Barta24

শনিবার, ২০ জুলাই ২০১৯, ৫ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

মেরি অলিভারের কবিতা

মেরি অলিভারের কবিতা
মেরি অলিভার
ভাষান্তর : কল্যাণী রমা


  • Font increase
  • Font Decrease

মেরি অলিভার এ সময়ের প্রধান আমেরিকান কবি। হেনরী ডেভিড থরো আর ওয়াল্ট হুইটম্যানের প্রভাব দেখা যায় তাঁর কবিতায়। এমিলি ডিকিনসনের সাথেও তুলনা করা হয় মেরি অলিভারকে। এ পর্যন্ত খুব কম সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে তাঁর। একান্তে থাকতে ভালোবাসেন কবি। মেরি অলিভারের মতে কবিতাই তাঁর কথা বলবে। জন্ম ১৯৩৫ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর, ওহাইও-র এক ছোট শহরে।

কালরাতে বৃষ্টি আমার সাথে কথা বলেছিল

কাল রাতে
বৃষ্টি
আমার সাথে কথা বলেছিল
ধীরে ধীরে, বলছিল,

চঞ্চল মেঘের বুক থেকে
ঝরে পড়তে
কী আনন্দ,
নতুন একভাবে আবার

পৃথিবীতে
সুখী হওয়া!
ঝরে পড়তে পড়তে
এ কথাই সে বলেছিল,

লোহার গন্ধ মাখা শরীরে,
সমুদ্রের স্বপ্নের মতো
উধাও হয়ে গিয়েছিল
ডালপালার ভিতর,

নিচের ঘাসের ভিতর।
তারপর বৃষ্টি শেষ হয়ে গেল।
আকাশ পরিষ্কার।
একটা গাছের নিচে

দাঁড়িয়েছিলাম।
গাছটা এমনই ছিল
যার পাতাগুলো সুখী সুখী,
নিজের মনে ছিলাম আমি,

আকাশে তারা ছিল
সে মুহূর্তে
ওরাও ওদের মতো ছিল
যে মুহূর্তে

আমার ডান হাত
আমার বাঁ হাত ধরে ছিল
যা কিনা গাছটা ছুঁয়ে ছিল
আর গাছটা ভরা ছিল তারায় তারায়

আর নরম বৃষ্টিতে—
ভেবে দেখো! দেখো!
ওইসব দীর্ঘ আর বিস্ময়কর ভ্রমণকাহিনীগুলোর
এখনো বাকি আছে আমাদের নিজস্ব হওয়ার।

[“Last Night the Rain Spoke to Me” কবিতার বাংলা ভাষান্তর।]

১৯৫০ সালের মাঝামাঝি অলিভার অল্প সময়ের জন্য ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটি ও ভাসসার কলেজে পড়াশোনা করেন। কিন্তু ডিগ্রি শেষ করেন নি। কবিতার জন্য অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। ১৯৭০ সালে পেয়েছেন শেলী মেমরিয়্যাল এওয়ার্ড। ১৯৮০ সালে গুগেনহাইম ফাউন্ডেশন ফেলোশিপ, ১৯৮৪ সালে ‘আমেরিকান প্রিমিটিভ’-এর জন্য পুলিত্‌জার পুরস্কার।

রাজহাঁস

তুমি কি দেখেছো? সারারাত কালো নদীটায় তার স্রোতে ভেসে যাওয়া?
দেখেছো ভোরবেলা? রুপালি বাতাসে তার জেগে ওঠা?
বাহুতে যতটুকু ধরে তা ভর্তি সাদা ফুল,
তার পাখার বাঁধনে ঝুঁকে পড়তেই মহা তুলকালাম রেশম আর লিনেনের মাঝে;
বরফের বাঁধ, তীর ঘিরে লিলিফুল,
কালো ঠোঁট দিয়ে বাতাস কামড়ে ধরে?
তুমি কি শুনেছিলে? বাঁশি আর শিসের মতো শব্দ?
কালো অন্ধকারের তীক্ষ্ণ গান—গাছের গায়ে প্রবল বৃষ্টির মতো সে সুর—
অন্ধকার কিনারায় ঝরনার মতো তার ধারালো নেমে যাওয়া?
আর তুমি কি দেখেছো? অবশেষে? মেঘের অল্প নিচে—
একটা সাদা ক্রস আকাশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত, তার পা
কালো পাতার মতো, তার পাখা নদীর ছড়িয়ে পড়া আলোর মতো?
এবং তুমি কি তা অনুভব করেছো? তোমার হৃদয়ের ভিতর, কিভাবে যে তা সবকিছুর অংশ?
এবং শেষপর্যন্ত তুমিও কি খুঁজে পেয়েছো? বুঝেছো সৌন্দর্য কিসের জন্য?
এবং তুমি কি বদলে ফেলেছ জীবনটা তোমার?

