Barta24

মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০১৯, ৮ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

সবার জন্য বাজেট

সবার জন্য বাজেট
ফরিদুল আলম/ ছবি: বার্তা২৪.কম
ফরিদুল আলম


  • Font increase
  • Font Decrease

নজিরবিহীন ঘটনার মধ্য ঘোষিত হল ২০১৯-২০ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের চোখের অসুস্থতাজনিত কারণে তাঁর বাজেট বক্তব্য দিতে সমস্যা অনুভূত হওয়ায় বক্তব্যের খানিকটা পাঠের পর বাকী অংশ পাঠ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অবশ্য এর আগেও দেশের প্রধানমন্ত্রী, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং রাষ্ট্রপ্রধান দেশের একাধিক বাজেট পেশ করলেও এবারই প্রধম এই বাজেট পেশ করা হল যৌথভাবে- অর্থমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে।

স্বাধীনতার পর এটি ছিল দেশের ৪৮তম বাজেট এবং ইতোপূর্বে ১১ জন এই বাজেট উপস্থাপন করেন। এদিন দিয়ে বর্তমান অর্থমন্ত্রীর জন্য প্রথমবারের মত এটি উপস্থাপনের সুযোগ থাকলেও তিনি যেমন এর একক কৃতিত্বের অধিকার থেকে বঞ্চিত হলেন, অপরদিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রথমবারের মত বাজেট বক্তব্য দেয়ার একটি বিরল সুযোগ গ্রহণ করলেন।

আজকের আলোচনাটি মূলতঃ বাজেট নিয়েই হওয়া সঙ্গত। তবে প্রাসঙ্গিকভাবেই এর সাথে সম্পৃক্ত কিছু বিষয় এসে যায়। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে শারীরিক অসুস্থতার বাইরেও মাননীয় অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের ধরণ দেখে তিনি যে ব্যাপক প্রস্তুতিহীনতায় ভুগেছেন তা ছিল স্পষ্ট। সেই সাথে দীর্ঘদিন সংসদ সদস্য হিসেবে থাকলেও সংসদীয় কার্যাবলী সম্পর্কে তিনি যে এখনও বেশ আনাড়ি সেটা তিনি প্রমাণ করে দিলেন। কীভাবে বাজেট বক্তব্য উপস্থাপনের অনুমতি চাইতে হবে এবং কীভাবে একটি লিখিত বক্তব্য পঠন করতে হবে এ বিষয়ে তাঁর জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আমার ধারণা সরকারকে বিব্রত করেছে। বক্তব্যের শুরু করতে গিয়েও অযথা সময়ক্ষেপণ এবং মূল বক্তব্যে শুরু করতে গিয়ে কিছু অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ের অবতারণা বাজেট বক্তব্যের মত একটি অতি আগ্রহের বিষয়কে ম্লান করে দিতে যাচ্ছিল। এক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসার মাধ্যমে পরবর্তীতে এবারের বাজেট বক্তব্য প্রাণ ফিরে আসে বলে মনে হয়েছে।

যাহোক এবারের বাজেটের আকার সঙ্গত কারণেই গত বছরের তুলনায় বেড়েছে এবং এই বৃদ্ধির পরিমাণ হচ্ছে ৫৯ হাজার কোটি টাকা। এখানে একটু বলে রাখা ভাল, বর্তমান সরকারের ইতোপূর্বেকার বাজেটগুলো পর্যবেক্ষণে বলা যায় যে, প্রতিটি বাজেটের আকার নিয়ে এবং সরকারের সামর্থ্যের বাইরে মনে করে কিছু মহল থেকে এর সমালোচনা করা হলেও কার্যত আমরা দেখেছি বাজেট বাস্তবায়নে সরকারকে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি।

একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে এখানে বাজেটের সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের যে ঘাটতি থেকে যায় তা কোনভাবেই ৫ শতাংশের অতিরিক্ত হয় না এবং এটি অর্থনীতিতে একটি স্বীকৃত তত্ত্বও বটে, যা সরকার সব সময় অনুসরণ করে যাচ্ছে।

তবে প্রতি বছর অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে গিয়ে বাজেট সংশোধনের প্রয়োজন পড়লে সেটাও করা হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে বিগত বাজেট অর্থাৎ ২০১৮-১৯ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট ৪ লক্ষ ৬৪ হাজার কোটি টাকা থেকে কিঞ্চিত কমিয়ে ৪ লক্ষ ৪২ হাজার কোটি টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছিল।

