Barta24

শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯, ৪ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

সমোটো শহরে হাতকাটা ক্যাপ্টেন

সমোটো শহরে হাতকাটা ক্যাপ্টেন
সমোটো শহরের দরিদ্র মহল্লা
মঈনুস সুলতান


  • Font increase
  • Font Decrease

বেশ বেলা হয়েছে, তবে নিকারাগুয়ার সমোটো শহর এখনো জেগে ওঠেছে বলে মনে হয় না। নিকারাগুয়ার অন্য একটি মফস্বল শহরে আমি বাস করছি বেশ কিছু দিন হলো। গতকাল এসেছি সমোটোতে। এখানে আছে সম্পূর্ণ পাথরে তৈরি দৃষ্টিনন্দন একটি পাহাড়। তার রুক্ষ পাষাণ কেটে ‘ককো’ নদীর বয়ে চলাতে প্রকৃতিকভাবে তৈরি হয়েছে অত্যন্ত দৃষ্টি নন্দন একটি ক্যানিয়ন। এর রূপবৈচিত্র অসামান্য, তার টানে ইদানীং সমোটো শহরে টুরিস্ট আসছে বিস্তর। আমি নিকারাগুয়া ছেড়ে যাওয়ার আগে এ ক্যানিয়নে একবার ঘুরে বেড়াতে চাই। আমার সাথে আজ অন্য শহর থেকে এসে যোগ দিচ্ছে দুই নিকারাগুয়ান বান্ধবী ইভা ও গাবরিয়েলা। গাবরিয়েলা তার ছোট মেয়ে মারিয়াকে নিয়ে আসছে। ঘণ্টা দুয়েক পর তারা বাসে করে সমোটোতে আসলে আমরা একসাথে ক্যানিয়নে বেড়াতে যাব।

গতকাল এখানে এসে ‘আসিয়ানদা’ বলে একটি গেস্ট-হাউসে উঠেছি। তো একটু বেলা হতেই আমি বেরিয়ে পড়ি। খানিকটা হেঁটে আসতে হয় শহরে। ক্যানিয়নে যাওয়ার আগে শহরটির খতিয়ান আরো ভালো করে নেওয়া উচিত। তাই বেরিয়ে পড়েছি ভোরবেলা। এদিকের ঘরদুয়ারের হালত দেখে মনে হয় না মানুষজনের অর্থনৈতিক অবস্থা বিশেষ একটা সুবিধাজনক। সড়কটি পিচঢালা, তাতে একটি-দুটি ভ্যান-জাতীয় গাড়ি ছাড়া আর কিছু দেখতে পাই না। ভ্যানের চালকেরাও এখনো খেপ দিতে সড়কে বেরোয়নি। হাঁটতে হাঁটতে বাড়িঘরের নির্মাণশৈলী ও দেয়ালের রংচঙ চুনকামের পরিবর্তন দেখে বুঝতে পারি, চলে এসেছি মধ্যবিত্তদের মহল্লায়। এ এলাকাও জনহীন, তবে এখান থেকে পেছন ফিরে মিরাদর বলে খ্যাত পর্বতটিকে সবুজ ধূসরে আবছা দেখা যায়। ওদিকে বেশ ঘন হয়ে কুয়াশা জমেছে।

ফুটপাতের পাশে তোলা উনুনে তৈরি হচ্ছে ভাঁপা পিঠার মতো দেখতে নারকেল, শসা ও মরিচের কুচি দেওয়া তমালে। হাতে সময় আছে, তাই দাঁড়িয়ে পড়ে তমালের অর্ডার করে গতকাল সমোটোতে চলে আসার ব্যাপার নিয়ে গুছিয়ে ভাবি। জনসংখ্যার পরিমাপে সমোটোকে ঠিক শহর বলা চলে না। হাল্কাপাতলা কিছু আবাসিক এলাকা, কয়েকটি কমার্শিয়াল স্থপনা, গোটা কয়েক ক্যাফে-রেস্তোরাঁ, পেট্রলপাম্প ও বাসস্টপ মিলিয়ে শহরের বিস্তার। আমি কোনো হেটেল বা গেস্টহাউস রিজার্ভ করে এখানে আসেনি। তাই বাস থেকে নেমে ক্যাফেতিন কুয়ো বলে ডিসকোর চনমনে মিউজিক বাজা একটা রেস্তোরাঁতে বসে এক পেয়ালা কফি খাই। দেখা হয় এক ট্যুরগাইড তরুণীর সাথে। তার নাম লুসিয়া। সে পর্যটকদের সমোটো কেনিয়ানে গাইড হিসাবে তার ঘোড়ায় চড়িয়ে বেড়াতে নিয়ে যায়। মেয়েটি হাসিখুশি ও খুব সহজে তার সাথে কথাবার্তা বলা যায়।

