Barta24

মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯, ৫ ভাদ্র ১৪২৬

English

বিবর্ণ সায়র

বিবর্ণ সায়র
অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ
ফাহ্‌মিদা বারী


  • Font increase
  • Font Decrease

এক

দিলারা হাসান পাতলা টাওয়েল দিয়ে শিশুটিকে প্যাঁচিয়ে বের হয়ে এলেন লেবার রুম থেকে। একটুও সময় নষ্ট করলেন না তিনি। ডাক্তার, দুজন জুনিয়র সহকারি ডাক্তার, নার্স...সবাই বিস্মিত হয়ে তাকে দেখছে। বাধা দেওয়ার ক্ষমতাটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে সবাই। দিলারা হাসান নির্বিকার। এত কিছু লক্ষ্য করার সময় নেই এখন। ডাক্তারের কাছ থেকে বিশেষ অনুমতি নিয়েই লেবার রুমে ঢুকেছিলেন তিনি। প্রথমে রাজি হচ্ছিলেন না ডাক্তার রওশন জাহান। বেশ কড়া ভাবেই বলেছিলেন, ‘আরে, কী বলছেন এসব আপনি? আপনি কেন থাকবেন লেবার রুমে? আমাদের হসপিটালের একটা নিজস্ব নিয়ম আছে। আমরা ডাক্তার কিংবা নার্স ছাড়া অন্য কাউকে লেবার রুমে এলাউ করি না।’
দিলারা হাসান কাতর মুখে বলেছিলেন, ‘দেখুন, দয়া করে বোঝার চেষ্টা করুন। আমার মেয়েটি সাঙ্ঘাতিক ভীতু প্রকৃতির। ভয়ে শেষমেশ ওর একটা ভীষণ কিছু হয়ে যাবে। আমি থাকলে মেয়েটা একটু সাহস পেত।’
‘দেখুন, আপনিও দয়া করে বোঝার চেষ্টা করুন। সব মেয়েদেরই এইরকম সময় পার করতে হয়। ডেলিভারি পেইন সহ্য করে মা হতে হয়। পৃথিবীর সব মেয়েই কি সাহসী হয়ে জন্মায়? মা হওয়ার এই প্রক্রিয়াও তাদের সাহসী হতে সাহায্য করে। তাছাড়া আপনার মেয়ের বয়স অল্প। ডেলিভারিতে কোনোরকম কমপ্লিকেসি হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। আমি কেন আপনার এই অন্যায় আবদার মেনে নেব?’

দিলারা হাসান তবুও গোঁ ধরে বসে থাকেন। কিছুতেই নিজের আবদার থেকে তাকে সরানো যায় না। শেষ পর্যন্ত নিতান্ত ইচ্ছের বিরুদ্ধে রাজি হতে বাধ্য হলেন ডাক্তার রওশন জাহান। দিলারা হাসান ডেলিভারির সময় লেবার রুমে থাকার অনুমতি পেলেন। কিন্তু ডেলিভারির পরপরই তিনি কেমন যেন অস্থিরতা শুরু করে দিলেন। তাড়াতাড়ি বাচ্চাকে কোলে নেওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন।

উপস্থিত ডাক্তার, নার্স প্রত্যেকে খুব বিরক্ত হয়ে উঠল এই আচরণে। ডেলিভারির পরে বাচ্চাকে তার মায়ের বুকে দেওয়ার কথা...কিন্তু দিলারা হাসান কেমন একরকম ছোঁ মেরেই বাচ্চাকে তুলে নিলেন। তারপরে হঠাৎ করে কাউকে কিছু বোঝার অবকাশ না দিয়েই বাচ্চাকে একটা টাওয়েল দিয়ে পেঁচিয়ে সেখান থেকে বের হয়ে এলেন। যে মেয়ের জন্য তিনি লেবার রুমে ঢোকার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন, সেই মেয়ের দিকে একবার ফিরেও দেখলেন না।

লেবার রুমে উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে এ ওর মুখের দিকে তাকাতে লাগল। কী ঘটে গেল তারা যেন কিছুই বুঝতে পারছে না। এভাবে বাচ্চাকে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার কী মানে হয়? আর তাছাড়া ডেলিভারির পরে বাচ্চাটাকে কিছুক্ষণ অবজারভেশনেও রাখার কথা। অথচ এই ভদ্রমহিলা কাউকে কোনো সময়ই দিলেন না!

বাইরে বেরিয়ে দিলারা হাসান নির্দিষ্ট জায়গায় অপেক্ষা করতে লাগলেন। বাচ্চাটা কাঁদছিল। তিনি মুখে একটা দুধের ফিডার ধরে দিলেন। কিছুক্ষণ টেনে তার কান্না বন্ধ হয়েছে। ড্রাইভার আর কাজের মেয়ে কমলাকে আগে থেকেই সবকিছু বলা ছিল।

নরমাল ডেলিভারি হয়েছে। অল্প সময়েই রোগীকে ওয়ার্ডে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকেই একটা হুইল চেয়ারে বসিয়ে তাকে ওঠানো হয়েছে গাড়িতে। ওয়ার্ডের এসিস্টেন্ট নার্স অনেক বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। সুবিধা করতে পারেনি। নার্স কিছু একটা সন্দেহ করে ডাক্তারকে ডেকে আনার জন্য পাও বাড়িয়েছিল। তখনই তার হাতে বেশ কিছু নোট গুঁজে দেয় ড্রাইভার লিয়াকত।

রোগীকে গাড়িতে উঠিয়ে তারা দুজন দিলারা হাসানকে চোখের ইশারা করে। সেটা দেখেই আর দেরি করেন না দিলারা হাসান। তাড়াতাড়ি চলে আসেন রিসেপশনে।

ক্লিনিকটা তেমন পুরনো নয়। মোটামুটি নতুনই বলা চলে। স্টাফ সংখ্যাও খুব একটা বেশি নয়। ওয়ার্ডগুলো বেশ ফাঁকা ফাঁকা। চিকন করিডোরটা পার হতে হতে এদিক সেদিক দেখছিলেন দিলারা হাসান। নাঃ! তেমন কেউ নেই আশেপাশে।

রিসেপশনে এসেই থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন তিনি। রিসেপশনিস্ট মেয়েটি চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। দিলারা হাসান কিছুক্ষণের জন্য থতমত খেয়ে গেলেন। কিন্তু খুব তাড়াতাড়িই সুনিপুণ দক্ষতায় নিজেকে সামলে নিলেন তিনি। করুণ মুখে বললেন, ‘আমার মেয়ের বাচ্চাটা মনে হয় বদল হয়েছে। আমি কাউকে পেলাম না কথাটা বলার জন্য। আপনি...তুমি কি একটু দেখবে দয়া করে মা?’ মেয়েটা ফোন করার জন্য রিসিভার কানে তুলতে যাচ্ছিল দেখেই তিনি তাড়াতাড়ি আবার বলে ওঠেন, ‘না না...তুমি একটু বাচ্চাটাকে সাথে করে নিয়ে যাও। আমি এখানেই আছি। একটু কিছুক্ষণের জন্য...নিজে গিয়ে একটু দেখো না মা!’

