Barta24

বুধবার, ১৭ জুলাই ২০১৯, ২ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

স্বাধীনতা দিবস

স্বাধীনতা দিবস
অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ
ইভন ভেরা


  • Font increase
  • Font Decrease

অনুবাদ ফজল হাসান

জিম্বাবুইয়ের অন্যতম সফল ও একাধিক পুরস্কার বিজয়ী ঔপন্যাসিক, ছোটগল্প লেখক এবং শিল্পকলার পরিচালক ইভন ভেরার জন্ম ১৯৬৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর, তৎকালীন দক্ষিণ রোডেশিয়ার বুলাওয়ে শহরে। মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনা বুলাওয়ের জিলিকাজি হাইস্কুলে। কানাডার ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি থেকে আন্ডারগ্রাজুয়েশন, গ্রাজুয়েশন এবং পিএইচি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরে সাহিত্যে অধ্যাপনা করেন। ১৯৯৫ সালে স্বদেশে ফিরে আসেন এবং ১৯৯৭ সালে জিম্বাবুইয়ের ন্যাশনাল গ্যালারির পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন।

ইভন ভেরার উপন্যাসের মূল বৈশিষ্ট্য কাব্যিক গদ্য ভাষা, জটিল বিষয়বস্তু, নারী চরিত্র এবং জিম্বাবুয়ের অতীত কাহিনী। তাঁর একমাত্র ছোটগল্প সংকলন ‘হোয়াই ডোন্ট ইউ কার্ভ আদার অ্যানিমেলস্’ প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে। তিনি পাঁচটি উপন্যাসের রচয়িতা। এগুলো হলো—‘নেহাদা’ (১৯৯৩), ‘উ্যইদআউট্ এ নেম’ (১৯৯৪), ‘আন্ডার দ্য টাঙ’ (১৯৯৬), ‘বাটারফ্লাই বার্নিং’ (১৯৯৮) এবং ‘দ্য স্টোন ভার্জিনস্’ (২০০২)। এসব উপন্যাসের জন্য তিনি একাধিক সম্মানিত পুরস্কার লাভ করেন। ‘উ্যইদআউট্ এ নেম’ এবং ‘আন্ডার দ্য টাঙ’ উপন্যাস দু’টির জন্য তিনি দু’বার কমনওয়েলথ্ রাইটার্স’ প্রাইজ (আফ্রিকা এলাকায়) পেয়েছেন। এছাড়া ‘উ্যইদআউট্ এ নেম’ উপন্যাসের জন্য জিম্বাবুইয়ান পাবলিশার্স’ লিটারেরি প্রাইজ, ‘বাটারফ্লাই বার্নিং’ উপন্যাসের জন্য জার্মান লিটারেরি প্রাইজ এবং ‘দ্য স্টোন ভার্জিনস্’ উপন্যাসের জন্য ম্যাকমিলান রাইটার্স প্রাইজ (আফ্রিকা এলাকায়) লাভ করেন।

আফ্রিকার নারীবাদী লেখিকা হিসেবে ২০০৪ সালে তাঁকে সুইডিশ পেন টাকোলস্কি পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। তিনি ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত ‘ওপেনিং স্পেসেস: অ্যান অ্যান্থলজি অফ কন্টেম্পোরারি আফ্রিকান উইমেন’স্ রাইটিং’ সংকলন সম্পাদনা করেন। মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে এইডস্-সম্পর্কীয় মেনিনজাইটিস রোগে আক্রান্ত হয়ে ২০০৫ সালের ৭ এপ্রিল টরন্টো শহরে দেহত্যাগ করেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Oct/04/1538647860596.jpg

ইভন ভেরা

 

‘পিছে যান! পিছে যান!’ পুলিশ চিৎকার করে বলল।

ইংল্যান্ড থেকে আসা রাজপুত্তুরকে দেখার জন্য জনগণ আজ শহরের রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছে। তাদের মাতৃভূমিকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য রাজপুত্তুর এসেছে। মধ্যরাতে।

মহিলা দুশ্চিন্তামুক্ত সাদা মন নিয়ে দাঁড়ায় এবং অপেক্ষা করে। নির্ধারিত সময়ের আগে স্কুলের ছেলেমেয়েদের ছুটি দেওয়া হয়েছে এবং ওরা ফাঁকা রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়েছে। মুখের ওপর সামান্য ছায়ার জন্য ছাত্রছাত্রীরা মাথার উপর বই তুলে ধরেছে। সূর্যের তীক্ষ্ণ রোদ পিচঢালা পথে এসে পড়েছে। মাঝখানে মোটা হলুদ দাগের ওপর একজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে এবং সে দূরের পানে তাকিয়ে একটা কিছু খুঁজছে। পুলিশের পায়ে ভারী বাদামি রঙের জুতা এবং খাকি কাপড়ের পোশাক। পুলিশ হাতের বন্দুক এবং লাঠি উঁচিয়ে ছেলেমেয়েদের পেছনে সরে যেতে বলছে। ইংল্যান্ডের রাজপুত্তুর ভিড় পছন্দ করবেন না।