কফি খাওয়া শেষ হতেই সে বলে—চলো, তোমাকে পৌঁছে দিচ্ছি একটি আসিয়ানদায়। আসিয়ানদা হচ্ছে একদম পাড়াগাঁয়ের ভেতর ছোট্ট গেস্ট-হাউস। চালাচ্ছে একটি পরিবার। দামে সস্তা। খুব নিরিবিলি। পছন্দ হবে তোমার। সে আমার ব্যাগ ও রুকস্যাখ তার ঘোড়ার জিনগদির ওপর বেঁধে দিয়ে লাগাম হাতে তুলে নেয়। কথাবার্তা বলতে বলতে হাঁটতে হাঁটতে আমরা চলে আসি অসিয়ানদাতে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Sep/02/1535885286565.jpg
আসিয়ানদার কটেজে ঝুলছে হ্যমোক

ঝোপঝাড়ে নিবিড় আসিয়ানদার প্রাঙ্গণে নদীর দিক থেকে বইছে মৃদুমন্দ সুবাতাস। মাটিতে লেপাপুছা দেয়ালের একটি কটেজ ভাড়া করি। দুটি কামরার বড়টিতে গাবরিয়েলা ও তার মেয়ে মারিয়া আমার অন্য বান্ধবী ইভার সঙ্গে থাকতে পারবে। পাশের কামরাটি ছোট হলেও তাতে আমার চলে যাবে। বারান্দায় জোড়া হ্যামোক বা দড়ির দোলনা ঝোলানো। বারোয়ারি আঙিনার চারপাশে অন্য কটেজগুলো গাছপালায় জড়ানো ঘন লতার ঘেরাটোপে আলাদা করা।

আঙিনায় জলপাই রঙের কমব্যাট কেতার জ্যাকেট পরে ক্রুকাট চুলের এক লোক বেজায় ভারী একটি ক্যামেরা নিয়ে কী যেন ধুন্দুর-মুন্দুর করেন। তাঁর জ্যাকেটের একটি হাতার ভেতরে বাহু বলে কিছু নেই। কানের সংখ্যাও এক। অন্যটির দগদগে ক্ষতময় ছিদ্রের ওপর লাগানো ব্যাঙের ছাতার মতো দেখতে একটি ইয়ারপিস। তিনি মাটিতে আয়না পেতে তাতে মস বা শুকনো শেওলার টুকরা রেখে চিমটা দিয়ে তাজাতনা লাল পিঁপড়া ধরে ছেড়ে দেন তার ওপর। পিঁপড়াটি মসের স্তূপ বেয়ে নেমে আসতে গেলে আয়নাতে তার পরিষ্কার প্রতিফলন হয়। তিনি ভারী ক্যামেরার স্ট্র্যাপ দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে এক হাতে লেন্স পাল্টে তার ছবি তোলেন। আমি চিয়ার্স বলে তাঁর কামেরাম্যানশিপের তারিফ করলে তিনি চোখমুখ কুঁচকে কুৎসিতভাবে আমাকে স্বমেহন করার পরামর্শ দেন। আচরণটি শুধু অস্বাভাবিকই না অশোভনও বটে। কিন্তু কেন জানি দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে ইচ্ছা হয় না। বিমর্ষ হয়ে আমার কটেজের দিকে ফিরে লতানো পত্রপল্লবে তৈরি কুঞ্জের আড়ালে বেতের চেয়ার টেনে বসলে সারা বাতাবরণ ভরে ওঠে অদেখা কোনো পতঙ্গের শার্প গুঞ্জনে।

