Barta24

রোববার, ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১০ ভাদ্র ১৪২৬

English

গায়ের জোরে কাশ্মীরকে দখল করা যাবে, জয় নয়

গায়ের জোরে কাশ্মীরকে দখল করা যাবে, জয় নয়
প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
প্রভাষ আমিন


  • Font increase
  • Font Decrease

ছেলেবেলা থেকেই কাশ্মীরের প্রতি আলাদা একটা টান ছিল। বই পড়ে, সিনেমা দেখে, বন্ধু-বান্ধবদের মুখে মুখে শুনে কাশ্মীরের রূপের প্রেমে পড়ে যাই। ইচ্ছা ছিল জীবনে একবার অন্তত কাশ্মীর যাবোই। অনেকবার পরিকল্পনা করেছিও, বিভিন্ন প্যাকেজ দেখেছি; কিন্তু বাজেট মেলাতে পারিনি বলে যাওয়া হয়নি। সোমবার (৫ আগস্ট) ভারতের পার্লামেন্টে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ঘোষণার পর মনে হচ্ছে, এই জীবনে আর এই ভূ-স্বর্গে যাওয়া হলো না। নরেন্দ্র মোদি আর অমিত শাহ মিলে কাশ্মীরে জ্বলতে থাকা আগুনে যে টনকে টন ঘি ঢাললেন, তাতে সে আগুন কবে নিভবে, আদৌ নিভবে নাকি আরো ছড়িয়ে পড়বে; কে জানে।

জম্মু-কাশ্মীর ভারতের অন্য রাজ্যের মত নয়। সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫এ ধারায় জম্মু-কাশ্মীর বিশেষ মর্যাদা ভোগ করত। ৩৭০ ধারা অনুযায়ী জম্মু-কাশ্মীরের আলাদা সংবিধান, জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় পতাকা ছিল। প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ ছাড়া বাকি সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার ছিল কাশ্মীর সরকারের। এমনকি কাশ্মীর বিধানসভার অনুমোদন কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত সেখানে প্রয়োগ করা যেতো না। একসময় জম্মু-কাশ্মীরের সরকারের সরকার প্রধানকেও প্রধানমন্ত্রীই বলা হতো, পরে অবশ্য মূখ্যমন্ত্রী হয়ে গেছেন। তবে জম্মু-কাশ্মীরের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ ছিল সংবিধানের ৩৫এ ধারা। এই ধারাবলে জম্মু-কাশ্মীরে বাইরের কারো ব্যবসা করার, জমি কেনার, সম্পদ অর্জনের সুযোগ ছিল না। এমনকি কাশ্মীরের কোনো নারী বাইরের কাউকে বিয়ে করলে তিনি সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হতেন। চাকরি-বাকরিও ছিল স্থানীয়দের জন্য সংরক্ষিত। ফলে ৭২ বছর ধরে ভারতের সাথে থাকলেও একটা স্বতন্ত্র ছিল কাশ্মীরিদের। এবার বুঝি সেটাও যাচ্ছে।

