Barta24

রোববার, ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১০ ভাদ্র ১৪২৬

English

বঙ্গবন্ধুর গল্প

বঙ্গবন্ধুর গল্প
শুভ কিবরিয়া, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
শুভ কিবরিয়া


  • Font increase
  • Font Decrease

বন্দী দিনের ভাবনা

'দুপুরের দিকে সূর্য্য মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারতে শুরু করেছে। রৌদ্র একটু উঠবে বলে মনে হয়। বৃষ্টি আর ভালো লাগছে না। একটা উপকার হয়েছে আমার দূর্বার বাগানটার। ছোট মাঠটা সবুজ হয়ে উঠেছে। সবুজ ঘাসগুলি বাতাসের তালে তালে নাচতে থাকে। চমৎকার লাগে, যেই আসে আমার বাগানের দিকে একবার না তাকিয়ে যেতে পারে না। বাজে গাছগুলো আমি নিজেই তুলে ফেলি। আগাছাগুলিকে আমার বড় ভয়, এগুলি না তুললে আসল গাছগুলি ধ্বংস হয়ে যাবে। যেমন আমাদের দেশের পরগাছা রাজনীতিবিদ-যারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক তাদের ধ্বংস করে, এবং করতে চেষ্টা করে। তাই পরগাছাকে আমার বড় ভয়। আমি লেগেই থাকি। কুলাতে না পারলে আরও কয়েকজনকে ডেকে আনি। আজ বিকালে অনেকগুলি তুললাম।' (২৩জুন ১৯৬৬, বৃহস্পতিবার, কারাগারের রোজনামচা)

খুব নরম এবং আদ্রভাষায় মোলায়েম করে প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে মানবচরিত্রের একটা বিশ্লেষণ আছে এই বয়ানে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০-১৯৭৫)-এর বয়স তখন মাত্র ছেচল্লিশ বছর। জেলখানায় বসে তিনি ভাবছেন এইসব কথা। আগাছা আর পরগাছার সঙ্গে রাজনীতিতে থাকা বিচিত্র সব সুবিধাবাদী আর বর্ণচোরা মানুষের মিল খুঁজছেন। মানুষ নিয়ে এই ভাবনা ছিল তাঁর আমৃত্যু। নিজে ছিলেন জনস্বার্থে, পরার্থে নিবেদিত মানুষ। তাঁর রাজনীতির মূল দর্শনও ছিল তাই।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার যে চিন্তা, তাঁর জন্য যে জীবনপর লড়াই, তাঁর কেন্দ্রীয় ভাবনাও ছিল দেশের জনকল্যাণে। ফলে তাঁর জীবন জুড়ে সব কর্মকাণ্ডেই রাজনৈতিক হৃদয় ছাপিয়ে জায়গা পেয়েছে একজন মানবিক মানুষের বড় হৃদয়। তার কিছু কাহিনী নিয়েই আজকের লেখাটি।

আমি ওঠাই আপনার বাক্সটা

একদিন আমার এলাকার স্কুল থেকে নাজীর আহমদ নামের এক ছাত্র প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয়ে বেকার হোস্টেলে থাকতে এসেছে। নাজীরের উচিত ছিল বন্ধুবান্ধব কাউকে খবর দেওয়া কিংবা কাউকে সঙ্গে করে নিয়ে আসা। কারণ, তখন গ্রাম থেকে কলকাতা আসা আজকের ঢাকা থেকে লন্ডন যাওয়ার মতোই ছিল। কিন্তু নাজীরের পক্ষে সেটা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

নাজীর বেলা ১১টার দিকে একাই কুলির মাথায় বাক্স ও বিছানা নিয়ে হোস্টেলে উপস্থিত। নাজীরকে কুলি এত ভারী ধরনের বাক্স ও বিছানা ( হোল্ড অল) নিয়ে এসে নিচের তলার সিঁড়ির কাছে নামিয়ে দিয়ে গেছে। নাজীরের বরাদ্দ পাওয়া কামরা দোতলায় ৩২ কি ৩৩ নম্বর। নাজীর কী করবে, কাকে জিজ্ঞেস করবে, কার সাহায্য চাইবে ভাবছে। বলতে গেলে ভীতই হয়ে পড়েছে সে। ১১টার দিকে বেশির ভাগ ছাত্র কলেজে গেছে ও ব্লক পরিচারকেরা খেতে গেছে। দু-চারজন ছাত্র সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল আর কেউ কেউ ওপরে উঠে গেল। সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে থাকা নাজীরকে কেউ দেখেও দেখল না। এমন সময় দীর্ঘদেহী এক ছাত্র, অর্থাৎ শেখ মুজিব, তড়িঘড়ি করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছেন। কোথাও যেতে হবে, একেবারেই সময় নেই। নাজীরকে পাশ কাটিয়ে দুই পা এগিয়েও গেলেন। তারপর ফিরে এলেন। 