আমার চেয়ারের সামনে সিমেন্টে বাঁধানো একটি স্মুদ পরিসর। কয়েকদিন আগে আমার বান্ধবী ইভা আমাকে উপহার দিয়েছে শিশুতোষ একটা লাটিম। তো পকেট থেকে বের করে ওখানে তা ঘোরাই। লাটিমটি একটি নির্দ্দিষ্ট বিন্দু থেকে ঘুরে ঘুরে তৈরি করছে বৃত্তের বাইরে একাধিক বৃহৎ বৃত্ত। তাদের ক্রমশ সম্প্রসারিত রেখার দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, যে মুহূর্তে প্রথম ইভার সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হয়, তার পর কিভাবে যেন তার যাপিত জীবনের বেশ কিছু অধ্যায় ঘুরে আবার তার উদ্যোগে গাবরিয়েলার সঙ্গে পরিচয়। তার সঙ্গে আমার মিথষ্ক্রিয়া লাটিমের চক্রের মতো বাঁক নিচ্ছে। জলপাই রঙের কমব্যাট জ্যাকেট পরা মানুষটি ক্যামেরা হাতে এসে দাঁড়িয়ে অবলোকন করেন লাটিমের ঘূর্ণমান রেখা। মে আই টেক আ পিকচার?—বলে মোলায়েম করে হেসে পোলাইটভাবে আমার পারমিশন চান। কী বলব, মাথা হেলিয়ে সায় দিতেই তিনি মাইক্রোলেন্সে তুলতে শুরু করেন তার ছবি। চেয়ার টেনে কাছে বসে আইপ্যাডের স্ক্রিনে লাটিমের ব্লারি রেখার ছবি দেখাতে দেখাতে তিনি এমন খোলামেলাভাবে নিজের কথা বলতে শুরু করেন যে আমি খানিকটা অপ্রস্তুত বোধ করি। তাঁর নাম এরোন হুরুম। মার্কিন সেনাবাহিনীতে কিছুদিন আগে তাঁর পদবি ছিল ক্যাপ্টেন। যদিও ব্যাটেলফিল্ডে খুইয়েছেন একখানা হাত ও বাঁ কান, তিনি আর্মি কমান্ডের তেমন কিছু জানেন না। কমব্যাট ফটোগ্রাফার হিসেবে তিনি চলমান যুদ্ধের ছবি তুলতেন। আহত হওয়ার পর মিলিটারি তাঁকে জবাব দিয়েছে। পোস্ট ট্রামাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের স্নায়বিক বিপত্তিতে ভুগছেন। মানসিক ভারসাম্য ফিরে পেতে তাঁর সময় লাগছে। এবং সবচেয়ে কঠিন হচ্ছে—গেস হোয়াট? বলে আমার অনুমান কী তা জানার জন্য মুখ তুলে তাকালে কোন বিষয়টি তাঁর জীবনে কঠিন মনে হচ্ছে, এ নিয়ে অনুমানপ্রসূত কোনো মন্তব্য করতে চাই না। এবং একটু আগে তিনি যে মিলিটারি মেজাজের পরিচয় দিয়েছেন, তাই কিছু আন্দাজ করাও নিরাপদ মনে হয় না। সুতরাং নীরব থাকি। তিনি একটু অপেক্ষা করে গলার স্বর নামিয়ে ফিসফিসিয়ে বলেন—এই যে একা, সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গভাবে চলাফেরা করা, দিস ইজ ভেরি ডিফিকাল্ট, বলে রোদেলা দিনে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মতো কেঁদে ওঠেন।

এ রকমের শক্তসমর্থ যুদ্ধংদেহী লোককে কিভাবে সান্ত্বনা দিতে হয়, তার কলাকৌশল আমার জানা নেই, আবার কিছু বললে যদি হিতে বিপরীত হয়, তাই খামোশ মেরে থাকি। তিনি নিজেই চোখটোখ মুছে মোলায়েম হেসে বলেন—লাইফ ইজ নট অলওয়েজ ব্যাড অ্যাট অল। মিলিটারি থেকে খালাস পাওয়ার পর হাতে এসেছে অঢেল অবসর ও বেশ কিছু বিত্ত। ঘুরে বেড়াচ্ছি এক দেশ থেকে আরেক দেশে, ক্যামেরা দিয়ে শ্যুট করছি। তো ঘুরে বেড়ানো আপনি এনজয় করছেন ক্যাপ্টেন?—বলে আমি তাকালে তিনি রিলাক্স-ভাবে জবাব দেন—আ ফিউ মোমেন্টস। কোনো কোনো জায়গায় কিছু কিছু মুহূর্ত ভালোই লাগছে। ফর এক্সাম্পল, কিছুদিন আগে পেরুতে গেলাম। লিমার এক উষ্ণ জলের স্পাতে সারা শরীর হাত-পা ঘষে-মেজে দিলো ঝামা পাথর দিয়ে। তারপর ফার্মের লামা, তাদের তুলতুলে লোমে হাত বোলানো, বাচ্চা বাচ্চা লামারা খড়বিচালিতে হামা দিচ্ছে, এ সবের ছবি তোলা। ইনডিড হ্যাড আ ফাইন টাইম ইন পেরু।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Sep/02/1535885165878.jpg
ফুটপাতে ছুটছে চশমা চোখে তরুণী

