Alexa

অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আ’লীগের কড়া নির্দেশনা

অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আ’লীগের কড়া নির্দেশনা

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা: প্রায় এক দশক ধরে দেশের শাসন ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। রাজনীতিতেও এককভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত। একটানা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় দুধের মাছির মতো দলটিতে ভিড়েছেন অনেকেই। এমনকি যারা এক সময় অন্য আদর্শের রাজনীতি করতেন, তারাও আজ আওয়ামী লীগ করতে চান। দলের নেতাকর্মীরা যাকে বলছেন ‘অনুপ্রবেশ’। এই অনুপ্রবেশ নিয়ে শঙ্কিত সরকারি দল, বিশেষ করে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।

এ অবস্থায়, আগামীতে কেন্দ্রের অনুমোদন ছাড়া অন্য দল থেকে কাউকে দলে ভেড়ানো হবে না বলে তৃণমূলে চিঠি দিয়েছে দলের হাইকমান্ড। একইসাথে জানানো হয়েছে, অনুপ্রবেশকারী এবং যারা অনুপ্রবশের সুযোগ করে দিয়েছেন, তাদের চিহ্নিত করা হবে। এছাড়া, সদস্য নবায়ন ও নতুন সদস্য সংগ্রহ অভিযানে যেন বিতর্কিত কেউ দলে ঢুকতে না পারে, সে ব্যাপারেও তৃণমূলের নেতৃত্বকে সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ।

দলীয় নেতাকর্মীদের হাতে পরিচয়পত্র তুলে দেওয়ারও চিন্তাভাবনা করছেন ক্ষমতাসীন দলের নীতি নির্ধারকরা।

সম্প্রতি বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছে বিএনপি-জামায়াতের অনেক নেতাকর্মী। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা, মামলা-হামলার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া, ব্যবসা বাণিজ্যর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ নানা কারণে সরকারি দলে যোগ দিচ্ছেন তারা। তাদের এই যোগদানকে প্রথমে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও এবার বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়েছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ। বিএনপি-জামায়াতের হাজার হাজার নেতাকর্মীদের আওয়মাী লীগে যোগ দেওয়াকে গভীর ষড়যন্ত্র হিসাবে দেখছে দলটি।

এসব অনুপ্রবেশ নিয়ে ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগের তৃণূমূলের নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগের ইমেজ ক্ষুন্ন করছেন অনুপ্রবেশকারীরাই। এদের কিছু আসে স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশে, আবার কেউ কেউ আসে নিজের দোষ ঢাকতে এবং শাস্তি থেকে বাঁচতে। দলীয় কোন্দলের মূল কারণও এসব অনুপ্রবেশকারী। ত্যাগী ও দীর্ঘ সময় দলকে সেবা দেওয়া নেতাদের বঞ্চিত করে অনুপ্রবেশকারীদের দলীয় পদ দেওয়ায় অনেক স্থানেই ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

রাজধানীর ওয়ারী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি লাভলু মিয়া বার্তা২৪.কমকে বলেন, আওয়ামী লীগ ঐতিহ্যবাহী ও বড় একটি দল। টানা তৃতীয়বারের মতো সততা, দক্ষতা ও নিষ্ঠার সাথে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পরিচালনা করে আসছেন দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যুদ্ধাপরাধী ও জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলায় জড়িত বড় বড় রাঘব বোয়ালদের ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে বিচারের আওতায় এনেছেন তিনি। এ কারণে অপরাধী-নাশকতা মামলার আসামিসহ অনেকেই আওয়ামী লীগে যোগ দিচ্ছে, নিজেরা বাঁচতে চাচ্ছে। অথচ আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড সতর্ক থাকলে অনুপ্রবেশকারীদের দ্রুত খুঁজে বের করা সম্ভব।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৩ সালের শেষ দিকে বিএনপি-জামায়াত থেকে ব্যাপক সংখ্যক নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দিতে শুরু করে। ২০১৭ পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। বিএনপি-জামায়াতের এসব নেতাকর্মী আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নেতাদের হাত ধরে আওয়ামী লীগে ভেড়েন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্থানীয় সাংসদদের হাত ধরে ক্ষমতাসীন দলে যোগ দেন তারা। বিষয়টি দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গোচরে এলে ২০১৫ সালের ৮ নভেম্বরে এক সাংবাদ সম্মেলনে, বিএনপি-জামায়াত থেকে কাউকে দলে নিতে নিষেধ করে দেন তিনি। তারপরও থেমে থাকেনি বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের আওয়ামী লীগে যোগদান।

গত ১০ বছরে ভোলায় ছাত্রদল-যুবদলের এক হাজারেরও বেশি নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। এছাড়া, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির শতাধিক, নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও বরগুনায় দুই শতাধিক করে, সিলেটে তিন শতাধিক, ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় দুই হাজারের বেশি, খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় দুই হাজারের অধিক, সাভারের আশুলিয়ায় ৩৪, মাদারীপুরের শিবচরে পাঁচ শতাধিক, মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার আমলসার ইউনিয়নে তিন শতাধিক, কুমিল্লা (উত্তর) জেলার দাউদকান্দি উপজেলার পৌর বিএনপি সভাপতি, মেয়র ও চার চেয়ারম্যানসহ কয়েকশ' নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন।

আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পড়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিএনপি-জামায়াতের হাজার হাজার নেতাকর্মী আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগদান করেছে। তবে এরা প্রকৃতপক্ষে সরকারের হয়ে কাজ করছে না। নিজেদের 'এজেন্ডা' বাস্তবায়ন করতে সরকারি দলে খুঁটি গাড়ছেন। সরকারবিরোধী আন্দোলনে মামলা-হামলা ও গ্রেফতার এড়াতে এসব নেতাকর্মী দল ত্যাগ করে সরকারি দলে ভিড় করছেন।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে আঁতাত করে নিজেদের পিঠ বাঁচিয়ে চলছেন সুবিধাভোগী বিএনপি-জামায়াতের এসব নেতাকর্মী। অথচ বিগত আন্দোলনগুলোর চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারী এসব নেতাকর্মীই এতদিন বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলনে বিভিন্ন নাশকতা চালিয়ে আসছিল। তার শত শত প্রমাণও রয়েছে তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছে।

সরকারি দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, যে ব্যক্তি ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত তাকে মূল্যায়ন না করে অনেক সময়েই তিন চার বছর আগে অনুপ্রবেশকারীকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এভাবে দু’একজন এমপি, মন্ত্রীও হয়ে গেছে! এ নিয়ে দলের মধ্যে বিভক্তি ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য পিযুষ কান্তি ভট্টাচার্য বার্তা২৪.কমকে বলেন, অনুপ্রবেশ ঠেকতে অবশ্যই আমাদের চিন্তাভাবনা আছে। দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। সেগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা হবে। কাউকে দলে নেওয়ার বিষয়ে তার সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজ নেওয়া এবং কেন্দ্রকে জানানোর বাধ্যবাধকতা দিয়ে তৃণমূলে চিঠি দেওয়া হবে। দলের সব পর্যায়ের নেতাদের নতুন সদস্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে যাতে কোনো অনুপ্রবেশকারী ঢুকতে না পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

দলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান বলেন, বিএনপি-জামায়াত রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগে বিএনপি-জামায়াতের অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে তৃণমূলে নির্দেশনা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :

রাজনীতি এর আরও খবর