Barta24

বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট ২০১৯, ৭ ভাদ্র ১৪২৬

English

নিদাঘ

নিদাঘ
অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ
পাপিয়া জেরীন


  • Font increase
  • Font Decrease

না! গাছের উপর পাখি বা কাউয়া কোনোকিছুই নাই। তারপরও কিছুক্ষণ পরপর ছিটা ছিটা পানি পড়তেছে। এইটা তো কাঠবাদাম গাছ, আগার দিকের কয়েকটা পাতা লাল। কিসের পানি কে জানে। একটু আগেই ঘাসের উপর দিয়া পেটমোটা কাঠবিড়ালী দৌড়াতেছিল, পাতার ফাঁক দিয়া কাঠবিড়ালী মুততেছে নাকি? এই পার্কে সবগুলা বেঞ্চ বুক্ড হয়া আছে। দশ-বিশ কদম দূরে বটগাছের গোড়াটা পাকা করা, সেইখানে বসা যায়। প্রবলেম হইল, সেইখানে একটা মেয়ে বসা। মেয়েটার সামনে ছোলা, পপকর্ন, চা, চানাচুর, আচার—দুনিয়ার যাবতীয় জিনিস। সেইগুলা সে একটু একটু কইরা চইখা রাইখা দিতেছে। হাতে একটা আমড়া, আমড়া শেষ না হইতেই চিৎকার দিয়া উঠল—চাচা, ঝালমুড়ি দেন। মেয়ের চাচা খালি পার্কে পাক খাইতেছে—এইদিকেও আসছিল কয়েকবার। অতনুর দিকে সরু চোখে তাকায়া কী জানি বলতে গিয়াও বলল না।

মেয়েটাও তার দিকেই তাকায়া কেমন কইরা পায়ের মাঝখানের আঙুলটা নাচাইতেছে... একবার আঙুলটা বুড়া আঙুলের উপরে উঠায়, আবার বুড়া আঙুলের নিচে নামায়। মাঝখানের আঙুলটা অসম্ভব লম্বা আর চিকন, দেখলেই গা হাত পা শিরশির করে। দিদিমা বলত, পায়ের মাঝখানের আঙুল লম্বা হইলে নাকি অঢালা টেকাপয়সার মালিক হওয়া যায়। অতনুর নিজের আঙুল দুইটাও অনেক লম্বা।

আবারও ঘাড়ের উপর পানির ছিটা পড়তেছে। অতনুর ভয় ভয় লাগতেছে। সন্ধ্যা নামতেছে, গাছের উপরে কাকপক্ষী কিচ্ছু নাই। ফরিদের উপর চরম মেজাজ খারাপ হইতেছে তার। একঘণ্টা ধইরা বইলা যাইতেছে... এই তো দাদা! আর পাঁচ মিনিট বসেন, আমি কাছেই—আইসা পড়ছি।

ফরিদরে নিয়া সে কী করবে কিছুই বুঝতে পারতেছে না। সাথীর সাথে ব্রেক-আপের মূল হইল এই ফরিদ। সাথী ওরে দেখলেই মেজাজ খারাপ করত, আরো আজব ঘটনা হইল ফরিদ সাথীরে সহ্যই করতে পারে না। এইটা এত এক্সট্রিম পর্যায়ে গেছিল যে, ফরিদ একবার বইলাই ফেলল—
‘দাদা, তুমি ব্রাহ্মণ। মা-বাপের একমাত্র পোলা, কত আশাভরসা কইরা রাখছে। তারা কি মাইনা নেবে? আর এই যে সাথী আপা—সে তো টাইম পাস্ করতেছে তোমার লগে। সে বিয়া করবে তাগো ডিপার্টমেন্টের বড় ভাই জাকিররে। সব খবর লওয়া শেষ আমার।
সেগুলা নাইলে বাদ দিলাম, তোমারে কোন দিনটায় শান্তি দিছে কও তো। দুই মিনিট পরপর লোকেশন চেক করে। ফোন ধরতে দেরি করলে কী করে তা তো আমি নিজেই দেখছি। ঘণ্টায় ঘণ্টায় ভিডিও কল দিয়া দেখাইতে হয়—কই আছো, কার লগে আছো। ফেবু পাসওয়ার্ডও তার কাছে। এগুলা কি প্রেম? মাথা বেইচা দেওনের নাম প্রেম?’

ফরিদের কথায় যুক্তি আছে, অতনু বুঝে এইসব। কিন্তু সাথীরে রিপ্লেস করা যায় না। সে ভালোবাসে তারে। অন্য কোনো মেয়ের কথা চিন্তাও করা সম্ভব না। একবার এই ফরিদ এক মেয়ের সাথে পরিচয় করায়ে দিল, মালবিকা কুন্ডু নাম। দুই দিন অতনু কথাও বলছে, কিন্তু কোনোভাবেই জমে না। মাথায় খালি সাথী ঘুরপাক খায়।

এই যে আঙ্কেল! অনেকক্ষণ ধইরা ভাবতেছি একটা কথা কমু। আমার মানিব্যাগটা হারাইছি এইখানেই। বিকাল থেইকা খুঁজতেছি খেয়াল করছেন মনে হয়।
- ও আচ্ছা। আমি দেখি নাই।
- কাছেই বাস-স্ট্যান্ড। দিঘির পাড়ের বাস। নয়ডা বাজলেই বাস বন্ধ। বহুত বিপদে পড়ছি আঙ্কেল। ষাইট টেকা কইরা টিকেট। যদি একটু হেল্প করতেন। বাড়িত গিয়া আপনের বিকাশ নম্বরে...
- ও...কিন্তু!
- কিন্তুমিন্তু কইয়েন না বাবা। জুয়ান ভাতিজী নিয়া রাইতে কই থাকুম কন! পায়ে ধরি, একটু দেহেন। দুইশো টেকা দেন। আমার ভাতিজীরে আপনের পাশে বসায়া দিয়া যাই। আমি ধরেন এই গেলাম আর এই আইলাম। এই সামনেই দিঘির পাড় বাসস্ট্যান্ড।
- এই যে দুইশো টাকা। কিন্তু ভাতিজী রাইখা যাবেন মানে? এরে রাইখা যাবেন ক্যান? না না! এরে নিয়া যান।
- (ওই রুজিনা এইমিহি আয়া বয়) আংকেল, বুঝবেন না কী জ্বালায় আছি। একটু দয়া কইরা বইতে দেন।অতনুর মাথায় কিছু ঢুকতেছে না। সবকিছু এমন আচানক হইতেছে, সব কন্ট্রোলের বাইরে। রুজিনা তার পাশে বসা। শরীরের রং ছাইবর্ণ মেয়েটার, ঠোঁটটা আরজিনার শরীরের মতো চিকচিক করতেছে। নাকে সাদা পাথরের নাকফুল, সেইটাও হীরার মতো চিকচিক করতেছে। চোখে টানা কাজল। কালো মানুষ এত সুন্দর হয় কেমনে? দূরে যখন বইসা ছিল এত কালো তো লাগে নাই! আাচ্ছা, সে কি কোনো সংঘবদ্ধ চক্রের ট্র্যাপে পড়ছে? ঐ চাচামিয়া তার ভাতিজীরে ক্যান তার কাছে দিয়া যাবে!

