Barta24

মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০১৯, ৭ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

একজন এরশাদ

একজন এরশাদ
ড. মাহফুজ পারভেজ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর
ড. মাহফুজ পারভেজ
কন্ট্রিবিউটিং এডিটর
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম


  • Font increase
  • Font Decrease

আমাদের তারুণ্য ও যৌবন কেটেছে এরশাদের সামরিক শাসনের বিরোধিতা করে। আমাদের শিক্ষাজীবনের একটা বড় অংশ বিনষ্ট হয়েছে এরশাদের সামরিক শাসনে সৃষ্ট ভ্যাকেশন ও সেশনজটে। আমাদের প্রজন্মের প্রায় সবার কাছেই এরশাদ একজন নেতিবাচক চরিত্র।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরশাদের আগমন নাটকীয়। পেশাগত জীবনে ক্ষমতা ও রাজনীতির ত্রি-সীমানায় তিনি ছিলেন না। অ্যাম্বিশান দেখাননি কখনো। চুপচাপ পেশাদারিত্বে নিরাপদে কাটিয়েছেন চাকরি জীবন। অকস্মাৎ, আশ্চর্যজনকভাবে সামরিক অভ্যুত্থান, পাল্টা-অভুত্থানের রক্ত পিচ্ছিল পথে সেনাপ্রধান থেকে তিনিই রাষ্ট্রপ্রধানের শীর্ষ পদে আসীন হন।

এরশাদের উত্থান ঘটে আশির দশকের গোড়ার দিকে। তারপর নব্বই দশকের শুরুর দিনগুলো পর্যন্ত তিনি ক্ষমতা আঁকড়ে থাকলেও রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সমর্থন তিনি পাননি। তার আমলে নির্বাচন ব্যবস্থা চরম অবক্ষয়ের শিকার হয়। হোন্ডা আর গুণ্ডা দিয়ে নির্বাচনে জেতার সংস্কৃতি চালু করেন এরশাদ।

Ershad
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ/ ছবি: সংগৃহীত

 

গণভোট, জাতীয় নির্বাচন ইত্যাদির আয়োজন করলেও লেজিটিমেসি বা বৈধতা বলে যে কথাটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিভাষায় রয়েছে, তা তিনি অর্জন করতে পারেননি। বৈধতার সঙ্কট নিয়েই তাকে ক্ষমতায় থাকতে ও ক্ষমতা ত্যাগ করতে হয়। তার অনেকগুলো বিশেষণের মধ্যে স্বৈরাচার, বিশ্ব বেহায়া ইত্যাদি ছিল প্রধান।

ক্ষমতার দশ বছর পেরিয়ে এরশাদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরও তিরিশ বছর সরব ছিলেন। একটি বিষয় তার সব সমালোচনার পরেও ইতিবাচক হয়ে আছে, তা হলো- ক্ষমতাচ্যুৎ হলেও তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাননি। দেশেই থেকেছেন। রাজনীতি করেছেন। জেল-জুলুম সহ্য করেছেন। এখানেই অন্যান্য ক্ষমতা দখলকারী স্বৈরাচারের সঙ্গে এরশাদের আচরণগত পার্থক্য।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে তার দল জাতীয় পার্টিকে নিয়ে তিনি চলতে চেয়েছেন। তবে, পরিতাপের বিষয় হলো- যে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি করে তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন, ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হয়েও তিনি সেই ষড়যন্ত্রের কবলে পড়েন। বড় দলগুলো তাকে জেলে রেখে বা চাপে রেখে সুবিধা নিয়েছে এবং অনেক ধরনের চাপ সহ্য করতে না পেরে তিনি নানা রকমের নাটক করেছেন। এসব ঘটনায় তার প্রতি জনসমর্থন বা জনসহানুভূতি কতটুকু বেড়েছে, তা স্পষ্ট না হলেও তার প্রতি জনকৌতূহল যে এন্তার বেড়েছে, তা বলাই বাহুল্য।

রাজনৈতিক কৌতুহলের পাশাপাশি এরশাদের ব্যক্তিগত আচরণ ও নারীঘটিত বিষয়াদি তাকে আরও বেশি আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এনেছে। এসব আলোচনা যতটা না রাজনৈতিক, তার চেয়ে বেশি ব্যক্তিগত, অস্বাস্থ্যকর ও হাস্য-রসাত্মক।

Ershad
বন্যার্তদের পাশে এরশাদ /ছবি: সংগৃহীত

 