তমালে তৈরি হয়ে গেছে। কলাপাতায় মোড়া তপ্ত পিঠা হাতে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসি শহরের মূল সরণিতে। গতকাল বিকেলে আসিয়ানদা থেকে বেরিয়ে এসে এখানে ঘোরাঘুরি করছি। দেখি ক্যাফেতিন কুয়া নামের রোস্তোরাঁয় রোয়াকে পাতা টেবিলে বসে ক্যামেরা হাতে ক্যাপ্টেন এরোন। আমাকে দেখতে পেয়ে তিনি ডেকে তাঁর টেবিলে বসতে বলেন। ক্যাফেতিন কুয়োর ওপরের তলায় সরগরম পাব। রোয়াকের আঙিনায় ফুলগাছের ঝোপেঝাড়ে বেশ নিরিবিলি। উড়ছে জোড়া ডানার লাল ফড়িং। তাকে ধাওয়া করে উড়ে আসে ছোট্ট এক নীল পাখি। তারা চক্রাকারে ঘুরপাক খেলে ক্যাপ্টেন ক্যামেরায় তাক করেন। ঠিক তখনই দেখি প্রায় নির্জন সড়ক ধরে ছুটে আসছে চশমা চোখের এক তরুণী। তার চোখেমুখে স্পষ্ট ভীতি। বিষয় কী দেখতে আমি উঠে দাঁড়িয়েছি। মেয়েটি রেস্তোরাঁর সামনে দাঁড়িয়ে একটু থতমত করে, তারপর জোরে জোরে শ্বাসপ্রশ্বাস ফেলে ঢুকে পড়ে ভেতরের কেবিনে। ততক্ষণে ক্যাফেতিনের সামনের ফুটপাতে এসে দাঁড়িয়েছে তাকে ধাওয়া করে নিয়ে আসা ছেলে দুটি। তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে কথা বলছে। সম্ভবত রেস্তোরাঁর ভেতরে ঢুকবে কি না, তা নিয়ে ইতস্তত করছে। ক্যাপ্টেন ভারী ক্যামেরাটি টেবিলে রেখে ব্যাকপ্যাক থেকে নোঙরের মতো একটি আংটায় প্যাঁচানো দড়ি নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে যান দোতলায়। মিনিট দু-তিনেকের মধ্যে বিষয়টি বিদ্যুদ্বেগে ঘটে যায়। পাবের বারান্দার পিলার বা রেলিংয়ে তিনি নোঙরের মতো আংটা আটকে এক হাতে দড়িতে ঝুলে ফ্লায়িং কেতায় লম্ফ দিয়ে ছেলে দুটির গর্দানে এ্যায়সা পদাঘাত করেন যে, তারা কুকাৎ-জাতীয় আওয়াজ করে ফুটপাতে ছিটকে পড়ে। সিমেন্টে হুমড়ি খেয়ে পড়ে একজনের দাঁতফাতও বোধ করি ভেঙেছে। কাপড়চোপড় থেকে ধুলো ঝেড়ে তারা নজর করে ক্যাপ্টেনকে দেখে। কমব্যাট জ্যাকেট পরা মিলিটারির এই সাবেক সাঙ্গাৎকে চিনতে তাদের কোনো অসুবিধা হয় না। কোনো চোটপাট না করেই তারা উল্টাপথে হাঁটা দেয়।