'আসসালামু আলাইকুম। আপনি কি হোস্টেলে নতুন এসেছেন?' নাজীর বলল, 'জি হ্যাঁ', 'কত নম্বর কামরা পেয়েছেন?' '৩২ নম্বর'। সে তো দোতলায়, আমার রুমের পাশেই। তা আপনার জিনিসগুলো নেওয়ার জন্য লোক নেই?' নাজীর নিরুত্তর। শেখ সাহেবের চিৎকার, 'কই তোমরা? রিয়াসাত, জহুর?' কোথাও থেকে কোনো সাড়া নেই। অবশেষে শেখ মুজিব বললেন, 'আপনি আপনার বিছানাটা উঠান, আমি ওঠাই আপনার বাক্সটা।' নাজীরও ছিল লম্বা ও শক্তিশালী। বললেন, 'না, তা হয় না। যদি ধরতেই চান, তবে আপনি বিছানাটা নিন, আমি ওঠাই বাক্স। ওটা তো ওঠানোই কঠিন। তারপর বয়ে নিয়ে অতটা ওপরে যাওয়া' ততক্ষণে মুজিব লোহার বাক্সটা কাঁধে নিয়ে সিঁড়ি বাইতে শুরু করেছেন।

মুজিব নাজীরকে নিয়ে গেলেন তাঁর কামরায়। দরজা খুলে নিজের ঘর থেকে পরিত্যক্ত নেকড়ার ঝাড়ন এনে মোটামুটি খাট, টেবিল ও চেয়ার ঝেড়ে বললেন, 'এবার বিশ্রাম করুন। প্রত্যেক ব্লকের ছাত্রদের দেখাশোনা করার জন্য একজন পরিচারক আছে। আমি ওকে নিচে থেকে খুঁজে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনার খাবারদাবার ও যা-কিছু লাগে ওকে বলবেন।' ঘড়ি দেখে বললেন, 'আমার খুব তাড়া। না হলে আমি সব দেখিয়ে দিতাম। বিকেলে দেখা হবে।' বলে চলে গেলেন।

ঘটনাটির বর্ণনা দিতে গিয়ে এখনো ডাক্তার নাজীরের (অ্যানেস্থেশিয়ার ফেলো ও বর্তমানে ইংল্যান্ডে কনসালট্যান্ট) স্বরটা আর্দ্র হয়ে ওঠে।

ছাত্রজীবনে বঙ্গবন্ধু আর মেজর জেনারেল এম খলিলুর রহমান একসময় কলকাতার বেকার হোস্টেলে থাকতেন। সে সুবাদে তাঁদের মধ্যে সদ্ভাব ছিল। ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে জেনারেল খলিলকে বিডিআর (এখনকার বিজিবি)-এর মহাপরিচালক নিযুক্ত করেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর ছাত্রজীবনের এই ঘটনাটির উল্লেখ করেছেন মেজর জেনারেল খলিল তাঁর, ‘ কাছ থেকে দেখা ১৯৭৩-৭৫’ বইয়ে।

জহুর ও শাড়ি সমাচার

ঘটনাটি বাহাত্তরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বাংলাদেশ সফরের সময়ের। বঙ্গভবনে অনুষ্ঠান শেষে তিনি ১৪ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী প্রত্যেকের হাতে উপহারস্বরুপ একটি করে ভারতীয় বেঙ্গালুরু সিল্কের শাড়ি দিলেন। বলা বাহুল্য, শাড়িগুলো মন্ত্রীদের বেগম সাহেবদের জন্য। শাড়ি বিতরণ শেষ, মন্ত্রীরা ইন্দিরা গান্ধীকে সমবেতভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন। এমন সময় দূর থেকে এগিয়ে এলেন বঙ্গবন্ধু।

তৎকালীন আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধরের শাড়ি প্রায় ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে জহুর আহমদ চৌধুরীর হাতে ধরিয়ে দিলেন। ইন্দিরাজি অবাক হয়ে বঙ্গবন্ধুর দিকে তাকালেন। তিনি বললেন, মনোরঞ্জন ধর ব্যাচেলর মানুষ। তাঁর শাড়ির দরকার নেই। বেচারা জহুরের দুই বউ। এক শাড়ি নিয়ে দুইজনে টানাটানি করবে। তাই তাঁরটি জহুরের আরেকটি বউয়ের জন্য দিলাম।

