Barta24

শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯, ৪ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

কায়সারবাগের কাকা-হুজুর

কায়সারবাগের কাকা-হুজুর
রেঙুনের সুলে প্যাগোডা। ছবি. লেখক
মঈনুস সুলতান


  • Font increase
  • Font Decrease

সারা দুপুর সেন্ট্রাল রেঙুনের হাটবাজার ঘেঁটে ঘামে গরমে লবেজান হয়ে আমি ও হলেণ আমাদের ঘুমন্ত কন্যা কাজরিকে কাঁধে নিয়ে সুলে প্যাগোডার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবি—এবার যাওয়া যায় কোথায়? আমাদের সামনে সুলে প্যাগোডার সুনশান সোনালি স্থাপত্য। তার চারপাশের চুনকাম করা শপিং কমপ্লেক্সে ক্রেতা বিক্রেতার কোনো পাত্তা নেই। দিন কয়েক হলো আমরা রেঙুনের হাটবাজারে বিস্তর ঘুরছি। খুঁজে খুঁজে খরিদ করছি বর্মার তাঁতে বোনা বস্ত্র, সোনালি ল্যাকারে রঞ্জিত লক্ষীপ্যাঁচা, টিক কাঠের ট্রে ও জেড পাথরের হাতি। কাজরি সব সময় স্থির থাকতে চায় না, সুতরাং তাকে নিয়ে বেশিক্ষণ বাজার-সওদা করা মুশকিল। তাই আমরা তাকে বিরতি দিতে প্রায়ই চলে আসি সুলে প্যাগোডার ভেতরের আঙিনায়। মন্দিরের হিমেল বাতাবরণে সে ওখানে ছোটাছুটি করতে ভালোবাসে। জনা কয়েক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীনীদের সাথে তার ভাবও হয়েছে। মাঝেমাঝে সে তাদের সাথে পালকের ঝাড়ু হাতে মন্দিরের বিগ্রহ ছড়ানো পরিসরে ঝাট দিতেও হাত লাগায়। এ মুহূর্তে সে ঘুমিয়ে পড়েছে, এবং আমাদের খুব পিপাসা পেয়েছে বলে আমরা কায়সারবাগ রেস্তোরাঁর দিকে হাঁটি।

সুলে প্যাগোডার পেছনভাগে ওয়ারলেস টাওয়ারের ছায়া ধরে হেঁটে আমরা কায়সারবাগ রেস্তোরাঁয় ঢুকি। খুব সস্তা কাঠ ও টিন দিয়ে সম্প্রতি তৈরি রেস্তোরাঁর ঘরটি আশপাশের অন্যান্য দোকানপাটের ডিজাইন থেকে ভিন্ন, এবং মানের দিক থেকে এক নজরে তার গরিবি হালতও খুব স্পষ্ট। এ রেস্তোরাঁয় আমরা আরো বার কয়েক এসেছি। সেন্ট্রাল রেঙুনে আসলে এখানে বসে এক পেয়ালা দুধপাত্তি চায়ের সাথে চালের রুটি দিয়ে সুজির হালুয়া—আমাদের পারিবারিক প্রিয় খাবারের তালিকায় পড়ে। এখানকার খদ্দেরদের বেশিরভাই বর্মার মুসলিম অভিবাসি সম্প্রদায়ের বেকার তরুণ। কায়সারবাগের বর্তমান স্বত্বাধিকারীর পরদাদা অনেক বছর আগে লখনৌ থেকে বর্মাটিক কাঠের ব্যবসা করতে রেঙুন এসেছিলেন। লখনৌ শহরে কায়সারবাগ নামে নবাবী আমলের মশহুর একটি প্রাসাদ আছে। রেস্তোরাঁর বর্তমান মালিক তার পুত্র সে স্মৃতিতে আদনা এ চা-খানার নামকরণ করেছেন। বয়সের দিক থেকে মুরব্বি হওয়ার কারণে সকলের কাছে তিনি কাকা-হুজুর বলে পরিচিত। তাঁর আসল নাম এ অব্দি আমাদের জানার সুযোগ হয়নি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Sep/10/1536567592493.jpg
সেন্ট্রাল রেঙুনের দৃশ্যপট