বস্তুত, ক্ষমতা ও ক্ষমতার বাইরে এরশাদ একজন আলোচিত ব্যক্তি ছিলেন কিন্তু আস্থাভাজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন কিনা, তা চট করে বলা যায় না। জাতীয় রাজনীতিতে তার কিছু অংশগ্রহণ থাকলেও জাতীয় নেতৃত্বের ঐতিহ্যবাহী-সুদীর্ঘ তালিকায় তার নাম সংযুক্ত হওয়ার বিষয়টিও আজকেই নির্ধারণ করা সম্ভব হবে না। বরং উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশের রাজনৈতিতে নেতিবাচক চরিত্রের কাফেলায় তিনি সগৌরবে থাকবেন। যেখানে আগে থেকেই আছেন সামরিক স্বৈরশাসক ইস্কান্দার মির্জা, আইয়ুব খান, আ. মোনেম খান, ইয়াহিয়া খান প্রমুখ।

কিন্তু এরশাদ অনেকগুলো বিষয়ে অন্যান্য স্বৈরশাসকের চেয়ে আলাদা হয়ে আছেন। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকে তিনি এমন কিছু কাজ করেছেন, যেগুলোকে অস্বীকারও করা যায় না। তার ওষুধ নীতি, ভূমি সংস্কার, যোগাযোগ ও উন্নয়ন নেটওয়ার্ক তৈরির প্রচেষ্টার কিছু সুফল এখনো পাওয়া যাচ্ছে।

ফলে বস্তুনিষ্ঠ রাজনৈতিক মূল্যায়নে একজন ব্যক্তি মানুষ ও শাসক হিসেবে এরশাদের প্রসঙ্গে অনেকগুলো সমালোচনার সঙ্গে সঙ্গে কিছু ভালো কথাও থাকবে। গণতন্ত্র ও সামরিক শাসনের প্রশ্নে নীতিগত তীব্র বিরোধিতা করার পরেও আমরা এরশাদের জনকল্যণকামী প্রচেষ্টা ও সংবেদনশীল মনের পরিচয়ও লক্ষ্য করব।

কঠোর সামরিক শাসক হিসেবে গণতন্ত্রকামী হাজার হাজার মানুষের জেল-জুলুমের কারণ ও জীবন অতিষ্ঠকারী এই চরিত্র, খুবই আশ্চর্যজনকভাবে একজন কবি হতে আগ্রহী ছিলেন। ‘কনক প্রদীন জ্বালো’ নামের একটি কাব্যগ্রন্থ তার আছে। আর আছে দলমত নির্বিশেষে সমকালীন অগ্রণী কবিদের অর্থ, বিত্ত এবং বনানী-গুলশানে প্লট দেওয়ার কোমলতা।

সন্দেহ নেই, ক্ষেত্র বিশেষে এইসব পক্ষপাত এরশাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক কার্যক্রমকে সমর্থন করার নৈতিক শক্তি দেয় না। তার অগণতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক তকমাকেও আড়াল করে না। বরং তাকে ইতিহাসের সংকুল সময়ের এক হতভাগ্য মানুষ হিসেবেই আমাদের সামনে দাঁড় করায়।

Ershad
ত্রাণ বিতরণ করছেন এরশাদ/ ছবি: সংগৃহীত

 

ক্ষমতা দখল করে তিনি ব্যক্তিগত লাভ এবং ঐতিহাসিক স্বীকৃতির কোনটা কতটুকু পেয়েছেন, এ প্রশ্নটিও ইতিহাসের নিরিখে অমীমাংসিত থাকে। ক্ষমতার রাজনীতির পাশা খেলায় বহুবার ব্যবহৃত হয়ে জীর্ণ ও অকেজো অবস্থায় তিনি ইতিহাসের কাছে কীরূপ মূল্যায়ন পাবেন, তা জানার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

কারণ, বিপরীতমুখী দু’টি মাছের প্রতীক রাশি মীনের জাতক হিসেবে এরশাদের অবস্থান সমালোচনা ও প্রশংসার ক্রসরোডে। ‘মিস্টার হাইড অ্যান্ড মিস্টার জেকিল’ উপন্যাসের চরিত্রের মতোই তারও পরস্পর-বিরোধী দু’টি সত্ত্বা অতি স্পষ্ট।

