Alexa

বাঘবিধবা

বাঘবিধবা

অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ

আতঙ্কে রাত কেটেছে সিংগীমারি গ্রামের লোকদের।

ফুলো ফুলো চোখ, চোখের কোণে অল্প পিচুটি মোর্শেদ আলির। দু-চারটা গেঞ্জির ওপরেও শাল জড়িয়েছে সে। পরনে বাটিক লুঙ্গি। পায়ে লাল মোজা আর স্যান্ডেল। সেকি শীত! দুধ-সাদা কুয়াশায় এক হাত দূরের কিছুও দেখা যায় না। বরফের মতন হাওয়া হাত, পা, কানের খোলা জায়গায় এসে ঝাপটা মারে। মনে হয় ছুরি দিয়ে শরীর চিড়ছে কেউ। দাঁতে দাঁত লেগে যায়। কাঁপুনি ধরে। তাছাড়া আলির শীত একটু বেশিই। নাক বন্ধ থাকে শীতের সময়। কফ জমে বুকে। সারাদিন খক খক কাঁশি আর কফ ফেলা। বেশির ভাগ সময়েই গিলে ফেলা হয় কফ। ঘর নোংরা করলে বউ রাগ দেখায়। মোর্শেদ আলির গলা জ্বলে। কষ্ট হয়। কাঁশির দমকে কঠিন যন্ত্রণা। সেই যন্ত্রণা সে চেপে রাখতে চায়। পারে না। কাশি তার কথা শোনে না। বেয়াড়া কাশি। সকালের দিকে কাশিটা বাড়ে। কেন বাড়ে জানা নেই। কাশতে কাশতে বমি হয়ে যায়।

কিছুক্ষণ আগেই সকাল হয়েছে। আলো কাটছে ধীরে ধীরে। রোদ আসতে সময় লাগবে। কুয়াশার জালে এখনো বন্দী রাতের অন্ধকার। এই অন্ধকারকে সরিয়ে সূর্যের দখল নিতে সময় লাগবে বোঝা যায়। কাশি দিতে দিতে মোর্শেদ আলি চুলায় পাতিল বসায়। বউ আকলিমার ঘুম ভাঙাতে চায় না। নিজেই একটু পানি গরম করে। গরম পানিতে গলায় আরাম হয়। পানিতে একটু মধু মেশাতে হয়। সুন্দর বনের খাঁটি মধু। মধু কাশির জন্য ভালো। আকলিমা ঘুমিয়ে থাকতে থাকতে দুটো চালও বসিয়ে দেওয়া যায়। একটা আলু সিদ্ধ। ভর্তা, কাঁচামরিচ দিয়ে ভাত। স্বামীর কাজ দেখে আকলিমা খুশি হবে।

মোর্শেদ আলী ঠিক করেছে আকলিমাকে মুখে তুলে খাইয়ে দেবে। এই সোহাগ আকলিমার পছন্দ হবার কথা না। তাদের সম্পর্কের মিষ্টি রস ফুরিয়েছে অনেক আগেই। এখন শুধু তিক্ততা। একদম করলা তিতা। বিষয়টা অস্বাভাবিক না। বিয়ের কিছুদিন পরেই সম্পর্ক শীতের মতন নির্জীব হয়ে যায়। দুটো শরীর প্রয়োজনের তাগিদে তখন মিশে যায় ঠিকই কিন্তু উত্তাপ ছড়ায় না। চুমোচুমি ঢের হয় তবু তাতে ভালোবাসার ঠাঁই হয় না।

এমন তার বাবা আর মায়ের ক্ষেত্রেও দেখেছে মোর্শেদ আলী। ছোটবেলা থেকেই তার কড়া চোখ। এড়ায় না কোনো কিছু। তীক্ষ্ণ নজর সবদিকে।