কাকা-হুজুরের বয়স হলেও তাকদ এবং তনদুরুস্তির দিক থেকে তিনি এখনো দড়ো আছেন। তাঁর দীর্ঘ কোঁকড়ানো দাড়ি মেহদি রঞ্জিত। উপর ও নিচের পাটি মিলিয়ে তাঁর মোট চারটি দাঁত খোয়া গেছে। তাই হাসলে তাঁর মুখমণ্ডলকে শিক-ভাঙ্গা জানালার মতো দেখায়। কারণে অকারণে তিনি লখনৌয়ের কবি তকী মীরের কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দিতে পছন্দ করেন। তাঁর কাউন্টারে ক্যাশবাক্সের পাশে ১৮৮৯ সালে লখনৌ থেকে ছাপা মীরের কবিতার একখান দিওয়ান হামেশা মজুদ থাকে। দিওয়ানের পাতাগুলো জিল ছিঁড়ে ঝুরঝুরে হয়ে গেছে। তাই তিনি শের-শায়েরীর কেতাবখানা তাঁতের কাপড়ে তৈরি বস্তনীতে সিজিলমিছিল করে রাখেন।

বেশ কিছুক্ষণ হলো আমরা কায়সারবাগে এসে বসেছি। কাকা-হুজুর আমাদের কোনো খোঁজখবর নিচ্ছেন না দেখে একটু অবাক লাগে। তাঁর খালি কাউন্টারে একটি আগরবাতি অযথা পুড়ে পুড়ে খুশবু ছড়াচ্ছে। আমরা পিপাসার্ত, তাই তাঁর খোঁজে কিচেন থেকে যে ফোঁকর দিয়ে চা-নাশতা সাপ্লাই দেওয়া হয়, তার সামনে এসে দাঁড়াই। রান্নাঘরে জ্বলন্ত চুলার উপর মস্ত এক হান্ডিতে কাকা-হুজুর হাতা দিয়ে কিছু নাড়ছেন। আমার সাথে চোখাচোখি হতেই তিনি কপালের ঘাম মুছে বলেন, ‘জেরা ইন্তেজার করো বেটা, আখনি পাকা রাহা হ্যায়।’ সাথে সাথে আমার নাকে এসে লাগে মশলাদার খুশবু। আমাদের কিন্তু বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না, গামছায় হাত মুছতে মুছতে দু’পেয়ালা লাচ্ছি হাতে কাকা-হুজুর আমাদের সামনে এসে দাঁড়ান। তারপর খুব স্নেহের স্বরে হলেণের কাঁধে হাত রেখে বলেন, ‘বহুত পেরেশান লাগতা হ্যায়.. বাচ্চেলোক, শরবত লাচ্ছি পিয়া করো, আল্লাকা নাম লিয়া করো।’

আমরা হাতপাখা দিয়ে মাছি তাড়িয়ে ধীরেসুস্থে লাচ্ছি পান করতে থাকি। কাকা-হুজুর এখন কাউন্টারে বসে চশমা চোখে বস্তনী খুলে ঘাঁটছেন তকী মীরের শের-শায়েরী। আজ থেকে হপ্তা দুয়েক আগে পয়লা যেদিন তাঁর চা-খানায় আমরা এসে হাজির হই, তিনি আমাদের দিকে খুব তাজ্জব হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। শ্বেতাঙ্গীনী হলেণের গাত্র বর্ণই বুঝি তাঁর অবাক হওয়ার কারণ। কপালে ভাঁজ ফেলে তিনি আমার নাম জানতে চেয়েছিলেন। আমি জবাবে ‘মঈনুস সুলতান’ বললে তিনি আমাকে শুধরে দিয়ে বলেন, ‘মোহাম্মদ মঈনুস সুলতান বলো বেটা।’ নামে মোহাম্মদ সংযোজনের তাঁর প্রস্তাব আমি বিনা বাক্যব্যয়ে কবুল করে নিলে—তিনি ভুরু কুঁচকে হলেণকে দেখিয়ে জানতে চান, ‘কৌণ হ্যায় উ হাসিন আওরত?’ জবাবে আমি কনফিডেন্টলি তাকে শাদি করা বেগম জানালে, তিনি শিক-ভাঙ্গা জানালা খোলার অভিব্যক্তিতে হো হো করে হেসে বলেন,  ‘তুমকো জরুর মীর ছাহেব ক্যা শ্যার শুনানো হোগা।’ তারপর তিনি বস্তনী বিছরিয়ে তকী মীরের দিওয়ান খোলেন। কিতাবখানার বয়স দেখে হলেণ রীতিমতো অবাক হয়। একটি হলুদ হয়ে আসা পৃষ্ঠা দেখিয়ে কাকা-হুজুর পড়েন, “মুহব্বৎসে হ্যায় ইন্তেজাম-এ জহাঁ/ মুহব্বৎসে গর্দিসমেঁ হ্যায় আসমাঁ।” অর্থাৎ “ভালোবাসার জন্যই তো সবকিছু/ আশমান ও তো চরকির মতো ঘুরছে তার টানে।” আচমকা শায়েরবাজিতে খানিক বিব্রত হলে কাকা-হুজুর কিতাব বন্ধ করে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলেন, “ভুখা হ্যায় তুম দুনো, ঠিক হ্যায়, পয়লা আল্লাকা নাম লাও, ইসকা বাদ হালওয়া রুটি খিলাও। ইয়ে খানে কা লিয়ে কই পয়সা উইসা দেনে কা জরুরত নেহি।”