একদিকে তিনি ক্ষমতা দখল ও নিপীড়ন করেছেন এবং অন্যদিকে বেনিভোলেন্ট ডিকটেটর বা জনমুখী স্বৈরাচারের মতো মানুষের কাছে গিয়েছেন। বন্যায়, বির্পযয়ে ‘তোমাদের পাশে এসে বিপদের সাথী হতে আজকের চেষ্টা আমার’ গান বাজিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন। দলের লোকদের দিয়ে নিজেকে ‘পল্লীবন্ধু’ আখ্যা দিয়েছেন।

স্বৈরতান্ত্রিকতা আর মানবিকতার সুতীব্র দোদুল্যমানতায় একজন এরশাদ শেষ বিচারে ইতিহাসের তুলাদণ্ডে কোন ব্যক্তিত্ব ও পরিচিতিতে গৃহীত হবেন, একমাত্র মহাকালই যথাসময়ে তা জানাতে পারবে।

আপনার মতামত লিখুন :

প্রিয়া সাহা, দেশটা কিন্তু আপনারও

প্রিয়া সাহা, দেশটা কিন্তু আপনারও
প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক স্লোগান আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। 'জয়বাংলা' বলেই মুক্তিযোদ্ধারা ঝাঁপিয়ে পড়তো যুদ্ধে, একদম জীবনের মায়া না করে। কিন্তু আমার সবচেয়ে প্রিয় স্লোগান 'বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রিস্টান, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালি'। ছোট্ট এই স্লোগানে আমাদের পুরো আকাঙ্ক্ষাটা ধারণ করা আছে, এটাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তান থেকে আমরা যুদ্ধ করে স্বাধীন করেছি অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ব বলে। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলমান সবাই মিলে একসাথে থাকব; এটাই ছিল স্বপ্ন, এটাই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা। এই স্লোগানে বাঙালি ছাড়া অন্য জাতিগোষ্ঠী বা আদিবাসীদের কথা নেই বটে, তবে এই স্লোগানের চেতনা সবাইকে ধারণ করার। বাঙালি, আদিবাসী সবাই মিলেই গড়ব দেশ।

আমরা চেয়েছি বটে, কিন্তু সবাইকে নিয়ে অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ার স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। স্বপ্নের পথে হাটতে গিয়ে আমরা বারবার হোঁচট খেয়েছি। হোঁচট খেয়েছি, আবার উঠে দাঁড়িয়েছি। বারবার হোঁচট খেয়েও স্বপ্ন হারাইনি, পথ ভুল করিনি। এখনও আমরা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের পথেই হাটছি। পথে খাওয়া কিছু হোচট ছোটখাটো, খাই আবার ভুলে যাই। কিছু হোঁচট আমাদের রক্তাক্ত করে দেয়, বেদনা ভুলতে পারি না। যেমন ২০০১ সালের নির্বাচনের পর দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, রামুর ঘটনা আমরা ভুলতে পারি না। তারপরও আমি বলছি, বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পৃথিবীর অনেক দেশের চেয়ে ভালো। তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি সত্যিকারের অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়তে আমাদের আরো অনেক লম্বা দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হবে।

সাম্প্রদায়িকতা আমাদের অনেক পুরোনো সমস্যা। ৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীনই হয়েছিল সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে। একাত্তর সালে আমরা পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হলেও আমাদেরই কেউ কেউ অন্তরে পাকিস্তানকে ধারণ করেন, সাম্প্রদায়িকতার বিষ তাদের অন্তরজুড়ে। আমাদের অনেকের রক্তে মিশে আছে ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িকতা।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় ধর্মের কারণে অনেকে দেশান্তরী হন। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময়ও অনেকে দেশ ছেড়েছেন। একাত্তরে অনেকে শরণার্থী হিসেবে দেশ ছাড়লেও তাদের প্রায় সবাই ফিরে এসেছেন। কিন্তু স্বাধীনতার পরও কিন্তু বিভিন্ন সময়ে অনেকে দেশ ছেড়েছেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ছিল প্রায় ৩০ ভাগ, একাত্তরেও ছিল ২০ ভাগ। কিন্তু এখন কেন কমতে কমতে ১০ ভাগের নিচে নেমে এসেছে; তার কারণ খুঁজে বের করতে হবে আমাদেরই। আমাদের মানে, আমরা যারা ধর্মীয় পরিচেয় সংখ্যাগুরু।

