেকে শ্বশুরের চেহলামে চাঁদা দেওয়া কিছুই সংসারের প্রচলিত নিয়মানুসারে পুরুষ হয়েও ভাবতে হয়নি তার।

বড় নির্ভার-নিরিবিলি-নিশ্চিত দিনযাপন করেছে সে। বাপ-মায়ের আক্ষেপ-দুশ্চিন্তা মিথ্যে করে তার দুনিয়ায় চলে খাওয়া বরং ঈর্ষাই জাগাত আশে পাশের পুরুষদের। অন্য পুরুষরা যখন সংসারের দৈর্ঘ্য-প্রস্থে অপর্যাপ্ত কম্বলের মতো খরচ টানতে হিমসিম খেতো, পা ঢাকলে মাথা ঢাকতে পারত না, মাথা ঢাকলে পা উদোম হয়ে পড়ত, তখন আকবর আলীর নিশ্চিত দিনযাপনের অলক্ষ্যে স্ত্রী ভাগ্য আবিষ্কার করে তারাই আক্ষেপে ডুবে মরত।

প্রথমবার জহুরার কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ দেখেছিল সে সেবারই। নইলে বাপ-মায়ের আক্ষেপ মিথ্যে করার স্বস্তিতেই দিন কাটছিল তার। বড় মেয়েটার বয়স আঠারোর ঘর পার হতে না হতেই আমেরিকা প্রবাসী পাত্রপক্ষ বাড়ি পর্যন্ত এলে জহুরার জহুরী বিবেচনা সুযোগটি হাতছাড়া করতে চায়নি। পাত্রের ফিরে যাবার তাড়া। সাতদিনের মধ্যে বিয়ে দেওয়ার তাগাদায় একবারই সে ভাঁজ দেখেছিল জহুরার কপালে—এই মূহুর্তে বিয়া ধরলে কম কইরা লাখখানেক টাকা লাগব, পাই কই!

সবসময় সংসারের সব আপদ-টানাপোড়েন থেকে তাঁকে আগলে রাখা জহুরার এই অস্থির ভাঁজ—তারে অসহ্য করে। কী করে সে! কেমনে মুক্তি দেয় সে জহুরাকে এই দুশ্চিন্তা থেকে। ভিতরে ভিতরে ভেবেছে সে, জহুরাকে বুঝতে দেয়নি। শেষ পর্যন্ত সামনে খোলা থাকা একমাত্র উপায়টিই কাজে লাগিয়েছে সে। পাপ জেনেই। অন্যায় জেনেই। ঘাম ধুয়ে ভিজে জবজবে শরীরে ওয়াশরুম থেকে ফিরে শরীরে খুলে রাখা কাপড়খানা জড়িয়ে জহুরা ফ্যানের স্পিড বাড়াতে বাড়াতে পাশে বসে কাঁধে হাত রেখে বলেছিল—শোনো, কতজন জীবনে উপ্রে উডার সিঁড়ি বানাইতে কত আকাম করে, মাইয়াডারে বিয়া দেওয়ার জইন্য সামান্য হাজার পঞ্চাশেক টাকা নিয়া মুখডা অমন পাতিলের তলার মতো কালো বানাইয়া রাখছো কেন? যা করছো, ঠিক করছো। এরকম একটু-আধটু সিঁড়ি আগে থেকে বানাইলে এতদিনে কই থাকতা একবার ভাবো!

জহুরার কথায় কী স্বর্গীয় সুধা ছিল কে জানে, সঙ্গমক্লান্ত শ্রান্ত শরীরে যেন শীতাতপযন্ত্রের হাওয়া লাগে। অপার শান্তি আর স্বস্তিতে জীবনের এক কঠিন সিঁড়ি পাড়ি দেওয়ার সুখে ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসতে থাকে তার...।

ঘুম ঘুম চোখে জহুরার হাত বাড়িয়ে আকুল বসে থাকার দিকে দ্রুত আবার সিঁড়িতে পা রাখে আকবর আলী। এই শেষ সিঁড়ি, দীর্ঘ লড়াই শেষে প্রস্তুতি তার। দ্রুত পাড়ি দিতেই হবে। পৌঁছাতে হবেই শেষ মাথায়… মোমেনার ব্লাউজভেজা ঘামের মাতাল গন্ধ সিঁড়িতে রাখা পা টলিয়ে দেয়, ভরপেট মাতালের পায়ের মতো। আকবর আলী বিপর্যন্ত বোধ করে। বাইরে বিজলি ঝড়ের তুমুল দাপাদাপি, সুপারি গাছের পাতায় পাতায় বিপন্নতার শো শো...। বাইরের ঠাডার গর্জন যেন মোমেনার উষ্ণতার মতো ভীষণ। সংযমের সব দেয়াল ভেঙেচুরে ঢুকে পরতে চায় অন্দরে। এই ঠাডা ঝড় ঝঞ্ছা না থামলে মোমেনা তাকে একা ফেলে যাবে না। ভালোই জানে আকবর আলী। বাঁধভেঙে পানির তোড়ের মতো বাড়তে থাকে বৃষ্টির তোড়… কাছাকাছি থামার কোনোই লক্ষণ নেই আকাশে-বাতাসে। বৃষ্টির তোড় আর বিজলি চমকানোর প্রতিযোগিতা যতই বাড়তে থাকে, ততই বাড়তে থাকে আকবর আলীর বিপন্নতাও। কপালে রাখা মোমেনার উষ্ণ হাত চঞ্চল হয়। আঙুলগুলো সমদূরত্বে সুবিন্যস্ত ফাঁক হয়ে হাঁটতে থাকে চুলের গহীনে গহীনে। আকবর আলীর সংহত লক্ষ্য শিথিল হয়ে যেতে চায়। নিজের সাথে নিজের তীব্র লড়াই চলতে থাকে অবিরাম। এই উষ্ণতার লোভে পড়ার পাপে জড়িয়ে পড়লে চলবে না কোনোমতেই। ঐ তো সিঁড়ির শেষ ধাপে জহুরা খাতুন দাঁড়িয়ে আছে হাত বাড়িয়ে...। তাকে যেতে হবে।