এই যে শুনছেন! আর কতখন বসায়া রাখবেন? চলেন ঐ দিকটায় যাই। ঝোপের পিছনেই আন্ধার।
- কী কও এগুলা। ঐ ব্যাটা কে তোমার? চাচা না!
- চাচা, তয় হেই চাচা না। রাইতে এই চাচা নাগর হইয়া যায়। তাতাড়ি চলেন তো!
- এই মেয়ে, চুপ থাকো।
আরে ফরিদ! তরে যে কী করতে মন চাইতেছে।- ওয়াও দাদা, ব্রেকাপ হওনের লগে লগেই শুরু হয়া গেছে! ব্রাভো। রিয়েল ম্যান!
- কী কছ্! এই মেয়েরে তার চাচা আমার কাছে জিম্মা রাইখা সামনের বাসস্টপে গেছে টিকেট কিনতে।
- অতনুদা, তুমি এহনও সত্য যুগেই আছো। এই মাইয়া স্লাট, আর তার কথিত চাচা পিম্প। এগুলা এইখানে নতুন নাটক শুরু হইছে। এরা বুইঝা ফেলছে কম্পিটিশনের যুগ, আর পুরুষেরা শিকার করতে ভালোবাসে। এইজন্য ভোলাভালা সাইজা কাস্টমাররে একধরনের বিনোদন দেয়। একচুয়ালি এরা প্রফেশনাল.....
- জ্বী ভাইজান! আপনের অনেক বুদ্ধি। আর একশো টেকা বাড়ায়া দেন। চলেন তিনজনে মিলা ঝোপের দিকে যাই। আমার লগে গাঁজাও আছে। চলেন চলেন।
- এই মেয়ে! থাপ্পর খাইছো?
দেখছস্ ফরিদ, কেমন সাহস! ঐ যে অর চাচা আইতেছে। অখনি সব ক্লিয়ার হয়া যাইব।
- ঐ মিয়া, তোমার ভাতিজী কী কইতেছে এইসব? দালালী তো ভালোই শিখছো।
- আংকেল এই নেন আশি টেকা। আর লাগব না। পকেটে যা ভাংতি আছে রিকশা ভাড়া হইয়া যাইব। ও আল্লা! রুজিনা কী কইছস? বেদ্দবী করছস?
- ভালোই ব্যবসা। দেখি টিকেট দেখি।
- এই যে ভাই দুইটা টিকেট।

ফরিদ ভালো কইরা টিকেট দুইটা চেক করতেছে। অতনুর মাথায় আবারও কয়েক ছিটা পানি পড়ল। মেয়েটারে এখন আর অতো কালো লাগতেছে না কেন কে জানে। ফরিদের তর্কাতর্কি আর ভাল্লাগতেছে না। অতনুর কী করা উচিত, সাথীরে আরেকবার ফোন দিবে? ফোন ধইরা যদি আবার ফরিদের গলা শুনতে পায়, তাইলে তো আরেক ভেজাল। আট বছর ধইরা এই প্রেম, এই সাথীরে ছাড়া সে কেমনে থাকবে! ফরিদরেই বরং বুঝায়া বলতে হবে। ফরিদ বুঝে সব, ওরে নিয়া ঝামেলা। তারপরও সে অতনুর পিছ ছাড়ে না। আকার ইঙ্গিতে অনেকবার বুঝাইতে চাইছে অতনু। কিন্তু ফরিদ ইচ্ছা কইরাই আঠার মতো লাইগা থাকে।

এই যে! আপনের বন্ধু কথার তালে পইড়া চাচামিয়ার লগে দূরে যাইতাছেগা। চলেন এই সুযুগ কাজে লাগাই। এই লন প্যাকেট, ব্যানানা ফ্লেভার।
- দূরে সইরা বসো রুজিনা। এক থাপ্পর খাইবা।
- আরে আসেন না।
- ঐ ফরিদ! আমি গেলাম, তুই থাক এগো লইয়া।

অতনু শরীর ঝাড়া দিয়া উঠে। রুজিনা হিহি কইরা হাইসাই যাইতেছে। অতনু পিছ ফিরা তাকাইতেই রুজিনা একটা বাজে ইঙ্গিত কইরা চোখ টিপ মারল। অতনুর মন খারাপ হয়া গেল। সাথীও হাসতে হাসতে এমন চোখ টিপ দেয়। সাথীর আরেকটা বদভ্যাস আছে, কথা বলতে বলতে অতনুর শার্টের বুতাম ঘুরানো। কত বুতাম যে ঢিলা হইয়া আছে, কতগুলির বুকের দিকে বুতামই নাই।

সাড়ে আটটা বাজে। অতনুর কেন জানি হলে যাইতেই ইচ্ছা করতেছে না। এই কাছেই পল্টনে নাকি ফরিদের মামার বাসা, সেইখানে গেলেও হয়। ফরিদের অবশ্য রাজি হওয়ার কথা না। সাথী একটা অদ্ভুত বিষয় খেয়াল করছে, ফরিদের বিষয়ে স্পেসিফিক কোনো তথ্য জানা নাই। যেমন ফরিদ কই থাকে, দেশের বাড়ি কই, কই পড়াশুনা করছিল। অথচ এই ফরিদ অতনুর বাড়ি তো আছেই, শরীয়তপুরে তার পিসির বাড়ি পর্যন্ত ঘুইরা আসছে।

আর কতক্ষণ এমন দাঁড়ায়া থাকতে ভাল্লাগে। ঐ বেটার সাথে কিসের এত কথা? ভাতিজীর দালাল হইলে হউক। ১২০ টাকা খাইলে খাউক। ধুর! অতনুর হাতে প্যকেটটা রইয়া গেছে। আজব... এইটা তো ম্যাগী নুডুলসের মশলার প্যাকেট! রুজিনা মেয়েটার বিষয়টা আসলে কী! মেয়েটা চরম ফাজিল আর অফকোর্স সে পতিতা না। পার্কের ভিতরে গিয়া আরেকবার কি রুজিনার সাথে কথা বলা উচিত? মেয়েটার প্রবলেমটা কী আসলে!