[“The Swan” কবিতার বাংলা ভাষান্তর।]

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Sep/16/1537044989860.jpg

১৯৯২ সালে ‘নিউ এন্ড সিলেক্টেড পোয়েম’-এর জন্য ‘ন্যাশনাল বুক এওয়ার্ড ফর পোয়েট্রি’, ১৯৯৮ সালে ‘ল্যাননান লিটারেরি এওয়ার্ড’-সহ পেয়েছেন আরো নানা পুরস্কার আর সম্মান।

সাদা ফুলগুলো

কাল রাতে অন্ধকারে
মাঠে শুয়েছিলাম
মৃত্যুর কথা ভাববার জন্য,
কিন্তু তার বদলে ঘুমিয়ে পড়লাম,
যেন এক বিশাল আর ঢালু ঘরের ভিতর
ঘরটা ভর্তি সেইসব সাদা ফুলে
সারা গ্রীষ্মকাল ধরে যারা ফুটে থাকে,
আঠালো, এলোমেলো,
উষ্ণ মাঠের মাঝে।
যখন আমি উঠলাম
তারাদের সামনে
ভোরের আলো
মাত্র গলে গলে
পড়তে শুরু করেছে,
আর আমি ঢেকে ছিলাম ফুলে।
কী জানি কিভাবে এমনটা হয়েছিল—
জানি না আমার শরীরটা
মধু-মাখা লতাগুলোর
নিচে ডুব দিয়েছিল কিনা
ঘুমে তীক্ষ্ণ হয়ে যাওয়া
কোনো এক আসক্তিতে
গভীরতার মাঝে, কিংবা
ওই সবুজ প্রকৃতি বুঝি
ঢেউয়ের মতো উঠে এসেছিল
আমাকে মুড়ে দিতে,
আমাকে নিয়ে নিয়েছিল
তার বলিষ্ঠ বাহুর ভিতর।
আমি তাদের ঠেলে সরিয়ে দিলাম,
কিন্তু উঠে দাঁড়ালাম না।
জীবনে কখনো এমন মখমলের পরশ পাই নি
কিংবা এমন মসৃণতা্র
অথবা এমন চমত্‌কার শূন্যতার
জীবনে কখনো ওই সরন্ধ্র রেখার
এত কাছাকাছি যেতে পারি নি
যেখানে আমার নিজ শরীর শেষ হয়েছিল
আর শুরু হয়েছিল শিকড় কাণ্ড আর ফুল।

[“White Flowers” কবিতার বাংলা ভাষান্তর। কবিতাটি “New Poems” বই থেকে নেওয়া। ]

১৯৯৮ সালে ‘আর্ট ইন্সটিটিউট অফ্‌ বোস্টন’, ২০০৭ সালে ‘ডার্টমুথ কলেজ’, ২০০৮ সালে ‘টাফটস্‌ ইউনিভার্সিটি’, ২০১২ সালে ‘মার্কেট ইউনিভার্সিটি’ থেকে ‘অনাররি ডক্টরেট’ দেওয়া হয় তাঁকে।

