Barta24

শনিবার, ২০ জুলাই ২০১৯, ৫ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

ধানের মূল্য বৃদ্ধি পাইবার আগেই কৃষক নিঃস্ব হইয়া গেল

ধানের মূল্য বৃদ্ধি পাইবার আগেই কৃষক নিঃস্ব হইয়া গেল
প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তা২৪.কম
প্রভাষ আমিন


  • Font increase
  • Font Decrease

চাঁদ দেখা নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি থাকলেও ঈদের আনন্দে তা ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি। আমরা সবাই বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় ঈদ উদযাপন করেছি। ঢাকাকে ফাঁকা করে অনেকেই শিকড়ের টানে গ্রামের বাড়ি ঘুরে এসেছেন।

লম্বা ছুটি শেষে সবাই আবার কাজে ফিরছেন। ঈদ উৎসব শেষ হতে না হতেই আমরা মজে গেছি ক্রিকেট উৎসবে। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলছে। এবার আমাদের স্বপ্ন সেমিফাইনাল খেলার। তাই ক্রিকেট নিয়ে মাতামাতির অন্ত নেই। এর মধ্যেই জাতি ঢুকে পড়েছে বাজেট উৎসবে। সব মিলিয়ে চারদিকে উৎসবমুখর পরিবেশ। কিন্তু আমরা কি কেউ খবর রেখেছি, যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আমাদের জন্য খাদ্য উৎপাদন করেন, সেই কৃষকরা কেমন আছেন? ক্রিকেট বা বাজেট নিয়ে মাথা ঘামানোর মত সময় হয়তো তাদের নেই। কিন্তু আর সবার মত ঈদ আসে তাদের জীবনেও। বছরে অন্তত একবার ঈদে সন্তানের জন্য নতুন পোশাক, ঈদে একটু ভালো খাবারের আকাঙ্ক্ষা থাকে কৃষক পিতারও। কিন্তু যতটুকু খবর পেয়েছি, তাদের ঘরে ঈদ এলেও, আনন্দ আসেনি। পত্রিকায় খবর দেখেছি, এবার গ্রামের হাট-বাজারে ঈদের কেনাকাটা জমেনি। জমবে কীভাবে? কৃষকের হাতে তো টাকা নেই। সারা বছরে তাদের আয়ের সবচেয়ে বড় যে উৎস, সেই বোরোতে এবার সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খেয়েছেন। এখন তাদের চিন্তা সারা বছরের খোরাকির, উৎসব করার কথা ভাবারও অবকাশ নেই।

এই সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু ধানের দাম। অনলাইনে, অফলাইনে, গণমাধ্যমে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন ধানের দাম নিয়ে তুমুল আলোচনা। ইদানীং আর কেউ কো্নো দাবি-দাওয়া নিয়ে রাজপথে নামেন না। প্রতিবাদহীন, নির্বিকার এই সময়ে তবু কেউ কেউ ধানের দাম কমে যাওয়ার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন। কিন্তু লাভ হয়নি কোনো। ধানের দাম বাড়েনি। অন্তত কৃষকের উৎপাদন খরচের ধারে কাছেও যায়নি। ধানের দাম বাড়াতে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে বটে। কিন্তু সেগুলো সময়ের অনেক পরে। বোরো ধানের মৌসুমে প্রতিবারই দাম নিয়ে এই হাহাকারটা হয়। কোনো বছর হঠাৎ বৃষ্টি, অকাল বন্যায় বোরো ভেসে যায়। এবার বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। আর দামের পতনও হয়েছে বাম্পার। সরকারের যারা নীতি নির্ধারক; যারা কৃষি মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয় চালান; তাদের তো আগেই এই হিসাবটা থাকার কথা। কখন বোরো মৌসুম শুরু হবে, এবার ফলন কেমন হবে, ফলন ভালো হলে দাম কমতে পারে; এই বিষয়গুলো তো তাদের আগেই জানা থাকার কথা। কারণ তাদের কাজই তো এটা। সে অনুযায়ী তাদের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। কিন্তু ধানের দাম বাড়াতে সরকার কিছু ব্যবস্থা নিল বটে, তবে বড্ড অসময়ে। চালের আমদানি শুল্ক বাড়ানো হলো মে মাসের শেষ দিকে। অথচ এপ্রিলের শুরুতেই সরকার চাইলে এ সিদ্ধান্ত নিতে পারত। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার একটি বড় উপায় হলো সরকারের ধান কেনা। কিন্তু সমস্যা হলো সরকার সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনতো না। তবে এবার সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুরুতে দেড় লাখ টন ধান কেনার কথা থাকলেও পরে তা বাড়িয়ে চার লাখ টন করা হয়েছে। তবে এই পরিমাণ খুবই কম। বোরোর উৎপাদন হবে প্রায় দুই কোটি টন। সেখানে সরকার কিনবে মাত্র চার লাখ টন। সমস্যা হলো আরো বেশি ধান কিনে রাখার মত জায়গা নেই সরকারের। ক্ষুদ্র-প্রান্তিক কৃষকের তো নেই-ই। আর ধান রাখার মত জায়গা খাকলেও দাম বাড়ার জন্য অপেক্ষা করার সামর্থ্য থাকে না। তাই লাভটা হয় শেষ পর্যন্ত চালকল মালিকদেরই।