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Sep/10/1536567706425.jpg
কায়সারবাগে আদি কাঠের বাড়ি

ব্যাস্, মুফতে পয়লা দিন হালওয়া রুটি খিলানোর পর থেকে তাঁর সাথে আমাদের চাচা-ভাতিজার জানপহচান সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে যায়। সেন্ট্রাল রেঙুনে আসলেই আমরা একবার করে কায়সারবাগে হাজিরা দিই। কিন্তু আজ কেন জানি কাকা-হুজুর নীরব হয়ে আছেন। হলেণ কায়সারবাগের দেয়ালে লটকানো একটি বড়সড় পিকচার ফ্রেমের দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এ ফটোগ্রাফ আগে আমরা খেয়াল করে দেখিনি। ছবিতে বর্মী কেতায় চমৎকার একটি কাঠের বাড়ির নিচে বড়বড় হরফে ইংরেজিতে হাতে লেখা ‘কায়সারবাগ’। আমি কৌতূহলী হয়ে ছবিটি কিসের তা জানতে চাইলে তিনি দ্বীর্ঘশ্বাস ফেলে যা বলেন, তার সারমর্ম হচ্ছে—মন্দিরের মতো চূড়োওলা টালির ছাদের প্রান্তে কাঠের ঝালর লাগানো সুদর্শন এ বাড়িটি তাঁর পরদাদা তৈরি করিয়েছিলেন পারিবারিক বাসস্থান হিসাবে। ওখানে একান্নবর্তী পরিবারের তিন প্রজন্ম একসাথে বাস করত। বাড়িটির নিচ তলার হলঘরে তেতাল্লিশ বছর আগে কাকা-হুজুর চালু করেছিলেন টি-স্টল কাম রেস্তোরাঁ। বর্মায় গোপনভাবে পরিচালিত গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত কিছু মুসলমান ছেলেপিলে এ চা-খানায় এসে বসত। পুলিশ তাড়া করলে তিনি তাদের কায়সারবাগের ছাদের কুঠুরিতে লুকিয়ে রাখতেন। বিষয়টি জানাজানি হলে পুলিশ তাঁর পিতামহের হাতে তৈরি কাঠের সুন্দর বাড়িটি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়। আজকাল সে ধরনের বাড়ি আবার তৈরি করা খুবই মুশকিল। বর্মাটিক কাঠ বাজারে পাওয়া যায় না, অলঙ্কৃত ছাদ তৈরি করার হাতযশওলা করিগররাও বিগত হয়েছেন। এ রকমের একটি ঘর তৈরির রসদপত্রও দারুণভাবে এক্সপেনসিভ। কাকা-হুজুরের সে কিমত নেই। তাই তিনি সাদামাটা কাঠ ও টিন দিয়ে নতুন ঘর বানিয়ে আবার কায়সারবাগ রেস্তোরাঁটি চালু করেছেন। ঘটনা শুনে আমি ও হলেণ তাকে হামদর্দির সাথে সহানুভূতি জানাই। তিনি ম্লান হেসে—সব আল্লাতালার ইচ্ছা বলে তকী মীরের আরেকটি শের আবৃত্তি করে শোনান, “জফায়েঁ দেখ লিয়ে, বেবফাইয়া দেখি/ ভলা হুয়া কেহ্ তেরি সব বুরাইয়াঁ দেখি।” অর্থাৎ “প্রভু তোমার অসীম দয়ার সাথে আশা দিয়ে আশহত করার নির্মমতাও দেখলাম/ তোমার খারাপ দিকটা দেখতে পেয়ে কিন্তু ভালোই হলো।”