ম্যাজেলান

ম্যাজেলানের মতো, চলো মরে যাওয়ার জন্য নিজ নিজ দ্বীপ খুঁজে নেই,
বাড়ি থেকে বহুদূরে, চেনাশোনা যে কোনো জায়গা থেকেই দূরে।
কোনো বুনো, আদিম জায়গার ঝুঁকিই না হয় নিয়ে ফেলি
পাছে আরাম আর হতাশায় আমাদের সে পথ না ঢেকে যায়।

বছরের পর বছর সাধারণ এলেবেলে পথের মাঝে আমরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলেছি,
আর রাতে পাল তুলে বেড়িয়ে পড়ে এমন জাহাজের স্বপ্ন দেখে গেছি।
চল বীরের মতো এগিয়ে যাই, কিংবা আমাদের ভিতরে বীরভাব যদি নাও থাকে,
চলো খুঁজে ফেলি তাদের যারা আমাদের পিছনে পিছনে হেঁটে আসবে, উজ্জ্বল গরিমায়।

প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফেরা ছাড়া জীবনের আর কী মানে আছে? আর
বিকশিত হওয়াকে অস্বীকার ক’রাই কি মৃত্যুর মানে নয়?
ম্যাজেলানের একটা স্বপ্ন ছিল যার পিছনে পিছনে সে চলেছিল।
সমুদ্র বিশাল, ওর জাহাজগুলো অপটু, ধীরে ধীরে চলে।

আর যখন জ্বরের জন্য সে গিয়ে দাঁড়াতে পারত না তাঁর রোগা পটকা নাবিকদের মাঝখানে, চিত্‌কার ক’রে বলে যেত, ‘পাল তুলে এগিয়ে চলো, এগিয়ে চলো!’
ওরাও এগিয়ে চলত, এভাবেই এক পলকা স্বপ্নকে ঘরের দিকে বয়ে নিয়ে।
আর এভাবেই ম্যাজেলান বেঁচে আছে, যদিও সে মারা গিয়েছিল।

[“Magellan” কবিতার বাংলা ভাষান্তর। কবিতাটি  “The River Styx, Ohio and Other Poems” বই থেকে নেওয়া।]

মেরি অলিভারের কবিতায় বারবারই মানুষ এবং প্রকৃতি একজন আর একজনের শরীর জড়িয়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তারপর সে মানুষ জীবন-মৃত্যু-অস্তিত্বের সব প্রশ্নের মাঝ দিয়ে নির্ভয়ে এক অপূর্ব শান্তির পথে হেঁটে গেছে।

বাড়ি থেকে একটা চিঠি

সে আমাকে ব্লু-জে পাখি, নীহারকণা,
তারা আর এখন টিলার উপরে উঠে যাওয়া
যে কোজাগরি পূর্ণিমার চাঁদ—তার খবর পাঠায়।
কথাচ্ছলে বলে ঠান্ডার কথা, বেদনার কথা,
যা কিছু এতদিনে হারিয়ে গেছে তার ফর্দ বানায় সে।
এখানে আমার জীবন কঠিন, ধীরে ধীরে চলে তা,
আমি পড়ে চলি দরজার পাশে
স্তূপীকৃত আরক্ত তরমুজের কথা,
ঝুড়ি ভর্তি ফেন্‌ল্‌, রোজমেরি, ডিল,
আর এদিকে যা কিছু সে তুলতে পারেনি
কিংবা যা পাতার ফাঁকে লুকিয়ে ছিল, তা কালো হয়ে ঝরে যায়।
এখানে আমার কঠিন আর অদ্ভুত জীবনে
আমি ওর পাগল করা আনন্দর কথা পড়ি
যখন তারা ফোটে, নীহারকণা ঝরে পড়ে, ব্লু-জে গান গায়।
বিক্ষিপ্ত সময় তার প্রাজ্ঞ আর ঘূর্ণি খাওয়া হৃদয়ে
কোনো ছাপই ফেলবে না;—
সে জানে কিভাবে মানুষ তাদের জীবন কাটানোর নানা পরিকল্পনা করে
আর তারপর তেমন জীবন সে কোনোদিন কাটায় না।
সে কাঁদে কিনা তা কখনো আমায় বলবে না।