এবারের বাজেটের মোট আকার ৫ লক্ষ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। গত বাজেটের অভিজ্ঞতার আলোকে এর আকার অনেকটা বড় হলেও সরকার এর বাস্তবায়নে যে কৌশলগুলো নির্ধারণ করেছে সেগুলোর সফল প্রয়োগ ঘটলে এটি খুবই বাস্তবায়নযোগ্য বলে মনে করা যায়।

সরকারের এই কৌশলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে নতুন করে কর না বাড়িয়ে করের আওয়া আরও বিস্তৃত করা এবং ভবিষ্যত সম্ভাবনাগুলোর দিকে অধিকতর বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা।

শিক্ষা এবং মানব সম্পদ উন্নয়নে ৮৭ হাজার ৬২০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ১৬.৭৫ শতাংশ এবং জিডিপির ৩.০৪ শতাংশ। শিক্ষার সাথে মানবসম্পদ উন্নয়নকে সম্পৃক্ত করে তরুণ প্রজন্মের বিজ্ঞান এবং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধকরণের অংশ হিসেবে সরকার অধিকতর মনযোগী হয়েছে এবং সেই সাথে এভাবে বেকার তরুণদের ব্যাপকহারে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে সকলকে করজালের আওতায় আনার যে পরিকল্পনা এটি বাস্তবায়ন করতে পারাটা চ্যালেঞ্জিং হলেও অসম্ভব নয়। এ লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে নতুন করে ৩ কোটি কর্মসংস্থানের পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছে।

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ ১ লক্ষ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা, যা মোকাবিলায় মাত্র ৬৮ হাজার ১৬ কোটি টাকা বৈদেশিক উৎসের ওপর নির্ভরতা রাখা হয়েছে এবং এর বিপরীতে ৭৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা দেশীয় উৎসের মাধ্যমে যোগাড় করার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। তবে প্রতিবছর যে প্রবণতা দেখা যায়, অর্থাৎ ব্যাংক এবং আর্থিক খাতগুলো থেকে উচ্চ সুদে অর্থ তুলে নেয়া এটি যদি অব্যাহত থাকে তবে তা অর্থনীতির জন্য সুখকর হবে না।

এখানে উল্লেখ করা সঙ্গত যে এই ঘাটতে মোকাবিলায় সরকারের আমদানি এবং রপ্তানি নীতি এবং আর্থিক খাতগুলো এবং অপরাপর কিছু জায়গায় কিছু প্রণোদনার সিদ্ধান্ত অভ্যন্তরীণ খাতে অধিক অর্থপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। রপ্তানিমুখী তৈরী পোষাক খাতে ১ শতাংশ নগদ প্রণোদনা এবং বিদেশ থেকে রেমিট্যান্সের উপর প্রণোদনার ব্যবস্থা কিছুটা সরকারি কোষাগারকে সমৃদ্ধ করতে পারে।

সামাজিক সুরক্ষা খাতকে আরও শক্তিশালী করতে এবারের বাজেটে গত বাজেটের চাইতে আরও অধিক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এবার এর পরিমাণ হচ্ছে ৬৭ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে দেশের এক চতুর্থাংশ পরিবারকে এর আওতায় আনা হয়েছে এবং আগামী ৫ বছরে এই খাতে দ্বিগুণ অর্থবরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার।

এটি যেমন একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ একই সাথে এই খাতে সুশাসনের বিষয়টি নিশ্চিত করা গেলে উপকারভোগীদের প্রতি সরকারের এই বিনিয়োগ অনেকগুণে ফেরত পাওয়া সম্ভব। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ২ হাজার টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাবনাও প্রশংসার দাবীদার।

সব মিলিয়ে এবারের বাজেটটি ‘সকলের জন্য’ বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়তে পারে এমন কোন উপকরণ এবারের বাজেটে রাখা হয়নি। সুতরাং সার্বিক বিবেচনায় একথা বলা যেতেই পারে যে সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় এটি একটি ব্যতিক্রমী বাজেট।

ফরিদুল আলম: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আপনার মতামত লিখুন :

আতঙ্ক, নৈরাজ্য, অস্থিতিশীলতা, অরাজকতা ছড়াচ্ছে কারা?