এ শের শুনে অবশেষে বিষণ্ণ মনে কাকা-হুজুরের কাছ থেকে বিদায় নিতে যাই। তিনি হাত নেড়ে বলেন, “বয়ঠো বাচ্চালোক, জেরা বয়ঠো, আভি আরেক দফা পরওয়াদেগার কি নাম লাও, ইস কা বাদ থোড়া আখনি খিলাও।

আপনার মতামত লিখুন :

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস ও কল্পনা

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস ও কল্পনা
বাংলায় ঐতিহাসিক নাটকের আদিগুরু অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়

দক্ষিণ এশিয়ার বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস রচনা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক আছে। নৈর্ব্যক্তিক ইতিহাস কতটুকু রচিত হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপিত হয় মাঝেমধ্যে। কবির কল্পনা না প্রকৃত ইতিহাস সত্য, এই দ্বন্দ্বের মীমাংসা হয় না।

কারণ, এ অঞ্চলের মানুষ ইতিহাস জেনেছে গল্প, উপন্যাস, নাটকে। শাহজাহান, সিরাজদ্দৌলা, মীর কাসিম সম্পর্কে তথ্যনিষ্ঠ ইতিহাস মানুষ যত কম জানে, তারচেয়ে ঢের বেশি জানে নাটকের আবেগাপ্লুত সংলাপ। ঐতিহাসিক সত্য চাপা পড়ে সাহিত্যিক কৃতকৌশল ও কল্পনার স্তূপের তলে।

ফলে সৃজনে অগ্রাধিকার কার? কবি যা রচিবে তাই কি সত্য? নাকি স্রষ্টাকে ইতিহাসের সত্যের কাছে নতজানু হতেই হবে? এসব প্রশ্ন বারবার গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ইতিহাস প্রসঙ্গে।

দক্ষিণ এশিয়া তো বটেই, ঔপনিবেশিক বাংলায় পণ্ডিত সমাজের চিন্তা-চেতনার আবহে এসব প্রশ্ন খুব বড় হয়ে উঠেছিল। বিশেষত অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় রচিত নাটকগুলোকে কেন্দ্র করে বিতণ্ডার সূত্রপাত ঘটেছিল।

অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ছিলেন ঐতিহাসিক নাটকের আদিগুরু। তিনি নিজেকে মনে করতেন, ইতিহাসের সত্য-প্রতিষ্ঠার একনিষ্ঠ সাধক। এ বক্তব্যের দৃষ্টান্তও তিনি রেখেছেন। সিরাজদ্দৌলা (১৩০৪ বঙ্গাব্দ) ও মীর কাসিম (১৩১২ ব.) বই দুটিতে তিনি তথ্যের ভিত্তিতে এই দুই নবাব সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা ভেঙে দিতে সচেষ্ট হন।

ইংরেজগণ এই দুই দেশপ্রেমিক নায়কের প্রতি যে মিথ্যাচার ও কলঙ্কলেপন করেছিলেন, অক্ষয়কুমার সেগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে গবেষকের নিবিষ্টতায় প্রকৃত সত্য উপস্থাপন করেন। তবে তিনি ইতিহাস রচনা করেননি, নাটক লিখেছিলেন। এবং সাহিত্যে ঐতিহাসিক সত্যের সন্নিকটে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। এমনকি, সমকালীন সাহিত্যিকদেরকেও সত্যানুসন্ধানী হতে প্রণোদিত করেছিলেন।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ‘চন্দ্রশেখর’ উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র, মীর কাসিম ও তকি খাঁর চরিত্রচিত্রণে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়েছেন বলে তীব্র ভাষায় অভিযোগ করতেও দ্বিধা করেননি অক্ষয়কুমার। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় যে বিতণ্ডা শুরু হয়, তাতে রবীন্দ্রনাথ অক্ষয়কুমারের সমর্থনে কলম ধরেন।