রিসেপশনিস্ট মেয়েটি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল দিলারা হাসানের দিকে। তার রিসেপশন থেকে উঠে যাওয়ার অনুমতি নেই। আবার ভদ্রমহিলার কথাগুলোও সে ঠেলতে পারছে না। বয়স্ক একজন মানুষ মা মা বলে তাকে অনুরোধ করছে। এটা ঠেলে ফেলার মতো মনের জোর এখনো হয়ে ওঠেনি মেয়েটার। সে কোলে তুলে নিলো বাচ্চাটিকে। বাচ্চাটি ঠিক সেই মুহূর্তেই কেমন যেন একটা শব্দ করে উঠল। দিলারা হাসান আবার তাড়া দিলেন তাকে। মেয়েটি কিছুটা অনিচ্ছা সহকারেই এগিয়ে গেল সামনের দিকে।

আর দাঁড়ালেন না দিলারা হাসান। তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে সশব্দে বন্ধ করে দিলেন দরজা। মেয়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন নিশ্চল চোখে। ব্যথায় কুঁকড়ে যাওয়া মুখে স্বগতোক্তি করে চলেছে তার মেয়ে ঈষিতা, ‘একটিবার দেখতেও দিলে না আমাকে? একটিবারের জন্য ওকে কোলে নিতে দিলে না! মাত্র একবার....’
দিলারা জামান ঠান্ডা গলায় ড্রাইভারকে নির্দেশ দিলেন, ‘লিয়াকত, গাড়ি চালাও।’

দুই

আঠারো বছর পরের কথা...
লতিফা বেগম আঁচারের বয়াম রোদে শুকাতে দিয়ে মোড়ায় বসে উলকাঁটা বুনছেন। শীতের সকালের মিঠেকড়া রোদ। এমন আরামদায়ক রোদে পিঠে রোদের হাল্কা আঁচ এসে লাগলে শরীরটা চনমনে হয়ে ওঠে। বাতের ব্যথারও বড় উপশম হয়। তিনি শীতের সকালের এই রোদটা উপভোগ করার জন্য সব কাজকর্ম ফেলে রাখতে রাজি আছেন।

ছোট বউমা আঁচার বানিয়েছে। লতিফা বেগম বসে বসে সেই আঁচার পাহারা দিচ্ছেন। এই অজুহাতেই তিনি দীর্ঘসময় রোদে বসে থাকেন। কারণ বেশিক্ষণ আরাম করে রোদ পোহানোর জো নেই। বড় বৌ সোহানা তার এই বেশিক্ষণ রোদ পোহানোর ওপরেও কড়াকড়ি জারি করে দিয়েছে। শক্ত নির্দেশ দিয়ে বলেছে, ‘মা, আপনি কিন্তু অনেক বেশি সময় রোদে বসে থাকেন। বেলা বারোটার পরে সূর্যের আলো সরাসরি গায়ে না লাগানোই ভালো। সকাল আটটা থেকে নয়টা...বড়জোর দশটা, ব্যাস! তারবেশি দরকার নেই। এক ঝামেলা মেটাতে গিয়ে আরেক ঝামেলা বাঁধিয়ে বসবেন দেখছি!’

সোহানা ডাক্তার। কাজেই তার কথা না শুনে উপায় নেই। তবু রোদ থেকে উঠে আসতে মন চায় না লতিফা বেগমের। বসে বসে কত কী ভাবনায় জড়িয়ে যান তিনি! রোদের ওম গায়ে লাগিয়ে ব্যথা বেদনাকে সাময়িক ছুটি দিয়ে সংসারের হাজার বেদনায় ইচ্ছেমতন ডুব মারা যায়।  মনোকষ্টের কি আর শেষ আছে? আপাতত ছোট ছেলের বৌকে নিয়েই যত চিন্তা তার। বিয়ের প্রায় পনেরো বছর হতে চলল। এখন অব্দি মা হওয়ার নাম নেই! সারাদিন রান্নাবান্না, সেলাই ফোঁড়াই নিয়ে তুমুল ব্যস্ত সময় কাটায়। কী ই বা করবে বেচারী! একটা কিছু না করলে তার সময়টাই বা কিভাবে কাটবে?

লক্ষীগোছের চুপচাপ মেয়ে দেখে ঘরে এনেছিলেন। দেখতে শুনতে একেবারে এক নাম্বার। মাস্টার্স করছিল। বড় বৌ ডাক্তার। কাজেই ছোটজন লেখাপড়াতে বেশি পিছিয়ে থাকলে বিয়ের পরে দুই বৌয়ের মধ্যে ঝামেলা বাঁধতে পারে। ব্যক্তিত্বের ঝামেলা। সেজন্যই মাস্টার্স পাশ মেয়ে দেখে খুঁজে এনেছিলেন। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে সেটাই কাল হয়েছে। আরেকটু কম বয়সী মেয়ে নিয়ে এলে হয়তো বাচ্চা হতে এই সমস্যাটা পোহাতে হতো না। আজকাল মেয়েদের একটু বাড়তির দিকে বয়স চলে গেলেই বিপদ। বাচ্চা হওয়া বন্ধ হয়ে যায়।

ছোটছেলের যদি কোনো উত্তরাধিকার না থাকে, তাহলে কিভাবে সয়সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারা করবেন সেই চিন্তাতেই রাতে ঘুম আসে না তার। স্বামী তো তার ঘাড়ে সব দায় চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে ওপারে বসে আছে। বড় জনের দুই ছেলে। বিপুল অধিকার তার। অথচ আদরের ছোট ছেলের ঘর শূন্য। মা হয়ে এই ব্যবধান তিনি সহ্য করতে পারছেন না। সোহানার বাছাই করে দেওয়া গাইনোকলজিস্টকেই দেখিয়ে আসছে ছোট বৌমা। কিন্তু সুফল তো আজও এলো না! তিনি চোখ বুজলেই যদি সম্পত্তি নিয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া বাঁধে!

ঈশিতা ছাদে উঠে এসে দেখে, গালে হাত দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে তার শাশুড়ি। হাতের উলকাঁটা মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আঁচারের বোতলের কাছে দু’তিনটি কাক ঘুরঘুর করছে। একজন একটু বেশি সাহসী হয়ে মুখ প্রায় লাগিয়েই ফেলেছে আর কি! ঈশিতা দৌঁড়ে গিয়ে সেটাকে তাড়িয়ে দিয়ে শাশুড়ির দিকে মুখ ফিরিয়ে বলে, ‘মা, কী করছেন? নিচে চলেন। ভাবী একবার ফোন করে খবর নিয়েছে আপনি ছাদ থেকে ফিরেছেন কি না!’
লতিফা বেগম ঈশিতার আওয়াজ পেয়ে নড়েচড়ে বসেন। ওঠার আয়োজন করতে করতে বলেন, ‘বড় বৌমার জ্বালায় একটু আরাম করে রোদ পোহাতে পারি না!’
ঈশিতা মুখ টিপে হাসে। আঁচারের বয়ামগুলোর মুখ আটকাতে আটকাতে ক্ষীণসুরে বলে, ‘মা, আজ বিকেলে একটু মোহাম্মদপুরে যাব।’

মোহাম্মদপুর ঈশিতার বাবার বাড়ি। সে মাসে বড়জোর এক দু’বার বাবার বাড়িতে যায়। ইচ্ছে করলে প্রতি সপ্তাহেই যেতে পারে। কারো কোনো আপত্তি নেই তাতে। কিন্তু ঈশিতা নিজে থেকেই তেমন একটা উৎসাহ দেখায় না। লতিফা বেগম জোরাজুরি করেন না। মেয়ে যদি নিজে থেকে বাবার বাড়িতে যেতে আগ্রহ না দেখায়, তাহলে তার কী করার আছে? অবশ্য ঈশিতার মাকে তিনি মনে মনে একটু ভয় পান। এমন কাঠখোট্টা স্বভাবের মহিলা! কেমন যেন চাঁছাছোলা ভাবভঙ্গি! মাধুর্য শব্দটা তার ভেতরে খুঁজেই পাওয়া যায় না। অথচ ঈশিতার আঁচার আচরণ ভারী নম্র। এমন মায়ের এরকম মেয়ে কিভাবে হয়, তা এক বিস্ময়েরই ব্যাপার বটে! বয়ামগুলোর মুখ আটকে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে ঈশিতা। শাশুড়ি নিচে নেমে গেছেন ইতিমধ্যে।

বিয়ের পরে এই বাড়িটাতেই শিকড় বিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে গেছে ঈশিতা। খুব ডাকাডাকি না করলে মায়ের কাছে যেতেও ইচ্ছে করে না ওর। কেন যেন মনে হয়, আঠারো বছর আগের সেই ঘটনাটি না ঘটলে ওর জীবনটা অন্যরকম হতে পারত।