দাদা চলো। অনেক চাপাচাপি কইরাও শালার থিকা টাকা বাইর করতে পারলাম না। তবে সে বিকাশ করবে। আমি আমার নম্বর দিছি।
- ফরিদ, মেয়েটারে যা ভাবছস, তা না।
- দাদা, কাহিনী তো খারাপ। তোমার হইছে কী? আহো রিকশা লই, হলে দিয়া আসি। ভাইগ্য ভালো তোমার, আজকা সাথী আপা ভিডিও কল দেয় নাই। হাহাহা।
- আজকে হলে যাইতে ইচ্ছা করে না, ফরিদ। চল তোর মামার বাসায়।
- হে হে, আমারেই তারা রাইতে জায়গা দেয় না। লগে তুমি গেলে ত খবরই আছে। এর চাইতে চলো সামনের মাজারে গিয়া শুয়া থাকিগা। সকালে উইঠা সোনারগাঁ বেড়াইতে যামু। আমার মামতো ভাই জসীমের একটা মটর সাইকেল আছে, সেইটা দিয়া রওনা দিমুনে।
- হ, যাওয়া যায়। ঐ দিকটা ঘুইরা টুইরা পরে ট্রলার দিয়া বাড়িত যামু। মারে জানায়া রাখি তাইলে।
- হুররর্ দাদা! এতো আগেই জানানের দরকারডা কী?
তুমি আসলেই! সেইবার নীলগিরি যামু বইলা টেকাপয়সা জমা দিলাম, আর তুমি গিয়া সাথী আপারে জানাইলা। হেয় দিল ব্যাগরা।
- ওহ, সাথীরে ফোন দেওয়া দরকার।
- তাইলে তুমি হলে যাওগা। সে সাথীরে ফোন দিবে। সাথীর বিয়া সামনের সপ্তাহে, বুঝলা? পাত্র ডেনমার্কে থাকে।
- হু, বলছে আমারে।
- কখন কথা কইলা?

অতনু জবাব না দিয়া হনহনায়া হাঁটতে থাকে, বিরক্তিতে মুখ তিতা হয়া যায়। এত খবর ফরিদ জানে কেমনে? ওর জানারই বা দরকার কী? এর আগেও সে এই কাজ করছে। সাথী কই, কোন পোলার লগে বইসা... কোন রঙের জামা পইরা কী কী খাইতেছে সব ডিটেইলে জানাইত। এমনভাবে কইত, মনে হয় এই কামের জন্য ওরে অতনু পে করে। এখনো সে পিছে পিছে আসতেছে আর সাথীর বিয়া বিষয়ক সব তথ্য দিয়াই যাইতেছে। একবার কী হইল, সে সাথীর বিষয়ে গোপন এক্সক্লুসিভ সব তথ্য যোগাড় করছে। মোবাইলে ভিডিও কইরা আনছে সাথীর গাঁজা খাওনের সিন। অথচ এই কাহিনী নতুন না, অতনু জানে এইসব।

হাঁটতে হাঁটতে মাজারের সামনে আইসা দাঁড়াইছে অতনু। ফরিদ একটু দূরে মোবাইল কানে, আঙুল নাড়ায়া সে অতনুরে মাজারে ঢুকতে বলে। ভিতরটা ধুঁয়ার আন্ধার, খিচুরী রান্না হইতেছে। যেই মহিলা রানতেছে, তার একটা হাত দেখা যাইতেছে। তার বিশাল এক ঘোমটা, লাল কাপড় দিয়া সারা শরীর ঢাকা। অতনু হোগলায় বইসা রান্ধুনীর কারবার দেখে। সে পিতলের হাতায় কইরা চাইরবারে একেকটা মালসায় খিচুরি বাড়তেছে। অথচ দুইবারে এইটুক খিচুরি দেওন যায়। একটা সময় সেই মহিলা তারে ইশারায় ডাকে। আশেপাশে ফরিদরেও দেখা যাইতেছে না। অতনু আগায়া যাইতেই হাতে মালসা ধরায়া দেয়।

বাবা, আপনে তো তুলারাশি, এত রাইতে ঘরের বাইরে কেন?
- তাজ্জব ব্যাপার! আপনে পুরুষ মানুষ?
- হ বাবা, আমি আগুন আর ধুঁয়া সহ্য করতে পারি না। কিন্তু রান্দনের কাজটাও আবার আমারই।
- আমার রাশি তো তুলা না, মেষ। ধুয়া সহ্য করতে না পাইরা ঘুমটা দিছেন ঠিক আছে, কিন্তু খোঁপা কইরা ফুল মাথায় লাগাইছেন যে!
- সবকিছু আজকেই জানা লাগবে? বাবা, আপনারে একটা কথা বলি, মিলায়া দেখেন। সবার জন্য ছয় ঋতু, কিন্তু আপনের জন্য এক ঋতু। আপনে শীত কী জিনিস আজও অনুভব করেন নাই। আপনে নিদাঘ, আগুনের হলকা। আপনের জন্য এই দুনিয়ায় খালি গ্রীষ্মকাল আছে।
- ও, তাই!
- বাবা, সামনে আপনের বিপদ। অঙ্গহানি। এই বিপদ আপনে কাটাইতে পারেন এক শর্তে। এই মাজার থেকা তিনদিন বাইর হইবেন না। প্রচুর গরম লাগব, প্রচুর ডাক আসব... কিন্তু এই মাজারে পইড়া থাকতে হইব।
- আইচ্ছা ঠিকাছে। আমার সাথে বন্ধু আছে একজন। তারে বইলা দেখি।
- ভুল করতেছেন বাপধন, আপনের বন্ধু নাই।

লাল কাপড় পরা লোকটা ঝামটা মাইরা চইলা গেল। মনে হয় রাগ করছে। একটু দূরে গান হইতেছে, কয়েকজন লোক কেমন কইরা নাচতেছে। গান ও নাচের ধরনটা সিলেটী গো ধামাইল দেওয়ার মতো। অতনু খাওন হাত দিয়া সরায়া রাখে, ঘুমে চোখ ঢইলা পড়তেছে। ফরিদের বিষয়টা বুঝতেছে না সে, টানা এককঘণ্টা মোবাইলে ফিসফিস করতেছে। তার কোনো কথাই স্পষ্ট শোনা যায় না, মাঝেমইধ্যে শুধু ‘অপরেশন’ শব্দটা একটু শোনা গেল। অতনুর খুব পানির তিয়াস, ঘুমের ঘোরে চাইয়া সে ফরিদরে কয়েকবার ডাকে। ফরিদ কোত্থাও নাই।

সকাল আটটা বাজে। দুইটা লোক মাজারের ফ্লোর ঘইষা ঝকঝকা কইরা ফেলছে। তাদের কানেও ফুল গোঁজা। মনে হয় ফুল নিয়া এই মাজারে কোনো আচার আছে। অতনু মোবাইলের দিকে তাকায়ে দেখে সাথীর কল।

তুমি কই?
- বলা যাবে না, জানলে রাগ করবা।
- তুমি ব্রোথেলে, আমি জানি। তুমি মানুষ না। অতনু তুমি তলে তলে কতদূর যাইতে পার জানতাম। এইজন্যই.....
- থামো তো তুমি। আমি একটা মাজারে আছি, রাতেও ছিলাম এইখানে।
- তুমি সারারাত প্রস্টিটিউটের সাথে ছিলা। খবর পাইছি আমি।
- সাথী, প্লিইজ। তোমার এই সন্দেহ বাতিক নিয়া জীবনেও সুখী হইতে পারবা না।
- একদম চুপ, শুওরের বাচ্চা। কোনো যোগাযোগ করবি না আমার সাথে।
- সাথী!