রাস্তার বিপরীত দিকে উঁচু গাম-ট্রির ছায়ায় মহিলারা আঞ্চলিক গান গাইছে এবং গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করছে। ভবিষ্যতকে স্বাগত জানানোর জন্য অপেক্ষারত মহিলাদের মুখমণ্ডল বেয়ে ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে। পুলিশ হাতের বন্দুক এবং লাঠি উঁচিয়ে উপস্থিত জনগণকে পেছনে সরে যাওয়ার অথবা সারি বেঁধে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিচ্ছে। হাতে নিয়ে নাড়ানোর জন্য একজন লোক এক মহিলাকে ছোট্ট একটা পতাকা দেয়। নতুন দেশের নতুন পতাকা। যুবরাজকে তার মা, অর্থাৎ রানি, পাঠিয়েছেন। তাঁর জন্য অপেক্ষারত মহিলা ক্লান্ত মুখের ওপর জাকারান্ডা গাছের একটা ভাঙা ডাল ধরে রেখেছে এবং অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

রাস্তার দু’পাশে বেগুনি রঙের ফুলে ভরা জাকারান্ডা গাছ। সেই রাস্তা দিয়ে একটা লিমোজিন গাড়ি এগিয়ে আসে। ছেলেমেয়েরা উল্লসিত হয়ে চিৎকারে চারপাশ মুখরিত করে তোলে। তারা ভেবেছে, তাদের মাতৃভূমিকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সেই সূদূর ইংল্যান্ড থেকে আসা আকাঙ্খিত মানুষ। রাস্তা পেরিয়ে চলে যাওয়া গাড়ির দিকে মহিলা তাকিয়ে থাকে। একসময় সে উপলব্ধি করে যে, মানুষের মাঝে উত্তেজনা স্তিমিত হয়ে গেছে। আসলে তা চরম উত্তেজনার মুহূর্ত ছিল না। সেটি ছিল অন্য একটা গাড়ি।

‘রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় আমরা জানব না কোন গাড়ির মধ্যে রাজকুমার আছে,’ ভিড়ের মধ্যে এক লোক বলল। ‘নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু রাস্তা দিয়ে পেরিয়ে যাওয়া প্রত্যেকটি গাড়িকে আমরা হাত নেড়ে অভিবাদন জানাব। একটা গাড়ির ভেতর রাজকুমার থাকবেন।’

‘তাহলে আপনি কী বলতে চান, আমরা যুবরাজকে দেখতে পারব না?’ মহিলা জিজ্ঞাসা করে। তার চোখেমুখে বিহ্বলতা। যেই লোক তাদের কাছে মাতৃভূমি ফিরিয়ে দিয়ে ক্ষমতার হাত বদল করবেন, তাকে একনজর দেখার জন্য সে খুব ভোরে ঘুম থেকে জেগেছে। সাইরেনের শব্দ শুনতে পেয়ে সে তাকিয়ে দেখে পুলিশের মোটরগাড়ি এবং পেছনে করেকটি গাড়ি ধীরগতিতে এগিয়ে আসছে।

‘পিছে হটো ! পিছে হটো !’ পুলিশ চিৎকার করে উল্লসিত ছাত্রছাত্রীদের বলল। তারা চলমান গাড়ির উদ্দেশ্যে ছোট্ট পতাকা নিয়ে সামনের দিকে হাত বাড়ায়।
‘কোন গাড়িতে রাজকুমার?’ মহিলা জিজ্ঞাসা করে।
‘নিরাপত্তার জন্য অবশ্যই প্রথম কিংবা দ্বিতীয় গাড়িতে নেই,’ জবাবে লোকটি বলল। ‘এবং অবশ্য সঙ্গত কারণে শেষ গাড়িতে নেই।’
তাহলে নিশ্চয়ই তৃতীয় গাড়িতে। মহিলা বড় বড় চোখ করে রঙিন কাঁচের জানালা গলিয়ে গাড়ির ভেতর কঠিন দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। কিন্তু সে কিছুই দেখতে পায়নি। তবুও সবাই হাত নেড়ে অভিবাদন জানাচ্ছে এবং আনন্দ-উল্লাসে চিৎকার-চেঁচামেচি করছে। তারা শুধু গাড়ির জানালার রঙিন কাঁচে বেগুনি রঙের ফুলে ভরা জাকারান্ডা গাছের প্রতিবিম্বের ফাঁকে নিজেদের উত্তেজিত চেহারার প্রতিচ্ছায়া দেখতে পেল। রাজকুমার নিশ্চয়ই সেই রাস্তা পেরিয়ে চলে গেছেন। যদিও তারা তাঁকে দেখেনি, কিন্তু তিনি হয়তো তাদের দেখেছেন। ‘আপনারা কি যুবরাজকে দেখেছেন?’ বাড়ি ফেরার পথে একজন আরেকজনকে জিজ্ঞাসা করে। পরবর্তীতে অনেকে তাঁকে রাতের বেলা স্টেডিয়ামে দেখতে পাবে। মহিলা সেখানে যাবে না।