সরকার নানা উদ্যোগ নিচ্ছে বটে। তবে সরকারের মন্ত্রীদের যথেষ্ট সংবেদনশীল মনে হয়নি। তাদের কথাবার্তায় কৃষকদের প্রতি মমতার ঘাটতি ছিল। কদিন আগে সরকারের এক নীতিনির্ধারক আমলা, মুক্তবাজার অর্থনীতির দোহাই দিয়ে বললেন, সরবরাহ বাড়লে দাম কমবে। এটাই নিয়ম। এটা সবাইকে মেনে নিতে হবে। আমি অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তিনি আরো ব্যাখ্যা করলেন, এখানে পক্ষ তিনটি উৎপাদনকারী কৃষক, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তা। সরকার এখানে কোনো পক্ষ নয়, সরকার রেফারি মাত্র। রেফারির কোনো পক্ষ নেওয়া ঠিক হবে না। আমার বিস্ময় আরো বাড়লো, সরকারের নীতিনির্ধারকদের একজন যদি এভাবে ভাবেন, তাহলে সেই কৃষক যাবেন কোথায়? সেই মূর্খ কৃষক তো পক্ষ বোঝে না, খেলা বোঝে না, রেফারি বোঝে না, মুক্তবাজার অর্থনীতি বোঝে না। তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শস্য ফলায় বলেই আমরা খেয়ে পড়ে বেঁচে আছি। কিন্তু তারা প্রতিবছর ক্ষতির মুখে পড়ে- কোনো বছর ফসল কম ফলে বলে, কোনো বছর বেশি ফলে বলে। প্রতিবছর তারা প্রান্ত থেকে আরো প্রান্তে চলে যায়।

তবে আশার কথা হলো বৃহস্পতিবার (১৩ জুন) সংসদে উপস্থাপিত ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষিকে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত উল্লেখ করে বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষিখাতে বরাদ্দ ও ভর্তুকি বাড়ানো হয়েছে। কৃষকদের কৃষি উপকরণ ও ভর্তুকি সহায়তা অব্যাহত রাখাসহ বাজেটে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ভর্তুকি বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সার, বীজ, কীটনাশক ও কৃষি যন্ত্রাংশ আমদানিতে শূন্য শুল্কহার অব্যাহত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। সারের দাম অপরিবর্তিত রাখার কথা বলা হয়েছে। কৃষকদের ধানের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে চাল আমদানির ওপর বিদ্যমান সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক ও সম্প্রতি আরোপিত ২৫ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি খাতে মোট বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ২৮ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।