অতনুর ঘাম দিয়া সারা শরীর গোসল হয়া গেছে। মাথা দিয়া খালি আগুন বাইর হইতেছে। গোসল করতে পারলে মাথাটা ঠান্ডা হইত। মাজারটায় গোছলের ব্যবস্থা আছে, কিন্তু ফরিদ সমানে চিল্লাইতেছে। সে মামাতো ভাইয়ের কাছ থিকা বাইক আনছে, এখন তার মামার বাড়িতে নাকি তুলকালাম কাণ্ড। এখন যেইটা করতে হইব সেইটা হইলো তাড়াতাড়ি রওনা দেওয়া, আর সোনারগাঁ ঘুইরা টুইরা বিকালের মইধ্যে বাইকটা ফিরত দেওয়া। কিন্তু অতনুর কোনোখানেই যাইতে ইচ্ছা করতেছে না। গতরাইতের রাইন্ধইন্যা লোকটা আগায়া আসতেছে তার দিকে। এখন তারে লুঙ্গি ফতুয়ায় নরমাল লাগতেছে। সে কথা বলতেছে না, হাতে ইশারায় থাকতে বলতেছে। এই লোকের হাতে যে চাইরটা আঙুল সেইটা গতরাতে চোখে পড়লো না ক্যান! আজব!

দাদা, তুমি কি আসলে যাবা? চলো তো। যেইখানেই যাও, লেটকা মাইরা বইসা পড়ো।
- ফরিদ, মাজারের খাদেম আমারে তিনদিন থাকন-খাওনের দাওয়াত দিছে। জায়গাটা পছন্দ হইছে আমার।
- অতনু দা, সবারই লাভ-লাইফে ঝামেলা হয়। সেইজন্যে এমন করবা তুমি? এই মাজারগুলি হইলো দান্দালের জায়গা। পয়সার লাইগা এমন কাহিনী করে অরা।
- তা ঠিক। কিন্তু আজব ঘটনা আছে একটা। ঠাকুরদা আমার কুষ্ঠী করছিল নিজ হাতে। কাগজের পিছনে লাল কালি দিয়া ‘নিদাঘ’ শব্দটা লেখা। অনেকরেই এই বিষয়টা দেখাইছি, কেউ কিছু বলতে পারে নাই। অনেকদিন পর এই লোকের মুখে এই শব্দটা শুইনা আশ্চর্য হইছি। সে স্পষ্ট বলছে—তুমি নিদাঘ।
- তুমি না, অতনু দা! এই যুগে কুষ্ঠী আর মাজার নিয়া আসলা? ওকে বুঝছি, তুমি যাইবা না। আমি গেলাম জসীম ভাইয়ের কাছে, বাইক দিয়া আসি।
- না, চল যাই। ঐদিক দিয়া বাড়ি যামু।

সাত দিন পর

গায়ত্রী সান্যাল ছেলে অতনুর পায়ের কাছে বসা। নার্স রেবা অতনুর অবস্থা নিয়া বলতেছে...

একটা লোক অতনুরে এমার্জেন্সিতে ভর্তি করানোর সময় নোট লিখা দিয়া গেছে। বাইক এক্সিডেন্ট, অতনু কোমরে আর পেটে আঘাত পাইছে। একটা ক্লিনিকে চারদিন ট্রিটমেন্টের পর অতনুর সঙ্গের জন মারা গেছে। তার সঠিক পরিচয় পাওয়া যায় নাই বইলা বেওয়ারিশ লাশ হিসাবে দাফন করা হইছে।

গায়ত্রীর চোখে জল। ফরিদ ছেলেটা খুব ভালো ছিল। গত ঈদে ফরিদ অতনুরে মলম পার্টির হাত থেকা বাঁচায়া বাড়িতে নিয়া আসছিল। মাসীমা মাসীমা বইলা পাগল হয়া যাইত। আহা বেচারা।

অতনু ফরিদের বিষয়টা জানে না। অতনু জাইগা উঠার পর গায়ত্রী একবার এক্সিডেন্টের কথা জানতে চাইল, অতনু মনেই করতে পারতেছে না। সে বারবার বলে—মা! এক সাধু আমারে সাবধান করছিল। বলছিলো. ..নিদাঘ! নিদাঘ! দেখো মা আমার ভিতরটা কেমন পুড়তেছে।

সুদীপ বাবু রিপোর্ট নিয়া ডাক্তারের সাথে দেখা করতে গেছিল। তিনি বললেন, এগুলা এক্সিডেন্টের ইনজুরী না। অরগান মিসিং কেইস, অতনুর একটা কিডনি নাই। ডাক্তার দ্রুত পুলিশরে জানাইতে বলল। তার থেকেও জরুরি ওরে ঢাকায় কোথাও এডমিট করা। আরেকটা যে কিডনি, সেইটাও কাজ করতেছে না।

এইদিকে, ফরিদ চুল ফালায়া দিছে...দাড়ি বড় করতেছে। নতুন এ্যাসাইনম্যান্ট নিবে তিন মাস পর। এই কাজগুলিরে সে আর্ট হিসাবে নিছে। এগুলার প্রস্তুতি বিশাল জিনিস। অতনু, রশিদ, মিলা, নজরুল, বাদল, লিপি....এদের জন্য তার খারাপ লাগে না। আফটার অল, হি ইজ আ পারফর্মার!

আপনার মতামত লিখুন :

বাংলা অনুবাদ সাহিত্যে তারুণ্যের জাগরণ

বাংলা অনুবাদ সাহিত্যে তারুণ্যের জাগরণ
প্রসিদ্ধ প্রকাশনীর বড় ভরসা অনুবাদ সাহিত্যগুলো

বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার মধ্যে অনুবাদ সাহিত্য অনেক আগেই তৈরি করে নিয়েছে শক্তিশালী এক অবস্থান। গত এক দশকজুড়ে এই মাধ্যমটা হয়েছে আরো শক্তিশালী। বিভিন্ন প্রসিদ্ধ প্রকাশনীর বড় ভরসা অনুবাদ সাহিত্যগুলো। তেমনি অপেক্ষাকৃত ছোট ও কম খ্যাতিমান প্রকাশনীগুলোও অনুবাদ বই বের করতে বিনিয়োগ করছে এই আশায় যে, তাদের টাকাটা অন্তত কিছু লাভসহ উঠে আসবে। আর এই অনুবাদ সাহিত্যের জগতে, উল্লেখ্য এই সময়টাতে, ভালো অনুবাদক হিসেবে পাঠকদের মনে জায়গা করে নিয়েছেন বেশ কিছু তরুণ অনুবাদক। প্রকাশক ও পাঠক—উভয়েই ভরসা করতে পারছেন দক্ষ এসব তরুণ অনুবাদকদের ওপর।