সংখ্যালঘু শব্দটা নিয়েই আমার প্রবল আপত্তি। তারপরও বলছি, সংখ্যালঘুদের মর্যাদা, নিরাপত্তা, অধিকার নিশ্চিত করা সংখ্যাগুরুর দায়িত্ব। বাংলাদেশে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ নামে একটি সংগঠন আছে। ১৯৭৫ -এর পর জিয়া-এরশাদ মিলে যখন দেশকে আবার পাকিস্তান বানাতে চেয়েছিল, এরশাদ যখন রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো বদলে দিয়ে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করেন; তখন গড়ে উঠেছিল এই সংগঠনটি। কিন্তু এমন একটি সংগঠনের থাকাটাই আমাদের সংখ্যাগুরুদের জন্য লজ্জার। তার মানে আমরা সংখ্যাগুরুরা তাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছি। তাই নিজেদের অধিকার আদায়ে তাদের সংগঠন করতে হয়েছে। যদি সংগঠনের নাম হতো; হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান সংহতি পরিষদ; আর তার নেতা যদি হতেন মুসলমানরা; তাহলে বুঝতাম যে আমরা মানে সংখ্যাগুরুরা ভালো মানুষ। কিন্তু মানুষ হিসেবে আমরা অত ভালো নই।

বাংলাদেশে সাধারণভাবে আওয়ামী লীগ সংখ্যালঘুদের বন্ধু। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন দুর্বিষহ ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের গত ১১ বছরের শাসনামলেও সংখ্যালঘুরা স্বর্গে আছে, তেমন ভাবার কারণ নেই। এই সময়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হয়েছে বারবার। পূজার সময় হলেই কোথাও না কোথাও মূর্তি ভাঙ্গার খবর আসে।

আসলে হিন্দুদের ওপর হামলার ঘটনা সবসময় রাজনৈতিক নয়, ধর্মীয় নয়; কখনো কখনো নিছকই স্বার্থ। ভয় দেখিয়ে তাদের তাড়াতে পারলে জমি দখল করা যাবে বা সস্তায় কেনা যাবে। সাম্প্রদায়িকতা আমাদের কারো কারো ফ্যাশন। নির্বাচনে জিতলে হিন্দুদের ওপর হামলা হয়, হারলে হামলা হয়, ভোট দিতে গেলে হামলা হয়, ভোট না দিলে হামলা হয়, যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির রায় হলে হামলা হয়, ফাঁসি কার্যকর হলে হামলা হয়।

আর সাম্প্রদায়িক হামলার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিকটা হলো, আক্রান্তের মনে নিরাপত্তহীনতা তৈরি করা। একবার হামলার পর মনের ভিতর যে নিরাপত্তাহীনতাবোধ তৈরি হয়, তা তো কোনোভাবেই দূর করা যায় না। চট্টগ্রামে হামলা হলে, আতঙ্কের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। সেই নিরাপত্তহীনতার বোধ থেকেই দেশ ছেড়ে যাওয়ার মতো কঠিনতম সিদ্ধান্ত নিয় ফেলেন কেউ কেউ। আর হিন্দুরা দেশ ছেড়ে গেলে এই দেশের কারো কারো সুবিধা হয় বটে।

আগেই বলেছি সংখ্যালঘু শব্দটা নিয়েই আমার আপত্তি। একটি স্বাধীন দেশে সবাই সমান হবে। ধর্মের ভিত্তিতে, সংখ্যার ভিত্তিতে মানুষকে আমরা গুনব কেন? আমি নিজে কখনো মানুষকে তার ধর্ম, বর্ণ, জাতি, গোষ্ঠী দিয়ে বিবেচনা করি না। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, চাকমা, গারো, মুরং- কত বৈচিত্র্য আমাদের। চাইলেই আমরা আমাদের দেশকে সত্যিকারের ‘রেইনবো কান্ট্রি’ হিসেবে গড়ে তুলতে পারতাম; কিন্তু পারিনি তো। আসলে সংখ্যালঘু টার্মটাই খুব আপেক্ষিক। এখানে যারা সংখ্যাগুরু, সীমানা পেরিয়ে ভারতে গেলে তারাই সংখ্যালঘু।

বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক মানুষের সংখ্যা খুবই কম, শুভবুদ্ধির মানুষের সংখ্যাই বেশি। অল্পকিছু মানুষের অপকর্মের জন্য আমাদের বারবার লজ্জিত হতে হয়, গ্লানিতে আমরা মুখ দেখাতে পারি না। এতকিছুর পরও বাংলাদেশ শেষ বিচারে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিরই দেশ। একই ভবনে বা পাশাপাশি ভবনে মসজিদ আর মন্দির আছে এই বাংলাদেশেই। এখনও কোথাও কোনো সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটলে সংখ্যাগুরু শুভবুদ্ধির মানুষই এগিয়ে আসে, প্রতিবাদ করে। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করা যাবে না।