***
লোকটি এক হাত দিয়ে মহিলাকে জড়িয়ে ধরে এবং তার অন্য হাতে শীতল পানীয়ের বোতল। লোকটির সম্মুখে টেলিভিশনে অনুষ্ঠান চলছে। কিন্তু সে আগে স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের অনুষ্ঠান দেখতে চায়। ইতিমধ্যে মহিলাকে সে টাকা দিয়েছে। মহিলা টাকাগুলো একটা হলুদ রুমালে গিট্টু করে ব্রা’র ফিতার সঙ্গে বেঁধে রেখেছে। ফুটবল খেলার জন্য নির্মিত স্টেডিয়ামের ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী লোকে লোকারণ্য। প্রথমে স্টেডিয়ামের মাঝখানে প্রথাগত নৃত্য পরিবেশন করা হয়। দুশ্চিন্তামুক্ত সাদা মন নিয়ে মহিলা নিজেকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেয় এবং টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে ওঠা ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে।

নয়া প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ সময় নিয়ে বক্তৃতা করেন এবং উপস্থিত জনগণ করতালির সঙ্গে চিৎকার-চেঁচামেচি করে। উল্লসিত হয়ে তারা মুষ্ঠি উপরের দিকে তুলে আনন্দ প্রকাশ করে। নয়া প্রধানমন্ত্রী মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর বক্তব্য রাখেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার সময় মহিলা নাচছিল। তিনি যখন আশু পরিবর্তনের কথা বলছিলেন, তখন লোকজন পতাকা নেড়ে তাঁকে সমর্থন জানায়। চাকুরী এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে উপার্জনের আশ্বাস প্রদান করেন। জমি-জমা এবং শিক্ষার কথাও উল্লেখ করেন, এমনকি ধনধৌলত এবং খাদ্য নিয়েও কথা বলেন। মহিলা দেখে রাজকুমার নিশ্চুপ বসে আছেন। তাঁর পরনে ধবধবে সাদা পোশাক। সরকারি লোকেরা বলেছে যুবরাজের মা, অর্থাৎ রানী, আসতে পারেননি। যাহোক, এধরনের অনুষ্ঠানে তিনি রানীর মতোই সম্মানিত এবং বিশিষ্ট ব্যক্তি। রাজকুমার সম্পর্কে নয়া প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য রেখেছেন এবং প্রত্যেকে তুমুল হাততালি দিয়ে সমর্থন জানিয়েছে।

একসময় লোকটি টেলিভিশনে অনুষ্ঠান দেখা ছেড়ে আরেক বোতল ঠান্ডা পানীয় আনার জন্য রান্নাঘরে প্রবেশ করে। সে পরিপূর্ণভাবে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করতে চায়—শীতল পানীয় এবং রমণী। তখন রাত বারোটা বাজতে দশ মিনিট বাকি। নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে মহিলা পরনের কাপড়চোপড় খুলে ফেলেছে। টেলিভিশনের পর্দায় ক্রমাগত মিনিটের সংখ্যা ভেসে উঠে। স্টেডিয়ামের মাঝখানে বিশাল পতাকা স্তম্ভের দিকে নয়া প্রধানমন্ত্রী এবং যুবরাজ হেঁটে যান। স্তম্ভের উপরে পুরনো পতাকা উড়ছে এবং নতুন পতাকা স্তম্ভের নিচে ঝুলে আছে।  লোকটি ধাক্কা দিয়ে মহিলাকে মেঝেতে সরিয়ে দেয়। সে বলবান এবং সাফল্যের মাধ্যমে নতুন যুগে প্রবেশ করবে। মহিলা পা মেলে ধরে। তখন মাঝরাত এবং নতুন পতাকা উত্তোলন করা হয়। পরিবর্তনের অলৌকিক সময়। সবুজ, হলুদ, সাদা। খাবার, ধনধৌলত, পুনরায় সমন্বয়।

একসময় লোকটি মহিলাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। যখন সে ঘুম থেকে জেগে ওঠে, তখন পুরো বাড়িটাই তার নিজের মনে হয়। জাকারান্ডা গাছের নিচে তাদের দেখা হয়েছিল। তখন তারা ইংরেজ যুবরাজের জন্য অপেক্ষা করছিল।

সকালে মহিলা দেখে ছোট্ট দুটি পতাকা ঝোপের ওপর ঝুলে আছে—একটা পুরনো পতাকা এবং একটা নতুন।

আপনার মতামত লিখুন :

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

আরো হাঁস

এইরূপ কান্দে কন্যা নিরালা বসিয়া
হাঁসের লাগিয়া কন্যা ধুড়িল শহর

কান আশে হইছে বিয়া স্বপ্নের ভিতর
ঘটকালি করে আপন মামতো ভাই

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর
কারা পানখিলি খাইয়া গপ মারে তাই

সজিনার তলে বসি কান্দিল তামাম
এর কিবা মানে শুন কান খাড়া করি
চিক চিক করে মনে এ বিয়ার জরি।

হেমন্তের হাঁস

আমার হয়নি ধোয়া ওগো শিশিরের তলে
আমার হয়নি নাচা মিশি যাওয়া ঊর্মিদলে।

আমার মিটিনি নেশা অলিকোলে শোয়া বাকি
আমায় ঢালিনি মৌন নূর বধির জোনাকি!