এই তরুণ অনুবাদকদের বয়স ২০ থেকে ৩৫-এর মধ্যে। তাদের অনেকেই এখনো ছাত্র। কিন্তু, এরই মধ্যে তাদের অনেকের অনুবাদ করা বই অর্জন করেছে দারুণ পাঠকপ্রিয়তা। একই সাথে অনুবাদক হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছেন তারাও। বিশ্বের বিখ্যাত ও বড় বড় লেখকদের বই তারা অনুবাদ করে হাজির করছেন বিশ্বসাহিত্যে আগ্রহী দেশের পাঠককূলের কাছে। তাদের কারণেই অনেক বিখ্যাত ও মাস্টারপিস সাহিত্যকর্ম আস্বাদন করতে পারছেন দেশের বিপুল সংখ্যক পাঠক। কেননা, ভাষার সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে ইংরেজি বা অন্যান্য ভাষায় সেসব বই পড়া সম্ভব হয় না দেশের বেশিরভাগ পাঠকের। তাই, তাদের ভরসা অনুবাদ। আর একাজে আসলেই অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করছেন দেশের তরুণ অনুবাদকেরা। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকাশনীর অনুবাদকদের বেশিরভাগই আসলে এই বয়সী তরুণরাই।

বাংলাদেশে তরুণ অনুবাদকদের এই কর্মস্পৃহাকে স্বাগত জানান অন্বেষা প্রকাশনীর প্রকাশক ও সত্ত্বাধিকারী মোহাম্মদ শাহাদত হোসেন। তিনি বলেন, “তরুণ অনুবাদকদের অনেকেই ভালো করছে। আমাদের অন্বেষা প্রকাশনীতে মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ, সান্তা রিকি, আদনান আহমেদ রিজনের মতো তরুণ অনুবাদকেরা যথেষ্ট ভালো মানের অনুবাদ বই উপহার দিচ্ছেন, এবং সাড়াও পাচ্ছেন পাঠকদের কাছ থেকে। আর দেশে তরুণ অনুবাদক যারা আছেন, তারা যদি অনুবাদকে আরো অর্থবহ করে তোলার সক্ষমতা অর্জন করেন, তাহলে তা অনুবাদ ও প্রকাশনা শিল্প—দুটোর জন্যই ভালো। বেশ কিছু তরুণ অনুবাদক এখন দুর্দান্ত কাজ করছেন। নিকট ভবিষ্যতে দেশের অনুবাদসাহিত্যকে আরো ভালো জায়গায় তারা নিয়ে যাবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।”

এসময়ের একজন জনপ্রিয় তরুণ অনুবাদক মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ। ২০১৫ থেকে এপর্যন্ত তার অনুবাদ গ্রন্থ বের হয়েছে ৪০টির মতো। এপ্রসঙ্গে তিনি বলেন, “একসময় দেশে ভালো মানের অনুবাদ বই বের হতো বেশ কম। এইক্ষেত্রে তরুণরা যে এগিয়ে এসেছে এবং দারুণ কাজ দেখাচ্ছে, তা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। আর্থিক ব্যাপারের থেকে এক্ষেত্রে তাদের কাজ করার প্যাশনটাই অনেক বড়। এই পরিবর্তনটা আসলেই দরকার ছিল।”

বাংলা অনুবাদ সাহিত্য আসলে শুরু হয়েছিল কবির চৌধুরী, কাজী আনোয়ার হোসেন, শেখ আব্দুল হাকিম, রকিব হাসান প্রমুখের হাত ধরে। বিদেশি সাহিত্যকে সহজ ভাষায় দেশের মানুষের কাছে উপস্থাপন করতে বড় ভূমিকা ছিল সেবা প্রকাশনীর। তবে, তাদের বইগুলো ছিল নিউজপ্রিন্ট কাগজের। এরপর ৯০ দশকের শেষার্ধ্ব ও ২০০০-এর প্রথম দশকে বোর্ড বাঁধাই ও হোয়াইট প্রিন্ট কাগজে অনুবাদ বইয়ের প্রচলন ঘটে। এক্ষেত্রে অগ্রগণ্য ভূমিকা রেখেছে সন্দেশ, অন্যধারা, রোদেলা, বাতিঘর, অন্বেষা, ঐতিহ্য ইত্যাদি প্রকাশনী।

বাতিঘর প্রকাশনীর যাত্রা শুরু ২০০৩ সালে মোহাম্মদ নাজিমউদ্দিনের হাত ধরে। তার অনূদিত ও বাতিঘর থেকেই প্রকাশিত ‘দ্য ডা ভিঞ্চি কোড’ বইটি বাংলা অনুবাদ সাহিত্যের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। জনপ্রিয়তা ও বিক্রয় সংখ্যা—দুই দিক থেকেই। ২০০৫-এ এই বইটি অনুবাদ করার সময় নাজিমউদ্দিনও নিজেই ছিলেন একজন তরুণ অনুবাদকই। এর ঠিক আগের সময়টাতে অনুবাদক হিসেবে দারুণ জনপ্রিয়তা পান অনীশ দাশ অপু। বলাই বাহুল্য, তিনিও অনুবাদ করতে ও জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেন তরুণ বয়স থেকেই।

তাদেরই পথ ধরে গত কয়েক বছরে অনুবাদ সাহিত্যে খুব ভালো কাজ দেখিয়েছেন অনেক তরুণ অনুবাদক। এদের মধ্যে পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছেন সায়েম সোলায়মান, মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ, শাহেদ জামান, সালমান হক, কিশোর পাশা ইমন, আদনান আহমেদ রিজন, সাইম শামস, অসীম পিয়াস, কৌশিক জামান, সান্তা রিকি মাকসুদুজ্জামান খান, ডিউক জন প্রমুখ। অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পেয়েছে সায়েম সোলায়মানের ‘কুইন অব দ্য ডন’, ‘কালো কফি’, ‘দ্য ওয়ান্ডারার্স নেকলেস’ (সেবা প্রকাশনী) ইত্যাদি থ্রিলার ঘরানার বই, সালমান হকের বাতিঘর প্রকাশনী থেকে বের হওয়া ‘থ্রিএএম’ সিরিজের বই ও ‘দ্য বয় ইন দ্য স্ট্রাইপড পাজামা’ বইটি, শাহেদ জামানের ‘দ্য পিলগ্রিম’ (বাতিঘর প্রকাশনী), ‘দ্য ফর্টি রুলস অব লাভ’ (রোদেলা প্রকাশনী) ও ‘দ্য ফরবিডেন উইশ (নালন্দা প্রকাশনী), মো. ফুয়াদ আল ফিদাহর ‘সিরিয়াল কিলার’, ‘গেম ওভার’ (সেবা প্রকাশনী) ও ‘সাইকো ২’ (আদি প্রকাশনী), কিশোর পাশা ইমনের ‘দ্য গার্ল অন দ্য ট্রেন’ (বাতিঘর প্রকাশনী), ‘দ্য পাওয়ার অব হ্যাবিট’ (নালন্দা প্রকাশনী), আদনান আহমেদ রিজনের ‘দ্য প্রেসিডেন্ট ইজ মিসিং’ ও ‘দ্য গার্ল ইন রুম ওয়ান জিরো ফাইভ’ (আদি প্রকাশনী), মাকসুদুজ্জামান খানের ‘দ্য আলকেমিস্ট’ (রোদেলা প্রকাশনী) ও ‘অ্যাঞ্জেল অ্যান্ড ডেমনস’ (অন্বেষা প্রকাশনী), ডিউক জনের ‘সুলতান সুলেমান’ ও ‘বিউলফ’ (সেবা প্রকাশনী), কৌশিক জামানের ‘নরওয়েজিয়ান উড’ (বাতিঘর প্রকাশনী), সান্তা রিকির ‘দ্য সার্জন’ (বাতিঘর প্রকাশনী)।

উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, কিছুদিন আগেও যেখানে বাংলা অনুবাদে আক্ষরিক অনুবাদের আধিক্য ছিল, সেখানে বর্তমানের তরুণ অনুবাদকেরা বইয়ের ভাবানুবাদটাই বেশি করেন। একারণে তাদের অনুবাদ হচ্ছে বেশি পরিমাণে সহজ, সাবলীল ও প্রাঞ্জল। আর, পাঠকদের বেশিরভাগই যেহেতু তরুণ, এক্ষেত্রে অনুবাদক-পাঠকের চিন্তাধারাও মিলে যাচ্ছে একই সমান্তরালে।

এই তরুণ অনুবাদকদের অন্য যে বৈশিষ্ট্য সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তা হচ্ছে এদের অনেকেই বই অনুবাদের কাজ শেষ করেন অত্যন্ত দ্রুত। এদের কারো কারো উদাহরণ রয়েছে ২ বছরে ১২টা অথবা দেড় বছরে ৯টি অনুবাদ বই বের করার। কিন্তু মানের দিক থেকে খারাপ হচ্ছে না বা হয়নি তাদের বইগুলো, এমনটাই মনে করছেন পাঠক ও সাহিত্যপ্রেমীরা। অত্যন্ত দ্রুত এবং মান ঠিক রেখে অনুবাদ করার ক্ষেত্রে পাঠক, প্রকাশক ও সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে আলাদাভাবে চিহ্নিত হয়ে আছেন ফুয়াদ আল ফিদা, শাহেদ জামান, সালমান হক, আদনান আহমেদ রিজনেরা। অনেকেই তাদের মতো দ্রুতগতির অনুবাদকদের ভালোবেসে ‘মেশিন ম্যান’ বলে আখ্যা দেন। কিন্তু অনেকের কাছে এই ব্যাপারটাই আবার রহস্য। নেতিবাচক-ইতিবাচক দুরকম মতামতই রয়েছে এ ব্যাপারে। সাহিত্যাঙ্গন নিয়ে কাজ করছেন এবং এক্ষেত্রে ভালো অবস্থানে আছেন, এরকম অনেকেই বিষয়টাকে ইতিবাচক চোখে দেখেন না। তাদের মতামত হচ্ছে, “বর্তমানে অনেক তরুণ অনুবাদকই দেখা যায় একমাসে একটা বই অনুবাদ করছেন। এতে অনুবাদে ভুলত্রুটি থেকে যাচ্ছে অনেক।” এক্ষেত্রে তারা জি এইচ হাবীবের মতো স্বনামধন্য অনুবাদকের উদাহরণ দিয়ে বলেন, তিনি তো সোফির জগত বইটি অনুবাদ করেছিলেন ৩-৪ বছর সময় নিয়ে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/21/1566394777242.jpg
 প্রকাশক, লেখক ও অনুবাদক মোহাম্মদ নাজিমুদ্দিনের হাত দিয়ে গত কয়েক বছরে উঠে এসেছে বেশকিছু ভালোমানের তরুণ অনুবাদক ◢


এই ব্যাপারটাকে কিভাবে দেখছেন প্রকাশনা শিল্পের কর্ণধাররা? যোগাযোগ করা হলে বাতিঘর প্রকাশনীর প্রকাশক, বিশিষ্ট লেখক ও অনুবাদক মোহাম্মদ নাজিমউদ্দিন বলেন, “আমি মনে করি না দ্রুত অনুবাদের কাজ শেষ করলেই তার মান খারাপ হয়। আমি নিজেও খুব দ্রুত কিছু বইয়ের অনুবাদের কাজ করেছি। বর্তমানে আমরা অনুবাদের কাজে প্রযুক্তির সহায়তা অনেক পরিমাণে পাচ্ছি। আগে হাতে লিখে তারপরে হয়তো কম্পোজ করা হতো। তবে, বর্তমানে পার্সোনাল গেজেটেই আমরা করি সেই অনুবাদের কাজটা। আগে হয়তো ডিকশনারিতে খুঁজে খুঁজে ইংরেজি শব্দের অর্থ বের করতাম আমরা। কিন্তু এখন ই-ডিকশনারি থেকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অর্থটা বের করতে পারি আমরা। এডিট করতেও সময় লাগছে আগের তুলনায় অনেক কম। কাজেই দ্রুত কাজ করেও অনুবাদের মান ভালো রাখা যায় বলেই মনে করি।”

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/21/1566394941196.jpg
◤ গত কয়েক বছরে জনপ্রিয়তা পেয়েছে তরুণ অনুবাদক সালমান হকের ‘থ্রিএএম সিরিজ’-এর অনুবাদসহ অন্যান্য অনুবাদ বই ◢


একই মতামত জনপ্রিয় তরুণ অনুবাদক সালমান হকের। তিনি বলেন, “অনেক আগে থেকেই, রকিব হাসান, শেখ আবদুল হাকিমেরাও কিন্তু অনেক দ্রুত কাজ করেন। আমি মনে করি এটা কোনো সমস্যা নয়। আর যারা দ্রুত অনুবাদ করছে, তাদের কারো কারো অনুবাদের মান খারাপ হতেই পারে। তবে, আমি মনে করি এই ধারায় ভালোর পরিমাণই বেশি। কারণ, জোয়ারের সময় অন্যান্য আজেবাজে জিনিসের সাথে কিন্তু পলিমাটিও এসে জমা হয়। আর সম্পাদনার কাজটা যদি ভালো করে বেশ কয়েকবার করা যায়, তাহলে অনুবাদ বইটি অবশ্যই ভালো হবে।”

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/21/1566394866820.jpg
◤ গত কয়েক বছরে পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে তরুণ অনুবাদক আদনান আহমেদ রিজনের বেশ কিছু অনুবাদ বই ◢