মায়ের চেয়ে সুন্দরবন বেশি পছন্দ ছিল বাবাটার। পশুর নদীর গর্জন শুনলেই তার মাথা খারাপ হয়ে যেত। মোটা চালের ভাত আর কোন্দ আলুর ঝাল ঝাল বিদঘুটে একটা তরকারি খেয়ে রোজ দুপুরে সে বের হয়ে যেত নৌকাটা নিয়ে। পশুর আর সন্ধ্যা নদীর অলিগলি চষে বেড়ানো হয়েছে তার। বনের গভীরে, একদম গহীনে কাঠের জন্য যেত বাবা। সাথে থাকত মোর্শেদ আলী। তোবড়ানো একটা টিনের ডিব্বায় মা খাবার দিয়ে দিত। ওটা থাকত মোর্শেদ আলীর হাতে। এক হাতে বৈঠা আরেক হাতে ডিব্বা। বাবা কুড়াল পাশে রেখে নৌকার পাটাতনে কাত হয়ে শুয়ে গান ধরত। ‘ওরে হৈ হৈ, জোয়ান মরদ বয়সের আগে হইলো বুড়া/ নাইরে বিবির সোহাগ/ আনিতে রস ছোবল দিলো শঙ্খচূড়া...।’

একটা সময় নদী ছেড়ে নৌকা ঢুকত খালে। নালার মতন ছোট্ট খাল। সে নালার শরীর চিড়ে ধীরে ধীরে নৌকা যেত গহীনে। এতটা গহীনে যেখানে বনকর্মীরা তো দূরের কথা, জলদস্যুরাও আসত না। শুধু বাতাসের শোঁ শোঁ আওয়াজ। জলের ওপর বৈঠার ছলাৎ আঘাত। ভূতুড়ে পরিবেশ। মোর্শেদ আলীর ভয় ধরত। বলত, ‘বাপজান, ডর লাগে। ফিরা যাই লন।’ তার বাবা হাসত। বলত, ‘পুরুষ মাইনষের কইলজা হইতে হইব পাহাড়ের মতন। এক বিঘৎ হইলে চলব?’ শুনে মোর্শেদ আলী চুপ যেত। ছোটবেলা থেকেই তার পৌরুষত্ব টনটনা। তবে এদিকে বাঘের ভয় আছে। শুনেছে অন্যদের কাছে। বাঘ জনবসতির কাছে এসে নিত্য টেনে নিয়ে যায় ছাগল, গরু। একটা বাঘ না, অনেকগুলো বাঘ। মোর্শেদ আলীর ভয় তাই কমত না। ইচ্ছে না থাকার পরেও তাই থেকে থেকে বলত, ‘ও বাপজান। ফিরা যাই না।’ বাবা হাসত। ভয়ংকর রকমের ক্ষয়ে যাওয়া হলুদ দাঁত বের করে হাসত। বেশি গহীনে ঢুকলে মোর্শেদ আলী বাবার বন্ধু হয়ে যেত। বাবার কথার আগল ছুটত তখন। কতসব কথা। জীবন, চাওয়া, পাওয়া এইসব। মাকে নিয়েও বলত এ সময়। বলত, ‘তোর মারে রাখা যাইব না। নতুন মা আনুম তোর লাইগা। সোহাগ-আদরের কমতি হইব না।’

এই এইভাবেই এক একটা দিন যেত। বাঘ আর ধরত না। কাঠ নিয়ে ফেরা হতো বাড়ি। মোর্শেদ আলী হাঁফ ছেড়ে বাঁচত। জীবন নিয়ে ফেরা।

বাবা একা গিয়েছিল একদিন। গোলপাতার ঝোপে কুড়াল দিয়ে কোপ দেবার সময়ে পেছন দিয়ে আঘাত করে বাঘ। গলা, কাঁধ, বুকে বাঘের থাবার আঘাত। রক্তে ভিজে একশেষ।

মোর্শেদ আলীর মা কেঁদে কেঁদে বনকর্মীকে বলছিল, ‘আমারে কইলো কাপড়-চোপড় পরিষ্কার কইরি রাখতি। জঙ্গলে যাইব। আমি জামা-কাপড় পরিষ্কার কইরে রাখলি দুপুরে গরম ভাত খাইয়া বাদায় যায় লোকটা। বিকালেই জাইলেরা এসে খবর দেয়, মোর্শেদের বাপ বনে বাঘের খপ্পরে পইড়িছে। তারপর সব শেইষ। লোকটা বাঁইচলোনা।’

এই কান্না কাজে লাগে। বনকর্মীদের মন গলে। তারা মায়ের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করে দেয়। সরকার বাঘ বিধবাদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করেছে। মোর্শেদের বাবার আর নতুন মা আনা হয় না। লোকটা এর আগেই হাওয়া হয়। মোর্শেদ পায় না নতুন মায়ের আদর-সোহাগ। অভিমান হয়। শুরুতে অভিমান, তারপর রাগ, কঠিন রাগ। বাঘের ওপর রাগ। বাঘের কারণে নতুন মাটা আসতে পারল না। বাঘের শাস্তি হওয়া দরকার। মোর্শেদ প্রতিশোধ নেবে। কঠিন প্রতিশোধ।