প্রিয়া সাহা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে যে নালিশ করেছেন, তা কোনোভাবেই সত্য নয়। ভয়ঙ্কর এক মিথ্যা দিয়ে তিনি বাংলাদেশকে হেয় করতে চেয়েছেন। ভিডিওটা প্রথম যখন দেখি, তখন এই নারীকে আমি চিনতাম না, নামও জানতাম না। পরে দ্রুত জানলাম, তার নাম প্রিয়া সাহা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি ‘শাড়ি’ নামে একটি এনজিওর নির্বাহী পরিচালক, ‘দলিত কণ্ঠ’ নামে একটি পত্রিকার সম্পাদক। তিনি হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক। তার স্বামী দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সহকারী পরিচালক। তার ভাই অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব।

যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আমন্ত্রণেই তিনি সেখানে গেছেন। বিভিন্ন সময় তোলা মন্ত্রী ও সমাজের প্রভাবশালীদের সাথে তার ছবি রয়েছে। তার মানে সব মিলিয়ে প্রিয়া সাহা বাংলাদেশের সমাজে একজন প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। সেই তিনি যখন তার বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার কথা বলেন, জমিজমা কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ করেন, তখন বোঝাই যায়, এটা অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, দুরভিসন্ধমিূলক।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে তিনি বলেছেন, ‘আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। সেখানে ৩ কোটি ৭০ লাখ হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ খ্রিস্টান হারিয়ে গেছে। এখনো সেখানে ১ কোটি ৮০ লাখ সংখ্যালঘু জনগণ রয়েছে। দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন। আমরা আমাদের দেশ ত্যাগ করতে চাই না। আমি আমার ঘর হারিয়েছি, আমার জমি নিয়ে নিয়েছে, আমার ঘরবাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে কিন্তু সেসবের কোনো বিচার হয়নি।‘

প্রিয়া সাহা যা বলেছেন, তার পুরোটাই মিথ্যা। ৩ কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘু ‘ডিজঅ্যাপিয়ার’ হয়ে গেছে, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। বাংলাদেশের কোনো মানুষ তার এই কথা বিশ্বাস করবে না। এখন এক কোটি ৮০ লাখ সংখ্যালঘুকে দেশে থাকতে হলে ট্রাম্পের সহায়তা লাগবে, এটাও বাংলাদেশের বাস্তবতা নয়। আর প্রিয়া সাহা তার বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া এবং জমি দখলের বিচার বাংলাদেশের কারো কাছে কি চেয়েছেন? যিনি ওভাল অফিসে পৌঁছে যেতে পারেন, তিনি চাইলে নিশ্চয়ই গণভবনেও যেতে পারতেন। সাংবাদিকদের কাছে বলতে পারতেন। মামলা করতে পারতেন। তা না করে সরাসরি ট্রাম্পের কাছে বিচার দিলেন!

বাস্তবতা হলো বাংলাদেশে অল্প জমি, অনেক মানুষ। তাই জমিজমা সংক্রান্ত ঝামেলা অনেক হয়। অনেক মুসলমানের জমিও প্রভাবশালী কেউ দখল করে রাখে। এর সাথে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে কোনো হিন্দু যদি অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হন, তাহলে তিনি দুর্বলতর। প্রান্তে থাকা এই মানুষগুলো দ্রুতই ছিটকে যায়, বাস্তুচ্যুত হয়ে যায়। এই প্রবণতা থেকে কিন্তু দুর্বল মুসলমানরাও রেহাই পায় না। দুর্বল হিন্দুরা যেমন আক্রান্ত হন, দুর্বল মুসলমানরাও কিন্তু হন। ঝুকিতে থাকেন নারীরাও। এটা ঠিক দুর্বল হিন্দুদের ঝুঁকি বেশি। হিন্দুদের ওপর অনেক রকম অত্যাচার-নির্যাতন হয়, কিন্তু স্রেফ হিন্দু বলে কি প্রিয়া সাহা কখনো বঞ্চিত হয়েছেন? আমার মনে হয় না। হলে তিনি এবং তার পরিবার এত দূর আসতে পারতেন না।