এমনি দাঁড়িয়েছিল জহুরা খাতুন সেদিনও, যেদিন দ্বিতীয় পাপটি করে তার আশ্রয়েই ফিরেছিল সে। ঢাকা থেকে নতুন প্রজেক্টের পিডি ট্রেনিং প্রোগ্রাম উদ্বোধন করে কেন যেন আকবর আলীকেই সবচেয়ে বিশ্বস্ত ভেবে কানে কানে জানিয়েছিল, হোটেলে রাতটা একটু এনজয় করতে চায়। আকবর আলী একটু থতমত খেলেও, জ্বী স্যার জ্বী স্যার বলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থার যোগাড়ে নামে। সবার আগে ফোন করে জহুরাকে। জহুরা এক কথায় তাঁকে অধিক উৎসাহে প্ররোচিত করে। বস বইলা কথা, খুশি অইলে কপালে কী ঘটে আল্লায় জানে। খুশি করেন খুশি করেন...। এসব ব্যাপারে আকবর আলীর অভিজ্ঞতা একবারেই নাই, জীবনে জহুরা ছাড়া দ্বিতীয় নারী শরীর দেখে নাই সে। তবে এমএলএসএস তকদিরের অভ্যাসের কথা অফিসে খোলা গোপনীয়। তকদিরের দ্বারস্থ হলে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ম্যানেজ করে ফেলে সে। সারাটা সময় বুক ধুকধুক করে... মেয়েটাকে হোটেলে পৌঁছে দিয়েই জহুরার আশ্রয়ে ফিরে ঘামতে থাকে সে। ঠান্ডার ফ্রিজের পানিতে লেুবু-লবন-চিনির শরবত গুলে আকবর আলীর হাতে দিয়ে হাসতে হাসতে ভেঙে পড়ে জহুরা—আহারে, দেখো কাণ্ড!  পাঁচ বাইচ্চার বাপ একটা মাইয়া মানুষ লইয়া এমুন কাঁইপা কুঁইপা শেষ। আর কেউ অইলে ঠিক… জহুরা শেষ করে না, নাউজুবিল্লাহ নাউজুবিল্লাহ পড়ে আকবর আলী, জীবনেও যেন এমন বিপথে চালিত না হয় সে। সে যাত্রা অবশ্য একটা বাজারী মেয়ের বিনিময়ে দারুণ নিশ্চিত নির্ভাবনার সিঁড়ি বানানো হয়ে গিয়েছিল তার। তিন ধাপ প্রমোশন পেয়েছিল আকবর আলী, বেতনের কাঠামোটা এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। অফিসের সবাই ঘটনাটা জানলেও প্রকাশ্যে কারো কিছু বলার সাহস ছিল না, কারণ বলাটা যে বসের বিপক্ষেই যায়।  তবে অনেকেই ঠেস দিয়ে কথা বলতে ছাড়ত না, গায়ে মাখত না আকবর আলী। তবে কেউ কেউ এমন সন্দেহও করত যে এমন নারীসঙ্গ বোধ করি তারও অভ্যাস, নইলে বস আর কাউকে না বলে তাকেই কেন বলতে গেল! সবার ঠেস দেওয়া কথা যদিও বা সহ্য করা যেত নীরবে, সন্দেহটুকু সইত না। জহুরার কাছে এসে গুজগুজ করত রাগে। জহুরা মুখ টিপে হাসত—ভালাই তো! সবাই যদি জানে আমার জামাইর এমন মুরোদ তো মন্দ কী? আমি তো জানি আফনে খালি আমার কাছেই পুরুষ মানুষ!

জহুরার এই তীব্র বিশ্বাস কী না ভেঙে পড়তে চাইছে! মোমেনার স্পর্শ তাকে জড়িয়ে জড়িয়ে বাঁধছে! মোমেনা এবার তার ঠোঁট দুটি নামিয়ে আনে প্রায় নিঃসাড় আকবর আলীর কানের কাছে, নিঃশ্বাসের উষ্ণতা টের পায় আকবর আলী। মোমেনা জানতে চায়—ডরাইতাছেন? ডরাইয়েন না। আমি পাশে বসা আছি। বাইরে আরো তুমুল বেগে নামে অবিশ্রান্ত বৃষ্টি। ইলেকট্রিসিটি আসার নামগন্ধ নাই। ঘরের ভিতর জ্বালানো মোমবাতির শিখাটা ফাঁক-ফোঁকড় গলে আসা বাতাসের সাথে লড়াই করেও জ্বলে যাচ্ছে অক্লান্ত। মোমেনার কণ্ঠ আর উদ্বিগ্নতা তাকে অস্থির করে। তাকে ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিতে চায় সে। কিন্তু নির্দেশ দেওয়ার সে বাসনা কণ্ঠনালীতেই ফ্যাসফ্যাস করে ঘুরে মরে। কেমনে বলে সে মোমেনাকে, কেমনে বলে। বলা নেই কওয়া নেই  হঠাৎ করে হার্ট এটাকে জহুরার মৃত্যুর পর যে অথৈ সমুদ্রে পড়েছিল আকবর আলী সেখান থেকে তো তাকে টেনে তুলেছে এই মোমেনা। ঠিক জহুরার মতো ওষুধখানা হাতের কাছে এনে দিয়ে, পাশে বসে পান বানিয়ে দিয়ে, মোজা জোড়া খুঁজে দিয়ে দিনের পর দিন নিজেকে অনিবার্য করে তুলেছে আকবর আলীর কাছে।