সে প্রতিশোধ নেবার সময় আর হয় না। শীতের মতন নির্জীব মা মোর্শেদ আলীকে নিয়ে সংসার চালানোর চেষ্টা করে। লাভ হয় না। ভাতার টাকা অতি অল্প। বিধবা মা ঘর চালাতে নদীতে কাঁকড়া আর রেনু ধরতে বের হয়। ওতে খাবার জোটানো যায় কিছুটা হলেও।

মোর্শেদ বনে যেতে চায়। বয়স তো কম হয়নি। তাকত আছে শরীরে। কাঠ কাটা সম্ভব।

মা রাজি হয় না। হাত, পা ধরে। কসম কাটে। বলে, ‘তোর বাপ গ্যাছে অই জঙ্গলে। তোরে আর হারাইতে পারবু না।’ মোর্শেদ আলী মায়ের কথায় বিরক্ত হলেও কথাটা শোনে। তাকে হারানোর ভয় বুকে পুষে শীতের মতন নির্জীব মাটা একদিন নিজেই হারিয়ে যায়।

ততদিনে বিয়ে হয়েছে মোর্শেদ আলীর। মা-ই ছেলেকে ঘরে রাখার জন্য করেছে এই কাণ্ড। বউয়ের রসে মজবে ছেলে। জঙ্গলে যাবে না। বোকা মা। শীতের মতন নির্জীব বউ এনেছে ঘরে। বাবার মতনই মোর্শেদ বসন্ত ঋতুর জন্য পাগল। শীতে শরীর উষ্ণ হয় না। ওতে ওম ওম গরমের আরাম নেই। বউয়ের সাথে তিক্ততা শুরু হয়। তিতা তিতা জীবন।

মোর্শেদ নানান কথা চিন্তা করতে করতে কাশে। চুলায় ভাত। আগুনের ভেতর কী যেন পট পট করে ফোটে। লাকড়ি জ্বলতে চায় না এই শীতে। ভিজে শেষ।

মোর্শেদ আলির কাশির দমকে একসময়ে ঘুম ভাঙে আকলিমার। উঠে এসে দাঁড়ায় মোর্শেদ আলির পাশে। পরনের শাড়ি আলুথালু। আটসাট পুরনো ব্লাউজের আড়াল হতে বের হয়ে আসার জন্য আকুল উদ্ধত্ব স্তন। আকলিমার দিকে তাকায় মোর্শেদ আলি। তাকিয়ে হাসি দেয়। আর কিছু না। নারীর চেয়েও তার কাছে বরাবরই আকর্ষণীয় গহীন অরণ্য। এসব জানে আকলিমা। তাই বনে না। বেহুদা পুরুষে শান্তি নাই। তিতা জীবনটা আরো তিতা করতে আকলিমা গালিগালাজ শুরু করে। ক্যান পুরুষমানুষ পাকঘরে ঢুকল এই হলো অপরাধ। মোর্শেদ কথা বাড়ায় না। পাকঘরের কাজ বুঝিয়ে দিয়ে খাটের ওপর গিয়ে বসে। আকলিমা গজগজ করে যায়। মোর্শেদ আলি চুপ থাকে। আজ আর কথার পিঠে কোনো কথা হবে না। আকলিমার শেষ দিনটায় মেনে নেওয়া হবে সব। তার শেষ খাওয়াটা নিজ হাতে রান্না করে খাওয়ালে ভালোই লাগত মোর্শেদ আলির। সেটা হতে দিলো না আকলিমা নিজেই।

বসে বসে সব ঠিক করে মোর্শেদ আলি। এই দিনটার জন্য অপেক্ষা ছিল অনেকদিনের। বাঘকে বাগে আনার সময় এবারই। কম তো চেষ্টা হয়নি। পারেনি কোনোবারই। এবার লোভনীয় টোপ। বাঘ ধরা না পড়ার কোনো কারণ দেখছে না সে।