শর্ট গ্লাসে সোডা ছাড়া ব্র্যান্ডির অর্ডার করে ক্যাপ্টেন খুব সংবেদনশীল স্বরে মেয়েটিকে ডেকে এনে টেবিলে বসান। জোরে শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে নিতে সে চশমা খুলে তাকালেই তার দৃষ্টিতে ঝাপসা অস্থিরতা থেকে বুঝতে পারি, তার মধ্যে ঘটছে অস্বাভাবিক কিছু। শর্টগ্লাস থেকে খুব ধীরে সে চুমুক দিয়ে ব্র্যান্ডি পান করছে। ক্যাপ্টেনকে দেখে মনে হয় খানিক দ্বিধায় পড়েছেন, ঠিক বুঝতে পারছেন না কী করবেন? আমি তরুণীর দিকে আই কন্টাক্ট করে জানতে চাই, কী সমাচার, কোথা থেকে এসেছো তুমি, কী ঘটেছে? কথা বলতে গিয়ে তার গলার স্বর তীব্রভাবে কাঁপে। হিস্পানিক আমেরিকান সে, তার ইংরেজিতে এসপানিওল উচ্চারণের প্রভাব আছে প্রচুর। আমেরিকার অখ্যাত শহরের এক স্কুলে সে সায়েন্স টিচার। পর্যটক হিসেবে সমোটো ক্যানিয়ন দেখতে গিয়েছিল। মাঝনদীতে নৌকা চালাতে চালাতে গাইড তাকে কোকেন অফার করলে স্রেফ কৌতূহলবশত সে তা স্মোক করে। দ্বীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মেয়েটি বলে, গাইডের কাছ থেকে কোকেন নেওয়াটাই তার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। ঠিক মনে করতে পারছে না কখন পাথর বেয়ে গাইডের সঙ্গে চলে গেছে গুহার অন্ধকারে। কেইভে কোনো পর্যটক নেই দেখে তার খুব অবাক লাগে। আবছা মনে পড়ে, গাইড তার শরীর স্পর্শ করেছে কিন্তু কোনো ভায়োলেন্স ব্যবহার করেনি। নৌকা বেয়ে ফিরিয়ে এনে তাকে নামিয়েও দিয়েছে পাড়ে। তার শরীরে এখনো ক্রিয়া করছে কোকেনের গাঢ় কুয়াশা। এটা কাটানোর জন্য আমি কাউন্টার থেকে ফ্রেশ অরেঞ্জ জুস নিয়ে এসে তাকে পান করতে বলি। জুস খেতে খেতে সে বলে, শহরে ঢোকার মুখে এ ছেলে দুটি তার পেছনে লেগেছে। ফিসফিস করে বলছিল—হানি, আমাদের কাছে আছে আরো ভালো কোয়ালিটির কোকেন। নিয়ে যাব সবচেয়ে সুন্দর গুহায়। চলো, আমাদের সঙ্গে, খুব সফিসটিকেটেড ইক্যুইপমেন্ট আছে, কোনো কষ্ট হবে না, তোমার শরীরে এঁকে দেব চমৎকার উল্কি। মেয়েটি অরেঞ্জ জুসের পুরা গ্লাস খালি করে ওয়াশ-রুমে যায়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Sep/02/1535885355537.jpg
দূরে ক্যানিয়নের পাথর কাটা নদী

ক্যাপ্টেন আমার দিকে কিছুক্ষণ খুব খেয়াল করে তাকিয়ে তাঁর নোঙরের মতো বস্তু ফ্লোর থেকে তুলে তাতে দড়ি প্যাঁচান। তা দিয়ে টেবিলের পায়ায় মৃদু ঠুকে বিদ্রূপ করে বলেন—সো, ইউ নো হাউ টু মেইক আ প্যারোট টক, টিয়া পাখির মুখে কিভাবে বুলি ফোটাতে হয়, তা তোমার জানা আছে দেখছি। জবাবে বলতে চাই, কোকেনের ঘোরে মেয়েটির মস্তিষ্ক এখনো কুয়াশাচ্ছন্ন। কতটা বলছে আর আদতে কী ঘটেছে, তার পরিষ্কার পিকচার পাওয়ার জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। আমাকে বক্তব্যের মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে টেবিলের ওপর নোঙরের মতো জিনিস রেখে ক্যাপ্টেন বলেন—ইউ আর আ কাওয়ার্ড, অ্যাডমিট ইট স্ট্রেইট। আমি এবার তাঁর চোখে চোখ রাখলে তাঁর এক্সপ্রেশনে পরিষ্কার বুঝতে পারি তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন, চরের দখল নিয়েছি আমি, ওখানে ফসল বোনার অধিকার আমার। তিনি নোঙর ঠুকে বিষয়টিতে জোর দিয়ে বলেন—অ্যাডমিট ইট, ইউ আর আ কাওয়ার্ড। আমি দ্রুত হিসাব করি, তিনি ফ্লাইং কিক কষিয়ে একটু আগে যে বিক্রমের পরিচয় দিয়েছেন, তা হিন্দি সিনেমাতে সুলভ হলেও পর্যটনে এ ধরনের তাকদ প্রদর্শন বিরল। আমি খানিকটা কাপুরুষও বটে, আর কোথাও গল্পের সন্ধান পেলে হুঁশও ঠিক থাকে না। তদুপরি আমি কুংফুতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত নই, সুতরাং, এক-হাতা সৈনিকের সঙ্গে হাতাহাতিতেও সফল হাওয়ার সম্ভাবনা জিরো। তাই তাঁকে গুডবাই বলে উঠে পড়ি। তিনি কুৎসিতভাবে পেছন থেকে বলেন—গো অ্যান্ড মাস্টারবেট ইয়োরসেল্ফ, স্বমেহন করগে, যাও।