আমি ওর নামের পাশের ক্রসগুলো ছুঁয়ে যাই।
উঠতে গিয়ে পৃষ্ঠাগুলো ভাঁজ করে রাখি।
খামটা একপাশে কাত করতেই বাতাসে ভেসে বেড়ায় টুকরো টুকরো
বর‍্যাজ, উডবাইন আর রু।

[“A letter from Home” কবিতার বাংলা ভাষান্তর। কবিতাটি “No Voyage and Other Poems” (১৯৬৩ এবং ১৯৬৫) বই থেকে নেওয়া।]

আপনার মতামত লিখুন :

হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে

হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে
হুমায়ূন আহমেদ

 

তিনি বলেছিলেন, তার মৃত্যুতে কেউ যেন না কাঁদে। বিষাদ কণ্ঠে গেয়েছিলেন গান, ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায় রে জাদু ধন। মরিলে কান্দিস না আমার দায়।’

কিন্তু সাত বছর আগে সুদূর আমেরিকায় তিনি যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন পুরো বাংলাদেশ কেঁদেছিল তার জন্য। শুধু সেদিনই নয়, বাংলা সাহিত্যের ভক্ত-অনুরাগীরা প্রতিটি দিনই তাকে স্মরণ করেন। তার কথা ভাবেন। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে।

১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর জন্ম নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন ২০১২ সালের ১৯ জুলাই। জীবনের প্রতিটি দিন তিনি ছিলেন সৃষ্টিশীল ও কর্মমুখর। জীবনকে উপভোগ করেছেন তিনি সৃজনের বিবিধ উপাচারে।

হাওর-বাওর-গানের দেশ বৃহত্তর ময়মনসিংহের নেত্রকোণার মোহনগঞ্জের নানাবাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। একই জেলার কেন্দুয়ার কুতুবপুর তার পিতৃভূমি।

পিতার চাকরির সুবাদে হুমায়ূনের শৈশব-কৈশোর কেটেছে বাংলাদেশের বহু স্থানে। সিলেটের মীরাবাজার, চট্টগ্রাম শহর, পিরোজপুরের মনকাড়া প্রকৃতিতে। যেসব কথা তার লেখায় বারবার ফিরে এসেছে।

স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নের স্নাতকোত্তর পাশ করেন তিনি। পিএইচডি ডিগ্রি নেন আমেরিকার থেকে। শুরু করেন অধ্যাপনা।

কিন্তু তার ভাগ্য মিশে ছিল সাহিত্যে। সার্বক্ষণিক লেখালেখি, নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণকে তিনি বেছে নেন। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ও ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসের মাধ্যমে যে লেখক জীবনের সূচনা ঘটে, তা পরিণত হয় বাংলা সাহিত্যের অবিস্মরণীয়-জনপ্রিয় লেখক সত্তায়।

গল্প-উপন্যাসের জাদুকরী ক্ষমতায় অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করেন তিনি। মানুষ লাইন ধরে কেনে তার বই। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি হয় হাজার হাজার কপি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন ঘটনা ছিল অভূতপূর্ব।

আর তিনি ছিলেন মেধা, প্রতিভা ও জনপ্রিয়তার এক বিরল ব্যক্তিত্ব। সমকাল তো বটেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি গড়েছিলেন পাঠকপ্রিয়তার তুঙ্গস্পর্শী রেকর্ড। যে রেকর্ড কারো পক্ষে ভাঙা আদৌ সম্ভব হবে না।

‘অচিনপুর’, ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’, ‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে’, ‘লীলাবতী’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘অচিনপুর’, ‘বাদশাহ নামদার’, ‘দেয়াল’, এমন তিন শতাধিক পাঠকনন্দিত উপন্যাসের রচয়িতা হুমায়ূন আহমেদ বাংলা কথাসাহিত্যে অর্জন করেন নিজস্ব পরিচিতি ও ভূগোল। একা লড়াই করে সাহিত্যের পাঠক সৃষ্টির পাশাপাশি মৃতপ্রায় প্রকাশনাকে বাঁচিয়ে দেন তিনি।