নইলে  জহুরার মৃত্যুর পর সবাই যখন জহুরার বেহেশত নসিবের জন্য হাত তুলছিল তখন আকবার আলী হাবুডুবু খাচ্ছিল মধ্য সমুদ্রে। কেমনে পাড়ি দেবে সে বাকি জীবন। যদিও বড় আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপর চিন্তা, তবুও সে অস্বীকার করতে পারে না জহুরার বেহেশত প্রাপ্তির চিন্তার চেয়ে নিজের বাকি জীবন কাটানোর চিন্তাই বেশি পীড়িত করেছিল তাকে সে মূহুর্তে। তৎক্ষণাৎ ছেলেমেয়েরা ‘আব্বা ভাইঙ্গা পইড়েন না, আমরা আছি তো’ ইত্যাদি সান্ত্বনা বাণী ক্রমাগত করে গেলেও দুই ছেলে আর তাদের বউরা ছেলেমেয়েদের পরীক্ষা-প্রাইভেট-স্কুল ইত্যাদি বাহানায় কেটে পড়েছে মাস না ফুরাতেই। আর দেশে থাকা একমাত্র মেয়ের স্বামীরও হোটেল রেঁস্তোরায় খেয়ে পেটের পীড়ার বাড়াবাড়িও আটকে রাখা গেল না মাসাধিক কাল।

ভাগ্যিস মাসখানেকের মধ্যেই ঘরে এলো মোমেনা আর লাগাম টেনে ধরল আউলা-ঝাউলা হয়ে পড়া আকবর আলীর জীবন। সবই ঠিকঠাক ছিল। বাকি ছেলেমেয়েরাও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিল মোমেনার যত্নআত্তি দেখে। কিন্তু সমস্যাটা তৈরি হলো নিজের ভেতরেই। এমন সমস্যা!! এমন সমস্যা কাউকে বলা যায় না, সহ্যও করা যায় না। এক দুঃসহ পাপবোধের ক্ষরণ তাকে রক্তাক্ত করতে থাকে প্রতিদিন। মোমেনা পাশে বসলে তার গায়ে গা লাগলে টের পায় আকবর আলী সে এখনো পুরুষ রয়ে গেছে। মনে মনে বয়স হিসাব করে সাত দশকের ঘর পার হয়নি যদিও, তবু এটা তো সব প্রবৃত্তি থেকে অবসর নেয়ারই বয়স। সামাজিকভাবেও প্রাকৃতিকভাবেও। কিন্তু কী আশ্চর্য! রাতে মশারির চারমাথা লাগিয়ে তোষকের নিচে টানটান গুঁজে দেওয়ার সময় ব্লাউজের গলা ভেদ করে দেখা যায় যে মোমেনার সুডৌল যৌবন, তা কিনা তার সারারাতের ঘুম কেড়ে নেয়। নানাভাবে চেষ্টা করে সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণের। ধর্মে-কর্মে অধিক মনোযোগী হয়। কিন্তু দিনকয় পরেই টের পায় লাভ হচ্ছে না। বরং মোমেনার প্রতি আকর্ষণ দ্বিগুণ মাত্রায় বাড়তে থাকে তার।

তারপরই এই সিঁড়ি বানানোর সিদ্ধান্ত নেয় সে। ধীরে-ধীরে, দিনে-দিনে। তৃতীয় পাপের আগেই জীবনের শেষ সিঁড়িটি বানাতে থাকে নিজের সাথে লড়াই করে করে...। কাউকে জানতেও দেয়নি, বুঝতেও...। আজই সেই সিঁড়ি বানানো শেষ করেছে সে। আজই তার শেষ বোঝাপড়ার রাত। এর আগে দু’ দুটো পাপ তার জীবনের সিঁড়ি পাড়ি দেওয়ায় অনিবার্য অনুষঙ্গ হয়েছে। আর এবারের সিঁড়িটা তাকে তৃতীয় পাপ থেকে মুক্তি দিয়ে পৌঁছে দেবে চূড়ান্ত গন্তব্যে।

ওষুধগুলো সে খেয়েছে মিনিট বিশেক আগেই। জমিয়ে রাখা ঘুমের ওষুধ। আকবর আলী ধীরে ধীরে তীব্র ঘুম টের পায়… টের পায় নিজ দেহের ক্রমশীতলতার দিকে যাত্রা।। কিছু কথা অস্পষ্ট কানে ঢোকে তার, কিছু ঢোকে না। মোমেনার উষ্ণ হাতও শীতল লাগে ততক্ষণে, শুনতে পায় মোমেনা উদ্বিগ্ন গলায় ডাকছে তার স্বামীকে, ডাকছে তার স্বামী আকবর আলীকে তৃতীয় ছেলে সোবহানকে—শুনছেন, তাড়াতাড়ি আইয়েন আব্বাজানের শরীলডা ক্যামন সাপের মতো ঠান্ডা লাগতাছে!! আকবর আলী শোনে কী শোনে না... অনেক দূর থেকে ছেলে সোবহানের কণ্ঠ—ও আব্বা! আব্বা!! চোখদুটো একবার খুলতে চায় সে.....পারে না। ততক্ষণে সে পৌঁছে গেছে সিঁড়ির শেষ ধাপে, জহুরার বাড়িয়ে থাকা হাত ছুঁয়ে।

আপনার মতামত লিখুন :

বাংলা অনুবাদ সাহিত্যে তারুণ্যের জাগরণ

বাংলা অনুবাদ সাহিত্যে তারুণ্যের জাগরণ
প্রসিদ্ধ প্রকাশনীর বড় ভরসা অনুবাদ সাহিত্যগুলো

বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার মধ্যে অনুবাদ সাহিত্য অনেক আগেই তৈরি করে নিয়েছে শক্তিশালী এক অবস্থান। গত এক দশকজুড়ে এই মাধ্যমটা হয়েছে আরো শক্তিশালী। বিভিন্ন প্রসিদ্ধ প্রকাশনীর বড় ভরসা অনুবাদ সাহিত্যগুলো। তেমনি অপেক্ষাকৃত ছোট ও কম খ্যাতিমান প্রকাশনীগুলোও অনুবাদ বই বের করতে বিনিয়োগ করছে এই আশায় যে, তাদের টাকাটা অন্তত কিছু লাভসহ উঠে আসবে। আর এই অনুবাদ সাহিত্যের জগতে, উল্লেখ্য এই সময়টাতে, ভালো অনুবাদক হিসেবে পাঠকদের মনে জায়গা করে নিয়েছেন বেশ কিছু তরুণ অনুবাদক। প্রকাশক ও পাঠক—উভয়েই ভরসা করতে পারছেন দক্ষ এসব তরুণ অনুবাদকদের ওপর।

এই তরুণ অনুবাদকদের বয়স ২০ থেকে ৩৫-এর মধ্যে। তাদের অনেকেই এখনো ছাত্র। কিন্তু, এরই মধ্যে তাদের অনেকের অনুবাদ করা বই অর্জন করেছে দারুণ পাঠকপ্রিয়তা। একই সাথে অনুবাদক হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছেন তারাও। বিশ্বের বিখ্যাত ও বড় বড় লেখকদের বই তারা অনুবাদ করে হাজির করছেন বিশ্বসাহিত্যে আগ্রহী দেশের পাঠককূলের কাছে। তাদের কারণেই অনেক বিখ্যাত ও মাস্টারপিস সাহিত্যকর্ম আস্বাদন করতে পারছেন দেশের বিপুল সংখ্যক পাঠক। কেননা, ভাষার সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে ইংরেজি বা অন্যান্য ভাষায় সেসব বই পড়া সম্ভব হয় না দেশের বেশিরভাগ পাঠকের। তাই, তাদের ভরসা অনুবাদ। আর একাজে আসলেই অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করছেন দেশের তরুণ অনুবাদকেরা। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকাশনীর অনুবাদকদের বেশিরভাগই আসলে এই বয়সী তরুণরাই।

বাংলাদেশে তরুণ অনুবাদকদের এই কর্মস্পৃহাকে স্বাগত জানান অন্বেষা প্রকাশনীর প্রকাশক ও সত্ত্বাধিকারী মোহাম্মদ শাহাদত হোসেন। তিনি বলেন, “তরুণ অনুবাদকদের অনেকেই ভালো করছে। আমাদের অন্বেষা প্রকাশনীতে মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ, সান্তা রিকি, আদনান আহমেদ রিজনের মতো তরুণ অনুবাদকেরা যথেষ্ট ভালো মানের অনুবাদ বই উপহার দিচ্ছেন, এবং সাড়াও পাচ্ছেন পাঠকদের কাছ থেকে। আর দেশে তরুণ অনুবাদক যারা আছেন, তারা যদি অনুবাদকে আরো অর্থবহ করে তোলার সক্ষমতা অর্জন করেন, তাহলে তা অনুবাদ ও প্রকাশনা শিল্প—দুটোর জন্যই ভালো। বেশ কিছু তরুণ অনুবাদক এখন দুর্দান্ত কাজ করছেন। নিকট ভবিষ্যতে দেশের অনুবাদসাহিত্যকে আরো ভালো জায়গায় তারা নিয়ে যাবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।”

এসময়ের একজন জনপ্রিয় তরুণ অনুবাদক মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ। ২০১৫ থেকে এপর্যন্ত তার অনুবাদ গ্রন্থ বের হয়েছে ৪০টির মতো। এপ্রসঙ্গে তিনি বলেন, “একসময় দেশে ভালো মানের অনুবাদ বই বের হতো বেশ কম। এইক্ষেত্রে তরুণরা যে এগিয়ে এসেছে এবং দারুণ কাজ দেখাচ্ছে, তা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। আর্থিক ব্যাপারের থেকে এক্ষেত্রে তাদের কাজ করার প্যাশনটাই অনেক বড়। এই পরিবর্তনটা আসলেই দরকার ছিল।”

বাংলা অনুবাদ সাহিত্য আসলে শুরু হয়েছিল কবির চৌধুরী, কাজী আনোয়ার হোসেন, শেখ আব্দুল হাকিম, রকিব হাসান প্রমুখের হাত ধরে। বিদেশি সাহিত্যকে সহজ ভাষায় দেশের মানুষের কাছে উপস্থাপন করতে বড় ভূমিকা ছিল সেবা প্রকাশনীর। তবে, তাদের বইগুলো ছিল নিউজপ্রিন্ট কাগজের। এরপর ৯০ দশকের শেষার্ধ্ব ও ২০০০-এর প্রথম দশকে বোর্ড বাঁধাই ও হোয়াইট প্রিন্ট কাগজে অনুবাদ বইয়ের প্রচলন ঘটে। এক্ষেত্রে অগ্রগণ্য ভূমিকা রেখেছে সন্দেশ, অন্যধারা, রোদেলা, বাতিঘর, অন্বেষা, ঐতিহ্য ইত্যাদি প্রকাশনী।

বাতিঘর প্রকাশনীর যাত্রা শুরু ২০০৩ সালে মোহাম্মদ নাজিমউদ্দিনের হাত ধরে। তার অনূদিত ও বাতিঘর থেকেই প্রকাশিত ‘দ্য ডা ভিঞ্চি কোড’ বইটি বাংলা অনুবাদ সাহিত্যের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। জনপ্রিয়তা ও বিক্রয় সংখ্যা—দুই দিক থেকেই। ২০০৫-এ এই বইটি অনুবাদ করার সময় নাজিমউদ্দিনও নিজেই ছিলেন একজন তরুণ অনুবাদকই। এর ঠিক আগের সময়টাতে অনুবাদক হিসেবে দারুণ জনপ্রিয়তা পান অনীশ দাশ অপু। বলাই বাহুল্য, তিনিও অনুবাদ করতে ও জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেন তরুণ বয়স থেকেই।