আমারে চিনিয়া চিনে নাই হেমন্তের হাঁস
আমার পানের পাত্রে বাদ গেছে শ্যামা ঘাস।

আমার ইউসুফ শোনে নাই ভাইদের শোকর
বকুল তলায় আসি হাঁপায় প্রকৃত ভোর।

হাঁসের জলেরা

হাঁসের পায়ের জল
শুকায়, তাই তারা ফের জলে নামে।
একটা কথা আমি ভুলি যাই
হাঁসের কোনো ইচ্ছা নাই।
হাঁসের জলে আমি ভাসি
হাঁসের পায়ের জলে
আমি মুখ ধুইছি,
আমার নিজের মুখ কেন মোর যেনতেন মোকাম ন রে!
আমার চোখে এই ফেরেবি জল ধরা দেয়
যেন বখিল আমি তার কিছু নির্ভরতাময় তর্জমা করি!
দাদি যেই ছাড়ে হাঁস
তারা আমার মরা দাদির জইফ হাঁস!
স্বপ্ন তারা আমার নিকট
তাদের নিকট
আমি তেমন বাস্তব ন রে!

এই বাড়িতে

দেয়ালের পর কাঠবিড়ালির দৌড় দেখি
যেন রইদ নাকফুল হয়,
তারপর সারা সকালটা গড়ায় দেয়াল ধরি,
একটা দোয়েল ডিম জারি হইলে
অনেক দোয়েল চিল্লায়ে ধরে বা গান,
একদিন আসে আসে করি শেষে আসে,
তারার মতন গোল চোখ ঘুঘু তার
চোখের বর্ডার আলতার রঙ পাছে
পায়ের রঙের সাথে মিশিবার চায়,
এ বাড়িতে আসি যেই হাঁসগুলি দুলি দুলি ও বাড়ি ত যায়,
ওদের ঘ্রাণের ভিতর ঘুরি ঘুরি থামি,
বাতাস হবেনে আসল শরিক
আডিয়াকলার ঝাড়ের নিকটে আসি,
আমি শুনি জলের মর্মর কলপাড়ে তড়পায়,
তারে ঢাকিবার আরো মিহি ধ্বনি আছে
এ বাড়ির অনেক অ-বাক কণ্ঠস্বর আছে!


প্রত্যাবর্তনের লজ্জা
(কবি আল মাহমুদকে)

ভাইয়ের ডাক শুনি উঠি রাতদুপারে স্বপ্নের ভিতর। যেন
বাতাসের ডাক শুনি ঢেউ উঠে তৎপর।
দেখি আব্বা আগেই উঠছেন, নিজ হাতে আতাফল, গাছপাকা তরমুজ
পরম আদরে ছেনি দিই কাটি কাটি ফালি ফালি করি খাওয়াইতেছেন,
খা, আহারে কতদিন খাস নাই!
আম্মা তজবিহ হাতে এক হাতে ভাইরে বাতাস করতেছে, আয়েশা ফুল তোলা
একটা রুমাল দিই কইলো, এইটা দিয়া মুখ মুইছো, মাথা মুইছো, চোখের কান্দন মুইছো না গো ভাই!
অথচ ভাই মারা গেছে তার চল্লিশাও পার হয় নাই। উনি কবরতে উঠি আসছেন, উনার চোখ দুইটা
তারার নিভু নিভু, এট্টু সর্দি লাগছে ক্যাল, ভাই হাঁকি কইলো, বকনা বাছুরটারে খ্যাতের আইলে
বান্ধিলি অইডা তো দড়ি ছিড়ি সব পাকাধান সাবাড় করবেনে!
আম্মা কান্দে আর ইশারা করে, ঠোঁট টিপে আঙুলে, কন, একদম চুপ!
ভাই যে মারা গেল শুক্রবার, ভাই নিজেই জানে না!
তাই আমাদের সংসারে কাঁঠাল পাতার নারকেল ছায়ার লোভে
পড়ি ঝোঁকে ঝোঁকে আইস্যে আগের মতো ধমক দিতেছে আমাদের সংসারে
জায়গা মতো, আব্বা কইলেন, খবরদার তোরা চুপ থাক,
ও যেন না জানে পাছে, ও মরি গেছে, পাছে বেচারা কষ্ট পাবে!