এই ঘটনাটি লিখেছেন প্রয়াত সাংবাদিক এ বি এম মূসা তাঁর 'মুজিব ভাই' গ্রন্থে।

তোমলোক খুন কিয়া

স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার দুই দিন পর। বঙ্গবন্ধু একদিন পুরোনো গণভবনে আমাকে বললেন, হ্যাঁ রে সবাইকে দেখলাম বদরুদ্দিন ভাই কোথায়? বদরুদ্দিন মানে তৎকালীন পাকিস্তানি মালিকানার ট্রাস্ট্রের পত্রিকা মর্নিং নিউজ-এর সম্পাদক। পত্রিকাটি অহর্নিশ তাঁর কুৎসা গেয়েছে, আগরতলা মামলার সময় তাঁর ফাঁসি দাবি করেছে। এই সেই পত্রিকা যার অফিস বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ও উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের সময় জনগণ পুড়িয়ে দিয়েছে। তাঁর সম্পর্কে অহর্নিশ বিষোদগারকারী সেই পত্রিকার সম্পাদকের সঙ্গেও তাঁর ব্যাক্তিগত সম্পর্কের কমতি ছিল না। তাঁর নিরাপত্তা বিষয়ে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে আমাকে বললেন, ‘কোথায় আছেন বদরুদ্দিন ভাই? খুঁজে নিয়ে আয়। ভালো আছেন তো? কোন অসুবিধায় নেই তো?’

বঙ্গবন্ধুর আদেশে বদরুদ্দিনকে খুঁজতে লাগলাম। পেয়েও গেলাম, লালমাটিয়ার একটি বাড়িতে আত্মগোপন করে আছেন তিনি। বহু কোশেশ করে দেখা করলাম। বললাম, 'মুজিব ভাই আপনাকে খুঁজছেন। চলুন আমার সঙ্গে।' বদরুদ্দিন ভাইয়ের চোখমুখ যেন ঝলসে উঠল, 'ক্যায়া, শেখ সাব মুঝে বোলায়া, আই ক্যান গো টু হিম, সি হিম? নিয়ে এলাম তাঁকে গণভবনে, যেন দুই বৈরী নয়, যেন দুই বন্ধুর মিলন দেখলাম। বুকে জড়িয়ে ধরলেন, পাশে বসালেন। নেতা জিজ্ঞেস করলেন, 'হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ। আপনি কী করতে চান? কাঁহা যাতে চাহেঁ? কোনো বিপদে নেই তো? আবেগময় প্রশ্নগুলো শুনে বদরুদ্দিন আধো কান্না আধো খুশি মেশানো কন্ঠে বললেন, 'পাকিস্তানে যেতে চাই, মে আই লিভ ফর করাচি? বঙ্গবন্ধু একান্ত সচিব রফিকউল্লাহকে ডাকলেন, 'বদরুদ্দিন ভাই যা চান, তা-ই করে দাও।' উল্লেখ করা প্রয়োজন পাকিস্তান তখনো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। ভারতের সঙ্গেও নৌ-স্থল-বিমান যোগাযোগ নেই। কিছু অবাঙালি গোপনে সীমান্ত পেরিয়ে ভারত ও কাঠমান্ডু হয়ে তারপর পাকিস্তানে যাচ্ছেন। 

তার পরের কাহিনী। বদরুদ্দিন ভাইয়ের আরেকটি প্রার্থনা, আসাদ অ্যাভিনিউয়ের বাড়িটি বিক্রি করবেন, সেই টাকাও তিনি সঙ্গে নিয়ে যাবেন। বাহাত্তরে সেই সময়ে একজন বিহারির এহেন একটি আবদার কেউ কল্পনাও করতে পারত না। কিন্ত বঙ্গবন্ধু বলেন তথাস্তু, তা-ই হবে।

ক্রেতা ঠিক হলো আতাউদ্দিন খান, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, পরবর্তী সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রী।

বঙ্গবন্ধুর সচিব রফিকউল্লাহ চৌধুরীর সহায়তায় আতা সাহেব বাড়ি কিনে যে টাকা দিয়েছিলেন তা বিদেশি মুদ্রায় রূপান্তরিত করে বাইরে নেওয়ার অনুমতি দিয়ে বঙ্গবন্ধু তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হামিদুল্লাহ সাহেবকে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছিলেন। অত:পর বদরুদ্দিন স্বচ্ছন্দে নেপাল হয়ে পাকিস্তানে চলে গেলেন।

পঁচাত্তরের অনেক বছর পর লাহোরে বদরুদ্দিনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিলেন। বলছিলেন, 'আল্লাহর শোকর, শেখ সাহেব ফিরে এসেছিলেন। তাই তো বেঁচে আছি। এখনো বহাল তবিয়তে আছি 'তারপরই মাথা থাবড়াতে থাকলেন, 'ইয়ে ফেরেশতা কো তোমলোক খুন কিয়া?'