জীবনটা আসলে লড়াইয়ের। লড়তে হবে নিরন্তর। ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা যেমন বঞ্চিত হন, অর্থনৈতিক সংখ্যালঘুরাও হন। ধানচাষিরাই তো প্রতিবছর নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হচ্ছেন। তবে ধর্মীয় কারণে আঘাত সবচেয়ে বেশি কষ্টের, সবচেয়ে বেশি ঘৃণার। বাংলাদেশের যে কোনো প্রান্তে সংখ্যালঘুদের ওপর যে কোনো আঘাত আমার বুকেও লাগে। সংখ্যাগুরু হিসেবে আমাকে লজ্জিত করে, ছোট করে। তবে কোনো অবস্থাতেই হাল ছেড়ে দেয়া যাবে না। প্রয়োজনে মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে হবে। আমি জানি শিকড় ছেড়ে কেউ যেতে চান না। তবুও অনেকে বাধ্য হন।

একটা ছোট্ট কথা বলি, বাংলাদেশের কোনো মুসলমান যতই নির্যাতিত হোক, নিপীড়িত হোক; কখনো দেশ ছাড়ার কথা ভাবে না। কিন্তু হিন্দুদের কেউ কেউ অনেক কম আঘাতেও দেশ ছাড়ে। আমি এমন অনেক হিন্দুকে চিনি, যারা আয় করেন ঢাকায়, সম্পদ গড়েন কলকাতায়। ভারত একটি বিকল্প- এই ভাবনাটা যতদিন কোনো কোনো হিন্দুর মাথা থেকে না যাবে, ততদিন এই সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান হবে না।

ভাবুন, বাংলাদেশ আমাদের সবার, এর কোনো বিকল্প নেই। তারপরও যদি বিকল্প খুজতেই চান, আমেরিকা, ইউরোপ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিদেনপক্ষে মালয়েশিয়ায় খুঁজুন; ভারতে নয়। এই দেশ যতটা আমার, ততটা প্রিয়া সাহারও। প্রিয়া সাহা কেন দেশে থাকতে পারবেন না, সেটা অবশ্যই খুঁজে দেখতে হবে। প্রিয়া সাহা যদি বাংলাদেশকে ভালোবাসতেন, তাহলে এই অভিযোগের প্রতিক্রিয়াটা বুঝতেন, তার এই মিথ্যা অভিযোগ বাংলাদেশকে কতটা খাটো করেছে টের পেতেন।

প্রিয়া সাহা মিথ্যা অভিযোগ করে বাংলাদেশকে হেয় করেছেন, আমাদের অপমান করেছেন। তিনি যদি ট্রাম্পের কাছে সত্যি অভিযোগও করতেন, তাও আমি প্রতিবাদ করতাম। ডোনাল্ড ট্রাম্প কে, তার কাছে নালিশ করতে হবে কেন? ট্রাম্প যদি আপনাদের উদ্ধার করার জন্য আমাদের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে বা সেনাবাহিনী পাঠায়; আপনি খুশি হবেন?

প্রিয়া সাহা কেন ট্রাম্পের কাছে এমন নালিশ করলেন, জানি না। রাজনৈতিক আশ্রয় বা নিজের ঘরবাড়ি রক্ষার জন্য যদি হয়, তাহলে মানতে হবে ব্যক্তি স্বার্থে তিনি দেশকে বাজি ধরেছেন। তিনি আসলে রাষ্ট্রকেই বিকিয়ে দিয়েছেন। যদি তিনি অ্যাটেনশন পাওয়ার জন্য করে থাকেন, তাহলে মানতে হবে তিনি ষোলো আনা সফল। বাংলাদেশের সবাই এখন তাকে চেনে। তবে মজাটা হলো, কেউ তাকে পছন্দ করে না।

ধর্ম নির্বিশেষে সবাই প্রিয়া সাহার ভুল জায়গায়, মিথ্যা নালিশ করার নিন্দা করছে। এমনকি যে সংগঠনের তিনি সাংগঠনিক সম্পাদক, সেই হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদও তাকে সমর্থন দেয়নি। এটা আমার কাছে ভালো লেগেছে। ভালো লেগেছে যে, আমার অধিকাংশ হিন্দু বন্ধুই প্রিয়া সাহার সমালোচনা করেছেন। তারা বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির যৌক্তিক অবস্থাটা জানেন, তারা সেই আলোকেই এর সমাধান খোঁজেন।

প্রিয়া সাহা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রতিনিধি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে যাননি, তাকে কেউ ট্রাম্পের কাছে নালিশ করতেও বলেনি। তারপরও তিনি যদি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্বার্থে নালিশ করেছেন, ভেবে থাকেন, ভুল ভেবেছেন। প্রিয়া সাহার এই নালিশ, বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে আরো বিপাকে ফেলবে।