যদিও মাকেও দোষ দেওয়া যায় না কিছুতেই। মেয়ের ভবিষ্যত সাচ্ছন্দ্যের দিকটা তো বাবা-মাকেই দেখতে হয়! অবশ্য ওর জীবনে বাবার ভূমিকা প্রায় নেই বললেই চলে। ছোটবেলা থেকেই ওদের পরিবারে মা’র কথাই শেষ কথা। বাবাকে নীরব দর্শকের ভূমিকায় দেখতে দেখতে সেই বাড়ির প্রতি কেমন যেন অভক্তি জন্মে গিয়েছিল ঈশিতার। তাইতো মোমেনের হাত ধরে পালিয়ে গিয়েছিল একদিন। পালিয়েই বাঁচতে চেয়েছিল।

মোমেনকে বিয়ে করে সন্তানের মাও হতে পেরেছিল সে। কিন্তু ওর নিজের মা ই তাকে সেই সংসার করতে দেয়নি। ছিনিয়ে নিয়েছে সবকিছু। মা’র পছন্দেই আবার নতুন সংসার পাততে হয়েছে তাকে। সব অতীতকে নিপুণ দক্ষতায় ধামাচাপা দিয়ে ঈশিতার মা তাকে আবার বিয়ে দিয়েছে। আজ্ঞাকারী ভক্তের মতো চুপচাপ সবকিছু মেনে নিয়েছিল ঈশিতা। এই নতুন সংসারেই সে ডালপালা ছড়িয়ে বাঁচতে চেয়েছিল আবার। কিন্তু ভাগ্যের ফের কার জানা আছে? সে তো শিকড় ছড়িয়েছে ঠিকই...কিন্তু ডালপালা আর ছাড়তে পারল কই?

তিন

ঈশিতা আগে একবার মা হয়েছিল। তার কেসটা প্রাইমারি ইনফার্টিলিটির নয়।
গাইনোকলোজিস্ট রেহানা খানম সোহানার টিচার ছিলেন। ঈশিতার ইনফার্টিলির বিষয়টা দেখার জন্য তার চেয়ে বেশি কাউকে পারদর্শী মনে করেনি সোহানা। সেই রেহানা খানমই একদিন ফোনে জানিয়েছিলেন বিষয়টা। সোহানা একেবারে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল শুনে। সহজ সরল বোকা ধরনের একটা মেয়ে ঈশিতা। কে জানত, ওর জীবনে এমন বিষয় লুকিয়ে আছে! অবশ্য সে জানে, আলাভোলা মেয়েরাই জীবনে বিপদে পড়ে বেশি। ঈশিতাও নিশ্চয়ই কোনো বোকামির খেসারত দিতে গিয়েই মা হয়ে গিয়েছিল। আর সেই মাতৃত্বকে লুকিয়ে ছাপিয়েই তাকে বিয়ে দেওয়া হয়েছে।

কথাটা ঈশিতাকে জিজ্ঞেস করবে কি করবে না অনেকদিন ভেবেছে সোহানা। করলে যদি কোনো সমস্যা হয়? ঈশিতা যদি আর কখনোই ওর সাথে সহজ হতে না পারে! সাত পাঁচ বহু কিছু ভেবে একদিন জিজ্ঞেস করেই ফেলেছিল কথাটা। ঈশিতার দু’চোখ ভরে উঠেছিল টলটলে অশ্রুতে। কাতর কণ্ঠে বলেছিল, ‘আমার সংসারটা ভেঙে দিও না ভাবী!’
সোহানা ব্যাকুল হয়ে বলেছিল, ‘না না এমন কথা বল না ঈশিতা। আমি তোমাকে আমার ছোটবোনের মতোই দেখি। এসব কথা কাউকে কি বলা যায়?’

সেদিন কাঁদতে কাঁদতে অনেক কথাই বলেছিল ঈশিতা। বাবার অফিসের ছোটখাট এক কর্মচারী প্রায়ই আসত ওদের বাসায়... এটা সেটা অফিসের কাজে। মা’র কড়া শাসনে বন্দি জীবনে হাঁপিয়ে উঠেছিল সে। অল্প বয়সী ভদ্র গোছের সেই কর্মচারীকে কেন যেন খুব আপন লাগত ঈশিতার। অল্প বয়সের ভুলে পালিয়ে গিয়েছিল তার সাথে। বিয়েও করেছিল ওরা। তারপরে লুকিয়ে সংসার...বাচ্চা। আর তখনই মায়ের হস্তক্ষেপ। বাচ্চাটাকে চোখের দেখাও দেখতে পারেনি সে। আর সেই কর্মচারীকে কোথায় যে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাও জানা হয়নি ঈশিতার।

সোহানা অবাক হয়েছিল এমন গল্প শুনে। নিখাঁদ বিস্ময়েই বলেছিল, ‘আবির জানে এসব কথা?’
‘নাহ ভাবী। ও কিছু জানে না!’
সোহানা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল সেই কথায়। মনে মনে ভেবেছিল, ‘ভাগ্যিস, আবিরটা চিরদিনের বোকা!’

ঈশিতার মা হতে চাওয়ার এই দুরন্ত সংগ্রামে তার মাকে সে কিছুতেই সামিল করতে চায়নি। নিজের মা একদিন ওর মাতৃত্ব ছিনিয়ে নিয়েছিল। তাকে সে কিছুতেই নিজের কষ্টের কথা বলবে না।

কিন্তু না বললেই বা কী আসে যায়! মায়ের দায় কি এত সহজে মেটে? আঠারো বছর আগে যা করেছিলেন, তার জন্য এখনো অনুতপ্ত হতে পারেননি দিলারা হাসান। একমাত্র মেয়েকে সারাজীবনের জন্য সামান্য এক অফিস কর্মচারীর কাছে সঁপে দিতে পারেননি তিনি। বাচ্চাটাকে যদি রেখে দিতেন, তাহলে ঈশিতা কোনোদিনই তার নতুন জীবনে মানিয়ে নিতে পারত না। আর তাছাড়া বিয়েই বা দিতেন কিভাবে?

মোমেন ছেলেটা অবশ্য খুব ঝামেলা করেছিল। যতটা না ঈশিতার জন্য, তারচেয়ে বেশি বাচ্চাটার জন্য। মৃত বাচ্চা প্রসবের গল্প শুনিয়ে আর মোটা অঙ্কের খেসারত চুকিয়ে তাকে অন্য জায়গায় বদলির ব্যবস্থা করিয়ে দিয়েছেন। তার স্বামী তো বিপদ দেখলেই গর্তে গিয়ে লুকায়। তাকেই এসব অপ্রিয় কাজগুলো করতে হয় সবসময়। আর তার ফল হিসেবে সকলের কাছে তিনিই খারাপ হিসেবে চিহ্নিত হন। আর কেউ না জানুক, তিনি নিজে তো জানেন...যা কিছু করেছেন মেয়ের সুখের কথা ভেবেই করেছেন।

কিন্তু তার মেয়েটা নতুন যে কষ্টের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, সেটা থেকেও মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারছেন না তিনি। কারণ তিনি তো মা! আর মা হওয়াই যে সবচেয়ে বড় বিপদ! গতকাল রাত থেকেই মেয়েকে ক্রমাগত ফোন দিয়ে চলেছেন দিলারা হাসান।

একটা ভালো সন্ধান পেয়েছেন। নবজাতক শিশুকে দত্তক হিসেবে নেওয়ার এক দারুণ সুযোগ। ড্রাইভার লিয়াকতই খবরই এনে দিয়েছে। লিয়াকত তার পুরনো বিশ্বস্ত লোক। এই পরিবারের সবকিছুই আগাগোড়া জানে সে। সরকারি হাসপাতালের এই বাচ্চা কেনা বেচার খবরটা সে কোথা থেকে যেন সংগ্রহ করেছে। দরিদ্র অনেক পিতামাতাই অর্থের অভাবে বাচ্চাকে বিক্রি করে দেয়। ঈশিতাকে এমন একটা বাচ্চা কিনে দেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলেই সব দুঃখ দূর হয়ে যাবে। একটা বাচ্চা সবকিছু বদলে দিতে পারে।