শেখ মুজিবের বিশাল হৃদয়ের বহুমাত্রিক উদারতার এই প্রত্যক্ষ বয়ান লিখেছেন সাংবাদিক এবিএম মূসা তাঁর 'মুজিব ভাই' নামের এক ক্ষীণকায়া বইয়ে।

শুভ কিবরিয়া: নির্বাহী সম্পাদক. সাপ্তাহিক

আপনার মতামত লিখুন :

‘নয়াকাশ্মীর’: জনভীতি না জনপ্রীতি

‘নয়াকাশ্মীর’: জনভীতি না জনপ্রীতি
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

সংবিধানের বিশেষ মর্যাদা রদ করে কাশ্মীরকে খণ্ডিত করে কেন্দ্রিয় শাসন জারি করে যে নতুন কাশ্মীর বানানোর ঘোষণা দিয়েছে ভারতের বিজেপি সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমিত শাহ জুটি, তা কি জনগণকে আশ্বস্ত করবে? বিনিয়োগ ও উন্নয়নের কথা বলে ভারতের অন্যরাজ্যের সঙ্গে কাশ্মীরের সমতা আনার যে পরিকল্পনার কথা বলছেন ভারতীয় এস্টাবলিশমেন্ট তা কী কাশ্মীরের জনগণকে তুষ্ট করবে? কাশ্মীরের জনগণের কাছে বিজেপি সরকারের এই সিদ্ধান্ত কি জনপ্রিয় হবে? নাকি তাদেরকে আরও ভীত-সন্ত্রস্ত ও দিশাহীন করে তুলবে? বলা চলে সামরিকীকৃত এলাকা কাশ্মীর এখন অবরুদ্ধ। সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনসমাজের জীবন এখন আইনশৃংখলা বাহিনী আর গোয়েন্দাদের নজরের তলায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত, ভীতি আর হতাশাই এখন তাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এসময় হঠাৎ করে বিজেপি এই পদক্ষেপ নিল কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে দেখা দরকার বিজেপির এই কর্মকাণ্ড কি নতুন?

এক.

যে বিপুল ম্যান্ডেট বা জনরায় নিয়ে বিজেপি এবার ক্ষমতায় এসেছে সেখানে ভারতীয় জাতিকে হিন্দুত্ববাদের জাতীয়তাবাদী আকাংখায় বাধার একটা রাজনৈতিক ইচ্ছের পক্ষে জনগণ সম্মতি দিয়েছে। কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের কথা ২০১৯ সালের বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তার ভারতীয় জনতা পার্টি দীর্ঘসময় ধরে ভারতয়ি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ এর বিরোধিতা করে আসছিলেন। ভারতের অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে কাশ্মীরকে একত্রিত করা, সেইসঙ্গে অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে সমতা আনার জন্য ঐ অনুচ্ছেদের বিলোপ প্রয়োজন বলে যুক্তি দিয়ে আসছিলেন তারা।

নির্বাচনের পরপর বিজেপির ভূমিধস বিজয়ের রেশ এখনো ভারতজুড়ে, যেখানে বিজেপির আকাংখা এমন এক ভারত তৈরি করা যাতে পরিচয়ের পার্থক্য যেন আর না থাকে- হিন্দুত্বের পরিচয় হয়ে ওঠে মুখ্য। সেই রেশ বজায় থাকতে থাকতেই নরেন্দ্র মোদি গং এই সিদ্ধান্ত নিলেন। সিদ্ধান্ত নেয়ার টাইমিং খুবই অনুকূলে থাকায় দ্রুত তা বাস্তবায়নে অগ্রণী হয়েছে বিজেপি সরকার। কেননা এ সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক এবং এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে বাধা দেয়ার ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তি এখন খুবই দুর্বল এবং বিচ্ছিন্ন। বিশেষ করে ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেস যারা এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধী তারা এখন ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বলতম অবস্থায় আছে। বলা যায় সংসদে আগে বিজেপি তার জোর প্রতিষ্ঠা করেছে, প্রতিপক্ষকে দুর্বলতর করেছে, বিরোধী দলগুলোর অনৈক্যকে নিশ্চিত করেছে, তারপরই তার রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