তবে, তরুণদের অনূদিত সব বই যে মানসম্মত হচ্ছে, তেমনটাও নয়। এই ফাঁকে নিশ্চিতভাবে কিছু সাব-স্ট্যান্ডার্ড অনুবাদ বই বের হচ্ছে বলে মনে করেন অনুবাদ সাহিত্য-সংশ্লিষ্টরা। জনপ্রিয় তরুণ অনুবাদক আদনান আহমেদ রিজন বলেন, “তরুণরা যে অনুবাদ সাহিত্যে এত বেশি পরিমাণে এগিয়ে আসছে, এতে নিম্নমানের কাজের চেয়ে ভালো মানের কাজই বেশি পরিমাণে বের হচ্ছে। অনুবাদে আসতে হলে সাহিত্যকে ভালোবাসতে হবে। আর যাদের অনুবাদ ভালো হচ্ছে না, সেক্ষেত্রে বলতে হবে অনুবাদ ভালো করে করার যোগ্যতাটাই হয়তো তাদের নেই। সেজন্য অনুবাদে আসতে হলে নিজেদেরকে ভালো করে যোগ্য করে তারপরে আসতে হবে।”

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/21/1566395064592.jpg

◤ একজন অনুবাদকের নিজেকে ঠিকভাবে অ্যাসেসমেন্টের ক্ষমতা থাকতে হবে বলে মনে করেন তরুণ অনুবাদক মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ ◢


তা কিভাবে তরুণ অনুবাদকেরা নিজেদের প্রস্তুত করতে পারে? হতে পারে একজন ভালো অনুবাদক? এই প্রসঙ্গে মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ বলেন, “বই অনুবাদে আসার আগে আমি নিয়মিত লিখতাম রহস্যপত্রিকায়। লেখা ছাপা হওয়ার পর দেখতাম সম্পাদনামণ্ডলী ওখানে কী কী চেঞ্জ এনেছে। এভাবে একজন অনুবাদকের নিজেকে অ্যাসেসমেন্টের যোগ্যতা থাকতে হবে। আর ভালো অনুবাদ যারা করছে, তাদের কাউকে মানদণ্ড ধরে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও ফলাফলটা ভালোই হবে।”

ইতোমধ্যেই তরুণ অনুবাদকেরা অত্যন্ত ভালো ও স্মার্ট কাজ দেখিয়ে অর্জন করেছেন পাঠক ও প্রকাশকের আস্থা। আর তরুণেরা যদি নিজেদেরকে আরো প্রস্তুত করে অনুবাদ জগতে আসেন এবং নিজেদের কাজের মানোন্নয়নে সচেষ্ট থাকেন, তাহলে অনুবাদ সাহিত্যে তরুণ অনুবাদকদের অবদান নিঃসন্দেহে পৌঁছে যাবে নতুন উচ্চতায়।

জহির রায়হান : দেশপ্রেমিক ও সমাজ-সচেতন এক শিল্পী-প্রতিকৃতি

জহির রায়হান : দেশপ্রেমিক ও সমাজ-সচেতন এক শিল্পী-প্রতিকৃতি
অসাধারণ চলচ্চিত্র ও শৈল্পিক সাহিত্যকর্মের স্রষ্টা হিসেবে আজও স্মরণীয় জহির রায়হান

মাত্র ৩৬ বছর বয়সের জীবনেই জহির রায়হান নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী একজন কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র-পরিচালক হিসেবে। প্রচণ্ড বক্তব্যধর্মী ও জীবনমুখী তাঁর চলচ্চিত্রগুলো নান্দনিকতা ও কৌশলগত মানের দিক থেকে এখনো স্মরণীয় হয়ে টিকে আছে। অনুপ্রাণিত করছে বর্তমান ও ভবিষ্যতের চলচ্চিত্রকারদের। তেমনি মাত্র আটটি উপন্যাস লিখেই তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লেখক হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছেন। ‘হাজার বছর ধরে’ দেশের সাহিত্য ও চলচ্চিত্রাঙ্গনে তাঁর পথ চলার কথা থাকলেও, ১৯৭২ সালে নিরুদ্দেশের ‘বরফ গলা নদীতে’ হারিয়ে যাওয়ার পর ফিরে আসেননি আর। আজ এই বহুপ্রজ বিরল প্রতিভার ৮৪তম জন্মদিন।

জহির রায়হানের প্রকৃত নাম মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। জন্ম ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর মজুপুর গ্রামে। জহির রায়হান তাঁর সাহিত্যিক নাম। এ নামেই তিনি সুপরিচিত। তাঁর শৈশব কেটেছে কলকাতায়। দেশ বিভাগের পর ঢাকায় আসেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে বাংলায় এমএ করেন জহির। ছাত্রাবস্থায়ই তাঁর সাহিত্যিক ও সাংবাদিক জীবন শুরু হয়। ১৯৫০ সালে তিনি যুগের আলো পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি খাপছাড়া, যান্ত্রিক, সিনেমা ইত্যাদি পত্রিকাতেও কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি সম্পাদক হিসেবে প্রবাহ পত্রিকায় যোগ দেন। এই সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাই হয়তো তাঁর ভেতরে আরো শক্তভাবে গেঁড়ে দেয় লেখক হওয়ার বুনিয়াদ।

১৯৫৫ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’ প্রকাশিত হয়। কিন্তু, তিনি যে ছিলেন একজন বহুমাত্রিক মানুষ। চলচ্চিত্রের প্রতি ছিল তাঁর মনের ভেতরে গভীর ভালোবাসা। তাই, চলে আসলেন চলচ্চিত্রাঙ্গনে। চলচ্চিত্র জগতে তার পদার্পণ ঘটে ১৯৫৭ সালে, ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে। সহকারী হিসেবে আরো কাজ করেন সালাউদ্দীনের ছবি—‘যে নদী মরুপথে’-তেও। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম তাকে ‘এ দেশ তোমার আমার’-এ কাজ করার আমন্ত্রণ জানান; এ ছবির নামসংগীত রচনা জহির রায়হানের হাতেই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207266898.jpg

◤ ‘বেহুলা’ সিনেমার সেটে নির্দেশনা দিচ্ছেন জহির ◢


সহকারী পরিচালক হিসেবে সফলভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে পরিচালক হিসেবে কাজ করার প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল। ১৯৬১ সালে তিনি রুপালি জগতে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’ নির্মাণ করেন। এটি অবশ্য ছিল উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র। পরের বছর মুক্তি পায় তার প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র ‘বাহানা’। এরপর ১৯৬৬ সালে ‘বেহুলা’, ১৯৬৭-তে ‘আনোয়ারা’, ১৯৭০-এ ‘জীবন থেকে নেওয়া’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘লেট দেয়ার বি লাইট’-এর মতো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। 

চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি, সাহিত্যিক হিসেবেও তাঁর কলম সচল ছিল মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত। অনেক কালজয়ী উপন্যাস তিনি উপহার দিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে : ‘বরফ গলা নদী’, ‘আর কত দিন’, ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, ‘হাজার বছর ধরে’, ‘আরেক ফাল্গুন’, ‘কয়েকটি মৃত্যু’, ‘তৃষ্ণা’, ‘সূর্যগ্রহণ’ ইত্যাদি। সংগ্রামমুখর নাগরিক জীবন, আবহমান বাংলার জনজীবন, মধ্যবিত্তের আশা-আকাঙ্ক্ষা-বেদনা প্রভৃতি তাঁর রচনায় শিল্পরূপ পেয়েছে। সাহিত্যকৃতীর স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (মরণোত্তর) দেওয়া হয়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207304659.jpg
◤ প্রথম স্ত্রী সুমিতা দেবীর সাথে জহির রায়হান ◢


ব্যক্তিজীবনে দুবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন জহির রায়হান। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন চিত্রনায়িকা সুমিতা দেবী। ১৯৬১ সালে বিয়ে করেন তারা। প্রথম পরিবারে অনল রায়হান এবং বিপুল রায়হান নামে দুই পুত্র সন্তানের জন্ম হয়।

সুমিতা দেবীর সাথে বিচ্ছেদের পর ১৯৬৮ সালে আরেক জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা সুচন্দার সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন তিনি। দ্বিতীয় পরিবারে রয়েছেন তার দুই সন্তান অপু ও তপু। তার বড় ভাই প্রয়াত লেখক শহীদুল্লা কায়সার। তিনি লেখক ও রাজনীতিক পান্না কায়সারের স্বামী এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী শমী কায়সারের বাবা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207352881.jpg

◤ জহির রায়হানের আলোচিত, নন্দিত ও প্রভাবশালী চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’র পোস্টার ◢


শুধুমাত্র কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার হিসেবে জহির রায়হানকে দেখলে সবটুকু যেন বলা হয় না তাঁর ব্যাপারে। একজন সমাজ ও রাজনীতি সচেতন শিল্পী ছিলেন তিনি। নিজেও স্বশরীরে অংশ নিয়েছেন দেশ মাতৃকার বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন জহির রায়হান। উপস্থিত ছিলেন একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আমতলা সমাবেশে। এসময় তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে জেলে পুরে দেয়। এই জেলে বসেই তিনি ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’ রচনা করেন। ভাষা আন্দোলন তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যার ছাপ দেখতে পাওয়া যায় তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেওয়া’–তে। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। কলকাতায় তার নির্মিত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেওয়ার বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয় এবং চলচ্চিত্রটি দেখে ভূয়সী প্রশংসা করেন সত্যজিত রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা এবং ঋত্বিক ঘটক প্রমুখ খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকাররা। সে সময়ে তিনি চরম আর্থিক দৈন্যের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হতে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করে দেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207399680.jpg
◤ প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’, যা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত তৈরিতে রাখে দারুণ ভূমিকা ◢


মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী নিধনের এক অসাধারণ প্রামাণ্য দলিল ‘স্টপ জেনোসাইড’ তৈরি করেন জহির রায়হান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী বাঙালিদের দুঃখ-দুর্দশা, হানাদার পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, ভারতে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের দিনকাল প্রভৃতি এই তথ্যচিত্রে তুলে ধরা হয়েছিল। এর প্রথম প্রদর্শনী হয় এক অজ্ঞাত স্থানে, যেখানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রীপরিষদের সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরি করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছিল ‘স্টপ জেনোসাইড’। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে এখন পর্যন্ত নির্মিত ছবিগুলোর মধ্যে শিল্পগত ও গুণগত সাফল্যের দিক থেকে শীর্ষে স্থান দেওয়া হয়ে থাকে এই চলচ্চিত্রটিকে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর জহির রায়হান ঢাকায় ফেরেন। ফিরে জানতে পারেন, মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে পাক হানাদার বাহিনীর দোসর রাজাকার আল বদর বাহিনী তার বড় ভাই প্রখ্যাত লেখক শহীদুল্লাহ কায়সারকে অপহরণ করেছে। নিখোঁজ ভাইকে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করেন জহির। ১৯৭২ সালের ২৮ জানুয়ারি সকালে এক রহস্যময় ব্যক্তি তাকে ফোন করে জানান, তার ভাইকে মিরপুর ১২ নাম্বারে একটি হাউজিং সেক্টরে আটকে রাখা হয়েছে। একথা শুনেই তিনি ভাইয়ের খোঁজে মিরপুর যান এবং আর ফিরে আসেননি।

জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে অনেক ধরনের থিওরি রয়েছে। এমন বলা হয় যে, তিনি একটি সার্চ পার্টি নিয়ে মিরপুরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। সেখানে পাক হানাদার বাহিনীর কিছু সদস্য ছদ্মবেশে ছিল। তারা তাকে লুকিয়ে আটক করে হত্যা ও গুম করে ফেলে। তার ছোট ভাই হাবীবের ভাষ্যমতে, তিনি জহির রায়হানকে মিরপুর পুলিশ স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে এসেছিলেন। এরপর আর তার দেখা পাননি। এমন খবরও শোনা যায়, মিরপুর পুলিশ স্টেশন থেকে জহির রায়হানকে জানানো হয়েছিল, মিরপুর ১২ নাম্বারে কিছু পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকার ছদ্মবেশে লুকিয়ে আছে। সেখানে না গিয়ে আগে তাকে কল ট্রেস করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর তিনি নাকি ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশ স্টেশন থেকে বেরিয়ে যান। আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207448145.jpg

◤ ১৯৭২-এর পর ‘আরেক ফাল্গুন’ হয়তো ‘কখনো আসেনি’ তবে দেশ ও সমাজ-সচেতন শিল্পীদের এগিয়ে যাওয়ার বড় প্রেরণা তিনিই ◢


এ ব্যাপারে বিভিন্ন সময় আরো অনেক গুজব ছড়িয়েছে। এগুলোর কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা, তা যাচাই করা মুশকিল। তাঁর মৃতদেহও কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই নিশ্চিত হওয়া যায়নি কিভাবে মারা গিয়েছেন তিনি। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি তার মৃত্যুদিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

স্বাধীনতার ঠিক পরপর, সেই ৭২ সালেই জহির রায়হান চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলেও তাঁর অসাধারণ, শৈল্পিক ও নান্দনিক সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্রের জন্য জাতি ঠিকই তাকে স্বরণে রেখেছে। চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য কয়েক বছর পর, ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে প্রদান করে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদক (মরণোত্তর)। ১৯৯২ সালে প্রদান করে সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার। আজও তাঁর সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্রগুলো টিকে আছে অমূল্য সম্পদ হয়ে। ১৯৭২-এর পর ‘আরেক ফাল্গুন’ হয়তো ‘কখনো আসেনি’ জহির রায়হানের জীবনে; তবে দেশ ও সমাজ সচেতন শিল্পীদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার বড় প্রেরণা তিনিই। এই ক্ষণজন্মা প্রতিভার জন্মদিনে তাঁর প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম!

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র