আজ ভোরবেলা আসিয়ানদা থেকে বেরোবার পথে দেখি, যে কটেজে ক্যাপ্টেন এরোন আছেন, তার বারান্দায় হ্যামোকে শুয়ে ঝিমাচ্ছে কোকেন নেওয়া শিক্ষয়িত্রী তরুণীটি। হয়তো সে তার নিজের হোটেলে একা ফিরে যেতে ভয় পাচ্ছিল। ক্যাপ্টেন তাকে আসিয়ানদায় নিয়ে এসে শেল্টার দিয়েছেন। পুরা ব্যাপারটা আমার কাছে পরিষ্কার হয় না। ক্যাপ্টেনের সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে চাই না, আর যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেড়াতে আসা মাস্টারনি গোছের হিস্পানিক মেয়েটির আসলে কী হয়েছে, সবকিছু জেনে আমার হবেই বা কি? এ মুহূর্তে আমার অতিথিদের দিকে মনোযোগ দেওয়া দরকার। ইভা গাবরিয়েলাকে নিয়ে সমোটোতে আসছে, সঙ্গে আছে গাবরিয়েলার বছর চারেকের মেয়ে মারিয়া। তাদের জন্য সমস্ত কিছুর অ্যারেঞ্জমেন্ট খতিয়ে দেখতে হয়। এসব ভাবতে ভাবতে আমি ক্যাফেতিন কুয়ো রেস্তোরাঁর দিকে হাঁটি।

আপনার মতামত লিখুন :

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস ও কল্পনা

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস ও কল্পনা
বাংলায় ঐতিহাসিক নাটকের আদিগুরু অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়

দক্ষিণ এশিয়ার বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস রচনা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক আছে। নৈর্ব্যক্তিক ইতিহাস কতটুকু রচিত হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপিত হয় মাঝেমধ্যে। কবির কল্পনা না প্রকৃত ইতিহাস সত্য, এই দ্বন্দ্বের মীমাংসা হয় না।

কারণ, এ অঞ্চলের মানুষ ইতিহাস জেনেছে গল্প, উপন্যাস, নাটকে। শাহজাহান, সিরাজদ্দৌলা, মীর কাসিম সম্পর্কে তথ্যনিষ্ঠ ইতিহাস মানুষ যত কম জানে, তারচেয়ে ঢের বেশি জানে নাটকের আবেগাপ্লুত সংলাপ। ঐতিহাসিক সত্য চাপা পড়ে সাহিত্যিক কৃতকৌশল ও কল্পনার স্তূপের তলে।

ফলে সৃজনে অগ্রাধিকার কার? কবি যা রচিবে তাই কি সত্য? নাকি স্রষ্টাকে ইতিহাসের সত্যের কাছে নতজানু হতেই হবে? এসব প্রশ্ন বারবার গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ইতিহাস প্রসঙ্গে।

দক্ষিণ এশিয়া তো বটেই, ঔপনিবেশিক বাংলায় পণ্ডিত সমাজের চিন্তা-চেতনার আবহে এসব প্রশ্ন খুব বড় হয়ে উঠেছিল। বিশেষত অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় রচিত নাটকগুলোকে কেন্দ্র করে বিতণ্ডার সূত্রপাত ঘটেছিল।

অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ছিলেন ঐতিহাসিক নাটকের আদিগুরু। তিনি নিজেকে মনে করতেন, ইতিহাসের সত্য-প্রতিষ্ঠার একনিষ্ঠ সাধক। এ বক্তব্যের দৃষ্টান্তও তিনি রেখেছেন। সিরাজদ্দৌলা (১৩০৪ বঙ্গাব্দ) ও মীর কাসিম (১৩১২ ব.) বই দুটিতে তিনি তথ্যের ভিত্তিতে এই দুই নবাব সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা ভেঙে দিতে সচেষ্ট হন।

