Barta24

শুক্রবার, ২৩ আগস্ট ২০১৯, ৮ ভাদ্র ১৪২৬

English

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

মিয়ানমারের অনীহা ও বিশ্ব মোড়লদের উদাসীনতা

মিয়ানমারের অনীহা ও বিশ্ব মোড়লদের উদাসীনতা
এরশাদুল আলম প্রিন্স, ছবি: বার্তা২৪
এরশাদুল আলম প্রিন্স


  • Font increase
  • Font Decrease

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে চায় না। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে চাইলে তাদের মেরে দেশ থেকে বিতাড়ন করতো না। দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা থাকলে পুরো একটি জনগোষ্ঠীর ওপর এভাবে কেউ নির্যাতন নিপীড়ন চালায় না।

সম্প্রতি তিন দেশ সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী আর রাখঢাক না রেখেই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারের অনীহার কথাটি প্রকাশ করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে আমাদের সব চেষ্টাই কি শেষ হয়ে গেছে? আর কি কোনো উপায়ই নেই?

একথা সত্য, আপাত দৃষ্টিতে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে দিতে বাংলাদেশ কম চেষ্টা করেনি। তবে আন্তর্জাতিক পরিসরে হয়তো আরও কিছু করার ছিল। বাংলাদেশ মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখলে হয়তো একটা সমাধানের পথ বের হতো। কিন্তু আমরা নিজের ব্যর্থতাই হোক অথবা বিশ্ব মোড়লদের সঙ্গে রাগ-গোস্বা করেই হোক, অব্যাহত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা থেকে পিছু হটেছি। এটি মিয়ানমারকে সুবিধা দিয়েছে। মিয়ানমার তলে তলে তার কাজটি ঠিকই করে গেছে।

মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের জন্য যে বদ্ধ পরিকর ছিল এটি পরিষ্কার। এটা তাদের দীর্ঘ দিনের পরিকল্পনারই বাস্তবায়ন মাত্র। ফলে বাংলাদেশের জন্য মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার কোনো বিকল্প ছিল না। এর একটি বড় প্রমাণ হলো, অব্যাহত চাপের ফলেই মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে একটি চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছে। যদিও এটি আগেই বোঝা গিয়েছে যে মিয়ানমার ওই চুক্তিটি করেছে মূলত তাদের ওপর চাপ প্রশমনের একটি কৌশল হিসেবেই। সে কৌশলে মিয়ানমার জয়ী হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ চুক্তি বাস্তবায়ন তথা আন্তর্জাতিক পরিসরে মিয়ানমারের ওপর কার্যত চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে পারেনি। সেটি করতে পারলে হয়তো মিয়ানমার পিছু হটতো। কিন্তু আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল, আমরা ‘বিশ্ব মোড়ল’ বা ‘বড় ভাই’দের কাউকেউ সঙ্গে পাইনি।

সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী মিয়ানমার বাংলাদেশ থেকে দুই বছরের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। শরণার্থীরা আসা শুরু করেছে প্রায় দুই বছর হয়ে গেল। কিন্তু এখনও উল্লেখ করার মতো কোনো রোহিঙ্গা নিজে দেশে ফেরত যায়নি। এর মূল কারণ, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে মিয়ানমারের অনীহা ও বিশ্ববাসীর উদাসীনতা।

আমাদের সবচেয়ে পরীক্ষিত বন্ধু বলে খ্যাত ভারতও রোহিঙ্গা প্রশ্নে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায়নি চীন ও জাপান। ট্রাম্পতো আগেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন আর পুতিনও সে পথেই গিয়েছেন। ফলে রোহিঙ্গা প্রশ্নে বাংলাদেশে বিশ্ব একা। কেউ কেউ কিছু তাৎক্ষণিক খয়রাতি সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এসেছে। কিন্তু বিশ্ববাসীর বুঝতে হবে, ১১ লাখ মানুষের ভরনপোষণ দুই টন গম, এক টন খেজুর আর দুই বান্ডেল ঢেউ টিনের কাজ না।

বিশ্ব মোড়ল এমনকি মুসলিম দেশগুলোর এমন উদাসীনতা দেখে প্রধানমন্ত্রী তার সেই হতাশাই ব্যক্ত করেছেন মাত্র। মুসলিম দেশগুলোও রোহিঙ্গাদের মতো একটি মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য এগিয়ে আসেনি। মুসলিম বিশ্ব একসঙ্গে মিয়ানমারকে একটি ধমকও দিতে পারেনি। পারবে কীভাবে তাদের নিজেদের মধ্যেই ঐক্য নেই। প্রধানমন্ত্রী শুরু থেকেই মুসলিম দেশগুলোকে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে আহবান জানিয়েছিলেন, কিন্তু কিছুতেউ কেউ রা করেনি। না বিশ্ব মোড়ল না মুসলিম উম্মাহ। তাই গত ১ জুন প্রধানমন্ত্রী এক রকম বাধ্য হয়েই ওআইসি সম্মেলনে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের প্রসঙ্গ টেনেছেন। এ ব্যাপারে তিনি মুসলিম দেশগুলোর কাছ থেকে অন্তত কারিগরি সহায়তা যেন পান, সেই আহ্বান জানান।