তাদেরই পথ ধরে গত কয়েক বছরে অনুবাদ সাহিত্যে খুব ভালো কাজ দেখিয়েছেন অনেক তরুণ অনুবাদক। এদের মধ্যে পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছেন সায়েম সোলায়মান, মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ, শাহেদ জামান, সালমান হক, কিশোর পাশা ইমন, আদনান আহমেদ রিজন, সাইম শামস, অসীম পিয়াস, কৌশিক জামান, সান্তা রিকি মাকসুদুজ্জামান খান, ডিউক জন প্রমুখ। অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পেয়েছে সায়েম সোলায়মানের ‘কুইন অব দ্য ডন’, ‘কালো কফি’, ‘দ্য ওয়ান্ডারার্স নেকলেস’ (সেবা প্রকাশনী) ইত্যাদি থ্রিলার ঘরানার বই, সালমান হকের বাতিঘর প্রকাশনী থেকে বের হওয়া ‘থ্রিএএম’ সিরিজের বই ও ‘দ্য বয় ইন দ্য স্ট্রাইপড পাজামা’ বইটি, শাহেদ জামানের ‘দ্য পিলগ্রিম’ (বাতিঘর প্রকাশনী), ‘দ্য ফর্টি রুলস অব লাভ’ (রোদেলা প্রকাশনী) ও ‘দ্য ফরবিডেন উইশ (নালন্দা প্রকাশনী), মো. ফুয়াদ আল ফিদাহর ‘সিরিয়াল কিলার’, ‘গেম ওভার’ (সেবা প্রকাশনী) ও ‘সাইকো ২’ (আদি প্রকাশনী), কিশোর পাশা ইমনের ‘দ্য গার্ল অন দ্য ট্রেন’ (বাতিঘর প্রকাশনী), ‘দ্য পাওয়ার অব হ্যাবিট’ (নালন্দা প্রকাশনী), আদনান আহমেদ রিজনের ‘দ্য প্রেসিডেন্ট ইজ মিসিং’ ও ‘দ্য গার্ল ইন রুম ওয়ান জিরো ফাইভ’ (আদি প্রকাশনী), মাকসুদুজ্জামান খানের ‘দ্য আলকেমিস্ট’ (রোদেলা প্রকাশনী) ও ‘অ্যাঞ্জেল অ্যান্ড ডেমনস’ (অন্বেষা প্রকাশনী), ডিউক জনের ‘সুলতান সুলেমান’ ও ‘বিউলফ’ (সেবা প্রকাশনী), কৌশিক জামানের ‘নরওয়েজিয়ান উড’ (বাতিঘর প্রকাশনী), সান্তা রিকির ‘দ্য সার্জন’ (বাতিঘর প্রকাশনী)।

উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, কিছুদিন আগেও যেখানে বাংলা অনুবাদে আক্ষরিক অনুবাদের আধিক্য ছিল, সেখানে বর্তমানের তরুণ অনুবাদকেরা বইয়ের ভাবানুবাদটাই বেশি করেন। একারণে তাদের অনুবাদ হচ্ছে বেশি পরিমাণে সহজ, সাবলীল ও প্রাঞ্জল। আর, পাঠকদের বেশিরভাগই যেহেতু তরুণ, এক্ষেত্রে অনুবাদক-পাঠকের চিন্তাধারাও মিলে যাচ্ছে একই সমান্তরালে।

এই তরুণ অনুবাদকদের অন্য যে বৈশিষ্ট্য সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তা হচ্ছে এদের অনেকেই বই অনুবাদের কাজ শেষ করেন অত্যন্ত দ্রুত। এদের কারো কারো উদাহরণ রয়েছে ২ বছরে ১২টা অথবা দেড় বছরে ৯টি অনুবাদ বই বের করার। কিন্তু মানের দিক থেকে খারাপ হচ্ছে না বা হয়নি তাদের বইগুলো, এমনটাই মনে করছেন পাঠক ও সাহিত্যপ্রেমীরা। অত্যন্ত দ্রুত এবং মান ঠিক রেখে অনুবাদ করার ক্ষেত্রে পাঠক, প্রকাশক ও সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে আলাদাভাবে চিহ্নিত হয়ে আছেন ফুয়াদ আল ফিদা, শাহেদ জামান, সালমান হক, আদনান আহমেদ রিজনেরা। অনেকেই তাদের মতো দ্রুতগতির অনুবাদকদের ভালোবেসে ‘মেশিন ম্যান’ বলে আখ্যা দেন। কিন্তু অনেকের কাছে এই ব্যাপারটাই আবার রহস্য। নেতিবাচক-ইতিবাচক দুরকম মতামতই রয়েছে এ ব্যাপারে। সাহিত্যাঙ্গন নিয়ে কাজ করছেন এবং এক্ষেত্রে ভালো অবস্থানে আছেন, এরকম অনেকেই বিষয়টাকে ইতিবাচক চোখে দেখেন না। তাদের মতামত হচ্ছে, “বর্তমানে অনেক তরুণ অনুবাদকই দেখা যায় একমাসে একটা বই অনুবাদ করছেন। এতে অনুবাদে ভুলত্রুটি থেকে যাচ্ছে অনেক।” এক্ষেত্রে তারা জি এইচ হাবীবের মতো স্বনামধন্য অনুবাদকের উদাহরণ দিয়ে বলেন, তিনি তো সোফির জগত বইটি অনুবাদ করেছিলেন ৩-৪ বছর সময় নিয়ে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/21/1566394777242.jpg
 প্রকাশক, লেখক ও অনুবাদক মোহাম্মদ নাজিমুদ্দিনের হাত দিয়ে গত কয়েক বছরে উঠে এসেছে বেশকিছু ভালোমানের তরুণ অনুবাদক ◢