অবশ্য নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ জুটির এই উদ্যোগ অভাবিত নয়। কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল ছিল বিজেপির নির্বাচনী অঙ্গীকার। আরেকটু পেছনে তাকালে দেখা যাবে, বিজেপির আদি প্রতিষ্ঠাতা বাঙালি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ১৯৫৩ সালেই ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের দাবি তুলেছিলেন। এমনকি তিনি এই দাবি নিয়ে লংমার্চে গিয়েছিলেন কাশ্মীর পর্যন্ত। সেখানে শেখ আব্দুল্লাহ সরকার তাকে গ্রেফতার করে। অভিযোগ রয়েছে কাশ্মীরের কারাগারে তাকে কম্বল দেয়া হয়নি। প্রচন্ড ঠান্ডায় মারা গিয়েছিলেন তিনি। শেখ আব্দুল্লাহ সরকার ৬৬ বছর আগে শ্যামাপ্রসাদের প্রতি যে অন্যায় করেছিল, এতদিন পর গোটা কাশ্মীরবাসীকে তার খেসারত দিতে হচ্ছে কি? শ্যামাপ্রসাদের আদর্শিক উত্তরসুরীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কেড়ে নিল কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা। আমি অনেকদিন ধরেই বলে আসছি, সংখ্যাগরিষ্ঠতার গণতন্ত্রের বিপদের কথা। সোমবার ভারতের রাজ্যসভায় অমিত শাহ যা করলেন, তা বেআইনি বা অগণতান্ত্রিক হয়তো নয়; কিন্তু অনৈতিক ও স্বৈরতান্ত্রিক। এটা সংখ্যাগরিষ্ঠের গণতন্ত্রের নিকৃষ্টতম উদাহরণ। যে গণতন্ত্রে সংখ্যালঘু মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়, মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার থাকে না, ন্যায্যতার ধারণা থাকে না, গায়ের জোরে সব হয়; সেটা গণতন্ত্রই নয়। বিজেপি এত বড় সিদ্ধান্ত নিল, অথচ বিরোধী দল তো দূরের কথা শরিকদেরও অন্ধকারে রাখলো। আচমকা যেন বোমা ফাটালেন মোদি-অমিত জুটি। তবে কাশ্মীর উপত্যকার মানুষ সপ্তাহখানেক ধরেই টের পাচ্ছিলেন, ভয়ঙ্কর কিছু একটা হতে যাচ্ছে। বাড়তি সেনা মোতায়েন, অমরনাথযাত্রা বাতিল করে সকল তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের বিশেষ ব্যবস্থায় কাশ্মীর ত্যাগে বাধ্য করা, সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা, ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করা, জায়গায় জায়গায় কারফিউ জারি, অন্তত চারমাসের খাদ্যসামগ্রী মজুদ, সাবেক দুই মূখ্যমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ সব নেতাকে গৃহবন্দী করার পরই এলো এই ঘোষণা। যাতে কাশ্মীরের মানুষ প্রতিবাদ করতে না পারে। হাত পা বেধেই কেড়ে নেয়া হলো তাদের অধিকার। কিন্তু গায়ের জোরে নরেন্দ্র মোদি কতদিন আটকে রাখতে পারবেন, কাশ্মীরের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার?

কাশ্মীরের সমস্যা ভারতের সমান বয়সী। দুইশ বছর শাসন করে ফিরে যেতে বাধ্য হওয়ার আগে ব্রিটিশরা ভারতকে ধর্মের ভিত্তিতে দুইভাগ করে দিয়ে যায়। মুসলমানদের জন্য গঠিত হয় পূর্ব ও পশ্চিমে বিভক্ত পাকিস্তান। এই দুই অংশের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব ১১০০ মাইল হলেও মানসিক দূরত্ব ছিল অনতিক্রম্য। ধর্ম দুই পাকিস্তানকে বেধে রাখতে পেরেছিল মাত্র ২৩ বছর। ব্রিটিশদের পেন্সিলের খোচায় বাংলাদেশ ও ভারতের ১৬২টি ছিটমহলে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ নিজভূমে পরবাসী হয়ে ছিলেন। ৬৮ বছর লেগেছে সেই জট খুলতে। তবে কাশ্মীর উপত্যকায় যে বিষবৃক্ষ রোপিত হয়েছে, তা আদৌ কখনো উৎপাটন করা সম্ভব কিনা জানি না। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও  হিন্দু রাজা হরি সিংএর ইচ্ছায় কাশ্মীর ভারতের সাথে থেকে যায় কিছু শর্তসাপেক্ষে। সেই শর্তগুলোই পরে ৩৭০ ও ৩৫এ ধারা হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভূক্ত হয়। বিজেপি সরকারের এই ধারা বাতিল তাই কাশ্মীরের জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।