ইংরেজগণ এই দুই দেশপ্রেমিক নায়কের প্রতি যে মিথ্যাচার ও কলঙ্কলেপন করেছিলেন, অক্ষয়কুমার সেগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে গবেষকের নিবিষ্টতায় প্রকৃত সত্য উপস্থাপন করেন। তবে তিনি ইতিহাস রচনা করেননি, নাটক লিখেছিলেন। এবং সাহিত্যে ঐতিহাসিক সত্যের সন্নিকটে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। এমনকি, সমকালীন সাহিত্যিকদেরকেও সত্যানুসন্ধানী হতে প্রণোদিত করেছিলেন।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ‘চন্দ্রশেখর’ উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র, মীর কাসিম ও তকি খাঁর চরিত্রচিত্রণে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়েছেন বলে তীব্র ভাষায় অভিযোগ করতেও দ্বিধা করেননি অক্ষয়কুমার। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় যে বিতণ্ডা শুরু হয়, তাতে রবীন্দ্রনাথ অক্ষয়কুমারের সমর্থনে কলম ধরেন।

তবে কৌশলী রবীন্দ্রনাথ এ কথাও বলেন যে, “ইতিহাসের রসটুকুর প্রতিই ঔপন্যাসিকের লোভ, তার সত্যের প্রতি তাঁর কোনো খাতির নেই।”

রবীন্দ্রনাথের এ কথায় ঔপন্যাসিক কল্পনার অধিকার পেলেও ‘ইতিহাসের মূল রসটুকু’ বা নির্যাস এড়িয়ে যাওয়ার এখতিয়ার পান না। এটাই মোটামুটি মানদণ্ড হয়ে গেছে। অর্থাৎ, ইতিহাসের নির্যাসটুকু নিয়ে কল্পনার আশ্রয় নিয়ে সাহিত্য রচনা করা যেতে পারে। তবে সেটা সাহিত্য নামেই চিহ্নিত ও ব্যক্ত হতে হবে, ইতিহাস নামে নয়।

অক্ষয়কুমারের যুগ পেরিয়ে শতবর্ষ অতিক্রান্ত হলেও ইতিহাস ও সাহিত্যের মিশ্রণ থেমে থাকেনি। বরং আরো বেড়েছে। অতি সাম্প্রতিক লেখকদের কথা উহ্য রেখে একটু পুরনো হিসেবে দৃষ্টান্ত দেওয়া যায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের। তার ‘সেই সময়’, ‘পূর্ব পশ্চিম’, ‘প্রথম আলো’ ইত্যাদি উপন্যাস মানুষকে আলোড়িত করেছে। বই আকারে বের হওয়ার আগে ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশের সময় লেখাগুলোর তথ্য ও সত্যাসত্য নিয়ে এন্তার চিঠি ও ভিন্নমত ছাপা হয়েছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/18/1563451116521.jpg

একজন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আমরা এত পরিশ্রম করে, কত তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে ইতিহাস রচনা করি। কিন্তু মানুষ সেগুলো খুব একটা পড়ে না। ইতিহাসের বই জনপ্রিয় হয় না। আর আপনি ইতিহাসকে উপন্যাসের মধ্যে নিয়ে এত জনপ্রিয় হলেন কেমন করে?’

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় খুব সুন্দর উত্তর দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘মানুষ ইতিহাসের মূল গল্পটি শুনতে চায়। আমি আমার মতো করে গল্পটি বলি।’

মানুষ যত দিন ইতিহাসের মধ্যে শুধু গল্পটি শুনতে চাইবে, ততদিন ইতিহাসের নির্জলা সত্যটি তার কাছে আসতে পারবে না। ইতিহাস আর কল্পনার মাখামাখি চলতেই থাকবে। এটাই সম্ভবত দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ঐতিহাসিক অদৃষ্ট বা হিস্টরিকাল ফেট!

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

আরো হাঁস

এইরূপ কান্দে কন্যা নিরালা বসিয়া
হাঁসের লাগিয়া কন্যা ধুড়িল শহর

কান আশে হইছে বিয়া স্বপ্নের ভিতর
ঘটকালি করে আপন মামতো ভাই

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর
কারা পানখিলি খাইয়া গপ মারে তাই

সজিনার তলে বসি কান্দিল তামাম
এর কিবা মানে শুন কান খাড়া করি
চিক চিক করে মনে এ বিয়ার জরি।

হেমন্তের হাঁস

আমার হয়নি ধোয়া ওগো শিশিরের তলে
আমার হয়নি নাচা মিশি যাওয়া ঊর্মিদলে।

আমার মিটিনি নেশা অলিকোলে শোয়া বাকি
আমায় ঢালিনি মৌন নূর বধির জোনাকি!