ঈশিতাকে রাতে অনেক অনুনয় বিনয় করে আসতে বলেছেন দিলারা হাসান। মেয়েটা কেন যেন তাকে আর দেখতেই পারে না। মাকে শত্রু মনে করে সে। অনেক অনুরোধের কারণে শেষমেশ আসতে রাজি হয়েছে বটে,  কিন্তু বাসায় পা দিয়েই বলেছে, ‘মা, আমার বাচ্চার ব্যাপারে তুমি দয়া করে আর কিছু করতে যেও না। বাচ্চা যদি আমার ভাগ্যে না থাকে আমি সেটা মেনে নিতে রাজি আছি।’ দিলারা হাসান জানেন, এসব মেয়ের ক্ষোভের কথা। একটা বাচ্চাকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারলেই এসব ক্ষোভ কই হাওয়া হয়ে যাবে! তিনি ধৈর্য হারান না। আস্তে ধীরে মেয়েকে বোঝান। ‘মারে, তুই না হয় মেনে নিবি। তোর শ্বশুরবাড়িও কি মেনে নিবে? তাদের বাচ্চা চাওয়ার আবদার মেটাবি কিভাবে?’
‘সেই আবদার মেটানোর জন্য আরেকজনের বাচ্চাকে কিনে আনতে বলছো! সেটা আমার শ্বশুরবাড়ি মেনে নিবে তাই বা কিভাবে ভাবছো মা?’
‘মেনে না নাওয়ার কিছু নেই। এমন হরহামেশাই হচ্ছে। তুই দয়া করে আর ঝামেলা করিস না। আবিরকে বোঝানোর ভার আমার।’

ঈশিতা বুঝতে পারে, তার মা আঁটঘাট বেঁধেই নেমেছে। এবারও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই করার নাই তার।

চার

আবির আর ঈশিতাকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছে যান দিলারা হাসান। লিয়াকত তাদেরকে একটা ওয়ার্ডের সামনে দাঁড় করিয়ে রেখে কাকে যেন ডেকে আনতে যায়। কিছুক্ষণ বাদেই মোটাসোটা গড়নের এক আয়াকে নিয়ে হাজির হয় সে। মহিলার নাম নুরজাহান। বয়স পঞ্চাশ আর পঞ্চান্নের আশেপাশে। প্রথম থেকেই বিভিন্ন ক্লিনিক আর হাসপাতালে আয়ার কাজ করে আসছে সে।

বিশাল শরীরে থপথপ করে হেঁটে এসে হাঁপাতে থাকে সেই নুরজাহান আয়া। নির্বিকার মুখে দেওয়ালের গায়ে পানের পিক ফেলে খসখসে গলায় বলে, ‘বাচ্চা কেডা নিব?’ দিলারা হাসান মেয়ে আর জামাইকে দেখিয়ে দিয়ে বলে, ‘এরা নিবে বাচ্চা।’
‘বিয়া কদ্দিনের? বাচ্চা হয়নি?’ লিয়াকত অধৈর্য গলায় বলে, ‘সেই খবরে তুমার কী খালা? বাচ্চা কনে পাইবো? ক্যামনে পাইবো...খোঁজ দাও। নিয়া বিদায় হই। তুমিও কামে যাও।’

লিয়াকতের মুখের দিকে গনগনে চোখে তাকিয়ে আরেকবার পিচ করে পানের পিক ফেলে দশাসই নুরজাহান খালা। তারপরে টেনে টেনে বলে, ‘গরীব মাইনষের বাচ্চারে নিয়ে যাইবো বইলা ডিটেল হুনুম না কী কও মিয়া? গরীব বইলা কি হ্যারা বানের পানিত ভাইসা আইছে নাকি? হ্যারাও আল্লাহর বান্দা! বৈধ বাচ্চা। আল্লাহ্‌র ফেরেশতা। এমনি এমনি যার তার হাতে তুইলা দিমু?’ লিয়াকত শান্ত হয়। সে জানে, এই খালাকে চেতিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। ইনি অনেকটা মিডিয়ার কাজ করে থাকে। দরিদ্র পিতামাতা যারা সন্তান লালনপালনে অক্ষম, তারা এই খালার সাথে যোগাযোগ করে। আর খালা যোগাযোগ করে কোনো নিঃসন্তান দম্পত্তি এমন বাচ্চা কিনে নেবে কিনা। টাকা পয়সা যা পায়, সেই দরিদ্র পিতামাতাকেই দিয়ে দেয় সে। এই লেনদেনে সে নিজে তেমন একটা লাভবান হয় না।

অথবা অন্য কথায় বলা যায়, লাভবান হতে চায় না। এই কাজ পরস্পরের সম্মতির ভিত্তিতেই করে থাকে সে। তবু নিজের বাচ্চাকে যখন অসহায় দুটি মানুষ অন্য একজনের হাতে নিতান্ত বাধ্য হয়ে তুলে দেয়, তখন সেই দরিদ্র পিতামাতার চোখের পানিতে সে এখনো কাতর হয়ে ওঠে। সেই শিশুটিকে বুকে নিয়ে নিঃসন্তান দুজন মানুষ যখন আকুল হয়ে কেঁদে ওঠে, সেই দৃশ্যও চোখের সামনে থেকে সরে না। এ যেন দুঃখ আর সুখের মিলিত ধারা!
লিয়াকত আবার জিজ্ঞেস করে। তবে এবার বেশ শান্ত গলায়, ‘তাইলে কই যামু খালা?’
‘৩ নাম্বার ওয়ার্ডের পাশে একডা ছোট ঘর আছে। হেইখানে আমার মাইয়া সুফিয়া আছে। হ্যায় বাচ্চা দেখাইবো। আইজ আমার ডিউটি নাই। বাড়িত যামু। হেইখানে গিয়া আমার নাম কইলেই হইবো। সুফিয়ারে কওন আছে!’

এতক্ষণ পাথরের মুখে দাঁড়িয়ে এই কথোপকথন শুনছিল আবির আর ঈশিতা। ঈশিতার দু’চোখের কোল বেয়ে অশ্রু ঝরে পড়ছে। আবিরও চুপচাপ শান্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ঈশিতার বুকের ভেতরটা অজানা যন্ত্রণায় জ্বলেপুড়ে খাক হচ্ছে। আঠারো বছরের আগুন এত সহজে তো শান্ত হবার নয়! এই বুক যে শিশুকে স্তন্যপান করাতে পারেনি, তা আজও যেন দুধের ভারে টনটন করে ওঠে। তবু সেই বুকে আর কোনো শিশুকে সে ঠাঁই দিতে পারল না! আর কেউ এই দুধের ভার থেকে তাকে মুক্তি দিলো না!

খালার কথামত ৩ নাম্বার ওয়ার্ডের পাশের ছোটঘরটিতে হাজির হয়ে যায় তারা। ঘরটিতে ছোটছোট কয়েকটা বেড সাজিয়ে রাখা। দুইটি বেডে দুজন শিশুকে রাখা আছে। মলিন শাড়ি কাপড়ের দুটি নারী আকুল চোখে সেই শিশুদুটির দিকে ঝুঁকে বসে আছে। সালোয়ার কামিজ পরা একটি সুশ্রী মেয়ে তাদের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে।

ওদের ঢুকতে দেখেই নারী দুজনের চোখে মুখে কিসের যেন এক ছায়া সরে গেল। ঈশিতার চোখ এড়ালো না সেই অব্যক্ত ছায়ার আড়ালের কথা। চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সবকিছু মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল সে। সুফিয়া মেয়েটিকে দেখে তার বুকের মধ্যে কেমন এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। মেয়েটার বয়স সতেরো আঠারোর বেশি হবে না। আয়াটি বলছিল, সুফিয়া তার মেয়ে। অথচ এই মেয়ের সমগ্র অবয়বের কোথাও সেই আয়াটির সাথে বিন্দুমাত্র মিল নেই। এ যেন অনেকটা...অনেকটা...তার মতোই দেখতে!

নিজেকে শাসন করল ঈশিতা। জীবন জীবনের মতোই। এই জীবনে কাকতালীয় কোনোকিছু এত সহজে ঘটে না। হয়তো এই মেয়েটি সত্যি সত্যিই সেই আয়াটিরই মেয়ে। অথবা এমনও হতে পারে, একেও সে কোথাও থেকে কিনেই নিয়েছে। যদিও সে নিজেও দরিদ্র...কিন্তু তারও তো অপূর্ণ মাতৃত্বের কষ্ট থাকতে পারে! অথবা এটাও সম্ভব... কারো ফেলে যাওয়া সন্তানকেই সে নিজের করে নিয়েছে!