আতঙ্ক, নৈরাজ্য, অস্থিতিশীলতা, অরাজকতা ছড়াচ্ছে কারা?
ড. মাহফুজ পারভেজ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন। কিন্ত একসঙ্গে মেলালে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির ছবি দেখা যায়। মনে হয়, অদৃশ্য কে বা কারা সঙ্গোপনে পুরো সমাজ ও মানুষকে টার্গেট করেছে। সুযোগ পেলেই নানা ছুতায় বা গুজব ছড়িয়ে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করছে।

এমন অরাজকতা ও নৈরাজ্যের সিরিজ ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে আতঙ্কিত হতে হয়। নিজের জন্য, স্ত্রী, সন্তান, পরিজনের জন্য চিন্তিত হতে হয়। কখন প্রকৃত ছেলে ধরা মুণ্ডু কেটে নিয়ে যাবে, কিংবা ছেলে ধরা বানিয়ে গণপিটুনিতে মেরে ফেলা হবে, কেউ জানে না।

আতঙ্ক, নৈরাজ্য, অস্থিতিশীলতা, অরাজকতা দেখা যায় বিপ্লব ও সংঘাতের সময়। চার্লস ডিকেন্সের কালজয়ী 'অ্যা টেল অব টু সিটিজ' যারা পড়েছেন, তারা সেই বিবরণ জানেন।

কখনো কখনো উদ্দেশ্যমূলকভাবেও আতঙ্ক, নৈরাজ্য, অস্থিতিশীলতা, অরাজকতা সৃষ্টি করা হয়। প্রতিবিপ্লবী, নাশকতাকামী, সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো কখনো কখনো সুপরিকল্পিত উপায়ে সমাজে ভীতি, আতঙ্ক ছড়িয়ে স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে চায় এবং এর মাধ্যমে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিল করে।

নব্য-স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বার্থবাদী মহল অস্থিতিশীল করতে চেয়েছিল। স্বাধীনতার পর পর তেমন চিত্র দেখা গিয়েছিল। মতিঝিলে গণপিটুনিতে যুবক নিহত। শাহবাগে লাশ। আলফাডাঙ্গায় ব্যাংকে হামলা। চাঁদপুরে পাটের গুদামে আগুন। এমন বহু ঘটনা সে সময় ঘটানো হয়েছিল।

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রকাশ্য ও গোপন শত্রুদের সেই হামলা ও নাশকতা রুখে দেশ ও জাতি অকুতোভয়ে সামনে এগিয়ে এসেছে। তবুও শত্রুর আঘাত ও চক্রান্ত মনে হয় থামেনি। বর্তমান পরিস্থিতি দেখে তেমনই ধারণা হচ্ছে।

কারণ, গত কিছুদিন ধরে বেশ কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা ও মৃত্যু সমাজে আতঙ্কের কারণ হয়েছে। প্রথমে ব্যাগে তাজা কর্তিত মস্তকসহ লোক ধরা পড়ল। তারপর ছেলে ধরা সন্দেহে মারা হলো একাধিক নারী ও পুরুষকে। সব ঘটনাকে একসঙ্গে করলে নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি উদ্দেশ্য ধরা পড়ে। মানুষের মধ্যে আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি বদ মতলব শনাক্ত হয়।

কে বা কারা এসব করছে? কেউ না কেউ অবশ্যই নেপথ্যে রয়েছে। কারণ সমাজে কোনও কিছুই আপনা-আপনি হয় না। এরা কারা? কী তাদের উদ্দেশ্য, যারা এসব হীন কাজ করছে?

উদ্দেশ্য যে ভয়ঙ্কর তা অনুমেয়। একজন মানুষও এগিয়ে এসে যুক্তি দিয়ে দেখছে না, নারী বা পুরুষটি আসলে কে। উন্মত্তদের সামনে কেউ হয়ত দাঁড়ানোর সুযোগও পায়নি। ছেলে ধরা বলে রায় দিয়ে সেখানে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো। এক জায়গায় নয়, একাধিক স্থানে এমন নৃশংস ও বর্বর ঘটনা ঘটল!