অন্যদিকে বিজেপির রাজনৈতিক যে আদর্শ হিন্দুত্ববাদ, গোটা ভারতকে একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদের মোড়কে মুড়ে ফেলা, যেখানে রাজনৈতিক দল-গণমাধ্যম-আদালত-সুশীল সমাজের বড় অংশ এই জাতীয়তাবাদী জিকিরে মশগুল থাকবে, সেই লক্ষ্যও ইতোমধ্যে অর্জিত হয়েছে বলেই বিজেপি এই সময়ে এরকম সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হয় নাই।

কাশ্মীর নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল কতটা জোরদার ভূমিকা নেবে সেটার একটা জাজমেন্ট ভারতের আছে। কাশ্মীর নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রতিবাদ দেখানোর কথা পাকিস্তানের। বাস্তবে তা দেখিয়েছেও পাকিস্তান।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, ভারতশাসিত কাশ্মীরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদক্ষেপ একটি ‘কৌশলগত ভুল’। পাকিস্তান নিরাপত্তা পরিষদেও এ বিষয়ে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, পাকিস্তান নিজে এখন একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। তার আন্তর্জাতিক ক্ষমতাও এখন ক্ষয়িষ্ণু। তার পক্ষে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে একটা যুদ্ধ করা আর সম্ভব নয়।

অন্যদিকে ভারতের প্রতিবেশী এবং শক্তিমান দেশ চীনও এ বিষয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু চীনের বিবেচনা কেবলমাত্র বাণিজ্য। সে ভারতবিরোধিতাকে তার বাণিজ্য স্বার্থ উদ্ধারের কাজেই লাগাতে চায়। আমেরিকা এসময় ভারতের বড় মিত্র। রাশিয়াও ভারতের স্বার্থের সাথে নিজের স্বার্থকে আলাদা করে দেখে না। আন্তর্জাতিক এই পরিস্থিতিও ভারতকে এই সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেছে।

কাজেই ভারতের বিজেপি সরকারের পক্ষে হিন্দুত্ববাদের ছাতার নীচে গোটা ভারতকে আনার রাজনৈতিক যে এজেন্ডা তা বাস্তবায়িত করার একটা বড় সুযোগ হিসাবেই জম্মু এবং কাশ্মীর উপত্যকাকে নিয়ে একটি, আর লাদাখকে আলাদা করে দিয়ে আরও একটি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল তৈরি করেছে ভারত সরকার। ভারতের মিডিয়া, সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক অংগন, আদালত সর্বত্রই বিজেপির এই সিদ্ধান্ত একটা বড় সমর্থনও পেয়েছে।

দুই.

কাশ্মীরের জনগণ বহুদিন যাবৎ ভারত সরকারের ওপর রুষ্ট।ভারতীয় সরকারের এক ধরনের মিলিটারি শাসনের অধীনেই ছিল অশান্ত কাশ্মীর। কাশ্মীরের জনগণ বহুবার গণভোট চেয়েছেন। বছরের পর বছর ধরে কাশ্মীরি জনগণের দাবি হালে পানি পায় নাই। অন্যদিকে ভারতীয় জনগণ, মিডিয়া, সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক দলের অনেকেই চেয়েছেন ভারতের আর অন্যসব রাজ্যের মতোই হোক কাশ্মীর। 

এইঅবস্থায় গণতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদ নতুন করে চড়াও হলো কাশ্মীরের ওপর। বিজেপি উন্নয়নের খাঁচায়, বিনিয়োগের মালায় এখন গাঁথতে চায় কাশ্মীরকে। সবার জন্য কাশ্মীরকে উন্মুক্ত করে, কাশ্মীরি জনগণের স্বাধীনতার আকাংখাকে খাঁচাবন্দী করে ফেলেছে মোদি সরকার।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই ঘটনায় আর কোনো রাখটাক রাখেন নাই। একে বলেছেন বিজেপির দর্শনে ‘কাশ্মীরের মুক্তি’ বলে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন সংবিধানে এখন যে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করা হলো এতকাল এই ‘৩৭০ ধারা কাশ্মীরকে দেশের সঙ্গে এক হতে দেয়নি’।

তিন.