এই ব্যাপারটাকে কিভাবে দেখছেন প্রকাশনা শিল্পের কর্ণধাররা? যোগাযোগ করা হলে বাতিঘর প্রকাশনীর প্রকাশক, বিশিষ্ট লেখক ও অনুবাদক মোহাম্মদ নাজিমউদ্দিন বলেন, “আমি মনে করি না দ্রুত অনুবাদের কাজ শেষ করলেই তার মান খারাপ হয়। আমি নিজেও খুব দ্রুত কিছু বইয়ের অনুবাদের কাজ করেছি। বর্তমানে আমরা অনুবাদের কাজে প্রযুক্তির সহায়তা অনেক পরিমাণে পাচ্ছি। আগে হাতে লিখে তারপরে হয়তো কম্পোজ করা হতো। তবে, বর্তমানে পার্সোনাল গেজেটেই আমরা করি সেই অনুবাদের কাজটা। আগে হয়তো ডিকশনারিতে খুঁজে খুঁজে ইংরেজি শব্দের অর্থ বের করতাম আমরা। কিন্তু এখন ই-ডিকশনারি থেকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অর্থটা বের করতে পারি আমরা। এডিট করতেও সময় লাগছে আগের তুলনায় অনেক কম। কাজেই দ্রুত কাজ করেও অনুবাদের মান ভালো রাখা যায় বলেই মনে করি।”

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/21/1566394941196.jpg
◤ গত কয়েক বছরে জনপ্রিয়তা পেয়েছে তরুণ অনুবাদক সালমান হকের ‘থ্রিএএম সিরিজ’-এর অনুবাদসহ অন্যান্য অনুবাদ বই ◢


একই মতামত জনপ্রিয় তরুণ অনুবাদক সালমান হকের। তিনি বলেন, “অনেক আগে থেকেই, রকিব হাসান, শেখ আবদুল হাকিমেরাও কিন্তু অনেক দ্রুত কাজ করেন। আমি মনে করি এটা কোনো সমস্যা নয়। আর যারা দ্রুত অনুবাদ করছে, তাদের কারো কারো অনুবাদের মান খারাপ হতেই পারে। তবে, আমি মনে করি এই ধারায় ভালোর পরিমাণই বেশি। কারণ, জোয়ারের সময় অন্যান্য আজেবাজে জিনিসের সাথে কিন্তু পলিমাটিও এসে জমা হয়। আর সম্পাদনার কাজটা যদি ভালো করে বেশ কয়েকবার করা যায়, তাহলে অনুবাদ বইটি অবশ্যই ভালো হবে।”

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/21/1566394866820.jpg
◤ গত কয়েক বছরে পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে তরুণ অনুবাদক আদনান আহমেদ রিজনের বেশ কিছু অনুবাদ বই ◢


তবে, তরুণদের অনূদিত সব বই যে মানসম্মত হচ্ছে, তেমনটাও নয়। এই ফাঁকে নিশ্চিতভাবে কিছু সাব-স্ট্যান্ডার্ড অনুবাদ বই বের হচ্ছে বলে মনে করেন অনুবাদ সাহিত্য-সংশ্লিষ্টরা। জনপ্রিয় তরুণ অনুবাদক আদনান আহমেদ রিজন বলেন, “তরুণরা যে অনুবাদ সাহিত্যে এত বেশি পরিমাণে এগিয়ে আসছে, এতে নিম্নমানের কাজের চেয়ে ভালো মানের কাজই বেশি পরিমাণে বের হচ্ছে। অনুবাদে আসতে হলে সাহিত্যকে ভালোবাসতে হবে। আর যাদের অনুবাদ ভালো হচ্ছে না, সেক্ষেত্রে বলতে হবে অনুবাদ ভালো করে করার যোগ্যতাটাই হয়তো তাদের নেই। সেজন্য অনুবাদে আসতে হলে নিজেদেরকে ভালো করে যোগ্য করে তারপরে আসতে হবে।”

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/21/1566395064592.jpg

◤ একজন অনুবাদকের নিজেকে ঠিকভাবে অ্যাসেসমেন্টের ক্ষমতা থাকতে হবে বলে মনে করেন তরুণ অনুবাদক মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ ◢


তা কিভাবে তরুণ অনুবাদকেরা নিজেদের প্রস্তুত করতে পারে? হতে পারে একজন ভালো অনুবাদক? এই প্রসঙ্গে মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ বলেন, “বই অনুবাদে আসার আগে আমি নিয়মিত লিখতাম রহস্যপত্রিকায়। লেখা ছাপা হওয়ার পর দেখতাম সম্পাদনামণ্ডলী ওখানে কী কী চেঞ্জ এনেছে। এভাবে একজন অনুবাদকের নিজেকে অ্যাসেসমেন্টের যোগ্যতা থাকতে হবে। আর ভালো অনুবাদ যারা করছে, তাদের কাউকে মানদণ্ড ধরে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও ফলাফলটা ভালোই হবে।”

ইতোমধ্যেই তরুণ অনুবাদকেরা অত্যন্ত ভালো ও স্মার্ট কাজ দেখিয়ে অর্জন করেছেন পাঠক ও প্রকাশকের আস্থা। আর তরুণেরা যদি নিজেদেরকে আরো প্রস্তুত করে অনুবাদ জগতে আসেন এবং নিজেদের কাজের মানোন্নয়নে সচেষ্ট থাকেন, তাহলে অনুবাদ সাহিত্যে তরুণ অনুবাদকদের অবদান নিঃসন্দেহে পৌঁছে যাবে নতুন উচ্চতায়।