মৌসুমি বায়ু আসে

মৌসুমি বায়ু আসে
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

নাদিরার আজ অন্য রূপ।
অন্যদিন নাদিরা আমার কাছে আসত ক্যাজুয়ালি। লিপস্টিক যদিও থাকে তার ঠোঁটে। লাল টকটকে রাশান লিপস্টিক মেখে আসে সে। ওর ফর্সা ত্বকের সঙ্গে লাল রঙটা খুব যায়। কিন্তু এটুকুই। একটা সালোয়ার বা একটা টপ পরে আলুথালু চুলে নাদিরা আমার কাছে আসত। আজ রোজার মধ্যেই লিপস্টিকের সাজ না দিলেও সে পরিপাটি। অন্তত চুল বাঁধা। নাদিরার চুল স্ট্রেট অ্যান্ড সিল্কি। মিহি চুলগুলা কিছুটা ব্রাউনিশ। এগুলো সে বেশিরভাগ সময় ছেড়ে আসত। বা খোঁপা যদি একটা বাঁধতও তো আশপাশে চুল উড়ত। কিন্তু আজ সে টাইট করে চুল বেঁধে এসেছে। ক্লিপ দিয়েছে, মাথাটা একটু উঁচা উঁচা লাগছে। আরো একটা ব্যাপার আছে। নাদিরা আজ আমাকে খাওয়াবে। বলতে গেলে এই প্রথম সে আমাকে খাওয়াবে মানে ইফতার করাবে। এই ট্রিটটা সে কেন দেবে জানি না। কারণও বলে নাই। ওকে কিছু জিজ্ঞাস করলে অনেক কথায় উত্তর দেয়। বলে, ‘তোরে কী আমি খাওয়াইতে পারি না একটা দিন? তুই আমারে কী ভাবিস’—এসব।

কিন্তু যে বিষয়টা নাদিরার রূপ সবচেয়ে কড়াভাবে বদলে দিয়েছে, তা হলো সে আজ শিশিরের নাম একবারও উচ্চারণ করে নাই। অন্যদিন নাদিরার আলাপের মূল বিষয় শিশির। তাকে নাদিরা গুরু ডাকে। শিশির নাদিরার জীবনের দার্শনিক। তাকে সে অন্য চোখে দ্যাখে। শিশিরকে সে নিজের জীবনদর্শনের একটা উঁচা জায়গায় রেখে দিয়েছে। গুরুর হাজার প্রসংশা, ন্যূনতম সমালোচনা আর অল্প-স্বল্প বিরক্তি মিলিয়ে সারাক্ষণ গুরুই নাদিরার আলোচ্য বিষয়। আমার দিক থেকে নাদিরার সঙ্গ পাওয়ার জন্য গুরুর আলাপ শুনতে হয়। ওকে যদিও একটু খাওয়াতে হয়। কিন্তু আমার নারীসঙ্গ ভালো লাগে বলে ওর জন্য এই খরচটুকু সামান্যই। তবে বোনাসও আছে সঙ্গে। সেটা শিশিরের বা অন্যদের খবর পাওয়া। শিশিরের কাছে না গিয়ে, বাংলার চলমান সাহিত্যের কারো কাছে না গিয়েও, ওদের বিষয়ে আমার আগ্রহ নাই বাইরে বাইরে এটা দেখিয়ে চলা অব্যাহত রেখেও সহজে ওদের বিষয়ে জানার উপায় নাদিরা। এবং আমাদের এসব সাক্ষাত বা আলাপ গোপন রাখাটা ছিল নিজেদের মধ্যে একমাত্র শর্ত।

শিশির গল্প লেখে। সে বিয়ে করে নাই। আমি করেছি এবং গল্প লেখি না। কিন্তু নাদিরার আমি বন্ধু। আর নাদিরা শিশিরের বোজম। ওদের বন্ধুত্বের শুরুটা বইমেলা থেকে। আরেক বন্ধুর হাত ধরে। আমার সঙ্গে নাদিরার বন্ধুত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর সেই বন্ধুত্ব ক্ষুণ্ন হয়। আমরা একে অন্যের থেকে দূরে সরে যাই। এরপর আমাদের দেখা ঘটবার কারণ ছিল আমার শ্বশুরবাড়ি। আর সেটা ময়মনসিংহ। ঠিক ময়মনসিংহও না নেত্রকোনা সীমানায়। সেখানে নাদিরাদেরও বাড়ি। নাদিরার সঙ্গে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, একান্তে আড্ডা দেওয়া কিম্বা খাওয়ানোর মতো সম্পর্ক ছিল না। ইনফ্যাক্ট আমি তাকে দেখেছি কিন্তু আলাপ হয় নাইয়ের মতো একটা সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্কটা একই বিশ্ববিদ্যালয়ে যতটা থাকে ততটা আরকি। আছেও আবার নাইও সম্পর্ক। বিয়ের পর বউয়ের কাছ থেকে ওদের এলাকাগত নৈকট্য জানার পর নাদিরা আবার ফিরে এলো আমার জীবনে। ফেসবুকে আমি তাকে অনেকদিন পর, বিশ্ববিদ্যালয় পার হয়ে যাওয়ারও সেই কত পরে, জিজ্ঞেস করলাম, কেমন আছিস?