আরও পড়ুন: রোহিঙ্গা নিয়ে মিয়ানমার মিথ্যাচার করছে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

মিয়ানমার চাপ প্রশমনের কৌশল হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করেছে। চাপ শেষ, চুক্তিও খতম। অং সান সু চি বহুদিন ঘাপটি মেরে বসেছিলেন। হঠাৎ করে তিনি সম্প্রতি চেক প্রজাতন্ত্র ও হাঙ্গেরি সফর করেছেন। সেখান সু চি ও চেক নেতা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, তাদের দুই দেশ তথা দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ‘অভিবাসন’। শুধু তাই নয়, তারা আরও বলেছেন, দুই অঞ্চলেই মুসলিম জনগোষ্ঠীর অব্যাহত সংখ্যা বৃদ্ধি’ এক বড় চ্যালেঞ্জ। এর মানে তারা দক্ষিণ এশিয়া মুসলিম অভিবাসীদের একটি সমস্যা হিসেবে দেখছেন। ‘মুসলিম জনগোষ্ঠী’ বলতে তারা মূলত এখানকার রোহিঙ্গাদের বোঝাচ্ছেন। একেই বলে চোরের মায়ের বড় গলা। যে সমস্যার সৃষ্টি করলো সুচি, অথচ সে সমস্যার জন্যই তিনি দুষছেন রোহিঙ্গা তথা এ অঞ্চলের মুসলিমদের।

পৃথিবীর নিকৃষ্টতম জাতিগত সংঘাত ও বিদ্বেষের জননী ‍সু চি। শুধু জাতিগত নিপীড়নই নয়, একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার সব রকম চেষ্টাই করেছেন তিনি। পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম নজির সু চির আগে শুধু হিটলারই সৃষ্টি করতে পেরেছেন। মৃত হিটলার আজও ঘৃণীত। অথচ সু চি আজও শান্তির দূত! নোবেল পদকপ্রাপ্ত। যে সমস্যার সৃষ্টি করেছেন ‍সুচি, আগুন লাগিয়েছেন সু চি, অথচ হাঙ্গেরি গিয়ে তিনি দুষছেন দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের। এটাই পরিহাস!

হিটলারের প্রচারমন্ত্রী ছিলেন গোয়েবলস। মিথ্যাকে গোয়েবল শৈল্পিক কায়দায় প্রচার করতেন। মিথ্যার রাজনীতিতে গোয়েবলরা আজও অপরিহার্য। কিন্তু সুচির গোয়েবলসও লাগে না। তিনি নিজেই সে কাজটি করে চলেছেন। মিয়ানমার যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিচ্ছে না এটা জলবৎ তরলং। কিন্তু তিনি শরণার্থী প্রত্যাবাসন না হওয়ার দোষ চাপাচ্ছেন বাংলাদেশের ওপর। শুধু তাই নয়, অন্যান্য দেশের নেতারা তার কথা বিশ্বাসও করছেন। এক চেক মন্ত্রী রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন ও প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে বাংলাদেশর উদাসীনতাকে দায়ী করেছেন।

অস্বীকার করা যাবে না, বর্তমান বিশ্ব কূটনীতিতে মিডিয়া একটি বড় নিয়ামক। ন্যায়-অন্যায় যাই হোক, নিজ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য গণমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা চালাতে হয়। যার অন্যায় যতো বড় তার প্রচারণাও ততো বেশি। সুচিও তাই করেছেন। দেশে বিদেশে একের পর মিথ্যা বয়ান করে যাচ্ছেন। এসব মিথ্যাচারের জন্য সুচিকে আমরা নিন্দা করতে পারি। কিন্তু স্বীকার করতে হবে, এটাই ছিল তাদের কূটনৈতিক কৌশল এবং এতে তারা জয়ী হয়েছে। কিন্তু আমরা বিশ্ব মোড়লদের সঙ্গে গোস্বা করে হারের আগেই হার মেনে বসে আছি। পৃথিবীর বুকে নিকৃষ্টতম মানবাধিকার হরণের তথ্যচিত্র আমরা বিশ্ববাসীর নজরে আনতে পারিনি, প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারিনি। কোনো ‘বড় ভাই’দের পাশে পাইনি।

মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার জন্য তাদের মেরেকেটে ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত না হলে তারা ফিরতে চাইবে না এটাই স্বাভাবিক। মিয়ানমার চুক্তি অনুযায়ী সে ব্যবস্থা করার কথা। কিন্তু তারা তা করছে না। রোহিঙ্গারাও ফিরছে না। ফলে, আমরা বলতেই পারি, মিয়ানমারের সঙ্গে এ চুক্তিটি আমাদের পক্ষে যায়নি। এটি মিয়ানমারের কূটনৈতিক কৌশলের অংশমাত্র।

মিয়ানমার তার দৌড়ঝাঁপ চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা মাঠে নাই। ফলে, আমাদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতেই হবে। মিয়ানমারের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে হবে। চীন, ভারত, রাশিয়া, ফ্রান্স, জাপানসহ অপরাপর দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে হবে। বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গেও গভীর যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন :

উচ্চশিক্ষার গুণগত পরিবর্তন এবং বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাকিং উন্নয়নে প্রস্তাবনা

উচ্চশিক্ষার গুণগত পরিবর্তন এবং বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাকিং উন্নয়নে প্রস্তাবনা
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার রয়েছে এক সুদীর্ঘ ইতিহাস পরিক্রমা। বলা যায়, আধুনিক চিন্তা-চেতনা ও ধ্যান- ধারণার ভিত্তিতে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার যাত্রা শুরু হয়। তবে ১৪০০-২০০০ বছর পূর্বের এ অঞ্চলের পুন্ড্রনগর (বর্তমান মহাস্থানগড়), পাহাড়পুর ও ময়নামতির বৌদ্ধ মঠগুলোতে আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষার নিদর্শন পাওয়া যায়। প্রখ্যাত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান বাংলাদেশ থেকে বেশি দূরে নয় এবং সপ্তম শতাব্দীতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ছিলেন শীলাভদ্র নামক একজন বাঙালি। বর্তমানে বাংলাদেশে আমরা উচ্চশিক্ষা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহান ঐতিহ্যের গর্বিত উত্তরাধিকারী। তবে, এ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা হয়নি। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশে (পূর্ববাংলা) শিক্ষার উন্নয়নের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। ব্রিটিশ শাসনামলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল বাংলাদেশ নামক এ ভূখণ্ডে একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়। তবে ১৯৫৩-১৯৭০ সময়কালে পাকিস্তান আমলে আরও পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশ স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর শিক্ষার্থী সংখ্যা উল্লেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ দেশকে একটি মেধাসম্পন্ন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ উন্নত জাতি গড়ার লক্ষ্যে স্বাধীনতা লাভের পর পরই ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর (প্রথম বিজয় দিবস) বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন প্রতিষ্ঠা করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি উচ্চশিক্ষার প্রতি তাঁর সর্বোচ্চ প্রাধান্য ও প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি জাতির সামনে তুলে ধরেন। উচ্চশিক্ষার প্রসার ও মানসম্মত উন্নয়নই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে আসীন করার পথকে সুগম করবে।

বিশ্বব্যাপী যখন অর্থনৈতিক মন্দা অব্যাহত রয়েছে, বাংলাদেশ তখন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ৭ থেকে ৮ শতাংশ স্থিতিশীল জিডিপি অর্জন করেছে। উচ্চ সম্ভাবনা এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি বাংলাদেশকে পরবর্তী এগারোটি সম্ভাবনাময় দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিশ্বে ৭ম জনবহুল (১৬০ মিলিয়ন) দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ সামাজিক ক্ষেত্রে ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি)-এর অধিকাংশই অর্জন করেছে। এ দেশের ১৫ থেকে ৩৫ বছরের আশি মিলিয়ন (আট কোটি) যুবশক্তিকে আধুনিক জ্ঞান ও দক্ষতা এবং উচ্চ শিক্ষার মাধ্যমে গড়ে তোলা সম্ভব হলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অর্জিত হবে। এজন্য সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে স্বাক্ষরতার হার ৬৩.০৮ শতাংশ এবং উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১২ শতাংশের অধিক। উচ্চশিক্ষা স্তরে এ বৃদ্ধি বিস্ময়কর। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা স্তরে ২০০৯ সালের ১.৬ মিলিয়ন শিক্ষার্থী বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৯ সালে ৩.৮ মিলিয়ন শিক্ষার্থীতে উন্নীত হয়েছে যা একটি কোয়ান্টাম জাম্প। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চশিক্ষার এ ব্যাপক বিস্তার ও সম্প্রসারণ শিক্ষা ও গবেষণার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। এটি স্পষ্ট যে, উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে এ দেশের উদীয়মান বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সমৃদ্ধি পূর্ব এশিয়া এবং নর্ডিক অঞ্চলের দেশসমূহে দৃশ্যমান। এ  দেশের শিক্ষা বিশেষকরে উচ্চ শিক্ষায় গুণগতমান বৃদ্ধির জন্য একটি পদ্ধতিগত বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিং ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম।

বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিং-এর গুরুত্ব :

বিগত কয়েক দশকে বিশ্বব্যাপী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে এসকল প্রতিষ্ঠানসমূহের পদ্ধতিগত র‌্যাংকিং শিক্ষার গুণগতমান উন্নয়নের জন্য অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে। এজন্য বিভিন্ন র‌্যাংকিং যেমন-একাডেমিক র‌্যাংকিং অব ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিজ (এআরডব্লিউইউ), টাইমস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিংস, ওয়েবোমেট্রিকস র‌্যাংকিং, কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিং ইত্যাদি বিশ্বব্যাপি চালু হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ও সম্প্রসারণ ঘটেছে যা অতীতে কখনোই ঘটেনি।

ইউনেস্কোর মতে, উচ্চশিক্ষাস্তরের গবেষণায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় সব ধরনের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত হবে যা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকবৃন্দ প্রদান করবেন। সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য অধিভুক্ত কলেজসমূহ প্রতিবছর গ্রাজুয়েট তৈরি করে যারা দেশের অর্থনৈতিক গতিকে ত্বরান্বিত করতে ভূমিকা রাখেন।