টিভি নাটকেও জনপ্রিয়তার ইতিহাস গড়েন তিনি। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘অয়োময়’, ‘দূরে কোথাও’, এমন হৃদয়ছোঁয়া নাটকের মাধ্যমে ছোটপর্দায় টেনে আনেন হাজার হাজার দর্শক।

চলচ্চিত্র নির্মাণ করেও সোনা ফলিয়েছেন হুমায়ূন। সিনেমাহলমুখী করেছেন মানুষকে। তার নির্মিত ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘ঘেটু পুত্র কমলা’র মতো ছবি বাণিজ্য সফল ও পুরস্কৃত হয়েছে।

নাটক ও চলচ্চিত্রে তিনি লোকবাংলার বহু গান চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার কথা বলেছেন। মানব-মানবীর অন্তর্গত হৃদয়ের দাহ ও বিষাদকে তুলে ধরেছেন অনন্য সুষমায়। তাকে ঘিরে শিল্প, সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্রের এক নান্দনিক জগত উন্মোচিত হয়েছিল।

প্রেম ও রহস্যময় বেদনার প্রতীক নগ্নপদে হলুদপাঞ্জাবির ‘হিমু’ তার অনবদ্য সৃষ্টি। যুক্তিবাদী বিশ্লেষক মিসির আলীর মতো চরিত্রও তিনি সৃষ্টি করেছেন। হুমায়ূনের এই দুই চরিত্রের কথা বাংলা সাহিত্যের পাঠক সহজে ভুলবে না। ভুলবে না এমন আরো অনেক মানবিক চরিত্র ও কাহিনীর নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদকেও।

মুক্তিযুদ্ধের মহান শহীদ, পুলিশ অফিসার বাবার জেষ্ঠ্য সন্তান হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টির পুরোটা জুড়েই আছে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ। হুমায়ূনের উপন্যাস ‘১৯৭১’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘উতল হাওয়া’ এবং চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’ বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের হৃদয়স্পর্শী কাহিনীচিত্র। যুদ্ধাপরাধ, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লেখার পাশাপাশি আন্দোলনও করেছেন তিনি।

প্রেম ও বিরহ হুমায়ূনের লেখার মূল উপজীব্য হলেও তিনি তার লেখায় অপরূপ দক্ষতায় স্পর্শ করেছেন রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক ঘটনাবলি। লেখার মায়াবী টানে তিনি পৌঁছে গেছেন মানুষের নিবিড় সান্নিধ্যে। নীল জোছনায় বেদনাহত একটি তরুণ কিংবা নীলপদ্ম হাতে একটি তরুণীর স্মৃতি-সত্তা পেরিয়ে হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন মানুষের চেতনার গহীন প্রদেশে। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে।

কাঙ্গাল হরিনাথের ১৮৬তম জন্মবার্ষিকী

কাঙ্গাল হরিনাথের ১৮৬তম জন্মবার্ষিকী
ছবি: সংগৃহীত

সাংবাদিকতার পথিকৃৎ, সাহিত্যিক, সমাজসেবক ও নারী জাগরণের অন্যতম দিকপাল কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের ১৮৬তম জন্মদিন আজ শনিবার (২০ জুলাই)। 

কালজয়ী এই সাংবাদিক ১২৪০ সালের ৫ই শ্রাবণ (ইংরেজি ১৮৩৩) কুষ্টিয়া জেলার (তদানীন্তন নদীয়া) কুমারখালী শহরের কুন্ডুপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম হলধর মজুমদার ও মায়ের নাম  কমলিনী দেবী।

হরিনাথ মজুমদার ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। শৈশবেই মাতৃ ও পিতৃহারা হয়ে চরম দারিদ্র্যতার মধ্যদিয়ে বেড়ে উঠেন তিনি। তিনি অত্যাচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে ছিলেন আপসহীন।