নাদিরা অন্য রকম মেয়ে। খোলামেলা, উড়ু উড়ু। একটা ছেলের সঙ্গে ওর চৌদ্দ বছরের সম্পর্ক ছিল। বিয়ের পর নাদিরাকে চাকরি করতে দেবে না বলে সেই বিয়ে আর হলো না। নাদিরা সেই থেকে একা থাকে। ওই ছেলে বিদেশ। চৌদ্দ বছরের সম্পর্ককে নাদিরা নিজের স্বাধীনতার জন্য বিসর্জন দিয়ে এলো। ওর জীবনে অনেক কাহিনী। প্রেমছাড়া হওয়ার পর বেশিরভাগ কাহিনীর সঙ্গে শিশিরের যোগাযোগ। অথচ আজ আর সে শিশিরের কথা বলতেছিল না একদমই। খালি নিজের এসব কথা আবার করে বলতেছিল। চৌদ্দ বছরের সম্পর্কের কথা। কত ঘুরেছে তারা। এই ঢাকা শহরের হেন রাস্তা নাই তারা রিকশায় ঘুরে নাই। পুরান ঢাকা টু বনানী—হেন রেস্টুরেন্ট নাই তারা খায় নাই। চৌদ্দ বছরের তুলনায় ঢাকা খুব ছোট একটা শহর। তবু তাদের প্রেম তো দমে নাই, ঘুরাঘুরি থামে নাই, শোয়াতে কম পড়ে নাই। অথচ চাকরির জন্য সব বিসর্জনে গেল। এই যে কত কথা, কত ঘটনা, অনুরাগ সব কিছুই কি ফ্যালনা? আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়া জানতে চাইল নাদিরা।

: বুঝলি মানুষ সবচেয়ে হারামি প্রাণী আর এর মধ্যে পুরুষরা বেশি হারামি। তুই আবার রাগ করিস না। তোর সাথে যে কেন আমার আগে দেখা হলো না। আমার আসলে তোদের সঙ্গে বেশি মেলে বুঝলি। ওই যে একটু বুদ্ধিজীবী টাইপ। নানা বিষয় নিয়ে কথা বলবে। তোদের মধ্যে এই ফ্রি ফ্রি ভাবটা আমার বেশ লাগে। কিন্তু আমি কিনা সম্পর্ক করলাম একটা গেরস্থ ছেলের সঙ্গে আর সেটা বুঝতে আমার চৌদ্দ বছর লাগবে?

আজ যেন নাদিরা কেঁদে দিবে। জ্যৈষ্ঠের শেষ দিকে ভাসতে ভাসতে আকাশে জমতে থাকা নতুন মেঘের মতো দলা দলা না-পাওয়ার বেদনা ওর চোখেমুখে। কাজল দেওয়া চোখে ভাব জমেছে। আমরা বসছি শুক্রাবাদের ‘হটহাট’-এ। এই জায়গাটা নাদিরার সবচেয়ে পছন্দ। ঢাকা ছোট হলেও এর মধ্যে এত চিপাচাপা যে অগম্যতা থেকেই যায়। চৌদ্দ বছরের দীর্ঘ প্রেমের পরও হটহাট-এ তাদের পায়ের চিহ্ন পড়ে নাই। এটা আমি নাদিরাকে প্রথম চেনাই। সে তো দেখেই অবাক। এমন নিরিবিলি, ছিমছাম একটা রেস্টুরেন্ট সে আগে দেখে নাই। এরপর থেকে এটা আমার আর নাদিরার কমন জায়গা। এখানে বসে সে শিশিরের কথা বলত আমাকে এতদিন।

: শিশির বুঝলি খুব শার্প একটা ছেলে। অন্য রকম একটা জায়গা আছে ওর মধ্যে। এই যে আমি যাই ওর বাসায়, কেউ থাকে না সেখানে তারপরও আমাকে একবারও ছুঁয়ে দেখে নাই। ওর চাহনির মধ্যেই এসব নাই আমার প্রতি। ওর গল্পের মধ্যে দেখিস না কেমন একটা বিয়োন্ড দ্য বাউন্ডারি ব্যাপার আছে। গল্পটা তো আসলে ইমাজিনেশনই বল। মানে এই যে তুই আর আমি গল্প করতেছি, কিন্তু এটা কি গল্প? গল্পে কল্পনাটা থাকতে হয়। শিশিরের আছে। ওর চোখ দুইটাই যেন কল্পনার রাজ্য বুঝলি।

এভাবে শিশিরের গুণকীর্তন আমার শুনে যাইতে হয়। সেটা নাদিরার কারণেই। ওর শরীরটা আমি দেখি, ওর হাসি, গহীন চোখ এসব দেখার জন্যই আমি নাদিরার ডাকে সাড়া দেই। ওরে ডাকি। কফি খাই। রাস্তার দিকে তাকাই। শুক্রাবাদের জঞ্জাল পার হয়ে কেমনে মানুষ যায়? নাদিরা থাকে ওর মায়ের সঙ্গে। বাবার লগে সেপারেশন হয়ে গেছে। নাদিরার বাবার অন্য মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। সেটা তিনি গোপন করতেন। বাসায় সবসময় খিটখিট করতেন। সবাইকে সাপ্রেশনে রাখতেন। প্রতিদিন দিনের একটা সময়ে তিনি বাসার বাইরে থাকতেন। একদিন নাদিরা তার এক বন্ধুকে বলল ফলো করতে। দেখা গেল তিনি একজন বোরখা পরা মহিলাকে নিয়ে ঘুরছেন রিকশায়। নাদিরা তার বাবাকে কখনো পান-সিগারেট খেতে দেখেনি। রিকশায় বসে তিনি পান চিবাচ্ছেন আর সিগারেট খাচ্ছেন। বোরখা পরা মহিলার চেহারা দেখা যাচ্ছে না। চোখ দেখা যাচ্ছে শুধু। ফলো করতে করতে নাদিরার বন্ধু আদাবর পর্যন্ত গেল। সেখানে একটা ফ্যাকাশে চার তলা বিল্ডিংয়ে ঢুকলেন।