 

নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, সম্প্রসারণ, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার চাহিদা নিরূপণ, উচ্চশিক্ষার উন্নয়ন ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়নের লক্ষ্যে ১৬ডিসেম্বর (প্রথম বিজয় দিবস) ১৯৭২ সালে প্রথম বিজয় দিবস-এ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ১৯৭৩ সালের রাষ্ট্রপতির ১০ নং আদেশে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে তিনভাগে ভাগ করা যেতে পারে, যথা :(১) সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়: এটি সরকারি অর্থায়নে ও সহায়তায় পরিচালিত হয় (২) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়: এটি বেসরকারি খাতে উচ্চশিক্ষা প্রদানকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যা বোর্ড অব ট্রাস্টিজ কর্তৃক পরিচালিত (৩) আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়: এটি ওআইসি‘র মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক আর্থিক অনুদান পেয়ে থাকে। দেশে বর্তমানে মোট ১৫৫টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। তন্মধ্যে ৪৯টি সরকারি, ১০৪টি বেসরকারি ও ০২টি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে।

জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে উচ্চশিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদি শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তাহলে সমগ্র জাতির জীবনে দুর্ভোগ নেমে আসে। কাজেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যথার্থ র‌্যাংকিং পদ্ধতি অত্যাবশ্যক। সর্বমহলে গৃহীত র‌্যাংকিং পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন, সঠিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন, আর্থিক সুবিধা অর্জন, নতুন গবেষকদের গবেষণা কর্মকাণ্ড পরিচালনায় সহায়তা এবং প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে গঠনমূলক প্রতিযোগিতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে। বিশ্বে একাধিক র‌্যাংকিং পদ্ধতি চালু রয়েছে। যেমন : দি টাইমস হায়ার এডুকেশন সাপ্লিমেন্ট, ‘ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিংস (দি র‌্যাংকিং)’, কোয়াককোয়ারেলি সিমন্ডস (কিউএস), ‘ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিংস’, দি সাংহাই জিয়াও টং ইউনিভার্সিটি, ‘একাডেমিক র‌্যাংকিং অব ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিজ (এআরডব্লিউইউ)’, ওয়েবোমেট্রিকস র‌্যাংকিং অব ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিজ, ওয়েবোমেট্রিকস র‌্যাংকিং (স্প্যানিস ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিল কর্তৃক প্রকাশিত), দি গার্ডিয়ান হায়ার এডুকেশন নেটওয়ার্ক, ইউনেস্কো র‌্যাংকিংস এন্ড একাউন্টেবিলিটি ইন হায়ার এডুকেশন, ইউএস নিউজ এডুকেশন, ইউনিভার্সিটাস ২১ এবং এনটিইউ র‌্যাংকিং।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদশের মতো একটি উদীয়মান দেশে মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা –এ ১৭টি সূচকে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রার চতুর্থ ও অন্যতম গূরুত্বপূর্ণ সূচক হলো শিক্ষা। বর্তমান সরকার শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞান অর্জন, বৈশ্বিক চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভাবনমূলক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা, শিক্ষা সহায়ক বিভিন্ন পর্যায়ে নীতিনির্ধারণে বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহকে আধুনিকভাবে গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছে। সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণেও কাজ করে চলেছে। তবে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে র‌্যাংকিং পদ্ধতি চালু হয়নি। কাজেই বাংলাদেশে একটি যথোপযুক্ত র‌্যাংকিং পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। গুণগত মানসম্পন্ন পাঠদান নিশ্চিতসহ শিক্ষার অন্যান্য ক্ষেত্রে মান বজায় রাখতে র‌্যাংকিং পদ্ধতি জরুরি।এই র‌্যাংকিং পদ্ধতি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের মধ্যে সুষম প্রতিযোগিতা গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। একটি দেশে যথার্থ র‌্যাংকিং পদ্ধতি না থাকলে উচ্চশিক্ষাকে এগিয়ে নেয়া যায় না। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন এবং সদ্য প্রতিষ্ঠিত অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল যৌথভাবে র‌্যাংকিং পদ্ধতি চালু করতে পারে।  অনেকগুলো মানদণ্ডের ভিত্তিতে র‌্যাংকিং পদ্ধতি হওয়া উচিত।

সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের জন্য উপকারী হবে এমন একটি র‌্যাংকিং পদ্ধতি চালু করাই আমাদের লক্ষ্য। প্রস্তাবিত মেথোডোলজিতে গবেষণা, ফ্যাকাল্টি, প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা ও অবকাঠামো, বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম, অ্যালামনাই, চাকরির বাজারে প্রবেশে শিক্ষার্থীদের কর্মদক্ষতা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ইত্যাদি সূচক ব্যবহৃত হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিং উন্নয়নের জন্য প্রস্তাব

১। আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিং পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী, তথ্য ও ডকুমেন্টেশন ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রশিক্ষণের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে এবং তা সময়মত আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিং কর্তৃপক্ষ, ইউজিসি‘র নিকট পেশ করতে হবে। একইসাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট হালনাগাদ করতে হবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইকিইউএসি (ইন্সটিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল) এ লক্ষ্যে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে।

ক. আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিং নির্ধারণে যে সূচক ব্যবহৃত হয় তার সাথে সঙ্গতি রেখে শিক্ষা ও গবেষণা সংক্রান্ত অভিন্ন তথ্যাদি সংবলিত ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে।

খ. প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গবেষণা ব্যবস্থাপনা এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্র চালু করতে পারে।

গ. সমন্বিতভাবে গবেষণা কার্যক্রম এগিয়ে নিতে জাতীয় গবেষণা কাউন্সিল গঠন করা যেতে পারে।

ঘ. আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিং পদ্ধতির চ্যালেঞ্জসমূহ শনাক্তকরণ।

ঙ. শীর্ষ স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের র‌্যাংকিং এর ক্ষেত্রে সুনাম একটি র‌্যাংকিং সূচক হতে পারে, কারণ একই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোকে এর মাধ্যমে পৃথক করা খুবই সহজ।

চ. শিল্প প্রতিষ্ঠানের চাহিদা পূরণে উচ্চমানসম্পন্ন গ্রাজুয়েট তৈরিতে বিশ্ববিদ্যালয়কে কাজ করতে হবে।

ছ. প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পারফরমেন্স এর ভিত্তিতে র‌্যাংকিং নির্ধারিত হবে। কাজেই প্রতিষ্ঠানসমূহকে তাদের স্ব স্ব অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ সেবা প্রদান করতে হবে।

জ. বর্তমানে বিশ্ব প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে আরও দক্ষতার সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে উচ্চমানসম্পন্ন তথ্য প্রযুক্তি সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

২. প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়-এর অনুষদভিত্তিক ও বিষয়ভিত্তিক মূল্যায়নের জন্য অভ্যন্তরীণ র‌্যাংকিং পদ্ধতি প্রবর্তন করতে হবে। এ ধরনের র‌্যাংকিং পদ্ধতি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি এবং স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানকে তাদের কর্মকাণ্ডে  উৎসাহ যোগাতে ভূমিকা রাখবে।                

ক. প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় অভ্যন্তরীণ র‌্যাংকিং পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করবে যার মাধ্যমে তারা প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব  গড়ে তুলবে।               

খ. বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে র‌্যাংকিং পদ্ধতি চালুর লক্ষ্যে কোয়ালিটি ম্যাট্রিক্স এন্ড মেথডস ক্রাইটেরিয়া সনাক্ত করতে হবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় এই পদ্ধতিতে অবশ্যই মূল্যায়িত হবে।

গ. বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক অবস্থা নিশ্চিতকল্পে বিভিন্ন মানদ- এবং কৌশল সনাক্ত করতে হবে।

ঘ. দেশের বাইরে যেসকল শিক্ষাবিদরা কাজ করছেন তাদেরকে শিক্ষাসংক্রান্ত কাজে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাদের প্রকাশনা ও উপস্থাপনা এদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত করতে হবে।

ঙ. প্রবাসী বাংলাদেশিদেরকে গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য শ্রেণিভুক্ত করা যেতে পারে।

চ. সাইটেশন বা উদ্ধৃতিকরণ র‌্যাংকিং এর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শিক্ষকগণের আন্তর্জাতিক মানের মৌলিক গবেষণা বিভিন্ন দেশি-বিদেশি জার্নালে প্রকাশিত হলেও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জর্নাল  সিস্টেম যেমন : স্কোপাস, ওয়েব অব সাইন্স, আইএসাই,গুগোল স্কলার বা রিসার্চগেটে অন্তর্ভুক্ত না করায় মৌলিক গবেষণাকর্ম হওয়া সত্ত্বেও এর সাইটেশন এর পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ফলে র‌্যাংকিং এর ক্ষেত্রে এ সূচকে গবেষক/বিশ্ববিদ্যালয় পর্যাপ্ত ক্রেডিট থেকে বঞ্চিত হয়। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষকগণকে আরও সচেষ্ট হতে হবে।

উচ্চশিক্ষার গুণগতমান বৃদ্ধি

শিক্ষাই জাতীর মেরুদণ্ড। আর উচ্চশিক্ষা একটি জাতীর অর্থনীতির চালিকাশক্তি। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে উচ্চ গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষা ছাড়া একটি জাতীর পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব নয়। উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশে গুণগত মানসম্পন্ন গ্রাজুয়েট বড়ই প্রয়োজন। গুণগত মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা শিক্ষার্থীদের মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান ও উন্নত জীবনব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে সহায়তা করে।

বাংলাদেশে অধিকাংশ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকার কর্তৃক পরিচালিত হয়ে আসছে। উচ্চশিক্ষায় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের চাহিদা পূরণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা অপ্রতুল হওয়ায় পরবর্তীতে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বিগত দশকগুলোতে এই ধারা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। ইউজিসি’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে ৪৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ১০৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ০২টি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা শুধুমাত্র এর সংখ্যাগত দিক বৃদ্ধি করলেও সে অনুযায়ী মান বৃদ্ধি করেনি। আমাদের প্রচলিত ধারণা, এদেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা উন্নতমানের। র‌্যাংকিং পদ্ধতি শিক্ষার্থী এবং গবেষকদের বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে দিকনির্দেশনা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