এই প্রবণতা যদি সামাজিক হিংসা ও অসহিষ্ণুতা থেকে হয়, তবে অবশ্যই তা প্রতিরোধ করতে হবে। সমাজে এমন তাণ্ডব ছড়িয়ে গেলে তা মনুষ্য বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে যাবে। আইন-কানুন, যুক্তি, বিশ্বাস, রীতি-নীতি নির্বাসিত হবে।

আর এই প্রবণতা যদি রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক কারণে হয়, তবে তা মারাত্মক। নৈরাজ্য, অরাজকতা ও অস্থিতিশীলতার মহামারি শুরু হবে তাহলে। মানুষের স্বাভাবিক জীবন-যাপন বিপন্ন হয়ে পড়বে।

কিংবা এই প্রবণতা যদি আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা ও ক্রিমিনাল কার্যক্রম হয়, তবে এর মাধ্যমে সমাজ অপরাধ প্রবণ হবে। ক্রিমিনালাইজেশনের মাধ্যমে অপরাধীরা ক্রমেই সব কিছু তছনছ করে দেবে।

ছেলে ধরা গুজব ও গণপিটুনি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র

ঘটনার নেপথ্যে কারণ যা-ই হোক, তাকে চিহ্নিত করতে হবে। সঠিকভাবে খুঁজে বের করতে হবে অস্বাভাবিক ঘটনাগুলোর প্রকৃত কার্যকারণ। তারপর উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যদি এ ক্ষেত্রে শৈথিল্য ও গাফিলতি দেখানো হয়, তাহলে আতঙ্ক, নৈরাজ্য, অস্থিতিশীলতা, অরাজকতার রাহু সবাইকে গ্রাস করবে।

ড. মাহফুজ পারভেজ: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

 

তাজউদ্দীন আহমদ: রাজনীতির সহিষ্ণু আলোয়

তাজউদ্দীন আহমদ: রাজনীতির সহিষ্ণু আলোয়
শুভ কিবরিয়া, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

তাজউদ্দীন আহমদ (১৯২৫-১৯৭৫) বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্পূর্ণ এক ভীন্নধারার মানুষ ছিলেন। তাঁর নীতিবোধ যেমন প্রখর ছিল, জীবনাচরণেও ছিল ঠিক তেমনি পরিমিতিবোধ। রাজনীতিকে তিনি নিয়েছিলেন জনমানুষের কল্যাণ করার পথ হিসেবে। এটা কেবল কথার কথা ছিল না। এর জন্য ছিল তাঁর জীবনভর অনুশীলন।

সেই অনুশীলন কেমন ছিল তার খোঁজ মেলে তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরির পাতা দেখলে। তাঁর ডায়েরি লেখার একটা বিশেষ স্টাইল ছিল। সকালে কখন ঘুম থেকে উঠছেন, কখন রাতে ঘুমাতে যাচ্ছেন, সেদিনের আবহাওয়া কেমন ছিল এসব থাকত তাঁর ডায়েরিতে নিয়মিত। এর বাইরে প্রতিদিন কার সাথে দেখা হচ্ছে, কী কাজ করছেন তার বয়ানও থাকত। থাকত দেশ বিদেশের উল্লেখযোগ্য রাজনীতির খবর। আর থাকত তেমনতর সব ঘটনা বা বিষয়, যার প্রভাব সাধারণ জনমানুষের জীবনকে প্রভাবিত করত।

তাজউদ্দীন আহমদ খুব অল্প বয়সেই রাজনীতিতে জড়িয়েছিলেন, আবার খুব অল্প বয়সেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। মাত্র ২৯ বছর বয়সে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক, হেভিওয়েট প্রার্থী ফকির আবদুল মান্নানকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেই ঢাকার একটি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখনও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।

সংসদ সদস্য, রাজনীতিবিদ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী তাজউদ্দীন আহমদের রাজনীতি ও জনকল্যাণ ভাবনা কেমন ছিল তাঁর একটা নমুনা হিসেবে ১৯৫৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ডায়েরির তিনদিনের বয়ান এখানে উল্লেখ করা হলো। বলা বাহুল্য তাজউদ্দীন আহমদ ইংরেজিতে ডায়েরি লিখতেন। পরে তাঁর কন্যা সিমিন হোসেন রিমির ব্যক্তিগত উদ্যোগে এসব ডায়েরির বাংলা ভাষান্তর বই হিসেবে বের হয়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/23/1563860107428.jpg
তাজউদ্দীন আহমদ

 

১৯৫৪ সালের ডায়েরির সেপ্টেম্বর মাসের ২, ৩ ও ৪ তারিখে তাজউদ্দীন আহমদ ডায়েরিতে লিখছেন-

ক.