বর্তমান সরকার কৃষিবান্ধব সরকার। তাদের অব্যাহত নীতি সহায়তার কারণেই কৃষিতে অভাবনীয় অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু সেই অগ্রগতির লাভটা কৃষকের পকেটে পৌঁছে দিতে হবে। সময়ের কাজটা সময়ে করতে হবে। কথায় বলে না, সময়ের এক ফোঁড়, অময়ের ১০ ফোঁড়। যতই মুক্তবাজার অর্থনীতির দোহাই দেওয়া হোক না কেন, কৃষকদের বাঁচাতে সরকারকেই তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। রেফারির নিরপেক্ষতা নিয়ে নিস্পৃহ থাকার সুযোগ নেই। ন্যায্যতা নিয়ে দুর্বল কৃষকের পাশে দাঁড়াতে হবে। আমদানি শুল্ক বাড়ানো, সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে মৌসুমের শুরুতেই। নইলে সরকারের সিদ্ধান্তের সুফল পৌঁছানোর আগেই কৃষক নিঃস্ব হয়ে যাবে। ছেলেবেলায় একটা অনুবাদ করতাম- ডাক্তার আসিবার পূর্বেই রোগী মারা গেল। ভবিষ্যতে হয়তো নতুন অনুবাদ করতে হবে- ধানের মূল্য বৃদ্ধি পাইবার আগেই কৃষক নিঃস্ব হইয়া গেল।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

আপনার মতামত লিখুন :

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের একটি মন্তব্য আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি বলেছেন 'সরকারি কর্মকর্তারা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না'। এ কথাটি মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মকতাদের দুর্নীতি আজ নতুন নয়। তবে সব কর্মকর্তাও এক নয়। সংখ্যায় সীমিত হলেও  অনেক অফিসার আছেন যারা সততার সাথে অনেক কষ্টে  জীবনযাপন করেন। তাই সকলকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশে দুদক নিরপেক্ষতা হারিয়েছে অনেক আগে, তবে কিছু দিন পূর্বে ছোটখাটো দুর্নীতি ধরতে সোচ্চার দেখে আমরা কিছুটা হলেও খুশি হয়েছি। এ জন্য যে এবার অন্তত দুদক চেয়ারম্যান নিজেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঠিক সময়ে ক্লাস শুরু হয় কিনা বা সকল শিক্ষক সময়মত স্কুলে আসছেন কিনা তা যাচাই করতে। 

আমরা মনে করেছি, তিনি একবার যেহেতু ঘর থেকে বেরিয়েছেন, বাংলাদেশের সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আর ঘরে ফিরবেন না। কিন্তু কোনও অদৃশ্য কারণে, বোধহয় তিনি বুঝতে পেরেছেন, সরকারি কর্মকতা, রাজনীতিবিদের দুর্নীতি থামানো অসম্ভব। তার কাছে তো অনেক উদাহরণ আছে।

যাক সেসব কথা। এবার আলোচনা করা যাক, তিনি কেন বলেছেন যে সরকারি কর্মকরা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না। তিনি কি আসলে সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় পেয়েছেন?  নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে।

কারণ ব্যাখ্যার আগে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে দুই-চার কথা না বললেই নয়। ওনারা সরকারিভাবে সে বৃটিশ আমল থেকে সুরক্ষিত। ওনারা সমাজের উপরে থাকেন। ওনাদের পল্লীর নাম ভদ্রপল্লী। ওনাদের সাথে ঈশ্বরের যোগাযোগ। সব কিছুই ওনারা নির্মাণ ও পরিচালনা করেন। সকল সুযোগ-সুবিধা ওনাদের জন্য। এ কারণে ওনাদের আচরণে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

এ জন্য তাদের সঙ্গে জনগণের একটা দুরত্ব কাজ করে। ফলে তাদের সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যানের মন্তব্যের পেছনে কোনো কারণ আছে কিনা, তা জানার আগেই পত্র-পত্রিকা,  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। আসলে দুদক চেয়ারম্যান কী বোঝাতে চেয়েছেন বা জনগণ কী বুঝেছে তা পরিষ্কার নয়।

আমি যদি ভুল না বুঝে থাকি, এখানে দুদক চেয়ারম্যান অর্থনৈতিক দুর্নীতিকে বুঝাননি। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, অনেক সরকারি কর্মকর্তা নিজের অনিচ্ছায় বা ভালো  উদ্দেশ্যে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে কারো ক্ষতি হতে পারে। এ জন্য ঐ কর্মকতাকে দুর্নীতি পরায়ণ বলা যাবে না। এটাকে দুদক চেয়ারম্যান 'সরল বিশ্বাস' বলেছেন। যদি ঐ কর্মকর্তা  ইচ্ছাকৃত ভুল করেন বা টাকার বিনিময়ে করেন বা কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য করেন, তা সরল বিশ্বাস নয়। এখানে অসততা আছে। এটাই দুর্নীতি।