তবে কৌশলী রবীন্দ্রনাথ এ কথাও বলেন যে, “ইতিহাসের রসটুকুর প্রতিই ঔপন্যাসিকের লোভ, তার সত্যের প্রতি তাঁর কোনো খাতির নেই।”

রবীন্দ্রনাথের এ কথায় ঔপন্যাসিক কল্পনার অধিকার পেলেও ‘ইতিহাসের মূল রসটুকু’ বা নির্যাস এড়িয়ে যাওয়ার এখতিয়ার পান না। এটাই মোটামুটি মানদণ্ড হয়ে গেছে। অর্থাৎ, ইতিহাসের নির্যাসটুকু নিয়ে কল্পনার আশ্রয় নিয়ে সাহিত্য রচনা করা যেতে পারে। তবে সেটা সাহিত্য নামেই চিহ্নিত ও ব্যক্ত হতে হবে, ইতিহাস নামে নয়।

অক্ষয়কুমারের যুগ পেরিয়ে শতবর্ষ অতিক্রান্ত হলেও ইতিহাস ও সাহিত্যের মিশ্রণ থেমে থাকেনি। বরং আরো বেড়েছে। অতি সাম্প্রতিক লেখকদের কথা উহ্য রেখে একটু পুরনো হিসেবে দৃষ্টান্ত দেওয়া যায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের। তার ‘সেই সময়’, ‘পূর্ব পশ্চিম’, ‘প্রথম আলো’ ইত্যাদি উপন্যাস মানুষকে আলোড়িত করেছে। বই আকারে বের হওয়ার আগে ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশের সময় লেখাগুলোর তথ্য ও সত্যাসত্য নিয়ে এন্তার চিঠি ও ভিন্নমত ছাপা হয়েছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/18/1563451116521.jpg

একজন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আমরা এত পরিশ্রম করে, কত তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে ইতিহাস রচনা করি। কিন্তু মানুষ সেগুলো খুব একটা পড়ে না। ইতিহাসের বই জনপ্রিয় হয় না। আর আপনি ইতিহাসকে উপন্যাসের মধ্যে নিয়ে এত জনপ্রিয় হলেন কেমন করে?’

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় খুব সুন্দর উত্তর দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘মানুষ ইতিহাসের মূল গল্পটি শুনতে চায়। আমি আমার মতো করে গল্পটি বলি।’

মানুষ যত দিন ইতিহাসের মধ্যে শুধু গল্পটি শুনতে চাইবে, ততদিন ইতিহাসের নির্জলা সত্যটি তার কাছে আসতে পারবে না। ইতিহাস আর কল্পনার মাখামাখি চলতেই থাকবে। এটাই সম্ভবত দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ঐতিহাসিক অদৃষ্ট বা হিস্টরিকাল ফেট!

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

আরো হাঁস

এইরূপ কান্দে কন্যা নিরালা বসিয়া
হাঁসের লাগিয়া কন্যা ধুড়িল শহর

কান আশে হইছে বিয়া স্বপ্নের ভিতর
ঘটকালি করে আপন মামতো ভাই

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর
কারা পানখিলি খাইয়া গপ মারে তাই

সজিনার তলে বসি কান্দিল তামাম
এর কিবা মানে শুন কান খাড়া করি
চিক চিক করে মনে এ বিয়ার জরি।

হেমন্তের হাঁস

আমার হয়নি ধোয়া ওগো শিশিরের তলে
আমার হয়নি নাচা মিশি যাওয়া ঊর্মিদলে।

আমার মিটিনি নেশা অলিকোলে শোয়া বাকি
আমায় ঢালিনি মৌন নূর বধির জোনাকি!