২ সেপ্টেম্বর ১৯৫৪ বৃহস্পতিবার

ভোর ৫টায় উঠেছি।

সকাল ১০টার দিকে ডেপুটি রেঞ্জার সেকান্দার আলী চৌধুরী ডিস্ট্রিক্ট ফরেস্ট অফিসারকে লেখা একটি দরখাস্তের খসড়া নিয়ে এলেন। আমি সেটি পড়ে কিছু সংযোজন এবং সংশোধনীসহ ঠিক করে দিলাম। তিনি ১১টার দিকে চলে গেলেন।

এর মাঝে ঢাকা হোমিওপ্যাথ কলেজে পড়ে সিংহস্রীর একটি ছেলে বন্যার জন্য সাহায্যের পরিচিতিপত্র নিল। সকালে কাপাসিয়ার জনাব আব্দুল জব্বারের ভাই আব্দুস সাহিদ একটি পরিচিতিপত্র নিয়ে গেছে। সে ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে। বিকেল সোয়া ৪টায় বের হলাম।

ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউটে অল্প কিছুক্ষণের জন্য শামসুল হকের সঙ্গে দেখা করলাম। ওয়াহেদ এবং শামসুর দাদা সেখানে ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩টি ক্লাসেই উপস্থিত ছিলাম। রাত ৮টায় হেঁটে বাসায় ফিরলাম। রাত সাড়ে ৯টায় ঘুমাতে গেলাম। গত রাতের মতো আজ রাতেও এখানে কোনো ঝঞ্ঝাটে বহিরাগত নেই। বিরল উদাহরণ।

আবহাওয়া: সারাদিন রোদ ঝলমলে। গত কয়েক দিনের তুলনায় গরম কম। হালকা বাতাসসহ পরিমিত রাত। রাতে হালকা বৃষ্টি।

বি. দ্র. বুড়িগঙ্গা নদীতে এখনও ভালোমাত্রায় জলোস্ফীতি। প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ২ থেকে আড়াই ইঞ্চি পানি বাড়ছে। এই বৃদ্ধি সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ রেকর্ডকে বেশ আগেই অতিক্রম করেছে। আগের সর্বোচ্চ রেকর্ড থেকে প্রায় ১ ফুট ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। শীতলক্ষ্যা নদীতেও পানির উচ্চতা বেড়ে চলেছে। তবে আমি এখনও জানি না সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ উচ্চতার রেকর্ড ছাড়িয়েছে কিনা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/23/1563860202722.jpeg
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদ

 

খ.

৩ সেপ্টেম্বর ১৯৫৪ শুক্রবার

ভোর ৫টায় উঠেছি।

সকাল ৮টার দিকে শামসুল হক এলেন। তার সঙ্গে বের হয়ে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত ১ম সাব জজের আদালতে ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলাম।

মফিজউদ্দীন মাস্টার সাহেব ১ম অতিরিক্ত ফৌজদারি জজের আদালতে অন্যতম জুরি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। দুপুর সোয়া ১টা পর্যন্ত বার লাইব্রেরি হলে ছিলাম। এরপর বাসায় ফিরে আসি।

বার লাইব্রেরিতে ২৬/১ মদনমোহন বসাক রোডের জলিল, শামসুল হক এবং আমার সঙ্গে প্রথমে কথা বললেন তারপর নাস্তা খাওয়ালেন। এরপর দুপুর ১২টার দিকে আতাউর রহমান খান সাহেব এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন। এছাড়াও কামরুদ্দীন সাহেব, আফতাবুদ্দীন ভূইয়া, এস এ রহিম প্রমুখ আমাদের সঙ্গে বসলেন এবং কথা বললেন।

গভর্নর জেনারেল জনাব গোলাম মোহাম্মদের সঙ্গে আলোচনার বিস্তারিত বিবরণ দিলেন জনাব আতাউর রহমান খান। কামরুদ্দীন সাহেব রিলিফের বিষয়ে আলোচনার জন্য সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় আমাকে ‘ইত্তেফাক’ অফিসে যেতে বললেন।