স্বাধীনতার পরপরই কাশ্মীর নিয়ে যুদ্ধে জড়ায় ভারত-পাকিস্তান। সে যুদ্ধে কাশ্মীরের এক তৃতীয়াংশ চলে যায় পাকিস্তানের দখলে। সে অংশটুকু পাকিস্তানে পরিচিত আজাদ কাশ্মীর হিসেবে আর ভারত দাবি করে অধিকৃত কাশ্মীর বলে। সেই অংশের দাবি ভারত কখনো ছাড়েনি; তাই কাশ্মীরে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে কোনো নির্ধারিত সীমানা নেই, আছে এলওসি মানে লাইন অব কন্ট্রোল বা নিয়ন্ত্রণরেখা। ৪৭ থেকে কাশ্মীর সীমান্তে ভারত-পাকিস্তান সবসময় যুদ্ধাবস্থায় থাকে। ছোট বড় মিলিয়ে বেশ কবার যুদ্ধ হয়েছেও, কিন্তু মীমাংসা হয়নি। আমার কেন জানি মনে হয়, কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের অযোগ্য। কদিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নাকি তাকে কাশ্মীর নিয়ে মধ্যস্ততা করতে বলেছেন। যদিও পরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেটা অস্বীকার করেছেন। আমার ধারণা কাশ্মীর সমস্যা মধ্যস্ততারও বাইরে। কারণ ভারত-পাকিস্তান দুই দেশের কাছেই কাশ্মীর একটা মর্যাদার ইস্যু। নিয়ন্ত্রণরেখায় একটু এদিক সেদিক হলেই নির্বাচনী পাল্লা বড্ড বেশি হেলে যায়। গত নির্বাচনের আগে পুলওয়ামা জোশ মোদিকে অনেক এগিয়ে দিয়েছিল। নির্বাচনী প্রচারণায় মোদি দাবি করেছেন, তার হাতেই ভারত নিরাপদ। পাকিস্তানের রাজনীতি তো আরো বেশি কাশ্মীরকেন্দ্রিক। জন্মের পর থেকে পাকিস্তানের ক্ষমতার মূল নিয়ন্ত্রণ সেনাবাহিনীর হাতে; কখনো সেটা পর্দার আড়ালে, কখনো সরাসরি। আর সেনাবাহিনীর মূল জোশ কাশ্মীরে। কাশ্মীরের জঙ্গীগোষ্ঠিকে আইএসআই লালন-পালন, পরিচর্যা করে এটা ওপেন সিক্রেট। তাই পাকিস্তানের সেনা সরকার তো নয়ই, কোনো রাজনৈতিক সরকারের পক্ষেও কাশ্মীর প্রশ্নে একচুলও ছাড় দেয়া সম্ভব নয়। তাই নিয়ন্ত্রণরেখা বজায় রাখতে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা, যুদ্ধংদেহী ভাব, যুদ্ধাবস্থা, যুদ্ধ- চলতেই থাকবে।

আমার কেন জানি মনে হয়, ৪৭ সালে কাশ্মীর ভারতের সাথে না গিয়ে পাকিস্তানের সাথে গেলে এবং শেখ মুজিবের মত একজন স্বাধীনতাকামী নেতা পেলে এতদিনে তারা স্বাধীন হয়ে যেতো। কিন্তু ৭২ বছর ভারতের সাথে থেকে কাশ্মীরের লোকজন ভারতীয় হতে পারেনি, ভারতকে ভালোবাসতে পারেনি। শুধু বিশেষ মর্যাদা নয়, তারা চাইছিল পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন, এমনকি স্বাধীনতা পর্যন্ত। ভারতের দৃষ্টিতে যেটা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, কাশ্মীরিদের কাছে সেটাই মুক্তির সংগ্রাম। তবে বাড়তি কিছু তো মিললোই না, বরং বিশেষ মর্যাদার সাথে সাথে রাজ্যের মর্যাদাও খুইয়েছে জম্মু-কাশ্মীর। প্রথমত লাদাখকে আলাদা করে ফেলা হয়েছে। দুইভাগ করে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল বানানো হয়েছে। বিশেষ মর্যাদার রাজ্য থেকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল- রাতারাতি এই অবনমন কাশ্মীরের কেউ তো মানবেনই না, মানছেন না বিরোধী রাজনৈতিক নেতারাও। রাজ্যসভায় উপস্থিত কাশ্মীরের দুই প্রতিনিধি সংবিধান ছিড়ে, এমনকি নিজেদের পোশাক ছিড়ে প্রতিবাদ করেছেন। বিরোধীরা দিনটিকে গণতন্ত্রের কালো দিন বলছেন। কংগ্রেস নেতা পি চিদম্বরম বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত দেশকে টুকরো টুকরো করে দেয়ার প্রথম পদক্ষেপ। চিদম্বরমের মত অত দূর হয়তো হবে না, তবে মোদি-অমিত জুটির এই সিদ্ধান্ত যে কাশ্মীর সমস্যাকে জটিলতর করে তুললো, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অমিত শাহ দাবি করেছেন, ৩৭০ ধারার কারণে কাশ্মীর মূলধারায় একাত্ম হতে পারেনি। কিন্তু মাথায় সাম্প্রদায়িকতার বিষে ভরা ভারতের ক্ষমতাশালী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কে বোঝাবে, সবসময় একাত্ম হয়ে যাওয়াই সমাধান নয়। বৈচিত্র্যেই সৌন্দর্য্য। আর কিছু সৌন্দ্যর্য্য টিকিয়ে রাখতে চাই স্বাতন্ত্র্য।

মোদি-অমিত জুটির পরিকল্পনাটা পরিষ্কার। ৩৫এ ধারার রক্ষাকবচ তুলে দিয়ে কাশ্মীরকে ওপেন করে দেয়া হলো। এখন ভারতের সব বড় লোকেরা এখন সেখানে জায়গা কিনে অবকাশকালীন বাগানবাড়ি বানাবেন। বড় বড় শিল্পপতিরা বড় বড় কারখানা বানাবেন। দলে দলে অমুসলিম সেটেলারদের পাঠিয়ে আস্তে আস্তে মুসলমানদের সেখানে সংখ্যালঘু বানানো হবে। কাশ্মীরে উন্নয়ন হবে অনেক, কিন্তু ভূ-স্বর্গ পরিণত হবে নরকে।

রাজনীতিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠা নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয় দফায় অনেক বেশি বেপরোয়া। সাম্প্রদায়িকতার বিষদাত, প্রথমবার যেটা কিছুটা লুকানো ছিল, এবার তা পুরোদমে বের করে ফেলেছেন। ভারতকে একটি অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র থেকে চরম অসহিষ্ণু সাম্প্রদায়িক ও একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করার দিকে এগুচ্ছেন। গায়ের জোরে কাশ্মীরকে দখল করতে পারবেন নরেন্দ্র দামোদর দাম মোদি, কিন্তু জয় করতে কখনোই নয়। যে আগুন তিনি লাগালেন, তা নেভানোর ক্ষমতা তার আছে তো?

আমার বোধহয় এই জীবনে আর কাশ্মীর যাওয়া হলো না।

আপনার মতামত লিখুন :

‘নয়াকাশ্মীর’: জনভীতি না জনপ্রীতি

‘নয়াকাশ্মীর’: জনভীতি না জনপ্রীতি
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

সংবিধানের বিশেষ মর্যাদা রদ করে কাশ্মীরকে খণ্ডিত করে কেন্দ্রিয় শাসন জারি করে যে নতুন কাশ্মীর বানানোর ঘোষণা দিয়েছে ভারতের বিজেপি সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমিত শাহ জুটি, তা কি জনগণকে আশ্বস্ত করবে? বিনিয়োগ ও উন্নয়নের কথা বলে ভারতের অন্যরাজ্যের সঙ্গে কাশ্মীরের সমতা আনার যে পরিকল্পনার কথা বলছেন ভারতীয় এস্টাবলিশমেন্ট তা কী কাশ্মীরের জনগণকে তুষ্ট করবে? কাশ্মীরের জনগণের কাছে বিজেপি সরকারের এই সিদ্ধান্ত কি জনপ্রিয় হবে? নাকি তাদেরকে আরও ভীত-সন্ত্রস্ত ও দিশাহীন করে তুলবে? বলা চলে সামরিকীকৃত এলাকা কাশ্মীর এখন অবরুদ্ধ। সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনসমাজের জীবন এখন আইনশৃংখলা বাহিনী আর গোয়েন্দাদের নজরের তলায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত, ভীতি আর হতাশাই এখন তাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এসময় হঠাৎ করে বিজেপি এই পদক্ষেপ নিল কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে দেখা দরকার বিজেপির এই কর্মকাণ্ড কি নতুন?

এক.

যে বিপুল ম্যান্ডেট বা জনরায় নিয়ে বিজেপি এবার ক্ষমতায় এসেছে সেখানে ভারতীয় জাতিকে হিন্দুত্ববাদের জাতীয়তাবাদী আকাংখায় বাধার একটা রাজনৈতিক ইচ্ছের পক্ষে জনগণ সম্মতি দিয়েছে। কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের কথা ২০১৯ সালের বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তার ভারতীয় জনতা পার্টি দীর্ঘসময় ধরে ভারতয়ি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ এর বিরোধিতা করে আসছিলেন। ভারতের অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে কাশ্মীরকে একত্রিত করা, সেইসঙ্গে অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে সমতা আনার জন্য ঐ অনুচ্ছেদের বিলোপ প্রয়োজন বলে যুক্তি দিয়ে আসছিলেন তারা।

নির্বাচনের পরপর বিজেপির ভূমিধস বিজয়ের রেশ এখনো ভারতজুড়ে, যেখানে বিজেপির আকাংখা এমন এক ভারত তৈরি করা যাতে পরিচয়ের পার্থক্য যেন আর না থাকে- হিন্দুত্বের পরিচয় হয়ে ওঠে মুখ্য। সেই রেশ বজায় থাকতে থাকতেই নরেন্দ্র মোদি গং এই সিদ্ধান্ত নিলেন। সিদ্ধান্ত নেয়ার টাইমিং খুবই অনুকূলে থাকায় দ্রুত তা বাস্তবায়নে অগ্রণী হয়েছে বিজেপি সরকার। কেননা এ সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক এবং এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে বাধা দেয়ার ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তি এখন খুবই দুর্বল এবং বিচ্ছিন্ন। বিশেষ করে ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেস যারা এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধী তারা এখন ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বলতম অবস্থায় আছে। বলা যায় সংসদে আগে বিজেপি তার জোর প্রতিষ্ঠা করেছে, প্রতিপক্ষকে দুর্বলতর করেছে, বিরোধী দলগুলোর অনৈক্যকে নিশ্চিত করেছে, তারপরই তার রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