কিন্তু এই পরিস্থিতি কি কাশ্মীরকে শান্ত করবে? বলপ্রয়োগের নীতি, বিভাজনের নীতি, জনসংখ্যার ঘনত্ব বদলে ফেলার নীতি, অন্য ভারতীয়দের জন্য কাশ্মীরকে উম্মুক্ত করার নীতি কি কাশ্মীরের এই বদ্ধদশাকে আলো-বাতাস দেবে? উন্নয়ন আর বিনিয়োগ কি স্বাধীনতার আকাংখাকে দমিয়ে দেবে এই ভূখণ্ডে?

পৃথিবীর অপরাপর রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায় দুনিয়াজুড়ে দমননীতি এখন একটা জয়ী অবস্থায় আছে। সেটা সিরিয়া, রাশিয়া, মিশর, সৌদি আরব থেকে পৃথিবীর অনেক অঞ্চলেই দৃশ্যমান। স্বাধীনতার আকাংখার জয়জয়কার কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইকে বিজয়ী হবার দৃশ্য এই মুহূর্তে পৃথিবীর বাস্তবতা নয়। কিন্তু তাই বলে লড়াই থেমে থাকে নাই।

কাশ্মীরের জনগণের জন্য চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সেই লড়াইকে তারা কতটুকু সংহত করতে পারবে । এই প্রতিকূল পরিস্থিতিকে তারা কতটা নিজেদের ইচ্ছেমত ব্যবহার করতে পারবে। অন্যদিকে ভারত রাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে যে গণতান্ত্রিক বহুমুখিন ভারতকে তারা তৈরি করার সাধনা করে এসেছে, তার বদলে একমুখী হিন্দু ভারত প্রতিষ্ঠার এই নয়াসাধনা কতটা সুখী করে সেখানকার মানুষকে সেটা দেখা। কেননা বিজেপির হিন্দুত্ববাদের এই নয়াজিগিরের একটা প্রাথমিক জোশ এখন খুবই প্রবলবেগে ভারতজুড়ে বিরাজমান। অচিরেই এই জিগির কিছুটা শান্ত হলে, নতুন করে মানুষের মনে ভাবনা আনবে।

ভারতের যে সমস্যা, তার অর্থনীতির যে সমস্যা, বিনিয়োগ-কর্মসংস্থানের যে দশা তার ব্যাপকতর উন্নতি না ঘটিয়ে শুধু ধর্মীয় বাতাসা খাইয়ে জনগণকে কতদিন তুষ্ট রাখা যাবে সেটা একটা বড় বিবেচনার বিষয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ভবিষ্যতে ভারতকে কতটা অখন্ড রাখা যাবে সেটা। কেননা বহু ভাষার, বহু ধর্মের, বহু জাতের, বহু চিন্তার, বহু ভীন্নতায় সমৃদ্ধ একক ভারত টিকে আছে যেসব প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধের ওপর সেগুলো এখন প্রলবেগেই ভাঙছে।

ভারতের নির্বাচন কমিশন, ভারতের উচ্চ আদালত, ভারতের মিডিয়া সর্বত্রই একটা একমুখিন হাওয়া বইছে। সেটা যদি ঠেকানো না যায় তবে ভারতের রাষ্ট্রকাঠামোর সবটা জুড়ে একটা সামরিকীকরণ প্রবণতা জোরদার হবে। অস্ত্র, প্রতিরক্ষা, দমন, নির্যাতন জায়গা নেবে গণতন্ত্র, মুক্তচিন্তা, সুশাসন, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার বদলে। দশকের পর দশক ধরে ভারতের গণতন্ত্র চর্চার যে ফল তা দ্রুত মিইয়ে যাবে একমুখিন হিন্দু ভারতের উগ্র নেশায়। ফলে ঐক্যবদ্ধ ভারত হুমকির মুখে পড়তে বাধ্য।

কাশ্মীরের এই কথিত ‘মুক্তিদশা’ কি সেটারই শুরু  কিনা তা বলার সময় এখনও আসেনি। তবে এটা বলা যায় কাশ্মীরের নতুন জেনারেশনের জন্য এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জও বটে। তারা অখন্ড ভারতের এই নতুন চাপ মাথা পেতে নেবে না এই চাপ থেকে মুক্ত হবার জন্য ‘নতুন লড়াই’ শুরু করবে ‘নতুন কৌশলে’ সেটাই ভাবার বিষয়।

শুভ কিবরিয়া: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক।

নীতির রাজার বিদায়

নীতির রাজার বিদায়
প্রয়াত অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ

আমার গ্রামের বাড়ি দাউদকান্দি। দেবীদ্বার আমার পাশের উপজেলা, যেটি ছিল অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের নির্বাচনী এলাকা। তাই ন্যাপ, মোজাফফর, কুঁড়েঘর শব্দগুলোর ঢেউ দেবীদ্বার থেকে দাউদকান্দিতে আমাদের কানে পৌছে যেতো অনায়াসে। ৭৩এর নির্বাচনের স্মৃতি তেমন নেই। শুধু মনে আছে জাসদের বেশ দাপট ছিল। পরে জেনেছি, দাউদকান্দিতে জাসদের রশিদ ইঞ্জিনিয়ারকে হারিয়ে খন্দকার মোশতাককে জেতাতে হেলিকপ্টারে ব্যালট বাক্স ঢাকায় নিতে হয়েছিল। যা বলছিলাম, আমাদের স্মৃতির প্রথম নির্বাচন ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন। ১০ বছর বয়সে অতকিছু বুঝিনি, খালি বুঝেছি, নির্বাচন মানেই স্লোগান, মিছিল, আনন্দ। তো সেই নির্বাচনে নিজের এলাকা ছাপিয়ে পাশের এলাকার কিছু স্লোগান এখনও কানে গেঁথে আছে। হয়তো ছন্দময়তার জন্য, তবে ভুলিনি এখনো- আমার নাম মোজাফফর, মার্কা আমার কুঁড়েঘর; আমার নাম মোজাফফর আহমেদ নুরী, আমি পথে পথে ঘুরি; মোজাফফরের কুঁড়েঘর, ভাইঙ্গা-চুইড়া নৌকাত ভর। এরকম মোজাফফরের পক্ষে-বিপক্ষের নানা স্লোগান কানে আসতো, আসতো নানা গল্পও। ৭৫'র আগ পর্যন্ত আমাদের অঞ্চলে সবচেয়ে বড় জাতীয় নেতা ছিল খন্দকার মোশতাক। এই কুলাঙ্গারের পতনের পর সবচেয়ে কাছের জাতীয় নেতা হলেন মোজাফফর আহমেদ। তখনও দেখিনি, কিন্তু নানান অবিশ্বাস্য গল্প কানে আসে। বিশাল বড় নেতা, কিন্তু একদম মাটির মানুষ। মার্কা যেমন কুঁড়েঘর, মানুষও তেমনি কুঁড়েঘরেরই। মানুষের সাথে মিশে যাচ্ছেন, তাদের মত করে। তাদের ভাষায় কথা বলছেন। লুঙ্গি পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ১৯৭৯ সালের সাজানো একতরফা নির্বাচনে ধানের শীষের জোয়ারও মোজাফফরের কুঁড়েঘরকে ভাসিয়ে নিতে পারেনি। ১৯৮১ সালে ন্যাপ-সিপিবির প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন কুঁড়েঘরের মোজাফফর। জিয়াউর রহমানকে জেতাতে আয়োজিত সে নির্বাচনে অন্য কারো জেতার সুযোগই ছিল না।

আমাদের পাশের বাড়ির নেতা হলেও পরে বুঝেছি তিনি দেবীদ্বার বা কুমিল্লা বা বাংলাদেশের নেতা নন; বিশ্বের বাম আন্দোলনেও তার নাম লেখা আছে। ছেলেবেলা থেকে নাম, স্লোগান, নানান গল্প শুনলেও অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদকে প্রথম দেখি ১৯৯১ সালে। তখন আমরা প্রিয় প্রজন্ম নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করতাম। ফজলুল বারী সম্পাদিত সে পত্রিকার অফিস ছিল ৭৬ সেগুনবাগিচায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দক্ষিণ পাশে। আর অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের বাসা ছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উত্তর পাশে কাকরাইলে। তিনি প্রায়শই সকালে লুঙ্গি পড়ে আমাদের অফিসে চলে আসতেন, একসাথে অনেক পত্রিকা পড়ার আকাঙ্খায়। তিনি পত্রিকা পড়তেন, আর আমরা তাঁর গল্প শুনতাম। ছেলেবেলায় তাঁর সম্পর্কে যা যা শুনেছি, তার একবিন্দুও মিথ্যা নয়। সেই কুঁড়েঘরের মাটির মানুষ। কুমিল্লার আঞ্চলিক টানে কথা বলছেন, বকা দিচ্ছেন। আমরা জানতাম রোদ চড়লে তাঁর মেজাজও চড়ে যায়।