বুকটা কেঁপে ওঠে ঈশিতার। তার অনেক চাপাচাপিতে কাজের মেয়ে কমলা বলেছিল, তার সন্তানকে সেই ক্লিনিকেই ফেলে এসেছিল তার মা। সেখানে তার ভাগ্যে কী ঘটেছিল সেই খবর কেউ জানে না। কাজেই... এমন কি হতে পারে না?

অবরুদ্ধ অশ্রুকে বহুকষ্টে সংবরণ করে বাইরে বেরিয়ে আসে ঈশিতা। এক মুহূর্তের জন্য ওর মনে হয়, দরিদ্র নারী দুটির চোখেমুখে কিসের এক চাপা আনন্দ যেন ছিটকে পড়ছে। ঈশিতা তাদের শিশুদের কাউকে নেবে না, আরো কিছুদিন তারা তাদের শিশুদের বুকের সাথে জড়িয়ে রাখতে পারবে... এই আনন্দ পৌঁছে গেছে তাদের কানে।

এদিকে ঘরে ফিরতে ফিরতে নুরজাহান আয়া তখন ভাবছিল, ঐ বয়স্কা মহিলাটিকে কোথায় যেন দেখেছে সে। অনেকদিন আগে ডাক্তার রওশন জাহানের ক্লিনিকে সে আয়ার কাজ করত। সুফিয়াকে সে যেখানে পেয়েছিল। সেখানেই কি দেখেছে এই মহিলাটিকে?

ভাবনাটা বেশিদূর এগোয় না নুরজাহানের। বয়স হয়ে গেছে। এখন কেন যেন কোনো কিছুই খুব বেশিক্ষণ ভাবতে ভালো লাগে না তার। জীবন সায়রে অনেক তো অবগাহন করা হলো! বিবর্ণ আঁচড়ে মলিন হয়ে গিয়েছে সেই সায়রের জল।
আর কী হবে ওতশত ভেবে?

আপনার মতামত লিখুন :

জহির রায়হান : দেশপ্রেমিক ও সমাজ-সচেতন এক শিল্পী-প্রতিকৃতি

জহির রায়হান : দেশপ্রেমিক ও সমাজ-সচেতন এক শিল্পী-প্রতিকৃতি
অসাধারণ চলচ্চিত্র ও শৈল্পিক সাহিত্যকর্মের স্রষ্টা হিসেবে আজও স্মরণীয় জহির রায়হান

মাত্র ৩৬ বছর বয়সের জীবনেই জহির রায়হান নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী একজন কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র-পরিচালক হিসেবে। প্রচণ্ড বক্তব্যধর্মী ও জীবনমুখী তাঁর চলচ্চিত্রগুলো নান্দনিকতা ও কৌশলগত মানের দিক থেকে এখনো স্মরণীয় হয়ে টিকে আছে। অনুপ্রাণিত করছে বর্তমান ও ভবিষ্যতের চলচ্চিত্রকারদের। তেমনি মাত্র আটটি উপন্যাস লিখেই তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লেখক হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছেন। ‘হাজার বছর ধরে’ দেশের সাহিত্য ও চলচ্চিত্রাঙ্গনে তাঁর পথ চলার কথা থাকলেও, ১৯৭২ সালে নিরুদ্দেশের ‘বরফ গলা নদীতে’ হারিয়ে যাওয়ার পর ফিরে আসেননি আর। আজ এই বহুপ্রজ বিরল প্রতিভার ৮৪তম জন্মদিন।

জহির রায়হানের প্রকৃত নাম মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। জন্ম ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর মজুপুর গ্রামে। জহির রায়হান তাঁর সাহিত্যিক নাম। এ নামেই তিনি সুপরিচিত। তাঁর শৈশব কেটেছে কলকাতায়। দেশ বিভাগের পর ঢাকায় আসেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে বাংলায় এমএ করেন জহির। ছাত্রাবস্থায়ই তাঁর সাহিত্যিক ও সাংবাদিক জীবন শুরু হয়। ১৯৫০ সালে তিনি যুগের আলো পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি খাপছাড়া, যান্ত্রিক, সিনেমা ইত্যাদি পত্রিকাতেও কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি সম্পাদক হিসেবে প্রবাহ পত্রিকায় যোগ দেন। এই সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাই হয়তো তাঁর ভেতরে আরো শক্তভাবে গেঁড়ে দেয় লেখক হওয়ার বুনিয়াদ।

১৯৫৫ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’ প্রকাশিত হয়। কিন্তু, তিনি যে ছিলেন একজন বহুমাত্রিক মানুষ। চলচ্চিত্রের প্রতি ছিল তাঁর মনের ভেতরে গভীর ভালোবাসা। তাই, চলে আসলেন চলচ্চিত্রাঙ্গনে। চলচ্চিত্র জগতে তার পদার্পণ ঘটে ১৯৫৭ সালে, ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে। সহকারী হিসেবে আরো কাজ করেন সালাউদ্দীনের ছবি—‘যে নদী মরুপথে’-তেও। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম তাকে ‘এ দেশ তোমার আমার’-এ কাজ করার আমন্ত্রণ জানান; এ ছবির নামসংগীত রচনা জহির রায়হানের হাতেই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207266898.jpg

◤ ‘বেহুলা’ সিনেমার সেটে নির্দেশনা দিচ্ছেন জহির ◢


সহকারী পরিচালক হিসেবে সফলভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে পরিচালক হিসেবে কাজ করার প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল। ১৯৬১ সালে তিনি রুপালি জগতে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’ নির্মাণ করেন। এটি অবশ্য ছিল উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র। পরের বছর মুক্তি পায় তার প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র ‘বাহানা’। এরপর ১৯৬৬ সালে ‘বেহুলা’, ১৯৬৭-তে ‘আনোয়ারা’, ১৯৭০-এ ‘জীবন থেকে নেওয়া’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘লেট দেয়ার বি লাইট’-এর মতো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। 

চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি, সাহিত্যিক হিসেবেও তাঁর কলম সচল ছিল মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত। অনেক কালজয়ী উপন্যাস তিনি উপহার দিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে : ‘বরফ গলা নদী’, ‘আর কত দিন’, ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, ‘হাজার বছর ধরে’, ‘আরেক ফাল্গুন’, ‘কয়েকটি মৃত্যু’, ‘তৃষ্ণা’, ‘সূর্যগ্রহণ’ ইত্যাদি। সংগ্রামমুখর নাগরিক জীবন, আবহমান বাংলার জনজীবন, মধ্যবিত্তের আশা-আকাঙ্ক্ষা-বেদনা প্রভৃতি তাঁর রচনায় শিল্পরূপ পেয়েছে। সাহিত্যকৃতীর স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (মরণোত্তর) দেওয়া হয়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207304659.jpg
◤ প্রথম স্ত্রী সুমিতা দেবীর সাথে জহির রায়হান ◢


ব্যক্তিজীবনে দুবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন জহির রায়হান। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন চিত্রনায়িকা সুমিতা দেবী। ১৯৬১ সালে বিয়ে করেন তারা। প্রথম পরিবারে অনল রায়হান এবং বিপুল রায়হান নামে দুই পুত্র সন্তানের জন্ম হয়।

সুমিতা দেবীর সাথে বিচ্ছেদের পর ১৯৬৮ সালে আরেক জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা সুচন্দার সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন তিনি। দ্বিতীয় পরিবারে রয়েছেন তার দুই সন্তান অপু ও তপু। তার বড় ভাই প্রয়াত লেখক শহীদুল্লা কায়সার। তিনি লেখক ও রাজনীতিক পান্না কায়সারের স্বামী এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী শমী কায়সারের বাবা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207352881.jpg

◤ জহির রায়হানের আলোচিত, নন্দিত ও প্রভাবশালী চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’র পোস্টার ◢