আমার  হয়তো বুঝতে ভুল হতে পারে আর যদি হয়ও তা কিন্তু সরল বিশ্বাসে। আমি এ বিষয়টি এ জন্যই উপস্থাপন করলাম, কারণ দুদক চেয়ারম্যানের কথার অর্থ যদি সরকারি কর্মকর্তারা ভুল বোঝেন, তাহলে তো সর্বনাশ! তারা তো সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা শুরু করবেন। অবস্থা তখন হবে, ‘একদিকে নাচুনি বুড়ি অন্য দিকে ঢোলের বাড়ি’-র মতো। আমার এ লেখা শুধু ওইসব দুর্নীতি পরায়ণ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য।

অতএব, দয়া করে সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা থেকে বিরত থাকুন।

ড. মো. কামাল উদ্দিন: প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন: সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি অপরাধ নয়: দুদক চেয়ারম্যান

জিএম কাদের কি পারবেন?

জিএম কাদের কি পারবেন?
এরশাদুল আলম প্রিন্স, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

জাতীয় পার্টির (জাপা) কো-চেয়ারম্যান থেকে দলটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেলেন এরশাদের ছোট ভাই জিএম কাদের। দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা জিএম কাদেরের উপস্থিতিতেই বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) এ ঘোষণা দেন। এখন অপেক্ষা, জাপা জিএম কাদেরের নেতৃত্বকে কতটা সহজভাবে মেনে নেয়, সেটি দেখার।

জিএম কাদের প্রাথমিক ধাক্কাটি সামলাতে পারলে সেটা তার নিজের ও দলের পক্ষে একটি ইতিবাচক ফল বয়ে নিয়ে আসবে বলেই মনে হয়। তবে জিএম কাদের আপাতত সফল হোন বা না হোন, জাপার জন্য আগামী দিনের রাজনীতিতে একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বহাল থাকার লড়াইটা খুব সহজ হবে না। নিশ্চিতভাবেই দলের ভেতর ও বাইরে থেকে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব আসবেই। তবে, সামগ্রীকভাবে দেশের রাজনীতির চালচিত্র কেমন যাবে, তার ওপর এটি অনেকটাই নির্ভর করে।

জাপায় নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন সময়েই দলের নেতাদের মধ্যে ক্ষমতার টানাপোড়েন দেখা গেছে। এমন টানাপোড়েন শুধু জাপায় নয়, আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতেও ছিল, এখনও আছে। যেকোনো বড় দলেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ‘পন্থী’রা শক্তিশালী থাকে। শক্তিহীনরা হয় টিকে থাকার চেষ্টা করেন, ধৈর্য ধরেন, না হয় এক সময় ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে ধীরে ধীরে ঝড়ে পড়েন। আওয়ামী লীগের অনেক বড় বড় নেতা আজ দলে নেই। অনেকে ফিরে আসার চেষ্টা করেছেন। কেউ পেরেছেন, কেউ পারেননি। বের হয়ে নতুন দল বা জোটে যোগ দিয়েছেন। বিএনপিতেও এমন নজিরের অভাব নেই। বড় দলে নেতৃত্ব ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে দলের ঐক্য ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। এতে দল ও নেতা উভয়ই লাভবান হয়। তা না হলে দলতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ই, দলের নেতারাও একসময় হারিয়ে যান। ১/১১ এর বিরাজনীতিকরণের রাজনীতিতে অনেকেই তথাকথিত সংস্কারপন্থী হয়েছেন। এতে না দলের, না নিজের লাভ হয়েছে। দুঃসময়ে লড়াইটা চালিয়ে যাওয়াই রাজনীতিকের আসল পরীক্ষা। সুসময়ে সবাই মিছিলের সামনেই থাকে।