অন্যদিকে বিজেপির রাজনৈতিক যে আদর্শ হিন্দুত্ববাদ, গোটা ভারতকে একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদের মোড়কে মুড়ে ফেলা, যেখানে রাজনৈতিক দল-গণমাধ্যম-আদালত-সুশীল সমাজের বড় অংশ এই জাতীয়তাবাদী জিকিরে মশগুল থাকবে, সেই লক্ষ্যও ইতোমধ্যে অর্জিত হয়েছে বলেই বিজেপি এই সময়ে এরকম সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হয় নাই।

কাশ্মীর নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল কতটা জোরদার ভূমিকা নেবে সেটার একটা জাজমেন্ট ভারতের আছে। কাশ্মীর নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রতিবাদ দেখানোর কথা পাকিস্তানের। বাস্তবে তা দেখিয়েছেও পাকিস্তান।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, ভারতশাসিত কাশ্মীরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদক্ষেপ একটি ‘কৌশলগত ভুল’। পাকিস্তান নিরাপত্তা পরিষদেও এ বিষয়ে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, পাকিস্তান নিজে এখন একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। তার আন্তর্জাতিক ক্ষমতাও এখন ক্ষয়িষ্ণু। তার পক্ষে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে একটা যুদ্ধ করা আর সম্ভব নয়।

অন্যদিকে ভারতের প্রতিবেশী এবং শক্তিমান দেশ চীনও এ বিষয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু চীনের বিবেচনা কেবলমাত্র বাণিজ্য। সে ভারতবিরোধিতাকে তার বাণিজ্য স্বার্থ উদ্ধারের কাজেই লাগাতে চায়। আমেরিকা এসময় ভারতের বড় মিত্র। রাশিয়াও ভারতের স্বার্থের সাথে নিজের স্বার্থকে আলাদা করে দেখে না। আন্তর্জাতিক এই পরিস্থিতিও ভারতকে এই সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেছে।

কাজেই ভারতের বিজেপি সরকারের পক্ষে হিন্দুত্ববাদের ছাতার নীচে গোটা ভারতকে আনার রাজনৈতিক যে এজেন্ডা তা বাস্তবায়িত করার একটা বড় সুযোগ হিসাবেই জম্মু এবং কাশ্মীর উপত্যকাকে নিয়ে একটি, আর লাদাখকে আলাদা করে দিয়ে আরও একটি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল তৈরি করেছে ভারত সরকার। ভারতের মিডিয়া, সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক অংগন, আদালত সর্বত্রই বিজেপির এই সিদ্ধান্ত একটা বড় সমর্থনও পেয়েছে।

দুই.

কাশ্মীরের জনগণ বহুদিন যাবৎ ভারত সরকারের ওপর রুষ্ট।ভারতীয় সরকারের এক ধরনের মিলিটারি শাসনের অধীনেই ছিল অশান্ত কাশ্মীর। কাশ্মীরের জনগণ বহুবার গণভোট চেয়েছেন। বছরের পর বছর ধরে কাশ্মীরি জনগণের দাবি হালে পানি পায় নাই। অন্যদিকে ভারতীয় জনগণ, মিডিয়া, সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক দলের অনেকেই চেয়েছেন ভারতের আর অন্যসব রাজ্যের মতোই হোক কাশ্মীর। 

এইঅবস্থায় গণতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদ নতুন করে চড়াও হলো কাশ্মীরের ওপর। বিজেপি উন্নয়নের খাঁচায়, বিনিয়োগের মালায় এখন গাঁথতে চায় কাশ্মীরকে। সবার জন্য কাশ্মীরকে উন্মুক্ত করে, কাশ্মীরি জনগণের স্বাধীনতার আকাংখাকে খাঁচাবন্দী করে ফেলেছে মোদি সরকার।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই ঘটনায় আর কোনো রাখটাক রাখেন নাই। একে বলেছেন বিজেপির দর্শনে ‘কাশ্মীরের মুক্তি’ বলে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন সংবিধানে এখন যে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করা হলো এতকাল এই ‘৩৭০ ধারা কাশ্মীরকে দেশের সঙ্গে এক হতে দেয়নি’।

তিন.