শুধুমাত্র কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার হিসেবে জহির রায়হানকে দেখলে সবটুকু যেন বলা হয় না তাঁর ব্যাপারে। একজন সমাজ ও রাজনীতি সচেতন শিল্পী ছিলেন তিনি। নিজেও স্বশরীরে অংশ নিয়েছেন দেশ মাতৃকার বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন জহির রায়হান। উপস্থিত ছিলেন একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আমতলা সমাবেশে। এসময় তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে জেলে পুরে দেয়। এই জেলে বসেই তিনি ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’ রচনা করেন। ভাষা আন্দোলন তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যার ছাপ দেখতে পাওয়া যায় তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেওয়া’–তে। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। কলকাতায় তার নির্মিত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেওয়ার বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয় এবং চলচ্চিত্রটি দেখে ভূয়সী প্রশংসা করেন সত্যজিত রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা এবং ঋত্বিক ঘটক প্রমুখ খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকাররা। সে সময়ে তিনি চরম আর্থিক দৈন্যের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হতে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করে দেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207399680.jpg
◤ প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’, যা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত তৈরিতে রাখে দারুণ ভূমিকা ◢


মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী নিধনের এক অসাধারণ প্রামাণ্য দলিল ‘স্টপ জেনোসাইড’ তৈরি করেন জহির রায়হান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী বাঙালিদের দুঃখ-দুর্দশা, হানাদার পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, ভারতে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের দিনকাল প্রভৃতি এই তথ্যচিত্রে তুলে ধরা হয়েছিল। এর প্রথম প্রদর্শনী হয় এক অজ্ঞাত স্থানে, যেখানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রীপরিষদের সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরি করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছিল ‘স্টপ জেনোসাইড’। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে এখন পর্যন্ত নির্মিত ছবিগুলোর মধ্যে শিল্পগত ও গুণগত সাফল্যের দিক থেকে শীর্ষে স্থান দেওয়া হয়ে থাকে এই চলচ্চিত্রটিকে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর জহির রায়হান ঢাকায় ফেরেন। ফিরে জানতে পারেন, মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে পাক হানাদার বাহিনীর দোসর রাজাকার আল বদর বাহিনী তার বড় ভাই প্রখ্যাত লেখক শহীদুল্লাহ কায়সারকে অপহরণ করেছে। নিখোঁজ ভাইকে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করেন জহির। ১৯৭২ সালের ২৮ জানুয়ারি সকালে এক রহস্যময় ব্যক্তি তাকে ফোন করে জানান, তার ভাইকে মিরপুর ১২ নাম্বারে একটি হাউজিং সেক্টরে আটকে রাখা হয়েছে। একথা শুনেই তিনি ভাইয়ের খোঁজে মিরপুর যান এবং আর ফিরে আসেননি।

জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে অনেক ধরনের থিওরি রয়েছে। এমন বলা হয় যে, তিনি একটি সার্চ পার্টি নিয়ে মিরপুরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। সেখানে পাক হানাদার বাহিনীর কিছু সদস্য ছদ্মবেশে ছিল। তারা তাকে লুকিয়ে আটক করে হত্যা ও গুম করে ফেলে। তার ছোট ভাই হাবীবের ভাষ্যমতে, তিনি জহির রায়হানকে মিরপুর পুলিশ স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে এসেছিলেন। এরপর আর তার দেখা পাননি। এমন খবরও শোনা যায়, মিরপুর পুলিশ স্টেশন থেকে জহির রায়হানকে জানানো হয়েছিল, মিরপুর ১২ নাম্বারে কিছু পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকার ছদ্মবেশে লুকিয়ে আছে। সেখানে না গিয়ে আগে তাকে কল ট্রেস করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর তিনি নাকি ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশ স্টেশন থেকে বেরিয়ে যান। আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207448145.jpg

◤ ১৯৭২-এর পর ‘আরেক ফাল্গুন’ হয়তো ‘কখনো আসেনি’ তবে দেশ ও সমাজ-সচেতন শিল্পীদের এগিয়ে যাওয়ার বড় প্রেরণা তিনিই ◢


এ ব্যাপারে বিভিন্ন সময় আরো অনেক গুজব ছড়িয়েছে। এগুলোর কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা, তা যাচাই করা মুশকিল। তাঁর মৃতদেহও কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই নিশ্চিত হওয়া যায়নি কিভাবে মারা গিয়েছেন তিনি। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি তার মৃত্যুদিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

স্বাধীনতার ঠিক পরপর, সেই ৭২ সালেই জহির রায়হান চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলেও তাঁর অসাধারণ, শৈল্পিক ও নান্দনিক সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্রের জন্য জাতি ঠিকই তাকে স্বরণে রেখেছে। চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য কয়েক বছর পর, ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে প্রদান করে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদক (মরণোত্তর)। ১৯৯২ সালে প্রদান করে সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার। আজও তাঁর সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্রগুলো টিকে আছে অমূল্য সম্পদ হয়ে। ১৯৭২-এর পর ‘আরেক ফাল্গুন’ হয়তো ‘কখনো আসেনি’ জহির রায়হানের জীবনে; তবে দেশ ও সমাজ সচেতন শিল্পীদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার বড় প্রেরণা তিনিই। এই ক্ষণজন্মা প্রতিভার জন্মদিনে তাঁর প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম!

রেমব্রান্ট ও ভারমিয়ার : সপ্তদশ শতকের দুই ডাচ শিল্পী

রেমব্রান্ট ও ভারমিয়ার : সপ্তদশ শতকের দুই ডাচ শিল্পী
ইউহানেস ভারমিয়ার┇রেমব্রান্ট

রেমব্রান্ট
১৬০৬-১৬৬৯

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114164805.jpg
◤ রেমব্রান্ট ◢


ছবি আঁকা শিখতে হলে কাকে গুরু মানবেন? রেমব্রান্ট বলেছেন, কেবল একমাত্র গুরু—প্রকৃতি। তিনি আরো বলেছেন পেইন্টিং হচ্ছে প্রকৃতির দৌহিত্র, এর সাথে ঈশ্বরের সম্পর্ক। কিংবা একটি পেইন্টিংকে তখনই সমাপ্ত বলা হয়েছে যখন এর ওপর ঈশ্বরের ছায়া পড়ে।

চিত্র-সমালোচকদের জন্য রেমব্রান্ট বলেছেন, পেইন্টিং নাকে শুকবার জন্য নয়। নতুন শিল্পীদের জন্য তাঁর কথা : যা জানো তার চর্চা করতে থাকো, এটাই তোমার কাছে স্পষ্ট করে দেবে তুমি কী জানো না। যে সব বড় শিল্পীর সাথে এক নিঃশ্বাসে রেমব্রান্টের নাম উচ্চারিত হয় তারা ইতালির। রেমব্রেন্ট ডাচ; হল্যান্ডের মানুষ।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114291988.jpg

◤ মিনার্ভা ◢


 ১৬০৬ : জন্ম ১৫ জুলাই, লেইডেনে। বাবামার দশ সন্তানের অষ্টম। পুরো নাম রেমব্রান্ট হার্মেনসুন ভ্যান রিইন।
১৬১৩ : ল্যাটিন স্কুলে ভর্তি।
১৬২০ : ১৪তম জন্মদিনের ২ মাস আগে লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, তখনও ল্যাটিন স্কুলের পাঠ অব্যাহত।
১৬২৪ : ইতিহাস, অলঙ্কার-শাস্ত্র অধ্যয়ন।
১৬২৫ : লেইডেনে নিজস্ব স্টুডিও স্থাপন, দ্য স্টোনিং অব স্টেপেন অঙ্কন
১৬২৯ : প্রথম আত্মপ্রতিকৃতি অঙ্কন।
১৬৩৪ : সাস্কিয়া উইলেনবার্গকে বিয়ে।
১৬৪২ : সাস্কিয়ার মৃত্যু, শিশুপুত্র টাইটাসের জন্য গির্জে ডির্কসকে আয়া নিয়োগ; নাইট ওয়াচ অঙ্কন।
১৬৪৭-১৬৫০ : ডির্কসের সাথে শারীরিক সম্পর্ক, বিরোধ, সাস্কিয়ার অলঙ্কার বন্ধক দেওয়ার কারণে রেমব্রান্টের চেষ্টায় তাকে সংশোধনাগারে প্রেরণ।
১৬৫৪ : নতুন হাউসমেইড হেন্ডরিক স্টোফেলস-এর সাথে সম্পর্ক, কন্যা সন্তান কর্নেলিয়ার জন্ম, বাথশেইবা অ্যাট হার বাথ অঙ্কন।
১৬৫৬ : দেওলিয়া ঘোষণা, ক্রোক পরোয়ানা জারি।
১৬৫৮ : বাড়ি বেচে ভাড়া বাড়িতে গমন।
১৬৬৯ : মৃত্যু ২ নভেম্বর। ওয়েস্টরকার্ক সিমেট্রিতে ভাড়া করা অজানা কবরে সমাহিত। 」