এসব আমাকে যতবার বলে, তত রাগে নাদিরার গা জ্বলে।
ফলো করতে করতে সেদিন ওই বাসার নিচে একটা চায়ের দোকানে বসে থাকে তার বন্ধু ঘণ্টার পর ঘণ্টা। দুপুরের পরে বেরিয়ে আসেন তার বাবা। নাদিরার বন্ধু নিজ বুদ্ধিতে নিজেকে আড়াল করার জন্য বোরখা পরে ছিল। সঙ্গে সঙ্গে নেকাব বেঁধে নেয়। দুধর্ষ সেসব অভিযানের দিনে শিশির ছিল নাদিরার পরামর্শদাতা, সহসদাতা। এসব ঘটনায় নাদিরার পরাজয় নাই, বরং জয় আছে—শিশির এভাবে তাকে মানসিক সান্ত্বনা দিত।

পঞ্চম দিনে নাদিরার বন্ধু নিজ সাহস ও বুদ্ধিতে হাতেনাতে ধরে ফেলে তার বাবাকে। ফলো করে উঠে যায় চারতলায়। কলিংবেল বাজিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে। তারপর বোরখার নেকাব খুলে দেখিয়ে দেয় নাদিরার বাবাকে নিজের মেয়ের বন্ধুর মুখ। নিজেও দেখে নেয় সেই মহিলাকে। তাদেরই বয়সী একটা মেয়ে। গ্রাম্য। একটা গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করত। নাদিরার বাবা তাকে একটা প্রকাশনা হাউসে চাকরি নিয়ে দিয়েছিলেন। মেয়েটা দেখতে শ্যামলা। কিন্তু শরীরটা ছিল পোক্ত। ঠাস করে নাদিরার সেই বন্ধুর গালে একটা চড় লাগিয়ে দেয় তার বাবা। ছেলেটা হকচকিয়ে যায়। কিন্তু নাদিরার বাবা হৈ চৈ শুরু করে দেন। নিজের মেয়ের ফন্দিতে এসব হচ্ছে জেনে তিনি চোখের সামনে অস্বীকার করে বসেন তার কোনো মেয়ে নাই। এবং এই ছেলে অনুপ্রবেশকারী। এই মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নিরাপদ রাখার জন্য লোকাল কিছু গুণ্ডাকে পুষতেন তিনি। তাদের ডেকে আনলেন। বললেন ছেলেটাকে পিটিয়ে ঘর থেকে বের করে দিতে। অপমানে, লজ্জায়, অসহায়ত্বে কুঁকড়ে গিয়ে রিক্ত, নিঃস্ব, সর্বশান্ত নাদিরা সেদিন এসব ঘটনার পর আবার বাড়ি ফিরে গেলেও সেটা ছিল তার কাছে ভাঙা হাটের মতো।

সেই থেকে শিশিরের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা। এতে ভীষণ আপ্লুত নাদিরা। এসব বিবরণ নাদিরা আমাকে দিয়েছে। শিশির তো পারত সেদিন তার দুর্বলতার সুযোগ নিতে। নাদিরা কি ফেলনা কিছু? সে দেখে না যে ছেলেরা তার দিকে কেমন করে তাকায়? কিন্তু শিশির, ও যেন সন্ত!

শিশিরের সঙ্গে যোগাযোগ ওর প্রথম প্রেমিকের সূত্রেই। শিশির যদিও বাম ছিল না কখনো। কিন্তু নাদিরার প্রথম ও জ্ঞাত একমাত্র প্রেমিক ছিল বাম। আজিজ সুপার মার্কেট, কাঁটাবন, শাহবাগ, তোপখানা রোড—এসব জায়গা ঢাকার বাম ও সাহিত্যিকদের জন্য কমন জায়গা।

আমি অবশ্য মফস্বল থেকে আসা। শিশিররা বরাবরই ঢাকার ছেলে। ওদের একটা চাপ আছে, ওরা পরিচিত, অনেক কিছু চেনে-জানে। আমার যেমন চিনতে-চিনতেই অনেক সময় চলে গেছে। এমনকি শিশিরকে চিনতেও। ঢাকায় সাহিত্য করতে এসে ঢাকার লোকদের না চিনে সাহিত্য করা যায় না। কিন্তু আমাকে না চিনে সাহিত্য করা যায়। ওদের ইন্টারোগেশনের চৌকাঠ পাড়ায়ে তারপর সাহিত্যিক স্বীকৃতি মেলা।