জহির রায়হান : দেশপ্রেমিক ও সমাজ-সচেতন এক শিল্পী-প্রতিকৃতি

জহির রায়হান : দেশপ্রেমিক ও সমাজ-সচেতন এক শিল্পী-প্রতিকৃতি
অসাধারণ চলচ্চিত্র ও শৈল্পিক সাহিত্যকর্মের স্রষ্টা হিসেবে আজও স্মরণীয় জহির রায়হান

মাত্র ৩৬ বছর বয়সের জীবনেই জহির রায়হান নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী একজন কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র-পরিচালক হিসেবে। প্রচণ্ড বক্তব্যধর্মী ও জীবনমুখী তাঁর চলচ্চিত্রগুলো নান্দনিকতা ও কৌশলগত মানের দিক থেকে এখনো স্মরণীয় হয়ে টিকে আছে। অনুপ্রাণিত করছে বর্তমান ও ভবিষ্যতের চলচ্চিত্রকারদের। তেমনি মাত্র আটটি উপন্যাস লিখেই তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লেখক হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছেন। ‘হাজার বছর ধরে’ দেশের সাহিত্য ও চলচ্চিত্রাঙ্গনে তাঁর পথ চলার কথা থাকলেও, ১৯৭২ সালে নিরুদ্দেশের ‘বরফ গলা নদীতে’ হারিয়ে যাওয়ার পর ফিরে আসেননি আর। আজ এই বহুপ্রজ বিরল প্রতিভার ৮৪তম জন্মদিন।

জহির রায়হানের প্রকৃত নাম মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। জন্ম ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর মজুপুর গ্রামে। জহির রায়হান তাঁর সাহিত্যিক নাম। এ নামেই তিনি সুপরিচিত। তাঁর শৈশব কেটেছে কলকাতায়। দেশ বিভাগের পর ঢাকায় আসেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে বাংলায় এমএ করেন জহির। ছাত্রাবস্থায়ই তাঁর সাহিত্যিক ও সাংবাদিক জীবন শুরু হয়। ১৯৫০ সালে তিনি যুগের আলো পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি খাপছাড়া, যান্ত্রিক, সিনেমা ইত্যাদি পত্রিকাতেও কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি সম্পাদক হিসেবে প্রবাহ পত্রিকায় যোগ দেন। এই সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাই হয়তো তাঁর ভেতরে আরো শক্তভাবে গেঁড়ে দেয় লেখক হওয়ার বুনিয়াদ।

১৯৫৫ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’ প্রকাশিত হয়। কিন্তু, তিনি যে ছিলেন একজন বহুমাত্রিক মানুষ। চলচ্চিত্রের প্রতি ছিল তাঁর মনের ভেতরে গভীর ভালোবাসা। তাই, চলে আসলেন চলচ্চিত্রাঙ্গনে। চলচ্চিত্র জগতে তার পদার্পণ ঘটে ১৯৫৭ সালে, ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে। সহকারী হিসেবে আরো কাজ করেন সালাউদ্দীনের ছবি—‘যে নদী মরুপথে’-তেও। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম তাকে ‘এ দেশ তোমার আমার’-এ কাজ করার আমন্ত্রণ জানান; এ ছবির নামসংগীত রচনা জহির রায়হানের হাতেই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207266898.jpg

◤ ‘বেহুলা’ সিনেমার সেটে নির্দেশনা দিচ্ছেন জহির ◢


সহকারী পরিচালক হিসেবে সফলভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে পরিচালক হিসেবে কাজ করার প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল। ১৯৬১ সালে তিনি রুপালি জগতে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’ নির্মাণ করেন। এটি অবশ্য ছিল উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র। পরের বছর মুক্তি পায় তার প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র ‘বাহানা’। এরপর ১৯৬৬ সালে ‘বেহুলা’, ১৯৬৭-তে ‘আনোয়ারা’, ১৯৭০-এ ‘জীবন থেকে নেওয়া’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘লেট দেয়ার বি লাইট’-এর মতো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। 

চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি, সাহিত্যিক হিসেবেও তাঁর কলম সচল ছিল মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত। অনেক কালজয়ী উপন্যাস তিনি উপহার দিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে : ‘বরফ গলা নদী’, ‘আর কত দিন’, ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, ‘হাজার বছর ধরে’, ‘আরেক ফাল্গুন’, ‘কয়েকটি মৃত্যু’, ‘তৃষ্ণা’, ‘সূর্যগ্রহণ’ ইত্যাদি। সংগ্রামমুখর নাগরিক জীবন, আবহমান বাংলার জনজীবন, মধ্যবিত্তের আশা-আকাঙ্ক্ষা-বেদনা প্রভৃতি তাঁর রচনায় শিল্পরূপ পেয়েছে। সাহিত্যকৃতীর স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (মরণোত্তর) দেওয়া হয়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207304659.jpg
◤ প্রথম স্ত্রী সুমিতা দেবীর সাথে জহির রায়হান ◢


ব্যক্তিজীবনে দুবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন জহির রায়হান। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন চিত্রনায়িকা সুমিতা দেবী। ১৯৬১ সালে বিয়ে করেন তারা। প্রথম পরিবারে অনল রায়হান এবং বিপুল রায়হান নামে দুই পুত্র সন্তানের জন্ম হয়।