গত রাতে সিংগীমারি গ্রামে বাঘ ঢোকার সময়েই মনে মনে ঠিক করে রেখেছিল সব। কাজ চলছে সে অনুযায়ী। বিছানায় বসে চারপাশটা দেখে নেয় আরেকবার মোর্শেদ আলি। ঘরটা এখনো শক্ত পোক্ত। কাঠের বেড়ার ওপর টিনের চালার ঘর। ধার-দেনা করে নতুন করা হয়েছে। বাড়ির একদিকে লোনা পানির খাল আর আরেক পাশে চিংড়ির ঘের। বাঘ লুকানোর জন্য খালের দিকটাই বেছে নেবার কথা। জংলা জায়গা। নিজেকে আড়াল করা যায় সহজে। গত রাতে টিন পিটিয়ে জানানো হয় বাঘ আসার কথা। মোর্শেদ তাই তাড়াহুড়ো করে ঘরে ঢুকে খিল দেয়। ততক্ষণে কয়েক বাড়ির মুরগি আর ছাগল হাওয়া। শোনা যায় আশপাশের বাড়ি থেকে আসা কারো কারো কান্না। এরপর সব চুপ। একদম নীরব, নিঃশব্দ।

ঘটনা কয়েকদিন আগের। গত সপ্তাহে বাঘ বাজার থেকে ফেরার পথে হামলা চালায় পুব কোনার ঘরের বাবলুর ওপর। হাত আর বুকের একপাশের ওপর দিয়ে যায় বিপদ। কোনোরকমে বেঁচে যায় বাবলু। বনকর্মীরা খোঁজ লাগায় বাঘের। বাজি পোড়ায় যাতে গহীন অরণ্যে চলে যায় বাঘটা।

বাঘ যায়নি। বাঘ আছে। মানুষের মাংসের স্বাদ পেলে ফিরে আসতেই হয়। বাঘ এই নেশার টান এড়াতে পারে না। এক জীবনে কম তো দেখল না মোর্শেদ। ভেড়া, ছাগল কত কিছু দিয়েই না ফাঁদ পাতল! কাজ হয়নি। চালাক প্রাণি। অত সহজে কাছে আসবে না। টোপ হিসেবে মানুষই ভালো। মানুষের মাংসের স্বাদ এড়ানোর সাধ্য নেই কোনো বাঘের। কিন্তু মানুষ কই পাওয়া যায়? মরা কিংবা জ্যান্ত মানুষ!

পুতাটা জায়গামতন লুকিয়ে রেখেছে মোর্শেদ আলী। মুগুরের চেয়ে কম নয়। মাথার ঠিক জায়গায় এক ঘাঁ পড়লেই যথেষ্ট। খুব বেশি রক্তপাত হবে বলে মনে হয় না। তারপর মৃতদেহটা টেনে ফেলা হবে ঘরের বাইরে। বাঘ মানুষের শরীরের গন্ধ টের পাবে ঠিক ঠিক। ছুটে আসবে মোর্শেদ আলীর বউয়ের নরম মাংসের লোভে।

আকলিমা নিজেই খাবার তৈরি করে। আলু ভর্তাটা ভালো মতন চটকায়। বোম্বাই মরিচের অর্ধেকটা দেয় সাথে। এই মরিচের গন্ধ মোর্শেদ আলীর পছন্দ। সাথে বেগুন ভাজির এক টুকরা। একটু সময়ই লাগে সব তৈরি করতে। সময় নিয়েই করে। ক্ষিধে লাগুক মোর্শেদ আলীর। ক্ষিধেটা দরকার। আকলিমা তো আর খাবে না।

বাইরে তুমুল শীত। কুয়াশার শরীর টিকে থাকার চেষ্টা করে সূর্যের সাথে লড়াই করে। আকলিমা রান্নাঘরের টিনের ফুটো দিয়ে বাইরের যতটুকুন দেখা যায় দেখে নেয়। কেউ নেই। সব ঘরে লুকিয়ে আছে। বের হয়নি বাঘের ভয়ে।

আকলিমার তোজাম্মেলের কথা মনে পড়ে। এলাকার সর্দার। ডাকাতের মতন চেহারা। শরীরে শক্তির কমতি নেই। মেয়ে মানুষ গিলে খেয়ে ফ্যালে। এক হাত লম্বা জিহ্বা মনে হয় লোকটার। এই লোকের ফাঁদেই পড়েছে আকলিমা। ইচ্ছে করেই পড়েছে। মরদ দরকার তার। মোর্শেদ আলীর মতন ঢিলেঢালা লোক তার পোষায় না। ভালো লাগে তোজাম্মেলকে। ভালোবাসে সে।