স্বাধীনতার পরে দেশের বড় তিনটি দলের ভাঙা-গড়াই আমরা দেখেছি। এর মধ্যে বিএনপি, ও জাপার জন্মই স্বাধীনতার পরে। তবে স্বাধীনতার পরে দলের ভাঙা-গড়ার সবচেয়ে বড় নজির জাসদের। এক সময় দেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের একটি শ্রেণী বিশেষ করে ছাত্র সমাজের একটি অংশের কাছে কয়েকটি শব্দ খুব পরিচিত ছিল-পুঁজিবাদ, বিপ্লব, সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, সর্বহারা, বিচ্যুতি, বুর্জোয়া, পেটি বুর্জোয়া, হঠকারিতা, বস্তুবাদ, লুটেরা, দ্বন্দ্ব, ধনিক-শ্রেণি, কায়েমী-স্বার্থবাদ ইত্যাদি ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলেতো কথাই নেই। মুখে মুখে এসব বুলি। বিশেষ করে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এ শব্দগুলো জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েই দেশের মেধাবী ছাত্রদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বামপন্থী হয়ে যায়। এরা রাজনৈতিক দল হিসেবে জাসদের ছাতার নীচে আশ্রয় নেয়। এদের মধ্যে আবার মস্কো, পিকিং আরো নানা পন্থী ছিল। জাসদ শুরুর সে ইতিহাসও অর্ন্তদ্বন্দ্বেরই ইতিহাস, ছাত্রলীগের মধ্যে মেরুকরণের ইতিহাস। এরই মধ্যে নতুন আরেকটি শব্দ চালু হলো রাজনীতিতে। সেটি হলো বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। এই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্বপ্নেই ছাত্রলীগের একটি গ্রুপ জাসদ গঠন করে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর নানা ঘটনার পরম্পরায় জাসদ উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যায়। এরপর জিয়া ও এরশাদ আমলে জাসদের ভাঙ্গনের খতিয়ান আরও দীর্ঘ। মেজর জলীল, কাজী আরেফ আহমদ, মনিরুল ইসলাম, শরীফ নূরুল আম্বিয়া, ইনু, রব হয়ে জাসদ এখন বর্তমান সুরতে বহাল আছে। বর্তমানে এক দল এক নেতার দল জাসদ। এর মাঝে আছে একাধিক পন্থী। দলের মাঝে ঐক্য ধরে রাখার জন্য জাসদ নেতারা কম চেষ্টা করেননি। কিন্তু পারেননি। কারণ তারা নিজেরাই স্বার্থের দ্বন্দ্বে মরিয়া ছিলেন।

ছোট দলের জন্য দলের ঐক্য ধরে রাখা সব সময়ই কঠিন। সেটা জাসদ হোক বা জাপা। কারণ, রাজনীতিতে ঐক্যের মূল শক্তি ক্ষমতা অথবা আদর্শ। কিন্তু আমাদের এখানে আদর্শের ভীত বড় নড়বড়ে। আর নিজ শক্তিবলে এসব দলের ক্ষমতায় আসার প্রেক্ষাপটও রচনা হয়নি। ফলে, দলের নেতারা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য ক্ষমতায় দৌড়ে অধিকতর কাছাকাকাছি থাকা দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য করেছেন। এখানেই ছোট দলের ভাঙনের মূল কারণ নিহিত। এছাড়া অপরের নেতৃত্ব মেনে না নেয়ার সহজাত প্রবণতা মানুষের থাকেই। সেই সাথে আরেকটি বিষয় হলো এসব দলের বড় নেতা ও পরবর্তী ধাপের নেতাদের পলিটিক্যাল ক্যারিয়ারের মাঝে দৃশ্যমান তেমন বড় কোনো পার্থক্য নেই। ফলের ঐক্যের মূল ভিত্তি খুবই দূর্বল থাকে। রাজনৈতিক আদর্শ বাদ দিলেও, আওয়ামীর লীগের ঐক্যের ভিত্তি বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার একথা অস্বীকার করা যাবে না। এখানে ঐক্যের একটি ‘পারিবারিক’ ভিত্তিও আছে।

জাতীয় পার্টির নতুন চেয়ারম্যান জিএম কাদের
জাতীয় পার্টির নতুন চেয়ারম্যান জিএম কাদের

 

বিএনপির ক্ষেত্রেও নেতাদের ঐক্যের মূল ভিত্তি কখনো ক্ষমতায়া যাওয়ার আশা, সেই সাথে জিয়া পরিবার। এর বাইরে একটি রাজনৈতিক আদর্শতো কাজ করেই। এটি শুধু আওয়ামী লীগ, বিএনপির ক্ষেত্রে নয়, নয় শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। ভারতের কংগ্রেসের বর্তমান হাল হকিকত দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। রাহুল গান্ধী পদত্যাগ করেছেন দুই সপ্তাহ, কিন্তু দল এখনও নতুন নেতা নির্ধারণ করতে পারেনি। ব্যক্তি ও পারিবারিক গণ্ডির বাইরে গিয়ে দলে পরবর্তী নেতৃত্বের পথ রচনা করার কাজটি এখনও শুরু হয়নি।