দেশের উচ্চশিক্ষা উন্নয়নের জন্য প্রস্তাবিত উদ্যোগ নিম্নরূপ:

ক. গবেষণা ও উন্নয়নের সংস্কৃতি অভিযোজনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নতুন নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে হবে।

খ. ইউজিসি মানসম্পন্ন পাঠদান, গবেষণা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় দক্ষ গ্রাজুয়েট তৈরির ক্ষেত্রে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে লক্ষ্যভিত্তিক এ্যাপ্রোচ চালু করবে। এই লক্ষ্যভিত্তিক এ্যাপ্রোচকে প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মদক্ষতা ও তহবিল বরাদ্দের সাথে সংযুক্ত করতে হবে।

গ. গবেষণার ফলাফল নির্দিষ্ট ক্রাইটেরিয়ার (প্রকাশিত জার্নাল, কনফারেন্স, হাই ইমপ্যাক্ট জার্নালস এবং কমার্শিয়ালাইজেশন ইত্যাদি) ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা যেতে পারে।

ঘ. গ্রাজুয়েটদের চাকরির বাজারে প্রবেশের জন্য কোর্স-কারিকুলাম, জ্ঞান, দক্ষতার উন্নয়নের লক্ষ্যে কাঠামোবদ্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা স্থাপন করতে হবে। ৪-৬ মাস এর বাধ্যতামূলক ও কার্যকরি ইন্টার্নশিপ চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে গ্রাজুয়েটদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারে।

ঙ. শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের জন্য ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, নতুন পাঠদান পদ্ধতি, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা এবং প্রশিক্ষণের ফলাফল নিয়মিত মূল্যায়ন ও তদারকি করতে হবে।

চ. কাঙ্খিত উচ্চশিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার গঠনের জন্য যোগ্যতা অনুযায়ী তাদের পরিচালনার লক্ষ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে।

ছ. ফলাফল ভিত্তিক শিক্ষা (আউটকাম বেজড এডুকেশন) এর আলোকে বিভিন্ন ডিগ্রির যোগ্যতা সনাক্তকরণের জন্য পদ্ধতি চালু করতে হবে।

জ. প্রয়োজনীয় শর্তারোপ করে স্থায়ী সনদপ্রাপ্ত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে চয.উ প্রোগাম চালু করা যেতে পারে। যে বিষয়ে চয.উ প্রদান করা হবে সে বিষয়ে কমপক্ষে ০৫ জন চয.উ ডিগ্রিধারী পূর্ণকালীন অধ্যাপক থাকতে হবে এবং প্রত্যেক অধ্যাপকের ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে অন্তত ১০টি প্রকাশনা থাকতে হবে (এটি প্রতি বছর প্রযোজ্য হবে)।

ঝ. গবেষণা, উন্নয়ন ও এর বাজারজাতকরণের জন্য ওছঅঈ এর মতো প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউনিভার্সিটি ইনোভেশন এন্ড ইনকিউবেশন সেন্টার (ইউআইআইসি) চালু করা যেতে পারে।

ঞ. পুরস্কার, স্বীকৃতি ও আর্থিক প্রণোদনার মাধ্যমে গবেষণা ও এর বাজারজাতকরণ সংস্কৃতি ত্বরান্বিত করতে হবে।

ট. শিক্ষকদের গবেষণালব্ধ ফলাফল আন্তর্জাতিকমানের জার্নালে (হাই ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নাল/ইনডেক্স জার্নালে) প্রকাশিত হলে গবেষক এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগকে আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করা যেতে পারে।

ঠ. শিল্প-প্রতিষ্ঠানের সাথে ২-৫ বছরের কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা যেতে পারে।

ড. একাডেমিক এক্সিলেন্সের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বজনবিদিত সুনাম বৃদ্ধি করতে হবে।

ঢ. যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগ প্রদানের মাধ্যমে গবেষণা ও শিক্ষার মান বৃদ্ধি করতে হবে।

ণ. জাপানের আদলে বাংলাদেশের শিল্পনীতিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে যাতে করে শিল্প-প্রতিষ্ঠানসমূহ বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের গবেষণায় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ব্যয় করবে।