তোজাম্মেল এখন বনে। এই সময়ে নিজের দল নিয়ে জঙ্গলে যায় সে কাঠ আর মধু আনতে। বনে গেলে আলগা মাথায় চলাফেরা বারণ স্ত্রীদের। রান্নার জন্য মরিচ পোড়ানো নিষেধ। যাবে না শরীরে সাবান ঘষা। সব ধরনের ভাজা পোড়া বন্ধ একদম। অন্যের জন্য রান্নায় দোষ নেই অবশ্য। শুধু নিজে মুখে তুলতে পারবে না। এসব মানতে হয়। না হলে অমঙ্গল।

তোজাম্মেলের স্ত্রী নেই। মরেছে নিউমোনিয়া হয়ে। তোজাম্মেলের হয়ে এসব রীতিনীতি পালন করছে আকলিমাই। বিয়ে কিন্তু তাদের হয়েছে। গত অগ্রহায়ণে। মোর্শেদ আলী বাড়ি থেকে এক সপ্তাহ ধরে নাই হয়ে গেল। আকলিমা তখন মুক্ত বিহঙ্গ। তোজাম্মেলের সাথে লুকিয়ে চুরিয়ে দেখা। উদ্দাম জীবন। দুটো শরীর একে অপরের ভাষা বোঝে। সাড়া দেয় দারুণভাবে। এই তো ভালোবাসা। স্পর্শ যার আরেক নাম। সেবারই গোপনে বিয়েটা সেরে নেয়। তবে কথাটা গোপন থাকেনি। গ্রামের লোকজন কিছুটা বুঝেছে। বুঝেছে তাদের মেলামেশার বিষয়টা। বিয়ে পর্যন্ত গড়িয়েছে সেটা আঁচ করেনি। আর অতটা ভাবাও নিষেধ। এই সমাজে এটা কঠিন পাপ। সর্দার হলেও তোজাম্মেল অন্যের বউকে নিজের করতে পারে না। মোর্শেদ মরলেই তখন আকলিমাকে নিজের ঘরে আনার বিধান আছে। মোর্শেদ মরবে কবে?

গ্রামের লোকজন মোর্শেদকে আকলিমার ব্যাপারটা বলতে চায়। কিন্তু মোর্শেদের মতন গাবড়কে বলে কী লাভ? সংসারের প্রতি খেয়াল নাই এই ছাওয়ালের। মা মারা যাবার পর এই সংসারটা দেখার কেউ নেই। মোর্শেদ তো শুধু বাঘ, বাঘ করেই কাটায়। দাদা, বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ। অবুঝ, মূর্খ লোক বটে! তাই আকলিমা আর তোজাম্মেলের অবাধ মেলামেশা চলতে থাকে।

আকলিমা তোজাম্মেলকে আরো কাছে চায়। এমন বুনো লোককে বেঁধে ফেলার মধ্যে আনন্দ আছে। মেয়েদের এই যেন অর্জন। এই পালিয়ে পালিয়ে আর কতদিন? তোজাম্মেলের সাথে সংসার গোছাতে হবে। সন্তান সন্ততিতে ভরে ফেলতে হবে ঘর। শেকড় গড়তে হবে। এই তো শান্তি!

মোর্শেদই প্রধান বাঁধা। মোর্শেদকে আজকাল আর একদমই ভালো লাগে না আকলিমার। তাছাড়া তোজাম্মেল কাছে নেই বলে মনও বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। অবশ্য আকলিমা চেয়েছিল এটাই হোক। বনে থাকলে ফায়দা। কেউ সন্দেহ করবে না।

আকলিমা খাবার নিয়ে আসে। মোর্শেদের ক্ষিধে পেয়েছে। সে আকলিমাকে সাথে খেতে বলে। আকলিমা খায় না। সে তোজাম্মেলের জন্য স্ত্রীর নিয়ম কানুন মেনে চলছে। সে এড়িয়ে যায়। মোর্শেদ জোরাজুরি করে না। এসব তার ধাতে নেই। সে খেয়ে নেয়। আকলিমার রান্না ভালো হয়েছে। মৃত্যুর আগে ভালো রেধেছে তার বউ। সে খাওয়ায় মনোযোগ দেয়। খেয়েই পুতাটা বের করে আঘাতটা করতে হবে।