সুমিতা দেবীর সাথে বিচ্ছেদের পর ১৯৬৮ সালে আরেক জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা সুচন্দার সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন তিনি। দ্বিতীয় পরিবারে রয়েছেন তার দুই সন্তান অপু ও তপু। তার বড় ভাই প্রয়াত লেখক শহীদুল্লা কায়সার। তিনি লেখক ও রাজনীতিক পান্না কায়সারের স্বামী এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী শমী কায়সারের বাবা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207352881.jpg

◤ জহির রায়হানের আলোচিত, নন্দিত ও প্রভাবশালী চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’র পোস্টার ◢


শুধুমাত্র কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার হিসেবে জহির রায়হানকে দেখলে সবটুকু যেন বলা হয় না তাঁর ব্যাপারে। একজন সমাজ ও রাজনীতি সচেতন শিল্পী ছিলেন তিনি। নিজেও স্বশরীরে অংশ নিয়েছেন দেশ মাতৃকার বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন জহির রায়হান। উপস্থিত ছিলেন একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আমতলা সমাবেশে। এসময় তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে জেলে পুরে দেয়। এই জেলে বসেই তিনি ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’ রচনা করেন। ভাষা আন্দোলন তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যার ছাপ দেখতে পাওয়া যায় তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেওয়া’–তে। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। কলকাতায় তার নির্মিত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেওয়ার বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয় এবং চলচ্চিত্রটি দেখে ভূয়সী প্রশংসা করেন সত্যজিত রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা এবং ঋত্বিক ঘটক প্রমুখ খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকাররা। সে সময়ে তিনি চরম আর্থিক দৈন্যের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হতে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করে দেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207399680.jpg
◤ প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’, যা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত তৈরিতে রাখে দারুণ ভূমিকা ◢


মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী নিধনের এক অসাধারণ প্রামাণ্য দলিল ‘স্টপ জেনোসাইড’ তৈরি করেন জহির রায়হান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী বাঙালিদের দুঃখ-দুর্দশা, হানাদার পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, ভারতে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের দিনকাল প্রভৃতি এই তথ্যচিত্রে তুলে ধরা হয়েছিল। এর প্রথম প্রদর্শনী হয় এক অজ্ঞাত স্থানে, যেখানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রীপরিষদের সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরি করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছিল ‘স্টপ জেনোসাইড’। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে এখন পর্যন্ত নির্মিত ছবিগুলোর মধ্যে শিল্পগত ও গুণগত সাফল্যের দিক থেকে শীর্ষে স্থান দেওয়া হয়ে থাকে এই চলচ্চিত্রটিকে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর জহির রায়হান ঢাকায় ফেরেন। ফিরে জানতে পারেন, মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে পাক হানাদার বাহিনীর দোসর রাজাকার আল বদর বাহিনী তার বড় ভাই প্রখ্যাত লেখক শহীদুল্লাহ কায়সারকে অপহরণ করেছে। নিখোঁজ ভাইকে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করেন জহির। ১৯৭২ সালের ২৮ জানুয়ারি সকালে এক রহস্যময় ব্যক্তি তাকে ফোন করে জানান, তার ভাইকে মিরপুর ১২ নাম্বারে একটি হাউজিং সেক্টরে আটকে রাখা হয়েছে। একথা শুনেই তিনি ভাইয়ের খোঁজে মিরপুর যান এবং আর ফিরে আসেননি।

জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে অনেক ধরনের থিওরি রয়েছে। এমন বলা হয় যে, তিনি একটি সার্চ পার্টি নিয়ে মিরপুরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। সেখানে পাক হানাদার বাহিনীর কিছু সদস্য ছদ্মবেশে ছিল। তারা তাকে লুকিয়ে আটক করে হত্যা ও গুম করে ফেলে। তার ছোট ভাই হাবীবের ভাষ্যমতে, তিনি জহির রায়হানকে মিরপুর পুলিশ স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে এসেছিলেন। এরপর আর তার দেখা পাননি। এমন খবরও শোনা যায়, মিরপুর পুলিশ স্টেশন থেকে জহির রায়হানকে জানানো হয়েছিল, মিরপুর ১২ নাম্বারে কিছু পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকার ছদ্মবেশে লুকিয়ে আছে। সেখানে না গিয়ে আগে তাকে কল ট্রেস করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর তিনি নাকি ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশ স্টেশন থেকে বেরিয়ে যান। আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207448145.jpg

◤ ১৯৭২-এর পর ‘আরেক ফাল্গুন’ হয়তো ‘কখনো আসেনি’ তবে দেশ ও সমাজ-সচেতন শিল্পীদের এগিয়ে যাওয়ার বড় প্রেরণা তিনিই ◢


এ ব্যাপারে বিভিন্ন সময় আরো অনেক গুজব ছড়িয়েছে। এগুলোর কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা, তা যাচাই করা মুশকিল। তাঁর মৃতদেহও কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই নিশ্চিত হওয়া যায়নি কিভাবে মারা গিয়েছেন তিনি। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি তার মৃত্যুদিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

স্বাধীনতার ঠিক পরপর, সেই ৭২ সালেই জহির রায়হান চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলেও তাঁর অসাধারণ, শৈল্পিক ও নান্দনিক সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্রের জন্য জাতি ঠিকই তাকে স্বরণে রেখেছে। চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য কয়েক বছর পর, ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে প্রদান করে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদক (মরণোত্তর)। ১৯৯২ সালে প্রদান করে সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার। আজও তাঁর সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্রগুলো টিকে আছে অমূল্য সম্পদ হয়ে। ১৯৭২-এর পর ‘আরেক ফাল্গুন’ হয়তো ‘কখনো আসেনি’ জহির রায়হানের জীবনে; তবে দেশ ও সমাজ সচেতন শিল্পীদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার বড় প্রেরণা তিনিই। এই ক্ষণজন্মা প্রতিভার জন্মদিনে তাঁর প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম!

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র