স্বাধীনতার পর যে ক’টি ঘটনা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্ষতির কারণ হয়েছে, তার মধ্যে ওপরের দিকে থাকবে প্রিয়া সাহার এই ঘটনা। প্রিয়া সাহার মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত নালিশের আড়ালে অনেকগুলো সত্যিকারের বঞ্চনাও হারিয়ে যাবে।

তবে প্রিয়া সাহার নালিশের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে আমরা যা করেছি, তাতে কিন্তু আমাদের অনেকের মুখোশ খুলে গেছে। প্রিয়া সাহা ভয়ঙ্কর অন্যায় করেছেন, তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু তাকে যে ভাষায় গালি দিলেন, তাকে যা যা করতে চাইলেন, যা যা শাস্তি দিতে চাইলেন; তা কি কোনো সভ্য মানুষের ভাষা?

প্রিয়া সাহা সাম্প্রদায়িক। কিন্তু আপনি তাকে গালি দিতে গিয়ে তো নিজেকে আরো বড় সাম্প্রদায়িক প্রমাণ করলেন। আপনাদের প্রতিক্রিয়াই তো প্রমাণ করে প্রিয়া সাহার পরিসংখ্যান ভুল হলেও সংখ্যালঘুদের দুর্দশাটা ভুল নয়। নিজের চিন্তাজুড়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষ নিয়ে আরেকজনকে গালি দেওয়া যায় না।

প্রিয় সংখ্যাগুরু ভাইয়েরা আসুন আমাদের চিন্তার প্যাটার্ন বদলাই। এই দেশ যতটা মুসলমানের, ততটাই হিন্দুর, বৌদ্ধের, খ্রিস্টানের, চাকমার, মারমার; এমনকি ধর্মহীন মানুষেরও সমান অধিকার এই দেশে। শুধু সংখ্যায় নয়, গুরু হতে হবে মানবিকতায়, বিবেকে, বুদ্ধিতে। যখন আপনার চিন্তা থেকে, ভাষা থেকে, হাত থেকে আপনার সংখ্যালঘু প্রতিবেশী নিরাপদ; যখন কোনো সংখ্যালঘু আক্রান্ত হলে আপনার প্রাণ কাঁদে, আপনি সবার আগে প্রতিবাদ করেন; যখন আপনি আপনার সংখ্যালঘু বন্ধুর মর্যাদা রক্ষা করেন, যখন আপনি তার মন থেকে দেশ ছাড়ার ভয় দূর করে দেন; তখন বুঝতে হবে আপনি ভালো মানুষ, ভালো সংখ্যাগুরু, ভালো মুসলমান।

পাল্টাতে হবে প্রিয়া সাহাদের চিন্তার প্যাটার্ন। ভাবতে হবে, এটাই আমার দেশ, আমার কোনো বিকল্প নেই। সব চিন্তা-ভাবনা, সহায়-সম্পদ, জ্ঞান-বুদ্ধি বাংলাদেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে। মন থেকে সব হীনমন্যতা ঝেড়ে ফেলতে হবে।

আসুন সবাই ধর্মটাকে ব্যক্তিগত চর্চায় রেখে, অপরের বিশ্বাসের প্রতি সম্মান রেখে; দেশটাকে এগিয়ে নেই। এই দেশটা আমাদের সবার।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

আরও পড়ুন: ট্রাম্পের কাছে করা অভিযোগের ব্যাখ্যা দিলেন প্রিয়া সাহা

কেন এই ছন্দপতন

কেন এই ছন্দপতন
তুষার আবদুল্লাহ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

সমাজ স্বাভাবিক জায়গায় নেই। অস্বাভাবিক আচরণ করছে। এই আচরণ নতুন নয়। তবে এবার অস্বাভাবিকতার চূড়ান্ত মাত্রায় বুঝি পৌঁছে গেল। সমাজ যাদের নিয়ে তৈরি, সেই মানুষেরা এখন তার গুণশূন্য। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে এখন আর মানবিক উপকরণ চোখে পড়ছে না। মানুষ এমন আচরণ করছে, যা পশুর মধ্যেও অনুপস্থিত। তাহলে মানুষ এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়াল?