আমারে চিনিয়া চিনে নাই হেমন্তের হাঁস
আমার পানের পাত্রে বাদ গেছে শ্যামা ঘাস।

আমার ইউসুফ শোনে নাই ভাইদের শোকর
বকুল তলায় আসি হাঁপায় প্রকৃত ভোর।

হাঁসের জলেরা

হাঁসের পায়ের জল
শুকায়, তাই তারা ফের জলে নামে।
একটা কথা আমি ভুলি যাই
হাঁসের কোনো ইচ্ছা নাই।
হাঁসের জলে আমি ভাসি
হাঁসের পায়ের জলে
আমি মুখ ধুইছি,
আমার নিজের মুখ কেন মোর যেনতেন মোকাম ন রে!
আমার চোখে এই ফেরেবি জল ধরা দেয়
যেন বখিল আমি তার কিছু নির্ভরতাময় তর্জমা করি!
দাদি যেই ছাড়ে হাঁস
তারা আমার মরা দাদির জইফ হাঁস!
স্বপ্ন তারা আমার নিকট
তাদের নিকট
আমি তেমন বাস্তব ন রে!

এই বাড়িতে

দেয়ালের পর কাঠবিড়ালির দৌড় দেখি
যেন রইদ নাকফুল হয়,
তারপর সারা সকালটা গড়ায় দেয়াল ধরি,
একটা দোয়েল ডিম জারি হইলে
অনেক দোয়েল চিল্লায়ে ধরে বা গান,
একদিন আসে আসে করি শেষে আসে,
তারার মতন গোল চোখ ঘুঘু তার
চোখের বর্ডার আলতার রঙ পাছে
পায়ের রঙের সাথে মিশিবার চায়,
এ বাড়িতে আসি যেই হাঁসগুলি দুলি দুলি ও বাড়ি ত যায়,
ওদের ঘ্রাণের ভিতর ঘুরি ঘুরি থামি,
বাতাস হবেনে আসল শরিক
আডিয়াকলার ঝাড়ের নিকটে আসি,
আমি শুনি জলের মর্মর কলপাড়ে তড়পায়,
তারে ঢাকিবার আরো মিহি ধ্বনি আছে
এ বাড়ির অনেক অ-বাক কণ্ঠস্বর আছে!


প্রত্যাবর্তনের লজ্জা
(কবি আল মাহমুদকে)

ভাইয়ের ডাক শুনি উঠি রাতদুপারে স্বপ্নের ভিতর। যেন
বাতাসের ডাক শুনি ঢেউ উঠে তৎপর।
দেখি আব্বা আগেই উঠছেন, নিজ হাতে আতাফল, গাছপাকা তরমুজ
পরম আদরে ছেনি দিই কাটি কাটি ফালি ফালি করি খাওয়াইতেছেন,
খা, আহারে কতদিন খাস নাই!
আম্মা তজবিহ হাতে এক হাতে ভাইরে বাতাস করতেছে, আয়েশা ফুল তোলা
একটা রুমাল দিই কইলো, এইটা দিয়া মুখ মুইছো, মাথা মুইছো, চোখের কান্দন মুইছো না গো ভাই!
অথচ ভাই মারা গেছে তার চল্লিশাও পার হয় নাই। উনি কবরতে উঠি আসছেন, উনার চোখ দুইটা
তারার নিভু নিভু, এট্টু সর্দি লাগছে ক্যাল, ভাই হাঁকি কইলো, বকনা বাছুরটারে খ্যাতের আইলে
বান্ধিলি অইডা তো দড়ি ছিড়ি সব পাকাধান সাবাড় করবেনে!
আম্মা কান্দে আর ইশারা করে, ঠোঁট টিপে আঙুলে, কন, একদম চুপ!
ভাই যে মারা গেল শুক্রবার, ভাই নিজেই জানে না!
তাই আমাদের সংসারে কাঁঠাল পাতার নারকেল ছায়ার লোভে
পড়ি ঝোঁকে ঝোঁকে আইস্যে আগের মতো ধমক দিতেছে আমাদের সংসারে
জায়গা মতো, আব্বা কইলেন, খবরদার তোরা চুপ থাক,
ও যেন না জানে পাছে, ও মরি গেছে, পাছে বেচারা কষ্ট পাবে!

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র