যাই হোক এসব জায়গার কোথাও শিশিরের সঙ্গে পরিচয় নাদিরার। তারপর হয়তো ফেসবুক, ওর সাহিত্যিক মনোযোগ—এগুলা করতে করতে প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্ক ছুটে গেলেও শিশিরের সঙ্গে রয়ে গেছে। সেই শিশির তার দুশ্চরিত্র বাবার স্বরূপ উন্মোচন কাহিনীর রচনাকার।

এরপর থেকে বাবার বিষয়ে তার ধারণা পাল্টে গেল। মেয়ের বিষয়েও বাবার আচরণ পাল্টে গেল। সে এক বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার। আর পুরোটা সময়ে নাদিরাকে শিশির সাপোর্ট দিয়েছে। আর্থিক, মানসিক—সব। আর সেই নাদিরা আজ একবারও শিশিরের নাম মুখে নিচ্ছে না এতক্ষণ হয়ে গেল। যেন ওই নামে কেউ নাই দুনিয়ায়। আমি একটু অবাক। কিছুটা ভাবছিও ব্যাপারটা কী হতে পারে। নাদিরা এরপর ওইসব সিনেম্যাটিক ঘটনার পর আবার বাসায় স্বাভাবিকভাবে থাকতে শুরু করেছে। এখন সে ব্যাংকে চাকরি আর নিজের মাকে নিয়ে থাকছে। শিশির বা আমি ছাড়া তার অন্যত্র যাওয়া আছে কিনা আমার জানা নাই। জানলেও কিছু করার কী আছে আমার, কিছুটা মনেমনে জ্বলা ছাড়া। আমার সঙ্গে যোগাযোগ সে কেন রাখে জানি না। হয়তো শিশিরের কথা কাউকে না কাউকে তো বলতে হবে এই বিবেচনায়। কিম্বা দ্বিতীয় পুরুষ হিসেবে আমাকে সে গোনায় ধরে। এমনও হতে পারে ওর তো বকবক করা স্বভাব, তা কার সঙ্গে করবে? কিন্তু এই কারণ নিয়ে আমি বিচলিত না।

বরং আজ কেন শিশির আলোচনাতেই নাই তা নিয়ে আমি বেশি চিন্তিত। অনেকক্ষণ আবার নাদিরার পুরান আলাপ, জীবনের গভীর বেদনার কথা শোনার পর জানতে চাইলাম শিশিরের কী খবর।

নাদিরা কিছুটা বিরক্ত মনে হইল। বলল—
: আছে ওর মতো। ওই যে অস্ট্রেলিয়ান গাভীটা আছে না রেহনুমা। ও ফিরছে। ওরে নিয়া আছে। আমার খোঁজ আর লাগে না তার। রেহনুমারে নিয়া নাকি একটা উপন্যাস লিখবে সে। আচ্ছা তুই বল, আমার জীবন কি কম ড্র্যামাটিক। এই যে এত ঘটনা ঘটল, সব তো সে জানে। কিন্তু ওই পুতুপুতু রেহনুমার মধ্যে কী আছে। ও ইউরোপ গেছে বইলাই কি সব! বুঝলি ছেলেরা খুব হারামি হয়। ওদের বুঝে উঠা যায় না। তুই অবশ্য আলাদা। তোর মতো ছেলের সঙ্গে যে আমার আগে কেন দেখা হয় নাই। তোর সঙ্গে মিশতে মিশতে তোরে ভালো লাগে। শিশির অবশ্য শুরুতেই ভালো লাগে। কিন্তু জানিস কি ভরসা করা যায় না ছেলেদের ওপর। আমার মতো মেয়েদের জন্য ছেলে পাওয়া খুব কষ্ট। তোর সঙ্গেই যা একটু-আধটু গল্পগুজব করি বল। নইলে তো আমার সারাটা দিন বেকার যায়। তোর বউ কেমনরে, ফ্রি খুব? অন্য মেয়েদের সঙ্গে মিশলে কিছু বলে না? আমার সঙ্গে যে মিশিস তা তো জানে না। জানে না যখন তখন তুই এত দূরে দূরে রাখিস কেন আমাকে বল তো?

বলতে বলতে কেমন মিইয়ে আসে নাদিরা। আমি রেস্টুরেন্টের গ্লাসের বাইরে তাকাই। আমার বউ বিষয়ে কখনো কিছু জানতে চায় নাই সে। আজ জানতে চাইল কেন ভাবছি।

কয়দিন আগে মোরা নামে একটা ঝড় খুব আতঙ্ক জাগাইছিল। কিন্তু যত গর্জাইল তত বর্ষাইল না। এতে অবশ্য ভালোই হলো। মৌসুমী বায়ুও ধরা দিল। এখন একটা একটানা বাতাস পাওয়া যায়। সন্ধ্যা নামতে শুরু করছে। কেমন একটা সোনালি আলো শুক্রাবাদের আকাশে দম ধরে আছে। রাতে হয়তো বৃষ্টি নামবে। নাদিরা একদম নাকি বৃষ্টিতে ভিজতে পারে না, ওর জ্বর চলে আসে।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র