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114473772.jpg

◤ আব্রহাম’স স্যাক্রিফাইস ◢


চিত্রশিল্পের ইতিহাসের দিকে যাদের নজর তারা খুব ভালোভাবেই জানেন সপ্তদশ শতকের ‘ডাচ গোল্ডেন এজ’-এর স্রষ্টাদের নাম বলতে শুরু করলেই রেমব্রান্টের নাম এসে যায় এবং প্রায় সকলে সেই সোনালি যুগে আঁকা নাইট ওয়াচ চিত্রটির উদাহরণ দেন। অথচ এ ছবিটির জন্য তিনি লাঞ্ছিত হয়েছেন। ছবির বিষয় রাতের প্রহরা, অর্থের বিনিময়ে যাদের জন্য এটি আঁকতে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন তারা কেউই রেমব্রান্টের কাজটি পছন্দ করেননি।

এই ছবিতে আলো পড়েছে ঠিক মাঝখানে, দুজন অফিসারের উপর আর বর্ষাধারী রক্ষীরা সব আঁধারে অস্পষ্ট। ফরমায়েশটা তাদেরই, অথচ তাদের ভালো করে দেখা যাবে না আর তারা চাঁদা তুলে শিল্পীর টাকা দেবে এটা তো হতে পারে না। খুব বদনাম হলো শিল্পীর। ছবি আঁকার ফরমায়েশ পাওয়া মারাত্মক হ্রাস পেল। স্বচ্ছল পরিবার থেকে আসা একটু বেহিসেবি গোছের এই শিল্পী দেওলিয়া হয়ে গেলেন, বাড়ি বিক্রি করলেন, পারিবারিক অশান্তিও তাঁকে ছাড়ল না। সেই নাইট ওয়াচ-এর দাম এখন কত মিলিয়ন ডলার হতে তা গবেষণার বিষয়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114622015.jpg
◤ দ্য নাইট ওয়াচ ◢


রেমব্রান্টের স্মরণীয় উক্তি : ওরা আমাকে নিয়ে যেভাবে ছবি আঁকাতে চায় আমি সেভাবে আঁকতে পারি না, এটা ওরাও জানে।

শিল্পীদের বিশ্বাস নেই
রেমব্রান্ট জেনোয়া থেকে দুটি ছবির ফরমায়েশ পেয়েছিলেন, একটি বাণিজ্যিক জাহাজের ক্যাপ্টেন ভিভিয়ানো দরদাম এবং সরবরাহের তারিখ ঠিক করেন। তিনি এসে দেখেন কাজ শেষ হয়নি, অধিকন্তু শিল্পী বেশি দাম হাঁকছেন। ক্যাপ্টেন পোর্ট অব আমস্টার্ডাম থেকে ক্রেতাকে লিখলেন : কাজের গতি অত্যন্ত মন্থর, শিল্পীরা সাধারণত তাই করে থাকে, তাছাড়া এই লোকটির বিশ্বাস নেই। এখন দুটি ছবির জন্য ৩০০০ গিল্ডার চাইছেন, অথচ আমার সাথে দর ঠিক হয়েছিল ১২০০ ডলার। তার উপর ভরসা রাখা যায় না।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114664684.jpg

◤ বাথশেইবা অ্যাট হার বাথ ◢


রেমব্রান্টের ছবির ওপর চোরের নজর, গবেষকেরও
১৬৩০-এ আঁকা রেমব্রান্টের বাবার পোর্টেট—‘পোর্ট্রেট অব দ্য ফাদার’ ২০০৬ সালে জাদুঘর থেকে চুরি হয়; সাত বছর পর সার্বিয়ার একটি গির্জায় ৪ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ছবিটি উদ্ধার করা হয়। এর আগে একবার চুরি হয়েছিল, ১৯৯৬ সালে, উদ্ধার হয় স্পেনে।

রেমব্রান্টের মাস্টারপিস ‘ওল্ডম্যান ইন মিলিটারি কস্টিউম’ ছবিটির ওপর ইনফ্রারেড আলো, নিউট্রন ও এক্স-রে প্রয়োগ করে গবেষণা ২০১৩ সালে নিশ্চিত হয়েছে অন্য একটি ছবি রঙ দিয়ে ঢেকে রেমব্রান্ট এটি এঁকেছেন। নিচের ছবিটিও উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114702139.jpg

◤ দ্য অ্যানাটমি লেসন অব ডক্টর নিকোলাস টাল্প ◢


বার্ধক্য ও যৌবন
রেমব্রান্ট ৬৩ বছর বেঁচে ছিলেন। বার্ধক্যের সঙ্কট তিনি মোকাবেলা করেছেন, তবুও বলেছেন : বার্ধক্য সৃজনশীলতার অন্তরায় কিন্তু বার্ধক্য আমার যৌবন-স্পৃহাকে দমিয়ে রাখতে পারে না।

কয়েকটি সেরা ছবি : সেল্ফ পোর্ট্রেট সিরিজ, দ্য নাইট ওয়াচ, দ্য রিটার্ন অব দ্য প্রডিগাল সান, দ্য অ্যানাটমি লেসন অব ডক্টর নিকোলাস টাল্প, দ্য জুইশ ব্রাইড, দ্য স্টর্ম অব দ্য সি অব গ্যালিলি, মিনার্ভা, আব্রহাম’স স্যাক্রিফাইস, বেলথাজার্স ফিস্ট, ডায়ানা, ফিলোসোফার ইন মেডিটেশন, বাথশেইবা অ্যাট হার বাথ, দ্য ব্লাইডিং অব স্যামসন, দ্য কন্সপিরেসি অব ক্লডিয়াস সিভিল, লুক্রেশিয়া।

 ✨

ইউহানেস ভারমিয়ার
১৬৩২-১৬৭৫

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114784531.jpg
◤ ইউহানেস ভারমিয়ার ◢


‘যে প্রভাতে পৃথিবী সৃষ্টি হয়, তখন ঈশ্বরের সামনে নিশ্চয়ই ভারমিয়ারের শিল্পকর্মগুলো ছিল’—ফ্রেডেরিক সোমার এভাবেই শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ডাচ চিত্রশিল্পের স্বর্ণযুগের শিল্পী ইউহানেস ভারমিয়ারকে। অথচ এই শিল্পীর কাজের খবর তাঁর জীবদ্দশায় নিজ শহর ডেলফট-এর বাইরে কোথাও পৌঁছেনি। তিনি ইয়ান বা ইউহান ভারমিয়ার নামেও পরিচিত। তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কিংবা কোনো শিল্পগুরুর কাছে শিক্ষালাভ করার সুযোগ হয়নি, তিনি নিজেও কোনো স্কুল খোলেননি বা নিজ হাতে অনুগত আঁকিয়ে শিষ্যও তৈরি করেননি। অন্যদিকে তাঁর ছবিগুলো কেবল একজন ক্রেতাই নিজ সংগ্রহে রাখায় শিল্প-সমঝদারদের অন্য কেউ তাঁর সম্পর্কে জানতেও পারেননি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114892303.jpg