বাংলাদেশ সম্প্রতি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অন্যতম কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছে। এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন প্রতিযোগিতা এবং প্রযুক্তি প্রদর্শনীতে ক্রমাগত সাফল্য বজায় রাখছে। দেশের তরুণ প্রজন্মকেদক্ষ মানবসম্পদ এবং উদ্যেক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকার ইতোমধ্যেই কয়েকটি বিষেশায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনির্ভাসিটি ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার তৃতীয় এবং বিশ্বে ১২তম মেরিটাইম ইউনির্ভাসিটি।এছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনির্ভাসিটি২০১৬ সালে যাত্রা শুরু করে এবং বঙ্গবন্ধু এভিয়েশন এন্ড এ্যারোস্পেস ইউনির্ভাসিটি প্রতিষ্ঠা বিল ২০১৯ সালের ২  ফেব্রুয়ারি মহান জাতীয় সংসদে পাস হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে এক বিকাশমান দেশ। অদূর ভবিষ্যতে এর র‌্যাংকিং আরও উচ্চমানে উন্নীত করা এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাকে আরও বেশি গতিশীল করার পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের র‌্যাংকিং একটি দেশ ও জাতির উচ্চশিক্ষার উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির মধ্যে অন্যতম। আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিংয়ের বিষয়ে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো অবস্থান সৃষ্টি করতে পারেনি। এমনকি র‌্যাংকিং আপগ্রেড করার জন্য যথোপযুক্ত মেথোডলজি তৈরি করা সম্ভবপর হয়নি। এই প্রস্তাবটি প্রথমবারের মতো একটি প্রাথমিক কাঠামোর অবতারণা করেছে যা যেকোন র‌্যাংকিং পদ্ধতির জন্য ব্যবহারোপযোগী হতে পারে এবং উচ্চশিক্ষার গুণগত পরিবর্তন আনতে পারে।

লেখক: প্রফেসর ড. মোঃ সাজ্জাদ হোসেন, সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন

২১ আগস্ট: বাংলাদেশের রাজনীতির স্থায়ী বিভক্তি রেখা

২১ আগস্ট: বাংলাদেশের রাজনীতির স্থায়ী বিভক্তি রেখা
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

বাংলাদেশের রাজনীতির দুটি ধারা- আওয়ামী লীগ এবং এন্টি আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতার আগে এন্টি আওয়ামী লীগ ধারার নেতৃত্ব ছিল মুসলিম লীগের হাতে, স্বাধীনতার পর এন্টি আওয়ামী লীগ ধারার নেতৃত্ব হাতে তুলে নেয় জাসদ। আর ৭৫এর পর থেকে এই ধারাটির নেতৃত্ব বিএনপির হাতে। রাজনীতিতে দুটি ধারা থাকা অস্বাভাবিক বা অভূতপূর্ব নয়। বরং এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই রাজনীতির একাধিক ধারা রয়েছে। তবে আদর্শিক ভিন্নতা থাকলেও সব দেশেই দুই ধারার রাজনীতির মধ্যে আলাপ-আলোচনা, স্বাভাবিক সৌজন্য, ক্ষমতার পালাবদল ইত্যাদি থাকে। আমাদের দেশেও ছিল, এখন আর নেই। নেই কেন? সেই প্রশ্নের উত্তর খুজতেই আজকের লেখা।

বাংলাদেশের রাজনীতির সকল বিভক্তি আগস্টে। বিভক্তি রেখা দুটি- ১৫ আগস্ট আর ২১ আগস্ট। আগস্ট মানেই যেন শোক আর বেদনা। ৭৫এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেছিল ঘাতকরা। বেঁচে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঘাতকরা তাদের অসমাপ্ত কাজ শেষ করার মিশনে নেমেছিল। নেতারা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানবঢাল হয়ে শেখ হাসিনাকে বাঁচাতে পেরেছেন। তবে আইভি রহমানসহ ২৪ জন মারা গেছেন নির্মম এই গ্রেনেড হামলায়। আগস্টের এই দুই নির্মম তারিখ আমাদের রাজনীতিতে স্থায়ী বিভক্তি রেখা টেনে দিয়েছে। যদিও ১৫ আগস্টের দায় চাইলে বিএনপি এড়াতে পারতো। কারণ ৭৫এর ১৫ আগস্ট বিএনপির জন্ম হয়নি। শেষ পর্যন্ত ১৫ আগস্টের মূল বেনিফিশিয়ারি জিয়াউর রহমানই বটে, তবুও বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে তার সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলেনি। কর্নেল ফারুক ৭৫এ একবার উপসেনা প্রধান জিয়াউর রহমানের সাথে দেখা করে সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষের কথা বলেছিলেন। জিয়া তাকে, তোমরা জুনিয়র অফিসাররা কিছু করো, জাতীয় হালকা উস্তানি দিয়ে বিদায় করেছিলেন এবং সতর্ক জিয়া পরে আর ফারুক গংকে অ্যালাউ করেননি। জিয়াউর রহমান চাইলে জুনিয়র অফিসারদের অসন্তোষের কথা সিনিয়রদের জানাতে পারতেন। তা না করে তিনি সুযোগের অপেক্ষায় থাকলেন। সুযোগটা তিনি পেয়েও গেলেন। নানা ঘটনার পর ৭৫এর ৭ নভেম্বর ক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন জিয়াউর রহমান।