জনাব কফিলউদ্দীন চৌধুরী সাহেব টেবিলের কিনারে বসেছিলেন। তার সঙ্গে আমার অল্প কথা হয়েছে। এর মধ্যে কফিলউদ্দীন চৌধুরী সাহেবের ক্লার্ক মমতাজউদ্দীন আহমদ জানালেন আমার ডিক্রির বিরুদ্ধে আসিমুদ্দিন আজ মিসকেস করেছে। জলিল গত নির্বাচনে মনোনয়ন প্রদানের ক্ষেত্রে কামরুদ্দীন সাহেবের সততার বিরুদ্ধে উদাহরণ টেনে অত্যন্ত জোরালোভাবে একজন লোকের উপস্থিতিতে শামসুল হক এবং আমাকে তার বক্তব্য শোনালেন। তার বেশিরভাগ বক্তব্যই মনে হলো অসন্তুষ্ট মনোভাব থেকে তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে অভিযোগকারী হিসেবে সে মোসলেম আলী এমএলএ’র নাম উল্লেখ করলো। ফেরার পথে আমি শামসুল হককে ৪০০ টাকা দেয়ার জন্য বললাম। এই বিষয়ে সন্ধ্যায় ইত্তেফাক অফিসে জানাবে বলে সে কথা দিল।

দুপুর ৩টার দিকে খাবারের পর একটু ঘুমাতে গেলাম। ঘুম থেকে জেগে দেখি প্রহ্লাদপুরের সলিমুল্লাহ একজন রোগীসহ আমাদের বারান্দায় অপেক্ষা করছেন। এছাড়াও গোসিংগার গনি ফকিরের ছেলেও একজন রোগীসহ বসে আছে। সোনারুয়ার আব্দুল কুদ্দুস এবং অন্য একজনও এসেছেন।

এরা সবাই রাতে আমার এখানে থাকলেন। আব্দুল মোড়লও রাতে এখানে থেকে গেল।

সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বের হলাম। পূর্ব নির্ধারিত প্রোগ্রাম থাকায় পায়ে হেঁটে রাত ৮টায় ‘ইত্তেফাক’ অফিসে গেলাম। অফিসে একমাত্র মুকুল উপস্থিত ছিল। রাত ৯টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত জনাব আতাউর রহমান খান, কামরুদ্দীন আহমেদ সাহেব প্রমুখ কেউ এলেন না।

মোহন মিয়া, নাসিরুদ্দীন সাহেব, লাল মিয়া, সৈয়দ আব্দুর রহিম সেখানে এসেছিলেন। আমি রাত ৯টা ৫০ মিনিটে ‘ইত্তেফাক’ অফিস থেকে চলে আসি। নবাবপুর রেলওয়ে ক্রসিং পর্যন্ত মুকুল আমার সঙ্গে আসে। রাত সোয়া ১০টায় বাসায় ফিরে আসি।

রাত ১২টায় ঘুমাতে গেলাম।

আবহাওয়া: সারাদিন প্রখর রোদ। গরম দিন। রাতে বাতাস থাকায় খুব বেশি গরম নয়। রাতের শেষ ভাগে বেশ অনেকক্ষণ ভালো বৃষ্টি হয়েছে। সূর্য ওঠার আগে বৃষ্টি থেমে যায়। গতকাল বন্যার পানি এক ইঞ্চি বৃদ্ধি পেয়েছে।

গ.

৪ সেপ্টেম্বর ১৯৫৪ শনিবার

ভোর ৫টায় উঠেছি।

সকাল সাড়ে ৭টায় ফকির সাহাবুদ্দীন এসেছিল ফজলুর কাছ থেকে একটি বইয়ের টাকা নিতে। সকাল সাড়ে ৮টায় সাইকেলে করে বের হলাম। গোসিংগার রহিমুদ্দিন নামের একজনকে ভর্তি করানোর জন্য সোজা মেডিকেল কলেজে গেলাম।

অনেক খোঁজাখুজির পর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ডাক্তার আবু সিদ্দিককে পেলাম। তিনি এই রোগীকে প্রফেসর আসিরুদ্দিনের কাছে পাঠালেন। সকাল সাড়ে ১০টায় অ্যাসেম্বলি হাউসে গেলাম। দুপুর সোয়া ১২টা পর্যন্ত স্টাফদের সঙ্গে কথা বললাম। ডিও নোট পেপার ও খাম কিনলাম। এরপর চলে এলাম।