◤ গার্ল উইথ অ্যা ইয়ার রিং ◢


১৬৩২ : অক্টোবরে জন্ম, ৩১ অক্টোবর ব্যাপটাইজড।
১৬৫২ : বাবার মৃত্যু।
১৬৫৩ : ক্যাথরিনা বোলনেসকে বিয়ে এপ্রিলে; বিয়ের আগে ক্যাথলিক চার্চে দীক্ষা গ্রহণ; চিত্রশিল্পী সংসদে যোগদান।
১৬৫৭ : পিটার ভ্যান রুভেন নামক একজন প্যাট্রন লাভ।
১৬৬১ : পেইন্টার্স গিল্ডের সভাপতি নির্বাচিত ; ১৬৬৩ ১৬৭০, ১৬৭১-এ পুনর্নির্বাচিত।
১৬৭২ : কিছু ইতালীয় চিত্রকলার যথার্থতা সনাক্ত করতে হেগ গমন।
১৬৭৫ : আর্থিক দুরবস্থা কাটাতে ১০০০ গিল্ডার ধার গ্রহণ, সে বছরই মৃত্যু। ১৫ ডিসেম্বর ওল্ড চার্চে সমাহিত। 」

গার্ল উইথ এ পার্ল ইয়াররিং
গার্ল উইথ এ পার্ল ইয়াররিং-কানে মুক্তোর দুল পরিহিত এ ছবিটি ভারমিয়ারের সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ। সপ্তদশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই ছবিকে বলা হয় ‘দ্য মোনালিসা অব দ্য নর্থ’ কিংবা ‘ডাচ মোনালিসা’। কারো ফরমায়েশে তিনি এ ছবিটি এঁকেছেন বা নিজস্ব কোনো নারীকে চিত্রায়িত করেছেন তা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।

১৮৮১ সালে হেগে অনুষ্ঠিত একটি নিলামে মাত্র দুই গিল্ডার ৩০ সেন্টে ছবিটি বিক্রি হয়ে যায়। ক্রেতার কোনো উত্তরাধিকার না থাকায় শেষ পর্যন্ত আজকের এ বিশ্বখ্যাত ছবিটি ১৯০২ সালে মরিতসুইস জাদুঘরে দান করে দেওয়া হয়।

ট্র্যাসি ক্যাভেনিয়র এ ছবিটিকে নিয়ে একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনা করেন গার্ল উইথ এ পার্ল ইয়াররিং (১৯৯৯) নামে। ২০০৩ সালে চলচ্চিত্রায়িত হলে তা গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড লাভ করে।

গার্ল উইথ এ রেড হ্যাট-লাল টুপি পরা এই মেয়েটিও এখন শিল্পরসিকদের কাছে পরিচিত মুখ। ভারমিয়ারের ছোট আকৃতির তেলচিত্রগুলোর একটি হয়ে ওঠে এই লাল টুপির মেয়ে। উনবিংশ শতকেই অল্প কটি ছবির শিল্পী হলেও ভারমিয়ারের প্রভাব নবীন শিল্পীদের ওপর পড়তে শুরু করে।

সালভাদর দালি ভারমিয়ারের দ্য লেসমেকার নিজের মতো করে এঁকেছেন। দালির ১৯৩৪ সালের একটি অমর কাজ-‘ভারমিয়ারের প্রেতাত্মা, যা টেবিল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।’

অঙ্কনই জীবনের ব্রত
অর্থনৈতিক মন্দা, মহামারি প্লেগ এবং ছবি আঁকার পেছনে ব্যয়—পনের সন্তানের জনক ভারমিয়ারের জীবনকে বিপন্ন করে তোলে। তারপরও তিনি সেকালের সবচেয়ে দামি রঙ কিনে ছবি আঁকতেন। দারিদ্র্য জর্জরিত অবস্থায় মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে মৃত্যু, তবুও তিনি বিস্মৃত হয়ে গেলেন। তাঁর শাশুড়ির বাড়িতে দুটি কক্ষে ছবিগুলো পড়ে থাকে। গুস্তাভ ফ্লেডরিখ ভাগান ও থিওফাইল থোর-বার্জার তাঁকে পুনরাবিষ্কার করেন এবং ৬৬টি ছবি সনাক্ত করেন। তবে এর মধ্যে ৩৪টি ছবি নিয়ে সার্বজনীন সম্মতি রয়েছে যে এগুলো তাঁরই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114986807.jpg

◤ দ্য মিল্কমেইড ◢


২০০ বছর পর
তখনকার চিত্রশিল্পের ইতিহাসে তিনি প্রায় সম্পূর্ণভাবে অনুল্লিখিত ও উপেক্ষিত রয়ে যান। মৃত্যুর ২০০ বছর পর ভারমিয়ারের পুনর্জাগরণ ঘটে এবং শিল্পবোদ্ধারা স্বীকার করেন তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের একজন। গুস্তাফ ফ্রেডরিখ ভাগান এবং থিউফাইল থোরে-বার্জার পুনরাবিষ্কৃত ভারমিয়ারের ওপর প্রবন্ধ রচনা করেন। তখন থেকেই ভারমিয়ার পুনর্মূল্যায়িত হতে শুরু করেন এবং কার্যত তাঁর পুনর্জাগরণ ঘটে। তিনি হয়ে ওঠেন ডাচ স্বর্ণযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী।

তাঁর প্রায় সব ছবিই ক্যানভাসে তৈল রঙ। অত্যন্ত দামি ল্যাপিস লাজুলাই, প্রাকৃতিক আলট্রামেরিন এবং অ্যম্বর রঙ ব্যবহার করতেন। সপ্তদশ শতকের কোনো শিল্পী রঙের পেছনে এত ব্যয় করতেন না, তাঁর দারিদ্র্যের সাথে এটা মেলানো যায় না। রঙের ঔজ্জ্বল্য তাঁর ছবি চিনিয়ে দেয়।

লক্ষীমন্ত নারী ক্যাথরিনা বোলনেসকে বিয়ে করেন। তাদের চৌদ্দটি সন্তানের মধ্যে দশজন বেঁচে থাকে। আর্থিক সংকটের কারণে ক্যাথরিনা স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে তার মায়ের বাড়ি ওঠেন। সে বাড়িরই দোতলার সামনের একটি কক্ষ হয়ে ওঠে ভারমিয়ারের স্টুডিও। সেই বাড়ির একেবারে গা ঘেঁষা একটি চার্চও ছিল, তাঁর ল্যান্ডস্কেপে চার্চের উপস্থিতি দেখা যায়। ভারমিয়ারের কেবল তিনটি ছবিতে অঙ্কনের সময়কাল লেখা হয়েছে : দ্য প্রোকিউরেস (১৬৫৮), দ্য অ্যাস্ট্রোনোমার (১৬৮৮) এবং দ্য জিওগ্রাফার (১৬৬৯)।

দারিদ্র্যের ভার
দারিদ্র্য ঘোচাতে তিনি রাতভর সরাইখানাও চালিয়েছেন, কিন্তু দারিদ্র্য ঘোচেনি। সন্তানদের ভার ও দারিদ্র্যের চাপ তাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। স্ত্রী ক্যাথরিনা বলেছেন, অর্থকষ্টের চাপ সহ্য করতে না পেরে মাত্র দেড় দিনের প্রচণ্ড উন্মত্ত আচরণের পর তাঁর স্বামী মৃত্যুবরণ করেছেন। সে সময় ক্যাথরিনা ও তাঁর মায়ের দখলে এসে যায় তার ১৯টি ছবি। এর মধ্যে দুটো ছবি বিক্রি করে ঋণ শোধ করা হয়।

‘ভারমিয়ারের মতো আর কেউ নেই’—জোনাথান রিচম্যানের এই গানটি সংগীত প্রেমিকদের কাছে একজন চিত্রশিল্পীকে পৌঁছে দিয়েছে। ট্রান্সট্রোমারের কবিতাও ভারমিয়ারকে নতুন করে চিনিয়েছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566115170809.jpg

◤ গার্ল উইথ অ্যা রেড হ্যাট ◢


কয়েকটি সেরা ছবি : ডিউ ফ্রম ডেলফ্ট, দ্য ক্যাপটিভ, গার্ল উইথ অ্যা ইয়ার রিং, গার্ল ইন অ্যান্টিক কস্টিউম, গার্ল উইথ অ্যা রেড হ্যাট, দ্য গিটার প্লেয়ার, ওমেন রিডিং, অ্যা লেটার, ডায়ানা অ্যান্ড হার নিম্ফস, ইয়াং ওমেন উইথ অ্যা পিচার, দ্য লাভ লেটার, দ্য মিল্কমেইড।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র