আপনি বাড়ি থেকে বের হলেন। পথের কোথাও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। সামনে দিয়ে চলাচল করা কারো দিকে তাকাচ্ছেন। এমনিতেই তাকাচ্ছেন। কোনো শিশুকে দেখে তাকাতে পারেন। আপনার এই তাকানো দেখে এক দল হত্যাকারী আপনার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। যারা ঝাঁপিয়ে পড়ল, তাদের অনেকেই হয়তো এতোক্ষণ আপনার আশপাশেই ছিল। একজন বা দুইজন আপনার ওপর ঝাঁপ দিল তো ব্যস অন্য পথচারীদের একটি অংশ আপনাকে না বাঁচিয়ে ‘গণ’তে যোগ দিল। আপনি হয়ে গেলেন ছেলেধরা। কিংবা কোনো মেয়েকে উত্ত্যক্তকারী। আপনাকে কেউ বাঁচাতে আসবে না। দূরে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে থাকবে।

পথের কথা বাদ দিন। স্কুলের প্রধান শিক্ষকের ঘর থেকে একজন মাকে নামিয়ে এনে হত্যা করে ফেলল। প্রতিবন্ধী একজনকেও মেরে ফেলা হলো ছেলেধরা সন্দেহে। সেই হত্যাকাণ্ড সমাজ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে উপভোগ করল। ঢাকাই চলচ্চিত্রের মন্দা বাজারে এই দৃশ্য বেশ উপভোগ্য এখন সমাজের কাছে।

সমাজটাকে দেখলে আপনার মনে হবে হতাশায় ডুবে আছে। ব্যক্তিগতভাবে হয়তো আপনি এবং আমিও তাই। কেন এই হতাশা? দুর্নীতির সরলীকরণ এর একটি কারণ অবশ্যই। প্রত্যেকেই যার যার অবস্থান থেকে মৃদু বা ভয়াবহ দুর্নীতির সঙ্গে পেঁচিয়ে আছি। নিজে দুর্নীতি করছি অথবা সয়ে যাচ্ছি। দুর্নীতি সামাল দেওয়া, ভোগ করাও সহজ নয়। নানা দিক সামাল দিয়ে চলতে হয়। যখন নকশা মতো হচ্ছে না, তখন হাজার কোটি টাকার মালিকের মধ্যেও হতাশা দেখা দেয়। আবার আপনি নিজে দুর্নীতি করছেন না, কিন্তু দুর্নীতির শিকার। নীরবে সয়ে যেতে যেতে আপনি হতাশার ব্যাধিতে আক্রান্ত। শিক্ষার্থীরা শিক্ষা বাণিজ্যের ‘কড়ি’। কড়ি দিয়ে তারা সনদ কিনছে ঠিকই কিন্তু যুৎসই চাকরি পাচ্ছে না। সাধারণ কৃষক, উৎপাদক তার ফসল ও পণ্যের দাম থেকে বঞ্চিত। তারপরও সমাজের আকাশে টাকা উড়ছে। ওই টাকা ধরতে না পেরে কেউ হতাশ। আবার কেউ ধরতে পেরে সেই টাকা ভোগ করতে করতেও এক ধরনের হতাশা এসে তাদের ঘিরে ধরেছে।

বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা আছে। অপরাধের তদন্ত স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় দ্রুত আদালতে পৌঁছে না। হিমঘরে জমতে থাকে। অপরাধের কারণ ও অপরাধীদের সঙ্গে রাজনীতির এখন প্রবল আত্মীয়তা। ফলে অপরাধের স্বাভাবিক বিচার প্রক্রিয়া সচল না দেখে সাধারণের মধ্যে এক ধরনের হতাশার নিম্নচাপ তৈরি হয়। আমরা বুঝি এখন সেই নিম্নচাপের ঘূর্ণি দেখতে পাচ্ছি। এই ঘূর্ণিই নিজেকে প্রকাশের জন্য গুজবের ধুলি খুঁজে বের করছে। ফলাফল গণপিটুনি, হত্যা ও ধর্ষণ। এই ঘূর্ণি থেকে সমাজ, রাষ্ট্র পরিত্রাণ পাবে কোন উপায়ে? একবারেই যে ঘূর্ণি মোকাবেলার সাধ্য নেই আমাদের, তা নয়। আছে। যে স্বাভাবিক রাজনৈতিক অনুশীলন দেখে আমরা অভ্যস্ত, তা যদি আবার ফিরে আসে, তবেই দেখা যাবে হতাশার নিম্নচাপ কাটতে শুরু করেছে। মানুষ, সমাজ স্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করেছে। অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াও তখন স্বাভাবিক ছন্দে চলতে শুরু করবে।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র