১৫ আগস্ট সকালে রাষ্ট্রপতি হত্যার খবর শুনে শেভ করতে করতে নির্বিকার কণ্ঠে জিয়া বলোছিলেন, 'সো হোয়াট। ভাইস প্রেসিডেন্ট ইজ দেয়ার। আপহোল্ড দ্যা কনস্টিটিউশন।' জিয়ার প্রতিপক্ষের লোকজন বলেন, রাষ্ট্রপতির হত্যার খবর শুনে উপসেনা প্রধান হিসেবে তার যা দায়িত্ব ছিল তা পালন করেননি। অন্য সবাই যখন খবর শুনে রাতের পোশাকে সেনা সদরে গেছেন। জিয়াউর রহমান তখন শেভ করে, চালক নিয়ে ইউনিফর্ম পড়ে গেছেন। তার মানে তিনি ঘটনা জানতেন এবং অপেক্ষা করছিলেন। আর জিয়ার পক্ষের লোকজনের যুক্তি হলো, তিনি তো সংবিধান সমুন্নত রাখার কথা বলেছিলেন; ক্যু বা বিশৃঙ্খলা নয়। আর সেনা প্রধান থেকে শুরু করে সবাই যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়, তখন উপসেনা প্রধান কী করবেন। আর পেশাদার সৈনিক হিসেবে দ্রুত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিজেকে তৈরি করে ফেলাটা তো কৃতিত্বের। ১৫ আগস্টে জিয়াউর রহমানের যেটুকু ভূমিকা বা অবস্থান; চাইলে তিনি সেটা এড়াতে পারতেন। কিন্তু ১৫ আগস্টের খুনীদের পুনর্বাসন করে, চাকরি দিয়ে, খন্দকার মোশতাকের করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বহাল রেখে জিয়াউর রহমান বুঝিয়ে দিলেন; পরিস্থিতি যাই হোক, ১৫ আগস্টই বিএনপির রাজনৈতিক জন্ম। জিয়াউর রহমান যাই হোক, চাইলে বেগম খালেদা জিয়া ১৫ আগস্টের দায় এড়াতে পারতেন, রাজনীতিকে রাজনীতির জায়গা ফিরিয়ে আনতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা তো করেনইনি, উল্টো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ১৫ আগস্ট জন্মদিন আবিষ্কার ও ঘটা করে পালন করে বুঝিয়ে দিলেন ১৫ আগস্টই তার এবং তার দলের রাজনৈতিক জন্ম। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার শুরু করেছিল। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে আবার পুরো বিচার প্রক্রিয়া ডিপ ফ্রিজে পাঠিয়ে দেয়। ১৫ আগস্টের দায় এড়ানোর সুযোগ থাকলেও জিয়া, খালেদা, বিএনপি বারবার নানাভাবে সে দায় নিজেদের কাঁধে টেনে নিয়েছে, যা আওয়ামী লীগের সাথে বিএনপির রাজনৈতিক দূরত্ব আরো বাড়িয়েছে শুধু। তারপরও ১৫ আগস্টের বিভক্তি রেখাটা অলঙ্ঘনীয় ছিল না।

তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে স্থায়ী ও অলঙ্ঘনীয় বিভক্তি রেখা টেনে দিয়েছে ২১ আগস্ট, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। সবকিছুরই একটা নিয়ম থাকে। কিন্তু ২১ আগস্ট রাজনীতির সকল নিয়ম কানুন ভুলুণ্ঠিত করে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। দেশের বাইরে থাকায় ১৫ আগস্টের নির্মমতা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর থেকে বারবার তাঁর ওপর হামলা হয়েছে। ১৯টি হত্যাচেষ্টা থেকে তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন। তবে অন্য সব হত্যাচেষ্টার সাথে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার একটা পার্থক্য রয়েছে। ২১ আগস্টের চেষ্টাটি ছিল বেপরোয়া, মরিয়া, নিষ্ঠুর ও সুপরিকল্পিত। রাষ্ট্রযন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতায় বিরোধী দলীয় হত্যার চেষ্টা নজিরবিহীন। সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোনো হত্যা পরিকল্পনায় সম্পৃক্ত থাকতে পারেন, এটা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়। তারচেয়ে বড় কথা হলো, ২১ আগস্ট হত্যা পরিকল্পনা হয়েছিল তখনকার বিকল্প ক্ষমতা কেন্দ্র হাওয়া ভবনে এবং মূল পরিকল্পনাটা ছিল তখনকার প্রধানমন্ত্রীপুত্র তারেক রহমানের। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও, এসব এখন আদালতে প্রমাণিত সত্য।

আমরা রাজনীতিতে সমঝোতার কথা বলি, আলোচনার কথা বলি। কিন্তু যখন জানি, শেখ হাসিনাকে মারতে গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনায় ছিলেন তারেক রহমানও, তখন বুঝি কাজটা কত কঠিন। ১৫ আগস্ট যে বিভক্তির শুরু, ২১ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতির সেই বিভক্তিকে যেন স্থায়ী রূপ দিয়েছে। এই গত ১১ বছর ধরে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে মুছে ফেলার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে, তার উৎসও কিন্তু ২১ আগস্ট। আপনি যথন রাজনীতির নিয়ম ভাঙবেন, তখন আপনিও প্রতিপক্ষের কাছ থেকে নিয়ম আশা করতে পারবেন না। জানি প্রায় অসম্ভব, তবু চাই রাজনীতিটা আবার নিয়মে ফিরুক। প্রতিহিংসার জবাব প্রতিহিংসায় না হোক। রাজনীতির লড়াইটা, বিভেদটা হোক আদর্শের।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র