জাতীয় পার্টিতে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে যারা বের হয়ে গেছেন তারা নিজেরাই নেতা হয়ে একনেতা নির্ভর দল গঠন করেছেন। জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) (জেপি) ইত্যাদি নানা উপদলে ভাগ হয়েছে। আসলে এসব বিভক্তি ও ভাঙনের পেছনে কোনো আদর্শ কাজ করেনি। কাজ করেছে ক্ষমতা ও নগদ প্রাপ্তি।

গত এক দশকে জাপা বহুবার ভাঙনের মুখে পড়েছে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ঘিরে জাপায় কোন্দল চরমে পৌঁছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যে বিরাজ করে তীব্র ক্ষোভ ও দ্বন্দ্ব। একপক্ষ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছে আরেক পক্ষ চায়নি। এ নিয়ে তুলকালাম কাণ্ডও হয়ে গেছে বহুবার। এর পেছনে শুধু দলের অর্ন্তকোন্দলই ছিল নাকি এর পেছনে আরও কারণ ছিল তা নিয়ে কথা হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলের ভেতরের দ্বন্দ্ব বাইরে আসেনি, মানে দলে ভাঙন হয়নি।

তারপরও দলে আপাতত দুইটি গ্রুপ আছে। রওশন ও জিএম কাদেরপন্থী এ দু’টো গ্রুপ দলে বহুদিন ধরেই দৃশ্যমান। এনিয়ে এরশাদ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নির্দেশনা ও আদেশ জারি করেছেন। পরে আবার সেই আদেশ প্রত্যাখ্যানও করেছেন, করতে বাধ্য হয়েছেন।

গত নির্বাচনের আগে থেকেই এরশাদ অসুস্থ। বিদেশে চিকিৎসার জন্য গিয়েছেন। দলের ঐক্য বজায় রাখতে বা তার অবর্তমানে দল টিকিয়ে রাখতে কে হবেন জাপার পরবর্তী কর্ণধার, তা নিয়েও তার শঙ্কা ছিল। দলের একটি পক্ষ চেয়েছে রওশনকে সামনে নিয়ে আসতে, আরেক পক্ষ চেয়েছে জিএম কাদেরকে। এছাড়া আগে পরে অন্য পক্ষও সক্রিয় ছিল। তবে সর্বশেষ এই দুটি গ্রপই দৃশ্যমান ছিল। এরশাদ জানতেন হয়তো এ বিরোধ সহজে মিটবে না। তাই তিনি নিজের সম্পত্তি ওসিয়ত করে যাওয়ার পাশাপাশি দলের নেতৃত্বের বিষয়টিও ওসিয়তও করে গেছেন। এরশাদ জাপার গঠনতন্ত্রের ক্ষমতাবলে তার অবর্তমানে বা চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিদেশে থাকাকালে ছোট ভাই দলের কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দিয়ে গেছেন।

এর আগে তিনি কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান করেছেন আবার সে আদেশ বাতিলও করেছেন। গত ১৪ জুন তার মৃত্যুর পাঁচদিনের মাথায় তার সেই ওসিয়তই পুরণ হলো। কারণ এরশাদ আজ অবর্তমান। তার অবর্তমানে আপাতত জিএম কাদের বর্তমান। দেখা যাক, এই বর্তমানকে জিএম কাদের ভবিষ্যতের কাছে নিয়ে যেতে পারেন কি-না। এই দিনকে তিনি সেই দিনের কাছে তিনি নিয়ে যেতে পারেন কিনা এটাই তার জন্য বড় পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় তিনি পাস করলে ফেল করার হাত থেকে হয়তো বেঁচে যেতে পারে জাপা।

এরশাদুল আলম প্রিন্স: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম।

আরও পড়ুন: রাজনীতির ‘দুষ্টু বালক’ ও আমাদের ‘এরশাদ সিনড্রোম’

আরও পড়ুন: জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র