আকলিমা মোর্শেদ আলীর খাওয়া দ্যাখে। ক্যামন হাভাতের মতন খাচ্ছে লোকটা। কোনোদিকে কোনো খেয়াল নেই। এটাই তো চায় আকলিমা। সে উঠে যায় রান্নাঘরের দিকে। ফিরে আসে অল্পসময়ের ভেতরেই। হাতে বটি। মোর্শেদ আলী মাত্র ভাত চিবোতে চিবোতে গেলার জন্য যখন একটু পানি খেতে যাবে ঠিক তখনই গলায় একটা কোপ বসিয়ে দেয় আকলিমা। যুতসই কোপ।

মোর্শেদ আলীর শরীর দুর্বল। এক কোপেই ঘায়েল। কোনো ঝামেলা করে না। লুটিয়ে পড়ে মেঝেতে। হালকা শরীরের লাশটা ধরে সাবধানে দরজার একটু দূরে বাইরে ফেলে রেখে আসে আকলিমা সহজেই। কোনো লোকজন নেই আশেপাশে। করুণাময় আজ তার সাথেই আছেন।

ঘরে ঢুকে খিল আটকায় সে। তারপর নিপুণহাতে রক্তটা পরিষ্কার করে। ধোয়া মোছার কাজে সে ভালোই তাছাড়া মোর্শেদের শরীরে রক্ত কম মনে হয়। তেমন রক্ত তো ছড়ায়নি।

এরপর আকলিমার অপেক্ষা। এই সময়ইটা কষ্টের। করুণাময়কে সাথে থাকতে হবে। সাথে থাকতে হবে বাঘদেবতাকে। বাঘ আসুক। ছিড়ে-খুবলে খাক মোর্শেদের শরীর। তবেই বেঁচে যাওয়া। তবেই স্বপ্ন পূরণ। তবেই তোজাম্মেলের সাথে থাকার সুযোগ।

মোর্শেদ বাঘের হাতেই মরবে এ তো জানা কথা। সারাজীবনই প্রতিশোধ আর বাঘ, বাঘ করে কাটল। এমনই হবার কথা মোর্শেদের সাথে। কেউ সন্দেহ করবে না।

বাঘ আসতে হবে। এসে এমনভাবে খুবলে খাক মোর্শেদকে যাতে গলার কোপটা খুঁজে না পাওয়া যায়। একদমই ঠাওর করা না যায় যে এটা মোর্শেদ ছিল।

প্রার্থনায় বসে আকলিমা। তার ভালোবাসা যেন জয়ী হয় এই চাওয়া। সে তেমন কিছু তো চায়নি কখনো প্রভুর কাছে। শুধু তোজাম্মেলের সাথে ঘর বাঁধতে চেয়েছে। আর এটার জন্য মোর্শেদের সাথে এমন করা ছাড়া উপায় ছিল না। করুণাময় তার প্রার্থনা শুনুক। সে অপেক্ষা করতে থাকে। সদ্য বিধবা হওয়া বাঘবিধবা আকলিমার চোখ ভেজে জলে। ‘ও খোদা, ও বাঘদেবতা নিরাশ কইরো না।’ এই তার প্রার্থনা। বাঘ আসবে। আর তখন শুরু করতে হবে বিলাপ। স্বামী হারানোর বিলাপ। সব সাজিয়ে রেখেছে ঠিকঠাক। শুধু বাঘটা আসুক। ভালোবাসার জয় হোক। পৃথিবীতে ভালোবাসারই জয় হয়েছে বরাবর। আজও হবে।

অপেক্ষায় সময় যায় আকলিমার। ভালোবাসা মেশানো করুণ, কঠিন অপেক্ষা।

করুণাময় তার ডাকে সাড়া দিক। আমরা যারা ভালোবাসার সাথে আছি তারা চাই চলুন, প্রভু যেন আকলিমার সাথে থাকে। আর মোর্শেদ? ও নিয়ে ভাবার কী আছে? যে যাবার সে তো যাবেই।

পৃথিবী অযথা, দুর্বল লোক পছন্দ করে না। সেসব তার ধাতে নেই। ধাতে থাকার কথাও না। কথা কি?

আপনার মতামত লিখুন :