কিন্তু এই পরিস্থিতি কি কাশ্মীরকে শান্ত করবে? বলপ্রয়োগের নীতি, বিভাজনের নীতি, জনসংখ্যার ঘনত্ব বদলে ফেলার নীতি, অন্য ভারতীয়দের জন্য কাশ্মীরকে উম্মুক্ত করার নীতি কি কাশ্মীরের এই বদ্ধদশাকে আলো-বাতাস দেবে? উন্নয়ন আর বিনিয়োগ কি স্বাধীনতার আকাংখাকে দমিয়ে দেবে এই ভূখণ্ডে?

পৃথিবীর অপরাপর রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায় দুনিয়াজুড়ে দমননীতি এখন একটা জয়ী অবস্থায় আছে। সেটা সিরিয়া, রাশিয়া, মিশর, সৌদি আরব থেকে পৃথিবীর অনেক অঞ্চলেই দৃশ্যমান। স্বাধীনতার আকাংখার জয়জয়কার কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইকে বিজয়ী হবার দৃশ্য এই মুহূর্তে পৃথিবীর বাস্তবতা নয়। কিন্তু তাই বলে লড়াই থেমে থাকে নাই।

কাশ্মীরের জনগণের জন্য চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সেই লড়াইকে তারা কতটুকু সংহত করতে পারবে । এই প্রতিকূল পরিস্থিতিকে তারা কতটা নিজেদের ইচ্ছেমত ব্যবহার করতে পারবে। অন্যদিকে ভারত রাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে যে গণতান্ত্রিক বহুমুখিন ভারতকে তারা তৈরি করার সাধনা করে এসেছে, তার বদলে একমুখী হিন্দু ভারত প্রতিষ্ঠার এই নয়াসাধনা কতটা সুখী করে সেখানকার মানুষকে সেটা দেখা। কেননা বিজেপির হিন্দুত্ববাদের এই নয়াজিগিরের একটা প্রাথমিক জোশ এখন খুবই প্রবলবেগে ভারতজুড়ে বিরাজমান। অচিরেই এই জিগির কিছুটা শান্ত হলে, নতুন করে মানুষের মনে ভাবনা আনবে।

ভারতের যে সমস্যা, তার অর্থনীতির যে সমস্যা, বিনিয়োগ-কর্মসংস্থানের যে দশা তার ব্যাপকতর উন্নতি না ঘটিয়ে শুধু ধর্মীয় বাতাসা খাইয়ে জনগণকে কতদিন তুষ্ট রাখা যাবে সেটা একটা বড় বিবেচনার বিষয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ভবিষ্যতে ভারতকে কতটা অখন্ড রাখা যাবে সেটা। কেননা বহু ভাষার, বহু ধর্মের, বহু জাতের, বহু চিন্তার, বহু ভীন্নতায় সমৃদ্ধ একক ভারত টিকে আছে যেসব প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধের ওপর সেগুলো এখন প্রলবেগেই ভাঙছে।

ভারতের নির্বাচন কমিশন, ভারতের উচ্চ আদালত, ভারতের মিডিয়া সর্বত্রই একটা একমুখিন হাওয়া বইছে। সেটা যদি ঠেকানো না যায় তবে ভারতের রাষ্ট্রকাঠামোর সবটা জুড়ে একটা সামরিকীকরণ প্রবণতা জোরদার হবে। অস্ত্র, প্রতিরক্ষা, দমন, নির্যাতন জায়গা নেবে গণতন্ত্র, মুক্তচিন্তা, সুশাসন, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার বদলে। দশকের পর দশক ধরে ভারতের গণতন্ত্র চর্চার যে ফল তা দ্রুত মিইয়ে যাবে একমুখিন হিন্দু ভারতের উগ্র নেশায়। ফলে ঐক্যবদ্ধ ভারত হুমকির মুখে পড়তে বাধ্য।

কাশ্মীরের এই কথিত ‘মুক্তিদশা’ কি সেটারই শুরু  কিনা তা বলার সময় এখনও আসেনি। তবে এটা বলা যায় কাশ্মীরের নতুন জেনারেশনের জন্য এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জও বটে। তারা অখন্ড ভারতের এই নতুন চাপ মাথা পেতে নেবে না এই চাপ থেকে মুক্ত হবার জন্য ‘নতুন লড়াই’ শুরু করবে ‘নতুন কৌশলে’ সেটাই ভাবার বিষয়।

শুভ কিবরিয়া: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক।

নীতির রাজার বিদায়

নীতির রাজার বিদায়
প্রয়াত অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ

আমার গ্রামের বাড়ি দাউদকান্দি। দেবীদ্বার আমার পাশের উপজেলা, যেটি ছিল অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের নির্বাচনী এলাকা। তাই ন্যাপ, মোজাফফর, কুঁড়েঘর শব্দগুলোর ঢেউ দেবীদ্বার থেকে দাউদকান্দিতে আমাদের কানে পৌছে যেতো অনায়াসে। ৭৩এর নির্বাচনের স্মৃতি তেমন নেই। শুধু মনে আছে জাসদের বেশ দাপট ছিল। পরে জেনেছি, দাউদকান্দিতে জাসদের রশিদ ইঞ্জিনিয়ারকে হারিয়ে খন্দকার মোশতাককে জেতাতে হেলিকপ্টারে ব্যালট বাক্স ঢাকায় নিতে হয়েছিল। যা বলছিলাম, আমাদের স্মৃতির প্রথম নির্বাচন ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন। ১০ বছর বয়সে অতকিছু বুঝিনি, খালি বুঝেছি, নির্বাচন মানেই স্লোগান, মিছিল, আনন্দ। তো সেই নির্বাচনে নিজের এলাকা ছাপিয়ে পাশের এলাকার কিছু স্লোগান এখনও কানে গেঁথে আছে। হয়তো ছন্দময়তার জন্য, তবে ভুলিনি এখনো- আমার নাম মোজাফফর, মার্কা আমার কুঁড়েঘর; আমার নাম মোজাফফর আহমেদ নুরী, আমি পথে পথে ঘুরি; মোজাফফরের কুঁড়েঘর, ভাইঙ্গা-চুইড়া নৌকাত ভর। এরকম মোজাফফরের পক্ষে-বিপক্ষের নানা স্লোগান কানে আসতো, আসতো নানা গল্পও। ৭৫'র আগ পর্যন্ত আমাদের অঞ্চলে সবচেয়ে বড় জাতীয় নেতা ছিল খন্দকার মোশতাক। এই কুলাঙ্গারের পতনের পর সবচেয়ে কাছের জাতীয় নেতা হলেন মোজাফফর আহমেদ। তখনও দেখিনি, কিন্তু নানান অবিশ্বাস্য গল্প কানে আসে। বিশাল বড় নেতা, কিন্তু একদম মাটির মানুষ। মার্কা যেমন কুঁড়েঘর, মানুষও তেমনি কুঁড়েঘরেরই। মানুষের সাথে মিশে যাচ্ছেন, তাদের মত করে। তাদের ভাষায় কথা বলছেন। লুঙ্গি পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ১৯৭৯ সালের সাজানো একতরফা নির্বাচনে ধানের শীষের জোয়ারও মোজাফফরের কুঁড়েঘরকে ভাসিয়ে নিতে পারেনি। ১৯৮১ সালে ন্যাপ-সিপিবির প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন কুঁড়েঘরের মোজাফফর। জিয়াউর রহমানকে জেতাতে আয়োজিত সে নির্বাচনে অন্য কারো জেতার সুযোগই ছিল না।

আমাদের পাশের বাড়ির নেতা হলেও পরে বুঝেছি তিনি দেবীদ্বার বা কুমিল্লা বা বাংলাদেশের নেতা নন; বিশ্বের বাম আন্দোলনেও তার নাম লেখা আছে। ছেলেবেলা থেকে নাম, স্লোগান, নানান গল্প শুনলেও অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদকে প্রথম দেখি ১৯৯১ সালে। তখন আমরা প্রিয় প্রজন্ম নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করতাম। ফজলুল বারী সম্পাদিত সে পত্রিকার অফিস ছিল ৭৬ সেগুনবাগিচায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দক্ষিণ পাশে। আর অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের বাসা ছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উত্তর পাশে কাকরাইলে। তিনি প্রায়শই সকালে লুঙ্গি পড়ে আমাদের অফিসে চলে আসতেন, একসাথে অনেক পত্রিকা পড়ার আকাঙ্খায়। তিনি পত্রিকা পড়তেন, আর আমরা তাঁর গল্প শুনতাম। ছেলেবেলায় তাঁর সম্পর্কে যা যা শুনেছি, তার একবিন্দুও মিথ্যা নয়। সেই কুঁড়েঘরের মাটির মানুষ। কুমিল্লার আঞ্চলিক টানে কথা বলছেন, বকা দিচ্ছেন। আমরা জানতাম রোদ চড়লে তাঁর মেজাজও চড়ে যায়।