আমাদের কাছে মনে হয় অতি কাছের জন, কিন্তু তিনি অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ; ইতিহাসের সাক্ষি নন, তিনি নিজেই ইতিহাস। শুধু বাংলাদেশ নয়, এই উপমহাদেশের বাম আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, মুজিবনগর সরকারের ৬ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদের একজন, ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়ন গেরিলা বাহিনীর সংগঠক, একাত্তরে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন দেশ, প্রতিনিধিত্ব করেছেন জাতিসংঘে, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠজন, ভিন্ন দলের হলেও বঙ্গবন্ধু যাকে মন্ত্রী করতে চেয়েছিলেন; সেই অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ পত্রিকা পড়তে আমাদের অফিসে আসেন! নিজেদের ভাগ্যকে ঈর্ষা করার মত ম্যাচুরিটি তখনও হয়তো হয়নি আমাদের।

১৯৩৭ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে চান্দিনায় মহাত্মা গান্ধীর জনসভায় যোগ দিতে গিয়ে রাজনীতিতে হাতেখড়ি। তারপর মৃত্যু পর্যন্ত রাজনীতির লাঠি আর ছাড়েননি। বরং রাজনীতি করবেন বলে ছেড়েছেন অনেককিছু, এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার মত নিশ্চিন্তের চাকরিও। বরং বেছে নিয়েছেন মামলা, হুলিয়া, আত্মগোপন আর কারাবরণের ঝুঁকি। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ- ২৩ বছরের মুক্তিসংগ্রামেও ছিলেন মোজাফফর।

৫৪এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ৩২ বছরের টগবগে তরুণ মোজাফফর তখনকার মুসলিম লীগের শিক্ষামন্ত্রী মফিজুল ইসলামকে হারিয়ে চমক সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি ছিলেন মাওলানা ভাসানীর অনুসারী। কিন্তু ৬৭ সালে আদর্শের প্রশ্নে দুজনার দুটি পথ দুটি দিকে বেকে যায়। ভাসানীর নেতৃত্বে রয়ে যায় চীনপন্থি বামরা। আর মস্কোপন্থিদের নেতৃত্ব দেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ। সেই থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনিই ন্যাপ'এর সভাপতি। আপনি তার অনেক কাজের সমালোচনা করতে পারবেন। কেন তিনি ৫২ বছর ধরে একটি দলের সভাপতি, ধর্ম-কর্ম-সমাজতন্ত্র আসলে এক ধরনের বিভ্রান্তি, সমাজতন্ত্রকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌছাতে পারেননি কেন? স্বাধীনতার পর ন্যাপ-সিপিবি কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা রাখতে পারেনি বলেই উগ্র জাসদ আর প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি সেই জায়গাটা  পূরণ করে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করেছিল। এই সব প্রশ্ন-অভিযোগ আপনি তুলতেই পারেন। সাংগঠনিক ভাবে অনেক প্রশ্ন থাকলেও ব্যক্তি অধ্যাপক মোজাফফরের বিরুদ্ধে কেউ কখনো কোনো অভিযোগের আঙ্গুল তুলতে পারেনি। তাঁর সততা, নিষ্ঠা, আদর্শের প্রতি একাগ্রতার কোনো তুলনা নেই। তিনি আদর্শের সাথে একচুলও আপস করেননি। বিশ্বাস থেকে নড়েননি এক ইঞ্চিও। তার অনেক কমরেড যখন নামের আগে আলহাজ্ব বসিয়ে নেন, তখনও তিনি বামপন্থায় অবিচল। আপস না করে, লোভের উর্ধ্বে থেকেও যে এই বাংলাদেশে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রাজনীতি করা যায়, তার উদাহরণ হয়ে থাকবেন মোজাফফর আহমেদ। এখনকার রাজনীতিবিদদের দেখলে মনে হয়, রাজনীতি মানে রাজা হওয়ার নীতি। আর অধ্যাপক মোজাফফরদের দেখলে মনে হয়, রাজনীতি আসলে নীতির রাজা। মন্ত্রিত্ব যার সম্মতির অপেক্ষায় ফিরে যায়, সেই তিনি শেষ বয়সে স্বাধীনতা পদকও ফিরিয়ে দেন, কারণ পদকের জন্য বা কিছু পাওয়ার আশায় মুক্তিযুদ্ধ করেননি। মন্ত্রিত্ব ফিরিয়ে দেয়া, পদক ফিরিয়ে এমন সন্তপুরুষ রাজনীতি আর কখনো পাবে?

অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের একটা যুগের অবসান ঘটলো। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া সর্বশেষ জাতীয় নেতা ছিলেন তিনি। তার স্মৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। আমাদের এখনকার রাজনীতিবিদরা যদি অধ্যাপক মোজাফফরের জীবন থেকে কিছু শেখেন, জাতির বড্ড উপকার হয়।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র