আমারে চিনিয়া চিনে নাই হেমন্তের হাঁস
আমার পানের পাত্রে বাদ গেছে শ্যামা ঘাস।

আমার ইউসুফ শোনে নাই ভাইদের শোকর
বকুল তলায় আসি হাঁপায় প্রকৃত ভোর।

হাঁসের জলেরা

হাঁসের পায়ের জল
শুকায়, তাই তারা ফের জলে নামে।
একটা কথা আমি ভুলি যাই
হাঁসের কোনো ইচ্ছা নাই।
হাঁসের জলে আমি ভাসি
হাঁসের পায়ের জলে
আমি মুখ ধুইছি,
আমার নিজের মুখ কেন মোর যেনতেন মোকাম ন রে!
আমার চোখে এই ফেরেবি জল ধরা দেয়
যেন বখিল আমি তার কিছু নির্ভরতাময় তর্জমা করি!
দাদি যেই ছাড়ে হাঁস
তারা আমার মরা দাদির জইফ হাঁস!
স্বপ্ন তারা আমার নিকট
তাদের নিকট
আমি তেমন বাস্তব ন রে!

এই বাড়িতে

দেয়ালের পর কাঠবিড়ালির দৌড় দেখি
যেন রইদ নাকফুল হয়,
তারপর সারা সকালটা গড়ায় দেয়াল ধরি,
একটা দোয়েল ডিম জারি হইলে
অনেক দোয়েল চিল্লায়ে ধরে বা গান,
একদিন আসে আসে করি শেষে আসে,
তারার মতন গোল চোখ ঘুঘু তার
চোখের বর্ডার আলতার রঙ পাছে
পায়ের রঙের সাথে মিশিবার চায়,
এ বাড়িতে আসি যেই হাঁসগুলি দুলি দুলি ও বাড়ি ত যায়,
ওদের ঘ্রাণের ভিতর ঘুরি ঘুরি থামি,
বাতাস হবেনে আসল শরিক
আডিয়াকলার ঝাড়ের নিকটে আসি,
আমি শুনি জলের মর্মর কলপাড়ে তড়পায়,
তারে ঢাকিবার আরো মিহি ধ্বনি আছে
এ বাড়ির অনেক অ-বাক কণ্ঠস্বর আছে!


প্রত্যাবর্তনের লজ্জা
(কবি আল মাহমুদকে)

ভাইয়ের ডাক শুনি উঠি রাতদুপারে স্বপ্নের ভিতর। যেন
বাতাসের ডাক শুনি ঢেউ উঠে তৎপর।
দেখি আব্বা আগেই উঠছেন, নিজ হাতে আতাফল, গাছপাকা তরমুজ
পরম আদরে ছেনি দিই কাটি কাটি ফালি ফালি করি খাওয়াইতেছেন,
খা, আহারে কতদিন খাস নাই!
আম্মা তজবিহ হাতে এক হাতে ভাইরে বাতাস করতেছে, আয়েশা ফুল তোলা
একটা রুমাল দিই কইলো, এইটা দিয়া মুখ মুইছো, মাথা মুইছো, চোখের কান্দন মুইছো না গো ভাই!
অথচ ভাই মারা গেছে তার চল্লিশাও পার হয় নাই। উনি কবরতে উঠি আসছেন, উনার চোখ দুইটা
তারার নিভু নিভু, এট্টু সর্দি লাগছে ক্যাল, ভাই হাঁকি কইলো, বকনা বাছুরটারে খ্যাতের আইলে
বান্ধিলি অইডা তো দড়ি ছিড়ি সব পাকাধান সাবাড় করবেনে!
আম্মা কান্দে আর ইশারা করে, ঠোঁট টিপে আঙুলে, কন, একদম চুপ!
ভাই যে মারা গেল শুক্রবার, ভাই নিজেই জানে না!
তাই আমাদের সংসারে কাঁঠাল পাতার নারকেল ছায়ার লোভে
পড়ি ঝোঁকে ঝোঁকে আইস্যে আগের মতো ধমক দিতেছে আমাদের সংসারে
জায়গা মতো, আব্বা কইলেন, খবরদার তোরা চুপ থাক,
ও যেন না জানে পাছে, ও মরি গেছে, পাছে বেচারা কষ্ট পাবে!

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র