আমাদের কাছে মনে হয় অতি কাছের জন, কিন্তু তিনি অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ; ইতিহাসের সাক্ষি নন, তিনি নিজেই ইতিহাস। শুধু বাংলাদেশ নয়, এই উপমহাদেশের বাম আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, মুজিবনগর সরকারের ৬ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদের একজন, ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়ন গেরিলা বাহিনীর সংগঠক, একাত্তরে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন দেশ, প্রতিনিধিত্ব করেছেন জাতিসংঘে, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠজন, ভিন্ন দলের হলেও বঙ্গবন্ধু যাকে মন্ত্রী করতে চেয়েছিলেন; সেই অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ পত্রিকা পড়তে আমাদের অফিসে আসেন! নিজেদের ভাগ্যকে ঈর্ষা করার মত ম্যাচুরিটি তখনও হয়তো হয়নি আমাদের।

১৯৩৭ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে চান্দিনায় মহাত্মা গান্ধীর জনসভায় যোগ দিতে গিয়ে রাজনীতিতে হাতেখড়ি। তারপর মৃত্যু পর্যন্ত রাজনীতির লাঠি আর ছাড়েননি। বরং রাজনীতি করবেন বলে ছেড়েছেন অনেককিছু, এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার মত নিশ্চিন্তের চাকরিও। বরং বেছে নিয়েছেন মামলা, হুলিয়া, আত্মগোপন আর কারাবরণের ঝুঁকি। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ- ২৩ বছরের মুক্তিসংগ্রামেও ছিলেন মোজাফফর।

৫৪এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ৩২ বছরের টগবগে তরুণ মোজাফফর তখনকার মুসলিম লীগের শিক্ষামন্ত্রী মফিজুল ইসলামকে হারিয়ে চমক সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি ছিলেন মাওলানা ভাসানীর অনুসারী। কিন্তু ৬৭ সালে আদর্শের প্রশ্নে দুজনার দুটি পথ দুটি দিকে বেকে যায়। ভাসানীর নেতৃত্বে রয়ে যায় চীনপন্থি বামরা। আর মস্কোপন্থিদের নেতৃত্ব দেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ। সেই থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনিই ন্যাপ'এর সভাপতি। আপনি তার অনেক কাজের সমালোচনা করতে পারবেন। কেন তিনি ৫২ বছর ধরে একটি দলের সভাপতি, ধর্ম-কর্ম-সমাজতন্ত্র আসলে এক ধরনের বিভ্রান্তি, সমাজতন্ত্রকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌছাতে পারেননি কেন? স্বাধীনতার পর ন্যাপ-সিপিবি কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা রাখতে পারেনি বলেই উগ্র জাসদ আর প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি সেই জায়গাটা  পূরণ করে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করেছিল। এই সব প্রশ্ন-অভিযোগ আপনি তুলতেই পারেন। সাংগঠনিক ভাবে অনেক প্রশ্ন থাকলেও ব্যক্তি অধ্যাপক মোজাফফরের বিরুদ্ধে কেউ কখনো কোনো অভিযোগের আঙ্গুল তুলতে পারেনি। তাঁর সততা, নিষ্ঠা, আদর্শের প্রতি একাগ্রতার কোনো তুলনা নেই। তিনি আদর্শের সাথে একচুলও আপস করেননি। বিশ্বাস থেকে নড়েননি এক ইঞ্চিও। তার অনেক কমরেড যখন নামের আগে আলহাজ্ব বসিয়ে নেন, তখনও তিনি বামপন্থায় অবিচল। আপস না করে, লোভের উর্ধ্বে থেকেও যে এই বাংলাদেশে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রাজনীতি করা যায়, তার উদাহরণ হয়ে থাকবেন মোজাফফর আহমেদ। এখনকার রাজনীতিবিদদের দেখলে মনে হয়, রাজনীতি মানে রাজা হওয়ার নীতি। আর অধ্যাপক মোজাফফরদের দেখলে মনে হয়, রাজনীতি আসলে নীতির রাজা। মন্ত্রিত্ব যার সম্মতির অপেক্ষায় ফিরে যায়, সেই তিনি শেষ বয়সে স্বাধীনতা পদকও ফিরিয়ে দেন, কারণ পদকের জন্য বা কিছু পাওয়ার আশায় মুক্তিযুদ্ধ করেননি। মন্ত্রিত্ব ফিরিয়ে দেয়া, পদক ফিরিয়ে এমন সন্তপুরুষ রাজনীতি আর কখনো পাবে?

অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের একটা যুগের অবসান ঘটলো। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া সর্বশেষ জাতীয় নেতা ছিলেন তিনি। তার স্মৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। আমাদের এখনকার রাজনীতিবিদরা যদি অধ্যাপক মোজাফফরের জীবন থেকে কিছু শেখেন, জাতির বড্ড উপকার হয়।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র