তৎকালীন সময়ে তিনি (১৮৫৭ সাল) প্রাচীন জনপদ কুমারখালীর নিভৃত গ্রাম থেকে হাতে লেখা পত্রিকা 'মাসিক গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা' প্রকাশ করেন। গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকায় তিনি ইংরেজ নীলকর, জমিদার ও শোষক শ্রেণির অত্যাচার, জুলুম, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার ও সামাজিক কু-প্রথার বিরুদ্ধে খবর প্রকাশ করেন। হাজারো বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে তিনি পত্রিকাটি প্রায় একযুগ প্রকাশ করেছিলেন।পরবর্তীতে মাসিক থেকে পাক্ষিক এবং ১৮৬৩ সালে সাপ্তাহিক আকারে কলকাতার গিরিশচন্দ্র বিদ্যারত্ন প্রেস থেকে নিয়মিত প্রকাশ করেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/20/1563602039922.jpg
কাঙ্গাল হরিনাথের লেখা পত্রিকা 'মাসিক গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা' 

 

১৮৭৩ সালে কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার তঁর সুহৃদ অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়’র বাবা মথুরনাথ মৈত্রয়’র আর্থিক সহায়তায় কুমারখালীতে এম, এন প্রেস স্থাপন করে, গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’র প্রকাশনা অব্যাহত রাখেন।

কুষ্টিয়ার প্রবীণ সাংবাদিক আবদুর রশীদ চৌধুরী বলেন, সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার ৬৩ বছরে জীবনকালে তিনি সাংবাদিকতা, আধ্যাত্ম সাধন, সাহিত্যচর্চা সহ নানাধরণের সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। মূলত তিনি ছিলেন সাংবাদিকতা পেশার একজন সংগ্রামী মানুষ।

কালজয়ী এই সাংবাদিক জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আজ শনিবার (২০ জুলাই) কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর মিলনায়তনে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/20/1563602126966.jpg
কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর মিলনায়তন

 

কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর য়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন, কুষ্টিয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার সেলিম আলতাফ জর্জ।

বিশেষ অতিথি থাকবেন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সচিব (যুগ্ম সচিব) মোঃ আবদুল মজিদ, কুমারখালী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ আব্দুল মান্নান খান, পৌর সভার মেয়র মোঃ সামছুজ্জামান অরুণ। অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসাবে থাকবেন, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড.আবুল আহসান চৌধুরী।

সাংবাদিক কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার প্রায় ৪০টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তবে বেশিরভাগ অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। তাঁর গ্রন্থগুলোর মধ্যে বিজয় বসন্ত একটি সফল উপন্যাস। গবেষকদের মতে, কাঙ্গাল হরিনাথ রচিত বিজয় বসন্ত উপন্যাসটিই বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম উপন্যাস। 

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/20/1563602157692.jpg
কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর মিলনায়তনের সামনের চিত্র 

 

গ্রামীণ সাংবাদিকতার এবং দরিদ্র কৃষক ও অসহায় সাধারণ মানুষের সুখ-দু:খের একমাত্র অবলম্বন কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের স্মৃতি রক্ষার্থে সরকারি উদ্যোগে কুমারখালীতে সাংবাদিক কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ করা হলেও এখনো অবহেলিত রয়েছে এই কালজয়ী সাংবাদিকের জন্মভিটা (বাস্তুভিটা)।

স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীসহ কবি-সাহিত্যিকদের ভাষ্যমতে, কাঙ্গাল হরিনাথ ব্যবহৃত ও গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’র সেই মুদ্রণ যন্ত্রটি এখনো অযত্ন অবহেলায় অন্ধকার একটি ভাঙা ঘরে পড়ে রয়েছে। তাই অনতিবিলম্বে ঐতিহ্যবাহী এই মুদ্রণ যন্ত্রটি কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘরে স্থানান্তর এবং কাঙ্গালের সমাধিসহ জন্মভিটা (বাস্তুভিটা) সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।  

কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার বাংলা ১৩০৩ সালের ৫ বৈশাখ (ইংরেজি ১৮৯৬ সাল, ১৬ এপ্রিল) নিজ বাড়িতে দেহত্যাগ করেন। 

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র