ডাক্তার আবু সিদ্দিকের সঙ্গে দেখা করলাম। জানলাম প্রফেসর আসিরুদ্দিন রোগীকে ভর্তি হওয়ার জন্য নির্দেশপত্র দিয়েছেন কিন্তু কোনো সিট খালি পাওয়া যাচ্ছে না।

রহিমুদ্দিনকে পরামর্শ দিলাম কিছু দিন পর এসে খোঁজ করতে।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফজলুল হক মুসলিম হলে এলাম। হল ইউনিয়নের সহসভাপতি ইমাজুদ্দিনের সঙ্গে দেখা করলাম। সে গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েছে। ৯২-ক ধারার আওতায় নিরাপত্তা আইনে তাকে এক মাস আগে বন্দী করা হয়েছিল। ফজলুল হক মুসলিম হলের ১২ নর্থ রুমে আমরা কিছুক্ষণ কথা বলি। এরপর ইমাজ চলে যায়। আজিজ রুমে ছিল। আমি সোয়া ১টায় বের হয়ে সরাসরি বাসায় ফিরে আসি।

বিকেল ৪টায় বের হলাম।

ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউটে শামসুল হকের সঙ্গে দেখা করলাম। সে জানালো আমাকে কথা দেয়া সত্ত্বেও সে আমার জন্য টাকার ব্যবস্থা করতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার পথে কিশোর মেডিকেল হলে ডাক্তার করিমের সঙ্গে দেখা করলাম। তাকে মাইক বিক্রির ব্যবস্থা করতে বললাম।

বিকেল সোয়া ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিট পর্যন্ত ক্লাস করলাম।

বন্যার কারণে ছাত্রদের ক্লাস শেষে বাড়ি ফিরতে অসুবিধার কথা বিবেচনা করে সাময়িক একটি ক্লাস কমিয়ে দেয়া হয়েছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/23/1563860434524.jpg
বঙ্গতাজ শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ

 

বাসে করে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বাসায় ফিরলাম। রাত সাড়ে ৮টায় আওয়ামী লীগ অফিসে গেলাম। রাত ৯টা ২৫ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। কিন্তু বৃথা, কেউ-ই এলেন না। বন্যা ত্রাণ কমিটির একটি সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। গতকাল রাতের মতো আজ রাতেও আমি বৃথাই এখানে সময় কাটালাম। পরে বাসায় ফিরে এলাম। রাত ১১টায় ঘুমাতে গেলাম।

আবহাওয়া: আলোকিত দিন। রাত এবং দিন গরম। রাতের প্রথম ভাগে বাতাস ছিল। কিন্তু তারপর বাতাস থেমে যায়। বাকি রাত ঘাম ঝরানো গরম। গতকাল বুড়িগঙ্গার পানি সামান্য বেড়েছে। ময়মনসিংহ এবং উত্তরবঙ্গের জেলাসমূহ থেকে পানি সরে যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

জনকল্যাণ ভাবনায় রাজনীতি করলে কী রকম প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় তার একটা নমুনা এই ডায়েরিতে আছে। বোঝা যায় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা এবং বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের পর সরকার গঠনের মত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত যে তিনি নিতে পেরেছিলেন সেটা তাৎক্ষণিক কোনো ঘটনা নয়, এটা তাজউদ্দীন আহমদের পুরো জীবনের রাজনৈতিক অনুশীলনের ফল। তাঁর রাজনৈতিক অধ্যবসায় ও অনুশীলন ছিল বিষ্ময়কর রকম লক্ষ্যভেদি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তার সাফল্যজনক নেতৃত্বই সেটা প্রমাণ করেছে।

১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই জন্ম নেয়া তাজউদ্দীন আহমদের ৯৪তম জন্মবার্ষিকীর দিনে তাই মনে হয়, বাংলাদেশকে যদি আমরা সত্যিকার অর্থে বড় দেখতে চাই, জনগণের জীবনমানের গুণগত উন্নতি দেখতে চাই, তবে তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত গুণের একটা সামষ্টিক অনুশীলনের চেষ্টা আমাদের চালাতেই হবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সামনে তার কর্ম ও জীবনকে আরও শক্তিমত্তা এবং সততার সাথে তুলে ধরতে হবে।

শুভ কিবরিয়া: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক এবং সদস্য, তাজউদ্দীন আহমদ পাঠচক্র পরিচালনা পর্ষদ

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র