Alexa

‘সেই তো নথ খসালি, তবে কেন লোক হাসালি’

‘সেই তো নথ খসালি, তবে কেন লোক হাসালি’

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ছবি: বার্তা২৪

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই ফল প্রত্যাখ্যান করে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে বিএনপি তথা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। সংসদে না যাওয়ার কথাও বারবার বলে আসছিলেন জোটের নেতারা। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সোমবার (২৯ এপ্রিল) বিএনপির চার নেতা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন।

এর মধ্য দিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া জোটের সাতজন সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন এবং যথারীতি সংসদ অধিবেশনে যোগও দিয়েছেন। এমনকি সংসদে বক্তব্যও দিয়েছেন।

গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, একাদশ সংসদ নির্বাচন কলঙ্কিত, সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। নির্বাচন বাতিল করে অবিলম্বে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি জানায় দলটি। দাবি আদায় না হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানায় তারা।

শুধু তাই নয়, পুনরায় নির্বাচন না দিলে বিএনপি আন্দোলনে যাবে বলেও হুমকি দেন বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। তবে গত চার মাসে দলটির সেই হুমকি শুধু প্রতিধ্বনি হয়েই ফিরে গেছে। কার্যত মাঠে কোনো আন্দোলনের লেশমাত্রও ছিল না। বেশিরভাগই ছিল শুধু খালেদা জিয়া ও কারাবন্দী নেতাদের মুক্তি এবং তারেক রহমান বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি, প্রতীকী অনশন ইত্যাদি।

নির্বাচনের পরই, বিএনপির নির্বাচিতরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন কি-না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, 'আমরা তো নির্বাচনের ফলাফলই প্রত্যাখ্যান করেছি। নতুন নির্বাচনের দাবি করেছি। ফলে সংসদে যোগ দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।'

জাতীয় নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ করে 'ভোট ডাকাতি' ও 'কারচুপি'র অভিযোগ তুলে হাইকোর্টের নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন বিএনপির শতাধিক প্রার্থী, যা এখনো চলমান। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী গত ২২ ফেব্রুয়ারি দিনভর গণশুনানি করে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, যার রায়ও এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি।

গণফোরাম থেকে নির্বাচিত সুলতান মোহাম্মদ মনসুর গত ৭ মার্চ সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। এর প্রতিক্রিয়ায় মির্জা ফখরুল বলেছিলেন, 'সুলতান মোহাম্মদ মনসুর নিজেকে জনগণের সামনে অত্যন্ত ছোট করে ফেলেছেন, ক্ষুদ্র করে ফেলেছেন। জনগণের প্রতিনিধি ছাড়া একটি পার্লামেন্টে গিয়ে তিনি জাতির সঙ্গে প্রতারণা ও খারাপ একটি কাজ করেছেন। গর্হিত কাজ করেছেন। এজন্য তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’

দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে গত ২৫ এপ্রিল ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপি নেতা জাহিদুর রহমান সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। এরপরই তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে হাইকমান্ড।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Apr/30/1556635963545.jpg

তার শপথের পরপরই বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক মানববন্ধনে বলেন, 'দেশনেত্রীকে (খালেদা জিয়া) জেলে রেখে কেউ যদি সংসদ সদস্য হিসবে শপথ নেয় তাহলে তারা জাতীয়তাবাদী শক্তির পক্ষে থাকতে পারে না, তারা গণদুশমন। আমাদের দলের সিদ্ধান্ত আমরা পার্লামেন্টে যাব না, দলের সিদ্ধান্ত যে অমান্য করবে সে আমাদের দলের লোক হবেন না। এরপরও শপথ নিলে জনগণের থুতুতে তারা ভেসে যাবেন।’

২৭ এপ্রিল এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বিএনপি একটা বড় বটগাছ, এখান থেকে দুএকটা পাতা ঝরে গেলে কিছু আসে যায় না। আমাদের সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ কোনো পদক্ষেপ নিলে গঠনতন্ত্র মোতাবেক ব্যবস্থা নেবে দল। তাতে দলের কোনো ক্ষতি হবে না।'

নির্বাচন প্রত্যাখ্যান, 'ভোট ডাকাতি' ও 'কারচুপির' অভিযোগে গণশুনানি, কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করে নালিশ জানানো, আন্দোলনের হুমকি দিয়ে মাঠে না নামা, দলের নেতাকে বহিষ্কার, রাজনৈতিক বক্তব্যের ফুলঝুরি সব কিছুকে ঢাকনাবন্দী করে শপথ নিল বিএনপি। দলের পক্ষ থেকে মির্জা ফখরুল জানালেন দলের হাইকমান্ড ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তেই সংসদে যাওয়া। তবে মির্জা ফখরুল নিজে শপথ নেবেন কি-না বা নিতে পারবেন কি-না, তা এখনো নিশ্চিত না।

গ্রাম্য শ্লোকের মতো এখন মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, 'সেই তো নথ খসালি, তবে কেন লোক হাসালি'। অর্থাৎ বিএনপির দাবি করা সেই 'কলঙ্কিত-অগ্রহণযোগ্য' নির্বাচনে নিজেদের বিজয়ী ভেবে শেষ পর্যন্ত সংসদে গেল। 'বর্তমান সংসদের কেউ নির্বাচিত নয়', 'আওয়ামী লীগ ভোট ডাকাতি করে ক্ষমতায় এসেছে', 'প্রধানমন্ত্রী অবৈধ' এসব কথার কি কোনো ভিত্তি থাকবে? যদি নাই থাকে তাহলে এতো কিছু করার কী দরকার ছিল? পর্দার আড়ালে যদি কোনো সমঝোতা হয়েই থাকে তাহলে সেটা অনেক আগেই কি করা সম্ভব ছিল না? ৯০ কর্মদিবসের শেষ দিন এসেই বা কেন আগের সিদ্ধান্ত থেকে সম্পূর্ণ 'ইউ টার্ন' নিয়ে সংসদে যোগ দিতে হলো। সাধারণ মানুষ ভাবতেই পারে যে, এর মাধ্যমে বিএনপি বর্তমান সংসদ ও সরকারকে বৈধতা দিয়ে দিল।

তবে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির বিনিময়েই বিএনপির সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেছেন। খুব দ্রুতই খালেদা জিয়া কারাগার থেকে মুক্তি পাবেন, জামিনে সরকারের আইনজীবীরা বাধা দেবেন না। হতাশাগ্রস্ত নেতাকর্মীরা কিছুটা হলেও উজ্জীবিত হবেন সেই প্রত্যাশা নিয়েই তারেক রহমান এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

আরও পড়ুন: কার নির্দেশে শপথ নিলেন না ফখরুল?

আপনার মতামত লিখুন :